valobashar golpo লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
valobashar golpo লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৪

ভালো বউ (Good wife)

ভালো বউ (Good wife)

writing by কামরুন নাহার মিশু


 মিতু চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় বসে বাইরে তাকিয়ে আছে। আজ শুক্রবার। অফিস বন্ধ। ছুটিরদিন প্রতি সপ্তাহে সন্ধ্যার পর মিতু এভাবেই কৌশিককে সাথে নিয়ে বারান্দায় বসে গল্প করে সময় কাটায়।

আজ এক বিশেষ কারণে মিতুর মন বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। তাই কৌশিককে না ডেকেই আজ সে একাএকা বারান্দায় এসে বসেছে।

হঠাৎ পিছন দিক থেকে কৌশিক এসে মিতুর ঘাড়ের কাছে ভারী নিশ্বাস ফেলে বলল,

" জানো মিতু! তুমি হচ্ছো আমার দেখা পৃথিবীর সবচেয়ে যোগ্য মেয়ে।"

মিতু তীক্ষ্ণ চোখে ঘাড় ঘুরিয়ে কৌশিকের দিকে তাকিয়ে বলল,

" কিছু বলবে?"

কৌশিক আমতা আমতা করতে করতে বলল,

" না মানে, অফিসে তুমি বেস্ট ইমপ্লোয়ী, মেয়ের স্কুলে তুমি বেস্ট মম। আমার কাছে শ্রেষ্ঠ স্ত্রী। আমি প্রতিদিন নতুন করে তোমার প্রেমে পড়ি। তোমার যোগ্যতায় মুগ্ধ হই। অথচ...!"

খুব ঝাঁঝ নিয়েই মিতু বলল,

" অথচ কি? তোমার মায়ের দৃষ্টিতে আমি অথর্ব মহিলা। তোমার বোনের দৃষ্টিতে আমি অহংকারী মেয়ে মানুষ। তোমার ভাইয়ের দৃষ্টিতে, তোমার মতো বিড়াল স্বামীর স্ত্রী হওয়ায় আমি এবাড়িতে খেতে পেরেছি, অন্য কোনো পুরুষের স্ত্রীর হলে আমার স্বামীর ভাত কপালে জুটতো না, এই তো বলবে!"

কিছুক্ষণ আগে নিচে যাওয়ার সময় সিঁড়ির পাশে যেতেই মায়ের রুম থেকে কিছু কথা মিতুর কানে এসেছে। এর পর থেকেই সে রেগে আছে। 

কৌশিক মাথা নিচু করে মিনমিন করতে করতে বলল,

" কে বলছে তোমাকে এসব? বোকা মেয়ে! মা তোমাকে ভীষণ পছন্দ করেন। কেয়াও তোমাকে যথেষ্ট মূল্যায়ন করে।"

" আমি সব জানি কৌশিক। কেন তোমার মা আমাকে পছন্দ করবেন না! তোমার চার ভাইয়ের বউদের মধ্যে শিক্ষায়, সৌন্দর্যে, যোগ্যতায় আমিই সেরা। আর কেয়া! আমাদের কাউকেই পছন্দ করে না।"

"অবশ্যই তুমি যোগ্য। কিন্তু বলছিলাম কি! অফিস থেকে ফিরে নিজের রুমে সময় না কাটিয়ে একটু মায়ের সাথে বসলেও তো পার। ভাবীদের সাথে রান্নাঘরে থাকতে পার। কাজ করার দরকার নেই। তুমি একটু গেলেই ওরা খুশি হবে। প্রয়োজনে সায়মাকে একজন শিক্ষক দিয়ে দাও।"

" আমি রান্নাঘরে যাই না তোমাকে কে বলছে?"

" কেউ বলেনি। আমারই মনে হলো আমার মিষ্টি বউটা সব জায়গার মতো ঘরেও সেরা বউ হওয়ার যোগ্যতা রাখে। যদি তুমি একটু...।

মিতু দৃঢ়কণ্ঠে বলল,

" না কৌশিক। আমি সেরা বউ হতে চাই না। সবচেয়ে বড় কথা বউরা কখনো সেরা হয় না। তোমার বড় ভাবী, ছোট ভাবী চব্বিশ ঘণ্টা তোমাদের পরিবারে শ্রম দিয়ে, সেবা দিয়ে তোমাদের পরিবারের পাশে থেকে আজ বড় ভাবী অসুস্থ। ছোট ভাবীর ছেলে পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল করে, মায়ের কেয়ারের অভাবে। কই তোমরা তো ভাবীদের সেরা বউ বলো না! মায়ের কথা বাদই দিলাম, তুমিও তো কখনো বলোনি।"

" তুমি জানো না, ওরা ভীষণ দুষ্ট।".

" আমি সব জানি কৌশিক বউরা দুষ্টই হয়। যারা শ্বশুর পরিবারে কাজ করতে করতে নিজের জীবন, যৌবন, ক্যারিয়ার, সন্তানের ভবিষ্যৎ সব ক্ষয় করে ফেলে, দিন শেষ তাদের কপালে দুষ্ট অপবাধই জোটে।"

" তুমি ভুল বুঝছ মিতু! "

" আমি ঠিকই বুঝছি কৌশিক। আমি তোমার ভাবীদের মতো অত বোকা নই, সংসারে কাজ করে মেকি প্রশংসার জন্য নিজের শরীর হারাব। আমার অত স্বস্তা প্রশংসার দরকার নেই।"

 কৌশিক অসহায়ের মতো করে বলল,

" মিতু!"

" কী মিতু! তোমাদের সংসারে কাজের দরকার এই তো! সাবুর মাকে বলে দেব তার মেয়ে রিনাকে নিয়ে আসতে, সে এখন থেকে এখানেই থাকবে চব্বিশঘণ্টা। তার বেতনভাতাও সব আমি পরিশোধ করব। তারপরও আমার কাছে এসব অন্যায় আবদার নিয়ে আসবে না।"

মিতুর অগ্নিমুর্তি দেখে কৌশিক আর কথা বাড়াল না।

মিতুর বিয়ে হয়েছে আজ আটবছর। বিয়ের আগেই সে একটা বেসরকারি ব্যংকে চাকরি করত। ব্যাংকের চাকরি মানেই ব্যস্ততা। ব্যস্তাতার অজুহাতে মিতু এই আট বছরে একদিনের জন্যও রান্নাঘরে যেতে পারেনি।

 কৌশিকদের যৌথ পরিবার। ওরা চার ভাইয়ের মধ্যে কৌশিক হচ্ছে তিন নাম্বার। ছোট ভাই ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। একটা মেয়ের সাথে সম্পর্ক আছে। চাকরিতে ঢুকলেই বিয়েটা সেরে ফেলবে। মেয়েটা অনেক ধূর্ত। রোজ নিয়ম করে এ বাড়িতে আসে। মায়ের সাথে গল্প করে। মায়ের চুল বেঁধে দেয়। বাড়ির সবাই তাদের সম্পর্কের কথা জানে।

 তার আসল টার্গেট হয়েছে মা। ইতিমধ্যে তার কাজে সে সফল হয়েছে। মা উঠতে বসতে সারাক্ষণই স্মৃতির কথাই বলে।

" স্মৃতির মতো মেয়ে বউ হিসাবে পাওয়া যে কোনো পরিবারের জন্য সৌভাগ্য। এত সুন্দরী মেয়ে। অথচ গুরুজনের প্রতি কেমন শ্রদ্ধা। অথচ একটা চাকরি করলেই কিছু মেয়ের অহংকারে পা মাটিতে পড়ে না।"

এসব কথা মা মিতুকে ইঙ্গিত করে কৌশিককে শুনিয়ে শুনিয়ে বলেন।

কৌশিকের ভীষণ রাগ হয়। স্মৃতির কী এমন যৌগ্যতা! বিশ্ববিদ্যালয় পড়লে কী হবে? তার রেজাল্ট ভালো নয়। অথচ তার বউ মিতু ইউনিভার্সিটির টপার ছিল। কত বড় চাকরি করে। প্রায় লাখ টাকা বেতন পায়। বাইরে তার কত সম্মান। অথচ স্মৃতি মায়ের পাশে একটু বসেই মায়ের কত প্রশংসা পাচ্ছে।

 কৌশিক মরিয়া হয়ে পড়ে বাইরের মতো ঘরেও নিজের স্ত্রীকে যোগ্য দেখতে। তার মনে হয় স্মৃতির মতো মিতুও যদি মায়ের পাশে একটু বসে তাহলে হয়তো মা মিতুরও প্রশংসা করবে।

রাতেরবেলা মিতু কৌশিকের সাথে একটাও বাড়তি কথা বলেনি। মেয়েকে ঘুম পাড়াতে গিয়ে মেয়ের পাশেই ঘুমিয়ে পড়ল। কৌশিক বারবার দরজার পাশ থেকে ঘুরে চলে এলো। স্ত্রীকে ডাকার সাহস পায়নি। মিতুর সকালবেলা অফিস আছে। হঠাৎ ঘুম ভাঙলে মিতুর মাথা ব্যথা করবে। ঠিকমতো অফিসে কাজ করতে পারবে না। অথচ ব্যাংকের চাকরিতে সারাক্ষণই অফিসে ব্যক্তিগত কষ্ট ভুলে গিয়ে কাজের মধ্যে ডুবে থাকতে হয়।

 মিতু অফিস থেকে ফিরে কাঁধ থেকে ব্যাগটা সোফার উপর ছুঁড়ে ফেলে সটান হয়ে খাটে শুয়ে পড়ল। প্রতিদিনের মতো আজও কৌশিক এসে মিতুর মাথার নিচে একটা বালিশ দিয়ে পা'টা বাঁকা করে খাটের উপর তুলে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যে মিতুর নাক ডাকার শব্দ শুনতে পাওয়া গেল।

মিতুর নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে কৌশিকের মনে হলো গতকাল সে মিতুর কাছে অন্যায় আবদার করে ফেলেনি তো।

মেয়েটা সারাদিন অফিসে কত পরিশ্রম করে। বাসায় আসলে মেয়েকে পড়ায়। কৌশিকের ব্যক্তিগত আবদার মেটায়। সে কখনো স্বামী সন্তানের প্রতি অবহেলা করেনি। সাবুর মায়ের বেতন পাঁচহাজার টাকা মিতুই দেয়। সংসারে কাজ করতে পারবে না, সেকারণে বিয়ের সময় বাবার বাড়ি থেকে সে সাবুর মাকে নিয়ে এসেছে।

অথচ মেয়েকে সে এখনো কোনো শিক্ষক দেয়নি। যদি শিক্ষক তার মতো যত্ন করে না পড়ায় এটাই তার ভয়।

বিয়ের পর আজ পর্যন্ত সে কৌশিককে কারো বানানো চা পান করায়নি। কৌশিকের চা'টা পর্যন্ত সে বানিয়ে ফ্লাক্সে রেখে যায়। কৌশিক একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেেজি পড়ায়। তাকে বেশিক্ষণ অফিসে থাকতে হয় না। আড়াইটার মধ্যেই সে বাসায় চলে আসে।

মিতু ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললেও কথাগুলো কিন্তু মিথ্যা নয়। এই পরিবারের কাজের জন্য বড়ভাবী, ছোট ভাবী কখনো নিজেদের ব্যক্তিগত সুখের কথা ভাবেনি। সারাক্ষণ বাবা-মায়ের সেবা করেছে। রান্নাঘরে কাজ করেছে। অথচ বাচ্চাগুলো শিক্ষকের কাছে কী পড়েছে না পড়েছে মা হিসাবে কখনো দেখার সুযোগ পায়নি। এখন ছেলেটা পরীক্ষায় ফলাফল খারাপ করেছে। প্রিন্সিপ্যাল স্যার প্যারেন্টস মিটিং ডেকেছেন। ছোট ভাবীকে উপস্থিত থেকে কৈফিয়ত দিতে হবে। কেন ছেলে খারাপ ফলাফল করেছে!

এতএত কষ্ট ভাবীরা পরিবারের জন্য করেও দিন শেষ তাদের কাঁধে কেবল বদনামটুকুই জোটে।

বিয়ের সময় তো মা মিতুকেও অনেক পছন্দ করে বিয়ে করে এনেছেন। এখন মিতু খারাপ হয়ে গেলো। মিতু না হয় কাজ না করার কারণে খারাপ হলো। মা তো বড় ভাবী, ছোট ভাবীকেও বিন্দু পরিমান পছন্দ করেন না। আচ্ছা বিয়ের পর কি সবাই স্মৃতির সাথেও এমনই আচরণ করবে? এখন যার বন্দনা করছে, বিয়ের পর তারই বদনাম করবে।

ঘুম থেকে উঠে মিতু দেখে দুই হাতে দুকাপ ধুমায়িত কফি নিয়ে হাসিমুখে সামনে দাঁড়িয়ে আছে কৌশিক। অন্যদিন হলে মিতু অবাক হতো। এবং সঙ্গে সঙ্গে সে বিস্ময়টা প্রকাশও করত। কারণ বিয়ের এত বছর পর মিতুর আগে অফিস থেকে ফিরেও কখনো কৌশিক একাজটা করেনি। আজই প্রথম সে মিতুর জন্য কফি বানিয়ে নিয়ে এলেো।

অথচ গতকাল সন্ধ্যার পর থেকেই মিতু অকারণে বিরক্ত হয়ে আছে সব কিছুর উপর। তাই এই রূপে কৌশিককে দেখেও সে স্বাভাবিক ভাবেই বলল,

" এককাজ কর মেয়ের জন্য একজন ভালো শিক্ষক ঠিক কর। তোমার পরিচিত কোনো ছাত্র হলেও চলবে।"

"হঠাৎ মেয়ের জন্য শিক্ষক কেন?"

" আমাকে ভালো বউ হতে হবে না! মেয়েকে পড়াতে বসালে রান্নাঘরে সময় দেবো কীভাবে?"

" দুঃখিত মিতু। দরকার হলে মেয়ের জন্য শিক্ষক রাখব। কিন্তু তোমাকে ভালো বউ হতে হবে না। তুমি এমনিতেই অনেক ভালো বউ।"

" কেন তোমাদের পরিবারে তো রোজ নিয়ম করে হাঁড়ি না বসালে চুলায়, আর যত যোগ্যতায় থাক সব চাপা পড়ে যায়। সে অথর্ব বউ হিসাবে প্রমাণীত হয়।"

" মিতু অহেতুক তুমি রাগ করছ। বাদ দাও এসব।"

" ভুল করেছ কৌশিক তুমি। একটা অর্ধশিক্ষিত মেয়েকে বিয়ে করলেই পারতে, যে মজা করে চা বানিয়ে ভালো বউয়ের খেতাব পেয়ে যেত। ইউনিভার্সিটির টপাররা তো অথর্বই আর অহংকারীই হবে।"

কৌশিক বুঝতে পেরেছে কথা বললে এখন বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। গতকাল কৌশিকের কথায় মিতু ভীষণ কষ্ট পেয়েছে। সে নিজের রোজগারের টাকাকে কখনো নিজের টাকা মনে করেনি। মায়ের চোখের অপারেশনটা সে নিজের টাকায় করিয়ে দিয়েছে। বাবা-মার রুমে এসি কিনে দিয়েছে। কারেন্টবিল, গ্যাসবিল প্রতিমাসে মিতুই পরিশোধ করে। কারণ সংসারে সময় দিতে পারে না। সেকারনে সে যেটা শ্রম দিয়ে পারে না, সেটা অর্থ দিয়ে হলেও করে দেয়। অথচ ইদানিং মা স্মৃতির গুণগান গেয়ে যাচ্ছে। যেটা যেকোনোভাবে হোক মিতুর কানে গেছে।

মিতুর কথা হয়তো সত্য শ্বশুর বাড়ির দৃষ্টিতে বউরা কখনো সেরা হয় না। কাজ করলে যদি সেরা হওয়া যেত তাহলে বড় ভাবী, ছোট ভাবী হতো। অর্থ দিয়ে যদি সেরা হতো তাহলে মিতু হতো। কই মাতো কাউকেই পছন্দ করছেন না।

কৌশিক উঠে গিয়ে মিতুর কাঁধে হাত রাখল।

" চলো মিতু আজ ডিনারটা আমরা বাইরেই করব। রেডি হয়ে নাও। "

মিতু রেডি হতে হতে বিড়বিড় করে বলল,

" তুমি আমাকে বুঝতে পেরেছ কৌশিক সেটাই বড় কথা। আমি ভালো স্ত্রী হতে চাই, ভালো বউ নয়।

#

Story the time (সময়)

Story the time (সময়)


 ’

লিখেছেন- শাহরিয়ার বিশাল


আমি মিমির হাত ধরে বসে আছি । দুহাতে ওর দুহাত আলতো করে জড়িয়ে রেখেছি । মুঠো কাঁপছে, তবে সঠিক কার হাতদুটো কাঁপছে তা বলা মুশকিল । সবে মিনিট-খানেক পেরিয়েছে । মনের হিসেব, ভুল হওয়ার সম্ভাবনা শূন্যের কাছাকাছি । আমি গুনে গুনে সময় বলে দিতে পারি । হাতে রয়েছে আর মাত্র চার মিনিট । চার মিনিট পর হাত ছেড়ে দিতে হবে । এর মাঝেও ছেড়ে দেয়া যেতে পারে তবে চার মিনিট পর অবশ্যই ছেড়ে দিতে হবে । নয়ত কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে । মিমি বলেছে পাঁচ মিনিটের মাথায় হাত ছেড়ে দিতে, না দিলে কেলেঙ্কারি ঘটিয়ে ফেলবে । আমি বিশ্বাস করেছি । যে মেয়ে বিয়ের আগের রাতে সাবেক প্রেমিকের হাত ধরে পাঁচ মিনিট বসে থাকতে পারে, সে সব অসাধ্যই সাধন করতে পারে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস । 


হুম, কাল ওর বিয়ে । ছেলে ভালো, বেশ ভালো একটা চাকুরী করে । চাকরীর আবার ভালো আর খারাপ, অন্তত বেকার আমির থেকে তো অনেক ভালো । ছেলে আর আমি একসাথে কলেজ পাশ । কলেজে গাধাটার নাম ছিল গ্যাস বাবু । শামীম বাবুর, “শামীম” কেটে “গ্যাস” ঢুকে গেছিল । ওর গ্যাস উৎপাদন ক্ষমতার বেশ নামডাক ছিল কি না ক্লাসে, তাই । যেদিন নাহার ম্যাডামের বিধ্বংসী টাইপের ক্লাস থাকত সেদিন সবাই মিলে ওর হাতে পায়ে ধরতাম । ‘বাবুরে বাবু দিস কিন্তু ভাই, পিলিজ লাগে’ । গ্যাসবাবু আমাদের আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে হাত তুলত, ‘টেনশন নিস না, আজ এক্কেরে একের মাল ছাড়ব’ । আমরা নিশ্চিন্ত মনে একদম শেষের বেঞ্চে বসতাম । একমাত্র একের মাল ছাড়া তার পক্ষেই সম্ভব । আর ম্যাডাম যে...... নিশ্চিত ক্লাস ছেড়ে পালাবেন । 


আমরা সব বন্ধু মিলে ঠিক করেছিলাম ওর বিয়েতে একটা গ্যাস সিলিন্ডার গিফট করব, তাও আবার খালি । বাবুকে বলতেই গম্ভীর মুখে বলে উঠল, ‘আচ্ছা দিস, তবে দুটো দিস । বাইচান্স যদি একটাতে না আঁটে । আরেকটা কাজে লাগবে । সবকিছুর একটা ব্যাকআপ থাকা ভালো’ । গাধাটার কথা শুনে এতটাই অবাক হয়ে গেছিলাম যে, সবাই দু সেকেন্ড হাঁসতে ভুলে গেছিলাম । সেই থেকে ওর নামের পাশে আরেকটা টাইটেল জুড়ে গেল ‘ব্যাকআপ গ্যাস বাবু’ । আর এই ব্যাকআপটাকেই নাকি বিয়ে করতে চলেছে মিমি ! কোনো মানে হয় ?! কে জানে বিয়ের জন্য আর কাউকে আবার ব্যাকআপ হিসেবে রেখে দিয়েছে কি না । গাধাটার কোনো ভরসা নাই ।


‘আচ্ছা একটু হোল্ড করা যাবে ?’ 

‘কি!’ 

‘হোল্ড, মানে আর চার মিনিট বাকি আছে । দুমিনিটের বিরতি দেয়া যাবে ? এই একটা কল করতাম’ ‘নাহ যাবে না, হাত ধরে থাক । পাঁচ মিনিট পর ছাড়বা । হাত ছেড়ে চোখের সামন থেকে দূর হয়ে যাবা’ অতি ভয়ানক গলা, এই গলার বিপরীতে বলা মানে কেয়ামত ডেকে নিয়ে আসা । তার থেকে থাক বাবা, খাল কেটে কুমির ঢোকানোর কোন ইচ্ছে আমার নেই । 


‘কাকে কল করবা ?’ 

‘মিমোকে’ 

‘কেন ? কি দরকার ?’ 

‘সিলিন্ডার কেনা হয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করতাম’ 

‘সিলিন্ডার ? সিলিন্ডার দিয়ে কি হবে ?’ 

‘তোমাদের বিয়ের উপহার’ মিনমিনিয়ে উত্তর দিলাম 

‘এত কিছু থাকতে সিলিন্ডার ! ক্যান ?’ ভ্রু কুঁচকে গেছে মিমির, লক্ষণ খারাপ । অযথাই শার্টের কলার ঠিকঠাক করতে করতে এড়িয়ে যেতে চাইলাম । তবে লাভের লাভ কিচ্ছু হল না, উল্টে জোর চেপে ধরল, ‘বল’ 

‘কি বলব ?’ 

‘ঢঙ্গ করবা না, তাড়াতাড়ি বল, সময় এমনিতেই কম । আর নাইলে............ এরপর আর কোন কথা চলে না, এমনেই উপরে কেলেঙ্কারির খড়গ ঝুলতেছে । আগাগোড়া সব খুলে বললাম, মিমি চুপচাপ । 


আমার ইনটিউশন বলছে মিমি লিটারেলি চিল্লিয়ে বাড়ি মাথায় তুলে সত্যি সত্যি কেলেঙ্কারি টাইপের কিছু করবে । কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে শুধু ‘ও’ বলে চুপ মেরে গেল । দু সেকেন্ড পর নিজ থেকেই ফের বলে উঠল, ‘আচ্ছা তাহলে আমাকে কয়েকটা রুম ফ্রেশনার গিফট কোরো’ । আমি নির্বোধের মত বলে উঠলাম ‘আচ্ছা’ । এই মুহূর্তে ‘আচ্ছা’ বলাটা শুধু নির্বোধই নয় আমি যে একটা গর্দভ তারও এক জলজ্যান্ত প্রমাণ । । এখানে বলা উচিত ছিল, ‘দেখ কি দরকার ঐ গাধা ব্যাকআপটাকে সহ্য করার, তার থেকে এক কাজ করো আমাকে বিয়ে করে ফেলো । অন্তত রুম ফ্রেসনারের খরচটাতো বেঁচে যাবে ।’ আমি যে সত্য সত্যই নির্বোধ তার আরো একখানা প্রমাণ দিয়ে চুপ মেরে গেলাম । মিমি ছোট্ট ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলছে । নিঃশ্বাসের তালে তালে নাকের পাটা মৃদু ফুলে ফুলে উঠছে । দেখতে এত মিষ্টি লাগছে যে চট করে চুমু খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে । অসম্ভব ইচ্ছে । আমি চুপচাপ সময় গুনে যাচ্ছি, দুশ নব্বই, একানব্বই...............তিনশ, তিনশ এক । সময় শেষ । 


‘আমার মনে হয় চলে যাওয়া উচিৎ ?’ 

‘কেন, হাত ধরে থাকতে কি এতটাই খারাপ লাগছে ?’ 

