২০. পাল্টা ধাওয়া(পর্ব-5)
সুলতান আইয়ুবী ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়ে গেলাে। তার বাহিনী পালিয়ে যাওয়ারও সুযােগ পেল না। তারা সমানে কচুকাটা হতে লাগল। সুলতান আইয়ুবী কিছু সৈন্য একত্রিত করে তার বিশেষ কৌশল খাটাতে গেল। কিন্তু সুবিধা করতে পারল না। যুদ্ধের ময়দান খৃষ্টানদের হাতেই রইল। তিনি শুধু পরাজিতই হলেন না বরং চারদিক তাকিয়ে দেখলেন, তার পালিয়ে যাওয়ার পথও বন্ধ।
সুলতান আইয়ুবীর নতুন রিক্রুট করা সৈন্যরা, যারা সহজেই কয়েকটি স্থান দখল করে নিয়েছিল, তারা ভেবেছিল, কেউ তাদের পরাজিত করতে পারবে না। কিন্তু তারা যখন খৃস্টান বাহিনীর সয়লাব ছুটে আসতে দেখল, তখন তারা কেয়ামতের প্রলয় দেখতে পেল। তারা প্রাণ নিয়ে এমন দ্রুত ময়দান ছেড়ে পালালাে, যেন তারা হিংস্র বাঘের মুখে পড়ে গেছে। তারা যে পথে এসেছিল, সে পথেই আবার মিশর যাত্রা করলাে। যুদ্ধ করার সাধ তাদের জন্মের মত মিটে গেল।
পলাতক সৈন্যদের মধ্যে কোন শৃংখলা ছিল না। অনভিজ্ঞ বালকের মত তারা কেবল প্রাণপণে ছুটছিল।
বিশ্ব বিজয়ী অপরাজেয় বীর সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর ভাগ্য ভাল, খৃস্টান সৈন্যরা পলায়নপর সৈন্যদের পিছু ধাওয়া করেনি। ফলে কোন ফাঁকে তিনি যুদ্ধের ময়দান থেকে সরে পড়েছিলেন, টের পায়নি কেউ। তাই সে যাত্রা তিনি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান।
কাজী বাহাউদ্দিন শাদ্দাদ তার বইতে যুদ্ধের বিবরণ লিখতে গিয়ে লিখেছেন, সুলতান আইয়ুবী আমাকে তার পরাজয়ের কারণ এইভাবে বলেছেন, ক্রুসেড বাহিনী আমার যুদ্ধের চাল আমার বাহিনীর ওপর চালিয়ে দিল। তারা ঠিক সেই সময় আমাকে যুদ্ধের ময়দানে টেনে নিল, যখন আমি ও আমার বাহিনী যুদ্ধের পজিশনে ছিলাম না। দ্বিতীয় কারণ হলাে, আমার সেনাবাহিনীর পার্শ্বদেশে যে সেনাদল ছিল, তারা নিজেদের মধ্যে স্থান পরিবর্তনের ব্যস্ততায় ছিল। তারা যখন এলোেমলাে অবস্থায়, তক্ষুণি ক্রুসেড বাহিনী আমাদের ওপর প্রবল আক্রমণ চালালাে। তাদের আক্রমণ এত কঠিন ও আকস্মিক ছিল যে, আমাদের নতুন সৈন্যরা ভীত হয়ে পালালাে। পিছু হটতে গিয়ে তারা মাঝ পথে পথ হারালাে ও ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। আমি আর তাদের একত্রিত করতে পারলাম না। শত্রুরা আমাদের অনেক সৈন্যকে ধরে যুদ্ধ বন্দী করলাে। তাদের মধ্যে সেনাপতি ঈশা আল হেকাবীও ছিলেন। আমি অবস্থা বেগতিক দেখে আদেশ দিলাম, যে যেভাবে পারাে পালিয়ে যেতে চেষ্টা করাে। পথে কোথাও না থেমে সােজা মিশরে চলে যাও।'
কাজী বাহাউদ্দিন শাদ্দাদ আরাে লিখেছেন, যুদ্ধের পরে সুলতান আইয়ুবী খৃস্টানদের ষাট হাজার দিনার মুক্তিপণ দিয়ে ঈশা আল হেকারীকে মুক্ত করে আনেন।'
এই যুদ্ধ ৫৭৩ হিজরীর জমাদিউল উলা মুতাবেক অক্টোবর ১১৭৭ সালে সংঘটিত হয়। সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী নিঃসঙ্গ অবস্থায় কায়রাে পৌছলেন। তাঁর মাথা ছিল অবনত।
তাঁর সাথে কোন সৈন্য ছিল না। এমনকি তার সাথে কোন রক্ষীও ছিল না।
তিনি কায়রাে পৌছেই আবার নতুন সৈন্য ভর্তি করার আদেশ জারী করলেন। তার ভাই তকিউদ্দিন ও যােগ্য সেনাপতিরা তখন হিম্মত এলাকায়।
যে রমলায় আটশাে বছর আগে সুলতান আইয়ুবী ক্রুসেড বাহিনীর হাতে পরাজিত হয়েছিলেন, আজও সেই রমলা ইসরাইলীদের দখলে। এই রমলা বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে মাত্র দশ মাইল উত্তরে অবস্থিত।
কিছুদিন আগেও এই রমলা ছিল জর্দানের অন্তর্ভুক্ত। ১৯৬৭ সালের জুন মাসে আরব ও ইসরাইলের মধ্যে যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়, সেই যুদ্ধে ইসরাইল জর্দানের এই অঞ্চল দখল করে নেয়।
জর্দান নদীর পশ্চিম তীর থেকে শুরু করে ইসরাইলের সীমান্ত পর্যন্ত এই এলাকা বিস্তৃত। যুদ্ধের পর কেটে গেছে তিন যুগেরও অধিক সময়, কিন্তু ইসরাইল এই আরব ভূখন্ড মুক্ত করার পরিবর্তে সেখানে আরও শক্ত করে আসন গেড়ে বসেছে। এখন তারা বলছে, দুনিয়ার কোন শক্তিই আমাদের এখান থেকে সরাতে পারবে না।'
তারা রমলার সেই ঐতিহাসিক অঞ্চলকে এখন মুসলমানদের বধ্যভূমিতে পরিণত করেছে। যেদিন তারা এ অঞ্চল অধিকার করেছিল, সেদিন থেকেই এ অঞ্চল মুসলমানদের বধ্যভূমিতে পরিণত হয়। গত কয়েক দশক ধরে রমলার বীর মুসলমানরা স্বাধীনতার দাবীতে ইসরাইল সরকারের বিরুদ্ধে অবিরাম লড়াই করে যাচ্ছে। আর ইসরাইলীরা এই সব মুসলমানকে তাদের রাইফেলের টার্গেটে পরিণত করছে।
ইসরাইলের এই একগুঁয়ে মনােভাব প্রমাণ করে, ইসরাইলীরা এ অঞ্চল কোনদিনই মুক্ত করবে না। আরবদের অনৈক্য ও শক্রতা সহায় হয়েছে তাদের, তাই ক্ষুদ্র একটি দেশ হয়েও তাদের দম্ভের কোন অন্ত নেই। মুসলিম বিশ্ব তাদের ব্যাপারে নির্বিকার। জাতিসংঘ তাদের মদদগার। ইঙ্গ-মার্কিন-রুশ চক্র তাদের সহায় । তাই আজো মানবতা মরুভূমির বিস্তৃত প্রান্তরে হাহাকার করে মরছে। মানবতা কাঁদছে বিশ্বের অলিতে গলিতে। পৃথিবীতে আজ মুসলমানের অভাব নেই। অভাব নেই তাদের সহায় ও সম্পদের। কিন্তু একজন সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর অভাবে কাঁদছে জগত-সংসার। কাঁদছে ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, আফগানিস্তান, মিন্দানাও, বসনিয়া, হার্জেগােভিনা। কিন্তু আটশাে বছর আগে যখন এই এলাকা খৃস্টান বাহিনীর অধিকারে চলে যায়, তখন সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী এক মুহূর্তের জন্য শান্তিতে বসবাস করতে পারেননি। আরাম আয়েশ ও বিলাসিতার কোন সময় পাননি তিনি। রমলার নির্যাতীত মানুষের কান্না তার রাতের আরাম ও দিনের বিশ্রাম হারাম করে দিয়েছিল। মজলুম মানুষের হাহাকার ছিনিয়ে নিয়েছিল তার সব সুখ ও শান্তি।
যুদ্ধের ময়দান থেকে পরাজিত হয়ে ফিরে এসেই তিনি আবার নতুন সৈন্য ভর্তির হুকুম দিয়েছিলেন। কষ্ট ও বিপদের বােঝা মাথায় চেপে থাকলেও হতাশা গ্রাস করতে পারেনি তাকে। পরাজয়ের গ্লানিকে তিনি উদ্যমের শাণিত তরবারী দিয়ে কেটেকুটে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলেন।
তাঁর সেনাদল যুদ্ধের ময়দান থেকে প্রাণ ভয়ে পালিয়ে এসেছিল মিশরে। যারা আসতে পারেনি তারা খৃস্টান বাহিনীর হাতে বন্দী হয়েছিল। আর অবশিষ্ট সৈন্যরা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে লালে লাল করে দিয়েছিল রমলার বিশাল প্রান্তর।
কিন্তু সুলতান আইয়ুবী মিশরে ফিরে এসে শুধু গুছিয়েই নেননি বরং তিনি পরাজিত এলাকায় আবার বীর বেশে ছুটে গিয়েছিলেন। যে ক্রুসেড বাহিনী তাঁর ওপর ঝড়ের মত আপতিত হয়েছিল তাদের ওপর তিনি কিয়ামত চাপিয়ে দিয়েছিলেন। রমলা আজ আবার তাকিয়ে আছে তেমনি এক নব্য সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর পথের পানে। তেমনি এক বীর আবার কখন রমলার অশ্রু মুছিয়ে দিতে ছুটে আসবে এই প্রশ্ন এখন বিশ্বের বিবেকবান প্রতিটি মানুষের মনে।
সুলতান আইয়ুবীর সামনে সেদিন শুধু এই প্রশ্নই ছিল না, তিনি পরাজয়ের প্রতিশােধ নেবেন এবং ক্রুসেড বাহিনীর অগ্রগতি রােধ করবেন। বরং বহু বিপদ ও মুসিবত তাকে ঘেরাও করে ধরেছিল। সে সব প্রতিবন্ধকতা মােকাবেলা করেই তাকে সামনে অগ্রসর হতে হচ্ছিল।
যে অগণিত বিপদ বাঁধা মােকাবেলা করে তাঁকে অগ্রসর হতে হচ্ছিল, তার এক নম্বরে ছিল বিশ্বাসঘাতকদের ভয়। কারণ বিশ্বাসঘাতকরাই যুগে যুগে মুসলিম বাহিনীর পরাজয়ের অন্যতম কারণ ছিল।
এ ছাড়া ছিল সুদানের দিক থেকে আক্রমণের আশংকা। কারণ সুদানীরা জানতাে, সুলতান আইয়ুবীর কাছে বেশী সৈন্য নেই। যে সব সৈন্য আছে, তারা পরাজিত ও ভগ্ন হৃদয় এবং আহত।
সবচে ভয়ংকর ও বেশী ভয়ের কারণ ছিল ক্রুসেড বাহিনী। কারণ তারা সংখ্যায় ছিল অনেক বেশী। তারা রমলায় ঘাঁটি গেড়ে বসেছিল।
এ ছাড়া ছিল সেই সব মুসলমান আমীর ও সুলতানদের ভয়, যারা সুলতান আইয়ুবীর বিরােধী ছিল। তারা সুলতানের পরাজয়ে যেমন খুশী হয়েছিল তেমনি আশায় ছিল, যদি সুযােগ পাওয়া যায় তবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাকে আবার পরাজিত করবে। আরও একটি আশংকার কারণ ছিল খৃস্টানদের গােয়েন্দা তৎপরতা। হরমনের দক্ষ হাতের পরিচালনায় সে সময় এ ক্ষেত্রে তারা যথেষ্ট অগ্রগতি সাধন করেছিল। চারদিকে শক্ত জাল বিছিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। তারা জনগণের মধ্যে মিশে গিয়ে জনমনে গুজব ছড়িয়ে জাতির মনােবল ভেঙ্গে দিচ্ছিল।
এই পরাজয়ের সংবাদ পেয়ে সুলতান আইয়ুবীর ভাই সুলতান তকিউদ্দিন হিম্মত দুর্গ ছেড়ে হিম্মত পর্বত চূড়ায় উঠে যান তার বাহিনী নিয়ে। তিনি আশংকা করলেন, ক্রুসেড বাহিনী এই বিজয়ের পর হিম্মত দুর্গ অবরােধ করে বসতে পারে।
তার আশংকা সত্যে পরিণত হলাে। ক্রুসেড বাহিনী সুলতানকে পরাজিত করে হিম্মতের দিকে অগ্রসর হলাে।
তকিউদ্দিন তার ভাইয়ের মতই যােগ্য সেনাপতি ছিলেন। তার সঙ্গী-সাথী সেনাপতিরাও ছিল রণ-নিপুন, বীর এবং মর্দে মুজাহিদ। সুলতান আইয়ুবীর মতই দৃঢ় ঈমানের অধিকারী ছিল এরাও। কারণ, তকিউদ্দিনসহ এরা সবাই ছিল সুলতান আইয়ুবীর শাগরেদ। যুদ্ধের কলা-কৌশলও তারা শিখেছিল আইয়ুবীর কাছ থেকেই।
তকিউদ্দিন ও তাঁর সাথীরা একমত হলাে, ক্রুসেড বাহিনী এত বড় ও এত সহজ বিজয় লাভের পর শুধু রমলা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবে না। রমলা জয়ের পর তাদের প্রথম টার্গেট হবে হিম্মত।
তিনি তাঁর গােয়েন্দাদেরকে ছদ্মবেশে রমলার পথে পথে ছড়িয়ে পড়তে বললেন। এর মধ্যেই তিনি খবর পেয়ে গেলেন, তার ভাই সুলতান আইয়ুবী মিশরে চলে গেছেন।
তাঁদের ধারণা সঠিক ছিল। গােয়েন্দা এসে সংবাদ দিল, ক্রুসেড বাহিনী হিম্মতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
তকিউদ্দিন তার সৈন্যদের অবস্থা দেখলেন। আইয়ুবীর পরাজয় সৈন্যদের মনােবল ভেঙ্গে দিয়েছিল। যে বিশাল বাহিনী এগিয়ে আসছে তার মােকাবেলায় তাদের ঘােড়া এবং উটের সংখ্যাও কম। খাদ্য শস্যের মজুতও সন্তোষজনক নয়। সুতরাং বাস্তব অবস্থা সামনে রেখেই তিনি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেন।
তিনি তার সৈন্যদেরকে সেই এলাকায় সরিয়ে নিলেন, যেখানে সবুজ মাঠ ছিল। খাওয়ার মত পর্যাপ্ত পানি ছিল, আর এলাকাটি ছিল পাহাড় পরিবেষ্টিত। তকিউদ্দিন সৈন্যদেরকে এক স্থানে একত্রিত করলেন।
তিনি যুদ্ধের সরঞ্জাম ও পশুর তদারকী করতে গিয়ে দেখতে পেলেন, তার ধারনার চাইতেও বেশী উট আহত। তিনি সে উটগুলাে জবেহ করে সৈন্যদের বললেন, “তােমরা পেট ভর্তি করে উটের গােস্ত খাও।'
মুহূর্তে সৈন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লাে এ খুশীর খবর। সৈন্যদের মধ্যে উৎসাহ উদ্যম ফিরে এলাে। রাতে তারা এক বিশাল ময়দানে উটের গােস্ত খাওয়ার উৎসবের আয়ােজন করলাে। সেই সন্ধ্যায়ই তিনি হলব ও দামেশকে কাসেদ মারফত সংবাদ পাঠালেন, তােমরা যে পরিমাণ রসদ, পশু ও অস্ত্র সম্ভব হয়, জলদি পাঠাও।'
রাতের উৎসব জমে উঠল। সৈন্যরা পেট ভরে তৃপ্তির সাথে উটের গােস্ত আহার করল। খাওয়া দাওয়ার পর সুলতান তকিউদ্দিন এক উঁচু স্থানে উঠে দাঁড়ালেন। তার ডানে ও বায়ে মশাল হাতে দাঁড়িয়ে গেলাে দুই রক্ষী সেনা।
তিনি বুলন্দ আওয়াজে বললেন, আল্লাহ ও রাসূলের বীর মুজাহিদবৃন্দ! তােমরা এই বাস্তবতাকে স্বীকার করে নাও যে, আমরা যে কারণেই হােক পরাজিত হয়েছি। তােমরা কি এই পরাজিত অবস্থায় তােমার মায়ের সামনে, তােমার বােনের সামনে, তােমার বিবি ও বাচ্চাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে চাও? তােমরা কি তাদেরকে এই কথা শােনাতে চাও, আমরা আমাদের রাসূলের বিরােধীদের হাতে পরাজিত হয়ে বাড়ীতে ফিরে এসেছি? তােমরা কি মনে করাে, এই খবর পেলে তারা খুশী হবে? নাকি তােমাদের মায়ের দুধের কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করবে, পরাজয়ের খবর শােনানাের জন্যই কি আমরা তােমাদের বুকের দুধ খাইয়ে বড় করেছিলাম?
তিনি একটু দম নিলেন। তারপর আবার সেই দরাজ গলায় বললেন, তারা এই আশা নিয়ে ঘরে বসে আছে যে, আমাদের প্রথম কেবলা কাফেরদের কবল থেকে মুক্ত করতে আমার যে সন্তানেরা ছুটে গেছে, একদিন বিজয়ের পতাকা উড়িয়ে তারা আবার ফিরে আসবে। তারা এ কথাও জানে, যে এলাকায় কাফেররা পা রাখে, সেখানে তারা মুসলমান মেয়েদের সম্মান ও সম্ভ্রম লুণ্ঠন করে। আজ রমলায় লুণ্ঠিত হচ্ছে তাদের ইজ্জত, এই ঝড়ের গতি থামাতে না পারতে কাল লুন্ঠিত হবে আমার মা ও বােনের সম্মান।
বন্ধুরা আমার! একটু গভীর ভাবে চিন্তা করাে, যদি কখনো এমন দিন তােমার সামনে আসে, সে দিন কি তুমি তােমার মা ও বােনদের সামনে মুখ দেখাতে পারবে? তাই আমি বলতে চাই, আজকের এ লড়াই, আমাদের ইজ্জত ও মর্যাদা লড়াই। আজকের এ লড়াই আমাদের অস্তিত্বের লড়াই আজকের এ লড়াই আমাদের ঈমানের চূড়ান্ত পরীক্ষার লড়াই ।
আমি কাউকে জোর করে লড়াইয়ের ময়দানে টেনে নিতে চাই
না। জোর করে কাউকে ধরে রাখতে চাই না, সত্যের এ কাফেলায়। হকের পথে এগিয়ে যাওয়ার হিম্মত যাদের আছে, তারা আমার সামনে বসাে। যারা মৃত্যুকে ভয় পাও, যারা লড়াই ছেড়ে প্রাণ নিয়ে বাড়ী ফিরে যেতে চাও, তারা পৃথক হয়ে যাও। আমি স্বেচ্ছায় তাদের বাড়ী যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছি। তােমাদের বাড়ী যাওয়ার পথে কেউ বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে না, এই নিশ্চয়তাও দিচ্ছি তােমাদের। এখন আমি তােমাদের সরে দাঁড়ানাের সুযোেগ দিচ্ছি। উঠে দাঁড়াও এবং একদিকে সরে যাও তােমরা।'
সুলতান তকিউদ্দিন চুপ করলেন। তাকিয়ে রইলেন সৈন্যদের দিকে। সৈন্যদের মাঝেও বিরাজ করছিল অখণ্ড নীরবতা। একটি সৈন্যও উঠে দাঁড়াল না। কেউ পৃথক হলাে না সেই যুথবদ্ধ সমাবেশ থেকে। এভাবেই কেটে গেল বেশ কিছু সময়।
তখন দেখা গেল সমাবেশের সামনের সারি থেকে একজন উঠে দাঁড়াল। সে পিছন ফিরে সৈন্যদের মুখােমুখি হলাে। বললাে, তােমরা কেউ বাড়ী ফিরে যেতে চাও?'
রাতের নিস্তব্ধতা খান খান করে সমবেত কণ্ঠের সম্মিলিত ধ্বনি ভেসে এলাে, না, আমরা কেউ ময়দানে পিঠ দেখানাের জন্য এখানে আসিনি।তখন সেই লােক ঘুরে দাঁড়ালাে সুলতান তকিউদ্দিনের দিকে। বললাে, আমাদের প্রাণপ্রিয় সেনাপতি! আপনাকে কে বলেছে, আমরা বাড়ী চলে যেতে চাই? আপনি আপনার উদ্দেশ্য বর্ণনা করুন! কোন্ কঠিন ময়দানে আমাদের নিয়ে যেতে চান, নির্দেশ করুন। আপনি আমাদেরকে পাহাড় থেকে লাফিয়ে পড়তে বললে আমরা তাই করবাে। যদি আপনি বলেন আমাদের সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে, আমাদের একজনও পিছন ফিরে তাকাবে না। আমরা সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ে আপনার নির্দেশ বাস্তবায়ন করবাে।'
পিছন থেকে আরেকজন উঠে দাঁড়িয়ে বলল, যদি আমরা পিছু হটে মারা যাই, তবে যেন আমাদের লাশ দাফন করা না হয়। আমাদের লাশ যেন শকুন ও শিয়ালের জন্য ফেলে রাখা হয়। আরও কয়েকটি ধ্বনি শােনা গেল সমবেত সৈন্যদের মধ্য থেকে। প্রত্যেকেই কথা বলছিল আবেগময় স্বরে এবং বলিষ্ঠ প্রত্যয় নিয়ে।
তকিউদ্দিনের বুক ফুলে উঠলাে। তিনি সৈন্যদের বললেন, ‘তােমাদের শত্রুরা এগিয়ে আসছে। তােমাদের প্রমাণ করতে হবে, রমলাই তাদের শেষ বিজয়। আজ রাত ও কালকের দিনটা পূর্ণ বিশ্রাম করাে। কাল রাতে আমি তােমাদের বলবাে, তােমাদের কি করতে হবে এবং আমরা কি করতে চাই।'
তকিউদ্দিন সৈন্যদের থেকে বিদায় নিয়ে তাঁর ক্যাম্পে সেনাপতি ও কমাণ্ডারদের ডাকলেন। তাদের তিনি বললেন, আগামীকাল রাতে তিনি কি করতে চান এবং এই সেনাবাহিনীকে কোথায় নিয়ে যেতে চান। হিম্মতের দুর্গ সেখান থেকে কাছেই ছিল। কিন্তু তিনি সেই দুর্গে আশ্রয় নিলেন না, সেনাবাহিনীকেও সেখানে যেতে দিলেন না।
ক্রুসেড বাহিনী দ্রুত অগ্রসর হচ্ছিল। এই বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন সম্রাট বিলডন। তিনি জানতেন, সামনেই হিম্মত দুর্গ। এ দুর্গে অবস্থান করছে সুলতান আইয়ুবীর ভাই সুলতান তকিউদ্দিন। আইয়ুবীর পরাজয়ের পর এবার তার পালা। এতক্ষণে নিশ্চয়ই সে তার ভাইয়ের পরাজয়ের খবর পেয়েছে। সেই খবরে তাঁর মনে ভীতির সঞ্চার হওয়াই স্বাভাবিক। সে যখন দেখতে পাবে, আইয়ুবীকে যারা পরাজিত করেছিল সেই বীর বাহিনী এসে তাকে অবরােধ করে বসেছে, ভয়ের চোটেই সে হয়তাে হাতিয়ার সমর্পণ করে দেবে।
খৃস্টান সম্রাট বিলডন এই আশা নিয়েই বিদ্যুৎগতিতে অগ্রসর হয়ে হিম্মত দুর্গ অবরােধ করে বসলাে। অবরােধ করার পর তারা ঘােষণা করল, কেল্লার দরজা খুলে দাও, নইলে এ কেল্লা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হবে।'
তারা ভেবেছিল, সুলতান তকিউদ্দিনের হাতে যুদ্ধ করার মত তেমন সৈন্য নেই। ফলে এ ঘােষণা শুনেই সে হাতিয়ার সমর্পন করে দেবে। কিন্তু দেখা গেল, হাতিয়ার সমর্পন করার জন্য কেউ এগিয়ে এলাে না। এমনকি কেউ তাদের আহবানের কোন জবাবও দিল না।
ধাঁধাঁয় পড়ে গেল বিলডন। এমন তাে হওয়ার কথা নয়! কেউ আত্মসমর্পনের জন্য এগিয়ে আসছে না কেন?
বিলডন আবার ঘােষণা করল, বৃথা রক্ত প্রবাহিত করে নিজেদের ধ্বংস ডেকে এনাে না। হাতিয়ার সমর্পন করাে। এখন আর লড়াই করে কোন লাভ হবে না, কেবল রক্ত ক্ষয় করবে। এ রক্ত তােমাদের কোন কাজে আসবে না। তােমরা যুদ্ধ করে জিততে পারবে না। তাই বিনা যুদ্ধেই দুৰ্গটা আমাদের কাছে সমর্পণ করাে। আমি অঙ্গীকার করছি, কোন বন্দীর সাথে দুর্ব্যবহার করা হবে না।
সঙ্গে সঙ্গে কেল্লার উপর থেকে উত্তর এলাে, সাবধান! আমাদের তীরর আওতা থেকে দয়া করে দূরে থাকো। কারণ আমাদের তীর কখনাে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না। এ দুর্গ কোনদিনই তােমরা হাতে পাবে না। প্রয়ােজনে এ কেল্লা আমরা নিজ হাতে ধ্বংস করে দেবাে, কিন্তু তােমাদের হাতে দেবাে না। আর আমাদের রক্ত! আমাদের রক্ত কখনাে বৃথা যায় না। আমরা জানি, আমাদের রক্ত শরীরে থাকলে যেমন লাভ, শরীর থেকে বেরিয়ে গেলে আরাে লাভ। আমাদের দেহের প্রতি ফোটা রক্ত তখন আমাদের বেহেশতের জামিন হয়ে যায়। উদ্দেশ্যহীনভাবে আমরা রক্ত দেই না, বরং তােমরাই লড়াই করতে নেমে অনর্থক মারা যাও।'
দুর্গ প্রাচীরে যে সব সৈন্য দাঁড়িয়েছিল, তারা দেখতে পেল, ক্রুসেড বাহিনী কেল্লার চারদিকে সাগরের তরঙ্গের মত ঢেউ তুলে ছড়িয়ে পড়ছে। উত্তাল তরঙ্গ যেমন বড় বড় পাথর গ্রাস করে তলিয়ে দেয় পানির নিচে, তেমনি এ কেল্লাকে যেন ওরা গ্রাস করে নেবে।
এদের মােকাবেলায় কেল্লায় যে পরিমাণ সৈন্য ছিল, তা অতি নগণ্য। কিন্তু এই সামান্য সংখ্যক সৈন্য নিয়েই সত্যের মুজাহিদ লড়াই করার জন্য ইস্পাতকঠিন সংকল্প ঘােষণা করল। কেল্লার কমাণ্ডার অস্ত্র সমর্পণ করতে কিছুতেই রাজী না হওয়ায় স্তম্ভিত হয়ে গেল বিলডন।
সুর্য ডুবে যাচ্ছিল। ক্রুসেড বাহিনী রাতের অন্ধকারে হামলা করার ঝুঁকি নিল না। তারা ভাবল, রাত কাটুক, কাল ভােরে ধীরে সুস্থে ওদের পাকড়াও করলেই হবে।
এমনিতেই দীর্ঘ পথ মার্চ করে এসে তারা খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। সৈন্যদেরকে আর কষ্ট দিতে চাচ্ছিল না বিলডন। তার মাথায় তখন একটাই চিন্তা, কি করে সুলতান তকিউদ্দিনকে জীবিত ধরা যায়। কারণ, সুলতান আইয়ুবীর ভাই হিসেবে তকিউদ্দিন খুবই মূল্যবান কয়েদী হবে। তাঁর বিনিময়ে ভাল শর্ত আদায় করা যাবে। চাই কি, কোন অঞ্চলও পেয়ে যেতে পারি।
বিলডনের মনে পূর্ণ আশা ও বিশ্বাস ছিল, এই কেল্লা ও কেল্লার সৈন্যদের তিনি সহজেই প্রেফতার করতে পারবেন।
সম্রাট বিলডন তার সৈন্য বাহিনীকে কেল্লা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গেলেন। এখন কেল্লা থেকে তীর বর্ষণ করলেও সে তীর এখানে পৌঁছতে পারবে না। তাদের মনে এমন কোন আশংকাই ছিল না, কোন সেনাদল বাইরে থেকে তাদের ওপর আক্রমণ চালাতে পারে।
তারা এই ভেবেও অনেকটা স্বস্তি অনুভব করছিল, সুলতান আইয়ুবী এখানে নেই। তাঁর সেনাবাহিনীও না। বিলডন কল্পনার চোখে দেখতে পাচ্ছিল, হিম্মত দুর্গের পতন হয়েছে। সেখানে শােভা পাচ্ছে তার নিশান। বাহ্যত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল, হিম্মত দুর্গের পতন সামান্য সময়ের ব্যাপার মাত্র। সন্ধ্যার পর তিনি তার কমাণ্ডারদের পরবর্তী দিনের কার্যাবলী বুঝিয়ে দিয়ে নিজের তাঁবুতে ফিরে গেলেন। তার জন্য তাঁবু খাটানাে হলাে সৈন্যদের ঘাঁটি থেকে কিছু দূরে। সে যুগে যুদ্ধের সময়ও সম্রাটদের তাঁবু খাটানাে হতাে আলীশান মহলের মত করে। সেখানে থাকতাে সম্রাটদের আনন্দ ও বিনােদনের ব্যবস্থা।
বিলডন যেহেতু একজন বিজয়ী সম্রাট, তাই তার ক্যাম্পও সেভাবেই সাজানাে হলাে। তার মনােরঞ্জনের জন্য পাঠানাে হলাে চারটি খৃস্টান মেয়ে ও চারজন মুসলমান মেয়ে। এই মুসলমান মেয়েদের ধরে আনা হয়েছিল বিজিত এলাকা রমলা থেকে। এ মেয়েদের সবাই ছিল অভিজাত ঘরের সন্তান। তারা কেবল যুবতীই ছিল না, ছিল নজরকাড়া সুন্দরীও।
খৃস্টান মেয়েরা তাদের বলছিল, এখন কান্নাকাটি করে কোন লাভ হবে না। তােমাদের মুক্ত করার জন্য ছুটে আসবে না কোন রাজপুত্তুর। তাই বৃথা চেষ্টা করাে না।
তাদেরকে আরও বলা হলাে, আরে, তােমরা তাে ভাগ্যবতী মেয়ে! কোন সাধারণ সেপাই বা কমাণ্ডার নয়, তােমরা স্বয়ং সম্রাটের নজরে পড়েছো।
আরেক মেয়ে তাদের বলছিল, মহাপ্রভুর শুকরিয়া আদায় করাে। যেসব মেয়েরা খৃস্টান সেনাদের কবলে পড়েছে, তারা এখন বুঝতে পারছে, দুনিয়া কত ভয়ংকর! তারা এখন বার বার হাত বদল হচ্ছে, আর তাদের চিৎকারে জমিন ও আসমান কেঁপে উঠছে।'
অন্য মেয়ে বলছিল, “তােমাদের ভাগ্যে বড়জোর কোন আমীর বা মুসলমান অফিসার জুটত! সেখানে তুমি খৃস্টান সম্রাটের সঙ্গিনী হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছো এটা কি কম কথা! ‘আরে, মুসলমান আমীর ও নবাবজাদাদের স্বভাব আমার জানা আছে। দু-চার বছর পর যৌবনে ভাটা পড়লে আপন বিবিকেও তারা বণিকের কাছে বিক্রি করে দেয়।' বলছিল আরেকজন।
মুসলমান চার মেয়ে চুপচাপ সহ্য করে যাচ্ছিল এই বাগাড়ম্বর। এ ছাড়া তাদের করার কিছুই ছিল না। খৃস্টান এক মেয়ে এ সময় আবার বলে উঠল, ‘শুনেছি সম্রাট তাদের বিয়ে করে বউ বানাবে। আহলে কিতাবদের মধ্যে বিয়ে জায়েজ করা হয়েছে কোরানেও। সুতরাং তােমাদের আর অসুবিধা কি!
এ সময় এক মুসলমান মেয়ে বলে উঠল, “খােদার দোহাই লাগে, ভণ্ডামী করার জন্য ধর্মকে টেনে এনাে না।'
ফোস করে টিপ্পনি কাটল এক খৃস্টান মেয়ে, ঠিকই তাে বলেছে সে। শুধু শুধু ধর্ম নিয়ে টানাটানি করছিস কেন! মেয়েদের আবার ধর্ম কি! মেয়েরা তাে পানির মত। যেই পাত্রে রাখাে সেই রং ধারণ করে। মেয়ে মানুষও তেমনি। স্বামী হােক আর যেই হােক, যার অধীনে সে থাকে, সেই মানুষটাই তার প্রভু। সে লােকের ধর্মই তার ধর্ম। যে ব্যক্তি দেশের রাজা তিনি তাে আমাদের দেহেরও রাজা, মনেরও রাজা।
এ ভাবেই চার মুসলিম মেয়েকে বিপথগামী করার জন্য চার খৃস্টান মেয়ে উঠেপড়ে লাগল। বিলডন তাদের ডেকে বলল, ‘এই মেয়েদের ওপর কোন কঠোরতা আরােপ করবে না। তাদের ওপর নির্যাতন চালাবে না। কোন রকম কষ্ট দেবে না। তাদেরকে কখনাে ধমক দিয়ে কথা বলবে না। বিলডন আরাে বলল, এরা খুবই সুন্দরী ও নব যুবতী। এদেরকে ট্রেনিং দিয়ে আমাদের কাজে লাগাতে হবে। আমি এই মেয়েদেরকে শুধু বিলাস ও ভােগের সামগ্রী বানাতে চাই না। দরকার হলে এদের সাথে আপন কন্যাদের মত ব্যবহার করাে। দরকার হলে ওদের উত্তম বান্ধবী হও তােমরা। তাদেরকে রাজকুমারীর মত বিলাস সামগ্রী সরবরাহ করাে। তাদের মনে স্বপ্নের আলপনা আঁকো! কথায় কথায় তাদেরকে আকাশের তারা বানিয়ে দাও।'
এই চার মুসলিম মেয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। এক মেয়ে বলল, “ইচ্ছায় হােক, অনিচ্ছায় হােক, শেষ পর্যন্ত আমাদেরকে আমাদের সম্ভ্রমের কোরবানী দিতেই হবে।
তার আগে আমরা এদের হাত থেকে পালাতে পারি না?
সেটা সম্ভব বলে আমার মনে হয় না। তারচে এখানে থেকেই এদের ওপর আমাদের প্রতিশােধ নেয়া উচিত। অপর মেয়ে বললাে।
‘কিন্তু প্রতিশােধ নেয়া ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয়, যে পর্যন্ত ওরা আমাদেরকে তাদের প্রতি আন্তরিক ও বিশ্বস্ত না পাবে।' প্রথম মেয়েটি বললাে, “ওদেরকে বুঝতে হবে, আমরা ওদের বশ্যতা মেনে নিয়েছি এবং তাদের ভাগ্যের সাথেই আমাদের ভাগ্য জুড়ে দিয়েছি।'
আমার পিতা সুলতান আইয়ুবীর সেনাবাহিনীতে আছেন। অপর মেয়েটি বললাে, তিনি বর্তমানে মিশরে আছেন। তিনি বলেছিলেন, কাফের মেয়েরা জাতির জন্য তাদের মান-সম্ভ্রম পর্যন্ত বিলিয়ে দেয়। তারা আমাদের বড় বড় আমীর ও অফিসারদের হাতে তাদের ইজ্জত তুলে দিয়ে তাদেরকে ক্রুসেড বাহিনীর তাবেদার বানিয়ে নেয়। যদি কাউকে হত্যা করার ইচ্ছা থাকে, সেই তাবেদারকে দিয়েই তাকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করে। আমাদের সেনাবাহিনীর গােপন তথ্য জেনে নিয়ে তারা খৃস্টানদের কাছে পৌছে দেয়।
‘আমি তা জানি। তার সাথী অন্য মেয়েটি বললাে, সেই মেয়েরা এমন কাজ করে, যা আমাদের পুরুষ গোয়েন্দারা শত্রুর দেশে গিয়ে করে থাকে। এ কথা বলেই সে চুপ হয়ে গেল এবং এদিক-ওদিক তাকিয়ে লক্ষ্য করলাে আশেপাশে কেউ আছে কিনা, কেউ গােপনে তাদের কথা শুনছে কিনা।
আশেপাশে কেউ নেই দেখে সে বললাে, যদি আমরা বলি, আমরা তাদের বশ্যতা মেনে নিয়েছি, তাতে এমন সুযােগও সৃষ্টি হতে পারে, আমরা একদিন সম্রাটকেও হত্যা করতে পারবাে।'
আর কিছু না হােক পালানাের সুযােগ তাে পাবাে। অন্য মেয়েটি বললাে।
যে রাতে বিলডনের সেনাবাহিনী হিম্মত দুর্গ অবরােধ করেছিল, তার দুই রাত আগের কথা। মুসলমান মেয়েরা খৃষ্টান মেয়েদের বলল, আচ্ছা, আমরা বিধর্মী হওয়ার পরও তােমরা আমাদের এমন আদর যত্ন করাে কেন?'
বাহ, তাতে কি হয়েছে, তােমাদের আর আমাদের খােদা তাে একজনই। তােমাকে যে আল্লাহ সৃষ্টি করেছে, আমাকেও তাে সে আল্লাহই বানিয়েছে। তাহলে ধর্মের কারণে আমরা তােমাদের দূরে ঠেলে ফেলবাে কেন?
ভাল কথা বলেছাে তাে! তােমরা যদি আমাদের এতটাই আপন করে নিতে পারাে, তাহলে আমরাই বা দূরে থাকবাে কেন? আমরা যদি আমাদের ধর্ম পরিবর্তন করে তােমাদের ধর্ম গ্রহণ করতে চাই, সে সুযােগ আমাদের দেবে?
কেন নয়? তােমরা চাইলে অবশ্যই তা সম্ভব।'
খৃস্টান মেয়েরা তখনি সে কথা সম্রাট বিলডনকে জানালাে। খুশী হয়ে সম্রাট বিলডন চার মেয়েকে চারটি মূল্যবান হার দান করলেন। তারপর তাদের ডেকে চার মেয়ের গলায় ছােট ছােট চারটি ক্রুশ ঝুলিয়ে দিলেন।
কিন্তু তিনি খৃস্টান মেয়েদের আলাদা ডেকে নিয়ে বললেন, ‘আমি এই চারজনের হাতে কোন খানাপিনা করবাে না। কারণ তারা ভয়ের কারণে ধর্ম পরিবর্তন করেছে, নাকি মন থেকে করেছে, আগে বুঝতে হবে। ধর্ম পরিবর্তনের কথা মুখে বলা যত সহজ মন থেকে মেনে নেয়া তত সহজ নয়। তবে তারা যখন বলেছে, তাদের মন জয় করতে চেষ্টা করাে। মুসলমানকে কেনা সহজ কিন্তু তাকে বিশ্বাস করা ও তার উপর ভরসা করা কঠিন ব্যাপার! যে মুসলমান বলিষ্ঠ ঈমানের অধিকারী, তারা এমন কঠিন কঠিন কোরবানী ও ত্যাগ স্বীকার করে, যা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। এই মেয়েদের উপর কড়া দৃষ্টি রাখবে, যেন কোথাও পালিয়ে যেতে না পারে। সতর্ক থাকবে, যেন সুযােগ মত আমাদের উপর আঘাত হেনে ক্ষতি না করে।
অবরােধের প্রথম রাত। এই চার মেয়ে পৃথক এক তাঁবুতে শুয়ে ছিল। বিলডনও তাদের সাথে কিছুক্ষণ হাসি-তামাশা করে নিজের তাবুতে গিয়ে শুয়ে পড়েছিলেন।
কমাণ্ডার ও সৈন্যরা ক্লান্তি ও অবসাদের কারণে শােয়ার সাথে সাথেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিল। শুধু ক্যাম্প প্রহরী ও বিলডনের দেহরক্ষী চার-পাঁচজন জেগে ছিল।
হিম্মত পর্বতশৃঙ্গের পাশে এক সবুজ শ্যামল প্রান্তর। এই প্রান্তরে কমবেশী এক হাজার পদাতিক সৈন্য নিয়ে ঘাপটি মেরে বসেছিলেন সুলতান তকিউদ্দিন। রাতের অন্ধকার গাঢ় হয়ে নেমে এলাে। রাত বাড়তে লাগল একটু একটু করে। মধ্যরাতের সামান্য আগে সুলতান তকিউদ্দিন গােপন সংকেত দিলেন।
আস্তে পা টিপে টিপে সেই প্রান্তর থেকে গােপনে বের হয়ে গেল সেই সেনাবাহিনী। কমাণ্ডার তাদেরকে ছােট ছােট সৈন্য দলে বিভক্ত করে ছড়িয়ে দিলাে। রাতের নিস্তব্ধতা যেন নষ্ট না হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে পায়ে পায়ে এগিয়ে চলল সেই কাফেলা। তারা সামনে অগ্রসর হয়ে বিলডনের সেনা ক্যাম্প ঘেরাও করে দাঁড়াল।
এই সে সেনাদল, যাদেরকে নিয়ে তকিউদ্দিন হিম্মত কেল্লা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। কেলায় সামান্য সৈন্যই রেখেছিলেন তিনি। তার বিশ্বাস সত্যে পরিণত হলাে। তিনি ধারণা করেছিলেন, ক্রুসেড বাহিনী হিম্মত কেল্লা অবরােধ করবে। সুতরাং তিনি তার মূল সেনাশক্তি হিম্মত পর্বতের পাশে লুকিয়ে রেখেছিলেন। কেল্লায় যারা ছিল তাদের অভয় দিয়ে বলেছিলেন, ‘খৃস্টান বাহিনী তােমাদের অবরােধ করলে ভয় পেয়াে না। তাদের সাথে তােমাদের নয়, লড়াই হবে আমাদের। ওরা তােমাদের অবরােধ করলে আমরা তাদের ওপর মরু সাইমুমের ঝড় হয়ে ছুটে আসবাে।
এ জন্যই কেল্লাধিপতি ক্রুসেড বাহিনীর চ্যালেঞ্জের বীরােচিত উত্তর দিয়েছিলেন। তার বলিষ্ঠ ভাষা ও সাহসিকতা দেখে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল সম্রাট বিলডন।
এই কেল্লার অধিপতি ছিলেন তকিউদ্দিনের মামা শিহাবুদ্দিন আল হাশমী।
রাতে তকিউদ্দিনের এক হাজার পদাতিক সৈন্য ছােট ছােট দলে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে কমান্ডো আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হলাে। তারপর তকিউদ্দিনের ইঙ্গিত পাওয়ার সাথে সাথে প্রথমে তারা তাবুর রশি ও দড়িদড়া দ্রুত হাতে কেটে ফেললাে। তারপর ওপর থেকে বর্শাবিদ্ধ করে মাছ মারার মত ক্রুসেডদের বিদ্ধ করতে লাগলাে। তাঁবুর নিচে ঘুমন্ত সৈন্যরা টেরই পেল না, কোন ফাঁকে মৃত্যু এসে তাদের পরপারে পাঠিয়ে দিল।
এরা এই যুদ্ধের প্রশিক্ষণ পেয়েছিল সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর কাছ থেকে। আইয়ুবী এই যুদ্ধের নাম দিয়েছিল, ‘আঘাত করাে আর পালাও! .
এতবড় বিশাল বাহিনীর সাথে মাত্র এক হাজার পদাতিক সৈন্যের সম্মুখ লড়াইয়ের প্রশ্নই আসে না। যত বড় বীর আর যােদ্ধাই হােক, হাজার হাজার মৌমাছি আঁকড়ে ধরলে সেও কুপােকাত হয়ে যায়। এই বিশাল বাহিনীর সামনে তকিউদ্দিনের বাহিনীর অবস্থা ছিল অনেকটা সেরকম।
তাই তকিউদ্দিন সঠিক সিদ্ধান্তই গ্রহণ করেছিলেন। তিনি তার বাহিনীকে ছােট ছােট দলে বিভক্ত করে বিভিন্ন গ্রুপের ওপর আলাদা দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন।
কিছু গ্রুপের ওপর দায়িত্ব ছিল, ক্যাম্প প্রহরীদেরকে কোন রকম আওয়াজ করার সুযােগ না দিয়ে গায়েব করে ফেলা।
কিছু গ্রুপ শত্রুদের ঘােড়া, উট ও খচ্চরের বাঁধন কেটে দেয়ার দায়িত্ব পেয়েছিল। এ দুই কাজে শ’দুই সৈন্য রেখে বাকী। আটশাে সৈন্যকে তিনি প্রস্তুত রেখেছিলেন মূল আক্রমণের জন্য। এই আটশাে সৈন্য ধূমকেতুর মত ঘুমন্ত বাহিনীর ওপর টুটে পড়লাে। চোখের নিমিষে তারা এমন ত্রাস সৃষ্টি করলাে যে, ক্রুসেড সৈন্যদের আতংকিত আর্ত চিঙ্কারে পুরাে এলাকা নরক গুলজার হয়ে উঠল। তাদের আর্তনাদের ধ্বনি দিকদিগন্তে ছড়িয়ে পড়লাে। তখনাে যারা আক্রান্ত হয়নি তারা দুঃস্বপ্নের ঘাের কাটিয়ে তাবুর বাইরে এসে দেখলাে, কেয়ামতের প্রলয় শুরু হয়ে গেছে ক্যাম্পে। সহসা তারাও আর্ত চিৎকার দিয়ে ছুটাছুটি শুরু করল প্রাণ নিয়ে পালাতে। কিন্তু চিতাবাঘের মতই ক্ষিপ্রগতিতে তাদের ওপর লাফিয়ে পড়ছিল মরণজয়ী মুজাহিদরা। সহসা যেন ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেল ক্যাম্পে। আকাশ-পাতাল কেঁপে উঠলাে মানুষ ও পশুর সম্মিলিত চিৎকারে।
সম্রাট বিলডন চোখ খােললেন। তার কমাণ্ডাররাও জেগে উঠলাে। তাঁবুর বাইরে গিয়ে দেখতে পেলাে, সেনা ক্যাম্পের তাবুতে সর্বত্র শুধু আগুন জ্বলছে। তকিউদ্দিনের পদাতিক বাহিনীর ছােট ছােট দলগুলাে দ্রুত আঘাতের পর আঘাত করছিল আর সাথে সাথে তাঁবুগুলােতে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছিল। তারা আঘাত করছিল আর তাকবীর-ধ্বনি দিচ্ছিল।
এই ধ্বনি অন্য সবার মত সেই চার মুসলিম মেয়েও শুনতে পেলাে। তারা বুঝতে পারলাে, রাতের আঁধারে যে ফৌজ এই সৈন্যদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে তারা মুসলমান।
তারা চারজন একই তাঁবুতে ছিল। একজন বলে উঠল, 'চলাে পালিয়ে যাই।'
না, আমি পালাবাে না। আমার বুকের মধ্যে প্রতিশােধের যে আগুন জ্বলছে, এখন আমি সেই আগুন নেভাবাে। আমি সম্রাট বিলডনকে হত্যা করবাে।
বিলডনের তাবু সেনা ক্যাম্প থেকে একটু দূরে ছিল। সেখানে মশাল জ্বলছিল। বিলডনের দেহরক্ষীরা অশ্বপৃষ্ঠে আরোহন করে তার চারপাশে পাহারা দিচ্ছিল।
সহসা কেঁপে উঠলাে সেখানকার মাটি। হাজার হাজার দুরন্ত অশ্বের মিলিত পদধ্বনি শােনা গেল। এগুলাে ছিল তকিউদ্দিনের অশ্বারােহী বাহিনী। এই অশ্বারােহীর সংখ্যা মুসলমান ঐতিহাসিকগণ দুই হাজার বলে উল্লেখ করেছেন, আর খৃস্টান ঐতিহাসিকরা চার হাজার বলেছেন। এই অশ্বারােহী বাহিনী বিদ্যুৎগতিতে ঝাঁপিয়ে পড়লাে ক্রুশেড বাহিনীর ওপর। এদের মােকাবেলা করার কোন প্রস্তুতিই ছিল না ক্রুসেড বাহিনীর। তারা তখনও জানতেও পারেনি, কি হচ্ছে আর কারা তাদের আক্রমণ করেছে। শুধু তাদের তকবীর ধ্বনি থেকে বুঝা যাচ্ছিল, এরা মুসলমান।
তকিউদ্দিনের অশ্বারােহীরা ক্রুসেড বাহিনীর ক্যাম্প ছিন্নভিন্ন করে হাতের কাছে যেখানে যাকে পেল ঘােড়ার পদতলে পিষে ফেলতে লাগল। যারা ঘােড়ার পায়ের তলে পড়েনি তাদেরকে তলােয়ারের আঘাতে পরপারে পাঠিয়ে দিচ্ছিল। কেউ আবার বর্শায় বিদ্ধ করে তাদেরকে ঠেলে দিচ্ছিল মৃত্যুর কোলে। প্রায় এক ঘন্টা এই তুফান চালানাের পর হঠাৎ কমাণ্ডার ফিরে যাওয়ার সংকেত দিল। সাথে সাথে অশ্বারােহী বাহিনী উধাও হয়ে গেল ময়দান থেকে।
বিলডনের মনে হলাে, সে ভয়ংকর কোন দুঃস্বপ্ন দেখছে। এটা যে বাস্তব তাই সে বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে দেখতে পেল, কোন প্রতিরােধ ছাড়াই একদল অশ্বারােহী এলাে এবং স্বাধীনভাবে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে চোখের নিমিষে আবার হাওয়া হয়ে গেল।
ক্রুসেড বাহিনী হিম্মত দুর্গ অবরােধ করে নিয়েছিল। সে কারণে দুর্গের দুই পাশেই তারা ক্যাম্প করেছিল। এক পাশে যখন এই কেয়ামত চলছিল কেল্লার অপর পাশের ক্রুসে বাহিনী তখনাে ছিল আক্রমণের বাইরে। তারা এদিকে শশারগােল শুনতে পেল। শুনতে পেল আহত ও মৃত্যুপথযা সৈনিকদের মরণ চিৎকার। এদিকের যে দু'চার জন সৈন্য এ বিভীষিকার হাত থেকে নিজেকে কোন মতে বাঁচাতে পার তারা ছুটল অপর পাশের সেনা ক্যাম্পে।
সেখানে পালিয়ে যারা আশ্রয় নিল তাদের কাছে ওরা জানতে চাইল কি ঘটেছে। কিন্তু ওরা যেন বােবা হয়ে গিয়েছিল প্রথমে ওরা কিছুই বলতে পারল না। কিছুটা ধাতস্থ হয়ে একজন বলল, কি ঘটেছে আমরা জানি না। আমরা ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ আমাদের ওপর দিয়ে হাজার হাজার ঘােড় উট ও খচ্চরকে ছুটে যেতে দেখলাম। আমাদের অনেকে সেইসব বােবা জানােয়ারের পায়ের তলে পিষে মারা পড়ল । কেউ হয়তাে আমাদের পশুগুলাের বাঁধন কেটে দিয়েছিল । সেগুলাে ছুটাছুটি করে আমাদের দলিত মথিত করছিল। প্রাণ ভয়ে আমরা পালিয়ে এসেছি।'
এদিকে চারজন মুসলিম মেয়েই বেরিয়ে এলাে তাদের তাবু থেকে। খৃস্টান সৈন্যদের নিজেদেরই তখন মরণ দশা। ফলে বন্দী মেয়েরা কে কোথায় যাচ্ছে সেদিকে নজর দেয়ার মত অবস্থা তাদের ছিল না, কেউ তাদের দিকে তাকালােও না।
মেয়েরা ছুটে গেল মুসলিম ফৌজের কাছে। তারা চিঙ্কার করে বলতে লাগল, ‘সম্রাট বিলডন এদিকে। তােমরা আমাদের কথা শােন। বিলডনকে গ্রেফতার করাে।'
কিন্তু তখন সেখানে এমন হট্টগােল চলছিল যে, মেয়েদের দিকে নজর দেয়ার মত সময় কারাে ছিল না। কেউ তাদের কথা গ্রাহ্য করল না। কেউ শুনতেও পেল না তাদের চিৎকার। অশ্বারােহীরা এত দ্রুতবেগে ছুটে যাচ্ছিল যে, তাদের কানে মেয়েদের কথা পৌঁছতেই পারছিল না। এক মেয়ে ছুটে হট্টগােলের ভেতর ঢুকে গেল। মুহূর্তে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল অন্য মেয়েদের থেকে।
সে এক অশ্বারােহীর পেছনে ছুটছিল আর চিৎকার করে বলছিল, ঘােড়া থামাও, আমার কথা শোন। সম্রাট বিলডন এদিকে।
কিছু দূর যাওয়ার পর অশ্বারােহীর মনে হলাে, কোন মেয়ে -চিৎকার করছে। সে ক্ষিপ্রগতি ঘােড়ার বাগ টেনে ধরল।
ঘােড়ার গতি কমে এলে মেয়েটি ছুটে গিয়ে ধরে ফেলল ঘােড়ার বাগ । মেয়েটি হাঁফাতে হাঁফাতে বললাে, আমি মুসলমান। আমার মত আরও তিনজন মুসলিম মেয়ে খৃস্টান সম্রাট বিলডনের বন্দীনী হয়ে ওদের সাথে আছি।'
‘কোথায় ওরা? সম্রাট বিলডন কোথায়?”
‘আমার সাথে এসাে, আমি দেখিয়ে দিচ্ছি তার তাবু। মেয়েটি বলল।
এই অশ্বারােহী এক কমাণ্ডার ছিল। সে মেয়েটিকে ঘােড়ার পিঠে তুলে নিয়ে বলল, 'কোন দিকে?'
মেয়েটি দিক নির্দেশ করল। কমাণ্ডার সেদিকে ঘােড়া ছুটিয়ে দিল।
কিছু দূর যাওয়ার পরই সে এক সেনাপতির সামনে পড়ে গেল। ঘােড়া থামিয়ে সে সেনাপতিকে বলল, “এই মেয়ে সম্রাট বিলডনের ক্যাম্পের খোঁজ জানে। আমি সেখানে যাচ্ছি ।'
সেনাপতি বলল, দাঁড়াও। সেখানে তােমার একা যাওয়া ঠিক হবে না। সেখানে নিশ্চয়ই তার রক্ষী বাহিনী আছে।
সেনাপতি মেয়েটির কথা শুনলাে। মেয়েটি সম্রাট বিলডনের তাবুর দিক নির্দেশ করে বলল, সেখানে আমার মত আরও তিনটি মুসলিম মেয়ে আছে।
সেনাপতি সম্রাট বিলডনের তাবুতে কমাণ্ডো আক্রমণ চালানাের জন্য দু’টি কমাণ্ডো গ্রুপকে সঙ্গে দিলেন তার। কমাণ্ডারের নেতৃত্বে এই বাহিনী অনতিবিলম্বে বিলডনের তাবুর দিকে ঘােড়া ছুটিয়ে দিল এবং দ্রুত সেখানে গিয়ে পৌছল। তারা বিলডনের তাবু অবরােধ করে দাঁড়াল। কমাণ্ডার সম্রাট বিলডনকে চ্যালেঞ্জ করলাে, তার ক্যাম্পে আগুন লাগানাের হুমকি দিল। কিন্তু, কেউ তার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করল না, কেউ তার হুমকীর কোন জবাবও দিল না।
কমাণ্ডার দুই সৈন্যকে তাবুতে ঢুকার হুকুম দিল। তারা তাবুতে ঢুকে দেখতে পেল, বিলডন সেখানে নেই। তার বডিগার্ডরাও কেউ নেই যে, অস্ত্র সমর্পণ করতে আসবে।
তারা আশপাশের তাবুগুলােতে তল্লাশী চালিয়ে কিছু মেয়ে, সেই মুসলিম মেয়ে তিনটি এবং কয়েকজন চাকর-বাকর ও রক্ষীর সন্ধান পেল। কমাণ্ডার তাদের সকলকেই গ্রেফতার করে সেনাপতির সামনে হাজির করল।
বন্দীদের কাছে বিলডন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাে সেনাপতি, কিন্তু কেউ তার হদিস বলতে পারলাে না।
বিলডন ভয় পেয়ে ততক্ষণে পালিয়ে গেছেন। ঘুম থেকে জেগেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এটা মুসলিম কমাণ্ডো বাহিনীর কাজ। এ অবস্থায় তার করার কিছুই ছিল না। তিনি যখন দেখলেন, তার বাহিনী কোন প্রতিরােধ গড়ে তােলার পরিবর্তে কেবল চিৎকার ও ছুটাছুটি করছে, তখনই তিনি পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি তার রক্ষী বাহিনী নিয়ে চুপিসারে সেখান থেকে সটকে পড়লেন। কিন্তু কিছু দূর যাওয়ার পরই তিনি এক কমাণ্ডো গ্রুপের সামনে পড়ে গেলেন। এই গ্রুপের দায়িত্ব ছিল, কেউ এ পথে পালিয়ে যেতে চাইলে তাকে বাঁধা দান করা।
সম্রাট বিলডন এই বাহিনীর সামনে পড়ে বুঝতে পারলেন, মুসলিম বাহিনী তাদের পালাবার পথও বন্ধ করে দিয়েছে। তিনি আর সামনে অগ্রসর হওয়ার সাহস পেলেন না। বাধ্য হয়ে তিনি আবার তার ক্যাম্পে ফিরে যাওয়ার জন্য ঘােড়ার মুখ ঘুরিয়ে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তার দেহরক্ষীরাও ঘােড়ার মুখ ঘুরিয়ে দিল।
তিনি তার ক্যাম্পের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, এ সময় তার এক পলাতক অশ্বারােহী সামনে পড়ে গেল। সেই অশ্বারােহী তাকে বললাে, আপনি অন্য কোথাও চলে যান, ক্যাম্পে আর যাবেন না। কারণ সেখানে মুসলমান সৈন্যরা পৌছে গেছে।'
বিলডন সেখান থেকেই ঘােড়ার গতি আবার অন্যদিকে ফিরিয়ে দিলেন।
যে অশ্বারােহী বাহিনী এতক্ষণ ক্রুসেড বাহিনীর একাংশের ওপর প্রলয়কাণ্ড ঘটাচ্ছিল, মুহূর্তে তারা সেখান থেকে উধাও হয়ে গেল। একটু পর একই রকম ডাক-চিৎকার শুরু হলাে ক্রুসেড বাহিনীর অপর অংশ থেকে। সেখানেও সিংহ বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়লাে প্রথমে তকিউদ্দিনের পদাতিক বাহিনী ও পরে অশ্বারােহী বাহিনী।
তকিউদ্দিনের পদাতিক বাহিনী এই বাহিনীর ওপর আঘাত হানতে এসে তুমুল প্রতিরােধের সম্মুখীন হয়েছিল। কারণ তখন তারা জেনে গিয়েছিল, মুসলিম বাহিনী রাতের অন্ধকার অগ্রাহ্য করে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। যদি সময় মতাে অশ্বারােহী বাহিনী এসে না পড়তাে, তবে পদাতিক বাহিনী বড় রকমের বেকায়দায় পড়ে যেতাে। এরই মধ্যে অনেকে শহীদ হয়ে গিয়েছিল, অনেকে আহত হয়েছিল।
সারা রাত তকিউদ্দিনের বাহিনী ‘আঘাত হাননা আর পালাও!’ যুদ্ধে লিপ্ত রইল। যখন ভাের হলাে, দেখা গেল, হিম্মত দুর্গের আশপাশে ছড়িয়ে আছে খৃস্টানদের অগণিত লাশ। চারদিকে লাল রক্তের ছড়াছড়ি। বহু আহত সৈন্য পালাতে না পেরে মরণ যন্ত্রণায় কাৎরাচ্ছে।
এসব লাশ ও আহত সৈন্যদের মধ্যে তকিউদ্দিনের মুসলিম মুজাহিদরাও ছিল। খৃস্টানদের উট, ঘােড়া ও খচ্চরগুলাে দূরদূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে চড়ে বেড়াচ্ছিল। কিন্তু সেখানে বিলডনও ছিল না, তার সেনাবাহিনী বা বডিগার্ডরাও ছিল না। ক্রুসেড বাহিনী তাদের বিস্তর রসদপত্র ফেলে পালিয়ে গেছে। ‘তকিউদ্দিন তার বাহিনীকে আদেশ দিলেন, আহতদের সেবা ও চিকিৎসা করতে। আরেকটি দলকে হুকুম দিলেন, সকল মৃত ব্যক্তি ও শহীদ সৈন্যদের দাফনের ব্যবস্থা করতে। অন্য একটি দলকে বললেন, দুশমনের ফেলে যাওয়া মাল সামান সব এক জায়গায় জমা করাে। তাদের যে পশুগুলাে বেওয়ারিশ অবস্থায় মরুভূমিতে ও পাহাড়ের আশেপাশে চড়ে বেড়াচ্ছে, সেগুলাে ধরে এনে বেঁধে রাখাে।
(চলবে)
সুলতান আইয়ুবীর নতুন রিক্রুট করা সৈন্যরা, যারা সহজেই কয়েকটি স্থান দখল করে নিয়েছিল, তারা ভেবেছিল, কেউ তাদের পরাজিত করতে পারবে না। কিন্তু তারা যখন খৃস্টান বাহিনীর সয়লাব ছুটে আসতে দেখল, তখন তারা কেয়ামতের প্রলয় দেখতে পেল। তারা প্রাণ নিয়ে এমন দ্রুত ময়দান ছেড়ে পালালাে, যেন তারা হিংস্র বাঘের মুখে পড়ে গেছে। তারা যে পথে এসেছিল, সে পথেই আবার মিশর যাত্রা করলাে। যুদ্ধ করার সাধ তাদের জন্মের মত মিটে গেল।
পলাতক সৈন্যদের মধ্যে কোন শৃংখলা ছিল না। অনভিজ্ঞ বালকের মত তারা কেবল প্রাণপণে ছুটছিল।
বিশ্ব বিজয়ী অপরাজেয় বীর সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর ভাগ্য ভাল, খৃস্টান সৈন্যরা পলায়নপর সৈন্যদের পিছু ধাওয়া করেনি। ফলে কোন ফাঁকে তিনি যুদ্ধের ময়দান থেকে সরে পড়েছিলেন, টের পায়নি কেউ। তাই সে যাত্রা তিনি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান।
কাজী বাহাউদ্দিন শাদ্দাদ তার বইতে যুদ্ধের বিবরণ লিখতে গিয়ে লিখেছেন, সুলতান আইয়ুবী আমাকে তার পরাজয়ের কারণ এইভাবে বলেছেন, ক্রুসেড বাহিনী আমার যুদ্ধের চাল আমার বাহিনীর ওপর চালিয়ে দিল। তারা ঠিক সেই সময় আমাকে যুদ্ধের ময়দানে টেনে নিল, যখন আমি ও আমার বাহিনী যুদ্ধের পজিশনে ছিলাম না। দ্বিতীয় কারণ হলাে, আমার সেনাবাহিনীর পার্শ্বদেশে যে সেনাদল ছিল, তারা নিজেদের মধ্যে স্থান পরিবর্তনের ব্যস্ততায় ছিল। তারা যখন এলোেমলাে অবস্থায়, তক্ষুণি ক্রুসেড বাহিনী আমাদের ওপর প্রবল আক্রমণ চালালাে। তাদের আক্রমণ এত কঠিন ও আকস্মিক ছিল যে, আমাদের নতুন সৈন্যরা ভীত হয়ে পালালাে। পিছু হটতে গিয়ে তারা মাঝ পথে পথ হারালাে ও ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। আমি আর তাদের একত্রিত করতে পারলাম না। শত্রুরা আমাদের অনেক সৈন্যকে ধরে যুদ্ধ বন্দী করলাে। তাদের মধ্যে সেনাপতি ঈশা আল হেকাবীও ছিলেন। আমি অবস্থা বেগতিক দেখে আদেশ দিলাম, যে যেভাবে পারাে পালিয়ে যেতে চেষ্টা করাে। পথে কোথাও না থেমে সােজা মিশরে চলে যাও।'
কাজী বাহাউদ্দিন শাদ্দাদ আরাে লিখেছেন, যুদ্ধের পরে সুলতান আইয়ুবী খৃস্টানদের ষাট হাজার দিনার মুক্তিপণ দিয়ে ঈশা আল হেকারীকে মুক্ত করে আনেন।'
এই যুদ্ধ ৫৭৩ হিজরীর জমাদিউল উলা মুতাবেক অক্টোবর ১১৭৭ সালে সংঘটিত হয়। সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী নিঃসঙ্গ অবস্থায় কায়রাে পৌছলেন। তাঁর মাথা ছিল অবনত।
তাঁর সাথে কোন সৈন্য ছিল না। এমনকি তার সাথে কোন রক্ষীও ছিল না।
তিনি কায়রাে পৌছেই আবার নতুন সৈন্য ভর্তি করার আদেশ জারী করলেন। তার ভাই তকিউদ্দিন ও যােগ্য সেনাপতিরা তখন হিম্মত এলাকায়।
যে রমলায় আটশাে বছর আগে সুলতান আইয়ুবী ক্রুসেড বাহিনীর হাতে পরাজিত হয়েছিলেন, আজও সেই রমলা ইসরাইলীদের দখলে। এই রমলা বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে মাত্র দশ মাইল উত্তরে অবস্থিত।
কিছুদিন আগেও এই রমলা ছিল জর্দানের অন্তর্ভুক্ত। ১৯৬৭ সালের জুন মাসে আরব ও ইসরাইলের মধ্যে যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়, সেই যুদ্ধে ইসরাইল জর্দানের এই অঞ্চল দখল করে নেয়।
জর্দান নদীর পশ্চিম তীর থেকে শুরু করে ইসরাইলের সীমান্ত পর্যন্ত এই এলাকা বিস্তৃত। যুদ্ধের পর কেটে গেছে তিন যুগেরও অধিক সময়, কিন্তু ইসরাইল এই আরব ভূখন্ড মুক্ত করার পরিবর্তে সেখানে আরও শক্ত করে আসন গেড়ে বসেছে। এখন তারা বলছে, দুনিয়ার কোন শক্তিই আমাদের এখান থেকে সরাতে পারবে না।'
তারা রমলার সেই ঐতিহাসিক অঞ্চলকে এখন মুসলমানদের বধ্যভূমিতে পরিণত করেছে। যেদিন তারা এ অঞ্চল অধিকার করেছিল, সেদিন থেকেই এ অঞ্চল মুসলমানদের বধ্যভূমিতে পরিণত হয়। গত কয়েক দশক ধরে রমলার বীর মুসলমানরা স্বাধীনতার দাবীতে ইসরাইল সরকারের বিরুদ্ধে অবিরাম লড়াই করে যাচ্ছে। আর ইসরাইলীরা এই সব মুসলমানকে তাদের রাইফেলের টার্গেটে পরিণত করছে।
ইসরাইলের এই একগুঁয়ে মনােভাব প্রমাণ করে, ইসরাইলীরা এ অঞ্চল কোনদিনই মুক্ত করবে না। আরবদের অনৈক্য ও শক্রতা সহায় হয়েছে তাদের, তাই ক্ষুদ্র একটি দেশ হয়েও তাদের দম্ভের কোন অন্ত নেই। মুসলিম বিশ্ব তাদের ব্যাপারে নির্বিকার। জাতিসংঘ তাদের মদদগার। ইঙ্গ-মার্কিন-রুশ চক্র তাদের সহায় । তাই আজো মানবতা মরুভূমির বিস্তৃত প্রান্তরে হাহাকার করে মরছে। মানবতা কাঁদছে বিশ্বের অলিতে গলিতে। পৃথিবীতে আজ মুসলমানের অভাব নেই। অভাব নেই তাদের সহায় ও সম্পদের। কিন্তু একজন সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর অভাবে কাঁদছে জগত-সংসার। কাঁদছে ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, আফগানিস্তান, মিন্দানাও, বসনিয়া, হার্জেগােভিনা। কিন্তু আটশাে বছর আগে যখন এই এলাকা খৃস্টান বাহিনীর অধিকারে চলে যায়, তখন সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী এক মুহূর্তের জন্য শান্তিতে বসবাস করতে পারেননি। আরাম আয়েশ ও বিলাসিতার কোন সময় পাননি তিনি। রমলার নির্যাতীত মানুষের কান্না তার রাতের আরাম ও দিনের বিশ্রাম হারাম করে দিয়েছিল। মজলুম মানুষের হাহাকার ছিনিয়ে নিয়েছিল তার সব সুখ ও শান্তি।
যুদ্ধের ময়দান থেকে পরাজিত হয়ে ফিরে এসেই তিনি আবার নতুন সৈন্য ভর্তির হুকুম দিয়েছিলেন। কষ্ট ও বিপদের বােঝা মাথায় চেপে থাকলেও হতাশা গ্রাস করতে পারেনি তাকে। পরাজয়ের গ্লানিকে তিনি উদ্যমের শাণিত তরবারী দিয়ে কেটেকুটে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলেন।
তাঁর সেনাদল যুদ্ধের ময়দান থেকে প্রাণ ভয়ে পালিয়ে এসেছিল মিশরে। যারা আসতে পারেনি তারা খৃস্টান বাহিনীর হাতে বন্দী হয়েছিল। আর অবশিষ্ট সৈন্যরা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে লালে লাল করে দিয়েছিল রমলার বিশাল প্রান্তর।
কিন্তু সুলতান আইয়ুবী মিশরে ফিরে এসে শুধু গুছিয়েই নেননি বরং তিনি পরাজিত এলাকায় আবার বীর বেশে ছুটে গিয়েছিলেন। যে ক্রুসেড বাহিনী তাঁর ওপর ঝড়ের মত আপতিত হয়েছিল তাদের ওপর তিনি কিয়ামত চাপিয়ে দিয়েছিলেন। রমলা আজ আবার তাকিয়ে আছে তেমনি এক নব্য সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর পথের পানে। তেমনি এক বীর আবার কখন রমলার অশ্রু মুছিয়ে দিতে ছুটে আসবে এই প্রশ্ন এখন বিশ্বের বিবেকবান প্রতিটি মানুষের মনে।
সুলতান আইয়ুবীর সামনে সেদিন শুধু এই প্রশ্নই ছিল না, তিনি পরাজয়ের প্রতিশােধ নেবেন এবং ক্রুসেড বাহিনীর অগ্রগতি রােধ করবেন। বরং বহু বিপদ ও মুসিবত তাকে ঘেরাও করে ধরেছিল। সে সব প্রতিবন্ধকতা মােকাবেলা করেই তাকে সামনে অগ্রসর হতে হচ্ছিল।
যে অগণিত বিপদ বাঁধা মােকাবেলা করে তাঁকে অগ্রসর হতে হচ্ছিল, তার এক নম্বরে ছিল বিশ্বাসঘাতকদের ভয়। কারণ বিশ্বাসঘাতকরাই যুগে যুগে মুসলিম বাহিনীর পরাজয়ের অন্যতম কারণ ছিল।
এ ছাড়া ছিল সুদানের দিক থেকে আক্রমণের আশংকা। কারণ সুদানীরা জানতাে, সুলতান আইয়ুবীর কাছে বেশী সৈন্য নেই। যে সব সৈন্য আছে, তারা পরাজিত ও ভগ্ন হৃদয় এবং আহত।
সবচে ভয়ংকর ও বেশী ভয়ের কারণ ছিল ক্রুসেড বাহিনী। কারণ তারা সংখ্যায় ছিল অনেক বেশী। তারা রমলায় ঘাঁটি গেড়ে বসেছিল।
এ ছাড়া ছিল সেই সব মুসলমান আমীর ও সুলতানদের ভয়, যারা সুলতান আইয়ুবীর বিরােধী ছিল। তারা সুলতানের পরাজয়ে যেমন খুশী হয়েছিল তেমনি আশায় ছিল, যদি সুযােগ পাওয়া যায় তবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাকে আবার পরাজিত করবে। আরও একটি আশংকার কারণ ছিল খৃস্টানদের গােয়েন্দা তৎপরতা। হরমনের দক্ষ হাতের পরিচালনায় সে সময় এ ক্ষেত্রে তারা যথেষ্ট অগ্রগতি সাধন করেছিল। চারদিকে শক্ত জাল বিছিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। তারা জনগণের মধ্যে মিশে গিয়ে জনমনে গুজব ছড়িয়ে জাতির মনােবল ভেঙ্গে দিচ্ছিল।
এই পরাজয়ের সংবাদ পেয়ে সুলতান আইয়ুবীর ভাই সুলতান তকিউদ্দিন হিম্মত দুর্গ ছেড়ে হিম্মত পর্বত চূড়ায় উঠে যান তার বাহিনী নিয়ে। তিনি আশংকা করলেন, ক্রুসেড বাহিনী এই বিজয়ের পর হিম্মত দুর্গ অবরােধ করে বসতে পারে।
তার আশংকা সত্যে পরিণত হলাে। ক্রুসেড বাহিনী সুলতানকে পরাজিত করে হিম্মতের দিকে অগ্রসর হলাে।
তকিউদ্দিন তার ভাইয়ের মতই যােগ্য সেনাপতি ছিলেন। তার সঙ্গী-সাথী সেনাপতিরাও ছিল রণ-নিপুন, বীর এবং মর্দে মুজাহিদ। সুলতান আইয়ুবীর মতই দৃঢ় ঈমানের অধিকারী ছিল এরাও। কারণ, তকিউদ্দিনসহ এরা সবাই ছিল সুলতান আইয়ুবীর শাগরেদ। যুদ্ধের কলা-কৌশলও তারা শিখেছিল আইয়ুবীর কাছ থেকেই।
তকিউদ্দিন ও তাঁর সাথীরা একমত হলাে, ক্রুসেড বাহিনী এত বড় ও এত সহজ বিজয় লাভের পর শুধু রমলা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবে না। রমলা জয়ের পর তাদের প্রথম টার্গেট হবে হিম্মত।
তিনি তাঁর গােয়েন্দাদেরকে ছদ্মবেশে রমলার পথে পথে ছড়িয়ে পড়তে বললেন। এর মধ্যেই তিনি খবর পেয়ে গেলেন, তার ভাই সুলতান আইয়ুবী মিশরে চলে গেছেন।
তাঁদের ধারণা সঠিক ছিল। গােয়েন্দা এসে সংবাদ দিল, ক্রুসেড বাহিনী হিম্মতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
তকিউদ্দিন তার সৈন্যদের অবস্থা দেখলেন। আইয়ুবীর পরাজয় সৈন্যদের মনােবল ভেঙ্গে দিয়েছিল। যে বিশাল বাহিনী এগিয়ে আসছে তার মােকাবেলায় তাদের ঘােড়া এবং উটের সংখ্যাও কম। খাদ্য শস্যের মজুতও সন্তোষজনক নয়। সুতরাং বাস্তব অবস্থা সামনে রেখেই তিনি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেন।
তিনি তার সৈন্যদেরকে সেই এলাকায় সরিয়ে নিলেন, যেখানে সবুজ মাঠ ছিল। খাওয়ার মত পর্যাপ্ত পানি ছিল, আর এলাকাটি ছিল পাহাড় পরিবেষ্টিত। তকিউদ্দিন সৈন্যদেরকে এক স্থানে একত্রিত করলেন।
তিনি যুদ্ধের সরঞ্জাম ও পশুর তদারকী করতে গিয়ে দেখতে পেলেন, তার ধারনার চাইতেও বেশী উট আহত। তিনি সে উটগুলাে জবেহ করে সৈন্যদের বললেন, “তােমরা পেট ভর্তি করে উটের গােস্ত খাও।'
মুহূর্তে সৈন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লাে এ খুশীর খবর। সৈন্যদের মধ্যে উৎসাহ উদ্যম ফিরে এলাে। রাতে তারা এক বিশাল ময়দানে উটের গােস্ত খাওয়ার উৎসবের আয়ােজন করলাে। সেই সন্ধ্যায়ই তিনি হলব ও দামেশকে কাসেদ মারফত সংবাদ পাঠালেন, তােমরা যে পরিমাণ রসদ, পশু ও অস্ত্র সম্ভব হয়, জলদি পাঠাও।'
রাতের উৎসব জমে উঠল। সৈন্যরা পেট ভরে তৃপ্তির সাথে উটের গােস্ত আহার করল। খাওয়া দাওয়ার পর সুলতান তকিউদ্দিন এক উঁচু স্থানে উঠে দাঁড়ালেন। তার ডানে ও বায়ে মশাল হাতে দাঁড়িয়ে গেলাে দুই রক্ষী সেনা।
তিনি বুলন্দ আওয়াজে বললেন, আল্লাহ ও রাসূলের বীর মুজাহিদবৃন্দ! তােমরা এই বাস্তবতাকে স্বীকার করে নাও যে, আমরা যে কারণেই হােক পরাজিত হয়েছি। তােমরা কি এই পরাজিত অবস্থায় তােমার মায়ের সামনে, তােমার বােনের সামনে, তােমার বিবি ও বাচ্চাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে চাও? তােমরা কি তাদেরকে এই কথা শােনাতে চাও, আমরা আমাদের রাসূলের বিরােধীদের হাতে পরাজিত হয়ে বাড়ীতে ফিরে এসেছি? তােমরা কি মনে করাে, এই খবর পেলে তারা খুশী হবে? নাকি তােমাদের মায়ের দুধের কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করবে, পরাজয়ের খবর শােনানাের জন্যই কি আমরা তােমাদের বুকের দুধ খাইয়ে বড় করেছিলাম?
তিনি একটু দম নিলেন। তারপর আবার সেই দরাজ গলায় বললেন, তারা এই আশা নিয়ে ঘরে বসে আছে যে, আমাদের প্রথম কেবলা কাফেরদের কবল থেকে মুক্ত করতে আমার যে সন্তানেরা ছুটে গেছে, একদিন বিজয়ের পতাকা উড়িয়ে তারা আবার ফিরে আসবে। তারা এ কথাও জানে, যে এলাকায় কাফেররা পা রাখে, সেখানে তারা মুসলমান মেয়েদের সম্মান ও সম্ভ্রম লুণ্ঠন করে। আজ রমলায় লুণ্ঠিত হচ্ছে তাদের ইজ্জত, এই ঝড়ের গতি থামাতে না পারতে কাল লুন্ঠিত হবে আমার মা ও বােনের সম্মান।
বন্ধুরা আমার! একটু গভীর ভাবে চিন্তা করাে, যদি কখনো এমন দিন তােমার সামনে আসে, সে দিন কি তুমি তােমার মা ও বােনদের সামনে মুখ দেখাতে পারবে? তাই আমি বলতে চাই, আজকের এ লড়াই, আমাদের ইজ্জত ও মর্যাদা লড়াই। আজকের এ লড়াই আমাদের অস্তিত্বের লড়াই আজকের এ লড়াই আমাদের ঈমানের চূড়ান্ত পরীক্ষার লড়াই ।
আমি কাউকে জোর করে লড়াইয়ের ময়দানে টেনে নিতে চাই
না। জোর করে কাউকে ধরে রাখতে চাই না, সত্যের এ কাফেলায়। হকের পথে এগিয়ে যাওয়ার হিম্মত যাদের আছে, তারা আমার সামনে বসাে। যারা মৃত্যুকে ভয় পাও, যারা লড়াই ছেড়ে প্রাণ নিয়ে বাড়ী ফিরে যেতে চাও, তারা পৃথক হয়ে যাও। আমি স্বেচ্ছায় তাদের বাড়ী যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছি। তােমাদের বাড়ী যাওয়ার পথে কেউ বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে না, এই নিশ্চয়তাও দিচ্ছি তােমাদের। এখন আমি তােমাদের সরে দাঁড়ানাের সুযোেগ দিচ্ছি। উঠে দাঁড়াও এবং একদিকে সরে যাও তােমরা।'
সুলতান তকিউদ্দিন চুপ করলেন। তাকিয়ে রইলেন সৈন্যদের দিকে। সৈন্যদের মাঝেও বিরাজ করছিল অখণ্ড নীরবতা। একটি সৈন্যও উঠে দাঁড়াল না। কেউ পৃথক হলাে না সেই যুথবদ্ধ সমাবেশ থেকে। এভাবেই কেটে গেল বেশ কিছু সময়।
তখন দেখা গেল সমাবেশের সামনের সারি থেকে একজন উঠে দাঁড়াল। সে পিছন ফিরে সৈন্যদের মুখােমুখি হলাে। বললাে, তােমরা কেউ বাড়ী ফিরে যেতে চাও?'
রাতের নিস্তব্ধতা খান খান করে সমবেত কণ্ঠের সম্মিলিত ধ্বনি ভেসে এলাে, না, আমরা কেউ ময়দানে পিঠ দেখানাের জন্য এখানে আসিনি।তখন সেই লােক ঘুরে দাঁড়ালাে সুলতান তকিউদ্দিনের দিকে। বললাে, আমাদের প্রাণপ্রিয় সেনাপতি! আপনাকে কে বলেছে, আমরা বাড়ী চলে যেতে চাই? আপনি আপনার উদ্দেশ্য বর্ণনা করুন! কোন্ কঠিন ময়দানে আমাদের নিয়ে যেতে চান, নির্দেশ করুন। আপনি আমাদেরকে পাহাড় থেকে লাফিয়ে পড়তে বললে আমরা তাই করবাে। যদি আপনি বলেন আমাদের সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে, আমাদের একজনও পিছন ফিরে তাকাবে না। আমরা সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ে আপনার নির্দেশ বাস্তবায়ন করবাে।'
পিছন থেকে আরেকজন উঠে দাঁড়িয়ে বলল, যদি আমরা পিছু হটে মারা যাই, তবে যেন আমাদের লাশ দাফন করা না হয়। আমাদের লাশ যেন শকুন ও শিয়ালের জন্য ফেলে রাখা হয়। আরও কয়েকটি ধ্বনি শােনা গেল সমবেত সৈন্যদের মধ্য থেকে। প্রত্যেকেই কথা বলছিল আবেগময় স্বরে এবং বলিষ্ঠ প্রত্যয় নিয়ে।
তকিউদ্দিনের বুক ফুলে উঠলাে। তিনি সৈন্যদের বললেন, ‘তােমাদের শত্রুরা এগিয়ে আসছে। তােমাদের প্রমাণ করতে হবে, রমলাই তাদের শেষ বিজয়। আজ রাত ও কালকের দিনটা পূর্ণ বিশ্রাম করাে। কাল রাতে আমি তােমাদের বলবাে, তােমাদের কি করতে হবে এবং আমরা কি করতে চাই।'
তকিউদ্দিন সৈন্যদের থেকে বিদায় নিয়ে তাঁর ক্যাম্পে সেনাপতি ও কমাণ্ডারদের ডাকলেন। তাদের তিনি বললেন, আগামীকাল রাতে তিনি কি করতে চান এবং এই সেনাবাহিনীকে কোথায় নিয়ে যেতে চান। হিম্মতের দুর্গ সেখান থেকে কাছেই ছিল। কিন্তু তিনি সেই দুর্গে আশ্রয় নিলেন না, সেনাবাহিনীকেও সেখানে যেতে দিলেন না।
ক্রুসেড বাহিনী দ্রুত অগ্রসর হচ্ছিল। এই বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন সম্রাট বিলডন। তিনি জানতেন, সামনেই হিম্মত দুর্গ। এ দুর্গে অবস্থান করছে সুলতান আইয়ুবীর ভাই সুলতান তকিউদ্দিন। আইয়ুবীর পরাজয়ের পর এবার তার পালা। এতক্ষণে নিশ্চয়ই সে তার ভাইয়ের পরাজয়ের খবর পেয়েছে। সেই খবরে তাঁর মনে ভীতির সঞ্চার হওয়াই স্বাভাবিক। সে যখন দেখতে পাবে, আইয়ুবীকে যারা পরাজিত করেছিল সেই বীর বাহিনী এসে তাকে অবরােধ করে বসেছে, ভয়ের চোটেই সে হয়তাে হাতিয়ার সমর্পণ করে দেবে।
খৃস্টান সম্রাট বিলডন এই আশা নিয়েই বিদ্যুৎগতিতে অগ্রসর হয়ে হিম্মত দুর্গ অবরােধ করে বসলাে। অবরােধ করার পর তারা ঘােষণা করল, কেল্লার দরজা খুলে দাও, নইলে এ কেল্লা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হবে।'
তারা ভেবেছিল, সুলতান তকিউদ্দিনের হাতে যুদ্ধ করার মত তেমন সৈন্য নেই। ফলে এ ঘােষণা শুনেই সে হাতিয়ার সমর্পন করে দেবে। কিন্তু দেখা গেল, হাতিয়ার সমর্পন করার জন্য কেউ এগিয়ে এলাে না। এমনকি কেউ তাদের আহবানের কোন জবাবও দিল না।
ধাঁধাঁয় পড়ে গেল বিলডন। এমন তাে হওয়ার কথা নয়! কেউ আত্মসমর্পনের জন্য এগিয়ে আসছে না কেন?
বিলডন আবার ঘােষণা করল, বৃথা রক্ত প্রবাহিত করে নিজেদের ধ্বংস ডেকে এনাে না। হাতিয়ার সমর্পন করাে। এখন আর লড়াই করে কোন লাভ হবে না, কেবল রক্ত ক্ষয় করবে। এ রক্ত তােমাদের কোন কাজে আসবে না। তােমরা যুদ্ধ করে জিততে পারবে না। তাই বিনা যুদ্ধেই দুৰ্গটা আমাদের কাছে সমর্পণ করাে। আমি অঙ্গীকার করছি, কোন বন্দীর সাথে দুর্ব্যবহার করা হবে না।
সঙ্গে সঙ্গে কেল্লার উপর থেকে উত্তর এলাে, সাবধান! আমাদের তীরর আওতা থেকে দয়া করে দূরে থাকো। কারণ আমাদের তীর কখনাে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না। এ দুর্গ কোনদিনই তােমরা হাতে পাবে না। প্রয়ােজনে এ কেল্লা আমরা নিজ হাতে ধ্বংস করে দেবাে, কিন্তু তােমাদের হাতে দেবাে না। আর আমাদের রক্ত! আমাদের রক্ত কখনাে বৃথা যায় না। আমরা জানি, আমাদের রক্ত শরীরে থাকলে যেমন লাভ, শরীর থেকে বেরিয়ে গেলে আরাে লাভ। আমাদের দেহের প্রতি ফোটা রক্ত তখন আমাদের বেহেশতের জামিন হয়ে যায়। উদ্দেশ্যহীনভাবে আমরা রক্ত দেই না, বরং তােমরাই লড়াই করতে নেমে অনর্থক মারা যাও।'
দুর্গ প্রাচীরে যে সব সৈন্য দাঁড়িয়েছিল, তারা দেখতে পেল, ক্রুসেড বাহিনী কেল্লার চারদিকে সাগরের তরঙ্গের মত ঢেউ তুলে ছড়িয়ে পড়ছে। উত্তাল তরঙ্গ যেমন বড় বড় পাথর গ্রাস করে তলিয়ে দেয় পানির নিচে, তেমনি এ কেল্লাকে যেন ওরা গ্রাস করে নেবে।
এদের মােকাবেলায় কেল্লায় যে পরিমাণ সৈন্য ছিল, তা অতি নগণ্য। কিন্তু এই সামান্য সংখ্যক সৈন্য নিয়েই সত্যের মুজাহিদ লড়াই করার জন্য ইস্পাতকঠিন সংকল্প ঘােষণা করল। কেল্লার কমাণ্ডার অস্ত্র সমর্পণ করতে কিছুতেই রাজী না হওয়ায় স্তম্ভিত হয়ে গেল বিলডন।
সুর্য ডুবে যাচ্ছিল। ক্রুসেড বাহিনী রাতের অন্ধকারে হামলা করার ঝুঁকি নিল না। তারা ভাবল, রাত কাটুক, কাল ভােরে ধীরে সুস্থে ওদের পাকড়াও করলেই হবে।
এমনিতেই দীর্ঘ পথ মার্চ করে এসে তারা খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। সৈন্যদেরকে আর কষ্ট দিতে চাচ্ছিল না বিলডন। তার মাথায় তখন একটাই চিন্তা, কি করে সুলতান তকিউদ্দিনকে জীবিত ধরা যায়। কারণ, সুলতান আইয়ুবীর ভাই হিসেবে তকিউদ্দিন খুবই মূল্যবান কয়েদী হবে। তাঁর বিনিময়ে ভাল শর্ত আদায় করা যাবে। চাই কি, কোন অঞ্চলও পেয়ে যেতে পারি।
বিলডনের মনে পূর্ণ আশা ও বিশ্বাস ছিল, এই কেল্লা ও কেল্লার সৈন্যদের তিনি সহজেই প্রেফতার করতে পারবেন।
সম্রাট বিলডন তার সৈন্য বাহিনীকে কেল্লা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গেলেন। এখন কেল্লা থেকে তীর বর্ষণ করলেও সে তীর এখানে পৌঁছতে পারবে না। তাদের মনে এমন কোন আশংকাই ছিল না, কোন সেনাদল বাইরে থেকে তাদের ওপর আক্রমণ চালাতে পারে।
তারা এই ভেবেও অনেকটা স্বস্তি অনুভব করছিল, সুলতান আইয়ুবী এখানে নেই। তাঁর সেনাবাহিনীও না। বিলডন কল্পনার চোখে দেখতে পাচ্ছিল, হিম্মত দুর্গের পতন হয়েছে। সেখানে শােভা পাচ্ছে তার নিশান। বাহ্যত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল, হিম্মত দুর্গের পতন সামান্য সময়ের ব্যাপার মাত্র। সন্ধ্যার পর তিনি তার কমাণ্ডারদের পরবর্তী দিনের কার্যাবলী বুঝিয়ে দিয়ে নিজের তাঁবুতে ফিরে গেলেন। তার জন্য তাঁবু খাটানাে হলাে সৈন্যদের ঘাঁটি থেকে কিছু দূরে। সে যুগে যুদ্ধের সময়ও সম্রাটদের তাঁবু খাটানাে হতাে আলীশান মহলের মত করে। সেখানে থাকতাে সম্রাটদের আনন্দ ও বিনােদনের ব্যবস্থা।
বিলডন যেহেতু একজন বিজয়ী সম্রাট, তাই তার ক্যাম্পও সেভাবেই সাজানাে হলাে। তার মনােরঞ্জনের জন্য পাঠানাে হলাে চারটি খৃস্টান মেয়ে ও চারজন মুসলমান মেয়ে। এই মুসলমান মেয়েদের ধরে আনা হয়েছিল বিজিত এলাকা রমলা থেকে। এ মেয়েদের সবাই ছিল অভিজাত ঘরের সন্তান। তারা কেবল যুবতীই ছিল না, ছিল নজরকাড়া সুন্দরীও।
খৃস্টান মেয়েরা তাদের বলছিল, এখন কান্নাকাটি করে কোন লাভ হবে না। তােমাদের মুক্ত করার জন্য ছুটে আসবে না কোন রাজপুত্তুর। তাই বৃথা চেষ্টা করাে না।
তাদেরকে আরও বলা হলাে, আরে, তােমরা তাে ভাগ্যবতী মেয়ে! কোন সাধারণ সেপাই বা কমাণ্ডার নয়, তােমরা স্বয়ং সম্রাটের নজরে পড়েছো।
আরেক মেয়ে তাদের বলছিল, মহাপ্রভুর শুকরিয়া আদায় করাে। যেসব মেয়েরা খৃস্টান সেনাদের কবলে পড়েছে, তারা এখন বুঝতে পারছে, দুনিয়া কত ভয়ংকর! তারা এখন বার বার হাত বদল হচ্ছে, আর তাদের চিৎকারে জমিন ও আসমান কেঁপে উঠছে।'
অন্য মেয়ে বলছিল, “তােমাদের ভাগ্যে বড়জোর কোন আমীর বা মুসলমান অফিসার জুটত! সেখানে তুমি খৃস্টান সম্রাটের সঙ্গিনী হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছো এটা কি কম কথা! ‘আরে, মুসলমান আমীর ও নবাবজাদাদের স্বভাব আমার জানা আছে। দু-চার বছর পর যৌবনে ভাটা পড়লে আপন বিবিকেও তারা বণিকের কাছে বিক্রি করে দেয়।' বলছিল আরেকজন।
মুসলমান চার মেয়ে চুপচাপ সহ্য করে যাচ্ছিল এই বাগাড়ম্বর। এ ছাড়া তাদের করার কিছুই ছিল না। খৃস্টান এক মেয়ে এ সময় আবার বলে উঠল, ‘শুনেছি সম্রাট তাদের বিয়ে করে বউ বানাবে। আহলে কিতাবদের মধ্যে বিয়ে জায়েজ করা হয়েছে কোরানেও। সুতরাং তােমাদের আর অসুবিধা কি!
এ সময় এক মুসলমান মেয়ে বলে উঠল, “খােদার দোহাই লাগে, ভণ্ডামী করার জন্য ধর্মকে টেনে এনাে না।'
ফোস করে টিপ্পনি কাটল এক খৃস্টান মেয়ে, ঠিকই তাে বলেছে সে। শুধু শুধু ধর্ম নিয়ে টানাটানি করছিস কেন! মেয়েদের আবার ধর্ম কি! মেয়েরা তাে পানির মত। যেই পাত্রে রাখাে সেই রং ধারণ করে। মেয়ে মানুষও তেমনি। স্বামী হােক আর যেই হােক, যার অধীনে সে থাকে, সেই মানুষটাই তার প্রভু। সে লােকের ধর্মই তার ধর্ম। যে ব্যক্তি দেশের রাজা তিনি তাে আমাদের দেহেরও রাজা, মনেরও রাজা।
এ ভাবেই চার মুসলিম মেয়েকে বিপথগামী করার জন্য চার খৃস্টান মেয়ে উঠেপড়ে লাগল। বিলডন তাদের ডেকে বলল, ‘এই মেয়েদের ওপর কোন কঠোরতা আরােপ করবে না। তাদের ওপর নির্যাতন চালাবে না। কোন রকম কষ্ট দেবে না। তাদেরকে কখনাে ধমক দিয়ে কথা বলবে না। বিলডন আরাে বলল, এরা খুবই সুন্দরী ও নব যুবতী। এদেরকে ট্রেনিং দিয়ে আমাদের কাজে লাগাতে হবে। আমি এই মেয়েদেরকে শুধু বিলাস ও ভােগের সামগ্রী বানাতে চাই না। দরকার হলে এদের সাথে আপন কন্যাদের মত ব্যবহার করাে। দরকার হলে ওদের উত্তম বান্ধবী হও তােমরা। তাদেরকে রাজকুমারীর মত বিলাস সামগ্রী সরবরাহ করাে। তাদের মনে স্বপ্নের আলপনা আঁকো! কথায় কথায় তাদেরকে আকাশের তারা বানিয়ে দাও।'
এই চার মুসলিম মেয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। এক মেয়ে বলল, “ইচ্ছায় হােক, অনিচ্ছায় হােক, শেষ পর্যন্ত আমাদেরকে আমাদের সম্ভ্রমের কোরবানী দিতেই হবে।
তার আগে আমরা এদের হাত থেকে পালাতে পারি না?
সেটা সম্ভব বলে আমার মনে হয় না। তারচে এখানে থেকেই এদের ওপর আমাদের প্রতিশােধ নেয়া উচিত। অপর মেয়ে বললাে।
‘কিন্তু প্রতিশােধ নেয়া ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয়, যে পর্যন্ত ওরা আমাদেরকে তাদের প্রতি আন্তরিক ও বিশ্বস্ত না পাবে।' প্রথম মেয়েটি বললাে, “ওদেরকে বুঝতে হবে, আমরা ওদের বশ্যতা মেনে নিয়েছি এবং তাদের ভাগ্যের সাথেই আমাদের ভাগ্য জুড়ে দিয়েছি।'
আমার পিতা সুলতান আইয়ুবীর সেনাবাহিনীতে আছেন। অপর মেয়েটি বললাে, তিনি বর্তমানে মিশরে আছেন। তিনি বলেছিলেন, কাফের মেয়েরা জাতির জন্য তাদের মান-সম্ভ্রম পর্যন্ত বিলিয়ে দেয়। তারা আমাদের বড় বড় আমীর ও অফিসারদের হাতে তাদের ইজ্জত তুলে দিয়ে তাদেরকে ক্রুসেড বাহিনীর তাবেদার বানিয়ে নেয়। যদি কাউকে হত্যা করার ইচ্ছা থাকে, সেই তাবেদারকে দিয়েই তাকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করে। আমাদের সেনাবাহিনীর গােপন তথ্য জেনে নিয়ে তারা খৃস্টানদের কাছে পৌছে দেয়।
‘আমি তা জানি। তার সাথী অন্য মেয়েটি বললাে, সেই মেয়েরা এমন কাজ করে, যা আমাদের পুরুষ গোয়েন্দারা শত্রুর দেশে গিয়ে করে থাকে। এ কথা বলেই সে চুপ হয়ে গেল এবং এদিক-ওদিক তাকিয়ে লক্ষ্য করলাে আশেপাশে কেউ আছে কিনা, কেউ গােপনে তাদের কথা শুনছে কিনা।
আশেপাশে কেউ নেই দেখে সে বললাে, যদি আমরা বলি, আমরা তাদের বশ্যতা মেনে নিয়েছি, তাতে এমন সুযােগও সৃষ্টি হতে পারে, আমরা একদিন সম্রাটকেও হত্যা করতে পারবাে।'
আর কিছু না হােক পালানাের সুযােগ তাে পাবাে। অন্য মেয়েটি বললাে।
যে রাতে বিলডনের সেনাবাহিনী হিম্মত দুর্গ অবরােধ করেছিল, তার দুই রাত আগের কথা। মুসলমান মেয়েরা খৃষ্টান মেয়েদের বলল, আচ্ছা, আমরা বিধর্মী হওয়ার পরও তােমরা আমাদের এমন আদর যত্ন করাে কেন?'
বাহ, তাতে কি হয়েছে, তােমাদের আর আমাদের খােদা তাে একজনই। তােমাকে যে আল্লাহ সৃষ্টি করেছে, আমাকেও তাে সে আল্লাহই বানিয়েছে। তাহলে ধর্মের কারণে আমরা তােমাদের দূরে ঠেলে ফেলবাে কেন?
ভাল কথা বলেছাে তাে! তােমরা যদি আমাদের এতটাই আপন করে নিতে পারাে, তাহলে আমরাই বা দূরে থাকবাে কেন? আমরা যদি আমাদের ধর্ম পরিবর্তন করে তােমাদের ধর্ম গ্রহণ করতে চাই, সে সুযােগ আমাদের দেবে?
কেন নয়? তােমরা চাইলে অবশ্যই তা সম্ভব।'
খৃস্টান মেয়েরা তখনি সে কথা সম্রাট বিলডনকে জানালাে। খুশী হয়ে সম্রাট বিলডন চার মেয়েকে চারটি মূল্যবান হার দান করলেন। তারপর তাদের ডেকে চার মেয়ের গলায় ছােট ছােট চারটি ক্রুশ ঝুলিয়ে দিলেন।
কিন্তু তিনি খৃস্টান মেয়েদের আলাদা ডেকে নিয়ে বললেন, ‘আমি এই চারজনের হাতে কোন খানাপিনা করবাে না। কারণ তারা ভয়ের কারণে ধর্ম পরিবর্তন করেছে, নাকি মন থেকে করেছে, আগে বুঝতে হবে। ধর্ম পরিবর্তনের কথা মুখে বলা যত সহজ মন থেকে মেনে নেয়া তত সহজ নয়। তবে তারা যখন বলেছে, তাদের মন জয় করতে চেষ্টা করাে। মুসলমানকে কেনা সহজ কিন্তু তাকে বিশ্বাস করা ও তার উপর ভরসা করা কঠিন ব্যাপার! যে মুসলমান বলিষ্ঠ ঈমানের অধিকারী, তারা এমন কঠিন কঠিন কোরবানী ও ত্যাগ স্বীকার করে, যা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। এই মেয়েদের উপর কড়া দৃষ্টি রাখবে, যেন কোথাও পালিয়ে যেতে না পারে। সতর্ক থাকবে, যেন সুযােগ মত আমাদের উপর আঘাত হেনে ক্ষতি না করে।
অবরােধের প্রথম রাত। এই চার মেয়ে পৃথক এক তাঁবুতে শুয়ে ছিল। বিলডনও তাদের সাথে কিছুক্ষণ হাসি-তামাশা করে নিজের তাবুতে গিয়ে শুয়ে পড়েছিলেন।
কমাণ্ডার ও সৈন্যরা ক্লান্তি ও অবসাদের কারণে শােয়ার সাথে সাথেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিল। শুধু ক্যাম্প প্রহরী ও বিলডনের দেহরক্ষী চার-পাঁচজন জেগে ছিল।
হিম্মত পর্বতশৃঙ্গের পাশে এক সবুজ শ্যামল প্রান্তর। এই প্রান্তরে কমবেশী এক হাজার পদাতিক সৈন্য নিয়ে ঘাপটি মেরে বসেছিলেন সুলতান তকিউদ্দিন। রাতের অন্ধকার গাঢ় হয়ে নেমে এলাে। রাত বাড়তে লাগল একটু একটু করে। মধ্যরাতের সামান্য আগে সুলতান তকিউদ্দিন গােপন সংকেত দিলেন।
আস্তে পা টিপে টিপে সেই প্রান্তর থেকে গােপনে বের হয়ে গেল সেই সেনাবাহিনী। কমাণ্ডার তাদেরকে ছােট ছােট সৈন্য দলে বিভক্ত করে ছড়িয়ে দিলাে। রাতের নিস্তব্ধতা যেন নষ্ট না হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে পায়ে পায়ে এগিয়ে চলল সেই কাফেলা। তারা সামনে অগ্রসর হয়ে বিলডনের সেনা ক্যাম্প ঘেরাও করে দাঁড়াল।
এই সে সেনাদল, যাদেরকে নিয়ে তকিউদ্দিন হিম্মত কেল্লা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। কেলায় সামান্য সৈন্যই রেখেছিলেন তিনি। তার বিশ্বাস সত্যে পরিণত হলাে। তিনি ধারণা করেছিলেন, ক্রুসেড বাহিনী হিম্মত কেল্লা অবরােধ করবে। সুতরাং তিনি তার মূল সেনাশক্তি হিম্মত পর্বতের পাশে লুকিয়ে রেখেছিলেন। কেল্লায় যারা ছিল তাদের অভয় দিয়ে বলেছিলেন, ‘খৃস্টান বাহিনী তােমাদের অবরােধ করলে ভয় পেয়াে না। তাদের সাথে তােমাদের নয়, লড়াই হবে আমাদের। ওরা তােমাদের অবরােধ করলে আমরা তাদের ওপর মরু সাইমুমের ঝড় হয়ে ছুটে আসবাে।
এ জন্যই কেল্লাধিপতি ক্রুসেড বাহিনীর চ্যালেঞ্জের বীরােচিত উত্তর দিয়েছিলেন। তার বলিষ্ঠ ভাষা ও সাহসিকতা দেখে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল সম্রাট বিলডন।
এই কেল্লার অধিপতি ছিলেন তকিউদ্দিনের মামা শিহাবুদ্দিন আল হাশমী।
রাতে তকিউদ্দিনের এক হাজার পদাতিক সৈন্য ছােট ছােট দলে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে কমান্ডো আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হলাে। তারপর তকিউদ্দিনের ইঙ্গিত পাওয়ার সাথে সাথে প্রথমে তারা তাবুর রশি ও দড়িদড়া দ্রুত হাতে কেটে ফেললাে। তারপর ওপর থেকে বর্শাবিদ্ধ করে মাছ মারার মত ক্রুসেডদের বিদ্ধ করতে লাগলাে। তাঁবুর নিচে ঘুমন্ত সৈন্যরা টেরই পেল না, কোন ফাঁকে মৃত্যু এসে তাদের পরপারে পাঠিয়ে দিল।
এরা এই যুদ্ধের প্রশিক্ষণ পেয়েছিল সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর কাছ থেকে। আইয়ুবী এই যুদ্ধের নাম দিয়েছিল, ‘আঘাত করাে আর পালাও! .
এতবড় বিশাল বাহিনীর সাথে মাত্র এক হাজার পদাতিক সৈন্যের সম্মুখ লড়াইয়ের প্রশ্নই আসে না। যত বড় বীর আর যােদ্ধাই হােক, হাজার হাজার মৌমাছি আঁকড়ে ধরলে সেও কুপােকাত হয়ে যায়। এই বিশাল বাহিনীর সামনে তকিউদ্দিনের বাহিনীর অবস্থা ছিল অনেকটা সেরকম।
তাই তকিউদ্দিন সঠিক সিদ্ধান্তই গ্রহণ করেছিলেন। তিনি তার বাহিনীকে ছােট ছােট দলে বিভক্ত করে বিভিন্ন গ্রুপের ওপর আলাদা দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন।
কিছু গ্রুপের ওপর দায়িত্ব ছিল, ক্যাম্প প্রহরীদেরকে কোন রকম আওয়াজ করার সুযােগ না দিয়ে গায়েব করে ফেলা।
কিছু গ্রুপ শত্রুদের ঘােড়া, উট ও খচ্চরের বাঁধন কেটে দেয়ার দায়িত্ব পেয়েছিল। এ দুই কাজে শ’দুই সৈন্য রেখে বাকী। আটশাে সৈন্যকে তিনি প্রস্তুত রেখেছিলেন মূল আক্রমণের জন্য। এই আটশাে সৈন্য ধূমকেতুর মত ঘুমন্ত বাহিনীর ওপর টুটে পড়লাে। চোখের নিমিষে তারা এমন ত্রাস সৃষ্টি করলাে যে, ক্রুসেড সৈন্যদের আতংকিত আর্ত চিঙ্কারে পুরাে এলাকা নরক গুলজার হয়ে উঠল। তাদের আর্তনাদের ধ্বনি দিকদিগন্তে ছড়িয়ে পড়লাে। তখনাে যারা আক্রান্ত হয়নি তারা দুঃস্বপ্নের ঘাের কাটিয়ে তাবুর বাইরে এসে দেখলাে, কেয়ামতের প্রলয় শুরু হয়ে গেছে ক্যাম্পে। সহসা তারাও আর্ত চিৎকার দিয়ে ছুটাছুটি শুরু করল প্রাণ নিয়ে পালাতে। কিন্তু চিতাবাঘের মতই ক্ষিপ্রগতিতে তাদের ওপর লাফিয়ে পড়ছিল মরণজয়ী মুজাহিদরা। সহসা যেন ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেল ক্যাম্পে। আকাশ-পাতাল কেঁপে উঠলাে মানুষ ও পশুর সম্মিলিত চিৎকারে।
সম্রাট বিলডন চোখ খােললেন। তার কমাণ্ডাররাও জেগে উঠলাে। তাঁবুর বাইরে গিয়ে দেখতে পেলাে, সেনা ক্যাম্পের তাবুতে সর্বত্র শুধু আগুন জ্বলছে। তকিউদ্দিনের পদাতিক বাহিনীর ছােট ছােট দলগুলাে দ্রুত আঘাতের পর আঘাত করছিল আর সাথে সাথে তাঁবুগুলােতে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছিল। তারা আঘাত করছিল আর তাকবীর-ধ্বনি দিচ্ছিল।
এই ধ্বনি অন্য সবার মত সেই চার মুসলিম মেয়েও শুনতে পেলাে। তারা বুঝতে পারলাে, রাতের আঁধারে যে ফৌজ এই সৈন্যদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে তারা মুসলমান।
তারা চারজন একই তাঁবুতে ছিল। একজন বলে উঠল, 'চলাে পালিয়ে যাই।'
না, আমি পালাবাে না। আমার বুকের মধ্যে প্রতিশােধের যে আগুন জ্বলছে, এখন আমি সেই আগুন নেভাবাে। আমি সম্রাট বিলডনকে হত্যা করবাে।
বিলডনের তাবু সেনা ক্যাম্প থেকে একটু দূরে ছিল। সেখানে মশাল জ্বলছিল। বিলডনের দেহরক্ষীরা অশ্বপৃষ্ঠে আরোহন করে তার চারপাশে পাহারা দিচ্ছিল।
সহসা কেঁপে উঠলাে সেখানকার মাটি। হাজার হাজার দুরন্ত অশ্বের মিলিত পদধ্বনি শােনা গেল। এগুলাে ছিল তকিউদ্দিনের অশ্বারােহী বাহিনী। এই অশ্বারােহীর সংখ্যা মুসলমান ঐতিহাসিকগণ দুই হাজার বলে উল্লেখ করেছেন, আর খৃস্টান ঐতিহাসিকরা চার হাজার বলেছেন। এই অশ্বারােহী বাহিনী বিদ্যুৎগতিতে ঝাঁপিয়ে পড়লাে ক্রুশেড বাহিনীর ওপর। এদের মােকাবেলা করার কোন প্রস্তুতিই ছিল না ক্রুসেড বাহিনীর। তারা তখনও জানতেও পারেনি, কি হচ্ছে আর কারা তাদের আক্রমণ করেছে। শুধু তাদের তকবীর ধ্বনি থেকে বুঝা যাচ্ছিল, এরা মুসলমান।
তকিউদ্দিনের অশ্বারােহীরা ক্রুসেড বাহিনীর ক্যাম্প ছিন্নভিন্ন করে হাতের কাছে যেখানে যাকে পেল ঘােড়ার পদতলে পিষে ফেলতে লাগল। যারা ঘােড়ার পায়ের তলে পড়েনি তাদেরকে তলােয়ারের আঘাতে পরপারে পাঠিয়ে দিচ্ছিল। কেউ আবার বর্শায় বিদ্ধ করে তাদেরকে ঠেলে দিচ্ছিল মৃত্যুর কোলে। প্রায় এক ঘন্টা এই তুফান চালানাের পর হঠাৎ কমাণ্ডার ফিরে যাওয়ার সংকেত দিল। সাথে সাথে অশ্বারােহী বাহিনী উধাও হয়ে গেল ময়দান থেকে।
বিলডনের মনে হলাে, সে ভয়ংকর কোন দুঃস্বপ্ন দেখছে। এটা যে বাস্তব তাই সে বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে দেখতে পেল, কোন প্রতিরােধ ছাড়াই একদল অশ্বারােহী এলাে এবং স্বাধীনভাবে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে চোখের নিমিষে আবার হাওয়া হয়ে গেল।
ক্রুসেড বাহিনী হিম্মত দুর্গ অবরােধ করে নিয়েছিল। সে কারণে দুর্গের দুই পাশেই তারা ক্যাম্প করেছিল। এক পাশে যখন এই কেয়ামত চলছিল কেল্লার অপর পাশের ক্রুসে বাহিনী তখনাে ছিল আক্রমণের বাইরে। তারা এদিকে শশারগােল শুনতে পেল। শুনতে পেল আহত ও মৃত্যুপথযা সৈনিকদের মরণ চিৎকার। এদিকের যে দু'চার জন সৈন্য এ বিভীষিকার হাত থেকে নিজেকে কোন মতে বাঁচাতে পার তারা ছুটল অপর পাশের সেনা ক্যাম্পে।
সেখানে পালিয়ে যারা আশ্রয় নিল তাদের কাছে ওরা জানতে চাইল কি ঘটেছে। কিন্তু ওরা যেন বােবা হয়ে গিয়েছিল প্রথমে ওরা কিছুই বলতে পারল না। কিছুটা ধাতস্থ হয়ে একজন বলল, কি ঘটেছে আমরা জানি না। আমরা ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ আমাদের ওপর দিয়ে হাজার হাজার ঘােড় উট ও খচ্চরকে ছুটে যেতে দেখলাম। আমাদের অনেকে সেইসব বােবা জানােয়ারের পায়ের তলে পিষে মারা পড়ল । কেউ হয়তাে আমাদের পশুগুলাের বাঁধন কেটে দিয়েছিল । সেগুলাে ছুটাছুটি করে আমাদের দলিত মথিত করছিল। প্রাণ ভয়ে আমরা পালিয়ে এসেছি।'
এদিকে চারজন মুসলিম মেয়েই বেরিয়ে এলাে তাদের তাবু থেকে। খৃস্টান সৈন্যদের নিজেদেরই তখন মরণ দশা। ফলে বন্দী মেয়েরা কে কোথায় যাচ্ছে সেদিকে নজর দেয়ার মত অবস্থা তাদের ছিল না, কেউ তাদের দিকে তাকালােও না।
মেয়েরা ছুটে গেল মুসলিম ফৌজের কাছে। তারা চিঙ্কার করে বলতে লাগল, ‘সম্রাট বিলডন এদিকে। তােমরা আমাদের কথা শােন। বিলডনকে গ্রেফতার করাে।'
কিন্তু তখন সেখানে এমন হট্টগােল চলছিল যে, মেয়েদের দিকে নজর দেয়ার মত সময় কারাে ছিল না। কেউ তাদের কথা গ্রাহ্য করল না। কেউ শুনতেও পেল না তাদের চিৎকার। অশ্বারােহীরা এত দ্রুতবেগে ছুটে যাচ্ছিল যে, তাদের কানে মেয়েদের কথা পৌঁছতেই পারছিল না। এক মেয়ে ছুটে হট্টগােলের ভেতর ঢুকে গেল। মুহূর্তে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল অন্য মেয়েদের থেকে।
সে এক অশ্বারােহীর পেছনে ছুটছিল আর চিৎকার করে বলছিল, ঘােড়া থামাও, আমার কথা শোন। সম্রাট বিলডন এদিকে।
কিছু দূর যাওয়ার পর অশ্বারােহীর মনে হলাে, কোন মেয়ে -চিৎকার করছে। সে ক্ষিপ্রগতি ঘােড়ার বাগ টেনে ধরল।
ঘােড়ার গতি কমে এলে মেয়েটি ছুটে গিয়ে ধরে ফেলল ঘােড়ার বাগ । মেয়েটি হাঁফাতে হাঁফাতে বললাে, আমি মুসলমান। আমার মত আরও তিনজন মুসলিম মেয়ে খৃস্টান সম্রাট বিলডনের বন্দীনী হয়ে ওদের সাথে আছি।'
‘কোথায় ওরা? সম্রাট বিলডন কোথায়?”
‘আমার সাথে এসাে, আমি দেখিয়ে দিচ্ছি তার তাবু। মেয়েটি বলল।
এই অশ্বারােহী এক কমাণ্ডার ছিল। সে মেয়েটিকে ঘােড়ার পিঠে তুলে নিয়ে বলল, 'কোন দিকে?'
মেয়েটি দিক নির্দেশ করল। কমাণ্ডার সেদিকে ঘােড়া ছুটিয়ে দিল।
কিছু দূর যাওয়ার পরই সে এক সেনাপতির সামনে পড়ে গেল। ঘােড়া থামিয়ে সে সেনাপতিকে বলল, “এই মেয়ে সম্রাট বিলডনের ক্যাম্পের খোঁজ জানে। আমি সেখানে যাচ্ছি ।'
সেনাপতি বলল, দাঁড়াও। সেখানে তােমার একা যাওয়া ঠিক হবে না। সেখানে নিশ্চয়ই তার রক্ষী বাহিনী আছে।
সেনাপতি মেয়েটির কথা শুনলাে। মেয়েটি সম্রাট বিলডনের তাবুর দিক নির্দেশ করে বলল, সেখানে আমার মত আরও তিনটি মুসলিম মেয়ে আছে।
সেনাপতি সম্রাট বিলডনের তাবুতে কমাণ্ডো আক্রমণ চালানাের জন্য দু’টি কমাণ্ডো গ্রুপকে সঙ্গে দিলেন তার। কমাণ্ডারের নেতৃত্বে এই বাহিনী অনতিবিলম্বে বিলডনের তাবুর দিকে ঘােড়া ছুটিয়ে দিল এবং দ্রুত সেখানে গিয়ে পৌছল। তারা বিলডনের তাবু অবরােধ করে দাঁড়াল। কমাণ্ডার সম্রাট বিলডনকে চ্যালেঞ্জ করলাে, তার ক্যাম্পে আগুন লাগানাের হুমকি দিল। কিন্তু, কেউ তার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করল না, কেউ তার হুমকীর কোন জবাবও দিল না।
কমাণ্ডার দুই সৈন্যকে তাবুতে ঢুকার হুকুম দিল। তারা তাবুতে ঢুকে দেখতে পেল, বিলডন সেখানে নেই। তার বডিগার্ডরাও কেউ নেই যে, অস্ত্র সমর্পণ করতে আসবে।
তারা আশপাশের তাবুগুলােতে তল্লাশী চালিয়ে কিছু মেয়ে, সেই মুসলিম মেয়ে তিনটি এবং কয়েকজন চাকর-বাকর ও রক্ষীর সন্ধান পেল। কমাণ্ডার তাদের সকলকেই গ্রেফতার করে সেনাপতির সামনে হাজির করল।
বন্দীদের কাছে বিলডন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাে সেনাপতি, কিন্তু কেউ তার হদিস বলতে পারলাে না।
বিলডন ভয় পেয়ে ততক্ষণে পালিয়ে গেছেন। ঘুম থেকে জেগেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এটা মুসলিম কমাণ্ডো বাহিনীর কাজ। এ অবস্থায় তার করার কিছুই ছিল না। তিনি যখন দেখলেন, তার বাহিনী কোন প্রতিরােধ গড়ে তােলার পরিবর্তে কেবল চিৎকার ও ছুটাছুটি করছে, তখনই তিনি পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি তার রক্ষী বাহিনী নিয়ে চুপিসারে সেখান থেকে সটকে পড়লেন। কিন্তু কিছু দূর যাওয়ার পরই তিনি এক কমাণ্ডো গ্রুপের সামনে পড়ে গেলেন। এই গ্রুপের দায়িত্ব ছিল, কেউ এ পথে পালিয়ে যেতে চাইলে তাকে বাঁধা দান করা।
সম্রাট বিলডন এই বাহিনীর সামনে পড়ে বুঝতে পারলেন, মুসলিম বাহিনী তাদের পালাবার পথও বন্ধ করে দিয়েছে। তিনি আর সামনে অগ্রসর হওয়ার সাহস পেলেন না। বাধ্য হয়ে তিনি আবার তার ক্যাম্পে ফিরে যাওয়ার জন্য ঘােড়ার মুখ ঘুরিয়ে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তার দেহরক্ষীরাও ঘােড়ার মুখ ঘুরিয়ে দিল।
তিনি তার ক্যাম্পের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, এ সময় তার এক পলাতক অশ্বারােহী সামনে পড়ে গেল। সেই অশ্বারােহী তাকে বললাে, আপনি অন্য কোথাও চলে যান, ক্যাম্পে আর যাবেন না। কারণ সেখানে মুসলমান সৈন্যরা পৌছে গেছে।'
বিলডন সেখান থেকেই ঘােড়ার গতি আবার অন্যদিকে ফিরিয়ে দিলেন।
যে অশ্বারােহী বাহিনী এতক্ষণ ক্রুসেড বাহিনীর একাংশের ওপর প্রলয়কাণ্ড ঘটাচ্ছিল, মুহূর্তে তারা সেখান থেকে উধাও হয়ে গেল। একটু পর একই রকম ডাক-চিৎকার শুরু হলাে ক্রুসেড বাহিনীর অপর অংশ থেকে। সেখানেও সিংহ বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়লাে প্রথমে তকিউদ্দিনের পদাতিক বাহিনী ও পরে অশ্বারােহী বাহিনী।
তকিউদ্দিনের পদাতিক বাহিনী এই বাহিনীর ওপর আঘাত হানতে এসে তুমুল প্রতিরােধের সম্মুখীন হয়েছিল। কারণ তখন তারা জেনে গিয়েছিল, মুসলিম বাহিনী রাতের অন্ধকার অগ্রাহ্য করে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। যদি সময় মতাে অশ্বারােহী বাহিনী এসে না পড়তাে, তবে পদাতিক বাহিনী বড় রকমের বেকায়দায় পড়ে যেতাে। এরই মধ্যে অনেকে শহীদ হয়ে গিয়েছিল, অনেকে আহত হয়েছিল।
সারা রাত তকিউদ্দিনের বাহিনী ‘আঘাত হাননা আর পালাও!’ যুদ্ধে লিপ্ত রইল। যখন ভাের হলাে, দেখা গেল, হিম্মত দুর্গের আশপাশে ছড়িয়ে আছে খৃস্টানদের অগণিত লাশ। চারদিকে লাল রক্তের ছড়াছড়ি। বহু আহত সৈন্য পালাতে না পেরে মরণ যন্ত্রণায় কাৎরাচ্ছে।
এসব লাশ ও আহত সৈন্যদের মধ্যে তকিউদ্দিনের মুসলিম মুজাহিদরাও ছিল। খৃস্টানদের উট, ঘােড়া ও খচ্চরগুলাে দূরদূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে চড়ে বেড়াচ্ছিল। কিন্তু সেখানে বিলডনও ছিল না, তার সেনাবাহিনী বা বডিগার্ডরাও ছিল না। ক্রুসেড বাহিনী তাদের বিস্তর রসদপত্র ফেলে পালিয়ে গেছে। ‘তকিউদ্দিন তার বাহিনীকে আদেশ দিলেন, আহতদের সেবা ও চিকিৎসা করতে। আরেকটি দলকে হুকুম দিলেন, সকল মৃত ব্যক্তি ও শহীদ সৈন্যদের দাফনের ব্যবস্থা করতে। অন্য একটি দলকে বললেন, দুশমনের ফেলে যাওয়া মাল সামান সব এক জায়গায় জমা করাে। তাদের যে পশুগুলাে বেওয়ারিশ অবস্থায় মরুভূমিতে ও পাহাড়ের আশেপাশে চড়ে বেড়াচ্ছে, সেগুলাে ধরে এনে বেঁধে রাখাে।
(চলবে)
0 coment rios:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন