বৃহস্পতিবার, ২ জানুয়ারি, ২০২০

ক্রুসেড সিরিজ- ১৯. খুনী চক্রের আস্তানায়(পর্ব-7)


১৯. খুনী চক্রের আস্তানায়(পর্ব-7)
কায়রাে পৌছতে হবে। ' 
সে মেয়েটার পায়ের বাঁধন খুলে দিল। হাত পিছনে পিঠের সাথে আগের মতই বাঁধা থাকল। পায়ের বাঁধন খুলে সে মেয়েটার পিছনে গিয়ে দাঁড়াল। খঞ্জরের ধারালাে মাথা। মেয়েটির গায়ে ঠেকিয়ে বললাে, “সামনে বাড়াে। আমার হুকুম ছাড়া ডানে বায়ে ঘুরবে না।'
তাদের অনুসন্ধানে পিছু নিয়ে যে ব্যক্তি বের হয়েছিল, সে সুড়ংয়ের মধ্যে ও আশেপাশে ঘােরাফেরা করছিল । সিনথিয়া ও মেহেদী আল হাসানকে কোথাও না পেয়ে সে সুড়ংয়ের মুখে দাঁড়ানাে দু’জনকে ডেকে বললাে, “ওদের তাে কোথাও দেখতে পাচ্ছি না। 
মেহেদী আল হাসান যেখান থেকে সুড়ংয়ের মধ্যে প্রবেশ করেছিল লােক দুজন সেখানে এসে দাঁড়ালাে। মেহেদী আল হাসান ততক্ষণে বিপদজনক দেয়াল পার হয়ে একটি সমতল উপত্যকায় এসে পৌছলাে। সেখান থেকে সামনে অগ্রসর হয়ে তারা আবার একটি দুর্গম পাহাড়ের সামনে পড়ল। এ পাহাড় খাঁড়া এবং এত উঁচু ছিল যে, সেখানে চড়া কিছুতেই সম্ভব নয়। 
মেহেদী আল হাসান ছিল প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গােয়েন্দা। বিপদ-বাঁধা তুচ্ছ করে এগিয়ে চলাই তার কাজ। অন্ধকারেও জায়গাটা চিনে ফেলল সে। 
সে সামনে তাকিয়ে বুঝল, এ পাহাড় অতিক্রম করা সম্ভব নয়। তারচেয়ে ডানে বা বায়ে কেটে এগিয়ে যেতে হবে। এ পাহাড়টার ওপাশেই আছে নীলনদ। নীলনদের পাড় ঘেঁষে একটি রাস্তা সােজা কায়রাের দিকে এগিয়ে গেছে। তাকে এখন সে রাস্তাতেই গিয়ে উঠতে হবে। 
সে এবার মেয়েটির হাত এবং মুখের বাঁধনও খুলে দিল । তারপর তাকে হাঁটিয়ে নিয়ে এল পাহাড়ের ঢালে। বললাে, বসে পড়াে এবং নিজেকে নিচের দিকে গড়িয়ে দাও। 
দু’জনেই পাহাড়ের গা ঘেঁষে গড়িয়ে নিচে নেমে এল। তারা পাহাড়ী ঢলের নিচে এসে পৌঁছতেই পানির কুল কুল শব্দ শুনতে পেল। নদীর উঁচু পাড়ে এসে দাঁড়াল তারা । মেহেদী আল হাসানের মনে পড়ে গেল, তাকে এবং মেয়েটিকে তার সাথীরা খুঁজছে। এ অবস্থায় সােজা রাস্তায় কায়রাে রওনা দেয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। সঙ্গে সঙ্গে সে নতুন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। মেয়েটিকে আদেশ করলাে, নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়াে! মেয়েটি বললাে, আমি সাঁতার জানি না।' 
মেহেদী আল হাসান খঞ্জরটি খাপের মধ্যে পুরে নিয়ে মেয়েটিকে শক্ত করে চেপে ধরে নদীতে ঝাঁপ দিল । নদীর ভাটির টান ছিল কায়রাের দিকে। সে মেয়েটিকে তার বুদ্ধির উপরে ছেড়ে দিয়ে লক্ষ্য করতে লাগলাে। দেখলাে, মেয়েটি বেশ সাঁতার কাটছে। 
‘আমার ধারণা ছিল তুমি সাঁতার দিতে পারবে।' মেহেদী বললাে, আমি জানি তােমাকে সব ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়েই আমাদের দেশে পাঠানাে হয়েছে। বেশী শক্তি প্রয়ােগ করার দরকার নেই। কেবল গা ভাসিয়ে রাখাে, দেখবে নদীর স্রোতই তােমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। স্রোত এখন আমাদের অনুকূলে। কারণ আমরাও ভাটির দিকেই যাবাে।' 
তাদের দুই পাশেই পাহাড় ও উপত্যকা। এক পাশে তাদের অনুসন্ধানে পাহাড় জঙ্গল চষে ফিরছে একদল দুষ্কৃতকারী। অন্য পাশে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে নিরেট পাহাড়। 
সাঁতরাতে সাঁতরাতে মেয়েটি আরেকবার চেষ্টা করলাে মেহেদী আল হাসানকে তার রূপ ও যৌবনের ফাঁদে আটকাতে । কিন্তু ব্যর্থ হলাে তার চেষ্টা। 
নদী পথে সাঁতরে অনেক দূর চলে এসেছে তারা। মেহেদী আল হাসান দেখলাে, তারা বিপদসীমা পার হয়ে এসেছে। সে মুখে আঙ্গুল দিয়ে বিশেষ ধরনের সিটি বাজাতে লাগলাে। 
সে স্বাভাবিক গতিতে সাঁতার কাটছিল আর মাঝে মাঝে সিটি বাজাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পরই সে অনুরূপ সিটি বাজানাে শুনতে পেলাে। কয়েকবার সিটি বিনিময়ের পর একটি টহল নৌকা তাদের কাছে এসে থামল। 
মেহেদী আল হাসান ভাল মতই জানতাে, যেভাবে সীমান্তের প্রহরীরা দিন রাত চব্বিশ ঘন্টা পাহারায় থাকে তেমনি নদীতেও চব্বিশ ঘন্টা পাহারার ব্যবস্থা থাকে। নদীতে কোন নৌসেনা বিপদে পড়লে একে অপরকে এভাবেই বিপদ সংকেত দেয়, যেমনটি দিয়েছে মেহেদী আল হাসান। সংকেত পেয়েই নৌ প্রহরী ছুটে এসেছে তাদের কাছে। মেহেদী আল হাসান নিজের পরিচয় দিল ওদের কাছে। প্রহরীরা তাকে এবং মেয়েটিকে নৌকায় উঠিয়ে নিল।
আলী বিন সুফিয়ান গভীর নিদ্রায় ডুবেছিলেন। তাঁকে তাঁর চাকর জাগিয়ে দিয়ে বললাে, “মেহেদী আল হাসান এই মুহূর্তে আপনার সাথে দেখা করতে চায়। তার সাথে একটি মেয়েও আছে।' 
মেহেদী আল হাসান নামটাই তার কাছে যথেষ্ট ছিল। আলী বিন সুফিয়ান দ্রুত বিছানা ত্যাগ করলেন এবং তড়িঘড়ি বাইরে ছুটে গেলেন। তখনও মেহেদী আল হাসান এবং মেয়েটির কাপড় থেকে পানি ঝরছিল। 
দু’জনকেই তার কামরায় নিয়ে গিয়ে বসতে বললেন আলী বিন সুফিয়ান। কামরায় প্রদীপ জ্বলছে। মেহেদী আল হাসান এই প্রথম প্রদীপের আলােয় মেয়েটিকে দেখতে পেলাে। সে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে মনে মনে স্বীকার করলে, মেয়েটি ঠিকই বলেছিল, যদি তুমি পুরুষ মানুষ হও আর আমাকে কখনও আলােতে দেখতে পাও, তবে আমি হলফ করে বলতে পারি, তুমি তােমার কর্তব্যের কথা ভুলে যাবে।' 
মেহেদী আল হাসান হেকিমের নাম উচ্চারণ করে বললাে, তার ঘরে এক্ষুণি তল্লাশী চালাতে হবে। সব কথা আমি আপনাকে খুলে বলছি, আগে তাকে গ্রেফতারের ব্যবস্থা করুন।' 
‘মেহেদী!' আলী বিন সুফিয়ান বিস্ময়ের সাথে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কার নাম বলছে, বুঝতে পারছাে?' 
‘বেয়াদবী মাফ করবেন, বিশ্বাসঘাতক কখনাে পরের ঘরে থাকে না। আর চাইলেও সবাই বিশ্বাসঘাতক হতে পারে না।
শক্ত পােক্ত আচ্ছাদন না থাকলে বিশ্বাসঘাতকতা করাও যায় না। নামী দামী লােকের বিশ্বাসঘাতক হওয়া কি কোন নতুন সংবাদ? 
আলী বিন সুফিয়ান মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলেন, হেকিম সাহেব কি তােমাদের দলেরই লােক? এখানে মিথ্যা বললে কিন্তু পরিণাম ভয়াবহ হবে। অতএব বুঝে শুনে ভেবে উত্তর দাও। 
মেয়েটি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাে। আলী বিন সুফিয়ান মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললেন, এখানে তােমাদের সাথে সে রকম কোন ব্যবহার করা হবে না, যেমনটি তুমি ভয় পাচ্ছাে। তোমার সৌন্দর্য এবং রূপ যৌবনের মােকাবেলায় আমার সৈনিকরা পাথরের মত মজবুত। কিন্তু অসহায় মেয়েদের সাহায্যের বেলায় আমরা রেশমের মত কোমল ও মােমের মত নরম। তুমি নির্ভয়ে আবার বলাে, হেকিম কি আসলেই তােমাদের সাথী?' 
সিনথিয়া মাথা নত রেখেই সংক্ষেপে বললাে, ‘হ্যা’। 
মেহেদী আল হাসান সংক্ষেপে আলী বিন সুফিয়ানের কাছে তার কাহিনী বর্ণনা করলাে। হেকিম কি করে তাকে প্রেতাত্মার ভয় দেখিয়েছিল তাও খুলে বলল। 
আলী বিন সুফিয়ান সঙ্গে সঙ্গে কমাণ্ডো বাহিনীর কমাণ্ডারকে ডেকে পাঠালেন। কায়রাের পুলিশ প্রধান গিয়াস বিলকিসকেও ডাকলেন। তাকে হেকিমের বাড়ীতে অতর্কিতে অভিযান চালানাের হুকুম দিয়ে বললেন, “হেকিমকে গ্রেফতার করে নিজের হেফাজতে নিয়ে নাও। তার বাড়ী ও দাওয়াখানায়  তল্লাশী অভিযান চালাও। 
তারপর তিনি কমান্ডো বাহিনীর কমাণ্ডারকে বললেন, ‘জলদি বাহিনী নিয়ে প্রস্তুত হও। এখনি অভিযানে বেরােতে হবে। 
রাতের অন্ধকারেই একদল কমাণ্ডো সৈনিক দ্রুত ব্যারাক থেকে বেরিয়ে এল। যে কোন ধরনের অভিযানের জন্য ওরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত। আদেশ পাওয়ার সাথে সাথেই ঐক্যবদ্ধ ভাবে দুশমনের ওপর ঝাপিয়ে পড়ার ক্ষেত্রে ওদের কোন জুড়ি নেই। মেহেদী আল হাসানের রিপাের্ট অনুযায়ী সেই দুর্গম পাহাড়ে অভিযান চালানাের জন্য কমাণ্ডো বাহিনী দ্রুত তৈরী হয়ে এলে আলী বিন সুফিয়ান নিজে তাদের পরিচালনার দায়িত্ব নিলেন। গিয়াস বিলকিসকে তার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে তিনি ঘােড়ার পিঠে চড়ে বসলেন। অন্য দু'টি ঘােড়ার একটিতে মেহেদী আল হাসান অপরটিতে মেয়েটিকে বসিয়ে রাতের অন্ধকারেই যাত্রা করলেন তিনি। ভােরের আলাে ফোটার আগেই তিনি ঘটনাস্থলে পৌঁছে যেতে চান ।
কায়রাে থেকে জায়গাটি বেশী দূরে ছিল না। মেয়েটির খোঁজে তার বাহিনীর লােকজন তখনাে পাহাড়ের প্রতিটি খানাখন্দ ও ঝােপঝাড় চষে ফিরছিল। সর্বত্র তন্ন তন্ন করেও খুঁজে তাকে না পেয়ে ওরা অধীর ও হতাশ হয়ে পড়ল। 
শেষ রাতে ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে আস্তানায় ফিরে এল তারা। দলের কমাণ্ডার বলল, অবস্থা গুরুতর, নিশ্চয়ই এ কথা সবাই বুঝতে পারছাে? সিনথিয়া এবং মেহেদীকে কোথাও না পাওয়ার মানে হচ্ছে, তারা কায়রাে চলে গেছে। যদি তাই হয় তাহলে সে ফৌজ পাঠাতে দেরী করবে না। তাই অনতিবিলম্বে আমাদেরকে এ স্থান ত্যাগ করতে হবে।' 
কয়েকজন তার কথার প্রতিবাদ করল। বলল, “তার উট এখানে রয়ে গেছে। পালালে সে নিশ্চয়ই তার উটটি নিয়েই পালাতাে। একটা মেয়েকে নিয়ে এতদূর হেঁটে যাওয়ার মত বােকামী করার লােক সে নয়। তাছাড়া আমরা কায়রাের পথে একাধিক গ্রুপ পাঠিয়েছি। ওই পথে গেলে আমাদের গ্রুপের চোখে ওরা পড়তােই।' 
কিন্তু এ যুক্তি মেনে নিতে পারল না কমাণ্ডার। আরাে কয়েকজন কমাণ্ডারকে সমর্থন করে বলল, “এখন এখানে বসে থাকাই বােকামী হবে।' 
ফলে সিদ্ধান্ত হল, ওরা এ আস্তানা থেকে পালিয়ে যাবে। দলনেতা বলল, যদি সিনথিয়াকে মেহেদী কোনভাবে কায়রাে নিয়ে যেতে পারে তবে তার কাছ থেকে ওরা সব তথ্য আদায় করে ছাড়বে । তাই ঝুঁকি এড়ানাের জন্য আমাদের দ্রুত সরে পড়ার চেষ্টা করতে হবে।' 
সিনথিয়াকে খুঁজতে গিয়ে এমনিতেই ওরা অনেক সময় ব্যয় করে ফেলেছিল, তারপর সিদ্ধান্ত নিয়ে রওনা করতে গিয়ে তাদের আরাে দেরী হয়ে গেল। 
প্রয়ােজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে, ওরা যখন আস্তানা থেকে বেরােতে যাবে তখনি ওদের কানে এল ঘােড়ার সম্মিলিত পদধ্বনি। তারা আস্তানা থেকে বের হয়ে দেখলাে, পালাবার সমস্ত পথ তাদের বন্ধ হয়ে গেছে। 
আলী বিন সুফিয়ানের কমাণ্ডেরা মশাল জ্বালিয়ে এলাকাটা আলােকিত করে তুলল। সিনথিয়া তাদের সাথেই ছিল, সে সব কথাই বললাে ওদের। তার কাছ থেকেই জানা গেল দলের কে কোথায় আছে। 
আস্তানাতেই পাওয়া গেল পাঁচ ছয় জন ক্রুসেডার। ভেতরে পাওয়া গেল বিভিন্ন আসবাবপত্র ও মালামালের স্তুপ। যার মধ্যে ছিল আগ্নেয়াস্ত্র, গােলাবারুদ, তীর, ধনুক, খঞ্জর, তলােয়ার এবং লােহার সিন্দুকে প্রচুর সােনা-দানা ও মনিমুক্তা। মিশরের প্রচলিত মুদ্রাও ছিল প্রচুর পরিমাণে। 
ধৃত লােকদের মধ্যে মাত্র একজন বিদেশী ছিল, সেই ছিল দলের একমাত্র খৃস্টান । বাকি সবাই ছিল মিশরের মুসলমান। তাদের দ্বারাই অন্যান্য সঙ্গীদের ধরা ও অনুসন্ধান আরম্ভ হলাে । সারা রাত এবং পরের দিনও অনুসন্ধান ও তল্লাশী কাজ চললাে অব্যাহতভাবে। শেষ পর্যন্ত তাদের অবশিষ্টরাও ধরা পড়ে গেল। ধৃতদের মধ্যে সিনথিয়া ছাড়াও ছিল আরও দুটি মেয়ে।
মধ্য রাত পেরিয়ে গেছে অনেক আগে। সারা শহর তলিয়ে আছে ঘুমের ঘােরে । এক দঙ্গল পুলিশ রাতের অন্ধকার উপেক্ষা করে কায়রাের হেকিমের বাড়ীর সামনে এসে হাজির হলাে। তাদের মধ্য থেকে একজন গিয়ে হেকিমের বাড়ীর গেটে আঘাত করতে লাগলাে । 
বাড়ীর বুড়াে চাকর ‘এত রাতে আবার কার মরার শখ হলাে’ বলতে বলতে ঘুম থেকে উঠে এসে দরজা খুলে দিল । গিয়াস বিলকিস বুড়ােকে উপেক্ষা করে পুলিশ নিয়ে ঢুকে গেল বাড়ীর ভেতর। সরাসরি হেকিমের শয়ন কক্ষের সামনে এসে থামল তারা। 
তাদের হাতে ছিল মশাল । একজন মশাল বা হাতে নিয়ে ডান হাতে হেকিমের শয়ন কক্ষের দরজার কড়া নাড়ল। ভেতর থেকে দরজায় খিল লাগানাে। লােকটি উপর্যুপরি কয়েকবার আঘাত করার পর এক অর্ধ উলঙ্গ মেয়ে এসে দরজা খুলে দিল। হেকিমও অর্ধ উলঙ্গ অবস্থায় বিছানায় পড়ে আছে। হেকিমের মাথার কাছে পালংকের পাশে মদের সুরাহী ও পিয়ালা সাজানাে। 
হেকিমের তখন কোন হুশ ছিল না। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় পড়ে ছিল বিছানায়। তার রােগীরা কখনও কল্পনাও করতে পারবে না, তাদের শ্রদ্ধেয় হেকিমের অবস্থার এত অধপতন হতে পারে। 
মেয়েটি তার স্ত্রী ছিল না, এমনকি মুসলমানও না। এই মেয়ে ছিল হেকিমকে দেয়া খৃস্টানদের নানা উপহার সামগ্রীর মতই এক উপহার । খৃস্টানদের দেয়া উপহার সামগ্রীতে ভরা ছিল তার কামরা ও গৃহের বিভিন্ন কোণ।  স্বর্ণ, রৌপ্য ও নানা রকম মূল্যবান ধাতুর তৈজষপত্রে ঘরটি ভরা। এ অঢেল সম্পদ নিশ্চয়ই হেকিমের সৎ উপায়ে অর্জিত নয়, ভাবতে বাধ্য হলাে গিয়াস বিলকিস। 
হেকিমের তখনও জ্ঞান ফেরেনি। সেই অজ্ঞান অবস্থায়ই তাকে তুলে আনা হয় তার ঘর থেকে। যখন তার জ্ঞান ফেরে তখন সে নিজেকে আবিষ্কার করে কারাগারের এক গােপন কক্ষে। 
পুলিশ সুপার গিয়াস বিলকিসকে খবর দেয়া হলাে, হেকিমের ঘুম ভেঙ্গেছে। তিনি হেকিমের কাছে গেলেন। বললেন, এখন দয়া করে কোন কিছু গােপন করতে চেষ্টা করবেন না।' হেকিম দু’জন সেনা অফিসারের নাম উল্লেখ করে বললাে, এরা দু'জন মিশরে সুলতান আইয়ুবীর ক্ষমতা ও গদীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এরা দুজনই খৃস্টানদের সাথে সম্পর্ক রাখে। ক্রুসেডাররা এদের নেতৃত্বে এখানে একটি গােপন দল সৃষ্টি করেছে।' হেকিম স্বীকার করলাে, তিনি নিজেও এই দলের সাথে যুক্ত। 
‘এই মেয়েটি কে?’ গিয়াস বিলকিস প্রশ্ন করলেন।
এই মেয়েটিকে উপহার হিসেবে খৃস্টানরা আমাকে দান করেছে।' 
আপনি কি করে ওদের সাথে শামিল হলেন? 
‘আমি ওদের সাথে শামিল হতে চাইনি। কিন্তু ওদের নানা রকম প্রলােভনে পড়ে যাই আমি। যেই মেয়েটিকে আমার বাসায় দেখেছেন সে মেয়েই আমাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে। ওদের সাথে শামিল না হলে ওরা সমাজে আমার মান সম্মান ধূলার সাথে মিশিয়ে দিত। আমি তাদের ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হয়েছি। 
শুধু কি এই ভয়েই আপনি তাদের সাথে শামিল হয়েছেন?” 
না, এক দিকে লােভ, অন্য দিকে ভয় আমাকে এদের সাথে যুক্ত করেছে। ওরা আমাকে প্রচুর অর্থ সম্পদ দিয়েছে। তারা আমার এ দাবী মেনে নিয়েছে যে, তাদের সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে, আমাকে মন্ত্রীর পদ দান করা হবে।' 
হেকিম ছিলেন কায়রাের বিখ্যাত চিকিৎসক। বড় বড় অফিসারদের কাছে তিনি বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন । এই সুবাদে তার বেশ প্রভাব ছিল তাদের ওপর। সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের কাজে তাকে ব্যবহারের জন্য ক্রুসেডাররা প্রথমে তাকে টার্গেট করে। পরে তাকে ঘায়েল করার জন্য মেয়েটিকে লেলিয়ে দেয়। মেয়েটি হেকিমকে ঘায়েল করার পর তার আশ্রয়ে থেকে তারা নানা রকম ধ্বংসাত্মক কাজ শুরু করে দেয় তারা। 
কায়রােতে যে ধ্বংসাত্মক তৎপরতা চলছিল তার মূলে ছিল এই হেকিম। সে তার যােগ্যতা বলে আলী বিন সুফিয়ানের বন্ধুত্ব এবং তাঁর বিশিষ্ট কিছু গােয়েন্দাকে চিনে নিয়েছিল। এদের মধ্যে মেহেদী আল হাসানও অন্তর্ভুক্ত ছিল। 
যখনই সে পাহাড়ী এলাকায় যাতায়াত এবং দুষ্কৃতকারীদের আডডা আবিষ্কারের চেষ্টা শুরু করল, সাথে সাথে টের পেয়ে গেল হেকিম। ক্রুসেডাররা অন্য দুই কমাণ্ডারের মতই তাকেও হত্যা করার পরিকল্পনা করল। কিন্তু হেকিম তাকে দেখে ভিন্ন ফন্দি আঁটল। হেকিম সিদ্ধান্ত নিল, এমন একজন সুন্দর, শক্তিশালী, সাহসী, বুদ্ধিমান ও অভিজ্ঞ গােয়েন্দাকে হত্যা করার পরিবর্তে নিজেদের জালে আটকে ফেললে কেমন হয়! কথাটা সে দলের নেতৃস্থানীয় কয়েক জনকে বলল। সবাই বলল, “কিন্তু সে তাে আইয়ুবীর খুবই বিশ্বস্তদের একজন। কিভাবে আপনি তাকে দলে টানবেন? 
সে ব্যবস্থা আমার আছে। আমাকে যেভাবে তােমরা বশীভূত করেছাে, ঠিক সেভাবেই তাকে বশীভূত করারও অনেক পদ্ধতি জানা আছে আমার। আমি যে কয়েকজন মিশরীয় গােয়েন্দাকে হাত করার পরিকল্পনা করেছি, সে তালিকার শীর্ষেই আছে তার নাম। আমি তাকে নিয়ে বেশ পরীক্ষানিরীক্ষা চালাচ্ছিলাম। আলী বিন সুফিয়ানের গােয়েন্দা বিভাগ তাকে অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও দায়িত্বশীল মনে করে। সে এই দায়িত্ব পাওয়ায় আমার কাজ আরাে সহজ হয়ে গেল। 
সবাই বলল, “ঠিক আছে, আপনি যা ভাল মনে করেন তাই হবে। ফলে সে ক্রুসেডারদের খুনের হাত থেকে বেচে যায়। হেকিম অনেক ভেবে-চিন্তে মেহেদী আল হাসানকে এই যাদুময় ইন্দ্রজালে আটকানাের চেষ্টা করে। তার পূর্ণ আস্থা ছিল, এমন পরী রূপী প্রেতাত্মার মােহে সে অবশ্যই বশে এসে যাবে। 
একবার তাকে রূপের মােহে ফেলতে পারলে পরবর্তীতে তার চিন্তার পরিশুদ্ধির কাজ নিয়ে আর মােটেও ভাবতে হবে না। নারী ও হাশিশের নেশায় সে আপনাতেই পরিবর্তিত হয়ে যাবে। কারণ এই প্রক্রিয়াটির সাফল্য বহুল পরীক্ষিত ।.যত জায়গায় এই পদ্ধতি ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে ততবারই তা সাফল্য বয়ে এনেছে। 
কিন্তু যাদের ঈমান দৃঢ় তারা নারীর ইন্দ্রজাল ছিন্ন করে বেরিয়ে যায়। যদি মেহেদী আল হাসানও তেমনি দৃঢ়মনা ঈমানদার হয়ে থাকে তবে তার নিজের মৃত্যুর জন্য সে নিজেই দায়ী হবে। 
যে দু’জন কমাণ্ডার রহস্যপূর্ণভাবে নিহত হয়েছিল, হেকিম তাদের সম্পর্কে বলেছিল, তাদেরকে বিষ প্রয়ােগ করে হত্যা করা হয়েছিল। দু’জনকেই হেকিম এমন বিষ প্রয়ােগ করেছিল, যার স্বাদ ও গন্ধ সামান্যতম তিক্ত বা ঝাঁঝালাে নয়। এতে মানুষ তার দেহের মধ্যে কোন প্রকার কষ্ট ও পরিবর্তন অনুভব করে না। এ বিষ প্রয়ােগের বার থেকে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে কোন এক সময় লােকটি হঠাৎ মারা যায়। 
সেই দুই কমাণ্ডারকে হত্যা করার কারণ ছিল, তারাও ঈমান বিক্রি করতে রাজি হয়নি। তারা সুলতান আইয়ুবী ও তাঁর সরকারের প্রতি একান্ত অনুগত ও বাধ্য ছিল। তাদের দু’জনকে কেনার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় ক্রুসেডাররা। তারা দু’জনেই বিশ্বঘাতকতার পরিবর্তে মৃত্যুকেই শ্রেয় মনে করল । স্বাভাবিক ভাবেই তারা বিশ্বাসঘাতকদের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াল। 
হেকিম প্রথম জনকে পথে পেয়ে কথায় কথায় তাকে দাওয়াখানায় নিয়ে যায়। পরে তার চোখ ও নাড়ি দেখে ওর মধ্যে গােপন অসুখ বাসা বেঁধে আছে বলে তাকে বিচলিত করে তােলে। তারপর তাকে বলে, ঘাবড়াবার কিছু নেই। এ ঔষধটুকু খেয়ে দেখাে, যদি অসুখ না থাকে ক্ষতি নেই, আর থাকলে এতেই ভাল হয়ে যাবে। ভয় নেই, ঔষধের দাম তােমাকে দিতে হবে না। দ্বীনের পথের মুজাহিদ তােমরা, এটুকু সেবা করার সুযােগ এই বুড়ােকে দাও।' 
ঔষুধের পরিবর্তে বিষ খাইয়ে বিদায় করে দেয় সেই কমাণ্ডারকে। এ বিষ হেকিম পেয়েছিল ফেদাইনদের কাছ থেকে। 
দ্বিতীয় কমাণ্ডারের বেলায়ও একই রকম ঘটনা ঘটে। তাকেও প্রথমে ফাঁসানাের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বাগে আনতে না পেরে একই পদ্ধতিতে গােপন ব্যাধির ধোকায় ফেলে ঔষুধের পরিবর্তে বিষ পান করায়। 
হেকিম অবশ্য এসব তথ্য সহজে প্রকাশ করেনি। তার মুখ খুলতে তাকে বাধ্য করা হয়। কয়েদখানার ভয়াবহ শাস্তির যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে অবশেষে বুড়াে সব কথাই গিয়াস বিলকিসের কাছে প্রকাশ করে দেয়। 
হেকিম তার জবানবন্দীতে আরাে জানায়, একদিকে সৈন্যদের মাঝে অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে। অপরদিকে গােপনে নেশার দ্রব্য সরবরাহ করা হচ্ছে সৈনিক ও যুবকদের মাঝে। যুবকদের চরিত্র হনন ও ব্ল্যাকমেইলিং করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে মেয়ে কর্মীদের । সামরিক অফিসারদেরকেও সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তােলা হচ্ছে নানা কায়দায়। এদের মধ্যে যারা কট্টর দেশপ্রেমিক তাদেরকে কৌশলে গােপনে হত্যা করার কাজও শুরু হয়ে গেছে । সুদানী বাহিনী শীঘ্রই মিশর সীমান্তে আক্রমণ শুরু করতে যাচ্ছে। এ আক্রমণে নেতৃত্ব দেবে ক্রুসেড বাহিনী। মিশরের সীমান্ত এলাকার গ্রামগুলাের লােকদেরকে অর্থের বিনিময়ে ক্রয় করার পরিকল্পনাও রয়েছে ওদের। 
এই ষড়যন্ত্রের উদঘাটন, দেশদ্রোহীদের গ্রেফতার ও তাদের চিন্তা-ভাবনা সম্পর্কে মিশরের মাত্র তিনজন লােক সম্যকভাবে অবহিত ছিলেন। এঁরা হলেন গােয়েন্দা প্রধান আলী বিন সুফিয়ান, পুলিশ প্রধান গিয়াস বিলকিস এবং মিশরের ভারপ্রাপ্ত সুলতান আমীর তকিউদ্দিন। কিন্তু এ গােপন তৎপরতার খবর অন্য আর কাউকেও জানানাে হয়নি।
হেকিম ও তার দলের লােকেরা যাদের নাম উল্লেখ করেছে সে সব সেনাপতি ও অফিসারদের গ্রেফতার করা আবশ্যক ছিল। কিন্তু সুলতান তকিউদ্দিন এ ব্যাপারে একটু ভীত হয়ে পড়েন। তিনি এই গােপন চক্রান্তকে গােপন রাখারই আদেশ দিলেন। তিনি বললেন, এই বিষয়টি এতই নাজুক যে, এ ব্যাপারটা সুলতান আইয়ুবী নিজে এসে সামাল দিলেই সব দিক থেকে মঙ্গলজনক হবে। আমি বিষয়টি সবার আগে তাকে জানাতে চাই।' 
আসলেও বিষয়টা বড় জটিল ছিল। পুলিশ ও গােয়েন্দা প্রধানের সাথে আলাপের পর তিনি সিদ্ধান্তে পৌছলেন, তিনি নিজেই সুলতান আইয়ুবীর কাছে যাবেন এবং তাঁকে মিশর এসে এর সমাধান করার পরামর্শ দেবেন।
আলী বিন সুফিয়ান প্রত্যেক সন্দেহভাজন সেনাপতি ও অফিসারদের পিছনে একটা করে গােয়েন্দা ছায়ার মত লাগিয়ে দিলেন। তকিউদ্দিনকে বললেন, এবার আপনি যেতে পারেন। 
তকিউদ্দিন গাজী সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর সাথে সাক্ষাতের জন্য গােপনে মিশর ত্যাগ করলেন। তার এ যাত্রার কথা বিশেষভাবে গােপন রাখা হলাে। হাতে গােণা কয়েকজন ছাড়া সবাই জানল, তিনি শিকারে বেরিয়েছেন।
(চলবে)

শেয়ার করুন

Author:

আমি সজীব হোসাইন -এই ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা পাশাপাশি লেখালেখির কাজটাও করি। অনলাইনে প্রযুক্তির বিষয় নিয়ে যা জানি তা মানুষের মাঝে শেয়ার করার ইচ্ছায় এ ব্লগ টি তৈরি করা।