২২. হেমসের যোদ্ধা(পর্ব-3)
বস্তি চোখে পড়বে, সেখানেই নির্বিচারে লুটতরাজ চালাবে। সুন্দরী ও যুবতী মেয়েদের লাঞ্ছিত করবে। গ্রামের বাড়িঘর ও বস্তিতে আগুন ধরিয়ে দেবে।'
আদেশ জারী করেই তিনি তার বাহিনীকে একদিকে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। বিলডনের পরাজিত বাহিনী ক্যাম্প গুটিয়ে রওনা হলাে। পরাজয়ের প্রতিশােধ নেয়ার জন্য তারা পথে যেখানেই মুসলমান বস্তি ও গ্রাম পেলাে সেখানেই লুটতরাজ চালাতে লাগলাে।
মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করার পর সেই গ্রামে তারা আগুন ধরিয়ে দিতাে। গ্রামের নারীদের লাঞ্ছিত করতাে এবং সুন্দরী ও যুবতী মেয়েদের অনেককেই ধরে নিয়ে যেতে লাগলাে বাহিনীর সাথে। এতে মুসলিম জনসাধারণ তাদের উপরও মারমুখী হয়ে উঠলাে। গ্রামের যুবক ও কিশােররা সেই বাহিনীর ক্ষতি সাধন করার জন্য জোট বেঁধে হামলা চালাতে লাগল। এভাবেই বিলডনের পরাজিত সৈন্যরা পথ চলছিল।
এক রাতে হেমস থেকে ছয় সাত মাইল দূরে এক জায়গায় গিয়ে রাত্রি যাপনের জন্য ক্যাম্প করলাে ওরা।
বিলডন মনে মনে আশা করছিলেন, কোন খৃস্টান সম্রাট হয়তাে তাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসবে। যদি তিনি বাইরে থেকে নতুন করে সৈন্য সহযােগিতা পান তবে তিনি ফিরে যাওয়ার পরিবর্তে তকিউদ্দিনের কাছে পরাজয়ের প্রতিশােধ নিতে রুখে দাঁড়াবেন। তিনি আশা করছিলেন, আরেক বার তকিউদ্দিনের মুখােমুখি হলে নিশ্চয়ই তকিউদ্দিন ভড়কে যাবে। চাইকি দামেশক পর্যন্ত তার রাজ্য বিস্তারের পথও খুলে যেতে পারে।
রাতে ক্যাম্পে বসে এসবই তিনি ভাবছিলেন। তখনই তার মনে পড়লাে সম্রাট রিনাল্টের কথা। সম্রাট রিনাল্ট ক্রুসেড রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এ যুদ্ধে শামিল হয়েছিলেন। যদি সম্রাট রিনাল্টের সহযােগিতা পাওয়া যায় তবে তকিউদ্দিনকে উপযুক্ত শিক্ষা দেয়া তেমন কঠিন হবে না ভেবে তিনি রিনাল্টের সাথে যােগাযােগ করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
জাভীরার কোন সন্ধান না পেয়ে নিরাশ হয়ে বৃদ্ধ খৃস্টান ও তার সাথীরা সারা রাত পথ চলে সকালে গিয়ে হেমসে পৌঁছলাে। কাফেলার অন্যরাও হেমসে পৌছে গেলাে ওদের সাথে । কিন্তু তাদের কারাে কারাে গন্তব্য ছিল আরাে দূরে। তারা হেমসের বাসিন্দা ছিল না, ফলে তারা হেমসে না থেমে আরও অগ্রসর হওয়ার জন্য ওদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। জাভীরার সঙ্গীরা হেমসে তাদের ঠিকানায় গিয়ে উঠল। তানভীরের ঘােড়া তাদের সাথেই ছিল। তারা ঘােড়াটি এক মসজিদের ইমামের কাছে হেফাজত রেখে বললাে, ‘এ ঘােড়ার মালিক হেমসের এক যুবক। সে তুফানের মাঝে ঘােড়া থেকে পড়ে ডুবে গেছে। ঘােড়াটি কোন মতে বেঁচে গিয়ে নদীর কুলে উঠে এসেছিল। আমরা ঘােড়াটি ফেলে না রেখে নিয়ে এসেছি।'
মসজিদ থেকে ঘােড়া যখন তানভীরের বাড়ী পৌছলাে, তখন সেখানে শােকের ছায়া নেমে এলাে ।
সেখানে এক ইহুদী বণিকের বাড়ী ছিল। ইহুদী বণিকটি ছিল ধনাঢ্য লােক। জাভীরার স্বঘােষিত বাবা বৃদ্ধ খৃস্টান তার সাথীদের নিয়ে সেই ইহুদীর বাড়ী গিয়ে উঠলাে।
ইহুদী লােকটি তাদের সাদরে বরণ করে নিয়ে বলল, ‘তােমাদের সাথে তাে একটি মেয়ে আসার কথা, ও কোথায়? বৃদ্ধ শােক প্রকাশ করে আফসােসের সাথে বলল, জাভীরা উত্তাল স্রোতে ডুবে মারা গেছে।'
এ কথা শুনে সেই ইহুদী এবং উপস্থিত সকলেই আফসােস করলাে। বৃদ্ধ লােকটি ইহুদীকে জিজ্ঞেস করলাে, হেমসের মুসলমানদের অবস্থা কি? জেহাদের পক্ষে এখানে কেমন তৎপরতা চলছে?’ ইহুদী এ প্রশ্নের জবাব দেয়ার আগেই বৃদ্ধ আবার বলল, তারা কি এখানে সংকল্পবদ্ধ ও সংগঠিত হয়েছে? অস্ত্রের ট্রেনিং নিচ্ছে?'
ইহুদী বণিক উত্তরে বলল, এখানকার অবস্থা খুবই খারাপ। এখানে মুসলমানদের তৎপরতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তারা যথারীতি অস্ত্রের ট্রেনিং ও প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। এ এলাকাকে সুলতান আইয়ুবী তার কমান্ডাে দলের কেন্দ্র বানিয়ে নিয়েছে। এখানকার খতিব তার জ্বালাময়ী ভাষণের মাধ্যমে মুসলমানদের উত্তেজিত করে তুলছে। লােকটাকে আমার কেবল ইমাম বলে মনে হয় না, মনে হয় এ লােক কোন সামরিক অফিসার। তার প্রতিটি কথা ও পদক্ষেপ অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ! কখন কি করতে হবে বা বলতে হবে এ কথা তিনি ভাল করেই জানেন। তিনি দক্ষ সেনা কমান্ডারের মতই প্রতিটি চাল চালছেন।'
যদি তাকে কৌশলে হত্যা করি তবে কি উপকার হবে মনে করেন?' বুড়াে খৃস্টান বললাে।
না, তাতে কোনই উপকার হবে না।' ইহুদী বণিক বললাে, বরং তাতে ক্ষতির সম্ভাবনা আছে। মুসলমানরা এ জন্য আমাদের সন্দেহ করবে এবং আমাদের সকলকে ধরে ধরে হত্যা করবে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, এ এলাকায় এখনাে তাদেরই শাসন জারী আছে।'
‘এখানে যেসব খৃস্টান ও ইহুদী রয়েছে তাদের মেয়েরা কি কিছুই করতে পারছে না?' বৃদ্ধ খৃস্টান জিজ্ঞেস করলাে।
‘আপনি তত ভাল করেই জানেন এমন কাজ করতে কি পরিমাণ ট্রেনিং ও অভিজ্ঞতার প্রয়ােজন হয়। ইহুদী বনিক বললাে, আমাদের মেয়েদের মধ্যে কেউ তেমন প্রশিক্ষণ পায়নি।'
আপনি কি এখানে মুসলমানের মধ্যে যুদ্ধের ট্রেনিং বন্ধ করে দিতে চান? বৃদ্ধ প্রশ্ন করলাে।
‘আপনি কেন্দ্র থেকে কি নির্দেশ নিয়ে এসেছেন?' ইহুদী পাল্টা প্রশ্ন করলাে।
‘আমাকে বলা হয়েছে এখানে মুসলমানদের নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধানোের আয়ােজন করতে। সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তােলার ব্যবস্থা করতে। জাভীরার জন্য এ কাজ তেমন কঠিন ছিল না। কিন্তু তাকে ছাড়া তাে এ কাজ করা সম্ভব নয়। এ কাজ করতে হলে এখানে তার মত আরাে দুটি মেয়ে আনানো প্রয়ােজন।'
কিন্তু আমাদের হাতে সময় খুবই কম।' ইহুদী বললাে, ‘আপনি তাে জানেন, রমলার যুদ্ধে যে আইয়ূবীকে আমরা পরাজিত করেছিলাম, তিনি বসে থাকার লােক নন। আপনি বাস্তবতা স্বীকার করলে বলবাে, এই পরাজয় সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর উদ্যম আরাে বাড়িয়ে দিয়েছে। বাঘকে খোঁচা দিলে সে বাঘ যেমন ভীত না হয়ে আরাে মারমুখী হয় তেমনি হয়েছে আইয়ুবীর অবস্থা। তিনি নিশ্চয়ই এতদিনে পরাজয়ের ধকল সামলে নিয়ে তার অদক্ষ সৈন্যদেরকে দক্ষ সৈনিকে পরিণত করে নিয়েছেন। কায়রাে থেকে গােয়েন্দারা যে রিপোের্ট পাঠাচ্ছে তা মােটেই ভাল নয়। সালাহউদ্দিন আইয়ুবী যে কোন মুহূর্তে কায়রাে থেকে যুদ্ধ অভিযানে বের হয়ে যেতে পারেন। এখনও জানা যায়নি তিনি কোন দিকে অভিযান চালাবেন বা কোথায় আক্রমণ করবেন। কিন্তু তিনি যে শিঘ্রই অভিযানে বেরােবেন তা নিশ্চিত।
এদিকে তার ভাই তকিউদ্দিনের কাছেও দামেশক থেকে সৈন্য ও রসদ পৌছে গেছে। তিনি সম্রাট বিলডনকে এমনভাবে পরাজিত করেছেন, দীর্ঘ দিন সম্রাট বিলডন তার বাহিনীকে ময়দানে পাঠাতে পারবেন কিনা সন্দেহ। ফলে অবস্থা আমাদের জন্য খুবই জটিল ও ঝুঁকিবহুল হয়ে উঠেছে।
হ্যা, আপনি ঠিক কথাই বলেছেন। সালাহউদ্দিন আইয়ুবী অতর্কিত ও কমাণ্ডো আক্রমণে অসম্ভব পারদর্শী। এবারও তিনি এ ধরনের আক্রমণ চালানাের পরিকল্পনাই করবেন এটাই স্বাভাবিক। আর এ ধরনের আক্রমণ চালালে আমাদের রসদপত্র তাদের কমান্ডাে বাহিনীর আক্রমণ থেকে নিরাপদ রাখা খুবই কঠিন হবে। যদি হেমসের মুসলমানদের মধ্য থেকেই তারা কমান্ডাে নির্বাচন করে থাকে তবে এ বিপদের মাত্রা আরাে একশাে গুণ বেড়ে যাবে। তখন তাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে আমাদের রসদপত্র অন্যত্র পাঠানাে যেমন নিরাপদ নয়, তেমনি বাইরে থেকে সাহায্য আসার পথও বিপদ মুক্ত নয়।'
‘এ জন্যই বলছিলাম, এই অবস্থায় মুসলমানদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে তাদেরকে দ্রুত চক্রান্তের জালে বন্দী করাটা জরুরী হয়ে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে বিলম্ব করলে তা আমাদের জন্য কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণই ডেকে আনবে। আর গুপ্তহত্যার যে চিন্তা আপনি করেছেন তা বাদ দিতে হবে। কারণ ওই পথে গেলে ব্যর্থতা গ্রাস করবে আমাদেরকে। তখন প্রমাণিত হবে আমরা এর সাথে জড়িত আছি। আর এমনটি ঘটলে এখানে যে দু'চার ঘর ইহুদী ও খৃস্টান আছে তাদেরকে মেরে টুকরাে টুকরাে করে ফেলবে এখানকার মুসলমানরা।
‘কিন্তু মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার মত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ ত মেয়ে এখানে নেই। নতুন করে মেয়ে আনতে গেলেও অনেক সময় লাগবে। তারচে আমার যে সঙ্গীরা আছে তারা দু'চারটি অপারেশন করলে তারা একটা ঝাঁকি খাবে। অস্ত্রশস্ত্রের ট্রেনিং সাময়িকভাবে বন্ধও করে দিতে পারে। কিছু না করে বসে থাকার চেয়ে একটা কিছু তাে করা দরকার। তাদের জানান দেয়া দরকার যে, হেমসেও তােমাদের দুশমন আছে। ‘কিন্তু তা করতে গেলে ওরা আমাদের মেরে একবারে সাফ করে দেবে!' ইহুদী তার হাতকে তলােয়ারের মত করে ডানে বামে ঘুরিয়ে বললাে, “এই মুসলিম এলাকা থেকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দেবে আমাদের। এই অবস্থায় আমাদের স্ত্রীসন্তান-পর িজন ও ধন-সম্পদসহ এখান থেকে বের হয়ে যেতে হবে।'
‘আমি আশা করি খৃস্টান সম্রাটরা তােমাদের অন্যত্র বসতি স্থাপনে সাহায্য করবেন । অবস্থা বুঝিয়ে বলতে পারলে তারা ক্ষতিপূরণ দিতেও প্রস্তুত থাকবেন।
“ঠিক আছে, আপনি যা ভাল বুঝেন তাই করেন। আপনাকে কেন্দ্র থেকে পাঠানাে হয়েছে। সবদিক বিবেচনা করে আপনি যে সিদ্ধান্ত নেবেন সেটাই আমাদের সিদ্ধান্ত। আমি ইহুদী, জেরুজালেমে আমাদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জন্য আমি নিজের বাড়ীঘর ধন-সম্পদ ত্যাগ করতেও রাজী আছি।
যদি এটাই হয় তােমাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত তবে বিষয়টি আমি নতুনভাবে খতিয়ে দেখতে চাই। সে ক্ষেত্রে গুপ্তহত্যার পথে না গিয়ে পুরাে জনপদ ধ্বংস করে দেয়ার ব্যবস্থা করলে কেমন হয়?' বৃদ্ধ প্রশ্ন করলাে।
‘এ জন্য তাে সেনাবাহিনীর প্রয়ােজন হবে!' অবাক হয়ে বলল ইহুদী।
সে ব্যবস্থাও আছে। সেনাবাহিনী রেডী হয়েই আছে।' বৃদ্ধ বলল, ‘সম্রাট বিলডনের সৈন্য বাহিনী এখান থেকে পাঁচ ছয় মাইল দূরে ক্যাম্প করে আছে। আপনি হয়তাে জানেন না, এই বাহিনী এখানে আসার পথে যত মুসলিম পল্লী পেয়েছে সব আগুন জ্বালিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছে। পরাজয়ের প্রতিশােধ নিতে তারা বেপরােয়া হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, অকাতরে লুণ্ঠন চালিয়েছে। তাদের মধ্যে যে ক্ষোভ আছে সেখানে একটু ঘি ঢাললে তাদের দিয়েই হেমস ধ্বংস করে দেয়া সম্ভব। আপনি ভাববেন না, আমি আজই সেখানে যাবাে এবং সম্রাট বিলডনকে বলবাে হেমস দখল করার. এটাই উপযুক্ত সময়। ‘কিন্তু নির্বিচারে ধ্বংসযজ্ঞ চালালে এখানকার ইহুদী ও খৃস্টানদের কি হবে? আমরা কি এলাকা থেকে সরে পড়বাে? “আরে না, আমাদের উদ্দেশ্য এটা নয় যে, এলাকাটা ধ্বংস হােক।' বৃদ্ধ বললাে, বরং আমাদের টার্গেট থাকবে যাতে এখানকার কোন মুসলমান জীবিত না থাকে। সৈন্যরা যে পরিমাণ সম্পদ পারে নিয়ে যাবে, বাকীটা তােমাদের। তােমরা নিজেরা তখন মুসলমানদের বাড়ীঘরগুলাে দখল করে নেবে। আমি সেভাবেই অভিযান চালানাের জন্য বলে দেবাে সম্রাট বিলডনকে।
‘আর সুন্দরী মেয়েদেরকে?' বুড়াের এক সঙ্গী পেছন থেকে প্রশ্নটা তুলল।
সৈন্যেরা ওদের মধ্য থেকে যাদের পছন্দ করবে উঠিয়ে নিয়ে যাবে, অবশিষ্টদের পাবে তােমরা।
সবাই এ প্রস্তাবে একমত হলাে। সিদ্ধান্ত নেয়া হলাে, আজ রাতেই বৃদ্ধ অতিথি সম্রাট বিলডনের ক্যাম্পে যাবেন।
তারা যখন এ সিদ্ধান্ত নিয়ে বৈঠক শেষ করে বাইরে এলাে, তখন এক অশ্বারােহীকে দেখলাে ছুটে আসছে গ্রামের দিকে। অশ্বারােহী গ্রামের মধ্যে প্রবেশ করলাে। স্থানীয় ইহুদী আগন্তুককে চিনতে পারল না ! বুঝা গেল এ লােক বাইরে থেকে কোন খবর নিয়ে এসেছে। ইহুদী তাকিয়ে রইলাে আগন্তুকের দিকে।
সামনেই খতিবের বাড়ী দেখা যাচ্ছিল। অশ্বারােহী খতিবের বাড়ীর সামনে গিয়ে থেমে গেলাে এবং অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নেমে এলাে। ইহুদী লােকটি দেখতে পেলাে যুবক খতিবের দরােজায় করাঘাত করছে।
খতিব বাইরে বেরিয়ে এলেন এবং আন্তরিকতার সাথে আগন্তুকের সঙ্গে মুছাফেহা করলেন। তারপর দু’জনই ঘরের ভেতরে ঢুকে গেলেন।
‘এই অশ্বারােহী দামেশক বা কায়রাের কাসেদ।' ইহুদী বণিক বললাে, “নিশ্চয়ই কোন গুরুতর খবর নিয়ে এসেছে।'
এশার নামাজের পর সমস্ত মুসল্লীরাই চলে গেল। মাত্র পাঁচ ছয় জন লােক খতিবের পাশে বসে রইলাে। তাদের মধ্যে আগন্তুক অশ্বারােহীও ছিল। খতিব কোন একজনকে বললাে, দরােজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দাও।
আমার বন্ধুগণ!' খতিব বললেন, “আমার এ বন্ধু সুলতান তকিউদ্দিনের কাছ থেকে এই সংবাদ নিয়ে এসেছে যে, সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী খুব শিঘ্রই কায়রাে থেকে যুদ্ধ যাত্রায় বের হবেন। আপনরা সকলেই কমান্ডো বাহিনীর একেকজন উস্তাদ। আপনাদের এখন কি করতে হবে সে কথা বলে দেয়া আমি নিষ্প্রয়ােজন মনে করি। আপনাদের কাজ আপনারা ঠিক করে নিন। তবে তার আগে নিজ নিজ বাহিনীর প্রশিক্ষণ ও ট্রেনিং ঠিক মত হয়েছে কিনা তা আবারাে যাচাই করে নিন। তকিউদ্দিন সংবাদ পাঠিয়েছেন, খৃস্টান সম্রাট বিলডন তার সৈন্যসহ হিম্মত এলাকা থেকে পরাজিত হয়ে পালিয়ে আমাদের আশপাশে কোথাও ক্যাম্প করে আছে। যে কোন সময় সে আমাদের ওপর আঘাত হানতে পারে। তাই এদিকে আমাদের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
আজ রাতেই হেমসের বাইরে চারদিকে গােয়েন্দা পাঠিয়ে তারা কোথায় আস্তানা গেড়েছে খবর নিতে হবে। তারা কোথায় এবং কত দূরে আছে জানতে হবে আমাদের। তাদের চলাফেরা ও মতিগতির উপরে দৃষ্টি রেখে তাদের তৎপরতা সম্পর্কে তকিউদ্দিনের কাছে রিপাের্ট পৌঁছাতে হবে। তিনি আরও আদেশ দিয়েছেন, পরিস্থিতি বুঝে বিলডনের খৃস্টান বাহিনীর উপর অতর্কিত কমান্ডাে আক্রমণ চালাতে দ্বিধা করবে না। তাদের উপর ততক্ষণ কমান্ডাে আক্রমণ অব্যাহত রাখবে, যতক্ষণ তারা পরাজয় স্বীকার না করে বা তােমাদের সাহায্যে আমরা এসে না পৌঁছাই। যাতে তারা শান্তিতে থাকতে না পারে তার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব এখন আমাদের। সেই সাথে তকিউদ্দিন আরও বলেছেন, তাদের সৈন্যরা অনেক মুসলমান গ্রাম ও বস্তি ধ্বংস করে হেমসের কাছে পৌঁছেছে। তাদের মনােভাব ভাল থাকার কথা নয়। সুযােগ পেলে তারা হেমসেও আক্রমণ করে বসতে পারে। অতএব তাদের ব্যাপারে খুবই সাবধান থাকবে।
তকিউদ্দিন আরাে জানিয়েছেন, তার কাছে সৈন্য সংখ্যা কম বলে তিনি খৃস্টান সৈন্যদের পিছু ধাওয়া করেননি। তিনি বলেছেন, যদি বিলডনের বাহিনী আরও পিছনে সরে যেতে চায় তবে তাদের বিরক্ত করবে না। তাদেরকে নির্বিঘ্নে সরে
মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করার পর সেই গ্রামে তারা আগুন ধরিয়ে দিতাে। গ্রামের নারীদের লাঞ্ছিত করতাে এবং সুন্দরী ও যুবতী মেয়েদের অনেককেই ধরে নিয়ে যেতে লাগলাে বাহিনীর সাথে। এতে মুসলিম জনসাধারণ তাদের উপরও মারমুখী হয়ে উঠলাে। গ্রামের যুবক ও কিশােররা সেই বাহিনীর ক্ষতি সাধন করার জন্য জোট বেঁধে হামলা চালাতে লাগল। এভাবেই বিলডনের পরাজিত সৈন্যরা পথ চলছিল।
এক রাতে হেমস থেকে ছয় সাত মাইল দূরে এক জায়গায় গিয়ে রাত্রি যাপনের জন্য ক্যাম্প করলাে ওরা।
বিলডন মনে মনে আশা করছিলেন, কোন খৃস্টান সম্রাট হয়তাে তাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসবে। যদি তিনি বাইরে থেকে নতুন করে সৈন্য সহযােগিতা পান তবে তিনি ফিরে যাওয়ার পরিবর্তে তকিউদ্দিনের কাছে পরাজয়ের প্রতিশােধ নিতে রুখে দাঁড়াবেন। তিনি আশা করছিলেন, আরেক বার তকিউদ্দিনের মুখােমুখি হলে নিশ্চয়ই তকিউদ্দিন ভড়কে যাবে। চাইকি দামেশক পর্যন্ত তার রাজ্য বিস্তারের পথও খুলে যেতে পারে।
রাতে ক্যাম্পে বসে এসবই তিনি ভাবছিলেন। তখনই তার মনে পড়লাে সম্রাট রিনাল্টের কথা। সম্রাট রিনাল্ট ক্রুসেড রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এ যুদ্ধে শামিল হয়েছিলেন। যদি সম্রাট রিনাল্টের সহযােগিতা পাওয়া যায় তবে তকিউদ্দিনকে উপযুক্ত শিক্ষা দেয়া তেমন কঠিন হবে না ভেবে তিনি রিনাল্টের সাথে যােগাযােগ করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
জাভীরার কোন সন্ধান না পেয়ে নিরাশ হয়ে বৃদ্ধ খৃস্টান ও তার সাথীরা সারা রাত পথ চলে সকালে গিয়ে হেমসে পৌঁছলাে। কাফেলার অন্যরাও হেমসে পৌছে গেলাে ওদের সাথে । কিন্তু তাদের কারাে কারাে গন্তব্য ছিল আরাে দূরে। তারা হেমসের বাসিন্দা ছিল না, ফলে তারা হেমসে না থেমে আরও অগ্রসর হওয়ার জন্য ওদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। জাভীরার সঙ্গীরা হেমসে তাদের ঠিকানায় গিয়ে উঠল। তানভীরের ঘােড়া তাদের সাথেই ছিল। তারা ঘােড়াটি এক মসজিদের ইমামের কাছে হেফাজত রেখে বললাে, ‘এ ঘােড়ার মালিক হেমসের এক যুবক। সে তুফানের মাঝে ঘােড়া থেকে পড়ে ডুবে গেছে। ঘােড়াটি কোন মতে বেঁচে গিয়ে নদীর কুলে উঠে এসেছিল। আমরা ঘােড়াটি ফেলে না রেখে নিয়ে এসেছি।'
মসজিদ থেকে ঘােড়া যখন তানভীরের বাড়ী পৌছলাে, তখন সেখানে শােকের ছায়া নেমে এলাে ।
সেখানে এক ইহুদী বণিকের বাড়ী ছিল। ইহুদী বণিকটি ছিল ধনাঢ্য লােক। জাভীরার স্বঘােষিত বাবা বৃদ্ধ খৃস্টান তার সাথীদের নিয়ে সেই ইহুদীর বাড়ী গিয়ে উঠলাে।
ইহুদী লােকটি তাদের সাদরে বরণ করে নিয়ে বলল, ‘তােমাদের সাথে তাে একটি মেয়ে আসার কথা, ও কোথায়? বৃদ্ধ শােক প্রকাশ করে আফসােসের সাথে বলল, জাভীরা উত্তাল স্রোতে ডুবে মারা গেছে।'
এ কথা শুনে সেই ইহুদী এবং উপস্থিত সকলেই আফসােস করলাে। বৃদ্ধ লােকটি ইহুদীকে জিজ্ঞেস করলাে, হেমসের মুসলমানদের অবস্থা কি? জেহাদের পক্ষে এখানে কেমন তৎপরতা চলছে?’ ইহুদী এ প্রশ্নের জবাব দেয়ার আগেই বৃদ্ধ আবার বলল, তারা কি এখানে সংকল্পবদ্ধ ও সংগঠিত হয়েছে? অস্ত্রের ট্রেনিং নিচ্ছে?'
ইহুদী বণিক উত্তরে বলল, এখানকার অবস্থা খুবই খারাপ। এখানে মুসলমানদের তৎপরতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তারা যথারীতি অস্ত্রের ট্রেনিং ও প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। এ এলাকাকে সুলতান আইয়ুবী তার কমান্ডাে দলের কেন্দ্র বানিয়ে নিয়েছে। এখানকার খতিব তার জ্বালাময়ী ভাষণের মাধ্যমে মুসলমানদের উত্তেজিত করে তুলছে। লােকটাকে আমার কেবল ইমাম বলে মনে হয় না, মনে হয় এ লােক কোন সামরিক অফিসার। তার প্রতিটি কথা ও পদক্ষেপ অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ! কখন কি করতে হবে বা বলতে হবে এ কথা তিনি ভাল করেই জানেন। তিনি দক্ষ সেনা কমান্ডারের মতই প্রতিটি চাল চালছেন।'
যদি তাকে কৌশলে হত্যা করি তবে কি উপকার হবে মনে করেন?' বুড়াে খৃস্টান বললাে।
না, তাতে কোনই উপকার হবে না।' ইহুদী বণিক বললাে, বরং তাতে ক্ষতির সম্ভাবনা আছে। মুসলমানরা এ জন্য আমাদের সন্দেহ করবে এবং আমাদের সকলকে ধরে ধরে হত্যা করবে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, এ এলাকায় এখনাে তাদেরই শাসন জারী আছে।'
‘এখানে যেসব খৃস্টান ও ইহুদী রয়েছে তাদের মেয়েরা কি কিছুই করতে পারছে না?' বৃদ্ধ খৃস্টান জিজ্ঞেস করলাে।
‘আপনি তত ভাল করেই জানেন এমন কাজ করতে কি পরিমাণ ট্রেনিং ও অভিজ্ঞতার প্রয়ােজন হয়। ইহুদী বনিক বললাে, আমাদের মেয়েদের মধ্যে কেউ তেমন প্রশিক্ষণ পায়নি।'
আপনি কি এখানে মুসলমানের মধ্যে যুদ্ধের ট্রেনিং বন্ধ করে দিতে চান? বৃদ্ধ প্রশ্ন করলাে।
‘আপনি কেন্দ্র থেকে কি নির্দেশ নিয়ে এসেছেন?' ইহুদী পাল্টা প্রশ্ন করলাে।
‘আমাকে বলা হয়েছে এখানে মুসলমানদের নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধানোের আয়ােজন করতে। সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তােলার ব্যবস্থা করতে। জাভীরার জন্য এ কাজ তেমন কঠিন ছিল না। কিন্তু তাকে ছাড়া তাে এ কাজ করা সম্ভব নয়। এ কাজ করতে হলে এখানে তার মত আরাে দুটি মেয়ে আনানো প্রয়ােজন।'
কিন্তু আমাদের হাতে সময় খুবই কম।' ইহুদী বললাে, ‘আপনি তাে জানেন, রমলার যুদ্ধে যে আইয়ূবীকে আমরা পরাজিত করেছিলাম, তিনি বসে থাকার লােক নন। আপনি বাস্তবতা স্বীকার করলে বলবাে, এই পরাজয় সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর উদ্যম আরাে বাড়িয়ে দিয়েছে। বাঘকে খোঁচা দিলে সে বাঘ যেমন ভীত না হয়ে আরাে মারমুখী হয় তেমনি হয়েছে আইয়ুবীর অবস্থা। তিনি নিশ্চয়ই এতদিনে পরাজয়ের ধকল সামলে নিয়ে তার অদক্ষ সৈন্যদেরকে দক্ষ সৈনিকে পরিণত করে নিয়েছেন। কায়রাে থেকে গােয়েন্দারা যে রিপোের্ট পাঠাচ্ছে তা মােটেই ভাল নয়। সালাহউদ্দিন আইয়ুবী যে কোন মুহূর্তে কায়রাে থেকে যুদ্ধ অভিযানে বের হয়ে যেতে পারেন। এখনও জানা যায়নি তিনি কোন দিকে অভিযান চালাবেন বা কোথায় আক্রমণ করবেন। কিন্তু তিনি যে শিঘ্রই অভিযানে বেরােবেন তা নিশ্চিত।
এদিকে তার ভাই তকিউদ্দিনের কাছেও দামেশক থেকে সৈন্য ও রসদ পৌছে গেছে। তিনি সম্রাট বিলডনকে এমনভাবে পরাজিত করেছেন, দীর্ঘ দিন সম্রাট বিলডন তার বাহিনীকে ময়দানে পাঠাতে পারবেন কিনা সন্দেহ। ফলে অবস্থা আমাদের জন্য খুবই জটিল ও ঝুঁকিবহুল হয়ে উঠেছে।
হ্যা, আপনি ঠিক কথাই বলেছেন। সালাহউদ্দিন আইয়ুবী অতর্কিত ও কমাণ্ডো আক্রমণে অসম্ভব পারদর্শী। এবারও তিনি এ ধরনের আক্রমণ চালানাের পরিকল্পনাই করবেন এটাই স্বাভাবিক। আর এ ধরনের আক্রমণ চালালে আমাদের রসদপত্র তাদের কমান্ডাে বাহিনীর আক্রমণ থেকে নিরাপদ রাখা খুবই কঠিন হবে। যদি হেমসের মুসলমানদের মধ্য থেকেই তারা কমান্ডাে নির্বাচন করে থাকে তবে এ বিপদের মাত্রা আরাে একশাে গুণ বেড়ে যাবে। তখন তাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে আমাদের রসদপত্র অন্যত্র পাঠানাে যেমন নিরাপদ নয়, তেমনি বাইরে থেকে সাহায্য আসার পথও বিপদ মুক্ত নয়।'
‘এ জন্যই বলছিলাম, এই অবস্থায় মুসলমানদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে তাদেরকে দ্রুত চক্রান্তের জালে বন্দী করাটা জরুরী হয়ে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে বিলম্ব করলে তা আমাদের জন্য কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণই ডেকে আনবে। আর গুপ্তহত্যার যে চিন্তা আপনি করেছেন তা বাদ দিতে হবে। কারণ ওই পথে গেলে ব্যর্থতা গ্রাস করবে আমাদেরকে। তখন প্রমাণিত হবে আমরা এর সাথে জড়িত আছি। আর এমনটি ঘটলে এখানে যে দু'চার ঘর ইহুদী ও খৃস্টান আছে তাদেরকে মেরে টুকরাে টুকরাে করে ফেলবে এখানকার মুসলমানরা।
‘কিন্তু মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার মত প্রশিক্ষণপ্রাপ্
‘আমি আশা করি খৃস্টান সম্রাটরা তােমাদের অন্যত্র বসতি স্থাপনে সাহায্য করবেন । অবস্থা বুঝিয়ে বলতে পারলে তারা ক্ষতিপূরণ দিতেও প্রস্তুত থাকবেন।
“ঠিক আছে, আপনি যা ভাল বুঝেন তাই করেন। আপনাকে কেন্দ্র থেকে পাঠানাে হয়েছে। সবদিক বিবেচনা করে আপনি যে সিদ্ধান্ত নেবেন সেটাই আমাদের সিদ্ধান্ত। আমি ইহুদী, জেরুজালেমে আমাদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জন্য আমি নিজের বাড়ীঘর ধন-সম্পদ ত্যাগ করতেও রাজী আছি।
যদি এটাই হয় তােমাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত তবে বিষয়টি আমি নতুনভাবে খতিয়ে দেখতে চাই। সে ক্ষেত্রে গুপ্তহত্যার পথে না গিয়ে পুরাে জনপদ ধ্বংস করে দেয়ার ব্যবস্থা করলে কেমন হয়?' বৃদ্ধ প্রশ্ন করলাে।
‘এ জন্য তাে সেনাবাহিনীর প্রয়ােজন হবে!' অবাক হয়ে বলল ইহুদী।
সে ব্যবস্থাও আছে। সেনাবাহিনী রেডী হয়েই আছে।' বৃদ্ধ বলল, ‘সম্রাট বিলডনের সৈন্য বাহিনী এখান থেকে পাঁচ ছয় মাইল দূরে ক্যাম্প করে আছে। আপনি হয়তাে জানেন না, এই বাহিনী এখানে আসার পথে যত মুসলিম পল্লী পেয়েছে সব আগুন জ্বালিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছে। পরাজয়ের প্রতিশােধ নিতে তারা বেপরােয়া হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, অকাতরে লুণ্ঠন চালিয়েছে। তাদের মধ্যে যে ক্ষোভ আছে সেখানে একটু ঘি ঢাললে তাদের দিয়েই হেমস ধ্বংস করে দেয়া সম্ভব। আপনি ভাববেন না, আমি আজই সেখানে যাবাে এবং সম্রাট বিলডনকে বলবাে হেমস দখল করার. এটাই উপযুক্ত সময়। ‘কিন্তু নির্বিচারে ধ্বংসযজ্ঞ চালালে এখানকার ইহুদী ও খৃস্টানদের কি হবে? আমরা কি এলাকা থেকে সরে পড়বাে? “আরে না, আমাদের উদ্দেশ্য এটা নয় যে, এলাকাটা ধ্বংস হােক।' বৃদ্ধ বললাে, বরং আমাদের টার্গেট থাকবে যাতে এখানকার কোন মুসলমান জীবিত না থাকে। সৈন্যরা যে পরিমাণ সম্পদ পারে নিয়ে যাবে, বাকীটা তােমাদের। তােমরা নিজেরা তখন মুসলমানদের বাড়ীঘরগুলাে দখল করে নেবে। আমি সেভাবেই অভিযান চালানাের জন্য বলে দেবাে সম্রাট বিলডনকে।
‘আর সুন্দরী মেয়েদেরকে?' বুড়াের এক সঙ্গী পেছন থেকে প্রশ্নটা তুলল।
সৈন্যেরা ওদের মধ্য থেকে যাদের পছন্দ করবে উঠিয়ে নিয়ে যাবে, অবশিষ্টদের পাবে তােমরা।
সবাই এ প্রস্তাবে একমত হলাে। সিদ্ধান্ত নেয়া হলাে, আজ রাতেই বৃদ্ধ অতিথি সম্রাট বিলডনের ক্যাম্পে যাবেন।
তারা যখন এ সিদ্ধান্ত নিয়ে বৈঠক শেষ করে বাইরে এলাে, তখন এক অশ্বারােহীকে দেখলাে ছুটে আসছে গ্রামের দিকে। অশ্বারােহী গ্রামের মধ্যে প্রবেশ করলাে। স্থানীয় ইহুদী আগন্তুককে চিনতে পারল না ! বুঝা গেল এ লােক বাইরে থেকে কোন খবর নিয়ে এসেছে। ইহুদী তাকিয়ে রইলাে আগন্তুকের দিকে।
সামনেই খতিবের বাড়ী দেখা যাচ্ছিল। অশ্বারােহী খতিবের বাড়ীর সামনে গিয়ে থেমে গেলাে এবং অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নেমে এলাে। ইহুদী লােকটি দেখতে পেলাে যুবক খতিবের দরােজায় করাঘাত করছে।
খতিব বাইরে বেরিয়ে এলেন এবং আন্তরিকতার সাথে আগন্তুকের সঙ্গে মুছাফেহা করলেন। তারপর দু’জনই ঘরের ভেতরে ঢুকে গেলেন।
‘এই অশ্বারােহী দামেশক বা কায়রাের কাসেদ।' ইহুদী বণিক বললাে, “নিশ্চয়ই কোন গুরুতর খবর নিয়ে এসেছে।'
এশার নামাজের পর সমস্ত মুসল্লীরাই চলে গেল। মাত্র পাঁচ ছয় জন লােক খতিবের পাশে বসে রইলাে। তাদের মধ্যে আগন্তুক অশ্বারােহীও ছিল। খতিব কোন একজনকে বললাে, দরােজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দাও।
আমার বন্ধুগণ!' খতিব বললেন, “আমার এ বন্ধু সুলতান তকিউদ্দিনের কাছ থেকে এই সংবাদ নিয়ে এসেছে যে, সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী খুব শিঘ্রই কায়রাে থেকে যুদ্ধ যাত্রায় বের হবেন। আপনরা সকলেই কমান্ডো বাহিনীর একেকজন উস্তাদ। আপনাদের এখন কি করতে হবে সে কথা বলে দেয়া আমি নিষ্প্রয়ােজন মনে করি। আপনাদের কাজ আপনারা ঠিক করে নিন। তবে তার আগে নিজ নিজ বাহিনীর প্রশিক্ষণ ও ট্রেনিং ঠিক মত হয়েছে কিনা তা আবারাে যাচাই করে নিন। তকিউদ্দিন সংবাদ পাঠিয়েছেন, খৃস্টান সম্রাট বিলডন তার সৈন্যসহ হিম্মত এলাকা থেকে পরাজিত হয়ে পালিয়ে আমাদের আশপাশে কোথাও ক্যাম্প করে আছে। যে কোন সময় সে আমাদের ওপর আঘাত হানতে পারে। তাই এদিকে আমাদের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
আজ রাতেই হেমসের বাইরে চারদিকে গােয়েন্দা পাঠিয়ে তারা কোথায় আস্তানা গেড়েছে খবর নিতে হবে। তারা কোথায় এবং কত দূরে আছে জানতে হবে আমাদের। তাদের চলাফেরা ও মতিগতির উপরে দৃষ্টি রেখে তাদের তৎপরতা সম্পর্কে তকিউদ্দিনের কাছে রিপাের্ট পৌঁছাতে হবে। তিনি আরও আদেশ দিয়েছেন, পরিস্থিতি বুঝে বিলডনের খৃস্টান বাহিনীর উপর অতর্কিত কমান্ডাে আক্রমণ চালাতে দ্বিধা করবে না। তাদের উপর ততক্ষণ কমান্ডাে আক্রমণ অব্যাহত রাখবে, যতক্ষণ তারা পরাজয় স্বীকার না করে বা তােমাদের সাহায্যে আমরা এসে না পৌঁছাই। যাতে তারা শান্তিতে থাকতে না পারে তার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব এখন আমাদের। সেই সাথে তকিউদ্দিন আরও বলেছেন, তাদের সৈন্যরা অনেক মুসলমান গ্রাম ও বস্তি ধ্বংস করে হেমসের কাছে পৌঁছেছে। তাদের মনােভাব ভাল থাকার কথা নয়। সুযােগ পেলে তারা হেমসেও আক্রমণ করে বসতে পারে। অতএব তাদের ব্যাপারে খুবই সাবধান থাকবে।
তকিউদ্দিন আরাে জানিয়েছেন, তার কাছে সৈন্য সংখ্যা কম বলে তিনি খৃস্টান সৈন্যদের পিছু ধাওয়া করেননি। তিনি বলেছেন, যদি বিলডনের বাহিনী আরও পিছনে সরে যেতে চায় তবে তাদের বিরক্ত করবে না। তাদেরকে নির্বিঘ্নে সরে
(চলবে)

0 coment rios:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন