১৯. খুনী চক্রের আস্তানায়(পর্ব-5)
পাহাড়ের এক টিলায় চড়ে বসল মেহেদী। আশেপাশে কোন জনমানব নেই। থাকার কথাও নয়। অন্ধকার এমন গাঢ় যে আশেপাশে কিছুই দেখা যায় না। গা ছমছম করা ভূতুড়ে পরিবেশ। স্বাভাবিকভাবেই এমন পরিবেশ মানুষের অন্তরে ভয় ধরিয়ে দেয়। কিন্তু মেহেদীর মােটেও ভয় লাগছিল না। হেকিমের কথা তার মনে সাহস বাড়িয়ে দিয়েছিল। তার বাহুতে এখনও ঝুলছে হেকিমের বেঁধে দেয়া তাবিজ। যে তাবিজ তাকে সব রকম বালা-মুসিবত থেকে রক্ষা করবে বলে বিশ্বাস করে মেহেদী। তাছাড়া সে আত্মবিশ্বাসী ও সাহসী যুবক হিসাবেই সবার কাছে পরিচিত।
সময় গড়িয়ে চলল। হেকিমের নির্দেশিত জায়গায় বসে আছে মেহেদী। এখনাে কারাে সাড়াশব্দ পায়নি সে। উদগ্রীব হয়ে সে অপেক্ষা করছিল, কখন সেই নারী আত্মা মনুষ্য মূর্তি ধরে তার সামনে আবির্ভূত হবে।
সে যেখানে বসে আছে তার পিছনেই বিরাট এক পাহাড় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে ঝাকড়াচুলাে বড় বড় বৃক্ষ। বাঁ দিক থেকে শুরু হয়েছে দুর্গম অরণ্যাঞ্চল। কেবল ডানপাশটাই যা একটু খােলামেলা। বাতাস বইছে। সেই বাতাসের ঝাপটায় দুলছে বৃক্ষের ডালপালা । বাঁ দিক থেকে শনশন, মড়মড় আওয়াজ আসছে বাতাসের ঝাপটায় জঙ্গলের বৃক্ষরাজির দোলা থেকে। সামনের গাছগুলাে এমনভাবে নড়ছে, যেন হেলেদুলে এগিয়ে আসছে কোন সুবিশাল ভূত। বাতাসের এই শব্দ ও বৃক্ষের নড়াচড়া দেখে মেহেদী আল হাসানের মত বীর যােদ্ধার অন্তরও ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল ।
বসে থাকতে থাকতে অধৈর্য হয়ে উঠল মেহেদী আল হাসান। সে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল এবং খানিকক্ষণ পায়চারী করল। এমন সময় সেই কান্নার সুর ভেসে এলাে, যে সুর সে আগে একবার শুনেছিল। সে সেই কান্নার শব্দ লক্ষ্য করে এগিয়ে গেল। কয়েক কদম এগুনাের পর হঠাৎ করেই কান্না আবার থেমে গেল। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল আল মেহেদী। কিছুক্ষণ নীরব থাকলাে । শুনতে চেষ্টা করল কোথাও কোন আওয়াজ হয় কিনা। কিন্তু না, চারদিক সুনসান, নিশ্চুপ। সে একটু এগিয়ে গিয়েই আবার থেমে গেল । কারণ হঠাৎ করেই সেই কান্নার সুর আবার ভেসে এলাে। তবে এবার সামনে থেকে নয়, আওয়াজটা এলাে পিছন থেকে।
এবার আওয়াজটা অনেক দূর থেকে এলাে। ভাবনায় পড়ে গেল মেহেদী। সে ঘুরে পিছন ফিরে আবার হাঁটা ধরল। কান্নার রেশ আরাে জোরালাে হল । বেশ কিছুটা পথ মাড়িয়ে এলাে মেহেদী, আবারাে কান্না থেমে গেল।
মেহেদী আল হাসান উচ্চস্বরে বললাে, তুমি কি আমাকে দেখা দিবে নাকি আমাকে শুধু ভয়ই দেখাতে থাকবে?
তার নিজের শব্দই পাহাড়ে প্রান্তরে আঘাত খেয়ে আবার ফিরে এল, কিন্তু কান্নার আওয়াজ বা এই প্রশ্নের কোন জবাব কেউ দিল না। একবার নয়, কয়েকবার সে এই প্রশ্ন করল, কিন্তু প্রতিবারই তার শব্দ ফিরে এসে তাকেই আঘাত করল । ধ্বনি-প্রতিধ্বনিত হলাে তার কণ্ঠের সে আওয়াজ, কিন্তু সব বৃথা চেষ্টা, কেউ তার প্রশ্নের জবাব দিল না।
সেই শব্দ অন্ধকারে আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল। নিরূপায় হয়ে আবার মাটিতে বসে পড়ল মেহেদী। তখন এক মেয়েলি কণ্ঠের আওয়াজ শুনতে পেল সে। মেয়েটি বলছে, হে সুন্দর যুবক! তুমি ওখানেই বসে থাকো । আমি প্রাণ ভরে তােমাকে দেখি । আজ দুই হাজার বছর ধরে আমি তােমার পথ পানে চেয়ে আছি। এতদিন পর প্রভু আমার প্রতি সদয় হলেন। আমি তোমাকে দেখতে পেলাম।'
মেহেদী আল হাসান এ শব্দও কয়েকবার শুনতে পেল। তারপরে আবার সব নীরব হয়ে গেল।
মেহেদী আল হাসান কিছুক্ষণ ওখানেই চুপচাপ বসে রইল। পরে আবার চিৎকার করে বলল, তুমি কি একাই আমাকে দেখবে? আমি কি কখনাে তােমাকে দেখতে পাবাে না?'
তুমি কি আমাকে সত্যি দেখতে চাও? বলল, তােমার হৃদয় থেকে বলল, তুমি কি সত্যি দেখতে চাও?
হ্যাঁ, চাই।'
তাহলে ওঠো। এগিয়ে এসাে আমার কাছে।
এইভাবে দুই দিক থেকে কথার আদান প্রদান হলাে। মেয়েটির মিষ্টি আহবান আবার শুনতে পেল মেহেদী, কই, ওঠো, এগিয়ে এসাে আমার কাছে!
মেহেদী আল হাসান সব দ্বিধা ও ভয়ভীতি দূর করে উঠে দাঁড়াল। সে ওই পাহাড়ের দিকে রওনা দিল, যেদিক থেকে মেয়েটির কণ্ঠ ভেসে আসছিল।
যেতে যেতে সে সেই গুহার কাছে গিয়ে পৌঁছল। গুহার ভেতর থেকে আলাে আসছিল, সে আলাের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
সে গুহামুখে পৌঁছতেই আলােটি বিজলীর মত চমক দিয়ে ফট করে নিতে গেল। সেই ক্ষণিক আলােয় সে নিজেকে সুড়ংয়ের মুখে আবিস্কার করল।
হতভম্ব হয়ে সে সেই গুহামুখে দাঁড়িয়ে রইল। গুহার ভেতর নিকষ কালাে অন্ধকার। এই অন্ধকারের ভেতর কোন মানুষ আছে কি নেই বুঝার উপায় নেই।
মাত্র কয়েক মুহূর্ত, তার পরই সুড়ংয়ের অনেক ভেতরে একটি ক্ষুদ্র আলাের শিখা দেখা দিল। আস্তে আস্তে সে আলাে বিস্তারিত হতে হতে একদম গুহার মুখ পর্যন্ত চলে এলাে। মেহেদী আল হাসান অনেক দূরে সুড়ংয়ের ভেতর একজন মানুষকে দাঁড়ানাে অবস্থায় দেখতে পেল। মানুষটি যে পুরুষ নয়, নারী তা এই দূর থেকেও বুঝা যাচ্ছে। সেই নারীদেহ তরঙ্গিত ছন্দ তুলে সামনে এগিয়ে আসছে। মন্ত্রমুগ্ধের মত সেদিকে তাকিয়ে আছে মেহেদী আল হাসান। সেই নারী তার থেকে কম-বেশী পঞ্চাশ গজ দূরে এসে থামল।
সে লক্ষ্য করে দেখলাে, মেয়েটি অনিন্দ্য সুন্দরী। তার চেহারা সুরত অতি মনােরম। সমস্ত শরীর কাফনের মত একদম সাদা কাপড়ে জড়াননা। হঠাৎ এ দৃশ্য দেখে মেহেদী আল হাসান ভয় পেয়ে গেল। তার কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হয়ে গেল। হাত-পা কাঁপতে লাগল।
মেয়েটি হাসানের এ অবস্থা দেখে খিলখিল করে হেসে উঠল। বলল, ভয় পাচ্ছাে কেন যুবক। আমি তােমার কোন ক্ষতি করবাে না, আমাকে ভয় পাওয়ারও কিছু নেই! আমি দুই হাজার বছর ধরে তােমার পথ চেয়ে আছি। তােমার তাে আজ খুশীর দিন। তাহলে তুমি অমন ভয় পাচ্ছাে কেন? এসাে, এগিয়ে এসাে আমার দিকে।
মেহেদী আল হাসান তার দিকে আরও একটু অগ্রসর হলাে। কয়েক কদম এগিয়েছে, কাফনের মধ্য থেকে একটি হাত বের হয়ে এলাে। হাতটি মেহেদী আল হাসানের দিকে বাড়িয়ে এমন ইশারা করলাে, যেন সে আর সামনে না যায়। ইশারা পেয়েই মেহেদী আল হাসান আবার দাঁড়িয়ে গেল। আলােও নিভে গেল সঙ্গে সঙ্গে । মেহেদী অপেক্ষা করতে থাকলাে, ভাবলাে, আলাে হয়তাে আবার জ্বলে উঠবে। সে আবার সেই কাফনে ঢাকা মেয়েটাকে দেখতে পাবে। কিন্তু আলাে জ্বলার পরিবর্তে এবার ভেসে এল মেয়েটির কণ্ঠস্বর, এ স্বর আগের মত মিষ্টি মধুর নয়। রুক্ষ্ণ ও কর্কশ কণ্ঠে মেয়েটি বলল, চলে যাও হে অবিশ্বাসী যুবক। তােমাকে বিশ্বাস করা চলে না। তােমার অন্তর ভালবাসাহীন। তুমি চলে যাও, চলে যাও তুমি।
‘আমাকে তুমি বিশ্বাস করাে, আমার উপর ভরসা রাখাে! মেহেদী আল হাসান অনুনয় করে বললাে, আমি অবিশ্বাসী নই। আমার অন্তর ভালবাসা ও মমতাহীন নয়' সে কথা বলছিল আর অন্ধকারের মধ্য দিয়েই দ্রুত সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল। সে চিৎকার করে বলতে লাগলাে, আমি তােমার জন্যই এখানে এসেছি। তােমাকে দেখার জন্যই নির্জন অন্ধকারের মধ্যে একাকী ছুটে এসেছি। আমাকে বিশ্বাস করাে, দেখা দাও আমার কাছে এসে।
সুড়ংয়ের গহীন থেকে আওয়াজ এলাে, এখনাে তােমাকে
আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। দুনিয়ার মানুষ সব প্রতারক, তুমিও প্রতারক।'
না, আমি প্রতারক নই। আমাকে বিশ্বাস করাে, আমি সত্যি বলছি।'
‘তাহলে তুমি আগামীকাল এসাে। ভয়ভীতি দূরে ফেলে এসাে। অন্তরে প্রীতি ও মহব্বত নিয়ে এসাে। যদি তুমি প্রতারক না হও তাহলে তুমি আমার দেখা পাবে। কিন্তু মনের মধ্যে ভয় ও সন্দেহ নিয়ে এলে, যেমন আজ এসেছো, তুমি কখনােই আমার দেখা পাবে না। আর যদি তুমি না আসসা তবে তুমি ও তােমার ওস্তাদ সেই কবিরাজের কপালে যে দুর্ভোগ আছে তা আমি খণ্ডাতে পারবাে না। আজ চলে যাও। মনকে পরিষ্কার করে কাল এসাে।'
মেহেদী আল হাসান এরপরও অনেকক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে রইল। বার বার ডাকল সেই মেয়েকে, কিন্তু মেয়েটির আর কোন সাড়াশব্দ পেল না। সে অন্ধকারের মধ্যেই সুড়ংয়ের ভেতর দিয়ে হাঁটতে লাগল এবং একসময় সুড়ংয়ের অপর প্রান্তে চলে এল । সুড়ংয়ের ভিতরের চেয়ে বাইরের অন্ধকার কিছু কম। জমাট অন্ধকারের ভেতর দিয়ে হেঁটে সে সুড়ংয়ের মুখে এসে পৌঁছল। বাইরে আবছা আলাের মাঝে একটি লম্বা ছায়া দেখতে পেল। সাদা কাফনে জড়ানাে একটি মেয়ে। সে গুহার বাইরে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে সেটা অদৃশ্য হয়ে গেল। মেহেদী আল হাসান দৌড় দিল। কিন্তু পায়ে বাঁধা পেয়ে পড়ে গেল। উঠে আবার দৌড় দিল। কিন্তু কোথায় কাফন, কোথায় মেয়ে! নিরেট পাহাড় ছাড়া সেখানে আর কেউ নেই। সে সুড়ংয়ের মুখে গিয়ে শব্দ করে ডাকলাে, তার আওয়াজই ধ্বনি প্রতিধ্বনি তুলে ফিরে এলাে তার কাছে। তারপর আর কোন আওয়াজ নেই। কান্নার শব্দ নেই, হাসির ঝরণা নেই, নেই কোন কথামালা।
একটু আগে সফেদ কাপড়ে-ঢাকা যে মেয়ের সাথে সে কথা বলেছিল কোথাও সে নেই ।
নিরাশ হয়ে ফিরে চলল মেহেদী আল হাসান। ফিরে চলল সুড়ং পথেই। সুড়ংয়ের মাঝামাঝি এসেছে এ সময় সুড়ংয়ের মুখে আলাে দেখতে পেল, কিন্তু সে আলােতে কোন মানুষের ছায়াও ছিল না।
আলাে নিভে গেল । মেহেদী আল হাসান আলোহীন অবস্থাতেই সুড়ং থেকে বেরিয়ে গেল। তার সামনে কিছু দূরে একটু আলাে দেখা গেল। সে ওই আলাের কাছে গিয়ে দেখল, কে যেন পাথরের আড়ালে আগুন জ্বালিয়ে রেখেছে।
মেহেদী আল হাসান সেখানে দাঁড়িয়ে অনেক কিছু চিন্তা করলাে। শেষে যেদিক দিয়ে এসেছিল, সে দিকে চলে গেল। ধীরে ধীরে পাহাড়ী এলাকা থেকে বের হয়ে এল মেহেদী। তার উট বাইরে এক গাছের সাথে বাঁধা ছিল। সে উটের উপর সওয়ার হলাে এবং কায়রাের দিকে যাত্রা করলাে।
