বৃহস্পতিবার, ২ জানুয়ারি, ২০২০

ক্রুসেড সিরিজ- ১৯. খুনী চক্রের আস্তানায়(পর্ব-3)


১৯. খুনী চক্রের আস্তানায়(পর্ব-3)



‘সেই ধরনের অবস্থা বলতে তুমি কি বুঝাতে চাচ্ছাে? আইয়ুবী কি স্বেচ্ছায় তােমার তলােয়ারের নিচে এসে মাথা পেতে দেবে?'

না, তা দেবেন কেন? তবে যেমন সুযােগ সৃষ্টি হয়েছিল নূরুদ্দিন জঙ্গীর সময়, তেমন সুযােগ না পাওয়া পর্যন্ত তাকে ঘায়েল করা সম্ভব নয়।' শেখ মান্নান বললাে, নূরুদ্দিন জঙ্গী ভুমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় এমন বেকারার হয়ে দৌড়ঝাঁপ করতেন, অন্য কোন দিকেই তার খেয়াল ছিল না। তার নাওয়া-খাওয়ার কোন সময় ছিল না। কে তার রান্না করছে, কে খাওয়াচ্ছে, এসব দিকে নজর দেয়ার সময়ও ছিল না তার। এই সুযােগটাই গ্রহণ করেছিল আমার খুনীরা। তারা এমন বিষ খাদ্যের মধ্যে মিশ্রিত করে দিয়েছিল, যাতে তাঁর গলার ভেতর ক্ষত হয়ে যায় এবং গলা ফুলে যায়। সেই খাবার গ্রহণের পর তিনি শয্যাশায়ী হতে বাধ্য হন । চিকিৎসকরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার রােগের কারণ খুঁজে বের করতে পারেনি। তিনি তিন-চারদিন বিছানায় শুয়ে ছটফট করে কাটান। পঞ্চম দিন অত্যধিক গলা ফোলার কারণে তাঁর নি:শ্বাস বন্ধ হয়ে যায় এবং তিনি মারা যান। তাঁর ব্যক্তিগত হাকীম মৃত্যুর পর যে ডাক্তারী রিপাের্ট লেখেন তাতে তিনি উল্লেখ করেছেন, নূরুদ্দিন জঙ্গী ‘গলা ফোলা রােগে মারা গেছেন। কিন্তু সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর অবস্থা ভিন্ন। তার বিশ্বস্ত ও নির্ধারিত বাবুর্চি ছাড়া অন্য কেউ তার খাদ্য দ্রব্যের কাছেও যেতে পারে না।'
তুমি কি সে বাবুর্চিকে কিনতে পারাে না?' এক কমাণ্ডার প্রশ্ন করল।
‘এ প্রশ্নের উত্তর আমার চেয়ে আমাদের বন্ধু হরমন ভাল দিতে পারবেন। শেখ মান্নান হরমনের দিকে তাকিয়ে হাসলাে ।
হরমন। গােয়েন্দা জগতের এক অমূল্য প্রতিভা। ব্যক্তিগতভাবে তিনি জার্মানীর নাগরিক হলেও সমগ্র খৃস্ট জগতে রয়েছে তার অবাধ যাতায়াত। আলী বিন সুফিয়ানের মতই গােয়েন্দাগিরীতে লােকটি অসামান্য দক্ষ। তার চোখের অনুসন্ধানী দৃষ্টি মানুষের বুকের হাড় অতিক্রম করে ভেতরে ঢুকে যায় । চরিত্র হনন ও ধ্বংসাত্মক কাজে তিনি সমান পারদর্শী।
অতীতে মিশরে সুলতান আইয়ুরীর বিরুদ্ধে যে কয়টি ষড়যন্ত্র কিছুটা কার্যকর হয়েছিল তার পরিকল্পনা তিনিই করেছিলেন। সুলতান আইয়ুবীর কয়েকজন উচ্চপদস্থ অফিসারকে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে সমর্থ হয়েছিলেন। অথচ তারা আইয়ুবীর খুবই বিশ্বস্ত ছিল। তিনি মুসলমান আমীর ও অফিসারদের মনস্তাত্বিক দিক ভাল বুঝতেন। তাকে কাজে লাগানাের কৌশলও ভাল জানতেন তিনি। খৃস্টান রাজা ফিলিপ অগাস্টাস তাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। লােকটির মেধা ও যােগ্যতা, এমন ইর্ষণীয় ছিল যে, তিনি সুদান, মিশর ও আরবের সব এলাকার স্থানীয় ভাষা হুবহু সেই ভাবেই উচ্চারণ করতে পারতেন ! ফলে যে অঞ্চলে তিনি যেতেন, লােকেরা তাকে সে অঞ্চলেরই একজন মনে করতাে। ‘শেখ মান্নান ঠিকই বলেছে।' হরমন বললাে, এর উত্তর আমারই দেয়া উচিত। সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর বাবুর্চিকে কেন কেনা যায় না তা আমার চাইতে কেউ বেশী জানে না। ব্যাপারটি যদি শুধু সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর হতাে, তবে তিনি বিষ পান করে কবেই মারা যেতেন। কারণ তিনি তার নিজের নিরাপত্তা সম্পর্কে কখনাে চিন্তা করেন না। তার খাবার কেউ পরীক্ষা করলাে কি না, এ খবর তিনি কোনদিনই নেননি। | তিনি তার জীবন ও প্রাণ আল্লাহর হেফাজতে ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, আল্লাহ তাঁর মৃত্যু যে দিন লিখে রেখেছেন সে দিনই হবে।
তার দেহরক্ষী দলের কমাণ্ডার, ইন্টেলিজেন্সের এক দায়িত্বশীল অফিসার এবং আলী বিন সুফিয়ানের নিয়ােজিত আরাে এক ব্যক্তি তার খাবার পরীক্ষা করে ভাল ভাবে দেখেশুনে তবে তাঁর সামনে পরিবেশন করে। কখনও কখনও সুলতানের ব্যক্তিগত ডাক্তারও এসে তাঁর খাবার চেক করে যায়।"
এতসব কড়া তত্ত্বাবধান ছাড়া আরও একটি অসুবিধা হলে, তার বাবুর্চি ও চাকর-বাকররা সবাই তার মুরীদ। তাদের অন্তরে তাঁর জন্য রয়েছে অন্ধ ভক্তি, বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা-ভালবাসা। কারণ আইয়ুবী তাদেরকে চাকর মনে করে না। তাদের সাথে ভাই অথবা বন্ধুর মত ব্যবহার করে। আমরা বিষয়টি গভীরভাবে লক্ষ্য করেছি।
সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর এই বিশ্বস্ত দলের মধ্য থেকে কাউকে কেনা যেমন কঠিন, তার মধ্যে অন্য কাউকে ঢােকানােও কঠিন। তার চারপাশে যে সব ব্যক্তিবর্গ আছে, তারা তার চারপাশে নিচ্ছিদ্র প্রাচীর খাঁড়া করে রেখেছে। বিশেষ করে আলী বিন সুফিয়ান, গিয়াস বিলকিস, হাসান বিন আব্দুল্লাহ ও জাহেদানের চোখ এড়িয়ে তার কাছে পৌঁছা কিছুতেই সম্ভব নয়। ওরা সবাই বিচক্ষণ ও অনুসন্ধানী দৃষ্টির অধিকারী। ওরা মানুষের চোখের ভাষা যেমন পড়তে পারে, তেমনি মানুষের অন্তরের গােপন গহীনে লুকিয়ে রাখা ইচ্ছা এবং স্বপ্নগুলােও পড়ে ফেলতে পারে। তাই কোন খুনী আইয়ুবীর কাছে পৌঁছতে পারে না।'
ইসলামের সমাপ্তি! ফিলিপ অগাস্টাস বললাে, আমি শতবার বলেছি যে, আমাদের কাজ হলাে, ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করা! এ এমন এক ধর্ম, যা মানুষকে বশীভূত করে ফেলে। এ ধর্ম মানুষের দেহকে যেমন নিয়ন্ত্রণ করে তেমনি তার আত্মাকেও নিয়ন্ত্রণ করে। যে ব্যক্তি ইসলামকে মনে প্রাণে গ্রহণ করে, দুনিয়ার কোন শক্তিই তাকে পরাজিত করতে পারে না। আপনারা দেখেছেন, সুলতান আইয়ুবীর পাশে যে সব মুসলমান আছে, তারা কট্টর ধর্ম বিশ্বাসী। ধর্মের প্রতি তাদের এমনি অটল বিশ্বাস যে, অর্থ-সম্পদ, হীরা-জহরত ও সেরা সুন্দরী দিয়েও ধর্মের সাথে তাদের আত্মার বন্ধন ছিন্ন করা যায়। তােমরা যাদের খরিদ করতে পারাে, তারা দুর্বল ঈমানের মুসলমান। তারা ইসলামকে অন্তরে গভীরভাবে গ্রহণ করেনি বলেই তােমরা তাদের পাকড়াও করতে পারছাে। তােমর, দেখেছাে, আমাদের বিশাল বাহিনীকে সুলতান আইয়ুবীর অল্প সংখ্যক সৈন্য কেমন করে পরাস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত করে। যেখানে আমাদের সৈন্য ও অশ্বগুলাে পিপাসায় ক্লান্ত হয়ে যায় সেখানে সুলতান আইয়ুবীর সৈন্যরা পিপাসা ও ক্লান্তি থেকে থাকে একেবারে নির্বিকার। এই ধৈর্যকেই তারা বলে ঈমান। আমাদের প্রথম কাজ হলাে তাদের এই ঈমানকে দুর্বল করা। হরমন তাদের দু'চার জন উচ্চ অফিসার ও আমীরকে কৌশলে মুঠোর মধ্যে নিয়েছে, এটা অবশ্যই প্রশংসার কাজ! এর দ্বারা আমরা অনেক উপকার পাবাে। কিন্তু এখন এমন পথ অবলম্বন করতে হবে, যাতে এ জাতির মন থেকে ধর্মের নেশা কেটে যায়। যাতে ধর্মের বিরুদ্ধে একটা অসন্তোষ ওদের মনেই দানা বেঁধে ওঠে। বয়স্কদের কাছে ইসলামের বিরুদ্ধে বলে তাদের মন পরিবর্তন করা সহজ ব্যাপার নয়। তাই তাদের বংশধর ও নতুন প্রজন্মের সামনে বিভ্রান্তির জাল বিস্তার করতে হবে। তাদেরকে তােমাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করাে। তাদের কাঁচা মনে যে কোন মতবাদ কার্যকরী হবে। তাদের মধ্যে পশু প্রবৃত্তি ও ধ্বংসাত্মক কাজের প্রেরণা দান করাে।'
ইহুদীরা এ কাজে বেশী পারদর্শী।' হরমন বললাে, তারাই এখন রণাঙ্গণে এ দায়িত্ব পালন করছে। আমিও চেষ্টা করছি । আমাদের প্রচেষ্টার ফল ক্রমশ ফলতে শুরু করেছে। একদিনে বা কয়েকদিনে আপনি কোন মতবাদ ও বিশ্বাস পরিবর্তন করতে পারবেন না। এমন কাজে অনেক সময়ের প্রয়ােজন, এর পিছনে যুগ যুগ কেটে যায়।
‘এ কাজ চালিয়ে যেতে হবে।' ফিলিপ অগাস্টাস বললেন, ‘আমরা এ আশা করবাে না যে, পরিণাম ফল আমাদের জীবনেই সফল হয়ে যাবে। আমার পূর্ণ বিশ্বাস, যদি আমরা চরিত্র হননের এই কাজে তৎপর থাকি, সেদিন বেশী দূরে নয়, মুসলমান শুধু নামকাওয়াস্তে মুসলমান থাকবে। তাদের সামনে ধর্মীয় দায়িত্ব শুধু সামাজিক নিয়ম ও প্রথা হিসেবেই থেকে যাবে। তাদের উপরে ধীরে ধীরে খৃস্টানী চাল-চলন চালু হয়ে যাবে। তাদের চিন্তাধারায় খৃষ্টান জগত প্রাধান্য পাবে।

‘শেখ মান্নান!' রাজা রিমাণ্ড বললেন, যদি তুমি আছিয়াত দুর্গের পরিবর্তে অন্য কোন দুর্গ চাও, তবে আমরা এক্ষুণি সে দাবী পুরণ করতে পারবাে না। আমাদের চুক্তি ঠিকই থাকবে। কেল্লার শর্ত ছাড়া অন্যান্য শর্ত বহাল থাকবে। তুমি যথা নিয়মে তােমার প্রাপ্য পেতে থাকবে। যদি তুমি আর্থিক অনুদান ও সাহায্য ঠিক মত পেতে চাও, তবে কায়রােসহ সমস্ত মিশরে সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর সেনাবাহিনী ও সরকারী গুরুত্বপূর্ণ লােকদের হত্যা করার কর্মসূচী অব্যাহত রাখবে। আর সেই সাথে সুযােগ মত সুলতান আইয়ুবীকে হত্যা করার চেষ্টাও জারী রাখবে।'
‘সুলতান আইয়ুবীকে হত্যা করার বিষয়ে আমি স্পষ্ট বলতে চাই, আমি তার পিছনে আর কোন লােক ক্ষয় করতে চাই না ।' শেখ মান্নান বললাে, তাকে হত্যা করা অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে। তার পিছনে লেলিয়ে দিয়ে আমি আমার সবচেয়ে দামী ও দক্ষ ফেদাইনদের শেষ করেছি। আমার বলতে দ্বিধা নেই, সুলতান আইয়ুবী আমাকে নতুন জীবন দান করেছে। আমি যখন তার সামনে অস্ত্র সমর্পণ করলাম, তখন ভেবেছিলাম, আমি তার ওপর যে হত্যা প্রচেষ্টা চালিয়েছি তাতে তিনি আমাকে তাে হত্যা করবেনই সেই সাথে নেতৃস্থানীয় সকল ফেদাইনকে নির্মূল করবেন। কিন্তু তিনি আমাকে ও আমার সঙ্গীদের সকলকেই ক্ষমা করলেন। তিনি নিজ মুখে ক্ষমা ঘােষণা করার পরও আমি তা বিশ্বাস করতে পারিনি। ভেবেছিলাম, তিনি আমাদের সাথে তামাশা করছেন। তিনি যে আমাদের ধোঁকা দিচ্ছেন না এ কথা আমরা কল্পনাও করতে পারিনি। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম, আমরা যখনই যাওয়ার জন্য ফিরে দাঁড়াবাে সঙ্গে সঙ্গে তার তীরন্দাজরা আমাদের পিঠে তীর বিদ্ধ করে হত্যা করবে বা আমাদের উপর দিয়ে ঘােড়া ছুটিয়ে দেবে। কিন্তু আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, আমি এবং আমার সঙ্গী-সাথীরা সবাই বহাল তবিয়তে আপনাদের সামনে এসে উপস্থিত হতে পেরেছি। আপনারা আমাকে সাহায্য দেয়া বন্ধ করলেও আমি আর সুলতান আইয়ুবীকে হত্যার কোন চেষ্টা করবাে না। কিন্তু কায়রােতে আমার ফেদাইন কর্মীরা আপনাদের নিরাশ করবে না। কায়রােতে এমন অবস্থার সৃষ্টি করা হবে, সুলতান আইয়ুবী তার অগ্রাভিযান বন্ধ রেখে কায়রাে ফিরে আসতে বাধ্য হবে।'
হরমন বলল, হ্যাঁ, এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমিও ভেবে রেখেছি, খুব শীঘ্রই সুদানীদের দিয়ে মিশরের সীমান্ত চৌকিতে আবার আক্রমণ চালাবাে। তবে এ মুহূর্তে মিশরের ওপর কোন বড় রকমের আক্রমণ চালানাের প্রয়ােজন নেই। আক্রমণের এমন পায়তারা করতে হবে, যাতে সুলতান আইয়ুবী সিরিয়া থেকে মিশরে ফিরতে বাধ্য হন।
হরমন ছিল গােয়েন্দাগিরী ও কূটচালে বিশেষ দক্ষ ব্যক্তি।
কিন্তু সেও জানতাে না, এই কনফারেন্সে এমন ব্যক্তি উপস্থিত আছে, যার মাধ্যমে সুলতান আইয়ুবী তাদের সকল তৎপরতার খবর পেয়ে যাবে। লােকটি এখানকার পানশালার এক কর্মচারী। অফিসারদের মদ ও আহারের ব্যবস্থাপনায় নিয়ােজিত। নাম ভিক্টর। ফ্রান্সের নাগরিক। সুলতান আইয়ুবীর গােয়েন্দা হিসাবে যথেষ্ট সুনাম কুড়িয়েছে।
তার এক সঙ্গী আছে রাশেদ চেঙ্গিস। তুর্কী মুসলমান। সে নিজেকে গ্রীকের এক খৃস্টান নাগরিক পরিচয় দিয়ে এখানে চাকরীতে ঢুকেছে। এই রাশেদও সুলতান আইয়ুবীর এক গােয়েন্দা।
এদেরকে অনেক যাচাই বাছাই করার পর এখানে ডিউটি দিয়েছে খৃস্টানরা। কারণ এখানকার কনফারেন্সে অনেক গুরুত্বপূর্ণ লােকের সমাগম ঘটে। অনেক প্রথিতযশা ব্যক্তিরা আসেন এখানে। আসেন বিভিন্ন দেশের রাজা ও সম্রাটগণ, আসেন সমরবিদ ও সেনাপতিরা, কূটনৈতিক মিশনের উচ্চপদস্থ অফিসার, প্রশাসনের বড় বড় দায়িত্বশীলগণ। এদের মিটিংয়ে উপস্থিত থেকে আহার ও পানীয় সরবরাহ করার জন্য যাদের নিযুক্ত করা হয়েছিল তাদের মধ্যে ভিক্টর এবং রাশেদও ছিল।
আমরা জানি, সুলতান আইয়ুবীর গােয়েন্দারা সর্বত্র জালের মত ছড়িয়ে আছে। খৃস্টানদের ভেতরের তথ্য ও সংবাদ জানার জন্য সেখানেও ঢুকে পড়েছিল আইয়ুবীর গােয়েন্দারা। তাদেরই দুইজন ভিক্টর ও রাশেদ। শেখ মান্নানের সাথে খৃস্টান সম্রাটদের কি কি কথা হল, সবই শুনে নিল এই দুই গােয়েন্দা। এর বিস্তারিত রিপোের্ট দু'একদিনের মধ্যেই সুলতান আইয়ুবীর কাছে পৌছে যাবে।
কায়রােতে তখন ধ্বংসাত্মক তৎপরতা পুরােদমে শুরু হয়ে গেছে। একদিন মিশরীয় বাহিনীর এক কমাণ্ডারের লাশ পাওয়া গেল শহরের বাইরে। সন্ধ্যার পরে সে বাড়ীর বাইরে গিয়েছিল ব্যক্তিগত কাজে। সারা রাত বাড়ীতে না ফেরায় বাড়ীর লােকজন চিন্তিত হল। সকাল বেলা তার লাশ পাওয়া গেল শহরের বাইরে। তার শরীরে কোন ক্ষতচিহ্ন ছিল না । সামান্য আঘাতের চিহ্নও পাওয়া যায়নি কোথাও। লাশের ময়না তদন্ত হল। তদন্তকারী দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করল। তারা সেখানে শুধু তার পায়ের চিহ্নই দেখতে পেল। কমাণ্ডারের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়া হল। সবাই তার চরিত্র ও চাল-চলন সম্পর্কে ভাল মন্তব্য করল। নিন্দার পরিবর্তে সকলেই তার প্রশংসা করল। কোন সন্দেহভাজন লােকের সাথে তার মেলামেশা ছিল বলে জানা গেল না। তার স্ত্রীর জবানবন্দী নেয়া হল। স্ত্রী তাকে সৎ ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি বলে উল্লেখ করল। সে আরাে জানাল, কমাণ্ডার খুবই কর্তব্যপরায়ণ ও হাসি খুশী দীলখােলা প্রকৃতির লােক ছিল।
এটা যে একটা খুন এ ব্যাপারে তদন্তকারী দলের কোন সন্দেহ ছিল না, কিন্তু শত অনুসন্ধান করেও খুনীর কোন সন্ধান পেল না তারা। এমনকি অনুসন্ধানের জন্য কোন প্রমাণ বা সূত্রও তারা উদ্ধার করতে পারল না।
তিন চার দিন পরের ঘটনা। সে যে দায়িত্বে নিয়ােজিত ছিল তার মৃত্যুর পর অন্য এক কমাণ্ডারের ওপর সে দায়িত্ব অর্পন করা হয়। দায়িত্ব পাওয়ার তিন দিনের মাথায় একই পরিণতি ঘটে তার। সারাদিন ডিউটি শেষে রাতে সে তার কামরায় ঘুমিয়েছিল। সকালে ঘুম থেকে না উঠায় সঙ্গীরা তাকে ডাকাডাকি করল, কিন্তু ঘুম ভাঙল না তার। শেষে কামরার দরজা ভেঙে দেখা গেল সেই সেনা কমাণ্ডার তার নিজের কামরায় মৃত অবস্থায় পড়ে আছে।
সেনা ব্যারাকে সে একা এক কামরায় থাকতাে। তার সম্পর্কেও খোঁজখবর নেয়া হল । সকলেই তার সম্পর্কে খুব ভাল রিপাের্ট দিল। তার বন্ধু মহল শােকাতুর কণ্ঠে জানাল, তার সাথে কারাে কোন বিবাদ বা মনােমালিন্য ছিল না। হত্যার স্পষ্ট কোন কারণ ছিল না। বাহ্যত এটাকে খুন বলার কোন অবকাশ নেই। কারণ তারও শরীরে কোন আঘাত বা ক্ষতচিহ্ন ছিল না। এমনকি সামান্য আঁচড়ের দাগও নেই। শরীরের কোথাও।

সরকারী ডাক্তার লাশ দেখলেন। লাশের ঠোটের কোণে সামান্য একটু শুকনাে ফেনা মত ছিল। তিনি সেই ফেনা কাঠি দিয়ে উঠিয়ে একটি পাত্রে রাখলেন। তারপর তিনি একটি কুকুর আনালেন। ফেনাটুকু এক টুকরাে মাংসের সাথে লাগিয়ে মাংসের টুকরাটি কুকুরকে খেতে দিলেন।



