২০. পাল্টা ধাওয়া(পর্ব-4)
গিয়ে দাঁড়াল।
এই মসজিদ ছিল ত্রিপলীতে সুলতান আইয়ুবীর গােয়েন্দা বিভাগের হেড কোয়ার্টার। আর মসজিদের ইমাম শুধু একজন ইমামই ছিলেন না, তিনি ত্রিপলীর গােয়েন্দা বিভাগেরও প্রধান।
রাত তখন অর্ধেকের বেশী পার হয়ে গেছে। ইমাম সাহেব গভীর নিদ্রায় ডুবে ছিলেন। দরােজার টোকা তাকে জাগিয়ে দিল। তিনি সজাগ হয়ে একটু থামলেন। এ সময় তিনি আবার দরজায় টোকার শব্দ শুনতে পেলেন। দরজায় টোকা দেয়ারও একটা নির্দিষ্ট ভঙ্গি ঠিক করে দেয়া ছিল গােয়েন্দাদের জন্য। তিনি সেই সাংকেতিক টোকাই শুনতে পেলেন। বিছানা ছেড়ে উঠলেন তিনি। সাবধানতার জন্য একটি লম্বা খঞ্জর হাতে নিলেন। তারপর দরজা ফাঁক করে বললেন, - কে?”
‘আমি ভিক্টর। আগে ভেতরে চলুন, জরুরী কথা আছে।
‘রক্তের গন্ধ আসছে কোত্থেকে?’ ইমাম সাহেব অন্ধকারেই রক্তের গন্ধ পেয়ে প্রশ্ন করে বসলেন।
‘জ্বি, আমার শরীর থেকেই!' ভিক্টর উত্তর দিল।
ইমাম সাহেব আর কোন প্রশ্ন না করে তাকে ভেতরে টেনে নিয়ে গেলেন। প্রদীপ জ্বালিয়ে দেখতে পেলেন, ভিক্টরের কাপড়ে রক্তের লাল দাগ। এখনও তা টাটকা ও ভেজা।
ভিক্টরের পরিচয় ইমাম সাহেবের জানা ছিল। সে কোথায় এবং কি দায়িত্বে আছে, তাও জানতেন তিনি। যদিও ভিক্টরকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন না তিনি, তবে ভিক্টর নামের একজন অপারেটর সম্রাট রিমাণ্ডের রাজপরিবারে খাদ্য বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছে এ কথা এখানকার দায়িত্বে এসেই জানতে পেরেছিলেন তিনি। নিয়ম মত তিনি তার কাজের রিপাের্টও পাচ্ছিলেন। সে যে খৃস্টান তাও জানতেন তিনি। এ ধরনের অপারেটরদের সামনে আনা বিপদজনক বিধায় তিনি কোন দিনই তাকে এখানে ডাকেননি, পরিচিত হতে চাননি। কিন্তু আজ যেহেতু সে নিজেই ছুটে এসেছে তখন বুঝতে হবে, বড় রকমের কোন সমস্যা হয়ে গেছে। তিনি উদ্বিগ্ন কণ্ঠে তার সাথে কিছু সাংকেতিক কথা বিনিময় করলেন। এতে এই লােকই যে ভিক্টর সে ব্যাপারে নিশ্চিত হলেন তিনি। এটাই গােয়েন্দাদের পরস্পরকে চেনার সহজ পদ্ধতি।
‘তুমি এলে যে! চেঙ্গিস কোথায়? সে আসেনি কেন?' ইমাম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন।
‘সে আর কোনদিন আসতে পারবে না।' ভিক্টর বললাে।
‘কেন? ইমাম সাহেব ভীত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, সে কি ধরা পড়ে গেছে?"
তার পাপ তাকে গ্রেফতার করেছে। ভিক্টর উত্তর দিল, আর আমার খঞ্জর তার পাপের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। আমার কাঁধ ও বাহু থেকে এখনাে রক্ত ঝরছে। আমার রক্ত পড়া বন্ধ করার কোন ব্যবস্থা করতে পারবেন আপনি?’
দাঁড়াও, আমি এখনি নতুন করে ব্যাণ্ডেজ করে দিচ্ছি। তুমি ভয় পেয়াে না।
ইমাম সাহেব জলদি ঔষুধ বের করলেন। পানি এনে তার আহত স্থান পরিষ্কার করতে করতে বললেন, “কি ঘটেছে বলাে তাে!”
বলছি। পেরেশান হওয়ার মত এখন আর কিছু নেই। যা ঘটার তা ঘটেই গেছে। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করুন, চেঙ্গিস জীবিত নেই। সে বেঁচে থাকলে আমাদের কেউ কারাগারের নিদারুণ যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে পারতাম না।'
ইমাম সাহেব তার জখম পরিষ্কার করে সেখানে ঔষধ ছিটিয়ে দিচ্ছিলেন। ভিক্টর ধীরে ধীরে আদ্যোপান্ত সমস্ত ঘটনা ইমাম সাহেবকে খুলে বলতে লাগলাে। সে বলল, যখন আমি নিশ্চিত হয়ে গেলাম, এই মেয়ে চরম ধোকা ও প্রতারণা দিয়ে চেঙ্গিসকে মহা বিপদের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, তখন আমি তাকে বাঁধা দিলাম। আমি সেই বুড়াে জেনারেলের খোঁজ নিলাম, যার আশ্রয়ে মেয়েটি আছে বলে জানিয়েছিল চেঙ্গিসকে। কিন্তু এই নামে তাদের কোন জেনারেলই নেই। মেয়েটি কোথায় থাকে এ খোঁজ নিতে গিয়ে আমি অবাক হয়ে গেছি। মেয়েটি ক্রুসেড বাহিনীর গােয়েন্দাদের কোয়ার্টারে থাকে।
গত কয়েকদিন ধরেই প্রতি রাতে সে চেঙ্গিসের পথ আগলে দাঁড়াচ্ছিল। এতে করে চেঙ্গিস আর আপনার কাছে পৌঁছতে পারছিল না। যে সব গুরুত্বপূর্ণ খবর আপনার কাছে পৌঁছানাে জরুরী ভেবে তাকে আপনার কাছে পাঠাতাম, সেগুলাে তার পকেটেই পড়ে থাকতাে, আপনার কাছ পর্যন্ত পৌঁছতাে না। এটা যে চরম দায়িত্বহীনতার পরিচায়ক, এ কথাটুকু বুঝার ক্ষমতাও তার লােপ পেয়েছিল।
মেয়েটা তার কাছে আসতাে ধোঁকা দিয়ে তার মুখোেশ খুলে দিতে। সে প্রতি মুহূর্তে চেঙ্গিসের ওপর দৃষ্টি রাখতাে। নইলে সে যখনি বাগানে প্রবেশ করতাে, মেয়েটি কোথেকে তার কাছে ছুটে আসতাে? আমি এসব বলে যখনই চেঙ্গিসকে সাবধান করতে চেষ্টা করেছি, তখনই সে আমার উপর রাগে ফেটে পড়েছে।
আপনি শুনলে অবাক হবেন, সে মদ পান করতে শুরু করেছিল। আমার সন্দেহ হচ্ছে, তাকে মদের সাথে হাশিশও পান করানাে হয়েছিল। নইলে চেঙ্গিসের মত দৃঢ়চেতা লােক প্রতারণার শিকার হতে পারে না। আগেও অনেক সুন্দরী মেয়ে তাকে ভালবাসার জালে আবদ্ধ করতে চেয়েছে। কিন্তু সে, ওদের কোন পাত্তাই দেয়নি। ভালবাসার প্রস্তাব শুনলেই সে ওসব হেসে উড়িয়ে দিয়েছে। এই মেয়েটা তাকে ঘায়েল করেছিল একই সঙ্গে তার রূপ, যৌবন, মদ আর হাশিশ প্রয়ােগ করে। ফলে সে শারিরীক ভাবে না হলেও মানসিক ভাবে মেয়েটির ফাঁদে পড়ে গিয়েছিল।
চেঙ্গিস যখন আমাকে বললাে, সে গােয়েন্দা এ কথা মেয়েটির কাছে ফাঁস করে দিয়েছে , তখনই আমার প্রাণ কেঁপে উঠেছিল। আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, চেঙ্গিস যে অপরাধ করছে তাতে সে একা মরবে না, আমাদের সবাইকে সে ডুবিয়ে মারবে। এর শাস্তি স্বরূপ এমন বিপর্যয় নেমে আসতে পারে, যাতে মিশরের স্বাধীনতারও মৃত্যু ঘটার সম্ভাবনা আছে।
আমি তাকে এসবই বুঝাতে চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু মেয়েটি তার মাথা এমন ভাবে খেয়ে ফেলেছিল যে, তার দায়িত্ব এবং ঈমানের দাবীর চাইতেও সে মেয়েটির কথাকে বেশী গুরুত্ব দিতে শুরু করেছিল।
আমি তখন মনে মনে সংকল্প করলাম, এ বিপদ এড়াতে হলে একটাই পথ খােলা আছে, আর তা হলাে, মেয়েটাকে হত্যা করা। এতেও যদি চেঙ্গিসের হুশ না হয়, তবে তাকেও দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হবে। দেশ ও জাতির চাইতে কোন একক মানুষের মূল্য অধিক হতে পারে না। দেশের জন্য, জাতির জন্য, ধর্মের জন্য ব্যক্তির জীবন দান, নতুন কোন বিষয় নয়। যুগে যুগে এমনি নজরানা পেশ করার ফলেই সভ্যতা টিকে আছে। আর গােয়েন্দাদের ব্যাপারটি তাে আরাে নাজুক। এ জন্য সর্ব মহলের স্বীকৃত নীতিমালা হচ্ছে, দলে কেউ গাদ্দারী করলে বা তার দ্বারা গােপন তথ্য প্রকাশ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে, তাকে সঙ্গে সঙ্গে শেষ করে দাও।
তবুও আমি তাকে হত্যা করতে অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগেছি। কিন্তু সে যখন আমাকে হত্যা করতে পাগল পারা হয়ে উঠলাে.......'
‘এটাও তাে হতে পারে, তুমি তাকে ভুল ধারণায় খুন করে ফেলেছাে!' ইমাম সাহেব বললেন, 'এমনও তাে হতে পারে, মেয়েটি মুসলমানই ছিল, সে সরল মনেই আমাদের জন্য কাজ করছিল এবং আরাে করার ইচ্ছা ছিল!'
হ্যা! তা হতে পারতাে। ভিক্টর বললাে, কিন্তু আমি যখন প্রমাণ পেলাম, তখন তাে আর অনুমানের প্রশ্ন থাকে না । আমি নিজেই মেয়েটিকে তাদের ক্যাম্পে দেখেছি। এক জেনারেলের আশ্রিতা বলে সে যে কথা রটিয়েছে, সে কথাও সম্পূর্ণ মিথ্যা। এই মেয়েটি সেখানেই থাকতাে, যেখানে হরমনের গুপ্তচর বাহিনীর মেয়েরা থাকে। আজও সে ওই ক্যাম্প থেকেই রাতে বেরিয়ে এসেছিল এবং চেঙ্গিসকে অনুসরণ করে বাগানে ঢুকে তার সাথে অভিসারে মেতে উঠেছিল।
তারা যেখানে বসে গল্প করছিল তার থেকে কয়েকগজ দূরেই একটি ঝােপের আড়ালে বসে আমি তাদের সমস্ত আলাপ শুনেছি। মেয়েটি যেভাবে চেঙ্গিসের কাছ থেকে গােপন তথ্য বের করে নিচ্ছিল তা শুনলে যে কেউ বুঝতে পারতাে, এই মেয়ে সত্যি ক্রুসেড বাহিনীর পাঠানাে গােয়েন্দা। সে জানতে চাচ্ছিল, ত্রিপলীতে আমাদের কতজন গােয়েন্দা আছে। এখানে আমাদের কোন কমান্ডো বাহিনী আছে কিনা। এ তথ্য বের করার জন্য সে চেঙ্গিসকে একটি কাল্পনিক গল্প শােনাল। বলল, ক্রুসেড বাহিনীর বেশুমার রসদ ও আসবাবপত্র এক জায়গায় স্তুপ করে রাখা আছে। সেখানে প্রচুর আগ্নেয়াস্ত্র, পেট্রোল ও বিস্ফোরক দ্রব্য আছে। এসব ধ্বংস করার জন্য কমাণ্ডো বাহিনী দরকার।
আমি এই শহরেরই একজন সতর্ক গােয়েন্দা। আমি ভাল করেই জানি, যেখানে রসদ মওজুদ আছে বলে জানিয়েছে মেয়েটি, সেখানে এর কিছুই নেই। ইচ্ছে করলে আপনি নিজেই কাল সেখানে গিয়ে একবার দেখে আসতে পারেন। চেঙ্গিস তার কাছে আমাদের গােয়েন্দা বিভাগের সমস্ত তথ্য দিয়ে দিল। সে আমার নাম নিয়ে এটাও বলল, খৃস্টান হলে আমি মুসলিম বাহিনীর পক্ষে কাজ করছি। আপনি জানেন আমি এমন জায়গায় বসে আছি, যেখানে সকল সংবাদ ও গােপন তথ্য সহজেই জেনে নেয়া যায়। মেয়েটি যখন আমার নাম শুনলাে, সে এতই আশ্চর্য হলাে যে, অনেকক্ষণ পর্যন্ত কোন কথাই বলতে পারল না।
সব তথ্য নেয়ার পর মেয়েটি উঠে দাঁড়ালাে এবং চেঙ্গিসে কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সেই ক্যাম্পের দিকেই রওনা দিল। আমি ভেবে দেখলাম, মেয়েটি আমাদের সমস্ত গােপন তথ্য নিয়ে চলে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই এ তথ্য সােজা চলে যাবে হরমন সাহেবের কাছে। আর তার পরিণাম ফল তো আপনি নিজেই বুঝতে পারছেন।
আমি তৎক্ষণাৎ উঠে মেয়েটাকে ধরে ফেললাম ও আমার খঞ্জর তার বুকে বসিয়ে দিলাম। চেঙ্গিস আমার উপর ঝাপিয়ে পড়লাে । তাকে অনেক বুঝালাম, সত্য ঘটনা বললাম, কিন্তু মদের নেশা তাকে পশু বানিয়ে দিয়েছিল। আমি তার খঞ্জরের আঘাতে আহত হলাম, তবুও তাকে বুঝাতে চেষ্টা করলাম কিন্তু তার চিন্তা করবার ও বুঝবার ক্ষমতা লােপ পেয়েছিল।
আমি ভেবে দেখলাম, যদি সে জীবিত থাকে তবে আমাকে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হবে। তাতেও আমার কোন দুঃখ ছিল না। কিন্তু সে বেঁচে থাকলে আমাদের দলের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে । শেষে বাধ্য হয়ে তাকেও দুনিয়া থেকে বিদায় করলাম।
তুমি ভালই করেছাে!' ইমাম সাহেব বললেন, আমি তােমার সিদ্ধান্তকে মেনে নিলাম। তুমি এখন ত্রিপলী থেকে বের হয়ে যাও। আমি সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।’
'না!' ভিক্টর বললাে, ‘ভাের বেলা লােকেরা উঠে চেঙ্গিস ও মেয়েটির লাশ দেখতে পাবে। মেয়েটিকে হরমন সাহেবই এ কাজে নিযুক্ত করেছেন। অতএব তার এ কথা বুঝতে কোনই অসুবিধা হবে না যে, এই দু’জনকে মুসলমান গােয়েন্দারাই হত্যা করেছে। তখন খুনীকে ধরার জন্য মুসলমানদের ওপর কিয়ামত শুরু হয়ে যাবে। সরকারের পক্ষ থেকে তাকে এ ক্ষমতা আগেই দেয়া হয়েছে যে, এখানে কোন লােকের উপর তার সন্দেহ হলে তিনি তাকে কারাগারে নিতে পারবেন, ইচ্ছে করলে তাকে হত্যাও করতে পারবেন।
ত্রিপলীর প্রতিটি মুসলিম বাড়ীতেই এখন গােয়েন্দা লাগানাে আছে। তারা মুসলমানদের উপরে জুলুম অত্যাচার চালানাের জন্য কোন একটু সূত্র খুঁজছে। এই খুন তাদের হাতে সেই সূত্র তুলে দেবে। এটা আমি কিছুতেই হতে দিতে পারি না।' ভিক্টর বললাে, আমি আমার ডিউটিতে ফিরে যাচ্ছি। এই হত্যাকাণ্ড আমিই করেছি, এর দায়িত্বও আমিই বহন করবে।
কারণ হিসাবে বলবাে, চেঙ্গিস আমার প্রিয়তমাকে বিপথগামী করেছিলাে।
‘আমি এত বড় কোরবানী তােমার কাছ থেকে নিতে পারি না।' ইমাম সাহেব বললেন, “আমি তােমার সাথে একজন লােক দিচ্ছি, সে তােমাকে কায়রাে পৌঁছে দেবে।'
‘আমি আমার জীবনের কোরবানীই তাে দিতে চাই।' ভিক্টর বললাে, “আজ আমার জীবনের সেই মুহূর্তের কথা মনে পড়ছে, যখন আমাদের শহরে দুই খৃস্টান সামরিক অফিসার আমার বােনের উপর নজর দিয়েছিল। তারা তাদের সৈন্যদের আদেশ দিয়েছিল আমার বােনকে উঠিয়ে নেয়ার জন্য। কোন খৃষ্টানই আমার বােনকে তাদের হাত থেকে উদ্ধারের জন্য চেষ্টা করতে রাজি হয়নি। কিন্তু সেদিন মাত্র তিনজন মুসলিম নওজোয়ান তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। লড়াই করতে করতে এক যুবক ঘটনাস্থলেই মারা যায় এবং বাকী দুই যুবক আহত হয়। কিন্তু তারা হার মানেনি, তারা আমার বােনকে উদ্ধার করতে পেরেছিল।
এই ঘটনাই আমাকে মুসলমানদের প্রতি সহানুভূতিশীল করে তােলে। এক ভাই হয়ে আমি যা পারিনি, এক মুসলিম যুবক নিজের জীবন দিয়ে সেই অসাধ্য সাধন করেছিল। আমি এর শােকর আদায় করার সুযােগ খুঁজছিলাম। তাই যখন মুসলমানদের পক্ষ থেকে আমাকে গুপ্তচরবৃত্তি করার আহবান জানানাে হলাে, আমি তাতে রাজি হয়ে যাই। আমি আপনাদের গােয়েন্দা বিভাগে যােগ দিয়েছিলাম সেই শহীদ যুবকের বদলা দিতে। আমি আপনার কাছে সে উপকারের বদলা দেয়ার একটু সুযােগ চাই। আমার মত একজন মানুষের কোরবানী যদি একটি জাতিকে নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচিয়ে দেয়, তবে এটা কি এক বিশাল পাওনা নয় আমার জন্য? তাহলে আপনি কেন আমাকে এই মহত্তর বদলা দেয়ার সুযােগ থেকে বঞ্চিত করবেন? আমি আমার অপরাধ স্বীকার করে ত্রিপলীর মুসলমানদের জীবন ও সম্মান রক্ষা করার সামান্য সুযােগ চাই আপনার কাছে।
সে ইমাম সাহেবকে আরাে বললাে, ক্রুসেড বাহিনী তাদের সৈন্যদেরকে একত্রিত করা শুরু করেছে। তাদের সমরাভিযান শুরু হবে হলবের দিক থেকে। তারা আগে হলব ও হারান অধিকার করার প্ল্যান নিয়েছে। এখনও জানা যায়নি, কবে তারা অভিযান শুরু করবে। আর এটাও জানা যায়নি, তাদের সকল সৈন্য কি এক দিনেই আক্রমণ চালাবে, নাকি বিভিন্ন দিকে ভাগ হয়ে যাবে, কিংবা একই সাথে সব সেক্টরেই যুদ্ধ চালাবে। সুলতান আইয়ুবীর কাছে এই সংবাদ অতি দ্রুত পৌছানাে দরকার, তিনি যেন মিশরেই বসে না থাকেন।
ভিক্টর যা কিছু জানতাে সব কিছুই ইমাম সাহেবকে জানিয়ে দিয়ে সে উঠে দাঁড়ালাে। ইমাম সাহেবের আপত্তি সত্বেও সে বললাে, আপনি এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকুন, আপনাকে বা অন্য কাউকে এ ঘটনার জন্য কোন প্রশ্নই করবে না খৃস্টানরা।মসজিদ থেকে বেরিয়ে এলাে ভিক্টর। তার শরীর থেকে রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ইমাম সাহেব তার আহত স্থানে ভাল মত পট্টি বেঁধে দিয়েছিলেন। সে যার কাছে যাচ্ছিল, সে যদি জানতে চায়, তােমার পট্টি বেঁধে দিল কে, এই ভয়ে সে তার পট্টি খুলে ফেললাে। ব্যাণ্ডেজ খুলে ফেলতেই তার ক্ষতস্থান থেকে আবার রক্ত পড়া শুরু হলাে।
মসজিদ থেকে বেরিয়ে চেঙ্গিস ও মেয়েটির লাশ যেখানে পড়েছিল প্রথমে সে ওখানে গেল। রাতের শেষ প্রহর। মাথার ওপর থেকে ভাঙা চাঁদ গড়িয়ে পড়ছিল পশ্চিম দিগন্তে।
ভিক্টরের চোখের সামনে এতীমের মত পড়েছিল মদের সুরাহী ও দু'টি পিয়ালা। চাঁদের আলােয় সে ভাল করে তাকালাে মেয়েটির দিকে। কি অপরূপ মায়াময় মিষ্টি মুখ! মৃত্যুও তার সৌন্দর্য বিন্দুমাত্র পরিবর্তন করতে পারেনি। একগুচ্ছ খােলা রেশমী কোমল চুল তার বুকের উপর ছড়িয়ে ছিল। লালিত্যময় হাত দুটো দিয়ে তখনাে সে আঁকড়ে ধরে ছিল, বুকের সে ক্ষতস্থান, যেখানটা ভিক্টর তার খঞ্জর দিয়ে ফুটো করে দিয়েছিল।
ভিক্টর তাকালাে মদের সুরাহীর দিকে। মেয়েটির পাশেই কাত হয়ে পড়েছিল সেই সুরাহী । সেদিকে তাকিয়ে ভিক্টর বিড় বিড় করে বললাে, মানুষ তার নিজের ধ্বংসের উপকরণ কেমন অপরূপ করে তৈরি করেছে, দেখাে!’
মেয়েটির কাছ থেকে সরে সে গেল চেঙ্গিসের লাশের পাশে।
তার দিকে দীর্ঘক্ষণ অপলক নেত্রে তাকিয়ে থাকলাে। তার চোখ ঠেলে বেরিয়ে এলাে অশান্ত অশ্রু রাশি। সে তার কাছে বসে পড়ল। হাত দিল চেঙ্গিসের শরীরে। বরফের মত ঠাণ্ডা শরীর।
একটু আগেও এই শরীরে জীবনের উত্তাপ ছিল। সে নিজ হাতে সেই উত্তাপ কেড়ে নিয়েছে। অনেক দিন তারা একত্রে ছিল। বহু সুখ-দুঃখ তারা ভাগাভাগি করে নিয়েছে। এক জনের কষ্ট মুছিয়ে দিয়েছে অন্য জন। এক জনের শোকে অন্য জন শান্তনা দিয়েছে। সেই অন্তরঙ্গ বন্ধুকে নিজ হাতে খুন করেছে ভিক্টর! নিয়তির কি নির্মম পরিহাস!
তাকে খুন করে ভিক্টর অনুতপ্ত নয়, বরং তৃপ্তি অনুভব করছে! ওকে খুন না করলে খুন হয়ে যেতাে একটি জাতি! চরম সর্বনাশের হাত থেকে সেই জাতিকে সে রক্ষা করেছে, পৃথিবীতে যারা মানবতার নিশান উড়াতে চায়।
চেঙ্গিসের হাত তার হাতের মধ্যে নিয়ে আবেগ ভরা কণ্ঠে সে বললাে, তুমি ভাল করেই জানতে, মদের নেশা বাদশাহকেও সিংহাসন থেকে নামিয়ে দেয়। তুমি এই দুর্বলতাকে নিজের মধ্যে কেন ঠাঁই দিয়েছিলে বন্ধু!
তুমি এও জানতে, ছলনাময়ী নারীর খপ্পড়ে পড়ে কত রাজ্য আর রাজা ধ্বংস গেছে। কেন তুমি তেমনি এক নারীর খপ্পড়ে পড়ে গেলে বন্ধু!
তােমার ধর্ম কত মহান! নারীর সাথে মেলামেশার সে এমন সুন্দর বিধান দিয়েছে, যা মানলে এই মাটির পৃথিবীতেই বেহেশতের সুখ অনুভব করা যায়! কেন সেই পথে না গিয়ে গােপন মেলামেশার পথ বেছে নিলে বন্ধু!
তুমি যদি এ পথে পা না বাড়াতে তাহলে আমাকে আর জল্লাদ হতে হতাে না। তােমার ধর্মের যে সৌন্দর্য দেখে আমি অভিভুত হয়ে তার হেফাজতের জন্য সর্বস্ব পণ করে বসে আছি, তুমি সেই ধর্মের অনুসারী হয়েও কেন তার সৌন্দর্য দেখতে পেলে না বন্ধু!
চেঙ্গিসের লাশ আঁকড়ে ধরে সেই জনশূন্য বাগানে একাকী বসে বিলাপ করছিল ভিক্টর। তার সেই বিলাপের শেষ কয়টি কথা ছিল এমন: ‘আমিও আসছি প্রিয় বন্ধু! জলদি শীঘ্রই আমাকে তােমার কাছে পৌছে দেবে। আমি তোমার প্রভুর কাছে কড়জোড়ে প্রার্থনা করছি, হে আল্লাহ, আমার এই বন্ধু তােমার দ্বীনের জন্যই সর্বস্ব পণ করে এই বাহিনীতে শামিল হয়েছিল। সারা জীবন, বিশেষ করে যৌবনের শ্রেষ্ঠ সময় সে তােমার পথে ব্যয় করেছে। তার এ ক্ষণিক ক্রটি তুমি ক্ষমা করে দিও প্রভু! আমরা একই গন্তব্যের যাত্রী।
এতদিন তােমার দ্বীনের জন্য কাজ করলেও দ্বীনের হুকুম আহকাম কিছুই মানতে পারিনি। প্রকাশ্যে ঘােষণা দিয়ে তােমার দ্বীন কবুলও করিনি। তবু তুমি জানাে আমার অন্তরের খবর। যেদিন তিন মুজাহিদ আমার বােনকে খৃস্টানের কবল থেকে উদ্ধার করেছিল, সেদিন থেকেই আমিও মনে মনে তােমার দ্বীনকে গ্রহণ করে নিয়েছিলাম। আল্লাহ, আমাকে তুমি তােমার দ্বীনের পথের এক সামান্য গােলাম হিসাবে কবুল করে নাও।
সে লাশ জড়িয়ে ধরে কাঁদছিল আর বলছিল, আমিও আসছি বন্ধু! একটু অপেক্ষা করাে। এই তাে আমি আসছি বলে!
সে সেখান থেকে উঠলাে ও দ্রুত পদক্ষেপে সেই মহলের দিকে চললাে, যেখানে শহরের পুলিশ প্রধান থাকেন।
তার শরীর থেকে তখনও রক্ত ঝরছিল। সে খাপ থেকে খঞ্জর বের করলাে। খঞ্জরের জমাট রক্ত কালচে হয়ে গিয়েছিল । সে তার দেহের তাজা রক্ত দিয়ে খঞ্জরটি ভিজিয়ে নিল এবং খঞ্জর হাতেই রাখলাে। অতিরিক্ত রক্ত বের হওয়ায় সে খুব দুর্বল বােধ করছিল।
অতি কষ্টে সে কোন মতে পুলিশ প্রধানের ফটক পর্যন্ত পৌঁছল । এগিয়ে গিয়ে আঘাত করলাে ফটকে। এক সেন্ট্রি এসে ফটক খুলে দিল।
ভিক্টর অফিসারের নাম নিয়ে বললাে, জলদি তাকে জাগিয়ে দাও। আর বলাে, এক খুনী আপনার সাথে দেখা করতে এসেছে।
এ কথা শুনে সেন্ট্রিবক্স থেকে আরেক সিপাই ছুটলাে ভেতরে। কয়েক মিনিট কেটে গেল চুপচাপ। এরপরই ভেতর থেকে ‘শানা গেল গালি-গালাজের আওয়াজ । পুলিশ প্রধান গালি দিতে দিতে বেরিয়ে এলাে। দরজার কাছে এসে গর্জে উঠে বললাে, ও তুমি? কার সাথে এমন লড়াই শুরু হয়েছিল?' পুলিশ প্রধান তাকে চিনতে পারলাে।
‘আমি দু’টি মানুষের খুনের স্বীকারােক্তি করতে এসেছি।'
ভিক্টর বললাে, আমাকে গ্রেফতার করুন।
পুলিশ প্রধান তার মুখে জোরে এক থাপ্পড় মেরে বললাে, তুমি আর খুন করার সময় পাওনি? দিনের বেলায় কি করেছিলে? আমি তােমার বাবার চাকর নাকি যে, এখন তােমাকে গ্রেফতার করতে যাবাে? কি আমার নবাবজাদা! আমাকে গভীর ঘুম থেকে জাগিয়ে দিয়ে বলে, আমাকে গ্রেফতার করুন!
ক্ষিপ্ত পুলিশ প্রধান সেন্ট্রিকে বললাে, একে নিয়ে যা তাে, কারাগারে বন্দী করে দে।
সেন্ট্রি ভিক্টরকে নিয়ে যাওয়ার জন্য তার হাত ধরলাে, পুলিশ প্রধান আবার গর্জে উঠলাে, ওরে, দাঁড়া, বােকা কোথাকার! তুই কি একটুও চিন্তা করিসনি, এই খুনী তােকেও খুন করে ফেলতে পারে? একে ভেতরে নিয়ে আয়। সে কি কেস করেছে?
‘আমি এক পুরুষ ও এক নারীকে হত্যা করেছি স্যার!’ ভিক্টর জোরেই বললাে।
‘খুন করেছো? পুলিশ প্রধান আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাে, ‘সত্যি তুমি খুন করেছো? যদি মুসলমানকে খুন করে থাকো, তবে যাও, ক্ষত স্থানে মলম ব্যাণ্ডেজ করাে। বাকীটা আমি দেখবাে। আর যদি কোন খৃস্টানকে খুন করে থাকো, তবে তার সাজা অবশ্যই তােমাকে পেতে হবে। চলাে, ভেতরে গিয়ে কথা বলি।
‘আপনি তাে আমার সাথে এক সুন্দর যুবককে দেখেছেন।
রাশেদ চেঙ্গিস।' ভিক্টর ভেতরে গিয়ে বললাে, আমার এক সুন্দরী যুবতীর সাথে ভালবাসা ছিল। সে ছিল আমার বন্ধু। আমাদের প্রেমের বিষয়টা সে জানতে এবং মেয়েটিকেও চিনতাে। সেই গাদ্দার সব জেনেশুনেও আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করল। সে মেয়েটিকে ফুসলিয়ে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিল এবং নিজে তার সাথে প্রেম করা শুরু করল।
এই নিয়ে তার সাথে আমার কথা কাটাকাটি হয়। সে আমাকে চরম ভাবে অপমান করে। আমি মেয়েটির অন্ধ প্রেমিক ছিলাম। কিছুতেই তাকে হারাতে রাজি ছিলাম না আমি । মেয়েটি চেঙ্গিসের সাথে তার সম্পর্কের কথা অস্বীকার করলাে। কিন্তু গত রাতে অভিসাররত অবস্থায় আমি তাদের দু’জনকে হাতেনাতে ধরে ফেলি।
তখন চেঙ্গিস আমাকে খুন করার জন্য ছুটে আসে। মেয়েটি ছুটে এসে তাকে বাধা দিতে চেষ্টা করে। সে আমাকে আঘাত করতে চাইলে সে আঘাত আমার পরিবর্তে মেয়েটির বুকে বিদ্ধ হয়। খুন হয়ে যায় আমার প্রেমিকা। আমার মাথায়ও তখন খুন চেপে যায়। আমি চেঙ্গিসের ওপর খঞ্জর নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি। সেও আমাকে খুন করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে।
সে আমার কয়েক জায়গায় জখম করতে সক্ষম হয়। কিন্তু আমিও ছেড়ে দেয়ার পাত্র ছিলাম না। আমি তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম এবং শেষ পর্যন্ত আমিই সফল হলাম।
অবশেষে তারা দু'জনেই মারা যায়। আমার যখন হুশ হলাে; তখন ভাবলাম, হায়, আমি এ কি করলাম! সেই থেকে আমার মন অস্থির হয়ে উঠল। অনেক চিন্তা-ভাবনা করে দেখলাম, আমার মুক্তির যদি কেউ ব্যাবস্থা করতে পারে, সে কেবল আপনি। তাই আমি সেখান থেকে সােজা আপনার কাছে চলে এলাম।'
পুলিশ প্রধান তাকে বললাে, “মেয়ে মানুষের জন্য খুন-খারাবী করা তাে বুদ্ধিমানের কাজ নয়। ঠিক আছে, তুমি বাসায় চলে যাও, আমি দেখছি কি করা যায়।
পুলিশ প্রধান তাকে গ্রেফতার না করে বাসায় পাঠিয়ে দিলেন। কারণ ভিক্টর ছিল সম্রাট রিমাণ্ডের রাজ কর্মচারী। পুলিশ প্রধানের বিবেচনায় এমন দু’একটা খুন সে করতেই পারে।
কিন্তু সকাল বেলা সকলেই দু’জনের লাশ দেখে তাে হতবাক। হরমন এবং তার সহকারীর কাছেও গিয়ে পৌঁছল এ খবর। তারা যখন এ খবর জানতে পারলাে, তখন তারা দুজনেই রেগে আগুন হয়ে গেল।
মেয়েটি তাদের অত্যন্ত করিকর্মা গােয়েন্দা ছিল আর চেঙ্গিস ছিল তার শিকার। চেঙ্গিসকে অবলম্বন করেই তারা ত্রিপলীতে অবস্থানরত মুসলিম গােয়েন্দাদের পুরাে দলটাকে ধরার জাল পেতেছিল। দলটা এরই মধ্যে জালের ভেতর মাথা ঢুকিয়েও দিয়েছিল, এখন শুধু জাল গুটিয়ে আনা বাকী।
এই অবস্থায় কেবল শিকার নয়, জাল এবং জ্বেলে শুদ্ধ সবকিছু গায়েব করে দিল যে আহাম্মক, আক্রোশটা তার ওপর গিয়ে পড়াটাই স্বাভাবিক। তার কারণে মুসলিম গােয়েন্দাদের ধরার যে সূত্রটি তাদের হাতে এসেছিল, তা গায়েব হয়ে গেল। সেই সাথে গায়েব হয়ে গেল তাদের চৌকস গুপ্তচর কন্যা। সব মিলে যে অপূরণীয় ক্ষতি হলাে, ভিক্টরের মত একশ গর্দভকে খুন করলেও তার বদলা আদায় হবার নয়।
ক্রুদ্ধ আক্রোশে এ সবই ভাবছিল হরমন! সঙ্গে সঙ্গে তার সহকারীকে হুকুম দিল, “ওই গর্দভটাকে ধরে এনে আচ্ছা মত পিটুনি লাগাও।'
ভিক্টরের ক্ষত স্থান থেকে তখনও রক্ত ঝরছিল । কেউ তাকে ঔষুধ দেয়ার বা সেই ক্ষতে ব্যাণ্ডেজ করার প্রয়ােজনও বােধ করলাে না। সেই অবস্থায় তাকে ধরে আনা হল।
হরমনের মত তার সহকারীও প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত ছিল ভিক্টরের ওপর। তাকে হাতের কাছে পেয়েই সে সমানে পিটাতে শুরু করলাে। ভিক্টর শেষে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। তার পরে আর তার জ্ঞান ফেরেনি। পরের দিন অজ্ঞান অবস্থায়ই তাকে জল্লাদের সামনে উপস্থিত করা হলাে। জল্লাদ তাকে এক চৌকির ওপর শুইয়ে ধারালাে অস্ত্রের এক আঘাতেই দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে দিল।
তার দেহ ও মাথা পৃথক দুই গর্তে যখন পুতে ফেলা হচ্ছিল, সে সময় ইমামের প্রেরিত এক গােয়েন্দা ত্রিপলী থেকে অনেক দূরে চলে গিয়েছিল। উটের উপর সওয়ার হয়ে সে যাচ্ছিল কায়রাের দিকে। কায়রাে সেখান থেকে অনেক দূর। এমন দীর্ঘ সফরের ধকল কেবলমাত্র উটই সহ্য করতে পারে। এই দুর্গম পথের কষ্টকর সফরের মাঝেও সেই পথিক এক ধরনের তৃপ্তি অনুভব করছিল। কারণ এমন মূল্যবান তথ্য নিয়ে এই প্রথম সে যাচ্ছিল মুসলমানদের আশা ভরসার কেন্দ্র সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর কাছে।
৫৭৩ হিজরী মুতাবেক ১১৭৭ খৃস্টাব্দের প্রথম দিকের ঘটনা। কায়রাের প্যারেড গ্রাউণ্ডে অসাধারণ ও ব্যতিক্রমধর্মী এক প্রদর্শনীর আয়ােজন করা হয়েছে। নতুন ভর্তি সৈন্যরা ট্রেনিং শেষে ওখানে কুচকাওয়াজ করছিল। কখনাে সেখানে চলছিল ঘােড়দৌড়ের প্রতিযােগিতা। কখনাে নেজাবাজি, তলােয়ার যুদ্ধ, মল্ল যুদ্ধ, তীরের নিশানা।
পদাতিক বাহিনীর কুচকাওয়াজের পর মাঠে এলাে উষ্ট্রারােহী বাহিনী। তাদের পেছনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছিল ঘােড়সওয়ার বাহিনী।
কায়রাে শহরের বাইরে এক পাহাড়ী এলাকা। কেউ দেখলে ভাববে এখানে দুই পক্ষে তুমুল লড়াই চলছে। আসলে সেখানে আইয়ুবীর নতুন
সৈন্যদের মহড়া চলছিল। সৈন্যরা সেখানে পেট্রোল বােঝাই হাড়ি নিক্ষেপ করে তাতে অগ্নিবান নিক্ষেপ করল। সঙ্গে সঙ্গে চল্লিশ পঞ্চাশ হাত এলাকা জুড়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ল। অশ্বারােহীরা সেই আগুনের মধ্য দিয়ে তীরবেগে ছুটে গেল একদিক থেকে অন্য দিকে।
এ রকম যুদ্ধ মহড়া শুরু হলাে মরু অঞ্চলেও। কোন সৈন্যেরই সেখানে সঙ্গে পানি রাখার অনুমতি ছিল না।
এ সবই ছিল কঠিন প্রশিক্ষণের শেষ পর্যায়। নতুন রিক্রুট সৈন্যরা পরম উৎসাহে তাতে অংশ নিচ্ছিল। ভর্তি কার্যক্রমও তখন চলছিল সমান তালে। সামরিক বাহিনীর সমস্ত সেনাপতি, কমাণ্ডার ও অফিসাররা ট্রেনিং নিয়ে ব্যস্ত ছিল।
সুলতান আইয়ুবী সেনাবাহিনীকে এ কাজে লাগিয়ে দিয়ে দেশের প্রশাসনিক কাজের দিকে মনযােগ দিলেন। দিনে ব্যস্ত থাকতেন প্রশাসনিক কাজে, রাতে সেনাপতি এবং অফিসারদের নির্দেশ দিতেই তার রাত শেষ হয়ে যেতাে।
এক রাতে তিনি অফিসারদের নিয়ে বৈঠক করছিলেন। তিনি উপস্থিত অফিসারদের বললেন, যদি ক্রুসেড বাহিনী এ মুহূর্তে সেনা অভিযান না চালায় তবে তােমরা হয়তাে ভাবতে পারাে, তারা যুদ্ধ করতে অপারগ। কিন্তু এটা বিশ্বাস করা যায় না। তারা অবশ্যই আসবে, সিরিয়ার দিক দিয়ে না হােক, অন্য কোন দিক দিয়ে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তারা আক্রমণ চালাবেই এবং তা অতি তাড়াতাড়ি।
পরদিন তিনি সৈন্যদের মহড়া পরিদর্শনে গেলেন। তিনি এক উপত্যকায় দাড়িয়ে যুদ্ধের মহড়া দেখছিলেন। এক সেনাপতি সুলতানকে বললেন, এ পর্যন্ত শত্রু কবলিত অঞ্চল থেকে কোন না কোন ব্যক্তির আসা প্রয়ােজন ছিল।
সুলতান আইয়ুবী তার দিকে ফিরলেন। বললেন, হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছাে। আমিও এ কথাই ভাবছিলাম। ক্রুসেড বাহিনী অবশ্যই আমাদের ওপর আক্রমণ চালাবে। তবে তারা কোন দিক থেকে আসবে সে সংবাদ শুধু গােয়েন্দারাই বলতে
পারবে। তারাই বলতে পারবে দুশমন কোথায় প্রথম আক্রমণ করবে এবং তাদের সৈন্য সংখ্যা কত। শত্রু অঞ্চল থেকে আমাদের গােয়েন্দারা যতক্ষণ এ খবর না দিচ্ছে, ততক্ষণ আমরা অন্ধকারেই থাকবাে।
তিনি কথা বলছিলেন আর উপত্যকায় দাঁড়িয়ে তাকিয়ে দেখছিলেন দূর পাহাড়ের দৃশ্যাবলী। তখন তার নজরে পড়লাে, দূরে ধূলি উড়ছে। এই ধূলি এক কিংবা দুটি অশ্বারােহীর ছুটে আসার আগাম খবর দিচ্ছিল। তিনি পাশের অফিসারকে বললেন, দেখােততা, ওদিক দিয়ে কেউ আসছে মনে হয়!'
সঙ্গী অফিসার সেদিকে তাকিয়ে বললাে, “মােহতারাম সুলতান! মনে হয় আমাদের কোন সঙ্গীই আসছে।
সুলতান আইয়ুবী অফিসারকে নিয়ে যেদিক থেকে ধূলি উড়ছিল সেদিকে কিছু দূর এগিয়ে গেলেন। ততক্ষণে ধূলি মেঘ আরাে কাছে চলে এসেছে । সহসা ধূলি মেঘের মধ্যে দু’টি অশ্ব দেখা গেল।
অশ্বারােহীরা আরাে কাছে এলে তিনি একজনকে চিনতে পারলেন। একটি অশ্বের উপর ছিলেন আলী বিন সুফিয়ান, অপর আরােহীকে তিনি চিনতে পারলেন না। সে ছিল ত্রিপলী থেকে ইমাম সাহেবের পাঠানাে সেই গােয়েন্দা, যে ত্রিপলী থেকে রওনা দিয়েছিল উটের আরােহী হয়ে।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বেশ কিছু দিন পর সে কায়রাে এসে পৌছে। আলী বিন সুফিয়ান তার কাছ থেকে রিপাের্ট নিয়ে দেরী না করেই তাকে নিয়ে অশ্বপৃষ্ঠে চেপে বসলেন। উদ্দেশ্য, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এ রিপাের্ট সুলতান আইয়ুবীকে পৌছানাে।
গােয়েন্দা সুলতান আইয়ুবীকে জানালাে, ক্রুসেড বাহিনী ঝড়ের গতিতে আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের সৈন্য সমাবেশ শুরু হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশী সৈন্য নিয়ে এসেছে সম্রাট রিনাল্ট। তিনি এই বিশাল বাহিনীর নেতৃত্ব দিতে চান।'
‘এই সে রিনাল্ট, যাকে নূরুদ্দিন জঙ্গী গ্রেফতার করে যুদ্ধবন্দী হিসেবে কারাগারে রেখেছিলেন। সুলতান আইয়ুবী বললেন, ‘তিনি তাকে কিছু শর্ত সাপেক্ষে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জঙ্গীর অকস্মাৎ মৃত্যুতে রিনাল্টের মুক্তির পথ প্রশস্ত হয়ে যায়। ক্ষমতা ও অর্থ লােভী আমীররা মরহুম জঙ্গীর নাবালক সন্তানকে গদীতে বসিয়ে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য রিনাল্টকে নি:শর্ত মুক্তি দিয়ে দেয়। আজ সেই রিনাল্টই ইসলামকে মিটিয়ে দিতে আসছে। হ্যা, পরবর্তী রিপাের্ট শােনও! তারই তাে আক্রমণ করা উচিত, সে ছাড়া আর কে করবে?”
‘ত্রিপলীর সম্রাট রিমাণ্ড এই যুদ্ধের মূল পরিকল্পনাকারী। অধিকাংশ সৈন্য ওখানেই সমবেত হচ্ছে। বিভিন্ন রাষ্ট্রের খৃস্টান সম্রাটরা ওখানে বসেই আক্রমণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করছেন। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন সম্রাট বিল্ডন। তার সৈন্য সংখ্যাও কম নয়। ক্রুসেড বাহিনী কবে নাগাদ আক্রমণ চালাবে তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে আক্রমণ হবে হলব, হারান ও হিম্মতের দিক দিয়ে এই সংবাদ পাওয়া গেছে।
যুদ্ধে জেতার জন্য তারা সিরিয়াকেও ব্যবহার করবে। সিরিয়া ব্যাপক আক্রমণে না গেলেও সীমান্তে গােলযােগ সৃষ্টি করে আপনাকে ব্যতিব্যস্ত ও পেরেশান করবে। যুদ্ধের চূড়ান্ত দিন তারিখ ঠিক না হলেও শীঘ্রই তারা যুদ্ধ যাত্রা করবে, এটা বুঝা যাচ্ছে।
‘আলী বিন সুফিয়ান!' সুলতান আইয়ুবী বললেন, ত্রিপলী থেকে শেষ সংবাদ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকবাে আমি। সুনির্দিষ্ট দিন তারিখের খবর অবশ্যই তুমি পাবে। ওই পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করতে চাই। আমি জানতে চাই, তারা কোন পথে কত সৈন্য নিয়ে যাত্রা করছে।
‘সে সংবাদের জন্য অপেক্ষা করার সময় আপনি পাবেন না সুলতান।' আলী বিন সুফিয়ান নয়, কথাটা বললাে সেই গােয়েন্দা, যে ত্রিপলী থেকে এসেছিল। ক্রুসেড বাহিনীর হেড কোয়ার্টারে আমাদের যে দু’জন গােয়েন্দা ছিল, তারা দু'জনেই মারা গেছে।
রাশেদ চেঙ্গিস ও ভিক্টরের ঘটনা তুলে ধরে সে বললাে, সম্রাট রিনাল্ট দাবী করেছেন, তার বাহিনীতে আড়াই'শ নাইট রয়েছে।'
সুলতান আইয়ুবীর চোখ রাগে লাল হয়ে গেল। তিনি বললেন, যুদ্ধে প্রথম পরাজয় ঘটে যখন কোন বাহিনী প্রতিপক্ষের শক্তি ও পরিকল্পনা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিতে না পারে। ইমাম সাহেব তােমাকে আর কিছু বলেছেন?
ইমাম সাহেব জানিয়েছেন, সেই দুই গােয়েন্দা মরার আগে বলে গেছে, ক্রুসেড যোদ্ধারা আপনার গেরিলা বাহিনীকে এবার আর অতর্কিত অন্ধকারে আক্রমণের সুযােগ দেবে না। তারা এমন কিছু ফন্দি এঁটেছে, যাতে কমাণ্ডো বাহিনী বেকায়দায় পড়ে যাবে।'
আর! আর কোন খবর আছে?
‘আপনার দুর্বলতাটুকু জানা আছে ক্রুসেড বাহিনীর। তারা জানে, আপনার সৈন্য সংখ্যা কম। অভিজ্ঞ সেনানায়করা বিগত যুদ্ধগুলােতে হয় মারা গেছে, নয়তাে পঙ্গু হয়েছে। তাছাড়া আপনার কাছে এখন যুদ্ধ উপকরণও সামান্যই আছে।' বললাে সেই গােয়েন্দা, তাই তারা এবার বিশাল বাহিনী নিয়ে আসছে, যাতে আপনার বাহিনীকে অবরুদ্ধ করে চূড়ান্তভাবে ধ্বংস করে দিতে পারে।
গােয়েন্দার কাছ থেকে এই সংবাদ পাওয়ার পর সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীকে বেশী বাইরে বেরুতে দেখা যেত না। তিনি অধিকাংশ সময় তার নিজের অফিস কক্ষেই থাকতেন। কাগজের উপর সম্ভাব্য যুদ্ধের পরিকল্পনা ও নকশা আঁকতেন। সেই নকশার উপর আক্রমণের ও পাল্টা আক্রমণের রেখা আঁকতেন।
কখনও তিনি সেনাপতিদের ডেকে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। কখনও তাদের সাথে বিতর্কে জড়িয়ে যেতেন। তিনি তাদেরকে বলতেন, “তােমরা ভাল মত চিন্তা-ভাবনা করাে। স্বাধীনভাবে সেই মতামত ব্যক্ত করাে। উত্তম কোন চাল মাথায় এলে তা প্রকাশ করতে বিলম্ব করাে না। এবারের লড়াই হবে বুদ্ধির। সৈন্য সংখ্যা দিয়ে এবার খৃস্টানদের মােকাবেলা করা যাবে না। জিততে হলে কৌশল ও বুদ্ধির জোরেই জিততে হবে।
এই সেনাপতিদের মধ্যে একজন ছিলেন ঈশা আল হেকারী । তিনি যেমন যােগ্য সেনাপতি ছিলেন, তেমনি ছিলেন পণ্ডিত ও আইনজ্ঞ। অনেক ঐতিহাসিক তাকে সুলতান আইয়ুবীর দক্ষিণ হস্ত বলে উল্লেখ করেছেন।
একদিন সুলতান আইয়ুবী হঠাৎ কোন ঘােষণা ছাড়াই সৈন্যদের যুদ্ধ যাত্রা করার হুকুম দিলেন। তিনি তাঁর বাহিনীর এক বিরাট অংশকে সুদানের সীমান্ত এলাকায় পাঠিয়ে দিলেন। কারণ ওদিক থেকে আক্রমণের যে আশংকা ব্যক্ত করছিল গােয়েন্দা, তিনি তার যৌক্তিকতা বুঝতে পারছিলেন। সিরিয়া বর্ডারে গােলমাল সৃষ্টি করলে তাদের মদদ জোগাবে ক্রুসেড বাহিনী। এই অবস্থায় ক্রুসেড বাহিনীর মােকাবেলার জন্য তিনি মিশরের সব সৈন্যকে সঙ্গে নিতে পারছিলেন না। তিনি যখন যুদ্ধ যাত্রা করলেন তখন, ঐতিহাসিকদের মতে তাঁর সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র এক হাজার পদাতিক বাহিনী। এরা সবাই ছিল মামলুক বংশের। এরা সাহসী, বীর ও যােদ্ধা। এ ছাড়া আট হাজার ছিল অশ্বারােহী সৈন্য। এদের অধিকাংশই ছিল মিশরী ও সুদানী। ১৯৬৯ সালে সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার অপরাধে তাদের সেনা বাহিনী থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং তাদেরকে এক উর্বর অঞ্চলে কৃষিকাজে নিয়ােজিত করা হয়। এখন তারা মিশরের এমন অনুগত প্রজা, যাদের উপর ভরসা করা যায়। এই আট হাজার অশ্বারােহী ও এক হাজার পদাতিক বাহিনীর সবাই নতুন রিক্রুট করা সৈন্য।
সুলতান আইয়ুবী তাঁর নিজস্ব সৈন্য বাহিনী তার ভাই তকিউদ্দিনের নেতৃত্বে হলবে রেখে এসেছিলেন। তিনি গােপন সূত্রে জানতে পারলেন, এখনও সিরিয়ার সেনা বাহিনী সীমান্তে গােলযােগ সৃষ্টির জন্য কোন প্রস্তুতি নেয়নি।
তিনি তীব্রগতিতে হলব গিয়ে পৌছলেন। সেখানে পৌঁছেই তিনি জানতে পারলেন, ক্রুসেড বাহিনী হারান দূর্গ অবরােধ করে রেখেছে। সুলতান আইয়ুবী সেখানে দম না নিয়েই ছুটলেন হারান অভিমুখে। দূর্গ অবরােধকারী ক্রুসেড বাহিনীকে স্তম্ভিত করে তিনি সেই বাহিনীকে পাল্টা অবরােধ করে বসলেন।
সুলতান আইয়ুবীর এই অবরােধ ও আক্রমণ এমন আকস্মিক ছিল যে, ক্রুসেড বাহিনী ফিরে দাঁড়ানাের আগেই তিনি সেই বাহিনীকে তছনছ করে দিলেন। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ধাওয়া আর পাল্টা ধাওয়া চললাে বিক্ষিপ্তভাবে। ক্রুসেড বাহিনী আর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুযােগ পেল না। আইয়ুবীর পাল্টা ধাওয়া খেয়ে ছিন্নভিন্ন ক্রুসেড বাহিনী পালাতে গেল। বিজয়ের স্বপ্ন নিয়ে ত্রিপলী থেকে ছুটে আসা ক্রুসেড বাহিনী পালাতে গিয়ে পড়ল মহা বেকায়দায়। এখানকার পথঘাট তাদের অচেনা, জনগণ তাদের প্রতিপক্ষ। কে তাদের আশ্রয় দেবে, কে দেবে একটু লুকানাের জায়গ?
না, তারা লুকানাের কোন জায়গা পেল না। হারানের জনগণ গণধােলাই দিয়ে তাদের ধরে এনে সুলতানের বাহিনীর হাতে সােপর্দ করতে লাগল। দেখতে দেখতে ক্রুসেড বাহিনীর বহু সৈন্য ধরা পড়লাে আইয়ুবীর বাহিনীর হাতে।
এই ফাঁকে বেরিয়ে এলাে হারান দূর্গের সৈন্যরা। তারা শত্রু সৈন্য বন্দী করার খেলায় মেতে উঠল। বৃষ্টি হলে কৈ মাছ যেমন পানি থেকে উঠে এসে মাঠ জুড়ে ছুটতে থাকে তেমনি ছুটছিল ক্রুসেড বাহিনী। আর গ্রামের ছেলে-বুড়াে কৈ মাছ ধরার মতই আনন্দে মাতােয়ারা হয়ে তাদের ধরে ধরে মুসলিম বাহিনীর হাতে তুলে দিচ্ছিল।
সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী এই সৈন্য ধরাঁ খেলায় অংশ নিলেন না। তিনি দুর্গের সৈন্যদের ওপর এ দায়িত্ব অর্পণ করে নিজের বাহিনী নিয়ে ছুটলেন অভিযানে। ঝড়ের মত ছুটে গিয়ে খৃস্টান অধিকৃত গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি লিডিয়া ও রমলা দখল করে নিলেন।
মিশরের নতুন রিক্রুট সৈন্যদের মনােবল এই বিজয়ে অনেক বেড়ে গেল। তারা ভাবলাে, যুদ্ধে বিজয় লাভ করা তাে তেমন কঠিন কিছু নয়! শুধু একটু সাহস ও মনােবলের দরকার। তাহলেই দুশমন ফৌজ ধরাশায়ী হয়ে যায়।
তাদের আরাে মনে হলাে, যেখানে সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী থাকবেন, বিজয় সেখানে এসেই চুমু খাবে। তিনি যে বলেছেন, অবশেষে সত্যের সেনানীরাই বিজয়ী হয় এটাই খাঁটি কথা। আমরা লড়াই করি নামে মাত্র, মূল লড়াই তাে করে আল্লাহর ফেরেশতারা। তাই বিজয় কেবল আমাদের ভাগ্যেই লেখা আছে।
এই চিন্তা নতুন সৈন্যদের ওপর দু’রকম প্রভাব ফেলল। একদল খুব বেপরােয়া হয়ে গেল। তারা ধরেই নিল, বিজয় যেহেতু আমাদের হাতে, অতএব নির্ভয়ে অস্ত্র চালাও। দুশমন শেষ পর্যন্ত আমাদের কিছুই করতে পারবে না। আরেকদল এই ভাবনার কারণে অসাবধান হয়ে উঠলাে। তাদের ইচ্ছা এ রকম, বিজয় তাে আমাদের হবেই। অতএব ঝুঁকি এড়িয়ে গিয়ে ময়দানে একটু দাঁড়াতে পারলেই হয়। তারপর আল্লাহর সাহায্য চলে আসবে এবং আমরা বিজয় নিয়ে ময়দান থেকে আবার ঘরে ফিরে যাবাে।
ক্রুসেড বাহিনী এই প্রথম নিজেদের পরিকল্পনা রেখে আইয়ুবীর স্টাইলে যুদ্ধ পরিচালনা করছিল। তারা ইচ্ছে করেই অল্প সংখ্যক সৈন্য দিয়ে হারান দুর্গ অবরােধ করেছিল। তারা জেনে শুনেই ফ্রাঙ্কিসের বাহিনীকে হারান দুর্গ অবরােধ করতে পাঠিয়েছিল। সম্রাট রিনাল্ট ও বিল্ডনের শক্তিশালী বাহিনী তখনও ছিল বেশ দূরে, রমলার কাছে এক পাহাড়ের আড়ালে। তারা জানতাে সুলতান আইয়ুবী সহজেই হারানের খৃস্টান বাহিনীকে পরাজিত করতে পারবে। হারানে বিজয় লাভ করলে আইয়ুবী কিছুতেই সেখানে থেমে থাকবে না। সে এগিয়ে লিডিয়া ও রমলার দুর্গ দখল করতে ছুটে আসবে।
আর এই সুযােগটিই গ্রহণ করতে হবে আইয়ুবীকে জন্মের মত শিক্ষা দেয়ার জন্য।
সুলতান আইয়ুবীর কাছে ত্রিপলীর গােয়েন্দা ছাড়া আর কোন গােয়েন্দা অসার সুযােগ পায়নি। তার আগেই তিনি ঝড়ের বেগে অভিযানে বেরিয়ে পড়েছিলেন। ফলে খৃস্টান বাহিনীর চূড়ান্ত অভিযানের খবর আইয়ুবীর কাছে পৌছাতেই পারেনি।
রমলার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে এক নদী। নদীতে তেমন পানি ছিল না। তাই নদীর পাড় ছিল বিস্তৃত। নদীর পাশে বড় বড় বৃক্ষের সারি। নদীর সুবিস্তৃত ঢালুতে লুকিয়ে ছিল খৃস্টনদের বিশাল বাহিনী।
সেনাপতি' ঈশা আল হেকারী রমলা জয় করার পর তার সৈন্যদেরকে রমলার আশেপাশে ছড়িয়ে দিলেন। হঠাৎ নদীর ঢালু পাড় বেয়ে পিঁপড়ের সারির মত উঠে এলাে ক্রুসেড বাহিনী। আইয়ুবী যেমন অতর্কিতে দুশমন বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সবুকিছু তছনছ করে দিতেন, তেমনি ওরা তুফান বেগে ঝাঁপিয়ে পড়লাে সেই বাহিনীর ওপর।
নদীর পাড়ে ক্রুসেড বাহিনী লুকিয়ে আছে এ কথা জানা ছিল না হেকারীর বাহিনীর। বিজয়ের পর তারা ঢিলেঢালা মেজাজে পাহাড়ের ঢালে, বৃক্ষের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছিল। কোথেকে এত ক্রুসেড সৈন্য ছুটে এল এ কথা বুঝার আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল অনেক মুজাহিদ। ক্রুসেড বাহিনীর এই প্লাবনের সামনে দাঁড়ায় সে শক্তি ঈশা আল হেকারীর সৈন্যদের ছিল না। ক্রুসেড বাহিনীর এ আকস্মিক হামলায় বহু সৈন্য অজ্ঞাতেই মারা পড়ল।
যারা নদী পাড় থেকে দূরে ছিল তারা তাৎক্ষণিক প্রতিরােধ গড়ে তােলার চেষ্টা করল। কিন্তু খৃস্টান বাহিনীর প্লাবনের মুখে খড়-কুটোর মতই ভেসে গেল তারা। যারা এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে আর মােকাবেলা বরার সুযােগ পেল না। ত্রিপলীর সেই গােয়েন্দার রিপাের্টই সত্য প্রমাণিত হলাে, ক্রুসেড বাহিনী এবার এমন চাল চাবে, যা সুলতান আইয়ুবীর ধারনার বাইরে। আইয়ুবীর যুদ্ধের চল বুঝে ফেলেছে খৃস্টান বাহিনী। পুরােনাে চালে লড়ে আর জিততে পারবেন না আইয়ুবী।
ইবনে আসির লিখেছেন, ক্রুসেড বাহিনী নদী থেকে এমন স্রোতের মত পাড়ে প্লাবিত হতে লাগলাে, যেন ঘােড়া ও জনতার স্রোত নদীর কুল ভাসিয়ে নিয়ে যেতে লাগলাে। সুলতান আইয়ুবীর সামান্য সৈন্য সেই স্রোতের মুখে পড়ে অজ্ঞাতেই মারা গেল।'
প্রসিদ্ধ খৃস্টান ঐতিহাসিক জেমস লিখেছেন, সম্রাট বিলডন সুলতান আইয়ুবীর আগেই তার বিশাল বাহিনী এনে রমলা নদীর বিস্তৃত ঢালু পাড়ে লুকিয়ে রেখেছিলেন। সুলতান আইয়ুবীর সৈন্যরা রমলা দুর্গ ও শহর দখল করে নিল। তারপর তারা শহরে আগুন ধরিয়ে দিয়ে উল্লাসে ফেটে পড়লে ক্রুসেড বাহিনীর জালে আটকা পড়ল। সফল হলাে ক্রুসেড বাহিনীর চাল।
(চলবে)
এই মসজিদ ছিল ত্রিপলীতে সুলতান আইয়ুবীর গােয়েন্দা বিভাগের হেড কোয়ার্টার। আর মসজিদের ইমাম শুধু একজন ইমামই ছিলেন না, তিনি ত্রিপলীর গােয়েন্দা বিভাগেরও প্রধান।
রাত তখন অর্ধেকের বেশী পার হয়ে গেছে। ইমাম সাহেব গভীর নিদ্রায় ডুবে ছিলেন। দরােজার টোকা তাকে জাগিয়ে দিল। তিনি সজাগ হয়ে একটু থামলেন। এ সময় তিনি আবার দরজায় টোকার শব্দ শুনতে পেলেন। দরজায় টোকা দেয়ারও একটা নির্দিষ্ট ভঙ্গি ঠিক করে দেয়া ছিল গােয়েন্দাদের জন্য। তিনি সেই সাংকেতিক টোকাই শুনতে পেলেন। বিছানা ছেড়ে উঠলেন তিনি। সাবধানতার জন্য একটি লম্বা খঞ্জর হাতে নিলেন। তারপর দরজা ফাঁক করে বললেন, - কে?”
‘আমি ভিক্টর। আগে ভেতরে চলুন, জরুরী কথা আছে।
‘রক্তের গন্ধ আসছে কোত্থেকে?’ ইমাম সাহেব অন্ধকারেই রক্তের গন্ধ পেয়ে প্রশ্ন করে বসলেন।
‘জ্বি, আমার শরীর থেকেই!' ভিক্টর উত্তর দিল।
ইমাম সাহেব আর কোন প্রশ্ন না করে তাকে ভেতরে টেনে নিয়ে গেলেন। প্রদীপ জ্বালিয়ে দেখতে পেলেন, ভিক্টরের কাপড়ে রক্তের লাল দাগ। এখনও তা টাটকা ও ভেজা।
ভিক্টরের পরিচয় ইমাম সাহেবের জানা ছিল। সে কোথায় এবং কি দায়িত্বে আছে, তাও জানতেন তিনি। যদিও ভিক্টরকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন না তিনি, তবে ভিক্টর নামের একজন অপারেটর সম্রাট রিমাণ্ডের রাজপরিবারে খাদ্য বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছে এ কথা এখানকার দায়িত্বে এসেই জানতে পেরেছিলেন তিনি। নিয়ম মত তিনি তার কাজের রিপাের্টও পাচ্ছিলেন। সে যে খৃস্টান তাও জানতেন তিনি। এ ধরনের অপারেটরদের সামনে আনা বিপদজনক বিধায় তিনি কোন দিনই তাকে এখানে ডাকেননি, পরিচিত হতে চাননি। কিন্তু আজ যেহেতু সে নিজেই ছুটে এসেছে তখন বুঝতে হবে, বড় রকমের কোন সমস্যা হয়ে গেছে। তিনি উদ্বিগ্ন কণ্ঠে তার সাথে কিছু সাংকেতিক কথা বিনিময় করলেন। এতে এই লােকই যে ভিক্টর সে ব্যাপারে নিশ্চিত হলেন তিনি। এটাই গােয়েন্দাদের পরস্পরকে চেনার সহজ পদ্ধতি।
‘তুমি এলে যে! চেঙ্গিস কোথায়? সে আসেনি কেন?' ইমাম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন।
‘সে আর কোনদিন আসতে পারবে না।' ভিক্টর বললাে।
‘কেন? ইমাম সাহেব ভীত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, সে কি ধরা পড়ে গেছে?"
তার পাপ তাকে গ্রেফতার করেছে। ভিক্টর উত্তর দিল, আর আমার খঞ্জর তার পাপের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। আমার কাঁধ ও বাহু থেকে এখনাে রক্ত ঝরছে। আমার রক্ত পড়া বন্ধ করার কোন ব্যবস্থা করতে পারবেন আপনি?’
দাঁড়াও, আমি এখনি নতুন করে ব্যাণ্ডেজ করে দিচ্ছি। তুমি ভয় পেয়াে না।
ইমাম সাহেব জলদি ঔষুধ বের করলেন। পানি এনে তার আহত স্থান পরিষ্কার করতে করতে বললেন, “কি ঘটেছে বলাে তাে!”
বলছি। পেরেশান হওয়ার মত এখন আর কিছু নেই। যা ঘটার তা ঘটেই গেছে। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করুন, চেঙ্গিস জীবিত নেই। সে বেঁচে থাকলে আমাদের কেউ কারাগারের নিদারুণ যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে পারতাম না।'
ইমাম সাহেব তার জখম পরিষ্কার করে সেখানে ঔষধ ছিটিয়ে দিচ্ছিলেন। ভিক্টর ধীরে ধীরে আদ্যোপান্ত সমস্ত ঘটনা ইমাম সাহেবকে খুলে বলতে লাগলাে। সে বলল, যখন আমি নিশ্চিত হয়ে গেলাম, এই মেয়ে চরম ধোকা ও প্রতারণা দিয়ে চেঙ্গিসকে মহা বিপদের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, তখন আমি তাকে বাঁধা দিলাম। আমি সেই বুড়াে জেনারেলের খোঁজ নিলাম, যার আশ্রয়ে মেয়েটি আছে বলে জানিয়েছিল চেঙ্গিসকে। কিন্তু এই নামে তাদের কোন জেনারেলই নেই। মেয়েটি কোথায় থাকে এ খোঁজ নিতে গিয়ে আমি অবাক হয়ে গেছি। মেয়েটি ক্রুসেড বাহিনীর গােয়েন্দাদের কোয়ার্টারে থাকে।
গত কয়েকদিন ধরেই প্রতি রাতে সে চেঙ্গিসের পথ আগলে দাঁড়াচ্ছিল। এতে করে চেঙ্গিস আর আপনার কাছে পৌঁছতে পারছিল না। যে সব গুরুত্বপূর্ণ খবর আপনার কাছে পৌঁছানাে জরুরী ভেবে তাকে আপনার কাছে পাঠাতাম, সেগুলাে তার পকেটেই পড়ে থাকতাে, আপনার কাছ পর্যন্ত পৌঁছতাে না। এটা যে চরম দায়িত্বহীনতার পরিচায়ক, এ কথাটুকু বুঝার ক্ষমতাও তার লােপ পেয়েছিল।
মেয়েটা তার কাছে আসতাে ধোঁকা দিয়ে তার মুখোেশ খুলে দিতে। সে প্রতি মুহূর্তে চেঙ্গিসের ওপর দৃষ্টি রাখতাে। নইলে সে যখনি বাগানে প্রবেশ করতাে, মেয়েটি কোথেকে তার কাছে ছুটে আসতাে? আমি এসব বলে যখনই চেঙ্গিসকে সাবধান করতে চেষ্টা করেছি, তখনই সে আমার উপর রাগে ফেটে পড়েছে।
আপনি শুনলে অবাক হবেন, সে মদ পান করতে শুরু করেছিল। আমার সন্দেহ হচ্ছে, তাকে মদের সাথে হাশিশও পান করানাে হয়েছিল। নইলে চেঙ্গিসের মত দৃঢ়চেতা লােক প্রতারণার শিকার হতে পারে না। আগেও অনেক সুন্দরী মেয়ে তাকে ভালবাসার জালে আবদ্ধ করতে চেয়েছে। কিন্তু সে, ওদের কোন পাত্তাই দেয়নি। ভালবাসার প্রস্তাব শুনলেই সে ওসব হেসে উড়িয়ে দিয়েছে। এই মেয়েটা তাকে ঘায়েল করেছিল একই সঙ্গে তার রূপ, যৌবন, মদ আর হাশিশ প্রয়ােগ করে। ফলে সে শারিরীক ভাবে না হলেও মানসিক ভাবে মেয়েটির ফাঁদে পড়ে গিয়েছিল।
চেঙ্গিস যখন আমাকে বললাে, সে গােয়েন্দা এ কথা মেয়েটির কাছে ফাঁস করে দিয়েছে , তখনই আমার প্রাণ কেঁপে উঠেছিল। আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, চেঙ্গিস যে অপরাধ করছে তাতে সে একা মরবে না, আমাদের সবাইকে সে ডুবিয়ে মারবে। এর শাস্তি স্বরূপ এমন বিপর্যয় নেমে আসতে পারে, যাতে মিশরের স্বাধীনতারও মৃত্যু ঘটার সম্ভাবনা আছে।
আমি তাকে এসবই বুঝাতে চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু মেয়েটি তার মাথা এমন ভাবে খেয়ে ফেলেছিল যে, তার দায়িত্ব এবং ঈমানের দাবীর চাইতেও সে মেয়েটির কথাকে বেশী গুরুত্ব দিতে শুরু করেছিল।
আমি তখন মনে মনে সংকল্প করলাম, এ বিপদ এড়াতে হলে একটাই পথ খােলা আছে, আর তা হলাে, মেয়েটাকে হত্যা করা। এতেও যদি চেঙ্গিসের হুশ না হয়, তবে তাকেও দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হবে। দেশ ও জাতির চাইতে কোন একক মানুষের মূল্য অধিক হতে পারে না। দেশের জন্য, জাতির জন্য, ধর্মের জন্য ব্যক্তির জীবন দান, নতুন কোন বিষয় নয়। যুগে যুগে এমনি নজরানা পেশ করার ফলেই সভ্যতা টিকে আছে। আর গােয়েন্দাদের ব্যাপারটি তাে আরাে নাজুক। এ জন্য সর্ব মহলের স্বীকৃত নীতিমালা হচ্ছে, দলে কেউ গাদ্দারী করলে বা তার দ্বারা গােপন তথ্য প্রকাশ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে, তাকে সঙ্গে সঙ্গে শেষ করে দাও।
তবুও আমি তাকে হত্যা করতে অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগেছি। কিন্তু সে যখন আমাকে হত্যা করতে পাগল পারা হয়ে উঠলাে.......'
‘এটাও তাে হতে পারে, তুমি তাকে ভুল ধারণায় খুন করে ফেলেছাে!' ইমাম সাহেব বললেন, 'এমনও তাে হতে পারে, মেয়েটি মুসলমানই ছিল, সে সরল মনেই আমাদের জন্য কাজ করছিল এবং আরাে করার ইচ্ছা ছিল!'
হ্যা! তা হতে পারতাে। ভিক্টর বললাে, কিন্তু আমি যখন প্রমাণ পেলাম, তখন তাে আর অনুমানের প্রশ্ন থাকে না । আমি নিজেই মেয়েটিকে তাদের ক্যাম্পে দেখেছি। এক জেনারেলের আশ্রিতা বলে সে যে কথা রটিয়েছে, সে কথাও সম্পূর্ণ মিথ্যা। এই মেয়েটি সেখানেই থাকতাে, যেখানে হরমনের গুপ্তচর বাহিনীর মেয়েরা থাকে। আজও সে ওই ক্যাম্প থেকেই রাতে বেরিয়ে এসেছিল এবং চেঙ্গিসকে অনুসরণ করে বাগানে ঢুকে তার সাথে অভিসারে মেতে উঠেছিল।
তারা যেখানে বসে গল্প করছিল তার থেকে কয়েকগজ দূরেই একটি ঝােপের আড়ালে বসে আমি তাদের সমস্ত আলাপ শুনেছি। মেয়েটি যেভাবে চেঙ্গিসের কাছ থেকে গােপন তথ্য বের করে নিচ্ছিল তা শুনলে যে কেউ বুঝতে পারতাে, এই মেয়ে সত্যি ক্রুসেড বাহিনীর পাঠানাে গােয়েন্দা। সে জানতে চাচ্ছিল, ত্রিপলীতে আমাদের কতজন গােয়েন্দা আছে। এখানে আমাদের কোন কমান্ডো বাহিনী আছে কিনা। এ তথ্য বের করার জন্য সে চেঙ্গিসকে একটি কাল্পনিক গল্প শােনাল। বলল, ক্রুসেড বাহিনীর বেশুমার রসদ ও আসবাবপত্র এক জায়গায় স্তুপ করে রাখা আছে। সেখানে প্রচুর আগ্নেয়াস্ত্র, পেট্রোল ও বিস্ফোরক দ্রব্য আছে। এসব ধ্বংস করার জন্য কমাণ্ডো বাহিনী দরকার।
আমি এই শহরেরই একজন সতর্ক গােয়েন্দা। আমি ভাল করেই জানি, যেখানে রসদ মওজুদ আছে বলে জানিয়েছে মেয়েটি, সেখানে এর কিছুই নেই। ইচ্ছে করলে আপনি নিজেই কাল সেখানে গিয়ে একবার দেখে আসতে পারেন। চেঙ্গিস তার কাছে আমাদের গােয়েন্দা বিভাগের সমস্ত তথ্য দিয়ে দিল। সে আমার নাম নিয়ে এটাও বলল, খৃস্টান হলে আমি মুসলিম বাহিনীর পক্ষে কাজ করছি। আপনি জানেন আমি এমন জায়গায় বসে আছি, যেখানে সকল সংবাদ ও গােপন তথ্য সহজেই জেনে নেয়া যায়। মেয়েটি যখন আমার নাম শুনলাে, সে এতই আশ্চর্য হলাে যে, অনেকক্ষণ পর্যন্ত কোন কথাই বলতে পারল না।
সব তথ্য নেয়ার পর মেয়েটি উঠে দাঁড়ালাে এবং চেঙ্গিসে কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সেই ক্যাম্পের দিকেই রওনা দিল। আমি ভেবে দেখলাম, মেয়েটি আমাদের সমস্ত গােপন তথ্য নিয়ে চলে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই এ তথ্য সােজা চলে যাবে হরমন সাহেবের কাছে। আর তার পরিণাম ফল তো আপনি নিজেই বুঝতে পারছেন।
আমি তৎক্ষণাৎ উঠে মেয়েটাকে ধরে ফেললাম ও আমার খঞ্জর তার বুকে বসিয়ে দিলাম। চেঙ্গিস আমার উপর ঝাপিয়ে পড়লাে । তাকে অনেক বুঝালাম, সত্য ঘটনা বললাম, কিন্তু মদের নেশা তাকে পশু বানিয়ে দিয়েছিল। আমি তার খঞ্জরের আঘাতে আহত হলাম, তবুও তাকে বুঝাতে চেষ্টা করলাম কিন্তু তার চিন্তা করবার ও বুঝবার ক্ষমতা লােপ পেয়েছিল।
আমি ভেবে দেখলাম, যদি সে জীবিত থাকে তবে আমাকে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হবে। তাতেও আমার কোন দুঃখ ছিল না। কিন্তু সে বেঁচে থাকলে আমাদের দলের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে । শেষে বাধ্য হয়ে তাকেও দুনিয়া থেকে বিদায় করলাম।
তুমি ভালই করেছাে!' ইমাম সাহেব বললেন, আমি তােমার সিদ্ধান্তকে মেনে নিলাম। তুমি এখন ত্রিপলী থেকে বের হয়ে যাও। আমি সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।’
'না!' ভিক্টর বললাে, ‘ভাের বেলা লােকেরা উঠে চেঙ্গিস ও মেয়েটির লাশ দেখতে পাবে। মেয়েটিকে হরমন সাহেবই এ কাজে নিযুক্ত করেছেন। অতএব তার এ কথা বুঝতে কোনই অসুবিধা হবে না যে, এই দু’জনকে মুসলমান গােয়েন্দারাই হত্যা করেছে। তখন খুনীকে ধরার জন্য মুসলমানদের ওপর কিয়ামত শুরু হয়ে যাবে। সরকারের পক্ষ থেকে তাকে এ ক্ষমতা আগেই দেয়া হয়েছে যে, এখানে কোন লােকের উপর তার সন্দেহ হলে তিনি তাকে কারাগারে নিতে পারবেন, ইচ্ছে করলে তাকে হত্যাও করতে পারবেন।
ত্রিপলীর প্রতিটি মুসলিম বাড়ীতেই এখন গােয়েন্দা লাগানাে আছে। তারা মুসলমানদের উপরে জুলুম অত্যাচার চালানাের জন্য কোন একটু সূত্র খুঁজছে। এই খুন তাদের হাতে সেই সূত্র তুলে দেবে। এটা আমি কিছুতেই হতে দিতে পারি না।' ভিক্টর বললাে, আমি আমার ডিউটিতে ফিরে যাচ্ছি। এই হত্যাকাণ্ড আমিই করেছি, এর দায়িত্বও আমিই বহন করবে।
কারণ হিসাবে বলবাে, চেঙ্গিস আমার প্রিয়তমাকে বিপথগামী করেছিলাে।
‘আমি এত বড় কোরবানী তােমার কাছ থেকে নিতে পারি না।' ইমাম সাহেব বললেন, “আমি তােমার সাথে একজন লােক দিচ্ছি, সে তােমাকে কায়রাে পৌঁছে দেবে।'
‘আমি আমার জীবনের কোরবানীই তাে দিতে চাই।' ভিক্টর বললাে, “আজ আমার জীবনের সেই মুহূর্তের কথা মনে পড়ছে, যখন আমাদের শহরে দুই খৃস্টান সামরিক অফিসার আমার বােনের উপর নজর দিয়েছিল। তারা তাদের সৈন্যদের আদেশ দিয়েছিল আমার বােনকে উঠিয়ে নেয়ার জন্য। কোন খৃষ্টানই আমার বােনকে তাদের হাত থেকে উদ্ধারের জন্য চেষ্টা করতে রাজি হয়নি। কিন্তু সেদিন মাত্র তিনজন মুসলিম নওজোয়ান তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। লড়াই করতে করতে এক যুবক ঘটনাস্থলেই মারা যায় এবং বাকী দুই যুবক আহত হয়। কিন্তু তারা হার মানেনি, তারা আমার বােনকে উদ্ধার করতে পেরেছিল।
এই ঘটনাই আমাকে মুসলমানদের প্রতি সহানুভূতিশীল করে তােলে। এক ভাই হয়ে আমি যা পারিনি, এক মুসলিম যুবক নিজের জীবন দিয়ে সেই অসাধ্য সাধন করেছিল। আমি এর শােকর আদায় করার সুযােগ খুঁজছিলাম। তাই যখন মুসলমানদের পক্ষ থেকে আমাকে গুপ্তচরবৃত্তি করার আহবান জানানাে হলাে, আমি তাতে রাজি হয়ে যাই। আমি আপনাদের গােয়েন্দা বিভাগে যােগ দিয়েছিলাম সেই শহীদ যুবকের বদলা দিতে। আমি আপনার কাছে সে উপকারের বদলা দেয়ার একটু সুযােগ চাই। আমার মত একজন মানুষের কোরবানী যদি একটি জাতিকে নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচিয়ে দেয়, তবে এটা কি এক বিশাল পাওনা নয় আমার জন্য? তাহলে আপনি কেন আমাকে এই মহত্তর বদলা দেয়ার সুযােগ থেকে বঞ্চিত করবেন? আমি আমার অপরাধ স্বীকার করে ত্রিপলীর মুসলমানদের জীবন ও সম্মান রক্ষা করার সামান্য সুযােগ চাই আপনার কাছে।
সে ইমাম সাহেবকে আরাে বললাে, ক্রুসেড বাহিনী তাদের সৈন্যদেরকে একত্রিত করা শুরু করেছে। তাদের সমরাভিযান শুরু হবে হলবের দিক থেকে। তারা আগে হলব ও হারান অধিকার করার প্ল্যান নিয়েছে। এখনও জানা যায়নি, কবে তারা অভিযান শুরু করবে। আর এটাও জানা যায়নি, তাদের সকল সৈন্য কি এক দিনেই আক্রমণ চালাবে, নাকি বিভিন্ন দিকে ভাগ হয়ে যাবে, কিংবা একই সাথে সব সেক্টরেই যুদ্ধ চালাবে। সুলতান আইয়ুবীর কাছে এই সংবাদ অতি দ্রুত পৌছানাে দরকার, তিনি যেন মিশরেই বসে না থাকেন।
ভিক্টর যা কিছু জানতাে সব কিছুই ইমাম সাহেবকে জানিয়ে দিয়ে সে উঠে দাঁড়ালাে। ইমাম সাহেবের আপত্তি সত্বেও সে বললাে, আপনি এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকুন, আপনাকে বা অন্য কাউকে এ ঘটনার জন্য কোন প্রশ্নই করবে না খৃস্টানরা।মসজিদ থেকে বেরিয়ে এলাে ভিক্টর। তার শরীর থেকে রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ইমাম সাহেব তার আহত স্থানে ভাল মত পট্টি বেঁধে দিয়েছিলেন। সে যার কাছে যাচ্ছিল, সে যদি জানতে চায়, তােমার পট্টি বেঁধে দিল কে, এই ভয়ে সে তার পট্টি খুলে ফেললাে। ব্যাণ্ডেজ খুলে ফেলতেই তার ক্ষতস্থান থেকে আবার রক্ত পড়া শুরু হলাে।
মসজিদ থেকে বেরিয়ে চেঙ্গিস ও মেয়েটির লাশ যেখানে পড়েছিল প্রথমে সে ওখানে গেল। রাতের শেষ প্রহর। মাথার ওপর থেকে ভাঙা চাঁদ গড়িয়ে পড়ছিল পশ্চিম দিগন্তে।
ভিক্টরের চোখের সামনে এতীমের মত পড়েছিল মদের সুরাহী ও দু'টি পিয়ালা। চাঁদের আলােয় সে ভাল করে তাকালাে মেয়েটির দিকে। কি অপরূপ মায়াময় মিষ্টি মুখ! মৃত্যুও তার সৌন্দর্য বিন্দুমাত্র পরিবর্তন করতে পারেনি। একগুচ্ছ খােলা রেশমী কোমল চুল তার বুকের উপর ছড়িয়ে ছিল। লালিত্যময় হাত দুটো দিয়ে তখনাে সে আঁকড়ে ধরে ছিল, বুকের সে ক্ষতস্থান, যেখানটা ভিক্টর তার খঞ্জর দিয়ে ফুটো করে দিয়েছিল।
ভিক্টর তাকালাে মদের সুরাহীর দিকে। মেয়েটির পাশেই কাত হয়ে পড়েছিল সেই সুরাহী । সেদিকে তাকিয়ে ভিক্টর বিড় বিড় করে বললাে, মানুষ তার নিজের ধ্বংসের উপকরণ কেমন অপরূপ করে তৈরি করেছে, দেখাে!’
মেয়েটির কাছ থেকে সরে সে গেল চেঙ্গিসের লাশের পাশে।
তার দিকে দীর্ঘক্ষণ অপলক নেত্রে তাকিয়ে থাকলাে। তার চোখ ঠেলে বেরিয়ে এলাে অশান্ত অশ্রু রাশি। সে তার কাছে বসে পড়ল। হাত দিল চেঙ্গিসের শরীরে। বরফের মত ঠাণ্ডা শরীর।
একটু আগেও এই শরীরে জীবনের উত্তাপ ছিল। সে নিজ হাতে সেই উত্তাপ কেড়ে নিয়েছে। অনেক দিন তারা একত্রে ছিল। বহু সুখ-দুঃখ তারা ভাগাভাগি করে নিয়েছে। এক জনের কষ্ট মুছিয়ে দিয়েছে অন্য জন। এক জনের শোকে অন্য জন শান্তনা দিয়েছে। সেই অন্তরঙ্গ বন্ধুকে নিজ হাতে খুন করেছে ভিক্টর! নিয়তির কি নির্মম পরিহাস!
তাকে খুন করে ভিক্টর অনুতপ্ত নয়, বরং তৃপ্তি অনুভব করছে! ওকে খুন না করলে খুন হয়ে যেতাে একটি জাতি! চরম সর্বনাশের হাত থেকে সেই জাতিকে সে রক্ষা করেছে, পৃথিবীতে যারা মানবতার নিশান উড়াতে চায়।
চেঙ্গিসের হাত তার হাতের মধ্যে নিয়ে আবেগ ভরা কণ্ঠে সে বললাে, তুমি ভাল করেই জানতে, মদের নেশা বাদশাহকেও সিংহাসন থেকে নামিয়ে দেয়। তুমি এই দুর্বলতাকে নিজের মধ্যে কেন ঠাঁই দিয়েছিলে বন্ধু!
তুমি এও জানতে, ছলনাময়ী নারীর খপ্পড়ে পড়ে কত রাজ্য আর রাজা ধ্বংস গেছে। কেন তুমি তেমনি এক নারীর খপ্পড়ে পড়ে গেলে বন্ধু!
তােমার ধর্ম কত মহান! নারীর সাথে মেলামেশার সে এমন সুন্দর বিধান দিয়েছে, যা মানলে এই মাটির পৃথিবীতেই বেহেশতের সুখ অনুভব করা যায়! কেন সেই পথে না গিয়ে গােপন মেলামেশার পথ বেছে নিলে বন্ধু!
তুমি যদি এ পথে পা না বাড়াতে তাহলে আমাকে আর জল্লাদ হতে হতাে না। তােমার ধর্মের যে সৌন্দর্য দেখে আমি অভিভুত হয়ে তার হেফাজতের জন্য সর্বস্ব পণ করে বসে আছি, তুমি সেই ধর্মের অনুসারী হয়েও কেন তার সৌন্দর্য দেখতে পেলে না বন্ধু!
চেঙ্গিসের লাশ আঁকড়ে ধরে সেই জনশূন্য বাগানে একাকী বসে বিলাপ করছিল ভিক্টর। তার সেই বিলাপের শেষ কয়টি কথা ছিল এমন: ‘আমিও আসছি প্রিয় বন্ধু! জলদি শীঘ্রই আমাকে তােমার কাছে পৌছে দেবে। আমি তোমার প্রভুর কাছে কড়জোড়ে প্রার্থনা করছি, হে আল্লাহ, আমার এই বন্ধু তােমার দ্বীনের জন্যই সর্বস্ব পণ করে এই বাহিনীতে শামিল হয়েছিল। সারা জীবন, বিশেষ করে যৌবনের শ্রেষ্ঠ সময় সে তােমার পথে ব্যয় করেছে। তার এ ক্ষণিক ক্রটি তুমি ক্ষমা করে দিও প্রভু! আমরা একই গন্তব্যের যাত্রী।
এতদিন তােমার দ্বীনের জন্য কাজ করলেও দ্বীনের হুকুম আহকাম কিছুই মানতে পারিনি। প্রকাশ্যে ঘােষণা দিয়ে তােমার দ্বীন কবুলও করিনি। তবু তুমি জানাে আমার অন্তরের খবর। যেদিন তিন মুজাহিদ আমার বােনকে খৃস্টানের কবল থেকে উদ্ধার করেছিল, সেদিন থেকেই আমিও মনে মনে তােমার দ্বীনকে গ্রহণ করে নিয়েছিলাম। আল্লাহ, আমাকে তুমি তােমার দ্বীনের পথের এক সামান্য গােলাম হিসাবে কবুল করে নাও।
সে লাশ জড়িয়ে ধরে কাঁদছিল আর বলছিল, আমিও আসছি বন্ধু! একটু অপেক্ষা করাে। এই তাে আমি আসছি বলে!
সে সেখান থেকে উঠলাে ও দ্রুত পদক্ষেপে সেই মহলের দিকে চললাে, যেখানে শহরের পুলিশ প্রধান থাকেন।
তার শরীর থেকে তখনও রক্ত ঝরছিল। সে খাপ থেকে খঞ্জর বের করলাে। খঞ্জরের জমাট রক্ত কালচে হয়ে গিয়েছিল । সে তার দেহের তাজা রক্ত দিয়ে খঞ্জরটি ভিজিয়ে নিল এবং খঞ্জর হাতেই রাখলাে। অতিরিক্ত রক্ত বের হওয়ায় সে খুব দুর্বল বােধ করছিল।
অতি কষ্টে সে কোন মতে পুলিশ প্রধানের ফটক পর্যন্ত পৌঁছল । এগিয়ে গিয়ে আঘাত করলাে ফটকে। এক সেন্ট্রি এসে ফটক খুলে দিল।
ভিক্টর অফিসারের নাম নিয়ে বললাে, জলদি তাকে জাগিয়ে দাও। আর বলাে, এক খুনী আপনার সাথে দেখা করতে এসেছে।
এ কথা শুনে সেন্ট্রিবক্স থেকে আরেক সিপাই ছুটলাে ভেতরে। কয়েক মিনিট কেটে গেল চুপচাপ। এরপরই ভেতর থেকে ‘শানা গেল গালি-গালাজের আওয়াজ । পুলিশ প্রধান গালি দিতে দিতে বেরিয়ে এলাে। দরজার কাছে এসে গর্জে উঠে বললাে, ও তুমি? কার সাথে এমন লড়াই শুরু হয়েছিল?' পুলিশ প্রধান তাকে চিনতে পারলাে।
‘আমি দু’টি মানুষের খুনের স্বীকারােক্তি করতে এসেছি।'
ভিক্টর বললাে, আমাকে গ্রেফতার করুন।
পুলিশ প্রধান তার মুখে জোরে এক থাপ্পড় মেরে বললাে, তুমি আর খুন করার সময় পাওনি? দিনের বেলায় কি করেছিলে? আমি তােমার বাবার চাকর নাকি যে, এখন তােমাকে গ্রেফতার করতে যাবাে? কি আমার নবাবজাদা! আমাকে গভীর ঘুম থেকে জাগিয়ে দিয়ে বলে, আমাকে গ্রেফতার করুন!
ক্ষিপ্ত পুলিশ প্রধান সেন্ট্রিকে বললাে, একে নিয়ে যা তাে, কারাগারে বন্দী করে দে।
সেন্ট্রি ভিক্টরকে নিয়ে যাওয়ার জন্য তার হাত ধরলাে, পুলিশ প্রধান আবার গর্জে উঠলাে, ওরে, দাঁড়া, বােকা কোথাকার! তুই কি একটুও চিন্তা করিসনি, এই খুনী তােকেও খুন করে ফেলতে পারে? একে ভেতরে নিয়ে আয়। সে কি কেস করেছে?
‘আমি এক পুরুষ ও এক নারীকে হত্যা করেছি স্যার!’ ভিক্টর জোরেই বললাে।
‘খুন করেছো? পুলিশ প্রধান আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাে, ‘সত্যি তুমি খুন করেছো? যদি মুসলমানকে খুন করে থাকো, তবে যাও, ক্ষত স্থানে মলম ব্যাণ্ডেজ করাে। বাকীটা আমি দেখবাে। আর যদি কোন খৃস্টানকে খুন করে থাকো, তবে তার সাজা অবশ্যই তােমাকে পেতে হবে। চলাে, ভেতরে গিয়ে কথা বলি।
‘আপনি তাে আমার সাথে এক সুন্দর যুবককে দেখেছেন।
রাশেদ চেঙ্গিস।' ভিক্টর ভেতরে গিয়ে বললাে, আমার এক সুন্দরী যুবতীর সাথে ভালবাসা ছিল। সে ছিল আমার বন্ধু। আমাদের প্রেমের বিষয়টা সে জানতে এবং মেয়েটিকেও চিনতাে। সেই গাদ্দার সব জেনেশুনেও আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করল। সে মেয়েটিকে ফুসলিয়ে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিল এবং নিজে তার সাথে প্রেম করা শুরু করল।
এই নিয়ে তার সাথে আমার কথা কাটাকাটি হয়। সে আমাকে চরম ভাবে অপমান করে। আমি মেয়েটির অন্ধ প্রেমিক ছিলাম। কিছুতেই তাকে হারাতে রাজি ছিলাম না আমি । মেয়েটি চেঙ্গিসের সাথে তার সম্পর্কের কথা অস্বীকার করলাে। কিন্তু গত রাতে অভিসাররত অবস্থায় আমি তাদের দু’জনকে হাতেনাতে ধরে ফেলি।
তখন চেঙ্গিস আমাকে খুন করার জন্য ছুটে আসে। মেয়েটি ছুটে এসে তাকে বাধা দিতে চেষ্টা করে। সে আমাকে আঘাত করতে চাইলে সে আঘাত আমার পরিবর্তে মেয়েটির বুকে বিদ্ধ হয়। খুন হয়ে যায় আমার প্রেমিকা। আমার মাথায়ও তখন খুন চেপে যায়। আমি চেঙ্গিসের ওপর খঞ্জর নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি। সেও আমাকে খুন করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে।
সে আমার কয়েক জায়গায় জখম করতে সক্ষম হয়। কিন্তু আমিও ছেড়ে দেয়ার পাত্র ছিলাম না। আমি তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম এবং শেষ পর্যন্ত আমিই সফল হলাম।
অবশেষে তারা দু'জনেই মারা যায়। আমার যখন হুশ হলাে; তখন ভাবলাম, হায়, আমি এ কি করলাম! সেই থেকে আমার মন অস্থির হয়ে উঠল। অনেক চিন্তা-ভাবনা করে দেখলাম, আমার মুক্তির যদি কেউ ব্যাবস্থা করতে পারে, সে কেবল আপনি। তাই আমি সেখান থেকে সােজা আপনার কাছে চলে এলাম।'
পুলিশ প্রধান তাকে বললাে, “মেয়ে মানুষের জন্য খুন-খারাবী করা তাে বুদ্ধিমানের কাজ নয়। ঠিক আছে, তুমি বাসায় চলে যাও, আমি দেখছি কি করা যায়।
পুলিশ প্রধান তাকে গ্রেফতার না করে বাসায় পাঠিয়ে দিলেন। কারণ ভিক্টর ছিল সম্রাট রিমাণ্ডের রাজ কর্মচারী। পুলিশ প্রধানের বিবেচনায় এমন দু’একটা খুন সে করতেই পারে।
কিন্তু সকাল বেলা সকলেই দু’জনের লাশ দেখে তাে হতবাক। হরমন এবং তার সহকারীর কাছেও গিয়ে পৌঁছল এ খবর। তারা যখন এ খবর জানতে পারলাে, তখন তারা দুজনেই রেগে আগুন হয়ে গেল।
মেয়েটি তাদের অত্যন্ত করিকর্মা গােয়েন্দা ছিল আর চেঙ্গিস ছিল তার শিকার। চেঙ্গিসকে অবলম্বন করেই তারা ত্রিপলীতে অবস্থানরত মুসলিম গােয়েন্দাদের পুরাে দলটাকে ধরার জাল পেতেছিল। দলটা এরই মধ্যে জালের ভেতর মাথা ঢুকিয়েও দিয়েছিল, এখন শুধু জাল গুটিয়ে আনা বাকী।
এই অবস্থায় কেবল শিকার নয়, জাল এবং জ্বেলে শুদ্ধ সবকিছু গায়েব করে দিল যে আহাম্মক, আক্রোশটা তার ওপর গিয়ে পড়াটাই স্বাভাবিক। তার কারণে মুসলিম গােয়েন্দাদের ধরার যে সূত্রটি তাদের হাতে এসেছিল, তা গায়েব হয়ে গেল। সেই সাথে গায়েব হয়ে গেল তাদের চৌকস গুপ্তচর কন্যা। সব মিলে যে অপূরণীয় ক্ষতি হলাে, ভিক্টরের মত একশ গর্দভকে খুন করলেও তার বদলা আদায় হবার নয়।
ক্রুদ্ধ আক্রোশে এ সবই ভাবছিল হরমন! সঙ্গে সঙ্গে তার সহকারীকে হুকুম দিল, “ওই গর্দভটাকে ধরে এনে আচ্ছা মত পিটুনি লাগাও।'
ভিক্টরের ক্ষত স্থান থেকে তখনও রক্ত ঝরছিল । কেউ তাকে ঔষুধ দেয়ার বা সেই ক্ষতে ব্যাণ্ডেজ করার প্রয়ােজনও বােধ করলাে না। সেই অবস্থায় তাকে ধরে আনা হল।
হরমনের মত তার সহকারীও প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত ছিল ভিক্টরের ওপর। তাকে হাতের কাছে পেয়েই সে সমানে পিটাতে শুরু করলাে। ভিক্টর শেষে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। তার পরে আর তার জ্ঞান ফেরেনি। পরের দিন অজ্ঞান অবস্থায়ই তাকে জল্লাদের সামনে উপস্থিত করা হলাে। জল্লাদ তাকে এক চৌকির ওপর শুইয়ে ধারালাে অস্ত্রের এক আঘাতেই দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে দিল।
তার দেহ ও মাথা পৃথক দুই গর্তে যখন পুতে ফেলা হচ্ছিল, সে সময় ইমামের প্রেরিত এক গােয়েন্দা ত্রিপলী থেকে অনেক দূরে চলে গিয়েছিল। উটের উপর সওয়ার হয়ে সে যাচ্ছিল কায়রাের দিকে। কায়রাে সেখান থেকে অনেক দূর। এমন দীর্ঘ সফরের ধকল কেবলমাত্র উটই সহ্য করতে পারে। এই দুর্গম পথের কষ্টকর সফরের মাঝেও সেই পথিক এক ধরনের তৃপ্তি অনুভব করছিল। কারণ এমন মূল্যবান তথ্য নিয়ে এই প্রথম সে যাচ্ছিল মুসলমানদের আশা ভরসার কেন্দ্র সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর কাছে।
৫৭৩ হিজরী মুতাবেক ১১৭৭ খৃস্টাব্দের প্রথম দিকের ঘটনা। কায়রাের প্যারেড গ্রাউণ্ডে অসাধারণ ও ব্যতিক্রমধর্মী এক প্রদর্শনীর আয়ােজন করা হয়েছে। নতুন ভর্তি সৈন্যরা ট্রেনিং শেষে ওখানে কুচকাওয়াজ করছিল। কখনাে সেখানে চলছিল ঘােড়দৌড়ের প্রতিযােগিতা। কখনাে নেজাবাজি, তলােয়ার যুদ্ধ, মল্ল যুদ্ধ, তীরের নিশানা।
পদাতিক বাহিনীর কুচকাওয়াজের পর মাঠে এলাে উষ্ট্রারােহী বাহিনী। তাদের পেছনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছিল ঘােড়সওয়ার বাহিনী।
কায়রাে শহরের বাইরে এক পাহাড়ী এলাকা। কেউ দেখলে ভাববে এখানে দুই পক্ষে তুমুল লড়াই চলছে। আসলে সেখানে আইয়ুবীর নতুন
সৈন্যদের মহড়া চলছিল। সৈন্যরা সেখানে পেট্রোল বােঝাই হাড়ি নিক্ষেপ করে তাতে অগ্নিবান নিক্ষেপ করল। সঙ্গে সঙ্গে চল্লিশ পঞ্চাশ হাত এলাকা জুড়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ল। অশ্বারােহীরা সেই আগুনের মধ্য দিয়ে তীরবেগে ছুটে গেল একদিক থেকে অন্য দিকে।
এ রকম যুদ্ধ মহড়া শুরু হলাে মরু অঞ্চলেও। কোন সৈন্যেরই সেখানে সঙ্গে পানি রাখার অনুমতি ছিল না।
এ সবই ছিল কঠিন প্রশিক্ষণের শেষ পর্যায়। নতুন রিক্রুট সৈন্যরা পরম উৎসাহে তাতে অংশ নিচ্ছিল। ভর্তি কার্যক্রমও তখন চলছিল সমান তালে। সামরিক বাহিনীর সমস্ত সেনাপতি, কমাণ্ডার ও অফিসাররা ট্রেনিং নিয়ে ব্যস্ত ছিল।
সুলতান আইয়ুবী সেনাবাহিনীকে এ কাজে লাগিয়ে দিয়ে দেশের প্রশাসনিক কাজের দিকে মনযােগ দিলেন। দিনে ব্যস্ত থাকতেন প্রশাসনিক কাজে, রাতে সেনাপতি এবং অফিসারদের নির্দেশ দিতেই তার রাত শেষ হয়ে যেতাে।
এক রাতে তিনি অফিসারদের নিয়ে বৈঠক করছিলেন। তিনি উপস্থিত অফিসারদের বললেন, যদি ক্রুসেড বাহিনী এ মুহূর্তে সেনা অভিযান না চালায় তবে তােমরা হয়তাে ভাবতে পারাে, তারা যুদ্ধ করতে অপারগ। কিন্তু এটা বিশ্বাস করা যায় না। তারা অবশ্যই আসবে, সিরিয়ার দিক দিয়ে না হােক, অন্য কোন দিক দিয়ে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তারা আক্রমণ চালাবেই এবং তা অতি তাড়াতাড়ি।
পরদিন তিনি সৈন্যদের মহড়া পরিদর্শনে গেলেন। তিনি এক উপত্যকায় দাড়িয়ে যুদ্ধের মহড়া দেখছিলেন। এক সেনাপতি সুলতানকে বললেন, এ পর্যন্ত শত্রু কবলিত অঞ্চল থেকে কোন না কোন ব্যক্তির আসা প্রয়ােজন ছিল।
সুলতান আইয়ুবী তার দিকে ফিরলেন। বললেন, হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছাে। আমিও এ কথাই ভাবছিলাম। ক্রুসেড বাহিনী অবশ্যই আমাদের ওপর আক্রমণ চালাবে। তবে তারা কোন দিক থেকে আসবে সে সংবাদ শুধু গােয়েন্দারাই বলতে
পারবে। তারাই বলতে পারবে দুশমন কোথায় প্রথম আক্রমণ করবে এবং তাদের সৈন্য সংখ্যা কত। শত্রু অঞ্চল থেকে আমাদের গােয়েন্দারা যতক্ষণ এ খবর না দিচ্ছে, ততক্ষণ আমরা অন্ধকারেই থাকবাে।
তিনি কথা বলছিলেন আর উপত্যকায় দাঁড়িয়ে তাকিয়ে দেখছিলেন দূর পাহাড়ের দৃশ্যাবলী। তখন তার নজরে পড়লাে, দূরে ধূলি উড়ছে। এই ধূলি এক কিংবা দুটি অশ্বারােহীর ছুটে আসার আগাম খবর দিচ্ছিল। তিনি পাশের অফিসারকে বললেন, দেখােততা, ওদিক দিয়ে কেউ আসছে মনে হয়!'
সঙ্গী অফিসার সেদিকে তাকিয়ে বললাে, “মােহতারাম সুলতান! মনে হয় আমাদের কোন সঙ্গীই আসছে।
সুলতান আইয়ুবী অফিসারকে নিয়ে যেদিক থেকে ধূলি উড়ছিল সেদিকে কিছু দূর এগিয়ে গেলেন। ততক্ষণে ধূলি মেঘ আরাে কাছে চলে এসেছে । সহসা ধূলি মেঘের মধ্যে দু’টি অশ্ব দেখা গেল।
অশ্বারােহীরা আরাে কাছে এলে তিনি একজনকে চিনতে পারলেন। একটি অশ্বের উপর ছিলেন আলী বিন সুফিয়ান, অপর আরােহীকে তিনি চিনতে পারলেন না। সে ছিল ত্রিপলী থেকে ইমাম সাহেবের পাঠানাে সেই গােয়েন্দা, যে ত্রিপলী থেকে রওনা দিয়েছিল উটের আরােহী হয়ে।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বেশ কিছু দিন পর সে কায়রাে এসে পৌছে। আলী বিন সুফিয়ান তার কাছ থেকে রিপাের্ট নিয়ে দেরী না করেই তাকে নিয়ে অশ্বপৃষ্ঠে চেপে বসলেন। উদ্দেশ্য, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এ রিপাের্ট সুলতান আইয়ুবীকে পৌছানাে।
গােয়েন্দা সুলতান আইয়ুবীকে জানালাে, ক্রুসেড বাহিনী ঝড়ের গতিতে আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের সৈন্য সমাবেশ শুরু হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশী সৈন্য নিয়ে এসেছে সম্রাট রিনাল্ট। তিনি এই বিশাল বাহিনীর নেতৃত্ব দিতে চান।'
‘এই সে রিনাল্ট, যাকে নূরুদ্দিন জঙ্গী গ্রেফতার করে যুদ্ধবন্দী হিসেবে কারাগারে রেখেছিলেন। সুলতান আইয়ুবী বললেন, ‘তিনি তাকে কিছু শর্ত সাপেক্ষে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জঙ্গীর অকস্মাৎ মৃত্যুতে রিনাল্টের মুক্তির পথ প্রশস্ত হয়ে যায়। ক্ষমতা ও অর্থ লােভী আমীররা মরহুম জঙ্গীর নাবালক সন্তানকে গদীতে বসিয়ে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য রিনাল্টকে নি:শর্ত মুক্তি দিয়ে দেয়। আজ সেই রিনাল্টই ইসলামকে মিটিয়ে দিতে আসছে। হ্যা, পরবর্তী রিপাের্ট শােনও! তারই তাে আক্রমণ করা উচিত, সে ছাড়া আর কে করবে?”
‘ত্রিপলীর সম্রাট রিমাণ্ড এই যুদ্ধের মূল পরিকল্পনাকারী। অধিকাংশ সৈন্য ওখানেই সমবেত হচ্ছে। বিভিন্ন রাষ্ট্রের খৃস্টান সম্রাটরা ওখানে বসেই আক্রমণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করছেন। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন সম্রাট বিল্ডন। তার সৈন্য সংখ্যাও কম নয়। ক্রুসেড বাহিনী কবে নাগাদ আক্রমণ চালাবে তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে আক্রমণ হবে হলব, হারান ও হিম্মতের দিক দিয়ে এই সংবাদ পাওয়া গেছে।
যুদ্ধে জেতার জন্য তারা সিরিয়াকেও ব্যবহার করবে। সিরিয়া ব্যাপক আক্রমণে না গেলেও সীমান্তে গােলযােগ সৃষ্টি করে আপনাকে ব্যতিব্যস্ত ও পেরেশান করবে। যুদ্ধের চূড়ান্ত দিন তারিখ ঠিক না হলেও শীঘ্রই তারা যুদ্ধ যাত্রা করবে, এটা বুঝা যাচ্ছে।
‘আলী বিন সুফিয়ান!' সুলতান আইয়ুবী বললেন, ত্রিপলী থেকে শেষ সংবাদ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকবাে আমি। সুনির্দিষ্ট দিন তারিখের খবর অবশ্যই তুমি পাবে। ওই পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করতে চাই। আমি জানতে চাই, তারা কোন পথে কত সৈন্য নিয়ে যাত্রা করছে।
‘সে সংবাদের জন্য অপেক্ষা করার সময় আপনি পাবেন না সুলতান।' আলী বিন সুফিয়ান নয়, কথাটা বললাে সেই গােয়েন্দা, যে ত্রিপলী থেকে এসেছিল। ক্রুসেড বাহিনীর হেড কোয়ার্টারে আমাদের যে দু’জন গােয়েন্দা ছিল, তারা দু'জনেই মারা গেছে।
রাশেদ চেঙ্গিস ও ভিক্টরের ঘটনা তুলে ধরে সে বললাে, সম্রাট রিনাল্ট দাবী করেছেন, তার বাহিনীতে আড়াই'শ নাইট রয়েছে।'
সুলতান আইয়ুবীর চোখ রাগে লাল হয়ে গেল। তিনি বললেন, যুদ্ধে প্রথম পরাজয় ঘটে যখন কোন বাহিনী প্রতিপক্ষের শক্তি ও পরিকল্পনা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিতে না পারে। ইমাম সাহেব তােমাকে আর কিছু বলেছেন?
ইমাম সাহেব জানিয়েছেন, সেই দুই গােয়েন্দা মরার আগে বলে গেছে, ক্রুসেড যোদ্ধারা আপনার গেরিলা বাহিনীকে এবার আর অতর্কিত অন্ধকারে আক্রমণের সুযােগ দেবে না। তারা এমন কিছু ফন্দি এঁটেছে, যাতে কমাণ্ডো বাহিনী বেকায়দায় পড়ে যাবে।'
আর! আর কোন খবর আছে?
‘আপনার দুর্বলতাটুকু জানা আছে ক্রুসেড বাহিনীর। তারা জানে, আপনার সৈন্য সংখ্যা কম। অভিজ্ঞ সেনানায়করা বিগত যুদ্ধগুলােতে হয় মারা গেছে, নয়তাে পঙ্গু হয়েছে। তাছাড়া আপনার কাছে এখন যুদ্ধ উপকরণও সামান্যই আছে।' বললাে সেই গােয়েন্দা, তাই তারা এবার বিশাল বাহিনী নিয়ে আসছে, যাতে আপনার বাহিনীকে অবরুদ্ধ করে চূড়ান্তভাবে ধ্বংস করে দিতে পারে।
গােয়েন্দার কাছ থেকে এই সংবাদ পাওয়ার পর সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীকে বেশী বাইরে বেরুতে দেখা যেত না। তিনি অধিকাংশ সময় তার নিজের অফিস কক্ষেই থাকতেন। কাগজের উপর সম্ভাব্য যুদ্ধের পরিকল্পনা ও নকশা আঁকতেন। সেই নকশার উপর আক্রমণের ও পাল্টা আক্রমণের রেখা আঁকতেন।
কখনও তিনি সেনাপতিদের ডেকে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। কখনও তাদের সাথে বিতর্কে জড়িয়ে যেতেন। তিনি তাদেরকে বলতেন, “তােমরা ভাল মত চিন্তা-ভাবনা করাে। স্বাধীনভাবে সেই মতামত ব্যক্ত করাে। উত্তম কোন চাল মাথায় এলে তা প্রকাশ করতে বিলম্ব করাে না। এবারের লড়াই হবে বুদ্ধির। সৈন্য সংখ্যা দিয়ে এবার খৃস্টানদের মােকাবেলা করা যাবে না। জিততে হলে কৌশল ও বুদ্ধির জোরেই জিততে হবে।
এই সেনাপতিদের মধ্যে একজন ছিলেন ঈশা আল হেকারী । তিনি যেমন যােগ্য সেনাপতি ছিলেন, তেমনি ছিলেন পণ্ডিত ও আইনজ্ঞ। অনেক ঐতিহাসিক তাকে সুলতান আইয়ুবীর দক্ষিণ হস্ত বলে উল্লেখ করেছেন।
একদিন সুলতান আইয়ুবী হঠাৎ কোন ঘােষণা ছাড়াই সৈন্যদের যুদ্ধ যাত্রা করার হুকুম দিলেন। তিনি তাঁর বাহিনীর এক বিরাট অংশকে সুদানের সীমান্ত এলাকায় পাঠিয়ে দিলেন। কারণ ওদিক থেকে আক্রমণের যে আশংকা ব্যক্ত করছিল গােয়েন্দা, তিনি তার যৌক্তিকতা বুঝতে পারছিলেন। সিরিয়া বর্ডারে গােলমাল সৃষ্টি করলে তাদের মদদ জোগাবে ক্রুসেড বাহিনী। এই অবস্থায় ক্রুসেড বাহিনীর মােকাবেলার জন্য তিনি মিশরের সব সৈন্যকে সঙ্গে নিতে পারছিলেন না। তিনি যখন যুদ্ধ যাত্রা করলেন তখন, ঐতিহাসিকদের মতে তাঁর সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র এক হাজার পদাতিক বাহিনী। এরা সবাই ছিল মামলুক বংশের। এরা সাহসী, বীর ও যােদ্ধা। এ ছাড়া আট হাজার ছিল অশ্বারােহী সৈন্য। এদের অধিকাংশই ছিল মিশরী ও সুদানী। ১৯৬৯ সালে সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার অপরাধে তাদের সেনা বাহিনী থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং তাদেরকে এক উর্বর অঞ্চলে কৃষিকাজে নিয়ােজিত করা হয়। এখন তারা মিশরের এমন অনুগত প্রজা, যাদের উপর ভরসা করা যায়। এই আট হাজার অশ্বারােহী ও এক হাজার পদাতিক বাহিনীর সবাই নতুন রিক্রুট করা সৈন্য।
সুলতান আইয়ুবী তাঁর নিজস্ব সৈন্য বাহিনী তার ভাই তকিউদ্দিনের নেতৃত্বে হলবে রেখে এসেছিলেন। তিনি গােপন সূত্রে জানতে পারলেন, এখনও সিরিয়ার সেনা বাহিনী সীমান্তে গােলযােগ সৃষ্টির জন্য কোন প্রস্তুতি নেয়নি।
তিনি তীব্রগতিতে হলব গিয়ে পৌছলেন। সেখানে পৌঁছেই তিনি জানতে পারলেন, ক্রুসেড বাহিনী হারান দূর্গ অবরােধ করে রেখেছে। সুলতান আইয়ুবী সেখানে দম না নিয়েই ছুটলেন হারান অভিমুখে। দূর্গ অবরােধকারী ক্রুসেড বাহিনীকে স্তম্ভিত করে তিনি সেই বাহিনীকে পাল্টা অবরােধ করে বসলেন।
সুলতান আইয়ুবীর এই অবরােধ ও আক্রমণ এমন আকস্মিক ছিল যে, ক্রুসেড বাহিনী ফিরে দাঁড়ানাের আগেই তিনি সেই বাহিনীকে তছনছ করে দিলেন। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ধাওয়া আর পাল্টা ধাওয়া চললাে বিক্ষিপ্তভাবে। ক্রুসেড বাহিনী আর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুযােগ পেল না। আইয়ুবীর পাল্টা ধাওয়া খেয়ে ছিন্নভিন্ন ক্রুসেড বাহিনী পালাতে গেল। বিজয়ের স্বপ্ন নিয়ে ত্রিপলী থেকে ছুটে আসা ক্রুসেড বাহিনী পালাতে গিয়ে পড়ল মহা বেকায়দায়। এখানকার পথঘাট তাদের অচেনা, জনগণ তাদের প্রতিপক্ষ। কে তাদের আশ্রয় দেবে, কে দেবে একটু লুকানাের জায়গ?
না, তারা লুকানাের কোন জায়গা পেল না। হারানের জনগণ গণধােলাই দিয়ে তাদের ধরে এনে সুলতানের বাহিনীর হাতে সােপর্দ করতে লাগল। দেখতে দেখতে ক্রুসেড বাহিনীর বহু সৈন্য ধরা পড়লাে আইয়ুবীর বাহিনীর হাতে।
এই ফাঁকে বেরিয়ে এলাে হারান দূর্গের সৈন্যরা। তারা শত্রু সৈন্য বন্দী করার খেলায় মেতে উঠল। বৃষ্টি হলে কৈ মাছ যেমন পানি থেকে উঠে এসে মাঠ জুড়ে ছুটতে থাকে তেমনি ছুটছিল ক্রুসেড বাহিনী। আর গ্রামের ছেলে-বুড়াে কৈ মাছ ধরার মতই আনন্দে মাতােয়ারা হয়ে তাদের ধরে ধরে মুসলিম বাহিনীর হাতে তুলে দিচ্ছিল।
সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী এই সৈন্য ধরাঁ খেলায় অংশ নিলেন না। তিনি দুর্গের সৈন্যদের ওপর এ দায়িত্ব অর্পণ করে নিজের বাহিনী নিয়ে ছুটলেন অভিযানে। ঝড়ের মত ছুটে গিয়ে খৃস্টান অধিকৃত গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি লিডিয়া ও রমলা দখল করে নিলেন।
মিশরের নতুন রিক্রুট সৈন্যদের মনােবল এই বিজয়ে অনেক বেড়ে গেল। তারা ভাবলাে, যুদ্ধে বিজয় লাভ করা তাে তেমন কঠিন কিছু নয়! শুধু একটু সাহস ও মনােবলের দরকার। তাহলেই দুশমন ফৌজ ধরাশায়ী হয়ে যায়।
তাদের আরাে মনে হলাে, যেখানে সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী থাকবেন, বিজয় সেখানে এসেই চুমু খাবে। তিনি যে বলেছেন, অবশেষে সত্যের সেনানীরাই বিজয়ী হয় এটাই খাঁটি কথা। আমরা লড়াই করি নামে মাত্র, মূল লড়াই তাে করে আল্লাহর ফেরেশতারা। তাই বিজয় কেবল আমাদের ভাগ্যেই লেখা আছে।
এই চিন্তা নতুন সৈন্যদের ওপর দু’রকম প্রভাব ফেলল। একদল খুব বেপরােয়া হয়ে গেল। তারা ধরেই নিল, বিজয় যেহেতু আমাদের হাতে, অতএব নির্ভয়ে অস্ত্র চালাও। দুশমন শেষ পর্যন্ত আমাদের কিছুই করতে পারবে না। আরেকদল এই ভাবনার কারণে অসাবধান হয়ে উঠলাে। তাদের ইচ্ছা এ রকম, বিজয় তাে আমাদের হবেই। অতএব ঝুঁকি এড়িয়ে গিয়ে ময়দানে একটু দাঁড়াতে পারলেই হয়। তারপর আল্লাহর সাহায্য চলে আসবে এবং আমরা বিজয় নিয়ে ময়দান থেকে আবার ঘরে ফিরে যাবাে।
ক্রুসেড বাহিনী এই প্রথম নিজেদের পরিকল্পনা রেখে আইয়ুবীর স্টাইলে যুদ্ধ পরিচালনা করছিল। তারা ইচ্ছে করেই অল্প সংখ্যক সৈন্য দিয়ে হারান দুর্গ অবরােধ করেছিল। তারা জেনে শুনেই ফ্রাঙ্কিসের বাহিনীকে হারান দুর্গ অবরােধ করতে পাঠিয়েছিল। সম্রাট রিনাল্ট ও বিল্ডনের শক্তিশালী বাহিনী তখনও ছিল বেশ দূরে, রমলার কাছে এক পাহাড়ের আড়ালে। তারা জানতাে সুলতান আইয়ুবী সহজেই হারানের খৃস্টান বাহিনীকে পরাজিত করতে পারবে। হারানে বিজয় লাভ করলে আইয়ুবী কিছুতেই সেখানে থেমে থাকবে না। সে এগিয়ে লিডিয়া ও রমলার দুর্গ দখল করতে ছুটে আসবে।
আর এই সুযােগটিই গ্রহণ করতে হবে আইয়ুবীকে জন্মের মত শিক্ষা দেয়ার জন্য।
সুলতান আইয়ুবীর কাছে ত্রিপলীর গােয়েন্দা ছাড়া আর কোন গােয়েন্দা অসার সুযােগ পায়নি। তার আগেই তিনি ঝড়ের বেগে অভিযানে বেরিয়ে পড়েছিলেন। ফলে খৃস্টান বাহিনীর চূড়ান্ত অভিযানের খবর আইয়ুবীর কাছে পৌছাতেই পারেনি।
রমলার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে এক নদী। নদীতে তেমন পানি ছিল না। তাই নদীর পাড় ছিল বিস্তৃত। নদীর পাশে বড় বড় বৃক্ষের সারি। নদীর সুবিস্তৃত ঢালুতে লুকিয়ে ছিল খৃস্টনদের বিশাল বাহিনী।
সেনাপতি' ঈশা আল হেকারী রমলা জয় করার পর তার সৈন্যদেরকে রমলার আশেপাশে ছড়িয়ে দিলেন। হঠাৎ নদীর ঢালু পাড় বেয়ে পিঁপড়ের সারির মত উঠে এলাে ক্রুসেড বাহিনী। আইয়ুবী যেমন অতর্কিতে দুশমন বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সবুকিছু তছনছ করে দিতেন, তেমনি ওরা তুফান বেগে ঝাঁপিয়ে পড়লাে সেই বাহিনীর ওপর।
নদীর পাড়ে ক্রুসেড বাহিনী লুকিয়ে আছে এ কথা জানা ছিল না হেকারীর বাহিনীর। বিজয়ের পর তারা ঢিলেঢালা মেজাজে পাহাড়ের ঢালে, বৃক্ষের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছিল। কোথেকে এত ক্রুসেড সৈন্য ছুটে এল এ কথা বুঝার আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল অনেক মুজাহিদ। ক্রুসেড বাহিনীর এই প্লাবনের সামনে দাঁড়ায় সে শক্তি ঈশা আল হেকারীর সৈন্যদের ছিল না। ক্রুসেড বাহিনীর এ আকস্মিক হামলায় বহু সৈন্য অজ্ঞাতেই মারা পড়ল।
যারা নদী পাড় থেকে দূরে ছিল তারা তাৎক্ষণিক প্রতিরােধ গড়ে তােলার চেষ্টা করল। কিন্তু খৃস্টান বাহিনীর প্লাবনের মুখে খড়-কুটোর মতই ভেসে গেল তারা। যারা এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে আর মােকাবেলা বরার সুযােগ পেল না। ত্রিপলীর সেই গােয়েন্দার রিপাের্টই সত্য প্রমাণিত হলাে, ক্রুসেড বাহিনী এবার এমন চাল চাবে, যা সুলতান আইয়ুবীর ধারনার বাইরে। আইয়ুবীর যুদ্ধের চল বুঝে ফেলেছে খৃস্টান বাহিনী। পুরােনাে চালে লড়ে আর জিততে পারবেন না আইয়ুবী।
ইবনে আসির লিখেছেন, ক্রুসেড বাহিনী নদী থেকে এমন স্রোতের মত পাড়ে প্লাবিত হতে লাগলাে, যেন ঘােড়া ও জনতার স্রোত নদীর কুল ভাসিয়ে নিয়ে যেতে লাগলাে। সুলতান আইয়ুবীর সামান্য সৈন্য সেই স্রোতের মুখে পড়ে অজ্ঞাতেই মারা গেল।'
প্রসিদ্ধ খৃস্টান ঐতিহাসিক জেমস লিখেছেন, সম্রাট বিলডন সুলতান আইয়ুবীর আগেই তার বিশাল বাহিনী এনে রমলা নদীর বিস্তৃত ঢালু পাড়ে লুকিয়ে রেখেছিলেন। সুলতান আইয়ুবীর সৈন্যরা রমলা দুর্গ ও শহর দখল করে নিল। তারপর তারা শহরে আগুন ধরিয়ে দিয়ে উল্লাসে ফেটে পড়লে ক্রুসেড বাহিনীর জালে আটকা পড়ল। সফল হলাে ক্রুসেড বাহিনীর চাল।
(চলবে)
2 coment rios:
Nice
Dt6y
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন