মঙ্গলবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৪

Story the time (সময়)


 ’

লিখেছেন- শাহরিয়ার বিশাল


আমি মিমির হাত ধরে বসে আছি । দুহাতে ওর দুহাত আলতো করে জড়িয়ে রেখেছি । মুঠো কাঁপছে, তবে সঠিক কার হাতদুটো কাঁপছে তা বলা মুশকিল । সবে মিনিট-খানেক পেরিয়েছে । মনের হিসেব, ভুল হওয়ার সম্ভাবনা শূন্যের কাছাকাছি । আমি গুনে গুনে সময় বলে দিতে পারি । হাতে রয়েছে আর মাত্র চার মিনিট । চার মিনিট পর হাত ছেড়ে দিতে হবে । এর মাঝেও ছেড়ে দেয়া যেতে পারে তবে চার মিনিট পর অবশ্যই ছেড়ে দিতে হবে । নয়ত কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে । মিমি বলেছে পাঁচ মিনিটের মাথায় হাত ছেড়ে দিতে, না দিলে কেলেঙ্কারি ঘটিয়ে ফেলবে । আমি বিশ্বাস করেছি । যে মেয়ে বিয়ের আগের রাতে সাবেক প্রেমিকের হাত ধরে পাঁচ মিনিট বসে থাকতে পারে, সে সব অসাধ্যই সাধন করতে পারে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস । 


হুম, কাল ওর বিয়ে । ছেলে ভালো, বেশ ভালো একটা চাকুরী করে । চাকরীর আবার ভালো আর খারাপ, অন্তত বেকার আমির থেকে তো অনেক ভালো । ছেলে আর আমি একসাথে কলেজ পাশ । কলেজে গাধাটার নাম ছিল গ্যাস বাবু । শামীম বাবুর, “শামীম” কেটে “গ্যাস” ঢুকে গেছিল । ওর গ্যাস উৎপাদন ক্ষমতার বেশ নামডাক ছিল কি না ক্লাসে, তাই । যেদিন নাহার ম্যাডামের বিধ্বংসী টাইপের ক্লাস থাকত সেদিন সবাই মিলে ওর হাতে পায়ে ধরতাম । ‘বাবুরে বাবু দিস কিন্তু ভাই, পিলিজ লাগে’ । গ্যাসবাবু আমাদের আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে হাত তুলত, ‘টেনশন নিস না, আজ এক্কেরে একের মাল ছাড়ব’ । আমরা নিশ্চিন্ত মনে একদম শেষের বেঞ্চে বসতাম । একমাত্র একের মাল ছাড়া তার পক্ষেই সম্ভব । আর ম্যাডাম যে...... নিশ্চিত ক্লাস ছেড়ে পালাবেন । 


আমরা সব বন্ধু মিলে ঠিক করেছিলাম ওর বিয়েতে একটা গ্যাস সিলিন্ডার গিফট করব, তাও আবার খালি । বাবুকে বলতেই গম্ভীর মুখে বলে উঠল, ‘আচ্ছা দিস, তবে দুটো দিস । বাইচান্স যদি একটাতে না আঁটে । আরেকটা কাজে লাগবে । সবকিছুর একটা ব্যাকআপ থাকা ভালো’ । গাধাটার কথা শুনে এতটাই অবাক হয়ে গেছিলাম যে, সবাই দু সেকেন্ড হাঁসতে ভুলে গেছিলাম । সেই থেকে ওর নামের পাশে আরেকটা টাইটেল জুড়ে গেল ‘ব্যাকআপ গ্যাস বাবু’ । আর এই ব্যাকআপটাকেই নাকি বিয়ে করতে চলেছে মিমি ! কোনো মানে হয় ?! কে জানে বিয়ের জন্য আর কাউকে আবার ব্যাকআপ হিসেবে রেখে দিয়েছে কি না । গাধাটার কোনো ভরসা নাই ।


‘আচ্ছা একটু হোল্ড করা যাবে ?’ 

‘কি!’ 

‘হোল্ড, মানে আর চার মিনিট বাকি আছে । দুমিনিটের বিরতি দেয়া যাবে ? এই একটা কল করতাম’ ‘নাহ যাবে না, হাত ধরে থাক । পাঁচ মিনিট পর ছাড়বা । হাত ছেড়ে চোখের সামন থেকে দূর হয়ে যাবা’ অতি ভয়ানক গলা, এই গলার বিপরীতে বলা মানে কেয়ামত ডেকে নিয়ে আসা । তার থেকে থাক বাবা, খাল কেটে কুমির ঢোকানোর কোন ইচ্ছে আমার নেই । 


‘কাকে কল করবা ?’ 

‘মিমোকে’ 

‘কেন ? কি দরকার ?’ 

‘সিলিন্ডার কেনা হয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করতাম’ 

‘সিলিন্ডার ? সিলিন্ডার দিয়ে কি হবে ?’ 

‘তোমাদের বিয়ের উপহার’ মিনমিনিয়ে উত্তর দিলাম 

‘এত কিছু থাকতে সিলিন্ডার ! ক্যান ?’ ভ্রু কুঁচকে গেছে মিমির, লক্ষণ খারাপ । অযথাই শার্টের কলার ঠিকঠাক করতে করতে এড়িয়ে যেতে চাইলাম । তবে লাভের লাভ কিচ্ছু হল না, উল্টে জোর চেপে ধরল, ‘বল’ 

‘কি বলব ?’ 

‘ঢঙ্গ করবা না, তাড়াতাড়ি বল, সময় এমনিতেই কম । আর নাইলে............ এরপর আর কোন কথা চলে না, এমনেই উপরে কেলেঙ্কারির খড়গ ঝুলতেছে । আগাগোড়া সব খুলে বললাম, মিমি চুপচাপ । 


আমার ইনটিউশন বলছে মিমি লিটারেলি চিল্লিয়ে বাড়ি মাথায় তুলে সত্যি সত্যি কেলেঙ্কারি টাইপের কিছু করবে । কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে শুধু ‘ও’ বলে চুপ মেরে গেল । দু সেকেন্ড পর নিজ থেকেই ফের বলে উঠল, ‘আচ্ছা তাহলে আমাকে কয়েকটা রুম ফ্রেশনার গিফট কোরো’ । আমি নির্বোধের মত বলে উঠলাম ‘আচ্ছা’ । এই মুহূর্তে ‘আচ্ছা’ বলাটা শুধু নির্বোধই নয় আমি যে একটা গর্দভ তারও এক জলজ্যান্ত প্রমাণ । । এখানে বলা উচিত ছিল, ‘দেখ কি দরকার ঐ গাধা ব্যাকআপটাকে সহ্য করার, তার থেকে এক কাজ করো আমাকে বিয়ে করে ফেলো । অন্তত রুম ফ্রেসনারের খরচটাতো বেঁচে যাবে ।’ আমি যে সত্য সত্যই নির্বোধ তার আরো একখানা প্রমাণ দিয়ে চুপ মেরে গেলাম । মিমি ছোট্ট ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলছে । নিঃশ্বাসের তালে তালে নাকের পাটা মৃদু ফুলে ফুলে উঠছে । দেখতে এত মিষ্টি লাগছে যে চট করে চুমু খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে । অসম্ভব ইচ্ছে । আমি চুপচাপ সময় গুনে যাচ্ছি, দুশ নব্বই, একানব্বই...............তিনশ, তিনশ এক । সময় শেষ । 


‘আমার মনে হয় চলে যাওয়া উচিৎ ?’ 

‘কেন, হাত ধরে থাকতে কি এতটাই খারাপ লাগছে ?’ 

‘না মানে, পাঁচ মিনিট তো শেষ’ 

‘ও’ উত্তরটা দিয়েই চুপ মেরে গেল মিমি । মুঠোটা মনে হয় একটু শক্তও হল, কে জানে আমার মনের ভুলও হতে পারে । 


হাত ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ালাম, পকেট থেকে হয়ত খামটা এখনো বের করে ওর হাতে তুলে দেয়া যায় কিন্তু মনটা আর সায় দিল না । পাঁচ মিনিটের ছোট ইচ্ছেটাই যদি ওকে এতটা কষ্ট দেয় তবে সারাজীবনের এই অসম্ভব ইচ্ছেটা ওকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়ে যাবে । থাক, কি দরকার । ‘বিশাল’ পেছন থেকে অতি পরিচিত ডাকটা শুনে পোড়া চোখদুটোকে শক্ত করে ঘুরে দাঁড়ালাম । ওর থেকে কোন আশা নেই, আরও দুটো নিরাশার কথা শুনতে হবে এই আরকি । 

‘হুম’ 

‘আমি কিন্তু কেলেঙ্কারি করে ফেলব’ 

‘মানেটা কি ! পাঁচ মিনিটের মাথায় হাত ছেড়ে দেয়ার কথা ছিল, আমি ছেড়েছি । এখন আবার এই কাহিনী ক্যান ?’ মুখ হা হয়ে গেছে আমার । 

‘শোন ঐ গাধাটারে আমি কিছুতেই বিয়ে করতে পারব না । তুমি আমারে নিয়া পালাবা ? নাহলে কিন্তু আমি নিজে নিজেই পালাব । বল পালাবা ? বল ?’ টলটলে ঐ দুচোখের আহ্বান কখনই উপেক্ষা করার দুঃসাহস হয়ে ওঠেনি আমার, আজও হল না । হাঁটু গেঁড়ে দুহাতে খামটা ওর হাতে তুলে দিলাম । একনজর চোখ বুলিয়েই দমাদম কিল বসাতে লাগল বুকে ‘তোমার যে চাকরি হইছে, আগে বলনাই ক্যান, ক্যান ?’ দুহাতে ওকে বুকে আগলে নিলাম, মেয়েটা ছোট বাচ্চার মত ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে । 


একটু পরে ভেজা স্বরে বলে উঠলো, ‘শোন একটা কেলেঙ্কারি যেহেতু করেই ফেলতেছি সেহেতু আরেকটাও করব । আমরা না দুটো বাবু নেব । দুটো মেয়ে, না একটা ছেলে আরেকটা মেয়ে । নামদুটো কিন্তু আমি রাখব, তোমার যে নামসেন্স । ছেলেটার নাম বিহান আর মেয়েটা... হুম আচ্ছা তুমি বল, বল, আরি বল না... মিমি কি যে আবোল তাবোল বকছে তার কিছুই কান দিয়ে ঢুকছে না আমার । আমি রীতিমত ওকে বুকের সাথে পিষছি আর প্রাণপণে সময় গুনছি । পাঁচ, ছয়, সাত, আট, নয়, দশ...... ছোট্ট একটা মুহূর্তকেও হারাতে রাজি নই আমি । হারাতে রাজি নই পাগলী এই মেয়েটাকে, আর জীবনের সবথেকে খুশির সময়গুলোকে । রাজি নই আমি, একদম না ।


শেয়ার করুন

Author:

আমি সজীব হোসাইন -এই ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা পাশাপাশি লেখালেখির কাজটাও করি। অনলাইনে প্রযুক্তির বিষয় নিয়ে যা জানি তা মানুষের মাঝে শেয়ার করার ইচ্ছায় এ ব্লগ টি তৈরি করা।