আফিয়া খোন্দকার আপ্পিতা
পয়তাল্লিশ বছর বয়সে দ্বিতীয় বিয়ে করে খালা নিরুদ্দেশ। তার কোন খোঁজখবর পাওয়া গেল না। ফোন বন্ধ, বাসায় তালা দেয়া। খালার ছেলের ঠিকানায় গিয়ে ও কোন লাভ হলো না। প্রতিবেশী বলল, তারা বাসা বদলে ফেলেছে। খালার ছায়ায় বড় হওয়ার সুবাধে আমাদের মায়া হয়ে গেছিল খালার প্রতি। এত বছরে বাসার সদস্যই হয়ে উঠেছিলেন যেন। মোটামুটি বাসার সবাই কৌতুহলী আর উদ্ধিগ্ন ছিল এ ব্যাপারে। নির্বিকার রইলেন কেবল মা। এ নিয়ে মায়ের কোন হেলদোল দেখা গেল না। মা নতুন বুয়া খোঁজার তোড়জোড়ে ব্যস্ত।
আমার বদ্ধমূল ধারণা আদ্যোপান্ত সব মায়ের জানা। মাকে জিজ্ঞেস ও করে ও আশানুরূপ উত্তর পাওয়া গেল না।
প্রতিদিন সকালে হাসপাতালের যাবার আগে নাস্তার সময় পাওয়া চায়ের স্বাদ ভিন্ন হলো। খালার হাতের চা খেয়ে অভ্যাস। সেই অভ্যাসে ভাটা পড়ল। নতুন বুয়ার হাতের চা বড্ড বিষাদ ঠেকল। নতুন বুয়ার কাজ কিংবা রান্না কোনটাই মনঃপূত হলো না। মা পরপর কয়েকটা বুয়া বদলালেন। কোনটাকেই টিকল না। অভ্যাস না কি মায়ার ভাটায় কে জানে? নতুন কাজের খালা এলো গেল, কিন্তু পুরনো কাজের খালাকে আর পাওয়া গেল না। দিন, সপ্তাহ, মাস পেরুলো।
মাঝে একবার নাইমের সাথে দেখা হলো। আমার হাসপাতালে লিফটে। নাইমের সাথে ছিল সুদর্শনা রমনী। চোখেমুখে ধূর্ততা। বোধকরি, স্ত্রীই হবে। খালার বদৌলতে ছোটোবেলা, বড়োবেলায় আমাদের বাসায় বেশ ক'বার এসেছিল নাইম। খালা আমাদের বাসার পার্মানেন্ট ছিলেন। দিনের অনেকটা সময় তাকে আমাদের বাসায় পাওয়া যেত। নাইম আসতো কখনো বাসার চাবি নিতে, কখনো মায়ের থেকে পকেট খরচ নিতে। সেই সুবাধে মুখটা এক দেখাতে চেনা গেল। খালার চিন্তা মাথায় এনে আমিই এগিয়ে গিয়ে কথা বললাম। ভাগ্যের সুপ্রসন্নতায় নাইম অচেনার ভান করল না। কুশল বিনিময় করল। আমি নাইমকে বললাম,
" তা তোমরা এখানে কার জন্য? খালা ঠিক আছেন?"