‘না মানে, পাঁচ মিনিট তো শেষ’ 

‘ও’ উত্তরটা দিয়েই চুপ মেরে গেল মিমি । মুঠোটা মনে হয় একটু শক্তও হল, কে জানে আমার মনের ভুলও হতে পারে । 


হাত ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ালাম, পকেট থেকে হয়ত খামটা এখনো বের করে ওর হাতে তুলে দেয়া যায় কিন্তু মনটা আর সায় দিল না । পাঁচ মিনিটের ছোট ইচ্ছেটাই যদি ওকে এতটা কষ্ট দেয় তবে সারাজীবনের এই অসম্ভব ইচ্ছেটা ওকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়ে যাবে । থাক, কি দরকার । ‘বিশাল’ পেছন থেকে অতি পরিচিত ডাকটা শুনে পোড়া চোখদুটোকে শক্ত করে ঘুরে দাঁড়ালাম । ওর থেকে কোন আশা নেই, আরও দুটো নিরাশার কথা শুনতে হবে এই আরকি । 

‘হুম’ 

‘আমি কিন্তু কেলেঙ্কারি করে ফেলব’ 

‘মানেটা কি ! পাঁচ মিনিটের মাথায় হাত ছেড়ে দেয়ার কথা ছিল, আমি ছেড়েছি । এখন আবার এই কাহিনী ক্যান ?’ মুখ হা হয়ে গেছে আমার । 

‘শোন ঐ গাধাটারে আমি কিছুতেই বিয়ে করতে পারব না । তুমি আমারে নিয়া পালাবা ? নাহলে কিন্তু আমি নিজে নিজেই পালাব । বল পালাবা ? বল ?’ টলটলে ঐ দুচোখের আহ্বান কখনই উপেক্ষা করার দুঃসাহস হয়ে ওঠেনি আমার, আজও হল না । হাঁটু গেঁড়ে দুহাতে খামটা ওর হাতে তুলে দিলাম । একনজর চোখ বুলিয়েই দমাদম কিল বসাতে লাগল বুকে ‘তোমার যে চাকরি হইছে, আগে বলনাই ক্যান, ক্যান ?’ দুহাতে ওকে বুকে আগলে নিলাম, মেয়েটা ছোট বাচ্চার মত ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে । 


একটু পরে ভেজা স্বরে বলে উঠলো, ‘শোন একটা কেলেঙ্কারি যেহেতু করেই ফেলতেছি সেহেতু আরেকটাও করব । আমরা না দুটো বাবু নেব । দুটো মেয়ে, না একটা ছেলে আরেকটা মেয়ে । নামদুটো কিন্তু আমি রাখব, তোমার যে নামসেন্স । ছেলেটার নাম বিহান আর মেয়েটা... হুম আচ্ছা তুমি বল, বল, আরি বল না... মিমি কি যে আবোল তাবোল বকছে তার কিছুই কান দিয়ে ঢুকছে না আমার । আমি রীতিমত ওকে বুকের সাথে পিষছি আর প্রাণপণে সময় গুনছি । পাঁচ, ছয়, সাত, আট, নয়, দশ...... ছোট্ট একটা মুহূর্তকেও হারাতে রাজি নই আমি । হারাতে রাজি নই পাগলী এই মেয়েটাকে, আর জীবনের সবথেকে খুশির সময়গুলোকে । রাজি নই আমি, একদম না ।

বৃহস্পতিবার, ৩০ মে, ২০২৪

দ্বিতীয়_বিয়ে। (দ্বিতীয় তথা শেষ পর্ব)

দ্বিতীয়_বিয়ে। (দ্বিতীয় তথা শেষ পর্ব)

 


Waiting by

আফিয়া খোন্দকার আপ্পিতা 


 পয়তাল্লিশ বছর বয়সে দ্বিতীয় বিয়ে করে খালা নিরুদ্দেশ। তার কোন খোঁজখবর পাওয়া গেল না। ফোন বন্ধ, বাসায় তালা দেয়া। খালার ছেলের ঠিকানায় গিয়ে ও কোন লাভ হলো না। প্রতিবেশী বলল, তারা বাসা বদলে ফেলেছে। খালার ছায়ায় বড় হওয়ার সুবাধে আমাদের মায়া হয়ে গেছিল খালার প্রতি। এত বছরে বাসার সদস্যই হয়ে উঠেছিলেন যেন। মোটামুটি বাসার সবাই কৌতুহলী আর উদ্ধিগ্ন ছিল এ ব্যাপারে। নির্বিকার রইলেন কেবল মা। এ নিয়ে মায়ের কোন হেলদোল দেখা গেল না। মা নতুন বুয়া খোঁজার তোড়জোড়ে ব্যস্ত। 

আমার বদ্ধমূল ধারণা আদ্যোপান্ত সব মায়ের জানা। মাকে জিজ্ঞেস ও করে ও আশানুরূপ উত্তর পাওয়া গেল না। 


প্রতিদিন সকালে হাসপাতালের যাবার আগে নাস্তার সময় পাওয়া চায়ের স্বাদ ভিন্ন হলো। খালার হাতের চা খেয়ে অভ্যাস। সেই অভ্যাসে ভাটা পড়ল। নতুন বুয়ার হাতের চা বড্ড বিষাদ ঠেকল। নতুন বুয়ার কাজ কিংবা রান্না কোনটাই মনঃপূত হলো না। মা পরপর কয়েকটা বুয়া বদলালেন। কোনটাকেই টিকল না। অভ্যাস না কি মায়ার ভাটায় কে জানে? নতুন কাজের খালা এলো গেল, কিন্তু পুরনো কাজের খালাকে আর পাওয়া গেল না। দিন, সপ্তাহ, মাস পেরুলো। 


  মাঝে একবার নাইমের সাথে দেখা হলো। আমার হাসপাতালে লিফটে। নাইমের সাথে ছিল সুদর্শনা রমনী। চোখেমুখে ধূর্ততা। বোধকরি, স্ত্রীই হবে। খালার বদৌলতে ছোটোবেলা, বড়োবেলায় আমাদের বাসায় বেশ ক'বার এসেছিল নাইম। খালা আমাদের বাসার পার্মানেন্ট ছিলেন। দিনের অনেকটা সময় তাকে আমাদের বাসায় পাওয়া যেত। নাইম আসতো কখনো বাসার চাবি নিতে, কখনো মায়ের থেকে পকেট খরচ নিতে। সেই সুবাধে মুখটা এক দেখাতে চেনা গেল। খালার চিন্তা মাথায় এনে আমিই এগিয়ে গিয়ে কথা বললাম। ভাগ্যের সুপ্রসন্নতায় নাইম অচেনার ভান করল না। কুশল বিনিময় করল। আমি নাইমকে বললাম,

" তা তোমরা এখানে কার জন্য? খালা ঠিক আছেন?" 


খালার নাম শুনতেই নাইমের কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ল। ওপাশ ফিরে নাক ফুলাল। ছোটো করে উত্তর দিল,

" আমার মামীশাশুড়ীকে দেখতে এসেছি। " 


আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। যাক খালা ঠিক আছে। জিজ্ঞেস করলাম,

" খালা ভালো আছেন? "


উত্তরটা নাইমের বদলে পাশে থাকা মেয়েটা দিল। তীব্র তাচ্ছিল্য করে বলল,

" বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরেছে, নাগর জুটিয়ে রঙ্গ করছে, বিয়ে করছে। কলঙ্কিনীরা ভালোই থাকে। "  


শ্বাশুড়ি সম্পর্কে পুত্রবধূর মুখে এহেন মন্তব্য শুনে মেয়ের অবিভক্ত বুঝা হয়ে গেল। নাইমের দিকে তাকিয়ে বললাম,

" সারাজীবন কষ্ট করেছে। এখন সুখে থাকুক। বিয়ের আগে খোঁজ নিয়েছো তো? পরিবার ভালো? " 


নাইম চোখমুখ কুঁচকে বলল, 

" এখন বিয়ে করার বয়স? সমাজে মুখ রাখল না। নিজের সুখের কথা ভেবে আমাদের মুখে চুনকালি দিয়েছে। সুখেই আছে। স্বার্থপর। এর থেকে মরে গেলেও নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারতাম।" 


আমি থমক গেলাম, নাইমের কথা শুনে নয়। নাইমের চোখমুখের ভাষা দেখে। চোখে মায়ের জন্য তীব্র ঘৃণা, বিতৃষ্ণা। কী তাচ্ছিল্যতা, কী ধিক্কার! এতখানি ঘৃণা মানুষ বোধহয় শত্রুকেও করেনা । আমি কখনো কোন মায়ের জন্য সন্তানের এত ঘৃণা দেখিনি। 


 আমার কানে বাজল, "স্বার্থপর" শব্দটা। আত্মত্যাগের উদাহরণে থাকা নামটার পাশে 'স্বার্থপর' শব্দটা শুনে আমি কথার খেই হারিয়ে ফেললাম। এই ছেলেটাকে মানুষ করার জন্য খালা রক্তমাংস এক করেছেন। পঁচিশটা বছর যুদ্ধ করার বিপরীতে কি একটু সম্মান ও ডিজার্ভ করেন না! খালা শুধু তার সুখ, শান্তি, রূপ, যৌবন বিলীন করেন নি, অর্থসম্পদ বিলীন করে একবারে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। এই তো মাস কয়েক আগেই তো ছেলে আর ছেলেবউ মেয়ে মায়ের গুচ্ছিত সব টাকা এক প্রকার হাতিয়ে নিয়েছে। 


খালা যতটা সহজ সরল, খালার ছেলে ছেলেবউ ততটাই ধুরন্ধর। নাইমের বিয়ের পর আলাদা থাকায় খালার বেতনের টাকার অনেকাংশ বেছে যেত। আমি খালাকে ব্যাংকে একাউন্ট খুলে দিয়েছিলাম। খালা টাকা ব্যাংকে জমা রাখতেন।

তিন চার বছরে তা জমে ভালো অংকের টাকা হয়ে গিয়েছিল। সে টাকার খবর কোনভাবে শুনে গিয়েছিল নাইমের বউ রিনা। তারপর থেকে শ্বাশুড়ির সাথে ভাব জমাল। নাইমের ব্যবসা লসের গল্প শুনাতে লাগল। 


খালা সবকিছু মায়ের সাথে পরামর্শ করেন। ছেলের মনোভাব খালা ছাড়া মোটামুটি সবার কাছেই পরিস্কার।  

 আজকালকার যুগে বাবা মা দম ছাড়বার পর কান্নার বদলে সম্পত্তির দলিল বসে ছেলেমেয়েরা। কে গেল থেকে কী রেখে গেল, জানা বেশি জরুরি। সেখানে এই ঘটনা কাম্যই বটে। মা সতর্ক করলেন,  


 "বয়স পড়ে আছে। এত কাজ আর কদিন করতে পারবে। টাকা থাকলে শেষবয়সে কাজে আসবে। ছেলেকে সব দিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পরে যদি ছেলে না দেখে!" 


ছেলে অন্তপ্রাণ খালা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জবাব দিলেন, "মা তো, জন্ম দিছি, কত কষ্টে পালছি, বড় করছি। মোর খুব আদরের পোলা, তার কষ্ট সইতে পারিনা। নিষ্ঠুর হইতে পারিনা। " 


মা খালাকে বুঝালেন। খালা বুঝ নিলেন। কিন্তু কথায় আছে, সরল মানুষ বিশ্বাসেই ঠকে। খালা সরলমনা মানুষ। অল্পতেই মানুষকে বিশ্বাস করে ফেলেন। অবিশ্বাস তো পরকে করা যায়, নিজের রক্ত, নিজের জন্ম দেয়া সন্তানকে অবিশ্বাস করা যায়! 


আমাদের কাছে ছেলের জন্য খালার ভালোবাসা বাড়াবাড়ি লাগলেও, কেবল খালাই জানেন এই ছেলেকে তিনি কত কষ্ট করে অর্জন করেছেন। পনেরো বছরের অপরিপক্ক শরীরে ন'টা মাস গর্ভে ধরে রেখেছেন। ছেলের বুঝ হবার আগেই বাবা মারা গেল। তখন তো বাবা মায়ের ভালোবাসা একাই দিয়েছেন। এই ছেলের জন্যই অজপাড়াগাঁয়ের এক মেয়ে অচেনা শহরে পা রেখেছে। ছেলের জন্মের পর ছেলে ছাড়া নিজের কথা মাথায় আসেনি। তার বেঁচে থাকা, তার পৃথিবী মানেই ছেলে। সন্তানের প্রসঙ্গে কি মা স্বার্থপর হতে পারে? সন্তানকে ফেলে নিজের কথা ভাবতে পারে? আমরা হয়তো দূর অবস্থান থেকে ঠিকই বিচার করতে পারব, কিন্তু কাছে গিয়ে খালার অবস্থানে বসলে শক্ত থাকার শক্তি আমাদেরও থাকবে না। সন্তান হিসেবে মায়ের ব্যাপারে আমরা স্বার্থপর হতে পারি কিন্তু মা হিসেবে সন্তানের ব্যাপারে স্বার্থপর হতে পারি না। মায়ের ধর্মই যে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।  


ছেলের জন্য খালার অবিশ্বাস এলো না। বিশ্বাস এলো। সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রইল না। ছলে বলে কৌশলে চেক বইয়ে তার আঙুলের ছাপ পড়ে গেল। কদিন ভালোই চলল।  

ছেলের ব্যবসা ঘুরে দাঁড়াতেই ছেলে, ছেলেবউয়ের মনোভাব ও ঘুরে দাঁড়াল। ফিরে গেল আগের স্থানে। নাক ছিটকাল রিনা। এমন ব্যাকটেডেড মানুষ নিয়ে উঁচু সমাজে চলা যায়! সবাই যদি জেনে যায় তার শ্বাশুড়ি কাজের বুয়া। বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করে। মানসম্মান থাকবে? থাকবে না। ব্যবসায়িক সফলতা মনে করিয়ে দিল সেটা। তারপর যা হবার তাই হলো.... মায়ের বিশ্বাস ভাঙল আরও একবার। 


মায়ের এত আত্মত্যাগের পর ও 'স্বার্থপর' এর দায়টা খালার উপর গেল! এই ছেলের বিবেকবোধ নেই! 

 আমরা ভেবেছিলাম, মায়ের বোঝা ঘাড় থেকে নামানোর জন্য বিয়ে দিচ্ছে নাইম। কিন্তু এখন দেখি সেখানেও সমস্যা। সমাজের কাছে না কি টেকা যাচ্ছে না। কোন সমাজে সমাজে সে রেখেছে মাকে! মা দিয়েই গেল, মাকে কিছু দেয়নি। বিয়ে করে থিতু হলো, সেও সহ্য হলো না। একটুখানি কৃতজ্ঞতাবোধ ও কি নেই! 


আমার স্বরে অজস্র প্রতিবাদ, অথচ আমি টু শব্দ ও করতে পারিনি। বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। খানিক বাদে রাগ নিয়ে বললাম,

"খালা স্বার্থপর! ভেবে বলছো তো!" 


নাইম অপ্রস্তুত হলো। তারপর হনহন করে চলে গেল। নাইমের ক্ষুব্ধতা দেখে আমার চিন্তা বাড়ল। খালা কি একা একা বিয়ে করলেন! 


খালার বিয়ের রহস্য উন্মোচন হলো খালার আগমনের পর। একদিন হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরে দেখি বসার ঘরে খালা বসা। সারাদিন রোগী দেখে ক্লান্ত বিধ্বস্ত আমি প্রথমে খেয়াল করিনি। কারণ অবশ্য খালার চলনবলন। আমি খালাকে সবসময় সাদামাটাভাবে চলতে দেখেছি। 


দুই ইদে মা খালাকে ভালো কাপড় দিতেন। কিন্তু খালার পছন্দ হতো সেই সুতির কাপড়। খালার গায়ে কখনো সোনার গহনা দেখিনি। মুখে বিষন্নতা, একটা দুঃখী, মলিনতা থাকতো। কিন্তু এই মহিলার ভাব ভিন্ন। পরনে চান্দেরি সিল্ক ফেব্রিকের শাড়ি। গলায় হাতে অলংকার বেশ। মুখে ঝুলছে হাসি। হেসে হেসে মায়ের সাথে গল্প করছেন। খালার কথা খেয়াল হতেই আমি চক্ষুচড়ক। 


আমাকে গিয়ে বললাম, " খালা না কি! ভালো আছেন?" 


বিপরীতে খালা সুন্দর করে হাসলেন। খালার এই হাসি আমি আগে কখনো দেখিনি। চেহারা ঝলমলে। সুখী মানুষের চেহারায় অন্যরকম এক উজ্জ্বলতা থাকে। খালার চেহারায় সেই উজ্জ্বলতা ভাসছে। খালার চোখমুখ বলছিল, খালা সুখে আছেন। 


বহুকাল ধরে কোন মানুষকে দুঃখী হয়ে থাকতে দেখার পর হুট করে তাকে সুখী হতে দেখলে মনের মাঝে অন্যরকম এক আনন্দ কাজ করে। চোখে শান্তি মিলে। খালার ওই সুখী মুখটা দেখে আমার মনে হলো, অনেকদিন, অনেক বছর পর আমি এমন সুন্দর দৃশ্য দেখিনি। খালা প্রসন্ন সুরে বললেন,

" আলহামদুলিল্লাহ ভালা আছি।" 


"ওখানে কোন সমস্যা হচ্ছে না তো?" 


খালা প্রসন্ন সুরে বললেন, " না, আল্লাহ আমারে সম্মানে রাখছে..


 দ্বিতীয় বিয়েতে ভালোবাসার থেকে সম্মানটাই ঢের কাম্য। খালা তা পেয়ে প্রসন্ন হয়ে গেছেন। তা দেখে পুলকিত হলো মন। 

খালার সুখমাখা অবতারে অবতারণে বাসায় খুশির জোয়ার বয়ে গেল। সবাই এসে বসল বসার ঘরে। আমি বললাম, 

"এতকাল আপনার দুঃখের গল্প শুনেছি, আজ শুনব আপনার সুখের গল্প। " 


খালা মায়ের দিকে তাকালেন। খালার গল্পটা মা বললেন। আকস্মিক খালার জীবনে হানা দেয়া সুখের গল্প। শুনবার সময় মনে হলো এ যেন কোন সিনেমার গল্প। পরে মনে হলো সিনেমা তৈরি হয় বাস্তব জীবন থেকে।  


খালার দ্বিতীয় বিয়ের সুত্রপাত নানুবাড়ি থেকে। বছর খানেক আগে খালাকে নিয়ে আমার নানুর গ্রামের বাড়িতে যান। বাবা ব্যস্ত, সাথে যাবেন না। মা একা যেতে নারাজ, বগলদাবা করে নিয়ে গেলেন শিউলি খালাকে। কটাদিন থেকে এলে তারও ভালো লাগবে। 


নানু বাড়িতে গিয়ে দেখা হলো একটা বছর দশের বাচ্চা মেয়ের সাথে। মলিন, বিষাদ, দুঃখ ভাসা চেহারা। মায়াময় চোখে জল দেখে খালা কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 

"কী হইছে মা? কানতাছো ক্যান?" 


মমতাভরা স্বর শুনে মেয়েটার কান্না বাড়ল। কেঁদে কেঁদে বলল, 

"মায়ের কথা মনে পড়তেছে।" 


"কী হইছে তোমার মার?"


মেয়েটা উত্তর দিল না, ডুকরে কেঁদে উঠল। খালা অনুসন্ধানী মনে জানলেন, মেয়েটার মা মারা গেছে। মা হারা মেয়ের কাতরতা দেখে বিধ্বস্ত খালার মনে হলো, তার দুঃখ অতি নগন্য। মমতাময়ী খালা মমতায় গা ভাসিয়ে মেয়েটাকে সান্ত্বনা দিলেন। কান্না থামার পর আলাপ হলো মেয়েটার সাথে। 


মায়ের দূর সম্পর্কের এক ভাইয়ের মেয়ে। নাম রোদেলা। রোদের মতোই উজ্জ্বল ছিল তার জীবন। বাবা মা আর সে, তিনজনের সুখী পরিবার। হঠাৎ মায়ের ক্যান্সার হলো। অকালেই মারা গেলেন। মায়ের মৃত্যুর পর জীবনটাই এলোমেলো হয়ে গেল। মায়ের ছায়ায় বড় হওয়া মেয়ে, মায়ের শূন্যতায় মনমরা হয়ে থাকে সারাক্ষণ। নাতনির এই অবস্থা দেখে দাদী ছেলের দ্বিতীয় বিয়ের কথা বললেন। রোদেলার বাবা তড়িৎ মানা করে দিলেন। নতুন বউ যদি তার মেয়েকে মানতে না পারে! যদি তার মেয়ের অনাদর হয়? সৎ মায়ের সংজ্ঞাতেই তো দোষ।


দাদী এবার নাতনিকে ধরলেন, বাবারে কও, নতুন মা লোইয়্যা আইতে। হ্যায় তোমারে আদর করবো। 


রোদেলা বাবাকে বলতেই বাবা বললেন,  

"তোমার জন্য আমিই যথেষ্ট। আমিই বাবা, আমিই মা। এসব কথা আর মুখে এনো না। মায়ের কোন রিপ্লেসমেন্ট হয়না। " 


মাকে মনে পড়লে রোদেলা বাবার কাছে গিয়ে কাঁদে, মাকে এনে দাও না বাবা! 

বাবা খুব অসহায় হয়ে যান তখন। ম'রে যাওয়া মাকে কি আনা যায়? তিনি সর্বোচ্চ আদর দেন মেয়েকে। কিন্তু মায়ের অভাব তবুও যায়না। রোদেলার দাদীও বুঝাতে থাকেন। শেষমেষ বিয়ে করবার জন্য রাজী হন তিনি। তবে শর্ত থাকে। পাত্রী পছন্দ করবে রোদেলা। সে যদি কারো মাঝে মমতা খুঁজে পায়, মায়ের ছায়া খুঁজে পায়। তবেই তিনি বিয়ে করবেন। 

রোদেলার মা খোঁজার পর্বে নানুবাড়িতে হাজির হলেন শিউলি খালা। 


সেবার মা খালাকে নিয়ে দিন দশেক ছিলেন নানুবাড়িতে। তখন খালা রোদেলার সাথে সময় কাটিয়েছেন অনেক সময়। এতটুকু একটা বাচ্চা মেয়ের দুঃখ দেখে খালা মায়ায় পড়ে গেছিলেন। আদর করেছেন বেশ। 


দুটো বিষয় নিশ্চিত করি, 

এক, রোদেলাকে আদর করার পেছনে খালার কোন উদ্দেশ্য ছিল না। খালা জানতেন না, রোদেলার মা খোঁজার ব্যাপারে। 

দুই, খালা পরিপাটি হয়ে থাকতেন। সাদামাটাভাবে চলতেন, তবে ছেঁড়া কাপড় পরতেন না।  


রোদেলার মন খারাপের বেলায় খালার মমতা দেখে রোদেলার মনে খালা জায়গা করে নিয়েছিলেন বটে। 

রোদেলার দাদী মাকে প্রস্তাব দিয়ে ফেলেছিলেন। মা অবশ্য তখন খালাকে জানাননি। খালাকে নিয়ে ফিরেছেন। 


ঢাকা আসার পরে খালাকে জানান। শুনেই খালা মানা করে দেন। ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়। প্রথম বিয়ের অসম্মান, অমর্যাদা, অসামঞ্জস্যতা, অপূর্ণার পর খালার জীবনে সুখ হারিয়ে গিয়েছিল।

দ্বিতীয়বার কাউকে জীবনে জড়ানোর সাহস নেই খালার। তাও এই বয়সে এসে! 


খালার প্রত্যাখানের করে ক্ষান্ত হন। মা খুব করে চাইছিলেন খালার একটা গতি হোক। মা রোদেলার পরিবারকে চিনেন। ভদ্র নম্ব বেশ। রোদেলার বাবা রেজা হাবিব খুব ভালো মানুষ। গ্রামের সহজ সরল মানু্ষ। প্রথম বউয়ের সাথে কখনো গলা উঁচু করেও কথা বলেননি। সেই পরিবারে গেলে খালার অসম্মান হবেনা, এটা নিশ্চিত থেকেই মা খালা বুঝাচ্ছিলেন। খালা বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে আসছিলেন। 


এরমাঝে ছেলে ছেলেবউ ভালো সাজল। খালা জীবনে সুখের ভ্রমে ডুবে গেলেন। তারপর ছেলে টাকা নিয়ে ছলনা করল। ছেলেকে নিয়েই সুখে থাকতে চেয়েছেন। কিন্তু ছেলেটা তাকে ঠকিয়ে গেছে বরাবর। সেবার খালার সব টাকা নিয়ে নাইম খুব খারাপ আচরণ করেছে মায়ের সাথে। খালা ভীষণ ভেঙে পড়েছিলেন। ভগ্নহৃদয়ে খালা বুঝে গিয়েছিলেন, এ ভুবনে তার কেউ নেই। যেই ছেলেকে তিনি আপন ভেবে এসেছেন, সে আপন না। সে প্রাচুর্যে ডুবে পর করেছে তাকে। আর আপন ভাবেনা। এই উপলব্ধি খালাকে শেষ করে দিচ্ছিল। নিজের জীবনটাই বৃথা মনে হলো। খালা নিজের মৃত্যু কামনা করতেন। 


খালার এই খারাপ সময়ে রোদেলা এলো ঢাকায়। আমি মনে করে দেখলাম, রোদেলা তখন খালার সাথেই থাকতো। খালা রোদেলার মায়ায় পড়ে গিয়েছিলেন। মেয়েটার সঙ্গ তাকে শান্তি ছিল, ছেলের ছলনা ভুলিয়ে দিল। জীবনের সাথে যুদ্ধ করতে করতে হাঁপিয়ে গিয়েছিলেন খালার। মা ছায়া হয়ে বুঝালেন। 

রোদেলার মায়ায় পড়েই খালা বিয়ের জন্য রাজি হয়েছেন। 


রোদেলার বাবার সাথে দেখা হয়নি তেমন। তিনি তো আর বাইশ বছরের তরুণী নয় দেখে পাত্র দেখাদেখি পর্বে চায়ের কাপে আলাপ সারবেন। দূর থেকেই দেখেছেন। খারাপ লাগেনি। 


আমাদের সবার অগোচরে খিচুড়ি পাকালেন মা। স্বভাবগতভাবেই মা বেশ চাপা স্বভাবের। তারউপর আমরা ভাইবোন সবাই পড়াশোনা, চাকরি নিয়ে ব্যাস্ত। সারাদিন বাইরে থাকি। সন্ধ্যেবেলা বাসায় ফিরি। শুক্রবারটাই সারাদিন থাকি। সারাসপ্তাহে বাসার খোঁজ থাকেনা। সে হিসেবে ব্যাপারটা এতটাও কঠিন না। 


এতে অবশ্য মায়ের সাথে বাবা ও শামিল ছিলেন। আমরা সবাই বড়ো হয়ে গেছি, এ বয়সে খালার বিয়ে কিভাবে নিব। এ জন্য খালা লজ্জায় ছিলেন। বিয়েটা হলো রোদেলার চাচার বাসায়। তিনি ঢাকা থাকেন। তারপর সুখ গায়ে মেখে খালা গেলেন শ্বশুরবাড়িতে। জীবনের বড্ড অবেলায় এসে খালার সংসার হলো, সন্তান পেলেন, সম্মান পেলেন। রেজা মামা স্বামী হিসেবে ভালো। খালাকে সম্মান করেন। কদিন মেয়ের সাথে খালার ভাব থেকে তিনিও ভীষণ ঝুকেছেন খালার প্রতি। এখন তাদের সংসারটা সুখের বটে। 


ও হ্যাঁ, নাইমের কথা বলা হয়নি। আসোলে সুখের অধ্যায়ে দুঃখের সুতো টানা অন্যায়। তাই সে প্রসঙ্গ বাদ গেল। খালার বিয়ের প্রস্তাব খালাকে দেয়ার পর মা নাইমের সাথে আলাপ করেছেন। শুনেই নাইম চটে গেল। মাকে তেমন কিছু না বললেও, খালার বাসায় গিয়ে খুব অপমান করেছেন। মা পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলার পরেও নাইম ধারণা করেছে, মা নিজেই স্বামী খুঁজে নিয়েছে। 

নাইম খুব খারাপ ভাষায় গালাগাল অবধি দিয়েছেন। ছেলের ব্যবহার দেখে খালা ফের বেঁকে বসেছিলেন। বিয়ে করবেন না। 

নাইম বিয়েতে ও আসেনি। ছেলের কথা বলতে গিয়ে খালার সুখমাখা মুখে ফের জল এলো। ছেলেটা তার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। ফোন দিলে ফোন ধরেনা। দুই একবার তুলে খুব অপমান করেছে। 


এমন না যে, বিয়ে ভেঙে দিলে নাইম মাকে দেখতো। না দেখতো না। এত কাল দেখেনি, এখন কী দেখবে। নাইম থাকে খালার আশার কিছু নেই। পূর্বাকার সময়ে নাইমের আচরণের পর খালার দ্বিতীয় বিয়ের সিদ্ধান্ত যথাযথ।  


খালার সুখ দুঃখের গল্পের মাঝে কলিংবেল বেজে উঠল। আমি গিয়ে দরজা খুললাম। লিলেন ফ্রক গায়ে একটা মেয়ে চঞ্চল গলায় বলল, 

" আমার ছোটমা কি আপনাদের বাসায়?" 


ভীষণ আন্তরিকতা নিয়ে বলল মেয়েটা। চোখ মুখ উজ্জ্বল। রোদের মতোই। আমি হ্যাঁ বলতেই, দৌড়ে ভেতরে ঢুকল। শিউলি খালাকে দেখে ডেকে উঠল,

"ছোটোমা?" 


খালা তখন ছেলের দুঃখে কাঁদছিলেন। সেই কান্নার মাঝেই মেয়েটার ডাকে হেসে ফেললেন। হাত বাড়ালেন। মেয়েটা বুকে খালার বুকে পড়ল। খালা আগলে নিলেন। মাথায় চুমু খেলেন। খালার চোখে ছেলের জন্য জল, ঠোঁটে মেয়ের জন্য হাসি। 

রোদেলা বলল,

"বাবা নিচে দাঁড়িয়ে আছে, তাড়াতাড়ি যেতে বলেছে। আজ আমরা ঘুরতে যাব।" 


খালা চোখের পানি মুছে ফেললেন। চোখ থেকে জল সরলেও ঠোঁট থেকে হাসি সরল না। খালার হাসিটা টিকল। সেই সুন্দর, সুখের হাসি। যে হাসি আমরা এতকাল দেখিনি। 


আমার মন বলল, খালা সুখে আছেন। খালার প্রথম জীবনে সুখ, শান্তি, সম্মান, সংসার কিছুই মিলেনি। দ্বিতীয় জীবনে মিলল। দ্বিতীয় বিয়ে, দ্বিতীয় জীবনে প্রথম সুখ মিলল। খালাও সুখের দেখা পেলেন। 


যার প্রথম জীবন দুঃখে কাটে, তার দ্বিতীয় জীবন সুখের কাটে। 


সমাপ্ত....


শেষ কথা- খালার ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয়তা রক্ষার্থে কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়েছে। তবে এটা নিশ্চিত যে, খালা দ্বিতীয় বিয়ের পর সুখে আছেন। খালার শেষ হাসিটা সুখের এখনো।

দ্বিতীয়_বিয়ে  । ( পর্ব-১)

দ্বিতীয়_বিয়ে । ( পর্ব-১)




Writing By 


আফিয়া খোন্দকার আপ্পিতা। 

পর্ব-১
 কদিন ধরে কাজের খালা আসছে না দেখে ফোন দিয়ে জানা গেল, খালার বিয়ে হয়ে গেছে। শুনে বেশ অবাক হলাম। খালার বয়স পয়তাল্লিশ। ছেলে ও বিয়ে করিয়েছেন। নাতির বয়স পাঁচ। এমতাবস্থায় বিয়ে করাটা বেশ বিস্ময়ের বটে। 


খালা আমাদের বাসায় প্রায় ২৫বছর ধরে কাজ করেন। 

আমার বুঝ হবার পর থেকে খালাকে আমাদের বাসায় কাজ করতে দেখছি। খালার মুখেই শুনেছি তার করুণ জীবনবৃত্তান্ত। 

 খালার প্রথম বিয়ে হয়েছে পনেরো বছর বয়সে। তাও তার চেয়ে তিনগুন এক লোকের সাথে। হতদরিদ্র বাবা বড়ো ঘরের সমন্ধ পেয়ে বাছ-বিচার ছাড়া মেয়ে তুলে দিয়েছেন দুই বাচ্চার বাবার কাছে। এলাকার প্রভাবশালী ব্যাক্তি, তালুকদার বংশ। নাম যশ খ্যাতি, অঢেল অর্থবিত্ত, কিছুরই কমতি নেই। রাজকীয় বাড়ি যার নামে, নাসির তালুকদার। 


দুই ছেলেমেয়ে। বিয়ে-শাদী দিয়ে যে যার মতো আছে। ছেলেটা থাকে শহরে, মেয়ে বিদেশ পাড়ি দিয়েছে। মা মরবার পর এ মুখো হয়না। সংসারে ঝুট ঝামেলা নেই। অত বড় বাড়ি খা খা করছে। মণি মুক্তো দেখার কেউ নেই। বিয়ের পর সব তো মেয়েরই হবে। মেয়ে রাজরানী হয়ে থাকবে। পাত্র দেখতে শুনতেও বেশ। কেবল বয়সটাই একটু বেশি । পঞ্চাশ পেরিয়ে ষাটের ঘরে এগুচ্ছে। এ আর এমন কী বয়স? পুরুষ মানুষ ২৫হোক আর ৫০, সে একই কথা। মতি মিয়া অমত করবার দিক খুঁজে পাননি। প্রস্তাব আসতেই নির্দ্বিধায় হ্যাঁ বলে দিয়েছেন।


  আশি দশকের কিশোরী মেয়ে শিউলি। সে মত দিল কি দিল না সে কথা ভাবার সময় কোথায়? ওত বড় ঘরে সমন্ধ হলে নিজের ও দিন ফিরবে, এই খুশিতে মেতেই কূল পেলেন না। এক শুক্রবার সমাজের লোকজন ডেকে পঞ্চদশী শিউলির হাত তুলে দিলেন পঞ্চাশোর্ধ নাসিরের হাতে। 


বিয়ের পরের দিন দাওয়াত হলো তালুকদার বাড়িতে। মাকে দেখে শিউলি কেঁদেকেটে বলল, মা আমি থাকব না এখানে। আমাকে নিয়ে যাও। লোকটা খুব খারাপ। 


মা ধমকে উঠলেন, স্বামীর নিন্দে করতে নেই। খারাপ হোক ভালো হোক, এখন থেকে উনিই তোর সব। এটাই তোর বাড়ি। মানিয়ে নে। 

দাদী বললেন, মাইয়্যা মানুষ স্বামীর ঘরে বউ হইয়্যা আহে, , লাশ হইয়্যা যায়। আর কোন যাওন টাওন নাই। মনে রাহিছ। 


 রাজভোগে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে বিদায় নিলেন তারা। যাবার কালে শিউলি কত আকুতি করল সাথে নেবার। কেউ নিল না। যদি আর না আসে! সংসারে মন বসে গেলে পরে যেতে পারবে। 


শিউলি বেগম সেদিনই বুঝে গেলেন, এখন এটাই তার একমাত্র আশ্রয়। নিয়তি মেনে নিলেন, মানিয়ে নিলেন। প্রথম দিকে মন কাঁদল, চোখ ভিজল। ধীরে ধীরে অভ্যাস হয়ে গেল বুড়োমানুষটা। 

 বছর ঘুরতেই বমির ব্যামোতে সুখবর আলো। ন'মাস বাদে কোল আলো করে এলো পুত্রসন্তান। ছেলের মুখ দেখতেই শিউলি নিজের দুঃখ কষ্ট সব ভুলে গেলেন। ছেলের মাঝে সব সুখ খুঁজে পেলেন। বুকে আগলে পরম যত্নে ছেলেকে আগলে রাখলেন। 


শেষকালে পুত্রসন্তানের বাবা হবার সৌভাগ্যে খুশিতে আটখানা হলেন নাসির তালুকদার। গরু জবাই করে আকিকা দিয়ে নাম রাখলেন, নাইম। 


স্বামী, সন্তান, সংসার নিয়ে শিউলির দিন ভালোই কাটছিল। কিন্তু সুখ যেন ঠিক ছুঁয়েও ছুঁতে পারেনি। বিয়ের বছর পাঁচেক হতেই বার্ধক্যজনিত রোগে গত হলেন স্বামী। হেসেখেলে বেড়াবার বয়সে গায়ে জুড়ল সাদা শাড়ি, বিধবা উপাধি। ভালো হোক কি মন্দ, ওই মানুষটাই এতদিন ছায়া হয়ে ছিল শিউলির। এখন সেই ছায়াও চলে গেল। 


স্বামীর মৃত্যুর শোকের মাঝে এলো তার জীবনের আরেক ঝড়। আগের পক্ষের ছেলে এসে হাজির হলো। বাবাকে দাফন করে এসে বাবার রেখে যাওয়া সহায় সম্পত্তির দলিল বুঝে নিল ছেলে। ছেলে বউ বুঝে নিল শিউলীর আলমারিতে রাখা বংশীয় অলংকার, আঁচলের গিট খুলে নিল সংসারের চাবি। 


শুভ্র শাড়িতে ছেলেকে বুকে নিয়ে নির্বাক চেয়ে রইল শিউলি। সে স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ। 


রাতারাতি উকিল ডেকে সব সম্পত্তি নিজের নামে করে নিল নাদির। বোনকে অবশ্য দিল কিছু। পেল না কেবল বাবার শেষ বয়সের ছেলে। না সম্পত্তি আর না স্বীকৃতি। কড়া স্বরে ঘোষণা দিল, বাবার দেখভালের জন্যই ছিল। এখন বাবা নেই, তার ও প্রয়োজন নেই। এত ঝামেলা কাধে নিতে পারবেনা। 


শিউলির জায়গা হলো না তালুকদার বাড়িতে। এক প্রকার বের করে দেয়া হলো তাকে। ছেলেকে নিয়ে ফের এসে পড়লেন বাবার বাড়ি। সেখানে নুন আনতে পানতা পুরোয়। তার আগমনে বাবা মা ও খুশিতে হতে পারলেন না। মেয়ে, তার উপর নাতি, এ যেন বাড়তি ঝামেলা। 


আশি নব্বই দশকে একটা বিধবা মেয়েকে সমাজ মেনে নিতে পারতো না। সতীদাহ প্রথা উঠে গেলেও রেশ কিন্তু রয়ে গেছিল। বিধবাকে পুড়িয়ে মা'রতো না, তবে জীবন্ত মা'রতো। মৃত লাশ দাফন করা হতো, কিন্তু জীবন্ত লাশ রেখে দিতো। তাকে পদে পদে হেয় করা হতো, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হতো। তাকে অপয়া ভাবা হতো। কথার বাণে বিদ্ধ করে ক্ষতবিক্ষত করা হতো প্রতিক্ষণ। তার বাঁচা দুর্বিষহ করে তুলতো। 

 আত্মীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশীর কথায় কান ভারি হলো। কদিন যাবার পর মা বোন ও কথা শুনাতে লাগলেন। উঠতে বসতে কটু কথা কানে এলো পরিবার থেকে। শিউলির বুঝে গেলেন, এখানেও ঠায় হবে না তার। 


তখন শিউলির বয়স ২০, ছেলের বয়স ৫। বাস্তবতা বুঝবার ক্ষমতা শিউলির হলেও বাচ্চাটার হয়নি। জমিদার ঘরের ছেলে। আভিজাত্যে বেড়ে উঠা। তিন বেলা মাছ মাংস খাওয়ার অভ্যাস নাইমের। নানা বাড়ির পেঁয়াজ, মরিচ দিয়ে পান্তাভাত তার গলা দিয়ে নামে না। ছেলেটা খেতে পারে না, মাংসের বায়না করে। শিউলি এনে দিতে পারেন না। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে যায়। খাওয়া অনিয়মে অল্প কদিনে ছেলের শরীর ভেঙে আসে। 


ছেলের দিকে তাকালে চোখে জল নামে শিউলির। কী করবে না করবে দিশেহারা লাগে। অজপাড়া গাঁয়ের অশিক্ষিত মেয়ে, জীবিকা নির্বাহ করবার পথ খুঁজে। ছেলেকে বাঁচাতে হবে তার। এখান থেকে পালাতে হবে, এ সমাজ বাঁচতে দিবেনা তাকে।  


সেই তাগিদে পা বাড়ান ঢাকায়। বস্তিতে আশ্রয় নিয়ে, মানুষের বাসায় কাজ জোগাড় করেন। 


খালা তখন থেকে আমাদের বাসায় কাজ করেন। ছেলেকে নিয়ে আসতেন। খালার মুখে কেবল একটাই নাম থাকতো, আমার নাইম। খেয়ে না খেয়ে ছেলেকে মানুষ করতে লাগলেন। মানুষের বাসায় কাজ করে, পড়ালেন ছেলেকে। আমাদের বাসায় ভালোমন্দ রান্না হলে, খালা কখনো খেতেন না। বলতেন, আমার ভাগেরটা দিয়ে দিন, আমার ছেলেটা খাবে। নিজে খেতেন না, দু'বেলা ছেলেকে খাওয়াতেন। ছেলের খুশিতেই খালার খুশি। খালার গায়ের কাপড় যত মলিন, ছেলের কাপড় তত উজ্জ্বল। ছেলের দিকে চেয়ে খালা কত কিছু বিসর্জন দিলেন, কত সংগ্রাম করে গেলেন। 


খালা আত্মমর্যাদা ছিল প্রখর। এত বাধাবিপত্তির পর ও কারো দয়া নেননি। নিজে কাজ করে ছেলের খরচ চালাতেন। 


স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে ছেলে বায়না ধরল শহরের বড় কলেজে পড়বে। খালা আর ক'টা বাসার কাজ বাড়িয়ে নিলেন। রাতদিন খেটেখুটে ছেলেকে পড়ালেন। খালার আশা ছেলে একদিন বড়ো চাকরি করবে। মাঝে মাঝে বলতেন, 

"বুঝলা মা, শরীরডা আর কুলায় না। গিটে গিটে ব্যাথা। পোলার চাকরি হইলে এই কাম ছাইড়া দিমু। আমাগো সুখের দিন আইব।" 


সেই সুখের দিন এলো। ছেলের চাকরি হলো। বস্তি থেকে বাসায় উঠল। খালা বিদায় নিতে এসে উৎফুল্ল হয়ে বললেন, "আমার সুখের দিন আইসা গেছে। দোয়া কইরো।" 


খালার সুখ দেখে আমাদের স্বস্তিই মিলল। সেই স্বস্তি উবে গেলে মাস তিনেক বাদে। একদিন ফোলামুখ নিয়ে খালা এলেন বাসায়। গায়ে মারের দাগ। কাতর গলায় মাকে বললেন,

"আমারে কাজে লোইবেন আপা?" 


মা অবাক হয়ে বললেন, " তুমি কাজ করবে কেন? তোমার ছেলের কতবড় চাকরি! " 


ছেলের কথা আসতেই খালা ডুকরে উঠলেন। ভেজা গলায় বললেন,

" আমার পোলাডা বদলাইয়্যা গেছে, আপা। বউ আমার গায়ে হাত তুলল, পোলা চাইয়্যা চাইয়া দেখল।" 


যে ছেলের জন্য মানুষটা নিজের সুখ শান্তি বিসর্জন দিয়েছে, সেই ছেলে এই প্রতিদান দিল! জানা গেল, ভার্সিটিতে পড়ার সময় এক জুনিয়রের সাথে মন দেয়া-নেয়া হয়েছিল। ভালো চাকরি পেয়ে বিয়ে করে বউ ঘরে তুলেছে। শিউলি খুশিমনেই মেনে নিলেন। কিন্তু বউ তাকে মানতে পারল না। সংসারে শ্বাশুড়ির উপস্থিতি পছন্দ না তার। বরের কান ভাঙিয়ে কদিনেই মায়ের প্রতি বিতৃষ্ণা তৈরি করিয়েছে। শ্বাশুড়ির সাথে খারাপ ব্যবহার করতো। হাত ও তুলতো। শিউলি ছেলেকে বলার সুযোগ পেতেন না, তার আগেই ছেলের কান ভারি করতো বউ। ঘটনা এমনভাবে উপস্থাপন করতো, যেন সব দোষ শিউলির। নিত্যকার কলহে ছেলেও অতিষ্ঠ মায়ের প্রতি। 

সংসারে সুখ আনতেই বিরক্তির ভাঁজ ফেলে নাইম বলল, 

"রোজ রোজ এত অশান্তি ভালো লাগেনা, মা। তুমি অন্য ব্যবস্থা করো। "


পোড়া কপালের ছাই তুলে বেরিয়ে গেলেন শিউলি। দ্বিতীয়বারের মতো উঠলেন বস্তিতে। একবার ছেলেকে বাঁচাতে, আরেকবার ছেলের থেকে বাঁচতে। 

সুখের দিন এলেও সুখ তাকে ছুঁতে পারল না এবারও। 


তারপর থেকে খালা আবার বাসায় কাজ করেন। জীবনের এত উত্থান পতনের মাঝেও খালা কখনো দ্বিতীয় বিয়ের নাম নেননি। তবে এখন কী এমন হলো যে খালা বিয়ে করে নিলেন? 




চলবে.....


বাস্তবিক ঘটনার নিরিখে ছোট্টো একটা গল্প। আগামী পর্বে শেষ হবে।

শুক্রবার, ২৪ মে, ২০২৪

Romantic story

Romantic story

লেখা: সুবর্ণা শারমিন নিশি


নিশা যদি আজ জানতে পারেন যে রায়হান এখনও বাড়ি খুঁজতে পারেননি তাহলে সম্ভবত তাকে চিবিয়ে খাবেন। অফিসে প্রচন্ড কমিউনিটি প্রেশারে এসির সীমাও এই চিন্তা রায়হানের ঘাম ছুটিয়ে দিচ্ছিল। ওদের বিয়ে হয়েছে কেবল চার মাস। যদিও বাইরের পরই নিশাকে নিয়ে রায়হান একটা ছোট্ট একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে শুরু করে কিন্তু উত্তর দিতে যাচ্ছে তাই। বোঝাতে থাকে কানাডায়, কেয়ারটেকের হাতে পানির সমস্যা, এর সমস্যা, ফ্ল্যাটর থেকে সিঁড়ি শুরু করে অনেকটাই নোংরা দিয়ে ভরা, হাবিজাবি এলাকান সমস্যা। নিশা কোনোভাবে মাস তিনেক পার করে রায়হানকে এক কথা বলে সে আর ঐ ফ্ল্যাটে, রায়হান যদি নতুন বাড়ি না থাকে তাহলে আর চিরকালের মতো হারিয়ে যাবে। নিশার এই এক অভ্যাস, খুব জেদি, অনেকটাই রেগে যায়। ঘরের সাথে চিরকালের মতো হারিয়ে যাওয়া কি সম্পর্ক, বুঝতে পারে না রায়হান। এক মাস প্রায় শেষ হতে চললো রায়হানের অফিসের চাপ এতই যে বেরোবে বাড়ি খুঁজবে সেই উপায় নেই। 

-কি কথা রায়হান ভাই এই নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়াতে ঘামছেন কেন? মিট মিট করে হাসছে কলিগ তানিয়া , মেয়েটা ইচরেপাকা কিন্তু মনটা খুব ভালো আর মিুক।
-আর বোলো না তানিয়া জানোই তোর বাড়ি বদলাতে হবে আর এটা কি মুখের কথা!
-উফ রায়হান ভাই! আপনি না ব্যাকেডেটেড হয়ে যাবেন থেকে এখন তো ফেসবুকেই টুলেটের প্রস্তাব দেওয়া হয়। আপনি ওখান থেকে ছবি দেখবেন, ভিডিও দেখবেন, ফোনে কথা বলবেন, পোষালে যাবেন বাড়িওয়ালা সমস্যা শেষ।
-তাই, কি বোলো!
-হ্যাঁ এই তো খারাপন না, তানিয়া মোবাইল ফোনটা ধরলো 
রায়হান দ্রুত নিজের ফোন থেকে শুরু করতে কয়েকটা বাড়ি পছন্দ করা। কিন্তু একটা জায়গায় গিয়ে সে ইন্টেন্টে গেল। ফ্ল্যাট্যাটের ঘরের ছবি বাথ রুমে রান্নাঘর বারান্দার ছবি সুন্দর করে সাজানো কিন্তু আমার ক্যাপশনটা দেওয়া হচ্ছে নিরিবিলি ভাড়াটিয়া চাই নিরিবিলি বাড়ির জন্য। বাড়ির নামটাও" নিরিবিলি" কি অদ্ভুত! অফিস একবার যেতে যেতে হয়। 
এই রায়হান খান আছে নিরিবিলি জবাব আশরাফ সাহেবের বক্তব্য। ভদ্রলোক-বিপত্নীক, একা থাকেন, একটা ছেলে আছে, পুরানো ৪০ এর আশেপাশে। আগে ঢাকা ইউনিভার্সি ফিজিক্স পাঠেন, স্বেচ্ছায় অফিস থেকে অবসরের।
ভদ্রলোক চশমাটা ঠিক করে নিয়ে রায়হানের দিকে এগিয়ে বললেন,
- আপনার ফ্যামিলিতে কে আছে?
- আমি আর আমার স্ত্রী 
-বাচ্চা?
- না শিশু আমাদের বিয়ে হয়েছে কেবলমাত্র মাস 
-ভালো হয়েছে, শিশুকা থাকলে চিৎকার চেঁচামেচি হয় আমার আবার পছন্দ না। রায়হান একবার ভুরুচকালো। বাচ্চাকাচ্চা নাই এমন না যে তাদের কখনো বাচ্চা হবে না। এখন তাদের এই প্ল্যানের বৈশিষ্ট্য নেই। তা ছাড়া বাড়িটা সুন্দরভাবে, সামনে অনেকখানি খোলা জায়গা, দোতলা বাড়ি ভদ্রলোক দোতা থাকে। নিচতলা টাকার ভাড়া, কারণ যা যাচ্ছে পয়সারে ভুল বোঝায় উনার, নিতান্তই খালি পড়া দরকার নেই তাই বড় বাড়ি ভাড়ার নাম লেখার কারণ এতটা ভাড়ায় রায় রায়হানের কিছু শর্ত আছে যেমন দোলায়ঠা যাবে না, ছাদ ঘটনা, চিৎকার। চেঁচামেচি করা যাবে না, বেশি মেহমান আসা যাবে না, নিজের বাগানের ফুল যাবে না, এই হাবিজাবি।
এতগুলো শর্ত চালু করার পর রায়হান কোল ঝাঁজ বেরোতে বললে,
- আমি কি মনে করি তা জানতে না 
-প্রয়োজন নেই তোমার কাপড়চোপড় ,থাক বার্তার স্টাইল, বসার ভর্তা সমস্ত অ্যাক্টিভিটিস বলে তোমার ব্যবহার এই শারীরিক ভাড়া নিয়ে কঠিন করা হবে না।
রায়হান বাধা দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললো,
আগামীকাল আমার স্ত্রী নিশা এসে দেখবে, যদি তার পছন্দ হয় তাহলে কেবল কনফার্ম করা হবে, আপনার কোন সমস্যা আছে?
-নাহ, শুধু দোতালায় কারন না পাওয়া। ভালো করে উঠুন, আমার ছেলেটা আপনি চলে গেছে। চা অফার করতে পারলাম না দুঃখিত।
বাড়িওয়ালাকে রায়হানের পছন্দ হয়েছে সে তার লেখা এত ইন্ট্রোভার্ট মানুষ ভুলনি। 
পরদিন অফিস থেকে ফির নিশা ছুটে এসে রায়হানকে প্রায় ধরলো।
- শোনো ছেলে বাড়িটা আমার পছন্দ হয়েছে। কি সুন্দর বাগান আর খোলা জায়গা, আমরা উঠতে পারি, বাড়ি তো খালি পড়ে আছে। ছেলেটা যে কেয়ারটেকার ছেলেটা কি নাম ,ও মনে মনে সুন্দর আমার সাথে আমার কথা হয়েছে। আপনার পক্ষে সব কাজ করে, ভাড়া টাকাও আমাদের হাত দিয়ে যায়, ও বলেছে কালই আমরা উঠতে পারি, চলো না চলো না প্লিজ।
রায়হান নিশাকে বুকে চেপে ধরে ঠোঁট চেপে হাসতে লাগলো। কে বলে এই মেয়েটি অনার্স কমপ্লিট করেছে , স্বভাবে আর আচরণে এখনো শিশুই রয়ে গেছে৷ বাবা মা হারিয়েছে কতকাল আগে, চাকে মানুষ হয়েছে, রায়হানই আমাদের সব, রায়হান আরো শক্ত করে নিশাকে ধরলো।
নিরিবিলি বাড়িতে এসে নিশা প্রশাসন। এইবার অন্য সে সত্যকারের জন্য কোমর বেঁধে মাঝে মধ্যে গুছিয়ে ফেললো কয়েকটা। বাড়িটার সামনের খোলা জায়গায় সেলিকারিই কফি মগ হাতে নিয়ে শুনতে শুনতে হাঁটাহাঁটি করে। রায়হান আশরাফ সাহেব বুদ্ধহয় বিষয়টা পছন্দ করবেন না কিন্তু সে ভুল ছিল। তাদের কথাবার্তা ও শব্দগুলো দোতলা পর্যন্ত না অনেকটাই হয়। ভদ্রলোক দোতালায় একা একা কি করেন, কে শিক্ষার্থী? তবে উনার কেয়ারটেকারমনের কাছ থেকে যা জানা গেছে ভদ্রলোকের সুফি কিছু ভালোভাবে চেক করে কিছু ব্রেরী আছে ক্রমলাইন সেখানে আলোচনা করে, গভীর রাতের গানের প্রকাশন, খুব ঘনঘন চা ক খান সাথে সিগারেট যাকে বলা হয় স্কার। জীবনযাত্রার মন যখন খারাপ হয় তখন আপনার কম্পিউটারের কবরস্থান আছে সেখানে ওনার মা, বাবা, ছোট সেই পাঁচ বছর বয়সে পানিতে ডুবে মারার বন্ধু আর কবরের বিনিময়ে চুপচাপ বসে থাকে। আশরাফ সাহেবের আবেদন গুরু গম্ভীর আচরণের কারণ রায়হান এখন আলোচনা, ভদ্রলোক প্রকৃতপক্ষে এককভাবে। 
প্রায় চার মাস। বাড়িতে বাড়িতে প্রায় প্রতিদিনই নিশার ঘ্যানঘ্যানি শুনতে আর এখানে এসে নিশা পুরোই বলে গেছে। প্রতিদিন ফোন করে জানার খোঁজ খবর অফিসই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কথা বলে। ছুটির দিনগুলোতেও উত্থাপিত হওয়ার জন্য বায়না ধরে না আমার রায়হানের পছন্দের খাবার রান্না করা। হালকা সাজগোজাও করে। বাকিটা শুধু ছেলেমানুষী করে দোতলায় ভুল, বেচারি কথা ধমককে দেখতে পাল্টাও। কিছু করার নেই, এটা তো শর্তই ছিল, রায়হানের নিয়ম মেনেও পারছিল না, এতটা অপমানিতও অন্যকে ভুল করেনি। বিগত তারিখেই কিন্তু জীবন তাদের খুব সুখেই ছিল।
কিন্তু এক সন্ধ্যায় নিয়মের ব্যতিক্রম করা। অনেকবার বাজান পরেও খুলনা না নিশা। নিজের পকেট থেকে চাবিটা বের করে লেখালিখল রায়হান। সে এলাকায় ছিল নিশা শঙ্কা ঘুমিয়েছে। কিন্তু নিশা নেই। সে সব নিয়ম ভেঙ্গে দোতলায় ছুটে গেল। 
-আরে রে ভাইজান, কি করেন, কি যান? সুমন বলে উঠলো না মেজাজ খারাপ বোলো, মানুষ পছন্দ করেন।
-কি হয়েছে রে সুমন? সুমন কাঁচুমাচু করে এক পাশে সরে গেল। আশরাফ সাহেব বের হয়ে আসছেন তার লাইব্রেরী থেকে।
- আমি খুব দুঃখিত তোমাকে বলার জন্য কিন্তু নিশাকে খুঁজে পাচ্ছি না, ফোনটাও বলে গেছে। আপনাকে না বলে ছাদে, বাগানে বাড়ির সব জায়গা খুঁজে বের করতেও কিছু নেই। রায়হানের পক্ষে ছিল ভদ্রলোক প্রচন্ড প্রবর্তন হবে কিন্তু আশরাফ সাহেব তাকে শান্ত করে বললেন,
- হোন চলুন আপনার আদর্শ। আশরাফ সাহেব রায়হান এবং সুমন তিনজনে চাপ এলো।
- এক কাজ করুন মিস্টার রায়হান আপনি আপনার স্ত্রীর ফোন থেকে তার বান্ধবীদের পরিচিত এমন কেউ আছে যার বাড়িতে সে যেতে পারে ফোন দিন। 
রায়হান যন্ত্রের সাহায্যে রোবট, তাই ঠিক করতে বাড়িতে চাওয়াই নিশা। 
-আপনি ফোনে খবর নিতে আমি আমার মত দেখছি, সুমন আশরাফ সাহেবের পিছন পিছন বের হয়ে গেল।
কোন উপায় না পেয়ে রায়হান পৌঁছে গেল কিন্তু ওরা বলল ২৪ ঘন্টা ধৈর্য ধরতে। রাত ১১:৩০ টার দিকে রায়হান বাড়ি ফিরে এলো। তার বারান্দায় হাত দিয়ে পাশ্বর সুমন শান্তি আছে।
-ভজান আগামী? ও ভাইজান , এহন কি হতে পারে? এই ঘর তো বডনাম হওয়া বো। 
-মানে তুমি কি বলছো সুমন?
-আপনাগোর আগেও এক লোক তার পরিবার নিয়া ভাড়া নিছিল কিন্তু সেমব, পরিবার উধাও। ভালো কষ্ট পোহাইতে হয়েছে। আপনি তো ম্যালা ভাগ্যবান, সামনে নিজের বড় চাচার ফোন দিয়া আপনার বয়ের খোঁজখবর নিতে বলেছেন, তার বড় চাচা রাজনৈতিক বড় বড় চাচার।
ভারাক্রান্ত হৃদয়ে রায়হান ফিরে এলো নিজের তৈরি। অনেক ধকল গেছে, তাকে শুতে হবে, বিএনপি কোনোমতে বিছানায় দিল কোলবালিশটা সরে যেতে একটা চিরকুটের মত পাওয়া গেল।
"আমি দুঃখিত রায়হান, আমি সোহানকে ভালবাসি। চাচার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আমার কাছে একটা ভিডিও করে। সো তখন কোন অফিসে ছিল না আমাকে নিয়ে তুলবে তার কোন নিশ্চয়তা ছিল না এবং এখন ভাল কথা বলবে আমার সাথে আমার উত্তর, তুমি বললে। আমাকে ক্ষমা করে দিই ইতি নিশা"
রায়হান কাঁপা হাতে চিঠিটা ধরো। মনে মনে কি তবে তারদিনের মত হারিয়ে যাবার, এই ভয়ই কি সে দেখাতো রায়হানকে?
-রায়হান সাহেব জেনারেলন? আশরাফ সাহেবের কন্ঠ 
 সেই চিঠি দিয়ে রায়হান মেরে পাস ছিল, কখন সকাল হয়েছে সে সকাল না 
খোলাই ছিল আশরাফ বলার কথা বলতে শুরু করুন 
-শুন আপনি চিন্তা করবেন না, আমার পরিচিত একজন আছে। দুই একের মধ্যেই আপনার স্ত্রী পাওয়া যাবে ইনশাআল্লাহ। কেবলমাত্র না, সব ঠিক হয়ে যাবে।
রায়হানের নেতৃত্বে মাথা তুলুন, কম্পিউটার হাতে চিঠিটা আশরাফ সাহেবের দিকে দিতে দিতে দিতে 
-ওকে আর খুঁজতে হবে না দয়া করে আর কষ্ট করবেন না।
চিঠি পড়ে বিস্ময়ে আশরাফ সাহেবের দেখা বড় হয়ে গেল। 
রায়হান ফিরে গেছে তার ব্যাচেলার জীবন সেই মেসে।
লাইব্রেরীর রিং চেয়ারে দোল নিজের আশরাফ সাহেব মনে করতে লাগলেন, "তোরা স্বামী স্বামী না থাকলে প্রেমিককে বাড়িতে ডেকে নাস্তামি করবি মেয়েটা সহ্য না হয়। বর দিয়ে পরিবারের সদস্যরা অধিকার।"
নিশার কাছে সোহানকে বেশ কয়েকবার আশরাফ আসতে চলেছে। কাছে সোহান বের হতে যেতে আশরাফ নিশারে কলিংবেল বাজায়। প্রতীক নিশা ভয় ভয় হওয়া যায়। সুমন তার গলায় ছুরি ধরেছিল আর আশরাফ বলেছিল চিঠিতে কি লিখতে হবে। ভাবতে আশরাফের ভাবতে ফুটে উঠতে বিধ্বস্ত একটা হাসি। চিৎকার করে তার সকল কুকর্মের কর্মীর সুমনকে ডাকলো। সুমন প্রায় ছুটতে এলো।
-হা*রা*মজা*দা টু-লেট ঝুলানোর কথা কি বলতে হবে? আর টেবিল পেইজটা আবার প্রকাশ করার কথা তোকে বারবার মনে করিয়ে দিতে হয় জা*নোয়ার?
এতগুলো গালি প্রচারের পরেও সুমন দিয়া বের করে বলে, -দুটোই করে কথা বলেছি, আপনি কোন চিন্তা করবেন না নিরিবিলি বাড়িতে ভিতরেই ভাড়াটিয়া বলে তার জন্য একই বিশ্রী কদাকার হাসি।
.


শুক্রবার, ৩ মে, ২০২৪

শিমুর_বিয়ে

শিমুর_বিয়ে


Writing By
দোলনা_বড়ুয়া_তৃষা


 ব্যাপারটা আমারা কেউ ঠিক মেনে নিতেই পারছিলাম না মা কীভাবে এই বিয়ের জন্য রাজি হয়ে গেল। কারণ শাহেদের পরিবারের সাথে দেখা হওয়ার আগে সবচেয়ে রেগে ছিল মা। মাকে অনেক টা জোর করেই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, এই বলে যে, সে ঘরে আমার বিয়ে দেওয়া হবে না।কথা বলে ফেলা হয়েছে না গেলে ব্যাপার টা ভালো দেখাচ্ছে না তাই। 

আমাদের বিশাল জয়েন ফ্যামিলি, দাদার খানদানী আমলের বিশাল এক বাড়ি আছে। যেটা দেখলে হিন্দি সিনেমায় দেখানো হাবিলির মতো লাগে। 

ওটাতে অবশ্য আমরা থাকি না। তবে সবার আশা যাওয়া আছে। সুবিশাল একটা জায়গা ডেপলভমেন্টকে দিয়ে বিশাল ফ্ল্যাট বাড়ি করা হয় যে যার পছন্দ মতো চার টা চারটা ফ্ল্যাট নিয়ে থাকি। আলাদা খাওয়াটা হয় শুধু। বাকি সব কিছু একসাথেই চলে। বড় আব্বু আর দাদু এখনো ঘরের হেড। 

এমন জমিদারী টাইপের ঘর হলেও আমাদের ঘরেই কেউ জমিদারী ছেলের মতো বসে খায় না। সবাই উচ্চ শিক্ষিত আর উচ্চপদস্থ। তাই হয়ত ঘরের সম্মান টা এখনো অক্ষত আছে। আব্বুরা চার ভাইয়ের মধ্যে দুই ভাই বুয়েট থেকে পাশ করা ইঞ্জিনিয়ার আর দুইভাই ডাক্তার। চাচাদের বউরাও ডাক্তার, ওদের ছেলে মেয়েরা কেউ ডাক্তারি পড়ছে কেউ ইঞ্জিনিয়ার।  

আমার আব্বু মেজ ভাই। আমার আম্মু কলেজের অধ্যাপিকা। 

ধরা যায় আমাদের এলাকায় আমাদের মতো ঘর রাজ পরিবারেই। যেহেতু আম্মুরা সবাই সুন্দরী আমরা ছয় বোন ও তাই পরীর মতো সুন্দরী বলা যায়। আমাদের পরিবারের বিলাসিতা ময় জীবন আমাদের পুতুল বানিয়ে রেখেছে। আমার চার বোনেরেই বিয়ে হয়েছে এমন ঘরে যাদের ঢাকা ঘরে গাড়ি বাড়ি আছে। এমন পরিবারের সাথে যায় এমন উচ্চ পদস্থ চাকরি আছে। 

এতকিছু থাকার পরেও সব বাঙালী পরিবারের মতো কোথায় যেন একটা সুর কাটা আছে। চাচী মায়েরদের মধ্যে সুর টেনে কথা বলা, একে অপরের খুত ধরা। কিন্তু সবার মধ্যে একটা জিনিস মিল আছে সেটা পরে বলছি৷ 

এইবার আসি শাহেদের কথায়। দাদু এখনো বেঁচে আছেন। উনি এখনো মাঝেমধ্যে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন। সেখানে পরিচয় শাহেদের বাবার সাথে। উনি বেশ সম্মানী ব্যাক্তি। উনি আমাকে দেখে বেশ পছন্দ করেছেন। না করার কিছু নেই। চার বোনের বিয়ের পর এখন আমার সিরিয়াল। আমি ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার কিছুই হতে পারি নি। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এইবার মাস্টার্স করে বের হয়েছি। বড় আপুর হাসবেন্ড বলেছেন, রেজাল্ট বের হওয়ার পর আমাকে উনাদের ব্যাংকে জব দেবেন। 

আমার ছোট চাচার মেয়ে ছোট টা সামনে ইন্টার পরীক্ষা দেবে। 

উনি দাদুকে খুব করে বললেন আমাকে তাদের বেশ পছন্দ হয়েছে। তার ছেলের জন্য আমাকে নিতে চান।

আসল কথা কেউ জানে না। আমি আর শাহেদ একই এলাকায় বড় হয়েছি। আমরা এক স্কুলে পড়তাম। তখন থেকে আমাদের সর্ম্পক। 

আমাদের ঘরে আমাদের সর্ম্পকের কথা জানাব সেই সাহস আমার নেই। কারণ আমি জানি আমাদের সর্ম্পক কেউ মানবে না। 

 সাদিয়া আপুও মারুফ ভাইয়াকে পছন্দ করত। সবাইকে জানানোর চেষ্টা করেছে। এতে ফল হলো তাড়াতাড়ি বিয়ে ঠিক করা হলো। তাতে করে আপু পালিয়ে গেল। এখন ঠিকিই মেনে নিয়েছে। আমাদের ঘরে মেয়েদের মর্জির চেয়ে তাদের সম্মানের দাম বেশি। 

শাহেদ কে আমি এই পদ্ধতি জানিয়েছি। তবে শাহেদ বলল, আমার ঘরে তো মানবে। পালানো তো সমাধান না। আগে একবার ট্রাই করে দেখি৷ তারপর না হয় দেখা যাবে। কি হবে? তবে শাহেদের কথায় বুঝেছিলাম ও পালানো পক্ষে না। যদি না এইভাবে না হয় তাহলে হয়ত হবে না বিয়ে। 

শাহেদ এই বুদ্ধি করল। সবার সামনে দাদুকে বলল, যাতে সম্মান রক্ষার জন্য দাদু সম্মতি দেয়।  

শাহেদের বাবা বলেছিল যে,

সবাই তো আমাদের ঘর আর পরিবার সর্ম্পকে জানে। মেয়েও দেখেছে। তাই আমাদের পরিবার তাদের ঘরে যাবে, তাদের ঘর আর ছেলে দেখতে। কারণ মেয়েকে বিয়ের পর তো ওখানেই থাকতে হবে। আগামী শুক্রবার সবাই আমরা যেন যায়। 

সবার সামনে দাদু হ্যাঁ বলে এলেন। 

এই নিয়ে ঘরে বেশ তুলকালাম চলল।আলোচনা,বৈঠক। 

দাদু সব সময় বেশ হিংসের মতো গর্জন করলেও এইবার কেন যেন চুপ হয়ে গেলেন।মিনি গলায় বলল, সবার সামনে বলল তাই না করতে পারি নি। 

অনেক কথাবার্তার পর ঠিক হল। যাবে যে যেতে চায়। একটা না একটা কারণ বলে 'না' করে দেবে। 

সবাই মাথা নেড়ে সায় দিলেও সবচেয়ে বেশি বেঁকে বসলো, আমার আম্মু। আম্মু কিছুতেই আমাকে এইভাবে বিয়ে দিবে না৷ 

আমি এমন ভাব দেখালাম যেন আমি বেশ বিরক্ত হয়েছি। 

আজ শুক্রবার সবাই যাওয়ার কথা। আমি যাওয়া কোন প্রশ্নেই আসে না। কিন্তু শাহেদের আব্বু আবার ফোন দিল আমাকেও নিয়ে যেতে আমারো তো ঘর ও ছেলে পছন্দ হওয়ার ব্যাপার আছে। 

আমি স্বাভাবিক লাগার জন্য, না করে দিয়েছিলাম, কিন্তু দাদু আমাকেও নিতে বলল তাই রেডি হতে হল। শুধু হলুদ রঙের একটা জামা পরে হাল্কা লিপস্টিক দিলাম। আমি যাওয়াতে আম্মুকেও যেতে হচ্ছে। আম্মু যাওয়াতে চাচী জ্যাটিরাও খুত ধরার জন্য বলল, আমরাও যাই তাহলে, শিমু তো আমাদের ও মেয়ে।

আম্মু আরো বেশিই বিরক্ত হল। 

বেশি দূরে না, দুই ব্লক পরেই শাহেদদের ঘর। তাও সবাই চারটা গাড়ি করে গেল। ব্যাপার টা তাদের অস্বস্তি তে ফেলল কিনা জানি না। তবে তিন তলার উপর মধ্যবিত্ত ফ্ল্যাট টা দেখে আমার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিল। আমার এক বান্ধবী আছে ওদের ঘরে মাঝেমধ্যে যেতাম। ওদের ঘর টা প্রায় এই রকম। আমি জানি ওরা কত টা সিম্পল জীবন কাটায়। আমি এইও জানি শাহেদ কত সিম্পল জীবন কাটায়। তাই ওকে এত ভালোবাসি। 

আমাদের সবাইকে দেখে ওরা অস্বস্তি তে পড়ার জায়গায় এতটা উচ্ছাস দেখালো যা দেখে চাচীরা একটু মুখ বেঁকালো।ওদের ঘরে আমি আগে আসি নি। 

 ড্রয়িং ডাইনিং একসাথে করা মাঝারি সামনের রুম। দুই দিকে তিন টা ছোট রুম মাঝে বাথরুম আর বাথরুমে পাশে রান্না ঘর। এদের পুরো ঘর। 

আমাদের পুরো ড্রয়িং রুমের অর্ধেক ও হবে না। 

দুই সেট সোফা আর সিংগেল একটা খাট বসানো আছে ড্রয়িং রুমে। এক পাশে একটা বইয়ে ঠাসা বুক সেল্ফ। 

হাতে আঁকা আর বানানো কয়েক টা সোপিস। দেওয়ালে একটা রবীন্দ্রনাথের ছবি ঠাঙ্গানো। 

সবার বসতে বেশ অস্বস্তি হচ্ছিল শাহেদের বাবা বার বার লজ্জিত বোধ করছিলেন এইটার জন্য। 

বাবা আর চাচারা মানা করছিল যাত্র উনি বিব্রত বোধ না করে। সবচেয়ে বেশি বিব্রত বোধ করছিলেন দাদু। 

শাহেদ কে ডেকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল ওর বাবা। শাহেদ বরাবরেই বেশ সুদর্শন আর নম্র ভদ্র প্রকৃতির। সে গত বছরেই সে একটা ব্যাংকে চাকরিতে জয়েন করেছে৷ ওরা দুই ভাই এক বোন। শাহেদ সবার বড়। ওর ছোট ভাই ঢাবি তে পড়ে। আর বোন ঢাকা মেডিকেল এ এইবছর চান্স পেয়েছে।

কিছুক্ষন পর প্লেট ভরে ভরে নাস্তা আনছিল দুইজন। তাদের মধ্যে শাহেদ ও আছে। ওর মামী চাচিরাও আছে। উনারাও আপ্যায়ন করে যাচ্ছেন। নানা পদের পিঠা আর হাতের বানানো নাস্তা। সবাই কথা বললেও একদম চুপ ছিল আম্মু৷ আমার খুব একটা খারাপ লাগছিল না আবার অতিরিক্ত ভালোও না। কোথায় যেন একটা অস্বস্তি আমারো লাগছিল। আমার মনে হচ্ছিল শাহেদ দের আরো বেশি কিছু করা দরকার ছিল আমার পরিবার কে খুশি করার জন্য। 

সব কিছু এনে রাখার পর যখন সবাই হাতে তুলে নিচ্ছিল নাস্তা। শাহেদের বাবাকেও বসে নিতে বলল, শাহেদের আব্বু খুব ভদ্র ভাবে অনুরোধ করল, একটু অপেক্ষা করুন। শাহেদের আম্মু সকাল থেকে এইসব বানাচ্ছে; ও আসুক। 

সবাই যেন এখন বিব্রত বোধ করল। এমন কি দাদুও থমকে গেল। আম্মু আর চাচীরা কেমন যেন চুপসে গেল। 

আমার তখন মনে হতে লাগল,শেষ হয়ে গেল। এখন কেউ আর রাজি হবে না। কি দরকার ছিল এইটা বলার? 

আমাদের বাসায় এত বড় বড় মানুষ আসে। কই আব্বুরা তো কেউ আম্মুদের জন্য তাদের বসিয়ে রাখে নি৷ অনেক সময় আম্মু চাচীরা তো দেখেও না কে কি খেল? কে কি প্রশংসা করল। ওরা আসার আগেই নাস্তা শেষ।  

আমি শাহেদের দিকে তাকালাম,দেখলাম ওরা কাছে বেশ স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। যেন এইটায় হওয়া উচিত। 

উনি তাড়াহুড়ো করে উঠে গেলেন। আবার তাড়া দিয়ে এলেন। হাসি মুখ করে বসলেন। আমাকে আর শাহেদ কে ডায়িং টেবিল থেকে দুইটা চেয়ার এনে বসানো হয়েছে। সবাই মিষ্টির প্লেট হাতে বসে কেমন যেন বিশেষ কারো জন্য অপেক্ষায় রান্না ঘরের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

শাহেদের আম্মুকে আমি কখনো দেখি নি। 

আমি ভেবেছিলাম আমার আম্মুর মতো ব্যাক্তিত্ব সম্পন্ন কেউ হেঁটে আসবে। তবে বাটিকের কাজ করা শাড়ি পরে আচঁল টেনে বের হয়ে এলো খুব সাধারণ মধ্যবয়েসি শাহেদের আম্মু। 

উনি এসে হাসি মুখ করে সবাইকে সালাম দিয়ে বসে সবাইকে খাওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। 

কিন্তু ততক্ষনে সবার গলা কি যেন বিধঁছে।

.

তবে সুস্বাদু নাস্তার কারণে কিছুক্ষনের মধ্যে আবার মেতে উঠলেও কিন্তু ছন্দপতন হয়ে গিয়েছে। 

বড় আম্মু তার নাতনিকে নিয়ে এসেছে তার জন্য ছোট একটা বাটি আনতে বললে, শাহেদের মা শাহেদ কে ইশারা করাতে সে টুপ করে আমার পাশ থেকে উঠে গিয়ে রান্না ঘর থেকে বাটি নিয়ে এলো।

 শাহেদের মা বলল, চামচ টাও তো লাগবে। 

শাহেদের ভাই ওদের রাখা শোকেস থেকে বের করে রান্না ঘর থেকে ধুয়ে আনল। 

ব্যাপার টা আমার কাছে কেন যেন খারাপ লাগল৷কিন্তু শাহেদর বোন ওখানেই বসে আছে।  

সবাই মিলে কথা বলছে৷ ওদের সবাই কথা বলতে চাইছিল বাট তাল মেলাতে পারছিল না৷ কারণ এইখানে কেউ ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার নেই। কেউ স্কুলের টিচার কেউ সরকারি চাকরিজীবি। শাহেদের বাবাও তাই। শাহেদের মা স্কুলে গানের শিক্ষিকা। উনার কাছে প্রতি সাপ্তাহের বিশ ত্রিশ জন্য স্টুডেন্ট আসে গান শেখার জন্য শাহেদের বাবা বেশ গর্ব করেই জানালেন। 

ঘন্টা খানিক পার হওয়ার পর কারোই আসলে বসার ইচ্ছে ছিল না। যেন বের হতে পারলেই বাঁচে। ''আমাদের পরে কথা হবে'' এই একটা দায়-সাড়া কথা বলে সবাই বের হয়ে এলো। 

আমি বের হওয়ার সময় শাহেদ একটু মিষ্টি হাসল। আমিও ফিরতি একটু হাসি দিলাম এইছাড়া তেমন কোন কথা বলা হয় নি। 

বাসায় ফিরে সবাই যখন নানা ধরনের ব্যঙ্গ কথায় মেতে উঠছিল আমাদের বিশাল ড্রয়িং রুমে। 

দাদুকে বলল, আপনার কথা মতো দেখে এলাম। এখন পরে জানাব বলেছি। এইটুকুতেই চুপ থাকেন। এরমধ্যেই মেয়ের অন্য কোথায় ও বিয়ে ঠিক হয়েছে বলে দেবেন। শেষ।  

তখন আম্মু বলে উঠল, না। এইসব বলার দরকার নেই। শিমুর বিয়ে ওখানেই হবে। 

সবাই চেঁচিয়ে উঠল, কি বল? এমন ছাপোষা ঘরে মেয়ের বিয়ে? প্রশ্নেই উঠে না। তাছাড়া আমাদের সাথে কোন স্ট্যাটাস যায় না। 

আমি নিজেও যেন অবাক হয়ে গেলাম। কারণ 

আম্মু বলল, কেন না যাওয়ার কি আছে, ছেলে ব্যাংকে চাকরি করে। বাবা সরকারি চাকরি। মেয়ে মেডিকেলে পড়ছে। মা টিচার। সব তো আছে। 

কিন্তু, তাও ওদের তো গাড়ি নেই, বাড়ি নেই। মেয়ের কোন শৌখিনতা থাকবে না। অন্য বোনেদের মতো স্বাচ্ছন্দ্য পাবে না। 

বড় আম্মুও বলে উঠল, কি বল? বেয়াইন বাড়িতে মুখ থাকবে এমন ঘরে সর্ম্পক হলে। আব্বুর কথা রাখতে গেল। শেষ। এমন কত হয়। দুই রুমের একটা ঘর। শিমুর নিজের শোয়ার ঘর তো এরচেয়ে বড়। মেয়ের জীবন নষ্ট করিও না তো। নিজেই তো রাজি ছিলে না। কি হলো হঠাৎ রাজি হয়ে গেলে। কি আছে? কি দেখেছো সে ঘরে?

আম্মু তার চোখ গুলো সিক্ত আর চোয়াল টা শক্ত করে বলল, 

-সম্মান দেখেছি। সে ঘরে, ঘরের বউ আর মেয়েদের প্রতি সম্মান দেখেছি। যেটা এই আমাদের অভিজাত্য ভরা ঘরে নেই। 

সবার মুখ বন্ধ হলেও চোখে কেমন যেন প্রশ্নাতুত। 

আম্মু বলল, 

-বড় আপা, আপনি তো কত রকমের নাস্তা বানিয়েছেন বিগত সব ইদে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। কখনো দেখেছেন কেউ আপনাকে ডেকেছে? 

আসমা তুমি তো ডাক্তার, তুমি দেশের বাইরে থেকে ডিগ্রি নিয়ে আসছো। আপনি কখনো শুনছেন ভাইয়া আপনার কাজের প্রশংসা করছে সবার সামনে? 

কখনো দেখছেন এই ঘরে শুধু মাত্র আমরা আসার জন্য ঘরের আসা মেহমান দেন বসিয়ে রাখা হয়েছে। 

এই ঘরে আমরা ঠিক কতটুকু সম্মান পাই?  

ঘরের মেয়েদের ভালোবাসা আর সম্মান করা এক নয়। 

এই ঘরে আমাদের সবাইকে আমাদের যোগ্যতা দেখে এনেছে শুধু নাম বাড়াতে। কেউ কি কর্ম জীবনে স্বামীর সাহায্য পেয়েছেন? 

কিন্তু সে ঘরে আছে। ঘরের নারীদের প্রতি সম্মান আছে, শ্রদ্ধা আছে, এপ্রিসিয়েশন আছে। 

সুখে থাকার জন্য মেয়েদের এরচেয়ে বেশি আর কিছু লাগবে না। লাগেও না। 

বড় আম্মু আর চাচীরাও এক সাথে বলে উঠলো। শিমুর বিয়ে ওঘরেই হবে। 

.

#

সোমবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৪

বর্ষার রাতে

বর্ষার রাতে

 


Writing By জাহের ওয়াসিম



অদ্ভুত এক প্রেমে পড়ে যাই গত বর্ষায়, যা এলোমেলো করে দেয় আমার বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দেয়াল। অন্য রকম এক সত্যের মুখোমুখি হই আমি। জীবনের অন্যতম সেই সত্য ঘটনাটি আপনাদের শোনাব। এটাকে নিছক গল্প ভাববেন না। এই ঘটনা আমার জীবন ওলটপালট করে দিয়েছে।

নানাবাড়িতে যাচ্ছিলাম ঢাকা থেকে। প্রায় পাঁচ-ছয় বছর পর যাচ্ছি। মা-বাবা ব্যস্ত, তাই ইউনিভার্সিটি থেকে ছুটি পেয়ে আমি একাই পথ দিলাম। সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য নানাবাড়িতে ফোন না করেই বের হলাম। রাত এগারোটায় স্টেশনে নামলাম। অজপাড়াগাঁয়ের স্টেশন। একটা কাকপক্ষীও নেই। দূরে শুধু একটা অচেনা পাখির চিঁ চিঁ ডাক শুনে হকচকিত হয়ে উঠলাম। আরও আগে নামার কথা। কিন্তু পথে ট্রেনের যান্ত্রিক সমস্যা হওয়ায় দুই ঘণ্টা দেরি হয়ে গেল। স্টেশন থেকে নানার বাড়ি মাইল পাঁচেকের পথ। রিকশায় যেতে হয়। কিন্তু এত রাতে গ্রামের রিকশাওয়ালাদের এক ঘুম হয়ে গেছে। এই স্টেশনে আমার সাথে আর একটা লোক নেমেছে। সাদা পাঞ্জাবি পরা। মাথায় লম্বা টুপি। একা একা যেতে ভয় লাগছে। ভাবলাম, লোকটার সাথে গিয়ে পরিচিত হই। আমি বললাম, ‘স্লামালাইকুম। চাচা, আমার নাম শুভ। হাবিবুল্যা চেয়ারম্যানের নাতি। ঢাকা থেকে এসেছি আমি।’ লোকটা কিছু বলল না। অদ্ভুতভাবে চেয়ে থাকল। আমি বললাম, ‘চাচা, আপনি কোন দিকে যাবেন। চলুন এক সাথে যাই।’ লোকটা হাত ইশারা করে উত্তর দিকের রাস্তাটা দেখাল। আমি যাব পশ্চিম পাশের রাস্তাটা দিয়ে। লোকটা মনে হয় বোবা কিংবা তার কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না। বোবা হওয়ার সম্ভাবনা কম। বোবারা সাধারণত কানে শোনে না। ইনি শোনে। যা-ই হোক, আমি হতাশ হয়ে একা একাই হাঁটা ধরলাম। অমাবস্যার রাত। অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না। আমি প্রচণ্ড ভীতু। রাতে গ্রামের রাস্তায় একা একা হাঁটা আমার কাছে পুলসিরাত পার হওয়ার চেয়েও দুঃসাধ্য। গা ছমছম করে ভয়ের একটা শীতল অনুভূতি বয়ে গেল আমার ভেতর দিয়ে। এত দূর হেঁটে হেঁটে যাব কী করে? ভেবে ঘেমে গেলাম। ভাবলাম, নানাবাড়িতে ফোন করি, যেন কেউ এসে আমাকে নিয়ে যায়। মোবাইলটা বের করে দেখি নেটওয়ার্ক নেই। অগত্যা মোবাইলের টর্চ জ্বেলে আয়াতুল কুরসি পড়ে বুকে তিনবার ফুঁ দিয়ে হাঁটা ধরলাম। কিছুক্ষণ হাঁটার পর মনে হলো, আমার পেছন পেছন কেউ একজন আসছে। এটা একটা চিরাচরিত সমস্যা। সব রহস্য গল্পেই এই লাইনটা থাকে। পিছে পিছে কেউ একজন আসে। এমনকি রহস্য পত্রিকার অনেক রহস্যগল্পতেই এই লাইনটা পড়েছি আর হেসে খুন হয়েছি। মনে মনে ভেবেছি, লেখকেরা বুঝি আর কোনো লাইন পান না। কিন্তু বাস্তবেও যে এ রকম অভিজ্ঞতা হতে পারে, তা আজ বুঝলাম। ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে এল। এসব ক্ষেত্রে নিয়ম হচ্ছে, পিছু ফিরে তাকানো যাবে না। পেছনে ভূত থাক আর পেত্নি থাক, কোনো আগ্রহ দেখানো যাবে না। সোজা হেঁটে চলে যেতে হবে। কিন্তু আমার যে এখন ঝেড়ে একটা দৌড় দিতে ইচ্ছে হচ্ছে। কী করব বুঝতেছি না। একবার মনে হলো, সাদা পাঞ্জাবি পরা লোকটা নাকি। হয়তো আমাকে ভীতু ভেবে ভয় দেখাচ্ছে। পেছনের লোকটার হাঁটার আওয়াজ বেড়েছে। আমি আর থাকতে না পেরে পিছু ফিরে তাকালাম। দেখি, কেউ নেই। কিন্তু আওয়াজটা অবিকল আছে। মনে হচ্ছে, ধপধপ করে পা ফেলে কেউ এগিয়ে আসছে। হঠাত্ করে হালকা মিষ্টি একটা গন্ধ এসে লাগল আমার নাকে। মিষ্টি জর্দা দিয়ে পান খাওয়ার গন্ধ। আমার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। মনে হলো, ঘুরে পড়ে যাব। আমার ভয় এখন চরম অবস্থায়। বুকের মধ্যে যেন ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেছে। হূিপণ্ডটা হাপরের মতো ওঠা-নামা করছে। আমি উল্টা দিকে ফিরে একটা দৌড় দিলাম। মনে মনে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিতে লাগলাম। বারবার নিজেকে গালি দিচ্ছি কেন যে ফোন করে এলাম না। পেছনের অদৃশ্য মানবটার দৌড়ের আওয়াজ স্পষ্ট কানে আসছে। ধীরে ধীরে তা কাছে চলে আসছে। এভাবে আমি মাইলখানেক চলে এসেছি। আরও বেশিও হতে পারে। আমার কোনো হুঁশ নেই। প্রাণপণ দৌড়াচ্ছি। কোনোমতেই ধরা পড়া যাবে না। এটা আমার জীবন-মরণ খেলা। তবে কাঁধের ব্যাগটা নিয়ে বেশিক্ষণ দৌড়াতে পারলাম না। ক্লান্ত-অবসন্ন হয়ে উঠল শরীর। নুয়ে পড়ছি আমি। এ যাত্রায় আমি মনে হয় শেষ। মৃত্যুভয় আমাকে গ্রাস করে নিল। আমি যেন অচেতন হয়ে যাচ্ছি। চলে যাচ্ছি জীবনের শেষ প্রান্তে, মৃত্যুর শিয়রে। মিষ্টি গন্ধটা নাকের কাছে চলে এসেছে। কলিজাটা মোচড় দিয়ে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য মা-বাবার ছবিটা ভেসে উঠল মনের আয়নায়। ইউনিভার্সিটির শায়লার কথা মনে হলো। মনে মনে বললাম, বিদায় শায়লা। আর তোমার পিছে পিছে ঘুরে বিরক্ত করব না। বিদায়! আমার ঘাড়ে স্পষ্ট ছোঁয়া অনুভব করলাম—ঠান্ডা-শীতল কিছু একটার।

ঘাড়ে হাত দিয়ে দেখি পানি। বৃষ্টি নামছে। কিছুটা প্রাণ ফিরে পেলাম। ভিজে যাচ্ছি আমি। পাশে একটা বাড়ি থেকে নারী কণ্ঠের খিলখিল আওয়াজ শুনলাম। অত-শত না ভেবে দৌড়ে রাস্তার পাশের অন্য একটা বাড়িতে আশ্রয় নিতে ছুটলাম। দূর থেকে বাড়ির ভেতরে আলো জ্বলতে দেখলাম। অনেক্ষণ ধরে নক করলাম দরজায়। কেউ দরজা খুলল না। এত রাতে কেউ খোলার কথাও নয়। গ্রামের বাড়ি। সবারই চোর-ডাকাতের ভয়। হতাশ হয়ে বাড়ির দরজায় বসে পড়লাম। ঘর থেকে একটু দূরে একটা কবর দেখতে পেলাম। উত্তেজনায় আমার সব ভয় মুহূর্তে উবে গেছে। অন্য সময় হলে কবর দেখেই অজ্ঞান হয়ে যেতাম। কবরকে খুব ভয় পাই আমি। হঠাত্ করে দরজাটা খুলে গেল। আমি উঠে দাঁড়ালাম। দেখি এক বৃদ্ধ মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন অন্ধকারে। পরনে সাদা শাড়ি বলে মনে হলো। আমি সালাম দিয়ে আমার নানার বাড়ির নাম বললাম। বৃদ্ধা বললেন, ‘ও চিনেছি। তুমি হাবিবুল্যা চেয়ারম্যানের নাতি।’ আমার নানাকে সবাই চেনে। বিখ্যাত লোক এলাকার। বললাম, ‘আমি ঢাকা থেকে আসছি। ভিজে যাচ্ছি বলে একটু আশ্রয় নিয়েছি। বৃষ্টি থামলেই চলে যাব।’ বৃদ্ধা আমাকে ভেতরে নিয়ে বসালেন। তারপর গামছা এনে দিলেন মাথার পানি মোছার জন্য। আমি বললাম, ‘দাদি ঘর অন্ধকার কেন? হারিকেন নাই?’ বৃদ্ধা বললেন, ‘আছে বাবা। দাঁড়াও দিচ্ছি। কিছুক্ষণ আগে নিভিয়েছি। আমরা শুয়ে পড়েছিলাম। তুমি বসো, আমি হারিকেন পাঠাচ্ছি। তুমি আসাতে ভালোই হলো। নামাজ না পড়েই শুয়ে গেছিলাম। নামাজটা পড়ে নিই।’ এ কথা বলে ভেতরে চলে গেলেন বৃদ্ধা। কিন্তু বৃদ্ধা আমাকে বাবা বাবা করছে কেন, আমি তো উনাকে দাদি বললাম। উনার কি ছেলে-টেলে নেই? যাক বাদ দিলাম। কিছুক্ষণ পর হারিকেন আর খাবার নিয়ে এল এক অপরূপা সুন্দরী। হালকা আলোয় অসাধারণ লাগছে ওকে। জীবনে এত রূপবতী মেয়ে দেখিনি। ঢিলেঢালা জামা পরেছে মেয়েটি। এর পরও তার প্রস্ফুটিত যৌবন ঠেলে বের হয়ে আসতে চাইছে। ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে আছে যেন। আমি লাজ-লজ্জা ফেলে সেদিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম। আমার জায়গায় আমার বন্ধু রবিন থাকলে সে এতক্ষণে মেয়েটির বুকের মাপ বলে দিতে পারত। মেয়েটি হেসে বলল, ‘আমি আনুশকা। উনি আমার দাদি। নামাজ পড়ছেন তো তাই আমি খাবার নিয়ে এলাম। আপনি ঢাকা থেকে আসছেন। নিশ্চয়ই না খেয়ে আছেন। আপনি নিঃসংকোচে খেয়ে নিন। আপনার নানাদের আমি চিনি। অনেক দূরে আপনার নানার বাড়ি। আমি এখানে স্থানীয় কলেজে পড়ি। আমার মা নেই। যেই কবরটা দেখে ভয় পেয়েছেন, ওটা আমার মায়ের। আমার জন্মের সময় মারা যান। বাবা ঢাকায় ছোট একটা চাকরি করেন। নইলে আমাদের নিয়ে যেতেন ওখানে। আমি শুধু বকবক করে যাচ্ছি, আপনি খান।’ আমি ইতস্তত করে বললাম, ‘না না, কী যে বলেন। আপনার কথা শুনতে অনেক ভালো লাগছে। আপনি বলুন।’ ভেতরে ভেতরে আমি অবাক হয়ে গেলাম মেয়েটা হড়বড় করে এত কথা বলছে কেন? তা ছাড়া আমি ভয় পেয়েছি, তা ও বুঝল কীভাবে। ভাবলাম, চালাক মেয়ে। মুখ দেখে সব বুঝে নেয়। গ্রামে সাধারণত এত মিশুক মেয়ে দেখা যায় না। ও মেয়েটা কোন কালারের জামা পরেছে, বলা হয়নি। আকাশি নীল। অদ্ভুত লাগছে। মনে হচ্ছে, স্বর্গ থেকে নেমে এসেছে। মেয়েটাকে আমার খুব ভালো লেগে গেল। খাবার পর আমি জানালার পাশে গিয়ে দাঁঁড়ালাম। দেখি, তুমুল বৃষ্টি বাইরে। থামার কোনো লক্ষণ নেই। মেয়েটা আমার পাশে এসে দাঁড়াল। বলল, ‘আল্লা! কী সুন্দর বৃষ্টি। উফ্ আমার-না ভিজতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু ভিজলেই ঠান্ডা লেগে যাবে। তা ছাড়া দাদিও বকবে।’ আমি মনে মনে ভাবলাম, মেয়েটা অনেক সহজ-সরল। মনের কথা গোপন রাখে না। এ রকম সরল মেয়ে আমি আগে দেখিনি। অপরিচিত মানুষের সাথে এমন ফ্রি-ভাবে কথা বলছে, যেন অনেক দিনের চেনা-জানা। বৃদ্ধা এসে বললেন, ‘বাবা বৃষ্টি মনে হয় আজ আর থামবে না। তুমি ওই পাশের রুমটাতে গিয়ে শুয়ে পড়ো। ওটা আমার ছেলের রুম। ও ঢাকা থেকে আসলে থাকে।’ আমি বললাম, ‘না না, আমি এক্ষুণি চলে যাব। বৃষ্টি কমে যাবে।’ বৃদ্ধা বললেন, ‘এখন যাবে কীভাবে? সকালে চলে যেও। বৃষ্টি কমবে না। আষাঢ়ের বৃষ্টি এত সহজে কমে না। যাও, শুয়ে পড়ো বাবা।’ আমি ওপরে-ওপরে না না করলেও ভেতরে ভেতরে থাকার জন্য রাজি। কারণ এই সহজ-সরল মেয়েটাকে আমার খুব পছন্দ হয়ে গেছে। তা ছাড়া সারা রাত বৃষ্টি হবে। হয়তো মেয়েটার সাথে ভেজার একটা চান্স পেয়ে যেতে পারি।

অন্ধকার একটি ঘরে আমাকে ঘুমাতে দেওয়া হলো। সামান্য ভয় পেলাম। বিছানায় শুতে যাব। দেখি, আমার বিছানায় কে যেন ঘুমিয়ে আছে। ভয়ে আমার গা শিউরে উঠল। ভয়ে ভয়ে হাত দিয়ে দেখি একটা কোলবালিশ। পাশের ঘর থেকে আনুশকার খিলখিল হাসি শোনা গেল। নিজের বোকামিতে লজ্জা পেয়ে শুয়ে পড়লাম।

রাত মনে হয় তিনটার মতো বাজে। শুয়ে আছি কিন্তু ঘুম আসছে না। এখানে আসার পর ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিয়ে ভাবতে লাগলাম। সকালে নানাবাড়ি গেলে তারা অনেক কথা জানতে চাইবে। তা ছাড়া গ্রামের একটা বাড়িতে এভাবে অপরিচিত একটা ছেলেকে থাকতে দেওয়াও অস্বাভাবিক। যাই হোক, নিজের এ রকম নেগেটিভ ধারণার জন্য নিজেকে বকা দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। আচমকা আমার গায়ের ওপর একটা শীতল হাতের ছোঁয়া পেয়ে আঁতকে উঠলাম ভয়ে। বুক ধুকধুক করে উঠল। দেখি, আনুশকা। আমার কানের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘ভয় পেয়েছেন? চেঁচাবেন না। দাদি জেগে যাবে। চলেন বৃষ্টিতে ভিজি।’ আমি অবাক হওয়ার ভান করে বললাম, ‘এত রাতে?’ কিন্তু মনে মনে যা ভাবছিলাম, তা ঘটে যাওয়ায় খুশি হয়ে গেলাম। ভয়ে ভয়ে থাকলাম, ও আবার চলে যায় নাকি। ও বলল, ‘ভিজার আবার দিন-রাত কী? আর রাতে ভিজতেই তো মজা।’ আমি বললাম, ‘তুমি কি প্রায় রাতেই ভিজো নাকি?’ ও বলল, ‘আরে না। একবার ভিজে অনেক ঠান্ডা লেগেছিল। আচ্ছা চলেন যাই।’

চুপিচুপি বাইরে এসে দেখি ব্যাপক বৃষ্টি। আনুশকা খুশি হয়ে গেল। আমাকে বলল, ‘আমার হাত ধরুন। প্লিজ সংকোচ করবেন না। আপনাকে আমার অনেক ভালো লেগেছে।’ আমার মনের কথাই ও বলে ফেলল। আমরা হাত ধরে ভিজতে লাগলাম। ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। দূরে একটা-দুইটা বাজও পড়ছে। বৃষ্টির তোড়ে আনুশকার ভেজা চুল আমার মুখে এসে বাড়ি খাচ্ছে। আর আমার সারা শরীরে যেন বিদ্যুত্ বয়ে যাচ্ছে। আনুশকার পাতলা জামা ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে গেছে। ওর শরীরের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আকৃতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ওর স্তনের বোটা দুটো দেখা যাচ্ছে পরিষ্কার। ইচ্ছা করল ছুঁয়ে দিই একবার। আমি বললাম, ‘আনুশকা তোমাকেও আমার অনেক ভালো লেগেছে। আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি।’ এ কথা বলে আমি ওকে জড়িয়ে ধরলাম। সাথে সাথে ও ছাড়িয়ে নিল। আমি লজ্জা পেয়ে সরি বললাম। একটু পর বৃষ্টি থেমে গেল। আনুশকা বলল, ‘তুমি এখন চলে যাও। হালকা অন্ধকার, ভয় পাবে না তো?’ আমি বললাম, ‘না না, ভয় পাব না।’ ও বলল, ‘চলে যেতে বলায় অবাক হয়েছ? এখন না গেলে সকালে গ্রামের মানুষ দেখলে খারাপ কথা রটাবে।’ আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, আমি তাহলে যাই। তুমি দাদিকে বুঝিয়ে বোলো। আর আমি আবার আসব।’ ও বলল, ‘রাতে এস। দিনে এস না। তাহলে কেউ দেখবে না।’ ওর প্রস্তাবটা ভালো লাগল। আমি বললাম, ‘আচ্ছা ঠিক আছে আমি যাই তাহলে।’

ভোরের দিকে নানাবাড়ি পৌঁছালাম। হালকা অন্ধকার তখনো। এত ভোরে আমাকে দেখে সবাই অবাক হলো। আমি আনুশকাদের বাড়ির ব্যাপারটা পুরো চেপে গেলাম। বললাম, ‘নানা, রাতের গাড়িতে এসেছি। তাই ভোরে পৌঁছুলাম।’ আমার মামাতো বোন রিয়া আমাকে দেখে খুব খুশি হলো। সামান্য সন্দেহের চোখে তাকাল মনে হচ্ছে। নাকি আমার মনের ভুল, কে জানে? চোরের মনে পুলিশ পুলিশ। ও মনে হয় আমাকে একটু-আধটু পছন্দ করে কিন্তু মুখ ফুটে বলেনি কখনো।

নানার বাড়িতে ভালোই দিন কাটছিল আমার। প্রতিদিন রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে আমি তখন চুপি চুপি বের হই। একটুও ডর-ভয় লাগে না। সেদিনের পর থেকে আমার সব ভয় মন থেকে উবে গেছে। এখন মনে শুধু আনুশকার ছবি। মামাতো ভাইয়ের একটা সাইকেল আছে, সেটা নিয়ে চলে যাই আনুশকাদের বাড়ি। চুপি চুপি আনুশকাকে ডেকে গল্প করি দুজনে। গভীর সখ্য হয়ে গেল আমাদের। আমার শারীরিক ভালোবাসা পেতে ইচ্ছে হলো। কিন্তু আনুশকা বলল, ‘না’। আমি কথা বাড়াইনি। শুধু ওকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়েছি। একবার ওর বুকে হাত দিতে চেয়েছি। ও সরিয়ে দিল। আমি প্রথমে কষ্ট পেলেও পরে ভাবলাম, ভালো মেয়ে বলেই রাজি হয়নি। তা ছাড়া বিয়ের পর তো ও আমারি হবে। আমরা এত কিছু করি, অথচ ওর দাদি কিছু টেরই পায় না। উনি বেঘোরে ঘুমায়।

অনেক দিন হলো এখানে আছি। আমার ঢাকায় ফেরার সময় হয়ে যাচ্ছে। আনুশকাকে বললাম, ‘আমি তোমাকে বিয়ে করে ঢাকায় নিয়ে যেতে চাই। আমি নানা-নানিকে পাঠাব বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে।’ আনুশকা চুপ করে রইল। আমার মন খারাপ হয়ে গেল। পরের দিন রাতেও সবাই ঘুমানোর পর আমি বেরুচ্ছিলাম। হঠাত্ কে যেন পেছন থেকে আমার শার্টের হাতা টেনে ধরেছে। দেখি রিয়া। ও আমাকে একদিকে টেনে নিয়ে বলল, ‘ভাইয়া রোজ রাতে তুমি কোথায় যাও? আমাকে বলো তো! আমি প্রতিদিনই দেখি, কিন্তু কিছু বলি না। আজ আর থাকতে পারলাম না। তুমি আমাকে সব খুলে বলো। কারণ তুমি হয়তো জানো না, তোমাকে আমি অনেক ভালোবাসি।’ আমি রিয়াকে প্রথম থেকে সব খুলে বললাম। বললাম, ‘তুই নানা-নানিকে বলে ব্যবস্থা করে দে।’ আমার সব কথা শুনে রিয়া থ মেরে গেল। এরপর ও আমাকে যা বলল, তা শুনে আমার মাথা ঘুরে গেল। ওর ভাষ্যমতে, সেদিন রাতে নাকি কোনো বৃষ্টিই হয়নি। আমি আতঙ্কিত হয়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম এবং পরের দিন বিকেলে ঘুম ভাঙল। ঘুম থেকে উঠে আমি সোজা আনুশকাদের বাড়িতে গেলাম। গিয়ে দেখলাম, ওই বাড়িতে যে ঘরটায় আমি রাতে এসেছি, সেই জায়গায় দুুটি কবর। দূরে আর একটা কবর, যার কথা আনুশকা আমাকে বলেছিল, ওর মায়ের। ঘর-টর কিচ্ছুর কোনো অস্তিত্ব নেই। পুরো বাড়ি খাঁ খাঁ করছে। দূরে একটা পাখি ডেকে উঠল। আমি মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম। পরে সম্ভবত আশপাশের লোকজন আমাকে নানাবাড়িতে পৌঁছে দেয়। আমার জ্ঞান ফিরে প্রায় তিন দিন পর। দীর্ঘদিন আমি মানসিক হাসপাতালে কাটিয়ে এখন সামান্য সুস্থ। তাও অন্ধকার দেখলে প্রচণ্ড ভয়ে চিল্লায়ে উঠি। ডাক্তার বলেছে, আমাকে একা রাখা যাবে না। সব সময় পাশে কেউ একজন থাকতে হবে।

রিয়ার কাছে আনুশকার যেই গল্প শুনেছি তা হলো, ‘ওই বাড়িতে আনুশকা নামের একটা মেয়ে থাকত, যে আরও পাঁচ বছর আগে মারা যায়। কোনো এক বৃষ্টির রাতে মেয়েটি তার প্রেমিকের সাথে ভেজে সারা রাত ধরে। তারপর প্রচণ্ড ঠান্ডা লেগে টাইফয়েড হয়ে মেয়েটি তিন দিনের মাথায় মারা যায়। আর ছেলেটি পাগল হয়ে যায়। মেয়েটির বাবা ঢাকায় থাকতেন। একমাত্র সন্তানের শোকে তিনি এখন আর বাড়িতে আসেন না। বৃদ্ধ হয়ে গেছেন এ ক’বছরেই। পাগলের মতো এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়ায়। বাড়িতে আনুশকার দাদি ছিলেন। আদরের নাতনির মৃত্যুশোকে পড়ে বৃদ্ধাও দুই মাসের মাথায় মারা যান। আনুশকার পাশেই তাকে কবর দেওয়া হয়। এর পর থেকে ওই বাড়িতে কেউ আর যায় না ভয়ে। অনেকেই নাকি আনুশকাকে বৃষ্টিতে ভিজতে দেখেছে রাতের বেলায়। লোকজন ভয়ে রাতে তো দূরের কথা, দিনেও ওই বাড়ির পাশ দিয়ে যায় না।’



 তার দেওয়া কাজল  ~

তার দেওয়া কাজল ~











Writing By কোয়েল তালুকদার


একদিন রাতে অফিস থেকে বাড়ি ফিরে দেখি -- অতিথি রুমে আলো জ্বলছে। আমি আমার স্ত্রীকে বলি, 'কে এসেছে, আলো জ্বলছে যে ঐ ঘরে।'

আমার স্ত্রী বলে, তোমার দেশের বাড়ি থেকে দুজন মানুষ এসেছে। সম্ভবত ওনারা স্বামী স্ত্রী।'


--- তাই। তুমি কী ওনাদের আগে দেখনি?


--- না। মহিলা আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, আমি তোমার কী হই? আমি যখন বলি, আমি তোমার স্ত্রী হই। তখন সে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে, 'তুমি আমাদের রঞ্জনের বউ! ও মা, কত সুন্দর তুমি! তারপর আমাকে যত সব আদর করা শুরু করেছিল।'


আমি আমার স্ত্রীকে নিয়েই অতিথি রুমে যাই। দেখি, পঞ্চাশোর্ধ একজন মহিলা ও একজন পুরুষ বিছানায় জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। আমি চিনতে পারছিলাম না। আমার মুখ ভ্যাবাচ্যাকা হয়ে ওঠে। ওনারও আমাকে চিনতে পারছিল না। আমার স্ত্রী মহিলাকে বলে, ইনি হচ্ছেন আপনাদের রঞ্জন, আপনাদের ছেলে।'

মহিলা আমার পরিচয় পেয়ে বিছানা থেকে উঠে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। এবং বলে -- 'তুমি এত বড় হয়ে গেছ!'


মহিলা বলেন, তুমি আমাকে চিনতে পারবে না। সেই ছোট বেলায় আমাকে দেখেছ। আমি তোমার ' জহুরা বুবু। মনে পড়ছে আমার কথা? মনে পড়ে কী আমাকে? সেই কত বছর আগের কথা।''


ফ্ল্যাশ ব্যাক। পঁচিশ বছর আগে।


ক্লাস ফোরে পড়ি তখন। স্কুল থেকে বাড়িতে 

ফিরলে আমাকে খেতে দিত -- হয় মা, না হয় জহুরা বুবু। জহুরা বুবু আমার জন্মের আগে আমাদের 

বাড়িতে কাজ করতে এসেছিল। সেই নাকি কোলে পিঠে আমাকে লালন পালন করেছে। আমাকে দেখে শুনে রেখেছে।


একদিন স্কুল থেকে এসে দেখি, জোহরা বুবু চোখে মোটা করে কাজল পরে আছে। আমি তার চোখের দিকে বিস্ময়ে পিট পিট করে তাকিয়ে থাকি। জহুরা বুবু আমাকে বলে -- 'কী দেখছ তুমি?'

আমি আঙুল দিয়ে জহুরা বুবুর চোখ দুটো দেখাই।


জহুরা বুবু বলে ওঠে ---'ওরে আমার ভাইটা।' 

বলেই তার চোখ থেকে আঙ্গুল দিয়ে কাজল মুছে মুছে আমার চোখে পরিয়ে দেয়। জহুরা বুবুর দেওয়া তার চোখের কাজল আমার চোখে এখন আর নেই। তা মুছে গেছে কবে।


একদিনের কথা মনে আছে। আমার খুব জ্বর এসেছিল। দু-তিন দিনেও জ্বর নামছিল না। এই জহুরা বুবু মাকে কিছুতেই রাত জাগতে দেয়নি। সেই একটানা চার রাত আমার সিয়রে বসে জেগে থেকেছে। মাথায় জলপট্টি দিয়েছে। দুচোখের পাতা একটু সময়ের জন্য সে বন্ধ করেনি।


আমার শিশুকালে জহুরা বুবু কত যে সেবা যত্ন করেছে, কত যে বিরক্তি ও যন্ত্রণা সহ্য করেছে। সে সব কথা আমার মনে নেই। আমি শুধু আমার মার কাছে থেকে সে সব কথা পরে শুনেছি।


আমি যখন ক্লাস সিক্সে পড়ি, এক বর্ষার দিনে জহুরা বুবুর বিয়ে হয়ে যায়। মা বাবাই সমস্ত বন্দোবস্ত করে তাকে বিয়ে দিয়ে দেয় দূরের এক গ্রামে। আমার শুধু মনে আছে, শ্বশুর বাড়িতে যাওয়ার সময় জহুরা বুবু আমাকে বুকে টেনে নিয়ে ফূঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। নৌকায় উঠে সারা পথ নাকি সে কাঁদতে কাঁদতে চলে গিয়েছিল।


বিয়ে হয়ে যাবার পর জহুরা বুবু মাঝে মাঝে আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসত। তারপর তার সংসার ব্যস্ততায় খুব বেশি আসত না। তারপর একদম না। তারপর চলে গেছে অনেক বছর। জহুরা বুবু আস্তে আস্তে সবার কাছে বিস্মৃত হয়ে যায়।


এই বিস্মৃত জহুরা বুবু কে দেখে যতটুকু খুশি হলাম, তার চেয়ে বেশি বিষাদে মনটি ভরে উঠল। জহুরা বুবু কেমন শীর্ণকায় হয়ে গেছে। চোখের নীচে কালো দাগ পড়ে গেছে। মনে হল, সে বড় ধরণের কোনো রোগে দুঃখে ভুগছে।


জহুরা বুবুই বলছিল, 'আমি তোমাদের বাড়ি থেকে ঠিকানা নিয়ে তোমার এখানে এসেছি। আমার অনেক বড় অসুখ হয়েছে মনে হয়। ওখানে এই রোগের কোনো চিকিৎসা নেই। তাই অসহায় হয়ে তোমার এখানে চলে এলাম। এই ঢাকা শহরে আমাদের আপন কেউ নেই। তোমার কথা মনে হল। তাই তোমার কাছে চলে আসলাম।'


আমি জহুরা বুবু কে বলি, তুমি কোনো চিন্তা করবে না। তোমাকে ভাল ডাক্তার দেখাব। তুমি ভাল হয়ে যাবে। তুমি সত্যিই ভালো হয়ে যাবে। জহুরা বুবু কিছু টাকা বের করে আমার হাতে দেয়। বলে, 'জানি না, কত খরচ হবে। তুমি এখান থেকে খরচ করবে।' আমি ঐ মুহুর্তে জহুরা বুবু কে কোনো করুণা করতে চাইনি। আমি তার হাত থেকে টাকা নিয়ে নেই।


রুমে এসে আমি আমার স্ত্রীকে বলি -- ' জানি, তোমাকে না বললেও তুমি ওনাদের জন্য অনেক করবে। তবুও বলছি, তুমি বিরক্ত হবে না।' 

তোমাকে একটা কথা বলি -- 'এই জহুরা বুবু আমার বড় বোনের মতন, আমার মায়ের মতন। আমার সর্ব শরীরে ওনার মায়া, মমতা, আদর স্নেহ লেগে আছে।'


আমার ছলো ছলো চোখ দেখে, ও শুধু বলল, 'ওনাদের কোনও অসম্মান ও অবহেলা হবে না। তুমি দেখ।'


শহরের সবচেয়ে ভাল বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে জহুরা বুবু কে দেখাই। ওনার সমস্ত কিছু চেক আপ করানো হয়। সব গুলো রিপোর্ট পেতে দুই তিন লেগে যায়। ইতোমধ্যে ঔষধ ও খেতে থাকে। সুন্দর চিকিৎসা পেয়ে জহুরা বুবুর মুখে হাসি ফুটে ওঠে।


একদিন রাতে টেবিলে বসে খাচ্ছিলাম, আমার খাওয়া দেখে জহুরা বুবু আমার স্ত্রীকে বলছিল, 'বউ মা, তুমি রঞ্জনকে এত ঝাল ভাত খাওয়াও কেন? ও তো ছোটবেলায় ঝালভাত খেত না। দুধ আর সর্বিকলা দিয়ে ভাত খেত। ও কোনো সময় নিজ হাত দিয়ে ভাত খেত না। চাচি আম্মা, না হয়‌ আমি তুলে খাওয়াতাম।'


আর একদিন আমার মাথার চুলে তেল নাই দেখে, আমার স্ত্রীকে বলছিল , 'বউ মা, তুমি ওর মাথায় তেল দিয়ে দাও না কেন? সরিষার তেল নিয়ে আসো, আমি ওর মাথায় তেল দিয়ে দেই।' এ রকম আরও অনেক কিছু ঐ অল্প কয়দিনে আমাকে পেতে হয়েছে।


ইতোমধ্যে সমস্ত রিপোর্ট গুলো পেয়ে যাই। জহুরা বুবু কে আবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। ডাক্তার সাহেব রিপোর্ট সব দেখলেন। রিপোর্ট দেখে তাঁর মুখটি বিমর্ষ হয়ে উঠে। তিনি নতুন করে আরও ঔষুধ দিলেন। এবং ইংরেজিতে আমাকে বললেন-- 'আপনি ওনাদের বাইরে রেখে এসে আমার সাথে দেখা করুন।' আমি জহুরা বুবুকে বাইরে রেখে ডাক্তার সাহেবের সাথে দেখা করি।


ডাক্তার বললেন, ওনার লিউকেমিয়া ধরা পড়েছে। রক্তের ক্যান্সার। খুব বেশি হলে উনি তিন মাস বাঁচতে পারে। এই চিকিৎসা এখানে এখনও ঐ রকম নেই। খুব ব্যায়বহুল। আর করেও লাভ হবে না।


জহুরা বুবু তার স্বামীসহ আমার বাসায় আরো তিন দিন ছিল। আমি জহুরা বুবুকে বলি, 'ডাক্তার সাহেব তোমাকে তিন মাসের ঔষধ দিয়ে দিয়েছে। তুমি যদি ভালো না হও, তিন মাস পর আবার এস।'


যেদিন জহুরা বুবু চলে যাবে, সেদিন বুবুকে বলি, 'বুবু তুমি আমার চোখে একটু কাজল পরিয়ে দাও না!' 

আমার স্ত্রীর কাছে কাজল ছিল। সে কাজল নিয়ে আসে। জহুরা বুবু আমার চোখে কাজল পরিয়ে দেয়। আমি তার চোখের দিকে তাকাই। দেখি, জহুরা বুবু অঝোরে কাঁদছে।


তারপর আরও কত বছর চলে গেছে। শুনেছি অনেক আগেই জহুরা বুবু চলে গিয়েছেন জীবন নদীর ওপারে। তার দেওয়া সেই কাজল এখন আর আমার চোখে নেই। তা কবে মুছে গিয়েছে!

 

রবিবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৪

জোড়া শালিক ও কুকুর

জোড়া শালিক ও কুকুর




















Writing অরণী মেঘ


প্রচলিত আছে জোড়া শালিক পাখি দেখলে দিন ভালো যায়। তবে একটা শর্ত আছে। দুইটাই পুরুষ অথবা দুইটাই নারী শালিক দেখলে হবে না। এদের মধ্যে একটা পুরুষ ও অন্যটা নারী শালিক পাখি হতে হবে। ইফাদ সাহেবের ধারণা দুইটা শালিক পাখির মধ্যে একটা নারী ও একটা পুরুষ শালিকই হবে। রোজ দুপুর বেলায় কোত্থেকে যেন দুইটা শালিক পাখি অতিথি হয়ে তার বারান্দায় আসে। তিনি কিছুটা বিস্মিত হলেন। 

একদিন বিস্মিত কণ্ঠে তার স্ত্রীকে বলেন,
"একটা জিনিস খেয়াল করেছ?"
"হ্যাঁ, ঠিক দুপুর বেলায় দুইটা শালিক পাখি আমাদের বারান্দায় এসে বসে। এরা অন্য কোনো সময়ে আসে না। ঠিক দুপুর সময়টায় আসে।"

তিনি বলার আগেই বিরস কণ্ঠে জবাব দেন রেনু। ইফাদ সাহেব দ্বিতীয় বারের মত বিস্মিত হলেন। যদিও তিনি জানেন রেনুর চোখ থেকে কোনো কিছু এড়ায় না। 

"তোমার অবাক লাগছে না?"
"নাহ। অবাক লাগার বয়স আরো ২৫-৩০ বছর আগে পার করে এসেছি।"

মুখের উপর এমন উত্তর শুনে ইফাদ সাহেব নিজের বিস্মিত ভাবটা গিলে ফেললেন। তিনি ঘরের জানালা দিয়ে লাগোয়া বারান্দায় তাকালেন। দুপুর দুইটা বাজতে চলেছে। এখনই শালিক পাখি দুইটা এসে বারান্দায় বসবে।

.

শালিক পাখিগুলোর জন্য কিছু খাবারের ব্যবস্থা করছেন ইফাদ। ইফাদ সাহেবের পাগলামিতে কিছুটা বিরক্ত হলেও রেনু মুখে কিছু বললেন না। মানুষটার অবসরটা যদি এই পাখিগুলোকে নিয়ে কাটে তো কাটুক না। ক্ষতি কী?

ইফাদ ঘরে এসে জানালার সামনে বসে রইলেন। তাকে দেখলে পাখিগুলো হয়ত খাবে না। কিছুক্ষণ বাদেই পাখিগুলাও এসে বারান্দায় বসলো। আজকে তাদের জন্য খাবার আর পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাখিগুলো খাচ্ছে। ভীষণ আনন্দ অনুভব করলো ইফাদ। 

"তোমার শুধু বয়সটাই বেড়েছে। এখনো সেই বাচ্চাটিই রয়ে গেছ।"
কাপড়গুলো ভাজ করতে করতে কথাগুলো বললেন রেনু।
ইফাদ স্ত্রীর দিকে তাকালেন না। না তাকিয়েই উত্তর দিলেন,
"পাখিগুলো কী সুন্দর খাচ্ছে, দেখো!"
রেনু সেদিকে একবার তাকালেন। কিন্তু জবাব দিলেন না। বুড়ো বয়সে বাচ্চামিকে প্রশ্রয় দেয়া ঠিক না। 
রেনু বললেন,
"খেতে চলো।"
"আসছি একটু পর।"

"বাবা, তুমি কি এখন শালিক পাখির সাথে সাথে কুকুরও পুষতে শুরু করেছ?"

ছেলে আরাফ এর আওয়াজে ঘুরে তাকালেন তিনি। একদিন মসজিদ থেকে আসার পথে এই কুকুরটাকে তিনি রুটি কিনে দিয়েছিলেন। কুকুরটা সেদিন তার পিছু পিছু বাসা পর্যন্ত চলে এসেছিলো। এরপর থেকে প্রায়ই কুকুরটা এখানে আসে। তবে রেনুর কড়া হুকুম কুকুরকে ঘরের ভিতরে আনা যাবে না। 

আরাফকে উদ্দেশ্য করে ইফাদ সাহেব বললেন,
কুকুররা মানুষের চাইতে বেশি বিশ্বাসী হয় জানিস তো? আর দেখ মাত্র একদিন রুটি খাইয়েছি তাতেই আমার পিছু ছাড়ছে না।"
"মা কিন্তু খুব রাগ করবে, বাবা। মায়ের কুকুর পছন্দ না।"
বাঁকা হেসে ইফাদ সাহেব বললেন,
"ছাড় তো তোর মায়ের কথা। তোর মায়ের তো আমাকেই পছন্দ না।"
"এটা কিন্তু ঠিক না বাবা। মা তোমাকে অসম্ভব ভালোবাসে।"
"কুকুরটার জন্য একটা নাম ভাবা দরকার। কী নাম দেয়া যায় বল তো।"
আরাফ কিছুটা রেগে বলল,
"জানি না।"

একদিন বড় সাহসিকতার কাজ করে ফেললেন। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। বাসার মূল ফটক খুলে অর্ধভেজা কুকুরটাকে বাসায় ঢুকতে দিলেন। 

"তুই তো পুরো ভিজে গেছিস রে। আয় ভিতরে আয়।"
কুকুরটাও লেজ গুটিয়ে ভিতরে চলে আসলো। রাগে রেনু কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলল।

"গত দুইদিন ধরে কুকুরটা আসছে না কেন? কুকুরটার সাথে কি ঝগড়া করেছ?"
 বিদ্রুপের স্বরে ইফাদ সাহেবকে উদ্দেশ্য করে কথাটা বললেন রেনু। 
"জানি না কেন আসছে না। কোথায় কোথায় থাকে কে জানে!"
"ওহ।"
"তোমার মায়া হয় না ওদের জন্য?"

ভীষণ মায়া হওয়া সত্ত্বেও কেন যেন রেনু সেটা প্রকাশ করতে পারলেন না। তার বিশ্বাস 'মায়া প্রকাশ করতে হয় না। মায়া প্রকাশ করলেই তারা হারিয়ে যাবে।" তিনি যখনই প্রকাশ করে ফেলবেন কুকুরটার প্রতি কিংবা জোড়া শালিক পাখিগুলোর প্রতি তার মায়া জন্মে গেছে এরপর থেকেই আর ওরা আসবে না। কেন এই ধারণা হলো কে জানে!

মুখে যথাসম্ভব বিরক্তিভাব এনে তিনি বললেন,
"ঘরটাকে চিরিয়াখানা বানিয়ে ফেলছ দিন দিন।"
ইফাদ সাহেব হাসলেন। 
"খাবার নিয়ে আসছি। খেয়ে নাও। এরপর তো ঔষধ গুলো খেতে হবে।"
"ইচ্ছে করছে না এখন।"

রেনু ইফাদ সাহেবকে কিছু বললেন না। রুম থেকে বেরিয়ে গিয়ে ছেলের হাতে খাবারের প্লেটটা ধরিয়ে দিয়ে বললেন,
"বাবাকে খাইয়ে দিয়ে আয়। আমার একটু কাজ আছে। কাজগুলো সেরে আসছি।"

আরাফকে খাবারের প্লেট হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হতাশার ভঙ্গিতে ইফাদ সাহেব বললেন,
"তোকে পাঠিয়েছে?"
"হ্যাঁ। এখন লক্ষী ছেলের মত খেয়ে নাও তো।"
বাবার পাশে বসে ছোট এক লোকমা বাবার মুখে তুলে দিলো আরাফ। তিন নাম্বার লোকমাটা মুখে নিয়ে বসে রইলেন ইফাদ সাহেব। হঠাৎ তার মাথাটা ঢলে পড়লো আরাফের কাধে। ঘটনার আকস্মিকতায় আরাফের হাত থেকে ভাতের থালা টা পড়ে গেল। শেষ লোকমাটা বাবার মুখেই থেকে গেল। সেটা আর পাকস্থলী পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। 

.

শালিক পাখিগুলোর জন্য রাখা বাটিটায় খাবার দিলেন রেনু। চারদিন খাবার দেয়া হয়নি পাখিগুলোকে। পাখিগুলো এসেছিলো কিনা সেটাও খেয়াল করেননি। বাটিটায় খাবার আর পানি দিয়ে তিনি রুমের ভিতরে এসে বসলেন। তিনি বারান্দায় থাকলে হয়ত পাখিগুলো আসবে না। 

অধৈর্য হয়ে ঘড়ির দিকে তাকালেন রেনু। তিনটা বাজতে চলল। অথচ পাখিগুলো আসেনি। 

রেনু তবুও বাটিটায় নষ্ট হয়ে যাওয়া আগের খাবার ফেলে দেন। নতুন খাবার দেন। কুকুরটা এসেছে কিনা সেটা জানার জন্য বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাস্তায় উঁকি মারেন। কিন্তু সেদিনের পর থেকে জোড়া শালিক কিংবা কুকুর কেউই আর আসেনি। কেন আসেনি এই উত্তর কেউ জানে না। 

(সমাপ্ত)

বুধবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৪

গল্প... অবসাদ . লেখা... Jahedul Hoque Shovon

গল্প... অবসাদ . লেখা... Jahedul Hoque Shovon

এক

.
“তাহলে আপনি আমাকে সত্যি সত্যিই ডিভোর্স দিতে রাজি হলেন?” আমি মাথা নিচু করে থাকি। সমগ্র কথা গুলো দীবার কাছে যখন বললাম ও একটা বারও হা হুতাশ করলো না। অন্য রুমে চলে গিয়েছিল। আর এখন প্রায় পনেরো মিনিট পর এসে এই ব্যাপারে জানতে চাচ্ছে।আচ্ছা আমার কি তাকে আর কিছু বলার আছে? বুঝানোর আছে? আমি যা বলেছি সে কি বুঝতে পারেনি?
.
আমি তারপরো ইতস্ততার সহিত বললাম “আমি মানুষটা কেমন জানি তাই না? স্পষ্ট করে বললে আমার মনটা একটা ভাবনার রাজ্য। একটা কথা কি ছোট বেলা আমার মনে যা আসতো আমি মাকে সাথে সাথেই জিজ্ঞেস করে ফেলতাম, জানতে চাইতাম। আমার মা একটুও বিরক্ত হতো না। কিন্তু যেবার বুবু আত্মহত্যা করলো গলায় ফাস দিয়ে সেবার মা খুব বিরক্ত হয়েছিল। আমার গালে চড় মেরে কান্না করে বলেছিল “এতো জ্বালাস ক্যা? মরতে পারিস না? দুর হ।” কিন্তু কিছুক্ষন পরই আমাকে বুকে নিয়ে বলেছিল “শোভন কষ্ট লাগেরে আব্বু। আমার মেয়েটার সাথে এমন কিছু হয়ে গেলো আমি বুঝতে পারি নাই। আমি কেমন মা হইলামরে?” আমি সেদিনই প্রথম আমার মাকে এমন করে কাঁদতে দেখেছিলাম। বাবাকে কেমন যেন পাথর হয়ে যেতে দেখলাম।আমার বাবা শোকে তিন দিন কারো সাথে কথা বলে নাই।আমার বাবাটা মাঝ রাতে চিৎকার দিয়ে বলে উঠতো “বিন্তি মা তোর বাবা ছিল তো। এমন করলি কেনরে মা? ও মা? বাবার কথা মনে পড়ে নাই একবারো?” আশেপাশের মানুষ কানাকানি করছিল বুবুর সাথে এক ছেলের সম্পর্ক ছিল। এই সূত্র ধরেই বুবু আত্মহত্যা করেছিল।আমি সম্পর্ক জিনিসটাই বুঝতাম না। পরে জানলাম আমার বুবু অন্তঃসত্ত্বা ছিল।আমার বয়স তখন আট। আচ্ছা সম্পর্ক থাকলেই কি মানুষ আত্মহত্যা করে? আমি অনেক বছর পর বুঝেছিলাম কি পরিমাণ যন্ত্রনা, আর নিজেকে তুচ্ছ ভেবে আমার বুবু আত্মহত্যা করেছিল।সেই বয়স থেকেই আমার শুরু হয় সম্পর্ক, ভালোবাসার অসমতা গুলিয়ে খাওয়ার।আমি স্থির করেছিলাম কখনোই এমন সম্পর্কে জড়াবো না। যে সম্পর্ক মানুষের মন বদলে দেয়। ঠিক তেমনি আমার বুবুর মত যদি আমার জন্য কেউ গলায় ফাস দেয়? একটা মানুষ আরেকটা মানুষের জন্য এমন করে হারিয়ে যাবে। রক্তের বন্ধন ছিন্ন করবে। ব্যাপারটা খুবই ভয়ানক।অদ্ভুত রকমের ভয়ানক।
.
এইটুকুই বলেই আমি থামি। দীবা আমার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। সেই দীর্ঘশ্বাস জানান দেয় চারপাশের বিষণ্নতাকে ছোয়ার।আমি জানালার দিকে হেটে যাই। আমার বাসার এই জানালাটা দিয়ে সূর্যের আলোটা আসে না বললেই চলে। কিন্তু মাঝে মাঝে দক্ষিনের বাতাসটা এসে পুরো ঘরটা মেঘাচ্ছন্নের মত করে দেয়। আমি জানালার পাশে গিয়েই দীবার দিকে ফিরে আবার বললাম “আমি যেমন চেয়েছিলাম তেমনই করেছি। কোন সম্পর্কে জড়াইনি। বাবা মায়ের পছন্দেই তোমাকে বিয়ে করলাম। কিন্তু সুখি ছিলাম কি? বলো? আমার কোন ভুল ছিল? তোমাকে আমার সব টুকু দিয়ে ভালোবাসি নাই? আমি বাচ্চাদের মত কাচুমচু করে তোমাকে গল্প শোনাতাম। সেই গল্পে থাকতো আমার ভালোবাসার কথা। যে কথা বহুকাল ধরে নিজের কাছে জমা করে রেখেছিলাম ভালোবাসার মানুষকেই বলবো বলে। কিন্তু তুমি কি করলে? আমার এসব ভালোবাসাকে ন্যাকামো ভাবতে। কথায় কথায় বিরক্ত ভাব দেখাতে। আমি বুঝেও না বুঝার ভান করতাম। অনুধাবন করলাম নিশ্চয় তোমার এই বিয়েতে মত ছিল না। পরিবারের চাপে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছো।এই বিষয়টা নিয়ে কথা বলবো বলে বলে একদিন ঠিকি বলে ফেললাম “তোমার অসুবিধার কথা আমাকে বলো।আমাকে যদি অপছন্দ হয় বা যদি মনে করো তোমার সাথে আমার যাচ্ছে না তাও বলো। আমি নিজেকে গুছিয়ে নিব।আমাকে সুযোগটা দাও।” তুমি সেদিন কিছু বলোনি। বলেছো তার কয়েকদিন পর। আমার সাথে বিয়ে হওয়ার আগে তোমার একটা সম্পর্ক ছিল এবং পালিয়ে গিয়ে তার সাথে কয়েকদিন থেকে ছিলে।আমি এসব শুনে কয়েকটা দিন ঠিক থাকতে পারিনি।আমি, হ্যাঁ আমি শোভন সারা রাত ঝিম মেরে বসে থেকে কান্না করেছিলাম। পরে ভাবলাম আমিও যদি তোমায় এখন অবহেলা করি তখন তুমি যদি আমার বোনের মত পথ বেছে নাও ব্যাপারটা আরো ভয়ানক হবে। আমি এসব চাইতাম না। আমি নিজেকে স্বাভাবিকে আনলাম। আমার জীবনে যা হবার হয়ে গেছে।তোমাকে আমি আমার মত করেই চাইলাম।কিন্তু তুমি পেরেছো কি? মাস খানিক পার হলো। আমি ভাবলাম তোমার একটু সময় দরকার। নিজেকে এই বিষয়টা থেকে বের করে সব কিছু ভুলে গিয়ে আবার নতুন করে উঠে দাঁড়ার। তোমার তো কোন দোষ ছিল না। সে তোমার সাথে প্রতারনা করেছে। একজন ভুল করবে, আর প্রতারনা করবে, তার শাস্তি কেন অপর মানুষটা পাবে? আমি তোমাকে সেই সময়টা দিয়েছি। তোমাকে ভালোবেসেছি। কিন্তু হঠাৎ করে যখন গত সাতদিন আগে বললে “আমার মনে হয় আমাদের আলাদা হওয়া দরকার কি বলুন? এভাবে আর কতদিন?” তখন আমার ভিতরটা কেমন করছিল হয়তো তুমি বুঝতে পারোনি।আমি বুঝলাম আমার ব্যর্থতা। আমি তোমাকে ঠিক মত ভালোবাসাটা দিতে পারছি না। আসলেই কি পারছিলাম না? ঠিক করে বলো তো?”
.
দীবা কাঁদতে থাকে।মাঝে মাঝে ওকে যখন কাঁদতে দেখি আমার কেমন যেন বুকের ভিতর লাগে। অনেক লাগে। আবার ওকে যখন একটু উদ্দীপনায় দেখি আমি বার বার লুকিয়ে লুকিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকি।তারপর এই ছন্নছড়ার বিষণ্নতার ব্যস্ত শহরে আমি অজস্র দীর্ঘশ্বাস নিয়ে হারিয়ে যাই।এই হারিয়ে যাওয়ার মাঝে আমার কি কোন দায়বদ্ধ ছিল? দীবা চোখের পানি মুছে বললো “শোভন আপনি অনেক ভালো একটা মানুষ। আপনি আমার সব কিছু জেনেও ভালোবেসেছেন।যেটা বিয়ের আগে আপনাকে বলা দরকার ছিল।কিন্তু আমি পারছিলাম না। তার জন্য আমি দুঃখিত।আমার এই বিয়েটা না করাই উচিৎ ছিল। কিন্তু আমি, আমার পরিবার, সমাজের পরিস্থিতির কাছে আটকে গিয়েছিলাম।বিশ্বাস করুন আপনার ভালোবাসার কোন কমতি ছিল না। আমি পারছিলাম না এই ভালোবাসার সঠিক মর্যদা দিতে।আমি যখন ঘুমিয়ে থাকতাম আপনি প্রায় আমার দিকে তাকিয়ে থাকতেন এমনকি আমার চুল কানে গুজে দিতেন। আমি এটা বুঝতাম। আমার না খুব কান্না পেত। এ পৃথিবীর মানুষ গুলো খুবই ভয়াবহ। প্রথমে ভালোবাসা দেখায় তারপর শুরু হয় অবহেলা, অবজ্ঞা করার। এমন কেন মানুষ গুলা? আমার নিজেকে খুব দুর্বল লাগে। আমি অনেক খারাপ একটা মানুষ তাই না? আমাকে তো আপনার ঘৃনা করা উচিৎ। এমন করে ভালোবাসতে গেলেন কেন? এই ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার কি আমি রাখি? বলুন রাখি? বলুন?
.
দুই
.
রাত এখন আনুমানিক সাড়ে বারোটা বাজে। হাটতে হাটতে মাঝে মাঝে আধপাকা পুরানো জং ধরা কয়েকটা বাড়ি চোখের সামনে পড়ে। আর একটু পরেই আজাদ চাচার বাসা। উনার সাথে আমার পরিচয় হঠাৎ করে। আমি বাসে করে যাচ্ছিলাম মোহাম্মদপুরের দিকে। আমার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল।হঠাৎ করে মাথা ঘুরে পড়ে যায়। পরে আমি উনার ফোনের কল লিস্ট থেকে মুনা নামের একজনকে কল করে উনার বাসা অব্দি পৌছে দিয়েছিলাম।জানলাম মুনা উনার মেয়ে। অনার্স শেষ বর্ষের ফাইনাল দিবে। এই সামান্য বিষয়টা থেকেই এই মানুষ গুলোর সাথে আমার পরিচয়।তবে একটা বিষয় হলো মুনা উনার নিজ মেয়ে না। পালিত মেয়ে। উনাদের কোন সন্তান হচ্ছিল না। মুনা যে উনাদের পালিত মেয়ে ব্যাপারটা মুনাও জানে।
.
মুনা আমাকে দেখেই বললো “আপনি মানুষটা সুবিধার না। আপনার আসার কথা ছিল কয়টায়? নয়টায় না? আর এখন কয়টা বাজে? আব্বা আম্মাও ঘুমিয়ে গেছেন অপেক্ষা করতে করতে।” আমি একটু সময় নিয়ে বললাম “আপনার নিশ্চয় অপেক্ষা ব্যাপারটার সাথে পরিচয় এই প্রথম। এই প্রথম কারো জন্য অপেক্ষা করলেন?” আমি বুঝতে পারলাম আমার কথাটা ভালো ভাবে নেয়নি মুনা। মুনা দরজার ভিতরে চলে গেলো। যাওয়ার সময় এইটুকুই বললো টেবিলে সব কিছু দেওয়া আছে।চলুন খেয়ে নিবেন।রাত কম হয়নি। এমনিতে খাবার অনেকটা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। না হয় আবার গরম করতে হবে।” যখন টেবিলে বসলাম মুনা প্লেটে খাবার বেড়ে দিয়ে ভিতরে চলে যায় আর বলে যায় “খাওয়া শেষ হলে আমাকে ডাক দিয়েন।”
.
আজকে মুনাদের বাসায় মিলাদ পড়িয়েছিল। আমাকে দাওয়াত দিয়েছিল। মুনা অনেক জোর করেই বলেছিল আসতেই হবে।আজাদ চাচাকে সেদিন বাসায় দিয়ে আসার পর ব্যাপারটা ওখানেই সমাপ্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ব্যাপারটা ওখানে সমাপ্ত না হয়ে পরিচয়টা আরো লম্বা করেছিল যদি না মুনার সাথে আমার দ্বিতীয়বার দেখা হতো বই মেলায়। আমি হাটছিলাম আর ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম কি কেনা যায়। হঠাৎ করেই একজন মিডিয়ার লোক এসে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল “এবারের বই মেলাটা আপনার কাছে কেমন মনে হচ্ছে? আর আপনি কি কি বই কিনতে আসছেন?” হুট করে এসে এমন করে প্রশ্ন করবে আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি।পরে আমি ভেবে শুধু বলেছিলাম “মেলার পরিবেশটা ভালোই। দেখি কি কেনা যায়।এখন তো যে পারে সেই লিখে। দু চারটা গল্প কবিতা লিখলো তারপর বই বের করে ফেললো।লেখক আর কবি হওয়া এতো সোজা না। এটা অনেক বড় একটা ব্যাপার।” এরপর আমাকে যখন বললো “গল্প পড়তে বেশি পছন্দ করেন নাকি কবিতা?” আমি ব্যাটার কাছ থেকে পালাতে চাইছিলাম আর কি না কি প্রশ্ন করে বসে। আমি উনার চোখ বরাবর তাকিয়ে সরাসরিই বলেছিলাম “ভাই অনেক চাপ আসছে।বড় ধরনের চাপ।চাপ সাইড়া আইসা উত্তর দিচ্ছি। বলতে পারেন টয়লেটটা কোনদিকে? মেলায় কি কোন টয়লেটের ব্যবস্থা করেছে?” কিন্তু মিডিয়ার মানুষের সামনে থেকে রেহাই পাওয়া অনেক কঠিন আমি জানতাম।পালাতে পারিনি।আমি উত্তর দিলাম “দুটোই পছন্দ।যখন যেটা মন চায় পড়ি।” এরপর আমাকে একটা কবিতার কিছু লাইন শোনাতে বলে।আমি বলতে পারছিলাম না “ভাইজান আর লজ্জা দিয়েন না।আমি তেমন একটা গল্প কবিতা পড়িই না।খুব কম পড়ি। বই মেলায় আসলে শুধু আমাকে না, কাউকে কাউকে প্রশ্ন করলে এমনিতেই বলবে “অনেক অনেক বই পড়ি।কিন্তু ফেসবুকে ওদের মধ্যে এই কাউকে কাউকে একটা লেখায় ম্যানশন করলে বলবে “হায় আল্লাহ এতো বড় লেখা পড়বে কে? পড়ার সময় নাই।” আমি তেমন একজন। কিন্তু আমি এসব না বলে ভদ্র ভাবেই আমার পছন্দের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটা কবিতা বললাম…
.
আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি
তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ
এই কি মানুষজন্ম?
নাকি শেষ পুরোহিত কঙ্কালের পাশা খেলা!
প্রতি সন্ধ্যেবেলা আমার বুকের মধ্যে হাওয়া ঘুরে ওঠে,
হৃদয়কে অবহেলা করে রক্ত;
আমি মানুষের পায়ের কাছে কুকুর হয়ে বসে থাকি-
তার ভেতরের কুকুরটাকে দেখবো বলে…
.
এই কবিতা বলেই মিডিয়ার লোকের কাছ থেকে পালাতে পেরেছিলাম ঠিকি কিন্তু তৎক্ষনাত মুনা আমার সামনে এসে বললো “আপনি তো দেখছি খুব ভালো কবিতা আবৃত্তি করতে পারেন। আমি সব শুনেছি। রসিকতাও করতে পারেন বটে। আপনি মানুষটা একটু আলাদা টাইপের আছেন। দেখলে কিন্তু তেমন একটা বুঝা যায় না।” সেই থেকেই মুনার সাথে আমার পরিচয়টা বাড়তে বাড়তে এই অব্দি পৌছালো।
.
আমি শহরটার দিকে তাকাই। সন্ধ্যার পর এই শহরটা সাজার মাঝে ব্যাস্ত থাকে।তার সাজসজ্জায় ঢাকার এই সৌন্দর্যে নিজেকে এখন অনেকটা ক্ষুদ্র মনে হয়। বাসায় পৌছে আমি বুঝতে পারলাম আমার কিছুই ভালো লাগছে না। আমি দীবার কথা ভাবি।আমি বুঝি না যখনি আমার খারাপ লাগে তখনি খুব বেশি দীবার কথা মনে পড়ে।দীবা আমার থেকে বিদায় নিয়েছে চার বছর হয়ে গেলো। দীবা যেদিন আমার থেকে বিদায় নিবে তার ঠিক দুদিন আগে আমাকে বলেছিল “একটা কথা রাখবেন?” আমি শুধু “হুম” করে একটা শব্দ করেছিলাম।দীবা আরো কিছুক্ষন সময় চুপ করে ছিল। তারপর আমাকে ইতস্ততার সহিত বললো “আজকে আমাকে একটু জড়িয়ে ধরবেন? বুকে নিয়ে ঘুমাবেন?” আমি কিছুই বুঝতে পারিনি কেন দীবা এমন করে বললো।আমি বলেছিলাম “অনেক খারাপ লাগছে? আমাকে বলো। খারাপ লাগছে কি অনেক?” দীবা কান্না করে দিয়ে বলেছিল “বলেন নাহ, আমাকে আজকে একটু জড়িয়ে নিবেন? বুকে নিয়ে ঘুমাবেন?” আমি সাথে সাথেই ওকে বুকে জড়িয়ে নিয়েছিলাম।আমার তখন মনে হয়েছিল সমগ্র দুনিয়া একদিকে আর ও একদিকে। আমি বলেতে চাইলাম “দীবা এই কয়েক মাসে তুমি আমার ভিতর কেমন টগবগে ভালোবাসা জন্ম দিয়েছো তা তুমি হয়তো জানো না।আমি মানুষটাকে একা রেখে কোথাও যেও না।” দীবা আমাকে জড়িয়ে থেকেই বলছিল “জানেন আমি বার বার হেরে যাচ্ছি।আমি দিন দিন নিজের সাথে ক্রমাগত যুদ্ধ করে যাচ্ছি। আপনাকে কষ্ট দিচ্ছি।আমি নিজেও কষ্ট পাচ্ছি।এই বিশাল একটা পৃথিবীর মাঝে আমি অনেক ক্ষুদ্র একটা মানুষ। এই ক্ষুদ্র মানুষটা এই পৃথিবীর বিশালত্ব থেকে আড়াল হলে পৃথিবীর কি কোন ক্ষতি হবে বলুন? আমি অনেক আগেই পচে গেছি। আপনাকে ভালোবাসা দেওয়ার মত কিছু নেই। আমার খুব খারাপ লাগে। কেন এমন করে ভালোবাসতে গেলেন আমায়?” দীবার কান্না দেখে আমার চোখেও পানি চলে আসছিল। কিন্তু আমি ওর মত শব্দ করে কাঁদতে পারছিলাম না।আমি শুধু বলেছিলাম “তুমি ক্ষুদ্রই থাকো।আমার বিশালতা দরকার নেই। তুমি কেঁদো না। তুমি কাঁদলে আমার খারাপ লাগে।একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।তুমি দেইখো।”
.
কিন্তু ঠিক হয়নি। কিছুই ঠিক হয়নি।তার ঠিক দুদিন পর দীবা আত্মহত্যা করলো।আত্মহত্যা করার আগে আমাকে শুধু এইটুকুই লিখে গিয়েছিল “আপনাকে ঠিক মত ভালোবাসাটাও দিতে পারলাম না। মাফ করবেন” আমি পাগলের মত হয়ে গিয়েছিলাম। কান্না করতাম আর শুধু বলতাম আমায় একা করলে কেন? একা করলে কেন? আমি মাফ করবো না তোমায়।” আমি যদি জানতাম ও এমন করে হারিয়ে যাবে আল্লাহর কসম আমি ওকে মরতে দিতাম না। আমার ভালোবাসাটা খুব দরকার ছিল কি? তার থেকে হাজার গুন দরকার ছিল তোমাকে। অন্তত আমার চোখে চোখে তোমাকে রাখতে পারতাম। যখন ইচ্ছা হতো আমি কাচুমচু করে একটু কথা বলতে পারতাম। তোমার চুল কানে গুজে দিতে পারতাম ঘুমের মাঝে। এর বেশি কি চাওয়া ছিল আমার? আমার কষ্ট পায় খুব কষ্ট পায়।আমি কেমন একটা মানুষ? একটা মানুষকে নিজের কাছে বন্ধি করার ক্ষমতা রাখি না। যোগ্যতা রাখি না।ছিহ।
.
তিন
.
মা সারা রাত ধরে আমার পাশে বসে জেগে ছিল। দুইটা দিন ধরে আমার কি জ্বর। আমি জ্বরে চোখ মেলতে পারছিলাম না। এখন একটু একটু মেলতে পারছি। মা আমার মাথায় পানি ঢেলে তোয়ালে দিয়ে মুছে দিয়ে বলে “ও বাবা কি হইলো তোর। আমার সোনা মানিক, জাদু সোনা। মায়ের বুঝি চিন্তা হয় না? তোরে আমি আবার বিয়ে দিবনে, মনের রোগ একদম ঠিক হয়ে যাইবে।” আমি মায়ের হাত শক্ত করে আগলে ধরে রাখি। বললাম “মা আজকাল কিছুই ভালো লাগে না। শহরটা কেমন যেন। যেদিকে তাকাই আর নিশ্বাস ফেলি সব কিছুতে অবসাদ। তাই মাঝে মাঝে বাবা আর তোমার কাছে চলে আসি। ভালো করি না? তোমাদের কাছে যতদিন থাকি ততদিন শান্তি লাগে। এই যে এখন আগলে ধরে রাখছি মনে হচ্ছে বুকের মাঝ থেকে একটা বড় পাথর নাই হয়ে গেছে।” মা আমার চোখের পাতায় দুইটা চুমু খায় আর বলে “আল্লাহ আমার ছেলেটার সব জ্বর আমারে দিয়া দাও গো। ও বাবা এতো কষ্ট ক্যান তোর বুকের মাইঝে? কষ্ট পালন ভালো না আব্বু। বুকের মাইঝে থেইকে এগুলা ঝাইড়ে ফেলে দিতে হয় তুই জানিস নে?” আমি কিছু বলি না। বুবু আত্মহত্যা করার পর থেকেই মা আমাকে নিয়ে বেশি বেশি চিন্তা করে। একা করতো না। তারপর এই আমি কেমন করে বড় হয়ে পড়ালেখার জন্য শহরে চলে গেলাম। তারপর চাকরি নেওয়ার আগে গ্রামে এসে বিয়ে করেছিলাম দীবাকে। জীবনে এতো কিছু ঘটে যাবে কে জানতো?
.
সন্ধ্যার নাগাত মুনা আমাকে ফোন করে বললো “আপনি আমাকে সেদিন এমন করে কেন বললেন? অপেক্ষা বিষয়টা নিয়ে আপনি কতটুকু বুঝেন?” আমি বাড়ির উঠোনে বসে দুইটা কাশি দিয়ে বললাম “আমাদের এখানে সন্ধ্যার পর থেকেই ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে যায়।আর ঢাকার শহরটা আলোর শহর তাই না? কয়েকদিন ধরে আমি অসুস্থ ছিলাম। এখন ভালো আছি। উঠোনে বসে সন্ধ্যার আকাশ দেখি।সেদিন কথাটা বলে আমি কষ্ট দিয়েছি তাই তো? আপনারও কি আমার মত কষ্ট আছে? মা প্রায় বলে কষ্ট নিজের কাছে রাখতে নেই। আচ্ছা বলুন তো কে চায় কষ্ট নিজের কাছে রাখতে? কিন্তু কষ্টরা তো মানুষের মনে বাস করে। এটাই তো তাদের থাকার স্থান। ওখানে না থাকলে তারা কোথায় থাকবে? মা এটা বুঝে না বুঝলেন।আমার মা একটু বোকা আছে।” মুনা কিছুক্ষন চুপ করে থাকলো। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললো “আপনি এমন করে কথা বলা কোথায় শিখছেন? আমি ভাবছিলাম ফোন করে আপনাকে কিছুক্ষন ঝাড়বো আমাকে সেদিন মন খারাপ করিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু তা আর হলো কই? এমন করে কথা বলে আমাকে ইমোশনাল করে ফেলেছেন।এমন আবেগ দিয়ে আর কথা বলবেন না। বুকের মাঝে অনেক লাগে।”
.
আমি মুনাকে বললাম “কেমন একটা ঝড় আমার মনের মাঝে বইছে আপনাকে তো সবই বলা হয়েছে পরিচয় হওয়ার পর।কিন্তু আপনার মনের ঝড়ের কথা তো কখনো বলেননি।সেদিন যখন রুমের ভিতরে চলে গেলেন তখনি আমি বুঝতে পেরেছিলাম।এতো ঝড় নিয়ে হাসিখুশি থাকেন কি করে? আমি তো পারি না। একটু হলেই ফ্যাসফ্যাস করে কেঁদে দেই।আমি জানি ছেলেদের কান্না করা ভালো না।কিন্তু নিজের চোখকে বুঝাতে পারি না।হারামজাদা চোখ দুইটা খালি পানি ঝড়াতে আনন্দ পায়।”
.
মুনা আরো একটু সময় নিল তারপর বললো “লোভ কতটা বিধস্ত করে দেয় আমি বুঝতাম না। আমার মনে লোভ হয়েছিল।ভালোবাসার লোভ।অর্ককে আমি খুব চাইতাম।আসলে আমি অন্য রকম হয়ে গিয়েছিলাম। আচ্ছা মেয়ে বলেই কি এমন চাওয়াটা মনে তৈরি হতে পারে না?জানেন আমাদের পরিচয়টা অনেক পুরানো। কলেজের শুরু থেকে।আমি দেখতে তেমন একটা সুন্দর না। তারউপর আমার ভিতরে সব সময় একটা বিষয় কাজ করতো। কে আমি? আমার আসল পরিচয়টা কি? আমি খুব চাইতাম কারো কবিতা হতে। কেউ আমার জন্য কবিতা লিখুক। কিন্তু কি অদ্ভুত এমন কোন কিছুই অর্কের মাঝে ছিল না। ও শুধু মানুষকে হাসাতো। স্পষ্ট করে বললে খুব মিশুক ছিল। হয়তো এটার জন্যই ওর প্রতি আমার একটা দুর্বলতা কাজ করতো।
.
তারপর কি হলো জানি না। আমি নিজেই ওর সাথে গিয়ে কথা বলতাম।একদিন অর্ক হঠাৎ করে বললো “এই তোমার লক্ষণ ভালো না। তুমি কি আমার প্রেমে পড়ছো?” জানেন আমার সেদিন খুব লজ্জা লাগছিল। আবার ভালোও লাগছিল। এই যে ব্যাপারটা ও অনুমান করতে পেরেছিল। আমি শুধু বলেছিলাম “আমার খেয়ে দেয়ে কাজ নাই তোমার মত লাগাম ছাড়া ছেলের প্রেমে পড়তে যাবো? ছাগল।” ও কোন খাবারটা খেতে পছন্দ করতো তা নোট করে রাখতাম।আমি শিখতে চেষ্টা করতাম। আসলে আমাদের মাঝে ভালোবাসার বিষয় নিয়ে কখনো কথা হয়নি। কিন্তু আমরা খুব কাছের ছিলাম। একে অপরের চাওয়া গুলো বুঝতাম। ওর জন্য অপেক্ষা করতাম কখন ছুটির পর একটু কথা বলতে পারবো। একসাথে হেটে যেতে পারবো। কিন্তু আমার ভয় লাগতো অন্য কিছুতে। বিশ্বাস করেন আমার ভিতরে ওর জন্য এতো অনুভূতি হতো এটা আমি নিজেও প্রথমে বুঝতাম না।তারপর এক বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায় আমাদের বাড়ির সামনে এসে আমাকে ফোন করে বললো “তোমাকে ভিজাতে আসছি।তোমার ভেজা চোখ গুলোয় ছুয়ে দিতে আসছি।” আমি খুব বিরক্ত হয়ে বলেছিলাম “বেশরম, দুইটা বছর ধরে তোমার সাথে আছি। ভালোবাসার কথা বলতে পারো না আর আমাকে ভিজাতে আসছো?”
.
সেদিন ওর সাথে আমি খুব ভিজেছিলাম। এই শহর দেখেছিল। শহরের সন্ধ্যার আকাশটা দেখেছিল।এই সন্ধ্যার আকাশকে স্বাক্ষী রেখে আমি আমার কথা বলেছিলাম। আমি কে? আমার কি পরচয়।” জানেন এর পর কি যেন একটা হলো। ও কেমন যেন বদলে গেলো।আমার সাথে ঠিক মত কথাও বলতো না।আমার ভীষন খারাপ লাগতো। আমি কান্না করতাম। ভাবতাম যে আমাকে জন্ম দিল সে আমাকে তখনি মেরে ফেললো না কেন? আমার তো কোন দোষ ছিল না। বলুন ছিল? একটা কথা কি মানুষ গুলো খুব ভয়াবহ। প্রথমে ভালো লাগা, ভালোবাসা দেখায়। তারপর একটা সময় শুরু হয় অবহেলা, অবজ্ঞা। আমি বুঝতে পেরেছিলাম এসব আমার জন্য না। এরপর থেকে আমি আর এসব ভাবিনি। একটু আগে বললেন না কষ্ট মনে বাস করে। সত্যিই তাই। এগুলো মনে পড়লে খারাপ লাগে।”
.
মুনাকে আমি কি বলবো বুঝতে পারি না। মুনার মত দীবাও এই কথাটা আমাকে বলেছিল “এ পৃথিবীর মানুষ গুলো খুবই ভয়াবহ। প্রথমে ভালোবাসা দেখায় তারপর শুরু হয় অবহেলা, অবজ্ঞা করার। এমন কেন মানুষ গুলা?” আমার হঠাৎ করে খারাপ লাগা শুরু হলো। আমি মুনাকে বললাম “পরে কথা বলি হ্যাঁ?” আমি লাইনটা কেটে দেই। মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছে।
.
চার
.
জুনায়েদ সাহেব আস্তে আস্তে চোখ মেলে ব্যথায় বলতে লাগলো “উফ, আমাকে এইভাবে কে মারলো? আমার চশমাটা কোথায়?কে আমাকে এই ভাবে বেধেছে?” এটা বলেই জুনায়েদ সাহেব বমি করে দিল।” আমি ফ্রিজ থেকে পানির বোতল এনে উনার মুখের ভিতর দিয়ে বললাম “নেন স্যার পানি দিয়ে গড়গড় করেন তারপর খেয়ে নেন।আপনাকে যে এখন একটু সুস্থ হতে হবে। পুরানো হিসেব নিয়ে বসতে হবে।বহুবছর পর আপনাকে আমি খুঁজে পেয়েছি।” তারপর চশমাটা আমার শার্টের কোনা দিয়ে মুছে উনার চোখে পরিয়ে বললাম “এতো বছর পর দেশের কথা মনে পড়ছে স্যার?” পানি খেতে খেতে সে আমার দিকে ভালো করে দেখলো তারপর বললো “কিসের হিসেব? কে আপনি? আমি আপনার কি ক্ষতি করলাম? আমার সাথে কেন এমন করছেন? খুব অভদ্রতা হচ্ছে। আমি পুলিশের কাছে কমপ্লেইন করবো।”
.
আমি ওর কাধে হাত রেখে কপালে একটা চুমু খেয়ে বললাম “স্যার আপনি আসলেই একটা বান্দিরপুত। এতো অস্থির হলে হয়? একটু পর আমি সব মনে করিয়ে দিব।মাইন্ড খাইয়েন না, আমি পাগল টাইপের হয়ে গেলে মুখে যা আসে বলে ফেলি।তবে আমার মনটা অনেক ভালো। এই দেখেন মা দুধ চিতই পিঠা বানিয়েছে আজকে। আসার সময় আপনার জন্য নিয়ে আসছি। আমার মা কিন্তু ভালো পিঠা বানায়। এখন বলেন আমি ভালো ছেলে না? ভালো ছেলেদের জন্য কি কেউ কমপ্লেইন করে? কিছুদিন অসুস্থ ছিলাম তাই দেখা করতে দেরি হয়ে গেলো। খুব স্যরি।”
.
আমার কথা শুনে ওর চোখ মুখ কেমন যেন হয়ে গেলো। আমি বুঝলাম সে ভয় পেয়েছে। ভয়ে ভয়েই বললো “আমি তো আপনার কোন ক্ষতি করিনি। আপনার কত টাকা লাগবে বলেন। আমি আপনাকে দিব। আমাকে ছেড়ে দেন।” আমি হেসে দিয়ে বললাম “আমি হিসেবের খাতায় হিসেব মিলাতে আসছি। আপনি ছাড়া হিসেবটা মিলাতে একদম পারছিনা। এতো বছর মাথাটা গোলমাল হয়ে গিয়েছে। অসমাপ্ত হিসেব নিয়ে কেমন করে দিন কেটেছে এক আল্লাহ ভালো জানেন। টাকার জন্য আসি নাই গো স্যার।” এটা বলার পর এবার একটু রাগ করে জোরেই বললাম “তোর অনেক টাকা হইছে না? তোর টাকায় আমি মুতি মাদারচোদ। অনেক বছর আগে বিন্তি নামের একজনের সাথে প্রেম ভালোবাসা ছিল তোর মনে আছে? মেয়েটা তো তোরে অনেক ভালোবাসতো।মেয়েটার সাথে শেষে এমন করলি ক্যান? আমি সেই মেয়েটার একমাত্র ছোট ভাই। আদরের ভাই। আমার বোনটা আমারে শুভু বইলা ডাকতো। এখন আমি আর শুভু ডাকটা শুনি না। আমার ভিতরটা ফাইটা যাইরে।আমার বোনটা তোরে ভালোবাইসা কোন পাপ করছিল শুয়রের বাচ্চা? আজকে তোরে আমি মারমু। কুচি কুচি করমু। আমারে একটু ভয় কর। আমার বোনের আত্মহত্যার পর তুই দেশ ছাইড়া চলে গেছিলি। কত খুঁজছি আমি তুরে।এই দিনটার জন্য আমি অপেক্ষা করছিলামরে।” এটা বলেই ওর বুকে একটা লাথি দেই। সে চেয়ারসহ মেঝেতে পড়ে কুকড়াতে কুকাড়াতে বলতে লাগলো “তোমাকে আমি আজকে একটা কথা বলবো। তার আগে আমাকে ছাড়ো। তোমার বোন আত্মহত্যা করে নাই।হ্যাঁ আমার ভুল হয়েছে তোমার বোনকে এড়িয়ে চলাতে।আমাকে ছাড়ো তারপর সব বলছি।”
.
খুব রাতে আমি বাবাকে নিয়ে আম গাছটার সামনে এসে বসে থাকি। জুনায়েদকে আমি মেরেছি তিন চারঘন্টা হয়ে যাবে। আমার ভিতরটা ধক ধক করছে। শরীর কাঁপছে।বাবা আমাকে বলে এতো রাতে তুই আমাকে এখানে নিয়ে আসলি কেন?” আমি কোন উত্তর দেই না। বাবার দিকে তাকিয়ে কান্না করতে থাকি। তারপর বলি “এই গাছটার কথা মনে আছে বাবা? এই গাছটা এখনো মরে নাই। তবুও এই গাছটাকে আমি মৃত গাছ বলি।এই গাছটায় আমার বোনটা গলায় ফাঁস দিয়েছিল না?” বাবা আমার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে। আমি কান্না করতে করতে বলি “এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না বাবা। আমি প্রথম যখন স্কুলে গেলাম আমি অনেক কান্না করেছিলাম। মোটা একটা টিচার ছিল আমার খুব ভয় লাগছিল। আমি ক্লাসে কান্না করে দিয়েছিলাম। বার বার বলছিলাম বাড়িত যাবো। এরপর বুবু আমারে প্রতিদিন দুইটা করে চকলেট দিতো যেন কান্না না করি। আমার বুবু তো বিড়ালের কাছে যেতেও ভয় পেতো। আমার এই ভালো বুবুটা কি সত্যিই আত্মহত্যা করেছিল নাকি হত্যা করা হয়েছিল ও বাবা? তুমি মারছিলা না আমার বুবুটারে? তোমার হাত কাঁপে নাই? ক্যান গো বাবা, ও বাবা ক্যান এমন করলা?” আমার বাবা বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। আমাকে বলে “তুই পাগল হইছিস? তুই কি ছাইপাস খাওয়া শুরু করছোস?” আমি বসে থেকেই নিচের দিকে তাকিয়েই বললাম “বুবু অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর তুমি বুবুরে নিয়ে জুনায়েদের কাছে গেছিলা এবং জুনায়েদের বাবা মায়ের কাছেও গেছিলা। তারা সব কিছু অস্বিকার করেছিল। আমরা গরীব বলে তাদের কাছে দাম পাই নাই। তুমি কি করবা ভেবে না পেয়ে সমাজের সামনে কিভাবে মুখ দেখাবে? কাকে কি বলবে এসব ভেবে বুবুরে মেরে এই গাছটায় ঝুলিয়ে দিছিলা তাই না বাবা? সব সমাধান হয়ে গিয়েছিলো? মা আজো এই ব্যাপারটা জানে না। আমি মাকে কিছু বলি নাই। আমার মা মইরা যাবে গো বাবা এসব জানলে।” আমার বাবা দু কদম পিছনে গিয়ে ধপাস করে বসে পড়ে। তারপর কিছুক্ষন ঝিম মেরে থেকে কান্না করতে থাকে। আমি কান্না করতে করতেই বললাম “জুনায়েদকে আমি তার শাস্তি দিয়েছি। কিন্তু তোমাকে?” এটা বলেই আমি উঠে চলে আসি। আমার এখানে আর থাকতে ইচ্ছে করছে না।
.
খুব সকাল বেলা খবর পেলাম আমার বাবা গলায় ফাঁসি খেয়েছে। মা আমার কাছে এসে চিৎকার দিয়ে কান্না করতে থাকে। আর বলতে থাকে “এই আমার কি হইলো? তার কি এমন দুঃখ ছিল আল্লাগো। এই তুমি আমার কি করলা? ও শোভন তোর বাপের এমন কি কষ্ট ছিল বাজান। ও বাজান আমারে বুঝা। আমি তো শেষ হইয়া গেলামরে।” আমার চোখ দিয়ে শুধু পানি ঝড়তে থাকে। সারা রাত আমি কেঁদেছি। এতো পানি এই চোখ দিয়ে কেমন করে আসে আমি জানি না।মাকে কিছু বলার ক্ষমতাও আমার নেই। বাবা কি ফাঁসি খেয়ে ভালো করেছে? এই যে আমি ব্যাপারটা জানতে পেরেছি বাবা কি এই মুখটা আমার কাছে দেখাতে পারতো? পারতো কি? 
তোমাদের পাথর বাগানের সবুজ ঘাসে
মিশে থাকে কত যুগের নষ্ট গল্প
যত পতাকার রং ধুয়ে যায় অভিশাপে
আকাশের সাদা অনুভূতিতে শুধু ঘৃণা…
.
তার কিছুক্ষন পর আমার কেন যেন মনে হলো মুনাকে ফোন করা দরকার। ফোন করেই আমি ঝিম মেরে থাকলাম। মুনা আমাকে বলতে লাগলো “কি হলো ফোন করে চুপ করে আছেন কেন? কথা বলুন। ট্রেনের শব্দ কেন? আপনি এখন কোথায়?” আমি এই কথার প্রতিভাষ না দিয়ে বললাম “মুনা, জীবনজুড়ে এই মানুষ গুলোকে স্বাভাবিক মনে হলেও মানুষগুলো স্বাভাবিক থাকে না।আমরা মানুষ গুলো ভিন্ন। কষ্ট গুলোও ভিন্ন। জীবনের স্রোত কাটিয়ে যখন মানুষ গুলো নীল আকাশটা দেখতে পায় তখন মনে হয় আঘাত শুকিয়ে গেছে। আসলে কি আঘাত শুকিয়ে যায়? আমার এখন তাই মনে হচ্ছে। জানেন আমি অনেক ক্লান্ত। আমি আপনার কাছে একটু আসি? অপেক্ষা করতে খারাপ লাগবে না তো?” মুনা চুপ করে থাকে। অনেকক্ষন পর বলে “নতুন করে অপেক্ষা করতে বলছেন?” আমি আবারো এই কথার উত্তর দেই না। শুধু তাকে বললাম “আকাশের রুপালি চাঁদটা একা দেখতে ভালো লাগছে না। একটু দেরি হলেও অপেক্ষা করুন আমি আসছি…
.