মঙ্গলবার, ৭ জানুয়ারি, ২০২০

ক্রুসেড সিরিজ-২০. পাল্টা ধাওয়া(পর্ব-3)

২০. পাল্টা ধাওয়া(পর্ব-3)
আমার প্রথম পরিচয় হয় তখন তােমাকে আমি খৃস্টানই মনে করেছিলাম। কিন্তু যখন টের পেলাম তুমি মুসলমান, আমার আনন্দের কোন সীমা রইল না। আমি আল্লাহর কাছে হাজার কোটি বার শুকরিয়া জানালাম। 
রাশেদ, আমি স্বপ্নে দেখেছি, আমাদের আত্মা এক সাথে আকাশে উড়ছে। আর এখন এই মাটিতেও আমাদের আত্মা একাকার হয়ে আছে। আমি বিশ্বাস করি, কিয়ামতের দিনও আমাদের আত্মা আল্লাহ এক সাথে উঠাবেন এবং এক সাথে হাশর-নশর করবেন। বলতাে, তােমাকে গােয়েন্দা প্রমাণ করার জন্য আর কতটি প্রমাণ উপস্থিত করব?' 
চেঙ্গিস পাথরের মূর্তির মত শক্ত হয়ে বসে রইল। মেয়েটির এ আবেগময় কথার পরও তার মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের হলাে না। মেয়েটিই আবার মুখ খুলল, আমি তােমাকে রক্ষার জন্য যে কোন ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত। আমি মনে করি, আজ এবং এখুনি এ স্থান আমাদের ত্যাগ করা দরকার। নইলে দু’জনের ওপরই বিপদ নেমে আসতে পারে। 
আমাদের কাছে এখন যে তথ্য আছে সেগুলাে মহা মূল্যবান সম্পদ। যদি এই সংবাদ সঠিক সময় কায়রােতে পৌছাতে না পারি তবে হারান, হলব, হিম্মত, দামেশক ও বাগদাদ ক্রুসেড বাহিনীর আক্রমণের প্লাবনে ভেসে যাবে। তখন মিশরকে রক্ষা করাও অসাধ্য হয়ে পড়বে। 
সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী এসব খবর কিছুই জানেন না। সময় আর বেশী নষ্ট করার উপায় নেই। আমি এখান থেকে একা বেরােনাের সাহস পাচ্ছি না। পেলে তােমাকে আমি পীড়াপীড়ি করতাম না। 
রাশেদ, তুমি বুঝতে চেষ্টা করাে, তােমার সঙ্গ আমার কেন বিশেষ প্রয়ােজন। আমি শহর থেকে বেরােনাের বুদ্ধিও চিন্তা করে রেখেছি। আমি তােমাকে নিয়ে শহরের বাইরে ভ্রমণে যাবাে। তুমি হবে আমার রক্ষী। তখন কেউ আর আমাদের সন্দেহ করতে পারবে না।' 
রাশেদ চেঙ্গিস নীরব ও নিথর হয়ে বসেছিল। মেয়েটি তার পিয়ালায় মদ ঢেলে পিয়ালাটি তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে আবেগ মাখা কণ্ঠে বলল, তুমি খুব ভয় পেয়ে গেছে। নাও, পান করে নাও। এটাই যেন তােমার জীবনের শেষ পিয়ালা হয়। এর পর আমরা তওবা করে ফিরে আসব এই পাপকর্ম থেকে। 
মেয়েটি পিয়ালা তার ঠোটে তুলে ধরলাে। মদের নেশায় চুর হয়ে চেঙ্গিস বলে উঠলাে, তুমি সত্যি এক অসামান্যা গুপ্তচর! নতুবা আজ দেড় বছর ধরে আমি ক্রুসেড গােয়েন্দা সংস্থার প্রধান হরমনের ছায়ায় কাটিয়ে দিলাম, কিন্তু তিনি আমাকে চেনা তাে দূরের কথা, সামান্য সন্দেহও করতে পারলেন না। আমি তােমার এই বিচক্ষণতার প্রশংসা করি। তুমি ঠিকই বলেছে, আমরা দু'জন একই লক্ষ্য পথের যাত্রী। তুমি সত্যি আমার সাথে কায়রাে যাবে? 
‘আমি তাে সে কথাই তােমাকে বলছি। কখন রওনা করতে চাও?'
আজ এবং এখুনি।
না, রাতের বেলা চোরের মত শহর ছাড়লে আমরা দুশমনের সন্দেহের তালিকায় পড়ে যাবাে। আমি আমার মনীবের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে নিই। তারপর তাকে বলবাে, আমার একজন রক্ষীর প্রয়ােজন। আমি রক্ষী হিসাবে তােমাকে আমার সাথে দেয়ার আবদার করবাে। আমার মনীব কখনাে আমার আবদার ফেলে না, আশা করি, কালও ফেলবে না। দিনের বেলা আমি গােছগাছে সময় কাটিয়ে দেবাে। তারপর রাত নামলে, যখন সবাই আনন্দ অভিসারে বেরােবে, ঠিক সেই ফাঁকে আমরা শহর ত্যাগ করবাে। কাল সন্ধ্যার পর তুমি এখানেই চলে এসাে। আমি এর মধ্যে আরও কোন নতুন খবর নেয়া যায় কিনা চেষ্টা করে দেখবাে।
রাতের শেষ প্রহরে রাশেদ চেঙ্গিস তার কামরায় পৌছলাে। সে ভিক্টরকে আর জাগালাে না। সকালে ঘুম থেকে উঠলেই তাকে রাতের কাহিনী শােনাবে বলে মনস্থির করলাে। 
এটি ছিল তার জীবনের সবচে স্মরণীয় রাত। এক দিকে তার চিন্তার রাজ্যে বিভীষিকা সৃষ্টি হয়েছিল মেয়েটির হাতে ধরা পড়ে গিয়ে। অন্যদিকে সে পরম আনন্দ ও খুশী অনুভব করছিল এই ভেবে, এক অসামান্যা মেয়ে তাকে ভালবেসে ফেলেছে। মেয়েটি কেবল বুদ্ধিমতিই নয়, তার মতই এক গুপ্তচর এবং সে এক মুসলিম বাপের কন্যা।
বিছানায় শুয়ে সে স্বপ্ন দেখতে লাগল আগামী কাল সকালের। কাল সূর্য উঠবে তার জীবনে নতুন খুশীর খবর নিয়ে। কি পরম সৌভাগ্য তার, কাল সে ত্রিপলী থেকে এক অসাধারণ সুন্দরী মেয়ে সঙ্গে নিয়ে পালিয়ে যাবে। 
কিছুক্ষণ বিছানায় শুয়ে সুখস্বপ্ন দেখল রাশেদ চেঙ্গিস। তার মনে হলাে, এখনি এ শুভ সংবাদটা ভিক্টরকে দেয়া দরকার। অধীর আগ্রহে সে তৎক্ষণাৎ ভিক্টরের কামরায় গিয়ে হাজির হলাে। 
ভিক্টর তাকে দেখতে পেয়েই তড়িঘড়ি বিছানায় উঠে বসলাে। বললাে, কি ব্যাপার, কোন দুঃসংবাদ? 
রাশেদ আনন্দে তার গলা জড়িয়ে ধরে বলল, না বন্ধু, বলল পরম সুসংবাদ আছে। 
বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকাল ভিক্টর । বলল, কি সুসংবাদ, শুনি?” 
রাশেদ ভিক্টরকে মেয়েটির সাথে তার কথােপকথন এবং সমস্ত ঘটনাই বিস্তারিত জানালাে। 
‘তুমি কি তাকে বলেছ, তুমি একজন গােয়েন্দা? ভিক্টর জিজ্ঞেস করলাে। 
হ্যা!' চেঙ্গিস উত্তর দিল, আমাকে তা বলতেই হলাে। 
আমার সম্পর্কে কি কিছু বলেছাে?' 
