শুক্রবার, ২৭ জুন, ২০২৫
অপার্থিব বউ
✍️ Waiting byতানভীর ইসলাম |
---
সেই রাতের কথা আমি কখনো ভুলতে পারব না। শুধু আমি না, আমাদের পুরো গ্রাম এখনো ভুলতে পারেনি — শিউরে ওঠে। আমি তানভীর, পেশায় স্কুলশিক্ষক। আমাদের গ্রাম গাংনী উপজেলার একদম শেষ প্রান্তে। ২০২১ সালের মে মাসে বিয়ে হয় আমার — রুকাইয়া নামের এক মেয়ে, যাকে আমি চিনি না, জানি না। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে তাকে বিয়ে করে এনেছিলাম, আর তারপর যা ঘটেছিল, সেটা এমনকি সিনেমাতেও দেখা যায় না।
ঘটনাটা মনে হলেই শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়।
---
১. পছন্দের বাইরে এক বিয়ে
আমার পরিবার চাইছিল আমার দ্রুত বিয়ে হোক। মা বলল, “রুকাইয়া নামের মেয়ে, খুব সুন্দরী, শান্তশিষ্ট। পাশের গ্রামেই থাকে। এক দিদিমার পালিত মেয়ে।”
মেয়ে দেখতে গিয়ে আমি অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম। তার চেহারা যেন পরির মতো — ফর্সা গায়ের রং, গভীর চোখ, চুপচাপ বসে থাকা। কথা কম, কিন্তু মুখে রহস্যময় এক টান ছিল। আমি আর না করতে পারলাম না।
বিয়ে হয়ে গেল। কিন্তু এখান থেকেই শুরু হয় অস্বাভাবিকতা।
---
২. নতুন বউয়ের অদ্ভুত আচরণ
বিয়ের প্রথম রাতেই আমি খেয়াল করলাম, রুকাইয়ার হাত বরফের মতো ঠান্ডা। সে একদম চুপচাপ বসে থাকে, চোখ একদৃষ্টিতে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি যত কথা বলি, সে শুধু ছোট করে ‘হুম’ অথবা ‘না’ বলে।
তারপর এক রাতে আমি ঘুম ভেঙে দেখি, সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কিছু বলছে। কাছে গিয়ে শুনি,
“আমি ফিরে যাবো... আমি ফিরতেই এসেছি...”
আমি ভয় পেয়ে গেলাম। পরদিন জিজ্ঞেস করলে সে বলে কিছুই মনে নেই।
---
৩. গ্রামের গুজব
গ্রামের লোকজনের মুখে মুখে রুকাইয়ার বিষয়ে কথা ছড়িয়ে পড়ে। কেউ কেউ বলল, মেয়েটাকে নাকি আগে কেউ কোনোদিন দেখেইনি! পাশের গ্রামের সেই দিদিমা, যিনি মেয়েটাকে ‘তুলে এনেছিলেন’, তিনিও এক মাস পরে হঠাৎ নিখোঁজ!
আমার বন্ধুরা জিজ্ঞেস করল, “তোর বউটা রাতে মাঠে যায় কেন?” আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। আমি তো জানতাম, সে ঘরে থাকে।
একদিন রাতে পিছু নিলাম।
---
৪. মৃতের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে!
আমি রাত ২টার দিকে দেখি, রুকাইয়া ধীরে ধীরে বের হচ্ছে। আমি চুপচাপ তার পেছনে হাঁটতে লাগলাম। গ্রামের কবরস্থানের দিকে সে যাচ্ছে। গিয়ে একটা পুরনো কবরের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগল।
সে বলল,
“তুই কথা রাখিসনি হাশেম... তুই তো বলেছিলি, তুই শুধু আমার!”
আমি হতভম্ব! আমি তো হাশেম না! কে হাশেম?
সে হঠাৎ পেছনে ঘুরে আমাকে দেখে ফেলে। তার চোখ লাল, মুখ থমথমে, ঠোঁট কাঁপছে।
সে বলে,
“তুই হাশেম না... তুই মিথ্যা লোক... আমাকে আবার ফিরতে হবে...”
আমি দৌড়ে বাড়ি ফিরি।
---
৫. মৃত রুকাইয়া?
আমি যা দেখেছি, তা নিয়ে গ্রামের হুজুর ও একজন ওস্তাদ কবিরাজের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তারা আমাকে যা বললেন, তা শুনে আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল।
“তোর বউটা মানুষ না। যাকে বিয়ে করেছিস, সে সেই রুকাইয়া না। রুকাইয়া তিন বছর আগে মারা গিয়েছিল। হাশেম নামের এক ছেলের সঙ্গে প্রেম ছিল। ছেলেটা তাকে বিয়ে না করে অন্যত্র বিয়ে করায়, রুকাইয়া আত্মহত্যা করে। কবর দেয় পাশের জঙ্গলে।”
“তারপর থেকে সে ফিরে আসে প্রতিশোধ নিতে। পুরুষের মুখোশে যাকেই দেখে হাশেম মনে করে, তার সাথেই বিয়ে করে, তারপর শেষ করে...”
আমি বিশ্বাস করছিলাম না। কিন্তু এতকিছু ঘটনার পর আর অস্বীকার করতে পারলাম না।
---
৬. সত্যের মুখোমুখি
রাতে আমি রুকাইয়ার সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করি,
“তুমি কে? তুমি রুকাইয়া না, তাই না?”
সে হাসে। ঠাণ্ডা এক হাসি।
“তুই তো নিজেই বেছে নিয়েছিস আমাকে... তুইও পালাতে পারবি না।”
আমি হুজুরদের তাবিজ দিয়ে দরজায় ঝুলিয়ে রাখি। হঠাৎ সে চিৎকার করে ওঠে — তার শরীর কাঁপে, ঘরের বাতি নিভে যায়, দেয়ালের ছবিগুলো পড়ে যায়।
আমি জানি, তার ভেতর একটা আত্মা বাস করে।
---
৭. শেষ রাত
সেই রাতে তার শরীর থেকে ধোঁয়ার মতো কিছু বেরিয়ে আসছিল। সে কেঁদে বলছিল,
“তুই যদি হাশেম না হোস, তবে তুই বাঁচবি না।”
আমি তেলাওয়াত করতে লাগলাম। হুজুররা এসে পানি ছিটাল। ভোরবেলা সে ধীরে ধীরে মাটিতে গলে যেতে থাকল, ঠিক যেন কাদার পুতুল।
সে চলে গেল। কোথায়, জানি না।
---
!
গল্প: দাদার ঘটনা লেখক: ভূতের গল্প লেখক সান
আমার দাদা ছিলেন একজন সরকারি স্কুলের শিক্ষক। খুবই সম্মানী, শিক্ষিত, সোজা-সাপ্টা মানুষ। জীবনের শেষদিকে এসে স্কুল থেকে অবসর নেন। অবসরের পরে প্রথম কয়েক মাস স্বাভাবিকই ছিলেন, কিন্তু ধীরে ধীরে তার আচরণ পাল্টাতে শুরু করে। তিনি মাঝেমাঝে এমন সব কথা বলতেন, যা আমাদের পরিবারের কারো কাছেই স্বাভাবিক মনে হতো না।
প্রথম ঘটনা ঘটে এক বিকেলে। আমার চাচী রান্নাঘরে ছিল। দাদা উঠানে বসে রোদ পোহাচ্ছিল। চাচী দাদাকে বলেছিল, “খাবার বানাইতেছি, একটু পরেই আসতেছি।” কিন্তু যখন খাবার নিয়ে আসলো, তখন দাদাকে উঠানে খুঁজে পেলো না। প্রথমে ভাবলো, হয়তো ঘরে গেছেন। কিন্তু ঘরেও নেই, গোয়ালঘর, পুকুরপাড়, আশেপাশে সব জায়গায় খুঁজেও দাদার হদিস মিললো না।
প্রায় আধা ঘণ্টা খোঁজার পর, এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ে চাচীর। বাড়ির পেছনের ধানখেতের দিকে দাদা হেঁটে যাচ্ছেন— একদম মন্ত্রমুগ্ধের মত, পা টানতে টানতে। চাচী চিৎকার করে ডাকতে থাকলেও দাদা থামেন না। শেষমেশ দৌড়ে সামনে গিয়ে চাচী দাদাকে জাপটে ধরে জিজ্ঞেস করলো, “আপনি এইখানে আসছেন ক্যামনে?”
দাদা তখন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলে, “আমি তো উঠানে আছিলাম, হঠাৎ কে যেন ডাইছে... তারপর কিছুই মনে নাই।”
চাচী কাঁপা কণ্ঠে দাদাকে বাড়ি নিয়ে আসে। দাদী, যিনি কিছু ঝাড়ফুঁকের কাজ জানতেন, তখন দাদার গায়ে পানি পড়া দিয়েছিলেন। কিন্তু এটা ছিল শুরু মাত্র।
পরের কয়েক মাসে এমন অনেক ঘটনা ঘটতে লাগলো। দাদাকে প্রায়ই বাড়ির বাইরে খুঁজে পাওয়া যেত, কখনও ধানখেতের মাঝখানে, কখনও জঙ্গল ঘেঁষা পুকুরপাড়ে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো— তিনি নিজে জানতেন না, কীভাবে সেখানে গেলেন।
প্রতিবার একই কথা বলতেন, “কেউ ডাইছিল… ও বলছিল, তাড়াতাড়ি আসো।”
এরপর হঠাৎ একদিন দাদা উঠানের মেঝেতে পা পিছলে পড়ে যান। সেই দিন থেকেই তার দেহের ডান পাশ অবশ হয়ে যায়— ডাক্তার বলেন স্ট্রোক। দাদা তখন পুরোপুরি প্যারালাইজড। একা একা চলাফেরা তো দূরের কথা, নড়াচড়াই করতে পারতেন না।
চাচী ও দাদী মিলে খুব যত্ন করতেন দাদাকে। খাইয়ে দিতেন, পরিস্কার করতেন, এক মুহূর্তের জন্যও ছেড়ে যেতেন না।
ঘটনাটা ঘটে এক রাত ১২টার দিকে। সবাই খেয়ে দেয়ে ঘুমাতে গেছেন। দাদী, যথারীতি দাদাকে ঘুম পাড়িয়ে দরজা লাগিয়ে রেখে খাবার খেতে গিয়েছিলেন। খাবার শেষে সবাই নিজেদের রুমে চলে যায়।
কিছুক্ষণ পর দাদী যখন দাদার ঘরে গেলেন, দেখেন দরজাটা হাট করে খোলা।
ভেতরে গিয়ে দেখে দাদা নেই।
দাদী হতবাক! যে মানুষটা এক বিন্দুও নড়তে পারে না, সে গেল কোথায়? দাদীর বুঝতে বাকি রইলো না দাদার সাথে আজকে খারাপ কিছু হবেই। কারণ যে মানুষ আরেকজনের সাহায্য ছাড়া এক দন্ড ও নড়তে পারে না। টয়লেট পর্যন্ত যেতে পারে না সেই মানুষ কি না বিছানা ছেড়ে যাবে? চিৎকার চেঁচামেচি তে পুরো বাড়ি তোলপাড় হয়ে গেলো। গ্রামের সবাই মিলে আমার দাদাকে খুজতে লাগল। আমার চাচী সেই ধানের মাঠের দিকে গেলো। কিন্তু পেলো না। দাদী বাড়ি আর মাঠ এর মাঝখানে আমদের পুকুর। তো চাচী যখন খুজতে খুজতে পুকুরের দিকে এলো। টর্চ টা যেই পুকুর পাড়ে ধরলো চাচীর ভয়ে অজ্ঞান হবার মত অবস্থা..
দ্রষ্টব্য: গল্পের লেখায় ছোটখাটো ভুল থাকলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। যদি সম্ভব হয়, মেসেজের মাধ্যমে জানাবেন। সবশেষে কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না, আজকের গল্পটি আপনার কেমন লেগেছে।
Note: This AI-generated image portrays a fictional scenario designed for creative and storytelling purposes. It may include elements that could be unsettling to some viewers. Please exercise discretion when viewing. The content aims to delve into themes of suspense and mystery and does not endorse or encourage any form of violence.
