বৃহস্পতিবার, ২ জানুয়ারি, ২০২০

ক্রুসেড সিরিজ- ১৯. খুনী চক্রের আস্তানায়(পর্ব-6)


১৯. খুনী চক্রের আস্তানায়(পর্ব-6)
ছেড়ে দে আমাকে। আমি তাে আর ফুরিয়ে যাচ্ছি না। আগে শিকার ধর। তাের শিকার এসে গেছে। আগে তাকে ঘায়েল করে নে। ছাড়, জলদি ছাড় বলছি।' 
মেহেদী আল হাসান যে সন্দেহে জীবন বাজী রেখে তাকে ধরতে চেয়েছিল, সে সন্দেহ সত্যে পরিণত হলাে। সে চিন্তা করেছিল, যদি সত্যিই প্রেতাত্মা হয়, তবে সে কখনও সামনে আসবে না। আর যদি তা না হয়, তবে তাে একটা বড় ধরনের শিকার হাতে পাওয়া যাবে। 
মেয়েটি ভেবেছিল, তার সঙ্গী ডিউটি ফেলে তার সঙ্গ পাওয়ার জন্য এভাবে জড়িয়ে ধরেছে। তাই সে প্রথমটায় এটাকে তেমন আমল দেয়নি। কিন্তু মেহেদী আল হাসানের কণ্ঠ কানে যেতেই তার সম্বিত ফিরে এল। 
মেহেদী আল হাসান তার কানের কাছে মুখ নিয়ে বললাে, যদি চিৎকার দাও, তবে খঞ্জরের আঘাতে তােমাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে ফেলবাে।' 
‘আমি তােমার কলিজা টেনে বের করে খেয়ে ফেলবাে।' মেয়েটি বললাে, জানাে আমি কি?” 
মেহেদী আল হাসান তাকে এক হাতে চেপে ধরে অন্য হাতে খঞ্জর বের করে তার ধারালাে মাথা মেয়েটির পাঁজড়ে ঠেকাল। বলল, প্রাণের মায়া থাকলে আমি যা বলি মন দিয়ে শােন। 
এ সময় সুড়ংয়ের মুখে আর একবার আলাে জ্বলে উঠলাে। মেহেদী আল হাসান এ পথে বাইরে বের হওয়া বিপদজনক মনে করল। মেয়েটি ততক্ষণে বুঝে ফেলেছে, কি ঘটেছে। সে তাকে বিভ্রান্ত করার জন্য বলে উঠল, 'আমি এ জন্যই তােমাকে কাল কাছে আসতে দেইনি। তােমরা দুনিয়ার মানুষরা বড় প্রতারক, বড় ফেরেববাজ। তােমাদেরকে বিশ্বাস করা যায় না। মেয়েটি রাগত স্বরে বললাে, দুই হাজার বছর ধরে এ জন্যই কি আমি তােমার পথ চেয়ে অপেক্ষা করছি, তুমি আমার বিশ্বাস ভঙ্গ করবে? 
হ্যা, তােমার অপেক্ষার দিন শেষ হয়ে গেছে। মেহেদী আল হাসান বললাে, এখন আর তুমি আত্মার পবিত্র জগতে ফিরে যেতে পারবে না। এখন তুমি আমাদের এই অপবিত্র পৃথিবীর অপবিত্র মেয়ে ও নারী। 
আমি নারী নই!' সে বললাে, আমি নব-যৌবনা মেয়ে, খুব সুন্দরী মেয়ে। সে কণ্ঠ নামিয়ে বলল, আমি জোরে কথা বলবাে না, আমার কথা মনোেযােগ সহকারে শুনে নাও। আমি জানি তুমি কে, আর কেন এখানে এসেছাে। তুমি আমার কাছে এত বেশী পছন্দনীয় যে, তােমাকে পাওয়ার জন্যই আমাকে এই পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়েছে।' 
তবে আর আপত্তি কেন, আমার সঙ্গেই চলাে।' মেহেদী আল হাসান বললাে। 
না!’ মেয়েটি বললাে, বরং তুমিই আমার সঙ্গে চলাে। যদি আমি তােমার সাথে যাই তবে আমরা দু'জনই না খেয়ে মরবাে। যদি তুমি আমার সঙ্গে আসো, তবে ফেরাউনের সমস্ত গুপ্তধন আমাদের হবে। তােমাকে আর জঙ্গল, পাহাড় ও বিরাণ মরুভূমিতে ছুটে বেড়াতে হবে না। সামান্য বেতনের বিনিময়ে আর গােয়েন্দাগিরী করতে হবে না।'
‘তােমরা এখানে কি করছাে?’ মেহেদী জিজ্ঞেস করলাে। 
‘আমরা ফেরাউনের ধন-রত্ন বের করছি। মেয়েটি বললাে, ‘আমি অনেক লােকের সঙ্গে এখানে আছি।' 
তারা সব কোথায়?' মেহেদী জিজ্ঞেস করলাে। 
‘আমার সঙ্গে চলাে, দেখতে পাবে। সকলেই তােমাকে খুশিতে বরণ করে নেবে। মেয়েটি বললাে, তুমি আমাকে যখন আলােতে দেখতে পাবে, তখন তুমি তােমার দুনিয়ার কথা, তােমার বিত্ত বৈভবের কথা সব ভুলে যাবে।' 
মেহেদী আল হাসান মেয়েটির শরীর থেকে এক ধরনের সুগন্ধ পাচ্ছিল। তাতে সে নেশার ঘাের অনুভব করল। সে যখন মেয়েটিকে তার বাহুতে চেপে ধরেছিল, তখনই সে বুঝতে পারল, এই দেহ মানুষের ঈমান নষ্ট করার এক লােভনীয় বস্তু। মেয়েটির মিষ্টি মধুর কণ্ঠস্বরে যে সুধা লুকিয়ে আছে তার মােহ যে কোন পুরুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য যথেষ্ট। তার মাদকতাময় দেহ, নেশা জাগানাে ঘ্রাণ সবই বিভ্রান্তির হাতিয়ার। 
সেই মুহূর্তেই সুড়ংয়ের মুখে আবার আলাে জ্বলে উঠলাে । মেহেদী আল হাসান এবার সতর্ক হয়ে গেল । সে মেয়েটিকে আর কিছু জিজ্ঞেস করার প্রয়ােজন বােধ করলাে না। তার লােকেরা যে সুড়ংয়ের মুখে ও আশেপাশে আছে তা এই আলােই প্রমাণ করে দিল। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, এদিকের মুখ দিয়ে সে বের হবে না। কারণ এদিকে মেয়েটির লােকজন অপেক্ষা করছে। সে অন্য পাশ দিয়ে মেয়েটিকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ার তাড়া অনুভব করল ।
তখনি তার মনে হল, সেখানেও কি মেয়েটির লােকজন থাকতে পারে না? মেয়েটির সঙ্গী সাথী কয়জন ও কারা কিছুই তার জানা নেই। এ অবস্থায় অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়া ছাড়া উপায় কি! সে মেয়েটিকে কর্কশ কন্ঠে হুকুম করল, ‘তােমার এ কাফনের পােষাক খুলে ফেলল। 
মেয়েটি হুকুম তামিল করল। সঙ্গে সঙ্গে সে তার গায়ের ওপর জড়িয়ে রাখা সাদা কাপড়ের চাদরটি খুলে ফেললাে। মেহেদী আল হাসান চাদরটি এক টানে ছিড়ে তার এক টুকরাে দিয়ে মেয়েটির হাত পিছনে নিয়ে বেঁধে ফেললাে। অপর টুকরাে দিয়ে তার পা দু’টিও বেঁধে ফেললাে। তৃতীয় আরেকটি খণ্ড দিয়ে মুখটি বেঁধে দিল। তারপর তাকে কাধে উঠিয়ে গুহা থেকে বাইরে বেবিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। 
খঞ্জরটি তার হাতেই ছিল। সে সুড়ংয়ের মুখ পিছনে রেখে মেয়েটিকে নিয়ে ছুটতে লাগলাে। উদ্দেশ্য, পেছনের মুখ দিয়ে বেরিয়ে মেয়েটিকে নিয়ে এখান থেকে সরে পড়া। দ্রুত পালাতে না পারলে মেয়েটির সঙ্গী সাথীরা তাকে ধরে ফেলবে। আর তাদের হাতে একবার ধরা পড়ার মানে হচ্ছে, আগে যে দুই কমাণ্ডার এখানে মারা পড়েছে তাদের ভাগ্য বরণ করা। কিন্তু না, এভাবে মৃত্যুর কাছে নিজেকে সঁপে দেয়ার কোন মানে হয় না। সে প্রাণপণে ছুটতে লাগল।
গত রাতে যখন মেহেদী আল হাসান এখানে এসেছিল তখন প্রেতাত্মার সাথেই সাক্ষাৎ করতে এসেছিল। সুড়ংয়ের মাঝে আলাের ঝিলিকের ভেতর পলকের জন্য সে তাকে দেখতেও পেয়েছিল। পরে সেই নারী অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। 
মেহেদী যখন সুড়ং পথে দাড়িয়ে ছিল তখন সুড়ংয়ের বাইরে সে আলাে দেখতে পেয়েছিল। সে সুড়ংয়ের ভেতর দিয়ে ওপাশে যাওয়ার সময় পলকের জন্য একটি ছায়াও দেখেছিল। দিনের বেলা সুড়ংয়ের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করার সময় সে এক টুকরা ফিতা মাটিতে পড়ে থাকতে দেখল। ফিতাটি দেখেই সে বুঝে নিয়েছিল, এটা মৃতের কাফন বাঁধার ফিতা। আলী বিন সুফিয়ানের কাছে সে গােয়েন্দাগিরীর ট্রেনিং পেয়েছে। সামান্য জিনিসও যে অনেক সময় বড় রহস্য উদঘাটন করে ফেলে সে শিক্ষা সে আলী বিন সুফিয়ানের কাছেই পেয়েছিল। ফলে এই সামান্য ফিতা তার কাছে অনেক বড় হয়ে দেখা দিল। তার মনে সন্দেহ সৃষ্টি করল এই ফিতা। তাই আজ রাতে প্রেতাত্মার সাথে সাক্ষাতের জন্য আসার সময় হেকিমের নিষেধ সত্ত্বেও সঙ্গে খঞ্জর নিয়ে এসেছিল। এটা পরীক্ষার এক সুন্দর পদ্ধতি। খঞ্জর থাকা সত্ত্বেও প্রেতাত্মা এসে হাজির হয়েছে। অতএব হেকিমের বাণী মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। 
তাই আজ তার সাহসিকতা প্রদর্শনের দিন। আলাে দেখা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে কৌশলে সুড়ংয়ের ভেতর প্রবেশ করার সময়ই সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল, আজ সে প্রেতাত্মার মুখােমুখি হবে। 
এই আগুন ও প্রেতাত্মার কাহিনী মেহেদী আল হাসানের মনে অতীতের কিছু ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দিল। তার মনে পড়ে গেল, ক্রুসেডাররা ঠিক এমনিভাবে মিশরের পাহাড়ী এলাকার মূখ লােকদের ধোঁকা দেয়ার জন্য চেষ্টা করেছিল। তারা পাহাড়ের ওপর বড় ধরনের মশাল জ্বালিয়ে তার সামনে কাঠের তক্তা রাখতে, যাতে আলাের উৎস গােপন থাকে। এরপর তারা চমকপ্রদ ধাতুর পাত ব্যবহার করতাে। চকমকি ধাতুর চমক ও আলাের কিরণ সামনের পাহাড়ে গিয়ে পড়তাে। মশাল ও চকমকি ধাতুর মাঝখানে অন্য আরেকটি কাঠের তক্তা রাখা হতাে। সেটি খাঁড়া করলে জ্যোতি নিতে যেত আর শুইয়ে দিলে আলাের চমক সৃষ্টি হতাে। এই মশাল ও চকমকি ধাতুর পাত এমন ভাবে রাখা হতাে, যা সহজে লােকদের চোখে পড়ত না। 
কিন্তু মিশরে আইয়ুবীর গােয়েন্দাদের হাতে ক্রুসেডারদের এই কেরামতি ধরা পড়ে যায়। তখন তারা সেই পাহাড়ী লােকদের কাছে সব ফাঁস করে দেয়। নইলে সহজ সরল পাহাড়ী লােকেরা ব্যাপারটিকে অলৌকিক ব্যাপার বলেই বিশ্বাস করতাে। এই রহস্য উদঘাটন অভিযানে সৌভাগ্যক্রমে মেহেদী আল হাসানও জড়িত ছিল। তাই সে ঝতে পারল, সুড়ংয়ের ভেতর আলাের নাচন কোন অলৌকিক ব্যাপার নয়, এটা মানুষকে বিভ্রান্ত করার একটি অপকৌশল মাত্র। 
এটা যে ক্রুসেডারদের অপকৌশল তা বুঝতে পেরেছিল বলেই সে মেয়েটিকে আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি। জিজ্ঞেস করার মত হাতে সময়ই বা কোথায়? যে কোন সময় মেয়েটির সঙ্গীরা এসে পড়তে পারে। তখন মেয়েটিকে তাে তারা ছিনিয়ে নেবেই, তার নিজের জীবনও বিপন্ন হয়ে পড়বে। তাই মেয়েটিকে আর কিছু জিজ্ঞেস করা প্রয়ােজন মনে করেনি সে। জিজ্ঞেস করলে ভুল ব্যাখ্যা ও বুঝ দিয়ে তাকে ভ্রান্ত পথে নিয়ে যাওয়া ছাড়া মেয়েটি আর কিইবা করতে পারতাে! 
মেহেদী আল হাসান মেয়েটিকে কাঁধে নিয়ে উল্টো পথে প্রাণপণে ছুটছিল । আলাে নিক্ষেপকারীরা সুড়ং মুখে আরও কয়েকবার আলাে ফেললাে। কিন্তু তখন মেহেদী আল হাসান মেয়েটাকে নিয়ে ছুটছে। মেয়েটির কান্নার আওয়াজ থেমে গিয়েছিল। এটা ছিল এক ধরনের সংকেত ধ্বনি। অর্থাৎ শিকার এখনাে জালে ধরা পড়েনি। কিন্তু তার কান্নার আওয়াজ থেমে যেতেই মেহেদী আল হাসানকে একটি ভয় এসে তাড়া করল। সে ভেবে দেখল, মেয়েটির কান্না থেমে যাওয়ায় তার লােকজন ভাববে, শিকার জানে পড়েছে। তখন তাকে ধরার জন্য তারা ছুটে আসবে। কিন্তু যেখানে মেয়েটিকে পাওয়ার কথা সেখানে না পেলে তারা চারদিক ছড়িয়ে পড়বে তার তালাশে। আবার এমনও হতে পারে, মেয়েটির কোন সাড়া না পেয়ে তার কি হয়েছে দেখার জন্য ওরা সুড়ংয়ের ভেতর নেমে আসতে পারে। 
সে মেয়েটাকে কাঁধে নিয়ে গুহার অপর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল। সুড়ংয়ের মুখ থেকে কিছু দূরে গিয়ে সে মেয়েটাকে কাঁধ থেকে নামিয়ে মাটিতে বসিয়ে দিল। তারপর তার মুখের বাঁধন খুলে জিজ্ঞেস করলাে, তুমি কি আমাকে বলবে, আমি কোন দিক দিয়ে গেলে তােমাদের লােকদের সামনে পড়বাে না?' 
যদি তুমি একা যাও তবে বলতে পারি।'
তুমি আমার সঙ্গেই যাবে।' মেহেদী আল হাসান বললাে, ‘দেখাে, আমাকে যদি ফাসাতে চেষ্টা করাে, তবে আমি তাে শেষ হবােই, তােমাকেও জীবিত রাখবাে না। 
‘আমি তােমাকে সেই গােপন তথ্য বলে দেব, যে গােপন ভেদ জানার জন্য তুমি আগ্রহী, যদি তুমি আমাকে ছেড়ে দাও।' 
কোন শর্ত ছাড়াই আমি যা জানতে চাই তা যদি আমাকে না বলাে তাহলে আমাকে সেই পথ ধরতে হবে, যা আমার পছন্দ নয়।' তুমি আমাকে শুধু একবার আলােতে দেখে নাও।' মেয়েটি বললাে, আর আমাকে তােমার নিজের মনে করে একবার আমার সাথে চলাে; আমি তােমার সাথে কোন প্রতারণা করছি না।' 
মেয়েটি মেহেদী আল হাসানকে তার রূপ যৌবন দিয়ে প্রলােভিত করার চেষ্টা করল। তাতেও সুবিধা করতে না পেরে ধন-রত্নের লােভ দেখাল। কিন্তু তাকে কাবু করতে পারল না। মেহেদী আল হাসান মেয়েটিকে আর কথা বাড়াবার সুযােগ না দিয়ে আবার তার মুখ বেঁধে দিল। তারপর নিজের বুদ্ধিমত একটা নিরাপদ রাস্তা বেছে নিল। রাস্তাটি পাহাড়ের উপর দিয়ে এপাশ থেকে ওপাশে চলে গেছে। 
সে মেয়েটাকে সেখানেই বসিয়ে রেখে উপরে উঠতে লাগলাে। পাহাড়ী লতাপাতা, গাছের ডালের ফাঁক-ফোঁকড় গলে সে মাত্র কয়েক কদম এগিয়েছে, মেয়েটিকে ডাকতে ডাকতে একটি লােক নিচে থেকে উপরে উঠতে শুরু করল। মেহেদী আল হাসান উপরে ওঠা বন্ধ করে ধীরে ধীরে নিচে নামলাে এবং মেয়েটির কাছাকাছি এসে এক পাথরের আড়ালে লুকাল। 
লােকটি সম্ভবত মেয়েটাকে দেখতে পেয়েছিল। কারণ সে ছিল উন্মুক্ত জায়গায়। লােকটি বলে উঠল, তুমি কথা বলছে না কেন?” 
লােকটি প্রশ্ন করছে আর উপরে উঠছে। মেয়েটির মুখ বাঁধা ছিল, তাই সে লােকটির কোন প্রশ্নের জবাব দিতে পারছিল না। অবশেষে লােকটি তার একদম কাছে এসে বসে পড়ল আর বললাে, “তােমার কি হয়েছে? ওদিকে গেলে না? 
মেহেদী আল হাসান তার পিছনেই ছিল। মাত্র দুতিন গজ দূরে। সে দ্রুতবেগে উঠে লােকটির পিঠে সজোরে খঞ্জর বসিয়ে দিল। লােকটি হুমড়ি খেয়ে পড়ে যেতেই সে খঞ্জর টেনে নিয়ে আবার সজোরে আঘাত করল। 
এই দুই আঘাতেই লােকটির ভবলীলা সাঙ্গ হল, সে আর কোন শব্দই করতে পারল না। 
মেহেদী আল হাসান তাকে টেনে নিয়ে সেই পাথরের আড়ালে ফেলে দিল। এরপর সে মেয়েটাকে আবার কাঁধে উঠিয়ে পাহাড়ের উপরে উঠতে লাগলাে । 
পাহাড়টা তেমন উঁচু ছিল না। উপরের দিকটা ছিল বেশ চওড়া। মেহেদী আল হাসান সেই উপত্যকায় গিয়ে পৌঁছল। মেয়েটিকে নিয়ে এতটা চড়াই মাড়িয়ে সে একেবারে কাহিল হয়ে পড়েছিল। তার সারা শরীর দিয়ে সমানে ঘাম ঝরছিল। পানির পিপাসায় মুখ শুকিয়ে এসেছিল। উপত্যকায় পৌঁছে সে থামল। মেয়েটিকে কাঁধ থেকে নামিয়ে ঘাসের ওপর শুয়ে পড়ে লম্বা লম্বা শ্বাস নিতে লাগল। 
তার জন্য সবচে ভাল হতাে যদি বাকী রাতটুকু কোথাও লুকিয়ে থাকতে পারতাে। তারপর দিনের আলােয় একদিকে সরে পড়া তেমন সমস্যা হতাে না। কিন্তু এ ঝুঁকি নেয়ার সাহস তার হলাে না। সে তাড়াতাড়ি কায়রাে পৌঁছতে চাচ্ছিল, যাতেহেকিমকে গ্রেফতার করতে পারে এবং তাের হওয়ার আগেই এই এলাকাও অবরােধ করে নিতে পারে। 
সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখলাে । নিচে যেখানে মশালের আলাে জ্বলছিল সেখানে এক লােককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। লােকটা আয়নার মত স্বচ্ছ নিকেল করা ধাতুর পাত দুই হাতে উঠিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরাচ্ছিল। লােকটার পাশে মনে হয় আরও একজন আছে। অন্ধকারের কারণে তাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। 
মেহেদী আল হাসান পাহাড়ের উপরে থাকায় তাকে কেউ দেখতে পাচ্ছিল না। আর অপেক্ষা করা সমীচিন মনে করল না মেহেদী। সে মেয়েটিকে কাঁধে উঠিয়ে ধীরে ধীরে পাহাড়ের অপর পাশ দিয়ে নিচে নামতে শুরু করল।
এই পাহাড়ী অঞ্চলের গভীর অরণ্যে যেখানে কখনাে কোন পথিক বা রাখাল যায় না, তেমন একটি জায়গায় একটি ছােট্ট পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে পর্বত গহ্বরের একটি ভােলা মুখ। এই মুখ দিয়ে গহ্বরের ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যাবে প্রশস্ত জায়গা। এটি কোন পর্বত গহ্বর নয়, এটি একটি বিশাল কামরা। 
সেই কামরায় অনেকগুলাে লােক বসেছিল। এদের মধ্যে দুটি মেয়েও ছিল। তাদের একজন বলল, এতক্ষণে তাে ওদের ফিরে আসার কথা। তার কথার মধ্যে দুশ্চিন্তার ছাপ ছিল।
অবশ্যই আসবে!’ অন্য মেয়েটি বললাে, “ওখানে তাে ভয় বা বিপদের কিছু নেই। আজ শিকার নিয়ে আসবে তাে, তাই হয়তাে একটু দেরী হচ্ছে।' 
‘এ শিকারটা খুব কাজের লােক!' আর একজন বললাে, হতভাগা বড় দক্ষ গােয়েন্দা। আমরা তাকে নিজের মত করে গড়ে নেব।' 
সেই মুহূর্তেই একটা লােক দৌড়ে ভেতরে এলাে এবং বললাে, ‘গােপাল মরে পড়ে আছে, সিনথিয়ার কোন খোঁজ নেই। সে কি এদিকে এসেছে?
‘না!’ বিস্মিত কণ্ঠে বলল একজন, ‘গােপাল কিভাবে নিহত হলাে?' 
‘গােপালকে খঞ্জর দিয়ে খুন করা হয়েছে।' 
“সেই লােকটি অর্থাৎ মেহেদী আল হাসান কোথায়? অন্য একজন জিজ্ঞেস করলাে। 
‘কোথাও তার কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।' লােকটি উত্তর দিল, তার উটটি ওখানেই আছে। কিন্তু তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।' 
কি বেকুবের মত কথা বলছাে! উট যদি ওখানেই থাকে তাহলে সেও ওখানেই আছে। হয়তাে কোন গর্তে বা ঝােপের আড়ালে লুকিয়ে আছে। ভাল মত খোঁজ করাে, পেয়ে যাবে।' 
ভাল মতই তাে খুঁজেছি । গুহার বাইরে থেকে কয়েকবার সংকেত দেয়ার পরও সিনথিয়ার কোন সাড়া না পেয়ে দু'টি মশাল নিয়ে আমরা সুড়ংয়ে ঢুকেছিলাম। সেখানে কাউকে না পেয়ে উল্টো পাশের মুখ দিয়ে বেরিয়ে আমরা ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে খুঁজতে লাগলাম। ঘুরতে ঘুরতে সুড়ং মুখের সামান্য উপরে আমরা গােপালের লাশ পেলাম। সেও আমাদের সাথেই সুড়ং থেকে বেরিয়েছিল এবং সিনথিয়াকে ডাকতে ডাকতে ওদিকে গিয়েছিল।' 
সুড়ংয়ের ভেতরে গিয়ে তােমরা কি দেখলে? 
সেখানে মেয়েটার কাপড়ের একটা টুকরা শুধু পড়েছিল, আর কিছু পাইনি।' 
দলনেতা বুঝতে পারল, অবস্থা গুরুতর। সে সকলকে উদ্দেশ্য করে বললাে, পরিস্থিতি আমার ভাল ঠেকছে না। তােমরা দু’জন আস্তানার বাইরে ডিউটিতে চলে যাও। সে দু’জনের দিকে ইশারা করে বলল, যদি বাইরে থেকে কোন বিপদ আসে, তবে সংবাদ জানাবে। এরপর আর দু’জনের দিকে ইশারা করে বলল, “আর তােমরা দুজন সেই পাহাড়ের পথ ধরাে। যদি তাদের খোঁজ পাও, ধরে নিয়ে আসবে। আর যদি সে তােমাদের সাথে লড়াই করে তবে হত্যা করবে। অন্য যারা আছে তারা দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাও। একভাগ এখানেই অপেক্ষা করবে যে কোন জরুরী পরিস্থিতি মােকাবেলার জন্য, বাকীরা চারদিকে ছড়িয়ে পড়াে। সে এই পাহাড়ী অঞ্চলেই কোথাও লুকিয়ে আছে। যদি সকাল পর্যন্ত না পাওয়া যায়, তবে দিনের আলােতে তাকে অবশ্যই ধরা দিতে হবে।' 
মেহেদী আল হাসান তখন মেয়েটিকে কাঁধে নিয়ে ছুটছে কায়রাের দিকে। পাহাড় থেকে নেমে সে উটের কাছে যাওয়ার ঝুঁকি নিল না। কারণ ইতিমধ্যেই সে যে তাদের ফাঁদে পা দেয়নি, তা জানাজানি হয়ে যাওয়ার কথা। ফলে তাকে ধরার জন্য এই কুচক্রী মহল চেষ্টার কোন ক্রটি করবে না। 
এ কথা ভেবেই সে কায়রাে যাবার সহজ রাস্তা ছেড়ে দুর্গম পার্বত্য পথ ধরল। চলতে চলতে এক জায়গায় গিয়ে সে মহা সমস্যায় পড়ে গেল। 
ততক্ষণে সে সুড়ংওয়ালা পাহাড় থেকে অনেক দূরে চলে এসেছে। এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়, এইভাবে চড়াই উৎরাই পেরিয়ে সে এক দুর্গম পাহাড়ে উঠে গেল। 
এখানে কোন রাস্তা ছিল না যে, সে ওই রাস্তা ধরে এগুবে। সে তার আন্দাজ মত কায়রাে অভিমুখে ছুটছিল। কিছু দূর যাওয়ার পর দেখতে পেল সামনে পথ বন্ধ। 
সে ডানে বামে তাকিয়ে দেখল। পাহাড়ের ডানে বামে কোথাও কোন ঢাল নেই, যেখান দিয়ে পরবর্তী পাহাড়ে যাওয়া যায়। পাহাড়ের চূড়ায় প্রায় বিশ গজের মত জায়গা আছে, যা একটা দেয়ালের মত দাঁড়িয়ে আছে। এটা পেরােলে আবার হাঁটা চলার উপযােগী পাহাড় পাওয়া যাবে। এই বিশ গজের দেয়ালটা খাঁড়া এবং বেশ উঁচু, প্রস্থে কোথাও এক ফুট, কোথাও তারও কিছু কম। 
পাহাড়ের এই খাড়া ও উঁচু চূড়াটা মেহেদী আল হাসানের জন্য মস্ত বাঁধা হয়ে দাঁড়াল। এর ওপর এক সঙ্গে দুটি পা রাখাও সম্ভব নয়। সে এই দুর্গম দেয়াল দেখে সেখানেই থেমে গেল এবং সিনথিয়াকে নামিয়ে ভাবতে বসল। কিন্তু ভাবাভাবির বেশী সময় ছিল না । পেছন থেকে যে কোন সময় দুশমন চলে আসতে পারে। তাই সে সিনথিয়াকে আবার কাঁধে তুলে নিয়ে সেই দেয়ালের ওপর চড়ে বসল । যেভাবে ঘােড়ায় চড়ে সেভাবে দেয়ালের দুপাশে পা ঝুলিয়ে বসে হেঁচড়ে হেঁচড়ে সে সামনে বাড়তে থাকল। 
মেয়েটাকে কাঁধে নিয়ে এমনিতেই ওজনের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে দাঁড়ালাে। তার ওপর মেয়েটা শুরু করল শয়তানী। তাকে ফেলে দেয়ার জন্য কাঁধের উপর ভীষণ নড়াচড়া করতে লাগলাে। সেখান থেকে পড়লে হাড়-মাংস এক হয়ে যাবে, এ কথা মেয়েটাও বুঝতে পারছিল। কিন্তু গােপন রহস্য উদঘাটন করার চেয়ে জীবন দেয়া শ্রেয় মনে করে মেয়েটা এমন ছটফট করছিল। মেহেদী আল হাসানও বুঝতে পারল, এখান থেকে পড়লে মেয়েটির সাথে সে নিজেও শেষ হয়ে যাবে । 
মেহেদী আল হাসান মহা সমস্যায় পড়ে গেল। মেয়েটি এমন দুষ্টামী  করলে এ দেয়াল আদৌ পার হওয়া যাবে কিনা তাই সন্দেহ। এদিকে মেয়েটিকে নিষেধ করা সত্ত্বেও সে থামছে না। ওদিকে মেয়েটির লােকজন নিশ্চয়ই তার সন্ধানে এতক্ষণে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। দেয়াল পার হওয়াটা মেহেদী আল হাসানের জন্য জীবন মরণ সমস্যা হয়ে দাঁড়াল। দুষ্কৃতকারীদের হাতে ধরা পড়ার অর্থ নির্মম ও যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু। কিন্তু এ নিয়ে তার বিন্দুমাত্র দুশ্চিন্তা ছিল না। সে ভাবছিল, এর ফলে জাতির অবর্ণনীয় ক্ষতি হয়ে যাবে। সে এই ক্ষতি হতে দিতে পারে না। সে মেয়েটির দু’টি বাহু বগলের নিচে নিয়ে এমন জোরে চেপে ধরলাে, মেয়েটির বাহু ভেঙ্গে যাওয়ার উপক্রম হলাে। মেয়েটি বেদনায় গুঙিয়ে উঠল। সে বলল, সাবধান, আবার নড়াচড়া করলে তােমার বাহু দুটি ভেঙে ফেলতে বাধ্য হবাে।' 
এটুকু ঔষধেই কাজ হলাে। কিছুটা শান্ত হলাে মেয়েটি। মেহেদী আল হাসান তার সর্বশক্তি প্রয়ােগ করে অতি সাবধানে বুকে ভর করে সামনে এগুতে লাগল। এক সময় তার এ প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা শেষ হলাে। তার শক্তি ও সাহস ওই পাহাড়ী দেয়াল তাকে পার করে নিয়ে এল। 
সামনে মােটামুটি প্রশস্ত এক উপত্যকা । মেহেদী আল হাসান সেখানে পৌঁছেই মেয়েটিকে ধপাস করে মাটিতে ফেলে দিল । তারপর তার দিকে তাকিয়ে ভীষণ রাগের সাথে বললাে, তুমি কি আমার রাস্তা বন্ধ করতে পারবে? 
সে মেয়েটাকে রাগের মাথায় দু’চার কদম টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে গেল আর বললাে, যদি আমার পথে আর কোন বিঘ্ন সৃষ্টি করাে, তবে এমন ভাবে সারা রাস্তা আমি তােমাকে টেনে নিয়ে যাবাে। যদি মরার ইচ্ছা থাকে তাে মরাে।' 
এ সময় সে দূরে নিচে একটি মশাল দেখতে পেল। সে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। সে বুঝতে পারলাে, সে বিপদ পার হয়ে এসেছে। কারণ মশালটি সেই ভয়ংকর দেয়ালের ওপাশে। কিন্তু এতে তার উৎফুল্ল হওয়ার কিছু নেই। তাকে জলদি
(চলবে)

শেয়ার করুন

Author:

আমি সজীব হোসাইন -এই ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা পাশাপাশি লেখালেখির কাজটাও করি। অনলাইনে প্রযুক্তির বিষয় নিয়ে যা জানি তা মানুষের মাঝে শেয়ার করার ইচ্ছায় এ ব্লগ টি তৈরি করা।