বৃহস্পতিবার, ২ জানুয়ারি, ২০২০

ক্রুসেড সিরিজ- ১৯. খুনী চক্রের আস্তানায়(পর্ব-4)


১৯. খুনী চক্রের আস্তানায়(পর্ব-4)
ঘুরে ফিরে কিছুই না পেয়ে মেহেদী আল হাসান মিশরের গােয়েন্দা প্রধান আলী বিন সুফিয়ানকে রিপাের্ট দিল, যত দূর দৃষ্টি যায় ঘুরে ফিরে দেখেছি। সন্দেহজনক কিছুই আমার চোখে পড়েনি। একটা বিশাল সুড়ং পেয়েছি। কিন্তু এত দিনেও সে সুড়ং পথে কোন লােককে ভেতরে যেতে আসতে দেখা যায়নি। 
আলী বিন সুফিয়ান বললাে, তুমি সারাদিন কোন গােপন জায়গায় বসে সুড়ংয়ের মুখে নজর রাখাে। ভেতরে যাওয়ার চেষ্টা করাে না। তাতে ধরা পড়া ও মারা যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।'
আলী বিন সুফিয়ান তাকে আরাে বললাে, মাঝে মাঝে উটের উপর চড়ে রাতেও সেখানে গিয়ে খোঁজ নিও। যদি কোন লােকের দেখা পাও এবং তাদের হাতে ধরা পড়ে যাও, বলবে, আমি কায়রাে যাচ্ছি। নিজেকে কৃষক হিসাবে পরিচয় দিও। 
এই নির্দেশ অনুযায়ী মেহেদী আল হাসান রাতেও সেখানে ডিউটি দিতে লাগল। এক রাতে সেখানে কারাে পদধ্বনি শুনতে পেল। এই পদধ্বনি কোন জংলী পশুর না মানুষের তা নিশ্চিত হতে পারল না মেহেদী আল হাসান। সে পদধ্বনির পিছনে তাড়া না করে কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলাে, পরে সে রাতের মত ফিরে এলাে নিজের আস্তানায় ।
পরের দিন। সূর্য উদয়ের আগেই দু'টি উট, কিছু মেষ ও ছাগল নিয়ে সেখানে চলে গেল মেহেদী আল হাসান। পশুর পাল মুক্ত মাঠে ছেড়ে দিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াতে লাগলাে সে। এক জায়গায় পৌঁছে দেখতে পেল লম্বা লম্বা ঘাস, ঝােপঝাড় ও তৃণলতা জড়াজড়ি করে আছে সেখানে। তার মাঝে জংলী ফুলের চারায় ফুটে আছে অজস্র ফুল । সেই ফুলের দিকে ঝুঁকে আছে একটি লােক। লােকটির পরণে দামী কাপড়। মুখে লম্বা দাড়ি, মাথায় দামী পাগড়িও আছে।
মেহেদী আল হাসান লােকটির দিকে এগিয়ে গেল। তার পায়ের আওয়াজ পেয়েই সম্ভবত দাড়িওয়ালা লােকটি তার দিকে মুখ তুলে তাকালাে। মেহেদী আল হাসানের সাথে চোখাচোখি হল সে লােকের। ধীরে ধীরে হেঁটে ওই দামী পােষাক পরা লােকটির কাছে গিয়ে দাড়ালাে সে। 
জোব্বা পরা লােকটির হাতে একটা থলে ছিল। থলের মধ্যে লতাপাতা রাখা। তার অন্য হাতে একটি জংলী চারার ডাল। আপনি কি খুঁজে বেড়াচ্ছেন?' মেহেদী আল হাসান বােকার মত হেসে বললো, কোন জিনিস হারিয়ে গেলে বলুন, আমিও খুঁজে দেখি? 
‘আমি কবিরাজ!' লােকটি বললাে, “জরি, বুটি খুঁজে বেড়াচ্ছি। এগুলাে দিয়ে ঔষুধ বানানাে হবে।' 
মেহেদী আল হাসান এবার লােকটির মুখের দিকে ভাল করে তাকাল। তাকিয়েই সে তাকে চিনতে পারলাে। তিনি কায়রাের প্রসিদ্ধ হেকিম। চিকিৎসক হিবে তার যথেষ্ট খ্যাতি ও নাম-ডাক আছে। 
মেহেদী আল হাসান সরল মনেই বিশ্বাস করল লােকটির উত্তর। সত্যি তাে, একজন হেকিম হিসাবে তিনি জরি বুটি অনুসন্ধান করতেই পারেন। আর জরি বুটি সংগ্রহের উত্তম স্থানও এটাই। 
হেকিম তাকে জিজ্ঞেস করলাে, তুমি এখানে কি করছাে? 
এখান থেকে একটু দূরেই থাকি আমরা। এখানে পশুর পাল নিয়ে এসেছি চরাতে ও পানি পান করাতে।' আগন্তুকের প্রশ্নের জবাব দিয়ে মেহেদী আল হাসান আবার প্রশ্ন করল, ‘এই জরি বুটি দিয়ে আপনি কি রােগের ঔষুধ বানাবেন? 
তুমি সে রােগের নাম জান না, আর বললেও বুঝবে না।' হেকিম উত্তর দিল, “কিছু কিছু রােগ এমন আছে, রুগী নিজেও টের পায় না তার কি হলাে। শুধু এক ধরনের অস্বস্তি ও অশান্তি অনুভব করে। অথচ সে এমন মারাত্মক অসুখে ভুগছে যে, সময় মত ঔষধ না পড়লে একটু পর লােকটি মারা যাবে।' 
এ হেকিম খুবই নামকরা ডাক্তার ছিল। দূর-দূরান্ত থেকে তার কাছে রুগীরা আসতাে। মেহেদী আল হাসান তাকে এখানে পেয়ে গেছে, এটা তার সৌভাগ্য। 
মানুষের একটা সহজাত দুর্বলতা এই যে, হাতের কাছে ডাক্তার পেলেই তার মনে নানা রকম অসুখের কথা উদয় হয়। ডাক্তার কাছে পেলে সে তার অসুখের কথা বলার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
মেহেদী আল হাসানেরও কিছু শারিরীক অসুবিধা ছিল। সে সেই অসুবিধার কথা হেকিমকে জানালাে। হেকিম তার হাতের পাস পরীক্ষা করলাে। পরে তার চোখের দিকে তাকিয়ে এমনভাবে চমকে উঠলাে, যেন তার চোখ কোন আশ্চর্য জিনিস দেখতে পেয়েছে। হেকিম মেহেদী আল হাসানের হাত ছেড়ে দিয়ে তাকে আপাদমস্তক ভাল করে নজর বুলিয়ে দেখলাে । হেকিমের চেহারায় আশ্চর্যের ভাব দেখে মেহেদী আল হাসানও কিছুটা অবাক হলাে। সে প্রশ্ন করলাে, “কি ব্যাপার! আপনি এমন অবাক হয়ে কি দেখছেন? 
তুমি আমার দাওয়াখানায় আসবে?' হাকিম তার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলাে। 
‘আমি খুব গরীব মানুষ! মেহেদী আল হাসান বললাে, আপনাকে টাকা দেব কোথেকে।' 
টাকার কথা পরে ভেবাে। সে নিয়ে তােমাকে দুশ্চিন্তা করতে হবে না। তুমি বরং এক্ষুণি আমার সাথে চলাে।' 
কি বলছেন আপনি! মেহেদী আল হাসান অবাক হয়ে বললাে, আমার উট চরছে, মেষ ও ছাগল চরছে। এগুলাে ফেলে আমি কোথায় যাবাে?' 
‘তােমার উট, ছাগল তুমি নিয়ে চলাে। ওগুলাে সামলে রৈখেই আমার সাথে শহরে যাবে। তােমার কাছ থেকে আমি কোন টাকা নেব না। আমাকে ধনী লােকেরা অনেক টাকা পয়সা দিয়ে যায়। গরীবদের চিকিৎসা আমি বিনা পয়সায় করে থাকি। তােমার অসুখ তাে এখন সাধারণ পর্যায়ে আছে, হঠাৎ বেড়ে  যেতে পারে। তােমার রােগ নিয়ে আমার অন্য রকম সন্দেহ আছে। 
মেহেদী আল হাসান তখন ডিউটিতে ছিল। এই সামান্য অসুখের জন্য ডিউটি ত্যাগ করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। সে হেকিমকে বললাে, আমার অসুখ কি খুব খারাপ? ঠিক আছে, আপনি যখন বলছেন, সন্ধ্যার পর আমি আপনার দাওয়াখানায় পৌঁছে যাবে। আপনি দয়া করে আপনার ঠিকানা ও রাস্তা বলে দিয়ে যান, কোথায় যেতে হবে।' 
যদিও মেহেদী আল হাসান হেকিম সাহেবের ঠিকানা ভাল করেই জানতাে, তবু সে এমন একটা ভাব করলাে, যেন সে ওই ঠিকানা সম্পর্কে কিছুই জানে না। হেকিম সাহেব তাকে ঠিকানা ও সেখানে পৌঁছার রাস্তা ভাল করে বুঝিয়ে বললেন। মেহেদী আল হাসান বললাে, সন্ধ্যার পর পরই আমি আপনার ঠিকানায় পৌঁছে যাবাে ইনশাআল্লাহ।
মেহেদী আল হাসান সন্ধ্যার পর ঠিক সেই রাখালের পােষাকেই হেকিমের দাওয়াখানায় গিয়ে পৌঁছলাে। সে তার উট সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিল, যাতে হেকিমের মনে কোন - রকম সন্দেহ না জাগে। সে জানতাে, হেকিমরা ঔষুধের গাছগাছড়া খুঁজে বেড়ায় এবং তাদের ঔষধে রােগ-ব্যাধি ভালও হয়। তার যেটাকে সাধারণ রােগ বলে মনে হচ্ছে সেটা কোন ভয়াবহ রােগও হতে পারে। হেকিম সাহেব যখন এটাকে গুরুতর মনে করছেন তখন তাকে হালকাভাবে দেখা ঠিক নয়। 
সে হেকিম সাহেবকে সালাম দিলে হেকিম সাহেব খুব উৎফুল্ল কণ্ঠে বললেন, তাহলে তুমি এসে পড়েছে? ঠিক আছে, বসাে। 
হেকিম সাহেব তাকে খুব ভাল করে দেখলেন। তার নাড়ী পরীক্ষা করলেন, চোখ দেখলেন, জিহবা দেখলেন, বলেন, “ঠিক আছে, আমি তােমাকে ঔষুধ দিয়ে দিচ্ছি। যদি এতে উপশম না হয় তবে অন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। তিন দিন পর তুমি আবার আমার সাথে সাক্ষাৎ করবে। যদি দেখি এ ঔষধে কাজ হয়নি, তখন বুঝবাে, আমি যা সন্দেহ করেছি তাই ঠিক। তখন অন্য ঔষধ দিতে হবে।' মেহেদী আল হাসান কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলাে, ‘আপনি কি সন্দেহ করছেন?' 
‘আল্লাহ না করুন, আমার সন্দেহটা যেন সত্য না হয়।' হেকিম সাহেব বললেন, তুমি একে তাে খুব সুন্দর যুবক, তাতে ওই বিরাণ মরুভূমিতে ঘুরে বেড়াও। যে স্থানে তােমার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল, সে জায়গাটা ভাল নয়। সেখানে প্রেতাত্মারা বসবাস করে। এই প্রেতাত্মাদের মধ্যে ফেরাউন যুগের সেরা সুন্দরী মেয়েদের আত্মাও রয়েছে। তাদেরকে ফেরাউন জোরপূর্বক তার কাছে রেখেছিলেন আমােদ-ফূর্তির জন্য। শেষে তাদেরকে সেখানেই হত্যা করা হয়, যাতে তারা অন্য কারাে হাতে না পড়ে। মানুষের আত্মা কখনাে বৃদ্ধ হয় না, সব সময় যৌবন অবস্থায় থাকে। যেসব সুন্দরী মেয়েদের হত্যা করা হয়েছিল তাদের আত্মা এই সবুজ বিয়াবানে বিভ্রান্তের মত ঘুরে বেড়ায়। 
আমার সন্দেহ হচ্ছে, ফেরাউন যুগের মেয়েদের খপ্পরে তুমি পড়ে গেলে কিনা। তােমার মত সুন্দর যুবককে দেখতে পেলে ওরা সহজেই তােমাকে ভালবেসে ফেলবে। তুমি একাকী সেই মরু বিয়াবানে চলাফেরা করে। সেই সুন্দরী মেয়েদের তাত্মাগুলাের সাথে তােমার আত্মার যােগাযােগ হয়ে গেলে তুমি আর তাদের খপ্পর থেকে বেরােতে পারবে না।' 
‘ওরা আমার কোন ক্ষতি তাে করবে না?' মেহেদী আল হাসান হেকিমের কথায় প্রভাবিত হয়ে বললাে, ‘প্রেতাত্মার ভালবাসা পাওয়া তাে কোন ভাল কথা নয়। আপনি কি ঐ প্রেতাত্মার কবল থেকে আমাকে মুক্ত করতে পারবেন?' 
‘আমার ধারণা ভুলও হতে পারে, আগে ঔষুধপত্র দিয়ে দেখি।' হেকিম বললেন, যদি উপশম না হয়, তবে প্রেতাত্মার নজর দূর করতে অন্য ব্যবস্থা নেবাে। আমার কাছে তারও চিকিৎসা আছে। দোয়া তাবিজ দেব, কিছু আমলও বাতলে দেবাে। যদি প্রয়ােজন পড়ে, তবে সে আত্মাকে এখানে হাজির করে তােমাকে ছেড়ে যেতে বলবাে। প্রেতাত্মার কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য যা যা করণীয় সব করবাে আমি। ভয় নেই, প্রেতাত্মারা তােমার কোন ক্ষতি করবে না।' 
মেহেদী আল হাসান ছিল হুশিয়ার গােয়েন্দা । কিন্তু সে আলেম ছিল না। জাতির প্রতিটি ব্যক্তির মত সেও জ্বীন, ভূত ও প্রেতাত্মার অস্তিত্বে বিশ্বাসী ছিল । সে জ্বীন পরীদের নিয়ে যত গল্প কাহিনী শুনেছে, সেগুলােকে সত্য বলেই মনে হয়েছে তার । তাই সেগুলাে সে বিশ্বাসও করেছে।
হেকিম সাহেবের প্রতিটি কথা ও শব্দ তার মনে দৃঢ় হয়ে বসে গেল। তার মনের ওপর প্রেতাত্মার ভয় আরও বেশী করে চেপে বসলাে। সে হেকিমের কাছে গােয়েন্দাগিরী করতে নয়, বরং চিকিৎসার জন্যই গিয়েছিল । হেকিম তাকে সান্ত্বনা দিয়েছিল, ভয় নেই যুবক। প্রেতাত্মারা তােমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। তুমি কোন চিন্তা করাে না। তেমন কিছু হলে আমি তারও চিকিৎসা করবাে।' 
কিন্তু হেকিম সাহেব যত আশ্বাসই দিক না কেন, তার দুশ্চিন্তা এতে আরাে বেড়ে গেল। হেকিম তাকে ঔষুধের একটি মাত্র পুরিয়া দিয়েছিল, আর বলেছিল, রাতে শােয়ার আগে খেয়ে শুয়ে পড়বে। 
সে শােয়ার আগে ঔষধ খেয়ে নিল। সঙ্গে সঙ্গে তার ঘুম এসে গেল। এর আগে তার কোন দিন এত জলদি ঘুম আসেনি। সুকালে যখন চোখ খুললাে, তখন সে অনুভব করলাে, তার শরীর অসম্ভব রকম দুর্বল ।
সে সেই দুর্বল শরীর নিয়েই আলী বিন সুফিয়ানের কাছে। গেল । কিন্তু তাঁকে হেকিমের পাহাড়ী এলাকা থেকে গাছগাছড়া বা জরি বুটি সংগ্রহের কথা কিছুই বলল না। তার কাছে এটা বলার মত কোন কথা নয়, কেননা হেকিম সাহেব কোন সন্দেহজনক ব্যক্তি নন। তিনি কায়রাের এক প্রসিদ্ধ হেকিম। সামরিক ও প্রশাসন বিভাগের বড় বড় অফিসাররা তার রােগী। তার সম্পর্কে এ কথাও প্রসিদ্ধ ছিল যে, তিনি দোয়া-তাবিজ দিয়ে জ্বীন-পরী বশে রাখেন। 
আলী বিন সুফিয়ান মেহেদী আল হাসানকে বললেন, 'তুমি রাতের বেলা এই বিজন প্রান্তরে ঘুরতে গিয়ে সে মােটেও ভয় পেতাে না। কিন্তু হেকিমের কাছ থেকে জ্বীন-পরীর কাহিনী শােনার পর থেকে তার ইদানিং কেমন যেন একটু ভয় ভয় করছে। হেকিম যদিও তাকে আশ্বাস দিয়ে বলেছে, প্রেতাত্মারা তার কোন ক্ষতি করবে না, তবু প্রেতাত্মার কথা মনে হলেই ভয়ের একটা শিহরণ পায়ের পাতা থেকে মাথায় লাফিয়ে ওঠে। সে যদিও ভীতু স্বভাবের লােক নয়, তবুও এই অদেখা রহস্যময় সৃষ্টি তার মনে কেমন যেন কাঁপন জাগায়। রাতে পথ চলতে গেলেই তার মনে হয়, তার আশেপাশে যেন প্রেতাত্মারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। একদিকে ডিউটির তাগিদ অন্য দিকে হেকিমের আশ্বাসের কারণে সে নিজের মনকে অবােধ দিচ্ছিল, ভয়ের কিছু নেই। এখানে কোন জ্বীন-পরী নেই। আর থাকলেও হেকিম তাে বলেই দিয়েছে, তারা আমার কোন ক্ষতি করবে না।' 
এভাবে সে নিজেকে প্রবােধ দিচ্ছিল আর সেই সাহসে ভর। করে রাতেও পাহাড় প্রান্তরে ঘুরে ঘুরে ডিউটি দিচ্ছিল। এই ডিউটিরত অবস্থায় হঠাৎ তার মনে হলাে, তার অবস্থা আগের চেয়ে বেশী শােচনীয়। তার মধ্যে হঠাৎ করেই অস্থিরতা দেখা দিল এবং তার মনে হতে লাগল, তার রােগটি যেন অস্বাভাবিক রকম বেড়ে গেছে। 
তার অন্তরে হঠাৎ করেই ভয়ের কাঁপন শুরু হয়ে গেল এবং রাত যত বাড়তে লাগল ততই ভয়ও বেড়ে চললাে তার। সে নিজেকে সামলে নেয়ার অনেক চেষ্টা করলাে, কিন্তু তার মনে ভয় বেড়েই চললাে। সে হেকিমকে তার যে কষ্টের কথা 
বলেছিল সেই কষ্ট যেন আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেল। 
তার ইচ্ছা করছিল সে ছুটে হেকিমের কাছে চলে যায়। কিন্তু তার দায়িত্ববােধ তাকে ডিউটি ফেলে কোথাও যেতে নিষেধ করলাে। এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার সাধ্য তার ছিল না, তাই সে ওই স্থান ত্যাগ করতে পারল না। সে তার কষ্ট ও অসুবিধা সহ্য করেই ডিউটি অব্যাহত রাখল। অনেকক্ষণ পর ধীরে ধীরে তার এই অবস্থা কেটে যেতে লাগল এবং এক সময় সে আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে এল । তার মন আবার ভয়শূন্য হয়ে গেল, যেমন ঔষুধ খাওয়ার আগে ছিল, ঠিক সে অবস্থায় ফিরে এল মেহেদী আল হাসান। তার মনে হলাে, এতক্ষণ সে একটি ঘােরের মধ্যে কাটিয়েছে। হয়তাে এই ঘাের লাগাকেই বলে প্রেতাত্মার প্রভাব ।
রাত শেষ হয়ে এল। সে ফিরে এল তার ডেরায়। সামান্য একটু ঘুমিয়ে নিয়ে সে ছুটলাে হেকিমের কাছে। রাতে তার যে অবস্থা হয়েছিল সব তাকে খুলে বলল। হেকিম তাকে বলল, “এতক্ষণে নিশ্চিত হওয়া গেল, সত্যি তােমার ওপর প্রেতাত্মারা ভর করেছে। তুমি এখন চলে যাও, সন্ধ্যায় এসে ঔষধ নিয়ে যেও।
সে আবার উট, মেষ ও বকরীর পাল গুছিয়ে সেই প্রান্তরে গেল। সারাদিন সেখানে কাটিয়ে সন্ধ্যায় ফিরে এল বাড়ীতে। তারপর এক উটের পিঠে সওয়ার হয়ে চলে এল শহরে, হেকিমের কাছে। হেকিম তাকে আরও একদিন ঔষধ খেতে বললেন। তিনি তাকে ঔষুধ দিয়ে বিদায় দিলেন। মেহেদী আল হাসান রাতে শােয়ার আগে ঔষধটুকু খেয়ে নিল । গত রাতের মত তার শীঘ্রই গভীর ঘুম এসে গেল। কিন্তু সকালে ঘুম থেকে জেগে দেখল, তার সব ক্লান্তি ও অবসাদ দূর হয়ে গেছে। সে শরীরে নতুন কর্মস্পৃহা ও সতেজতা অনুভব করল । প্রফুল্ল চিত্তে সে প্রতিদিনের মত আলী বিন সুফিয়ানের কাছে গেল, রুটিন রিপাের্ট সেরে সে চলে গেল ডিউটিতে। 
প্রফুল্ল মনে সে সেই পাহাড়ী বিজন প্রান্তরে একাকী ঘুরে বেড়াতে লাগল। দুপুর পর্যন্ত ভালই কাটল তার, কিন্তু দুপুরের পর থেকে তার মনে প্রেতাত্মার চিন্তা চেপে বসল। তার শরীরের স্ফুর্তি ও শক্তি কমতে লাগলাে । সন্ধ্যায় ক্লান্তি ও অবসাদের শেষ সীমানায় পৌঁছে গেল সে। বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিবর্তে তার মনে এসে বাসা বাঁধল ভয় ও শংকা। উদাসিনতায় ছেয়ে গেল তার হৃদয়-মন। সে এই হতাশা দূর করার জন্য এটা-সেটা ভাবার চেষ্টা করল। ক্লান্তি দূর করার জন্য পায়চারী করতে লাগল। এভাবে চেষ্টা করতে করতে এক সময় মনের ভাব স্বাভাবিক হয়ে গেল। 
ততক্ষণে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমে এসেছে। আকাশে চাঁদ নেই। অন্ধকার ঘন হয়ে এসেছে। বাড়ী ফেরার তাড়া অনুভব করল মেহেদী আল হাসান। পশুগুলােকে জড়াে করে বাড়ীর পথ ধরতে যাবে, সহসা তার কানে ভেসে এলাে দূরে কারাে কান্নার স্বর। থমকে দাঁড়াল হাসান। কান পাতল কান্নার দিকে। পাহাড়ের দিক থেকে ভেসে আসছে কান্না। কোন মেয়ে গভীর বেদনায় ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদছে। 
দীর্ঘক্ষণ এ কান্নার ধ্বনি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে শুনল হাসান। কান্নার শব্দ কমতে কমতে এক সময় একেবারে থেমে গেল। মেহেদী আল হাসান যেখানে ছিল, সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলাে। ভাবলাে, এটা কোন প্রেতাত্মার কান্না, যে প্রেতাত্মার কথা হেকিম সাহেব বলেছেন। মেহেদী আল হাসানের মন আবার হঠাৎ অজানা ভয়ে সংকোচিত হয়ে পড়ল। কিন্তু সে ভয়-ভীতি তাড়িয়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে আনতে চেষ্টা করল। 
একবার তার মনে হলাে, আচ্ছা! এই প্রেতাত্মার সাথে কথা বললে কেমন হয়? সে ভাবল, যদি এই কান্না অন্য কোন সময় এবং স্বাভাবিক পরিবেশে হতাে তাহলে আমি কি করতাম? নিশ্চয়ই কোন মেয়ের কান্না শােনার সাথে সাথে দৌড়ে তার সাহায্যের জন্য এগিয়ে যেতাম। কিন্তু এখানে কারাে সাহায্যে এগিয়ে যাওয়ার কোন প্রশ্নই আসে না। কারণ এই নির্জন পাহাড়ী অঞ্চলে কোন জীবন্ত মেয়ে এসে এভাবে কাঁদবে, এটা সম্ভব নয়। নিশ্চয়ই এটা ফেরাউনের যুগের কোন অশরীরি প্রেতাত্মার কান্নার ধ্বনি। 
রাত একটু বেশী হওয়ার পরও সে গত দিনের মত হেকিমের কাছে গেল এবং তার কাছে নিজের অবস্থা সবিস্তারে বর্ণনা করল। তার অবস্থা ও কান্নার কথা শুনে হেকিম যেন গভীর চিন্তায় পড়ে গেল। কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে রইল। পরে মাথা তুলে বললাে, এটা প্রেতাত্মারই কান্না। তবে ভয় পাবার কোন কারণ নেই। আমি এক্ষুণি একটি তাবিজ দিচ্ছি। এটা সাথে রাখলে সে তােমার কোন অনিষ্ট করতে পারবে না। রাতে আমি প্রেতাত্মাকে ডেকে পাঠাব। ওর কাছে জানতে চাইব, সে তােমার কাছে কি চায়? তার জওয়াবের ওপর ভিত্তি করে আমি পরবর্তী পদক্ষেপ নেবাে। কিন্তু তােমাকে একটি কথা বলে রাখি, তােমাকে ভয় করলে চলবে না। এই প্রেতাত্মা তােমাকে ভালবেসে ফেলেছে, তাই সে তােমার কোন ক্ষতি করবে না। কিন্তু তুমি যদি প্রেতাত্মা থেকে পালানাের চেষ্টা করাে, তবে তােমার ক্ষতির সম্ভাবনা আছে। 

হেকিম তাকে একটি তাবিজ দিল। সে ওই তাবিজ তার বাম হাতের বাহুতে সযত্নে বেঁধে নিল। ‘আমি রাতে তােমার জন্য আমল করবাে।' হেকিম বললাে, আগামী কাল সকালে তুমি আবার এখানে এসাে। তখন তােমাকে বলে দেব, প্রেতাত্মা তােমার কাছে কি চায়? যে প্রেতাত্মা তােমার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে, সে শয়তান নয়। সে তােমার অনিষ্ট চাইলে গত রাতেই তােমার ক্ষতি করতে পারতাে। তবুও আমি চেষ্টা করবাে যেন তুমি এর প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে যাও।' 
হেকিমের কথায় মেহেদী আল হাসান মনে মনে দারুণ ভয় পেল। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সীমাহীন দুশ্চিন্তা নিয়ে সে রাতের অন্ধকারে বাইরে পা রাখল। তার চোখের সামনে নাচতে লাগল একশ একটা ভয়াল আজদাহা। ভীতি ও আশংকার দোদুল্যমানতায় দুলতে লাগল তার হৃদয়।
পরের দিন মেহেদী আল হাসান আলী বিন সুফিয়ানের কাছ থেকে কিছু নির্দেশ পেল। সে তড়িঘড়ি করে হেকিমের নিকট গেল । হেকিম তার অপেক্ষাতেই বসেছিলেন। তিনি তাকে দেখেই দাঁড়িয়ে গেলেন ও তাকে ভিতরে নিয়ে গেলেন। সে তােমার সাথে একবার দেখা করতে চায়।' হেকিম তাকে বললেন, “সে তােমার সামনে আসবে, তােমার আসল রূপ দেখবে। তুমিও তাকে দেখতে পাবে। হয়ত সে প্রথম সাক্ষাতে তােমার সামনে এসে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। সে তাে অন্য জগতের সৃষ্টি। সে এই জগতের লােকের সাথে দেখা করতে ইতস্তত করতে পারে। যদি সে এমন ব্যবহার করে তবে তুমি পরের দিন সেখানে যাবে।' 
“সে কোথায়?' মেহেদী জিজ্ঞেস করলাে। 
‘সেখানেই, যেখানে তুমি প্রতিদিন যাতায়াত করাে।' হেকিম বললেন, যেখানে তুমি আমাকে প্রথম দেখেছিলে, তুমি আজ রাতে সেখানে যাবে। 
‘আপনিও কি আমার সাথে থাকবেন? 
না!' হেকিম উত্তরে বললেন, “সে আত্মা শুধু তার সাথেই দেখা দেয়, যাকে সে ভালবাসে। যদি কোন প্রেতাত্মার নজরে কোন মানুষ পড়ে যায়, সেই মানুষকে সে হত্যা করে। মে প্রেতাত্মা তােমার সাথে দেখা করতে চায়, সে খুবই ভাল মনের অধিকারী। তার কান্না শুনলেই তুমি বুঝতে পারবে, সে এক মজলুম মেয়ের কান্না। সে ভালবাসার কাঙাল। আমি যখন তাকে রাতে হাজির করলাম, সে শুধু অঝােরে কাঁদলাে । আমাকে বিনয়ের সাথে বললাে, ঐ যুবককে কিছুক্ষণের জন্য আমার কাছে পাঠিয়ে দিন, আমি চিরদিনের জন্য বিদায় হয়ে যাবাে।'

এই কথা যদি অন্য কেউ বলতাে, তবে মেহেদী আল হাসান এতটা প্রভাবিত হতাে না। কিন্তু শহরের নামকরা হেকিম ও কবিরাজের কথা সে অবিশ্বাস করে কি করে! সবাই জানে, তিনি জ্বীন-ভুত বশীভুত করতে পারেন। নিশ্চয়ই তিনি যা বলছেন তা সত্য। সেই মেয়ের কান্না আমি শুনেছি, হেকিম তাে শুনেননি! তাহলে তিনি কি করে জানলেন, এ এক মজলুম মেয়ের কান্না! নিশ্চয়ই তিনি কাল রাতে সেই মেয়েকে ডাকিয়ে ছিলেন। 
এই হেকিম যেমন বড় চিকিৎসক তেমনি মশহুর আলম। তার বলার ভঙ্গী এমন চমৎকার যে, লােকেরা তার কথা মুগ্ধ হয়ে শোনে এবং বিশ্বাসও করে। মেহেদী আল হাসানও হেকিমের সব কথা বিশ্বাস করল। হেকিম তাকে আরাে বলল, রাতে ঐ প্রেতাত্মার সাথে সাক্ষাৎ করার মধ্যে ভয়ের কিছু নেই। বরং এতে ক্ষতির পরিবর্তে তােমার লাভের সম্ভাবনাই বেশী। 
‘আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না। নিশ্চয়ই আমি তার সাথে দেখা করবাে। রাতে যথা সময়ে আমি সেখানে চলে যাবাে। আপনি আমার জন্য দোয়া করবেন।' বলল মেহেদী আল হাসান। 
হ্যাঁ, অবশ্যই আমি তােমার মঙ্গলের জন্য দোয়া করবাে । তবে একটা ব্যাপারে তােমাকে সাবধান করা দরকার মনে করছি।' 
‘কি?’ ব্যাকুল হয়ে প্রশ্ন করল মেহেদী আল হাসান। 
কারাে সাথে এই প্রেতাত্মার সাক্ষাতের বিষয় নিয়ে আলোচনা করবে না। যদি তুমি এই গােপন বিষয় ফাঁস করে দাও, তবে তােমার ক্ষতির সম্ভাবনা আছে। তুমি মাটির মানুষকে ধোঁকা দিতে পারাে। কিন্তু অদৃশ্যলােকের কোন আত্মার গােপন কথা যদি ফাঁস করে দাও তবে আমি বলতে পারি না, তােমার শরীরের কোন দুটি অঙ্গ চিরদিনের জন্য অকেজো হয়ে যাবে। দুটি পা অবশ হয়ে যেতে পারে অথবা দুটি হাত কিংবা দুটি চোখ থেকে চিরদিনের জন্য বঞ্চিত হয়ে যাবে তুমি। 
মেহেদী আল হাসান ভয়ে একেবারে সংকুচিত হয়ে গেল। বলল, 'না, এ কথা আমি কাউকে বলব না। আমি চিরদিনের জন্য পঙ্গু হতে চাই না।' 
মানুষের এই এক দোষ। সে তার মনের মধ্যে কথা গােপন রাখতে পারে না। যদি পারতাে তবে অহেতুক বিপদে জড়িয়ে পড়তে হতাে না তাকে। তােমাকে তাহলে একটা গােপন তথ্য বলেই ফেলি। হয়তাে এর থেকে তুমি শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে। এখানে দু’জন সামরিক অফিসার রাতের বেলায় অজ্ঞাতে মারা গেছে, শুনেছাে নিশ্চয়ই। কেউ বলতে পারে না, তারা কেমন করে মারা গেছে। কাল রাতে যে প্রেতাত্মা এসেছিল সে আমাকে বলেছে, তাদের দুজনকে নাকি প্রেতাত্মারাই হত্যা করেছে। কারণ তারা নাকি প্রেতাত্মাদের গােপন ভেদ খুলে দিতে চেয়েছিল। এবার বুঝ অবস্থা! 
‘সেটা কেমন করে? অদৃশ্য জগতের খবর অফিসাররা জানবে কেমন করে?' মেহেদী আল হাসান মুর্খ রাখালের মতই প্রশ্ন করে বসলাে ।
কিন্তু সামরিক অফিসারদের প্রসঙ্গ আসার সাথে সাথেই মেহেদী আল হাসান সতর্ক হয়ে গিয়েছিল । এতক্ষণের সরলতা ও ভক্তি-বিশ্বাসের জায়গায় এসে আসন নিয়েছিল বিচক্ষণ গােয়েন্দার প্রজ্ঞা। সে এই তথ্যের জন্যই তাে এতদিন ধরে পাহাড় অরণ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। হেকিমের এ কথায় মুহূর্তে সে একজন রােগী থেকে গােয়েন্দায় পরিণত হয়ে গেল। বুঝতে পারল, সে আসল জায়গাতেই এসেছে। দুই কমাণ্ডারের মৃত্যুর গােপন তথ্য উদ্ধারের জন্য সে হেকিমের কাছে প্রশ্নবাণ ছুঁড়ে মারতে শুরু করল। 
‘আমি এ গােপন রহস্য কাউকে বলতে পারি না।' হেকিম বললাে, “যেটুকু বলার ছিল তাই বললাম। তুমি কিন্তু সম্পূর্ণ নীরব থাকবে। তুমি এই গােপন তথ্য কাউকে বলবে না। “জ্বী না, বলব না। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, আমি কাউকে বলব না বলার পরও কেন আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। আমার কি প্রাণের মায়া নেই? 
দেখাে, তােমাকে সতর্ক করার জন্যই এত কথা বললাম আমি। জ্বীন-ভুত বশীভূত করা বড় ভয়ংকর কাজ। এদের সাথে গড়বড় করলে ওরা কাউকে ছাড়ে না। তােমাকে যে এত করে সতর্ক করছি, তা কেবল তােমার স্বার্থে নয়, এর পিছনে আমার নিজেরও স্বার্থ রয়েছে। কারণ আমি এই সব প্রেতাত্মার ইচ্ছা ও অনিচ্ছার সাথে জড়িয়ে পড়েছি। যদি আমি তাদের অসন্তুষ্ট করি, তবে আমার এ বিদ্যা অকেজো হয়ে যাবে। প্রেতাত্মারা আমাকেও সেই শাস্তি দিবে, যেমন শাস্তি দেয় তারা নিজ শত্রুকে। তুমি কোন ভুল বা বেয়াদবী করলে সেই রাগে ওরা যদি তােমার সাথে আমাকেও শাস্তিযােগ্য ভাবে, তবে এমন কোন আদালত নেই যেখানে গিয়ে আমি সুবিচার প্রার্থনা করতে পারবাে। তাই আমি চাই তুমি সহিসালামতে তাদের ইচ্ছা পূর্ণ করে নিজে বাঁচো এবং আমাকেও বিপদের হাত থেকে রক্ষা করাে।' ‘ওদের ইচ্ছাটা কি?' 
‘যে আত্মা তােমার জন্য কেঁদেছে, সে আমাকে বলেছে, নির্জনে কিছুক্ষণের জন্য সে তােমার সাক্ষাৎ চায়। আমি যদি তার ইচ্ছা পূরণ করি তবে সেও আমার আশা পূরণ করবে।' যদি আমি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ না করি, তবে কি হবে?” 

‘সে প্রেতাত্মা তােমার আত্মার উপরে ছায়া হয়ে বিস্তার করবে।' হেকিম উত্তর দিল, তুমি আমাকে যে অসুবিধার কথা বলেছ, তা কোন শারীরিক অসুবিধা নয়। এটা রূহানী বা আধ্যাত্মিক সমস্যা। সে তােমার উপর এখনও পূর্ণভাবে প্রভাব বিস্তার করেনি। কারণ তুমি অতিশয় ভাল লােক। যদি তুমি ভালাে লােক হও, তবে তােমার ভালাের পরিণাম ফল তােমারই কাজে আসবে। তুমি আমার কাছে সেই অসুবিধার কথা বলেছ, আল্লাহ জাল্লে শানুহু যার উপরে রহমত বর্ষণ করতে চান, তার জন্য আল্লাহ কোন লােককে মাধ্যম বা অছিলা বানিয়ে নেন। এই কেরামতি আল্লাহর নিজস্ব ব্যাপার । তাই তুমি আমাকে সেখানে দেখতে পেয়েছিলে এবং আমরা পরস্পর পরিচিত হলাম। এই কল্যাণকর কাজে ভয় পেও না । যদি তুমি এই প্রেতাত্মার সঙ্গে সাক্ষাৎ করাে, তবে সে তােমাকে এই দুনিয়াতে অনেক উপকার করবে। একটা উপকার এটাও হতে পারে যে, সে কোন সুন্দরী মেয়ের রূপ ধরে সশরীরে জীবন্ত মানুষের মত তুমি যখন চাইবে তােমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। তখন তুমি তাকে নিয়ে স্ত্রীর মত সংসার জীবন-যাপন করতে পারবে। যদি সে তােমার উপর আরও বেশী সদয় হয়, তবে বিশ্বাস করাে, ফেরাউনের কবর থেকে গুপ্তধন এনে দেবে। অথবা এমনও হতে পারে, তুমি সেই গুপ্তধন নিয়ে মিশর থেকে দূরে কোথাও চলে যাবে। সেখানে বাদশাহর মত মহল বানিয়ে শান্তিময় জীবন কাটাবে। 
কবে তার সাক্ষাৎ পাবাে?' মেহেদী উদগ্রীব কণ্ঠে জানতে চাইল।' 
আজ রাতেই। মধ্য রাতের একটু আগে বা পরে তাকে তুমি সেখানে পাবে! হেকিম বললেন। 
হেকিম তার গলায় আরও একটি তাবিজ বেঁধে দিলেন এবং মাথা ও শরীরে হাত বুলিয়ে ঝাড়ফুঁক করলেন। 
মেহেদী আল হাসান অপূর্ব অনুভূতি নিয়ে সেখান থেকে উঠলাে। তারপর প্রতিদিনের মত ডিউটিতে চলে গেল সে। বিকেল পর্যন্ত সেখানেই কাটিয়ে দিল। কিন্তু সূর্য অস্ত যাওয়ার বেশ আগেই সে তার ঠিকানায় ফিরে এল।
রাত গভীর হলাে। মেহেদী আল হাসান মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে পৌছে গেল সেই কাংখিত জায়গায়। কিন্তু এখন সে ডিউটিতে আসেনি, এসেছে তার স্বপ্নের নারী আত্মার সাথে দেখা করতে। 
অন্ধকার রাত। চারদিকে সুনসান নির্জনতা! জঙ্গলের পাশে
(চলবে)

শেয়ার করুন

Author:

আমি সজীব হোসাইন -এই ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা পাশাপাশি লেখালেখির কাজটাও করি। অনলাইনে প্রযুক্তির বিষয় নিয়ে যা জানি তা মানুষের মাঝে শেয়ার করার ইচ্ছায় এ ব্লগ টি তৈরি করা।