#fyp #viral #highlights #photochallenge #Amazing #trending #ভূতেরগল্প
সোমবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৪
বর্ষার রাতে
Writing By জাহের ওয়াসিম
নানাবাড়িতে যাচ্ছিলাম ঢাকা থেকে। প্রায় পাঁচ-ছয় বছর পর যাচ্ছি। মা-বাবা ব্যস্ত, তাই ইউনিভার্সিটি থেকে ছুটি পেয়ে আমি একাই পথ দিলাম। সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য নানাবাড়িতে ফোন না করেই বের হলাম। রাত এগারোটায় স্টেশনে নামলাম। অজপাড়াগাঁয়ের স্টেশন। একটা কাকপক্ষীও নেই। দূরে শুধু একটা অচেনা পাখির চিঁ চিঁ ডাক শুনে হকচকিত হয়ে উঠলাম। আরও আগে নামার কথা। কিন্তু পথে ট্রেনের যান্ত্রিক সমস্যা হওয়ায় দুই ঘণ্টা দেরি হয়ে গেল। স্টেশন থেকে নানার বাড়ি মাইল পাঁচেকের পথ। রিকশায় যেতে হয়। কিন্তু এত রাতে গ্রামের রিকশাওয়ালাদের এক ঘুম হয়ে গেছে। এই স্টেশনে আমার সাথে আর একটা লোক নেমেছে। সাদা পাঞ্জাবি পরা। মাথায় লম্বা টুপি। একা একা যেতে ভয় লাগছে। ভাবলাম, লোকটার সাথে গিয়ে পরিচিত হই। আমি বললাম, ‘স্লামালাইকুম। চাচা, আমার নাম শুভ। হাবিবুল্যা চেয়ারম্যানের নাতি। ঢাকা থেকে এসেছি আমি।’ লোকটা কিছু বলল না। অদ্ভুতভাবে চেয়ে থাকল। আমি বললাম, ‘চাচা, আপনি কোন দিকে যাবেন। চলুন এক সাথে যাই।’ লোকটা হাত ইশারা করে উত্তর দিকের রাস্তাটা দেখাল। আমি যাব পশ্চিম পাশের রাস্তাটা দিয়ে। লোকটা মনে হয় বোবা কিংবা তার কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না। বোবা হওয়ার সম্ভাবনা কম। বোবারা সাধারণত কানে শোনে না। ইনি শোনে। যা-ই হোক, আমি হতাশ হয়ে একা একাই হাঁটা ধরলাম। অমাবস্যার রাত। অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না। আমি প্রচণ্ড ভীতু। রাতে গ্রামের রাস্তায় একা একা হাঁটা আমার কাছে পুলসিরাত পার হওয়ার চেয়েও দুঃসাধ্য। গা ছমছম করে ভয়ের একটা শীতল অনুভূতি বয়ে গেল আমার ভেতর দিয়ে। এত দূর হেঁটে হেঁটে যাব কী করে? ভেবে ঘেমে গেলাম। ভাবলাম, নানাবাড়িতে ফোন করি, যেন কেউ এসে আমাকে নিয়ে যায়। মোবাইলটা বের করে দেখি নেটওয়ার্ক নেই। অগত্যা মোবাইলের টর্চ জ্বেলে আয়াতুল কুরসি পড়ে বুকে তিনবার ফুঁ দিয়ে হাঁটা ধরলাম। কিছুক্ষণ হাঁটার পর মনে হলো, আমার পেছন পেছন কেউ একজন আসছে। এটা একটা চিরাচরিত সমস্যা। সব রহস্য গল্পেই এই লাইনটা থাকে। পিছে পিছে কেউ একজন আসে। এমনকি রহস্য পত্রিকার অনেক রহস্যগল্পতেই এই লাইনটা পড়েছি আর হেসে খুন হয়েছি। মনে মনে ভেবেছি, লেখকেরা বুঝি আর কোনো লাইন পান না। কিন্তু বাস্তবেও যে এ রকম অভিজ্ঞতা হতে পারে, তা আজ বুঝলাম। ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে এল। এসব ক্ষেত্রে নিয়ম হচ্ছে, পিছু ফিরে তাকানো যাবে না। পেছনে ভূত থাক আর পেত্নি থাক, কোনো আগ্রহ দেখানো যাবে না। সোজা হেঁটে চলে যেতে হবে। কিন্তু আমার যে এখন ঝেড়ে একটা দৌড় দিতে ইচ্ছে হচ্ছে। কী করব বুঝতেছি না। একবার মনে হলো, সাদা পাঞ্জাবি পরা লোকটা নাকি। হয়তো আমাকে ভীতু ভেবে ভয় দেখাচ্ছে। পেছনের লোকটার হাঁটার আওয়াজ বেড়েছে। আমি আর থাকতে না পেরে পিছু ফিরে তাকালাম। দেখি, কেউ নেই। কিন্তু আওয়াজটা অবিকল আছে। মনে হচ্ছে, ধপধপ করে পা ফেলে কেউ এগিয়ে আসছে। হঠাত্ করে হালকা মিষ্টি একটা গন্ধ এসে লাগল আমার নাকে। মিষ্টি জর্দা দিয়ে পান খাওয়ার গন্ধ। আমার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। মনে হলো, ঘুরে পড়ে যাব। আমার ভয় এখন চরম অবস্থায়। বুকের মধ্যে যেন ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেছে। হূিপণ্ডটা হাপরের মতো ওঠা-নামা করছে। আমি উল্টা দিকে ফিরে একটা দৌড় দিলাম। মনে মনে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিতে লাগলাম। বারবার নিজেকে গালি দিচ্ছি কেন যে ফোন করে এলাম না। পেছনের অদৃশ্য মানবটার দৌড়ের আওয়াজ স্পষ্ট কানে আসছে। ধীরে ধীরে তা কাছে চলে আসছে। এভাবে আমি মাইলখানেক চলে এসেছি। আরও বেশিও হতে পারে। আমার কোনো হুঁশ নেই। প্রাণপণ দৌড়াচ্ছি। কোনোমতেই ধরা পড়া যাবে না। এটা আমার জীবন-মরণ খেলা। তবে কাঁধের ব্যাগটা নিয়ে বেশিক্ষণ দৌড়াতে পারলাম না। ক্লান্ত-অবসন্ন হয়ে উঠল শরীর। নুয়ে পড়ছি আমি। এ যাত্রায় আমি মনে হয় শেষ। মৃত্যুভয় আমাকে গ্রাস করে নিল। আমি যেন অচেতন হয়ে যাচ্ছি। চলে যাচ্ছি জীবনের শেষ প্রান্তে, মৃত্যুর শিয়রে। মিষ্টি গন্ধটা নাকের কাছে চলে এসেছে। কলিজাটা মোচড় দিয়ে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য মা-বাবার ছবিটা ভেসে উঠল মনের আয়নায়। ইউনিভার্সিটির শায়লার কথা মনে হলো। মনে মনে বললাম, বিদায় শায়লা। আর তোমার পিছে পিছে ঘুরে বিরক্ত করব না। বিদায়! আমার ঘাড়ে স্পষ্ট ছোঁয়া অনুভব করলাম—ঠান্ডা-শীতল কিছু একটার।
ঘাড়ে হাত দিয়ে দেখি পানি। বৃষ্টি নামছে। কিছুটা প্রাণ ফিরে পেলাম। ভিজে যাচ্ছি আমি। পাশে একটা বাড়ি থেকে নারী কণ্ঠের খিলখিল আওয়াজ শুনলাম। অত-শত না ভেবে দৌড়ে রাস্তার পাশের অন্য একটা বাড়িতে আশ্রয় নিতে ছুটলাম। দূর থেকে বাড়ির ভেতরে আলো জ্বলতে দেখলাম। অনেক্ষণ ধরে নক করলাম দরজায়। কেউ দরজা খুলল না। এত রাতে কেউ খোলার কথাও নয়। গ্রামের বাড়ি। সবারই চোর-ডাকাতের ভয়। হতাশ হয়ে বাড়ির দরজায় বসে পড়লাম। ঘর থেকে একটু দূরে একটা কবর দেখতে পেলাম। উত্তেজনায় আমার সব ভয় মুহূর্তে উবে গেছে। অন্য সময় হলে কবর দেখেই অজ্ঞান হয়ে যেতাম। কবরকে খুব ভয় পাই আমি। হঠাত্ করে দরজাটা খুলে গেল। আমি উঠে দাঁড়ালাম। দেখি এক বৃদ্ধ মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন অন্ধকারে। পরনে সাদা শাড়ি বলে মনে হলো। আমি সালাম দিয়ে আমার নানার বাড়ির নাম বললাম। বৃদ্ধা বললেন, ‘ও চিনেছি। তুমি হাবিবুল্যা চেয়ারম্যানের নাতি।’ আমার নানাকে সবাই চেনে। বিখ্যাত লোক এলাকার। বললাম, ‘আমি ঢাকা থেকে আসছি। ভিজে যাচ্ছি বলে একটু আশ্রয় নিয়েছি। বৃষ্টি থামলেই চলে যাব।’ বৃদ্ধা আমাকে ভেতরে নিয়ে বসালেন। তারপর গামছা এনে দিলেন মাথার পানি মোছার জন্য। আমি বললাম, ‘দাদি ঘর অন্ধকার কেন? হারিকেন নাই?’ বৃদ্ধা বললেন, ‘আছে বাবা। দাঁড়াও দিচ্ছি। কিছুক্ষণ আগে নিভিয়েছি। আমরা শুয়ে পড়েছিলাম। তুমি বসো, আমি হারিকেন পাঠাচ্ছি। তুমি আসাতে ভালোই হলো। নামাজ না পড়েই শুয়ে গেছিলাম। নামাজটা পড়ে নিই।’ এ কথা বলে ভেতরে চলে গেলেন বৃদ্ধা। কিন্তু বৃদ্ধা আমাকে বাবা বাবা করছে কেন, আমি তো উনাকে দাদি বললাম। উনার কি ছেলে-টেলে নেই? যাক বাদ দিলাম। কিছুক্ষণ পর হারিকেন আর খাবার নিয়ে এল এক অপরূপা সুন্দরী। হালকা আলোয় অসাধারণ লাগছে ওকে। জীবনে এত রূপবতী মেয়ে দেখিনি। ঢিলেঢালা জামা পরেছে মেয়েটি। এর পরও তার প্রস্ফুটিত যৌবন ঠেলে বের হয়ে আসতে চাইছে। ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে আছে যেন। আমি লাজ-লজ্জা ফেলে সেদিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম। আমার জায়গায় আমার বন্ধু রবিন থাকলে সে এতক্ষণে মেয়েটির বুকের মাপ বলে দিতে পারত। মেয়েটি হেসে বলল, ‘আমি আনুশকা। উনি আমার দাদি। নামাজ পড়ছেন তো তাই আমি খাবার নিয়ে এলাম। আপনি ঢাকা থেকে আসছেন। নিশ্চয়ই না খেয়ে আছেন। আপনি নিঃসংকোচে খেয়ে নিন। আপনার নানাদের আমি চিনি। অনেক দূরে আপনার নানার বাড়ি। আমি এখানে স্থানীয় কলেজে পড়ি। আমার মা নেই। যেই কবরটা দেখে ভয় পেয়েছেন, ওটা আমার মায়ের। আমার জন্মের সময় মারা যান। বাবা ঢাকায় ছোট একটা চাকরি করেন। নইলে আমাদের নিয়ে যেতেন ওখানে। আমি শুধু বকবক করে যাচ্ছি, আপনি খান।’ আমি ইতস্তত করে বললাম, ‘না না, কী যে বলেন। আপনার কথা শুনতে অনেক ভালো লাগছে। আপনি বলুন।’ ভেতরে ভেতরে আমি অবাক হয়ে গেলাম মেয়েটা হড়বড় করে এত কথা বলছে কেন? তা ছাড়া আমি ভয় পেয়েছি, তা ও বুঝল কীভাবে। ভাবলাম, চালাক মেয়ে। মুখ দেখে সব বুঝে নেয়। গ্রামে সাধারণত এত মিশুক মেয়ে দেখা যায় না। ও মেয়েটা কোন কালারের জামা পরেছে, বলা হয়নি। আকাশি নীল। অদ্ভুত লাগছে। মনে হচ্ছে, স্বর্গ থেকে নেমে এসেছে। মেয়েটাকে আমার খুব ভালো লেগে গেল। খাবার পর আমি জানালার পাশে গিয়ে দাঁঁড়ালাম। দেখি, তুমুল বৃষ্টি বাইরে। থামার কোনো লক্ষণ নেই। মেয়েটা আমার পাশে এসে দাঁড়াল। বলল, ‘আল্লা! কী সুন্দর বৃষ্টি। উফ্ আমার-না ভিজতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু ভিজলেই ঠান্ডা লেগে যাবে। তা ছাড়া দাদিও বকবে।’ আমি মনে মনে ভাবলাম, মেয়েটা অনেক সহজ-সরল। মনের কথা গোপন রাখে না। এ রকম সরল মেয়ে আমি আগে দেখিনি। অপরিচিত মানুষের সাথে এমন ফ্রি-ভাবে কথা বলছে, যেন অনেক দিনের চেনা-জানা। বৃদ্ধা এসে বললেন, ‘বাবা বৃষ্টি মনে হয় আজ আর থামবে না। তুমি ওই পাশের রুমটাতে গিয়ে শুয়ে পড়ো। ওটা আমার ছেলের রুম। ও ঢাকা থেকে আসলে থাকে।’ আমি বললাম, ‘না না, আমি এক্ষুণি চলে যাব। বৃষ্টি কমে যাবে।’ বৃদ্ধা বললেন, ‘এখন যাবে কীভাবে? সকালে চলে যেও। বৃষ্টি কমবে না। আষাঢ়ের বৃষ্টি এত সহজে কমে না। যাও, শুয়ে পড়ো বাবা।’ আমি ওপরে-ওপরে না না করলেও ভেতরে ভেতরে থাকার জন্য রাজি। কারণ এই সহজ-সরল মেয়েটাকে আমার খুব পছন্দ হয়ে গেছে। তা ছাড়া সারা রাত বৃষ্টি হবে। হয়তো মেয়েটার সাথে ভেজার একটা চান্স পেয়ে যেতে পারি।
অন্ধকার একটি ঘরে আমাকে ঘুমাতে দেওয়া হলো। সামান্য ভয় পেলাম। বিছানায় শুতে যাব। দেখি, আমার বিছানায় কে যেন ঘুমিয়ে আছে। ভয়ে আমার গা শিউরে উঠল। ভয়ে ভয়ে হাত দিয়ে দেখি একটা কোলবালিশ। পাশের ঘর থেকে আনুশকার খিলখিল হাসি শোনা গেল। নিজের বোকামিতে লজ্জা পেয়ে শুয়ে পড়লাম।
রাত মনে হয় তিনটার মতো বাজে। শুয়ে আছি কিন্তু ঘুম আসছে না। এখানে আসার পর ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিয়ে ভাবতে লাগলাম। সকালে নানাবাড়ি গেলে তারা অনেক কথা জানতে চাইবে। তা ছাড়া গ্রামের একটা বাড়িতে এভাবে অপরিচিত একটা ছেলেকে থাকতে দেওয়াও অস্বাভাবিক। যাই হোক, নিজের এ রকম নেগেটিভ ধারণার জন্য নিজেকে বকা দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। আচমকা আমার গায়ের ওপর একটা শীতল হাতের ছোঁয়া পেয়ে আঁতকে উঠলাম ভয়ে। বুক ধুকধুক করে উঠল। দেখি, আনুশকা। আমার কানের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘ভয় পেয়েছেন? চেঁচাবেন না। দাদি জেগে যাবে। চলেন বৃষ্টিতে ভিজি।’ আমি অবাক হওয়ার ভান করে বললাম, ‘এত রাতে?’ কিন্তু মনে মনে যা ভাবছিলাম, তা ঘটে যাওয়ায় খুশি হয়ে গেলাম। ভয়ে ভয়ে থাকলাম, ও আবার চলে যায় নাকি। ও বলল, ‘ভিজার আবার দিন-রাত কী? আর রাতে ভিজতেই তো মজা।’ আমি বললাম, ‘তুমি কি প্রায় রাতেই ভিজো নাকি?’ ও বলল, ‘আরে না। একবার ভিজে অনেক ঠান্ডা লেগেছিল। আচ্ছা চলেন যাই।’
চুপিচুপি বাইরে এসে দেখি ব্যাপক বৃষ্টি। আনুশকা খুশি হয়ে গেল। আমাকে বলল, ‘আমার হাত ধরুন। প্লিজ সংকোচ করবেন না। আপনাকে আমার অনেক ভালো লেগেছে।’ আমার মনের কথাই ও বলে ফেলল। আমরা হাত ধরে ভিজতে লাগলাম। ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। দূরে একটা-দুইটা বাজও পড়ছে। বৃষ্টির তোড়ে আনুশকার ভেজা চুল আমার মুখে এসে বাড়ি খাচ্ছে। আর আমার সারা শরীরে যেন বিদ্যুত্ বয়ে যাচ্ছে। আনুশকার পাতলা জামা ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে গেছে। ওর শরীরের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আকৃতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ওর স্তনের বোটা দুটো দেখা যাচ্ছে পরিষ্কার। ইচ্ছা করল ছুঁয়ে দিই একবার। আমি বললাম, ‘আনুশকা তোমাকেও আমার অনেক ভালো লেগেছে। আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি।’ এ কথা বলে আমি ওকে জড়িয়ে ধরলাম। সাথে সাথে ও ছাড়িয়ে নিল। আমি লজ্জা পেয়ে সরি বললাম। একটু পর বৃষ্টি থেমে গেল। আনুশকা বলল, ‘তুমি এখন চলে যাও। হালকা অন্ধকার, ভয় পাবে না তো?’ আমি বললাম, ‘না না, ভয় পাব না।’ ও বলল, ‘চলে যেতে বলায় অবাক হয়েছ? এখন না গেলে সকালে গ্রামের মানুষ দেখলে খারাপ কথা রটাবে।’ আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, আমি তাহলে যাই। তুমি দাদিকে বুঝিয়ে বোলো। আর আমি আবার আসব।’ ও বলল, ‘রাতে এস। দিনে এস না। তাহলে কেউ দেখবে না।’ ওর প্রস্তাবটা ভালো লাগল। আমি বললাম, ‘আচ্ছা ঠিক আছে আমি যাই তাহলে।’
ভোরের দিকে নানাবাড়ি পৌঁছালাম। হালকা অন্ধকার তখনো। এত ভোরে আমাকে দেখে সবাই অবাক হলো। আমি আনুশকাদের বাড়ির ব্যাপারটা পুরো চেপে গেলাম। বললাম, ‘নানা, রাতের গাড়িতে এসেছি। তাই ভোরে পৌঁছুলাম।’ আমার মামাতো বোন রিয়া আমাকে দেখে খুব খুশি হলো। সামান্য সন্দেহের চোখে তাকাল মনে হচ্ছে। নাকি আমার মনের ভুল, কে জানে? চোরের মনে পুলিশ পুলিশ। ও মনে হয় আমাকে একটু-আধটু পছন্দ করে কিন্তু মুখ ফুটে বলেনি কখনো।
নানার বাড়িতে ভালোই দিন কাটছিল আমার। প্রতিদিন রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে আমি তখন চুপি চুপি বের হই। একটুও ডর-ভয় লাগে না। সেদিনের পর থেকে আমার সব ভয় মন থেকে উবে গেছে। এখন মনে শুধু আনুশকার ছবি। মামাতো ভাইয়ের একটা সাইকেল আছে, সেটা নিয়ে চলে যাই আনুশকাদের বাড়ি। চুপি চুপি আনুশকাকে ডেকে গল্প করি দুজনে। গভীর সখ্য হয়ে গেল আমাদের। আমার শারীরিক ভালোবাসা পেতে ইচ্ছে হলো। কিন্তু আনুশকা বলল, ‘না’। আমি কথা বাড়াইনি। শুধু ওকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়েছি। একবার ওর বুকে হাত দিতে চেয়েছি। ও সরিয়ে দিল। আমি প্রথমে কষ্ট পেলেও পরে ভাবলাম, ভালো মেয়ে বলেই রাজি হয়নি। তা ছাড়া বিয়ের পর তো ও আমারি হবে। আমরা এত কিছু করি, অথচ ওর দাদি কিছু টেরই পায় না। উনি বেঘোরে ঘুমায়।
অনেক দিন হলো এখানে আছি। আমার ঢাকায় ফেরার সময় হয়ে যাচ্ছে। আনুশকাকে বললাম, ‘আমি তোমাকে বিয়ে করে ঢাকায় নিয়ে যেতে চাই। আমি নানা-নানিকে পাঠাব বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে।’ আনুশকা চুপ করে রইল। আমার মন খারাপ হয়ে গেল। পরের দিন রাতেও সবাই ঘুমানোর পর আমি বেরুচ্ছিলাম। হঠাত্ কে যেন পেছন থেকে আমার শার্টের হাতা টেনে ধরেছে। দেখি রিয়া। ও আমাকে একদিকে টেনে নিয়ে বলল, ‘ভাইয়া রোজ রাতে তুমি কোথায় যাও? আমাকে বলো তো! আমি প্রতিদিনই দেখি, কিন্তু কিছু বলি না। আজ আর থাকতে পারলাম না। তুমি আমাকে সব খুলে বলো। কারণ তুমি হয়তো জানো না, তোমাকে আমি অনেক ভালোবাসি।’ আমি রিয়াকে প্রথম থেকে সব খুলে বললাম। বললাম, ‘তুই নানা-নানিকে বলে ব্যবস্থা করে দে।’ আমার সব কথা শুনে রিয়া থ মেরে গেল। এরপর ও আমাকে যা বলল, তা শুনে আমার মাথা ঘুরে গেল। ওর ভাষ্যমতে, সেদিন রাতে নাকি কোনো বৃষ্টিই হয়নি। আমি আতঙ্কিত হয়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম এবং পরের দিন বিকেলে ঘুম ভাঙল। ঘুম থেকে উঠে আমি সোজা আনুশকাদের বাড়িতে গেলাম। গিয়ে দেখলাম, ওই বাড়িতে যে ঘরটায় আমি রাতে এসেছি, সেই জায়গায় দুুটি কবর। দূরে আর একটা কবর, যার কথা আনুশকা আমাকে বলেছিল, ওর মায়ের। ঘর-টর কিচ্ছুর কোনো অস্তিত্ব নেই। পুরো বাড়ি খাঁ খাঁ করছে। দূরে একটা পাখি ডেকে উঠল। আমি মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম। পরে সম্ভবত আশপাশের লোকজন আমাকে নানাবাড়িতে পৌঁছে দেয়। আমার জ্ঞান ফিরে প্রায় তিন দিন পর। দীর্ঘদিন আমি মানসিক হাসপাতালে কাটিয়ে এখন সামান্য সুস্থ। তাও অন্ধকার দেখলে প্রচণ্ড ভয়ে চিল্লায়ে উঠি। ডাক্তার বলেছে, আমাকে একা রাখা যাবে না। সব সময় পাশে কেউ একজন থাকতে হবে।
রিয়ার কাছে আনুশকার যেই গল্প শুনেছি তা হলো, ‘ওই বাড়িতে আনুশকা নামের একটা মেয়ে থাকত, যে আরও পাঁচ বছর আগে মারা যায়। কোনো এক বৃষ্টির রাতে মেয়েটি তার প্রেমিকের সাথে ভেজে সারা রাত ধরে। তারপর প্রচণ্ড ঠান্ডা লেগে টাইফয়েড হয়ে মেয়েটি তিন দিনের মাথায় মারা যায়। আর ছেলেটি পাগল হয়ে যায়। মেয়েটির বাবা ঢাকায় থাকতেন। একমাত্র সন্তানের শোকে তিনি এখন আর বাড়িতে আসেন না। বৃদ্ধ হয়ে গেছেন এ ক’বছরেই। পাগলের মতো এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়ায়। বাড়িতে আনুশকার দাদি ছিলেন। আদরের নাতনির মৃত্যুশোকে পড়ে বৃদ্ধাও দুই মাসের মাথায় মারা যান। আনুশকার পাশেই তাকে কবর দেওয়া হয়। এর পর থেকে ওই বাড়িতে কেউ আর যায় না ভয়ে। অনেকেই নাকি আনুশকাকে বৃষ্টিতে ভিজতে দেখেছে রাতের বেলায়। লোকজন ভয়ে রাতে তো দূরের কথা, দিনেও ওই বাড়ির পাশ দিয়ে যায় না।’
বৃহস্পতিবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৮
>Horror story
>Horror story
তখন আমার বয়স প্রায় ১৮আমি
ছোটকাল হতেই বেশ ফুরতিবাজ
ছিলাম, বাড়ির ছোট ছেলে হউয়ায়
আমার কোন কাজেই কোনদিন কেও
বাধা দেয়নিআমার একটি ঘোড়া
ছিল , তার নাম মানিকআমি
মানিক কে নিয়ে দূরদুরান্ত ঘুরে
বেড়াতাম আর গান -বাজনা এবং
যাত্রার প্রতি ছিল আমার দুর্নিবার
আকর্ষণ
একদিন কগবর পেলাম দেওয়ানগঞ্জে
যাত্রা দল এসেছে , আমি সকাল
সকাল বেরিয়ে পড়লামবিকালের
পর আমি যেয়ে পৌঁছাইসন্ধার পর
জাত্রার আশর বসে , শেষ হয় অনেক
রাতেআমি যাত্রা শেষে মানিক
কে নিয়ে আবার বকশিগঞ্জ পুবের
পাড়ার উদ্দেশে রউনা দেইআমি
যখন পল্লাকান্দি তখন রাত
আনুমানিক ১০ টা বা তার
আশেপাশেতখন নিঝুম রাত , পুরো
এলাকা নিস্তব্ধ নীরবশুধু মাঝে
মাঝে ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজ আর
রাতের আকাশের নাম না জানা
পাখির আর্তনাদকখনও কানে আসে
হুতুম পেঁচার ডাকপরিবেশটা
মোটেও সুখকর নয় , তবে আমি ছিলাম
শিক্ষিত এক সাহসী জুবক , গ্রাম্য
কুসংস্কার কখনই মনে দানা বাধতে
দিতাম না, তাই নদীর পাড় ধরে
এগিয়ে গেলাম নৌকার সন্ধানে
ঘাঁটের শেষ মাথায় একটি নৌকা
পেলাম, নৌকায় মানিককে নিয়ে
উঠলামআমার সাথে নৌকায়
আরোহী মাত্র একজন , আর নৌকার
মাঝিআমি , মানিক , সাথের
জাত্রি আর মাঝি ছাড়া মনে হয়
আশেপাশের এলাকায় আর জীবিত
কোন প্রাণী নেইহটাত মাঝি
বলে উঠে , ভাইজান আপনাকে
দেখে তো মনে হয় বড় ঘরের ছেলে ,
তবে এত রাতে এখানে কি করেন ,
কই যাবেন ? আমি তাকে সব খুলে
বলি আর তার জবাব , এত রাতে
যেয়েন নাবিপদ হবে
আমি হেসে ফেলি , আর বলি , কোন
ডাকাতের সাহসে কুলাবেনা
আমার নাম শোনার পর আর আমাকে
আটকাবে
তখন আমার সাথের আরোহী বলে
উঠলো , ভাই ডাকাততো মানুষ ,
আমরা যে বিপদের কথা বলছি তা
ঠিক মানুষ না
আমি হেসে বললাম যে এসব আমি
বিশ্বাস করিনাতখন তারা বলল,
ভাই তাও যেয়েন না , আমাদের
বাড়ি কাছেই , রাতটি কাটান আর
সকালে যেয়েন , পথে জন্তু -
জানোয়ার তো থাকতে পারে
আমি বললাম , আমার যেতেই হবে
এরপরও তারা সাবধান করে দিলো
আর বলে দিলো সারমারা বাজার
থেকে বামের রাস্তায় উঠতে ,
ডানে না যেতে কারন ওই রাস্তা
জঙ্গল এলাকার ভিতরকথাটা
আমারও মনে ধরলোআমি নৌকা
থেকে নেমে আবার রউনা দিলাম
রাত আনুমানিক ১টাতখন আমি
সারমারা বাজারে, পুরো এলাকা
নিস্তব্ধ বিরান ভুমির মত দেখাচ্ছে
কোথাও বিন্দু মাত্র জীবনের চিহ্ন
নেই , পোকামাকড় কিংবা
পাখিরও শব্দ নেই , যেন সমস্ত
এলাকাটাই মারা গেছেআমার
তখন খুব খারাপ অবস্থা, মানিকেরও
পানি দরকারআমি খেয়াল করলাম
ওই ডান পাশের রাস্তাতেই বেশ
দূরে একটা বাড়ি দেখা যাচ্ছে
যার আঙ্গিনায় আগুন জলছেআমি
আশা নিয়ে ওদিকে গেলামকিন্তু
মানিক আমার সাথে এগোতে চায়
নাএমন তো হউয়ার কথা না,
মানিক কখনও এমন করেনা , ছোট
একটা বাচ্চা অবস্থা থেকে ওকে বড়
করেছি, কখনও আমার অবাধ্য হয়না , তবু
আমি ওকে রাস্তায় রেখেই হাঁটা
দিলামবাড়ির আঙিনায় এসে
দেখি এক অগ্নি কুণ্ড জলছে , যেন
কেও আগুন তাপানোর জন্য খরে আগুন
দিয়েছেএক মহিলাকে দেখলাম ,
সেই আগুনের আলোয় মাটিতে বসে
হাড়ি পাতিল মাজছেনিল শাড়ি
পড়া, দেখেই বোঝা যায় নতুন বউ
কারন তার মাথায় ঘোমটা দেয়া
একটু অবাক লাগলো কারন এত রাতে
কেও উঠানে আগুনের আলোয়
হাড়ি- পাতিল মাজে না আর
বাড়িতে অন্য কোন লকেরও
আনাগোনা দেখছিনা
আমি একটু কাছে যেয়ে বললাম
“ খালাগো আমাকে একটু পানি
দিবেন , আমার আর আমার ঘোড়ার
জন্য”
সে পাতিল মাজা বন্ধ করে দিলো ,
আর চুপ হয়ে থাকলো , আমি আবার
কাছে যেয়ে বললাম , ও খালা
শুনেন না?
তখন সে ধীরে ধীরে আমার দিকে
চাইলো……
আমি যা দেখলাম , তা …
ঘোমটার ভিতর কালো ঘুটঘুটে
অন্ধকার , শুধু দুটো রক্ত লাল চোখ আর
মুখের গহব্বর থেকে এক হাত লম্বা
জিভ ঝুলছেসেই জিভ নড়েচড়ে
উঠলো আর বের হয়ে এলো এক আঙ্গুল
সমান লম্বা দুইটা শ্বদন্ত
আমার দিন দুনিয়া আধার হয়ে এলো ,
কিন্তু টোলে পড়ার আগে শেষ
মুহূর্তে মনে হোল , বাঁচতে চাইলে
পালাতে হবেআমি ঘুরে দৌর
দিলাম রাস্তার দিকে , আর পিছন
থেকে শুনতে পেলাম এক জান্তব
আর্তনাদ মিস্রিত চিৎকার
মানিকের কাছে পৌঁছে ওকে
সামনের দিকে টান দিলাম ,
কিছুটা রাস্তা পাড় হউয়ার পর
দেখি মানিক থেমে গেলো
চারজন মানুষ আসতে দেখলাম একটু
মৌলানা গোছেরতারা কাছে
এসে আমাকে দেখে বলল ভাই
আপনি সরকার সাহেবের ছেলে
না ?
এই অন্ধকারে কিভাবে চিনলো
আমাকে, তা ঠিক বুঝলাম না কিন্তু
বললাম , হ্যাঁ
তাদের সব খুলে বললাম আর তারা
আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলো
একটা দেয়াল ঘেরা বাগান টাইপ
এলাকার কাছে এনে আমাকে বলল
আপনি এই গেট দিয়ে ভিতরে যান,
ওই গাছের নিচে বসে বিস্রাম
নেনভয় পাবেননা , এখানে আপনি
নিরাপদআর আমরা আপনার থাকার
বেবস্থা করে আসছি , আমরা ছাড়া
অন্য কেও এসে যদি আপনাকে
ডাকে, তবে বের হবেন না
এটা বলে তারা চলে গেলো আর
আমি ওই গাছের নিচে যেয়ে বসে
পড়লামকখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম
বলতে পারবোনাঘুম ভাঙলো
ফজরের আজান শুনে , তখন ভোরের
হালকা আলো ফুটেছে , আমি
দেখলাম কাছেই মসজিদের ছাদে
মুয়াজ্জিন আজান দিচ্ছে আর
সেখান থেকে হতবাক নয়নে
আমাকে দেখছে মানিককে
দেখলাম দিব্বি ঘুরে বেড়াচ্ছে
আমি আগের রাতের ঘটনা মনে
করছি আর কিছুক্ষণ পর দেখি ওই
মুয়াজ্জিন আমার কাছে এসে
পড়লো
আমাকে জিগ্যেস করলো আমি কে,
এখানে কি করছিসব তাকে বললাম
শুনে সে গম্ভির হয়ে গেলো আর বলল
যে “ প্রথমে যার পাল্লায়
পড়েছিলেন সে প্রচণ্ড খারাপ এক
জিনিস, অন্ধকার জগতের বাসিন্দা
সেআপনি অল্পের জন্য যানে
বেঁচে গেছেনওই উজানতলী জঙ্গল
তার এলাকা , সে উজানতলীর
পিশাচসেখানে কেন
গিয়েছিলেন ? কিভাবে
গিয়েছিলেন ? ওইখানে তো কোন
রাস্তা বা ঘরবাড়ি নেই , সুধুই জঙ্গল
হাঁটা অসম্ভব প্রায়”
আমি বললাম যে কিন্তু আমি যে
রাস্তা দেখে পাড় হয়েছি , আর
বাড়িও দেখেছিতখন মুয়াজ্জিন বলল, তা আপনাকে
দেখানো হয়েছে তাই দেখেছেন
এরপর সে বলল যে যাদের আপনি
পরে পেয়েছেন , তারা জিনতবে
ভালো, তারা এই এলাকার
পাহারাদারআপনাকে এখানে
এনে রেখেছে , কারন এই জায়গায়
শয়তান ধুক্তে পারেনাআপনি
চারিদিক তাকিয়ে দেখেন , এটা
কোন বাগান নয় , এটা একটা গরস্থান
আর মুসলমানের গোরস্থান খুবি
পবিত্র আর নিরাপদ জায়গা
আমি চারপাশে দেখলাম যে
আসলেই আমি একটা গরস্থানের
মাঝখানে, এই দিনের বেলাতেও
আমার গায়ে কাঁটা দিলো
মুয়াজ্জিন লোকটা আমাকে তখনই
রউনা হতে বলল আর বলে দিলো ,
অনেকেপিছন থেকে ডাকতে
পারে , আমি যেন ফিরে না দেখি ,
এমন কি সে ডাকলেও যেন না
তাকাই
আমি সেখান থেকে বের হয়েই
বাসার উদ্দেশে রউনা দিলাম ,
কয়েকবার কেও আমায় যেন পিছন
থেকে ডাকল, কিন্তু ওই
মুয়াজ্জিনের নিষেধ থাকায় আমি
পিছন ফিরে দেখিনি
বাড়ি এসে আমি নিমপাতা
ফুটানো পানি দিয়ে গোসল করলাম
আর তউবা করলাম , রাত -বিরেতে আর
বাসা থেকেই বের হবোনা