বৃহস্পতিবার, ৩০ মে, ২০২৪

দ্বিতীয়_বিয়ে । ( পর্ব-১)




Writing By 


আফিয়া খোন্দকার আপ্পিতা। 

পর্ব-১
 কদিন ধরে কাজের খালা আসছে না দেখে ফোন দিয়ে জানা গেল, খালার বিয়ে হয়ে গেছে। শুনে বেশ অবাক হলাম। খালার বয়স পয়তাল্লিশ। ছেলে ও বিয়ে করিয়েছেন। নাতির বয়স পাঁচ। এমতাবস্থায় বিয়ে করাটা বেশ বিস্ময়ের বটে। 


খালা আমাদের বাসায় প্রায় ২৫বছর ধরে কাজ করেন। 

আমার বুঝ হবার পর থেকে খালাকে আমাদের বাসায় কাজ করতে দেখছি। খালার মুখেই শুনেছি তার করুণ জীবনবৃত্তান্ত। 

 খালার প্রথম বিয়ে হয়েছে পনেরো বছর বয়সে। তাও তার চেয়ে তিনগুন এক লোকের সাথে। হতদরিদ্র বাবা বড়ো ঘরের সমন্ধ পেয়ে বাছ-বিচার ছাড়া মেয়ে তুলে দিয়েছেন দুই বাচ্চার বাবার কাছে। এলাকার প্রভাবশালী ব্যাক্তি, তালুকদার বংশ। নাম যশ খ্যাতি, অঢেল অর্থবিত্ত, কিছুরই কমতি নেই। রাজকীয় বাড়ি যার নামে, নাসির তালুকদার। 


দুই ছেলেমেয়ে। বিয়ে-শাদী দিয়ে যে যার মতো আছে। ছেলেটা থাকে শহরে, মেয়ে বিদেশ পাড়ি দিয়েছে। মা মরবার পর এ মুখো হয়না। সংসারে ঝুট ঝামেলা নেই। অত বড় বাড়ি খা খা করছে। মণি মুক্তো দেখার কেউ নেই। বিয়ের পর সব তো মেয়েরই হবে। মেয়ে রাজরানী হয়ে থাকবে। পাত্র দেখতে শুনতেও বেশ। কেবল বয়সটাই একটু বেশি । পঞ্চাশ পেরিয়ে ষাটের ঘরে এগুচ্ছে। এ আর এমন কী বয়স? পুরুষ মানুষ ২৫হোক আর ৫০, সে একই কথা। মতি মিয়া অমত করবার দিক খুঁজে পাননি। প্রস্তাব আসতেই নির্দ্বিধায় হ্যাঁ বলে দিয়েছেন।


  আশি দশকের কিশোরী মেয়ে শিউলি। সে মত দিল কি দিল না সে কথা ভাবার সময় কোথায়? ওত বড় ঘরে সমন্ধ হলে নিজের ও দিন ফিরবে, এই খুশিতে মেতেই কূল পেলেন না। এক শুক্রবার সমাজের লোকজন ডেকে পঞ্চদশী শিউলির হাত তুলে দিলেন পঞ্চাশোর্ধ নাসিরের হাতে। 


বিয়ের পরের দিন দাওয়াত হলো তালুকদার বাড়িতে। মাকে দেখে শিউলি কেঁদেকেটে বলল, মা আমি থাকব না এখানে। আমাকে নিয়ে যাও। লোকটা খুব খারাপ। 


মা ধমকে উঠলেন, স্বামীর নিন্দে করতে নেই। খারাপ হোক ভালো হোক, এখন থেকে উনিই তোর সব। এটাই তোর বাড়ি। মানিয়ে নে। 

দাদী বললেন, মাইয়্যা মানুষ স্বামীর ঘরে বউ হইয়্যা আহে, , লাশ হইয়্যা যায়। আর কোন যাওন টাওন নাই। মনে রাহিছ। 


 রাজভোগে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে বিদায় নিলেন তারা। যাবার কালে শিউলি কত আকুতি করল সাথে নেবার। কেউ নিল না। যদি আর না আসে! সংসারে মন বসে গেলে পরে যেতে পারবে। 


শিউলি বেগম সেদিনই বুঝে গেলেন, এখন এটাই তার একমাত্র আশ্রয়। নিয়তি মেনে নিলেন, মানিয়ে নিলেন। প্রথম দিকে মন কাঁদল, চোখ ভিজল। ধীরে ধীরে অভ্যাস হয়ে গেল বুড়োমানুষটা। 

 বছর ঘুরতেই বমির ব্যামোতে সুখবর আলো। ন'মাস বাদে কোল আলো করে এলো পুত্রসন্তান। ছেলের মুখ দেখতেই শিউলি নিজের দুঃখ কষ্ট সব ভুলে গেলেন। ছেলের মাঝে সব সুখ খুঁজে পেলেন। বুকে আগলে পরম যত্নে ছেলেকে আগলে রাখলেন। 


শেষকালে পুত্রসন্তানের বাবা হবার সৌভাগ্যে খুশিতে আটখানা হলেন নাসির তালুকদার। গরু জবাই করে আকিকা দিয়ে নাম রাখলেন, নাইম। 


স্বামী, সন্তান, সংসার নিয়ে শিউলির দিন ভালোই কাটছিল। কিন্তু সুখ যেন ঠিক ছুঁয়েও ছুঁতে পারেনি। বিয়ের বছর পাঁচেক হতেই বার্ধক্যজনিত রোগে গত হলেন স্বামী। হেসেখেলে বেড়াবার বয়সে গায়ে জুড়ল সাদা শাড়ি, বিধবা উপাধি। ভালো হোক কি মন্দ, ওই মানুষটাই এতদিন ছায়া হয়ে ছিল শিউলির। এখন সেই ছায়াও চলে গেল। 


স্বামীর মৃত্যুর শোকের মাঝে এলো তার জীবনের আরেক ঝড়। আগের পক্ষের ছেলে এসে হাজির হলো। বাবাকে দাফন করে এসে বাবার রেখে যাওয়া সহায় সম্পত্তির দলিল বুঝে নিল ছেলে। ছেলে বউ বুঝে নিল শিউলীর আলমারিতে রাখা বংশীয় অলংকার, আঁচলের গিট খুলে নিল সংসারের চাবি। 


শুভ্র শাড়িতে ছেলেকে বুকে নিয়ে নির্বাক চেয়ে রইল শিউলি। সে স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ। 


রাতারাতি উকিল ডেকে সব সম্পত্তি নিজের নামে করে নিল নাদির। বোনকে অবশ্য দিল কিছু। পেল না কেবল বাবার শেষ বয়সের ছেলে। না সম্পত্তি আর না স্বীকৃতি। কড়া স্বরে ঘোষণা দিল, বাবার দেখভালের জন্যই ছিল। এখন বাবা নেই, তার ও প্রয়োজন নেই। এত ঝামেলা কাধে নিতে পারবেনা। 


শিউলির জায়গা হলো না তালুকদার বাড়িতে। এক প্রকার বের করে দেয়া হলো তাকে। ছেলেকে নিয়ে ফের এসে পড়লেন বাবার বাড়ি। সেখানে নুন আনতে পানতা পুরোয়। তার আগমনে বাবা মা ও খুশিতে হতে পারলেন না। মেয়ে, তার উপর নাতি, এ যেন বাড়তি ঝামেলা। 


আশি নব্বই দশকে একটা বিধবা মেয়েকে সমাজ মেনে নিতে পারতো না। সতীদাহ প্রথা উঠে গেলেও রেশ কিন্তু রয়ে গেছিল। বিধবাকে পুড়িয়ে মা'রতো না, তবে জীবন্ত মা'রতো। মৃত লাশ দাফন করা হতো, কিন্তু জীবন্ত লাশ রেখে দিতো। তাকে পদে পদে হেয় করা হতো, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হতো। তাকে অপয়া ভাবা হতো। কথার বাণে বিদ্ধ করে ক্ষতবিক্ষত করা হতো প্রতিক্ষণ। তার বাঁচা দুর্বিষহ করে তুলতো। 

 আত্মীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশীর কথায় কান ভারি হলো। কদিন যাবার পর মা বোন ও কথা শুনাতে লাগলেন। উঠতে বসতে কটু কথা কানে এলো পরিবার থেকে। শিউলির বুঝে গেলেন, এখানেও ঠায় হবে না তার। 


তখন শিউলির বয়স ২০, ছেলের বয়স ৫। বাস্তবতা বুঝবার ক্ষমতা শিউলির হলেও বাচ্চাটার হয়নি। জমিদার ঘরের ছেলে। আভিজাত্যে বেড়ে উঠা। তিন বেলা মাছ মাংস খাওয়ার অভ্যাস নাইমের। নানা বাড়ির পেঁয়াজ, মরিচ দিয়ে পান্তাভাত তার গলা দিয়ে নামে না। ছেলেটা খেতে পারে না, মাংসের বায়না করে। শিউলি এনে দিতে পারেন না। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে যায়। খাওয়া অনিয়মে অল্প কদিনে ছেলের শরীর ভেঙে আসে। 


ছেলের দিকে তাকালে চোখে জল নামে শিউলির। কী করবে না করবে দিশেহারা লাগে। অজপাড়া গাঁয়ের অশিক্ষিত মেয়ে, জীবিকা নির্বাহ করবার পথ খুঁজে। ছেলেকে বাঁচাতে হবে তার। এখান থেকে পালাতে হবে, এ সমাজ বাঁচতে দিবেনা তাকে।  


সেই তাগিদে পা বাড়ান ঢাকায়। বস্তিতে আশ্রয় নিয়ে, মানুষের বাসায় কাজ জোগাড় করেন। 


খালা তখন থেকে আমাদের বাসায় কাজ করেন। ছেলেকে নিয়ে আসতেন। খালার মুখে কেবল একটাই নাম থাকতো, আমার নাইম। খেয়ে না খেয়ে ছেলেকে মানুষ করতে লাগলেন। মানুষের বাসায় কাজ করে, পড়ালেন ছেলেকে। আমাদের বাসায় ভালোমন্দ রান্না হলে, খালা কখনো খেতেন না। বলতেন, আমার ভাগেরটা দিয়ে দিন, আমার ছেলেটা খাবে। নিজে খেতেন না, দু'বেলা ছেলেকে খাওয়াতেন। ছেলের খুশিতেই খালার খুশি। খালার গায়ের কাপড় যত মলিন, ছেলের কাপড় তত উজ্জ্বল। ছেলের দিকে চেয়ে খালা কত কিছু বিসর্জন দিলেন, কত সংগ্রাম করে গেলেন। 


খালা আত্মমর্যাদা ছিল প্রখর। এত বাধাবিপত্তির পর ও কারো দয়া নেননি। নিজে কাজ করে ছেলের খরচ চালাতেন। 


স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে ছেলে বায়না ধরল শহরের বড় কলেজে পড়বে। খালা আর ক'টা বাসার কাজ বাড়িয়ে নিলেন। রাতদিন খেটেখুটে ছেলেকে পড়ালেন। খালার আশা ছেলে একদিন বড়ো চাকরি করবে। মাঝে মাঝে বলতেন, 

"বুঝলা মা, শরীরডা আর কুলায় না। গিটে গিটে ব্যাথা। পোলার চাকরি হইলে এই কাম ছাইড়া দিমু। আমাগো সুখের দিন আইব।" 


সেই সুখের দিন এলো। ছেলের চাকরি হলো। বস্তি থেকে বাসায় উঠল। খালা বিদায় নিতে এসে উৎফুল্ল হয়ে বললেন, "আমার সুখের দিন আইসা গেছে। দোয়া কইরো।" 


খালার সুখ দেখে আমাদের স্বস্তিই মিলল। সেই স্বস্তি উবে গেলে মাস তিনেক বাদে। একদিন ফোলামুখ নিয়ে খালা এলেন বাসায়। গায়ে মারের দাগ। কাতর গলায় মাকে বললেন,

"আমারে কাজে লোইবেন আপা?" 


মা অবাক হয়ে বললেন, " তুমি কাজ করবে কেন? তোমার ছেলের কতবড় চাকরি! " 


ছেলের কথা আসতেই খালা ডুকরে উঠলেন। ভেজা গলায় বললেন,

" আমার পোলাডা বদলাইয়্যা গেছে, আপা। বউ আমার গায়ে হাত তুলল, পোলা চাইয়্যা চাইয়া দেখল।" 


যে ছেলের জন্য মানুষটা নিজের সুখ শান্তি বিসর্জন দিয়েছে, সেই ছেলে এই প্রতিদান দিল! জানা গেল, ভার্সিটিতে পড়ার সময় এক জুনিয়রের সাথে মন দেয়া-নেয়া হয়েছিল। ভালো চাকরি পেয়ে বিয়ে করে বউ ঘরে তুলেছে। শিউলি খুশিমনেই মেনে নিলেন। কিন্তু বউ তাকে মানতে পারল না। সংসারে শ্বাশুড়ির উপস্থিতি পছন্দ না তার। বরের কান ভাঙিয়ে কদিনেই মায়ের প্রতি বিতৃষ্ণা তৈরি করিয়েছে। শ্বাশুড়ির সাথে খারাপ ব্যবহার করতো। হাত ও তুলতো। শিউলি ছেলেকে বলার সুযোগ পেতেন না, তার আগেই ছেলের কান ভারি করতো বউ। ঘটনা এমনভাবে উপস্থাপন করতো, যেন সব দোষ শিউলির। নিত্যকার কলহে ছেলেও অতিষ্ঠ মায়ের প্রতি। 

সংসারে সুখ আনতেই বিরক্তির ভাঁজ ফেলে নাইম বলল, 

"রোজ রোজ এত অশান্তি ভালো লাগেনা, মা। তুমি অন্য ব্যবস্থা করো। "


পোড়া কপালের ছাই তুলে বেরিয়ে গেলেন শিউলি। দ্বিতীয়বারের মতো উঠলেন বস্তিতে। একবার ছেলেকে বাঁচাতে, আরেকবার ছেলের থেকে বাঁচতে। 

সুখের দিন এলেও সুখ তাকে ছুঁতে পারল না এবারও। 


তারপর থেকে খালা আবার বাসায় কাজ করেন। জীবনের এত উত্থান পতনের মাঝেও খালা কখনো দ্বিতীয় বিয়ের নাম নেননি। তবে এখন কী এমন হলো যে খালা বিয়ে করে নিলেন? 




চলবে.....


বাস্তবিক ঘটনার নিরিখে ছোট্টো একটা গল্প। আগামী পর্বে শেষ হবে।


শেয়ার করুন

Author:

আমি সজীব হোসাইন -এই ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা পাশাপাশি লেখালেখির কাজটাও করি। অনলাইনে প্রযুক্তির বিষয় নিয়ে যা জানি তা মানুষের মাঝে শেয়ার করার ইচ্ছায় এ ব্লগ টি তৈরি করা।

2 coment rios:

sojib বলেছেন...

banglanews24.com কেন, পুরুষ মানুষ বিয়ের আগে কয়েকটি বিষয় নিয়ে বারবার না ...
ছবি
প্রয়োজনে দ্বিতীয় বিয়ে করা ...
প্রয়োজনে দ্বিতীয় বিয়ে করা ...

আমার বিক্রমপুর
যদি দ্বিতীয় বিয়ে করতেই হয় ...
যদি দ্বিতীয় বিয়ে করতেই হয় ...

banglanews24.com
স্বামী অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় ...
স্বামী অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় ...

Jugantor
Second Marriage: দ্বিতীয় বিয়ে করার আগে ...
Second Marriage: দ্বিতীয় বিয়ে করার আগে ...

Eisamay
আরও ছবি
লোকেরা এটাও সার্চ করেছে
দ্বিতীয় বিয়ের আবেদন
ডিভোর্সের পর দ্বিতীয় বিয়ে
প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ের শাস্তি
দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে উক্তি
দ্বিতীয় বিয়ে করতে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি লাগবে কিনা ইসলাম কি বলে
দ্বিতীয় বিয়ের জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি পত্রok

sojib বলেছেন...


দ্বিতীয় বিয়ের উপকারিতা
গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে
স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে
এক স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও পুরুষের দ্বিতীয় বিবাহ অর্থ
দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি পত্র
প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে হাদিস