তিনি কুকুরটি তার বাড়ীতে নিয়ে গেলেন। ঘরে বসে লক্ষ্য রাখা যায় এমন একটি জায়গায় কুকুরটি বেঁধে রেখে তাকিয়ে রইলেন সেদিকে । কুকুরটা কোন রকম অস্বাভাবিক আচরণ করল না। অযথা ছুটাছুটি বা চিৎকারও করলাে না। তাকে যে খাবার দেয়া হলাে সেগুলাে সে স্বাভাবিক ভাবেই খেয়ে নিল। ডাক্তার সারা রাত জেগে থেকে কুকুরটির প্রতি লক্ষ্য রাখলাে । মাঝ রাতের পর কুকুরটি দড়ি টানতে শুরু করল। যত সময়, যেতে লাগল ততই তার ছুটাছুটি বাড়তে লাগল। অনেক্ষণ ছুটাছুটির পর কুকুরটি ক্লান্ত হয়ে পড়ল। আস্তে আস্তে তার দৌড়াদৌড়ি বন্ধ হয়ে গেল এবং দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে কুকুরটা হঠাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

ডাক্তার বাইরে এলেন। কুকুরটির কাছে গিয়ে দেখলেন, কুকুরটি মারা গেছে। ডাক্তার রিপাের্ট দিলেন, কমাণ্ডার দু’জনকে এমন বিষ প্রয়ােগ করে মারা হয়েছে, যে বিষ প্রয়ােগ করার সাথে সাথেই আক্রান্ত ব্যক্তি তা টের পায় না। একটা বিশেষ সময় পরে সে বিষের ক্রিয়া শুরু হয় এবং আক্রান্ত ব্যক্তি কিছু বুঝে উঠার আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। বিষ রােগীর কেবলমাত্র হার্টে আঘাত করে এবং ওখানেই জমাটবদ্ধ হয়ে থাকে। ফলে সারা শরীরের আর কোথাও তার প্রভাব পড়ে না। এ জন্যই কমাণ্ডার দু’জনের রক্ত ও গােশত পরীক্ষা করে আমরা কোন বিষের সন্ধান পাইনি।
ডাক্তারের রিপোের্ট পাওয়ার পর গােয়েন্দা বিভাগ ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেল। এই অভিনব পদ্ধতিতে এর আগে আর কোন খুনের ঘটনা এখানে ঘটেনি। তাদের মনে হলাে, যুদ্ধের একটি নতুন সেক্টর খুলে বসেছে দুশমন। তারা ব্যাপারটা আলী বিন সুফিয়ানকে জানাল।
আলী বিন সুফিয়ানও বিষয়টি জানতে পেরে চিন্তিত হয়ে পড়লেন। অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে কিভাবে লড়াই করবেন বুঝে উঠতে পারলেন না তিনি। কিন্তু শত্রুকে এখনি পাকড়াও করতে না পারলে ভয়ানক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। একজন দু'জন নয়, হাজার হাজার সৈন্য সহজেই শিকার হতে পারে এ বিষের। কেবল সৈন্যরা নয়, প্রশাসনের উচ্চপদস্থ অফিসার, আমীর-ওমরা, সেনাপতি, এদের যে কেউ যে কোন সময় আক্রান্ত হতে পারে।
আলী বিন সুফিয়ান এই খুনী চক্রের হােতাদের খুঁজে বের করার জন্য কঠিন সংকল্প গ্রহণ করলেন। মরার আগে এই কমাণ্ডাররা, কার কার সাথে সাক্ষাৎ করেছে, কোথায় গিয়েছে, কার সাথে খানা খেয়েছে, এসব খোঁজখবর নেয়া শুরু করলেন তিনি। কিন্তু এর থেকে সন্দেহভাজন এমন কাউকে খুঁজে পেলেন না, যার পিছনে লেগে এ ষড়যন্ত্রের সুরাহা করা যেতে পারে।
কমাণ্ডারের স্ত্রীকে ডেকে অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করা হলাে, কিন্তু তার কাছ থেকেও কোন তথ্যই এমন পাওয়া গেল না, যাকে অবলম্বন করে সামনে অগ্রসর হওয়া যায়। কমাণ্ডার দু’জনই খাঁটি মুসলমান ছিল, নিষ্ঠাবান মুজাহিদ ছিল। যুদ্ধের ময়দানে এ দুই কমাণ্ডারের বীরত্ব ও সাহসিকতা দেখে স্বয়ং সুলতান আইয়ুবীও তাদের প্রশংসা করেছেন। এরা দু’জনই সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর কমাণ্ডার হিসাবে সাফল্যের সাথে দায়িত্ব পালন করেছে। তাদের সময় কোন অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বর্ডার অতিক্রম করতে পারেনি। সুদানী অনুপ্রবেশকারীরা বহু বার তাদের হাতে ধরা পড়েছে। সুদানীরা মােটা অংকের ঘুষ দিতে চেয়েও কখনােই তা দিতে পারেনি এবং গ্রেফতার এড়াতে পারেনি। লােভ এবং ভয় দু'টোই তারা জয় করে নিয়েছিল। তাদের তৎপরতায় খুশী হয়ে সরকার তাদের পদোন্নতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। শীঘ্রই এ দুই কমাণ্ডারকে সহ-সেনাপতি পদে পদোন্নতি দেয়ার ঘােষণা জানানাে হতাে। কিন্তু আফসােস, ঘােষণা শােনার আগেই দুশমনের মরণ বিষ কেড়ে নিল তাদের জীবন।
ঘটনার আকস্মিকতায় আলী বিন সুফিয়ান গােয়েন্দা বাহিনীর কমাণ্ডারদের সম্মেলন ডাকতে বাধ্য হলেন। তিনি ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে সমবেত কমাণ্ডারদের উদ্দেশ্য করে বললেন, 'আমি নিশ্চিত, এই জঘন্য হত্যাকাণ্ড দুটি ক্রুসেড দুষ্কৃতকারীরা ঘটিয়েছে, আর তাদের হয়ে এ কাজ আঞ্জাম দিয়েছে খুনী ফেদাইন চক্র।' তিনি আরাে বললেন, শত্রুরা এখন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হত্যার কাজ শুরু করে দিয়েছে। তাই সেনাবাহিনীর সমস্ত কমাণ্ডার ও অফিসারদের সতর্ক থাকতে হবে। কোন অজানা লােক ও সন্দেহভাজন ব্যক্তির দেয়া কোন কিছু খাওয়া যাবে না। বরং এমন অচেনা ও সন্দেহজনক লােককে চোখে চোখে রাখতে হবে। প্রয়ােজনে তাদের গ্রেফতার করতে হবে।'
দ্বিতীয় কমাণ্ডার হত্যার আট দিন পরের ঘটনা। এক রাতে সৈন্যরা ক্যাম্পে নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়েছিল। ক্যাম্প প্রহরীরা যথারীতি পাহারা দিচ্ছিল ক্যাম্প, হঠাৎ ক্যাম্পে আগুন লেগে গেল। আগুনটা লাগল ক্যাম্পের গুদাম ঘরে। এক জায়গায় হাজার হাজার তাঁবু স্তুপ করে রাখা ছিল। স্তুপের ওপর ছিল তাবুর ছাউনি। সেখানে রােজকার মত সৈন্যরা পাহারা দিচ্ছিল, তবুও সেখানে কেমন করে যেন আগুন লেগে গেল। এই অগ্নি সংযােগের ব্যাপারটা আলী বিন সুফিয়ানকে নতুনভাবে ভাবিয়ে তুলল। এটা যে শত্রুদের নাশকতামূলক কাজেরই একটা অংশ তাতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ এখানে হঠাৎ করে আগুন লাগার কোন সম্ভাবনাই ছিল না। এর আশেপাশে রান্নাবান্না বা অন্য কোন কারণে কখনাে আগুন জ্বালানাের প্রয়ােজন পড়ে না।
একদিকে অচেনা বিষের ছােবল, অন্যদিকে খােদ সেনা ছাউনীতে আগুন দেয়ার বিষয়টি যেমন আলী বিন সুফিয়ানকে চিন্তাগ্রস্ত করে তুলল, তেমনি আরাে একটি সমস্যা পেরেশান করে তুলল আলী বিন সুফিয়ানকে। ইদানিং সীমান্ত ফাড়িগুলাে থেকে যে সংবাদ আসছে তাতে দেখা যাচ্ছে, সুদানের বর্ডার দিয়ে চোরের মত গােপনে বর্ডার পার হওয়ার প্রবণতা খুব বেড়ে গেছে। সীমান্ত ফাঁড়িগুলােকে এ ব্যাপারে সাবধান ও সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। অবশ্য সীমান্ত প্রহরীরা যথেষ্ট সজাগ ও সতর্ক। তাই ইদানিং গ্রেফতারের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। সুদানীদের এই অনুপ্রবেশের পিছনে নিশ্চয়ই কোন কুমতলব কাজ করছে। সব মিলিয়ে অবস্থা বেশ নাজুক ও জটিল হয়ে গেছে। এ অবস্থায় কি করা যায় ভেবে কোন কূলকিনারা পাচ্ছিলেন না আলী বিন সুফিয়ান। বিষয়টি তিনি গাজী সালাহউদ্দিন আইয়ুবীকে জানানাের তীব্র তাগিদ অনুভব করলেন। আলী বিন সুফিয়ান তার গােয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা আরও বাড়িয়ে দিলেন। আগের চেয়ে বেশী সাবধানতা অবলম্বন করার নির্দেশ দিলেন গােয়েন্দা কর্মীদের।
কায়রাে থেকে দূরে নীলনদের পাশে এক পাহাড়ী এলাকা। সেই বিরান পাহাড়ী অঞ্চলে ফেরাউন যুগের কিছু ধ্বংসাবশেষ ছিল। ক্রুসেডার ও সুদানীরা এই ধ্বংসাবশেষের ভেতর গােপন আড্ডা বানিয়ে এখান থেকে তাদের অভিযান পরিচালনা করতাে।
কেবল সে পাহাড়ী অঞ্চল নয়, মিশরে এমন পুরাতন ধ্বংসাবশেষ অনেক অঞ্চলেই ছিল। এই সব পাহাড়ী এলাকায় কড়া দৃষ্টি রাখার জন্য আলী বিন সুফিয়ান তার গােয়েন্দাদের মধ্য থেকে একদল কমাণ্ডোকে বাছাই করলেন। তাদেরকে বিশেষ কিছু নির্দেশ দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন সে সব অঞ্চলে। দুর্গম পাহাড়ী এলাকাগুলােতে ছড়িয়ে পড়লাে আলীর পাঠানাে গােয়েন্দা বাহিনী। কিন্তু এক মাসের মধ্যেই সেসব এলাকা থেকে আলীর কাছে ফিরে এলাে দুঃসংবাদ।

এই এক মাসের মধ্যেই আলী বিন সুফিয়ানের পাঁচ জন 



গােয়েন্দা ময়দান থেকে একদম হাওয়া হয়ে গেল। আরাে আশ্চর্যের ব্যাপার, কোন একটি বিশেষ এলাকা থেকে নয়, কায়রাের আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এরা নিখোঁজ হয়েছে। আলীর কাছে আরাে খবর এল, এরা কেউ বিশ্রামের সময় নয়; বরং গায়েব হয়েছে ডিউটিরত অবস্থায়।

এরা এমন গােয়েন্দা ছিল, যারা ক্রুসেড গােয়েন্দাদের গ্রেফতার করার ক্ষেত্রে অতীতে পারদর্শীতা দেখিয়েছে। কিন্তু আজ তারা নিজেরাই নিখোজ হয়ে গেছে। হয়তাে গ্রেফতার হয়েছে নতুবা মারা গেছে। যাই ঘটুক, আলীর জন্য কোনটাই শুভ সংবাদ নয়। মৃত্যুর চেয়ে গ্রেফতার হওয়াটাই বরং বেশী ভয়ের। কারণ, তারা ধরা পড়লে ক্রুসেড বাহিনী তাদের কাছ থেকে তথ্য আদায় করবে। এরপর তাদেরকে হাশিশ প্রয়ােগ করে নেশাগ্রস্ত করবে। তারপর নেশার ঘােরের মধ্যে ফেলে তাদের সম্মোহন করবে। সম্মোহিত এইসব সৈন্যরা তখন মিশরের সেনাবাহিনী ও সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে অবলীলায়। কারণ তারা যে শক্রয় দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, এই বােধ তখন আর তাদের মধ্যে কাজ করবে না। বরং যে তাদের কমাণ্ড করবে তাকেই তারা তাদের কমাণ্ডার মনে করবে।
বিপদ এখানেই শেষ নয়। আলী, বিন সুফিয়ানের সামনে আসল বিপদ হয়ে দেখা দিল অন্য বিষয়। শত্রুর গােয়েন্দারা যে আলী বিন সুফিয়ানের গােয়েন্দাদের চিনে ফেলেছে, এটিকেই তিনি সবচে বড় বিপদ বলে গণ্য করলেন।
গােয়েন্দাগিরীর ক্ষেত্রে নিজেকে আড়াল করাই হলাে গােয়েন্দাদের প্রথম ও প্রধান কাজ। এ জন্য যে কোন ধরনের ছদ্মবেশ ধারণে তাদেরকে পারঙ্গম হতে হয়। যে গােয়েন্দা নিজের পরিচয় গােপন করতে পারে না, তার পক্ষে গােয়েন্দা কাজ করা মােটেও সম্ভব নয়।
গােয়েন্দা জগতে আলী বিন সুফিয়ানের একটি সুনাম ছিল। তাঁর কাছে ট্রেনিং পাওয়া গােয়েন্দাদের একটা মর্যাদা ছিল সর্ব মহলে। কিন্তু সে মর্যাদা ও সম্মান আজ যেন ধুলায় মিশে গেল। এক জন নয়, দু'জন নয়, এক মাসে পাঁচজন গােয়েন্দা ধরা পড়ে গেল দুশমনের হাতে! তাহলে এতদিন তিনি তাদের কি শিখিয়েছেন। তাঁর বাছাই করা গােয়েন্দারাই যদি দুশমনকে পাকড়াও করার পরিবর্তে নিজেরা ধরাশায়ী হয়ে পড়ে তাহলে সাধারণ গােয়েন্দাদের অবস্থা কি দাঁড়াবে? এসব প্রশ্ন এসে আলী বিন সুফিয়ানকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলল।
সারা রাত আলী বিন সুফিয়ানের কোন ঘুম হলাে না। তিনি রাতভর জেগে কাটালেন এবং চিন্তা করলেন। ফজরের আজান হলাে। তিনি সৈনিকদের সাথে একত্রে জামায়াতে নামাজ আদায় করলেন। নামাজ শেষে তিনি একজন কাসেদকে ডাকলেন। কাসেদ হাজির হলে তাকে বললেন, ‘আমি একজন লােককে এই মুহূর্তে আমার কাছে পেতে চাই। তুমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাকে আমার সাথে দেখা করার জন্য খবর দাও।' তারপর তিনি লােকটির নাম ও ঠিকানা দিয়ে কাসেদকে বিদায় করে দিলেন।
আলী বিন সুফিয়ান একজন যােগ্য গােয়েন্দাকে খুঁজছিলেন, যার ওপর তিনি এই কাজের দায়িত্ব অর্পণ করবেন। এ সময় তার মানসপটে ভেসে উঠল একটি নাম মেহেদী আল হাসান। মেহেদী আল হাসান জেরুজালেম ও ত্রিপলীতে খুব সফলতার সাথে গােয়েন্দাগিরী করে এসেছে। এ যুবক খুবই বীর ও সাহসী। সবচে বড় কথা, সে অসম্ভব রকম দূরদর্শী। এখনকার মিশন সফল করতে হলে এরকম দূরদর্শী লােকেরই প্রয়ােজন।
খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এলাে মেহেদী আল হাসান। আলী বিন সুফিয়ান তাকে কাছে পেয়েই বললেন, যুবক, তােমাকে একটি জটিল দায়িত্ব দিতে চাই। আশা করি তুমি সানন্দে তা গ্রহণ করবে।'
‘আপনি আমাকে কোন দায়িত্ব দেয়ার যােগ্য মনে করেছেন, এতেই আমি খুশী। আপনি যে কোন কঠিন দায়িত্ব আমাকে দিতে পারেন। জাতির স্বার্থে ইসলামের জন্য যে কোন ত্যাগ স্বীকার করতে আমি সর্বদা প্রস্তুত।
আলী বিন সুফিয়ান তাকে অভিযানের গুরুত্ব বুঝিয়ে বললেন। এ পর্যন্ত যা ঘটেছে সব তাকে খুলে বলে বললেন, ‘সেই পাহাড়ী এলাকায়ই শুধু আমাদের দুই গােয়েন্দা নিখোঁজ হয়েছে। তাই আমার মনে হচ্ছে, সেখানে ওদের শক্ত ঘাঁটি রয়েছে। প্রথমে আমি তােমাকে সে এলাকায়ই পাঠাতে চাই।' মেহেদী আল হাসান সানন্দে এ দায়িত্ব কবুল করে বিদায় নিল আলী বিন সুফিয়ানের কাছ থেকে।
সেই দুর্গম এলাকায় যাতায়াতের মাত্র একটিই রাস্তা। রাস্তাটি চলে গেছে নীল নদের পাশ ঘেঁষে । রাস্তার অপর পাশে পাহাড়ী তৃণভূমি। মাঝে মাঝে উপত্যকা ও ময়দান। ছােট বড় নানা আকারের পাহাড়ের চূড়া মাইলের পর মাইল মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে । ভিতরের দিকে সবুজ ঘাস এবং গাছপালাও আছে। কোথাও কোথাও পানির ঝিলও আছে, যার চারপাশে পাড়ের মত খাঁড়া বা আধ-খাঁড়া পাহাড়।
মেহেদী আল হাসান সে অঞ্চলে পা দিয়েই টের পেল, এলাকায় সন্দেহজনক লােকের যাতায়াত আছে।
নীল নদের পাড় ধরে এগিয়ে চলল মেহেদী আল হাসান। কোথাও রাস্তা নীল নদের একদম পাশ ঘেষে এগিয়েছে, কোথাও জঙ্গল বা পাহাড়ের বেশ ভেতরে ঢুকে পড়েছে। ঘােড়ায় চড়ে স্বাভাবিক গতিতে এগুচ্ছে সে। কোথাও ফেরাউনের কোন মহলের ধ্বংসাবশেষ এখনাে তার নজরে পড়েনি। ফেরাউনের মহলের ধ্বংসাবশেষ এখানে আদৌ আছে কিনা তাই সন্দেহ। অন্তত রাস্তা থেকে কেউ কোনদিন ফেরাউনের ধ্বংসাবশেষ দেখেছে বলে জানা যায়নি। কিন্তু এ বিশ্বাস সবারই ছিল, পাহাড়ের মধ্যে ফেরাউন কিছু না কিছু বানিয়ে রেখেছে যা এখনও অক্ষত আছে। তবে সে অঞ্চলে পৌঁছতে হলে রাস্তা ছেড়ে তাকে দুর্গম অঞ্চলের গভীরে ঢুকতে হবে। সে অঞ্চল এমন নির্জন যে, দুষ্কৃতকারীদের গােপন আজ্ঞা হওয়ার উপযুক্ত জায়গাই বটে।
মেহেদী আল হাসান সে অঞ্চলের বেশ গভীর পর্যন্ত ঢুকে আবার ফিরে এল। পরদিন দু'টো উট, কিছু মেষ ও বকরি নিয়ে জংলী রাখাল সেজে সেখানে গেল । পাহাড়ী অঞ্চলের বেশ গভীরে ঢুকে পশুগুলােকে ছেড়ে দিল। পশুগুলাে আপন মনে চরে বেড়িয়ে ঘাস খেতে লাগল। আর সে মরু বেদুইনদের মত পাহাড়ী এলাকায় সজাগ দৃষ্টি রেখে ঘুরে বেড়াতে লাগল।
ঘুরতে ঘুরতে সে এই বিজন পাহাড়ী অঞ্চলের আরাে গভীরে ঢুকে যেতে লাগল । কিন্তু সন্দেহজনক কিছুই তার দৃষ্টিতে পড়ল না । আরও অগ্রসর হয়ে সম্মুখে একটি পাহাড় দেখতে পেল। সমতল ক্ষেত্র থেকে বিশ-পঁচিশ ফুট উপরে সে পাহাড়ে একটা প্রাকৃতিক সুড়ংয়ের মুখ হা করে আছে। মেহেদী আল হাসান সেই সুড়ংয়ের মুখে এসে দাঁড়াল।
বিশাল সুড়ং। সুড়ংটা এতই প্রশস্ত যে, তার মধ্য দিয়ে উট চালিয়ে নেয়া যাবে। পাহাড়ের ভেতরে কতদূর চলে গেছে এ সুড়ং বুঝার উপায় নেই। কারণ ভেতরটা অন্ধকার । মেহেদী আল হাসান পাহাড়ের চুড়া টপকে অপর দিকে গেল। সেখানে সে দেখতে পেল সংকীর্ণ মাঠ। কিন্তু কোন মানুষের ছায়াও নেই সেখানে।
হতাশ হল মেহেদী আল হাসান। দুশমনের আড্ডা খুঁজে বের করার জন্য সে এই পাহাড়ের রাজ্যে এসেছে। কিন্তু কোথায় দুশমন? কোথায় তাদের আস্তানা বা আখড়া? সে আবার এসে দাঁড়াল সুড়ংয়ের মুখে। আস্তে করে পা রাখল সুড়ংয়ে। সুড়ংটা খুব দীর্ঘ। অন্ধকার প্রথম দিকে বেশী জমাট নয়, হালকা হালকা ফিকে ভাব। ডান ও বায়ের দেয়ালে অনেক গহ্বর। সেখানে বড় বড় পাথর বসানো । এত বড় পাথর যে, একটা মানুষ অনায়াসে সেখানে লুকিয়ে বসে থাকতে পারবে ।
মেহেদী আল হাসান সেই সুড়ং ধরে অনেক দূর এগােলাে। কিন্তু সন্দেহজনক কিছুই দেখতে পেল না। এভাবে কয়েকদিন
(চলবে)


শেয়ার করুন

Author:

আমি সজীব হোসাইন -এই ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা পাশাপাশি লেখালেখির কাজটাও করি। অনলাইনে প্রযুক্তির বিষয় নিয়ে যা জানি তা মানুষের মাঝে শেয়ার করার ইচ্ছায় এ ব্লগ টি তৈরি করা।