তার মানসিক অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। একে ভয় বলা যাবে না কিন্তু তার মন ভরা ছিল উৎকট অস্থিরতা ও পেরেশানী। সে ওই আলাে দু’টি সম্পর্কে চিন্তা করছিল। একটা সেই আলাে, যার সামনে সফেদ কাপড়ে ঢাকা মেয়েটি দাঁড়িয়ে ছিল। আরেকটি আলাে, যেটি উপরে সে দেখে এসেছে।
উপরের আলােটা আগুন ছিল। কিন্তু মেয়েটি যে আলােতে দাঁড়িয়ে ছিল, সেই আলােতে আগুন ছিল না। কারণ আলাে জ্বলা স্থানটি সে দুইবার অতিক্রম করেছে। সেখানে আগুন জ্বালালে তার কিছুটা উত্তাপ তাে সে অবশ্যই পেতাে! তাহলে সেটা কিসের আলাে ছিল? প্রশ্নটার কোন জবাব সে তাৎক্ষণিকভাবে পেলাে না।
রাত অনেক হয়ে গিয়েছিল। নিজের আস্তানায় ফিরে এল মেহেদী আল হাসান। বিছানায় গেল ঘুমােবার জন্য, কিন্তু তার কিছুতেই ঘুম এলাে না। বার বার সেই কাফনে জড়ানাে মেয়েটির চেহারাই তার সামনে ভেসে উঠতে লাগলাে। বিছানায় শুয়ে সে কেবলই ছটফট করতে লাগলাে।
অনেক রাতে শােয়ার পরও অভ্যাস অনুসারে সকাল সকালই ঘুম থেকে উঠলাে সে। তারপর প্রাত্যহিক কাজ সেরে আলী বিন সুফিয়ানের কাছে গেল নতুন নির্দেশ নিতে। আলী বিন সুফিয়ান তার ডিউটির স্থান পরিবর্তন করে তাকে শহর থেকে দূরে অন্য এক জায়গায় ডিউটি করতে বলল।
‘আরও কিছু দিন আমাকে এখানেই ডিউটি করার অনুমতি দিন। এতদিন এখানে কাজ করছি, মনে হয় একটি সূত্রের কাছাকাছি চলে এসেছি প্রায়। মেহেদী আল হাসান বললাে, ‘আমি আশা করছি, এই পাহাড়ী এলাকায় আমি এমন কিছু পাবাে, যা আপনাকে চমৎকৃত করবে। আমাকে আর দু'তিন দিন সময় দিন। এর মধ্যেই ইনশাআল্লাহ আমি আপনাকে নতুন কোন সুসংবাদ শােনাতে পারবাে আশা করি।'
আলী বিন সুফিয়ান তার আবেদন উপেক্ষা করলাে না। কারণ সে আনাড়ী গােয়েন্দা নয়। সে এক বিশ্বস্ত ও ট্রেনিংপ্রাপ্ত অফিসার। সে যখন চাইছে তখন তাকে একটু সুযােগ দেয়া দরকার। আলী বিন সুফিয়ান এ নিয়ে তার সাথে কিছুক্ষণ আলােচনা করলেন। পরে চিন্তা-ভাবনা করে বললেন, তােমার আবেদন মঞ্জুর করা হলাে। আশা করি তুমি সাবধানে কদম ফেলবে এবং নতুন সংবাদ নিয়েই ফিরবে।
মেহেদী আল হাসান প্রেতাত্মার সাথে সাক্ষাৎ করার আগে সে এলাকা ছাড়তে চাচ্ছিল না! এই প্রথম সে তার দায়িত্ব চেয়ে নিল। আলী বিন সুফিয়ানের যদি সামান্যতম সন্দেহও হত যে, সে কোন-চক্রে পড়ে তার ডিউটি পরিবর্তন করতে চাচ্ছে, তবে তাকে কখনােই সেখানে যাওয়ার অনুমতি দিত না। এক দক্ষ গােয়েন্দা নিজেকে এমন ভয় ও বিপদের মধ্যে ফেলে দিয়েছিল, যেখানে তার জীবন যাওয়ারও ঝুঁকি ছিল।
মেহেদী আল হাসান হেকিমের কাছে
গেল। তার কাছে রাতের ঘটনা সব খুলে বলল। হেকিম তার কাহিনী শুনে চোখ বন্ধ করলে, মুখে বিড় বিড় করে কি যেন বলল । কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে মেহেদী আল হাসানের চোখে চোখ রাখলাে।
‘আজ রাতে আবার সেখানে যাও।' হেকিম তাকে বললাে, ‘সেই পবিত্র জগতের সৃষ্টি এই অপবিত্র পৃথিবীর মানুষের ধোঁকায় পড়তে চায় না, ভয় পায়। তুমি সেখানে ভয় পাবার মত কিছু করবে না, যাতে আজও সে দেখা দিয়ে সাক্ষাৎ না করে অদৃশ্য হয়ে যায়। তুমি অধৈর্য হয়াে না। সে তােমার সাথে সাক্ষাতের জন্য অধীর হয়ে আছে। অবশ্যই সাক্ষাৎ হবে। যদি এই সাক্ষাতে তােমার কোন উপকার না হয়, তবে আমি কেন সেখানে তােমাকে পাঠাতে যাবােয। নিশ্চয়ই এই সাক্ষাত তােমার জীবনের এক উল্লেখযােগ্য ঘটনা হয়ে থাকবে।'
মেহেদী আল হাসান চলে গেল। রােজকার মত পশুর পাল নিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে ছেড়ে দিয়ে সে উঠে গেল পাহাড়ে। সেখানে সে ঘােরাফেরা করতে লাগল। তার চোখে পড়ল সেই গুহা-মুখ। সে সেই গুহার কাছে গেল। তাকাল চারদিকে। তারপর সুড়ংয়ের মধ্যে ঢুকে গেল। সুড়ংয়ের মুখে সে মাটিতে একটি কাপড়ের টুকরাে পড়ে থাকতে দেখলাে। সে কাপড়ের খণ্ডটি উঠিয়ে নিল। এক ইঞ্জি চওড়া হাতখানেক লম্বা এক টুকরাে ফিতা। সে কাপড়ের ফিতাটাকে গভীর দৃষ্টিতে লক্ষ্য করলাে। ফিতাটি পকেটে রেখে সে এবার সুড়ংয়ের মধ্য দিয়ে হাঁটা শুরু করলাে। এক পাশ দিয়ে ঢুকে সে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে এলাে। সে সেই উঁচু জায়গাটির কাছে গেল, যেখানে পাথরের আড়ালে সে আগুন জ্বলতে দেখেছিল।
এরপর সে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপরে উঠতে লাগলাে। তখন অদৃশ্য থেকে এক পুরুষ কষ্ঠের আওয়াজ ভেসে এলাে, উপরে যেও না। যার জন্য তুমি এসেছাে, সে রাতে আসবে।' এ শব্দটি গুঞ্জরিত হয়ে বার বার তার কানে বাজতে লাগলাে ।
তখন আবার শব্দ হলাে, আমাদের পৃথিবীতে এসে খোঁজাখুঁজি করবে না। যে পথে এসেছে সেই পথে ফিরে যাও।'
মেহেদী আল হাসান থেমে গেল। তার এমন মনে হতে লাগলাে, যেন সে শব্দ তার আশেপাশে ঘুরছে। সে আর উপরে গেল না। সে অভিভূত হয়ে এদিক ওদিক দেখতে লাগলাে। সে ভাবলাে, তার এমন কিছু করা উচিত নয় যাতে এখানকার প্রেতাত্মারা তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়। অসন্তুষ্ট হলে তারা তার ক্ষতি সাধন করে বসতে পারে।
সে আবার গুহার ভেতর ঢুকে গেল এবং সুড়ংয়ের ভেতর দিয়ে হেঁটে অপর পাশ দিয়ে বাইরে চলে এল। তারপর হেঁটে হেঁটে সে তার পশুগুলাের কাছে চলে এল। সেখানে এক পাথরের ওপর বসে সে চিন্তা করতে লাগলাে, এর রহস্যটা কি? কে আমাকে উপরে যেতে নিষেধ করলাে? কেন নিষেধ করলাে এই দিনের বেলায় যেখানে কোন জনমনিষ্যি নেই সেখানে কিভাবে স্পষ্ট আওয়াজে তাকে উপরে যেতে বারণ করলাে? লােকটার কথা থেকে বুঝা যায়, সে আমার প্রতিটি কার্যকলাপ দেখছে, তাহলে আমি তাকে দেখলাম না কেন? তাহলে কি এখানে কোন মানুষ নেই? অদৃশ্য আত্মাই আমাকে এভাবে বারণ করলাে? কিন্তু কেন? উপরে কি আছে, যা ওরা আমাকে দেখতে দিতে চায় না?
দিনটা তার এই সব চিন্তাতেই কেটে গেল । শেষে রাতে আবার এখানে আসার জন্য বিকেলে তাড়াতাড়ি তার ঠিকানায় ফিরে গেল।
সূর্য অস্ত যাওয়ার পর সে আবার রাখালের পােষাক পরে পাহাড়ী অঞ্চলে রওনা দিল। এভাবেই সে প্রতিদিন যায় । সাধারণ পোষাক পাল্টে মরু রাখালের বেশেই সে বরাবর হেকিমের সাথেও দেখা করেছে। এটাই তার ডিউটির পােষাক । সে যখন ডিউটিতে যায়, তখন সে লম্বা একটা খঞ্জরও সঙ্গে নিয়ে যায়। গতকাল তার সঙ্গে খঞ্জর ছিল বলেই রাতে সেই নারী তার সাথে সাক্ষাত করেনি। হেকিম বিষয়টি লক্ষ্য করে তাকে বলেছিল, 'তুমি কি এই খঞ্জর নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলে?'
মেহেদী আল হাসান হ্যাঁ সুচক মাথা নাড়লে তিনি কড়া ভাষায় নিষেধ করে বলেছিলেন, “খবরদার, যখন রাতে প্রেতাত্মার সাথে দেখা করতে যাবে তখন সঙ্গে কোন অস্ত্রশস্ত্র রেখাে না। অস্ত্রকে ওরা ঘৃণা করে। অস্ত্র মানুষের বুক থেকে প্রেমের শক্তি কেড়ে নেয়। ফেরাউন অস্ত্রের মুখে ওঁদের জোর করে ধরে এনেছিল। তাই ওরা অস্ত্রধারী কারাে সাথে সাক্ষাত করে না। আজ রাতে তুমি যখন ওখানে যাবে তখন সঙ্গে কোন অস্ত্র নিও না।
রাখালের পােষাক পরে সে লম্বা ছােরাটির দিকে তাকাল ছােরাটি দেয়ালের সাথে ঝুলানো। সে ছােরাটি দেখলাে হেকিমের সাবধান বাণী মনে পড়ে গেল তার। সে গভীর চিন্তায় পড়ে গেল। হেকিমের নির্দেশ অনুযায়ী খঞ্জর বা কোন অস্ত্রই সাথে নেয়া যাবে না । কিন্তু নিরস্ত্র অবস্থায় যাওয়াটা কি ঠিক হবে? অনেক চিন্তা-ভাবনার পর জীবনের নিরাপত্তার কথা ভেবে সে খঞ্জরটি সঙ্গে নেয়াই যুক্তিযুক্ত মনে করল। সে দেয়াল থেকে খঞ্জরটি পেড়ে কাপড়ের ভেতর কোমরের সাথে সেটি বেঁধে নিয়ে বের হয়ে গেল ঘর থেকে।
গন্তব্য স্থানে পৌছে সে উটকে বসিয়ে দিল। তারপর পায়ে হেঁটে রওনা দিল সুড়ংয়ের মুখের দিকে। সহসা সে পিছনে কারাে পদধ্বনি শুনতে পেল। থেমে গেল সে। সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল সেই পদধ্বনি। মেহেদী সামনে না এগিয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকল।
একটু পর উপর থেকে পাথর গড়ানাের শব্দ শুনতে পেল। পাথর পতনের সেই ধ্বনি তেমন বিকট ছিল না। কিন্তু এমন নিঝুম ও খাঁড়া পাহাড়ে পাথর পতনের আওয়াজ ধ্বনিপ্রতিধ্বনি তুলে নিচ পর্যন্ত গড়িয়ে চললাে। পাথর পতনের আওয়াজ শেষ হতেই একটি গুঞ্জন ধ্বনি ভেসে আসল গুহার ওদিক থেকে। মনে হল, কেউ যেন ফোঁপাচ্ছে ও কাঁদছে। আস্তে আস্তে সেই কান্নার ধ্বনি জোরালাে হলাে। মেহেদী আল হাসানের কানে সেই কান্নার ধ্বনি আঘাত করতেই সে বলে উঠল, ‘কেঁদো না, আমার সামনে এসাে। আমার দুনিয়া অপবিত্র হতে পারে, কিন্তু আমি অপবিত্র নই।'
তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে।' কান্না কাতর কণ্ঠেই কথাটা বলল কোন নারী। সে আওয়াজে ছিল বিনয় ও নম্রতা।
হঠাৎ আলাে জ্বলে উঠলাে এবং সঙ্গে সঙ্গেই তা আবার নিভেও গেল। আলােটি জ্বলে উঠেছিল সুড়ংয়ের একেবারে মুখে। মেহেদী আল হাসান দ্রুত পদক্ষেপে সুড়ংয়ের দিকে এগিয়ে গেল।
সুড়ংয়ের একদম কাছাকাছি গিয়ে এক বিরাট পাথরের পিছনে বসে নিজেকে লুকিয়ে ফেললাে সে। সেখান থেকে উপরের দিকে তাকালাে, যেখানে গত রাতে আগুন জ্বলতে দেখেছিল। একটু পর আজও সেখানে আগুন জ্বলে উঠল। সে নিজেকে মাটির সাথে একদম মিশিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে সুড়ংয়ের মুখের কাছে চলে এল। তারপর নিজেকে ছুঁড়ে মারল সুড়ংয়ের ভেতর।
সুড়ংয়ে পৌঁছে যতটা সম্ভব পাথরের আড়ালে নিজেকে গােপন করে চুপচাপ বসে থাকলাে। অন্ধকারে তার চোখ সহনীয় হয়ে উঠলে সে এদিক-ওদিক দৃষ্টি মেলে নীরবে দেখতে লাগলাে। গুহা থেকে আগুনটা সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল না, তবে আগুনের আভা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল।
সুড়ংয়ের ভেতর গাঢ় অন্ধকার। নিজের হাত-পা পর্যন্ত দেখা যায় না। ফলে আগন্তুক পুরুষ না নারী তা যেমন সে দেখতে পারল না, তেমনি আগন্তুক ঠিক কতটা দূরে তাও নিশ্চিত হতে পারছিল না। সহসা তার মনে হল, কেউ তার সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে।
তাকে পেরিয়ে মেয়েটি আরাে দু’কদম এগিয়ে গিয়ে থামল। থেমেই আবার কান্না শুরু করে দিল।
এত ঘুটঘুটে অন্ধকারেও সে বুঝতে পারলাে, গতকাল যে মেয়েকে সে আলাের সামনে দেখেছিল, এই সে মেয়ে। মেহেদী আল হাসান এ শব্দ আগেও কয়েকবার শুনেছে। এখন মেয়েটি তার এত কাছে যে, হাত বাড়ালেই সে তাকে ধরতে পারবে। টেনশনে তার বুক জোরে জোরে লাফাতে লাগলাে। মেয়েটি আবার সামনে অগ্রসর হওয়ার জন্য পা বাড়াল, ঠিক সেই সময় সুড়ংয়ের মুখে আলাে জ্বলে উঠলাে। আলােটা জ্বলেই সঙ্গে সঙ্গে আবার নিভে গেল। মেহেদী আল হাসান দেয়াল থেকে আলগােছে তুলে আনল তার দেহ এবং চোখের পলকে আগন্তুকের পিছন থেকে জোরে তাকে জাপটে ধরলাে।
মেয়েটি এতে মােটেও ভীত না হয়ে বলে উঠলাে, ওরে হতভাগা, তুই কি এটাকে কৌতুক ভাবতে শুরু করেছিস?
সময় গড়িয়ে চলল। হেকিমের নির্দেশিত জায়গায় বসে আছে মেহেদী। এখনাে কারাে সাড়াশব্দ পায়নি সে। উদগ্রীব হয়ে সে অপেক্ষা করছিল, কখন সেই নারী আত্মা মনুষ্য মূর্তি ধরে তার সামনে আবির্ভূত হবে।
সে যেখানে বসে আছে তার পিছনেই বিরাট এক পাহাড় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে ঝাকড়াচুলাে বড় বড় বৃক্ষ। বাঁ দিক থেকে শুরু হয়েছে দুর্গম অরণ্যাঞ্চল। কেবল ডানপাশটাই যা একটু খােলামেলা। বাতাস বইছে। সেই বাতাসের ঝাপটায় দুলছে বৃক্ষের ডালপালা । বাঁ দিক থেকে শনশন, মড়মড় আওয়াজ আসছে বাতাসের ঝাপটায় জঙ্গলের বৃক্ষরাজির দোলা থেকে। সামনের গাছগুলাে এমনভাবে নড়ছে, যেন হেলেদুলে এগিয়ে আসছে কোন সুবিশাল ভূত। বাতাসের এই শব্দ ও বৃক্ষের নড়াচড়া দেখে মেহেদী আল হাসানের মত বীর যােদ্ধার অন্তরও ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল ।
বসে থাকতে থাকতে অধৈর্য হয়ে উঠল মেহেদী আল হাসান। সে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল এবং খানিকক্ষণ পায়চারী করল। এমন সময় সেই কান্নার সুর ভেসে এলাে, যে সুর সে আগে একবার শুনেছিল। সে সেই কান্নার শব্দ লক্ষ্য করে এগিয়ে গেল। কয়েক কদম এগুনাের পর হঠাৎ করেই কান্না আবার থেমে গেল। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল আল মেহেদী। কিছুক্ষণ নীরব থাকলাে । শুনতে চেষ্টা করল কোথাও কোন আওয়াজ হয় কিনা। কিন্তু না, চারদিক সুনসান, নিশ্চুপ। সে একটু এগিয়ে গিয়েই আবার থেমে গেল । কারণ হঠাৎ করেই সেই কান্নার সুর আবার ভেসে এলাে। তবে এবার সামনে থেকে নয়, আওয়াজটা এলাে পিছন থেকে।
এবার আওয়াজটা অনেক দূর থেকে এলাে। ভাবনায় পড়ে গেল মেহেদী। সে ঘুরে পিছন ফিরে আবার হাঁটা ধরল। কান্নার রেশ আরাে জোরালাে হল । বেশ কিছুটা পথ মাড়িয়ে এলাে মেহেদী, আবারাে কান্না থেমে গেল।
মেহেদী আল হাসান উচ্চস্বরে বললাে, তুমি কি আমাকে দেখা দিবে নাকি আমাকে শুধু ভয়ই দেখাতে থাকবে?
তার নিজের শব্দই পাহাড়ে প্রান্তরে আঘাত খেয়ে আবার ফিরে এল, কিন্তু কান্নার আওয়াজ বা এই প্রশ্নের কোন জবাব কেউ দিল না। একবার নয়, কয়েকবার সে এই প্রশ্ন করল, কিন্তু প্রতিবারই তার শব্দ ফিরে এসে তাকেই আঘাত করল । ধ্বনি-প্রতিধ্বনিত হলাে তার কণ্ঠের সে আওয়াজ, কিন্তু সব বৃথা চেষ্টা, কেউ তার প্রশ্নের জবাব দিল না।
সেই শব্দ অন্ধকারে আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল। নিরূপায় হয়ে আবার মাটিতে বসে পড়ল মেহেদী। তখন এক মেয়েলি কণ্ঠের আওয়াজ শুনতে পেল সে। মেয়েটি বলছে, হে সুন্দর যুবক! তুমি ওখানেই বসে থাকো । আমি প্রাণ ভরে তােমাকে দেখি । আজ দুই হাজার বছর ধরে আমি তােমার পথ পানে চেয়ে আছি। এতদিন পর প্রভু আমার প্রতি সদয় হলেন। আমি তোমাকে দেখতে পেলাম।'
মেহেদী আল হাসান এ শব্দও কয়েকবার শুনতে পেল। তারপরে আবার সব নীরব হয়ে গেল।
মেহেদী আল হাসান কিছুক্ষণ ওখানেই চুপচাপ বসে রইল। পরে আবার চিৎকার করে বলল, তুমি কি একাই আমাকে দেখবে? আমি কি কখনাে তােমাকে দেখতে পাবাে না?'
তুমি কি আমাকে সত্যি দেখতে চাও? বলল, তােমার হৃদয় থেকে বলল, তুমি কি সত্যি দেখতে চাও?
হ্যাঁ, চাই।'
তাহলে ওঠো। এগিয়ে এসাে আমার কাছে।
এইভাবে দুই দিক থেকে কথার আদান প্রদান হলাে। মেয়েটির মিষ্টি আহবান আবার শুনতে পেল মেহেদী, কই, ওঠো, এগিয়ে এসাে আমার কাছে!
মেহেদী আল হাসান সব দ্বিধা ও ভয়ভীতি দূর করে উঠে দাঁড়াল। সে ওই পাহাড়ের দিকে রওনা দিল, যেদিক থেকে মেয়েটির কণ্ঠ ভেসে আসছিল।
যেতে যেতে সে সেই গুহার কাছে গিয়ে পৌঁছল। গুহার ভেতর থেকে আলাে আসছিল, সে আলাের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
সে গুহামুখে পৌঁছতেই আলােটি বিজলীর মত চমক দিয়ে ফট করে নিতে গেল। সেই ক্ষণিক আলােয় সে নিজেকে সুড়ংয়ের মুখে আবিস্কার করল।
হতভম্ব হয়ে সে সেই গুহামুখে দাঁড়িয়ে রইল। গুহার ভেতর নিকষ কালাে অন্ধকার। এই অন্ধকারের ভেতর কোন মানুষ আছে কি নেই বুঝার উপায় নেই।
মাত্র কয়েক মুহূর্ত, তার পরই সুড়ংয়ের অনেক ভেতরে একটি ক্ষুদ্র আলাের শিখা দেখা দিল। আস্তে আস্তে সে আলাে বিস্তারিত হতে হতে একদম গুহার মুখ পর্যন্ত চলে এলাে। মেহেদী আল হাসান অনেক দূরে সুড়ংয়ের ভেতর একজন মানুষকে দাঁড়ানাে অবস্থায় দেখতে পেল। মানুষটি যে পুরুষ নয়, নারী তা এই দূর থেকেও বুঝা যাচ্ছে। সেই নারীদেহ তরঙ্গিত ছন্দ তুলে সামনে এগিয়ে আসছে। মন্ত্রমুগ্ধের মত সেদিকে তাকিয়ে আছে মেহেদী আল হাসান। সেই নারী তার থেকে কম-বেশী পঞ্চাশ গজ দূরে এসে থামল।
সে লক্ষ্য করে দেখলাে, মেয়েটি অনিন্দ্য সুন্দরী। তার চেহারা সুরত অতি মনােরম। সমস্ত শরীর কাফনের মত একদম সাদা কাপড়ে জড়াননা। হঠাৎ এ দৃশ্য দেখে মেহেদী আল হাসান ভয় পেয়ে গেল। তার কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হয়ে গেল। হাত-পা কাঁপতে লাগল।
মেয়েটি হাসানের এ অবস্থা দেখে খিলখিল করে হেসে উঠল। বলল, ভয় পাচ্ছাে কেন যুবক। আমি তােমার কোন ক্ষতি করবাে না, আমাকে ভয় পাওয়ারও কিছু নেই! আমি দুই হাজার বছর ধরে তােমার পথ চেয়ে আছি। তােমার তাে আজ খুশীর দিন। তাহলে তুমি অমন ভয় পাচ্ছাে কেন? এসাে, এগিয়ে এসাে আমার দিকে।
মেহেদী আল হাসান তার দিকে আরও একটু অগ্রসর হলাে। কয়েক কদম এগিয়েছে, কাফনের মধ্য থেকে একটি হাত বের হয়ে এলাে। হাতটি মেহেদী আল হাসানের দিকে বাড়িয়ে এমন ইশারা করলাে, যেন সে আর সামনে না যায়। ইশারা পেয়েই মেহেদী আল হাসান আবার দাঁড়িয়ে গেল। আলােও নিভে গেল সঙ্গে সঙ্গে । মেহেদী অপেক্ষা করতে থাকলাে, ভাবলাে, আলাে হয়তাে আবার জ্বলে উঠবে। সে আবার সেই কাফনে ঢাকা মেয়েটাকে দেখতে পাবে। কিন্তু আলাে জ্বলার পরিবর্তে এবার ভেসে এল মেয়েটির কণ্ঠস্বর, এ স্বর আগের মত মিষ্টি মধুর নয়। রুক্ষ্ণ ও কর্কশ কণ্ঠে মেয়েটি বলল, চলে যাও হে অবিশ্বাসী যুবক। তােমাকে বিশ্বাস করা চলে না। তােমার অন্তর ভালবাসাহীন। তুমি চলে যাও, চলে যাও তুমি।
‘আমাকে তুমি বিশ্বাস করাে, আমার উপর ভরসা রাখাে! মেহেদী আল হাসান অনুনয় করে বললাে, আমি অবিশ্বাসী নই। আমার অন্তর ভালবাসা ও মমতাহীন নয়' সে কথা বলছিল আর অন্ধকারের মধ্য দিয়েই দ্রুত সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল। সে চিৎকার করে বলতে লাগলাে, আমি তােমার জন্যই এখানে এসেছি। তােমাকে দেখার জন্যই নির্জন অন্ধকারের মধ্যে একাকী ছুটে এসেছি। আমাকে বিশ্বাস করাে, দেখা দাও আমার কাছে এসে।
সুড়ংয়ের গহীন থেকে আওয়াজ এলাে, এখনাে তােমাকে
আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। দুনিয়ার মানুষ সব প্রতারক, তুমিও প্রতারক।'
না, আমি প্রতারক নই। আমাকে বিশ্বাস করাে, আমি সত্যি বলছি।'
‘তাহলে তুমি আগামীকাল এসাে। ভয়ভীতি দূরে ফেলে এসাে। অন্তরে প্রীতি ও মহব্বত নিয়ে এসাে। যদি তুমি প্রতারক না হও তাহলে তুমি আমার দেখা পাবে। কিন্তু মনের মধ্যে ভয় ও সন্দেহ নিয়ে এলে, যেমন আজ এসেছো, তুমি কখনােই আমার দেখা পাবে না। আর যদি তুমি না আসসা তবে তুমি ও তােমার ওস্তাদ সেই কবিরাজের কপালে যে দুর্ভোগ আছে তা আমি খণ্ডাতে পারবাে না। আজ চলে যাও। মনকে পরিষ্কার করে কাল এসাে।'
মেহেদী আল হাসান এরপরও অনেকক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে রইল। বার বার ডাকল সেই মেয়েকে, কিন্তু মেয়েটির আর কোন সাড়াশব্দ পেল না। সে অন্ধকারের মধ্যেই সুড়ংয়ের ভেতর দিয়ে হাঁটতে লাগল এবং একসময় সুড়ংয়ের অপর প্রান্তে চলে এল । সুড়ংয়ের ভিতরের চেয়ে বাইরের অন্ধকার কিছু কম। জমাট অন্ধকারের ভেতর দিয়ে হেঁটে সে সুড়ংয়ের মুখে এসে পৌঁছল। বাইরে আবছা আলাের মাঝে একটি লম্বা ছায়া দেখতে পেল। সাদা কাফনে জড়ানাে একটি মেয়ে। সে গুহার বাইরে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে সেটা অদৃশ্য হয়ে গেল। মেহেদী আল হাসান দৌড় দিল। কিন্তু পায়ে বাঁধা পেয়ে পড়ে গেল। উঠে আবার দৌড় দিল। কিন্তু কোথায় কাফন, কোথায় মেয়ে! নিরেট পাহাড় ছাড়া সেখানে আর কেউ নেই। সে সুড়ংয়ের মুখে গিয়ে শব্দ করে ডাকলাে, তার আওয়াজই ধ্বনি প্রতিধ্বনি তুলে ফিরে এলাে তার কাছে। তারপর আর কোন আওয়াজ নেই। কান্নার শব্দ নেই, হাসির ঝরণা নেই, নেই কোন কথামালা।
একটু আগে সফেদ কাপড়ে-ঢাকা যে মেয়ের সাথে সে কথা বলেছিল কোথাও সে নেই ।
নিরাশ হয়ে ফিরে চলল মেহেদী আল হাসান। ফিরে চলল সুড়ং পথেই। সুড়ংয়ের মাঝামাঝি এসেছে এ সময় সুড়ংয়ের মুখে আলাে দেখতে পেল, কিন্তু সে আলােতে কোন মানুষের ছায়াও ছিল না।
আলাে নিভে গেল । মেহেদী আল হাসান আলোহীন অবস্থাতেই সুড়ং থেকে বেরিয়ে গেল। তার সামনে কিছু দূরে একটু আলাে দেখা গেল। সে ওই আলাের কাছে গিয়ে দেখল, কে যেন পাথরের আড়ালে আগুন জ্বালিয়ে রেখেছে।
মেহেদী আল হাসান সেখানে দাঁড়িয়ে অনেক কিছু চিন্তা করলাে। শেষে যেদিক দিয়ে এসেছিল, সে দিকে চলে গেল। ধীরে ধীরে পাহাড়ী এলাকা থেকে বের হয়ে এল মেহেদী। তার উট বাইরে এক গাছের সাথে বাঁধা ছিল। সে উটের উপর সওয়ার হলাে এবং কায়রাের দিকে যাত্রা করলাে।
তার মানসিক অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। একে ভয় বলা যাবে না কিন্তু তার মন ভরা ছিল উৎকট অস্থিরতা ও পেরেশানী। সে ওই আলাে দু’টি সম্পর্কে চিন্তা করছিল। একটা সেই আলাে, যার সামনে সফেদ কাপড়ে ঢাকা মেয়েটি দাঁড়িয়ে ছিল। আরেকটি আলাে, যেটি উপরে সে দেখে এসেছে।
উপরের আলােটা আগুন ছিল। কিন্তু মেয়েটি যে আলােতে দাঁড়িয়ে ছিল, সেই আলােতে আগুন ছিল না। কারণ আলাে জ্বলা স্থানটি সে দুইবার অতিক্রম করেছে। সেখানে আগুন জ্বালালে তার কিছুটা উত্তাপ তাে সে অবশ্যই পেতাে! তাহলে সেটা কিসের আলাে ছিল? প্রশ্নটার কোন জবাব সে তাৎক্ষণিকভাবে পেলাে না।
রাত অনেক হয়ে গিয়েছিল। নিজের আস্তানায় ফিরে এল মেহেদী আল হাসান। বিছানায় গেল ঘুমােবার জন্য, কিন্তু তার কিছুতেই ঘুম এলাে না। বার বার সেই কাফনে জড়ানাে মেয়েটির চেহারাই তার সামনে ভেসে উঠতে লাগলাে। বিছানায় শুয়ে সে কেবলই ছটফট করতে লাগলাে।
অনেক রাতে শােয়ার পরও অভ্যাস অনুসারে সকাল সকালই ঘুম থেকে উঠলাে সে। তারপর প্রাত্যহিক কাজ সেরে আলী বিন সুফিয়ানের কাছে গেল নতুন নির্দেশ নিতে। আলী বিন সুফিয়ান তার ডিউটির স্থান পরিবর্তন করে তাকে শহর থেকে দূরে অন্য এক জায়গায় ডিউটি করতে বলল।
‘আরও কিছু দিন আমাকে এখানেই ডিউটি করার অনুমতি দিন। এতদিন এখানে কাজ করছি, মনে হয় একটি সূত্রের কাছাকাছি চলে এসেছি প্রায়। মেহেদী আল হাসান বললাে, ‘আমি আশা করছি, এই পাহাড়ী এলাকায় আমি এমন কিছু পাবাে, যা আপনাকে চমৎকৃত করবে। আমাকে আর দু'তিন দিন সময় দিন। এর মধ্যেই ইনশাআল্লাহ আমি আপনাকে নতুন কোন সুসংবাদ শােনাতে পারবাে আশা করি।'
আলী বিন সুফিয়ান তার আবেদন উপেক্ষা করলাে না। কারণ সে আনাড়ী গােয়েন্দা নয়। সে এক বিশ্বস্ত ও ট্রেনিংপ্রাপ্ত অফিসার। সে যখন চাইছে তখন তাকে একটু সুযােগ দেয়া দরকার। আলী বিন সুফিয়ান এ নিয়ে তার সাথে কিছুক্ষণ আলােচনা করলেন। পরে চিন্তা-ভাবনা করে বললেন, তােমার আবেদন মঞ্জুর করা হলাে। আশা করি তুমি সাবধানে কদম ফেলবে এবং নতুন সংবাদ নিয়েই ফিরবে।
মেহেদী আল হাসান প্রেতাত্মার সাথে সাক্ষাৎ করার আগে সে এলাকা ছাড়তে চাচ্ছিল না! এই প্রথম সে তার দায়িত্ব চেয়ে নিল। আলী বিন সুফিয়ানের যদি সামান্যতম সন্দেহও হত যে, সে কোন-চক্রে পড়ে তার ডিউটি পরিবর্তন করতে চাচ্ছে, তবে তাকে কখনােই সেখানে যাওয়ার অনুমতি দিত না। এক দক্ষ গােয়েন্দা নিজেকে এমন ভয় ও বিপদের মধ্যে ফেলে দিয়েছিল, যেখানে তার জীবন যাওয়ারও ঝুঁকি ছিল।
মেহেদী আল হাসান হেকিমের কাছে
গেল। তার কাছে রাতের ঘটনা সব খুলে বলল। হেকিম তার কাহিনী শুনে চোখ বন্ধ করলে, মুখে বিড় বিড় করে কি যেন বলল । কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে মেহেদী আল হাসানের চোখে চোখ রাখলাে।
‘আজ রাতে আবার সেখানে যাও।' হেকিম তাকে বললাে, ‘সেই পবিত্র জগতের সৃষ্টি এই অপবিত্র পৃথিবীর মানুষের ধোঁকায় পড়তে চায় না, ভয় পায়। তুমি সেখানে ভয় পাবার মত কিছু করবে না, যাতে আজও সে দেখা দিয়ে সাক্ষাৎ না করে অদৃশ্য হয়ে যায়। তুমি অধৈর্য হয়াে না। সে তােমার সাথে সাক্ষাতের জন্য অধীর হয়ে আছে। অবশ্যই সাক্ষাৎ হবে। যদি এই সাক্ষাতে তােমার কোন উপকার না হয়, তবে আমি কেন সেখানে তােমাকে পাঠাতে যাবােয। নিশ্চয়ই এই সাক্ষাত তােমার জীবনের এক উল্লেখযােগ্য ঘটনা হয়ে থাকবে।'
মেহেদী আল হাসান চলে গেল। রােজকার মত পশুর পাল নিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে ছেড়ে দিয়ে সে উঠে গেল পাহাড়ে। সেখানে সে ঘােরাফেরা করতে লাগল। তার চোখে পড়ল সেই গুহা-মুখ। সে সেই গুহার কাছে গেল। তাকাল চারদিকে। তারপর সুড়ংয়ের মধ্যে ঢুকে গেল। সুড়ংয়ের মুখে সে মাটিতে একটি কাপড়ের টুকরাে পড়ে থাকতে দেখলাে। সে কাপড়ের খণ্ডটি উঠিয়ে নিল। এক ইঞ্জি চওড়া হাতখানেক লম্বা এক টুকরাে ফিতা। সে কাপড়ের ফিতাটাকে গভীর দৃষ্টিতে লক্ষ্য করলাে। ফিতাটি পকেটে রেখে সে এবার সুড়ংয়ের মধ্য দিয়ে হাঁটা শুরু করলাে। এক পাশ দিয়ে ঢুকে সে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে এলাে। সে সেই উঁচু জায়গাটির কাছে গেল, যেখানে পাথরের আড়ালে সে আগুন জ্বলতে দেখেছিল।
এরপর সে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপরে উঠতে লাগলাে। তখন অদৃশ্য থেকে এক পুরুষ কষ্ঠের আওয়াজ ভেসে এলাে, উপরে যেও না। যার জন্য তুমি এসেছাে, সে রাতে আসবে।' এ শব্দটি গুঞ্জরিত হয়ে বার বার তার কানে বাজতে লাগলাে ।
তখন আবার শব্দ হলাে, আমাদের পৃথিবীতে এসে খোঁজাখুঁজি করবে না। যে পথে এসেছে সেই পথে ফিরে যাও।'
মেহেদী আল হাসান থেমে গেল। তার এমন মনে হতে লাগলাে, যেন সে শব্দ তার আশেপাশে ঘুরছে। সে আর উপরে গেল না। সে অভিভূত হয়ে এদিক ওদিক দেখতে লাগলাে। সে ভাবলাে, তার এমন কিছু করা উচিত নয় যাতে এখানকার প্রেতাত্মারা তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়। অসন্তুষ্ট হলে তারা তার ক্ষতি সাধন করে বসতে পারে।
সে আবার গুহার ভেতর ঢুকে গেল এবং সুড়ংয়ের ভেতর দিয়ে হেঁটে অপর পাশ দিয়ে বাইরে চলে এল। তারপর হেঁটে হেঁটে সে তার পশুগুলাের কাছে চলে এল। সেখানে এক পাথরের ওপর বসে সে চিন্তা করতে লাগলাে, এর রহস্যটা কি? কে আমাকে উপরে যেতে নিষেধ করলাে? কেন নিষেধ করলাে এই দিনের বেলায় যেখানে কোন জনমনিষ্যি নেই সেখানে কিভাবে স্পষ্ট আওয়াজে তাকে উপরে যেতে বারণ করলাে? লােকটার কথা থেকে বুঝা যায়, সে আমার প্রতিটি কার্যকলাপ দেখছে, তাহলে আমি তাকে দেখলাম না কেন? তাহলে কি এখানে কোন মানুষ নেই? অদৃশ্য আত্মাই আমাকে এভাবে বারণ করলাে? কিন্তু কেন? উপরে কি আছে, যা ওরা আমাকে দেখতে দিতে চায় না?
দিনটা তার এই সব চিন্তাতেই কেটে গেল । শেষে রাতে আবার এখানে আসার জন্য বিকেলে তাড়াতাড়ি তার ঠিকানায় ফিরে গেল।
সূর্য অস্ত যাওয়ার পর সে আবার রাখালের পােষাক পরে পাহাড়ী অঞ্চলে রওনা দিল। এভাবেই সে প্রতিদিন যায় । সাধারণ পোষাক পাল্টে মরু রাখালের বেশেই সে বরাবর হেকিমের সাথেও দেখা করেছে। এটাই তার ডিউটির পােষাক । সে যখন ডিউটিতে যায়, তখন সে লম্বা একটা খঞ্জরও সঙ্গে নিয়ে যায়। গতকাল তার সঙ্গে খঞ্জর ছিল বলেই রাতে সেই নারী তার সাথে সাক্ষাত করেনি। হেকিম বিষয়টি লক্ষ্য করে তাকে বলেছিল, 'তুমি কি এই খঞ্জর নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলে?'
মেহেদী আল হাসান হ্যাঁ সুচক মাথা নাড়লে তিনি কড়া ভাষায় নিষেধ করে বলেছিলেন, “খবরদার, যখন রাতে প্রেতাত্মার সাথে দেখা করতে যাবে তখন সঙ্গে কোন অস্ত্রশস্ত্র রেখাে না। অস্ত্রকে ওরা ঘৃণা করে। অস্ত্র মানুষের বুক থেকে প্রেমের শক্তি কেড়ে নেয়। ফেরাউন অস্ত্রের মুখে ওঁদের জোর করে ধরে এনেছিল। তাই ওরা অস্ত্রধারী কারাে সাথে সাক্ষাত করে না। আজ রাতে তুমি যখন ওখানে যাবে তখন সঙ্গে কোন অস্ত্র নিও না।
রাখালের পােষাক পরে সে লম্বা ছােরাটির দিকে তাকাল ছােরাটি দেয়ালের সাথে ঝুলানো। সে ছােরাটি দেখলাে হেকিমের সাবধান বাণী মনে পড়ে গেল তার। সে গভীর চিন্তায় পড়ে গেল। হেকিমের নির্দেশ অনুযায়ী খঞ্জর বা কোন অস্ত্রই সাথে নেয়া যাবে না । কিন্তু নিরস্ত্র অবস্থায় যাওয়াটা কি ঠিক হবে? অনেক চিন্তা-ভাবনার পর জীবনের নিরাপত্তার কথা ভেবে সে খঞ্জরটি সঙ্গে নেয়াই যুক্তিযুক্ত মনে করল। সে দেয়াল থেকে খঞ্জরটি পেড়ে কাপড়ের ভেতর কোমরের সাথে সেটি বেঁধে নিয়ে বের হয়ে গেল ঘর থেকে।
গন্তব্য স্থানে পৌছে সে উটকে বসিয়ে দিল। তারপর পায়ে হেঁটে রওনা দিল সুড়ংয়ের মুখের দিকে। সহসা সে পিছনে কারাে পদধ্বনি শুনতে পেল। থেমে গেল সে। সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল সেই পদধ্বনি। মেহেদী সামনে না এগিয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকল।
একটু পর উপর থেকে পাথর গড়ানাের শব্দ শুনতে পেল। পাথর পতনের সেই ধ্বনি তেমন বিকট ছিল না। কিন্তু এমন নিঝুম ও খাঁড়া পাহাড়ে পাথর পতনের আওয়াজ ধ্বনিপ্রতিধ্বনি তুলে নিচ পর্যন্ত গড়িয়ে চললাে। পাথর পতনের আওয়াজ শেষ হতেই একটি গুঞ্জন ধ্বনি ভেসে আসল গুহার ওদিক থেকে। মনে হল, কেউ যেন ফোঁপাচ্ছে ও কাঁদছে। আস্তে আস্তে সেই কান্নার ধ্বনি জোরালাে হলাে। মেহেদী আল হাসানের কানে সেই কান্নার ধ্বনি আঘাত করতেই সে বলে উঠল, ‘কেঁদো না, আমার সামনে এসাে। আমার দুনিয়া অপবিত্র হতে পারে, কিন্তু আমি অপবিত্র নই।'
তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে।' কান্না কাতর কণ্ঠেই কথাটা বলল কোন নারী। সে আওয়াজে ছিল বিনয় ও নম্রতা।
হঠাৎ আলাে জ্বলে উঠলাে এবং সঙ্গে সঙ্গেই তা আবার নিভেও গেল। আলােটি জ্বলে উঠেছিল সুড়ংয়ের একেবারে মুখে। মেহেদী আল হাসান দ্রুত পদক্ষেপে সুড়ংয়ের দিকে এগিয়ে গেল।
সুড়ংয়ের একদম কাছাকাছি গিয়ে এক বিরাট পাথরের পিছনে বসে নিজেকে লুকিয়ে ফেললাে সে। সেখান থেকে উপরের দিকে তাকালাে, যেখানে গত রাতে আগুন জ্বলতে দেখেছিল। একটু পর আজও সেখানে আগুন জ্বলে উঠল। সে নিজেকে মাটির সাথে একদম মিশিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে সুড়ংয়ের মুখের কাছে চলে এল। তারপর নিজেকে ছুঁড়ে মারল সুড়ংয়ের ভেতর।
সুড়ংয়ে পৌঁছে যতটা সম্ভব পাথরের আড়ালে নিজেকে গােপন করে চুপচাপ বসে থাকলাে। অন্ধকারে তার চোখ সহনীয় হয়ে উঠলে সে এদিক-ওদিক দৃষ্টি মেলে নীরবে দেখতে লাগলাে। গুহা থেকে আগুনটা সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল না, তবে আগুনের আভা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল।
সুড়ংয়ের ভেতর থেকে মেয়েটির কণ্ঠস্বর ভেসে এল, হে সুন্দর যুবক, দুই হাজার বছর ধরে তােমার পথ পানে চেয়ে আছি। তুমি আমার সামনে এসাে।' সুড়ংয়ের ভেতর এ কথা বার বার ধ্বনি প্রতিধ্বনি হতে লাগল।
মেহেদী আল হাসান সেই কণ্ঠস্বরের উদ্দেশ্যে নিঃশব্দে পা বাড়াল। অন্ধকারে সুড়ংয়ের দেয়াল হাতড়ে ভেতরের দিকে চলতে লাগলাে সে। তার মনে পড়লাে, হেকিম তাকে বলেছে, সাথে কোন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যেও না। নিলে সে মেয়ের আত্মা তােমার সামনে আসবে না। তার সঙ্গে এখন দেড় ফুট লম্বা খঞ্জর আছে, অথচ মেয়েটি কথা বলছে, ডাকছে তাকে। সে আরাে অগ্রসর হলাে এবং সুড়ংয়ের মাঝমাঝি পৌছে গেল। সুড়ংটা প্রশস্ত। দেয়াল হাতড়ে সে এগুচ্ছে এমন সময় তার মনে হলাে, সামনে থেকে কেউ এগিয়ে আসছে। সে দেয়ালের সাথে পিঠ লাগিয়ে রুদ্ধশ্বাসে আগন্তুকের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।সুড়ংয়ের ভেতর গাঢ় অন্ধকার। নিজের হাত-পা পর্যন্ত দেখা যায় না। ফলে আগন্তুক পুরুষ না নারী তা যেমন সে দেখতে পারল না, তেমনি আগন্তুক ঠিক কতটা দূরে তাও নিশ্চিত হতে পারছিল না। সহসা তার মনে হল, কেউ তার সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে।
তাকে পেরিয়ে মেয়েটি আরাে দু’কদম এগিয়ে গিয়ে থামল। থেমেই আবার কান্না শুরু করে দিল।
এত ঘুটঘুটে অন্ধকারেও সে বুঝতে পারলাে, গতকাল যে মেয়েকে সে আলাের সামনে দেখেছিল, এই সে মেয়ে। মেহেদী আল হাসান এ শব্দ আগেও কয়েকবার শুনেছে। এখন মেয়েটি তার এত কাছে যে, হাত বাড়ালেই সে তাকে ধরতে পারবে। টেনশনে তার বুক জোরে জোরে লাফাতে লাগলাে। মেয়েটি আবার সামনে অগ্রসর হওয়ার জন্য পা বাড়াল, ঠিক সেই সময় সুড়ংয়ের মুখে আলাে জ্বলে উঠলাে। আলােটা জ্বলেই সঙ্গে সঙ্গে আবার নিভে গেল। মেহেদী আল হাসান দেয়াল থেকে আলগােছে তুলে আনল তার দেহ এবং চোখের পলকে আগন্তুকের পিছন থেকে জোরে তাকে জাপটে ধরলাে।
মেয়েটি এতে মােটেও ভীত না হয়ে বলে উঠলাে, ওরে হতভাগা, তুই কি এটাকে কৌতুক ভাবতে শুরু করেছিস?
(চলবে)
0 coment rios:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন