শুক্রবার, ২৭ জুন, ২০২৫
ঘরে বসে ভিডিও বানিয়ে টাকা আয় করার ৬টি চমকপ্রদ ফ্রি এআই টুল!
অপার্থিব বউ
✍️ Waiting byতানভীর ইসলাম |
---
সেই রাতের কথা আমি কখনো ভুলতে পারব না। শুধু আমি না, আমাদের পুরো গ্রাম এখনো ভুলতে পারেনি — শিউরে ওঠে। আমি তানভীর, পেশায় স্কুলশিক্ষক। আমাদের গ্রাম গাংনী উপজেলার একদম শেষ প্রান্তে। ২০২১ সালের মে মাসে বিয়ে হয় আমার — রুকাইয়া নামের এক মেয়ে, যাকে আমি চিনি না, জানি না। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে তাকে বিয়ে করে এনেছিলাম, আর তারপর যা ঘটেছিল, সেটা এমনকি সিনেমাতেও দেখা যায় না।
ঘটনাটা মনে হলেই শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়।
---
১. পছন্দের বাইরে এক বিয়ে
আমার পরিবার চাইছিল আমার দ্রুত বিয়ে হোক। মা বলল, “রুকাইয়া নামের মেয়ে, খুব সুন্দরী, শান্তশিষ্ট। পাশের গ্রামেই থাকে। এক দিদিমার পালিত মেয়ে।”
মেয়ে দেখতে গিয়ে আমি অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম। তার চেহারা যেন পরির মতো — ফর্সা গায়ের রং, গভীর চোখ, চুপচাপ বসে থাকা। কথা কম, কিন্তু মুখে রহস্যময় এক টান ছিল। আমি আর না করতে পারলাম না।
বিয়ে হয়ে গেল। কিন্তু এখান থেকেই শুরু হয় অস্বাভাবিকতা।
---
২. নতুন বউয়ের অদ্ভুত আচরণ
বিয়ের প্রথম রাতেই আমি খেয়াল করলাম, রুকাইয়ার হাত বরফের মতো ঠান্ডা। সে একদম চুপচাপ বসে থাকে, চোখ একদৃষ্টিতে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি যত কথা বলি, সে শুধু ছোট করে ‘হুম’ অথবা ‘না’ বলে।
তারপর এক রাতে আমি ঘুম ভেঙে দেখি, সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কিছু বলছে। কাছে গিয়ে শুনি,
“আমি ফিরে যাবো... আমি ফিরতেই এসেছি...”
আমি ভয় পেয়ে গেলাম। পরদিন জিজ্ঞেস করলে সে বলে কিছুই মনে নেই।
---
৩. গ্রামের গুজব
গ্রামের লোকজনের মুখে মুখে রুকাইয়ার বিষয়ে কথা ছড়িয়ে পড়ে। কেউ কেউ বলল, মেয়েটাকে নাকি আগে কেউ কোনোদিন দেখেইনি! পাশের গ্রামের সেই দিদিমা, যিনি মেয়েটাকে ‘তুলে এনেছিলেন’, তিনিও এক মাস পরে হঠাৎ নিখোঁজ!
আমার বন্ধুরা জিজ্ঞেস করল, “তোর বউটা রাতে মাঠে যায় কেন?” আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। আমি তো জানতাম, সে ঘরে থাকে।
একদিন রাতে পিছু নিলাম।
---
৪. মৃতের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে!
আমি রাত ২টার দিকে দেখি, রুকাইয়া ধীরে ধীরে বের হচ্ছে। আমি চুপচাপ তার পেছনে হাঁটতে লাগলাম। গ্রামের কবরস্থানের দিকে সে যাচ্ছে। গিয়ে একটা পুরনো কবরের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগল।
সে বলল,
“তুই কথা রাখিসনি হাশেম... তুই তো বলেছিলি, তুই শুধু আমার!”
আমি হতভম্ব! আমি তো হাশেম না! কে হাশেম?
সে হঠাৎ পেছনে ঘুরে আমাকে দেখে ফেলে। তার চোখ লাল, মুখ থমথমে, ঠোঁট কাঁপছে।
সে বলে,
“তুই হাশেম না... তুই মিথ্যা লোক... আমাকে আবার ফিরতে হবে...”
আমি দৌড়ে বাড়ি ফিরি।
---
৫. মৃত রুকাইয়া?
আমি যা দেখেছি, তা নিয়ে গ্রামের হুজুর ও একজন ওস্তাদ কবিরাজের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তারা আমাকে যা বললেন, তা শুনে আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল।
“তোর বউটা মানুষ না। যাকে বিয়ে করেছিস, সে সেই রুকাইয়া না। রুকাইয়া তিন বছর আগে মারা গিয়েছিল। হাশেম নামের এক ছেলের সঙ্গে প্রেম ছিল। ছেলেটা তাকে বিয়ে না করে অন্যত্র বিয়ে করায়, রুকাইয়া আত্মহত্যা করে। কবর দেয় পাশের জঙ্গলে।”
“তারপর থেকে সে ফিরে আসে প্রতিশোধ নিতে। পুরুষের মুখোশে যাকেই দেখে হাশেম মনে করে, তার সাথেই বিয়ে করে, তারপর শেষ করে...”
আমি বিশ্বাস করছিলাম না। কিন্তু এতকিছু ঘটনার পর আর অস্বীকার করতে পারলাম না।
---
৬. সত্যের মুখোমুখি
রাতে আমি রুকাইয়ার সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করি,
“তুমি কে? তুমি রুকাইয়া না, তাই না?”
সে হাসে। ঠাণ্ডা এক হাসি।
“তুই তো নিজেই বেছে নিয়েছিস আমাকে... তুইও পালাতে পারবি না।”
আমি হুজুরদের তাবিজ দিয়ে দরজায় ঝুলিয়ে রাখি। হঠাৎ সে চিৎকার করে ওঠে — তার শরীর কাঁপে, ঘরের বাতি নিভে যায়, দেয়ালের ছবিগুলো পড়ে যায়।
আমি জানি, তার ভেতর একটা আত্মা বাস করে।
---
৭. শেষ রাত
সেই রাতে তার শরীর থেকে ধোঁয়ার মতো কিছু বেরিয়ে আসছিল। সে কেঁদে বলছিল,
“তুই যদি হাশেম না হোস, তবে তুই বাঁচবি না।”
আমি তেলাওয়াত করতে লাগলাম। হুজুররা এসে পানি ছিটাল। ভোরবেলা সে ধীরে ধীরে মাটিতে গলে যেতে থাকল, ঠিক যেন কাদার পুতুল।
সে চলে গেল। কোথায়, জানি না।
---
!
গল্প: দাদার ঘটনা লেখক: ভূতের গল্প লেখক সান
আমার দাদা ছিলেন একজন সরকারি স্কুলের শিক্ষক। খুবই সম্মানী, শিক্ষিত, সোজা-সাপ্টা মানুষ। জীবনের শেষদিকে এসে স্কুল থেকে অবসর নেন। অবসরের পরে প্রথম কয়েক মাস স্বাভাবিকই ছিলেন, কিন্তু ধীরে ধীরে তার আচরণ পাল্টাতে শুরু করে। তিনি মাঝেমাঝে এমন সব কথা বলতেন, যা আমাদের পরিবারের কারো কাছেই স্বাভাবিক মনে হতো না।
প্রথম ঘটনা ঘটে এক বিকেলে। আমার চাচী রান্নাঘরে ছিল। দাদা উঠানে বসে রোদ পোহাচ্ছিল। চাচী দাদাকে বলেছিল, “খাবার বানাইতেছি, একটু পরেই আসতেছি।” কিন্তু যখন খাবার নিয়ে আসলো, তখন দাদাকে উঠানে খুঁজে পেলো না। প্রথমে ভাবলো, হয়তো ঘরে গেছেন। কিন্তু ঘরেও নেই, গোয়ালঘর, পুকুরপাড়, আশেপাশে সব জায়গায় খুঁজেও দাদার হদিস মিললো না।
প্রায় আধা ঘণ্টা খোঁজার পর, এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ে চাচীর। বাড়ির পেছনের ধানখেতের দিকে দাদা হেঁটে যাচ্ছেন— একদম মন্ত্রমুগ্ধের মত, পা টানতে টানতে। চাচী চিৎকার করে ডাকতে থাকলেও দাদা থামেন না। শেষমেশ দৌড়ে সামনে গিয়ে চাচী দাদাকে জাপটে ধরে জিজ্ঞেস করলো, “আপনি এইখানে আসছেন ক্যামনে?”
দাদা তখন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলে, “আমি তো উঠানে আছিলাম, হঠাৎ কে যেন ডাইছে... তারপর কিছুই মনে নাই।”
চাচী কাঁপা কণ্ঠে দাদাকে বাড়ি নিয়ে আসে। দাদী, যিনি কিছু ঝাড়ফুঁকের কাজ জানতেন, তখন দাদার গায়ে পানি পড়া দিয়েছিলেন। কিন্তু এটা ছিল শুরু মাত্র।
পরের কয়েক মাসে এমন অনেক ঘটনা ঘটতে লাগলো। দাদাকে প্রায়ই বাড়ির বাইরে খুঁজে পাওয়া যেত, কখনও ধানখেতের মাঝখানে, কখনও জঙ্গল ঘেঁষা পুকুরপাড়ে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো— তিনি নিজে জানতেন না, কীভাবে সেখানে গেলেন।
প্রতিবার একই কথা বলতেন, “কেউ ডাইছিল… ও বলছিল, তাড়াতাড়ি আসো।”
এরপর হঠাৎ একদিন দাদা উঠানের মেঝেতে পা পিছলে পড়ে যান। সেই দিন থেকেই তার দেহের ডান পাশ অবশ হয়ে যায়— ডাক্তার বলেন স্ট্রোক। দাদা তখন পুরোপুরি প্যারালাইজড। একা একা চলাফেরা তো দূরের কথা, নড়াচড়াই করতে পারতেন না।
চাচী ও দাদী মিলে খুব যত্ন করতেন দাদাকে। খাইয়ে দিতেন, পরিস্কার করতেন, এক মুহূর্তের জন্যও ছেড়ে যেতেন না।
ঘটনাটা ঘটে এক রাত ১২টার দিকে। সবাই খেয়ে দেয়ে ঘুমাতে গেছেন। দাদী, যথারীতি দাদাকে ঘুম পাড়িয়ে দরজা লাগিয়ে রেখে খাবার খেতে গিয়েছিলেন। খাবার শেষে সবাই নিজেদের রুমে চলে যায়।
কিছুক্ষণ পর দাদী যখন দাদার ঘরে গেলেন, দেখেন দরজাটা হাট করে খোলা।
ভেতরে গিয়ে দেখে দাদা নেই।
দাদী হতবাক! যে মানুষটা এক বিন্দুও নড়তে পারে না, সে গেল কোথায়? দাদীর বুঝতে বাকি রইলো না দাদার সাথে আজকে খারাপ কিছু হবেই। কারণ যে মানুষ আরেকজনের সাহায্য ছাড়া এক দন্ড ও নড়তে পারে না। টয়লেট পর্যন্ত যেতে পারে না সেই মানুষ কি না বিছানা ছেড়ে যাবে? চিৎকার চেঁচামেচি তে পুরো বাড়ি তোলপাড় হয়ে গেলো। গ্রামের সবাই মিলে আমার দাদাকে খুজতে লাগল। আমার চাচী সেই ধানের মাঠের দিকে গেলো। কিন্তু পেলো না। দাদী বাড়ি আর মাঠ এর মাঝখানে আমদের পুকুর। তো চাচী যখন খুজতে খুজতে পুকুরের দিকে এলো। টর্চ টা যেই পুকুর পাড়ে ধরলো চাচীর ভয়ে অজ্ঞান হবার মত অবস্থা..
দ্রষ্টব্য: গল্পের লেখায় ছোটখাটো ভুল থাকলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। যদি সম্ভব হয়, মেসেজের মাধ্যমে জানাবেন। সবশেষে কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না, আজকের গল্পটি আপনার কেমন লেগেছে।
Note: This AI-generated image portrays a fictional scenario designed for creative and storytelling purposes. It may include elements that could be unsettling to some viewers. Please exercise discretion when viewing. The content aims to delve into themes of suspense and mystery and does not endorse or encourage any form of violence.
#fyp #viral #highlights #photochallenge #Amazing #trending #ভূতেরগল্প
বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৪
অনূ গল্প
ফারিয়া আপুর ডাকে ঘুমের রাজ্য থেকে বাস্তবে ফিরলাম। ফারিয়া আপু ডাকছেই...
.
-- অই হ্রামী। আর কত ঘুমাবে, এবার তো উঠো।
-- হু যাও তো,, ডিস্টার্ব করো না। শান্তিতে ঘুমাতে দাও।
-- বাবু, উঠ না রে। কলেজ যেতে হবে তো।
-- আচ্ছা উঠছি। শান্তিতে তো আর ঘুম হবে না। হলেও দিবে না।
-- হি হি..
.
প্রতিদিন কলেজ যাবার আগে ও আমায় ডেকে তুলে কলেজ নিয়ে যায়। আমি নিয়মিত উপস্থিত থাকার পেছনে তার হাত যে রয়েছে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। আমাকে জোর করে ডেকে বিছানা থেকে তুলে দিলো। আধা ঘুম আধা জাগরণে বাথরুমে গিয়ে পানি দিয়ে মুখ টুক ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। কিছুক্ষুণ পর এসে দেখি সব রেডি। তাড়াতাড়ি শার্ট গায়ে দিয়ে মায়ের কাছে গেলাম। কিছু মুখে দিয়ে আপুকে বলে বাইরে এলাম। পরে আমার ফ্রেন্ড কে নিয়ে কলেজের দিকে রওনা দিলাম।
.
আমি ফয়সাল আহমেদ। পড়ি ইন্টার সেকেন্ড ইয়ার। ফারিয়া আমার আপন বড় আপু। আমাকে বাবু বলেই ডাকে। আমি নাকি পিচ্চি বাবুর মত তাই। আপুই সেই যে প্রতিদিন আমাকে ঘুম থেকে তুলে কলেজে পাঠিয়ে দেয়। আর আমার বন্ধু মনির। ব্যাচ মেট আমরা।
.
কলেজে পৌছালাম ক্লাস শুরুর ১৫ মিনিট আগে। আমার আরও কয়েক ফ্রেন্ড ওখানে ছিলো। কয়েকজন বন্ধু বান্ধুবী মিলে আমাদের একটা ফ্রেন্ড সার্কেল। আমরা আড্ডা দিবো এমন সময় একটা মেয়ে ক্যাম্পাসে এ ঢুকলো। মেয়েটা নতুন। এবার ট্রান্সফার হয়েছে ২য় বর্ষে। মেয়েটা খুব সুন্দর না, আবার খারাপও না। তবে বেশ মায়াবী। হেটে চলে গেলো আমাদের সামনে দিয়ে। আমার বন্ধুবী তখন বলল,
.
-- কে এই মেয়েটাকে প্রপোজ করবে? বাজি রাখলাম। কে পারে দেখি?
.
আমার এক ফ্রেন্ড বলে উঠলো,
.
-- আমি করবো প্রপোজ। টাকা রেডি রাখ।
-- কিসের টাকা। এখানে চ্যালেঞ্জ বাজি হবে। কার মুখের কত দাম দেখি।
.
কিন্তু সেই বন্ধুটা পিছিয়ে গেল। কারণ তার গার্ল ফ্রেন্ড আছে। সে একবার জেনে গেলে কি অবস্থা হবে বুঝতে পারছে। তাইলে বাজি ধরার কেউ নাই নাকি। আসলে, মেয়েটা কারওর সাথে কথা বলে না। কারও সঙ্গে মিশে না। কাউকে পাত্তা দেয় না। সবাই হয়তো ভাবে ভাব। কিন্তু আমি বুঝি মেয়েটা কারওর সাথে মিশতে পারে না। আসলে মেয়েটাকে খারাপও লাগে না আমার। একটা চান্স নেয়া যায় কি বলেন? প্রেম করি না, আগেও করি নি। একেবারে খাটি সিঙ্গেল যারে কয় আর কি।
.
আমি মধ্যে থেকে হিরো সেজে বললাম,
.
-- আমিই করবো প্রপোজ। তোরা খালি সব ব্যাবস্থা করে দে।
-- আচ্ছা করে দিবে নে।
.
আমার কয়েকটা বন্ধুকে ব্যাবস্থা করতে বললাম। তারা ভিতরে চলে গেল। আর আমি বাইরে এসে বসলাম। মেয়েটার নাম জেনেছি। তাসনিয়া নাম মেয়েটার। বন্ধুরা তাসনিয়াকে আমার ব্যাপার বুঝাবে। আমি তাকে ভালবাসি এই সেই। অতঃপর কোনো এক বন্ধুর কল। তাসনিয়া আমার কাছে আসছে। এটা বলেই কল রেখে দিলো। আমি প্রস্তুত হলাম। মেয়েটা এসে আমাকে ডেকে নিয়ে যায়।
.
আমার অবস্থা কি বলবো। লাইফে ফার্স্ট কাউকে প্রপোজ করবো। কেমন যেন ফিল হচ্ছে ভিতরে। যাই হোক তাসনিয়া আমায় জিজ্ঞাসা করলো,
.
--তোমার বন্ধুরা যা বলেছে সত্যি?
-- হ্যা।
.
সে আমার দিকে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। আমি অনেক কষ্টে তাকে বললাম, আমি তাকে ভালোবাসি। আসলে লাইফে ফার্স্ট প্রপোজ কি না তাই একটু ভয় লাগছিল। আসলে আমি তাকে ভালবাসি কথা টা মন থেকে নাকি এমনিই সাধারণ ভাবে বললাম বুঝতে পারছি না। তাসনিয়া একটা হাসি দিলো। আর আমার কাছ থেকে ফোন নাম্বার নিলো। আর সাথে ১ দিন সময় চাইলো সে।
.
আমি তো টেনশন এ আছি। বাজি ধরলাম, এখন যদি রিজেক্ট করে মান সম্মান যাবে। আর তাছাড়া এতো সহজে তো কেউ রাজিও হবে না। ধুর যা হবার হোক। তাকে দেখে তো পজিটিভ মনে হলো। আচ্ছা রাজি হলে কি হবে। আমি তো বাজি ধরে প্রেম করবো। ধুরর ছাই.. যা হবার হোক। পরে দেখা যাবে।
.
পরের দিন যখন কলেজ শেষ করে বাসায় ফিরছি। বাসার কাছে প্রায় পৌঁছে গেছি, তখনই সে আমাকে ফোন করলো। প্রথমে আমি তাকে চিনতে পারি নি। কিন্তু পরে কথা বলার পর পরিচয় দিলে আমি তাকে চিনতে পারি। কথায় কথায় জানতে চাইলাম আমার উত্তর তো পেলাম না। সে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে উত্তর দিলো। আমি চুপসে আছি। কিন্তু যখন বুঝলাম সে রাজি আছে। আমার আনন্দ যেন আর ধরে না। আসলে এই আনন্দটা কিসের? বাজি জিতার না তাকে কাছে পাবো সেটার? কনফিউজড!
.
ভালোই চলছিলো আমাদের রিলেশন। দিনে খুব বেশি ফোনে কথা বলতাম না। যাও বলতাম বাইরে গিয়ে বলতাম। মাঝে মাঝে গভির রাতেও কথা বলতাম। মায়ের কাছে ধরা খেয়েছিলাম। ওর আর আমার সম্পর্ক ভালোই চলছিলো। কিন্তু সমস্যা অনেক ছিল।
১) আমরা সমবয়সী।
২) ওর ফ্যামিলির কেউ ভালো ভালো না। আমার মা বাবা মেনে নিবে না।
৩) ওর খুব রাগ আর প্রচণ্ড জেদ। যার কারণে ঠিক মতো খাবার খেত না। দিনে একবার খেত আবার কখনো না খেয়েই দিন পার করতো।
৪) ও আমায় কিছু শেয়ার করতো না। অনেক কষ্টে কিছু কিছু জানতে পাড়তাম।
.
আমাদের সম্পর্কের এক পর্যায়ে সে তার প্রায় সবাইকে জানিয়ে দেয় আমাদের সম্পর্কের কথা। আমি চাইছিলাম না কেউ জানুক। জানুক তবে দু একজন। তবুও সে তার বাবা আর চাচা বাদে সবাইকে জানিয়ে দেয়। আর তার চাচা ছিলো খুব রাগি আর ভয়ঙ্কর। এক পর্যায়ে তার চাচাকে জানিয়ে দেয়।
.
আসতে আসতে আমাদের সম্পর্ক খারাপের দিকে এগুতে লাগলো। ওর সাথে কথা বললেই ঝগড়া হতো। ভাঙ্গন শুরু হলো। ওর চলা ফেরা আমার ভালো লাগতো না। ওকে অসহ্য লাগতে শুরু করলো। ও আমার সাথে ঠিক মতো কথা বলতো না। এক পর্যায়ে চরম অসহ্য লাগতে শুরু করলো। আমি তাকে সরাসরি ডেকে ব্রেক আপ করতে বললাম। এটা শুনেই সে আমার মোবাইল নিয়ে মায়ের নাম্বার নিজের মোবাইল টুকে নিয়ে মায়ের নাম্বারে কল দিয়ে দিলো।
.
আমার মা এসব কিছু জানতো না। কিন্তু সে সব বলে দিলো। কিন্তু দেখলাম সে শান্ত ভাবে কথা বলছে। অর্থাৎ আমার মা তার সাথে শান্ত ভাবে বলছে। আমি কিছু অনুকূলতা অনুভব করলাম। আমি তাকে কিছু বললাম না। ফোন নিয়ে বাড়ি চলে আসলাম। বাড়িতে ফিরেই আম্মু সেরকম যাচ্ছে তাই বলে আমাকে বকা বকি করলো। কি হলো। শান্ত ছিলো ভেবেছিলাম। কথায় আছে না নিশ্চুপ হাওয়া ঝড়ের লক্ষণ। এখানেও তাই। নিশ্চুপ থাকা অতি রাগের কারণ হয়ে উঠেছে। ফারিয়া আপু আমাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে ঘরে বসিয়ে আমার মাথায় কিছুক্ষণ হাত বুলিয়ে দিয়ে উঠে চলে গেল।
.
আমি তো এদিকে রাগে ফুঁসছি। ঠিক করলাম কথা বলবো না আর ওর সাথে। কিন্তু না বলেও থাকতে পারতাম না। তাই মাঝে মাঝে এক আধ টুক কথা হতো আমাদের। এভাবেই দুজনই বিরক্ত একে ওপরের উপর। কিন্তু আবার দুজন দুজনলে ছাড়তে চাইতাম না। মানে একেবারে নাজেহাল অবস্থা। না পাড়ছি সইতে, না পাড়ছি সরে পড়তে।
.
এদিকে ঝগড়া সম্পর্ক নিয়ে বিজি থাকতে পরিক্ষা খারাপ হলো। ও আবার এগুলো নিয়ে সারাক্ষণ চিন্তায় থাকতো। কিন্তু কিছু শেয়ার করতো না। এক সময় পুরো অসহ্য হয়ে গেলো সে। আমার সবার উপর আমার ক্যারিয়ার, তারপর বাদ বাকি। তার জন্য আমার রেজাল্ট খারাপ হয়েছে।
.
একসময় ভাবতে লাগলাম যে, ব্রেক আপ করে দিবো। যা কে বিয়ে করতে পারবো না, আমার বিয়ে পর্যন্ত যাকে রাখবে না, অযথা তার জীবন নিয়ে খেলা করে লাভ নাই। আর ব্রেক আপ করার জন্য একটা কারণ লাগবে তো। আমি সেই বাজিকেই কারণ হিসেবে ধরবো ঠিক করলাম।
.
আমি কল দিয়ে তাসনিয়াকে পার্কে আসতে বললাম। সে আসলে আমি বাজি খেলেছি এই সেই বলে আমি ব্রেক আপ করে দিই। সে চুপ করেছিলো। কিছু বলে নি। ও প্রমাণ চাইলো যে আমি সত্যই বাজি ধরেছিলাম কি না? আমি মনির কে কল দিলাম। সে সব বলে দিলো। তাসনিয়া কে বলেদিলাম, আমার সাথে রিলেশন রাখার জন্য চাপ দিবে না। এতে আমি চিরদিনের মত তোমার লাইফ থেকে হারিয়ে যাবো। যদি বিরক্ত না করো আমরা বন্ধু হিসেবে থাকতে পারি। তাসনিয়া তাতেই রাজি হয়ে গেলো।
.
আচ্ছা একবার পরিক্ষা করা দরকার। সে আমাকে সত্যিই ভালোবাসে কিনা। তা করাই যায়। ঠিক করলাম তার সামনে প্রেমের অভিনয় করবো। আর এই কাজে আমার গার্ল ফ্রেন্ড হবার জন্য বললাম, জাষ্ট অভিনয় করতে হবে। সব ঠিক করে ফেললাম।
.
এখন রোজ তার সামনে অভিনয় করি, কথা বলি, চ্যাট করি। সাথে তার প্রতিক্রিয়া দেখি। জেলাস হয় বুঝা যায়। কিন্তু একদিন দেখলাম আমার এক বন্ধুর হাত ধরে ক্যাম্পাসে ঢুকছে। আমি অবাক হয়ে গেলাম। খোজ নিয়ে জানতে পারলাম ওটা ওর বয়ফ্রেন্ড। নতুন বয়ফ্রেন্ড। এই সে বন্ধু আমাদের সম্পর্কের মাঝে ওকে ওর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম।
.
স্বাভাবিকই যদিও বাজি ধরে রিলেশন করেছিলাম। কিন্তু অনেক দিন রিলেশন গিয়েছে। মায়া জন্মানো স্বাভাবিক। প্রেমেও পড়লেও অবাক হবো না। আসলে সে যে জেলাস হতো এটা আমার ভুল ধারণা প্রমাণিত হলো। যাক গে মায়া বাড়িয়ে লাভ নাই। সে নিজের কাউকে খুঁজে নিয়েছে। আমার আর অভিনয় দরকার নাই। তাকে তার মতো চলতে দিই।
.
এখন আমাদের মাঝে বন্ধুত্ব ছাড়া অন্য কোনো সম্পর্ক নেই। আমি আমার ক্যারিয়ার নিয়ে বিজি। এটাই এখন আমার শখ। মন খারাপ থাকে তাসনিয়ার জন্য। কিন্তু কিছু করার নেই। আগে ভাগেই সরে পরেছি। অনেকে হয়তো বেঈমান ভাববে। হ্যা আমি হয়তো তাই। আমি তার ভালো জন্যই তাকে ছেড়ে চলে এসেছি। এটাও তো এক প্রকারের বেঈমানি। যাই হোক, তাসনিয়া ভালো থাকুক এটাই আমার চাওয়া|
মঙ্গলবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৪
ভালো বউ (Good wife)
writing by কামরুন নাহার মিশু
মিতু চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় বসে বাইরে তাকিয়ে আছে। আজ শুক্রবার। অফিস বন্ধ। ছুটিরদিন প্রতি সপ্তাহে সন্ধ্যার পর মিতু এভাবেই কৌশিককে সাথে নিয়ে বারান্দায় বসে গল্প করে সময় কাটায়।
আজ এক বিশেষ কারণে মিতুর মন বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। তাই কৌশিককে না ডেকেই আজ সে একাএকা বারান্দায় এসে বসেছে।
হঠাৎ পিছন দিক থেকে কৌশিক এসে মিতুর ঘাড়ের কাছে ভারী নিশ্বাস ফেলে বলল,
" জানো মিতু! তুমি হচ্ছো আমার দেখা পৃথিবীর সবচেয়ে যোগ্য মেয়ে।"
মিতু তীক্ষ্ণ চোখে ঘাড় ঘুরিয়ে কৌশিকের দিকে তাকিয়ে বলল,
" কিছু বলবে?"
কৌশিক আমতা আমতা করতে করতে বলল,
" না মানে, অফিসে তুমি বেস্ট ইমপ্লোয়ী, মেয়ের স্কুলে তুমি বেস্ট মম। আমার কাছে শ্রেষ্ঠ স্ত্রী। আমি প্রতিদিন নতুন করে তোমার প্রেমে পড়ি। তোমার যোগ্যতায় মুগ্ধ হই। অথচ...!"
খুব ঝাঁঝ নিয়েই মিতু বলল,
" অথচ কি? তোমার মায়ের দৃষ্টিতে আমি অথর্ব মহিলা। তোমার বোনের দৃষ্টিতে আমি অহংকারী মেয়ে মানুষ। তোমার ভাইয়ের দৃষ্টিতে, তোমার মতো বিড়াল স্বামীর স্ত্রী হওয়ায় আমি এবাড়িতে খেতে পেরেছি, অন্য কোনো পুরুষের স্ত্রীর হলে আমার স্বামীর ভাত কপালে জুটতো না, এই তো বলবে!"
কিছুক্ষণ আগে নিচে যাওয়ার সময় সিঁড়ির পাশে যেতেই মায়ের রুম থেকে কিছু কথা মিতুর কানে এসেছে। এর পর থেকেই সে রেগে আছে।
কৌশিক মাথা নিচু করে মিনমিন করতে করতে বলল,
" কে বলছে তোমাকে এসব? বোকা মেয়ে! মা তোমাকে ভীষণ পছন্দ করেন। কেয়াও তোমাকে যথেষ্ট মূল্যায়ন করে।"
" আমি সব জানি কৌশিক। কেন তোমার মা আমাকে পছন্দ করবেন না! তোমার চার ভাইয়ের বউদের মধ্যে শিক্ষায়, সৌন্দর্যে, যোগ্যতায় আমিই সেরা। আর কেয়া! আমাদের কাউকেই পছন্দ করে না।"
"অবশ্যই তুমি যোগ্য। কিন্তু বলছিলাম কি! অফিস থেকে ফিরে নিজের রুমে সময় না কাটিয়ে একটু মায়ের সাথে বসলেও তো পার। ভাবীদের সাথে রান্নাঘরে থাকতে পার। কাজ করার দরকার নেই। তুমি একটু গেলেই ওরা খুশি হবে। প্রয়োজনে সায়মাকে একজন শিক্ষক দিয়ে দাও।"
" আমি রান্নাঘরে যাই না তোমাকে কে বলছে?"
" কেউ বলেনি। আমারই মনে হলো আমার মিষ্টি বউটা সব জায়গার মতো ঘরেও সেরা বউ হওয়ার যোগ্যতা রাখে। যদি তুমি একটু...।
মিতু দৃঢ়কণ্ঠে বলল,
" না কৌশিক। আমি সেরা বউ হতে চাই না। সবচেয়ে বড় কথা বউরা কখনো সেরা হয় না। তোমার বড় ভাবী, ছোট ভাবী চব্বিশ ঘণ্টা তোমাদের পরিবারে শ্রম দিয়ে, সেবা দিয়ে তোমাদের পরিবারের পাশে থেকে আজ বড় ভাবী অসুস্থ। ছোট ভাবীর ছেলে পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল করে, মায়ের কেয়ারের অভাবে। কই তোমরা তো ভাবীদের সেরা বউ বলো না! মায়ের কথা বাদই দিলাম, তুমিও তো কখনো বলোনি।"
" তুমি জানো না, ওরা ভীষণ দুষ্ট।".
" আমি সব জানি কৌশিক বউরা দুষ্টই হয়। যারা শ্বশুর পরিবারে কাজ করতে করতে নিজের জীবন, যৌবন, ক্যারিয়ার, সন্তানের ভবিষ্যৎ সব ক্ষয় করে ফেলে, দিন শেষ তাদের কপালে দুষ্ট অপবাধই জোটে।"
" তুমি ভুল বুঝছ মিতু! "
" আমি ঠিকই বুঝছি কৌশিক। আমি তোমার ভাবীদের মতো অত বোকা নই, সংসারে কাজ করে মেকি প্রশংসার জন্য নিজের শরীর হারাব। আমার অত স্বস্তা প্রশংসার দরকার নেই।"
কৌশিক অসহায়ের মতো করে বলল,
" মিতু!"
" কী মিতু! তোমাদের সংসারে কাজের দরকার এই তো! সাবুর মাকে বলে দেব তার মেয়ে রিনাকে নিয়ে আসতে, সে এখন থেকে এখানেই থাকবে চব্বিশঘণ্টা। তার বেতনভাতাও সব আমি পরিশোধ করব। তারপরও আমার কাছে এসব অন্যায় আবদার নিয়ে আসবে না।"
মিতুর অগ্নিমুর্তি দেখে কৌশিক আর কথা বাড়াল না।
মিতুর বিয়ে হয়েছে আজ আটবছর। বিয়ের আগেই সে একটা বেসরকারি ব্যংকে চাকরি করত। ব্যাংকের চাকরি মানেই ব্যস্ততা। ব্যস্তাতার অজুহাতে মিতু এই আট বছরে একদিনের জন্যও রান্নাঘরে যেতে পারেনি।
কৌশিকদের যৌথ পরিবার। ওরা চার ভাইয়ের মধ্যে কৌশিক হচ্ছে তিন নাম্বার। ছোট ভাই ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। একটা মেয়ের সাথে সম্পর্ক আছে। চাকরিতে ঢুকলেই বিয়েটা সেরে ফেলবে। মেয়েটা অনেক ধূর্ত। রোজ নিয়ম করে এ বাড়িতে আসে। মায়ের সাথে গল্প করে। মায়ের চুল বেঁধে দেয়। বাড়ির সবাই তাদের সম্পর্কের কথা জানে।
তার আসল টার্গেট হয়েছে মা। ইতিমধ্যে তার কাজে সে সফল হয়েছে। মা উঠতে বসতে সারাক্ষণই স্মৃতির কথাই বলে।
" স্মৃতির মতো মেয়ে বউ হিসাবে পাওয়া যে কোনো পরিবারের জন্য সৌভাগ্য। এত সুন্দরী মেয়ে। অথচ গুরুজনের প্রতি কেমন শ্রদ্ধা। অথচ একটা চাকরি করলেই কিছু মেয়ের অহংকারে পা মাটিতে পড়ে না।"
এসব কথা মা মিতুকে ইঙ্গিত করে কৌশিককে শুনিয়ে শুনিয়ে বলেন।
কৌশিকের ভীষণ রাগ হয়। স্মৃতির কী এমন যৌগ্যতা! বিশ্ববিদ্যালয় পড়লে কী হবে? তার রেজাল্ট ভালো নয়। অথচ তার বউ মিতু ইউনিভার্সিটির টপার ছিল। কত বড় চাকরি করে। প্রায় লাখ টাকা বেতন পায়। বাইরে তার কত সম্মান। অথচ স্মৃতি মায়ের পাশে একটু বসেই মায়ের কত প্রশংসা পাচ্ছে।
কৌশিক মরিয়া হয়ে পড়ে বাইরের মতো ঘরেও নিজের স্ত্রীকে যোগ্য দেখতে। তার মনে হয় স্মৃতির মতো মিতুও যদি মায়ের পাশে একটু বসে তাহলে হয়তো মা মিতুরও প্রশংসা করবে।
রাতেরবেলা মিতু কৌশিকের সাথে একটাও বাড়তি কথা বলেনি। মেয়েকে ঘুম পাড়াতে গিয়ে মেয়ের পাশেই ঘুমিয়ে পড়ল। কৌশিক বারবার দরজার পাশ থেকে ঘুরে চলে এলো। স্ত্রীকে ডাকার সাহস পায়নি। মিতুর সকালবেলা অফিস আছে। হঠাৎ ঘুম ভাঙলে মিতুর মাথা ব্যথা করবে। ঠিকমতো অফিসে কাজ করতে পারবে না। অথচ ব্যাংকের চাকরিতে সারাক্ষণই অফিসে ব্যক্তিগত কষ্ট ভুলে গিয়ে কাজের মধ্যে ডুবে থাকতে হয়।
মিতু অফিস থেকে ফিরে কাঁধ থেকে ব্যাগটা সোফার উপর ছুঁড়ে ফেলে সটান হয়ে খাটে শুয়ে পড়ল। প্রতিদিনের মতো আজও কৌশিক এসে মিতুর মাথার নিচে একটা বালিশ দিয়ে পা'টা বাঁকা করে খাটের উপর তুলে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যে মিতুর নাক ডাকার শব্দ শুনতে পাওয়া গেল।
মিতুর নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে কৌশিকের মনে হলো গতকাল সে মিতুর কাছে অন্যায় আবদার করে ফেলেনি তো।
মেয়েটা সারাদিন অফিসে কত পরিশ্রম করে। বাসায় আসলে মেয়েকে পড়ায়। কৌশিকের ব্যক্তিগত আবদার মেটায়। সে কখনো স্বামী সন্তানের প্রতি অবহেলা করেনি। সাবুর মায়ের বেতন পাঁচহাজার টাকা মিতুই দেয়। সংসারে কাজ করতে পারবে না, সেকারণে বিয়ের সময় বাবার বাড়ি থেকে সে সাবুর মাকে নিয়ে এসেছে।
অথচ মেয়েকে সে এখনো কোনো শিক্ষক দেয়নি। যদি শিক্ষক তার মতো যত্ন করে না পড়ায় এটাই তার ভয়।
বিয়ের পর আজ পর্যন্ত সে কৌশিককে কারো বানানো চা পান করায়নি। কৌশিকের চা'টা পর্যন্ত সে বানিয়ে ফ্লাক্সে রেখে যায়। কৌশিক একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেেজি পড়ায়। তাকে বেশিক্ষণ অফিসে থাকতে হয় না। আড়াইটার মধ্যেই সে বাসায় চলে আসে।
মিতু ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললেও কথাগুলো কিন্তু মিথ্যা নয়। এই পরিবারের কাজের জন্য বড়ভাবী, ছোট ভাবী কখনো নিজেদের ব্যক্তিগত সুখের কথা ভাবেনি। সারাক্ষণ বাবা-মায়ের সেবা করেছে। রান্নাঘরে কাজ করেছে। অথচ বাচ্চাগুলো শিক্ষকের কাছে কী পড়েছে না পড়েছে মা হিসাবে কখনো দেখার সুযোগ পায়নি। এখন ছেলেটা পরীক্ষায় ফলাফল খারাপ করেছে। প্রিন্সিপ্যাল স্যার প্যারেন্টস মিটিং ডেকেছেন। ছোট ভাবীকে উপস্থিত থেকে কৈফিয়ত দিতে হবে। কেন ছেলে খারাপ ফলাফল করেছে!
এতএত কষ্ট ভাবীরা পরিবারের জন্য করেও দিন শেষ তাদের কাঁধে কেবল বদনামটুকুই জোটে।
বিয়ের সময় তো মা মিতুকেও অনেক পছন্দ করে বিয়ে করে এনেছেন। এখন মিতু খারাপ হয়ে গেলো। মিতু না হয় কাজ না করার কারণে খারাপ হলো। মা তো বড় ভাবী, ছোট ভাবীকেও বিন্দু পরিমান পছন্দ করেন না। আচ্ছা বিয়ের পর কি সবাই স্মৃতির সাথেও এমনই আচরণ করবে? এখন যার বন্দনা করছে, বিয়ের পর তারই বদনাম করবে।
ঘুম থেকে উঠে মিতু দেখে দুই হাতে দুকাপ ধুমায়িত কফি নিয়ে হাসিমুখে সামনে দাঁড়িয়ে আছে কৌশিক। অন্যদিন হলে মিতু অবাক হতো। এবং সঙ্গে সঙ্গে সে বিস্ময়টা প্রকাশও করত। কারণ বিয়ের এত বছর পর মিতুর আগে অফিস থেকে ফিরেও কখনো কৌশিক একাজটা করেনি। আজই প্রথম সে মিতুর জন্য কফি বানিয়ে নিয়ে এলেো।
অথচ গতকাল সন্ধ্যার পর থেকেই মিতু অকারণে বিরক্ত হয়ে আছে সব কিছুর উপর। তাই এই রূপে কৌশিককে দেখেও সে স্বাভাবিক ভাবেই বলল,
" এককাজ কর মেয়ের জন্য একজন ভালো শিক্ষক ঠিক কর। তোমার পরিচিত কোনো ছাত্র হলেও চলবে।"
"হঠাৎ মেয়ের জন্য শিক্ষক কেন?"
" আমাকে ভালো বউ হতে হবে না! মেয়েকে পড়াতে বসালে রান্নাঘরে সময় দেবো কীভাবে?"
" দুঃখিত মিতু। দরকার হলে মেয়ের জন্য শিক্ষক রাখব। কিন্তু তোমাকে ভালো বউ হতে হবে না। তুমি এমনিতেই অনেক ভালো বউ।"
" কেন তোমাদের পরিবারে তো রোজ নিয়ম করে হাঁড়ি না বসালে চুলায়, আর যত যোগ্যতায় থাক সব চাপা পড়ে যায়। সে অথর্ব বউ হিসাবে প্রমাণীত হয়।"
" মিতু অহেতুক তুমি রাগ করছ। বাদ দাও এসব।"
" ভুল করেছ কৌশিক তুমি। একটা অর্ধশিক্ষিত মেয়েকে বিয়ে করলেই পারতে, যে মজা করে চা বানিয়ে ভালো বউয়ের খেতাব পেয়ে যেত। ইউনিভার্সিটির টপাররা তো অথর্বই আর অহংকারীই হবে।"
কৌশিক বুঝতে পেরেছে কথা বললে এখন বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। গতকাল কৌশিকের কথায় মিতু ভীষণ কষ্ট পেয়েছে। সে নিজের রোজগারের টাকাকে কখনো নিজের টাকা মনে করেনি। মায়ের চোখের অপারেশনটা সে নিজের টাকায় করিয়ে দিয়েছে। বাবা-মার রুমে এসি কিনে দিয়েছে। কারেন্টবিল, গ্যাসবিল প্রতিমাসে মিতুই পরিশোধ করে। কারণ সংসারে সময় দিতে পারে না। সেকারনে সে যেটা শ্রম দিয়ে পারে না, সেটা অর্থ দিয়ে হলেও করে দেয়। অথচ ইদানিং মা স্মৃতির গুণগান গেয়ে যাচ্ছে। যেটা যেকোনোভাবে হোক মিতুর কানে গেছে।
মিতুর কথা হয়তো সত্য শ্বশুর বাড়ির দৃষ্টিতে বউরা কখনো সেরা হয় না। কাজ করলে যদি সেরা হওয়া যেত তাহলে বড় ভাবী, ছোট ভাবী হতো। অর্থ দিয়ে যদি সেরা হতো তাহলে মিতু হতো। কই মাতো কাউকেই পছন্দ করছেন না।
কৌশিক উঠে গিয়ে মিতুর কাঁধে হাত রাখল।
" চলো মিতু আজ ডিনারটা আমরা বাইরেই করব। রেডি হয়ে নাও। "
মিতু রেডি হতে হতে বিড়বিড় করে বলল,
" তুমি আমাকে বুঝতে পেরেছ কৌশিক সেটাই বড় কথা। আমি ভালো স্ত্রী হতে চাই, ভালো বউ নয়।
#
Story the time (সময়)
’
লিখেছেন- শাহরিয়ার বিশাল
আমি মিমির হাত ধরে বসে আছি । দুহাতে ওর দুহাত আলতো করে জড়িয়ে রেখেছি । মুঠো কাঁপছে, তবে সঠিক কার হাতদুটো কাঁপছে তা বলা মুশকিল । সবে মিনিট-খানেক পেরিয়েছে । মনের হিসেব, ভুল হওয়ার সম্ভাবনা শূন্যের কাছাকাছি । আমি গুনে গুনে সময় বলে দিতে পারি । হাতে রয়েছে আর মাত্র চার মিনিট । চার মিনিট পর হাত ছেড়ে দিতে হবে । এর মাঝেও ছেড়ে দেয়া যেতে পারে তবে চার মিনিট পর অবশ্যই ছেড়ে দিতে হবে । নয়ত কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে । মিমি বলেছে পাঁচ মিনিটের মাথায় হাত ছেড়ে দিতে, না দিলে কেলেঙ্কারি ঘটিয়ে ফেলবে । আমি বিশ্বাস করেছি । যে মেয়ে বিয়ের আগের রাতে সাবেক প্রেমিকের হাত ধরে পাঁচ মিনিট বসে থাকতে পারে, সে সব অসাধ্যই সাধন করতে পারে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস ।
হুম, কাল ওর বিয়ে । ছেলে ভালো, বেশ ভালো একটা চাকুরী করে । চাকরীর আবার ভালো আর খারাপ, অন্তত বেকার আমির থেকে তো অনেক ভালো । ছেলে আর আমি একসাথে কলেজ পাশ । কলেজে গাধাটার নাম ছিল গ্যাস বাবু । শামীম বাবুর, “শামীম” কেটে “গ্যাস” ঢুকে গেছিল । ওর গ্যাস উৎপাদন ক্ষমতার বেশ নামডাক ছিল কি না ক্লাসে, তাই । যেদিন নাহার ম্যাডামের বিধ্বংসী টাইপের ক্লাস থাকত সেদিন সবাই মিলে ওর হাতে পায়ে ধরতাম । ‘বাবুরে বাবু দিস কিন্তু ভাই, পিলিজ লাগে’ । গ্যাসবাবু আমাদের আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে হাত তুলত, ‘টেনশন নিস না, আজ এক্কেরে একের মাল ছাড়ব’ । আমরা নিশ্চিন্ত মনে একদম শেষের বেঞ্চে বসতাম । একমাত্র একের মাল ছাড়া তার পক্ষেই সম্ভব । আর ম্যাডাম যে...... নিশ্চিত ক্লাস ছেড়ে পালাবেন ।
আমরা সব বন্ধু মিলে ঠিক করেছিলাম ওর বিয়েতে একটা গ্যাস সিলিন্ডার গিফট করব, তাও আবার খালি । বাবুকে বলতেই গম্ভীর মুখে বলে উঠল, ‘আচ্ছা দিস, তবে দুটো দিস । বাইচান্স যদি একটাতে না আঁটে । আরেকটা কাজে লাগবে । সবকিছুর একটা ব্যাকআপ থাকা ভালো’ । গাধাটার কথা শুনে এতটাই অবাক হয়ে গেছিলাম যে, সবাই দু সেকেন্ড হাঁসতে ভুলে গেছিলাম । সেই থেকে ওর নামের পাশে আরেকটা টাইটেল জুড়ে গেল ‘ব্যাকআপ গ্যাস বাবু’ । আর এই ব্যাকআপটাকেই নাকি বিয়ে করতে চলেছে মিমি ! কোনো মানে হয় ?! কে জানে বিয়ের জন্য আর কাউকে আবার ব্যাকআপ হিসেবে রেখে দিয়েছে কি না । গাধাটার কোনো ভরসা নাই ।
‘আচ্ছা একটু হোল্ড করা যাবে ?’
‘কি!’
‘হোল্ড, মানে আর চার মিনিট বাকি আছে । দুমিনিটের বিরতি দেয়া যাবে ? এই একটা কল করতাম’ ‘নাহ যাবে না, হাত ধরে থাক । পাঁচ মিনিট পর ছাড়বা । হাত ছেড়ে চোখের সামন থেকে দূর হয়ে যাবা’ অতি ভয়ানক গলা, এই গলার বিপরীতে বলা মানে কেয়ামত ডেকে নিয়ে আসা । তার থেকে থাক বাবা, খাল কেটে কুমির ঢোকানোর কোন ইচ্ছে আমার নেই ।
‘কাকে কল করবা ?’
‘মিমোকে’
‘কেন ? কি দরকার ?’
‘সিলিন্ডার কেনা হয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করতাম’
‘সিলিন্ডার ? সিলিন্ডার দিয়ে কি হবে ?’
‘তোমাদের বিয়ের উপহার’ মিনমিনিয়ে উত্তর দিলাম
‘এত কিছু থাকতে সিলিন্ডার ! ক্যান ?’ ভ্রু কুঁচকে গেছে মিমির, লক্ষণ খারাপ । অযথাই শার্টের কলার ঠিকঠাক করতে করতে এড়িয়ে যেতে চাইলাম । তবে লাভের লাভ কিচ্ছু হল না, উল্টে জোর চেপে ধরল, ‘বল’
‘কি বলব ?’
‘ঢঙ্গ করবা না, তাড়াতাড়ি বল, সময় এমনিতেই কম । আর নাইলে............ এরপর আর কোন কথা চলে না, এমনেই উপরে কেলেঙ্কারির খড়গ ঝুলতেছে । আগাগোড়া সব খুলে বললাম, মিমি চুপচাপ ।
আমার ইনটিউশন বলছে মিমি লিটারেলি চিল্লিয়ে বাড়ি মাথায় তুলে সত্যি সত্যি কেলেঙ্কারি টাইপের কিছু করবে । কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে শুধু ‘ও’ বলে চুপ মেরে গেল । দু সেকেন্ড পর নিজ থেকেই ফের বলে উঠল, ‘আচ্ছা তাহলে আমাকে কয়েকটা রুম ফ্রেশনার গিফট কোরো’ । আমি নির্বোধের মত বলে উঠলাম ‘আচ্ছা’ । এই মুহূর্তে ‘আচ্ছা’ বলাটা শুধু নির্বোধই নয় আমি যে একটা গর্দভ তারও এক জলজ্যান্ত প্রমাণ । । এখানে বলা উচিত ছিল, ‘দেখ কি দরকার ঐ গাধা ব্যাকআপটাকে সহ্য করার, তার থেকে এক কাজ করো আমাকে বিয়ে করে ফেলো । অন্তত রুম ফ্রেসনারের খরচটাতো বেঁচে যাবে ।’ আমি যে সত্য সত্যই নির্বোধ তার আরো একখানা প্রমাণ দিয়ে চুপ মেরে গেলাম । মিমি ছোট্ট ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলছে । নিঃশ্বাসের তালে তালে নাকের পাটা মৃদু ফুলে ফুলে উঠছে । দেখতে এত মিষ্টি লাগছে যে চট করে চুমু খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে । অসম্ভব ইচ্ছে । আমি চুপচাপ সময় গুনে যাচ্ছি, দুশ নব্বই, একানব্বই...............তিনশ, তিনশ এক । সময় শেষ ।
‘আমার মনে হয় চলে যাওয়া উচিৎ ?’
‘কেন, হাত ধরে থাকতে কি এতটাই খারাপ লাগছে ?’
‘না মানে, পাঁচ মিনিট তো শেষ’
‘ও’ উত্তরটা দিয়েই চুপ মেরে গেল মিমি । মুঠোটা মনে হয় একটু শক্তও হল, কে জানে আমার মনের ভুলও হতে পারে ।
হাত ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ালাম, পকেট থেকে হয়ত খামটা এখনো বের করে ওর হাতে তুলে দেয়া যায় কিন্তু মনটা আর সায় দিল না । পাঁচ মিনিটের ছোট ইচ্ছেটাই যদি ওকে এতটা কষ্ট দেয় তবে সারাজীবনের এই অসম্ভব ইচ্ছেটা ওকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়ে যাবে । থাক, কি দরকার । ‘বিশাল’ পেছন থেকে অতি পরিচিত ডাকটা শুনে পোড়া চোখদুটোকে শক্ত করে ঘুরে দাঁড়ালাম । ওর থেকে কোন আশা নেই, আরও দুটো নিরাশার কথা শুনতে হবে এই আরকি ।
‘হুম’
‘আমি কিন্তু কেলেঙ্কারি করে ফেলব’
‘মানেটা কি ! পাঁচ মিনিটের মাথায় হাত ছেড়ে দেয়ার কথা ছিল, আমি ছেড়েছি । এখন আবার এই কাহিনী ক্যান ?’ মুখ হা হয়ে গেছে আমার ।
‘শোন ঐ গাধাটারে আমি কিছুতেই বিয়ে করতে পারব না । তুমি আমারে নিয়া পালাবা ? নাহলে কিন্তু আমি নিজে নিজেই পালাব । বল পালাবা ? বল ?’ টলটলে ঐ দুচোখের আহ্বান কখনই উপেক্ষা করার দুঃসাহস হয়ে ওঠেনি আমার, আজও হল না । হাঁটু গেঁড়ে দুহাতে খামটা ওর হাতে তুলে দিলাম । একনজর চোখ বুলিয়েই দমাদম কিল বসাতে লাগল বুকে ‘তোমার যে চাকরি হইছে, আগে বলনাই ক্যান, ক্যান ?’ দুহাতে ওকে বুকে আগলে নিলাম, মেয়েটা ছোট বাচ্চার মত ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে ।
একটু পরে ভেজা স্বরে বলে উঠলো, ‘শোন একটা কেলেঙ্কারি যেহেতু করেই ফেলতেছি সেহেতু আরেকটাও করব । আমরা না দুটো বাবু নেব । দুটো মেয়ে, না একটা ছেলে আরেকটা মেয়ে । নামদুটো কিন্তু আমি রাখব, তোমার যে নামসেন্স । ছেলেটার নাম বিহান আর মেয়েটা... হুম আচ্ছা তুমি বল, বল, আরি বল না... মিমি কি যে আবোল তাবোল বকছে তার কিছুই কান দিয়ে ঢুকছে না আমার । আমি রীতিমত ওকে বুকের সাথে পিষছি আর প্রাণপণে সময় গুনছি । পাঁচ, ছয়, সাত, আট, নয়, দশ...... ছোট্ট একটা মুহূর্তকেও হারাতে রাজি নই আমি । হারাতে রাজি নই পাগলী এই মেয়েটাকে, আর জীবনের সবথেকে খুশির সময়গুলোকে । রাজি নই আমি, একদম না ।
সোমবার, ১৫ জুলাই, ২০২৪
তৃতীয় দফায় পেছাল কোপার ফাইনাল, জানা গেল নতুন সময়
শনিবার, ১৩ জুলাই, ২০২৪
গল্প:- শেষ_দেখা,,,
লেখক:- আরিয়ান ইসলাম
প্রায় বছর দুইয়েক পর অহনা নক দিলো ম্যাসেঞ্জারে। ভালো মন্দ, না করে সোজা পথ কর এই, লন্ডের কই থাকো তুমি? এড্রেস কী?সোমবার, ৮ জুলাই, ২০২৪
গল্প কথা
প্রথম প্রথম মত পাত্র পক্ষ আমাকে দেখতে আমি খুবই নাভাস আসলে বান্ধবীদের জন্য এত কিছু উল্লেখ করছি যে এখন নার্ভাস না হওয়া। ভাবী আমাকে সাহস দিয়ে বলেছে খুব ভালোভাবে কথা বলতে এখানে ভয় পাবার কিছু নেই।
পাত্রপক্ষের উত্তর দিয়ে হেঁটে ঘরের মনে মনে বসল মা হাতের ইশারায় আমাকে প্রায় ৬/৭ জন এসেছিলেন। পাত্র মা চাচি বোন সহ আরো বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
আমি ইরা গত বছর ঢাকা ইউনিভার্সিটির থেকে ইংলিশ ছাত্রদের কমপ্লিট করেছি, এখন একটা প্রাইভেট ফার্মে কর্মরত আমার কোন বোন নেই, মা, বড় ভাই আর ভাবীকে নিয়ে আমাদের ছোট ছোট।
সোফায় বসার সালাম বাবা, ছেলের নাম রাতুল একটা প্রাইভেট নামতে আছে।
আমি সাধারণভাবে কামিজ পরা শুনতে শুনতে শুনতে শুনতে পাই, আমি চাই ওরা আমাকে নাচার সালো ব্রাক দেখুক।
-মেয়ে তোকে অনেক শুকনা তা তোমার বাবার বাড়ি থেকে টেতে দেয় না? হাসতে হাসতে ছেলের মা আমি খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে মিশে তাকালাম।
দেওয়া স্থায়ী আমার ভাবী একজন ডক্টর, শি দল সম্ভ্রান্ত ফ্যামিলির মেয়ে। নিজেও তখন হাসতে বললেন,
- আপনার বাড়িতে ছেলেমেয়েকে ভালো করে দেখাতে হবে না, কিন্তু আপনার কাছে যেতে পারে যে চুল পড়ে যাচ্ছে সেই টাকের চিকিৎসার প্রয়োজন হলে আমাকে বলবেন আমার কিছু বন্ধুবান্ধব কলিগ তাদের সাহায্যে নেবে।
ভাবীর হাস্যজ্জল কথাগুলো খুব সম্ভবত ছেলের ছেলের ছেলের বুকে গিয়ে বিধায়ক এবং খানিকটা অপমানিত আবারও তিনি সামালের উপরে।
- এই মেয়ে , কি বাবার নাম তোমার ও হ্যাঁ ইরা আচ্ছা ইরা যাও সেখানে গিয়ে অনেক হেঁটে দেখাও। আমি আবার খান অপ্রস্তুত অপ্রস্তুত আমি তো ওদের আমাকে দিয়েই হেঁটে আসলাম। ভাবীর তাকালম , ভাবী ইশারা করে যেতে বললেন, আমি সামনে পর্যন্ত হেঁটে আবার ফিরে আসলাম।ভাইয়া বললেন,
- ওখানেই দাঁড়া ইরা, এই ছেলে কি ছেলের নাম তোমার ওও রাতুল তা ভাই রাত্রি তুমি যাও সেখানে গিয়ে আমাদের সামনে দাঁড়াও। ছেলের চাচির প্রায় হতেই উঠলেন,
- আবার এটা কি ধরনের অসভ্যতা?
-আরে কি আশ্চর্য্য আমরা দেখবো না ছেলে মেয়ে চেয়ে খাটো না লম্বা, হাঁটতে পারে কি না?
-কেন ছেলে যখন এসেছিলেন তখন ভালোনি
-তা আমার বোন নিজেও তো হেঁটে আসলো মুসলিম ইসলামের উত্তরই মুসলিমনি! আলোচনা পারলামে বেশ জব্দ করা হয়েছে আমার চারণ দাঁড় করানো ছাড়া কোন উপায় নেই।
ভাইয়া কিছুক্ষণ কথা বলতে,
- বায়োডাটাতে বোল্ডার লিখেছেন ছেলের উচ্চতা ৫ ফুট আট ফুট হচ্ছে মনে মনে ৫ ৬ এর বেশি হবে না ,যাই রাতুল তুমি বসো।
আমি গেছি আমি এখানে একজন সত্যি কথা বলতে পারলাম, আপনি এটা বলছেন যে ফ্যামিলি এখনও আমার সাথে কথা বলে না আবার বসলাম।
ছেলের বোন বলে,
- কি তোমার আসবাব রংয়ের মেকআপ করে পার্লারে এটা বিশ্বাস করে?
আমি মাথা না দেখা
-তা রাতুল তুমি কি চুলে কলে টলপ মাখো? চুল কি পেকে গেছে? প্রকৃতপক্ষে তোমার চুলটা অনেক বেশি কালো ছিল, ভাবীর প্রশ্নের উত্তরে।
-ইরা তুমি রান্নাবান্না জানো তো? ।
-আপনি আপনাকে বললেন অনেক টাকা পয়সা আছে, আমার বোনকে টাকা রোজগার করতে হবে না তাহলে ভালো বিদেশী কোন শেকফ কেন রাখছেন? ঘরের বউকে কেন রান্না করতে হবে? সে তো বড়লোক ঘর বউ তাই না! সে খাতার উপর পায়ের পাতার উপর পাল্টা হিন্দি বারল দেখবে আর কুটনামি শিখবে, অসুবিধা প্রশ্ন? পাশ থেকে ভাইয়া বললেন।
- আপনি কি আমাদেরকে এখানে অপমান করার জন্য ডেকেছেন? ছেলের মা ঝাঁঝালো কনঠে বলে উঠলো
আমার মা মুখ খুলুন,
- কেন আপা আমার মেয়েকে দেখতে এসেছেন যদি বাজারের পণ্যের মত বিচার করি আমরাও মেয়ে দিচ্ছ আমারও কিছু দায়ভার আছে তাই না? মেয়ে শিক্ষকদের জীবনের জন্য কার হাতে লেখা তাকে বলো তোকে-বাছাই করা তো আমাদের দায়িত্ব এবং শ্রদ্ধার মধ্যে পড়ে যদি না পড়ি তাহলে মা হিসেবে আমি আমার বাল্বকে। ব্লু বাছাই করে ভালো একটা বউ নিয়ে যাবে কিন্তু আমরা ভালো-বাছাই করি যদি একটা মেয়ে জামাই না পাই তাহলে একতরফা হয়ে গেল না? এখন আর দীর্ঘ যুগটা পড়ে নেই ১৯৫৪ সালে। যে মেয়ের চুল দেখবে, রং দেখবে, হাত-পা খুঁটে দেখবে কিন্তু মেয়ে দল টুটি শব্দ করবে না। দুনিয়া বিপরীত হয়ে গেছে আপা , আপনি যে তার তিনগুণ বিচারের কারণ হবেন আপনি আপনার পছন্দ করবেন না, তবে আপনি ফেরত দেবেন কিন্তু আমি আমার বুকের কলিজাকে, যাকে আমি জন্ম দিয়েছি, ছোটবেলা থেকে মানুষ আমি তাকে লিখতে দিয়েছি। ফল-বাছাইটা আমি বেশি দর্শক না। আপনি দয়া করে আসতে পারেন।
-কি হয়েছে ইরা মন খারাপ?
-না ভাবী
-মার মনে আছে যখন তোমরা দেখতে পাবে তখন আমাকে কি হবে? আমি সাধারণ পোশাকে আমাকে আমার খুব কাছে এসেছিলাম। মা খুব সুন্দর সালামের উত্তর দিয়েছিলেন আজকে এখানে কেউ আমার সালামের উত্তর দেয়নি যেখানে আমার বিষয়টা খুব খারাপ, একইভাবে আর আপনার পরিবারকে এমন প্রশ্ন করতে পারে যাতে আমার খারাপ হতে পারে আমার পড়াশুনা বিষয়ক কথাবার্তা জানতে চেয়েছিলাম, আমার মা বলেছিল। পরেও আমি শক্তিশালী আর চাকরি-বাকরি শুল্ক তখন তোমার বাবা আমারশ্বর জীবিত তুমি আর কথা দিয়েছিলে আমাকে শেষ করবে। সর্বউনার কথা অক্ষরে পালন করেছেন, আজ আমি একজন ডাক্তার। একটি চাকরি করছি আর যতটা সম্ভব করতে চেষ্টা করছি এটা নিয়ে কিন্তু মা কোন সমস্যাটি নিচ্ছে না। আমার জন্য আমি একটি পরিবারের সদস্যদের ঠিক দেবার জন্য একটি পরিবারকে একইসঙ্গে রঞ্জিত করার জন্য আপনাকে আমার মত বর্ণনা করতে পারবো, ভালোবাসতে পারো অভিযোগ কোন পরিবারকে না যে মেয়ের সমর্থক বিচার, হাঁটার স্টাইল, রান্নাবান্না দিয়ে বিচার করা। কারণ আমরা আমাদের সাধ্য মতবাদ করি, এখন তুমি চাকরি কর। তুমি তোমার কাছে তোমার ঢোকার পর চাকরির কর্পোরেশনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব পালন করবে তোমার ব্যক্তিগত অভিমত সেই ক্ষেত্রে তোমার শুউর অন্য কোনো ইন্টারফেয়ার করতে পারে না। প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তি স্বাধীন আছে সব সময় মনে রাখবেন আত্মসম্মানবোধ হচ্ছে জীবনের মূলমন্ত্র।
-এই তুমি যাবে আমার সাথে? ভাবী ভাইয়ার দিকে ফিরে কথাটা বললেন।
-রাত আটটা বাজে এখন আবার তোমরা জানতে পারবে মা?
-মা আপনাকে ভাই বলে না আমার চাচাতো ফাহিম ভিডিও আমাদের সাথে দেখা করছি।
-ও মনে মনে সুন্দর যে ছেলেটা দেখতে বেশ ভালোই ডক্টর পাশ করে কি ডিগ্রির জন্য ছিল
-ঠিক ধরেছেন মা, আমাদের সাথে দেখা করে আসবার ফোন করে চাচি সহ ডেকে নেব? রাতের খাবারটা না হয় এখানে খেলো, এমনিতেও আমরা তো চেষ্টা করেই।
আমার পথের কিছু আলোচনা আমার দিকে আমার দিকে
- সেই ভালো এত রাতে গিয়ে কাজ নেই ডেকে নাও। ভাবী আমার দিকে মুখি হাসলেন।
সোমবার, ৩ জুন, ২০২৪
অনু গল্প
বললেন, কতদিন থেকে ফাঁস। উত্তর, তিন বছর রাস্তা। আপনি বললেন, নাটা বছর দীর্ঘ হয়ে গেছে, কাগজ পাইনি এখনো যেতে পারি না।
বাদাম নিলেন পর টাকা দিতে,
বললেন, কাজ না থাকলে চলো ভাতিজা গল্প করি।
অনুমতি, কাজ আছে, তবে সতর্ক পর পর।
জিগাইলেন, দেশের খোঁজ,বিয়ে করছি কি'না,মা বাপ আছেন কি'না এক জন বয়স্ক মানুষ, আমাদের মতো ছেলের ছেলের বাড়ির ছেলে যা জিগেস করেন ঐগুলাই জিগাইলেন৷
বেশ মোটা মানুষ তারউপর বয়স্ক, এর মধ্যে ইলিগ্যাল, বুঝলাম এই জন্য উনারে কেউ বলতে পারে না।
পকেট থেকে সামং ফোন বের করে, স্ক্রিনে একটা মেয়ের ছবি দেখা যায়, মেয়েটা সুন্দর কি'না?
একটা মেয়ে মেয়ের বাড়ন্ত পুরনো যে' সুন্দরী থাকে ও পছন্দ করে। আমি আপনাকে ঐ কুমিল্লায় গিয়ে বিয়ে করব, বেটা থামালেন, কাস্টমার বিদায় করি সিগারেট খাইলে একটা ব্যাপার।
সিগারেট নামলাম, চাচায় কাস্টমার বিদায় বিদায় তার পর বললেন, এটা আমার মেয়েকে মুচকি মুচকি হাসতে শুরু করবে।
চাওয়া কথা বলে থামেন, মুচকি হাসেন, লংটাইম আবার বলেন, আমার এই মেয়েটি এইটে গোল্ডেন। চাচা গোল্ডেন কি চাচা বললেন, এটা কি আর আমি জানি। আমার মেয়েটা পড়ায় খুব ভালো। আমার দুই মেয়ে,এটাই বড়।
আমি ঠিক নিয়ে এগোচ,কে চাও বলে উটেন, আমার মেয়ে বিয়ে করবে?
বলেছে, মনে কর ত্রিশ পয়ত্র, চল্লিশ চাচাবলাম, অনেক কম। রুমাভাড়া, শান্তর বিলা'তো আর ঘরতে পাটাশ দিতে দিতে ডেবলে, টাইটুনা ঘামাশ দেই তোমার চাচের ডিসকাউন্ট।
বললেন, ভাতিজা নিয়োগ করছি, নতুন ডাক্তার পর ভালো বেতনে কাজ করছি। আর মনে কর, কুৃমিল্লা নেতা বাসার কিন পাওয়ার পচিশ দীর্ঘ দিয়ে, এখন পাশাশ জায়গাম লাগানো হবে।আল্লাহ নাফ দিয়ে ভাতিজাবল, চাচাচালক যান। এই পুরানো আর বিদেশলেন, আগামী বছর পাবো তারপর যাবো। থাকলে, অটোমেটিক লিগ্যাল কার্ড দেয়।
চরিত্রহোক,বললাম চাচা যাচ্ছেন, গোসলের তারপরে বলতে হবে,অন্য দিন কথা হবে।ছাড়লেন,বললেন বিশ মিনিট দাড়াও গল্প করি, তোমার সাথে করতে পারলাম
বললেন, আমার এই মেয়ে মেট্রিকে এ প্লাস কথা। পড়ায় খুব ভালো। আমার তো মনে কর, আশা, মেয়েরা টাকা পয়সা খারছ কইরা পড়ুন, ডাক্তার বানামো, রুজি করতে হবে না।গরীব মানষের চিকিৎসা কর।
আমি কিছু চেষ্টা করতে পারোনা, আমার বাড়ির মালিকের বাড়ি উনার মেয়ের গল্প দেখলাম কেন, আমি ফেসবুকে ভিডিও দেখলাম, এক ছেলে হেলিকপ্টারে বিয়ে করতেছে, আমি ও খবর নিয়া দেখলাম পাঁচলাখের খরছ হেলিপ্টার চড়াইয়া মেয়ের শশুড় পাটাতে পারবো। চা, তোমার মেয়ে নিয়া'তো চানা স্বপ্ন।
বললেন,ভাতিজা আমাদের এই বয়সে এসে নিজের আর কিচ্ছু আশা আকাঙ্ক্ষার থাকেনা। সবগুলো স্বপ্ন থাকে শিশু কাচ্চা নিয়া।
রুম তো ছিলই। আমার মেয়ের একলা রুম ভিডিও কলে দেখুন, শুধু খাট আর পড়ার টেবিল আর কিছু নাই।
মেয়েটি খুব করেছিল সোফায় মনের ব্যাখ্যায়। তার অনেক প্রস্তাব শুরু করে, ভাল ভালো প্রস্তাব, ছেলে ব্যাসায়ী, বিদেশ সেটেল্ড, আরো কত'কি। বলবেন, তোমার ছেলের মতো পাইলে দিবো।
চাচা বললেন, এই বছর আমার মেয়ের আইএ (এইচসিএসএস পরিদর্শন, পরিস্থিতির প্রশ্নে) পিছিয়ে পড়েছি।শুন ভাতিজা, এক দিন রাতে আমার শরীরের মাথা থেকে সবজাগায় আমার সব চুল কাটাচ্ছে,পড়েছে। পড়ে সীমাহীন হয়ে গেছে। আমি মহারাজ দিয়ে,মানুষ আমাকে হাসেহাটে ঘুম ঘুম ভেঙ্গে কথা, রাত বাচারটা, বাংলাদেশ সময় সকাল আটটা। , ও ফোন ধরেনা। ভাবলাম ঘুমাতে হবে।
তোর চাচীব কামাল কমবন চশমা ব্যাহার করেছে। ফেটে পড়লেন।
তো ফোন কর, তোর মেয়ে চাচির ফোনে ফোন রিসিভ। 🙂🙂🙂
চাচা বাকি আছে,মুচকি হেসেই যাচ্ছেন আর বাদাম নাড়ছেন।বললাম, বলেন কি চাচা?বললেন, ভাতিজা মেয়েটা মরার আজ সাইত্রিশদিনের কথা। আমি মনে কর কর্লো দেশ, গিয়া, তোর চাচিরে নিয়া হজ্ব কইরা আইসা,মরার জন্য শুইয়া পড়মু। মরছি আর কনবোনা।আরে ব্যাটা,কার জন্য বাচবো কষ্টটা।
কত কষ্টের মেয়ে,কত আদরের মেয়েটা, স্বপ্নের মেয়ে আমার মরে জোরে,কোন পোলার জন্য।
বিলিভ মি- চাচা তবু ও হাসছিলেন। আমি পুরাই হ্যাং হয়ে গেছি কতক্ষণের জন্য। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দিয়ে, চাচা আসি আজ।আবার আসবো শিওর। ফোন নম্বর দিয়ে, যখন ইচ্ছা কল দিয়ে, আপনার সাথে গল্প করতে।
মানুষ মনে হয় কৌতূহলকে বিরক্ত করতে হাসে অথবা, কান্নাকে অৌক্তিক মনে করে বা ভয় পায়, কান্না করতে যদি নিজেকে খুইয়ে দেয়, ভালো থাকার আনন্দে জগৎ থেকে।
শুক্রবার, ৩১ মে, ২০২৪

শয়তান ও রাজনীতিবিদ
বৃহস্পতিবার, ৩০ মে, ২০২৪
দ্বিতীয়_বিয়ে। (দ্বিতীয় তথা শেষ পর্ব)
আফিয়া খোন্দকার আপ্পিতা
পয়তাল্লিশ বছর বয়সে দ্বিতীয় বিয়ে করে খালা নিরুদ্দেশ। তার কোন খোঁজখবর পাওয়া গেল না। ফোন বন্ধ, বাসায় তালা দেয়া। খালার ছেলের ঠিকানায় গিয়ে ও কোন লাভ হলো না। প্রতিবেশী বলল, তারা বাসা বদলে ফেলেছে। খালার ছায়ায় বড় হওয়ার সুবাধে আমাদের মায়া হয়ে গেছিল খালার প্রতি। এত বছরে বাসার সদস্যই হয়ে উঠেছিলেন যেন। মোটামুটি বাসার সবাই কৌতুহলী আর উদ্ধিগ্ন ছিল এ ব্যাপারে। নির্বিকার রইলেন কেবল মা। এ নিয়ে মায়ের কোন হেলদোল দেখা গেল না। মা নতুন বুয়া খোঁজার তোড়জোড়ে ব্যস্ত।
আমার বদ্ধমূল ধারণা আদ্যোপান্ত সব মায়ের জানা। মাকে জিজ্ঞেস ও করে ও আশানুরূপ উত্তর পাওয়া গেল না।
প্রতিদিন সকালে হাসপাতালের যাবার আগে নাস্তার সময় পাওয়া চায়ের স্বাদ ভিন্ন হলো। খালার হাতের চা খেয়ে অভ্যাস। সেই অভ্যাসে ভাটা পড়ল। নতুন বুয়ার হাতের চা বড্ড বিষাদ ঠেকল। নতুন বুয়ার কাজ কিংবা রান্না কোনটাই মনঃপূত হলো না। মা পরপর কয়েকটা বুয়া বদলালেন। কোনটাকেই টিকল না। অভ্যাস না কি মায়ার ভাটায় কে জানে? নতুন কাজের খালা এলো গেল, কিন্তু পুরনো কাজের খালাকে আর পাওয়া গেল না। দিন, সপ্তাহ, মাস পেরুলো।
মাঝে একবার নাইমের সাথে দেখা হলো। আমার হাসপাতালে লিফটে। নাইমের সাথে ছিল সুদর্শনা রমনী। চোখেমুখে ধূর্ততা। বোধকরি, স্ত্রীই হবে। খালার বদৌলতে ছোটোবেলা, বড়োবেলায় আমাদের বাসায় বেশ ক'বার এসেছিল নাইম। খালা আমাদের বাসার পার্মানেন্ট ছিলেন। দিনের অনেকটা সময় তাকে আমাদের বাসায় পাওয়া যেত। নাইম আসতো কখনো বাসার চাবি নিতে, কখনো মায়ের থেকে পকেট খরচ নিতে। সেই সুবাধে মুখটা এক দেখাতে চেনা গেল। খালার চিন্তা মাথায় এনে আমিই এগিয়ে গিয়ে কথা বললাম। ভাগ্যের সুপ্রসন্নতায় নাইম অচেনার ভান করল না। কুশল বিনিময় করল। আমি নাইমকে বললাম,
" তা তোমরা এখানে কার জন্য? খালা ঠিক আছেন?"
খালার নাম শুনতেই নাইমের কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ল। ওপাশ ফিরে নাক ফুলাল। ছোটো করে উত্তর দিল,
" আমার মামীশাশুড়ীকে দেখতে এসেছি। "
আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। যাক খালা ঠিক আছে। জিজ্ঞেস করলাম,
" খালা ভালো আছেন? "
উত্তরটা নাইমের বদলে পাশে থাকা মেয়েটা দিল। তীব্র তাচ্ছিল্য করে বলল,
" বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরেছে, নাগর জুটিয়ে রঙ্গ করছে, বিয়ে করছে। কলঙ্কিনীরা ভালোই থাকে। "
শ্বাশুড়ি সম্পর্কে পুত্রবধূর মুখে এহেন মন্তব্য শুনে মেয়ের অবিভক্ত বুঝা হয়ে গেল। নাইমের দিকে তাকিয়ে বললাম,
" সারাজীবন কষ্ট করেছে। এখন সুখে থাকুক। বিয়ের আগে খোঁজ নিয়েছো তো? পরিবার ভালো? "
নাইম চোখমুখ কুঁচকে বলল,
" এখন বিয়ে করার বয়স? সমাজে মুখ রাখল না। নিজের সুখের কথা ভেবে আমাদের মুখে চুনকালি দিয়েছে। সুখেই আছে। স্বার্থপর। এর থেকে মরে গেলেও নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারতাম।"
আমি থমক গেলাম, নাইমের কথা শুনে নয়। নাইমের চোখমুখের ভাষা দেখে। চোখে মায়ের জন্য তীব্র ঘৃণা, বিতৃষ্ণা। কী তাচ্ছিল্যতা, কী ধিক্কার! এতখানি ঘৃণা মানুষ বোধহয় শত্রুকেও করেনা । আমি কখনো কোন মায়ের জন্য সন্তানের এত ঘৃণা দেখিনি।
আমার কানে বাজল, "স্বার্থপর" শব্দটা। আত্মত্যাগের উদাহরণে থাকা নামটার পাশে 'স্বার্থপর' শব্দটা শুনে আমি কথার খেই হারিয়ে ফেললাম। এই ছেলেটাকে মানুষ করার জন্য খালা রক্তমাংস এক করেছেন। পঁচিশটা বছর যুদ্ধ করার বিপরীতে কি একটু সম্মান ও ডিজার্ভ করেন না! খালা শুধু তার সুখ, শান্তি, রূপ, যৌবন বিলীন করেন নি, অর্থসম্পদ বিলীন করে একবারে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। এই তো মাস কয়েক আগেই তো ছেলে আর ছেলেবউ মেয়ে মায়ের গুচ্ছিত সব টাকা এক প্রকার হাতিয়ে নিয়েছে।
খালা যতটা সহজ সরল, খালার ছেলে ছেলেবউ ততটাই ধুরন্ধর। নাইমের বিয়ের পর আলাদা থাকায় খালার বেতনের টাকার অনেকাংশ বেছে যেত। আমি খালাকে ব্যাংকে একাউন্ট খুলে দিয়েছিলাম। খালা টাকা ব্যাংকে জমা রাখতেন।
তিন চার বছরে তা জমে ভালো অংকের টাকা হয়ে গিয়েছিল। সে টাকার খবর কোনভাবে শুনে গিয়েছিল নাইমের বউ রিনা। তারপর থেকে শ্বাশুড়ির সাথে ভাব জমাল। নাইমের ব্যবসা লসের গল্প শুনাতে লাগল।
খালা সবকিছু মায়ের সাথে পরামর্শ করেন। ছেলের মনোভাব খালা ছাড়া মোটামুটি সবার কাছেই পরিস্কার।
আজকালকার যুগে বাবা মা দম ছাড়বার পর কান্নার বদলে সম্পত্তির দলিল বসে ছেলেমেয়েরা। কে গেল থেকে কী রেখে গেল, জানা বেশি জরুরি। সেখানে এই ঘটনা কাম্যই বটে। মা সতর্ক করলেন,
"বয়স পড়ে আছে। এত কাজ আর কদিন করতে পারবে। টাকা থাকলে শেষবয়সে কাজে আসবে। ছেলেকে সব দিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পরে যদি ছেলে না দেখে!"
ছেলে অন্তপ্রাণ খালা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জবাব দিলেন, "মা তো, জন্ম দিছি, কত কষ্টে পালছি, বড় করছি। মোর খুব আদরের পোলা, তার কষ্ট সইতে পারিনা। নিষ্ঠুর হইতে পারিনা। "
মা খালাকে বুঝালেন। খালা বুঝ নিলেন। কিন্তু কথায় আছে, সরল মানুষ বিশ্বাসেই ঠকে। খালা সরলমনা মানুষ। অল্পতেই মানুষকে বিশ্বাস করে ফেলেন। অবিশ্বাস তো পরকে করা যায়, নিজের রক্ত, নিজের জন্ম দেয়া সন্তানকে অবিশ্বাস করা যায়!
আমাদের কাছে ছেলের জন্য খালার ভালোবাসা বাড়াবাড়ি লাগলেও, কেবল খালাই জানেন এই ছেলেকে তিনি কত কষ্ট করে অর্জন করেছেন। পনেরো বছরের অপরিপক্ক শরীরে ন'টা মাস গর্ভে ধরে রেখেছেন। ছেলের বুঝ হবার আগেই বাবা মারা গেল। তখন তো বাবা মায়ের ভালোবাসা একাই দিয়েছেন। এই ছেলের জন্যই অজপাড়াগাঁয়ের এক মেয়ে অচেনা শহরে পা রেখেছে। ছেলের জন্মের পর ছেলে ছাড়া নিজের কথা মাথায় আসেনি। তার বেঁচে থাকা, তার পৃথিবী মানেই ছেলে। সন্তানের প্রসঙ্গে কি মা স্বার্থপর হতে পারে? সন্তানকে ফেলে নিজের কথা ভাবতে পারে? আমরা হয়তো দূর অবস্থান থেকে ঠিকই বিচার করতে পারব, কিন্তু কাছে গিয়ে খালার অবস্থানে বসলে শক্ত থাকার শক্তি আমাদেরও থাকবে না। সন্তান হিসেবে মায়ের ব্যাপারে আমরা স্বার্থপর হতে পারি কিন্তু মা হিসেবে সন্তানের ব্যাপারে স্বার্থপর হতে পারি না। মায়ের ধর্মই যে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
ছেলের জন্য খালার অবিশ্বাস এলো না। বিশ্বাস এলো। সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রইল না। ছলে বলে কৌশলে চেক বইয়ে তার আঙুলের ছাপ পড়ে গেল। কদিন ভালোই চলল।
ছেলের ব্যবসা ঘুরে দাঁড়াতেই ছেলে, ছেলেবউয়ের মনোভাব ও ঘুরে দাঁড়াল। ফিরে গেল আগের স্থানে। নাক ছিটকাল রিনা। এমন ব্যাকটেডেড মানুষ নিয়ে উঁচু সমাজে চলা যায়! সবাই যদি জেনে যায় তার শ্বাশুড়ি কাজের বুয়া। বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করে। মানসম্মান থাকবে? থাকবে না। ব্যবসায়িক সফলতা মনে করিয়ে দিল সেটা। তারপর যা হবার তাই হলো.... মায়ের বিশ্বাস ভাঙল আরও একবার।
মায়ের এত আত্মত্যাগের পর ও 'স্বার্থপর' এর দায়টা খালার উপর গেল! এই ছেলের বিবেকবোধ নেই!
আমরা ভেবেছিলাম, মায়ের বোঝা ঘাড় থেকে নামানোর জন্য বিয়ে দিচ্ছে নাইম। কিন্তু এখন দেখি সেখানেও সমস্যা। সমাজের কাছে না কি টেকা যাচ্ছে না। কোন সমাজে সমাজে সে রেখেছে মাকে! মা দিয়েই গেল, মাকে কিছু দেয়নি। বিয়ে করে থিতু হলো, সেও সহ্য হলো না। একটুখানি কৃতজ্ঞতাবোধ ও কি নেই!
আমার স্বরে অজস্র প্রতিবাদ, অথচ আমি টু শব্দ ও করতে পারিনি। বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। খানিক বাদে রাগ নিয়ে বললাম,
"খালা স্বার্থপর! ভেবে বলছো তো!"
নাইম অপ্রস্তুত হলো। তারপর হনহন করে চলে গেল। নাইমের ক্ষুব্ধতা দেখে আমার চিন্তা বাড়ল। খালা কি একা একা বিয়ে করলেন!
খালার বিয়ের রহস্য উন্মোচন হলো খালার আগমনের পর। একদিন হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরে দেখি বসার ঘরে খালা বসা। সারাদিন রোগী দেখে ক্লান্ত বিধ্বস্ত আমি প্রথমে খেয়াল করিনি। কারণ অবশ্য খালার চলনবলন। আমি খালাকে সবসময় সাদামাটাভাবে চলতে দেখেছি।
দুই ইদে মা খালাকে ভালো কাপড় দিতেন। কিন্তু খালার পছন্দ হতো সেই সুতির কাপড়। খালার গায়ে কখনো সোনার গহনা দেখিনি। মুখে বিষন্নতা, একটা দুঃখী, মলিনতা থাকতো। কিন্তু এই মহিলার ভাব ভিন্ন। পরনে চান্দেরি সিল্ক ফেব্রিকের শাড়ি। গলায় হাতে অলংকার বেশ। মুখে ঝুলছে হাসি। হেসে হেসে মায়ের সাথে গল্প করছেন। খালার কথা খেয়াল হতেই আমি চক্ষুচড়ক।
আমাকে গিয়ে বললাম, " খালা না কি! ভালো আছেন?"
বিপরীতে খালা সুন্দর করে হাসলেন। খালার এই হাসি আমি আগে কখনো দেখিনি। চেহারা ঝলমলে। সুখী মানুষের চেহারায় অন্যরকম এক উজ্জ্বলতা থাকে। খালার চেহারায় সেই উজ্জ্বলতা ভাসছে। খালার চোখমুখ বলছিল, খালা সুখে আছেন।
বহুকাল ধরে কোন মানুষকে দুঃখী হয়ে থাকতে দেখার পর হুট করে তাকে সুখী হতে দেখলে মনের মাঝে অন্যরকম এক আনন্দ কাজ করে। চোখে শান্তি মিলে। খালার ওই সুখী মুখটা দেখে আমার মনে হলো, অনেকদিন, অনেক বছর পর আমি এমন সুন্দর দৃশ্য দেখিনি। খালা প্রসন্ন সুরে বললেন,
" আলহামদুলিল্লাহ ভালা আছি।"
"ওখানে কোন সমস্যা হচ্ছে না তো?"
খালা প্রসন্ন সুরে বললেন, " না, আল্লাহ আমারে সম্মানে রাখছে..
দ্বিতীয় বিয়েতে ভালোবাসার থেকে সম্মানটাই ঢের কাম্য। খালা তা পেয়ে প্রসন্ন হয়ে গেছেন। তা দেখে পুলকিত হলো মন।
খালার সুখমাখা অবতারে অবতারণে বাসায় খুশির জোয়ার বয়ে গেল। সবাই এসে বসল বসার ঘরে। আমি বললাম,
"এতকাল আপনার দুঃখের গল্প শুনেছি, আজ শুনব আপনার সুখের গল্প। "
খালা মায়ের দিকে তাকালেন। খালার গল্পটা মা বললেন। আকস্মিক খালার জীবনে হানা দেয়া সুখের গল্প। শুনবার সময় মনে হলো এ যেন কোন সিনেমার গল্প। পরে মনে হলো সিনেমা তৈরি হয় বাস্তব জীবন থেকে।
খালার দ্বিতীয় বিয়ের সুত্রপাত নানুবাড়ি থেকে। বছর খানেক আগে খালাকে নিয়ে আমার নানুর গ্রামের বাড়িতে যান। বাবা ব্যস্ত, সাথে যাবেন না। মা একা যেতে নারাজ, বগলদাবা করে নিয়ে গেলেন শিউলি খালাকে। কটাদিন থেকে এলে তারও ভালো লাগবে।
নানু বাড়িতে গিয়ে দেখা হলো একটা বছর দশের বাচ্চা মেয়ের সাথে। মলিন, বিষাদ, দুঃখ ভাসা চেহারা। মায়াময় চোখে জল দেখে খালা কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
"কী হইছে মা? কানতাছো ক্যান?"
মমতাভরা স্বর শুনে মেয়েটার কান্না বাড়ল। কেঁদে কেঁদে বলল,
"মায়ের কথা মনে পড়তেছে।"
"কী হইছে তোমার মার?"
মেয়েটা উত্তর দিল না, ডুকরে কেঁদে উঠল। খালা অনুসন্ধানী মনে জানলেন, মেয়েটার মা মারা গেছে। মা হারা মেয়ের কাতরতা দেখে বিধ্বস্ত খালার মনে হলো, তার দুঃখ অতি নগন্য। মমতাময়ী খালা মমতায় গা ভাসিয়ে মেয়েটাকে সান্ত্বনা দিলেন। কান্না থামার পর আলাপ হলো মেয়েটার সাথে।
মায়ের দূর সম্পর্কের এক ভাইয়ের মেয়ে। নাম রোদেলা। রোদের মতোই উজ্জ্বল ছিল তার জীবন। বাবা মা আর সে, তিনজনের সুখী পরিবার। হঠাৎ মায়ের ক্যান্সার হলো। অকালেই মারা গেলেন। মায়ের মৃত্যুর পর জীবনটাই এলোমেলো হয়ে গেল। মায়ের ছায়ায় বড় হওয়া মেয়ে, মায়ের শূন্যতায় মনমরা হয়ে থাকে সারাক্ষণ। নাতনির এই অবস্থা দেখে দাদী ছেলের দ্বিতীয় বিয়ের কথা বললেন। রোদেলার বাবা তড়িৎ মানা করে দিলেন। নতুন বউ যদি তার মেয়েকে মানতে না পারে! যদি তার মেয়ের অনাদর হয়? সৎ মায়ের সংজ্ঞাতেই তো দোষ।
দাদী এবার নাতনিকে ধরলেন, বাবারে কও, নতুন মা লোইয়্যা আইতে। হ্যায় তোমারে আদর করবো।
রোদেলা বাবাকে বলতেই বাবা বললেন,
"তোমার জন্য আমিই যথেষ্ট। আমিই বাবা, আমিই মা। এসব কথা আর মুখে এনো না। মায়ের কোন রিপ্লেসমেন্ট হয়না। "
মাকে মনে পড়লে রোদেলা বাবার কাছে গিয়ে কাঁদে, মাকে এনে দাও না বাবা!
বাবা খুব অসহায় হয়ে যান তখন। ম'রে যাওয়া মাকে কি আনা যায়? তিনি সর্বোচ্চ আদর দেন মেয়েকে। কিন্তু মায়ের অভাব তবুও যায়না। রোদেলার দাদীও বুঝাতে থাকেন। শেষমেষ বিয়ে করবার জন্য রাজী হন তিনি। তবে শর্ত থাকে। পাত্রী পছন্দ করবে রোদেলা। সে যদি কারো মাঝে মমতা খুঁজে পায়, মায়ের ছায়া খুঁজে পায়। তবেই তিনি বিয়ে করবেন।
রোদেলার মা খোঁজার পর্বে নানুবাড়িতে হাজির হলেন শিউলি খালা।
সেবার মা খালাকে নিয়ে দিন দশেক ছিলেন নানুবাড়িতে। তখন খালা রোদেলার সাথে সময় কাটিয়েছেন অনেক সময়। এতটুকু একটা বাচ্চা মেয়ের দুঃখ দেখে খালা মায়ায় পড়ে গেছিলেন। আদর করেছেন বেশ।
দুটো বিষয় নিশ্চিত করি,
এক, রোদেলাকে আদর করার পেছনে খালার কোন উদ্দেশ্য ছিল না। খালা জানতেন না, রোদেলার মা খোঁজার ব্যাপারে।
দুই, খালা পরিপাটি হয়ে থাকতেন। সাদামাটাভাবে চলতেন, তবে ছেঁড়া কাপড় পরতেন না।
রোদেলার মন খারাপের বেলায় খালার মমতা দেখে রোদেলার মনে খালা জায়গা করে নিয়েছিলেন বটে।
রোদেলার দাদী মাকে প্রস্তাব দিয়ে ফেলেছিলেন। মা অবশ্য তখন খালাকে জানাননি। খালাকে নিয়ে ফিরেছেন।
ঢাকা আসার পরে খালাকে জানান। শুনেই খালা মানা করে দেন। ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়। প্রথম বিয়ের অসম্মান, অমর্যাদা, অসামঞ্জস্যতা, অপূর্ণার পর খালার জীবনে সুখ হারিয়ে গিয়েছিল।
দ্বিতীয়বার কাউকে জীবনে জড়ানোর সাহস নেই খালার। তাও এই বয়সে এসে!
খালার প্রত্যাখানের করে ক্ষান্ত হন। মা খুব করে চাইছিলেন খালার একটা গতি হোক। মা রোদেলার পরিবারকে চিনেন। ভদ্র নম্ব বেশ। রোদেলার বাবা রেজা হাবিব খুব ভালো মানুষ। গ্রামের সহজ সরল মানু্ষ। প্রথম বউয়ের সাথে কখনো গলা উঁচু করেও কথা বলেননি। সেই পরিবারে গেলে খালার অসম্মান হবেনা, এটা নিশ্চিত থেকেই মা খালা বুঝাচ্ছিলেন। খালা বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে আসছিলেন।
এরমাঝে ছেলে ছেলেবউ ভালো সাজল। খালা জীবনে সুখের ভ্রমে ডুবে গেলেন। তারপর ছেলে টাকা নিয়ে ছলনা করল। ছেলেকে নিয়েই সুখে থাকতে চেয়েছেন। কিন্তু ছেলেটা তাকে ঠকিয়ে গেছে বরাবর। সেবার খালার সব টাকা নিয়ে নাইম খুব খারাপ আচরণ করেছে মায়ের সাথে। খালা ভীষণ ভেঙে পড়েছিলেন। ভগ্নহৃদয়ে খালা বুঝে গিয়েছিলেন, এ ভুবনে তার কেউ নেই। যেই ছেলেকে তিনি আপন ভেবে এসেছেন, সে আপন না। সে প্রাচুর্যে ডুবে পর করেছে তাকে। আর আপন ভাবেনা। এই উপলব্ধি খালাকে শেষ করে দিচ্ছিল। নিজের জীবনটাই বৃথা মনে হলো। খালা নিজের মৃত্যু কামনা করতেন।
খালার এই খারাপ সময়ে রোদেলা এলো ঢাকায়। আমি মনে করে দেখলাম, রোদেলা তখন খালার সাথেই থাকতো। খালা রোদেলার মায়ায় পড়ে গিয়েছিলেন। মেয়েটার সঙ্গ তাকে শান্তি ছিল, ছেলের ছলনা ভুলিয়ে দিল। জীবনের সাথে যুদ্ধ করতে করতে হাঁপিয়ে গিয়েছিলেন খালার। মা ছায়া হয়ে বুঝালেন।
রোদেলার মায়ায় পড়েই খালা বিয়ের জন্য রাজি হয়েছেন।
রোদেলার বাবার সাথে দেখা হয়নি তেমন। তিনি তো আর বাইশ বছরের তরুণী নয় দেখে পাত্র দেখাদেখি পর্বে চায়ের কাপে আলাপ সারবেন। দূর থেকেই দেখেছেন। খারাপ লাগেনি।
আমাদের সবার অগোচরে খিচুড়ি পাকালেন মা। স্বভাবগতভাবেই মা বেশ চাপা স্বভাবের। তারউপর আমরা ভাইবোন সবাই পড়াশোনা, চাকরি নিয়ে ব্যাস্ত। সারাদিন বাইরে থাকি। সন্ধ্যেবেলা বাসায় ফিরি। শুক্রবারটাই সারাদিন থাকি। সারাসপ্তাহে বাসার খোঁজ থাকেনা। সে হিসেবে ব্যাপারটা এতটাও কঠিন না।
এতে অবশ্য মায়ের সাথে বাবা ও শামিল ছিলেন। আমরা সবাই বড়ো হয়ে গেছি, এ বয়সে খালার বিয়ে কিভাবে নিব। এ জন্য খালা লজ্জায় ছিলেন। বিয়েটা হলো রোদেলার চাচার বাসায়। তিনি ঢাকা থাকেন। তারপর সুখ গায়ে মেখে খালা গেলেন শ্বশুরবাড়িতে। জীবনের বড্ড অবেলায় এসে খালার সংসার হলো, সন্তান পেলেন, সম্মান পেলেন। রেজা মামা স্বামী হিসেবে ভালো। খালাকে সম্মান করেন। কদিন মেয়ের সাথে খালার ভাব থেকে তিনিও ভীষণ ঝুকেছেন খালার প্রতি। এখন তাদের সংসারটা সুখের বটে।
ও হ্যাঁ, নাইমের কথা বলা হয়নি। আসোলে সুখের অধ্যায়ে দুঃখের সুতো টানা অন্যায়। তাই সে প্রসঙ্গ বাদ গেল। খালার বিয়ের প্রস্তাব খালাকে দেয়ার পর মা নাইমের সাথে আলাপ করেছেন। শুনেই নাইম চটে গেল। মাকে তেমন কিছু না বললেও, খালার বাসায় গিয়ে খুব অপমান করেছেন। মা পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলার পরেও নাইম ধারণা করেছে, মা নিজেই স্বামী খুঁজে নিয়েছে।
নাইম খুব খারাপ ভাষায় গালাগাল অবধি দিয়েছেন। ছেলের ব্যবহার দেখে খালা ফের বেঁকে বসেছিলেন। বিয়ে করবেন না।
নাইম বিয়েতে ও আসেনি। ছেলের কথা বলতে গিয়ে খালার সুখমাখা মুখে ফের জল এলো। ছেলেটা তার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। ফোন দিলে ফোন ধরেনা। দুই একবার তুলে খুব অপমান করেছে।
এমন না যে, বিয়ে ভেঙে দিলে নাইম মাকে দেখতো। না দেখতো না। এত কাল দেখেনি, এখন কী দেখবে। নাইম থাকে খালার আশার কিছু নেই। পূর্বাকার সময়ে নাইমের আচরণের পর খালার দ্বিতীয় বিয়ের সিদ্ধান্ত যথাযথ।
খালার সুখ দুঃখের গল্পের মাঝে কলিংবেল বেজে উঠল। আমি গিয়ে দরজা খুললাম। লিলেন ফ্রক গায়ে একটা মেয়ে চঞ্চল গলায় বলল,
" আমার ছোটমা কি আপনাদের বাসায়?"
ভীষণ আন্তরিকতা নিয়ে বলল মেয়েটা। চোখ মুখ উজ্জ্বল। রোদের মতোই। আমি হ্যাঁ বলতেই, দৌড়ে ভেতরে ঢুকল। শিউলি খালাকে দেখে ডেকে উঠল,
"ছোটোমা?"
খালা তখন ছেলের দুঃখে কাঁদছিলেন। সেই কান্নার মাঝেই মেয়েটার ডাকে হেসে ফেললেন। হাত বাড়ালেন। মেয়েটা বুকে খালার বুকে পড়ল। খালা আগলে নিলেন। মাথায় চুমু খেলেন। খালার চোখে ছেলের জন্য জল, ঠোঁটে মেয়ের জন্য হাসি।
রোদেলা বলল,
"বাবা নিচে দাঁড়িয়ে আছে, তাড়াতাড়ি যেতে বলেছে। আজ আমরা ঘুরতে যাব।"
খালা চোখের পানি মুছে ফেললেন। চোখ থেকে জল সরলেও ঠোঁট থেকে হাসি সরল না। খালার হাসিটা টিকল। সেই সুন্দর, সুখের হাসি। যে হাসি আমরা এতকাল দেখিনি।
আমার মন বলল, খালা সুখে আছেন। খালার প্রথম জীবনে সুখ, শান্তি, সম্মান, সংসার কিছুই মিলেনি। দ্বিতীয় জীবনে মিলল। দ্বিতীয় বিয়ে, দ্বিতীয় জীবনে প্রথম সুখ মিলল। খালাও সুখের দেখা পেলেন।
যার প্রথম জীবন দুঃখে কাটে, তার দ্বিতীয় জীবন সুখের কাটে।
সমাপ্ত....
শেষ কথা- খালার ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয়তা রক্ষার্থে কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়েছে। তবে এটা নিশ্চিত যে, খালা দ্বিতীয় বিয়ের পর সুখে আছেন। খালার শেষ হাসিটা সুখের এখনো।
দ্বিতীয়_বিয়ে । ( পর্ব-১)
Writing By
খালা আমাদের বাসায় প্রায় ২৫বছর ধরে কাজ করেন।
আমার বুঝ হবার পর থেকে খালাকে আমাদের বাসায় কাজ করতে দেখছি। খালার মুখেই শুনেছি তার করুণ জীবনবৃত্তান্ত।
খালার প্রথম বিয়ে হয়েছে পনেরো বছর বয়সে। তাও তার চেয়ে তিনগুন এক লোকের সাথে। হতদরিদ্র বাবা বড়ো ঘরের সমন্ধ পেয়ে বাছ-বিচার ছাড়া মেয়ে তুলে দিয়েছেন দুই বাচ্চার বাবার কাছে। এলাকার প্রভাবশালী ব্যাক্তি, তালুকদার বংশ। নাম যশ খ্যাতি, অঢেল অর্থবিত্ত, কিছুরই কমতি নেই। রাজকীয় বাড়ি যার নামে, নাসির তালুকদার।
দুই ছেলেমেয়ে। বিয়ে-শাদী দিয়ে যে যার মতো আছে। ছেলেটা থাকে শহরে, মেয়ে বিদেশ পাড়ি দিয়েছে। মা মরবার পর এ মুখো হয়না। সংসারে ঝুট ঝামেলা নেই। অত বড় বাড়ি খা খা করছে। মণি মুক্তো দেখার কেউ নেই। বিয়ের পর সব তো মেয়েরই হবে। মেয়ে রাজরানী হয়ে থাকবে। পাত্র দেখতে শুনতেও বেশ। কেবল বয়সটাই একটু বেশি । পঞ্চাশ পেরিয়ে ষাটের ঘরে এগুচ্ছে। এ আর এমন কী বয়স? পুরুষ মানুষ ২৫হোক আর ৫০, সে একই কথা। মতি মিয়া অমত করবার দিক খুঁজে পাননি। প্রস্তাব আসতেই নির্দ্বিধায় হ্যাঁ বলে দিয়েছেন।
আশি দশকের কিশোরী মেয়ে শিউলি। সে মত দিল কি দিল না সে কথা ভাবার সময় কোথায়? ওত বড় ঘরে সমন্ধ হলে নিজের ও দিন ফিরবে, এই খুশিতে মেতেই কূল পেলেন না। এক শুক্রবার সমাজের লোকজন ডেকে পঞ্চদশী শিউলির হাত তুলে দিলেন পঞ্চাশোর্ধ নাসিরের হাতে।
বিয়ের পরের দিন দাওয়াত হলো তালুকদার বাড়িতে। মাকে দেখে শিউলি কেঁদেকেটে বলল, মা আমি থাকব না এখানে। আমাকে নিয়ে যাও। লোকটা খুব খারাপ।
মা ধমকে উঠলেন, স্বামীর নিন্দে করতে নেই। খারাপ হোক ভালো হোক, এখন থেকে উনিই তোর সব। এটাই তোর বাড়ি। মানিয়ে নে।
দাদী বললেন, মাইয়্যা মানুষ স্বামীর ঘরে বউ হইয়্যা আহে, , লাশ হইয়্যা যায়। আর কোন যাওন টাওন নাই। মনে রাহিছ।
রাজভোগে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে বিদায় নিলেন তারা। যাবার কালে শিউলি কত আকুতি করল সাথে নেবার। কেউ নিল না। যদি আর না আসে! সংসারে মন বসে গেলে পরে যেতে পারবে।
শিউলি বেগম সেদিনই বুঝে গেলেন, এখন এটাই তার একমাত্র আশ্রয়। নিয়তি মেনে নিলেন, মানিয়ে নিলেন। প্রথম দিকে মন কাঁদল, চোখ ভিজল। ধীরে ধীরে অভ্যাস হয়ে গেল বুড়োমানুষটা।
বছর ঘুরতেই বমির ব্যামোতে সুখবর আলো। ন'মাস বাদে কোল আলো করে এলো পুত্রসন্তান। ছেলের মুখ দেখতেই শিউলি নিজের দুঃখ কষ্ট সব ভুলে গেলেন। ছেলের মাঝে সব সুখ খুঁজে পেলেন। বুকে আগলে পরম যত্নে ছেলেকে আগলে রাখলেন।
শেষকালে পুত্রসন্তানের বাবা হবার সৌভাগ্যে খুশিতে আটখানা হলেন নাসির তালুকদার। গরু জবাই করে আকিকা দিয়ে নাম রাখলেন, নাইম।
স্বামী, সন্তান, সংসার নিয়ে শিউলির দিন ভালোই কাটছিল। কিন্তু সুখ যেন ঠিক ছুঁয়েও ছুঁতে পারেনি। বিয়ের বছর পাঁচেক হতেই বার্ধক্যজনিত রোগে গত হলেন স্বামী। হেসেখেলে বেড়াবার বয়সে গায়ে জুড়ল সাদা শাড়ি, বিধবা উপাধি। ভালো হোক কি মন্দ, ওই মানুষটাই এতদিন ছায়া হয়ে ছিল শিউলির। এখন সেই ছায়াও চলে গেল।
স্বামীর মৃত্যুর শোকের মাঝে এলো তার জীবনের আরেক ঝড়। আগের পক্ষের ছেলে এসে হাজির হলো। বাবাকে দাফন করে এসে বাবার রেখে যাওয়া সহায় সম্পত্তির দলিল বুঝে নিল ছেলে। ছেলে বউ বুঝে নিল শিউলীর আলমারিতে রাখা বংশীয় অলংকার, আঁচলের গিট খুলে নিল সংসারের চাবি।
শুভ্র শাড়িতে ছেলেকে বুকে নিয়ে নির্বাক চেয়ে রইল শিউলি। সে স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ।
রাতারাতি উকিল ডেকে সব সম্পত্তি নিজের নামে করে নিল নাদির। বোনকে অবশ্য দিল কিছু। পেল না কেবল বাবার শেষ বয়সের ছেলে। না সম্পত্তি আর না স্বীকৃতি। কড়া স্বরে ঘোষণা দিল, বাবার দেখভালের জন্যই ছিল। এখন বাবা নেই, তার ও প্রয়োজন নেই। এত ঝামেলা কাধে নিতে পারবেনা।
শিউলির জায়গা হলো না তালুকদার বাড়িতে। এক প্রকার বের করে দেয়া হলো তাকে। ছেলেকে নিয়ে ফের এসে পড়লেন বাবার বাড়ি। সেখানে নুন আনতে পানতা পুরোয়। তার আগমনে বাবা মা ও খুশিতে হতে পারলেন না। মেয়ে, তার উপর নাতি, এ যেন বাড়তি ঝামেলা।
আশি নব্বই দশকে একটা বিধবা মেয়েকে সমাজ মেনে নিতে পারতো না। সতীদাহ প্রথা উঠে গেলেও রেশ কিন্তু রয়ে গেছিল। বিধবাকে পুড়িয়ে মা'রতো না, তবে জীবন্ত মা'রতো। মৃত লাশ দাফন করা হতো, কিন্তু জীবন্ত লাশ রেখে দিতো। তাকে পদে পদে হেয় করা হতো, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হতো। তাকে অপয়া ভাবা হতো। কথার বাণে বিদ্ধ করে ক্ষতবিক্ষত করা হতো প্রতিক্ষণ। তার বাঁচা দুর্বিষহ করে তুলতো।
আত্মীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশীর কথায় কান ভারি হলো। কদিন যাবার পর মা বোন ও কথা শুনাতে লাগলেন। উঠতে বসতে কটু কথা কানে এলো পরিবার থেকে। শিউলির বুঝে গেলেন, এখানেও ঠায় হবে না তার।
তখন শিউলির বয়স ২০, ছেলের বয়স ৫। বাস্তবতা বুঝবার ক্ষমতা শিউলির হলেও বাচ্চাটার হয়নি। জমিদার ঘরের ছেলে। আভিজাত্যে বেড়ে উঠা। তিন বেলা মাছ মাংস খাওয়ার অভ্যাস নাইমের। নানা বাড়ির পেঁয়াজ, মরিচ দিয়ে পান্তাভাত তার গলা দিয়ে নামে না। ছেলেটা খেতে পারে না, মাংসের বায়না করে। শিউলি এনে দিতে পারেন না। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে যায়। খাওয়া অনিয়মে অল্প কদিনে ছেলের শরীর ভেঙে আসে।
ছেলের দিকে তাকালে চোখে জল নামে শিউলির। কী করবে না করবে দিশেহারা লাগে। অজপাড়া গাঁয়ের অশিক্ষিত মেয়ে, জীবিকা নির্বাহ করবার পথ খুঁজে। ছেলেকে বাঁচাতে হবে তার। এখান থেকে পালাতে হবে, এ সমাজ বাঁচতে দিবেনা তাকে।
সেই তাগিদে পা বাড়ান ঢাকায়। বস্তিতে আশ্রয় নিয়ে, মানুষের বাসায় কাজ জোগাড় করেন।
খালা তখন থেকে আমাদের বাসায় কাজ করেন। ছেলেকে নিয়ে আসতেন। খালার মুখে কেবল একটাই নাম থাকতো, আমার নাইম। খেয়ে না খেয়ে ছেলেকে মানুষ করতে লাগলেন। মানুষের বাসায় কাজ করে, পড়ালেন ছেলেকে। আমাদের বাসায় ভালোমন্দ রান্না হলে, খালা কখনো খেতেন না। বলতেন, আমার ভাগেরটা দিয়ে দিন, আমার ছেলেটা খাবে। নিজে খেতেন না, দু'বেলা ছেলেকে খাওয়াতেন। ছেলের খুশিতেই খালার খুশি। খালার গায়ের কাপড় যত মলিন, ছেলের কাপড় তত উজ্জ্বল। ছেলের দিকে চেয়ে খালা কত কিছু বিসর্জন দিলেন, কত সংগ্রাম করে গেলেন।
খালা আত্মমর্যাদা ছিল প্রখর। এত বাধাবিপত্তির পর ও কারো দয়া নেননি। নিজে কাজ করে ছেলের খরচ চালাতেন।
স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে ছেলে বায়না ধরল শহরের বড় কলেজে পড়বে। খালা আর ক'টা বাসার কাজ বাড়িয়ে নিলেন। রাতদিন খেটেখুটে ছেলেকে পড়ালেন। খালার আশা ছেলে একদিন বড়ো চাকরি করবে। মাঝে মাঝে বলতেন,
"বুঝলা মা, শরীরডা আর কুলায় না। গিটে গিটে ব্যাথা। পোলার চাকরি হইলে এই কাম ছাইড়া দিমু। আমাগো সুখের দিন আইব।"
সেই সুখের দিন এলো। ছেলের চাকরি হলো। বস্তি থেকে বাসায় উঠল। খালা বিদায় নিতে এসে উৎফুল্ল হয়ে বললেন, "আমার সুখের দিন আইসা গেছে। দোয়া কইরো।"
খালার সুখ দেখে আমাদের স্বস্তিই মিলল। সেই স্বস্তি উবে গেলে মাস তিনেক বাদে। একদিন ফোলামুখ নিয়ে খালা এলেন বাসায়। গায়ে মারের দাগ। কাতর গলায় মাকে বললেন,
"আমারে কাজে লোইবেন আপা?"
মা অবাক হয়ে বললেন, " তুমি কাজ করবে কেন? তোমার ছেলের কতবড় চাকরি! "
ছেলের কথা আসতেই খালা ডুকরে উঠলেন। ভেজা গলায় বললেন,
" আমার পোলাডা বদলাইয়্যা গেছে, আপা। বউ আমার গায়ে হাত তুলল, পোলা চাইয়্যা চাইয়া দেখল।"
যে ছেলের জন্য মানুষটা নিজের সুখ শান্তি বিসর্জন দিয়েছে, সেই ছেলে এই প্রতিদান দিল! জানা গেল, ভার্সিটিতে পড়ার সময় এক জুনিয়রের সাথে মন দেয়া-নেয়া হয়েছিল। ভালো চাকরি পেয়ে বিয়ে করে বউ ঘরে তুলেছে। শিউলি খুশিমনেই মেনে নিলেন। কিন্তু বউ তাকে মানতে পারল না। সংসারে শ্বাশুড়ির উপস্থিতি পছন্দ না তার। বরের কান ভাঙিয়ে কদিনেই মায়ের প্রতি বিতৃষ্ণা তৈরি করিয়েছে। শ্বাশুড়ির সাথে খারাপ ব্যবহার করতো। হাত ও তুলতো। শিউলি ছেলেকে বলার সুযোগ পেতেন না, তার আগেই ছেলের কান ভারি করতো বউ। ঘটনা এমনভাবে উপস্থাপন করতো, যেন সব দোষ শিউলির। নিত্যকার কলহে ছেলেও অতিষ্ঠ মায়ের প্রতি।
সংসারে সুখ আনতেই বিরক্তির ভাঁজ ফেলে নাইম বলল,
"রোজ রোজ এত অশান্তি ভালো লাগেনা, মা। তুমি অন্য ব্যবস্থা করো। "
পোড়া কপালের ছাই তুলে বেরিয়ে গেলেন শিউলি। দ্বিতীয়বারের মতো উঠলেন বস্তিতে। একবার ছেলেকে বাঁচাতে, আরেকবার ছেলের থেকে বাঁচতে।
সুখের দিন এলেও সুখ তাকে ছুঁতে পারল না এবারও।
তারপর থেকে খালা আবার বাসায় কাজ করেন। জীবনের এত উত্থান পতনের মাঝেও খালা কখনো দ্বিতীয় বিয়ের নাম নেননি। তবে এখন কী এমন হলো যে খালা বিয়ে করে নিলেন?
চলবে.....
বাস্তবিক ঘটনার নিরিখে ছোট্টো একটা গল্প। আগামী পর্বে শেষ হবে।