‘না।' চেঙ্গিস উত্তর দিল, তােমার সম্পর্কে কোন কথাই হয়নি। 
ভিক্টর মাথা নিচু করে চুপ হয়ে বসে থাকল। তাকে নীরব থাকতে দেখে রাশেদ বললাে, তুমি কি মনে করছে, আমি ভুল করেছি? 
‘জানি না। শুধু এইটুকু বলতে পারি, মেয়েটা তাদেরই গােয়েন্দা। 
তার মানে তুমি বলতে চাও, আমি এক অবুঝ ও আনাড়ী গােয়েন্দা! তার কাছে পরিচয় দিয়ে আমি ভুল করেছি? 
‘তুমি ভালাে শুধু এটাই করেছো যে, আমার নামটা তার কাছে বলোনি।' ভিক্টর বললাে, এখন তুমি নিজেই ঠিক করাে, তুমি আনাড়ী ও অবুঝ কি না।' 
‘আমি কি তাহলে সত্যি ভুল করে ফেলেছি!' চেঙ্গিস আপন মনেই বললাে কথাটা। 
হয়ত হতেও পারে, তুমি বিরাট একটা ভাল কাজ করে ফেলেছাে। ভিক্টর বললাে, আর যদি ভুলই করে থাকো তবে সেটাও কোন ছােটখাটো ভুল নয়। তুমি হয়তাে ভুলেই গেছাে, শুধুমাত্র একটি গােয়েন্দাই একটি সেনাদলের বিজয়ের কারণ হতে পারে। আর যদি ভুল হয়, তবে সে একাই তার দলকে ডুবিয়েও দিতে পারে। তুমি তাে জানােই, সুলতান আইয়ুবী ক্রুসেড বাহিনীর এই বিরাট রণপ্রস্তুতি ও যুদ্ধ পরিকল্পনা সম্পর্কে সম্পূর্ণ বেখবর। যদি আমরা ধরা পড়ে যাই, আর আমাদের সাথে এ গােপন সংবাদও কারাগারে বন্দী হয়ে যায়, অথবা আমরা যদি জল্লাদের হাতে পড়ে যাই, তবে যে সুলতান আইয়ুবী প্রতিটি যুদ্ধক্ষেত্রে আজও বিজয়ী বীর হিসেবে পরিচিতি হয়ে আসছেন, তিনিই একজন পরাজিত সেনানায়ক হয়ে ইতিহাসে পরিচিতি লাভ করবেন।
‘না!’ চেঙ্গিস আত্মবিশ্বাস নিয়ে দৃঢ়তার সাথে বললাে, সে আমাকে ধোঁকা দেবে না, দিতে পারে না। সে এক মুসলিম মেয়ে। আমি কথা মত আজ রাতেও তার কাছে যাবাে। সে, আরও গােপন খবর নিয়ে আমার সঙ্গে যাবে। এখন আর আমার ইমাম সাহেবের কাছে যাওয়ার প্রয়ােজন নেই। এই তথ্য এখন 'আমরা নিজেরাই কায়রােতে নিয়ে যাবাে। আমার সাথে থাকবে আমার হৃদয়ের রাণী। সে-ই আমাকে শহর থেকে বেরােনাের পথ পরিষ্কার করে দেবে। আমরা এমনভাবে শহর ছাড়বাে, যেন কারাে মনে কোন সন্দেহ না জাগে। আমার অনুপস্থিতিতে কেউ যেন একথা না ভাবে, আমিই এখানকার ক্রুসেড বাহিনীর গােপন খবর নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছি। তুমি বরং প্রচার করে দিও, আমাদের দুজনকে গােপনে মেলামেশা করতে দেখেছে। সম্ভবত মেয়েটি ছেলেটিকে নিয়ে । জেরুজালেম পালিয়ে গেছে। 
ভিক্টর গভীর চিন্তায় পড়ে গেল। রাশেদ চেঙ্গিস ঢুলুঢুলু চোখে শুতে গেল তার কামরায়।
যে সময় চেঙ্গিস ভিক্টরের কামরায় প্রবেশ করছিল, ঠিক সেই সময় তার থেকে একটু দূরে ক্রুসেড বাহিনীর অফিসারদের আশ্রয় ক্যাম্পে গিয়ে প্রবেশ করলাে মেয়েটি ! সে ক্যাম্পের এক তাবুতে ঘুমিয়ে থাকা একটি লােককে জাগিয়ে তুলল। লােকটির ঘুম ভাঙছিল না দেখে মেয়েটি লােকটির পা ধরে জোরে টান দিল। অবশেষে লােকটি হতচকিত হয়ে উঠে বসলাে। 
মেয়েটি হেসে বললাে, আমি শিকার ধরে ফেলেছি। 
সে লােক মেয়েটিকে তার বাহুতে জড়িয়ে নিয়ে বললাে, বলাে, কি সংবাদ এনেছাে।' 
‘সে সত্যিই গােয়েন্দা। মেয়েটি বললাে, এবং সে মুসলমান।' 
হরমনের সন্দেহটা তাহলে সত্যে প্রমাণিত হলাে?' 
সম্পূর্ণ সত্য। মেয়েটি বললাে, মদের নেশা ও আমার রূপের যাদুর কেরামতি দেখাে। যাকে হরমনের মত উস্তাদ গােয়েন্দাও সনাক্ত করতে পারেনি, আমি সেই অসাধ্য সাধন করেছি।' 
সত্যি, তােমার কোন তুলনা হয় না সুন্দরী। 
তার নকল দাড়িটা আমার হাতে না পড়লে আমিও হয়তাে নাকাল হতাম। অবশ্য তাকে আমি সেদিনই সন্দেহ করেছিলাম, যেদিন প্রথম সে মদ পান করতে অস্বীকার করলাে। তখনি আমার সন্দেহ হলাে, সে মুসলমান। আমি যখন তাকে বললাম, আমি পবিত্র ভালবাসার পিয়াসী, তখন সে আমাকে ভােগ না করে পবিত্র ভালবাসাই দিল। কোন খৃস্টান এটা করতাে না। আমাদের লােক হলে প্রথমেই সে আমাকে উলঙ্গ করার চেষ্টা করতাে। 
‘ভালবাসা পবিত্র হােক বা অপবিত্র, মেয়েদের দেহটাই এমন কোমল যে, তা পাহাড়কেও গলিয়ে পানি করে দেয়।' লােকটি বললাে, এই দুর্বলতা প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই আছে। আমি তােমাকে বলেছিলাম না, তােমার অনুপম দেহ সে লােকের মুখােশ খােলার জন্য যথেষ্ট। দেখলে তাে, সে লােক ফেরেশতা হলেও তােমার জালে ধরা পড়তাে।
কথা বলছিল খৃস্টান গােয়েন্দা সংস্থার এক অফিসার, যে হরমনের সহকারী হিসাবে দায়িত্ব পালন করছিল। হরমনের কোন কারণে সন্দেহ হয়েছিল, রাশেদ চেঙ্গিস বােধ হয় গােয়েন্দা। এমনিতেই এ লােক ছিল বিচক্ষণ, তার ওপর তাকে আদেশ দেয়া হয়েছে, যার ওপর সামান্য সন্দেহ হয় তাকেই গ্রেফতার করার। সুতরাং এ ব্যাপারে তিনি কড়া ব্যবস্থাই গ্রহণ করেছিলেন। 
রাশেদ চেঙ্গিস যে রাতে মসজিদে যায় সে রাতেই হরমন তার সহকারীকে বলেছিল, চেঙ্গিসের পিছনে মেয়ে লাগাও। দেখাে, সে আসল না নকল! ভেজাল না খাটি। 
ক্রুসেডের গােয়েন্দা বাহিনীতে এ কাজের জন্য অনেক সুন্দরী মেয়েই ছিল। হরমনের সহকারী এ মেয়েটিকেই বেছে নিল তাদের মধ্য থেকে এবং চেঙ্গিসের পিছনে তাকে লেলিয়ে দিল। 
মেয়েটা ছিল প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। দায়িত্ব পাওয়ার সাথে সাথেই সে তার এতদিনের ট্রেনিং কাজে লাগাতে শুরু করে দিল। নারীর সহজাত ছলাকলায়ও সে ছিল খুবই পারদর্শী। সে চেঙ্গিসকে তার রূপের ফাঁদে আটকানাের নাটক শুরু করে দিল।
চেঙ্গিস কোনদিন সামান্য চিন্তাও করেনি, এমন ভয়াবহ ফাঁদে তাকে  পড়তে হবে। সে যথারীতি ইমাম সাহেবের সাথে দেখা করার জন্য কামরা থেকে বেরিয়েছিল। অমনি মেয়েটা তাকে অনুসরণ শুরু করে এবং বাগানের নিরিবিলিতে তার পথ আটকে দাঁড়ায়। 
এই মেয়েটা কোথায় থাকে, কেমন করে সে তার পথে বের হওয়ার খবর পায়, এসব চিন্তা একবারও চেঙ্গিসের, মনে পড়েনি। সে সহজেই মেয়েটিকে বিশ্বাস করে, এবং তার খপ্পড়ে পড়ে যায়।
‘আমি তাকে তােমার শেখানাে হৃদয় বিদারক কাহিনীটি এমনভাবে শুনালাম যে, তাতেই সে বুদ্ধু কাবু হয়ে গেল। মেয়েটি হরমনের সহকর্মীকে বললাে, “সে অবলীলায় বিশ্বাস করে নিল, আমি সত্যিই মুসলমান এবং সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর এক গােয়েন্দা। 
মুসলমান জাতিটাই আবেগপ্রবণ!' হরমনের সহকর্মী বললাে, ‘এই জাতিটা এক অদ্ভূত ও বিস্ময়কর জাতি। এই জাতি ধর্মের নামে এমন এমন কোরবানী দিয়ে থাকে, যা অন্য জাতি দিতে পারে না। যুদ্ধের ময়দানে এক মুসলমান দশ, কখনও পনেরাে বিশ সৈন্যদের সাথে যুদ্ধ করে জয় লাভ করে। কখনাে জয় লাভ করতে না পারলে শহীদ হয়ে যায়, কিন্তু পিছু হটে না। একেই তারা বলে ঈমানের শক্তি। আমি মুসলমানদের এই রূহানী শক্তিকে অস্বীকার করতে পারি না।
মাত্র আট দশ জনের একটি কমাণ্ডে গ্রুপ অতর্কিতে আমাদের বিশাল বাহিনীতে ঢুকে পড়ে, রাতের অন্ধকারে অতর্কিতে আমাদের ক্যাম্পে আক্রমণ চালায়, আমাদের রসদপত্র, খাদ্যশস্যে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়, আমাদের ঘেরাওয়ের মধ্য থেকে চোখে ধাঁ ধাঁ লাগিয়ে বেরিয়ে যায়, নিজেদের লাগানাে আগুনে জ্বলেপুড়ে নিঃশেষ হয়ে যায়- এটা কোন সহজ কথা নয়। এটা অসাধারণ সাহস ও বীরত্বের ব্যাপার। এই সাহস ও শক্তি আসে আধ্যাত্মিক প্রেরণা থেকে। এই আধ্যাত্মিক প্রেরণাকেই বলে মােজেযা।
মুসলমানদের, এই শক্তি দুর্বল করার জন্য আমাদের বুদ্ধিজীবীরা প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। বিভিন্ন উপায় বের করছে মুসলমানদের ধর্মীয় উন্মাদনাকে দুর্বল করার জন্য। এ ক্ষেত্রে ইহুদীরা আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে। আমরা সম্মিলিত ভাবে চেষ্টা করে এ ক্ষেত্রে কিছুটা সফলতাও লাভ করেছি। 
আমরা কয়েকজন ইহুদী ও খৃষ্টানকে মুসলমান আলেম ও ইমামের ছদ্মবেশে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পাঠিয়ে দিয়েছি। মুসলিম এলাকার বেশ কিছু মসজিদের ইমাম এখন ইহুদী ও খৃস্টান। তারা কোরআন ও হাদীসের ভুল ব্যাখ্যা ও তাফসীর পেশ করে। আর এ কাজটা এমন ভাবে করে, যা জনমনে গভীর রেখাপাত করে। এভাবে মুসলমানরা ভুল বিশ্বাসের শিকার হয়ে যাচ্ছে। জিহাদকে তারা এখন ধর্মীয় গােড়ামী বলে বুঝতে শিখছে। তাদের নৈতিকতার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে যাচ্ছে।
আঞ্চলিকতা ও ধর্মীয় ফেরকাগত পার্থক্যকে অবলম্বন করে এখন তারা পরস্পরের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার দৃষ্টান্তও তুলে ধরছে। থামল সহকারী। 
মেয়েটি বলল, আর আমরা বুঝি বসে আছি? আমাদের সাফল্যের দিকটাও বুঝতে চেষ্টা করাে। আমরাই তাে মুসলমানদের মধ্যে যৌন উন্মাদনা সৃষ্টি করেছি। এখন যে সকল মুসলমান ধনসম্পদ ও ক্ষমতার অধিকারী হয়, তাদের প্রথম কাজ হয় সুরক্ষিত অন্দর মহল বা হেরেম তৈরি করা। সেখানে সুন্দরী মেয়েরা তাদের হেরেমের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। 
“হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছে। এই নারী পূজা এখন মুসলিম সমাজের সর্বস্তরে প্রবেশ করে গেছে। তােমরা মুসলমান মেয়েদের মধ্যে প্রসাধনী ও বিলাসিতার রােগ ছড়িয়ে দিতে যথার্থই সক্ষম হয়েছে। তাদের সময় ও অর্থ এখন এতেই অপচয় হয়। 
মুসলমানরা তাে এমনিতেই আবেগময়।' বললাে মেয়েটি। ‘তাদের চেতনায় একটু আবেগের ঝড় তুলতে পারলেই তাদের জালে ফেলা যায়। তাদের এই আবেগপ্রবণতা ও তােষামােদপ্রিয়তাকে এখন কাজে লাগাতে হবে। 
হরমন সাহেব বলেন, অদূর ভবিষ্যতে এ জাতি কল্পনাবিলাসী, ও গােলাম জাতিতে পরিণত হয়ে যাবে।' বললাে, হরমনের সহকারী । তারা বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে সরে যাবে। তখন আর আমাদের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ কিংবা মহাসমরের প্রয়ােজন পড়বে না। মুসলমানরা মানসিক দিক থেকেই আমাদের দাস হয়ে যাবে। তারা তাদের ঐতিহ্য ভুলে আমাদের কৃষ্টি ও সভ্যতাকে তাদের জীবনে বাস্তবায়ন করতে থাকবে। এমনকি আমাদের কালচারকে ধারণ করতে পেরে নিজেরা গর্ববােধ করবে। 
‘আমার ঘুম পাচ্ছে। মেয়েটি বললাে, আমি তাে তােমাকে মস্তবড় একটা শিকার ধরে দিলাম। এবার তাকে গ্রেফতার করার ব্যবস্থা করাে, আমি যাই।' 
‘না! গােয়েন্দা সংস্থার সহকারী প্রধান বললাে, এখনও তােমার কাজ শেষ হয়নি। তাকে গ্রেফতার করার ইচ্ছা থাকলে এত নাটক করার কি প্রয়ােজন ছিল? তােমাকে এত কষ্ট দেয়ারই বা কি দরকার ছিল! আমি তাে যে কোন লােককে সন্দেহ মাত্র গ্রেফতার করতে পারি।' 
‘তাহলে আর এত কষ্ট দিলে কেন? 
“নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে। শােন, তাকে এখন গ্রেফতার করবাে না। তার কাছ থেকে তার সমস্ত সঙ্গীদের সন্ধান নিতে হবে। যারা, তাদের হয়ে ত্রিপলীতে গােয়েন্দগীরি করছে তাদের খুঁজে বের করতে হবে। আমার বিশ্বাস, এখানে তাদের ধ্বংসাত্মক কমাণ্ডো বাহিনীও আছে। তুমি এদের সন্ধান বের করতে পারলে দেখা যাবে, হয়তাে অন্যান্য শহরের গােয়েন্দাদের তালিকাও পেয়ে যাবাে তাদের কাছে। তুমি তাে তার সাথে আবার সাক্ষাতের সময় ঠিক করেই এসেছাে। তখন তাকে বলবে, তুমি গােপন তথ্য সবই জেনে নিয়েছ। এখন তােমার কয়েকজন কমাণ্ডো.প্রয়ােজন। কারণ, একস্থানে ক্রুসেড বাহিনীর অপরিমেয় আগ্নেয়াস্ত্র, গােলাবারুদ ও পেট্রোল জমা আছে। এগুলাে জমা করা হয়েছে অভিযানের সময় সঙ্গে নেয়ার জন্য। পালাবার আগে এগুলাে ধ্বংস করে যেতে পারলে ক্রুসেড বাহিনীর কোমর ভেঙে যাবে। তাই জীবন গেলেও এ কাজ সমাধা না করে তুমি কোথাও যেতে পারাে না। 
বুঝতে পেরেছি।' মেয়েটি বললাে, কিন্তু এ ব্যাপারে একটি অসুবিধা আছে। সে তার সাথীদেরকে আড়াল করার চেষ্টা করতে পারে।' 
হরমনের সহকর্মী মেয়েটির নরম চুলে হাত বুলিয়ে বললাে, ‘তােমার দেহের অস্ত্রগুলাে কি অকেজো হয়ে গেছে? সে তাে তােমার কাছে তার সব কিছু উন্মুক্ত করে দিয়েছে। তােমাকে এখন আরও ভেতরে প্রবেশ করতে হবে। তার অন্তরের প্রতিটি কোণে তল্লাশী চালাতে হবে। একবার যখন তুমি তার ভেতরে প্রবেশ করতে পেরেছে, তখন এ কাজটিও পারবে। আমি সকালেই হরমনকে তােমার সাফল্যের বিস্তারিত কাহিনী জানাবাে। বলবাে, তুমি এক অসামান্য কাজ সম্পন্ন করে এসেছে।
ঐ দিনই সন্ধ্যার পর। ভােজ সভায় চেঙ্গিস ও ভিক্টর ডিউটি করছে, এমন সময় সেখানে এসে হাজির হলেন হরমন । তিনি চেঙ্গিসকে কাছে পেয়ে অন্তরঙ্গ স্বরে বললেন, তুমি কি জানাে, আমাদের বিশাল সম্মিলিত বাহিনী ইতিহাসের সবচে বড় যুদ্ধে যাত্রা করছে? অনেক দূরের পথ, দীর্ঘ লম্বা সফর। এই সফরে আমাদের সঙ্গে যাচ্ছেন কয়েকজন সম্রাট। তাই আমি মনে করছি, তােমাকেও আমরা সঙ্গে নিয়ে যাবাে। ভিক্টরও যাবে তােমার সাথে। 
‘আমি অবশ্যই যাবাে!' চেঙ্গিস উৎসাহের সাথে বললাে। 
হরমনের কাছে এরই মধ্যে রিপাের্ট পৌছে গেছে যে, রাশেদ চেঙ্গিস একজন শত্রু গােয়েন্দা। গত রাতেই তাদের এক যুবতী গুপ্তচর তার মুখােশ উন্মােচন করেছে। আজও মেয়েটি তার সাথে মিলিত হবে এবং তার কাছ থেকে দলের অন্যান্য সঙ্গী সাথীর নাম উদ্ধারের চেষ্টা করবে।' 
হরমন এ সংবাদে খুবই উৎফুল্ল হলেন। সহকর্মীকে বললেন, ‘চেঙ্গিসের দলের পূর্ণ সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত মেয়েটি যেন এ অভিনয় অব্যাহত রাখে। ওকে এমন ভাবে মেলামেশা করতে বলবে, চেঙ্গিস যেন ওকে সন্দেহ করতে না পারে।' 
আজ চেঙ্গিসের মন ছিল বিক্ষিপ্ত। সে ডিউটি করছিল ঠিকই, কিন্তু ডিউটির দিকে আর কোন খেয়াল ছিল না। বার বার তার মনে পড়ে যাচ্ছিল মেয়েটির কথা। সন্ধ্যার পর থেকে তার হৃদয় রাণী হয়তাে তারই অপেক্ষায় বাগানে বসে ছটফট করছে। আজ সে তাকে নিয়ে পালিয়ে যাবে। কিছুণ পরই এ শহর তার পর হয়ে যাবে । উত্তেজনায় প্রতিটি মুহূর্ত তার কাটছিল ভয়ংকর অস্থিরতার মধ্যে। 
তার জীবনে এত বড় সফলতা আর কখনাে আসেনি। তার কাছে এত গােপন তথ্য এসেছে এবং এমন সুন্দরী যুবতী তার জন্য জীবনের সবকিছু ত্যাগ করতে প্রস্তুত হয়েছে; যা সে কখনাে কল্পনাও করেনি। 
সে ভাবছিল, সত্যি কি আজকের রাতই ত্রিপলীতে তার জীবনের শেষ রাত! সে কি পারবে এই অমূল্য তথ্যরাজি নিয়ে কায়রাে ফিরে যেতে! আল্লাহর কি অপূর্ব মহিমা! একেই বলে রাজ্য ও রাজকন্যা একত্রে পাওয়া। 
মেয়েটিকে সঙ্গে করে ত্রিপলী থেকে বের হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে সে দ্রুত তার ডিউটি শেষ করে কামরায় এলাে। ভিক্টরও সঙ্গে এলাে তার। সে তাড়াতাড়ি তার পােষাক পরিবর্তন করে প্রস্তুত হয়ে নিল। আজ আর কৃত্রিম দাড়ি সঙ্গে নিল না, তার পরিবর্তে একটা খঞ্জর জোব্বার মধ্যে লুকিয়ে নিল। 
‘আমি তােমাকে আগেও বলেছি এখনও শেষ বারের মত বলছি, এই নারী ও মদের নেশা থেকে তুমি সাবধান হও। ভিক্টর তাকে বললাে, আমার কিন্তু তােমার ব্যাপারে ভীষণ ভয় হচ্ছে। তুমি মেয়েটাকে না চিনে কোন যাচাই-বাছাই না করে তােমার সমস্ত গােপন তথ্য তাকে দিয়ে দিয়েছ, এখন আবারও যাচ্ছ। কিন্তু সে তােমাকে জান্নাতে না জাহান্নামে নেবে তার কিছুই তুমি জানাে না।' 
‘শােন ভিক্টর!' চেঙ্গিস গম্ভীর স্বরে বললাে, আমি এই মেয়ের বিরুদ্ধে কোন কথাই শুনতে রাজী নই। আমি তার সাথে নতুন ও হঠাৎ সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছি না। এর আগেও বহু বার মেয়েটির সাথে আমার দীর্ঘ সাক্ষাৎ হয়েছে। তার বেদনাময় জীবনের পূর্ণ কাহিনী আমি শুনেছি। তুমি তাকে দেখােনি, তার সাথে কথাও বলোনি, তাই ওই মেয়েকে তুমি চিনতে বা বুঝতে পারবে না। আমাকে তুমি পাগল ভেবাে না। আমার জীবনের এটাই প্রথম ও শেষ ভালবাসা।' 
এরপর আর কথা বলা বৃথা ভাবলাে ভিক্টর। তার কথায় বুঝা যাচ্ছে, সে আর স্বাভাবিক ও সুস্থ্য জ্ঞানে নেই। পতঙ্গ যদি দিওয়ানা হয়ে আগুনে ঝাঁপ দিতেই চায়, তাকে ফেরায় সাধ্য কার! ভিক্টর চিন্তা করে দেখলাে, চেঙ্গিসের মত এমন অনুপম সুন্দর যুবক যে কোন নারীর মন সহজেই আকর্ষণ করতে পারে। কেবল সুঠাম দেহই নয়, নারীর মন ভুলানাের জন্য পুরুষের মধ্যে আর যেসব গুণ থাকা দরকার, তার সবই আছে চেঙ্গিসের মধ্যে। তার চোখের চাহনীতে আছে সম্মােহনী শক্তি, কণ্ঠে আছে মাধুর্য ও গভীরতা। ফলে এই মেয়ে কেন, এরচে আরও সুন্দরী ও অভিজাত ঘরের নারীও তাকে দেখে মজে যেতে পারে। 
কিন্তু এই মেয়ে কি সত্যি তাকে দেখে প্রেমে পড়েছে, নাকি তার পেছনে এই মেয়েকে লেলিয়ে দেয়া হয়েছে? মেয়েটি নিঃসন্দেহে কোন সাধারণ মেয়ে নয়। যদি সে প্রেমেই পড়তাে তবে সে চেঙ্গিসকে দেখেই নয়ন সার্থক করতাে, তাকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে সে যে এক গােয়েন্দা, এ তথ্য আদায় করতে যেতাে না। ভিক্টরের দৃঢ় বিশ্বাস, মেয়েটি চেঙ্গিসকে ধােকা দিয়ে চলেছে। আর যদি ধোকা না দেয় তবু চেঙ্গিস যা করছে তা ঠিক নয়। সে নির্বোধের মত তার গােপন পরিচয় মেয়েটির কাছে উন্মুক্ত করে দিয়ে নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠলে দিচ্ছে। কেবল সে একা নয়, সে আমাদের সকলকেই বিপদের মুখে নিয়ে যাচ্ছে। 
যদি এই মেয়ে মুসলিম গােয়েন্দাও হয়, তবুও তাকে বিশ্বাস করার কোন কারণ নেই। কারণ, এই মেয়ে সে রকম কোন পরিচয় নিয়ে আমাদের কাছে আসেনি। ভিক্টর এই সাক্ষাতের মধ্যে কোন শান্তির লক্ষণ দেখতে পাচ্ছে না। 
চেঙ্গিস চলে গেল। ভিক্টর গভীর চিন্তায় পড়ে গেল। প্রতিদিন চেঙ্গিসের যাওয়ার পর সে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে যেত কিন্তু আজ রাতে সে শুতেও পারছে না, ঘুমও আসছে না। সে তার কামরায় গিয়ে শােয়ার পরিবর্তে অশান্ত ভাবে পায়চারী করতে লাগল।
মেয়েটি ঠিক সেই স্থানেই চেঙ্গিসের জন্য দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। তার পাশে মাটিতে মদের সুরাহী ও পেয়ালা। অন্ধকারে সে চেঙ্গিসকে আসতে দেখে দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলাে। 
সে এমন ভাবে নিজেকে তার কাছে সঁপে দিল, তাতেই চেঙ্গিসের বুদ্ধি লােপ পাওয়ার উপায় হলাে। ভিক্টরের কথায় তার মনে যদিও সামান্য সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছিল, সেই সন্দেহ এতেই ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল। 
মেয়েটি তার যৌবনের যাবতীয় অস্ত্র ব্যবহার করলাে চেঙ্গিসকে বিভ্রান্ত করতে। কিন্তু চেঙ্গিস পথে আসতে আসতে চিন্তা করছিল, সে মেয়েটিকে আবারও জিজ্ঞেস করবে, সে তাকে প্রতারণা করছে কিনা। সেই প্রশ্নটিই তার মুখ ফসকে বেরিয়ে এল, তুমি তাে আমাকে ধোকা দিচ্ছ না?' 
মেয়েটি অভিমানী সুরে বললাে, এমন প্রশ্ন তুমি করতে পারলে! তােমার ভালবাসা আমাকে অসহায় ও নিরূপায় করে ফেলেছে। তােমাকে এত গােপন তথ্য দেয়ার পরও তুমি কি করে ভাবতে পারলে আমি তােমাকে ধোঁকা দেবাে?” 
‘দুঃখিত, আমি তােমার মনে কষ্ট দিতে চাইনি। আমার এক বন্ধু বললাে, “খবরদার, মেয়েদের বিশ্বাস করবি না। ওরা প্রেমের নামে এত ছলনা করতে জানে যে, ফেরাউনের গদিও তাতে উল্টে যায়। তাই কথাটা তােমাকে বললাম। 
বামুনের কাছে আঙুর ফল সব সময়ই টক। কারণ, সে তাে আর কোনদিন তার নাগাল পাবে না!' মেয়েটি বললাে, কি নাম তােমার সে বন্ধুর?” 
‘আরে রাখাে তাে! তার কথা বাদ দাও।' 
মেয়েটি বন্ধুর নাম জানার জন্য আর পীড়াপীড়ি করলাে না। তার কোমরে একটি বাহু জড়িয়ে তাকে সেখান থেকে মদের পাত্র ও পিয়ালার কাছে নিয়ে এলাে। বললাে, আমি কি আর জানি না, তুমি আমাকে অবিশ্বাস করতে পারাে না। আমি মন খারাপ করিনি, এসাে বসি, গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। 
ওরা ঘাসের ওপর বসে পড়লাে। মেয়েটি পিয়ালায় মদ ঢেলে তার দিকে বাড়িয়ে ধরে বললাে, “তােমার বিজয়ের আনন্দে এক পিয়ালা। 
চেঙ্গিস এতই খুশী ছিল যে, বলার সাথে সাথেই পিয়ালা তুলে নিল ও মুখে নিয়ে পান করতে লাগলাে। মেয়েটা তার পিয়ালায় আরও মদ ঢেলে দিল। চেঙ্গিস সেটুকুও পান করে নিল। 
তারা যেখানে বসেছিল তার থেকে আট দশ গজ দূরে ফুলের একটা ঝাকড়া ঝােপ ছিল। কেউ একজন হামাগুড়ি দিয়ে সেই ঝােপের কাছে চলে এলাে এবং তার আড়ালে বসে পড়ল। 
রাত বাড়তে লাগল। চারদিক নীরব ও নিঝুম হয়ে গেল। বাগানের আঁধাে আলাে-আঁধারীতে বসে গল্প করছে ওরা। ঝােপের পেছনে বসা লােকটি কান লাগিয়ে শুনছিল চেঙ্গিস ও মেয়েটির কথা। তারা দু'জন জানে, আশেপাশে কেউ নেই। তাই কোন লুকোচুরি না করে স্পষ্ট স্বরেই তারা কথা বলছিল। 
‘এখন বলো, কি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের কথা বলছিলে?' চেঙ্গিস মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলাে। 
‘এমন গােপন তথ্য নিয়ে এসেছি, সুলতান আইয়ুবী কখনও স্বপ্নেও এমন সংবাদ শুনেননি। মেয়েটি বললাে, আমি খৃস্টানদের মৃত্যুর পরােয়ানা নিয়ে এসেছি।' 
সে চেঙ্গিসকে ক্রুসেডদের আক্রমণের প্ল্যান ও অভিযানের রাস্তা বলে দিল। আরও বললাে তারা কোথায় কোথায় আক্রমণ চালাবে। সে ক্রুসেড বাহিনীর রসদপত্র পাঠানাের রাস্তাও বলে দিল এবং কত তারিখে সমরাভিযান শুরু হচ্ছে তাও বলে দিল।
‘আমি এখান থেকে জলদি বের হয়ে যেতে চাই।' চেঙ্গিস বললাে, চলাে আজ রাতেই আমরা বের হয়ে যাই? 
না!’ মেয়েটি বললাে, আমার কাছে আরাে কিছু গােপন খবর আছে। সেটুকুও শুনে নাও, তারপর সিদ্ধান্ত নাও কি করবে? 
“কি সেই খবর, জলদি বলাে! 
“আরে, এত উতলা হচ্ছে কেন? অস্থিরতা আমাদের শত্রু। যা করতে হবে সব ভেবে-চিন্তে করতে হবে, এত উতলা হলে চলবে না। মেয়েটি বললাে, 'তুমি তাে জানােই, খৃস্টানদের ব্যাপারে আমার মনে প্রতিশােধের কি আগুন জ্বলছে। সে আগুন ঠাণ্ডা করার একটা উপায় পেয়ে গেছি। আমি ভাবছি, যাওয়ার আগে তাদের পায়ে একটা মরণ কামড় দিয়ে গেলে কেমন হয়? 
মেয়েটি চেঙ্গিসের মনযােগ আকর্ষণ করে বললাে, “ক্রুসেড, বাহিনী তাদের সৈন্যদের জন্য অপরিমেয় খাদ্যশস্য সংহ করে একখানে গুদামজাত করে রেখেছে। শুধু খাদ্যশস্য নয়, যুদ্ধের যাবতীয় তাঁবু এবং অস্ত্রশস্ত্রও সব সেখানে জড়াে করা। সেখানে তীর ধনুক ছাড়াও আছে অচেল আগ্নেয়াস্ত্র। আছে পেট্রোলের ড্রাম। বলতে গেলে আইয়ুবীর বিরুদ্ধে যে বিশাল বাহিনী রওনা হচ্ছে, তাদের সমুদয় মাল-সামান ও অস্ত্র জমা করা হয়েছে সেখানে। এগুলাে ধ্বংস করা কোন কঠিন ব্যাপার নয়! সেখানে মাত্র সাত-আট জন সিপাহী রাতে পাহারায় থাকে।আমি যতদূর জানতে পেরেছি, তা হলাে, প্রায় তিন-চার মাস ধরে খৃস্টানরা এগুলাে জমা করছে। যদি আমরা এগুলাে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিতে পারি তবে ক্রুসেড বাহিনীর আক্রমণ অন্তত ছয় মাস পিছিয়ে যাবে। কারণ পূর্ণ প্রস্তুতি না নিয়ে এবার খৃষ্টানরা সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর মুখােমুখি হবে না। আর যুদ্ধ ছয় মাস পিছানাে মানে, সুলতান আইয়ুবী আরাে ছয় মাস সময় পেয়ে যাবেন তার বাহিনী ভাল ভাবে গুছিয়ে নেয়ার জন্য। কি বলাে, আমি ঠিক চিন্তা করিনি?' 
কিন্তু...' ভাবনায় পড়ে গেল চেঙ্গিস। মেয়েটিই আবার মুখ খুলল। বলল, তুমি তাে হরমনকে ভাল করেই জানাে। ক্রুসেড গােয়েন্দা বাহিনীর তিনি প্রধান। আমি তার অন্তর থেকেও গােপন তথ্য বের করে নিয়েছি। তিনি আমাকে জানিয়েছেন, সুলতান আইয়ুবী নতুন সেনা ভর্তি শুরু করেছেন। কারণ তার আগের সৈন্যরা গৃহযুদ্ধে লড়েই প্রায় শেষ হয়ে গেছে। অনেকে পঙ্গু হয়ে পড়ে আছে বিছানায় । এখন তার যুদ্ধ করার কোন শক্তি নেই। 
অভিশপ্ত ক্রুসেড বাহিনী এই সুযােগটাই গ্রহণ করতে চায়। নইলে সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে লড়ার সাহসই হতাে না ওদের। এখন যদি আমরা ক্রুসেড বাহিনীর আক্রমণকে পিছিয়ে দিতে পারি, তবে আমাদের বিজয় অর্জন আরাে সহজ হবে। আর এর একমাত্র উপায় তাদের অস্ত্র ও রসদ জ্বালিয়ে দেয়া। তাদের যে হাজার হাজার ঘােড়া এখানে জড়াে করেছে, সেগুলােকে ধ্বংস করার ব্যবস্থা করা। 
তাদের রসদপত্রে আগুন কে লাগাবে?' চেঙ্গিস জিজ্ঞেস করলাে। 
‘কেন, আমরাই লাগাবাে। এখানে কি আমাদের লােকজন নেই? কোন কমাণ্ডো গ্রুপ নেই?' মেয়েটি বললাে, “নিশ্চয়ই এখানে আমাদের কমাণ্ডা বাহিনী আছে। এ কাজ তাদের উপরই ন্যস্ত করা যায়। আর যদি তা না থাকে তবে আমাদেরকেই এ ঝুঁকি নিতে হবে। তুমি ভয় পাচ্ছাে? আরে জীবনের কি দাম আছে, যদি তা জাতির প্রয়ােজনেই না লাগলাে!”
না, এটা ভয়ের কথা নয়। সুলতান আইয়ুবীর নিষেধ আছে, শত্রু কবলিত এলাকায় কোন ধ্বংসাত্মক কাজ করা যাবে না । কারণ কমাণ্ডোরা ধ্বংসাত্মক কাজ করে এদিক-ওদিক পালিয়ে যেতে পারবে কিন্তু সাধারণ নিরীহ মুসলমানদের ভােগ করতে হবে তার শাস্তি। চেঙ্গিস বললাে, ‘খৃস্টান বাহিনী মুসলমানদের বাড়ীতে ঢুকে পর্দানসীন মেয়েদের ওপর অত্যাচার করবে। অযথা মুসলিম ছেলে-বুড়ােকে ধরে নির্যাতন করবে। তাই আমরা কমাণ্ডোদের ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছি। এখানে শুধু গােয়েন্দা আছে। তারা ধ্বংসাত্মক কাজ করতে পারবে ঠিকই, তবে তাদের সংগঠিত করার জন্য কিছু সময়ের দরকার। 
‘কিন্তু বেশী সময় নেয়া ঠিক হবে না। যা করার আমাদের তাড়াতাড়িই করতে হবে। মেয়েটি বললাে, আমাদের লােকজনকে কি কোথাও একত্রিত করা যায় না? সবাই মিলে বসে পরামর্শ করলে একটা না একটা রাস্তা বেরিয়ে আসবেই। 
‘আমরা একটি মসজিদকে গােপন আড্ডাখানা বানিয়ে নিয়েছি।' চেঙ্গিস মদের পাত্রে চুমুক দিয়ে বললাে, সেই মসজিদের ইমাম আমাদের এখানকার দল নেতা। তিনি খুবই যােগ্য ও সাহসী ব্যক্তি! আমি আজ রাতেই তার সাথে দেখা করবাে। তাকে সব কথা খুলে বললে তিনিই এ অভিযানের ব্যবস্থা করতে পারবেন। দলের আর যে সব যুবক আছে, তারা নামাজ পড়ার উদ্দেশ্যে মসজিদে চলে আসবে। নামাজের পর সাধারণ মুসল্লীরা চলে গেলে আমরা সেখানেই অথবা ইমাম সাহেব যদি কোন গােপন জায়গা বের করতে পারেন সেখানে এই পরামর্শ সভা করতে পারি।' 
হ্যাঁ, এটা তুমি ঠিক বুদ্ধি বের করেছে। তবে আমি ভাবছি, যদি দলে তেমন যােগ্য লােক থাকে তবে এ অপারেশনের আগেই আমাদের শহর ছাড়তে হবে। নইলে ক্রুসেড বাহিনীর বেপরােয়া তল্লাশীর ঝামেলায় পড়ে যেতে হবে। আর যদি না থাকে তবে প্রয়ােজন হলে এ অভিযানের নেতৃত্ব আমাদেরকেই নিতে হবে। খুব সাবধানতার সাথে সুপরিকল্পিত উপায়ে এগুতে হবে আমাদের। তুমি কি মনে করাে তােমাকে ছাড়া এ অভিযান সফল করার মত যােগ্য লােক এখানে আছে? বলল, মেয়েটি। 
ইমাম সাহেব নিজেই একজন যােগ্য লােক। চেঙ্গিস বললাে,
‘এ ছাড়া এখানে আরও এমন কয়েকজন সাহসী ও বীর গুপ্তচর রয়েছে, যাদের কমাণ্ডো ট্রেনিং রয়েছে। সে কয়েক জনের নাম উল্লেখ করে বললাে, “ধ্বংসাত্মক কাজের জন্য এ কয়জনই যথেষ্ট। 
‘তাহলে এদের সবাইকে মসজিদের পরামর্শ সভায় ডাকো। শত্রু এলাকায় বার বার সভা করার ঝুঁকি নেয়া ঠিক নয়। মেয়েটি চেঙ্গিসের কাছ থেকে যে সব তথ্য সংগ্রহ করতে চাচ্ছিল, সে সব তথ্য তার মুঠোয় এসে গেল। মনে মনে নিজের কৃতিত্বে নিজেই মুগ্ধ হচ্ছিল সে। সে আরাে খুশী হয়ে উঠল এ জন্য যে, পুরাে দলটিকে ফাঁদে ফেলার জন্য জাল পাতার কাজটিও সে করে নিল একই সাথে । সে আরাে কোন তথ্য পাওয়া যায় কিনা সেই আশায় নতুন প্রশ্ন ছুঁড়ে মারল। বলল, চেঙ্গিস, তুমি কিন্তু খুব হুশিয়ার থেকো। তােমাকে নিয়ে আমার খুব ভয় হয়। কারণ তুমি তাে থাকো একেবারে বাঘের ঘরে। স্বয়ং খৃস্টান সম্রাটের নিরাপত্তা বাহিনীর পেটের মধ্যে। সত্যি, তােমার কোন তুলনা হয় না। সম্পূর্ণ একা এই শত্ৰুপুরীতে তােমার ভয় করে না?” 
‘ভয় করলে কি আর গুপ্তচর হওয়া যায়!’ বলল চেঙ্গিস, তবে আমি একা নই, রাজ দরবারের চৌহদ্দীতেই আমার আরাে বন্ধু আছে। তুমি ভিক্টরকে চেনাে না, সেও আমাদের দলের একজন।' 
‘কি! ভিক্টরও?' মেয়েটি প্রচণ্ডভাবে চমকে উঠে বললাে, সে তাে খৃস্টান!
‘হ্যাঁ!' চেঙ্গিস বললাে, কেন তুমি কি আমাদের এ কৌশলের জন্য প্রশংসা করবে না? একজন খৃস্টান যে আমাদের দলের গােয়েন্দা হতে পারে, তা স্বপ্নেও ভাববে না ক্রুসেড গােয়েন্দা বাহিনী, কি বলো?’ 
মেয়েটি কিছুক্ষণ গুম মেরে বসে রইল। এই অস্বাভাবিক খবরটি হজম করতে সময় লাগলাে তার। শেষে মাথা তুলে বলল, “এতক্ষণে একটি ভাল খবর দিলে। ওরকম একজন বন্ধু থাকলে আমি তাে দিনের বেলায়ও তােমার সাথে দেখা করতে পারি! কাল আমি তােমার কামরায় যাবাে। তুমি ঠিকই বলেছাে, ভিক্টর যথেষ্ট যােগ্য ও চালাক লােক। সে যদি এ অভিযানের নেতৃত্ব নেয় তবে আমরা নিশ্চিন্তে শহর ছেড়ে রওনা দিতে পারবাে। আমি কালই তােমার কামরায় তার সাথে কথা বলতে চাই। আমি তােমার কামরায় গেলে সে আবার কিছু মনে করবে নাতাে?” 
“আরে না! ও আমার খুবই ঘনিষ্ট বন্ধু।' বলল চেঙ্গিস ।
মেয়েটি যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালাে। ঝােপের পেছনে লুকানাে মানুষটি নড়ে উঠলাে। সে বসা অবস্থায়ই কোমরের খাপ থেকে খঞ্জর বের করে নিল। 
ওরা দু'জন বিদায় নিয়ে দু'দিকে হাঁটা ধরল। আট-দশ কদম এগিয়েছে মেয়েটি, পেছন থেকে একটি বাহু তাকে জড়িয়ে ধরল এবং চোখের নিমেষে তার হাতের খঞ্জরটি তার বুকে বসিয়ে দিল। মেয়েটি আর্তনাদ করে উঠল। বলে উঠল, হায়! আমার বুকে কে যেন খঞ্জর ঢুকিয়ে দিয়েছে।' 
চিৎকার শুনে ঘুরে দাঁড়াল চেঙ্গিস। দেখতে পেলাে একটি লােক মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে আছে। সে দ্রুত হাতে তার খঞ্জর বের করে ছুটল আগন্তুককে আঘাত করতে। কাছে যেতেই লােকটি ঘুরে সেই মেয়েকে সামনে রাখলাে আর বলে উঠলাে, “চেঙ্গিস! আমি ভিক্টর, তােমার সঙ্গী! এই হতভাগী কালনাগিনী এমন সব তথ্য পেয়ে গেছে যে, এর আর বেঁচে থাকার অধিকার নেই।'
মেয়েটির প্রাণ তখনাে বের হয়নি। ভিক্টর বুক থেকে তার খঞ্জরটি টেনে বের করে আনতেই ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল। সেই রক্ত গিয়ে আঘাত করল চেঙ্গিসের চোখে মুখে। ভিক্টর শক্ত করে মেয়েটিকে পেছন থেকে ধরে রেখেছিল। ‘খৃস্টানের বাচ্চা খৃস্টান! চেঙ্গিস হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে চিৎকার করে বকছিল, “তুই শেষে কাল সাপ হয়ে আমার ভালবাসাকে দংশন করলি? 
সে ঘুরে ভিক্টরের ওপর আক্রমণ চালানাের চেষ্টা করল। ভিক্টর মেয়েটিকে ঢাল হিসেবে সামনে রেখে বললাে, স্বাভাবিক হও চেঙ্গিস! নেশার কবল থেকে ফিরে এসাে। স্বপ্ন ও কল্পনার জগত থেকে বাস্তব জগতে আসাে। বুঝতে চেষ্টা করাে কি ভয়ংকর ফাঁদে তুমি পড়েছিলে! তুমি এই মেয়েটার কাছে আমাদের সবার পরিচয় ফাঁস করে দিয়েছাে। তুমি আমাদের সবার জন্য মহা বিপদ চাপিয়ে দিয়েছ। এই ডাইনী বেঁচে থাকলে আগামী কালই আমরা সদলবলে গ্রেফতার হয়ে যেতাম। কেবল তুমি বা আমি নই, তার ষড়যন্ত্র সফল হলে এই ত্রিপলীতে আমাদের যত সদস্য কাজ করছে সবার ভাগ্যে কি অবর্ণনীয় বিপর্যয় নেমে আসত তা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। তােমার সৌভাগ্য যে, আমি এসে পড়েছিলাম এবং তােমাকে কারাগারের নির্যাতন সেল ও অন্ধ প্রকোষ্ঠ থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছি।' 
চেঙ্গিস আহত চিতার মত তার চারদিক ঘুরে ঘুরে হুংকার ' দিচ্ছিল আর তাকে আঘাত করার চেষ্টা করছিল। মেয়েটি তখনও জীবিত ছিল। সে কাতরাতে কাতরাতে বললাে, চেঙ্গিস! আমার জান! আমাকে ক্ষমা করে দিও। তােমাকে সেবা করার সৌভাগ্য আমার হলাে না । আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে। আমার কথা শােন, মনে রেখাে, খৃস্টানরা কখনও আমাদের বন্ধু হতে পারে না! এ লােক আমাদের গােয়েন্দা নয়, এ নিশ্চয়ই ক্রুসেডদের গােয়েন্দা। যদি পারাে আমার খুনের প্রতিশােধ নিও। বিদায় চেঙ্গিস! 
চেঙ্গিস সর্বশক্তি দিয়ে ভিক্টরকে আক্রমণ করলাে। ভিক্টর বার বার তাকে বুঝাতে চেষ্টা করলাে, চেঙ্গিস, তুমি মহা ভুল করছাে। তুমি এক ছলনাময়ী নারীর ধোঁকায় পড়ে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছো। একজন গােয়েন্দা হিসাবে এর জালে পড়া কোন মতেই ঠিক হয়নি তােমার। তুমি জানাে না, সুলতান আইয়ুবীর কড়া নির্দেশ আছে গুপ্তচরবৃত্তিতে মেয়ে ব্যবহার না করার? তাহলে এই মেয়ে কি করে আমাদের গােয়েন্দা হয়?
এখনাে সময় আছে, এসাে এই কালনাগিনীকে হত্যা করে লাশটি দূরে কোথাও ফেলে আসি। 
কিন্তু চেঙ্গিস তখন আর গােয়েন্দা ছিল না, সে ছিল এক দেওয়ানা প্রেমিক, যার প্রেয়সীকে অন্য এক পুরুষ ধরে রেখেছে। সে ছিল এক বীর পুরুষ ও যােদ্ধা, যার প্রেয়সীর বুকে খঞ্জর বিদ্ধ হওয়ায় সেখান থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে। 
মেয়েটির জন্য সে ভিক্টরকে আঘাত করতে পারছিল না। যত বারই সে আঘাত করতে যাচ্ছিল ততবারই ভিক্টর মেয়েটিকে ঢাল বানিয়ে আত্মরক্ষা করছিল। সে আত্মরক্ষা করছিল তার চেঙ্গিসকে বুঝানাের চেষ্টা করছিল। 
ভিক্টরকে আঘাত করতে না পেরে পাগলা কুকুরের মত ক্ষেপে উঠল চেঙ্গিস। সে সামনে থেকে মেয়েটাকে এত জোরে ধাক্কা দিল যে, ভিক্টর পিছন দিকে পড়ে গেল। পড়ে গেলেও ভিক্টর মেয়েটিকে ছাড়েনি, মেয়েটিও তার বুকের ওপর দড়াম করে পড়ে গেল । 
চেঙ্গিস এই সুযােগটা নিল, সে ভিক্টরকে পাশ থেকে আঘাত করলাে। কিন্তু ভিক্টর ছিল ঠাণ্ডা মাথার লােক। চেঙ্গিস যে মরিয়া হয়ে তাকে আঘাত করতে চেষ্টা করবে, এটা তার ভাল করেই জানা ছিল। সে একদিকে সরে কোন রকমে এ যাত্রা আত্মরক্ষা করলাে। 
কিন্তু চেঙ্গিস তাকে ছেড়ে দেয়ার মত পাত্র ছিল না। সে এবার উল্টো পাশে লাফিয়ে পড়ে খঞ্জরের এক ঘা বসিয়ে দিল ভিক্টরের কাঁধে। 
ভিক্টর এবার তার রূপ পাল্টাতে বাধ্য হলাে। নিজেকে সামলে নিয়ে সেও পাল্টা আক্রমণ চালালাে। সে ভাবতে বাধ্য হলাে, চেঙ্গিসকে বাঁচিয়ে রাখাও এখন ভয়ের কারণ। ভিক্টরের খঞ্জরের আঘাত চেঙ্গিসের পিঠে লাগলাে। চেঙ্গিস খঞ্জরের আঘাত খেয়ে আরাে ক্ষিপ্ত হয়ে ভিক্টরকে আক্রমণ করলাে। চেঙ্গিসের আঘাত ভিক্টরের বাহুতে লেগে কিছুটা ফেড়ে গেল । সে সঙ্গে সঙ্গে তার খঞ্জর সজোরে চেঙ্গিসের বুকে বসিয়ে দিল ।
চেঙ্গিস একে তাে মদের নেশায় মাতাল ছিল, তার ওপর অতিরিক্ত ক্ষিপ্ত হওয়ার কারণে বেসামাল ছিল। ভিক্টরের এ আঘাতের ধকল সে সইতে পারল না, টলমল পায়ে কয়েক কদম পেছনে গিয়ে চেঙ্গিস মাটিতে পড়ে গেল। ভিক্টর মেয়েটির নাড়িতে হাত রাখলাে। দেখলাে তার প্রাণ স্পন্দন শেষ হয়ে গেছে। চেঙ্গিসের কাছে গেল সে। তারও তখন প্রাণ বায়ু বের হওয়ার পথে। না মরলেও তার তখন কোন জ্ঞান ছিল না। 
ভিক্টরের কাঁধ ও বাহু থেকে রক্ত ঝরছে। সে মেয়েটির ওড়না ছিড়ে তার বাহু ও কাঁধে পট্টি বেঁধে নিল, যাতে রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যায়। তারপর সে সেখান থেকে তাড়াতাড়ি সরে পড়ার তাড়া অনুভব করলাে। সে সেখান থেকে সরে পড়ার জন্য দ্রুত হাঁটা শুরু করলো। 
ক্ষতস্থানে পট্টি বাঁধার পরও রক্ত পড়া বন্ধ হলাে না। কিন্তু সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করার সময় ছিল না ভিক্টরের, সে দ্রুত গতিতে বাগান থেকে বেরিয়ে এলাে। 
বাগান থেকে বেরিয়েই সে একটি চিপা গলির মধ্যে প্রবেশ করলাে। দু'তিনটা মােড় ঘুরে এই গলি এক প্রশস্ত রাস্তায় গিয়ে শেষ হয়েছিল। সে অন্ধকার গলি অতিক্রম করে বড় রাস্তায় চলে এলাে। 
তার ভাগ্য ভাল যে, তখন অনেক রাত। ত্রিপলী শহরের বাসিন্দারা গভীর নিদ্রায় বিভাের। সুনসান, নিস্তব্ধ সড়কের দু’পাশের প্রতিটি বাড়ীর গেট বন্ধ। 
কিন্তু একটি ঘরের দরজা তখনাে খােলা ছিল। সেই ঘর আল্লাহর ঘর। এই ঘরে কোনদিন ঢুকেনি ভিক্টর, তবে জানে মসজিদের ইমাম সাহেবের কামরার দরোজা সব সময় কিছু লােকের জন্য খােলা থাকে। একটু ধাক্কা বা যুৎসই টোকা দিতে পারলেই তা খুলে যায় । 
ভিক্টর এই প্রথম মসজিদে এলাে। চেঙ্গিস বলেছিল, যদি কখনও ইমাম সাহেবের সাথে দেখা করার প্রয়ােজন হয়, তবে মসজিদের বারান্দায় চলে যাবে। বারান্দার বাম দিকের দেয়ালে একটি দরজা আছে, সেটিই ইমাম সাহেবের কামরার দরােজা। 
ভিক্টর মসজিদের সিড়িতে পা দিয়েই থমকে দাঁড়ান। তার মনে পড়ে গেল, এই পবিত্র ঘরে ঢােকার সময় সবাইকে সে জুতা খুলে প্রবেশ করতে দেখেছে। সে তার জুতা খুলে হাতে নিল এবং বারান্দা পেরিয়ে ইমাম সাহেবের দরজার সামনে
(চলবে)

শেয়ার করুন

Author:

আমি সজীব হোসাইন -এই ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা পাশাপাশি লেখালেখির কাজটাও করি। অনলাইনে প্রযুক্তির বিষয় নিয়ে যা জানি তা মানুষের মাঝে শেয়ার করার ইচ্ছায় এ ব্লগ টি তৈরি করা।