খালার নাম শুনতেই নাইমের কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ল। ওপাশ ফিরে নাক ফুলাল। ছোটো করে উত্তর দিল,
" আমার মামীশাশুড়ীকে দেখতে এসেছি। "
আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। যাক খালা ঠিক আছে। জিজ্ঞেস করলাম,
" খালা ভালো আছেন? "
উত্তরটা নাইমের বদলে পাশে থাকা মেয়েটা দিল। তীব্র তাচ্ছিল্য করে বলল,
" বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরেছে, নাগর জুটিয়ে রঙ্গ করছে, বিয়ে করছে। কলঙ্কিনীরা ভালোই থাকে। "
শ্বাশুড়ি সম্পর্কে পুত্রবধূর মুখে এহেন মন্তব্য শুনে মেয়ের অবিভক্ত বুঝা হয়ে গেল। নাইমের দিকে তাকিয়ে বললাম,
" সারাজীবন কষ্ট করেছে। এখন সুখে থাকুক। বিয়ের আগে খোঁজ নিয়েছো তো? পরিবার ভালো? "
নাইম চোখমুখ কুঁচকে বলল,
" এখন বিয়ে করার বয়স? সমাজে মুখ রাখল না। নিজের সুখের কথা ভেবে আমাদের মুখে চুনকালি দিয়েছে। সুখেই আছে। স্বার্থপর। এর থেকে মরে গেলেও নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারতাম।"
আমি থমক গেলাম, নাইমের কথা শুনে নয়। নাইমের চোখমুখের ভাষা দেখে। চোখে মায়ের জন্য তীব্র ঘৃণা, বিতৃষ্ণা। কী তাচ্ছিল্যতা, কী ধিক্কার! এতখানি ঘৃণা মানুষ বোধহয় শত্রুকেও করেনা । আমি কখনো কোন মায়ের জন্য সন্তানের এত ঘৃণা দেখিনি।
আমার কানে বাজল, "স্বার্থপর" শব্দটা। আত্মত্যাগের উদাহরণে থাকা নামটার পাশে 'স্বার্থপর' শব্দটা শুনে আমি কথার খেই হারিয়ে ফেললাম। এই ছেলেটাকে মানুষ করার জন্য খালা রক্তমাংস এক করেছেন। পঁচিশটা বছর যুদ্ধ করার বিপরীতে কি একটু সম্মান ও ডিজার্ভ করেন না! খালা শুধু তার সুখ, শান্তি, রূপ, যৌবন বিলীন করেন নি, অর্থসম্পদ বিলীন করে একবারে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। এই তো মাস কয়েক আগেই তো ছেলে আর ছেলেবউ মেয়ে মায়ের গুচ্ছিত সব টাকা এক প্রকার হাতিয়ে নিয়েছে।
খালা যতটা সহজ সরল, খালার ছেলে ছেলেবউ ততটাই ধুরন্ধর। নাইমের বিয়ের পর আলাদা থাকায় খালার বেতনের টাকার অনেকাংশ বেছে যেত। আমি খালাকে ব্যাংকে একাউন্ট খুলে দিয়েছিলাম। খালা টাকা ব্যাংকে জমা রাখতেন।
তিন চার বছরে তা জমে ভালো অংকের টাকা হয়ে গিয়েছিল। সে টাকার খবর কোনভাবে শুনে গিয়েছিল নাইমের বউ রিনা। তারপর থেকে শ্বাশুড়ির সাথে ভাব জমাল। নাইমের ব্যবসা লসের গল্প শুনাতে লাগল।
খালা সবকিছু মায়ের সাথে পরামর্শ করেন। ছেলের মনোভাব খালা ছাড়া মোটামুটি সবার কাছেই পরিস্কার।
আজকালকার যুগে বাবা মা দম ছাড়বার পর কান্নার বদলে সম্পত্তির দলিল বসে ছেলেমেয়েরা। কে গেল থেকে কী রেখে গেল, জানা বেশি জরুরি। সেখানে এই ঘটনা কাম্যই বটে। মা সতর্ক করলেন,
"বয়স পড়ে আছে। এত কাজ আর কদিন করতে পারবে। টাকা থাকলে শেষবয়সে কাজে আসবে। ছেলেকে সব দিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পরে যদি ছেলে না দেখে!"
ছেলে অন্তপ্রাণ খালা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জবাব দিলেন, "মা তো, জন্ম দিছি, কত কষ্টে পালছি, বড় করছি। মোর খুব আদরের পোলা, তার কষ্ট সইতে পারিনা। নিষ্ঠুর হইতে পারিনা। "
মা খালাকে বুঝালেন। খালা বুঝ নিলেন। কিন্তু কথায় আছে, সরল মানুষ বিশ্বাসেই ঠকে। খালা সরলমনা মানুষ। অল্পতেই মানুষকে বিশ্বাস করে ফেলেন। অবিশ্বাস তো পরকে করা যায়, নিজের রক্ত, নিজের জন্ম দেয়া সন্তানকে অবিশ্বাস করা যায়!
আমাদের কাছে ছেলের জন্য খালার ভালোবাসা বাড়াবাড়ি লাগলেও, কেবল খালাই জানেন এই ছেলেকে তিনি কত কষ্ট করে অর্জন করেছেন। পনেরো বছরের অপরিপক্ক শরীরে ন'টা মাস গর্ভে ধরে রেখেছেন। ছেলের বুঝ হবার আগেই বাবা মারা গেল। তখন তো বাবা মায়ের ভালোবাসা একাই দিয়েছেন। এই ছেলের জন্যই অজপাড়াগাঁয়ের এক মেয়ে অচেনা শহরে পা রেখেছে। ছেলের জন্মের পর ছেলে ছাড়া নিজের কথা মাথায় আসেনি। তার বেঁচে থাকা, তার পৃথিবী মানেই ছেলে। সন্তানের প্রসঙ্গে কি মা স্বার্থপর হতে পারে? সন্তানকে ফেলে নিজের কথা ভাবতে পারে? আমরা হয়তো দূর অবস্থান থেকে ঠিকই বিচার করতে পারব, কিন্তু কাছে গিয়ে খালার অবস্থানে বসলে শক্ত থাকার শক্তি আমাদেরও থাকবে না। সন্তান হিসেবে মায়ের ব্যাপারে আমরা স্বার্থপর হতে পারি কিন্তু মা হিসেবে সন্তানের ব্যাপারে স্বার্থপর হতে পারি না। মায়ের ধর্মই যে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
ছেলের জন্য খালার অবিশ্বাস এলো না। বিশ্বাস এলো। সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রইল না। ছলে বলে কৌশলে চেক বইয়ে তার আঙুলের ছাপ পড়ে গেল। কদিন ভালোই চলল।
ছেলের ব্যবসা ঘুরে দাঁড়াতেই ছেলে, ছেলেবউয়ের মনোভাব ও ঘুরে দাঁড়াল। ফিরে গেল আগের স্থানে। নাক ছিটকাল রিনা। এমন ব্যাকটেডেড মানুষ নিয়ে উঁচু সমাজে চলা যায়! সবাই যদি জেনে যায় তার শ্বাশুড়ি কাজের বুয়া। বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করে। মানসম্মান থাকবে? থাকবে না। ব্যবসায়িক সফলতা মনে করিয়ে দিল সেটা। তারপর যা হবার তাই হলো.... মায়ের বিশ্বাস ভাঙল আরও একবার।
মায়ের এত আত্মত্যাগের পর ও 'স্বার্থপর' এর দায়টা খালার উপর গেল! এই ছেলের বিবেকবোধ নেই!
আমরা ভেবেছিলাম, মায়ের বোঝা ঘাড় থেকে নামানোর জন্য বিয়ে দিচ্ছে নাইম। কিন্তু এখন দেখি সেখানেও সমস্যা। সমাজের কাছে না কি টেকা যাচ্ছে না। কোন সমাজে সমাজে সে রেখেছে মাকে! মা দিয়েই গেল, মাকে কিছু দেয়নি। বিয়ে করে থিতু হলো, সেও সহ্য হলো না। একটুখানি কৃতজ্ঞতাবোধ ও কি নেই!
আমার স্বরে অজস্র প্রতিবাদ, অথচ আমি টু শব্দ ও করতে পারিনি। বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। খানিক বাদে রাগ নিয়ে বললাম,
"খালা স্বার্থপর! ভেবে বলছো তো!"
নাইম অপ্রস্তুত হলো। তারপর হনহন করে চলে গেল। নাইমের ক্ষুব্ধতা দেখে আমার চিন্তা বাড়ল। খালা কি একা একা বিয়ে করলেন!
খালার বিয়ের রহস্য উন্মোচন হলো খালার আগমনের পর। একদিন হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরে দেখি বসার ঘরে খালা বসা। সারাদিন রোগী দেখে ক্লান্ত বিধ্বস্ত আমি প্রথমে খেয়াল করিনি। কারণ অবশ্য খালার চলনবলন। আমি খালাকে সবসময় সাদামাটাভাবে চলতে দেখেছি।
দুই ইদে মা খালাকে ভালো কাপড় দিতেন। কিন্তু খালার পছন্দ হতো সেই সুতির কাপড়। খালার গায়ে কখনো সোনার গহনা দেখিনি। মুখে বিষন্নতা, একটা দুঃখী, মলিনতা থাকতো। কিন্তু এই মহিলার ভাব ভিন্ন। পরনে চান্দেরি সিল্ক ফেব্রিকের শাড়ি। গলায় হাতে অলংকার বেশ। মুখে ঝুলছে হাসি। হেসে হেসে মায়ের সাথে গল্প করছেন। খালার কথা খেয়াল হতেই আমি চক্ষুচড়ক।
আমাকে গিয়ে বললাম, " খালা না কি! ভালো আছেন?"
বিপরীতে খালা সুন্দর করে হাসলেন। খালার এই হাসি আমি আগে কখনো দেখিনি। চেহারা ঝলমলে। সুখী মানুষের চেহারায় অন্যরকম এক উজ্জ্বলতা থাকে। খালার চেহারায় সেই উজ্জ্বলতা ভাসছে। খালার চোখমুখ বলছিল, খালা সুখে আছেন।
বহুকাল ধরে কোন মানুষকে দুঃখী হয়ে থাকতে দেখার পর হুট করে তাকে সুখী হতে দেখলে মনের মাঝে অন্যরকম এক আনন্দ কাজ করে। চোখে শান্তি মিলে। খালার ওই সুখী মুখটা দেখে আমার মনে হলো, অনেকদিন, অনেক বছর পর আমি এমন সুন্দর দৃশ্য দেখিনি। খালা প্রসন্ন সুরে বললেন,
" আলহামদুলিল্লাহ ভালা আছি।"
"ওখানে কোন সমস্যা হচ্ছে না তো?"
খালা প্রসন্ন সুরে বললেন, " না, আল্লাহ আমারে সম্মানে রাখছে..
দ্বিতীয় বিয়েতে ভালোবাসার থেকে সম্মানটাই ঢের কাম্য। খালা তা পেয়ে প্রসন্ন হয়ে গেছেন। তা দেখে পুলকিত হলো মন।
খালার সুখমাখা অবতারে অবতারণে বাসায় খুশির জোয়ার বয়ে গেল। সবাই এসে বসল বসার ঘরে। আমি বললাম,
"এতকাল আপনার দুঃখের গল্প শুনেছি, আজ শুনব আপনার সুখের গল্প। "
খালা মায়ের দিকে তাকালেন। খালার গল্পটা মা বললেন। আকস্মিক খালার জীবনে হানা দেয়া সুখের গল্প। শুনবার সময় মনে হলো এ যেন কোন সিনেমার গল্প। পরে মনে হলো সিনেমা তৈরি হয় বাস্তব জীবন থেকে।
খালার দ্বিতীয় বিয়ের সুত্রপাত নানুবাড়ি থেকে। বছর খানেক আগে খালাকে নিয়ে আমার নানুর গ্রামের বাড়িতে যান। বাবা ব্যস্ত, সাথে যাবেন না। মা একা যেতে নারাজ, বগলদাবা করে নিয়ে গেলেন শিউলি খালাকে। কটাদিন থেকে এলে তারও ভালো লাগবে।
নানু বাড়িতে গিয়ে দেখা হলো একটা বছর দশের বাচ্চা মেয়ের সাথে। মলিন, বিষাদ, দুঃখ ভাসা চেহারা। মায়াময় চোখে জল দেখে খালা কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
"কী হইছে মা? কানতাছো ক্যান?"
মমতাভরা স্বর শুনে মেয়েটার কান্না বাড়ল। কেঁদে কেঁদে বলল,
"মায়ের কথা মনে পড়তেছে।"
"কী হইছে তোমার মার?"
মেয়েটা উত্তর দিল না, ডুকরে কেঁদে উঠল। খালা অনুসন্ধানী মনে জানলেন, মেয়েটার মা মারা গেছে। মা হারা মেয়ের কাতরতা দেখে বিধ্বস্ত খালার মনে হলো, তার দুঃখ অতি নগন্য। মমতাময়ী খালা মমতায় গা ভাসিয়ে মেয়েটাকে সান্ত্বনা দিলেন। কান্না থামার পর আলাপ হলো মেয়েটার সাথে।
মায়ের দূর সম্পর্কের এক ভাইয়ের মেয়ে। নাম রোদেলা। রোদের মতোই উজ্জ্বল ছিল তার জীবন। বাবা মা আর সে, তিনজনের সুখী পরিবার। হঠাৎ মায়ের ক্যান্সার হলো। অকালেই মারা গেলেন। মায়ের মৃত্যুর পর জীবনটাই এলোমেলো হয়ে গেল। মায়ের ছায়ায় বড় হওয়া মেয়ে, মায়ের শূন্যতায় মনমরা হয়ে থাকে সারাক্ষণ। নাতনির এই অবস্থা দেখে দাদী ছেলের দ্বিতীয় বিয়ের কথা বললেন। রোদেলার বাবা তড়িৎ মানা করে দিলেন। নতুন বউ যদি তার মেয়েকে মানতে না পারে! যদি তার মেয়ের অনাদর হয়? সৎ মায়ের সংজ্ঞাতেই তো দোষ।
দাদী এবার নাতনিকে ধরলেন, বাবারে কও, নতুন মা লোইয়্যা আইতে। হ্যায় তোমারে আদর করবো।
রোদেলা বাবাকে বলতেই বাবা বললেন,
"তোমার জন্য আমিই যথেষ্ট। আমিই বাবা, আমিই মা। এসব কথা আর মুখে এনো না। মায়ের কোন রিপ্লেসমেন্ট হয়না। "
মাকে মনে পড়লে রোদেলা বাবার কাছে গিয়ে কাঁদে, মাকে এনে দাও না বাবা!
বাবা খুব অসহায় হয়ে যান তখন। ম'রে যাওয়া মাকে কি আনা যায়? তিনি সর্বোচ্চ আদর দেন মেয়েকে। কিন্তু মায়ের অভাব তবুও যায়না। রোদেলার দাদীও বুঝাতে থাকেন। শেষমেষ বিয়ে করবার জন্য রাজী হন তিনি। তবে শর্ত থাকে। পাত্রী পছন্দ করবে রোদেলা। সে যদি কারো মাঝে মমতা খুঁজে পায়, মায়ের ছায়া খুঁজে পায়। তবেই তিনি বিয়ে করবেন।
রোদেলার মা খোঁজার পর্বে নানুবাড়িতে হাজির হলেন শিউলি খালা।
সেবার মা খালাকে নিয়ে দিন দশেক ছিলেন নানুবাড়িতে। তখন খালা রোদেলার সাথে সময় কাটিয়েছেন অনেক সময়। এতটুকু একটা বাচ্চা মেয়ের দুঃখ দেখে খালা মায়ায় পড়ে গেছিলেন। আদর করেছেন বেশ।
দুটো বিষয় নিশ্চিত করি,
এক, রোদেলাকে আদর করার পেছনে খালার কোন উদ্দেশ্য ছিল না। খালা জানতেন না, রোদেলার মা খোঁজার ব্যাপারে।
দুই, খালা পরিপাটি হয়ে থাকতেন। সাদামাটাভাবে চলতেন, তবে ছেঁড়া কাপড় পরতেন না।
রোদেলার মন খারাপের বেলায় খালার মমতা দেখে রোদেলার মনে খালা জায়গা করে নিয়েছিলেন বটে।
রোদেলার দাদী মাকে প্রস্তাব দিয়ে ফেলেছিলেন। মা অবশ্য তখন খালাকে জানাননি। খালাকে নিয়ে ফিরেছেন।
ঢাকা আসার পরে খালাকে জানান। শুনেই খালা মানা করে দেন। ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়। প্রথম বিয়ের অসম্মান, অমর্যাদা, অসামঞ্জস্যতা, অপূর্ণার পর খালার জীবনে সুখ হারিয়ে গিয়েছিল।
দ্বিতীয়বার কাউকে জীবনে জড়ানোর সাহস নেই খালার। তাও এই বয়সে এসে!
খালার প্রত্যাখানের করে ক্ষান্ত হন। মা খুব করে চাইছিলেন খালার একটা গতি হোক। মা রোদেলার পরিবারকে চিনেন। ভদ্র নম্ব বেশ। রোদেলার বাবা রেজা হাবিব খুব ভালো মানুষ। গ্রামের সহজ সরল মানু্ষ। প্রথম বউয়ের সাথে কখনো গলা উঁচু করেও কথা বলেননি। সেই পরিবারে গেলে খালার অসম্মান হবেনা, এটা নিশ্চিত থেকেই মা খালা বুঝাচ্ছিলেন। খালা বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে আসছিলেন।
এরমাঝে ছেলে ছেলেবউ ভালো সাজল। খালা জীবনে সুখের ভ্রমে ডুবে গেলেন। তারপর ছেলে টাকা নিয়ে ছলনা করল। ছেলেকে নিয়েই সুখে থাকতে চেয়েছেন। কিন্তু ছেলেটা তাকে ঠকিয়ে গেছে বরাবর। সেবার খালার সব টাকা নিয়ে নাইম খুব খারাপ আচরণ করেছে মায়ের সাথে। খালা ভীষণ ভেঙে পড়েছিলেন। ভগ্নহৃদয়ে খালা বুঝে গিয়েছিলেন, এ ভুবনে তার কেউ নেই। যেই ছেলেকে তিনি আপন ভেবে এসেছেন, সে আপন না। সে প্রাচুর্যে ডুবে পর করেছে তাকে। আর আপন ভাবেনা। এই উপলব্ধি খালাকে শেষ করে দিচ্ছিল। নিজের জীবনটাই বৃথা মনে হলো। খালা নিজের মৃত্যু কামনা করতেন।
খালার এই খারাপ সময়ে রোদেলা এলো ঢাকায়। আমি মনে করে দেখলাম, রোদেলা তখন খালার সাথেই থাকতো। খালা রোদেলার মায়ায় পড়ে গিয়েছিলেন। মেয়েটার সঙ্গ তাকে শান্তি ছিল, ছেলের ছলনা ভুলিয়ে দিল। জীবনের সাথে যুদ্ধ করতে করতে হাঁপিয়ে গিয়েছিলেন খালার। মা ছায়া হয়ে বুঝালেন।
রোদেলার মায়ায় পড়েই খালা বিয়ের জন্য রাজি হয়েছেন।
রোদেলার বাবার সাথে দেখা হয়নি তেমন। তিনি তো আর বাইশ বছরের তরুণী নয় দেখে পাত্র দেখাদেখি পর্বে চায়ের কাপে আলাপ সারবেন। দূর থেকেই দেখেছেন। খারাপ লাগেনি।
আমাদের সবার অগোচরে খিচুড়ি পাকালেন মা। স্বভাবগতভাবেই মা বেশ চাপা স্বভাবের। তারউপর আমরা ভাইবোন সবাই পড়াশোনা, চাকরি নিয়ে ব্যাস্ত। সারাদিন বাইরে থাকি। সন্ধ্যেবেলা বাসায় ফিরি। শুক্রবারটাই সারাদিন থাকি। সারাসপ্তাহে বাসার খোঁজ থাকেনা। সে হিসেবে ব্যাপারটা এতটাও কঠিন না।
এতে অবশ্য মায়ের সাথে বাবা ও শামিল ছিলেন। আমরা সবাই বড়ো হয়ে গেছি, এ বয়সে খালার বিয়ে কিভাবে নিব। এ জন্য খালা লজ্জায় ছিলেন। বিয়েটা হলো রোদেলার চাচার বাসায়। তিনি ঢাকা থাকেন। তারপর সুখ গায়ে মেখে খালা গেলেন শ্বশুরবাড়িতে। জীবনের বড্ড অবেলায় এসে খালার সংসার হলো, সন্তান পেলেন, সম্মান পেলেন। রেজা মামা স্বামী হিসেবে ভালো। খালাকে সম্মান করেন। কদিন মেয়ের সাথে খালার ভাব থেকে তিনিও ভীষণ ঝুকেছেন খালার প্রতি। এখন তাদের সংসারটা সুখের বটে।
ও হ্যাঁ, নাইমের কথা বলা হয়নি। আসোলে সুখের অধ্যায়ে দুঃখের সুতো টানা অন্যায়। তাই সে প্রসঙ্গ বাদ গেল। খালার বিয়ের প্রস্তাব খালাকে দেয়ার পর মা নাইমের সাথে আলাপ করেছেন। শুনেই নাইম চটে গেল। মাকে তেমন কিছু না বললেও, খালার বাসায় গিয়ে খুব অপমান করেছেন। মা পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলার পরেও নাইম ধারণা করেছে, মা নিজেই স্বামী খুঁজে নিয়েছে।
নাইম খুব খারাপ ভাষায় গালাগাল অবধি দিয়েছেন। ছেলের ব্যবহার দেখে খালা ফের বেঁকে বসেছিলেন। বিয়ে করবেন না।
নাইম বিয়েতে ও আসেনি। ছেলের কথা বলতে গিয়ে খালার সুখমাখা মুখে ফের জল এলো। ছেলেটা তার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। ফোন দিলে ফোন ধরেনা। দুই একবার তুলে খুব অপমান করেছে।
এমন না যে, বিয়ে ভেঙে দিলে নাইম মাকে দেখতো। না দেখতো না। এত কাল দেখেনি, এখন কী দেখবে। নাইম থাকে খালার আশার কিছু নেই। পূর্বাকার সময়ে নাইমের আচরণের পর খালার দ্বিতীয় বিয়ের সিদ্ধান্ত যথাযথ।
খালার সুখ দুঃখের গল্পের মাঝে কলিংবেল বেজে উঠল। আমি গিয়ে দরজা খুললাম। লিলেন ফ্রক গায়ে একটা মেয়ে চঞ্চল গলায় বলল,
" আমার ছোটমা কি আপনাদের বাসায়?"
ভীষণ আন্তরিকতা নিয়ে বলল মেয়েটা। চোখ মুখ উজ্জ্বল। রোদের মতোই। আমি হ্যাঁ বলতেই, দৌড়ে ভেতরে ঢুকল। শিউলি খালাকে দেখে ডেকে উঠল,
"ছোটোমা?"
খালা তখন ছেলের দুঃখে কাঁদছিলেন। সেই কান্নার মাঝেই মেয়েটার ডাকে হেসে ফেললেন। হাত বাড়ালেন। মেয়েটা বুকে খালার বুকে পড়ল। খালা আগলে নিলেন। মাথায় চুমু খেলেন। খালার চোখে ছেলের জন্য জল, ঠোঁটে মেয়ের জন্য হাসি।
রোদেলা বলল,
"বাবা নিচে দাঁড়িয়ে আছে, তাড়াতাড়ি যেতে বলেছে। আজ আমরা ঘুরতে যাব।"
খালা চোখের পানি মুছে ফেললেন। চোখ থেকে জল সরলেও ঠোঁট থেকে হাসি সরল না। খালার হাসিটা টিকল। সেই সুন্দর, সুখের হাসি। যে হাসি আমরা এতকাল দেখিনি।
আমার মন বলল, খালা সুখে আছেন। খালার প্রথম জীবনে সুখ, শান্তি, সম্মান, সংসার কিছুই মিলেনি। দ্বিতীয় জীবনে মিলল। দ্বিতীয় বিয়ে, দ্বিতীয় জীবনে প্রথম সুখ মিলল। খালাও সুখের দেখা পেলেন।
যার প্রথম জীবন দুঃখে কাটে, তার দ্বিতীয় জীবন সুখের কাটে।
সমাপ্ত....
শেষ কথা- খালার ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয়তা রক্ষার্থে কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়েছে। তবে এটা নিশ্চিত যে, খালা দ্বিতীয় বিয়ের পর সুখে আছেন। খালার শেষ হাসিটা সুখের এখনো।

0 coment rios:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন