সোমবার, ৩ জুন, ২০২৪

অনু গল্প

অনু গল্প

 








Writing By.জুনেদ আল রহমান
ফ্রেঞ্চঞ্চাম প্রকাশ, দুইটাকার বাদ দেন।উনি দিতে বললেন, ভাতিজা কি বাংলা। বৈধ, হায় চাচা।

বললেন, কতদিন থেকে ফাঁস। উত্তর, তিন বছর রাস্তা। আপনি বললেন, নাটা বছর দীর্ঘ হয়ে গেছে, কাগজ পাইনি এখনো যেতে পারি না।


বাদাম নিলেন পর টাকা দিতে,

বললেন, কাজ না থাকলে চলো ভাতিজা গল্প করি।

অনুমতি, কাজ আছে, তবে সতর্ক পর পর।


জিগাইলেন, দেশের খোঁজ,বিয়ে করছি কি'না,মা বাপ আছেন কি'না এক জন বয়স্ক মানুষ, আমাদের মতো ছেলের ছেলের বাড়ির ছেলে যা জিগেস করেন ঐগুলাই জিগাইলেন৷


বেশ মোটা মানুষ তারউপর বয়স্ক, এর মধ্যে ইলিগ্যাল, বুঝলাম এই জন্য উনারে কেউ বলতে পারে না।


পকেট থেকে সামং ফোন বের করে, স্ক্রিনে একটা মেয়ের ছবি দেখা যায়, মেয়েটা সুন্দর কি'না?


একটা মেয়ে মেয়ের বাড়ন্ত পুরনো যে' সুন্দরী থাকে ও পছন্দ করে। আমি আপনাকে ঐ কুমিল্লায় গিয়ে বিয়ে করব, বেটা থামালেন, কাস্টমার বিদায় করি সিগারেট খাইলে একটা ব্যাপার।


সিগারেট নামলাম, চাচায় কাস্টমার বিদায় বিদায় তার পর বললেন, এটা আমার মেয়েকে মুচকি মুচকি হাসতে শুরু করবে।


চাওয়া কথা বলে থামেন, মুচকি হাসেন, লংটাইম আবার বলেন, আমার এই মেয়েটি এইটে গোল্ডেন। চাচা গোল্ডেন কি চাচা বললেন, এটা কি আর আমি জানি। আমার মেয়েটা পড়ায় খুব ভালো। আমার দুই মেয়ে,এটাই বড়।


আমি ঠিক নিয়ে এগোচ,কে চাও বলে উটেন, আমার মেয়ে বিয়ে করবে?


বলেছে, মনে কর ত্রিশ পয়ত্র, চল্লিশ চাচাবলাম, অনেক কম। রুমাভাড়া, শান্তর বিলা'তো আর ঘরতে পাটাশ দিতে দিতে ডেবলে, টাইটুনা ঘামাশ দেই তোমার চাচের ডিসকাউন্ট। 


বললেন, ভাতিজা নিয়োগ করছি, নতুন ডাক্তার পর ভালো বেতনে কাজ করছি। আর মনে কর, কুৃমিল্লা নেতা বাসার কিন পাওয়ার পচিশ দীর্ঘ দিয়ে, এখন পাশাশ জায়গাম লাগানো হবে।আল্লাহ নাফ দিয়ে ভাতিজাবল, চাচাচালক যান। এই পুরানো আর বিদেশলেন, আগামী বছর পাবো তারপর যাবো। থাকলে, অটোমেটিক লিগ্যাল কার্ড দেয়।


চরিত্রহোক,বললাম চাচা যাচ্ছেন, গোসলের তারপরে বলতে হবে,অন্য দিন কথা হবে।ছাড়লেন,বললেন বিশ মিনিট দাড়াও গল্প করি, তোমার সাথে করতে পারলাম 


বললেন, আমার এই মেয়ে মেট্রিকে এ প্লাস কথা। পড়ায় খুব ভালো। আমার তো মনে কর, আশা, মেয়েরা টাকা পয়সা খারছ কইরা পড়ুন, ডাক্তার বানামো, রুজি করতে হবে না।গরীব মানষের চিকিৎসা কর।


আমি কিছু চেষ্টা করতে পারোনা, আমার বাড়ির মালিকের বাড়ি উনার মেয়ের গল্প দেখলাম কেন, আমি ফেসবুকে ভিডিও দেখলাম, এক ছেলে হেলিকপ্টারে বিয়ে করতেছে, আমি ও খবর নিয়া দেখলাম পাঁচলাখের খরছ হেলিপ্টার চড়াইয়া মেয়ের শশুড় পাটাতে পারবো। চা, তোমার মেয়ে নিয়া'তো চানা স্বপ্ন।


বললেন,ভাতিজা আমাদের এই বয়সে এসে নিজের আর কিচ্ছু আশা আকাঙ্ক্ষার থাকেনা। সবগুলো স্বপ্ন থাকে শিশু কাচ্চা নিয়া। 


রুম তো ছিলই। আমার মেয়ের একলা রুম ভিডিও কলে দেখুন, শুধু খাট আর পড়ার টেবিল আর কিছু নাই।


মেয়েটি খুব করেছিল সোফায় মনের ব্যাখ্যায়। তার অনেক প্রস্তাব শুরু করে, ভাল ভালো প্রস্তাব, ছেলে ব্যাসায়ী, বিদেশ সেটেল্ড, আরো কত'কি। বলবেন, তোমার ছেলের মতো পাইলে দিবো।


চাচা বললেন, এই বছর আমার মেয়ের আইএ (এইচসিএসএস পরিদর্শন, পরিস্থিতির প্রশ্নে) পিছিয়ে পড়েছি।শুন ভাতিজা, এক দিন রাতে আমার শরীরের মাথা থেকে সবজাগায় আমার সব চুল কাটাচ্ছে,পড়েছে। পড়ে সীমাহীন হয়ে গেছে। আমি মহারাজ দিয়ে,মানুষ আমাকে হাসেহাটে ঘুম ঘুম ভেঙ্গে কথা, রাত বাচারটা, বাংলাদেশ সময় সকাল আটটা। , ও ফোন ধরেনা। ভাবলাম ঘুমাতে হবে।


তোর চাচীব কামাল কমবন চশমা ব্যাহার করেছে। ফেটে পড়লেন।


তো ফোন কর, তোর মেয়ে চাচির ফোনে ফোন রিসিভ। 🙂🙂🙂


চাচা বাকি আছে,মুচকি হেসেই যাচ্ছেন আর বাদাম নাড়ছেন।বললাম, বলেন কি চাচা?বললেন, ভাতিজা মেয়েটা মরার আজ সাইত্রিশদিনের কথা। আমি মনে কর কর্লো দেশ, গিয়া, তোর চাচিরে নিয়া হজ্ব কইরা আইসা,মরার জন্য শুইয়া পড়মু। মরছি আর কনবোনা।আরে ব্যাটা,কার জন্য বাচবো কষ্টটা।


কত কষ্টের মেয়ে,কত আদরের মেয়েটা, স্বপ্নের মেয়ে আমার মরে জোরে,কোন পোলার জন্য। 


বিলিভ মি- চাচা তবু ও হাসছিলেন। আমি পুরাই হ্যাং হয়ে গেছি কতক্ষণের জন্য। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দিয়ে, চাচা আসি আজ।আবার আসবো শিওর। ফোন নম্বর দিয়ে, যখন ইচ্ছা কল দিয়ে, আপনার সাথে গল্প করতে।


মানুষ মনে হয় কৌতূহলকে বিরক্ত করতে হাসে অথবা, কান্নাকে অৌক্তিক মনে করে বা ভয় পায়, কান্না করতে যদি নিজেকে খুইয়ে দেয়, ভালো থাকার আনন্দে জগৎ থেকে।





শুক্রবার, ৩১ মে, ২০২৪

শয়তান ও রাজনীতিবিদ

শয়তান ও রাজনীতিবিদ

মানবজাতির প্রধান শত্রু হল শয়তান যার সম্পর্কে আল্লাহপাক কুরআনে বহুবার সর্তক করেছেন। এই শয়তান ও তার অনুসারী মানুষ ও জ্বিন উভয় হতে হয়। সুরা নাসে বর্নিত- যে কুমন্ত্রণা দেয় অন্তরে। জিনের মধ্য হতে ও মানুষের মধ্য হতে (৫-৬)। বর্তমানে অনেক রাজনীতিবিদের চরিত্র, ইবলিস শয়তানের চরিত্রের আদিরীতি ছাড়া কিছুই নয়। যেমনঃ ১. প্রচলিত রাজনীতিবিদগণ একজন প্রার্থী অন্যজন প্রার্থী হতে শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে। তার শ্রেষ্ঠ হওয়ার দাবির অধিকাংশ কারণ হল সে স্বীয়দলের মহান নেতার নিকট পরিচিত, আত্মীয় অথবা প্রিয়। অথচ মুসলিমদের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ তা আল্লাহপাক জানে। কোন ব্যক্তি অপর ব্যক্তি অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ দাবি করা সুস্পষ্ট অহংকার। “আর অহংকার হল সত্য গোপন রাখা ও অন্যকে নিকৃষ্ট জানা” (সহীহ মুসলিম -৯১)। আর জন্ম বা সৃষ্টি সূত্রে নিজেকে শ্রেষ্ঠভাবা এই জাতীয়তাবাদী চেতনার জন্মদাতা ইবলিশ। আল্লাহ বলেন- “হে ইবলিস আমার দুহাতে আমি যাকে সৃষ্টি করছি কে তোমাকে তাকে সিজদাহবনত হতে বাধা দিল? তুমি কি অহংকার করলে না তুমি অধিকতর উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন? সে বলল, আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন অগ্নি হতে আর তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি হতে (সুরা সাদ)।” ২. নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানো (বিরোধী দল) বর্তমান রাজনীতিবীদদের একটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যা ইবলিসের চরিত্রের অনুরূপ। ইবলিস ভুল করেছিল কিন্তু ক্ষমা চায়নি, অথচ আদম (আ:) অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চায় আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন আর ইবলিস তার দোষের দায় আদম (আ:) এর উপর চাপায়। তার ধারণা আদম (আ:) এর জন্য আল্লাহ তাকে পথভ্রষ্ট করেছে তাই সে প্রতিটি আদম সন্তানের উপর প্রতিশোধ নিতে সংকল্পবদ্ধ। কুরআনে বর্নিত- “সে বলল, তুমি যেহেতু আমাকে পথভ্রষ্ট করেছ, আমিও শপথ করেছি যে, আমিও তাদের জন্য আপনার সরলপথে ওৎ পথে বসে থাকবো। তারপর আমি তাদের হামলা করব তাদের সম্মুখ দিক হতে, তাদের পিছন দিক, তাদের ডানদিক হতে, তাদের বামদিক হতেও। আর তুমি তাদের অধিকাংশদের কৃতজ্ঞ হিসেবে পাবে না।” (সুরা আরাফ-১৬-১৭)। আজও ক্ষমতাসীনদের সত্যের পথে আহ্বান করলে বা সমালোচনা করলে বিভিন্ন রকম হামলা ও মামলা শুরু হয়ে যায়। তারা বিরোধীদলের সাথে এমনকি ক্ষমতার জন্য দলের লোকদের সাথেও সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। ৩. স্বাধীন মতবাদ- বর্তমান রাজনীতিবিদগণ নিজ খেয়াল খুশি মত বিধান রচনা করে যা শয়তানেরই নীতি। শয়তান আল্লাহর নিয়মনীতি প্রত্যাহার করে নিজ ইচ্ছার অনুসরন করে চলছে অথচ ইসলাম হল আত্মসমর্পণ আর মুসলিম হল আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণকারী। সে তার সকল চিন্তাচেতনা বর্জন করে এক আল্লাহর নিয়মনীতির অধীন হবে বিনিমিয়ে আল্লাহপাক তাকে জান্নাত দিবেন। ক্ষমতাসীনরা নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী আল্লাহর আইনকে বাতিল করে নিজস্ব আইন চালু করে। যেমন – আল্লাহ মদ, সুদকে অবৈধ (হারাম) করেছে পরিবর্তে মানবরচিত আইনে তাকে বৈধ (হালাল) করা হয়েছে। ৪. আল্লাহর বিরোধীতা করার জন্য আল্লাহর কাছেই প্রার্থণা করা- বর্তমানে অধিকাংশ রাজনীতিবিদরা ক্ষমতা চায় নিজের দুনিয়ার সুবিধা, নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার জন্য ও সমোলোচক, বিরোধীদের দমন করার জন্য। এজন্য তারা আল্লাহর কাছে প্রার্থণা করে, হজ্বে যায় ও মসজিদ-মাহফিলে দান করে। অথচ জুলুম ও জালেম শাসকের জন্য আল্লাহ জাহান্নামের শাস্তি রেখেছেন। এধরনের কর্মকান্ড ইবলিসেরই চরিত্রে বিদ্যামান। সে আল্লাহর কাছে প্রার্থণা করে আল্লাহর নাফরমানী ও তার শত্রু আদম সন্তানদের ক্ষতি সাধনের জন্য।আল্লাহপাক বলেন- “তিনি (আল্লাহ) বলেন তুমি এখান হতে বের হয়ে যাও। কেননা নিশ্চয় তুমি বিতাড়িত। আর নিশ্চয় বিচার দিবস পর্যন্ত তোমার প্রতি আমার অভিশাপ বলবৎ থাকবে। সে (ইবলিশ) বলল- আমাকে সেদিন পর্যন্ত অবকাশ দিন যেদিন তারা পুনরুত্থিত হবে। তিনি (আল্লাহ) বললেন, আচ্ছা তুমি অবকাশপ্রাপ্তদের অন্তভুক্ত হলে, নির্ধারিত সময় উপস্হিত হওয়ার আগের দিন পর্যন্ত। সে (ইবলিস) বলল- তোমার ইজ্জত্বের কসম! আমি তাদের সকলকে বিপদগামী করে ছাড়ব। তাদের মধ্য হতে তোমার একনিষ্ঠ বান্দা ছাড়া। আল্লাহ বলেন- এটি সত্য আর সত্যই আমি বলি, তোমাকে দিয়ে আর তাদের মধ্যে যারা তোমার অনুসরণ করবে তাদের দিয়ে নিশ্চয় আমি জাহান্নাম পূর্ণ করব।” (সুরা সাদ)। আজ যারা প্রতারণামূলক এই রাজনীতিবিদদের সমর্থন দিচ্ছে ও ওদের মাধ্যমে শান্তি চায় সমাজে, নিশ্চিত থাকুন ওরাই সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিবে।

বৃহস্পতিবার, ৩০ মে, ২০২৪

দ্বিতীয়_বিয়ে। (দ্বিতীয় তথা শেষ পর্ব)

দ্বিতীয়_বিয়ে। (দ্বিতীয় তথা শেষ পর্ব)

 


Waiting by

আফিয়া খোন্দকার আপ্পিতা 


 পয়তাল্লিশ বছর বয়সে দ্বিতীয় বিয়ে করে খালা নিরুদ্দেশ। তার কোন খোঁজখবর পাওয়া গেল না। ফোন বন্ধ, বাসায় তালা দেয়া। খালার ছেলের ঠিকানায় গিয়ে ও কোন লাভ হলো না। প্রতিবেশী বলল, তারা বাসা বদলে ফেলেছে। খালার ছায়ায় বড় হওয়ার সুবাধে আমাদের মায়া হয়ে গেছিল খালার প্রতি। এত বছরে বাসার সদস্যই হয়ে উঠেছিলেন যেন। মোটামুটি বাসার সবাই কৌতুহলী আর উদ্ধিগ্ন ছিল এ ব্যাপারে। নির্বিকার রইলেন কেবল মা। এ নিয়ে মায়ের কোন হেলদোল দেখা গেল না। মা নতুন বুয়া খোঁজার তোড়জোড়ে ব্যস্ত। 

আমার বদ্ধমূল ধারণা আদ্যোপান্ত সব মায়ের জানা। মাকে জিজ্ঞেস ও করে ও আশানুরূপ উত্তর পাওয়া গেল না। 


প্রতিদিন সকালে হাসপাতালের যাবার আগে নাস্তার সময় পাওয়া চায়ের স্বাদ ভিন্ন হলো। খালার হাতের চা খেয়ে অভ্যাস। সেই অভ্যাসে ভাটা পড়ল। নতুন বুয়ার হাতের চা বড্ড বিষাদ ঠেকল। নতুন বুয়ার কাজ কিংবা রান্না কোনটাই মনঃপূত হলো না। মা পরপর কয়েকটা বুয়া বদলালেন। কোনটাকেই টিকল না। অভ্যাস না কি মায়ার ভাটায় কে জানে? নতুন কাজের খালা এলো গেল, কিন্তু পুরনো কাজের খালাকে আর পাওয়া গেল না। দিন, সপ্তাহ, মাস পেরুলো। 


  মাঝে একবার নাইমের সাথে দেখা হলো। আমার হাসপাতালে লিফটে। নাইমের সাথে ছিল সুদর্শনা রমনী। চোখেমুখে ধূর্ততা। বোধকরি, স্ত্রীই হবে। খালার বদৌলতে ছোটোবেলা, বড়োবেলায় আমাদের বাসায় বেশ ক'বার এসেছিল নাইম। খালা আমাদের বাসার পার্মানেন্ট ছিলেন। দিনের অনেকটা সময় তাকে আমাদের বাসায় পাওয়া যেত। নাইম আসতো কখনো বাসার চাবি নিতে, কখনো মায়ের থেকে পকেট খরচ নিতে। সেই সুবাধে মুখটা এক দেখাতে চেনা গেল। খালার চিন্তা মাথায় এনে আমিই এগিয়ে গিয়ে কথা বললাম। ভাগ্যের সুপ্রসন্নতায় নাইম অচেনার ভান করল না। কুশল বিনিময় করল। আমি নাইমকে বললাম,

" তা তোমরা এখানে কার জন্য? খালা ঠিক আছেন?" 


খালার নাম শুনতেই নাইমের কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ল। ওপাশ ফিরে নাক ফুলাল। ছোটো করে উত্তর দিল,

" আমার মামীশাশুড়ীকে দেখতে এসেছি। " 


আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। যাক খালা ঠিক আছে। জিজ্ঞেস করলাম,

" খালা ভালো আছেন? "


উত্তরটা নাইমের বদলে পাশে থাকা মেয়েটা দিল। তীব্র তাচ্ছিল্য করে বলল,

" বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরেছে, নাগর জুটিয়ে রঙ্গ করছে, বিয়ে করছে। কলঙ্কিনীরা ভালোই থাকে। "  


শ্বাশুড়ি সম্পর্কে পুত্রবধূর মুখে এহেন মন্তব্য শুনে মেয়ের অবিভক্ত বুঝা হয়ে গেল। নাইমের দিকে তাকিয়ে বললাম,

" সারাজীবন কষ্ট করেছে। এখন সুখে থাকুক। বিয়ের আগে খোঁজ নিয়েছো তো? পরিবার ভালো? " 


নাইম চোখমুখ কুঁচকে বলল, 

" এখন বিয়ে করার বয়স? সমাজে মুখ রাখল না। নিজের সুখের কথা ভেবে আমাদের মুখে চুনকালি দিয়েছে। সুখেই আছে। স্বার্থপর। এর থেকে মরে গেলেও নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারতাম।" 


আমি থমক গেলাম, নাইমের কথা শুনে নয়। নাইমের চোখমুখের ভাষা দেখে। চোখে মায়ের জন্য তীব্র ঘৃণা, বিতৃষ্ণা। কী তাচ্ছিল্যতা, কী ধিক্কার! এতখানি ঘৃণা মানুষ বোধহয় শত্রুকেও করেনা । আমি কখনো কোন মায়ের জন্য সন্তানের এত ঘৃণা দেখিনি। 


 আমার কানে বাজল, "স্বার্থপর" শব্দটা। আত্মত্যাগের উদাহরণে থাকা নামটার পাশে 'স্বার্থপর' শব্দটা শুনে আমি কথার খেই হারিয়ে ফেললাম। এই ছেলেটাকে মানুষ করার জন্য খালা রক্তমাংস এক করেছেন। পঁচিশটা বছর যুদ্ধ করার বিপরীতে কি একটু সম্মান ও ডিজার্ভ করেন না! খালা শুধু তার সুখ, শান্তি, রূপ, যৌবন বিলীন করেন নি, অর্থসম্পদ বিলীন করে একবারে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। এই তো মাস কয়েক আগেই তো ছেলে আর ছেলেবউ মেয়ে মায়ের গুচ্ছিত সব টাকা এক প্রকার হাতিয়ে নিয়েছে। 


খালা যতটা সহজ সরল, খালার ছেলে ছেলেবউ ততটাই ধুরন্ধর। নাইমের বিয়ের পর আলাদা থাকায় খালার বেতনের টাকার অনেকাংশ বেছে যেত। আমি খালাকে ব্যাংকে একাউন্ট খুলে দিয়েছিলাম। খালা টাকা ব্যাংকে জমা রাখতেন।

তিন চার বছরে তা জমে ভালো অংকের টাকা হয়ে গিয়েছিল। সে টাকার খবর কোনভাবে শুনে গিয়েছিল নাইমের বউ রিনা। তারপর থেকে শ্বাশুড়ির সাথে ভাব জমাল। নাইমের ব্যবসা লসের গল্প শুনাতে লাগল। 


খালা সবকিছু মায়ের সাথে পরামর্শ করেন। ছেলের মনোভাব খালা ছাড়া মোটামুটি সবার কাছেই পরিস্কার।  

 আজকালকার যুগে বাবা মা দম ছাড়বার পর কান্নার বদলে সম্পত্তির দলিল বসে ছেলেমেয়েরা। কে গেল থেকে কী রেখে গেল, জানা বেশি জরুরি। সেখানে এই ঘটনা কাম্যই বটে। মা সতর্ক করলেন,  


 "বয়স পড়ে আছে। এত কাজ আর কদিন করতে পারবে। টাকা থাকলে শেষবয়সে কাজে আসবে। ছেলেকে সব দিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পরে যদি ছেলে না দেখে!" 


ছেলে অন্তপ্রাণ খালা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জবাব দিলেন, "মা তো, জন্ম দিছি, কত কষ্টে পালছি, বড় করছি। মোর খুব আদরের পোলা, তার কষ্ট সইতে পারিনা। নিষ্ঠুর হইতে পারিনা। " 


মা খালাকে বুঝালেন। খালা বুঝ নিলেন। কিন্তু কথায় আছে, সরল মানুষ বিশ্বাসেই ঠকে। খালা সরলমনা মানুষ। অল্পতেই মানুষকে বিশ্বাস করে ফেলেন। অবিশ্বাস তো পরকে করা যায়, নিজের রক্ত, নিজের জন্ম দেয়া সন্তানকে অবিশ্বাস করা যায়! 


আমাদের কাছে ছেলের জন্য খালার ভালোবাসা বাড়াবাড়ি লাগলেও, কেবল খালাই জানেন এই ছেলেকে তিনি কত কষ্ট করে অর্জন করেছেন। পনেরো বছরের অপরিপক্ক শরীরে ন'টা মাস গর্ভে ধরে রেখেছেন। ছেলের বুঝ হবার আগেই বাবা মারা গেল। তখন তো বাবা মায়ের ভালোবাসা একাই দিয়েছেন। এই ছেলের জন্যই অজপাড়াগাঁয়ের এক মেয়ে অচেনা শহরে পা রেখেছে। ছেলের জন্মের পর ছেলে ছাড়া নিজের কথা মাথায় আসেনি। তার বেঁচে থাকা, তার পৃথিবী মানেই ছেলে। সন্তানের প্রসঙ্গে কি মা স্বার্থপর হতে পারে? সন্তানকে ফেলে নিজের কথা ভাবতে পারে? আমরা হয়তো দূর অবস্থান থেকে ঠিকই বিচার করতে পারব, কিন্তু কাছে গিয়ে খালার অবস্থানে বসলে শক্ত থাকার শক্তি আমাদেরও থাকবে না। সন্তান হিসেবে মায়ের ব্যাপারে আমরা স্বার্থপর হতে পারি কিন্তু মা হিসেবে সন্তানের ব্যাপারে স্বার্থপর হতে পারি না। মায়ের ধর্মই যে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।  


ছেলের জন্য খালার অবিশ্বাস এলো না। বিশ্বাস এলো। সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রইল না। ছলে বলে কৌশলে চেক বইয়ে তার আঙুলের ছাপ পড়ে গেল। কদিন ভালোই চলল।  

ছেলের ব্যবসা ঘুরে দাঁড়াতেই ছেলে, ছেলেবউয়ের মনোভাব ও ঘুরে দাঁড়াল। ফিরে গেল আগের স্থানে। নাক ছিটকাল রিনা। এমন ব্যাকটেডেড মানুষ নিয়ে উঁচু সমাজে চলা যায়! সবাই যদি জেনে যায় তার শ্বাশুড়ি কাজের বুয়া। বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করে। মানসম্মান থাকবে? থাকবে না। ব্যবসায়িক সফলতা মনে করিয়ে দিল সেটা। তারপর যা হবার তাই হলো.... মায়ের বিশ্বাস ভাঙল আরও একবার। 


মায়ের এত আত্মত্যাগের পর ও 'স্বার্থপর' এর দায়টা খালার উপর গেল! এই ছেলের বিবেকবোধ নেই! 

 আমরা ভেবেছিলাম, মায়ের বোঝা ঘাড় থেকে নামানোর জন্য বিয়ে দিচ্ছে নাইম। কিন্তু এখন দেখি সেখানেও সমস্যা। সমাজের কাছে না কি টেকা যাচ্ছে না। কোন সমাজে সমাজে সে রেখেছে মাকে! মা দিয়েই গেল, মাকে কিছু দেয়নি। বিয়ে করে থিতু হলো, সেও সহ্য হলো না। একটুখানি কৃতজ্ঞতাবোধ ও কি নেই! 


আমার স্বরে অজস্র প্রতিবাদ, অথচ আমি টু শব্দ ও করতে পারিনি। বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। খানিক বাদে রাগ নিয়ে বললাম,

"খালা স্বার্থপর! ভেবে বলছো তো!" 


নাইম অপ্রস্তুত হলো। তারপর হনহন করে চলে গেল। নাইমের ক্ষুব্ধতা দেখে আমার চিন্তা বাড়ল। খালা কি একা একা বিয়ে করলেন! 


খালার বিয়ের রহস্য উন্মোচন হলো খালার আগমনের পর। একদিন হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরে দেখি বসার ঘরে খালা বসা। সারাদিন রোগী দেখে ক্লান্ত বিধ্বস্ত আমি প্রথমে খেয়াল করিনি। কারণ অবশ্য খালার চলনবলন। আমি খালাকে সবসময় সাদামাটাভাবে চলতে দেখেছি। 


দুই ইদে মা খালাকে ভালো কাপড় দিতেন। কিন্তু খালার পছন্দ হতো সেই সুতির কাপড়। খালার গায়ে কখনো সোনার গহনা দেখিনি। মুখে বিষন্নতা, একটা দুঃখী, মলিনতা থাকতো। কিন্তু এই মহিলার ভাব ভিন্ন। পরনে চান্দেরি সিল্ক ফেব্রিকের শাড়ি। গলায় হাতে অলংকার বেশ। মুখে ঝুলছে হাসি। হেসে হেসে মায়ের সাথে গল্প করছেন। খালার কথা খেয়াল হতেই আমি চক্ষুচড়ক। 


আমাকে গিয়ে বললাম, " খালা না কি! ভালো আছেন?" 


বিপরীতে খালা সুন্দর করে হাসলেন। খালার এই হাসি আমি আগে কখনো দেখিনি। চেহারা ঝলমলে। সুখী মানুষের চেহারায় অন্যরকম এক উজ্জ্বলতা থাকে। খালার চেহারায় সেই উজ্জ্বলতা ভাসছে। খালার চোখমুখ বলছিল, খালা সুখে আছেন। 


বহুকাল ধরে কোন মানুষকে দুঃখী হয়ে থাকতে দেখার পর হুট করে তাকে সুখী হতে দেখলে মনের মাঝে অন্যরকম এক আনন্দ কাজ করে। চোখে শান্তি মিলে। খালার ওই সুখী মুখটা দেখে আমার মনে হলো, অনেকদিন, অনেক বছর পর আমি এমন সুন্দর দৃশ্য দেখিনি। খালা প্রসন্ন সুরে বললেন,

" আলহামদুলিল্লাহ ভালা আছি।" 


"ওখানে কোন সমস্যা হচ্ছে না তো?" 


খালা প্রসন্ন সুরে বললেন, " না, আল্লাহ আমারে সম্মানে রাখছে..


 দ্বিতীয় বিয়েতে ভালোবাসার থেকে সম্মানটাই ঢের কাম্য। খালা তা পেয়ে প্রসন্ন হয়ে গেছেন। তা দেখে পুলকিত হলো মন। 

খালার সুখমাখা অবতারে অবতারণে বাসায় খুশির জোয়ার বয়ে গেল। সবাই এসে বসল বসার ঘরে। আমি বললাম, 

"এতকাল আপনার দুঃখের গল্প শুনেছি, আজ শুনব আপনার সুখের গল্প। " 


খালা মায়ের দিকে তাকালেন। খালার গল্পটা মা বললেন। আকস্মিক খালার জীবনে হানা দেয়া সুখের গল্প। শুনবার সময় মনে হলো এ যেন কোন সিনেমার গল্প। পরে মনে হলো সিনেমা তৈরি হয় বাস্তব জীবন থেকে।  


খালার দ্বিতীয় বিয়ের সুত্রপাত নানুবাড়ি থেকে। বছর খানেক আগে খালাকে নিয়ে আমার নানুর গ্রামের বাড়িতে যান। বাবা ব্যস্ত, সাথে যাবেন না। মা একা যেতে নারাজ, বগলদাবা করে নিয়ে গেলেন শিউলি খালাকে। কটাদিন থেকে এলে তারও ভালো লাগবে। 


নানু বাড়িতে গিয়ে দেখা হলো একটা বছর দশের বাচ্চা মেয়ের সাথে। মলিন, বিষাদ, দুঃখ ভাসা চেহারা। মায়াময় চোখে জল দেখে খালা কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 

"কী হইছে মা? কানতাছো ক্যান?" 


মমতাভরা স্বর শুনে মেয়েটার কান্না বাড়ল। কেঁদে কেঁদে বলল, 

"মায়ের কথা মনে পড়তেছে।" 


"কী হইছে তোমার মার?"


মেয়েটা উত্তর দিল না, ডুকরে কেঁদে উঠল। খালা অনুসন্ধানী মনে জানলেন, মেয়েটার মা মারা গেছে। মা হারা মেয়ের কাতরতা দেখে বিধ্বস্ত খালার মনে হলো, তার দুঃখ অতি নগন্য। মমতাময়ী খালা মমতায় গা ভাসিয়ে মেয়েটাকে সান্ত্বনা দিলেন। কান্না থামার পর আলাপ হলো মেয়েটার সাথে। 


মায়ের দূর সম্পর্কের এক ভাইয়ের মেয়ে। নাম রোদেলা। রোদের মতোই উজ্জ্বল ছিল তার জীবন। বাবা মা আর সে, তিনজনের সুখী পরিবার। হঠাৎ মায়ের ক্যান্সার হলো। অকালেই মারা গেলেন। মায়ের মৃত্যুর পর জীবনটাই এলোমেলো হয়ে গেল। মায়ের ছায়ায় বড় হওয়া মেয়ে, মায়ের শূন্যতায় মনমরা হয়ে থাকে সারাক্ষণ। নাতনির এই অবস্থা দেখে দাদী ছেলের দ্বিতীয় বিয়ের কথা বললেন। রোদেলার বাবা তড়িৎ মানা করে দিলেন। নতুন বউ যদি তার মেয়েকে মানতে না পারে! যদি তার মেয়ের অনাদর হয়? সৎ মায়ের সংজ্ঞাতেই তো দোষ।


দাদী এবার নাতনিকে ধরলেন, বাবারে কও, নতুন মা লোইয়্যা আইতে। হ্যায় তোমারে আদর করবো। 


রোদেলা বাবাকে বলতেই বাবা বললেন,  

"তোমার জন্য আমিই যথেষ্ট। আমিই বাবা, আমিই মা। এসব কথা আর মুখে এনো না। মায়ের কোন রিপ্লেসমেন্ট হয়না। " 


মাকে মনে পড়লে রোদেলা বাবার কাছে গিয়ে কাঁদে, মাকে এনে দাও না বাবা! 

বাবা খুব অসহায় হয়ে যান তখন। ম'রে যাওয়া মাকে কি আনা যায়? তিনি সর্বোচ্চ আদর দেন মেয়েকে। কিন্তু মায়ের অভাব তবুও যায়না। রোদেলার দাদীও বুঝাতে থাকেন। শেষমেষ বিয়ে করবার জন্য রাজী হন তিনি। তবে শর্ত থাকে। পাত্রী পছন্দ করবে রোদেলা। সে যদি কারো মাঝে মমতা খুঁজে পায়, মায়ের ছায়া খুঁজে পায়। তবেই তিনি বিয়ে করবেন। 

রোদেলার মা খোঁজার পর্বে নানুবাড়িতে হাজির হলেন শিউলি খালা। 


সেবার মা খালাকে নিয়ে দিন দশেক ছিলেন নানুবাড়িতে। তখন খালা রোদেলার সাথে সময় কাটিয়েছেন অনেক সময়। এতটুকু একটা বাচ্চা মেয়ের দুঃখ দেখে খালা মায়ায় পড়ে গেছিলেন। আদর করেছেন বেশ। 


দুটো বিষয় নিশ্চিত করি, 

এক, রোদেলাকে আদর করার পেছনে খালার কোন উদ্দেশ্য ছিল না। খালা জানতেন না, রোদেলার মা খোঁজার ব্যাপারে। 

দুই, খালা পরিপাটি হয়ে থাকতেন। সাদামাটাভাবে চলতেন, তবে ছেঁড়া কাপড় পরতেন না।  


রোদেলার মন খারাপের বেলায় খালার মমতা দেখে রোদেলার মনে খালা জায়গা করে নিয়েছিলেন বটে। 

রোদেলার দাদী মাকে প্রস্তাব দিয়ে ফেলেছিলেন। মা অবশ্য তখন খালাকে জানাননি। খালাকে নিয়ে ফিরেছেন। 


ঢাকা আসার পরে খালাকে জানান। শুনেই খালা মানা করে দেন। ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়। প্রথম বিয়ের অসম্মান, অমর্যাদা, অসামঞ্জস্যতা, অপূর্ণার পর খালার জীবনে সুখ হারিয়ে গিয়েছিল।

দ্বিতীয়বার কাউকে জীবনে জড়ানোর সাহস নেই খালার। তাও এই বয়সে এসে! 


খালার প্রত্যাখানের করে ক্ষান্ত হন। মা খুব করে চাইছিলেন খালার একটা গতি হোক। মা রোদেলার পরিবারকে চিনেন। ভদ্র নম্ব বেশ। রোদেলার বাবা রেজা হাবিব খুব ভালো মানুষ। গ্রামের সহজ সরল মানু্ষ। প্রথম বউয়ের সাথে কখনো গলা উঁচু করেও কথা বলেননি। সেই পরিবারে গেলে খালার অসম্মান হবেনা, এটা নিশ্চিত থেকেই মা খালা বুঝাচ্ছিলেন। খালা বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে আসছিলেন। 


এরমাঝে ছেলে ছেলেবউ ভালো সাজল। খালা জীবনে সুখের ভ্রমে ডুবে গেলেন। তারপর ছেলে টাকা নিয়ে ছলনা করল। ছেলেকে নিয়েই সুখে থাকতে চেয়েছেন। কিন্তু ছেলেটা তাকে ঠকিয়ে গেছে বরাবর। সেবার খালার সব টাকা নিয়ে নাইম খুব খারাপ আচরণ করেছে মায়ের সাথে। খালা ভীষণ ভেঙে পড়েছিলেন। ভগ্নহৃদয়ে খালা বুঝে গিয়েছিলেন, এ ভুবনে তার কেউ নেই। যেই ছেলেকে তিনি আপন ভেবে এসেছেন, সে আপন না। সে প্রাচুর্যে ডুবে পর করেছে তাকে। আর আপন ভাবেনা। এই উপলব্ধি খালাকে শেষ করে দিচ্ছিল। নিজের জীবনটাই বৃথা মনে হলো। খালা নিজের মৃত্যু কামনা করতেন। 


খালার এই খারাপ সময়ে রোদেলা এলো ঢাকায়। আমি মনে করে দেখলাম, রোদেলা তখন খালার সাথেই থাকতো। খালা রোদেলার মায়ায় পড়ে গিয়েছিলেন। মেয়েটার সঙ্গ তাকে শান্তি ছিল, ছেলের ছলনা ভুলিয়ে দিল। জীবনের সাথে যুদ্ধ করতে করতে হাঁপিয়ে গিয়েছিলেন খালার। মা ছায়া হয়ে বুঝালেন। 

রোদেলার মায়ায় পড়েই খালা বিয়ের জন্য রাজি হয়েছেন। 


রোদেলার বাবার সাথে দেখা হয়নি তেমন। তিনি তো আর বাইশ বছরের তরুণী নয় দেখে পাত্র দেখাদেখি পর্বে চায়ের কাপে আলাপ সারবেন। দূর থেকেই দেখেছেন। খারাপ লাগেনি। 


আমাদের সবার অগোচরে খিচুড়ি পাকালেন মা। স্বভাবগতভাবেই মা বেশ চাপা স্বভাবের। তারউপর আমরা ভাইবোন সবাই পড়াশোনা, চাকরি নিয়ে ব্যাস্ত। সারাদিন বাইরে থাকি। সন্ধ্যেবেলা বাসায় ফিরি। শুক্রবারটাই সারাদিন থাকি। সারাসপ্তাহে বাসার খোঁজ থাকেনা। সে হিসেবে ব্যাপারটা এতটাও কঠিন না। 


এতে অবশ্য মায়ের সাথে বাবা ও শামিল ছিলেন। আমরা সবাই বড়ো হয়ে গেছি, এ বয়সে খালার বিয়ে কিভাবে নিব। এ জন্য খালা লজ্জায় ছিলেন। বিয়েটা হলো রোদেলার চাচার বাসায়। তিনি ঢাকা থাকেন। তারপর সুখ গায়ে মেখে খালা গেলেন শ্বশুরবাড়িতে। জীবনের বড্ড অবেলায় এসে খালার সংসার হলো, সন্তান পেলেন, সম্মান পেলেন। রেজা মামা স্বামী হিসেবে ভালো। খালাকে সম্মান করেন। কদিন মেয়ের সাথে খালার ভাব থেকে তিনিও ভীষণ ঝুকেছেন খালার প্রতি। এখন তাদের সংসারটা সুখের বটে। 


ও হ্যাঁ, নাইমের কথা বলা হয়নি। আসোলে সুখের অধ্যায়ে দুঃখের সুতো টানা অন্যায়। তাই সে প্রসঙ্গ বাদ গেল। খালার বিয়ের প্রস্তাব খালাকে দেয়ার পর মা নাইমের সাথে আলাপ করেছেন। শুনেই নাইম চটে গেল। মাকে তেমন কিছু না বললেও, খালার বাসায় গিয়ে খুব অপমান করেছেন। মা পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলার পরেও নাইম ধারণা করেছে, মা নিজেই স্বামী খুঁজে নিয়েছে। 

নাইম খুব খারাপ ভাষায় গালাগাল অবধি দিয়েছেন। ছেলের ব্যবহার দেখে খালা ফের বেঁকে বসেছিলেন। বিয়ে করবেন না। 

নাইম বিয়েতে ও আসেনি। ছেলের কথা বলতে গিয়ে খালার সুখমাখা মুখে ফের জল এলো। ছেলেটা তার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। ফোন দিলে ফোন ধরেনা। দুই একবার তুলে খুব অপমান করেছে। 


এমন না যে, বিয়ে ভেঙে দিলে নাইম মাকে দেখতো। না দেখতো না। এত কাল দেখেনি, এখন কী দেখবে। নাইম থাকে খালার আশার কিছু নেই। পূর্বাকার সময়ে নাইমের আচরণের পর খালার দ্বিতীয় বিয়ের সিদ্ধান্ত যথাযথ।  


খালার সুখ দুঃখের গল্পের মাঝে কলিংবেল বেজে উঠল। আমি গিয়ে দরজা খুললাম। লিলেন ফ্রক গায়ে একটা মেয়ে চঞ্চল গলায় বলল, 

" আমার ছোটমা কি আপনাদের বাসায়?" 


ভীষণ আন্তরিকতা নিয়ে বলল মেয়েটা। চোখ মুখ উজ্জ্বল। রোদের মতোই। আমি হ্যাঁ বলতেই, দৌড়ে ভেতরে ঢুকল। শিউলি খালাকে দেখে ডেকে উঠল,

"ছোটোমা?" 


খালা তখন ছেলের দুঃখে কাঁদছিলেন। সেই কান্নার মাঝেই মেয়েটার ডাকে হেসে ফেললেন। হাত বাড়ালেন। মেয়েটা বুকে খালার বুকে পড়ল। খালা আগলে নিলেন। মাথায় চুমু খেলেন। খালার চোখে ছেলের জন্য জল, ঠোঁটে মেয়ের জন্য হাসি। 

রোদেলা বলল,

"বাবা নিচে দাঁড়িয়ে আছে, তাড়াতাড়ি যেতে বলেছে। আজ আমরা ঘুরতে যাব।" 


খালা চোখের পানি মুছে ফেললেন। চোখ থেকে জল সরলেও ঠোঁট থেকে হাসি সরল না। খালার হাসিটা টিকল। সেই সুন্দর, সুখের হাসি। যে হাসি আমরা এতকাল দেখিনি। 


আমার মন বলল, খালা সুখে আছেন। খালার প্রথম জীবনে সুখ, শান্তি, সম্মান, সংসার কিছুই মিলেনি। দ্বিতীয় জীবনে মিলল। দ্বিতীয় বিয়ে, দ্বিতীয় জীবনে প্রথম সুখ মিলল। খালাও সুখের দেখা পেলেন। 


যার প্রথম জীবন দুঃখে কাটে, তার দ্বিতীয় জীবন সুখের কাটে। 


সমাপ্ত....


শেষ কথা- খালার ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয়তা রক্ষার্থে কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়েছে। তবে এটা নিশ্চিত যে, খালা দ্বিতীয় বিয়ের পর সুখে আছেন। খালার শেষ হাসিটা সুখের এখনো।

দ্বিতীয়_বিয়ে  । ( পর্ব-১)

দ্বিতীয়_বিয়ে । ( পর্ব-১)




Writing By 


আফিয়া খোন্দকার আপ্পিতা। 

পর্ব-১
 কদিন ধরে কাজের খালা আসছে না দেখে ফোন দিয়ে জানা গেল, খালার বিয়ে হয়ে গেছে। শুনে বেশ অবাক হলাম। খালার বয়স পয়তাল্লিশ। ছেলে ও বিয়ে করিয়েছেন। নাতির বয়স পাঁচ। এমতাবস্থায় বিয়ে করাটা বেশ বিস্ময়ের বটে। 


খালা আমাদের বাসায় প্রায় ২৫বছর ধরে কাজ করেন। 

আমার বুঝ হবার পর থেকে খালাকে আমাদের বাসায় কাজ করতে দেখছি। খালার মুখেই শুনেছি তার করুণ জীবনবৃত্তান্ত। 

 খালার প্রথম বিয়ে হয়েছে পনেরো বছর বয়সে। তাও তার চেয়ে তিনগুন এক লোকের সাথে। হতদরিদ্র বাবা বড়ো ঘরের সমন্ধ পেয়ে বাছ-বিচার ছাড়া মেয়ে তুলে দিয়েছেন দুই বাচ্চার বাবার কাছে। এলাকার প্রভাবশালী ব্যাক্তি, তালুকদার বংশ। নাম যশ খ্যাতি, অঢেল অর্থবিত্ত, কিছুরই কমতি নেই। রাজকীয় বাড়ি যার নামে, নাসির তালুকদার। 


দুই ছেলেমেয়ে। বিয়ে-শাদী দিয়ে যে যার মতো আছে। ছেলেটা থাকে শহরে, মেয়ে বিদেশ পাড়ি দিয়েছে। মা মরবার পর এ মুখো হয়না। সংসারে ঝুট ঝামেলা নেই। অত বড় বাড়ি খা খা করছে। মণি মুক্তো দেখার কেউ নেই। বিয়ের পর সব তো মেয়েরই হবে। মেয়ে রাজরানী হয়ে থাকবে। পাত্র দেখতে শুনতেও বেশ। কেবল বয়সটাই একটু বেশি । পঞ্চাশ পেরিয়ে ষাটের ঘরে এগুচ্ছে। এ আর এমন কী বয়স? পুরুষ মানুষ ২৫হোক আর ৫০, সে একই কথা। মতি মিয়া অমত করবার দিক খুঁজে পাননি। প্রস্তাব আসতেই নির্দ্বিধায় হ্যাঁ বলে দিয়েছেন।


  আশি দশকের কিশোরী মেয়ে শিউলি। সে মত দিল কি দিল না সে কথা ভাবার সময় কোথায়? ওত বড় ঘরে সমন্ধ হলে নিজের ও দিন ফিরবে, এই খুশিতে মেতেই কূল পেলেন না। এক শুক্রবার সমাজের লোকজন ডেকে পঞ্চদশী শিউলির হাত তুলে দিলেন পঞ্চাশোর্ধ নাসিরের হাতে। 


বিয়ের পরের দিন দাওয়াত হলো তালুকদার বাড়িতে। মাকে দেখে শিউলি কেঁদেকেটে বলল, মা আমি থাকব না এখানে। আমাকে নিয়ে যাও। লোকটা খুব খারাপ। 


মা ধমকে উঠলেন, স্বামীর নিন্দে করতে নেই। খারাপ হোক ভালো হোক, এখন থেকে উনিই তোর সব। এটাই তোর বাড়ি। মানিয়ে নে। 

দাদী বললেন, মাইয়্যা মানুষ স্বামীর ঘরে বউ হইয়্যা আহে, , লাশ হইয়্যা যায়। আর কোন যাওন টাওন নাই। মনে রাহিছ। 


 রাজভোগে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে বিদায় নিলেন তারা। যাবার কালে শিউলি কত আকুতি করল সাথে নেবার। কেউ নিল না। যদি আর না আসে! সংসারে মন বসে গেলে পরে যেতে পারবে। 


শিউলি বেগম সেদিনই বুঝে গেলেন, এখন এটাই তার একমাত্র আশ্রয়। নিয়তি মেনে নিলেন, মানিয়ে নিলেন। প্রথম দিকে মন কাঁদল, চোখ ভিজল। ধীরে ধীরে অভ্যাস হয়ে গেল বুড়োমানুষটা। 

 বছর ঘুরতেই বমির ব্যামোতে সুখবর আলো। ন'মাস বাদে কোল আলো করে এলো পুত্রসন্তান। ছেলের মুখ দেখতেই শিউলি নিজের দুঃখ কষ্ট সব ভুলে গেলেন। ছেলের মাঝে সব সুখ খুঁজে পেলেন। বুকে আগলে পরম যত্নে ছেলেকে আগলে রাখলেন। 


শেষকালে পুত্রসন্তানের বাবা হবার সৌভাগ্যে খুশিতে আটখানা হলেন নাসির তালুকদার। গরু জবাই করে আকিকা দিয়ে নাম রাখলেন, নাইম। 


স্বামী, সন্তান, সংসার নিয়ে শিউলির দিন ভালোই কাটছিল। কিন্তু সুখ যেন ঠিক ছুঁয়েও ছুঁতে পারেনি। বিয়ের বছর পাঁচেক হতেই বার্ধক্যজনিত রোগে গত হলেন স্বামী। হেসেখেলে বেড়াবার বয়সে গায়ে জুড়ল সাদা শাড়ি, বিধবা উপাধি। ভালো হোক কি মন্দ, ওই মানুষটাই এতদিন ছায়া হয়ে ছিল শিউলির। এখন সেই ছায়াও চলে গেল। 


স্বামীর মৃত্যুর শোকের মাঝে এলো তার জীবনের আরেক ঝড়। আগের পক্ষের ছেলে এসে হাজির হলো। বাবাকে দাফন করে এসে বাবার রেখে যাওয়া সহায় সম্পত্তির দলিল বুঝে নিল ছেলে। ছেলে বউ বুঝে নিল শিউলীর আলমারিতে রাখা বংশীয় অলংকার, আঁচলের গিট খুলে নিল সংসারের চাবি। 


শুভ্র শাড়িতে ছেলেকে বুকে নিয়ে নির্বাক চেয়ে রইল শিউলি। সে স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ। 


রাতারাতি উকিল ডেকে সব সম্পত্তি নিজের নামে করে নিল নাদির। বোনকে অবশ্য দিল কিছু। পেল না কেবল বাবার শেষ বয়সের ছেলে। না সম্পত্তি আর না স্বীকৃতি। কড়া স্বরে ঘোষণা দিল, বাবার দেখভালের জন্যই ছিল। এখন বাবা নেই, তার ও প্রয়োজন নেই। এত ঝামেলা কাধে নিতে পারবেনা। 


শিউলির জায়গা হলো না তালুকদার বাড়িতে। এক প্রকার বের করে দেয়া হলো তাকে। ছেলেকে নিয়ে ফের এসে পড়লেন বাবার বাড়ি। সেখানে নুন আনতে পানতা পুরোয়। তার আগমনে বাবা মা ও খুশিতে হতে পারলেন না। মেয়ে, তার উপর নাতি, এ যেন বাড়তি ঝামেলা। 


আশি নব্বই দশকে একটা বিধবা মেয়েকে সমাজ মেনে নিতে পারতো না। সতীদাহ প্রথা উঠে গেলেও রেশ কিন্তু রয়ে গেছিল। বিধবাকে পুড়িয়ে মা'রতো না, তবে জীবন্ত মা'রতো। মৃত লাশ দাফন করা হতো, কিন্তু জীবন্ত লাশ রেখে দিতো। তাকে পদে পদে হেয় করা হতো, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হতো। তাকে অপয়া ভাবা হতো। কথার বাণে বিদ্ধ করে ক্ষতবিক্ষত করা হতো প্রতিক্ষণ। তার বাঁচা দুর্বিষহ করে তুলতো। 

 আত্মীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশীর কথায় কান ভারি হলো। কদিন যাবার পর মা বোন ও কথা শুনাতে লাগলেন। উঠতে বসতে কটু কথা কানে এলো পরিবার থেকে। শিউলির বুঝে গেলেন, এখানেও ঠায় হবে না তার। 


তখন শিউলির বয়স ২০, ছেলের বয়স ৫। বাস্তবতা বুঝবার ক্ষমতা শিউলির হলেও বাচ্চাটার হয়নি। জমিদার ঘরের ছেলে। আভিজাত্যে বেড়ে উঠা। তিন বেলা মাছ মাংস খাওয়ার অভ্যাস নাইমের। নানা বাড়ির পেঁয়াজ, মরিচ দিয়ে পান্তাভাত তার গলা দিয়ে নামে না। ছেলেটা খেতে পারে না, মাংসের বায়না করে। শিউলি এনে দিতে পারেন না। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে যায়। খাওয়া অনিয়মে অল্প কদিনে ছেলের শরীর ভেঙে আসে। 


ছেলের দিকে তাকালে চোখে জল নামে শিউলির। কী করবে না করবে দিশেহারা লাগে। অজপাড়া গাঁয়ের অশিক্ষিত মেয়ে, জীবিকা নির্বাহ করবার পথ খুঁজে। ছেলেকে বাঁচাতে হবে তার। এখান থেকে পালাতে হবে, এ সমাজ বাঁচতে দিবেনা তাকে।  


সেই তাগিদে পা বাড়ান ঢাকায়। বস্তিতে আশ্রয় নিয়ে, মানুষের বাসায় কাজ জোগাড় করেন। 


খালা তখন থেকে আমাদের বাসায় কাজ করেন। ছেলেকে নিয়ে আসতেন। খালার মুখে কেবল একটাই নাম থাকতো, আমার নাইম। খেয়ে না খেয়ে ছেলেকে মানুষ করতে লাগলেন। মানুষের বাসায় কাজ করে, পড়ালেন ছেলেকে। আমাদের বাসায় ভালোমন্দ রান্না হলে, খালা কখনো খেতেন না। বলতেন, আমার ভাগেরটা দিয়ে দিন, আমার ছেলেটা খাবে। নিজে খেতেন না, দু'বেলা ছেলেকে খাওয়াতেন। ছেলের খুশিতেই খালার খুশি। খালার গায়ের কাপড় যত মলিন, ছেলের কাপড় তত উজ্জ্বল। ছেলের দিকে চেয়ে খালা কত কিছু বিসর্জন দিলেন, কত সংগ্রাম করে গেলেন। 


খালা আত্মমর্যাদা ছিল প্রখর। এত বাধাবিপত্তির পর ও কারো দয়া নেননি। নিজে কাজ করে ছেলের খরচ চালাতেন। 


স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে ছেলে বায়না ধরল শহরের বড় কলেজে পড়বে। খালা আর ক'টা বাসার কাজ বাড়িয়ে নিলেন। রাতদিন খেটেখুটে ছেলেকে পড়ালেন। খালার আশা ছেলে একদিন বড়ো চাকরি করবে। মাঝে মাঝে বলতেন, 

"বুঝলা মা, শরীরডা আর কুলায় না। গিটে গিটে ব্যাথা। পোলার চাকরি হইলে এই কাম ছাইড়া দিমু। আমাগো সুখের দিন আইব।" 


সেই সুখের দিন এলো। ছেলের চাকরি হলো। বস্তি থেকে বাসায় উঠল। খালা বিদায় নিতে এসে উৎফুল্ল হয়ে বললেন, "আমার সুখের দিন আইসা গেছে। দোয়া কইরো।" 


খালার সুখ দেখে আমাদের স্বস্তিই মিলল। সেই স্বস্তি উবে গেলে মাস তিনেক বাদে। একদিন ফোলামুখ নিয়ে খালা এলেন বাসায়। গায়ে মারের দাগ। কাতর গলায় মাকে বললেন,

"আমারে কাজে লোইবেন আপা?" 


মা অবাক হয়ে বললেন, " তুমি কাজ করবে কেন? তোমার ছেলের কতবড় চাকরি! " 


ছেলের কথা আসতেই খালা ডুকরে উঠলেন। ভেজা গলায় বললেন,

" আমার পোলাডা বদলাইয়্যা গেছে, আপা। বউ আমার গায়ে হাত তুলল, পোলা চাইয়্যা চাইয়া দেখল।" 


যে ছেলের জন্য মানুষটা নিজের সুখ শান্তি বিসর্জন দিয়েছে, সেই ছেলে এই প্রতিদান দিল! জানা গেল, ভার্সিটিতে পড়ার সময় এক জুনিয়রের সাথে মন দেয়া-নেয়া হয়েছিল। ভালো চাকরি পেয়ে বিয়ে করে বউ ঘরে তুলেছে। শিউলি খুশিমনেই মেনে নিলেন। কিন্তু বউ তাকে মানতে পারল না। সংসারে শ্বাশুড়ির উপস্থিতি পছন্দ না তার। বরের কান ভাঙিয়ে কদিনেই মায়ের প্রতি বিতৃষ্ণা তৈরি করিয়েছে। শ্বাশুড়ির সাথে খারাপ ব্যবহার করতো। হাত ও তুলতো। শিউলি ছেলেকে বলার সুযোগ পেতেন না, তার আগেই ছেলের কান ভারি করতো বউ। ঘটনা এমনভাবে উপস্থাপন করতো, যেন সব দোষ শিউলির। নিত্যকার কলহে ছেলেও অতিষ্ঠ মায়ের প্রতি। 

সংসারে সুখ আনতেই বিরক্তির ভাঁজ ফেলে নাইম বলল, 

"রোজ রোজ এত অশান্তি ভালো লাগেনা, মা। তুমি অন্য ব্যবস্থা করো। "


পোড়া কপালের ছাই তুলে বেরিয়ে গেলেন শিউলি। দ্বিতীয়বারের মতো উঠলেন বস্তিতে। একবার ছেলেকে বাঁচাতে, আরেকবার ছেলের থেকে বাঁচতে। 

সুখের দিন এলেও সুখ তাকে ছুঁতে পারল না এবারও। 


তারপর থেকে খালা আবার বাসায় কাজ করেন। জীবনের এত উত্থান পতনের মাঝেও খালা কখনো দ্বিতীয় বিয়ের নাম নেননি। তবে এখন কী এমন হলো যে খালা বিয়ে করে নিলেন? 




চলবে.....


বাস্তবিক ঘটনার নিরিখে ছোট্টো একটা গল্প। আগামী পর্বে শেষ হবে।

শুক্রবার, ২৪ মে, ২০২৪

অনুগল্প : ডিভোর্সি বউ  ভালোবাসা

অনুগল্প : ডিভোর্সি বউ ভালোবাসা

Waiting: মি হাসিব

 'ডিভোর্সের ২ মাস পরে অগ্র প্রাক্তন ফোন 

দিয়ে বলতেছি। "জান জানা আছো।


'আশ্চর্য হলাম তার কথায়।

কিন্তু আমি তাকে না চেনার ভান 

আপনি কি বলতে চান?


'আরে আমি তোমার বউ অহনা।

আমার কন্ঠ বন্ধু চিনতে পাচ্ছো তুমি।


'আমার বউমান। 

আপনার সাথে আমার ২ মাস আগ ডি*ভোর্স হয়েছে


'হ্যাঁ তাই কি?

আমি তোমার বউনা বলো।


'নাটক 

ভালো লাগতেছে। কি বলতে চাও সেইটা আগে 

আমাকে প্রচার বল? (সরি বলুন)


'ভালোবাসি।


'ফাজলামি করার জায়গা পাননা। তাই আমাকে ফোন

দিয়ে ফাজলামি করতেছেন।


'সত‍্য আমি ভালোবাসি।

আমি ভূল করে ফেলছি আমাকে অনুরোধ করছি।


'সত‍্য অহনা আপনি অনেক সুন্দর নাটক জানেন।

যদি দেখতে দেখতে ভাবতেন।

তাহলে ২ মহিলার জন্য নেওয়ার পর পুরুষ 

হাত ধরে কখনো ধরেন না।


'বিশ্বাস করো।

আমি আমার ভূলটি বুজতেছি। আমার সন্তানদের কাছে ফিরে যেতে চাই।


'বুজলাম।

কিন্তু আপনার স্বামী কি হবে।

যাকে বিয়ে করে সংসার করতে তুমি।


'ওর সঙ্গেও আমার ডিভো*র্স হয়েছে।

আমি আবার নতুন করে কিছু করতে চাই।

আমার সুখের সংসারে ফিরাই নাও প্লাজ।


'স্ত্রীর এমন আকুল আবেদনে স্বামী কিছুক্ষন নিস্তব্ধ 

হয়ে যায়।

এবং বলে "ঠিক আছে ফিরে এসো।


'সত্য যাবো।


'হ্যা সত্যি ফিরে আসো। 

একটি সুযোগ দিতে আমি চাই। শুধুমাত্র 

আমার সন্তানের কারনে। আমি চাই না আমার সন্তান 

তার আমেরিকা আদর থেকে বন্চিত


'স্বমি কখনো আমি এমন ভূল আর না।

সত্যি আমি লজ্জি*ত।


'আমি তোমার বতর্মান স্বামী না।

যদি আমাদের সম্পর্ক ঠিক হয় তখন হবো। আমরা আমাকে স্বামী বলিওনা।

আর একটি কথা আমাদের ইসলামে একটি দিকে নিদর্শন আছে। ডি*ভোর্সি স্ত্রী কে কখনো কখনো নিতে হবে না আমি এখনও আমার সন্তানের মুখের দিকে এগিয়ে নেই।

(ভুল হলে ক্ষমা করবেন)


'হ্যাঁ মন্তব্য করছি। 


'আল্লাহ হাফেজ।

আমি সব কিছু ঠিক করতে ব‍্যবস্তা করতেছি।


'হুম।


'আসলেই পুরুষের ভালোবাসা।

আত্ত্যগ বুজি এমনি হয়।



Romantic story

Romantic story

লেখা: সুবর্ণা শারমিন নিশি


নিশা যদি আজ জানতে পারেন যে রায়হান এখনও বাড়ি খুঁজতে পারেননি তাহলে সম্ভবত তাকে চিবিয়ে খাবেন। অফিসে প্রচন্ড কমিউনিটি প্রেশারে এসির সীমাও এই চিন্তা রায়হানের ঘাম ছুটিয়ে দিচ্ছিল। ওদের বিয়ে হয়েছে কেবল চার মাস। যদিও বাইরের পরই নিশাকে নিয়ে রায়হান একটা ছোট্ট একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে শুরু করে কিন্তু উত্তর দিতে যাচ্ছে তাই। বোঝাতে থাকে কানাডায়, কেয়ারটেকের হাতে পানির সমস্যা, এর সমস্যা, ফ্ল্যাটর থেকে সিঁড়ি শুরু করে অনেকটাই নোংরা দিয়ে ভরা, হাবিজাবি এলাকান সমস্যা। নিশা কোনোভাবে মাস তিনেক পার করে রায়হানকে এক কথা বলে সে আর ঐ ফ্ল্যাটে, রায়হান যদি নতুন বাড়ি না থাকে তাহলে আর চিরকালের মতো হারিয়ে যাবে। নিশার এই এক অভ্যাস, খুব জেদি, অনেকটাই রেগে যায়। ঘরের সাথে চিরকালের মতো হারিয়ে যাওয়া কি সম্পর্ক, বুঝতে পারে না রায়হান। এক মাস প্রায় শেষ হতে চললো রায়হানের অফিসের চাপ এতই যে বেরোবে বাড়ি খুঁজবে সেই উপায় নেই। 

-কি কথা রায়হান ভাই এই নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়াতে ঘামছেন কেন? মিট মিট করে হাসছে কলিগ তানিয়া , মেয়েটা ইচরেপাকা কিন্তু মনটা খুব ভালো আর মিুক।
-আর বোলো না তানিয়া জানোই তোর বাড়ি বদলাতে হবে আর এটা কি মুখের কথা!
-উফ রায়হান ভাই! আপনি না ব্যাকেডেটেড হয়ে যাবেন থেকে এখন তো ফেসবুকেই টুলেটের প্রস্তাব দেওয়া হয়। আপনি ওখান থেকে ছবি দেখবেন, ভিডিও দেখবেন, ফোনে কথা বলবেন, পোষালে যাবেন বাড়িওয়ালা সমস্যা শেষ।
-তাই, কি বোলো!
-হ্যাঁ এই তো খারাপন না, তানিয়া মোবাইল ফোনটা ধরলো 
রায়হান দ্রুত নিজের ফোন থেকে শুরু করতে কয়েকটা বাড়ি পছন্দ করা। কিন্তু একটা জায়গায় গিয়ে সে ইন্টেন্টে গেল। ফ্ল্যাট্যাটের ঘরের ছবি বাথ রুমে রান্নাঘর বারান্দার ছবি সুন্দর করে সাজানো কিন্তু আমার ক্যাপশনটা দেওয়া হচ্ছে নিরিবিলি ভাড়াটিয়া চাই নিরিবিলি বাড়ির জন্য। বাড়ির নামটাও" নিরিবিলি" কি অদ্ভুত! অফিস একবার যেতে যেতে হয়। 
এই রায়হান খান আছে নিরিবিলি জবাব আশরাফ সাহেবের বক্তব্য। ভদ্রলোক-বিপত্নীক, একা থাকেন, একটা ছেলে আছে, পুরানো ৪০ এর আশেপাশে। আগে ঢাকা ইউনিভার্সি ফিজিক্স পাঠেন, স্বেচ্ছায় অফিস থেকে অবসরের।
ভদ্রলোক চশমাটা ঠিক করে নিয়ে রায়হানের দিকে এগিয়ে বললেন,
- আপনার ফ্যামিলিতে কে আছে?
- আমি আর আমার স্ত্রী 
-বাচ্চা?
- না শিশু আমাদের বিয়ে হয়েছে কেবলমাত্র মাস 
-ভালো হয়েছে, শিশুকা থাকলে চিৎকার চেঁচামেচি হয় আমার আবার পছন্দ না। রায়হান একবার ভুরুচকালো। বাচ্চাকাচ্চা নাই এমন না যে তাদের কখনো বাচ্চা হবে না। এখন তাদের এই প্ল্যানের বৈশিষ্ট্য নেই। তা ছাড়া বাড়িটা সুন্দরভাবে, সামনে অনেকখানি খোলা জায়গা, দোতলা বাড়ি ভদ্রলোক দোতা থাকে। নিচতলা টাকার ভাড়া, কারণ যা যাচ্ছে পয়সারে ভুল বোঝায় উনার, নিতান্তই খালি পড়া দরকার নেই তাই বড় বাড়ি ভাড়ার নাম লেখার কারণ এতটা ভাড়ায় রায় রায়হানের কিছু শর্ত আছে যেমন দোলায়ঠা যাবে না, ছাদ ঘটনা, চিৎকার। চেঁচামেচি করা যাবে না, বেশি মেহমান আসা যাবে না, নিজের বাগানের ফুল যাবে না, এই হাবিজাবি।
এতগুলো শর্ত চালু করার পর রায়হান কোল ঝাঁজ বেরোতে বললে,
- আমি কি মনে করি তা জানতে না 
-প্রয়োজন নেই তোমার কাপড়চোপড় ,থাক বার্তার স্টাইল, বসার ভর্তা সমস্ত অ্যাক্টিভিটিস বলে তোমার ব্যবহার এই শারীরিক ভাড়া নিয়ে কঠিন করা হবে না।
রায়হান বাধা দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললো,
আগামীকাল আমার স্ত্রী নিশা এসে দেখবে, যদি তার পছন্দ হয় তাহলে কেবল কনফার্ম করা হবে, আপনার কোন সমস্যা আছে?
-নাহ, শুধু দোতালায় কারন না পাওয়া। ভালো করে উঠুন, আমার ছেলেটা আপনি চলে গেছে। চা অফার করতে পারলাম না দুঃখিত।
বাড়িওয়ালাকে রায়হানের পছন্দ হয়েছে সে তার লেখা এত ইন্ট্রোভার্ট মানুষ ভুলনি। 
পরদিন অফিস থেকে ফির নিশা ছুটে এসে রায়হানকে প্রায় ধরলো।
- শোনো ছেলে বাড়িটা আমার পছন্দ হয়েছে। কি সুন্দর বাগান আর খোলা জায়গা, আমরা উঠতে পারি, বাড়ি তো খালি পড়ে আছে। ছেলেটা যে কেয়ারটেকার ছেলেটা কি নাম ,ও মনে মনে সুন্দর আমার সাথে আমার কথা হয়েছে। আপনার পক্ষে সব কাজ করে, ভাড়া টাকাও আমাদের হাত দিয়ে যায়, ও বলেছে কালই আমরা উঠতে পারি, চলো না চলো না প্লিজ।
রায়হান নিশাকে বুকে চেপে ধরে ঠোঁট চেপে হাসতে লাগলো। কে বলে এই মেয়েটি অনার্স কমপ্লিট করেছে , স্বভাবে আর আচরণে এখনো শিশুই রয়ে গেছে৷ বাবা মা হারিয়েছে কতকাল আগে, চাকে মানুষ হয়েছে, রায়হানই আমাদের সব, রায়হান আরো শক্ত করে নিশাকে ধরলো।
নিরিবিলি বাড়িতে এসে নিশা প্রশাসন। এইবার অন্য সে সত্যকারের জন্য কোমর বেঁধে মাঝে মধ্যে গুছিয়ে ফেললো কয়েকটা। বাড়িটার সামনের খোলা জায়গায় সেলিকারিই কফি মগ হাতে নিয়ে শুনতে শুনতে হাঁটাহাঁটি করে। রায়হান আশরাফ সাহেব বুদ্ধহয় বিষয়টা পছন্দ করবেন না কিন্তু সে ভুল ছিল। তাদের কথাবার্তা ও শব্দগুলো দোতলা পর্যন্ত না অনেকটাই হয়। ভদ্রলোক দোতালায় একা একা কি করেন, কে শিক্ষার্থী? তবে উনার কেয়ারটেকারমনের কাছ থেকে যা জানা গেছে ভদ্রলোকের সুফি কিছু ভালোভাবে চেক করে কিছু ব্রেরী আছে ক্রমলাইন সেখানে আলোচনা করে, গভীর রাতের গানের প্রকাশন, খুব ঘনঘন চা ক খান সাথে সিগারেট যাকে বলা হয় স্কার। জীবনযাত্রার মন যখন খারাপ হয় তখন আপনার কম্পিউটারের কবরস্থান আছে সেখানে ওনার মা, বাবা, ছোট সেই পাঁচ বছর বয়সে পানিতে ডুবে মারার বন্ধু আর কবরের বিনিময়ে চুপচাপ বসে থাকে। আশরাফ সাহেবের আবেদন গুরু গম্ভীর আচরণের কারণ রায়হান এখন আলোচনা, ভদ্রলোক প্রকৃতপক্ষে এককভাবে। 
প্রায় চার মাস। বাড়িতে বাড়িতে প্রায় প্রতিদিনই নিশার ঘ্যানঘ্যানি শুনতে আর এখানে এসে নিশা পুরোই বলে গেছে। প্রতিদিন ফোন করে জানার খোঁজ খবর অফিসই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কথা বলে। ছুটির দিনগুলোতেও উত্থাপিত হওয়ার জন্য বায়না ধরে না আমার রায়হানের পছন্দের খাবার রান্না করা। হালকা সাজগোজাও করে। বাকিটা শুধু ছেলেমানুষী করে দোতলায় ভুল, বেচারি কথা ধমককে দেখতে পাল্টাও। কিছু করার নেই, এটা তো শর্তই ছিল, রায়হানের নিয়ম মেনেও পারছিল না, এতটা অপমানিতও অন্যকে ভুল করেনি। বিগত তারিখেই কিন্তু জীবন তাদের খুব সুখেই ছিল।
কিন্তু এক সন্ধ্যায় নিয়মের ব্যতিক্রম করা। অনেকবার বাজান পরেও খুলনা না নিশা। নিজের পকেট থেকে চাবিটা বের করে লেখালিখল রায়হান। সে এলাকায় ছিল নিশা শঙ্কা ঘুমিয়েছে। কিন্তু নিশা নেই। সে সব নিয়ম ভেঙ্গে দোতলায় ছুটে গেল। 
-আরে রে ভাইজান, কি করেন, কি যান? সুমন বলে উঠলো না মেজাজ খারাপ বোলো, মানুষ পছন্দ করেন।
-কি হয়েছে রে সুমন? সুমন কাঁচুমাচু করে এক পাশে সরে গেল। আশরাফ সাহেব বের হয়ে আসছেন তার লাইব্রেরী থেকে।
- আমি খুব দুঃখিত তোমাকে বলার জন্য কিন্তু নিশাকে খুঁজে পাচ্ছি না, ফোনটাও বলে গেছে। আপনাকে না বলে ছাদে, বাগানে বাড়ির সব জায়গা খুঁজে বের করতেও কিছু নেই। রায়হানের পক্ষে ছিল ভদ্রলোক প্রচন্ড প্রবর্তন হবে কিন্তু আশরাফ সাহেব তাকে শান্ত করে বললেন,
- হোন চলুন আপনার আদর্শ। আশরাফ সাহেব রায়হান এবং সুমন তিনজনে চাপ এলো।
- এক কাজ করুন মিস্টার রায়হান আপনি আপনার স্ত্রীর ফোন থেকে তার বান্ধবীদের পরিচিত এমন কেউ আছে যার বাড়িতে সে যেতে পারে ফোন দিন। 
রায়হান যন্ত্রের সাহায্যে রোবট, তাই ঠিক করতে বাড়িতে চাওয়াই নিশা। 
-আপনি ফোনে খবর নিতে আমি আমার মত দেখছি, সুমন আশরাফ সাহেবের পিছন পিছন বের হয়ে গেল।
কোন উপায় না পেয়ে রায়হান পৌঁছে গেল কিন্তু ওরা বলল ২৪ ঘন্টা ধৈর্য ধরতে। রাত ১১:৩০ টার দিকে রায়হান বাড়ি ফিরে এলো। তার বারান্দায় হাত দিয়ে পাশ্বর সুমন শান্তি আছে।
-ভজান আগামী? ও ভাইজান , এহন কি হতে পারে? এই ঘর তো বডনাম হওয়া বো। 
-মানে তুমি কি বলছো সুমন?
-আপনাগোর আগেও এক লোক তার পরিবার নিয়া ভাড়া নিছিল কিন্তু সেমব, পরিবার উধাও। ভালো কষ্ট পোহাইতে হয়েছে। আপনি তো ম্যালা ভাগ্যবান, সামনে নিজের বড় চাচার ফোন দিয়া আপনার বয়ের খোঁজখবর নিতে বলেছেন, তার বড় চাচা রাজনৈতিক বড় বড় চাচার।
ভারাক্রান্ত হৃদয়ে রায়হান ফিরে এলো নিজের তৈরি। অনেক ধকল গেছে, তাকে শুতে হবে, বিএনপি কোনোমতে বিছানায় দিল কোলবালিশটা সরে যেতে একটা চিরকুটের মত পাওয়া গেল।
"আমি দুঃখিত রায়হান, আমি সোহানকে ভালবাসি। চাচার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আমার কাছে একটা ভিডিও করে। সো তখন কোন অফিসে ছিল না আমাকে নিয়ে তুলবে তার কোন নিশ্চয়তা ছিল না এবং এখন ভাল কথা বলবে আমার সাথে আমার উত্তর, তুমি বললে। আমাকে ক্ষমা করে দিই ইতি নিশা"
রায়হান কাঁপা হাতে চিঠিটা ধরো। মনে মনে কি তবে তারদিনের মত হারিয়ে যাবার, এই ভয়ই কি সে দেখাতো রায়হানকে?
-রায়হান সাহেব জেনারেলন? আশরাফ সাহেবের কন্ঠ 
 সেই চিঠি দিয়ে রায়হান মেরে পাস ছিল, কখন সকাল হয়েছে সে সকাল না 
খোলাই ছিল আশরাফ বলার কথা বলতে শুরু করুন 
-শুন আপনি চিন্তা করবেন না, আমার পরিচিত একজন আছে। দুই একের মধ্যেই আপনার স্ত্রী পাওয়া যাবে ইনশাআল্লাহ। কেবলমাত্র না, সব ঠিক হয়ে যাবে।
রায়হানের নেতৃত্বে মাথা তুলুন, কম্পিউটার হাতে চিঠিটা আশরাফ সাহেবের দিকে দিতে দিতে দিতে 
-ওকে আর খুঁজতে হবে না দয়া করে আর কষ্ট করবেন না।
চিঠি পড়ে বিস্ময়ে আশরাফ সাহেবের দেখা বড় হয়ে গেল। 
রায়হান ফিরে গেছে তার ব্যাচেলার জীবন সেই মেসে।
লাইব্রেরীর রিং চেয়ারে দোল নিজের আশরাফ সাহেব মনে করতে লাগলেন, "তোরা স্বামী স্বামী না থাকলে প্রেমিককে বাড়িতে ডেকে নাস্তামি করবি মেয়েটা সহ্য না হয়। বর দিয়ে পরিবারের সদস্যরা অধিকার।"
নিশার কাছে সোহানকে বেশ কয়েকবার আশরাফ আসতে চলেছে। কাছে সোহান বের হতে যেতে আশরাফ নিশারে কলিংবেল বাজায়। প্রতীক নিশা ভয় ভয় হওয়া যায়। সুমন তার গলায় ছুরি ধরেছিল আর আশরাফ বলেছিল চিঠিতে কি লিখতে হবে। ভাবতে আশরাফের ভাবতে ফুটে উঠতে বিধ্বস্ত একটা হাসি। চিৎকার করে তার সকল কুকর্মের কর্মীর সুমনকে ডাকলো। সুমন প্রায় ছুটতে এলো।
-হা*রা*মজা*দা টু-লেট ঝুলানোর কথা কি বলতে হবে? আর টেবিল পেইজটা আবার প্রকাশ করার কথা তোকে বারবার মনে করিয়ে দিতে হয় জা*নোয়ার?
এতগুলো গালি প্রচারের পরেও সুমন দিয়া বের করে বলে, -দুটোই করে কথা বলেছি, আপনি কোন চিন্তা করবেন না নিরিবিলি বাড়িতে ভিতরেই ভাড়াটিয়া বলে তার জন্য একই বিশ্রী কদাকার হাসি।
.


শুক্রবার, ৩ মে, ২০২৪

শিমুর_বিয়ে

শিমুর_বিয়ে


Writing By
দোলনা_বড়ুয়া_তৃষা


 ব্যাপারটা আমারা কেউ ঠিক মেনে নিতেই পারছিলাম না মা কীভাবে এই বিয়ের জন্য রাজি হয়ে গেল। কারণ শাহেদের পরিবারের সাথে দেখা হওয়ার আগে সবচেয়ে রেগে ছিল মা। মাকে অনেক টা জোর করেই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, এই বলে যে, সে ঘরে আমার বিয়ে দেওয়া হবে না।কথা বলে ফেলা হয়েছে না গেলে ব্যাপার টা ভালো দেখাচ্ছে না তাই। 

আমাদের বিশাল জয়েন ফ্যামিলি, দাদার খানদানী আমলের বিশাল এক বাড়ি আছে। যেটা দেখলে হিন্দি সিনেমায় দেখানো হাবিলির মতো লাগে। 

ওটাতে অবশ্য আমরা থাকি না। তবে সবার আশা যাওয়া আছে। সুবিশাল একটা জায়গা ডেপলভমেন্টকে দিয়ে বিশাল ফ্ল্যাট বাড়ি করা হয় যে যার পছন্দ মতো চার টা চারটা ফ্ল্যাট নিয়ে থাকি। আলাদা খাওয়াটা হয় শুধু। বাকি সব কিছু একসাথেই চলে। বড় আব্বু আর দাদু এখনো ঘরের হেড। 

এমন জমিদারী টাইপের ঘর হলেও আমাদের ঘরেই কেউ জমিদারী ছেলের মতো বসে খায় না। সবাই উচ্চ শিক্ষিত আর উচ্চপদস্থ। তাই হয়ত ঘরের সম্মান টা এখনো অক্ষত আছে। আব্বুরা চার ভাইয়ের মধ্যে দুই ভাই বুয়েট থেকে পাশ করা ইঞ্জিনিয়ার আর দুইভাই ডাক্তার। চাচাদের বউরাও ডাক্তার, ওদের ছেলে মেয়েরা কেউ ডাক্তারি পড়ছে কেউ ইঞ্জিনিয়ার।  

আমার আব্বু মেজ ভাই। আমার আম্মু কলেজের অধ্যাপিকা। 

ধরা যায় আমাদের এলাকায় আমাদের মতো ঘর রাজ পরিবারেই। যেহেতু আম্মুরা সবাই সুন্দরী আমরা ছয় বোন ও তাই পরীর মতো সুন্দরী বলা যায়। আমাদের পরিবারের বিলাসিতা ময় জীবন আমাদের পুতুল বানিয়ে রেখেছে। আমার চার বোনেরেই বিয়ে হয়েছে এমন ঘরে যাদের ঢাকা ঘরে গাড়ি বাড়ি আছে। এমন পরিবারের সাথে যায় এমন উচ্চ পদস্থ চাকরি আছে। 

এতকিছু থাকার পরেও সব বাঙালী পরিবারের মতো কোথায় যেন একটা সুর কাটা আছে। চাচী মায়েরদের মধ্যে সুর টেনে কথা বলা, একে অপরের খুত ধরা। কিন্তু সবার মধ্যে একটা জিনিস মিল আছে সেটা পরে বলছি৷ 

এইবার আসি শাহেদের কথায়। দাদু এখনো বেঁচে আছেন। উনি এখনো মাঝেমধ্যে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন। সেখানে পরিচয় শাহেদের বাবার সাথে। উনি বেশ সম্মানী ব্যাক্তি। উনি আমাকে দেখে বেশ পছন্দ করেছেন। না করার কিছু নেই। চার বোনের বিয়ের পর এখন আমার সিরিয়াল। আমি ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার কিছুই হতে পারি নি। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এইবার মাস্টার্স করে বের হয়েছি। বড় আপুর হাসবেন্ড বলেছেন, রেজাল্ট বের হওয়ার পর আমাকে উনাদের ব্যাংকে জব দেবেন। 

আমার ছোট চাচার মেয়ে ছোট টা সামনে ইন্টার পরীক্ষা দেবে। 

উনি দাদুকে খুব করে বললেন আমাকে তাদের বেশ পছন্দ হয়েছে। তার ছেলের জন্য আমাকে নিতে চান।

আসল কথা কেউ জানে না। আমি আর শাহেদ একই এলাকায় বড় হয়েছি। আমরা এক স্কুলে পড়তাম। তখন থেকে আমাদের সর্ম্পক। 

আমাদের ঘরে আমাদের সর্ম্পকের কথা জানাব সেই সাহস আমার নেই। কারণ আমি জানি আমাদের সর্ম্পক কেউ মানবে না। 

 সাদিয়া আপুও মারুফ ভাইয়াকে পছন্দ করত। সবাইকে জানানোর চেষ্টা করেছে। এতে ফল হলো তাড়াতাড়ি বিয়ে ঠিক করা হলো। তাতে করে আপু পালিয়ে গেল। এখন ঠিকিই মেনে নিয়েছে। আমাদের ঘরে মেয়েদের মর্জির চেয়ে তাদের সম্মানের দাম বেশি। 

শাহেদ কে আমি এই পদ্ধতি জানিয়েছি। তবে শাহেদ বলল, আমার ঘরে তো মানবে। পালানো তো সমাধান না। আগে একবার ট্রাই করে দেখি৷ তারপর না হয় দেখা যাবে। কি হবে? তবে শাহেদের কথায় বুঝেছিলাম ও পালানো পক্ষে না। যদি না এইভাবে না হয় তাহলে হয়ত হবে না বিয়ে। 

শাহেদ এই বুদ্ধি করল। সবার সামনে দাদুকে বলল, যাতে সম্মান রক্ষার জন্য দাদু সম্মতি দেয়।  

শাহেদের বাবা বলেছিল যে,

সবাই তো আমাদের ঘর আর পরিবার সর্ম্পকে জানে। মেয়েও দেখেছে। তাই আমাদের পরিবার তাদের ঘরে যাবে, তাদের ঘর আর ছেলে দেখতে। কারণ মেয়েকে বিয়ের পর তো ওখানেই থাকতে হবে। আগামী শুক্রবার সবাই আমরা যেন যায়। 

সবার সামনে দাদু হ্যাঁ বলে এলেন। 

এই নিয়ে ঘরে বেশ তুলকালাম চলল।আলোচনা,বৈঠক। 

দাদু সব সময় বেশ হিংসের মতো গর্জন করলেও এইবার কেন যেন চুপ হয়ে গেলেন।মিনি গলায় বলল, সবার সামনে বলল তাই না করতে পারি নি। 

অনেক কথাবার্তার পর ঠিক হল। যাবে যে যেতে চায়। একটা না একটা কারণ বলে 'না' করে দেবে। 

সবাই মাথা নেড়ে সায় দিলেও সবচেয়ে বেশি বেঁকে বসলো, আমার আম্মু। আম্মু কিছুতেই আমাকে এইভাবে বিয়ে দিবে না৷ 

আমি এমন ভাব দেখালাম যেন আমি বেশ বিরক্ত হয়েছি। 

আজ শুক্রবার সবাই যাওয়ার কথা। আমি যাওয়া কোন প্রশ্নেই আসে না। কিন্তু শাহেদের আব্বু আবার ফোন দিল আমাকেও নিয়ে যেতে আমারো তো ঘর ও ছেলে পছন্দ হওয়ার ব্যাপার আছে। 

আমি স্বাভাবিক লাগার জন্য, না করে দিয়েছিলাম, কিন্তু দাদু আমাকেও নিতে বলল তাই রেডি হতে হল। শুধু হলুদ রঙের একটা জামা পরে হাল্কা লিপস্টিক দিলাম। আমি যাওয়াতে আম্মুকেও যেতে হচ্ছে। আম্মু যাওয়াতে চাচী জ্যাটিরাও খুত ধরার জন্য বলল, আমরাও যাই তাহলে, শিমু তো আমাদের ও মেয়ে।

আম্মু আরো বেশিই বিরক্ত হল। 

বেশি দূরে না, দুই ব্লক পরেই শাহেদদের ঘর। তাও সবাই চারটা গাড়ি করে গেল। ব্যাপার টা তাদের অস্বস্তি তে ফেলল কিনা জানি না। তবে তিন তলার উপর মধ্যবিত্ত ফ্ল্যাট টা দেখে আমার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিল। আমার এক বান্ধবী আছে ওদের ঘরে মাঝেমধ্যে যেতাম। ওদের ঘর টা প্রায় এই রকম। আমি জানি ওরা কত টা সিম্পল জীবন কাটায়। আমি এইও জানি শাহেদ কত সিম্পল জীবন কাটায়। তাই ওকে এত ভালোবাসি। 

আমাদের সবাইকে দেখে ওরা অস্বস্তি তে পড়ার জায়গায় এতটা উচ্ছাস দেখালো যা দেখে চাচীরা একটু মুখ বেঁকালো।ওদের ঘরে আমি আগে আসি নি। 

 ড্রয়িং ডাইনিং একসাথে করা মাঝারি সামনের রুম। দুই দিকে তিন টা ছোট রুম মাঝে বাথরুম আর বাথরুমে পাশে রান্না ঘর। এদের পুরো ঘর। 

আমাদের পুরো ড্রয়িং রুমের অর্ধেক ও হবে না। 

দুই সেট সোফা আর সিংগেল একটা খাট বসানো আছে ড্রয়িং রুমে। এক পাশে একটা বইয়ে ঠাসা বুক সেল্ফ। 

হাতে আঁকা আর বানানো কয়েক টা সোপিস। দেওয়ালে একটা রবীন্দ্রনাথের ছবি ঠাঙ্গানো। 

সবার বসতে বেশ অস্বস্তি হচ্ছিল শাহেদের বাবা বার বার লজ্জিত বোধ করছিলেন এইটার জন্য। 

বাবা আর চাচারা মানা করছিল যাত্র উনি বিব্রত বোধ না করে। সবচেয়ে বেশি বিব্রত বোধ করছিলেন দাদু। 

শাহেদ কে ডেকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল ওর বাবা। শাহেদ বরাবরেই বেশ সুদর্শন আর নম্র ভদ্র প্রকৃতির। সে গত বছরেই সে একটা ব্যাংকে চাকরিতে জয়েন করেছে৷ ওরা দুই ভাই এক বোন। শাহেদ সবার বড়। ওর ছোট ভাই ঢাবি তে পড়ে। আর বোন ঢাকা মেডিকেল এ এইবছর চান্স পেয়েছে।

কিছুক্ষন পর প্লেট ভরে ভরে নাস্তা আনছিল দুইজন। তাদের মধ্যে শাহেদ ও আছে। ওর মামী চাচিরাও আছে। উনারাও আপ্যায়ন করে যাচ্ছেন। নানা পদের পিঠা আর হাতের বানানো নাস্তা। সবাই কথা বললেও একদম চুপ ছিল আম্মু৷ আমার খুব একটা খারাপ লাগছিল না আবার অতিরিক্ত ভালোও না। কোথায় যেন একটা অস্বস্তি আমারো লাগছিল। আমার মনে হচ্ছিল শাহেদ দের আরো বেশি কিছু করা দরকার ছিল আমার পরিবার কে খুশি করার জন্য। 

সব কিছু এনে রাখার পর যখন সবাই হাতে তুলে নিচ্ছিল নাস্তা। শাহেদের বাবাকেও বসে নিতে বলল, শাহেদের আব্বু খুব ভদ্র ভাবে অনুরোধ করল, একটু অপেক্ষা করুন। শাহেদের আম্মু সকাল থেকে এইসব বানাচ্ছে; ও আসুক। 

সবাই যেন এখন বিব্রত বোধ করল। এমন কি দাদুও থমকে গেল। আম্মু আর চাচীরা কেমন যেন চুপসে গেল। 

আমার তখন মনে হতে লাগল,শেষ হয়ে গেল। এখন কেউ আর রাজি হবে না। কি দরকার ছিল এইটা বলার? 

আমাদের বাসায় এত বড় বড় মানুষ আসে। কই আব্বুরা তো কেউ আম্মুদের জন্য তাদের বসিয়ে রাখে নি৷ অনেক সময় আম্মু চাচীরা তো দেখেও না কে কি খেল? কে কি প্রশংসা করল। ওরা আসার আগেই নাস্তা শেষ।  

আমি শাহেদের দিকে তাকালাম,দেখলাম ওরা কাছে বেশ স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। যেন এইটায় হওয়া উচিত। 

উনি তাড়াহুড়ো করে উঠে গেলেন। আবার তাড়া দিয়ে এলেন। হাসি মুখ করে বসলেন। আমাকে আর শাহেদ কে ডায়িং টেবিল থেকে দুইটা চেয়ার এনে বসানো হয়েছে। সবাই মিষ্টির প্লেট হাতে বসে কেমন যেন বিশেষ কারো জন্য অপেক্ষায় রান্না ঘরের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

শাহেদের আম্মুকে আমি কখনো দেখি নি। 

আমি ভেবেছিলাম আমার আম্মুর মতো ব্যাক্তিত্ব সম্পন্ন কেউ হেঁটে আসবে। তবে বাটিকের কাজ করা শাড়ি পরে আচঁল টেনে বের হয়ে এলো খুব সাধারণ মধ্যবয়েসি শাহেদের আম্মু। 

উনি এসে হাসি মুখ করে সবাইকে সালাম দিয়ে বসে সবাইকে খাওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। 

কিন্তু ততক্ষনে সবার গলা কি যেন বিধঁছে।

.

তবে সুস্বাদু নাস্তার কারণে কিছুক্ষনের মধ্যে আবার মেতে উঠলেও কিন্তু ছন্দপতন হয়ে গিয়েছে। 

বড় আম্মু তার নাতনিকে নিয়ে এসেছে তার জন্য ছোট একটা বাটি আনতে বললে, শাহেদের মা শাহেদ কে ইশারা করাতে সে টুপ করে আমার পাশ থেকে উঠে গিয়ে রান্না ঘর থেকে বাটি নিয়ে এলো।

 শাহেদের মা বলল, চামচ টাও তো লাগবে। 

শাহেদের ভাই ওদের রাখা শোকেস থেকে বের করে রান্না ঘর থেকে ধুয়ে আনল। 

ব্যাপার টা আমার কাছে কেন যেন খারাপ লাগল৷কিন্তু শাহেদর বোন ওখানেই বসে আছে।  

সবাই মিলে কথা বলছে৷ ওদের সবাই কথা বলতে চাইছিল বাট তাল মেলাতে পারছিল না৷ কারণ এইখানে কেউ ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার নেই। কেউ স্কুলের টিচার কেউ সরকারি চাকরিজীবি। শাহেদের বাবাও তাই। শাহেদের মা স্কুলে গানের শিক্ষিকা। উনার কাছে প্রতি সাপ্তাহের বিশ ত্রিশ জন্য স্টুডেন্ট আসে গান শেখার জন্য শাহেদের বাবা বেশ গর্ব করেই জানালেন। 

ঘন্টা খানিক পার হওয়ার পর কারোই আসলে বসার ইচ্ছে ছিল না। যেন বের হতে পারলেই বাঁচে। ''আমাদের পরে কথা হবে'' এই একটা দায়-সাড়া কথা বলে সবাই বের হয়ে এলো। 

আমি বের হওয়ার সময় শাহেদ একটু মিষ্টি হাসল। আমিও ফিরতি একটু হাসি দিলাম এইছাড়া তেমন কোন কথা বলা হয় নি। 

বাসায় ফিরে সবাই যখন নানা ধরনের ব্যঙ্গ কথায় মেতে উঠছিল আমাদের বিশাল ড্রয়িং রুমে। 

দাদুকে বলল, আপনার কথা মতো দেখে এলাম। এখন পরে জানাব বলেছি। এইটুকুতেই চুপ থাকেন। এরমধ্যেই মেয়ের অন্য কোথায় ও বিয়ে ঠিক হয়েছে বলে দেবেন। শেষ।  

তখন আম্মু বলে উঠল, না। এইসব বলার দরকার নেই। শিমুর বিয়ে ওখানেই হবে। 

সবাই চেঁচিয়ে উঠল, কি বল? এমন ছাপোষা ঘরে মেয়ের বিয়ে? প্রশ্নেই উঠে না। তাছাড়া আমাদের সাথে কোন স্ট্যাটাস যায় না। 

আমি নিজেও যেন অবাক হয়ে গেলাম। কারণ 

আম্মু বলল, কেন না যাওয়ার কি আছে, ছেলে ব্যাংকে চাকরি করে। বাবা সরকারি চাকরি। মেয়ে মেডিকেলে পড়ছে। মা টিচার। সব তো আছে। 

কিন্তু, তাও ওদের তো গাড়ি নেই, বাড়ি নেই। মেয়ের কোন শৌখিনতা থাকবে না। অন্য বোনেদের মতো স্বাচ্ছন্দ্য পাবে না। 

বড় আম্মুও বলে উঠল, কি বল? বেয়াইন বাড়িতে মুখ থাকবে এমন ঘরে সর্ম্পক হলে। আব্বুর কথা রাখতে গেল। শেষ। এমন কত হয়। দুই রুমের একটা ঘর। শিমুর নিজের শোয়ার ঘর তো এরচেয়ে বড়। মেয়ের জীবন নষ্ট করিও না তো। নিজেই তো রাজি ছিলে না। কি হলো হঠাৎ রাজি হয়ে গেলে। কি আছে? কি দেখেছো সে ঘরে?

আম্মু তার চোখ গুলো সিক্ত আর চোয়াল টা শক্ত করে বলল, 

-সম্মান দেখেছি। সে ঘরে, ঘরের বউ আর মেয়েদের প্রতি সম্মান দেখেছি। যেটা এই আমাদের অভিজাত্য ভরা ঘরে নেই। 

সবার মুখ বন্ধ হলেও চোখে কেমন যেন প্রশ্নাতুত। 

আম্মু বলল, 

-বড় আপা, আপনি তো কত রকমের নাস্তা বানিয়েছেন বিগত সব ইদে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। কখনো দেখেছেন কেউ আপনাকে ডেকেছে? 

আসমা তুমি তো ডাক্তার, তুমি দেশের বাইরে থেকে ডিগ্রি নিয়ে আসছো। আপনি কখনো শুনছেন ভাইয়া আপনার কাজের প্রশংসা করছে সবার সামনে? 

কখনো দেখছেন এই ঘরে শুধু মাত্র আমরা আসার জন্য ঘরের আসা মেহমান দেন বসিয়ে রাখা হয়েছে। 

এই ঘরে আমরা ঠিক কতটুকু সম্মান পাই?  

ঘরের মেয়েদের ভালোবাসা আর সম্মান করা এক নয়। 

এই ঘরে আমাদের সবাইকে আমাদের যোগ্যতা দেখে এনেছে শুধু নাম বাড়াতে। কেউ কি কর্ম জীবনে স্বামীর সাহায্য পেয়েছেন? 

কিন্তু সে ঘরে আছে। ঘরের নারীদের প্রতি সম্মান আছে, শ্রদ্ধা আছে, এপ্রিসিয়েশন আছে। 

সুখে থাকার জন্য মেয়েদের এরচেয়ে বেশি আর কিছু লাগবে না। লাগেও না। 

বড় আম্মু আর চাচীরাও এক সাথে বলে উঠলো। শিমুর বিয়ে ওঘরেই হবে। 

.

#

সোমবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৪

বর্ষার রাতে

বর্ষার রাতে

 


Writing By জাহের ওয়াসিম



অদ্ভুত এক প্রেমে পড়ে যাই গত বর্ষায়, যা এলোমেলো করে দেয় আমার বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দেয়াল। অন্য রকম এক সত্যের মুখোমুখি হই আমি। জীবনের অন্যতম সেই সত্য ঘটনাটি আপনাদের শোনাব। এটাকে নিছক গল্প ভাববেন না। এই ঘটনা আমার জীবন ওলটপালট করে দিয়েছে।

নানাবাড়িতে যাচ্ছিলাম ঢাকা থেকে। প্রায় পাঁচ-ছয় বছর পর যাচ্ছি। মা-বাবা ব্যস্ত, তাই ইউনিভার্সিটি থেকে ছুটি পেয়ে আমি একাই পথ দিলাম। সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য নানাবাড়িতে ফোন না করেই বের হলাম। রাত এগারোটায় স্টেশনে নামলাম। অজপাড়াগাঁয়ের স্টেশন। একটা কাকপক্ষীও নেই। দূরে শুধু একটা অচেনা পাখির চিঁ চিঁ ডাক শুনে হকচকিত হয়ে উঠলাম। আরও আগে নামার কথা। কিন্তু পথে ট্রেনের যান্ত্রিক সমস্যা হওয়ায় দুই ঘণ্টা দেরি হয়ে গেল। স্টেশন থেকে নানার বাড়ি মাইল পাঁচেকের পথ। রিকশায় যেতে হয়। কিন্তু এত রাতে গ্রামের রিকশাওয়ালাদের এক ঘুম হয়ে গেছে। এই স্টেশনে আমার সাথে আর একটা লোক নেমেছে। সাদা পাঞ্জাবি পরা। মাথায় লম্বা টুপি। একা একা যেতে ভয় লাগছে। ভাবলাম, লোকটার সাথে গিয়ে পরিচিত হই। আমি বললাম, ‘স্লামালাইকুম। চাচা, আমার নাম শুভ। হাবিবুল্যা চেয়ারম্যানের নাতি। ঢাকা থেকে এসেছি আমি।’ লোকটা কিছু বলল না। অদ্ভুতভাবে চেয়ে থাকল। আমি বললাম, ‘চাচা, আপনি কোন দিকে যাবেন। চলুন এক সাথে যাই।’ লোকটা হাত ইশারা করে উত্তর দিকের রাস্তাটা দেখাল। আমি যাব পশ্চিম পাশের রাস্তাটা দিয়ে। লোকটা মনে হয় বোবা কিংবা তার কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না। বোবা হওয়ার সম্ভাবনা কম। বোবারা সাধারণত কানে শোনে না। ইনি শোনে। যা-ই হোক, আমি হতাশ হয়ে একা একাই হাঁটা ধরলাম। অমাবস্যার রাত। অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না। আমি প্রচণ্ড ভীতু। রাতে গ্রামের রাস্তায় একা একা হাঁটা আমার কাছে পুলসিরাত পার হওয়ার চেয়েও দুঃসাধ্য। গা ছমছম করে ভয়ের একটা শীতল অনুভূতি বয়ে গেল আমার ভেতর দিয়ে। এত দূর হেঁটে হেঁটে যাব কী করে? ভেবে ঘেমে গেলাম। ভাবলাম, নানাবাড়িতে ফোন করি, যেন কেউ এসে আমাকে নিয়ে যায়। মোবাইলটা বের করে দেখি নেটওয়ার্ক নেই। অগত্যা মোবাইলের টর্চ জ্বেলে আয়াতুল কুরসি পড়ে বুকে তিনবার ফুঁ দিয়ে হাঁটা ধরলাম। কিছুক্ষণ হাঁটার পর মনে হলো, আমার পেছন পেছন কেউ একজন আসছে। এটা একটা চিরাচরিত সমস্যা। সব রহস্য গল্পেই এই লাইনটা থাকে। পিছে পিছে কেউ একজন আসে। এমনকি রহস্য পত্রিকার অনেক রহস্যগল্পতেই এই লাইনটা পড়েছি আর হেসে খুন হয়েছি। মনে মনে ভেবেছি, লেখকেরা বুঝি আর কোনো লাইন পান না। কিন্তু বাস্তবেও যে এ রকম অভিজ্ঞতা হতে পারে, তা আজ বুঝলাম। ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে এল। এসব ক্ষেত্রে নিয়ম হচ্ছে, পিছু ফিরে তাকানো যাবে না। পেছনে ভূত থাক আর পেত্নি থাক, কোনো আগ্রহ দেখানো যাবে না। সোজা হেঁটে চলে যেতে হবে। কিন্তু আমার যে এখন ঝেড়ে একটা দৌড় দিতে ইচ্ছে হচ্ছে। কী করব বুঝতেছি না। একবার মনে হলো, সাদা পাঞ্জাবি পরা লোকটা নাকি। হয়তো আমাকে ভীতু ভেবে ভয় দেখাচ্ছে। পেছনের লোকটার হাঁটার আওয়াজ বেড়েছে। আমি আর থাকতে না পেরে পিছু ফিরে তাকালাম। দেখি, কেউ নেই। কিন্তু আওয়াজটা অবিকল আছে। মনে হচ্ছে, ধপধপ করে পা ফেলে কেউ এগিয়ে আসছে। হঠাত্ করে হালকা মিষ্টি একটা গন্ধ এসে লাগল আমার নাকে। মিষ্টি জর্দা দিয়ে পান খাওয়ার গন্ধ। আমার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। মনে হলো, ঘুরে পড়ে যাব। আমার ভয় এখন চরম অবস্থায়। বুকের মধ্যে যেন ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেছে। হূিপণ্ডটা হাপরের মতো ওঠা-নামা করছে। আমি উল্টা দিকে ফিরে একটা দৌড় দিলাম। মনে মনে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিতে লাগলাম। বারবার নিজেকে গালি দিচ্ছি কেন যে ফোন করে এলাম না। পেছনের অদৃশ্য মানবটার দৌড়ের আওয়াজ স্পষ্ট কানে আসছে। ধীরে ধীরে তা কাছে চলে আসছে। এভাবে আমি মাইলখানেক চলে এসেছি। আরও বেশিও হতে পারে। আমার কোনো হুঁশ নেই। প্রাণপণ দৌড়াচ্ছি। কোনোমতেই ধরা পড়া যাবে না। এটা আমার জীবন-মরণ খেলা। তবে কাঁধের ব্যাগটা নিয়ে বেশিক্ষণ দৌড়াতে পারলাম না। ক্লান্ত-অবসন্ন হয়ে উঠল শরীর। নুয়ে পড়ছি আমি। এ যাত্রায় আমি মনে হয় শেষ। মৃত্যুভয় আমাকে গ্রাস করে নিল। আমি যেন অচেতন হয়ে যাচ্ছি। চলে যাচ্ছি জীবনের শেষ প্রান্তে, মৃত্যুর শিয়রে। মিষ্টি গন্ধটা নাকের কাছে চলে এসেছে। কলিজাটা মোচড় দিয়ে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য মা-বাবার ছবিটা ভেসে উঠল মনের আয়নায়। ইউনিভার্সিটির শায়লার কথা মনে হলো। মনে মনে বললাম, বিদায় শায়লা। আর তোমার পিছে পিছে ঘুরে বিরক্ত করব না। বিদায়! আমার ঘাড়ে স্পষ্ট ছোঁয়া অনুভব করলাম—ঠান্ডা-শীতল কিছু একটার।

ঘাড়ে হাত দিয়ে দেখি পানি। বৃষ্টি নামছে। কিছুটা প্রাণ ফিরে পেলাম। ভিজে যাচ্ছি আমি। পাশে একটা বাড়ি থেকে নারী কণ্ঠের খিলখিল আওয়াজ শুনলাম। অত-শত না ভেবে দৌড়ে রাস্তার পাশের অন্য একটা বাড়িতে আশ্রয় নিতে ছুটলাম। দূর থেকে বাড়ির ভেতরে আলো জ্বলতে দেখলাম। অনেক্ষণ ধরে নক করলাম দরজায়। কেউ দরজা খুলল না। এত রাতে কেউ খোলার কথাও নয়। গ্রামের বাড়ি। সবারই চোর-ডাকাতের ভয়। হতাশ হয়ে বাড়ির দরজায় বসে পড়লাম। ঘর থেকে একটু দূরে একটা কবর দেখতে পেলাম। উত্তেজনায় আমার সব ভয় মুহূর্তে উবে গেছে। অন্য সময় হলে কবর দেখেই অজ্ঞান হয়ে যেতাম। কবরকে খুব ভয় পাই আমি। হঠাত্ করে দরজাটা খুলে গেল। আমি উঠে দাঁড়ালাম। দেখি এক বৃদ্ধ মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন অন্ধকারে। পরনে সাদা শাড়ি বলে মনে হলো। আমি সালাম দিয়ে আমার নানার বাড়ির নাম বললাম। বৃদ্ধা বললেন, ‘ও চিনেছি। তুমি হাবিবুল্যা চেয়ারম্যানের নাতি।’ আমার নানাকে সবাই চেনে। বিখ্যাত লোক এলাকার। বললাম, ‘আমি ঢাকা থেকে আসছি। ভিজে যাচ্ছি বলে একটু আশ্রয় নিয়েছি। বৃষ্টি থামলেই চলে যাব।’ বৃদ্ধা আমাকে ভেতরে নিয়ে বসালেন। তারপর গামছা এনে দিলেন মাথার পানি মোছার জন্য। আমি বললাম, ‘দাদি ঘর অন্ধকার কেন? হারিকেন নাই?’ বৃদ্ধা বললেন, ‘আছে বাবা। দাঁড়াও দিচ্ছি। কিছুক্ষণ আগে নিভিয়েছি। আমরা শুয়ে পড়েছিলাম। তুমি বসো, আমি হারিকেন পাঠাচ্ছি। তুমি আসাতে ভালোই হলো। নামাজ না পড়েই শুয়ে গেছিলাম। নামাজটা পড়ে নিই।’ এ কথা বলে ভেতরে চলে গেলেন বৃদ্ধা। কিন্তু বৃদ্ধা আমাকে বাবা বাবা করছে কেন, আমি তো উনাকে দাদি বললাম। উনার কি ছেলে-টেলে নেই? যাক বাদ দিলাম। কিছুক্ষণ পর হারিকেন আর খাবার নিয়ে এল এক অপরূপা সুন্দরী। হালকা আলোয় অসাধারণ লাগছে ওকে। জীবনে এত রূপবতী মেয়ে দেখিনি। ঢিলেঢালা জামা পরেছে মেয়েটি। এর পরও তার প্রস্ফুটিত যৌবন ঠেলে বের হয়ে আসতে চাইছে। ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে আছে যেন। আমি লাজ-লজ্জা ফেলে সেদিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম। আমার জায়গায় আমার বন্ধু রবিন থাকলে সে এতক্ষণে মেয়েটির বুকের মাপ বলে দিতে পারত। মেয়েটি হেসে বলল, ‘আমি আনুশকা। উনি আমার দাদি। নামাজ পড়ছেন তো তাই আমি খাবার নিয়ে এলাম। আপনি ঢাকা থেকে আসছেন। নিশ্চয়ই না খেয়ে আছেন। আপনি নিঃসংকোচে খেয়ে নিন। আপনার নানাদের আমি চিনি। অনেক দূরে আপনার নানার বাড়ি। আমি এখানে স্থানীয় কলেজে পড়ি। আমার মা নেই। যেই কবরটা দেখে ভয় পেয়েছেন, ওটা আমার মায়ের। আমার জন্মের সময় মারা যান। বাবা ঢাকায় ছোট একটা চাকরি করেন। নইলে আমাদের নিয়ে যেতেন ওখানে। আমি শুধু বকবক করে যাচ্ছি, আপনি খান।’ আমি ইতস্তত করে বললাম, ‘না না, কী যে বলেন। আপনার কথা শুনতে অনেক ভালো লাগছে। আপনি বলুন।’ ভেতরে ভেতরে আমি অবাক হয়ে গেলাম মেয়েটা হড়বড় করে এত কথা বলছে কেন? তা ছাড়া আমি ভয় পেয়েছি, তা ও বুঝল কীভাবে। ভাবলাম, চালাক মেয়ে। মুখ দেখে সব বুঝে নেয়। গ্রামে সাধারণত এত মিশুক মেয়ে দেখা যায় না। ও মেয়েটা কোন কালারের জামা পরেছে, বলা হয়নি। আকাশি নীল। অদ্ভুত লাগছে। মনে হচ্ছে, স্বর্গ থেকে নেমে এসেছে। মেয়েটাকে আমার খুব ভালো লেগে গেল। খাবার পর আমি জানালার পাশে গিয়ে দাঁঁড়ালাম। দেখি, তুমুল বৃষ্টি বাইরে। থামার কোনো লক্ষণ নেই। মেয়েটা আমার পাশে এসে দাঁড়াল। বলল, ‘আল্লা! কী সুন্দর বৃষ্টি। উফ্ আমার-না ভিজতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু ভিজলেই ঠান্ডা লেগে যাবে। তা ছাড়া দাদিও বকবে।’ আমি মনে মনে ভাবলাম, মেয়েটা অনেক সহজ-সরল। মনের কথা গোপন রাখে না। এ রকম সরল মেয়ে আমি আগে দেখিনি। অপরিচিত মানুষের সাথে এমন ফ্রি-ভাবে কথা বলছে, যেন অনেক দিনের চেনা-জানা। বৃদ্ধা এসে বললেন, ‘বাবা বৃষ্টি মনে হয় আজ আর থামবে না। তুমি ওই পাশের রুমটাতে গিয়ে শুয়ে পড়ো। ওটা আমার ছেলের রুম। ও ঢাকা থেকে আসলে থাকে।’ আমি বললাম, ‘না না, আমি এক্ষুণি চলে যাব। বৃষ্টি কমে যাবে।’ বৃদ্ধা বললেন, ‘এখন যাবে কীভাবে? সকালে চলে যেও। বৃষ্টি কমবে না। আষাঢ়ের বৃষ্টি এত সহজে কমে না। যাও, শুয়ে পড়ো বাবা।’ আমি ওপরে-ওপরে না না করলেও ভেতরে ভেতরে থাকার জন্য রাজি। কারণ এই সহজ-সরল মেয়েটাকে আমার খুব পছন্দ হয়ে গেছে। তা ছাড়া সারা রাত বৃষ্টি হবে। হয়তো মেয়েটার সাথে ভেজার একটা চান্স পেয়ে যেতে পারি।

অন্ধকার একটি ঘরে আমাকে ঘুমাতে দেওয়া হলো। সামান্য ভয় পেলাম। বিছানায় শুতে যাব। দেখি, আমার বিছানায় কে যেন ঘুমিয়ে আছে। ভয়ে আমার গা শিউরে উঠল। ভয়ে ভয়ে হাত দিয়ে দেখি একটা কোলবালিশ। পাশের ঘর থেকে আনুশকার খিলখিল হাসি শোনা গেল। নিজের বোকামিতে লজ্জা পেয়ে শুয়ে পড়লাম।

রাত মনে হয় তিনটার মতো বাজে। শুয়ে আছি কিন্তু ঘুম আসছে না। এখানে আসার পর ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিয়ে ভাবতে লাগলাম। সকালে নানাবাড়ি গেলে তারা অনেক কথা জানতে চাইবে। তা ছাড়া গ্রামের একটা বাড়িতে এভাবে অপরিচিত একটা ছেলেকে থাকতে দেওয়াও অস্বাভাবিক। যাই হোক, নিজের এ রকম নেগেটিভ ধারণার জন্য নিজেকে বকা দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। আচমকা আমার গায়ের ওপর একটা শীতল হাতের ছোঁয়া পেয়ে আঁতকে উঠলাম ভয়ে। বুক ধুকধুক করে উঠল। দেখি, আনুশকা। আমার কানের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘ভয় পেয়েছেন? চেঁচাবেন না। দাদি জেগে যাবে। চলেন বৃষ্টিতে ভিজি।’ আমি অবাক হওয়ার ভান করে বললাম, ‘এত রাতে?’ কিন্তু মনে মনে যা ভাবছিলাম, তা ঘটে যাওয়ায় খুশি হয়ে গেলাম। ভয়ে ভয়ে থাকলাম, ও আবার চলে যায় নাকি। ও বলল, ‘ভিজার আবার দিন-রাত কী? আর রাতে ভিজতেই তো মজা।’ আমি বললাম, ‘তুমি কি প্রায় রাতেই ভিজো নাকি?’ ও বলল, ‘আরে না। একবার ভিজে অনেক ঠান্ডা লেগেছিল। আচ্ছা চলেন যাই।’

চুপিচুপি বাইরে এসে দেখি ব্যাপক বৃষ্টি। আনুশকা খুশি হয়ে গেল। আমাকে বলল, ‘আমার হাত ধরুন। প্লিজ সংকোচ করবেন না। আপনাকে আমার অনেক ভালো লেগেছে।’ আমার মনের কথাই ও বলে ফেলল। আমরা হাত ধরে ভিজতে লাগলাম। ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। দূরে একটা-দুইটা বাজও পড়ছে। বৃষ্টির তোড়ে আনুশকার ভেজা চুল আমার মুখে এসে বাড়ি খাচ্ছে। আর আমার সারা শরীরে যেন বিদ্যুত্ বয়ে যাচ্ছে। আনুশকার পাতলা জামা ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে গেছে। ওর শরীরের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আকৃতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ওর স্তনের বোটা দুটো দেখা যাচ্ছে পরিষ্কার। ইচ্ছা করল ছুঁয়ে দিই একবার। আমি বললাম, ‘আনুশকা তোমাকেও আমার অনেক ভালো লেগেছে। আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি।’ এ কথা বলে আমি ওকে জড়িয়ে ধরলাম। সাথে সাথে ও ছাড়িয়ে নিল। আমি লজ্জা পেয়ে সরি বললাম। একটু পর বৃষ্টি থেমে গেল। আনুশকা বলল, ‘তুমি এখন চলে যাও। হালকা অন্ধকার, ভয় পাবে না তো?’ আমি বললাম, ‘না না, ভয় পাব না।’ ও বলল, ‘চলে যেতে বলায় অবাক হয়েছ? এখন না গেলে সকালে গ্রামের মানুষ দেখলে খারাপ কথা রটাবে।’ আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, আমি তাহলে যাই। তুমি দাদিকে বুঝিয়ে বোলো। আর আমি আবার আসব।’ ও বলল, ‘রাতে এস। দিনে এস না। তাহলে কেউ দেখবে না।’ ওর প্রস্তাবটা ভালো লাগল। আমি বললাম, ‘আচ্ছা ঠিক আছে আমি যাই তাহলে।’

ভোরের দিকে নানাবাড়ি পৌঁছালাম। হালকা অন্ধকার তখনো। এত ভোরে আমাকে দেখে সবাই অবাক হলো। আমি আনুশকাদের বাড়ির ব্যাপারটা পুরো চেপে গেলাম। বললাম, ‘নানা, রাতের গাড়িতে এসেছি। তাই ভোরে পৌঁছুলাম।’ আমার মামাতো বোন রিয়া আমাকে দেখে খুব খুশি হলো। সামান্য সন্দেহের চোখে তাকাল মনে হচ্ছে। নাকি আমার মনের ভুল, কে জানে? চোরের মনে পুলিশ পুলিশ। ও মনে হয় আমাকে একটু-আধটু পছন্দ করে কিন্তু মুখ ফুটে বলেনি কখনো।

নানার বাড়িতে ভালোই দিন কাটছিল আমার। প্রতিদিন রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে আমি তখন চুপি চুপি বের হই। একটুও ডর-ভয় লাগে না। সেদিনের পর থেকে আমার সব ভয় মন থেকে উবে গেছে। এখন মনে শুধু আনুশকার ছবি। মামাতো ভাইয়ের একটা সাইকেল আছে, সেটা নিয়ে চলে যাই আনুশকাদের বাড়ি। চুপি চুপি আনুশকাকে ডেকে গল্প করি দুজনে। গভীর সখ্য হয়ে গেল আমাদের। আমার শারীরিক ভালোবাসা পেতে ইচ্ছে হলো। কিন্তু আনুশকা বলল, ‘না’। আমি কথা বাড়াইনি। শুধু ওকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়েছি। একবার ওর বুকে হাত দিতে চেয়েছি। ও সরিয়ে দিল। আমি প্রথমে কষ্ট পেলেও পরে ভাবলাম, ভালো মেয়ে বলেই রাজি হয়নি। তা ছাড়া বিয়ের পর তো ও আমারি হবে। আমরা এত কিছু করি, অথচ ওর দাদি কিছু টেরই পায় না। উনি বেঘোরে ঘুমায়।

অনেক দিন হলো এখানে আছি। আমার ঢাকায় ফেরার সময় হয়ে যাচ্ছে। আনুশকাকে বললাম, ‘আমি তোমাকে বিয়ে করে ঢাকায় নিয়ে যেতে চাই। আমি নানা-নানিকে পাঠাব বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে।’ আনুশকা চুপ করে রইল। আমার মন খারাপ হয়ে গেল। পরের দিন রাতেও সবাই ঘুমানোর পর আমি বেরুচ্ছিলাম। হঠাত্ কে যেন পেছন থেকে আমার শার্টের হাতা টেনে ধরেছে। দেখি রিয়া। ও আমাকে একদিকে টেনে নিয়ে বলল, ‘ভাইয়া রোজ রাতে তুমি কোথায় যাও? আমাকে বলো তো! আমি প্রতিদিনই দেখি, কিন্তু কিছু বলি না। আজ আর থাকতে পারলাম না। তুমি আমাকে সব খুলে বলো। কারণ তুমি হয়তো জানো না, তোমাকে আমি অনেক ভালোবাসি।’ আমি রিয়াকে প্রথম থেকে সব খুলে বললাম। বললাম, ‘তুই নানা-নানিকে বলে ব্যবস্থা করে দে।’ আমার সব কথা শুনে রিয়া থ মেরে গেল। এরপর ও আমাকে যা বলল, তা শুনে আমার মাথা ঘুরে গেল। ওর ভাষ্যমতে, সেদিন রাতে নাকি কোনো বৃষ্টিই হয়নি। আমি আতঙ্কিত হয়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম এবং পরের দিন বিকেলে ঘুম ভাঙল। ঘুম থেকে উঠে আমি সোজা আনুশকাদের বাড়িতে গেলাম। গিয়ে দেখলাম, ওই বাড়িতে যে ঘরটায় আমি রাতে এসেছি, সেই জায়গায় দুুটি কবর। দূরে আর একটা কবর, যার কথা আনুশকা আমাকে বলেছিল, ওর মায়ের। ঘর-টর কিচ্ছুর কোনো অস্তিত্ব নেই। পুরো বাড়ি খাঁ খাঁ করছে। দূরে একটা পাখি ডেকে উঠল। আমি মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম। পরে সম্ভবত আশপাশের লোকজন আমাকে নানাবাড়িতে পৌঁছে দেয়। আমার জ্ঞান ফিরে প্রায় তিন দিন পর। দীর্ঘদিন আমি মানসিক হাসপাতালে কাটিয়ে এখন সামান্য সুস্থ। তাও অন্ধকার দেখলে প্রচণ্ড ভয়ে চিল্লায়ে উঠি। ডাক্তার বলেছে, আমাকে একা রাখা যাবে না। সব সময় পাশে কেউ একজন থাকতে হবে।

রিয়ার কাছে আনুশকার যেই গল্প শুনেছি তা হলো, ‘ওই বাড়িতে আনুশকা নামের একটা মেয়ে থাকত, যে আরও পাঁচ বছর আগে মারা যায়। কোনো এক বৃষ্টির রাতে মেয়েটি তার প্রেমিকের সাথে ভেজে সারা রাত ধরে। তারপর প্রচণ্ড ঠান্ডা লেগে টাইফয়েড হয়ে মেয়েটি তিন দিনের মাথায় মারা যায়। আর ছেলেটি পাগল হয়ে যায়। মেয়েটির বাবা ঢাকায় থাকতেন। একমাত্র সন্তানের শোকে তিনি এখন আর বাড়িতে আসেন না। বৃদ্ধ হয়ে গেছেন এ ক’বছরেই। পাগলের মতো এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়ায়। বাড়িতে আনুশকার দাদি ছিলেন। আদরের নাতনির মৃত্যুশোকে পড়ে বৃদ্ধাও দুই মাসের মাথায় মারা যান। আনুশকার পাশেই তাকে কবর দেওয়া হয়। এর পর থেকে ওই বাড়িতে কেউ আর যায় না ভয়ে। অনেকেই নাকি আনুশকাকে বৃষ্টিতে ভিজতে দেখেছে রাতের বেলায়। লোকজন ভয়ে রাতে তো দূরের কথা, দিনেও ওই বাড়ির পাশ দিয়ে যায় না।’



ভাবীর_সংসার(51)

ভাবীর_সংসার(51)

 # 


 ৫১ তম পর্ব।


পলি ডাক্তার দেখিয়ে ভাইয়ের বাসায় আসছে। কিছু টেস্ট করে এসেছে বাসায়, আগামী কাল রিপোর্ট দেখিয়ে চট্টগ্রাম যাবে। বাসায় আসতে সময় এক কেজী মিষ্টি আর এক পাতিল দই নিয়ে এসেছে। আবিদ কম আনতে চাইলেও, পলি ভালো ভাবেই আসতে চেষ্টা করে, যাতে ভাবী মনক্ষুন্ন না হোন।


শারমিন পলির আসা, খুব একটা পছন্দ করছেন না, এটা তার চেহারায় স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। পলি আসার পরে, ভাবীকে রান্নাঘরে সাহায্য করতে করতে বললো ভাবী এসে আপনাদের কি বেশি ঝামেলায় ফেলে দিলাম?

- ঝামেলা আর কি! দুইটা বাচ্চা নিয়ে যে কি যন্ত্রণা! ইশ কি বলবো। এরাই যন্ত্রনা দে বেশি।

- বাচ্চা মানুষ তো! বুঝেই কি।

- একটা ছেলে-মেয়ে হোক, তখন বুঝবে। আচ্ছা ডাক্তার কি বললো? 

- কয়েকটি টেস্ট দিয়েছেন।

- করেছ? নাকি কাল করবে?

- আজই করে এসেছি। কাল রিপোর্ট। 

- দেখবে রিপোর্ট দেখে আবার টেস্ট দিবে। এটা তাদের অভ্যাস। 

- না, আর হয়তো দিবেনা।

- না দিলেই ভালো। 


পলি এর পরে আরো তিন বার ঢাকা গিয়েছে, কিন্তু ভাবীর বাসায় যায়নি। কারণ তিনি দরজাই খুলেন বিরক্ত হয়ে, রাতে সাঈদের সাথে ঝামেলা হয়, তা স্পষ্ট কানে আসে। এখন আর পলির আগের মতো ধৈর্য্য হয়না! তাই, পরের বার হোটেলে থেকে ডাক্তার দেখিয়েছে। অন্তত নিজের আত্ন সম্মান বজায় থাকে, হয়তো আবিদ এতো দামী হোটেলে থাকেনা, একেবারেই নরমাল খাওয়া দাওয়া করে, তবুও শান্তি লাগে। 


জাহিদের বিয়ের জন্য যে মেয়ে ঠিক করা হয়েছে, সে এ বছর ডিগ্রি পরীক্ষা দিবে, তাহমিনা হাফিজ নাম। পাশের গ্রামের মেয়ে, বাবা হাই স্কুলে পড়ান। দুই ভাই-বোনের মধ্যে সে ছোট। দেখতে শ্যাম বর্ণের হলেও খুব মায়াবী চেহারা। মধ্যেবিত্ত পরিবারের বড় মেয়ে, শান্ত শিষ্ট ভদ্র মেয়ে। রাহেলা বেগম নিজে বিয়ে ঠিক করেছেন আগামী মাসের তিন তারিখ জাহিদের বিয়ে। সে খুব দুঃচিন্তায় করছে, তার বউ কি আবার ভাবীর মতো হবে কিনা! 


বিশ বছর পর......


পলির অনেক চিকিৎসার পরে যময পুত্র হয়েছে। যময পুত্র দুইজন খুবই মেধাবী। একজন বুয়েটে ত্রিশ তম হয়েছে, অন্যজন মেডিকেলে নব্বই তম হয়েছে। বড় ছেলের নাম তামিম, ছোট জন তালহা। শিক্ষক বাবার মেধাবী সন্তান হয়েছে দুজন। বাবার স্বল্প বেতনের চাকরিতে তারা আনন্দে থেকেছে। কখনো অন্যায় আবদার করেনি।


পলির শ্বশুর ঢাকায় ছয় তলা বাড়ী করেছেন, প্রত্যেক ছেলেকে একেক ফ্ল্যাট দিয়ে, বাকি গুলি ভাড়া দিয়েছেন। পলির ফ্ল্যাট দক্ষিণ দিকে। তিন বেড বড় ফ্ল্যাট পলির। শ্বশুর নিজের জীবনের সব জমানো অর্থ, পেনশন আর পুরোনো সেই টিন শেডের বাসা বিক্রি করে এই বাড়ী করেছেন।


যদিও টাইলস করা নয়, এবং থাই গ্লাস লাগানো নয়। খুবই সাদামাটা একটা ছয়তলা বিল্ডিং করেছেন প্রফেসর শফিউল আলম। বড় ছেলের ঘরের নাতিও এবার ডাক্তারি পাশ করেছে। অনান্য নাতি-নাতনীরা ও পড়াশোনায় খুবই ভালো। শফিউল সাহেব নাতি-নাতনীদের সাথে গল্প করে বেশিরভাগ সময় কাটিয়ে দেন, আর বাকি সময় নামাযেই চলে যায়। বয়স প্রায় আশি ছুঁই ছুঁই, তবুও পাঁচ ওয়াক্ত মসজিদে নামায পড়েন তিনি। 


আবিদের চাকরী এখনো চট্টগ্রামে, কিন্তু পলি দুই ছেলে নিয়ে ঢাকায় থাকে কারণ দুইজনই ঢাকায় চান্স পেয়েছে। বড় ছেলে বুয়েটে, আর ছোট ছেলে সলিম উল্লাহ মেডিকেলে। এজন্য শফিউল সাহেব বলেছেন পলি, তুমি ঢাকার বাসায়, নিজের ফ্ল্যাটে উঠে যাও। যদিও ছোট ছেলেকে হলে থাকতে হয়, শুধু বৃহস্পতিবার বাসায় ফিরে সে। তবুও ঢাকায় ভালোই লাগে পলির, জা, দেবর সবাই নিয়ে আনন্দে থাকে।


সাঈদের দুই সন্তান বিদেশে পড়াশোনা করছে। সাঈদ এ বছর অবসরে গিয়েছে। শারমিন-সাঈদ ঢাকার পাশে নারায়ণ গঞ্জের দিকে একটা একতলা বাড়ী করেছে। বিশাল বাংলা প্যাটার্ন বাড়ী। কিন্তু মানুষ মাত্র দুইজন, আত্নীয়-স্বজন ভাই-বোন কেউ সাঈদের বাসায় যায়না। তাদের দুজনের সময় যায় একা একা গল্প করে করে।


কলি আর জুয়েলের একটা রাজকন্যা আছে। সে এবার ক্লাস টেনে উঠেছে। জুয়েলের পোস্টিং এখন রাজশাহীতে। মেয়ে নিয়ে বেশ আনন্দে কেটে যায় তাদের সংসার। প্রায়ই ঢাকায় পলির বাসায় এসে দুই বেন মিলে ঘুরাঘুরি করে। 


জাহিদের এক ছেলে-এক মেয়ে। জাহিদের বউ তাহমিনা সবাই কে আদর করে, ভালবাসে। রাহেলা বেগম জাহিদের সাথেই থাকেন। বাড়ীতে এখন পাকা বাড়ী হয়েছে। তাদের অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। জাহিদ চাকরির পাশে পাশে ব্যবসা করে, বেশ উন্নতি করেছে।


জলিও তিন ছেলে মেয়ে ভালো আছে। জলির ছেলে, এলাকার কলেজে ডিগ্রি ৩য় বর্ষে পড়ছে। আগের চেয়ে রনির আর্থিক অবস্থা অনেক ভালো হয়েছে।


মাঝখান থেকে শাহিদ পড়াশোনা শেষ করিনি। ঢাকা থেকে ফিরে সে লাইব্রেরি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল। সবাই বলার পর ও আর সে পড়াশোনা শেষ করিনি। বাড়ীতে আলাদা হয়ে সংসার করছে শাহিদ। শাহিদের বউ মাঝারি ধরণের, চলে যাচ্ছে তাদের সংসার। জাহিদ আর নাহিদ সব সময় শাহিদ কে সাহায্য করে চালিয়ে নিচ্ছে। শাহিদের দুই মেয়ে, তারা স্কুলে পড়ছে। বাড়ীতে গেলে সবাই জাহিদের ঘরে উঠলেও শাহিদের বউ আদর আপ্যায়ন করে। রাহেলা বেগম সংসারের শান্তির জন্য আলাদা করে দিয়েছেন। দুই বউ আলাদা থাকলেও ভালো ভাবে যার যার সংসার করছে।


নাহিদ ভালো একটা মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানীর উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, এক পুত্র নিয়ে সুখে সংসার করছে। সময় পেলেই সবার সাথে দেখা করতে আসে। বাড়ীতে গেলে আগের অনেক স্মৃতি মনে করে দুই বোন, ভাইদের নিয়ে অনেক আনন্দ করে।


প্রায়ই পলিকে ফোন দেন শারমিন। আজ ও ফোন দিয়েছেন, এই পলি তুমি ঢাকায় থাকো, আর আমার বাসায় আসার সময় হয়না?

- কাকে নিয়ে আসবো ভাবী। দুই ছেলে ব্যস্ত, আর আবিদ ছুটি পেলে আসে।

- এখন তো তুমি বড়লোক মানুষ, ঢাকায় ফ্ল্যাট পেয়েছো।

- এটা তো আমার শ্বশুরের বাসা তিনি দিয়েছেন, তাই থাকছি। আমি বড়লোক হলাম কবে?

- আমরা তো আর ঢাকায় ফ্ল্যাট করতে পারলাম না। দুই জনের পড়ার কত খরচ ছিল! তাই ঢাকার বাইরে থাকি। মন পড়ে থাকে ঢাকায়।

- কত্ত বড় বাড়ী করেছো!

- ঢাকায় তো আর পারিনি।এখন দুই ছেলে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার তোমার আলাদা ভাব, তাই গরীবের বাসায় আসো না।

- না, ভাবী কি যে বলো। আসবো, তোমরা আসো।

- হ্যা আসবো। কবে আসবে বলিও আমি তোমার পছন্দ মতো জিনিস রান্না করবো।

- আচ্ছা! আসবো এক সময়।


পলি ছয় তলার ছাদে দাঁড়িয়ে আছে। ফোনে কথা বলা শেষ করে, দীর্ঘশ্বাস ফেলছে! আহারে এক দিন ভাবীর বাসায় থেকে পড়াশোনা করা সম্ভব হয়নি, এমনকি ডাক্তার দেখাতে যেতে পারেনি। আজ অবস্থার উন্নতি, আর ছেলেদের চান্স পাওয়ার পর ভাবী দাওয়াত দেন। দুই সন্তান প্রতিষ্টিত অথচ একাকিত্ব এখন দুজনের উপর ভর করেছে প্রবল ভাবে।

এক সময় ভাবী আলাদা থেকেছেন এখন কেউ তার বাসায় যেতে চায়না! 


শারমিনের পুরোনো অভ্যাস এখনো আছে। তিনি পলি,কলি আর নাহিদ কে দাওয়াত দিলেও এখনো শাহিদ আর জলিকে কখনোই ফোন দেন না, কারণ তারা আর্থিক দিক থেকে দূর্বল। জাহিদ কে মাঝে মাঝে ফোন দেন দরকারে। জাহিদ অবশ্যই কাজ করে দ্রুত ফিরে, কারণ সে জানে ভাবীর সংসারে তাদের জায়গা এখনো হয়নি, আর হবেনা। এটা ভসবীর একান্তই নিজের সংসার।


পলি ভাবছে, ভাবী কি একা থেকেও মানুষ নিয়ে, আত্নীয়-স্বজন নিয়ে ভালো থাকার চিন্তা করবেন না! নাকি চিরকাল এভাবেই থাকবেন।


রাহেলা বেগমের এখন কোন চিন্তা নেই, বিভিন্ন ধরনের অসুখ বাসা করেছে শরীরে। কিন্তু নাতি নাতনীদের সাথে গল্প চলমান। সব সময় বলেন তোমরা মানুষ বড় হও, দেখবা সবাই দাম দিবে। নয়তো কখন হারিয়ে যাবে, বুঝবেনা। তালহা-তামিমের মতো হও, তারা যেমন পড়াশোনায় ভালো, মানুষ হিসেবে ভালো। সব দিক দিয়ে ভালো হও, দেখবে সবাই কাছে ডাকবে আদর করবে। পড়াশোনা করে আবার নিজের মানুষ কে ভুলে যেওনা, তবে কখনোই শান্তি পাবেনা। পড়াশোনার ডিগ্রির সাথে ভালো মানুষ হওয়ার ডিগ্রি নিতে হবে, এটা মনে রাখবে....


সমাপ্ত।

শেষ পর্ব।

#ভাবীর_সংসার

#আন্নামা_চৌধুরী


এই গল্পের সবগুলো লিংক একসাথে দেওয়া হলো........


Part 1

https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116748237585946/


Part 2

https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116748577585912/


Part 3 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116749654252471/


Part 4 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116749830919120/


Part 5 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116749987585771/


Part 6 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116750184252418/


Part 7 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116750594252377/


Part 8 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116750777585692/


Part 9 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116750834252353/


Part 10 

https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116750990919004/


Part 11 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116752694252167/


Part 12 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116752737585496/


Part 13 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116752877585482/


Part 14 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116752924252144/


Part 15 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116752980918805/


Part 16 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116753907585379/


Part 17 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116753950918708/


Part 18 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116754134252023/


Part 19 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116754357585334/


Part 20 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116754460918657/


Part 21 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116755404251896/


Part 22 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116755697585200/


Part 23 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116755724251864/


Part 24 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116755837585186/


Part 25 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116755887585181/


Part 26 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116756464251790/


Part 27 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116756510918452/


Part 28 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116756584251778/


Part 29 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116756704251766/


Part 30 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116756760918427/


Part 31 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116757237585046/


Part 32 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116757294251707/


Part 33 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116757334251703/


Part 34 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116757400918363/


Part 35 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116757507585019/


Part 36

https://www.facebook.com/110634791530624/posts/116911754236261/


Part 37 

https://www.facebook.com/110634791530624/posts/118646237396146/


Part 38 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/119540520640051/


Part 39 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/121197933807643/


Part 40 

https://www.facebook.com/110634791530624/posts/122277197033050/


Part 41 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/123262766934493/


Part 42 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/123914693535967/


Part 43 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/124876020106501/


Part 44 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/126133143314122/


Part 45 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/127153526545417/


Part 46 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/128351763092260/


Part 47 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/129308249663278/


Part 48 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/129874692939967/


Part 49 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/131153766145393/


Part 50 https://www.facebook.com/110634791530624/posts/132133499380753/


Part 51(End Part) https://www.facebook.com/110634791530624/posts/132859899308113/

আন্নামা চৌধুরী।

৩০.০৩.২০২২


বি.দ্রঃ প্রিয় পাঠক, আপনাদের ভালবাসায়, এই গল্প একান্ন পর্ব পর্যন্ত লেখার সাহস করেছি। আপনাদের এতো এতো ভালবাসায় আমি মুগ্ধ। অনেক সময় নানা কারণে দেরী করেছি এজন্য দুঃখিত। সবাই পাশে থাকবেন। আবারও শীঘ্রই নতুন কোন গল্প নিয়ে হাজির হবো, ভালো থাকুন সবাই।

 তার দেওয়া কাজল  ~

তার দেওয়া কাজল ~











Writing By কোয়েল তালুকদার


একদিন রাতে অফিস থেকে বাড়ি ফিরে দেখি -- অতিথি রুমে আলো জ্বলছে। আমি আমার স্ত্রীকে বলি, 'কে এসেছে, আলো জ্বলছে যে ঐ ঘরে।'

আমার স্ত্রী বলে, তোমার দেশের বাড়ি থেকে দুজন মানুষ এসেছে। সম্ভবত ওনারা স্বামী স্ত্রী।'


--- তাই। তুমি কী ওনাদের আগে দেখনি?


--- না। মহিলা আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, আমি তোমার কী হই? আমি যখন বলি, আমি তোমার স্ত্রী হই। তখন সে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে, 'তুমি আমাদের রঞ্জনের বউ! ও মা, কত সুন্দর তুমি! তারপর আমাকে যত সব আদর করা শুরু করেছিল।'


আমি আমার স্ত্রীকে নিয়েই অতিথি রুমে যাই। দেখি, পঞ্চাশোর্ধ একজন মহিলা ও একজন পুরুষ বিছানায় জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। আমি চিনতে পারছিলাম না। আমার মুখ ভ্যাবাচ্যাকা হয়ে ওঠে। ওনারও আমাকে চিনতে পারছিল না। আমার স্ত্রী মহিলাকে বলে, ইনি হচ্ছেন আপনাদের রঞ্জন, আপনাদের ছেলে।'

মহিলা আমার পরিচয় পেয়ে বিছানা থেকে উঠে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। এবং বলে -- 'তুমি এত বড় হয়ে গেছ!'


মহিলা বলেন, তুমি আমাকে চিনতে পারবে না। সেই ছোট বেলায় আমাকে দেখেছ। আমি তোমার ' জহুরা বুবু। মনে পড়ছে আমার কথা? মনে পড়ে কী আমাকে? সেই কত বছর আগের কথা।''


ফ্ল্যাশ ব্যাক। পঁচিশ বছর আগে।


ক্লাস ফোরে পড়ি তখন। স্কুল থেকে বাড়িতে 

ফিরলে আমাকে খেতে দিত -- হয় মা, না হয় জহুরা বুবু। জহুরা বুবু আমার জন্মের আগে আমাদের 

বাড়িতে কাজ করতে এসেছিল। সেই নাকি কোলে পিঠে আমাকে লালন পালন করেছে। আমাকে দেখে শুনে রেখেছে।


একদিন স্কুল থেকে এসে দেখি, জোহরা বুবু চোখে মোটা করে কাজল পরে আছে। আমি তার চোখের দিকে বিস্ময়ে পিট পিট করে তাকিয়ে থাকি। জহুরা বুবু আমাকে বলে -- 'কী দেখছ তুমি?'

আমি আঙুল দিয়ে জহুরা বুবুর চোখ দুটো দেখাই।


জহুরা বুবু বলে ওঠে ---'ওরে আমার ভাইটা।' 

বলেই তার চোখ থেকে আঙ্গুল দিয়ে কাজল মুছে মুছে আমার চোখে পরিয়ে দেয়। জহুরা বুবুর দেওয়া তার চোখের কাজল আমার চোখে এখন আর নেই। তা মুছে গেছে কবে।


একদিনের কথা মনে আছে। আমার খুব জ্বর এসেছিল। দু-তিন দিনেও জ্বর নামছিল না। এই জহুরা বুবু মাকে কিছুতেই রাত জাগতে দেয়নি। সেই একটানা চার রাত আমার সিয়রে বসে জেগে থেকেছে। মাথায় জলপট্টি দিয়েছে। দুচোখের পাতা একটু সময়ের জন্য সে বন্ধ করেনি।


আমার শিশুকালে জহুরা বুবু কত যে সেবা যত্ন করেছে, কত যে বিরক্তি ও যন্ত্রণা সহ্য করেছে। সে সব কথা আমার মনে নেই। আমি শুধু আমার মার কাছে থেকে সে সব কথা পরে শুনেছি।


আমি যখন ক্লাস সিক্সে পড়ি, এক বর্ষার দিনে জহুরা বুবুর বিয়ে হয়ে যায়। মা বাবাই সমস্ত বন্দোবস্ত করে তাকে বিয়ে দিয়ে দেয় দূরের এক গ্রামে। আমার শুধু মনে আছে, শ্বশুর বাড়িতে যাওয়ার সময় জহুরা বুবু আমাকে বুকে টেনে নিয়ে ফূঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। নৌকায় উঠে সারা পথ নাকি সে কাঁদতে কাঁদতে চলে গিয়েছিল।


বিয়ে হয়ে যাবার পর জহুরা বুবু মাঝে মাঝে আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসত। তারপর তার সংসার ব্যস্ততায় খুব বেশি আসত না। তারপর একদম না। তারপর চলে গেছে অনেক বছর। জহুরা বুবু আস্তে আস্তে সবার কাছে বিস্মৃত হয়ে যায়।


এই বিস্মৃত জহুরা বুবু কে দেখে যতটুকু খুশি হলাম, তার চেয়ে বেশি বিষাদে মনটি ভরে উঠল। জহুরা বুবু কেমন শীর্ণকায় হয়ে গেছে। চোখের নীচে কালো দাগ পড়ে গেছে। মনে হল, সে বড় ধরণের কোনো রোগে দুঃখে ভুগছে।


জহুরা বুবুই বলছিল, 'আমি তোমাদের বাড়ি থেকে ঠিকানা নিয়ে তোমার এখানে এসেছি। আমার অনেক বড় অসুখ হয়েছে মনে হয়। ওখানে এই রোগের কোনো চিকিৎসা নেই। তাই অসহায় হয়ে তোমার এখানে চলে এলাম। এই ঢাকা শহরে আমাদের আপন কেউ নেই। তোমার কথা মনে হল। তাই তোমার কাছে চলে আসলাম।'


আমি জহুরা বুবু কে বলি, তুমি কোনো চিন্তা করবে না। তোমাকে ভাল ডাক্তার দেখাব। তুমি ভাল হয়ে যাবে। তুমি সত্যিই ভালো হয়ে যাবে। জহুরা বুবু কিছু টাকা বের করে আমার হাতে দেয়। বলে, 'জানি না, কত খরচ হবে। তুমি এখান থেকে খরচ করবে।' আমি ঐ মুহুর্তে জহুরা বুবু কে কোনো করুণা করতে চাইনি। আমি তার হাত থেকে টাকা নিয়ে নেই।


রুমে এসে আমি আমার স্ত্রীকে বলি -- ' জানি, তোমাকে না বললেও তুমি ওনাদের জন্য অনেক করবে। তবুও বলছি, তুমি বিরক্ত হবে না।' 

তোমাকে একটা কথা বলি -- 'এই জহুরা বুবু আমার বড় বোনের মতন, আমার মায়ের মতন। আমার সর্ব শরীরে ওনার মায়া, মমতা, আদর স্নেহ লেগে আছে।'


আমার ছলো ছলো চোখ দেখে, ও শুধু বলল, 'ওনাদের কোনও অসম্মান ও অবহেলা হবে না। তুমি দেখ।'


শহরের সবচেয়ে ভাল বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে জহুরা বুবু কে দেখাই। ওনার সমস্ত কিছু চেক আপ করানো হয়। সব গুলো রিপোর্ট পেতে দুই তিন লেগে যায়। ইতোমধ্যে ঔষধ ও খেতে থাকে। সুন্দর চিকিৎসা পেয়ে জহুরা বুবুর মুখে হাসি ফুটে ওঠে।


একদিন রাতে টেবিলে বসে খাচ্ছিলাম, আমার খাওয়া দেখে জহুরা বুবু আমার স্ত্রীকে বলছিল, 'বউ মা, তুমি রঞ্জনকে এত ঝাল ভাত খাওয়াও কেন? ও তো ছোটবেলায় ঝালভাত খেত না। দুধ আর সর্বিকলা দিয়ে ভাত খেত। ও কোনো সময় নিজ হাত দিয়ে ভাত খেত না। চাচি আম্মা, না হয়‌ আমি তুলে খাওয়াতাম।'


আর একদিন আমার মাথার চুলে তেল নাই দেখে, আমার স্ত্রীকে বলছিল , 'বউ মা, তুমি ওর মাথায় তেল দিয়ে দাও না কেন? সরিষার তেল নিয়ে আসো, আমি ওর মাথায় তেল দিয়ে দেই।' এ রকম আরও অনেক কিছু ঐ অল্প কয়দিনে আমাকে পেতে হয়েছে।


ইতোমধ্যে সমস্ত রিপোর্ট গুলো পেয়ে যাই। জহুরা বুবু কে আবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। ডাক্তার সাহেব রিপোর্ট সব দেখলেন। রিপোর্ট দেখে তাঁর মুখটি বিমর্ষ হয়ে উঠে। তিনি নতুন করে আরও ঔষুধ দিলেন। এবং ইংরেজিতে আমাকে বললেন-- 'আপনি ওনাদের বাইরে রেখে এসে আমার সাথে দেখা করুন।' আমি জহুরা বুবুকে বাইরে রেখে ডাক্তার সাহেবের সাথে দেখা করি।


ডাক্তার বললেন, ওনার লিউকেমিয়া ধরা পড়েছে। রক্তের ক্যান্সার। খুব বেশি হলে উনি তিন মাস বাঁচতে পারে। এই চিকিৎসা এখানে এখনও ঐ রকম নেই। খুব ব্যায়বহুল। আর করেও লাভ হবে না।


জহুরা বুবু তার স্বামীসহ আমার বাসায় আরো তিন দিন ছিল। আমি জহুরা বুবুকে বলি, 'ডাক্তার সাহেব তোমাকে তিন মাসের ঔষধ দিয়ে দিয়েছে। তুমি যদি ভালো না হও, তিন মাস পর আবার এস।'


যেদিন জহুরা বুবু চলে যাবে, সেদিন বুবুকে বলি, 'বুবু তুমি আমার চোখে একটু কাজল পরিয়ে দাও না!' 

আমার স্ত্রীর কাছে কাজল ছিল। সে কাজল নিয়ে আসে। জহুরা বুবু আমার চোখে কাজল পরিয়ে দেয়। আমি তার চোখের দিকে তাকাই। দেখি, জহুরা বুবু অঝোরে কাঁদছে।


তারপর আরও কত বছর চলে গেছে। শুনেছি অনেক আগেই জহুরা বুবু চলে গিয়েছেন জীবন নদীর ওপারে। তার দেওয়া সেই কাজল এখন আর আমার চোখে নেই। তা কবে মুছে গিয়েছে!