২০. পাল্টা ধাওয়া(পর্ব-1)
ত্রিপলীর খৃস্টান রাজ দরবার। বিভিন্ন খৃস্টান সম্রাটরা এসে এখানে মিলিত হয়েছেন। উদ্দেশ্য, সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত ও সর্বপ্লাবী হামলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা। মুসলমানদের ওপর চুড়ান্ত হামলার লক্ষ্যেই এ সম্মেলন। সম্মেলনে অতিথিদের আপ্যায়নের দায়িত্ব পালন করছে দুই বিশ্বস্ত খৃস্টান, ডিক্টর ও চেঙ্গিস।
রাজকীয় উর্দি পরে দু’জনই মেহমানদের সামনে ঘােরাফেরা করছিল। এটা সেটা এগিয়ে দিচ্ছিল তাদের। মেহমানদের অনেকেই এদের আগে থেকে চেনে। ওরা মেহমানদের বিশ্বাসভাজন তাে বটেই, কারাে কারাে প্রিয়ভাজনও।
ক্রুসেডদের গােয়েন্দা বাহিনীর প্রধান হরমন। তিনিই অনেক যাচাই-বাছাই করে ওদেরকে এ চাকরীতে নিয়ােগ দিয়েছেন। কিন্তু আসলে এরা দুজনই ছিল সুলতান আইয়ুবীর গােয়েন্দা। গােয়েন্দা হিসাবে তারা দু'জনই ছিল চৌকস। অসম্ভব বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ না হলে হরমনের মত উস্তাদ গােয়েন্দার সন্ধানী দৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়ে তাদের পক্ষে এখানে টিকে থাকা সম্ভব ছিল না।
দেখতে শুনতেও দু'জনই ছিল স্মার্ট। এখানে তাদের চাকরী হওয়ার এটাও একটা কারণ যে, তাদের উভয়েরই চেহারা সুন্দর, দেহ কাঠামাে সুঠাম, সবল ও পৌরুষদীপ্ত। রাজকীয় মেহমানখানায় কাজ করার উপযুক্তই বটে।
ভিক্টর তার প্রকৃত নামেই সবার কাছে পরিচিত। কারণ সে আসলেই খৃস্টান। রাশেদ চেঙ্গিস ছিল তুরস্কের নাগরিক, মুসলমান। খৃস্টানদের কাছে সে তার নিজের দেয়া খৃস্টান ছদ্মনামে পরিচিতি ছিল। এ জন্য কোন খৃস্টানই তার আসল নাম জানতাে না এবং সে যে মুসলমান তাও জানতাে না। গভীর রাত পর্যন্ত চলল সম্মেলনের কাজ। আহারাদি, মদপান ও আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে রাত পার করে দিল সম্রাটগণ। বিশ্বস্ত খাদেমের মতই হাসি মুখে তারা এই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অতিথিদের সেবা করে যাচ্ছিল।
মাঝ রাতের পর মিটিং শেষ হলাে। তখন তারা ছুটি পেল নিজ নিজ কামরায় যাওয়ার।
‘আমরা দুজন একই সাথে চাকরী ও ডিউটিতে অনুপস্থিত থাকতে পারি না। ভিক্টর বললাে, এ সংবাদ অন্য কাউকে দিয়ে কায়রাে পাঠাতে হবে। এমন বিশ্বস্ত লােক কাকে পাওয়া যায় বলতাে?
ইমাম সাহেবের সাথে কথা বলতে হবে। রাশেদ চেঙ্গিস বললাে, তিনি ভাল বলতে পারবেন, কে দ্রুত ও বিশ্বস্ততার সাথে এ সংবাদ কায়রাে পৌছাতে পারবে। তবে যেই যাক, তাকে বিশ্বস্ত হতে হবে। সে আরাে বলল, আমি আজই এ সংবাদ দিয়ে কাউকে পাঠানাের দরকার মনে করছি না। এখনাে খৃস্টান সম্রাটরা যুদ্ধের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেনি। যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিকল্পনা ও পরিপূর্ণ তথ্য নিয়েই কায়রােতে লােক পাঠানাে দরকার। অসম্পূর্ণ সংবাদ দিয়ে সুলতান আইয়ুবীকে হয়রান পেরেশান করার কোন মানে নেই।'
‘না, আমি এটুকুকেই অনেক বড় খবর মনে করি। ইমাম সাহেবকে বলা দরকার, ক্রুসেড বাহিনী বিশাল শক্তি নিয়ে আক্রমণের পরিকল্পনা করেছে। যাতে তিনি এ খবর কায়রাে পৌঁছে দিতে পারেন। ভিক্টর বললাে, সুলতান আইয়ুবী এতে করে প্রস্তুতি নেয়ার সুযােগ পাবেন। এখনাে যেসব দিকে তাঁর দুর্বলতা রয়েছে দ্রুত তা সংশােধন করে নিতে পারবেন। অভাবগুলাে দ্রুত পূরণের জন্য সচেষ্ট হতে পারবেন। পরে যখন বিস্তারিত পরিকল্পনা পাবাে তখন সে খবরও পাঠাবাে।
‘কিন্তু বার বার যাতায়াত করলে হরমনের গুপ্তচরদের নজরে পড়ে যাওয়ার ভয় আছে!''
‘আর এমন যদি হয়, কোন খবর পাঠানোর আগেই আমরা ধরা পড়ে গেলাম!'
‘কেন, তােমার কি নিজের প্রতি আস্থা নেই?
‘নিজের প্রতি আস্থা আমার ঠিকই আছে, কিন্তু তােমার প্রতি নেই। শােনো!” ভিক্টর চেঙ্গিসকে বললাে, “যে সময় মেহমানরা আক্রমণের কথা বলছিল, তখন আমি তােমাকে লক্ষ্য করে দেখেছি। তুমি মদের পিয়ালা সম্রাট রিমাণ্ডের সামনে সাজিয়ে, রাখতে রাখতে একবার থেমে গিয়েছিলে। তাতে স্পষ্ট বােঝা যাচ্ছিল, তুমি তার কথার দিকে খেয়াল করছে। আমি তােমার চেহারা দেখছিলাম। খবরটি শুনে তােমার চেহারায় প্রফুল্ল ভাব ফুটে উঠেছিল। আমি জানতাম, এত দামী তথ্য পাওয়ার পর আতংক বা খুশীর ভাব ফুটে উঠাই স্বাভাবিক। কিন্তু তােমার ভুলে গেলে চলবে না, হরমনও এখানে উপস্থিত আছেন। হরমন আলী বিন সুফিয়ানের সম পর্যায়ের গােয়েন্দা। আমি তােমাকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে হরমনের দিকেও তাকিয়েছিলাম। আমার তখন আশংকা হলাে, তিনি তােমাকে লক্ষ্য করছেন। তাই তাে বলছি, ভাই, আমাদের নিঃশ্বাসের কোন বিশ্বাস নেই।'
হরমনের কাছে আমি কোন অপরিচিত লােক নই।' রাশেদ চেঙ্গিস বললাে, আমার সম্পর্কে তিনি সন্দেহ অনেক আগেই শেষ করেছেন। এখন ভয় পাওয়ার কিছু নেই।'
ভয় করার কথা বলছি না, সাবধান হওয়ার কথা বলছি। ভিক্টর বললাে, আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, আমরা শত্রুর পেটের মধ্যে বাস করছি।'
তা ঠিক। কিন্তু ভাই, যাই বলাে, আমিও তাে একজন মানুষ। মানবিক ত্রুটিবিচ্যুতির উর্ধে কি করে উঠি!
সে জন্যই তাে তােমাকে সাবধান করছি। তুমি তাে জানাে না আজ হরমনের ওপর কি নির্দেশ জারী করা হয়েছে। এখন থেকে প্রতিটি মানুষকেই সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখার জন্য বলা হয়েছে তাকে। আর তাকে এই ক্ষমতাও দেয়া হয়েছে, এ ক্ষেত্রে তিনি যা ভাল মনে করবেন, সেটাই আইন। তিনি কাউকে সন্দেহ করলে এবং সেই সন্দেহের বশে কাউকে খুন করলেও কেউ তার কাছে কোন কৈফিয়ত তলব করতে পারবে না।
বলাে কি! এ ব্যাপারে তার হাতে সর্বময় ক্ষমতা দিয়ে দেয়া হয়েছে?'
হ্যাঁ, শােন, এসব কথা এখন থাক। আগে কাজের কথায় আসি। তুমি এখনি সােজা মসজিদে চলে যাও। সবাই এখন ঘুমিয়ে আছে। এই সুযােগে আজকের আলােচনা ইমাম সাহেবকে বিস্তারিত জানিয়ে এসাে। যদি কায়রােতে যাওয়ার মত লােক পাওয়া যায়, তবে যেন দ্রুত তাকে আলী বিন সুফিয়ানের কাছে পাঠিয়ে দেয়। আর যদি ওদিক থেকে কেউ এসে থাকে, তবে আমার সাথে দেখা না করে যেন ফিরে না যায়।'
শহরের এক মসজিদের ইমাম সুলতান আইয়ুবীর গােপন সংবাদ আদান-প্রদানের মাধ্যমে পরিণত হয়েছেন। সেই সুবাদে মসজিদটিও মুসলিম গােয়েন্দাদের গােপন আড্ডায় পরিণত হয়েছে। আলী বিন সুফিয়ানের কোন গােয়েন্দা গােপন কোন খবর পেলে মসজিদে গিয়ে ইমাম সাহেবকে সে তথ্য দিয়ে আসে। ইমাম সাহেব আবার সে খবর অন্য গােয়েন্দা মারফত জায়গা মত পৌঁছে দেন।
ভিক্টর কখনও মসজিদে যায় না। সে বলে, আমি মুসলমানও না, নামাজ-কালামও জানি না। আর মসজিদের ইজ্জত-সম্মান বিষয়েও কোন জ্ঞান নেই আমার। আমি কেন মসজিদে যাবাে?'
তার এ কথা যেমন খাঁটি, তারচে বেশী খাঁটি, সে এক হুশিয়ার গােয়েন্দা। অযথা মসজিদে যাওয়ার ঝুঁকি সে কেন নিতে যাবে! মসজিদে মুসল্লী বেশে ক্রুসেড গােয়েন্দা নেই, এমন তাে নয়। অনেক মুসল্লীই আছে, যারা পাকা গােয়েন্দা। তারা খৃস্টানদের চর হিসাবে মুসলমানদের মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। তারা মসজিদের মুসল্লীদের প্রতি কড়া দৃষ্টি রাখে এবং তাদের কথা গভীর মনােযােগ দিয়ে শােনে। এ জন্যই দেখা যায়, আইয়ুবীর প্রতি সামান্য দরদ রাখে এমন বেশীর ভাগ মুসলমানই গ্রেফতার হয়ে যায়।
রাশেদ চেঙ্গিসও দিনের বেলা এবং প্রকাশ্যে কখনাে মসজিদে যায় না। কারণ সে নিজেও খৃস্টান পরিচয়েই সবার কাছে পরিচিত। কোন খৃস্টান মসজিদে গেলে প্রথম দর্শনেই সে সন্দেহভাজনদের তালিকায় পড়ে যাবে। যে লােক খৃস্টান রাজসভায় মদ পরিবেশনের দায়িত্ব পালন করে, মসজিদের তার কি দরকার? এ প্রশ্নের কোন সদুত্তর সে দিতে পারবে
না। তাই যখনি প্রয়ােজন পড়ে, তখন গভীর রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে সে ইমামের সাথে দেখা করতে যায়।
ইমাম সাহেবের কামরা মসজিদের সাথে লাগােয়া । কামরার দরজা মসজিদের বারান্দার দিকে। বারান্দা দিয়ে উঠে দরজায় ধাক্কা দিলে দেখা যাবে, দরজাটি ভেতর থেকে ভেজানাে বা আটকানাে । তখন নিয়ম মাফিক সাংকেতিক টোকা দিতে পারলেই সে দরজা খুলে যাবে।
রাশেদ চেঙ্গিস তার পােষাক পরিবর্তন করলাে। গায়ে জোব্বাও মাথায় পাগড়ী বেঁধে নিল। মুখে কৃত্রিম দাড়িও লাগাল। এরপর কামরা থেকে বেরিয়ে অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে গেল। আদেশ অনুযায়ী তাকে সব সময় ক্লীন সেভ থাকতে হয়। গােপন মিশনে যাওয়ার সময় সে কৃত্রিম দাড়ি লাগিয়ে বের হয়, যাতে কারাে চোখে পড়লেও সহজে ধরা না পড়ে।
একজন পাক্কা হুজুর সেজে রাস্তায় নামে সে। রাজ দরবারের বাইরে তাদের থাকার জন্য নির্দিষ্ট কোয়ার্টার আছে। সেখানেই থাকে সে এবং ভিক্টর। তাই বেরােতে কোন অসুবিধা হয়নি। রাস্তার মােড়ে মােড়ে বাতি জ্বলছে। সে যতটা সম্ভব আলাে এড়িয়ে পথ চলছিল।
রিমাণ্ডের পারিষদ এবং সেনা অফিসার ছাড়াও ওখানে জমায়েত হয়েছিল অনেক মেহমান। তারা বিভিন্ন খৃস্টান সাম্রাজ্যের সম্রাট বা সেনাপতি। সম্রাট রিনাল্ট, তার অনেক নাইট এবং অফিসারও সেখানে উপস্থিত ছিল। আরও ছিল বিভিন্ন রাষ্ট্রের সেনা কর্মকর্তাবৃন্দ।
এইসব সম্মানিত মেহমানদের জন্য পর্যাপ্ত বিনােদনের ব্যবস্থা রেখেছিলেন সম্রাট রিমান্ড। আলাপ-আলােচনা ও যুদ্ধের পরিকল্পনায় যেটুকু সময় ব্যয় হতাে তার বাইরে বাকী সময়টুকু তারা কাটিয়ে দিত আমােদ-স্ফুর্তি ও মাতলামী করে। অধিকাংশ রাত তারা পার করতাে মদ ও মেয়ে নিয়ে। দরবারে ছিল অভিজাত শ্রেণীর পেশাদার নিশিকন্যাদের রমরমা ভাব। উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসাররা মেতে উঠে স্ত্রী বদল খেলায়। ফলে রাতে শহর জুড়ে একটা উৎসব উৎসব
ভাব চলে এলাে।
রাশেদ চেঙ্গিস তার কামরা থেকে বেরিয়ে পথে নেমেই বিপাকে পড়ল। কোথায় সে একটু নিরিবিলিতে পথ চলবে, গােপনে দেখা করবে ইমাম সাহেবের সাথে, তা নয়, পথ ভর্তি লােকজন। পথের পাশে বিভিন্ন দেশের সৈনিকরা তাবু টানিয়ে নিয়েছে। সেই সব তাঁবুতে, এমনকি পথের মধ্যেও অসভ্যপনা চলছিল। বেসামাল মাতাল জোড়া এমন ভাবে পথ চলছে, যেন ওটা ওদের ড্রয়িং রুম।
সে এই সব জুটির দৃষ্টি এড়িয়ে কৌশলে রাস্তা পার হয়ে এলাে। শেষ পর্যন্ত সে বিপদসীমা পার হয়ে শহরের সাধারণ আবাসিক এলাকায় প্রবেশ করলাে। একটু পর গিয়ে হাজির হলাে সেই মসজিদের পাশে।
মসজিদটি এক মুসলিম মহল্লার অভ্যন্তরে। এখানে কোন কোলাহল ছিল না, আশেপাশে কেউ জেগে আছে বলেও মনে হলাে না তার। সে বারান্দা পেরিয়ে ইমাম সাহেবের দরজায় গিয়ে হাজির হলাে। এদিক-ওদিক ভাল ভাবে লক্ষ্য করে কামরায় প্রবেশ করতে যাবে, এমন সময় কারাে আলতাে পায়ের শব্দ শুনতে পেল। থমকে দম আটকে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইল সে। শব্দটি গলি পেরিয়ে মসজিদের মােড়ের কাছে এসে নীরব হয়ে গেল।
রাশেদ চেঙ্গিস অনেকক্ষণ ওখানে দাঁড়িয়ে রইল। আর কোন শব্দ নেই। সে ভাবল, তবে কি এটা মনের ধোকা? নাকি ভুল শুনলাম? সে বারান্দা দিয়ে হেঁটে আবার এসে গলি মুখে উঁকি দিল। না, আশেপাশে কেউ নেই।
রাশেদ চেঙ্গিস ভাবলাে, হয়তাে কোন কুকুরের পদধ্বনি ছিল ওটা। সে তার মনকে শান্ত করে ইমাম সহেবের কামরার দরজায় ধাক্কা দিল। খুলে গেল দরােজা। রাশেদ চেঙ্গিস ভেতরে প্রবেশ করে ইমাম সাহেবকে সব কথা খুলে বলল। ক্রুসেড বাহিনীর অধিকাংশ সৈন্য এখানে জড়াে হয়েছে। চেঙ্গিস বললাে, সবচে বড় দলটি নিয়ে এসেছে সম্রাট রিনাল্ট। ত্রিপলীর সেনাবাহিনী আগে থেকেই এখানে আছে। অন্যান্য সম্রাটরাও তাদের বাহিনী এসে পৌঁছার জন্য অপেক্ষা করছে। কায়রােতে এ সংবাদ তাড়াতাড়ি পাঠানাে দরকার। সৈন্য অভিযানের আগেই এ বার্তা সুলতান আইয়ুবীর কাছে পৌঁছলে তিনি তাদের সম্বর্ধনার উপযুক্ত ব্যবস্থা করতে পারবেন।
‘তুমি খুব গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ নিয়ে এসেছে। আমি এ খবর কায়রাে পাঠাবার ব্যবস্থা করছি। তুমি আর কিছু বলবে? আমরা যদি সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারি, তবে অভিযানের আগেই কমান্ডো হামলা চালিয়ে এই বাহিনীর ব্যাপক ক্ষতি সাধন করা সম্ভব। বিষয়টি আপনি গভীরভাবে ভেবে দেখবেন। আর যদি এটা সম্ভব না হয় তবে তাদেরকে অভিযানের মাঝ পথে বাঁধা দেয়া যেতে পারে।'
‘তােমার কথার অর্থ হচ্ছে, কমান্ডোদের বলতে হবে, তারা যেন শত্রুদের রসদপত্র পথেই জ্বালিয়ে ভস্ম করে দেয়। ইমাম সাহেব বললেন, আমি এ কাজ করাতে পারবাে, কিন্তু করাবো না। তুমি হয়তাে শুনে থাকবে, যে সব অধিকৃত শহরে আমাদের কমান্ডো বাহিনী ক্রুসেড বাহিনীর ক্ষতি সাধন করেছে, সেখানে নিরীহ মুসলমানদের বস্তিগুলাের কি অবর্ণনীয় দুর্দশা হয়েছে। সে এলাকার মুসলমানদের জীবন জাহান্নামের মতই কষ্টদায়ক হয়ে উঠেছে। ক্রুসেড বাহিনী প্রতিটি ঘরে ঘরে গিয়ে অনুসন্ধান করেছে। আমাদের পর্দানশীন নারীদের সম্ভ্রম নষ্ট করেছে। আমাদের যুবতী মেয়েদেরকে ধরে নিয়ে গেছে ওরা। কিশাের ও যুবকদেরকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে। বুড়ােদেরকে বন্দী করে নিয়ে গিয়ে ওদের দিয়ে অমানুষিক পরিশ্রমের কাজ করাচ্ছে।
আমি বিষয়টি সুলতান আইয়ুবীকে জানিয়েছিলাম। উত্তরে তিনি বলেছেন, মুসলমান নাগরিকদের জান ও মালের ক্ষতি হতে পারে এমন ভয় থাকলে সেই শহরে কমান্ডো অভিযান চালানাে যাবে না। শত্রুদের খাদ্যসামগ্রী তাদের বাহিনীর সাথে আসতে থাকুক। সময়মত সেগুলাের ব্যবস্থা আমি করবাে।'
আমি আরাে
(চলবে)বিস্তারিত রিপোের্ট আপনাকে দু'চার দিনের মধ্যেই দিচ্ছি।' চেঙ্গিস বললাে, আপনি এখন আরও বেশী সাবধান থাকবেন। এখানকার গােয়েন্দা সংস্থা খুব বেশী তৎপর হয়ে উঠেছে। তারা এখন পশু-পাখীকেও সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছে।
“ঠিক আছে, এ নিয়ে ভেবাে না। তুমিও সাবধানে থেকো। ইমাম সাহেব বললেন, আগামী কাল ভােরেই আমি কাউকে কায়রাে পাঠিয়ে দেবাে।'
রাশেদ চেঙ্গিস মসজিদ থেকে বেরিয়ে এলাে। এবার সে আর চোরের মত লুকিয়ে নয়, প্রকাশ্যেই গলি পথ ধরে হাঁটতে লাগল।
সে যেই রাস্তার মােড় ঘুরলাে, তখন আবারও কারাে পায়ের চাপা শব্দ শুনতে পেল। সে পিছন ফিরে তাকালাে, অন্ধকার গলিপথে কাউকে দেখতে পেল না। তবে এবারের শব্দটা এত স্পষ্ট ছিল যে, এটা আর অমূলক ধারণা রইল না, কেউ তাকে অনুসরণ করছে, এই সন্দেহ তার দৃঢ় বিশ্বাসে পরিণত হলো। সে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। তারপর পিছন ফিরে আবার গলিপথে ঢুকে বেশ কিছু দূর অগ্রসর হলাে। কিন্তু না, কাউকেই দেখা গেল না।
সে আবার ফিরতি পথ ধরলাে এবং দ্রুত হেঁটে তার ঠিকানায় পৌঁছে গেল। কামরায় পৌঁছে সে তার কৃত্রিম দাড়ি খুলে পুরাতন কাপড়ের বাণ্ডিলে তা লুকিয়ে রাখলাে। তারপর সে তার পােষাক পাল্টাল, যেমন পােষক সাধারণত খৃস্টানরা পরিধান করে। এখন আর কেউ তাকে সন্দেহ করতে পারবে না।
ভিক্টর ও চেঙ্গিস চেষ্টা করছিল, ক্রুসেড বাহিনী কোথায় আক্রমণ চালাবে এবং তাদের অভিযানের ধরণ কি হবে তা জানার জন্য।
ত্রিপলীতে সেনা সমাবেশ বেড়েই চলছিল। গােয়েন্দাদের আনাগােনা এবং ছুটাছুটিও বেড়ে গিয়েছিল। এই দুই গােয়েন্দা চোখ কান খােলা রেখে প্রত্যেকের গতিবিধি জানার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
সম্রাট রিমান্ডের দায়িত্ব ছিল মেহমানদের আতিথেয়তা করা। কারণ তার রাজধানীতেই এই সমাবেশ হচ্ছে। এক রাতে তিনি সমস্ত খৃষ্টান সম্রাট, উচ্চ সামরিক অফিসার ও অন্যান্য শাসকবৃন্দকে নৈশভােজের দাওয়াত দিলেন। এই রাতটি ছিল চেঙ্গিস ও ভিক্টরের জন্য অসম্ভব ব্যস্ততার রাত।
সম্রাট রিমান্ড মেহমানদেরকে উত্তম আপ্যায়ন ও দামী মদ পরিবেশনের জন্য হুকুম দিলেন। স্বাভাবিকভাবেই তাদের ব্যস্ততা বেড়ে গেল।
তারা জানতাে, এই ব্যস্ততা ও সতর্কতার প্রয়ােজন ততক্ষণ, যতক্ষণ মেহমানরা সজ্ঞানে থাকে। মেহমানরা মদের নেশায় বিভাের হয়ে গেলে সেই সতর্কতার আর প্রয়ােজন পড়ে না। তখন ভােজসভার কর্মচারীদের জন্য সৃষ্টি হয় সুবর্ণ সুযােগ। এই সুযােগে অনেকেই দু'চার পেগ মদ সরিয়ে রাখে। পছন্দের খাবারটা একটু চেখে দেখে। আর কেউ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে রাজ-রাজরাদের লীলাখেলা ও অসভ্যতা।
এই ভােজ সভা ছিল নারী-পুরুষের অবাধ মিলনকেন্দ্র। তার মধ্যে যুবতী মেয়েরা যেমন ছিল, তেমনি ছিল যুবতী সাজা বৃদ্ধারাও।
ভিক্টর ও চেঙ্গিস উভয়েই খাবার ও মদ পরিবেশনের তদারকিতে খুবই ব্যস্ত ছিল। এক যুবতী রাশেদ চেঙ্গিসের কাছ থেকে দু'তিন বার মদ চেয়ে নিল। চেঙ্গিস প্রত্যেকবারই কোন বয়কে ডেকে মদ দিতে বললাে।
মেহমানরা অনেকেই সম্রাট রিমান্ডকে ঘিরে বসে বসে গল্পগুজব করছিল। কেউ বসেছিল হলরুমের ভেতর, কেউ বারান্দার খােলামেলা পরিবেশে ছােট ছােট টেবিলে জুটি বেঁধে আলাপ করছিল। কেউ আবার নিরিবিলি পরিবেশ পাওয়ার আশায় বাগানে নেমে পড়েছিল।
যে যুবতী বার বার চেঙ্গিসের কাছে মদ চাচ্ছিল, আবারও সে হাত ইশারায় তাকে কাছে ডাকল। মেয়েটি ছিল খুবই সুন্দরী , চেঙ্গিস তার কাছে যেতেই সে বলল, আমি যতবার তােমার কাছে মদ চেয়েছি ততবারই তুমি বয়-বেয়ারা দিয়ে তা পাঠিয়ে দিয়েছ। এক যুবতীকে খুশী করার জন্য তুমি কি নিজের হাতে একবার পরিবেশন করতে পারাে না?”
জ্বী, কেন নয়। চেঙ্গিস বিনয়ের হাসি হেসে বলল, “আচ্ছা, এখুনি এনে দিচ্ছি।
উহু, এখানে নয়। মেয়েটি মুচকি হেসে বললাে, 'আচ্ছা, বাগানে যাচ্ছি ওখানে নিয়ে এসাে।
চেঙ্গিস মদের একটি সুন্দর সুরাহী ও পিয়ালা নিয়ে বাগানে চলে গেল। মেয়েটা আগেই ওখানে গিয়ে বসেছিল। রাতের প্রাসাদের আঙ্গিনায় চমৎকার সাজানাে গুছানাে বাগান সেখানেও মেহমানরা জোড়ায় জোড়ায় বসে গল্প করছিল সেই সাথে চলছিল সমানে পানাহার।
কিন্তু এই মেয়েটি বাগানের এক টেবিলে একাকীই বসেছিল এতে চেঙ্গিস একটু বিস্মিত হলাে। কারণ এখানে কেউ একা নেই, সবাই ব্যস্ত আপন আপন সঙ্গীর সাথে। এতসব জুটির মাঝে তাকে বড় বেমানান লাগছিল।
এমন সুন্দরী ও যুবতী মেয়ের তাে একা থাকার কথা নয়। ভাবল চেঙ্গিস, তার চারপাশে তাে এতক্ষণে ভ্রমরের ভিড় লেগে যাওয়ার কথা। সে মেয়েটির পিয়ালায় মদ ঢালতে ঢালতে বললাে, আপনার আর কিছু লাগবে?
না, ধন্যবাদ।' মেয়েটি সৌজন্য প্রকাশ করে বলল, আমার আর যা লাগবে তা তুমি দিতে রাজি হবে কিনা তাই ভাবছি। আরাে অবাক হলাে চেঙ্গিস। জিজ্ঞেস করলাে, বলুন, কি লাগবে আপনার?',
‘দেখতেই পাচ্ছাে আমি একা। তােমার সাথে একটু কথা বললে অসুবিধা আছে?
বিনয়ের সাথে বললাে চেঙ্গিস, না, না। বলুন কি জানতে চান?”
তােমার দেশ কোথায়?”
সে ইউরােপের একটি অঞ্চলের নাম বললাে।
‘এখানে কতদিন আছাে?'
বলতে পারেন শিশুকাল থেকেই। আমার বাবা ছিলেন সম্রাট রিমাণ্ডের রাজ পরিবারের কর্মচারী । এখন আমি তার সামান্য গােলাম।
‘বাহ! তাহলে তাে দেখছি, তুমি রাজ পরিবারেরই একজন! অন্তত এ রাজ পরিবারের যত কাহিনী তােমার জানা আছে, অনেকেরই তা নেই।'
‘হ্যাঁ, বলতে পারেন এ আমার পরম সৌভাগ্য। বিনয়ের সাথে বলল চেঙ্গিস।
তােমার এ সৌভাগ্যে সামান্য ভাগ বসানাের লােভ হচ্ছে। আমি কি তােমার কাজের ক্ষতি করছি?
না, না। আপনাদের সেবা করাই তাে আমার কাজ! বলুন, কি বলবেন।'
তাহলে তুমি আরাে কিছুক্ষণ আমাকে সঙ্গ দাও। মেয়েটি তার পিয়ালা চেঙ্গিসের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললাে, নাও, তুমিও সামান্য পান করে নাও।'
না, না। একি বলছেন আপনি! আমি আপনার সামান্য গােলাম মাত্র! তার কণ্ঠ থেকে অকৃত্রিম বিস্ময় ও বিনয় ঝরে পড়ল, ‘আপনি আমার মুনীবের মেহমান! একি করে সম্ভব!
রাখাে তাে ওসব কথা! এখানে তােমার সংকোচের কিছু নেই। আমি নিজেই তাে তােমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। মেয়েটির কণ্ঠে অন্তরঙ্গতা। সে পাত্রটি বাড়িয়ে ধরে বলল, ‘এই মুহূর্তে কিছুক্ষণের জন্য না হয় তুমি সম্রাট হয়ে যাও, আর আমাকে তােমার দাসী মনে করাে।' মেয়েটি তার হাত ধরে তৃষ্ণার্ত হাসি হেসে বলল, আমার চোখে তুমি এখন পরদেশী এক শাহজাদা! আর আমি এখানকার শাহজাদী! কই, নাও! ধরাে তাে এটা! আমার মেহমানকে আমি কিছু খেতে দেবাে না!
চেঙ্গিস বিব্রত কণ্ঠে প্রশ্ন করলাে, আপনি এখানে একা কেন? আপনার সঙ্গী কোথায়?
‘আমার সঙ্গী আমার পাশেই আছে। মেয়েটি রহস্যময় কন্ঠে বলল, আমার মন যারে চায় তাকেই তাে সঙ্গী করা উচিত, কি বলাে? যাদের আমি ঘৃণা করি তাদের সাথে কেমন করে হেসে খেলে বেড়াই। মেয়েটি উত্তর দিল। আমার যাকে ভাল লাগছে, আমি তাকেই পাশে ডেকে নিয়েছি। তুমি তাে আমার হাত থেকে পিয়ালা গ্রহণ করলে না?'
যদি কেউ দেখতে পায়, তবে আমাকে শুলে চড়াবে।' চেঙ্গিস ভয়ার্ত স্বরে বললাে।
কিন্তু যদি তুমি আমার নিবেদন প্রত্যাখ্যান করাে, তবে আমিই তােমাকে শুলে চড়াবাে। মেয়েটি হেসে বললাে, ‘পাগল! তােমাকে আমার ভাল লেগেছে বলেই না তােমাকে এখানে ডেকে এনেছি।'
মেয়েটি উঠে দাঁড়ালাে এবং তার কাঁধে হাত রেখে কানে কানে বললাে, তুমি আমাকে নিরাশ করাে না যুবক। তখনও তার ঠোঁটের কোণে লেগেছিল বন মােহিনী হাসি।
কিন্তু আমি তাে এখন মদ পান করতে পারবাে না। এখন যে আমি ডিউটিতে আছি!' চেঙ্গিস আড়ষ্ট কণ্ঠে বললাে।
আচ্ছ, নাই বা করলে মদ পান। মেয়েটি তার কাঁধ থেকে হাত নামিয়ে মুখােমুখি দাঁড়িয়ে বললাে, কিন্তু আমি যখন ও যেখানেই ডাকি, সেখানে তােমাকে হাজির হতে হবে।
রাশেদ চেঙ্গিস এ প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল। সে ধারণা করলাে, এই মেয়ে কোন বৃদ্ধ জেনারেলের স্ত্রী হতে পারে। আবার এমনও হতে পারে, তার স্বামী অন্য কোন নারী নিয়ে মেতে
)আছে। তারই প্রতিশােধ নেয়ার জন্য এ মেয়ে তাকে বাছাই করেছে।
সে ছিল এক বিচক্ষণ গােয়েন্দা। তাই মেয়েটির আচরণে সে সামান্য বিচলিতও হলাে না। এমন সুন্দরী ও অভিজাত যুবতী তার বন্ধুত্বের আকাংখা করেছে, এটা তার কাছে কোন নতুন ঘটনা নয়। চেঙ্গিস এতটাই সুদর্শন ও আকর্ষণীয় দেহ সৌষ্ঠবের অধিকারী যে, এর আগেও তাঁকে এমন বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে।
খৃস্টান সম্রাট ও অফিসারদের মাহফিলগুলাে সুন্দরী ও আকর্ষণীয় মেয়েরাই সরগরম করে রাখে। এর আগেও একাধিক মেয়ে চেঙ্গিসের সাথে সম্পর্ক করতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু চেঙ্গিস তার কর্তব্যের খাতিরে তাদের এড়িয়ে গেছে। সুলতান আইয়ুবী তাকে যে দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন, সে দায়িত্ব পালনে কোন ত্রুটি ঘটতে পারে এমন কোন কিছুর সাথে সে নিজেকে জড়াতে চায় না।
আলী বিন সুফিয়ান তাকে ট্রেনিং দেয়ার সময় তার মগজে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন এই চিন্তা, নিজের কর্তব্যকেই সব সময় প্রাধান্য দেবে। কখনাে এমন কিছুর সাথে নিজেকে জড়াবে না, যাতে দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। মেয়ে মানুষের কাছ থেকে সাবধান থাকবে। কখনাে আপন বিবি ছাড়া অন্য কারাে দিকে নজর দেবে না। মনে রাখবে, দুশমন তােমাদের ঘায়েল করার জন্য যে অস্ত্রটি সবচে বেশী ব্যবহার করবে তার নাম মেয়ে। যারা অন্য নারীর প্রেমে পড়ে যায় বা নেশা ও বিলাসিতায় আকৃষ্ট হয়ে পড়ে; আপন দায়িত্ববােধের কথা তাদের স্মরণ থাকে না। তারা ধীরে ধীরে দায়িত্বহীন হয়ে যায়। তার মন-মগজে মদ ও নারীর মােহ এমন বিষের ন্যায় কাজ করে যে, সে ধীরে ধীরে তার ঈমানও হারিয়ে ফেলে। অতএব নেশা ও নারী থেকে সব সময় দূরে থাকবে।
সম্রাট রিমাণ্ডের রাজপ্রাসাদে এসে সে দেখেছে, রাজার খেয়াল কাকে বলে। এখানে সম্রাট যখন যাকে ইচ্ছা চাকরী প্রদান করে এবং যাকে ইচ্ছা চাকরী থেকে বরখাস্ত করে। রাজার ক্ষমতা ও ব্যক্তিত্ব যাদুর মত। এখানে এমন কেউ নেই, যে তাকে প্রশ্ন করতে পারে।
এখানে এসে সে আর যে জিনিসটি দেখে অবাক হয়েছে, তাহলাে খৃস্টানদের চরিত্র। এদের কাছে চরিত্র বলে কিছু নেই। নির্লজ্জতা ও বেহায়াপনাকে তারা গর্বের বিষয় বলে মনে করে। তাই এখানকার মেয়েরা এমন খােলামেলা প্রেম নিবেদন করলেও সে আর অবাক হয় না।
একজন গােয়েন্দা হিসাবে সে তখন চিন্তা করছিল, মেয়েটির কাছ থেকে তার কিছু পাওয়ার আছে কিনা। সে চিন্তা করে দেখল, এই মেয়েকে ব্যবহার করে সে এমন কিছু তথ্য পেতে পারে, যা অন্যভাবে পাওয়ার উপায় নেই। মেয়েটি যখন তাকে বলছিল, আমি যখন ও যেখানেই ডাকি সেখানে তােমাকে হাজির হতে হবে' তার এ বক্তব্যে ধমক বা আদেশের সুর ছিল না বরং ছিল আন্তরিকতা ও বন্ধুত্বের আবেদন। চেঙ্গিস এটা ভাল করে বুঝেছিল বলেই সেও মেয়েটির হাসির উত্তরে হাসি মুখেই সে প্রস্তাব কবুল করে নিয়েছিল। হাসির বিনিময়ে হাসি দিয়েই সে তার শিকারকে ফাঁদে ফেলতে চেষ্টা করেছিল।
‘এখন আমাকে যাওয়ার অনুমতি দিন। চেঙ্গিস বললাে, ‘আপনি বরং মেহমানদের কাছে চলে যান।
‘অনুমতি দেবাে, তার আগে বলাে, তুমি ঠিক ঠিক আসবে তাে?'
‘আসবাে। সময় পেলেই আমি আপনার ডাকে সাড়া দেবাে, কথা দিলাম। চেঙ্গিস বললাে, কিন্তু আমি তে আপনার ঠিকানা জানি না। আপনি কার স্ত্রী?”
‘স্ত্রী নই, আশ্রিতা!' মেয়েটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে এক সেনা অফিসারের নাম উল্লেখ করে বললাে, হতভাগার কাছে অঢেল ধন-সম্পদ আছে। আর এই সম্পদের জোরে সে আমার মত মেয়েদের কিনে নিয়ে তার হেরেমের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করছে। আমি একা নই, আরাে বেশ কিছু মেয়ে আছে তার, যাদের সাথে সে দাসী-বাদীর মত ব্যবহার করে। কিন্তু কে যে তার মনের মানুষ তা আমরা কেউ জানি না।'
‘এত লােভ না করে ওখান থেকে চলে এলেই পারেন!
না, তা আমরা পারি না। সে আমাকে মুক্তি দিতে নারাজ। বলে, তােমার কোন সাধ-আহলাদ আমি অপূর্ণ রাখবাে না। তাহলে কেন আমাকে ছেড়ে চলে যাবে?' সেই গর্দভ সম্পদের দম্ভটুকুই চেনে, নারীর মন চেনার সময় কোথায় তার!
যখন বুঝেছি এ লােকের হৃদয়ে দয়া, মায়া, প্রেম বলতে কিছু নেই তখন থেকেই তাকে আমি ঘৃণা করতে শুরু করেছি। সেই ঘৃণা এখন আমার মনের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে আছে। এই চাপ সহ্য করা আমার পক্ষে অসহনীয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু যখন তােমাকে দেখলাম, কেন জানি না, তােমাকে আমার ভাল লেগে গেল। বিশ্বাস করাে, তুমি আমার কাছে প্রথম পুরুষ, যাকে আমি অন্তর দিয়ে বেছে নিয়েছি।
আমি তােমার কাছ থেকে শারিরীক বা দৈহিক কোন তৃপ্তির পিয়াসী নই। পিপাসা আমার অন্তরের, পিপাসা আমার ভালবাসা। তােমাকে দেখে চোখের পানিতে আমি সে পিপাসা নিবারণ করতে পারবাে। দোহাই লাগে, তুমি আমার দৃষ্টির আড়ালে যেও না। আমাকে পাষাণপুরীতে ফেলে রেখে দূরে কোথাও পালিয়ে যেও না। যদি এমন করাে তবে আমার ওপর জুলুম করা হবে। আমি সব সইতে পারবাে, কিন্তু এ অত্যাচার সইতে পারবাে না। এখন যাও, তােমার অনেক সময় আমি নিয়ে ফেলেছি, আর নয়। কাল রাতে আমি নিজেই তােমাকে খুঁজে নেবাে, কষ্ট করে তােমাকে আমার কাছে যেতে হবে না।
যে সময় রাশেদ চেঙ্গিস বাগানে মেয়েটির সাথে কথা বলছিল, ভিক্টর তখন মেহমানদের মধ্যে ঘােরাফেরা করছিল। সে মেহমানদের আপ্যায়ন করছিল ঠিকই কিন্তু তার কান পড়েছিল ক্রুসেড লিডারদের আলােচনায়। তারা আলােচনা করছিল, কোন দিকে অভিযান চালালে সুবিধা হবে। কোথায় আক্রমণ করলে আইয়ুবী সহজে ধরাশায়ী হবে, এইসব।
এসব আলােচনা থেকে সে তার প্রয়ােজনীয় কথা মনে মনে টুকে নিচ্ছিল। কিন্তু তখনও আলােচনা ও পরামর্শ চলছে। সেদিকে কান পেতে দ্রুত হাতে কাজ করছে ভিক্টর।
রাশেদ চেঙ্গিস মেয়েটির কাছ থেকে ছুটি পেয়ে মেহমানদের মধ্যে এসে পড়লাে। ঘুরতে ঘুরতে সে সম্রাট রিনাল্টেরর পাশে চলে এলাে। রিনাল্ট তখন তার সাথীদের বলছে, তােমরা কোন চিন্তা করাে না। এবার আমি এত বেশী সামরিক শক্তি নিয়ে এসেছি, আমার তাে মনে হয়, আমি একাই আইয়ুবীকে ধরাশায়ী করে ফেলতে পারবাে। ভাবতে পারাে, আমার সাথে আছে আড়াইশাে নাইট। যাদের প্রত্যেকের আণ্ডারে আছে আলাদা বাহিনী। এক নাইটকে পরাজিত করলে আরেক নাইট এগিয়ে যাবে তার বাহিনী নিয়ে। আইয়ুবী একা কয়টা বাহিনীর সাথে মােকাবেলা করতে পারবে?
এভাবে রিনাল্ট শক্তির বড়াই করছিল আর বড় ধরনের সফলতা ছিনিয়ে এনে দেবে বলে দাবী করছিল সঙ্গীদের কাছে।
রাত কেটে গেল। পরের দিন চেঙ্গিসের কাছে একটি লােক এলাে। লােকটি তার দলেরই এক গােয়েন্দা। সে তাকে বলল, মধ্য রাতের পর তুমি ইমাম সাহেবের কাছে চলে এসাে। সেখানে জরুরী আলােচনা আছে।
দিন কেটে গেল। রাত হলাে। চেঙ্গিস ও ভিক্টর সম্রাট রিমাণ্ডের ভােজ সভায় তাদের ডিউটিতে চলে গেল । অনেক রাতে ডিউটি শেষ হলে ওরা ওখান থেকে ওদের কামরায় ফিরে এলাে।
চেঙ্গিস এখনও ভিক্টরকে বলেনি, একটি মেয়ে তার সঙ্গে অন্তরঙ্গ হতে চাচ্ছে। ডিউটি থেকে ফিরেই সে ভিক্টরকে বললাে, ‘পােষাক পাল্টে আমি ইমাম সাহেবের কাছে যাচ্ছি। ভিক্টর বললাে, ঠিক আছে যাও। সে তাকে কিছু তথ্য দিয়ে বললাে, এগুলাে ইমাম সাহেবকে বলাে।
রাশেদ চেঙ্গিস তার পােষাক পরিবর্তন করলাে। কৃত্রিম দাড়ি লাগালাে মুখে। মাথায় পাগড়ী পরে চেহারা লুকাল। তারপর কামরা থেকে বেরিয়ে অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে গেল।
তাদের বাসা থেকে কিছু দূর এগিয়ে গেলেই একটি পার্ক। পার্কের ভেতর দিয়ে মসজিদে যাওয়ার সংক্ষিপ্ত রাস্তা আছে। সেই রাস্তা ধরে হাঁটা ধরল রাশেদ চেঙ্গিস।
বাগানটি হরেক রকম ফুল গাছে ভরা। নিচে সবুজ ঘাসের জাজিম। তার মাঝখান দিয়ে পায়ে চলা পথ। ফুল গাছগুলােতে ফুটে আছে হরেক রঙের ফুল। লাল, নীল, হলুদ। গাছে গাছে সবুজ সতেজ পাতা। কিন্তু এখন এসব কিছুই দেখার উপায় নেই। শুধু দেখা যায় ছােট বড় কালাে ঝােপগুলাে মাথা মুড়ে বসে আছে।
পার্কের আশেপাশে কোন জনবসতি নেই। মানুষের নিত্যদিনের সান্ধ্য কোলাহল থেমে গেছে অনেক আগেই।
এখন সবকিছুই কেমন সুনসান, নিঝুম, নিরব।
বাগানের মধ্য দিয়ে হাঁটছে রাশেদ চেঙ্গিস। এমন সময় এক গাছের আড়াল থেকে একটি ছায়া বের হয়ে তার দিকে অগ্রসর হতে লাগলাে। চেঙ্গিস লােকটিকে দেখতে পেয়েই তার কৃত্রিম দাড়ি খুলে ফেলল। সে ভাবল, হয়তাে কোন পরিচিত পাহারাদার ডিউটিতে আছে, তার গলার স্বর চিনে ফেলতে পারে। এ অবস্থায় দাড়ি দেখলে লােকটি বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে। তার মনে সন্দেহ উঁকি দেবে। তখন সে যদি চ্যালেঞ্জ করে বসে তাহলে বিপদ আছে।
সে তার চলার গতি ধীর করে দিয়ে আস্তে ধীরে পা ফেলে চলতে লাগলাে।
ছায়াটি একেবারে তার কাছে এসে বলে উঠল, 'আমি তোমাকে বলিনি, আমি নিজেই তােমাকে খুঁজে নেবাে। কি, ঠিক বলিনি?’ কণ্ঠটি একটি নারীর।
কণ্ঠটি চিনে ফেলল রাশেদ চেঙ্গিস। এই তাে সে মেয়ে, যে তার সাথে অন্তরঙ্গ হওয়ার চেষ্টা করেছিল।
মহলের ব্যস্ততা মাথাটা একেবারে খারাপ করে দিয়েছে। চেঙ্গিস বললাে, তাই একটু হাওয়া খাওয়ার জন্য এদিকে চলে এলাম।
‘আমি তােমার কামরাতেই যাচ্ছিলাম। মেয়েটি বললাে, ‘যাক, ভালই হলাে। তােমাকে পথেই পেয়ে গেলাম। জায়গাটা মন্দ নয়, কি বলাে? ফুলের সৌন্দর্য দেখতে না পারলেও ফুলের সুবাস তাে পাবে!
হাঁ, তা ঠিক।' হাঁটতে হাঁটতেই বললাে চেঙ্গিস।
‘বসবে, না কি চলতেই থাকবে? মেয়েটি বলে উঠল, 'আমি কিন্তু সুরাহী ও পিয়ালা সঙ্গে নিয়ে এসেছি। হাসি মুখে বলল মেয়েটি।
রাশেদ চেঙ্গিস দাঁড়ালাে। একবার ভাবলাে, সে কোথায় থাকে জিজ্ঞেস করে। কিন্তু পরক্ষণেই বাতিল করে দিল চিন্তাটা। বলল, তুমি যাঁর আশ্রিতা তিনি তােমাকে খুঁজবেন না?
কি যে বলাে! আমাকে খোঁজার মত সময় কি তার আছে! নতুন ফুলের মধু ছাড়া তার রাত কাটে না। সে আছে তার মত, আমি আমার মত। ওর কথা মনে করিয়ে দিয়ে তুমি এ মধুর সময়টা মাটি করাে নাতাে!'
রাশেদ বুঝে নিল, এই মেয়ে এখন আবেগে বিভাের হয়ে আছে। বড় বিপদের ঝুঁকি নিয়ে সামনে চলছে মেয়েটা, কিন্তু কোন বিপদকেই পরােয়া করার অবস্থা নেই তার। চেষ্টা করলে তার কাছ থেকে হয়তাে কিছু গােপন তথ্য আদায় করা যাবে। চেঙ্গিস তাকে বললাে, আর ভাবছাে কেন, শীঘ্রই তাে তুমি তােমার প্রভুর কাছ থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে।
এটা কি করে সম্ভব! মেয়েটি অবাক হয়ে বলল।
‘কেন, তুমিই বললে সে লােক সেনাবাহিনীর অফিসার। তারা তাে অচিরেই যুদ্ধের ময়দানে যাত্রা করবে।
হ্যাঁ, সে লােক বিলডন সাহেবের এক জেনারেল। মেয়েটি উত্তরে বললাে, কিন্তু সে আমাকে এবং অন্যান্য মেয়েদেরও সঙ্গে নিয়ে যাবে। ফলে তুমি যা ভাবছে তেমনটি আর হচ্ছে না। তার হাত থেকে মুক্তি পাওয়া সােজা ব্যাপার নয়।
কবে তােমরা যাত্রা করছে, আর কোথায় যাবে?
‘তা জানি না। তবে সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে খুব তাড়াতাড়িই অভিযান শুরু হবে বলে মনে হয়।
সালাহউদ্দিন আইয়ুবী এখন কোথায়?' চেঙ্গিস প্রশ্ন করলাে। ‘সেটা আমি কি করে বলব?' মেয়েটি উত্তরে বললাে, তবে তুমি যদি জানতে চাও, খোঁজ নিয়ে তােমাকে জানাতে পারবাে।'
রাশেদ চেঙ্গিস তাকে আরও কিছু প্রশ্ন করলাে। যে সব প্রশ্নের উত্তর মেয়েটির জানা ছিল তা সে খুলে বললাে। আর যা জানে না সেগুলাে জেনে এসে বলবে বলে ওয়াদা করলাে। মেয়েটি বললাে, “কে যুদ্ধ করলাে, কে মরলাে, কে বাঁচলাে তা নিয়ে তােমার কি?”
“দেখাে, যুদ্ধ যে করে সেই শুধু মরে না, যুদ্ধ সবার জন্যই দুঃখ বয়ে নিয়ে আসে।'
মেয়েটি আবেগের স্বরে বললাে, আমাকে সে যুদ্ধের ময়দানে যেতে বললেও আমি যাব না। আমি তাে তার স্ত্রী নই। আমি আমার মালিকের কেনা দাসীও নই, রক্ষিতা মাত্র। সুলতান আইয়ুবী এখন আর আমার কি ক্ষতি করবে? আমার যারা আপন, যারা আমার ধর্মের ভাই, তারাই আমাকে এমনভাবে লাঞ্ছিত করেছে, যা আমি জীবনেও ভুলতে পারবাে না। আমার মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয়, পবিত্র কুশের নাম ভাঙিয়ে যারা আমার ওপর এ নির্যাতন করেছে, তাদেরকে আমি বিষ দিয়ে হত্যা করি।
তারা উভয়েই বাগানের এক বেঞ্চিতে গিয়ে বসলাে। মেয়েটি দু’জনের মাঝখানে পিয়ালা রেখে তাতে মদ ঢেলে একটি পিয়ালা চেঙ্গিসের দিকে এগিয়ে ধরলাে। বললাে, এমন নির্জন নিঝুম রাত আর বাগানের এই পরিবেশ, এ তাে যুদ্ধের আলাপের জন্য নয়, ভালবাসার কথা বলার জন্য। নাও, একটু পান করাে। ভুলে যাও পৃথিবীর সব দ্বন্দ্ব কোলাহল। এসাে হৃদয়ের ভায়ােলিনে ভালবাসার গান শুনি।'
চেঙ্গিস মহা বিপদে পড়ে গেলাে। সে আজ দেড় বছর যাবত এই মদের কারবারের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে। নিজ হাতে কত মেহমানকে মদ পান করিয়েছে, কিন্তু সে নিজে কখনও মদ স্পর্শ করেনি। এমন পাপময় পরিবেশে মাঝে মধ্যে যেখানে বিরাট আকর্ষণীয় দাওয়াত এসে যায়, সেখানেও সে নিজেকে সংযত রেখেছে। ঈমানকে নষ্ট হতে দেয়নি। কিন্তু এখন এমন এক নারীর পাল্লায় পড়ে গেল, যার মাধ্যমে সে তার দায়িত্ব পালনকে আরও সহজ করতে চায়। কিন্তু মুশকিল হলাে, এই নারী তাকে মদ পান করতে বলছে। ভয় হচ্ছে, যদি এই আবেগময়ী নারীর ভালবাসা প্রত্যাখ্যান করে তবে সে হাত ছাড়া হয়ে যেতে পারে।
একদিকে ঈমানের দাবী, অন্যদিকে দায়িত্ব পালনের হাতিয়ার হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয়, কোনটা রাখবে সে? ব্যাপারটা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ে গেল চেঙ্গিস। কর্তব্যের খাতিরে দু’এক ঢােক পান করবে, নাকি এমন দামী হাতিয়ার
(চলবে)
রাজকীয় উর্দি পরে দু’জনই মেহমানদের সামনে ঘােরাফেরা করছিল। এটা সেটা এগিয়ে দিচ্ছিল তাদের। মেহমানদের অনেকেই এদের আগে থেকে চেনে। ওরা মেহমানদের বিশ্বাসভাজন তাে বটেই, কারাে কারাে প্রিয়ভাজনও।
ক্রুসেডদের গােয়েন্দা বাহিনীর প্রধান হরমন। তিনিই অনেক যাচাই-বাছাই করে ওদেরকে এ চাকরীতে নিয়ােগ দিয়েছেন। কিন্তু আসলে এরা দুজনই ছিল সুলতান আইয়ুবীর গােয়েন্দা। গােয়েন্দা হিসাবে তারা দু'জনই ছিল চৌকস। অসম্ভব বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ না হলে হরমনের মত উস্তাদ গােয়েন্দার সন্ধানী দৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়ে তাদের পক্ষে এখানে টিকে থাকা সম্ভব ছিল না।
দেখতে শুনতেও দু'জনই ছিল স্মার্ট। এখানে তাদের চাকরী হওয়ার এটাও একটা কারণ যে, তাদের উভয়েরই চেহারা সুন্দর, দেহ কাঠামাে সুঠাম, সবল ও পৌরুষদীপ্ত। রাজকীয় মেহমানখানায় কাজ করার উপযুক্তই বটে।
ভিক্টর তার প্রকৃত নামেই সবার কাছে পরিচিত। কারণ সে আসলেই খৃস্টান। রাশেদ চেঙ্গিস ছিল তুরস্কের নাগরিক, মুসলমান। খৃস্টানদের কাছে সে তার নিজের দেয়া খৃস্টান ছদ্মনামে পরিচিতি ছিল। এ জন্য কোন খৃস্টানই তার আসল নাম জানতাে না এবং সে যে মুসলমান তাও জানতাে না। গভীর রাত পর্যন্ত চলল সম্মেলনের কাজ। আহারাদি, মদপান ও আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে রাত পার করে দিল সম্রাটগণ। বিশ্বস্ত খাদেমের মতই হাসি মুখে তারা এই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অতিথিদের সেবা করে যাচ্ছিল।
মাঝ রাতের পর মিটিং শেষ হলাে। তখন তারা ছুটি পেল নিজ নিজ কামরায় যাওয়ার।
‘আমরা দুজন একই সাথে চাকরী ও ডিউটিতে অনুপস্থিত থাকতে পারি না। ভিক্টর বললাে, এ সংবাদ অন্য কাউকে দিয়ে কায়রাে পাঠাতে হবে। এমন বিশ্বস্ত লােক কাকে পাওয়া যায় বলতাে?
ইমাম সাহেবের সাথে কথা বলতে হবে। রাশেদ চেঙ্গিস বললাে, তিনি ভাল বলতে পারবেন, কে দ্রুত ও বিশ্বস্ততার সাথে এ সংবাদ কায়রাে পৌছাতে পারবে। তবে যেই যাক, তাকে বিশ্বস্ত হতে হবে। সে আরাে বলল, আমি আজই এ সংবাদ দিয়ে কাউকে পাঠানাের দরকার মনে করছি না। এখনাে খৃস্টান সম্রাটরা যুদ্ধের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেনি। যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিকল্পনা ও পরিপূর্ণ তথ্য নিয়েই কায়রােতে লােক পাঠানাে দরকার। অসম্পূর্ণ সংবাদ দিয়ে সুলতান আইয়ুবীকে হয়রান পেরেশান করার কোন মানে নেই।'
‘না, আমি এটুকুকেই অনেক বড় খবর মনে করি। ইমাম সাহেবকে বলা দরকার, ক্রুসেড বাহিনী বিশাল শক্তি নিয়ে আক্রমণের পরিকল্পনা করেছে। যাতে তিনি এ খবর কায়রাে পৌঁছে দিতে পারেন। ভিক্টর বললাে, সুলতান আইয়ুবী এতে করে প্রস্তুতি নেয়ার সুযােগ পাবেন। এখনাে যেসব দিকে তাঁর দুর্বলতা রয়েছে দ্রুত তা সংশােধন করে নিতে পারবেন। অভাবগুলাে দ্রুত পূরণের জন্য সচেষ্ট হতে পারবেন। পরে যখন বিস্তারিত পরিকল্পনা পাবাে তখন সে খবরও পাঠাবাে।
‘কিন্তু বার বার যাতায়াত করলে হরমনের গুপ্তচরদের নজরে পড়ে যাওয়ার ভয় আছে!''
‘আর এমন যদি হয়, কোন খবর পাঠানোর আগেই আমরা ধরা পড়ে গেলাম!'
‘কেন, তােমার কি নিজের প্রতি আস্থা নেই?
‘নিজের প্রতি আস্থা আমার ঠিকই আছে, কিন্তু তােমার প্রতি নেই। শােনো!” ভিক্টর চেঙ্গিসকে বললাে, “যে সময় মেহমানরা আক্রমণের কথা বলছিল, তখন আমি তােমাকে লক্ষ্য করে দেখেছি। তুমি মদের পিয়ালা সম্রাট রিমাণ্ডের সামনে সাজিয়ে, রাখতে রাখতে একবার থেমে গিয়েছিলে। তাতে স্পষ্ট বােঝা যাচ্ছিল, তুমি তার কথার দিকে খেয়াল করছে। আমি তােমার চেহারা দেখছিলাম। খবরটি শুনে তােমার চেহারায় প্রফুল্ল ভাব ফুটে উঠেছিল। আমি জানতাম, এত দামী তথ্য পাওয়ার পর আতংক বা খুশীর ভাব ফুটে উঠাই স্বাভাবিক। কিন্তু তােমার ভুলে গেলে চলবে না, হরমনও এখানে উপস্থিত আছেন। হরমন আলী বিন সুফিয়ানের সম পর্যায়ের গােয়েন্দা। আমি তােমাকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে হরমনের দিকেও তাকিয়েছিলাম। আমার তখন আশংকা হলাে, তিনি তােমাকে লক্ষ্য করছেন। তাই তাে বলছি, ভাই, আমাদের নিঃশ্বাসের কোন বিশ্বাস নেই।'
হরমনের কাছে আমি কোন অপরিচিত লােক নই।' রাশেদ চেঙ্গিস বললাে, আমার সম্পর্কে তিনি সন্দেহ অনেক আগেই শেষ করেছেন। এখন ভয় পাওয়ার কিছু নেই।'
ভয় করার কথা বলছি না, সাবধান হওয়ার কথা বলছি। ভিক্টর বললাে, আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, আমরা শত্রুর পেটের মধ্যে বাস করছি।'
তা ঠিক। কিন্তু ভাই, যাই বলাে, আমিও তাে একজন মানুষ। মানবিক ত্রুটিবিচ্যুতির উর্ধে কি করে উঠি!
সে জন্যই তাে তােমাকে সাবধান করছি। তুমি তাে জানাে না আজ হরমনের ওপর কি নির্দেশ জারী করা হয়েছে। এখন থেকে প্রতিটি মানুষকেই সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখার জন্য বলা হয়েছে তাকে। আর তাকে এই ক্ষমতাও দেয়া হয়েছে, এ ক্ষেত্রে তিনি যা ভাল মনে করবেন, সেটাই আইন। তিনি কাউকে সন্দেহ করলে এবং সেই সন্দেহের বশে কাউকে খুন করলেও কেউ তার কাছে কোন কৈফিয়ত তলব করতে পারবে না।
বলাে কি! এ ব্যাপারে তার হাতে সর্বময় ক্ষমতা দিয়ে দেয়া হয়েছে?'
হ্যাঁ, শােন, এসব কথা এখন থাক। আগে কাজের কথায় আসি। তুমি এখনি সােজা মসজিদে চলে যাও। সবাই এখন ঘুমিয়ে আছে। এই সুযােগে আজকের আলােচনা ইমাম সাহেবকে বিস্তারিত জানিয়ে এসাে। যদি কায়রােতে যাওয়ার মত লােক পাওয়া যায়, তবে যেন দ্রুত তাকে আলী বিন সুফিয়ানের কাছে পাঠিয়ে দেয়। আর যদি ওদিক থেকে কেউ এসে থাকে, তবে আমার সাথে দেখা না করে যেন ফিরে না যায়।'
শহরের এক মসজিদের ইমাম সুলতান আইয়ুবীর গােপন সংবাদ আদান-প্রদানের মাধ্যমে পরিণত হয়েছেন। সেই সুবাদে মসজিদটিও মুসলিম গােয়েন্দাদের গােপন আড্ডায় পরিণত হয়েছে। আলী বিন সুফিয়ানের কোন গােয়েন্দা গােপন কোন খবর পেলে মসজিদে গিয়ে ইমাম সাহেবকে সে তথ্য দিয়ে আসে। ইমাম সাহেব আবার সে খবর অন্য গােয়েন্দা মারফত জায়গা মত পৌঁছে দেন।
ভিক্টর কখনও মসজিদে যায় না। সে বলে, আমি মুসলমানও না, নামাজ-কালামও জানি না। আর মসজিদের ইজ্জত-সম্মান বিষয়েও কোন জ্ঞান নেই আমার। আমি কেন মসজিদে যাবাে?'
তার এ কথা যেমন খাঁটি, তারচে বেশী খাঁটি, সে এক হুশিয়ার গােয়েন্দা। অযথা মসজিদে যাওয়ার ঝুঁকি সে কেন নিতে যাবে! মসজিদে মুসল্লী বেশে ক্রুসেড গােয়েন্দা নেই, এমন তাে নয়। অনেক মুসল্লীই আছে, যারা পাকা গােয়েন্দা। তারা খৃস্টানদের চর হিসাবে মুসলমানদের মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। তারা মসজিদের মুসল্লীদের প্রতি কড়া দৃষ্টি রাখে এবং তাদের কথা গভীর মনােযােগ দিয়ে শােনে। এ জন্যই দেখা যায়, আইয়ুবীর প্রতি সামান্য দরদ রাখে এমন বেশীর ভাগ মুসলমানই গ্রেফতার হয়ে যায়।
রাশেদ চেঙ্গিসও দিনের বেলা এবং প্রকাশ্যে কখনাে মসজিদে যায় না। কারণ সে নিজেও খৃস্টান পরিচয়েই সবার কাছে পরিচিত। কোন খৃস্টান মসজিদে গেলে প্রথম দর্শনেই সে সন্দেহভাজনদের তালিকায় পড়ে যাবে। যে লােক খৃস্টান রাজসভায় মদ পরিবেশনের দায়িত্ব পালন করে, মসজিদের তার কি দরকার? এ প্রশ্নের কোন সদুত্তর সে দিতে পারবে
না। তাই যখনি প্রয়ােজন পড়ে, তখন গভীর রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে সে ইমামের সাথে দেখা করতে যায়।
ইমাম সাহেবের কামরা মসজিদের সাথে লাগােয়া । কামরার দরজা মসজিদের বারান্দার দিকে। বারান্দা দিয়ে উঠে দরজায় ধাক্কা দিলে দেখা যাবে, দরজাটি ভেতর থেকে ভেজানাে বা আটকানাে । তখন নিয়ম মাফিক সাংকেতিক টোকা দিতে পারলেই সে দরজা খুলে যাবে।
রাশেদ চেঙ্গিস তার পােষাক পরিবর্তন করলাে। গায়ে জোব্বাও মাথায় পাগড়ী বেঁধে নিল। মুখে কৃত্রিম দাড়িও লাগাল। এরপর কামরা থেকে বেরিয়ে অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে গেল। আদেশ অনুযায়ী তাকে সব সময় ক্লীন সেভ থাকতে হয়। গােপন মিশনে যাওয়ার সময় সে কৃত্রিম দাড়ি লাগিয়ে বের হয়, যাতে কারাে চোখে পড়লেও সহজে ধরা না পড়ে।
একজন পাক্কা হুজুর সেজে রাস্তায় নামে সে। রাজ দরবারের বাইরে তাদের থাকার জন্য নির্দিষ্ট কোয়ার্টার আছে। সেখানেই থাকে সে এবং ভিক্টর। তাই বেরােতে কোন অসুবিধা হয়নি। রাস্তার মােড়ে মােড়ে বাতি জ্বলছে। সে যতটা সম্ভব আলাে এড়িয়ে পথ চলছিল।
রিমাণ্ডের পারিষদ এবং সেনা অফিসার ছাড়াও ওখানে জমায়েত হয়েছিল অনেক মেহমান। তারা বিভিন্ন খৃস্টান সাম্রাজ্যের সম্রাট বা সেনাপতি। সম্রাট রিনাল্ট, তার অনেক নাইট এবং অফিসারও সেখানে উপস্থিত ছিল। আরও ছিল বিভিন্ন রাষ্ট্রের সেনা কর্মকর্তাবৃন্দ।
এইসব সম্মানিত মেহমানদের জন্য পর্যাপ্ত বিনােদনের ব্যবস্থা রেখেছিলেন সম্রাট রিমান্ড। আলাপ-আলােচনা ও যুদ্ধের পরিকল্পনায় যেটুকু সময় ব্যয় হতাে তার বাইরে বাকী সময়টুকু তারা কাটিয়ে দিত আমােদ-স্ফুর্তি ও মাতলামী করে। অধিকাংশ রাত তারা পার করতাে মদ ও মেয়ে নিয়ে। দরবারে ছিল অভিজাত শ্রেণীর পেশাদার নিশিকন্যাদের রমরমা ভাব। উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসাররা মেতে উঠে স্ত্রী বদল খেলায়। ফলে রাতে শহর জুড়ে একটা উৎসব উৎসব
ভাব চলে এলাে।
রাশেদ চেঙ্গিস তার কামরা থেকে বেরিয়ে পথে নেমেই বিপাকে পড়ল। কোথায় সে একটু নিরিবিলিতে পথ চলবে, গােপনে দেখা করবে ইমাম সাহেবের সাথে, তা নয়, পথ ভর্তি লােকজন। পথের পাশে বিভিন্ন দেশের সৈনিকরা তাবু টানিয়ে নিয়েছে। সেই সব তাঁবুতে, এমনকি পথের মধ্যেও অসভ্যপনা চলছিল। বেসামাল মাতাল জোড়া এমন ভাবে পথ চলছে, যেন ওটা ওদের ড্রয়িং রুম।
সে এই সব জুটির দৃষ্টি এড়িয়ে কৌশলে রাস্তা পার হয়ে এলাে। শেষ পর্যন্ত সে বিপদসীমা পার হয়ে শহরের সাধারণ আবাসিক এলাকায় প্রবেশ করলাে। একটু পর গিয়ে হাজির হলাে সেই মসজিদের পাশে।
মসজিদটি এক মুসলিম মহল্লার অভ্যন্তরে। এখানে কোন কোলাহল ছিল না, আশেপাশে কেউ জেগে আছে বলেও মনে হলাে না তার। সে বারান্দা পেরিয়ে ইমাম সাহেবের দরজায় গিয়ে হাজির হলাে। এদিক-ওদিক ভাল ভাবে লক্ষ্য করে কামরায় প্রবেশ করতে যাবে, এমন সময় কারাে আলতাে পায়ের শব্দ শুনতে পেল। থমকে দম আটকে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইল সে। শব্দটি গলি পেরিয়ে মসজিদের মােড়ের কাছে এসে নীরব হয়ে গেল।
রাশেদ চেঙ্গিস অনেকক্ষণ ওখানে দাঁড়িয়ে রইল। আর কোন শব্দ নেই। সে ভাবল, তবে কি এটা মনের ধোকা? নাকি ভুল শুনলাম? সে বারান্দা দিয়ে হেঁটে আবার এসে গলি মুখে উঁকি দিল। না, আশেপাশে কেউ নেই।
রাশেদ চেঙ্গিস ভাবলাে, হয়তাে কোন কুকুরের পদধ্বনি ছিল ওটা। সে তার মনকে শান্ত করে ইমাম সহেবের কামরার দরজায় ধাক্কা দিল। খুলে গেল দরােজা। রাশেদ চেঙ্গিস ভেতরে প্রবেশ করে ইমাম সাহেবকে সব কথা খুলে বলল। ক্রুসেড বাহিনীর অধিকাংশ সৈন্য এখানে জড়াে হয়েছে। চেঙ্গিস বললাে, সবচে বড় দলটি নিয়ে এসেছে সম্রাট রিনাল্ট। ত্রিপলীর সেনাবাহিনী আগে থেকেই এখানে আছে। অন্যান্য সম্রাটরাও তাদের বাহিনী এসে পৌঁছার জন্য অপেক্ষা করছে। কায়রােতে এ সংবাদ তাড়াতাড়ি পাঠানাে দরকার। সৈন্য অভিযানের আগেই এ বার্তা সুলতান আইয়ুবীর কাছে পৌঁছলে তিনি তাদের সম্বর্ধনার উপযুক্ত ব্যবস্থা করতে পারবেন।
‘তুমি খুব গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ নিয়ে এসেছে। আমি এ খবর কায়রাে পাঠাবার ব্যবস্থা করছি। তুমি আর কিছু বলবে? আমরা যদি সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারি, তবে অভিযানের আগেই কমান্ডো হামলা চালিয়ে এই বাহিনীর ব্যাপক ক্ষতি সাধন করা সম্ভব। বিষয়টি আপনি গভীরভাবে ভেবে দেখবেন। আর যদি এটা সম্ভব না হয় তবে তাদেরকে অভিযানের মাঝ পথে বাঁধা দেয়া যেতে পারে।'
‘তােমার কথার অর্থ হচ্ছে, কমান্ডোদের বলতে হবে, তারা যেন শত্রুদের রসদপত্র পথেই জ্বালিয়ে ভস্ম করে দেয়। ইমাম সাহেব বললেন, আমি এ কাজ করাতে পারবাে, কিন্তু করাবো না। তুমি হয়তাে শুনে থাকবে, যে সব অধিকৃত শহরে আমাদের কমান্ডো বাহিনী ক্রুসেড বাহিনীর ক্ষতি সাধন করেছে, সেখানে নিরীহ মুসলমানদের বস্তিগুলাের কি অবর্ণনীয় দুর্দশা হয়েছে। সে এলাকার মুসলমানদের জীবন জাহান্নামের মতই কষ্টদায়ক হয়ে উঠেছে। ক্রুসেড বাহিনী প্রতিটি ঘরে ঘরে গিয়ে অনুসন্ধান করেছে। আমাদের পর্দানশীন নারীদের সম্ভ্রম নষ্ট করেছে। আমাদের যুবতী মেয়েদেরকে ধরে নিয়ে গেছে ওরা। কিশাের ও যুবকদেরকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে। বুড়ােদেরকে বন্দী করে নিয়ে গিয়ে ওদের দিয়ে অমানুষিক পরিশ্রমের কাজ করাচ্ছে।
আমি বিষয়টি সুলতান আইয়ুবীকে জানিয়েছিলাম। উত্তরে তিনি বলেছেন, মুসলমান নাগরিকদের জান ও মালের ক্ষতি হতে পারে এমন ভয় থাকলে সেই শহরে কমান্ডো অভিযান চালানাে যাবে না। শত্রুদের খাদ্যসামগ্রী তাদের বাহিনীর সাথে আসতে থাকুক। সময়মত সেগুলাের ব্যবস্থা আমি করবাে।'
আমি আরাে
(চলবে)বিস্তারিত রিপোের্ট আপনাকে দু'চার দিনের মধ্যেই দিচ্ছি।' চেঙ্গিস বললাে, আপনি এখন আরও বেশী সাবধান থাকবেন। এখানকার গােয়েন্দা সংস্থা খুব বেশী তৎপর হয়ে উঠেছে। তারা এখন পশু-পাখীকেও সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছে।
“ঠিক আছে, এ নিয়ে ভেবাে না। তুমিও সাবধানে থেকো। ইমাম সাহেব বললেন, আগামী কাল ভােরেই আমি কাউকে কায়রাে পাঠিয়ে দেবাে।'
রাশেদ চেঙ্গিস মসজিদ থেকে বেরিয়ে এলাে। এবার সে আর চোরের মত লুকিয়ে নয়, প্রকাশ্যেই গলি পথ ধরে হাঁটতে লাগল।
সে যেই রাস্তার মােড় ঘুরলাে, তখন আবারও কারাে পায়ের চাপা শব্দ শুনতে পেল। সে পিছন ফিরে তাকালাে, অন্ধকার গলিপথে কাউকে দেখতে পেল না। তবে এবারের শব্দটা এত স্পষ্ট ছিল যে, এটা আর অমূলক ধারণা রইল না, কেউ তাকে অনুসরণ করছে, এই সন্দেহ তার দৃঢ় বিশ্বাসে পরিণত হলো। সে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। তারপর পিছন ফিরে আবার গলিপথে ঢুকে বেশ কিছু দূর অগ্রসর হলাে। কিন্তু না, কাউকেই দেখা গেল না।
সে আবার ফিরতি পথ ধরলাে এবং দ্রুত হেঁটে তার ঠিকানায় পৌঁছে গেল। কামরায় পৌঁছে সে তার কৃত্রিম দাড়ি খুলে পুরাতন কাপড়ের বাণ্ডিলে তা লুকিয়ে রাখলাে। তারপর সে তার পােষাক পাল্টাল, যেমন পােষক সাধারণত খৃস্টানরা পরিধান করে। এখন আর কেউ তাকে সন্দেহ করতে পারবে না।
ভিক্টর ও চেঙ্গিস চেষ্টা করছিল, ক্রুসেড বাহিনী কোথায় আক্রমণ চালাবে এবং তাদের অভিযানের ধরণ কি হবে তা জানার জন্য।
ত্রিপলীতে সেনা সমাবেশ বেড়েই চলছিল। গােয়েন্দাদের আনাগােনা এবং ছুটাছুটিও বেড়ে গিয়েছিল। এই দুই গােয়েন্দা চোখ কান খােলা রেখে প্রত্যেকের গতিবিধি জানার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
সম্রাট রিমান্ডের দায়িত্ব ছিল মেহমানদের আতিথেয়তা করা। কারণ তার রাজধানীতেই এই সমাবেশ হচ্ছে। এক রাতে তিনি সমস্ত খৃষ্টান সম্রাট, উচ্চ সামরিক অফিসার ও অন্যান্য শাসকবৃন্দকে নৈশভােজের দাওয়াত দিলেন। এই রাতটি ছিল চেঙ্গিস ও ভিক্টরের জন্য অসম্ভব ব্যস্ততার রাত।
সম্রাট রিমান্ড মেহমানদেরকে উত্তম আপ্যায়ন ও দামী মদ পরিবেশনের জন্য হুকুম দিলেন। স্বাভাবিকভাবেই তাদের ব্যস্ততা বেড়ে গেল।
তারা জানতাে, এই ব্যস্ততা ও সতর্কতার প্রয়ােজন ততক্ষণ, যতক্ষণ মেহমানরা সজ্ঞানে থাকে। মেহমানরা মদের নেশায় বিভাের হয়ে গেলে সেই সতর্কতার আর প্রয়ােজন পড়ে না। তখন ভােজসভার কর্মচারীদের জন্য সৃষ্টি হয় সুবর্ণ সুযােগ। এই সুযােগে অনেকেই দু'চার পেগ মদ সরিয়ে রাখে। পছন্দের খাবারটা একটু চেখে দেখে। আর কেউ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে রাজ-রাজরাদের লীলাখেলা ও অসভ্যতা।
এই ভােজ সভা ছিল নারী-পুরুষের অবাধ মিলনকেন্দ্র। তার মধ্যে যুবতী মেয়েরা যেমন ছিল, তেমনি ছিল যুবতী সাজা বৃদ্ধারাও।
ভিক্টর ও চেঙ্গিস উভয়েই খাবার ও মদ পরিবেশনের তদারকিতে খুবই ব্যস্ত ছিল। এক যুবতী রাশেদ চেঙ্গিসের কাছ থেকে দু'তিন বার মদ চেয়ে নিল। চেঙ্গিস প্রত্যেকবারই কোন বয়কে ডেকে মদ দিতে বললাে।
মেহমানরা অনেকেই সম্রাট রিমান্ডকে ঘিরে বসে বসে গল্পগুজব করছিল। কেউ বসেছিল হলরুমের ভেতর, কেউ বারান্দার খােলামেলা পরিবেশে ছােট ছােট টেবিলে জুটি বেঁধে আলাপ করছিল। কেউ আবার নিরিবিলি পরিবেশ পাওয়ার আশায় বাগানে নেমে পড়েছিল।
যে যুবতী বার বার চেঙ্গিসের কাছে মদ চাচ্ছিল, আবারও সে হাত ইশারায় তাকে কাছে ডাকল। মেয়েটি ছিল খুবই সুন্দরী , চেঙ্গিস তার কাছে যেতেই সে বলল, আমি যতবার তােমার কাছে মদ চেয়েছি ততবারই তুমি বয়-বেয়ারা দিয়ে তা পাঠিয়ে দিয়েছ। এক যুবতীকে খুশী করার জন্য তুমি কি নিজের হাতে একবার পরিবেশন করতে পারাে না?”
জ্বী, কেন নয়। চেঙ্গিস বিনয়ের হাসি হেসে বলল, “আচ্ছা, এখুনি এনে দিচ্ছি।
উহু, এখানে নয়। মেয়েটি মুচকি হেসে বললাে, 'আচ্ছা, বাগানে যাচ্ছি ওখানে নিয়ে এসাে।
চেঙ্গিস মদের একটি সুন্দর সুরাহী ও পিয়ালা নিয়ে বাগানে চলে গেল। মেয়েটা আগেই ওখানে গিয়ে বসেছিল। রাতের প্রাসাদের আঙ্গিনায় চমৎকার সাজানাে গুছানাে বাগান সেখানেও মেহমানরা জোড়ায় জোড়ায় বসে গল্প করছিল সেই সাথে চলছিল সমানে পানাহার।
কিন্তু এই মেয়েটি বাগানের এক টেবিলে একাকীই বসেছিল এতে চেঙ্গিস একটু বিস্মিত হলাে। কারণ এখানে কেউ একা নেই, সবাই ব্যস্ত আপন আপন সঙ্গীর সাথে। এতসব জুটির মাঝে তাকে বড় বেমানান লাগছিল।
এমন সুন্দরী ও যুবতী মেয়ের তাে একা থাকার কথা নয়। ভাবল চেঙ্গিস, তার চারপাশে তাে এতক্ষণে ভ্রমরের ভিড় লেগে যাওয়ার কথা। সে মেয়েটির পিয়ালায় মদ ঢালতে ঢালতে বললাে, আপনার আর কিছু লাগবে?
না, ধন্যবাদ।' মেয়েটি সৌজন্য প্রকাশ করে বলল, আমার আর যা লাগবে তা তুমি দিতে রাজি হবে কিনা তাই ভাবছি। আরাে অবাক হলাে চেঙ্গিস। জিজ্ঞেস করলাে, বলুন, কি লাগবে আপনার?',
‘দেখতেই পাচ্ছাে আমি একা। তােমার সাথে একটু কথা বললে অসুবিধা আছে?
বিনয়ের সাথে বললাে চেঙ্গিস, না, না। বলুন কি জানতে চান?”
তােমার দেশ কোথায়?”
সে ইউরােপের একটি অঞ্চলের নাম বললাে।
‘এখানে কতদিন আছাে?'
বলতে পারেন শিশুকাল থেকেই। আমার বাবা ছিলেন সম্রাট রিমাণ্ডের রাজ পরিবারের কর্মচারী । এখন আমি তার সামান্য গােলাম।
‘বাহ! তাহলে তাে দেখছি, তুমি রাজ পরিবারেরই একজন! অন্তত এ রাজ পরিবারের যত কাহিনী তােমার জানা আছে, অনেকেরই তা নেই।'
‘হ্যাঁ, বলতে পারেন এ আমার পরম সৌভাগ্য। বিনয়ের সাথে বলল চেঙ্গিস।
তােমার এ সৌভাগ্যে সামান্য ভাগ বসানাের লােভ হচ্ছে। আমি কি তােমার কাজের ক্ষতি করছি?
না, না। আপনাদের সেবা করাই তাে আমার কাজ! বলুন, কি বলবেন।'
তাহলে তুমি আরাে কিছুক্ষণ আমাকে সঙ্গ দাও। মেয়েটি তার পিয়ালা চেঙ্গিসের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললাে, নাও, তুমিও সামান্য পান করে নাও।'
না, না। একি বলছেন আপনি! আমি আপনার সামান্য গােলাম মাত্র! তার কণ্ঠ থেকে অকৃত্রিম বিস্ময় ও বিনয় ঝরে পড়ল, ‘আপনি আমার মুনীবের মেহমান! একি করে সম্ভব!
রাখাে তাে ওসব কথা! এখানে তােমার সংকোচের কিছু নেই। আমি নিজেই তাে তােমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। মেয়েটির কণ্ঠে অন্তরঙ্গতা। সে পাত্রটি বাড়িয়ে ধরে বলল, ‘এই মুহূর্তে কিছুক্ষণের জন্য না হয় তুমি সম্রাট হয়ে যাও, আর আমাকে তােমার দাসী মনে করাে।' মেয়েটি তার হাত ধরে তৃষ্ণার্ত হাসি হেসে বলল, আমার চোখে তুমি এখন পরদেশী এক শাহজাদা! আর আমি এখানকার শাহজাদী! কই, নাও! ধরাে তাে এটা! আমার মেহমানকে আমি কিছু খেতে দেবাে না!
চেঙ্গিস বিব্রত কণ্ঠে প্রশ্ন করলাে, আপনি এখানে একা কেন? আপনার সঙ্গী কোথায়?
‘আমার সঙ্গী আমার পাশেই আছে। মেয়েটি রহস্যময় কন্ঠে বলল, আমার মন যারে চায় তাকেই তাে সঙ্গী করা উচিত, কি বলাে? যাদের আমি ঘৃণা করি তাদের সাথে কেমন করে হেসে খেলে বেড়াই। মেয়েটি উত্তর দিল। আমার যাকে ভাল লাগছে, আমি তাকেই পাশে ডেকে নিয়েছি। তুমি তাে আমার হাত থেকে পিয়ালা গ্রহণ করলে না?'
যদি কেউ দেখতে পায়, তবে আমাকে শুলে চড়াবে।' চেঙ্গিস ভয়ার্ত স্বরে বললাে।
কিন্তু যদি তুমি আমার নিবেদন প্রত্যাখ্যান করাে, তবে আমিই তােমাকে শুলে চড়াবাে। মেয়েটি হেসে বললাে, ‘পাগল! তােমাকে আমার ভাল লেগেছে বলেই না তােমাকে এখানে ডেকে এনেছি।'
মেয়েটি উঠে দাঁড়ালাে এবং তার কাঁধে হাত রেখে কানে কানে বললাে, তুমি আমাকে নিরাশ করাে না যুবক। তখনও তার ঠোঁটের কোণে লেগেছিল বন মােহিনী হাসি।
কিন্তু আমি তাে এখন মদ পান করতে পারবাে না। এখন যে আমি ডিউটিতে আছি!' চেঙ্গিস আড়ষ্ট কণ্ঠে বললাে।
আচ্ছ, নাই বা করলে মদ পান। মেয়েটি তার কাঁধ থেকে হাত নামিয়ে মুখােমুখি দাঁড়িয়ে বললাে, কিন্তু আমি যখন ও যেখানেই ডাকি, সেখানে তােমাকে হাজির হতে হবে।
রাশেদ চেঙ্গিস এ প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল। সে ধারণা করলাে, এই মেয়ে কোন বৃদ্ধ জেনারেলের স্ত্রী হতে পারে। আবার এমনও হতে পারে, তার স্বামী অন্য কোন নারী নিয়ে মেতে
)আছে। তারই প্রতিশােধ নেয়ার জন্য এ মেয়ে তাকে বাছাই করেছে।
সে ছিল এক বিচক্ষণ গােয়েন্দা। তাই মেয়েটির আচরণে সে সামান্য বিচলিতও হলাে না। এমন সুন্দরী ও অভিজাত যুবতী তার বন্ধুত্বের আকাংখা করেছে, এটা তার কাছে কোন নতুন ঘটনা নয়। চেঙ্গিস এতটাই সুদর্শন ও আকর্ষণীয় দেহ সৌষ্ঠবের অধিকারী যে, এর আগেও তাঁকে এমন বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে।
খৃস্টান সম্রাট ও অফিসারদের মাহফিলগুলাে সুন্দরী ও আকর্ষণীয় মেয়েরাই সরগরম করে রাখে। এর আগেও একাধিক মেয়ে চেঙ্গিসের সাথে সম্পর্ক করতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু চেঙ্গিস তার কর্তব্যের খাতিরে তাদের এড়িয়ে গেছে। সুলতান আইয়ুবী তাকে যে দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন, সে দায়িত্ব পালনে কোন ত্রুটি ঘটতে পারে এমন কোন কিছুর সাথে সে নিজেকে জড়াতে চায় না।
আলী বিন সুফিয়ান তাকে ট্রেনিং দেয়ার সময় তার মগজে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন এই চিন্তা, নিজের কর্তব্যকেই সব সময় প্রাধান্য দেবে। কখনাে এমন কিছুর সাথে নিজেকে জড়াবে না, যাতে দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। মেয়ে মানুষের কাছ থেকে সাবধান থাকবে। কখনাে আপন বিবি ছাড়া অন্য কারাে দিকে নজর দেবে না। মনে রাখবে, দুশমন তােমাদের ঘায়েল করার জন্য যে অস্ত্রটি সবচে বেশী ব্যবহার করবে তার নাম মেয়ে। যারা অন্য নারীর প্রেমে পড়ে যায় বা নেশা ও বিলাসিতায় আকৃষ্ট হয়ে পড়ে; আপন দায়িত্ববােধের কথা তাদের স্মরণ থাকে না। তারা ধীরে ধীরে দায়িত্বহীন হয়ে যায়। তার মন-মগজে মদ ও নারীর মােহ এমন বিষের ন্যায় কাজ করে যে, সে ধীরে ধীরে তার ঈমানও হারিয়ে ফেলে। অতএব নেশা ও নারী থেকে সব সময় দূরে থাকবে।
সম্রাট রিমাণ্ডের রাজপ্রাসাদে এসে সে দেখেছে, রাজার খেয়াল কাকে বলে। এখানে সম্রাট যখন যাকে ইচ্ছা চাকরী প্রদান করে এবং যাকে ইচ্ছা চাকরী থেকে বরখাস্ত করে। রাজার ক্ষমতা ও ব্যক্তিত্ব যাদুর মত। এখানে এমন কেউ নেই, যে তাকে প্রশ্ন করতে পারে।
এখানে এসে সে আর যে জিনিসটি দেখে অবাক হয়েছে, তাহলাে খৃস্টানদের চরিত্র। এদের কাছে চরিত্র বলে কিছু নেই। নির্লজ্জতা ও বেহায়াপনাকে তারা গর্বের বিষয় বলে মনে করে। তাই এখানকার মেয়েরা এমন খােলামেলা প্রেম নিবেদন করলেও সে আর অবাক হয় না।
একজন গােয়েন্দা হিসাবে সে তখন চিন্তা করছিল, মেয়েটির কাছ থেকে তার কিছু পাওয়ার আছে কিনা। সে চিন্তা করে দেখল, এই মেয়েকে ব্যবহার করে সে এমন কিছু তথ্য পেতে পারে, যা অন্যভাবে পাওয়ার উপায় নেই। মেয়েটি যখন তাকে বলছিল, আমি যখন ও যেখানেই ডাকি সেখানে তােমাকে হাজির হতে হবে' তার এ বক্তব্যে ধমক বা আদেশের সুর ছিল না বরং ছিল আন্তরিকতা ও বন্ধুত্বের আবেদন। চেঙ্গিস এটা ভাল করে বুঝেছিল বলেই সেও মেয়েটির হাসির উত্তরে হাসি মুখেই সে প্রস্তাব কবুল করে নিয়েছিল। হাসির বিনিময়ে হাসি দিয়েই সে তার শিকারকে ফাঁদে ফেলতে চেষ্টা করেছিল।
‘এখন আমাকে যাওয়ার অনুমতি দিন। চেঙ্গিস বললাে, ‘আপনি বরং মেহমানদের কাছে চলে যান।
‘অনুমতি দেবাে, তার আগে বলাে, তুমি ঠিক ঠিক আসবে তাে?'
‘আসবাে। সময় পেলেই আমি আপনার ডাকে সাড়া দেবাে, কথা দিলাম। চেঙ্গিস বললাে, কিন্তু আমি তে আপনার ঠিকানা জানি না। আপনি কার স্ত্রী?”
‘স্ত্রী নই, আশ্রিতা!' মেয়েটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে এক সেনা অফিসারের নাম উল্লেখ করে বললাে, হতভাগার কাছে অঢেল ধন-সম্পদ আছে। আর এই সম্পদের জোরে সে আমার মত মেয়েদের কিনে নিয়ে তার হেরেমের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করছে। আমি একা নই, আরাে বেশ কিছু মেয়ে আছে তার, যাদের সাথে সে দাসী-বাদীর মত ব্যবহার করে। কিন্তু কে যে তার মনের মানুষ তা আমরা কেউ জানি না।'
‘এত লােভ না করে ওখান থেকে চলে এলেই পারেন!
না, তা আমরা পারি না। সে আমাকে মুক্তি দিতে নারাজ। বলে, তােমার কোন সাধ-আহলাদ আমি অপূর্ণ রাখবাে না। তাহলে কেন আমাকে ছেড়ে চলে যাবে?' সেই গর্দভ সম্পদের দম্ভটুকুই চেনে, নারীর মন চেনার সময় কোথায় তার!
যখন বুঝেছি এ লােকের হৃদয়ে দয়া, মায়া, প্রেম বলতে কিছু নেই তখন থেকেই তাকে আমি ঘৃণা করতে শুরু করেছি। সেই ঘৃণা এখন আমার মনের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে আছে। এই চাপ সহ্য করা আমার পক্ষে অসহনীয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু যখন তােমাকে দেখলাম, কেন জানি না, তােমাকে আমার ভাল লেগে গেল। বিশ্বাস করাে, তুমি আমার কাছে প্রথম পুরুষ, যাকে আমি অন্তর দিয়ে বেছে নিয়েছি।
আমি তােমার কাছ থেকে শারিরীক বা দৈহিক কোন তৃপ্তির পিয়াসী নই। পিপাসা আমার অন্তরের, পিপাসা আমার ভালবাসা। তােমাকে দেখে চোখের পানিতে আমি সে পিপাসা নিবারণ করতে পারবাে। দোহাই লাগে, তুমি আমার দৃষ্টির আড়ালে যেও না। আমাকে পাষাণপুরীতে ফেলে রেখে দূরে কোথাও পালিয়ে যেও না। যদি এমন করাে তবে আমার ওপর জুলুম করা হবে। আমি সব সইতে পারবাে, কিন্তু এ অত্যাচার সইতে পারবাে না। এখন যাও, তােমার অনেক সময় আমি নিয়ে ফেলেছি, আর নয়। কাল রাতে আমি নিজেই তােমাকে খুঁজে নেবাে, কষ্ট করে তােমাকে আমার কাছে যেতে হবে না।
যে সময় রাশেদ চেঙ্গিস বাগানে মেয়েটির সাথে কথা বলছিল, ভিক্টর তখন মেহমানদের মধ্যে ঘােরাফেরা করছিল। সে মেহমানদের আপ্যায়ন করছিল ঠিকই কিন্তু তার কান পড়েছিল ক্রুসেড লিডারদের আলােচনায়। তারা আলােচনা করছিল, কোন দিকে অভিযান চালালে সুবিধা হবে। কোথায় আক্রমণ করলে আইয়ুবী সহজে ধরাশায়ী হবে, এইসব।
এসব আলােচনা থেকে সে তার প্রয়ােজনীয় কথা মনে মনে টুকে নিচ্ছিল। কিন্তু তখনও আলােচনা ও পরামর্শ চলছে। সেদিকে কান পেতে দ্রুত হাতে কাজ করছে ভিক্টর।
রাশেদ চেঙ্গিস মেয়েটির কাছ থেকে ছুটি পেয়ে মেহমানদের মধ্যে এসে পড়লাে। ঘুরতে ঘুরতে সে সম্রাট রিনাল্টেরর পাশে চলে এলাে। রিনাল্ট তখন তার সাথীদের বলছে, তােমরা কোন চিন্তা করাে না। এবার আমি এত বেশী সামরিক শক্তি নিয়ে এসেছি, আমার তাে মনে হয়, আমি একাই আইয়ুবীকে ধরাশায়ী করে ফেলতে পারবাে। ভাবতে পারাে, আমার সাথে আছে আড়াইশাে নাইট। যাদের প্রত্যেকের আণ্ডারে আছে আলাদা বাহিনী। এক নাইটকে পরাজিত করলে আরেক নাইট এগিয়ে যাবে তার বাহিনী নিয়ে। আইয়ুবী একা কয়টা বাহিনীর সাথে মােকাবেলা করতে পারবে?
এভাবে রিনাল্ট শক্তির বড়াই করছিল আর বড় ধরনের সফলতা ছিনিয়ে এনে দেবে বলে দাবী করছিল সঙ্গীদের কাছে।
রাত কেটে গেল। পরের দিন চেঙ্গিসের কাছে একটি লােক এলাে। লােকটি তার দলেরই এক গােয়েন্দা। সে তাকে বলল, মধ্য রাতের পর তুমি ইমাম সাহেবের কাছে চলে এসাে। সেখানে জরুরী আলােচনা আছে।
দিন কেটে গেল। রাত হলাে। চেঙ্গিস ও ভিক্টর সম্রাট রিমাণ্ডের ভােজ সভায় তাদের ডিউটিতে চলে গেল । অনেক রাতে ডিউটি শেষ হলে ওরা ওখান থেকে ওদের কামরায় ফিরে এলাে।
চেঙ্গিস এখনও ভিক্টরকে বলেনি, একটি মেয়ে তার সঙ্গে অন্তরঙ্গ হতে চাচ্ছে। ডিউটি থেকে ফিরেই সে ভিক্টরকে বললাে, ‘পােষাক পাল্টে আমি ইমাম সাহেবের কাছে যাচ্ছি। ভিক্টর বললাে, ঠিক আছে যাও। সে তাকে কিছু তথ্য দিয়ে বললাে, এগুলাে ইমাম সাহেবকে বলাে।
রাশেদ চেঙ্গিস তার পােষাক পরিবর্তন করলাে। কৃত্রিম দাড়ি লাগালাে মুখে। মাথায় পাগড়ী পরে চেহারা লুকাল। তারপর কামরা থেকে বেরিয়ে অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে গেল।
তাদের বাসা থেকে কিছু দূর এগিয়ে গেলেই একটি পার্ক। পার্কের ভেতর দিয়ে মসজিদে যাওয়ার সংক্ষিপ্ত রাস্তা আছে। সেই রাস্তা ধরে হাঁটা ধরল রাশেদ চেঙ্গিস।
বাগানটি হরেক রকম ফুল গাছে ভরা। নিচে সবুজ ঘাসের জাজিম। তার মাঝখান দিয়ে পায়ে চলা পথ। ফুল গাছগুলােতে ফুটে আছে হরেক রঙের ফুল। লাল, নীল, হলুদ। গাছে গাছে সবুজ সতেজ পাতা। কিন্তু এখন এসব কিছুই দেখার উপায় নেই। শুধু দেখা যায় ছােট বড় কালাে ঝােপগুলাে মাথা মুড়ে বসে আছে।
পার্কের আশেপাশে কোন জনবসতি নেই। মানুষের নিত্যদিনের সান্ধ্য কোলাহল থেমে গেছে অনেক আগেই।
এখন সবকিছুই কেমন সুনসান, নিঝুম, নিরব।
বাগানের মধ্য দিয়ে হাঁটছে রাশেদ চেঙ্গিস। এমন সময় এক গাছের আড়াল থেকে একটি ছায়া বের হয়ে তার দিকে অগ্রসর হতে লাগলাে। চেঙ্গিস লােকটিকে দেখতে পেয়েই তার কৃত্রিম দাড়ি খুলে ফেলল। সে ভাবল, হয়তাে কোন পরিচিত পাহারাদার ডিউটিতে আছে, তার গলার স্বর চিনে ফেলতে পারে। এ অবস্থায় দাড়ি দেখলে লােকটি বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে। তার মনে সন্দেহ উঁকি দেবে। তখন সে যদি চ্যালেঞ্জ করে বসে তাহলে বিপদ আছে।
সে তার চলার গতি ধীর করে দিয়ে আস্তে ধীরে পা ফেলে চলতে লাগলাে।
ছায়াটি একেবারে তার কাছে এসে বলে উঠল, 'আমি তোমাকে বলিনি, আমি নিজেই তােমাকে খুঁজে নেবাে। কি, ঠিক বলিনি?’ কণ্ঠটি একটি নারীর।
কণ্ঠটি চিনে ফেলল রাশেদ চেঙ্গিস। এই তাে সে মেয়ে, যে তার সাথে অন্তরঙ্গ হওয়ার চেষ্টা করেছিল।
মহলের ব্যস্ততা মাথাটা একেবারে খারাপ করে দিয়েছে। চেঙ্গিস বললাে, তাই একটু হাওয়া খাওয়ার জন্য এদিকে চলে এলাম।
‘আমি তােমার কামরাতেই যাচ্ছিলাম। মেয়েটি বললাে, ‘যাক, ভালই হলাে। তােমাকে পথেই পেয়ে গেলাম। জায়গাটা মন্দ নয়, কি বলাে? ফুলের সৌন্দর্য দেখতে না পারলেও ফুলের সুবাস তাে পাবে!
হাঁ, তা ঠিক।' হাঁটতে হাঁটতেই বললাে চেঙ্গিস।
‘বসবে, না কি চলতেই থাকবে? মেয়েটি বলে উঠল, 'আমি কিন্তু সুরাহী ও পিয়ালা সঙ্গে নিয়ে এসেছি। হাসি মুখে বলল মেয়েটি।
রাশেদ চেঙ্গিস দাঁড়ালাে। একবার ভাবলাে, সে কোথায় থাকে জিজ্ঞেস করে। কিন্তু পরক্ষণেই বাতিল করে দিল চিন্তাটা। বলল, তুমি যাঁর আশ্রিতা তিনি তােমাকে খুঁজবেন না?
কি যে বলাে! আমাকে খোঁজার মত সময় কি তার আছে! নতুন ফুলের মধু ছাড়া তার রাত কাটে না। সে আছে তার মত, আমি আমার মত। ওর কথা মনে করিয়ে দিয়ে তুমি এ মধুর সময়টা মাটি করাে নাতাে!'
রাশেদ বুঝে নিল, এই মেয়ে এখন আবেগে বিভাের হয়ে আছে। বড় বিপদের ঝুঁকি নিয়ে সামনে চলছে মেয়েটা, কিন্তু কোন বিপদকেই পরােয়া করার অবস্থা নেই তার। চেষ্টা করলে তার কাছ থেকে হয়তাে কিছু গােপন তথ্য আদায় করা যাবে। চেঙ্গিস তাকে বললাে, আর ভাবছাে কেন, শীঘ্রই তাে তুমি তােমার প্রভুর কাছ থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে।
এটা কি করে সম্ভব! মেয়েটি অবাক হয়ে বলল।
‘কেন, তুমিই বললে সে লােক সেনাবাহিনীর অফিসার। তারা তাে অচিরেই যুদ্ধের ময়দানে যাত্রা করবে।
হ্যাঁ, সে লােক বিলডন সাহেবের এক জেনারেল। মেয়েটি উত্তরে বললাে, কিন্তু সে আমাকে এবং অন্যান্য মেয়েদেরও সঙ্গে নিয়ে যাবে। ফলে তুমি যা ভাবছে তেমনটি আর হচ্ছে না। তার হাত থেকে মুক্তি পাওয়া সােজা ব্যাপার নয়।
কবে তােমরা যাত্রা করছে, আর কোথায় যাবে?
‘তা জানি না। তবে সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে খুব তাড়াতাড়িই অভিযান শুরু হবে বলে মনে হয়।
সালাহউদ্দিন আইয়ুবী এখন কোথায়?' চেঙ্গিস প্রশ্ন করলাে। ‘সেটা আমি কি করে বলব?' মেয়েটি উত্তরে বললাে, তবে তুমি যদি জানতে চাও, খোঁজ নিয়ে তােমাকে জানাতে পারবাে।'
রাশেদ চেঙ্গিস তাকে আরও কিছু প্রশ্ন করলাে। যে সব প্রশ্নের উত্তর মেয়েটির জানা ছিল তা সে খুলে বললাে। আর যা জানে না সেগুলাে জেনে এসে বলবে বলে ওয়াদা করলাে। মেয়েটি বললাে, “কে যুদ্ধ করলাে, কে মরলাে, কে বাঁচলাে তা নিয়ে তােমার কি?”
“দেখাে, যুদ্ধ যে করে সেই শুধু মরে না, যুদ্ধ সবার জন্যই দুঃখ বয়ে নিয়ে আসে।'
মেয়েটি আবেগের স্বরে বললাে, আমাকে সে যুদ্ধের ময়দানে যেতে বললেও আমি যাব না। আমি তাে তার স্ত্রী নই। আমি আমার মালিকের কেনা দাসীও নই, রক্ষিতা মাত্র। সুলতান আইয়ুবী এখন আর আমার কি ক্ষতি করবে? আমার যারা আপন, যারা আমার ধর্মের ভাই, তারাই আমাকে এমনভাবে লাঞ্ছিত করেছে, যা আমি জীবনেও ভুলতে পারবাে না। আমার মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয়, পবিত্র কুশের নাম ভাঙিয়ে যারা আমার ওপর এ নির্যাতন করেছে, তাদেরকে আমি বিষ দিয়ে হত্যা করি।
তারা উভয়েই বাগানের এক বেঞ্চিতে গিয়ে বসলাে। মেয়েটি দু’জনের মাঝখানে পিয়ালা রেখে তাতে মদ ঢেলে একটি পিয়ালা চেঙ্গিসের দিকে এগিয়ে ধরলাে। বললাে, এমন নির্জন নিঝুম রাত আর বাগানের এই পরিবেশ, এ তাে যুদ্ধের আলাপের জন্য নয়, ভালবাসার কথা বলার জন্য। নাও, একটু পান করাে। ভুলে যাও পৃথিবীর সব দ্বন্দ্ব কোলাহল। এসাে হৃদয়ের ভায়ােলিনে ভালবাসার গান শুনি।'
চেঙ্গিস মহা বিপদে পড়ে গেলাে। সে আজ দেড় বছর যাবত এই মদের কারবারের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে। নিজ হাতে কত মেহমানকে মদ পান করিয়েছে, কিন্তু সে নিজে কখনও মদ স্পর্শ করেনি। এমন পাপময় পরিবেশে মাঝে মধ্যে যেখানে বিরাট আকর্ষণীয় দাওয়াত এসে যায়, সেখানেও সে নিজেকে সংযত রেখেছে। ঈমানকে নষ্ট হতে দেয়নি। কিন্তু এখন এমন এক নারীর পাল্লায় পড়ে গেল, যার মাধ্যমে সে তার দায়িত্ব পালনকে আরও সহজ করতে চায়। কিন্তু মুশকিল হলাে, এই নারী তাকে মদ পান করতে বলছে। ভয় হচ্ছে, যদি এই আবেগময়ী নারীর ভালবাসা প্রত্যাখ্যান করে তবে সে হাত ছাড়া হয়ে যেতে পারে।
একদিকে ঈমানের দাবী, অন্যদিকে দায়িত্ব পালনের হাতিয়ার হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয়, কোনটা রাখবে সে? ব্যাপারটা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ে গেল চেঙ্গিস। কর্তব্যের খাতিরে দু’এক ঢােক পান করবে, নাকি এমন দামী হাতিয়ার
(চলবে)
0 coment rios:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন