মঙ্গলবার, ৭ জানুয়ারি, ২০২০

ক্রুসেড সিরিজ-২০. পাল্টা ধাওয়া(পর্ব-2)

২০. পাল্টা ধাওয়া(পর্ব-2)
মেয়েটাকে হারানাের ঝুঁকি নেবে, বুঝতে পারল না। শেষ পর্যন্ত সে বলেই ফেলল, কিন্তু আমি তাে পান করা পছন্দ করি না।' 
‘খােদা তােমাকে পুরুষের সকল সৌন্দর্য, বীরত্ব ও আকর্ষণীয় দেহসৌষ্ঠব দান করেছেন। মেয়েটি বললাে, কিন্তু মদকে অস্বীকার করে তুমি প্রমাণ করলে, তুমি এক সুন্দর প্রাণহীন পাথর। 
কিছুক্ষণ দু’জনের মধ্যে এই নিয়ে বাদানুবাদ চললাে। শেষে চেঙ্গিস মেয়েটার মন রক্ষার জন্য তার হাত থেকে পিয়ালা নিয়ে নিল। 
চেঙ্গিস কম্পিত হাতে পিয়ালা মুখে লাগালাে এবং ধীরে ধীরে পিয়ালা খালি করে দিল। জীবনে এই প্রথম সে মদ পান করলাে। কিছুক্ষণ পরই সে অনুভব করলাে, তার চোখের সামনে সবকিছু কেমন উলট-পালট হয়ে যাচ্ছে। তার চিন্তাভাবনা এলােমেলাে হয়ে যাচ্ছে। আশপাশের ঝােপগুলাে মনে হচ্ছে উড়ছে। আর তখনি তার মনে হলাে, সে নিজেও উড়ছে! সে খুব উৎফুল্ল বােধ করলাে। তার মনে হতে লাগল, সে এক আনন্দ নগরে প্রবেশ করেছে। 
রাশেদ চেঙ্গিস ছিল অবিবাহিত যুবক। নারী দেহ স্পর্শের অভিজ্ঞতা তার ছিল না। যৌবনে পা দিয়েই সে গােয়েন্দাগিরীতে ঢুকে পড়েছিল। গােয়েন্দা অভিযানের কঠিন চ্যালেঞ্জ মােকাবেলাই ছিল তার একমাত্র আনন্দের বিষয়। অবিবাহিত থাকায় তার কোন পিছু টান ছিল না। ফলে সে ছিল বেপরােয়া ও দুর্ধর্ষ প্রকৃতির। কিন্তু এখন এই গভীর রাতে বাগানের পুষ্পিত ঘ্রাণের ভেতর এক সুন্দরী নারী তাকে মদ পান করিয়ে দেহের সাথে দেহ লাগিয়ে বসে আছে। সে তাকে নানা আভাসে ও ইঙ্গিতে প্রলুব্ধ করতে চাচ্ছে। কিন্তু সেই ইঙ্গিত বুঝার মত মনমানসিকতা তার ছিল না। অবিবাহিত হওয়াই তাকে যেন বাঁচিয়ে দিল। অজ্ঞতা ও আনাড়িপনাই সম্বল হয়ে দাঁড়াল তার। 
সেই নারী তাকে পাপের দিকে ডাকছিল। তার কাছে ভালবাসা ভিক্ষা চাচ্ছিল। কিন্তু নেশাগ্রস্ত রাশেদ চেঙ্গিসের স্বভাবে কোন পাপ ছিল না। তাই সে এই খৃষ্টান মেয়ের কোন আহবানই বুঝতে পারছিল না। 
মেয়েটি এবার আরাে সক্রিয় হলাে। আগের রাশেদ চেঙ্গিস আর থাকতে দিল না তাকে। প্রেমিক এক রাশেদ চেঙ্গিস তৈরীতে মনযােগী হল সে। রাত ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যেতে লাগলাে। 
সে যখন মেয়েটির কাছ থেকে বিদায় নেয়ার জন্য উঠে দাড়ালাে, মেয়েটি বললাে, তুমি আমাকে যুদ্ধের ব্যাপারে কিছু কথা জিজ্ঞেস করেছিলে। আমার তাে সবটা জানা নেই। যদি তুমি চাও তবে আমি আগামী কাল রাতে সে উত্তর সংগ্রহ করে আনবাে। 
সহসা চেঙ্গিসের মধ্যে সেই আগের চেঙ্গিস জেগে উঠলাে, যে চেঙ্গিস সুলতান আইয়ুবীর গােয়েন্দা। সঙ্গে সঙ্গে তার দায়িত্বের কথা স্মরণ হলাে। সেই সাথে তার মনে পড়লাে, সে এক সুন্দরী নারী ও মদের নেশায় মত্ত আছে, যার থেকে তাকে সাবধান হতে হবে। 
সে মেয়েটিকে বললাে, তােমার মত আমারও যুদ্ধ বিগ্রহে সাথে কোন সম্পর্ক নেই। আমি আরাম ও শান্তিতে জীবন কাটাতে চাই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যদি আমার মনীব যুদ্ধে যায় তবে আমাকেও তার সঙ্গে যেতে হতে পারে। যদি আগে জানতে পারি, আমাদের সেনাবাহিনী কোন দিকে ও কত দূরে আক্রমণ করতে যাচ্ছে, তবে সেই ভাবে আমি প্রস্তুত হয়ে যেতে পারবাে। কতটুকু মদ সঙ্গে নিতে হবে, চাকর-বাকর কেমন নিতে হবে, এইসব ঠিক করতে পারবাে।' 
“ঠিক আছে, কাল রাতে তােমাকে সব আমি জানিয়ে দেবাে বলল মেয়েটি।
রাত প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। চেঙ্গিস ফিরে এসে ভাবল এত রাতে ভিক্টরকে জাগানাে উচিত হবে না। তার দুঃখ হচ্ছিল এই ভেবে, আমি তাে ইমাম সাহেবের সাথে সাক্ষাত করতে যাচ্ছিলাম। মাঝ পথে মেয়েটি আমাকে আটকে দিল। হায়, হায়, মেয়েটি আমাকে কোখেকে কোথায় নামিয়ে নিল। রাতের তখন শেষ প্রহর। খৃষ্টানদের বিলাস জীবনে খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠার কোন অভ্যাস ছিল না। চেঙ্গিস ইচ্ছা করলে তখনাে ইমাম সহেবের কাছে যেতে পারতাে। কিন্তু মুখে মদের গন্ধ নিয়ে মসজিদে যেতে সঙ্কোচ হচ্ছিল তার। পরে ইমাম সাহেব আবার কি ভেবে বসেন! 
তাছাড়া তার নিজের মনেও চেপে ছিল এক পাপের বােঝা। যে মদ হারাম, যা পান করা পাপের কাজ, সেই মদ আমি পান করেছি! 
মেয়েটির কথাও স্মরণ হলাে তার। মেয়েটির ভালবাসার আকুতি ও উন্মাদনা নেশার মত তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। যদিও মেয়েটি তাকে পাপের সাগরে ডুবাতে পারেনি, কিন্তু তার দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন ঘটিয়েছে, এ জন্য তার আফসােস হচ্ছিল। 
সে শুয়ে পড়ল, কিন্তু চোখে তার ঘুম এলাে না। একবার মেয়েটির হাসিমাখা মুখ ভেসে উঠছিল তার হৃদয়পটে, আবার মেয়েটির প্রতি সৃষ্টি হচ্ছিল রাগ ও ক্ষোভ। কারণ এ মেয়ে তাকে তার দায়িত্ব পালন করতে দেয়নি। 
এভাবে আকর্ষণ ও বিকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হলাে মেয়েটি। যতই ভাবছিল ততই মেয়েটি তার হৃদয়ে গেঁথে যাচ্ছিল। মেয়েটির কথা তার যতবার মনে পড়ছিল, ততই তার প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যাচ্ছিল তার। 
আবার ইমাম সাহেবের কথা মনে হলেই অনুশােচনা হচ্ছিল। তিনি নিশ্চয়ই অপেক্ষা করেছেন। হয়তাে দুশ্চিন্তা করছেন আমার কথা ভেবে। নিশ্চয়ই কোন জরুরী বিষয় ছিল, যে জন্য তিনি আমাকে খবর দেয়ার ঝুঁকি নিয়েছিলেন। এইসব অনুশােচনা করতে করতেই এক সময় ঘুমের কোলে ঢলে পড়ল রাশেদ চেঙ্গিস।
সূর্য অনেক উপরে উঠে গেছে। তখনাে তার ঘুম ভাঙেনি দেখে ভিক্টর তাকে জাগিয়ে দিল। বলল, কাল কখন ফিরেছাে? আমি তাে কিছুই টের পাইনি! ইমাম সাহেবের সাথে এত দীর্ঘক্ষণ কি আলােচনা করলে? কেন ডেকেছিলেন তিনি? 
রাশেদ চেঙ্গিস ধড়ফড় করে উঠে বসল। মনে পড়ে গেল তার কাল রাতের কথা। সে মাথা নিচু করে বসে রইল, ভিক্টরের প্রশ্নের কোন জবাব দিল না। 
ভিক্টরই আবার মুখ খুলল। বলল, কই, কথা বলছে না কেন? কোন সমস্যা?’ তার কণ্ঠে উদ্বেগ।
‘না! তেমন কিছুই হয়নি। ভিক্টরকে হতভম্ব করে দিয়ে চেঙ্গিস বলল, কাল আমি মসজিদ পর্যন্ত যেতেই পারিনি। 
কি বলছাে তুমি! কি হয়েছিল? কেউ অনুসরণ করেছিল? বিস্ময় ও উদ্বেগ ভিক্টরের কণ্ঠে, রাশেদ, কাল রাতে কি ঘটেছিল সব আমাকে খুলে বলাে তাে! 
সে ভিক্টরকে সমস্ত ঘটনাই খুলে বলল। মেয়েটির সাথে পরিচয় থেকে শুরু করে গত রাতের মদ পানের কাহিনী পর্যন্ত। শেষে বললাে, যদি আমি মদ পান না করতাম তবে মেয়েটির কাছ থেকে বিদায় নেয়ার পরেও আমি ওখানে যেতে পারতাম। কিন্তু মুখে মদের গন্ধ নিয়ে মসজিদে যাওয়ার সাহস আমার হলাে না। 
দায়িত্বে গাফলতির জন্য শরমে মরে যাচ্ছিল রাশেদ চেঙ্গিস। তার চেহারা হয়ে উঠেছিল বর্ষা রাতের থমথমে আকাশের মত। সেখানে বাসা বেঁধেছিল রাজ্যের মালিন্য ও বিষন্নতা।
এ রকম দায়িত্বহীনতার পরও ভিক্টর তাকে গালাগালি করল না। বরং তাকে শান্তনা দিয়ে বলল, যদি দায়িত্ব পালনের স্বার্থে মেয়েটার হাত থেকে দুই ঢােক মদ গিলেই থাকো, আল্লাহর কাছে মাফ চাও, তিনি তােমাকে ক্ষমাও করে দিতে পারেন। তবে তওবা করাে, ভবিষ্যতে আর কোনদিন মদ পান করবে না। 
ভিক্টর তাকে সাবধান করে আরাে বললাে, কিন্তু ইমাম সাহেবের কাছে না যাওয়াটা তােমার মস্ত বড় অপরাধ হয়েছে । এটা তােমার মােটেই উচিত হয়নি। ইমাম সাহেব নিশ্চয় সারা রাত অধীর হয়ে তােমার অপেক্ষায় জেগেছিলেন! যাক, দিনে যাওয়া তাে সম্ভব নয়, আজ রাতে অবশ্যই যাবে। গিয়ে তার কাছে ক্ষমা চাইবে। তবে সব কথা তাকে বলার দরকার নেই। শুধু বলাে, বিশেষ অসুবিধার কারণে কাল যেতে পারােনি।' 
‘কিন্তু মেয়েটা তাে কাল খবর নিয়ে আসবে বলেছে। বলল রাশেদ চেঙ্গিস। 
ভিক্টর তাকে বললাে, “দেখাে চেঙ্গিস! তুমি আনাড়ী বা অবুঝ নও! নিজে ভাল মত বুঝতে চেষ্টা করাে, মেয়েটির আসল উদ্দেশ্যটা কি? সে কি তােমাকে আসলেই মনেপ্রাণে ভালবাসে, নাকি ছলনা করছে? সে কি তােমাকে তার দেহের ক্ষুধা নিবারণের মাধ্যম বানাতে চায়, নাকি তুমি গােয়েন্দা কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিত হতে চায়। তােমাদের মধ্যে যে কথা হয়েছে তাতে তােমাকে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে। তুমি যেভাবেই বলল না কেন, যুদ্ধের ব্যাপারে তুমি উৎসাহ বা আগ্রহ দেখিয়েছে, এটা বুঝতে কোন আনাড়ি গােয়েন্দারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। মেয়েটি যে ক্রুসেডদের গােয়েন্দা নয়, তাই বা তােমাকে কে বলল? তাই এ ব্যাপারে তােমাকে খুবই হুশিয়ারীর সাথে অগ্রসর হতে হবে।'
‘আমি যে গােয়েন্দা তা তাে এখানকার কাকপক্ষীও জানে না। এমনকি শয়তানেরও এটা জানার কথা নয়।' বলল রাশেদ চেঙ্গিস। 
‘কিন্তু আমি তােমাকে এ কথা বলা জরুরী মনে করছি, মেয়েদের ছলনার যাদুতে ফেরাউনের মত সম্রাটের সিংহাসনও মাটিতে মিশে গেছে। শুধু তাই নয়, আপন জাতির দিকেই একবার তাকিয়ে দেখােনা। খৃস্টানদের পাঠানাে সুন্দরী মেয়েদের ছলনার যাদুতে মিশরে বিদ্রোহ পর্যন্ত ঘটেছে। সুলতান আইয়ুবীর প্রতি আল্লাহর বিশেষ রহমত আছে বলেই তিনি বেঁচে গেছেন। নইলে তাঁর একান্ত বিশ্বস্ত সেনাপতিরা বিশ্বাসঘাতক হওয়ার পর তাঁর বাঁচার কোন কথা ছিল না।' 
‘আমি কোন আনাড়ী গােয়েন্দা নই ব্রাদার ভিক্টর।' রাশেদ, চেঙ্গিস বললাে, এই মেয়েটিকে নির্যাতীত বলেই মনে হয়। সে কোন পতিতা নয়। সে কোন রাজকন্যা না হলেও নিশ্চয়ই কোন অভিজাত ঘরের সন্তান। আমার মনে হয়, সে পবিত্র ভালবাসাই পাওয়ার পিয়াসী। সে আমার কাছে দৈহিক ভালবাসা দাবী করেনি, আর করবে বলেও মনে হয় না। কিন্তু তার পবিত্র ভালবাসা প্রত্যাখ্যান করে তাকে আরও মজলুম বানাতে চাই না। তাই বলে তুমি ভেবাে না, আমি তার গােলাম হয়ে যাবাে। প্রয়ােজনীয় গােপন তথ্য সংগ্রহের জন্য তার যতটুকু সান্নিধ্যে যাওয়া দরকার, তার সাথে আমি শুধু ততটুকুই ঘনিষ্ট হবাে।' 
কিন্তু এ বড় কঠিন রােগ ভায়া, তুমি নিজেও টের পাবে না কখন থেকে তাকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসতে শুরু করেছ। 
হ্যা ভিক্টর! চেঙ্গিস উত্তর দিল, তুমি ঠিকই বলেছাে। শুরুতে আমি এটাকে একটা খেলাই মনে করেছিলাম। ভেবেছিলাম, খেলতে খেলতে যদি কিছু তথ্য পেয়ে যাই মন্দ কি! কিন্তু এখন তােমার কথা শুনে মনে হচ্ছে, মেয়েটি সত্যি আমার অন্তরের মধ্যে গেঁথে গেছে।' 
‘যে অন্তরে গেঁথে যেতে পারে সে কিন্তু পায়ের শিকলও হয়ে যেতে পারে চেঙ্গিস! ভিক্টর বললাে, আমি তােমাকে এর চেয়ে বেশী আর কি বলতে পারি। তুমি যে পবিত্র দায়িত্ব নিয়ে এখানে এসেছে, তােমার সবটুকু ভালবাসা তাতেই উজাড় করে দেয়া উচিত। দায়িত্বের চেয়ে অন্য কিছুকে অধিক ভালবাসলে তার পরিণাম ফল ভয়াবহ হতে পারে।' 
আরে, আমি তাে তােমাকে বললামই, দায়িত্ব পালনের জন্যই আমি তার সাথে সম্পর্ক গড়তে চাচ্ছি, দায়িত্বকে আমি অবহেলা করলাম কই? 
‘শােন, কল্পনা ও বাস্তবতা এক জিনিস নয়। আলাে ও কালাের মধ্যে প্রভেদ অনেক, কিন্তু তাদের দূরত্ব এক চুলের অধিক নয়। বিবেক ও আবেগের মাঝখানে বা ঈমান ও নির্বুদ্ধিতার মাঝখানে যে প্রাচীর আছে তুমি যদি সেই প্রাচীরের ওপর দিয়েই হাঁটতে শুরু করো, তবে যে কোন সময় তুমি একদিকে কাত হয়ে পড়ে যেতে পারাে। এ এমনই এক সুক্ষ্ম রেখা যার ওপর দিয়ে হাঁটা যায় না। শেষে এমন না হয়ে যায়, তার কাছ থেকে গােপন তথ্য নিতে গিয়ে তুমি নিজেই গােপন হয়ে যাও।
রাশেদ চেঙ্গিস হাে হাে করে হেসে উঠে ভিক্টরের উরুতে থাবা মেরে বললাে, এমন হবে না বন্ধু! তুমি দেখে নিও, এমনটি কখনাে হবে না! 
আর একটি কথা। ভিক্টর বললাে, ‘মদের সম্পর্ক থাকে শয়তানের সাথে। যেসব গুণ শয়তানের মধ্যে থকে সে সব গুণ মদের মধ্যেও থাকে। মেয়েটিকে খুশী করতে গিয়ে সেই পরিমাণ পান করাে না, যে পরিমাণ পান করলে তােমার স্বাভাবিক জ্ঞান লােপ পায়।' 
আচ্ছা, ঠিক আছে, তােমার এ উপদেশের কথা আমি স্মরণ রাখবাে। আজ রাতেই ইমাম সাহেবের সাথে আমি দেখা করবো এবং তাকে জানাবাে, গতকাল বিশেষ কারণে আমি তার সাথে দেখা করতে পারিনি।' চেঙ্গিস বললাে। 
‘আর এখনি বাজারে যাও। যাতে ইমাম সাহেব জানতে পারেন, তুমি সহিসালামতে আছাে। ভিক্টর বললাে। 
তাদের দু'চার জন সঙ্গীর বাজারে দোকান ছিল। ছােটখাট সংবাদ তাদের দ্বারাই পৌছানাে যেতাে। অবশ্য অতি দরকারী ও গােপনীয় সংবাদ তাদের দিয়ে পৌছানাে হতাে না। 
তুমি এখন কি করবে? চলাে দু’জনেই ঘুরে আসি।' বলল চেঙ্গিস। 
রাশেদ চেঙ্গিস ও ভিক্টর দুজনেই বাজারের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাে।
পরের রাতে চেঙ্গিস তার ডিউটি থেকে একটু আগেই বিদায় নিল। সে তার কামরায় গিয়ে ডিউটির পােষাক পরিবর্তন করলাে। 'মুখে কৃত্রিম দাড়ি লাগিয়ে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লাে । সে ভয় পাচ্ছিল, যদি মেয়েটি হঠাৎ তাকে দেখে ফেলে! সে ইমাম সাহেবের সাথে দেখা করে ফেরার পথে মেয়েটির সাথে দেখা করবে বলে ঠিক করল। 
আজো সে বাগানের সেই সংক্ষিপ্ত পথেই মসজিদের দিকে রওনা দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে সবুজ ঘাস ও বৃক্ষ শােভিত বাগানে গিয়ে প্রবেশ করল। সে দ্রুত হাঁটছিল, কিন্তু আজও সামনে থেকে কাউকে আসতে দেখলাে। চেঙ্গিসের পালাবার কোন পথ ছিল না। কি মনে করে সে সাবধানে দাড়ি খুলে ফেললাে। শীঘ্রই সামনের লােকটি তার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলাে, “আজ যে খুব তাড়াতাড়ি চলে এলে ! আমার ভালবাসার টানে বুঝি?'' 
‘তুমিই বা এত জলদি কি মনে করে?' চেঙ্গিস জিজ্ঞেস হলাে, এখনও তাে রাত বারােটার ঘন্টা পড়েনি!'‘আমার মন বলছিল, তুমি মধ্য রাতের ঘন্টা বাজার আগেই চলে আসবে। মেয়েটি বললাে। ' 
‘কিন্তু আমি আশা করিনি, তুমি এত তাড়াতাড়ি আসবে। চেঙ্গিস বললাে, আমি একটা কাজে যাচ্ছিলাম, ফেরার পথে তোমার সাথে দেখা করতাম। 
“যদি তােমার কাজ খুব জরুরী হয়, তবে যাও।' মেয়েটি বললাে, আমি সারারাত তােমার জন্য এখানে অপেক্ষা করবাে।' 
‘এখন তাে আমি এখান থেকে নড়তেও পারবাে না। চেঙ্গিস বললাে, তােমার চুলের ঘ্রাণ আমাকে পাগল করে দিয়েছে।' কথাটা সে মুখে বলল ঠিকই, কিন্তু নিজেকে সে স্বাভাবিক ও সচেতন রাখলাে। 
একবার ভাবল, ইমাম সাহেবের কাছ থেকে ঘুরে আসি। কিন্তু পরক্ষণেই চিন্তাটা বাতিল করে দিল। সে সন্দেহ করলাে, ইমামের কাছে রওনা দিলে যদি মেয়েটা পিছু নেয়! সুতরাং ভালবাসার দাবীকে প্রাধান্য দিয়ে সে সেখানে বসে পড়ল। 
মেয়েটা সুরাহী থেকে মদ ঢেলে একটি পিয়ালা চেঙ্গিসের দিকে বাড়িয়ে ধরল। চেঙ্গিস মদ পান করতে চাইল না। বলল, না না, আমার এখন পান করার ইচ্ছে নেই।' 
মেয়েটি বলল, তুমি যদি আমাকে বিষের পিয়ালা দাও তবুও তা পান করতে আমি প্রস্তুত। আর তুমি আমার কাছ থেকে মদ নেবে না?
চেঙ্গিস কণ্ঠে আবেগ এনে বললাে, মদ দিয়ে কি করবাে সুন্দরী। তােমার রূপের নেশার কাছে সব নেশাই যে ম্লান হয়ে যায়!' 
তুমি দেখছি মুসলমানদের মত কথা বলছাে! ওদের ধর্ম তাে মদকে হারামই করে দিয়েছে। কিন্তু একজন খৃষ্টান হয়ে তুমি কেন মদকে ঘৃণা করাে? 
মদের নেশা তােমার ভালবাসা ও সৌন্দর্যের কাছে হার মেনে যায়, তাই।' চেঙ্গিস বললাে, তুমি যেমন অঢেল ধনরত্ন ও বিলাসিতার গায়ে লাথি মেরে আমার মত এক নগন্য কর্মচারীর কাছে ছুটে এসেছে, আমার মনও তেমনি কোন কৃত্রিম জিনিস গ্রহণ করতে চায় না। মদের নেশার চেয়ে এই প্রেমের নেশা অনেক বেশী খাঁটি এবং দীর্ঘস্থায়ী। 
তার এ কথায় হয়তাে মিথ্যের কিছু মিশেল ছিল কিন্তু যতই সময় যেতে লাগলাে তার বুদ্ধি-বিবেকের ওপর মেয়েটি ততই প্রাধান্য বিস্তার করতে লাগলাে। তারপর এমন মুহূর্ত এসে গেল যে, সে নিজেই পিয়ালা উঠিয়ে বলল, “দাও, আরও দাও।' 
মেয়েটি তার পিয়ালা পূর্ণ করে দিল। সে ধীরে ধীরে পান করতে লাগলাে আর ক্রমেই মেয়েটির মধ্যে বিলীন হয়ে যেতে লাগল। 
‘আমরা আর কতদিন এমন গােপনে চোরের মত মেলামেশা করতে থাকবাে?' মেয়েটি বললাে, আমার কথা একটু চিন্তা করাে, ভেবে দেখাে আমি কেমন কষ্টের মধ্যে আছি। আমার দেহের মালিক অন্য কেউ আর মনের মালিক তুমি। তােমার ভালবাসা তার প্রতি আমার ঘৃণা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন আমি তাকে আর সহ্যই করতে পারছি না। এসাে, আমরা এখান থেকে পালিয়ে যাই। 
‘কোথায় যাবাে?’ চেঙ্গিস প্রশ্ন করলাে।
এই পৃথিবীটা বিশাল ও অনেক প্রশস্ত! মেয়েটি বললাে, ‘আমাকে এখান থেকে বের করাে, তারপর তােমার হাত ধরে আমি পৃথিবীর অপর প্রান্ত পর্যন্ত যেতে প্রস্তুত। 
আচ্ছা যাবাে। চেঙ্গিস বললাে, কটা দিন সবুর করাে, আমি একটু গুছিয়ে নিই। ভাল কথা, আমার প্রশ্নের উত্তর এনেছাে?” হ্যা, এনেছি। মেয়েটি বললাে, আমাদের সৈন্য জড়াে হচ্ছে। সে কার সৈন্যবাহিনী কোথায় জড়াে হবে, তারা কি করতে চায় সব খবরই তাকে খুলে বলল। কিন্তু কবে তারা রওনা দেবে এই খবরটাই সে তাকে দিতে পারল না। কারণ কবে তারা রওনা দেবে সে সংবাদ এখনও জানতে পারেনি মেয়েটি। চেঙ্গিস তার কাছ থেকে খুঁটে খুটে সব জেনে নিল। সে যখন সেখান থেকে উঠলাে, তখন রাত প্রবেশ করছিল দিনের ভেতর, আর মেয়েটি প্রবেশ করছিল চেঙ্গিসের অন্তরে।
‘আমি ইমাম সাহেবের কাছে যদিও পৌছতে পারিনি কিন্তু আমি মেয়েটির কাছ থেকে অনেক নতুন তথ্য সংগ্রহ করে এনেছি।' চেঙ্গিস ভিক্টরকে বললাে, সে আমার ফাঁদে পড়ে গেছে, এখন সে আমার হাতের খেলনা। 
‘আমার তাে ধারণা হচ্ছে, তুমিই তার ফাঁদে আটকে গেছে। ভিক্টর তাকে বললাে, তােমার কথাই প্রমাণ করছে, তার তীর তােমার হৃদয়ে বিধে গেছে।' 
‘আমি তাে তােমার কাছে স্বীকারই করেছি, সে আমার মনের গভীরে আসন গেড়ে বসেছে। চেঙ্গিস বললাে, “সে এ কথাও বলে দিয়েছে, সে আমার সঙ্গে পালিয়ে যেতে প্রস্তুত। কিন্তু আমিই তাকে বলেছি, আরও কিছু দিন অপেক্ষা করাে। আমি তাকে এখান থেকে বের করে নিয়ে যাবাে। আমি আশা করছি, ক্রুসেড বাহিনীর পরিকল্পনা জেনে সে তথ্য আমি নিজেই কায়রাে নিয়ে যাবাে আর ওই মেয়েটিও থাকবে আমার সঙ্গে।' 
তাকে কখন বলবে যে তুমি মুসলমান আর তুমি এখানে গােয়েন্দাগিরী করতে এসেছ? 
মিশরের মাটিতে প্রবেশ করে!' চেঙ্গিস উত্তর দিল, এখানে তাকে সামান্যই বলবাে!’ 
চেঙ্গিস ভালবাসার নেশায় উন্মত্ত হয়ে গেল। সে খৃস্টানদের পরিকল্পনা জানার জন্য যে পরিমাণ অধীর ছিল তার চেয়েও বেশী অশান্ত ছিল মেয়েটার সাথে দেখা করার জন্য। সে নিজেই অনুভব করছিল, তার চিন্তা রাজ্যে এবং দৈনন্দিন জীবনের গতি ধারায় ভীষণ পরিবর্তন এসে গেছে। প্রথম যখন সে মদ পান করেছিল, তখন সে খুব অনুতপ্ত ছিল। কিন্তু গত রাতে সে নিজের মর্জিতেই মদের পিয়ালা হাতে তুলে নিয়েছিল। এখন আর তার কোন অনুশােচনা নেই। এক মুমীনের জন্য এটা এক বিরাট পরিবর্তন। 
সে দিন সন্ধ্যায় তাকে বলা হলাে, কয়েকজন খৃস্টান সম্রাট ও তাদের সেনাবাহিনীর হাইকমাণ্ড এখানে আসছেন। সম্রাট রিমাণ্ড তাদের নৈশ ভােজের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। 
রাতে মেহমানরা আসতে লাগলাে। ভিক্টররা ব্যস্ত হয়ে পড়ল তাদের সেবায়। কিন্তু এ দিন আগের মত তেমন ভীড় ছিল না। মাত্র সামান্য কয়েকজন বিশিষ্ট মেহমান। চুড়ান্ত পরিকল্পনার জন্য তারা এক গােপন বৈঠকে বসেছিল। 
ভিক্টর ও চেঙ্গিস মহা ব্যস্ত। এই বৈঠকে উপস্থিত বিশিষ্ট মেহমানদের আহারাদির জন্য স্পেশাল বাবুর্চি ডাকা হলাে। আয়ােজন করা হলাে রাজকীয় বিশেষ ডিনার। 
এ মিটিংয়ে ক্রুসেড ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চের প্রধান হরমন উপস্থিত আছেন। শুরুতেই মেহমানদেরকে স্পেশাল মদ দিয়ে আপ্যায়িত করা হলাে। মেহমানরা যুদ্ধের খুঁটিনাটি পরিকল্পনা ও অভিযানের কথা আলাপ করতে লাগলাে। এ আলােচনা কোন বাদানুবাদের আলােচনা ছিল না, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের আলােচনা ছিল। এতে প্ল্যানের একটা নকশা ও আক্রমণের খসড়া পরিকল্পনা হাজির করা হলাে। তাদের আলােচনা থেকে স্পষ্টই বুঝা যাচ্ছিল, খুব শীঘ্রই তারা অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে। 
হরমনকে তার গােয়েন্দা বিভাগের তৎপরতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলাে। তিনি বললেন, যে সব জায়গায় ক্রুসেড বাহিনী আছে, সেখানে গােয়েন্দা তৎপরতাও বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ক্রুসেড বাহিনীর অগ্রাভিযানের প্রতিটি পথে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে গােয়েন্দা কর্মীদের। তারা সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর গােয়েন্দাদেরকে চিরুনী অভিযান চালিয়ে তালাশ করছে। অনুসন্ধান করে যাদের পাওয়া যাচ্ছে তাদেরকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। 
‘ত্রিপলীর কি অবস্থা? জানতে চাইলেন এক সম্রাট। 
‘ত্রিপলীতে যেহেতু ক্রুসেড বাহিনী সবচেয়ে বিশাল সমাবেশ করছে, সে জন্য এখানেও গােয়েন্দা বিভাগ বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে। এখানে শক্রর গােয়েন্দা ধরার জন্য জোর প্রচেষ্টা চলছে। আমি এখানেও শত্রুর গােয়েন্দা বাহিনীর গন্ধ পেয়েছি। এই গন্ধ শুকে এঁকে অগ্রসর হচ্ছে আমাদের বাহিনী। সন্দেহভাজনদের তৎপরতার ওপর বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। যদি এখানে একটি গােয়েন্দাও পাওয়া যায়, তবে তার সূত্র ধরেই আমরা পুরাে দলটিকে গ্রেফতার করতে পারবাে।' আর কায়রাের অবস্থা? জানতে চাইলেন আরেক সম্রাট। 
কায়রােতেও আমাদের গােয়েন্দারা পরিপূর্ণ, সক্রিয় রয়েছে। তাদেরকে আরাে সতর্ক ও সজাগ থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সেখান থেকে গতকাল আমাদের এক বাহক এসেছে। সে বলেছে, সালাহউদ্দিন আইয়ুবী সেখানে নতুন সৈন্য ভর্তি ও তাদের ট্রেনিং দেয়ার কাজ জোরেশােরে শুরু করেছে। জেরুজালেম আক্রমণের চিন্তা সে এখনাে মাথা থেকে বাদ দেয়নি। এই কথা সে ওখানে জোরেশােরেই প্রচার করছে।
খৃষ্টানদের এই বৈঠক থেকে চেঙ্গিস ও ভিক্টর যেটুকু জানতে পেরেছিল, যদি সেইটুকুই কায়রাে পৌছে দেয়া যেত, তবে সুলতান আইয়ুবীর জন্য যথেষ্ট উপকার হতাে। তার কাছে এ সংবাদ আরও আগেই পৌছানাে উচিত ছিল যে, ক্রুসেড বাহিনী শীঘ্রই অভিযান চালাচ্ছে আর তাদের অভিযান হবে হারান ও হলব অভিমুখে। 
বৈঠক শেষ হলাে মাঝ রাতেরও পর। মেহমানদের বিদায় দিয়ে অনেক রাত্রে চেঙ্গিস ও ভিক্টর সেখান থেকে বিদায় পেলাে। কামরায় আসার পথেই ভিক্টর চেঙ্গিসকে বললাে, তাড়াতাড়ি ইমাম সাহেবের কাছ যাও।' 
রাশেদ চেঙ্গিস প্রতিদিনের মত পােষাক পাল্টে কৃত্রিম দাড়ি পরে দেরী না করেই রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল। যেহেতু আজ অনেক রাত হয়ে গেছে, 'সে জন্য মেয়েটা তাকে রাস্তায় আটকাবে এমন কোন ভয় ছিল না তার। সে প্রশান্ত মনেই কামরা থেকে বের হয়ে গেল।
তার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হলাে। সে যখন সেই সবুজ শ্যামল বাগানে গিয়ে পৌঁছল, মেয়েটি তাকে থামিয়ে দিল। চেঙ্গিস তখনও এ কথা জিজ্ঞেস করলাে না বা চিন্তাও করলাে না যে, মেয়েটা থাকে কোথায় এবং সে তাকে এই অন্ধকারেও কেমন করে দেখতে পায়। 
মেয়েটির হাবভাবে মনে হয়, সে সব সময় এমনকি চব্বিশটা ঘন্টাই তার পাশেপাশে থাকে। সে চেঙ্গিসের প্রতিটি পদক্ষেপ ও পদধ্বনি শুনতে পায়। দিনের বেলা তাে বটেই, এমনকি অন্ধকার রাতেও। 
চেঙ্গিস মেয়েটিকে দেখতে পেয়েই তার দায়িত্বের কথা ভুলে গেল। প্রতিদিনের মতই তারা বাগানের ভেতর অভিসারে 'মেতে উঠল। এদিকে কেমন করে সময় গড়িয়ে গিয়ে সকাল হলাে সেদিকে কোন খেয়ালই করলাে না! 
এসব দিকে লক্ষ্য করার তার সময় কোথায়? সে তাে এক মেয়ের প্রেমে মজে আছে। তার মন-মগজ আচ্ছন্ন করে বসে আছে এই মেয়ে। সে কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে সেখানেই পড়ে রইল, আজ রাতেও ইমাম সাহেবের কাছে যেতে পারলাে না। 
এ জন্য তার মনে যে খুব দু:খ বা আফসােস হলাে, তাও না। কারণ মেয়েটা তার দুঃখের কাহিনী এমন ভাবে প্রকাশ করতে শুরু করলাে যে, সে কথা শুনতে শুনতেই চেঙ্গিসের রাত কাবার হয়ে গেল। 
‘আমাকে তােমার আশ্রয়ে নিয়ে নাও।' মেয়েটি কাঁদো কাঁদো স্বরে বললাে, দেখে তাে আমাকে সবাই রাজকন্যা বলে, রাণী মনে করে। কিন্তু আমার জীবনটা এমন নরকময়! তুমি যদি আমাকে কাছ থেকে দেখতে তবে তােমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত শিউরে উঠতাে। তােমার কাছে সত্য প্রকাশ করতে আজ আর আমার কোন দ্বিধা নেই। কারণ আমি চাই না আমার পরিচয় গােপন করে তােমাকে প্রতারিত করি। তুমি ইচ্ছা করলে আমাকে ঘৃণা করতে পারাে, কারণ আমি তােমার ধর্মের লােক নই। 
আমি এক মুসলমান মা-বাবার আদরের কন্যা। হরিণের সুস্বাদু গােশতই তার দুশমন। কারণ, হরিণের গােশত সুস্বাদু না হলে কেউ তাকে শিকার করতাে না। তেমনি আমার সৌন্দর্যই আমার কষ্টের কারণ। আর এ যাতনা ক্রমশ বেড়েই চলেছে, শেষ হওয়ার কোন লক্ষণ নেই। পনেরাে বছর বয়সে আমার বাবা আমাকে এক আরব বণিকের কাছে বিক্রি করে দেয়। আমার বাবা গরীব লােক ছিল না, কিন্তু লােভী ছিল । আমরা ছিলাম ছয় বােন। সে মেয়েদের প্রতি মােটেই দরদী ছিল না। আমার বড় দুই বােন পিতার ব্যবহারে বিরক্ত হয়ে তাদের প্রেমিকের সাথে পালিয়ে যায়। এই দুঃখে বাবা। আমাকে বিক্রি করে দেয়। 
এক বছর পর বণিক এক খৃস্টান সামরিক অফিসারের কাছে আমাকে উপহার স্বরূপ পাঠায়। কিছুদিন পর সে অফিসার যুদ্ধক্ষেত্রে মারা যায়। তখন আমি সেই অফিসারের বাসা থেকে পালিয়ে আসি। কিন্তু পালিয়ে আমি যাবাে কোথায়? এক খৃস্টান আমাকে আশ্রয় দিল কিন্তু আমার দেহটাকে তার রুজি ও উপার্জনের উৎস বানিয়ে নিল। আমি কোন নিচু দরে নিশিকন্যা ছিলাম না। সে আমাকে ক্রুসেড বাহিনীর উঁচু দরের অফিসার ও কমাণ্ডারদের কাছে কিছু দিনের জন্য পাঠিয়ে দিত। আমি সেই অফিসার বা কমাণ্ডারের কাছে রাণীর মত থাকতাম। তারা আমাকে খুশী করার জন্য অলংকার বানিয়ে দিত, মাঝে মধ্যে নগদ অর্থও দিত। আমার সর্বপ্রকার আরাম আয়েশের ব্যবস্থা করতাে। মােট কথা, সেখানে আমি রাণীর হালেই থাকতাম।
কিন্তু তবু আমার মনে কোন শান্তি ছিল না। এই পেশাতে বড় বড় সামরিক অফিসারের সাথে আমার মেলামেশার সুযােগ হলাে। আমি জন্ম থেকেই বুদ্ধিমতি ও বিচক্ষণ মেয়ে হিসাবে সবার প্রিয় ছিলাম। শীঘ্রই আমি শাসকশ্রেণী, এমনকি রাজাবাদশাহর সাথেও পরিচিত হয়ে উঠলাম। তারা আমাকে গােয়েন্দাগিরীর প্রশিক্ষণ দিয়ে গােয়েন্দা কাজে ব্যবহার করতে লাগলাে। 
একবার আমাকে বাগদাদে পাঠানাে হলাে। সেখানে নূরুদ্দিন জঙ্গীর এক সেনাপতিকে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে জড়াতে গিয়েছিলাম। আমি সেখানে খুবই সাফল্য লাভ করি এবং অত্যন্ত নিপূণভাবে আমার দায়িত্ব সমাধা করি। এতে গােয়েন্দা মহলে আমার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ গােয়েন্দাদের চোখে আমি শ্রদ্ধেয় হয়ে উঠি। এরপর আমার ওপর আরাে বড় বড় দায়িত্ব অর্পিত হয় এবং আমি কুশলী হাতেই সে সব দায়িত্ব পালন করি। 
আমি যদি এখন তােমাকে আমার গােয়েন্দা কর্মের ফিরিস্তি শােনাতে শুরু করি, তবে তুমি আশ্চর্য হয়ে যাবে। হয়তাে সব কথা বিশ্বাসও করবে না। সেই লম্বা কাহিনী রেখে এবার আসল কথায় আসি।
এক সময় আমার দায়িত্ব এই জেনারেলের হাতে পড়ে। তিন আমাকে তার আশ্রিতা হিসেবে রেখে দেন। এই জেনারেল একজন প্রবীণ ও বৃদ্ধ মানুষ। তিনি আমাকে সুখে শান্তিতে রাখতে চেষ্টার কোন জটি করছেন না। তিনি আমাকে সঙ্গে নিয়ে খুব গর্বের সাথে চলাফেরা করেন। লোকদেরকে এই বলে ধোঁকা দিতে চান, তিনি বৃদ্ধ নন। তিনি যুবতী মেয়েদেরকেও পরিপূর্ণ আনন্দ ও তৃপ্তি দানে সক্ষম।
এই বুড়াে আমার সকল আবদার পূরণ করে। এতদিন আমি তার সঙ্গে আক্রাতে ছিলাম। সেখানে হঠাৎ আমার সঙ্গে এক মুসলমান গােয়েন্দার সাক্ষাৎ হলাে। সে গােয়েন্দা দামেশক থেকে এসেছিল।
তার নাম কি?' চেঙ্গিস প্রশ্ন করলাে।
তার নাম শুনে তােমার কি লাভ?' মেয়েটি বললাে, তুমি তাে আর তাকে চেনাে না। এখন আমার কথা শােন। তােমার ভালবাসা আমার মুখের বাঁধন খুলে দিয়েছে। বলতে পারাে আমার হৃদয়ের দুয়ার খুলে দিয়েছে। আমি তােমার সামনে এমন গােপন তথ্য ফাঁস করছি, যার পরিণাম সােজা কারাগারে যাওয়া। যেখানে মানুষ অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করতে করতে এক সময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। কিন্তু আমার ইচ্ছা, আমি তােমার কোলে মাথা রেখে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করি।'
চেঙ্গিস কিছু বলতে যাচ্ছিল, তাকে থামিয়ে দিয়ে মেয়েটি বললাে, আমার কথা এখনাে শেষ হয়নি। দামেশকের সেই গােয়েন্দা ধরা পড়েছিল। গ্রেফতার করার পর তাকে কারাগারের গােপন কক্ষে পাঠিয়ে দেয়া হলাে।
আমি ছিলাম ক্ষমতাধর এক জেনারেলের প্রিয় আশ্রিতা। আমি আমার মুনীবের কাছে সেই গােয়েন্দাকে দেখার আবদার করলাম। যথারীতি সে আবদার মঞ্জুর হলাে। গােয়েন্দার তামাশা দেখার জন্য আমি কারাগারের গােপন কক্ষে গেলাম। তাকে এমন কঠিন ও বর্বরােচিত শাস্তি দান করা হচ্ছিল যে, দেখে আমার মূৰ্ছা যাওয়ার দশা। তাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছিল, তার অন্য সাথীরা কোথায়, আর সে এ যাবত কি কি তথ্য যােগাড় করেছে।'
তার নাক-মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছিল। চেহারা নীল হয়ে উঠেছিল। তবুও সে বলছিল, আমার শরীরে এক মুসলমান পিতার রক্ত বইছে। আমাকে মেরে ফেলতে পারবে, কিন্তু আমি গাদ্দারী করতে পারবাে না।
সহসা আমার যেন কি হয়ে গেল। এতদিন পর হঠাৎ করেই আমারও মনে পড়ে গেল, আমার শিরায়ও তাে এক মুসলিম পিতারই রক্ত বইছে! আর এ কথা মনে হতেই জেগে উঠলাে আমার আপন সত্ত্বা। আমার চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। গােয়েন্দার গায়ের প্রতিটি আঘাত মনে হলাে আমারই শরীরে পড়ছে। লজ্জায়, ক্ষোভে, দুঃখে, আমি কাঁপতে লাগলাম। সবাই ভাবলাে, আমি দুর্বল চিত্তের মেয়ে মানুষ। সে কারণে আমি ওই অত্যাচার দেখে ভয় পেয়েছি।
ওরা আমাকে তাড়াতাড়ি ওখান থেকে সরিয়ে নিল। কিন্তু তখন আমার প্রতিটি রক্ত কণিকায় যেন ভূমিকম্প হচ্ছিল। মরু সাইমুমের মত তােলপাড় করছিল হৃদয়। আমি সংকল্প করলাম, যে করেই হােক, এই মুসলমান গােয়েন্দাকে আমি কারাগার থেকে মুক্ত করবােই।
আমি আমার সবটুকু বুদ্ধি ও বিচক্ষণতাকে একত্রিত করলাম। আমার মালিকের পদমর্যাদা ও ক্ষমতাকে কাজে লাগালাম। আমার রূপ ও সৌন্দর্যের যাদু ব্যবহার করলাম। আর কয়েক টুকরাে সােনা ব্যবহার করলাম তার মুক্তির জন্য।
তারপর একদিন সকালে আমার মালিকের মুখে শুনতে পেলাম, কারাগারের গােপন কক্ষ থেকে সেই মুসলমান গােয়েন্দা পালিয়েছে।
আসলে সে তখনাে কারাগার থেকে পালাতে পারেনি। আমি, তাকে সেখান থেকে বের করে উপরের গুদাম ঘরে লুকিয়ে রেখেছিলাম। তারপর শহরে তাকে খোঁজাখুজি শেষ হলে আমি আমার এক মুসলমান চাকর দিয়ে গােপনে তাকে ওখান থেকে বের করে আনি।
তার অবস্থা তখন খুবই কাহিল ছিল। আমি তাকে শহরেই এক জায়গায় লুকিয়ে রাখার বন্দোবস্ত করলাম।
সেও তােমার মত এক সুন্দর যুবক ছিল। কয়েদখানা তাকে লাশ বানিয়ে দিয়েছিল। আমি তার চিকিৎসার জন্য এক ডাক্তার নিয়ােগ করলাম। ডাক্তার তার ক্ষতগুলাে ধুয়ে সেখানে পট্টি বেধে দিল। তাকে শক্তি ও বল ফিরে পাওয়ার ঔষধ দিল। আমি রাতে গােপনে তার কাছে যেতাম। তার জন্য ভাল ভাল খাবার ও ফলমূল নিয়ে যেতাম।
সেই যুবক জানতে চাইল, কেন তুমি আমার জন্য এতসব করছাে?”
তখন আমি তাকে বললাম, আমিও এক মুসলমানের মেয়ে। আমার ঈমানই আমাকে এই দুঃসাহসিক কাজে প্রেরণা জুগিয়েছে।'
আমার জবাব শুনে সেই যুবক আমার ঈমানের প্রদীপকে আরাে প্রজ্জ্বলিত করে দিল। সে আমাকে শােনালাে বিবি খাওলা ও আরাে মহিয়সী মহিলাদের ত্যাগের কাহিনী।
আমিও আমার জীবন ইতিহাস তাকে শুনিয়ে দিলাম, যেমন আজ তােমাকে শুনাচ্ছি। সে আমাকে বলল, আমার সাথে চলাে।'
আমি তাকে বললাম, না, তুমি আমাকে দোয়া করাে, গােয়েন্দাগিরীর যে বিদ্যা আমি শিখেছি তা যেন আমার জাতি ও ধর্মের জন্য কাজে লাগাতে পারি।'
তখন সে আমাকে আক্রার তিন জন লােকের নাম বলল। বলল, যদি কখনাে বিপদে পড়াে এই তিনজনের যে কারাে কাছে খবরটা দিও। আর কোন খবর থাকলে,তাও ওদের কাছে পাঠাতে পারাে।'
পরে সে ওই তিনজনের সাথে আমার সাক্ষাতের ব্যবস্থাও করেছিল। এই গােয়েন্দা যখন সুস্থ্য হয়ে উঠলাে, তখন সে শহর থেকে বেরিয়ে গেল।
তার যাওয়ার পর আমি গােপনে  তার সাথীদের সাথে দেখা করতে লাগলাম। তারা আমাকে গােয়েন্দাগিরীর আরাে কায়দা কানুন শিখিয়ে দিতে লাগলাে। এভাবেই আমি তাদের দলে শামিল হয়ে গেলাম এবং তাদেরই একজন হয়ে কাজ করতে লাগলাম।
আমার মালিক এক উঁচু সামরিক অফিসার ছিল বলে সহজেই আমি শহরের অভিজাত মহল এবং বড় বড় আমীর ও অফিসারদের সাথে মিশতে পারতাম। তাছাড়া আমার অনুপম সৌন্দর্য ও যৌবনের আকর্ষণে সকলেই আমার সাথে সখ্যতা করতে আগ্রহী ছিল। সতীত্ব আমি আরাে আগেই হারিয়ে ফেলেছিলাম। এবার চোখের ইশারায় বড় বড় রথীমহারথীদের ঘায়েল করার কাজে নেমে পড়লাম আমি। পাপিষ্ঠদের আঙ্গুলের ইশারায় নাচিয়ে আমি ওদের বন্দী করতে লাগলাম আমার রূপের জালে। কাউকে কাউকে আশ্বাস দিলাম, মালিককে বলে তাদের পদোন্নতির ব্যবস্থা করে দেবাে। এভাবে সখ্যতা গড়ে তাদের কাছ থেকে অনেক মুল্যবান ও গােপন তথ্য আমি বের করে আনতাম আর তা পাঠিয়ে দিতাম সেই তিন মুসলিম গােয়েন্দার কাছে।
তারা আমাকে সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী সম্পর্কে নানা কথা শুনাতাে। তাদের কাছ থেকে আইয়ুবীর গল্প শুনে আমার মনে হতাে, লােকটা মানুষ নয়, ফেরেশতা।
আমার অন্তর সেই ফেরেশতাকে এক নজর দেখার জন্য আনচান করতে লাগল। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য, তাকে এক নজর চোখের দেখা দেখার সৌভাগ্য আমার হলাে না। তিনি জানতেও পারলেন না, জাতির জন্য তিনি একাই লড়ছেন না, আমার মত পাপিষ্ঠারাও সাধ্যমত চেষ্টা করে যাচ্ছে।
তারপর আমি আমার মালিকের সাথে এখানে এসে গেলাম। জানতে পারলাম, ক্রুসেড বাহিনী সর্বশক্তি প্রয়ােগ করে মুসলমানদের উপর সামরিক অভিযান চালানাের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
আমি আমার মালিক এই জেনারেলের কাছ থেকে তাদের সমস্ত গােপন তথ্য জেনে নিলাম। এসব তথ্য এখন কায়রাে পাঠানো দরকার। কিন্তু এখানে আইয়ুবীর কোন গােয়েন্দার সাথে আর পরিচয় নেই। তাই আমি নিজেই এসব তথ্য নিয়ে কায়রো ছুটে যেতে চাই। তােমার কাছে আমার ভালবাসার দোহাই, তুমি শুধু একবার আমাকে এখান থেকে বােরোনাের সুযােগ করে দাও। এর বিনিময়ে তুমি আমার কাছে যা চাবে, তাই পাবে। সারা জীবন আমি তােমার কেনা বাঁদী হয়ে থাকবে। আর কোনদিন আমি গােয়েন্দাগিরী করবাে না। তােমার কাছে ওয়াদা করছি, সারা জনম আমি তােমার সেবাদাসী হয়ে কাটাবাে। শুধু একবার তুমি আমাকে সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর দরবারে পৌঁছার সুযােগ করে দাও। মেয়েটির কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়ছিল সীমাহীন অনুনয়। স্তব্ধ হয়ে বসেছিল রাশেদ চেঙ্গিস।
তুমি এই গােপন তথ্য কোন সাহসে ফাঁস করে দিলে? চেঙ্গিস বললাে, যদি তুমি সত্যিই গােয়েন্দা হয়ে থাকো তবে তুমি এক আনাড়ী গােয়েন্দা। তুমি এক যুবকের ভালবাসার উপরে ভরসা করে এমন কাজ করেছে, যা কোন গােয়েন্দা করে না। যদি আমি তােমাকে বলি, আমি তােমার চেয়ে ক্রুশকেই বেশী ভালবাসি, আর আমার আনুগত্য ক্রুসেড বাহিনীর ওপর, তখন তুমি কি করবে? বুদ্ধিমান গােয়েন্দা তার দায়িত্বের ওপর সন্তানের ভালবাসাকেও কোরবানী করে।
‘আমি যদি তােমার কাছে সত্য কথা প্রকাশ করে দেই, তবে কি তুমি মানবে, ‘আমি আনাড়ী নই?' মেয়েটি বললাে, আমি প্রথম থেকেই বিশ্বাস করে নিয়েছিলাম, তুমি খৃস্টান নও। তুমি মুসলমান এবং মিশরের গােয়েন্দা।
রাশেদ চেঙ্গিস এমন আঁৎকে উঠলাে, যেন গােখরাে সাপে তাকে দংশন করেছে। তার চোখ থেকে মদের নেশা আর ভালবাসার আবেগ সবই উড়ে গেল। সেখানে এসে জমাট বাঁধল ভয় ও শঙ্কার পাহাড়। সেই পাহাড়ের নিচে তলিয়ে গেল রাশেদ চেঙ্গিস নামের এক গােয়েন্দা। রক্তশূন্য ফ্যাকাশে চোখে সে তাকাল মেয়েটির দিকে। কিছু বলার চেষ্টা করলাে, কিন্তু অনুভব করলাে, তার জবান বন্ধ হয়ে গেছে। কিছুই বলতে পারছে না সে।
মেয়েটির চাপা হাসির শব্দ শুনতে পেল সে। হাসি থামিয়ে মেয়েটি বললাে, আমি কি আনাড়ী?'
এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া সম্ভব ছিল না চেঙ্গিসের পক্ষে। মেয়েটি যদি সত্যিই মুসলমান হয়ে থাকে তবে তার কাছে পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়াটা তেমন ভয়ের নয়। কিন্তু যদি মেয়েটি মিথ্যে বলে থাকে, তবে এই মেয়ের কাছে পরিচয় দেয়া, বা না দেয়া কোন ব্যাপার নয়। ব্যাপার হলাে, সে নিজে এতটাই আনাড়ী যে, দুশমন পক্ষের এক নারীর কাছে সে ধরা খেয়ে গেল।
যদি মেয়েটি মিশরের গােয়েন্দা হয়ে থাকে তবে তাে তারা একই দলের লােক। সে ক্ষেত্রে এই মেয়ে তার কাছে অপরিচিত থাকার কথা নয়। কিন্তু মেয়েটির সাথে তার সে রকম কোন পরিচয় তাে হয়নি!
মেয়েটি যে দলেরই হােক, সে যে এক ঝানু গােয়েন্দা, এ কথা অস্বীকারের কোন উপায় ছিল না চেঙ্গিসের। তার ভয় হলাে, এ মেয়ে তাে আবার দু’মুখাে সাপ নয়! মেয়েটি দু’দিকের চর হয়ে দুদিকেই খেলছে, এমনও তাে হতে পারে। সে ভাল করেই জানতাে, সুলতান আইয়ুবী গুপ্তচরবৃত্তিতে কোন নারীকে ব্যবহার করতে কড়া ভাবে নিষেধ করেছেন। মুসলিম গােয়েন্দারা বড়জোর বিশেষ প্রয়ােজনে কোন নারীর সহযােগিতা নিয়েছে, এর বেশী নয়।
এমনও তাে হতে পারে, মেয়েটা তার নিজ স্বার্থেই গােয়েন্দগিরী করছে। যদি তাই হয় তাহলে তাে এ মেয়ে কাল নাগিনীর চেয়েও বিষাক্ত! সাপকে হয়তাে পােষ মানানাে যাবে, কিন্তু দু’মুখাে সাপের স্বভাব মেয়েকে কিছুতেই বিশ্বাস করা যায় না। এরা যখন তখন এবং যে কোন দিকে ছােবল হানতে পারে।
চুপ হয়ে গেলে যে!'মেয়েটি জিজ্ঞেস করলাে, বলল, আমি কি মিথ্যা বলেছি?
হ্যা! তুমি সম্পূর্ণ মিথ্যা বলেছে। চেঙ্গিস উত্তর দিল, “তুমি আমাকে বিপদে ফেলে দিয়েছে।'
‘কেমন বিপদ?' মেয়েটি বললাে।
ভাবছি তােমাকে কি ধরিয়ে দেবাে, নাকি ভালবাসার খাতিরে চুপ থাকবাে।' চেঙ্গিস বললাে, আমি জাত খৃস্টান এবং কট্টর ক্রুসেডার। যে কোন মূল্যে আমি ক্রুসেড বাহিনীর বিজয় চাই।'
তারা বাগানে ঘাসের ওপর বসে কথা বলছিল। মেয়েটি তার উরুর নিচ থেকে কিছু একটা বের করে চেঙ্গিসের দিকে মেলে ধরে বললাে, “এই নাও তােমার দাড়ি। কাল রাতেও যখন নেশায় ছিলে, তখন তােমার পকেটে দেখেছিলাম। আজ ভাবলাম, আমার কথার সত্যতা প্রমাণ করার জন্য যদি দরকার হয়, তাই বের করে নিয়েছি।'
চেঙ্গিস মেয়েটির রূপের ফাঁদে আটকে গিয়ে নিজেকেই হারিয়ে বসেছিল। তাই মেয়েটি তাকে মদের নেশায় ডুবিয়ে দিয়ে তাকে আবিস্কারের জন্য কতদূর এগিয়ে গিয়েছিল, কিছুই সে টের পায়নি।
‘আমি তােমার মুখে এক রাতে এই দাড়ি দেখেছিলাম। মেয়েটি বললাে, তুমি এই দাড়ি লাগিয়েই তােমার কামরা। থেকে বের হয়েছিলে। আমি তােমাকে এই বাগানে এসে থামিয়ে দিলাম। তুমি তাড়াতাড়ি দাড়ি লুকিয়ে আমার সামনে এসেছিলে । আমি তােমাকে জড়িয়ে ধরে তােমার জোব্বার দুই পকেটেই হাত ঢুকিয়ে দিয়ে ছিলাম, তুমি খেয়াল করতে পারােনি। তখনই আমি তােমার এই দাড়ির অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম।'
কৃত্রিম দাড়িতে লেখা নেই যে, আমি এক গােয়েন্দা। তুমি কি করে আমাকে এক গােয়েন্দা ভাবতে পারলে?'
তুমি যেমন করে আমার কাছে সৈন্যদের সম্পর্কে জানতে চাইলে, কেবল কোন গােয়েন্দাই তা চাইতে পারে। মেয়েটি বললাে, তুমি যেসব প্রশ্ন আমার কাছে করেছিলে, কোন গােয়েন্দা ছাড়া এসব জানার জন্য কেউ ব্যতিব্যস্ত হয় না। সাধারণ মানুষ তাে দূরের কথা, কোন সৈনিকের মনেও এসব প্রশ্ন আসতে পারে না। আর মদ পান নিয়ে তুমি যে অভিনয় করলে, তাও কেবল কোন মুসলমানই করতে পারে। কোন খৃস্টানই মদ পান করাকে খারাপ জানে না, একমাত্র মুসলমানরাই তাকে হারাম জানে ও মানে।
কথা বলতে বলতে মেয়েটি হঠাৎ চুপ হয়ে গেল। সে চেঙ্গিসের চোখে চোখ রেখে তাকাল তার দিকে। তারপর দুবাহু বাড়িয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরে বললাে, তুমি আমাকে ভয় পাচ্ছাে? তােমার কি এখনাে বিশ্বাস হচ্ছে না, আমি এক মুসলমান? আমি কেমন করে তােমাকে আমার মন খুলে দেখাবাে যে, আমরা দুজন একই পথের যাত্রী। আমি তােমাকে শুধু সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর গােয়েন্দা হিসেবেই আপন ভাবিনি। আমি জানি না, তােমাকে দেখার পর আমার মন কেন এমন উতলা হয়ে উঠলাে। আমি তােমার সাথে সম্পর্ক গড়ার জন্য পাগল হয়ে গেলাম। যখন তােমার সাথে
(চলবে)

শেয়ার করুন

Author:

আমি সজীব হোসাইন -এই ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা পাশাপাশি লেখালেখির কাজটাও করি। অনলাইনে প্রযুক্তির বিষয় নিয়ে যা জানি তা মানুষের মাঝে শেয়ার করার ইচ্ছায় এ ব্লগ টি তৈরি করা।