শুক্রবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৯

ক্রুসেড সিরিজ-১৮. বিষাক্ত ছোবল(পর্ব-4)

১৮. বিষাক্ত ছোবল(পর্ব-4)

অফিসার মাত্র। হতভাগা আমার কাছ থেকে মেয়েটাকে লুকাতে চেয়েছিল, যেন সে তার কন্যা!
গুমাস্তগীন তার কাছ থেকে বিদায় নিল। তাকে এগিয়ে দিতে গেট পর্যন্ত সঙ্গে এলাে শেখ মান্নান।
গেটের কাছে কাফেলা প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। গুমাস্তগীন অশ্বপৃষ্ঠে আরােহণ করলাে। তার দেহরক্ষীরাও ঘােড়ায় আরােহণ করলাে। দেহরক্ষীদের দু'জন সামনে ও দু'জন পিছনে চললাে গুমাস্তগীনের। তাদের হাতে উদ্যত বর্শা।
গুমাস্তগীনের পিছনেই আন নাসের ও তার সঙ্গীরা। সবার পিছনে মাল বােঝাই উটের বহর।
কেল্লার গেট খুলে দেয়া হলাে। কাফেলা ধীরে ধীরে বাইরে চলে গেল কোর। শেষ বারের মত হাত নেড়ে গুমাস্তগীনকে বিদায় জানিয়ে গেট বন্ধ করার হুকুম দিল শেখ মান্নান। সঙ্গে সঙ্গে কেল্লার গেট আবার বন্ধ হয়ে গেল।
কেল্লার দৃষ্টিসীমা থেকে হারিয়ে গেল কাফেলা। দ্রুত পা চালিয়ে ওরা অনেক দূরে সরে এলাে। ধীরে ধীরে পশ্চিম দিগন্ত রক্তিম হয়ে উঠলাে। সূর্য ডুবতে শুরু করলাে। কাফেলা তার চলার গতি তীব্রতর করে ছুটে চললাে হারানের দিকে।
প্রতিদিনের মত সন্ধ্যা নেমে এলাে কেল্লায়। প্রহরীরা সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালিয়ে দিল কেল্লার ঘরে ঘরে। রাস্তার মােড়েও জ্বালানাে হলাে বাতি। শেখ মান্নানের বিনােদন মহলের ঝাড়বাতিগুলােও জ্বলে উঠলাে।
সন্ধ্যা পেরিয়ে নেমে এলাে রাত। চারদিক ছেয়ে গেল গভীর। আঁধারে। শেখ মান্নান অস্থির হয়ে দারোয়ানকে ডাকলাে। বললাে, সেই খৃস্টান অফিসার কি এখনও মেয়েটাকে নিয়ে আসেনি?”
জ্বি না, জনাব।'
ঠিক আছে যাও।'
একটু পর আবার ডাকলাে। দারােয়ান একই জবাব দিল । তৃতীয় বার ডাকার পরও যখন দারােয়ান বললাে, “জ্বি না, জনাব শেখ মান্নান তার ব্যক্তিগত চাকরকে ডেকে বললাে, ঐ খৃস্টান অফিসারকে গিয়ে বলল, মেয়েটাকে নিয়ে যেন অতি সত্তর এখানে চলে আসে।'
চাকর খৃস্টান অফিসারের কামরায় গেল, কিন্তু সেখানে কেউ ছিল না। মেয়ে দু'টির কামরায় গেল চাকর, সেখানেও কেউ নেই। ওখানে দাঁড়িয়ে ওদের নাম ধরে ডাকাডাকি করলাে, কিন্তু কেউ সাড়া দিল না সে ডাকে। চারদিকে খুঁজলাে, কিন্তু কোন সন্ধান পেল না তাদের।
চাকর আশপাশের সবগুলাে কামরা একে একে ঘুরে দেখলাে, সবগুলােই শূন্য। সে এদিক-ওদিক ঘুরে ফিরে দেখলাে, কেল্লার বাগানে গিয়ে তালাশ করলাে ওদের। আশপাশের উঠান, আঙ্গিনা সর্বত্র খুঁজলাে । শেষে নিরাশ হয়ে সেখান থেকে ফিরে শেখ মান্নানকে বললাে, ‘খৃষ্টান অফিসার ও তার দুই মেয়েকে কোথাও পাওয়া গেল না।' শেখ মান্নান বসা থেকে উঠে দাঁড়ালাে। চেঁচিয়ে বললাে, কি বলছিস তুই। কেল্লার ফটকে বলা আছে ওদের যেন বাইরে যেতে দেয়া না হয়। নিশ্চয়ই ওরা কেল্লার ভেতরেই আছে, ভাল করে খুঁজে দেখ।
চাকর বললাে, আমি ওদের সবগুলাে কামরা খুঁজে দেখেছি। আশপাশ, বাগান, কোথাও খুঁজতে বাদ রাখিনি।
তাহলে?' বিস্মিত শেখ মান্নান বললাে, “জলদি সেনা। কমাণ্ডারকে ডাকো।' শেখ মান্নানের তলব পেয়ে ছুটে এলোঁ সেনা কমাণ্ডার।
শেখ মান্নান বললাে, “খৃস্টান অফিসার ও মেয়েরা কোথায় আছে খুঁজে বের করাে।'
হুকুম পেয়ে ছুটলাে সেনা কমাণ্ডার। কেল্লার প্রাচীরের পাশের খাদে, ঝোপ-ঝাড়ে সর্বত্র খুঁজলাে ওদের। বললাে, ‘ওরা কেল্লায় নেই জনাব।' শেখ মান্নান বললাে, এটা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারি
যেভাবেই হােক ওদেরকে খুঁজে বের করো। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফেদাইন খুনী ও সৈন্যদের মাঝে তােলপাড় শুরু হয়ে গেল ।মশাল নিয়ে ওরা হন্যে হয়ে ছুটলাে কেল্লার প্রতিটি কোণে। অন্ধকারে সৈন্যদর দেখা যাচ্ছিল না, চারদিকে শুধু দেখা যাচ্ছিল আলাের নাচন। বিশাল কেল্লার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত আলাের ফুলগুলাে ছুটে বেড়ালাে অনেক রাত পর্যন্ত । কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা এই সিদ্ধান্তে আসতে বাধ্য হলাে যে, কেল্লার মধ্যে কোথাও খৃস্টান অফিসার ও মেয়ে দুটি নেই।
শেখ মান্নান গেটে ডিউটিরত তার অর্ধ ডজন প্রহরীকে ডাকলাে। যারা সে সময় পাহারায় নিযুক্ত ছিল এবং যারা বিশ্রামে ছিল তাদের সকলকে একত্র করে শেৰ মান্নান জিজ্ঞেস করলাে, গুমাস্তগীনের কাফেলা ছাড়া অন্য কারাে জন্য কি আজ গেট খােলা হয়েছিল?
তারা ভীতসন্ত্রস্ত কণ্ঠে বললাে, আপনার আদেশ ছাড়া কখনাে গেট খােলা হয় না। আজ একবারই গেট খােলা হয়েছিল, যখন আপনি গেটে উপস্থিত ছিলেন।
তােমরা কি দুটি মেয়ে ও খৃষ্টান লােকটিকে এ কেল্লা থেকে বের হতে দেখেছাে?'
আলবত না হুজুর। ভয়ে কাচুমাচু হয়ে বললাে প্রহরীরা। গুমাগীনের কাফেলার সাথে কি ওদের দেখেছিলে?'
‘জ্বি না হুজুর। ওনার কাফেলার সাথে খৃষ্টান লােকটি বা কোন মেয়ে ছিল না।
‘তাহলে বলাে, একজন খৃষ্টান অফিসার এবং দুটি মেয়ে কেমন করে কেল্লা থেকে গায়েব হয়ে গেল? তাদের কি পাখা আছে যে, তারা হাওয়ায় উড়ে গেল? নাকি তারা জ্বীন-পরী বা যাদু কন্যা ছিল যে, ভােজবাজির মত সবাই হাওয়া হয়ে গেল? প্রহরীরা এ কথার কোন জবাব দিতে পারল না। তারা মাথা নিচু করে অপরাধীর মত দাঁড়িয়ে রইল। কেউ দেখলে মনে করবে, এখুনি এসব অপরাধীদের ফাঁসির আদেশ কার্যকরী করা হবে। গভীর রাতে শেখ মান্নান তার কামরায় গেল।
রাগে ও গােস্বায় তার চেহারা তখনাে টগবগ করছিল।
রাতের প্রথম প্রহর শেষ হয়ে গেল, গুমাস্তগীনের কাফেলা তখনাে পূর্ণোদ্যমে ছুটছিল। চারদিকে হালকা অন্ধকার। পথ চলতে চলতে এক সময় থেমে গেল গুমাস্তগীন। সঙ্গী দেহরক্ষীদের বললাে, এবার থামাে।
কাফেলা থামতেই তিনি উট চালকদের বললেন, উটগুলােকে জলদি বসাও। তবু বােঝার মধ্য থেকে ওদের বের করে দেখাে, ওরা এখনাে বেঁচে আছে, নাকি দম বন্ধ হয়ে এরই মধ্যে মারা গেল?
উট চালকেরা উটকে বসালাে। উটের পিঠ থেকে তাঁবুর বােঝা নামিয়ে দ্রুত হাতে তাঁবুর বাঁধন খুললাে। বাঁধন খুলতেই তাঁবুর ভিতর থেকে বেরিয়ে এলাে খৃস্টান অফিসার, কারিশমা ও লিজা।
না, কেউ মারা যায়নি। তবে তাদের গায়ের ঘামে তাঁবুগুলাে ভিজে গিয়েছিল। গরমে তিনজনেরই জিহ্বা বেরিয়ে এসেছিল। চোখ ঘােলাটে এবং রক্তবর্ণ হয়ে গিয়েছিল। তারপরও তারা মাগীনের ওপর কৃতজ্ঞ ছিল এ জন্য যে, গুমান্তগীন তাদেরকে তাঁবুতে জড়িয়ে আছিয়াত দুর্গ থেকে বের করে নিয়ে এসেছে।
কেল্লা থেকে এখন তারা অনেক দূরে, নিরাপদ স্থানে। শেখ মান্নানের ফেদাইন দল পিছু ধাওয়া করে তাদের ধরে ফেলবে, এমন কোন ভয়ও নেই আর। আর এসেই বা কি করবে, তারা তাে সম্মুখ যুদ্ধে পটু নয়। সামনাসামনি যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে চাইবে না তারা। তাই ক্লান্ত খৃস্টান অফিসার সেখানেই রাতের মত তাঁবু করার প্রস্তাব দিল । কিন্তু গুমাস্তগীন সে প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে বললাে, আমি শেখ মান্নানকে চিনি। কোন রকম ঝুঁকি নিতে চাই না। এখানে আমরা বিশ্রামের জন্য থামিনি, থেমেছি তােমাদেরকে তাঁবুর বালি থেকে বের করার জন্য।' আন নাসেরও বললাে, উনি ঠিকই বলেছেন। বিশ্রাম না করে আমাদের আরাে এগিয়ে যাওয়া দরকার।
ফলে কাফেলা আবার যাত্রা শুরু করলাে। মেয়ে দুটিকে দুই উটের পিঠে তুলে দেয়া হলাে । খৃস্টান অফিসার গুমাস্তগীনের এক রক্ষীর ঘােড়া নিয়ে চারজন কমাণ্ডের সাথে সাথে চললাে। চলতে চলতে খৃস্টান অফিসার আন নাসেরের সঙ্গে আলাপ শুরু করে দিল। তার কথার মধ্যে বন্ধুত্ব ও ভালবাসার সুর ধ্বনিত হচ্ছিল। আন নাসেরের মন থেকে ভয়ের ভাব কেটে গিয়েছিল। সেও অফিসারের সঙ্গে গল্পে মেতে উঠলাে।
মধ্য রাতের পর কাফেলাকে এক স্থানে বিশ্রামের জন্য থামতে হুকুম দিল গুমাস্তগীন। থেমে গেল কাফেলা। প্রথমেই তাঁবু খাটানাের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লাে সবাই।
গুমাস্তগীনের জন্য পৃথক তাঁবু টানানাে হলাে। মেয়েদের জন্যও আলাদা তাঁবুর ব্যবস্থা করা হলাে। রক্ষী ও কমান্ডোরা তাঁবু না টানিয়েই খােলা আকাশের নিচে শুয়ে পড়লাে। আন নাসেরের মন-মস্তিষ্ক আচ্ছন্ন করে রেখেছিল লিজাকে আপন করে পাওয়ার স্বপ্ন। শুয়ে শুয়ে লিজার কথাই ভাবছিল সে। মজার ব্যাপার হলো, সেই রাতেই লিজাকে কাছে পাওয়ার সুযােগও পেয়ে গেল সে।
কাফেলার সবাই ছিল বড় ক্লান্ত। দীর্ঘ পথশ্রমের সাথে যুক্ত হয়েছিল ফেদাইনদের ধাওয়া করার ভয়। এই টেনশন ও ক্লান্তি থেকে তাদের মুক্তি দিল ঘুম। শােয়ার সাথে সাথেই নিদ্রা এসে জড়িয়ে ধরলাে তাদের।
কিন্তু আন নাসেরের চোখে কোন ঘুম ছিল না। সে তখন শুয়ে শুয়ে সে লিজার কথাই চিন্তা করছিল। একবার ভাবলাে, সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়েছে, এই ফাঁকে লিজার কাছে চলে যাই না কেন? কারিশমা তাে আমাদের ব্যাপারটা জানেই। পরক্ষণে মনে হলাে, না, এভাবে যাওয়াটা ঠিক হবে না। লিজা তাকে অন্য রকম ভাবতে পারে। তারচে, একটু অপেক্ষা করেই দেখি না কেন লিজাও তাে চলে আসতে পারে!
এইসব নানা রকম চিন্তায় হাবুডুবু খাচ্ছিল আন নাসের। সে যে একজন কমান্ডো বাহিনীর কমাণ্ডার, এ কথা সে ভুলেই গিয়েছিল! ভুলে গিয়েছিল, তার মত অন্যান্য কমান্ডোরা তখনাে সারা দেশে ছড়িয়ে থেকে ইসলামের বিজয়ের জন্য জীবন বাজী রেখে গেরিলা কায়দায় লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। তার মনে এ চিন্তাও কাজ করছিল না যে, তাকে আবার তার বাহিনীতে ফিরে যেতে হবে।
তার অন্যান্য সাথীরাও শুয়ে পড়েছিল। সে ভেবেছিল, তার সাথীরাও সবার মতই ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু তার তিন সাথীর চোখে তখন ঘুম ছিল না। অন্যান্যদের সাথে তারাও শুয়ে পড়েছিল ঠিক, কিন্তু শুয়ে শুয়ে ভাবছিল, কি করে এই চক্রের হাত থেকে উদ্ধার পাওয়া যায়।
তারা ভেবে দেখলাে, পালিয়ে যাওয়ার এটাই মহা সুযােগ। সবাই গভীর নিদ্রায় মগ্ন! পাশেই রয়েছে ঘােড়া ও অস্ত্রশস্ত্র । রয়েছে খাদ্য ও পানীয়। তারা আশা করছিল, কমাণ্ডার এ সুযােগের সদ্ব্যবহার করবে। তাদের এখন প্রয়ােজন শুধু কমাণ্ডারের একটু নির্দেশ বা সংকেত। তাদের যে প্রশিক্ষণ আছে তাতে গুমাস্তগীনসহ সবাই মিলে বাঁধা দিলেও তারা সে বাঁধার মােকাবেলা করে টিকে যেতে পারবে। তাই না ঘুমিয়ে ওরা কমাণ্ডারের একটু ইশারার অপেক্ষা করছিল।
তাদের তাে আর জানা ছিল না, তাদের কমাণ্ডার ইতােমধ্যেই তার বুদ্ধি-বিবেক, তার ঈমান ও আকিদা এবং তার সৈনিকসুলভ চেতনা এক যুবতীর পায়ের তলে সমর্পণ করে বসে আছে। এক খৃস্টান মেয়ে তার সমস্ত সৎ গুণাবলী ধ্বংস করে দিয়ে নিজের সারা জীবনের পাপের বােঝা নিয়ে আন নাসেরের পিঠে সওয়ার হয়ে গেছে।
আন নাসের শুয়েছিল লিজাদের তাবুর দিকে মুখ করে। অন্ধকারেও সে দেখতে পেল, তাবু থেকে একটি কালাে ছায়া বেরিয়ে এসেছে। ছায়াটি পা টিপে টিপে তার দিকেই অগ্রসর হচ্ছে। ছায়াটি কোন পুরুষের নয়, একটি মেয়ের।
এ দৃশ্য দেখার সাথে সাথেই সেও উঠে বসলাে এবং ঘুমন্ত সাথীদের থেকে আস্তে আস্তে দূরে সরে যেতে লাগলাে। কিছুটা তফাতে গিয়ে সে দ্রুত উঠে দাঁড়ালাে এবং পা টিপে টিপে ছায়াটির দিকেই অগ্রসর হলাে।
অল্প সময় পরেই দু’টি ছায়া একাকার হয়ে গেল।
লিজা আন নাসেরকে ঘুমন্ত কাফেলা থেকে সরিয়ে দূরে এক টিলার পাশে নিয়ে গেল। তার কথা থেকে ঝরে পড়ছিল প্রচণ্ড আবেগ ও উচ্ছ্বাস। শেখ মান্নানের কবল থেকে রক্ষা পেয়েছে এই আনন্দে তার লাফাতে ইচ্ছে করছিল। আন নাসেরকে একান্ত করে কাছে পেয়েছে এই আবেগে সে যেন উন্মাদ হয়ে গেছে।
লিজার এই আবেগ দেখে আন নাসেরও আবেগে উদীপ্ত হয়ে উঠলাে। বিশ্ব প্রকৃতি ভুলে দু'জনই ভেসে চললাে আবেগের সাগরে। লিজা তার মনের আবেগ প্রকাশ করছিল হাত-পা নেড়ে। খেলনা পেলে কচি খুকীরা যেমন আনন্দে লাফায় তেমনি লাফাচ্ছিল সে। হঠাৎ তার কি হলাে, আন নাসের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সামান্য দূরে সরে গিয়ে বললাে, “আন নাসের, তােমাকে একটি কথা বলবাে, তােমার জীবনে কি আর কোন নারী এসেছে।'
আমার মা ও বােন ছাড়া জীবনে আমি আর কোন নারীর সান্নিধ্য পাইনি! আন নাসের বললাে, তুমিই আমার জীবনে প্রথম নারী, যে ভালবাসার পসরা নিয়ে আমার জীবনে এসেছে, হৃদয়ের কড়া নেড়ে জাগিয়েছে আমায়।
তুমি সত্যি বলছছা তাে!'
দেখাে, আমি মিথ্যে বলি না। যৌবনের প্রারম্ভেই আমি নূরুদ্দিন জঙ্গীর সেনাবাহিনীতে প্রবেশ করি। তার পরের দিনগুলাে কেটেছে আমার যুদ্ধের ময়দানে। মরুভূমির তপ্ত বালুকারাশি, দুর্গম পাহাড়, অরণ্য, সর্বত্র ছুটে বেরিয়েছি আমি। আপনজন থেকে দূরে নির্জন প্রান্তরে শিকারী বাঘের মত খুঁজে ফিরেছি দুশমন। মেতে উঠেছি রক্ত দেয়া-নেয়ার খেলায়। এর বাইরে যে কোন জীবন আছে, সে কথাটাই মনে হয়নি কখনাে। তােমাকে দেখার আগে নারীকে নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার প্রয়ােজনও পড়েনি, সময়ও হয়নি।
সারাক্ষণ তৎপর থাকতাম অর্পিত দায়িত্ব পালনের কাজে। দায়িত্বশীল কমাণ্ডার হিসাবে আমার যথেষ্ট খ্যাতি আছে। আমি যেখানেই থাকি দায়িত্ব পালনে কখনও ক্রটি করি না। কারণ দায়িত্ব পালনকে আমি কেবল ডিউটি মনে করি না, দায়িত্ব পালন আমার ঈমানেরই অঙ্গ।'
ঈমান শব্দটি উচ্চারণ করতেই তার ভেতরটা হঠাৎ নড়ে উঠলাে। চমকে উঠে কথা বন্ধ করে দিল সে। বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর লিজা তাকে প্রশ্ন করলাে, কি ভাবছাে?'
লিজা! তুমি হয়ত আমার ঈমানকে দুর্বল করে দিয়েছে! আমাকে বলাে তাে, তােমরা আমাকে ও আমার সঙ্গীদেরকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?
তার আগে তুমি আমাকে বলাে, আমার ভালবাসা ও রূপলাবণ্য দেখে তােমার মনে কুপ্রবৃত্তি জেগে উঠেছে কি না?' লিজা এমন ভঙ্গিতে প্রশ্ন করলাে, যার মধ্যে রসিকতার সামান্যতম লেশও ছিল না।
লিজাকে সিরিয়াস হতে দেখে আন নাসেরও সিরিয়াস হয়ে উঠলাে। বললাে, তােমার মনে এমন প্রশ্ন জাগলাে কেন?'

তুমি তাে আমাকে বলেছিলে, আমাদের ভালবাসা পবিত্র। এ পবিত্র ভালবাসা কখনাে তুমি অপবিত্র করবে না!
আন নাসের বললাে, 'আমি প্রমাণ করবাে, আমি পশু নই।
তাহলে তােমার মনে এ ধারণা কেন এলাে যে, আমি তােমার ঈমান দুর্বল করে দিয়েছি। আমরা উভয়েই আমাদের ভালবাসার পবিত্রতা রক্ষায় সংকল্পবদ্ধ। আমি এটাও তােমাকে বলেছি, তুমি যদি চাও, আমি আমার ধর্ম ত্যাগ করে তােমার ধর্ম কবুল করে নেবে। তাহলে এ কথার মানে কি? আমার ভালবাসা নিয়ে কি করে তােমার মনে প্রশ্নের সৃষ্টি হলাে? তুমি কি জানাে, আমাদের খৃস্টান জাতিতেও তােমার চেয়ে সুদর্শন যুবক আছে। যারা বীর যােদ্ধা, সুন্দর, স্বাস্থ্যবান এবং উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন লােক তারা আমাকে দেখে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা করে। আমাকে পাওয়ার জন্য কত যুবক যে পাগলপারা, কই, আমি তাে তাদের কাউকে মন দেইনি!
আন নাসেরের যে কি হলাে সে বলতে পারবে না, লিজাকে শান্তনা দেয়ার পরিবর্তে বলে উঠলাে, তাহলে তুমি সেখানেই চলে যাওনা কেন? আমার মধ্যে এত কি গুণ দেখেছাে যে, আমাকে আকৃষ্ট করছাে?'
লিজা আশা করেনি, এ পর্যায়ে এসে আন নাসের এমন উত্তর দিতে পারে। সে এ উত্তর শুনে প্রচণ্ড আশাহত হলাে এবং এ প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে গুম মেরে বসে রইলাে।
আন নাসের তার কাঁধে হাত রেখে বললাে, আমার কথার উত্তর দাও লিজা! এভাবে চুপ করে থেকো না, বলাে, তুমি আমার মাঝে কি পেয়েছাে?
লিজা কোন কথা বললাে না। সে তার মাথাটি হাঁটুর উপর রেখে ফুফিয়ে কাঁদতে লাগলাে । আন নাসের তার কান্নার শব্দ শুনতে পেল। সে লিজার কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে বললাে, কাঁদছে কেন? আহা, কি হয়েছে বলবে তাে?
লিজা এবারও কোন কথা বললাে না, কাঁদতেই থাকলাে। আন নাসের বার বার তাকে জিজ্ঞেস করলাে সে কেন কাঁদছে। কিন্তু কোন জবাব না দিয়ে লিজা ফুলে ফুলে কেঁদেই চললাে।
আন নাসের তার এ কান্না সইতে পারলাে না। কান্না এক সংক্রামক আবেগের নাম। এ কান্না দেখে তার নিজের ভেতরও ঝড়ের তাণ্ডব শুরু হয়ে গেলাে। বুঝতে পারলাে, এমন প্রশ্ন করা ঠিক হয়নি তার। সে তাকে বললাে, ভুল হয়ে গেছে লিজা, এমন কথা আর কোনদিন বলবাে না।'
তাতেও থামলাে না লিজার কান্না। তখন আন নাসের তাকে নিজের বাহুর বেষ্টনীতে নিয়ে নিল। বাঁধা দিল না লিজা, বরং ওর বুকে মাথা রেখে আরও জোরে কাঁদতে লাগলাে। এ কান্নার ক্ষমতা সম্পর্কে কোন ধারণা ছিল না আন নাসেরের। কয়েক মিনিটের এ কান্না যে তার সারা জীবনের সংযম ভেঙে দেয়ার জন্য যথেষ্ট, এ কথা বুঝার মত মানসিক শক্তি তার ছিল না। সে তখন বিপর্যয়কর মানবিক দুর্বলতার শিকার। যে দুর্বলতা মানুষের স্বাভাবিক জ্ঞান ও বুদ্ধিকে প্রায় লুপ্ত করে দেয়। সে তখন লিজার মনে কষ্ট দেয়ার অনুতাপে দগ্ধ হচ্ছিল। সেই অনুতাপ তাকে লিজার প্রতি আরাে দুর্বল করে তুলছিল। সেই দুর্বলতার শিকার হয়ে আন নাসের ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছিল লিজার মধ্যে।
এ ছিল সেই দুর্বলতা, যে দুর্বলতা রাণীকে তার গােলামের কাছে নত করে দেয়। যে দুর্বলতার কারণে রাজা তার রাজকীয় ভাণ্ডার ও অর্থ-সম্পদকে পাথরের মত মূল্যহীন ভেবে রাজমহল ত্যাগ করে আশ্রয় নেয় সাধারণ পর্ণকুটিরে। একটু মানসিক শাস্তির আশায় জমিদার পথে নামে মুসাফিরের বেশে।
লিজাও ভালবাসার পিপাসু ছিল। সেই ভালবাসা, যে ভালবাসা আত্মাকে শাস্তি দেয়। সে দৈহিক প্রেম এমন সব পুরুষের কাছ থেকে পেয়েছে, যাদের সে ঘৃণা করে। সে আছিয়াত দুর্গে আসার পথে এবং কেল্লায় পৌছেও কারিশমার কাছে তার এই মনের আবেগ প্রকাশ করে ছিল।
আন নাসেরের হৃদয়ের উত্তাপ তাকেও গলিয়ে ফেলেছিল। প্রতারণা করতে এসে সে সত্যিকার অর্থেই ভালবেসে ফেললাে।
আবেগ জড়িত কণ্ঠে সে বললাে, আমাকে বিশ্বাস করাে। নারী জীবনে একজনকেই মন দেয়। সে মন আমি তােমাকে দিয়ে ফেলেছি। এখন আমার নিজস্ব বলতে কিছু নেই। এ দেহ মন এখন সবই তােমার। তুমি বিশ্বাস করে কাছে টানলেও তােমার, অবিশ্বাস করে দূরে ছুঁড়ে ফেললেও এ তােমারই থাকবে।'
সে যখন এসব বলছিল, তখন তার মনে কোন ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের লেশমাত্র ছিল না। সে তার মনের সত্যিকার আবেগই প্রকাশ করছিল। মনের টানেই সে আন নাসেরের কাছে চলে এসেছিল।
যদিও আন নাসেরকে ফাঁসানাের জন্যই তারা লিজাকে নিয়ােগ করেছিল এবং লিজা সে ব্যাপারে যথেষ্ট কৃতিত্ব দেখিয়েছিল, কিন্তু তার মন তাতে সাড়া দেয়নি। সে আন নাসেরকে ভালবেসেই তার কাছে ছুটে আসতাে। চাপানাে দায়িত্বের কথাও সব সময় স্মরণ থাকতাে তার, সে সেই দায়িত্বটুকু পালন করতাে নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বে।
দায়িত্বের কথা মনে হলেই তার মাঝে দোদুল্যমানতা সৃষ্টি হতাে। এক ধরনের দ্বিধা তার পথ রােধ করে দাঁড়াতাে। কিন্তু সব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাটিয়ে সে আন নাসেরের কাছেই ছুটে আসতাে। কেবল দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কেন, আরাে যে কত রকম বাঁধা তার পথ রােধ করে দাঁড়াতাে তার কি শেষ আছে?
আজকে রাতের কথাই ধরা যাক, কাফেলা এখানে তাবু স্থাপন করার সময় গুমাস্তগীন এক ফাঁকে এসে লিজার কানে কানে বললাে, সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়বে, তখন তুমি আমার তাবুতে একটু এসাে। তােমার জাতি যে উত্তম উপহার পাঠিয়েছে আমাদের জন্য, তাকে একটু সম্মানিত করতে চাই। শেখ মান্নান তােমাদের যে বিপদে জড়িয়ে ফেলেছিল, আমি সাহায্য না করলে তার হাত থেকে নিস্তার পাওয়া কঠিন হতাে তােমাদের। দেখাে, আমি তােমাদের কত কৌশলে শেখ মান্নানের কাছ থেকে মুক্ত করে নিয়ে এলাম। আমাকে কি পুরষ্কৃত করবে না তােমরা?
লিজা এ প্রস্তাবের কোন উত্তর দেয়নি।
গুমাস্তগীন চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর এসেছিল খৃষ্টান অফিসার। সে তাকে বললাে, লিজা, মহাপ্রভুর অসীম কৃপা, শেষ পর্যন্ত বুড়ো শয়তানের কবল থেকে বেঁচে গেছাে তুমি। আমি সময় মত না পৌছলে তােমার কপালে যে কি ঘটতাে! কারিশমা ঘুমিয়ে গেলে তুমি একটু আমার কাছে এসাে। সফরটা আমরা আনন্দময় করে তুলবাে।
এসব দেখেশুনে নিজের সৌন্দর্য ও যৌবনের প্রতি ভীষণ ঘৃণা ধরে গেল লিজার। সে তার তাবুতে গিয়ে প্রবেশ করলাে। কারিশমা ঘুমিয়ে পড়েছিল, কিন্তু ঘুম এলাে না লিজার। সে উঠে বসলাে, আলতাে পায়ে বেরিয়ে এলাে তাঁবু থেকে। গুমাস্তগীন বা খৃস্টান অফিসারের পরিবর্তে সে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল আন নাসেরের দিকে। আন নাসেরও তারই চিন্তায় ও অপেক্ষায় জেগে ছিল।
দীর্ঘ সময় তারা টিলার আড়ালে বসে এভাবে কথা বললাে। হঠাৎ এক অভাবিত ঘটনা না ঘটলে হয়তাে তারা ভাের পর্যন্ত এভাবেই কথা চালিয়ে যেতাে। টিলার আড়ালে বসে তখনাে কথা বলছিল ওরা, লিজা আন নাসেরকে কিছু বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় আন নাসের চমকে উঠে বললাে, লিজা, চুপ! একটু খেয়াল করে শােন তাে! তােমার কানে কোন শব্দ আসছে? ঘােড়ার পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছাে! শব্দটা মনে হয় এদিকেই ছুটে আসছে।
হ্যা! শব্দটা তাে স্পষ্টই শােনা যাচ্ছে। লিজা বললাে, চলাে, জলদি সকলকে জাগিয়ে দেই। শেখ মান্নান আমাদের পিছু ধাওয়া করেছে, অনেক সৈন্য পাঠিয়েছে সে।
আন নাসের দৌড়ে এক টিলার উপর উঠে গেলাে। টিলায় দাঁড়িয়ে সে দেখতে পেল অনেক মশাল। মশালের আলােগুলাে ঘােড়ার গতির সাথে তাল রেখে উপর নিচে দুলছে। অনেক ঘােড়া। অন্ধকার রাত বলে দূর থেকেও আলােগুলাে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এবং রাতের নিরবতা ছিন্ন করে তাদের চলার আওয়াজও স্পষ্ট শােনা যাচ্ছে ।
আন নাসের দৌড়ে নিচে নেমে এলাে। লিজাকে সঙ্গে নিয়ে ছুটলাে ঘুমন্ত কাফেলার দিকে। দ্রুত সবাইকে জাগিয়ে তুলে বললাে, শেখ মান্নানের ধাওয়াকারী বাহিনী ছুটে আসছে।' ঘুম জাগা লােকগুলাে প্রথমে কিছু বুঝতে না পারলেও আন নাসেরের চাপা গর্জন শুনেই বুঝে গেলাে কি ঘটেছে। দ্রুত প্রস্তুত হয়ে কমান্ডোরা ছুটলাে টিলার দিকে। তাদের সঙ্গে সঙ্গে ছুটলাে লিজাও।
গুমাস্তগীনের রক্ষীরা কমাণ্ডোদের কাছে দ্রুত হাতে তলােয়ার ও বর্শা সরবরাহ করে নিজেরাও হাতে তুলে নিল হাতিয়ার। সবাই মােকাবেলার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল । এমনকি উটের চালকরাও উট ফেলে বর্শা ও তলােয়ার নিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল, তাদের কারাে কাছে তীর ধনুক নেই। দূর থেকে হামলাকারীদের বাঁধা দেয়ার কোন সুযােগ নেই। মােকাবেলা করতে হবে সামনাসামনি।
ধাওয়াকারীরা ছিল পনেরাে-ষােল জন । ছয়-সাতজনের হাতে মশাল । তারা এসে বিনা বাধায় কাফেলাকে ঘিরে ফেললাে। একজন গর্জন করে বললাে, মেয়ে দুটিকে আমাদের হাতে তুলে দাও। শেখ মান্নান বলেছেন, মেয়ে দু'টিকে দিয়ে দিলে তােমাদেরকে ছেড়ে দিতে। তােমাদের সাথে কোন সংঘাত বাঁধানাের ইচ্ছে নেই তার। মেয়েদেরকে আমাদের হাতে তুলে দিলেই তােমরা নিরাপদে চলে যেতে পারবে।
আন নাসের ছিল গেরিলা বাহিনীর সুদক্ষ ও চৌকস কমাণ্ডার। গেরিলা যুদ্ধের যেসব কলাকৌশল তার জানা ছিল, সেগুলাে জানতাে তার বাহিনীর অন্যান্য সদস্যরাও।
ঘােষণা শুনে প্রথমেই সে বললাে, এই মেয়েরাই আমাদের ধরে এনেছে। ফলে মেয়েরাই আমাদের দুর্গতির জন্য দায়ী। আমরা তােমাদের কেল্লায় ছিলাম। ইচ্ছে করলে তােমরা আমাদের সেখানেই বন্দী করে রাখতে পারতে। কিন্তু তােমরা সহৃদয়তার পরিচয় দিয়ে আমাদের মুক্ত দুনিয়ায় আসার সুযােগ দিয়েছো। এ জন্য আমরা তােমাদের কাছে কৃতজ্ঞ। সেই কৃতজ্ঞতার দাবী পূরণের স্বার্থে আমরা মেয়েদের হেফাজতের জিম্মা থেকে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছি। তােমরা আমাদের চারজনকে তােমাদের ঘেরাওয়ের বাইরে যেতে দাও, তারপর গুমাস্তগীন ও খৃষ্টান অফিসারের সাথে আলাপ করে দেখাে, তারা তােমাদের মােকাবেলা করবে, নাকি স্বেচ্ছায় তােমাদের দাবী মেনে নেবে তার কথায় যুক্তি ছিল, শেখ মান্নানের সৈন্যরা তাদেরকে ঘেরাওয়ের বাইরে যাওয়ার জন্য সুযােগ করে দিল। আন নাসের ও তার তিন সঙ্গী ঘেরাওয়ের বাইরে চলে গেলাে।
ধাওয়কারীদের কমাণ্ডার আন নাসেরের ভূমিকায় সন্তুষ্ট হল এই ভেবে যে, প্রতিরােধকারীদের মধ্যে এর ফলে যে ভাঙন সৃষ্টি হলাে তাতে সংঘাত ছাড়াই হয়তাে মেয়েদের নিয়ে যাওয়ার একটি সুযােগ সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে এই মেয়েদের সাথে গুমাস্তগীনেরও কোন সম্পর্ক নেই। সে সরে দাঁড়ালে একমাত্র খৃষ্টান অফিসার ছাড়া তাদের মােকাবেলায় আর কেউ থাকে না।
তাই সে গুমাস্তগীনকে উদ্দেশ্য করে বললাে, আপনি শেখ মান্নানের মেহমান ছিলেন। আপনি জানেন, আপনার সাথে তার কোন সংঘাত নেই। বরং তিনি আপনার একজন শুভাকাঙ্খী ও সহযােগী। তার সাথে আপনার সুসম্পর্ক আছে বলেই তিনি আপনার হাতে আইয়ুবীর চার জানবাজ কমান্ডাের মত মূল্যবান বন্দী তুলে দিয়েছেন। আমরা আশা করছি, বন্দীদের মত আপনিও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে এই সংঘাত থেকে সরে দাঁড়াবেন। আমাদেরকে এই খৃস্টান অফিসার ধোঁকা দিয়েছে। প্রতারণা করে মেয়েদের নিয়ে পালিয়ে এসেছে কেল্লা থেকে। কিন্তু তারপরও শেখ মান্নান বলে দিয়েছেন, সংঘাত ছাড়া যদি খৃষ্টান অফিসার মেয়েদেরকে তােমাদের হাতে তুলে দেয়, তাহলে নির্বিঘ্নে তাকে চলে যেতে দিও। এবার আপনাদের মতামত চাই, মেয়েদেরকে আমাদের হাতে তুলে দেবেন, নাকি মােকাবেলা করবেন আমাদের?
গুমাস্তগীন বা খৃষ্টান অফিসার কাউকে এ প্রশ্নের জবাব দেয়ার সুযােগ দিল না আন নাসের। সে তার তিন সঙ্গীকে ইশারা করলাে এবং নিজেও সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়লাে ধাওয়াকারী অশ্বারােহীদের ওপর। পিছন থেকে আক্রান্ত হলাে অশ্বারােহীরা, চার কমাণ্ডার বর্ণা মুহূর্তে বিদ্ধ করলাে চার অশ্বারােহীকে। পলকে পাল্টে গেল পরিস্থিতি। বর্শা বিদ্ধ চার অশ্বারােহী পড়ে গেল ঘােড়া থেকে।
পরিস্থিতির সুযােগ নিল গুমাস্তগীনের রক্ষী বাহিনী। তারাও বর্শা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাে হামলাকারীদের ওপর। আন নাসের চিক্কার করে লিজাকে বললাে, ‘এদিকে এসাে, জলদি ঘােড়ার পিঠে চড়ে বসাে!'
ততক্ষণে আন নাসের নিহত এক অশ্বারােহীর ঘােড়া পাকড়াও করে তার ওপর চড়ে বসেছিল। লিজা ছুটে এসে লাফিয়ে পড়লাে ঘােড়র ওপর। লিজাকে নিয়ে ছুটলাে আন নাসের। প্রাণপণে ঘােড়া ছুটিয়ে বললাে, শক্ত করে আমার কোমর জড়িয়ে ধরে রাখাে।'
শেখ মান্নানের ফেদাইন দলের সাথে প্রাণপণ যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলাে গুমাস্তগীনের রক্ষীদলের। খৃস্টান অফিসার এবং গুমাস্তগীন নিজেও অস্ত্র তুলে নিল হাতে। শেখ মান্নানের বাহিনী হাতের মশাল ফেলে কেউ তলােয়ার, কেউ বর্শা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাে।
মাটিতে পড়েও মশালগুলাে জ্বলতেই লাগলাে। আন নাসেরের তিন সঙ্গী তখনও প্রাণপণ লড়াই করে চলেছে।
বিশাল মরুভূমির মাঝে ছােট্ট এক টিলার পাশে চলছিল এ লড়াই। এটা কোন মহাসমর নয়, ছোট দুই দলের মাঝে ক্ষুদ্র এক লড়াই। কিন্তু যারা লড়ছিল, তারা উপলব্ধি করছিল, বিশাল সমরের চাইতেও এ লড়াই ভয়াবহ। কারণ বড় লড়াইয়ে পালানাের মওকা পাওয়া যায়, আত্মসমর্পনের সুযােগ থাকে। কিন্তু এখানে সে সবের কোনই বালাই নেই, হয় মারাে, নয় মরাে।
প্রথম আঘাতের সাথে সাথেই সতর্ক হয়ে গিয়েছিল ফেদাইন বাহিনী। চার অশ্বারােহী ছাড়া কোন পক্ষেই আর কেউ মারা যায়নি। এ সময় একটি ঘােড়া তীরবেগে ছুটে যাওয়ার শব্দ পেল ওরা। ফিরে তাকিয়ে দেখলাে, আন নাসের এক মেয়েকে নিয়ে পালাচ্ছে।
সঙ্গে সঙ্গে তার পিছনে ছুটলাে তিন ফেদাইন সেনা। আন নাসেরের সঙ্গীরা বাঁধা দিল তাদের। যুদ্ধ টুকরাে টুকরাে হয়ে ছড়িয়ে পড়লাে।
আন নাসের এ সুযােগে বেশ কিছু দূর এগিয়ে গেল। কমাণ্ডোদের বাঁধা ডিঙিয়ে অন্য তিন-চার ফেদাইন সেনা তাদের পাশ কেটে ছুটলাে আন নাসেরের পিছনে।
শেখ মান্নান যাদের পাঠিয়েছিল তাদের কেউ কেউ এরই মধ্যে ধরাশায়ী হয়ে পড়েছিল। তারা বুঝলাে, প্রতিপক্ষকে না মারতে পারলে নিজের মৃত্যু ওরা ঠেকাতে পারবে না। ফলে এবার তারাও মরিয়া হয়ে হামলা চালালাে।
দু’পক্ষেই আহত নিহতের সংখ্যা বেড়ে চললাে। গুমাস্তগীনের দুই বিশ্বস্ত দেহরক্ষীর বুক এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গেল তার চোখের সামনে। এ দৃশ্য দেখার পর সে আর দেরী করেনি, এক ঘােড়ার পিঠে লাফিয়ে পড়ে গুমাস্তগীন প্রাণ ভয়ে পালিয়ে গেল সেখান থেকে।
ফেদাইনরা আন নাসেরের পিছনের মেয়েটিকে জীবিত ধরে নিয়ে যেতে চেষ্টা করছিল। তাই তারা চেষ্টা করছিল, মেয়েটিকে বাঁচিয়ে রেখে কিভাবে আন নাসেরকে ঘায়েল করা যায়। তারা চার অশ্বারােহী মিলে আন নাসেরকে একত্রে আক্রমণ করেছিল এবং চেষ্টা করছিল তাকে ঘেরাও করে ফেলতে।
আন নাসের দক্ষ সৈনিক। সে দুশমনের প্রতিটি চাল ব্যর্থ করে ছুটছিল প্রাণপণে। বার বার তার ঘােড়াকে বাঁচানাের জন্য বিপদজনক মােড় নিচ্ছিল। ফেদাইনরা চাচ্ছিল তাকে আহত বা নিহত করতে, সে রুখে দাঁড়ানাের পরিবর্তে কোন রকমে আত্মরক্ষা করে চলছিল।
বিপদজনকভাবে ঘােড়া চালাচ্ছিল আন নাসের। এমন বেপরােয়া গতির ঘােড়া আর দেখেনি লিজা। আন নাসের যখন চোখের পলকে ঘােড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছিল, লিজার পা তখন ফসকে যাচ্ছিল রেকাব থেকে। আন নাসেরকে জাপটে ধরে লিজা কোন রকমে তার পতন ঠেকিয়ে রাখছিল।
দুই পাশ থেকে দুই ফেদাইন একত্রে আঘাত করলাে আন নাসেরকে। আন নাসের চোখের পলকে ঘুরিয়ে নিল ঘােড়ার মুখ । অল্পের জন্য বেঁচে গেল এ যাত্রা। কিন্তু নিজে বাঁচলেও লিজাকে বাঁচাতে পারলাে না। সাবধান হওয়ার আগেই অশ্বপৃষ্ঠ থেকে ছিটকে পড়ে গেল লিজা।
এক ফেদাইন অশ্বপৃষ্ঠ থেকে লাফিয়ে পড়ে জাপটে ধরলাে লিজাকে। লিজা হাত-পা ছুঁড়ে প্রাণপণে চেষ্টা করছিল তার হাত থেকে মুক্ত হয়ে আন নাসেরের কাছে ছুটে যেতে।
আন নাসের ঘােড়া ছুটিয়ে ফিরে এলাে তার দিকে এবং বর্শা উচিয়ে নিক্ষেপ করতে উদ্যত হলাে। কিন্তু ফেদাইন সেনা লিজাকে সামনে বাড়িয়ে দিল, বর্শা সরিয়ে নিল আন নাসের।
একটু আগে যে দুই ফেদাইন সেনা আন নাসেরকে হামলা করেছিল, ফিরে এসে তারা আবার ঝাঁপিয়ে পড়লাে আন নাসেরের ওপর। বর্শা ফেলে তলােয়ার বের করলাে ওরা। আন নাসেরও তলােয়ার বের করলাে। এক ফেদাইন তার তলােয়ার আন নাসেরের ঘােড়ার পেটে সেঁধিয়ে দিল। ঘােড়াটি মুখ থুবরে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ফেদাইনরাও লাফিয়ে নামলাে ঘােড়া থেকে।
সঙ্গীদের কথা স্মরণ হলাে আন নাসেরের। এখন তারা কি অবস্থায় আছে কোন সংবাদ সে জানে না। তাদের যে কেউ এখন তার পাশে থাকলে এ চারজনকে সামাল দেয়া কোন ব্যাপারই ছিল না। কিন্তু একা সে চার গুপ্তখুনীর সঙ্গে পারবে কি চিন্তাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিল। এখন দুশমন চার থেকে চারশ’ হলেও তার কিছু যায় আসে না। জীবনের মায়া ত্যাগ করে সে বেপরােয়া হয়ে উঠলাে।
তার সঙ্গে লড়াই করছিল দুইজন, দুইজন ধরে রেখেছিল লিজাকে। তলােয়ারের অবিরাম ঠোকাঠুকির আওয়াজ ছাড়া আর কিছু ঢুকছিল না তার কানে।
লড়াই করতে করতে আহত ও রক্তাক্ত হয়ে উঠলাে তার শরীর। আহত হয়েও চিতা বাঘের মত দ্রুত আঘাত হেনে শেষ পর্যন্ত ওদের ঘায়েল করে ফেললাে সে।
ওই দুজনকে ঘায়েল করার পর লিজাকে যারা ধরে রেখেছিল ছুটে এসে তাদের ওপর হামলা করলাে আন নাসের। আবার শুরু হলাে তরবারির ঝনর ঝন।
লিজা চিৎকার করে বললাে, আন নাসের, তুমি সরে যাও! আমার জন্য প্রাণ দিও না। দোহাই খােদার, জলদি সরে পড়াে, তুমি একা এবং আহত! ওদের সাথে তুমি কুলিয়ে উঠতে পারবে না।'
কিন্তু এ চিৎকারের দিকে কান দেয়ার মত সময় ছিল না আন নাসেরের। সে পাগলের মত লড়াই করে চললাে। লিজা চিৎকারের পর চিৎকার দিয়ে যাচ্ছিল। আন নাসের ধমকে উঠে বললাে, চুপ করাে লিজা! ভয় নেই, এরা তােমাকে নিয়ে যেতে পারবে না। সে সুযােগ আমি ওদের দেবাে ।
আন নাসের বাস্তবেও তাই করে দেখালাে। ফেদাইনরা লিজাকে নিয়ে যেতে পারলােনা। সে দুই ফেদাইন সেনাকে গুরুতর আহত করে মাটিতে ফেলে দিল।
এই যুদ্ধ চলছিল মূল যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক দূরে। আন নাসেরের সামনে আর কোন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। সে একটি ঘােড়া ধরে এনে প্রথমে নিজে তাতে চড়ে বসলাে এবং লিজাকেও তার সঙ্গে ঘােড়ার পিঠে আরােহণ করতে বললাে। লিজা উঠে বসতেই ঘােড়া ছুটিয়ে দিল আন নাসের।
লিজা ভেবেছিল, আন নাসের তাকে নিয়ে পালিয়ে যাবে। কিন্তু সে পালালাে না, ঘােড়ার মুখ ঘুরিয়ে দিল যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে। ক্যাম্পের পাশে যে টিলার আড়ালে বসে রাতে গল্পে মেতে উঠেছিল সে আর লিজা, ঘােড়া এগিয়ে চললাে সে টিলার দিকে।
যুদ্ধ শেষ হয়ে গিয়েছিল। আন নাসের ও লিজা সেখানে গিয়ে দেখলাে, সেখানে পড়ে আছে দু’পক্ষের নিহত সৈন্যদের লাশ। তখনাে দু'তিনজন ফেদাইন সৈন্য আহত হয়ে ছটফট করছিল। আন নাসের লাশগুলাে দেখলাে একে একে। তার তিন সঙ্গীর কেউ পিঠটান দেয়নি। মরার আগ পর্যন্ত তারা যে বীরের মত লড়াই করেছিল তার সাক্ষী পাশে পড়ে থাকা ফেদাইনদের লাশগুলাে। খৃস্টান অফিসারের লাশ পাওয়া গেল। তার লাশটি পড়েছিল গুমাস্তগীনের এক রক্ষীর লাশের ওপর।
কারিশমার লাশ কোথাও পাওয়া গেল না। বুঝতে পারলাে না, সে গুমাস্তগীনের সাথে পালিয়েছে, নাকি শেখ মান্নানের ললাকেরা তাকে ধরে নিয়ে গেছে। কারণ যুদ্ধে কোন পক্ষ জিতেছে লাশ দেখে তা বুঝতে পারলাে না আন নাসের।
কারিশমা নিখোঁজ। জানি না কি গতি হয়েছে তার। আন নাসের বললাে, ‘এখানে তার লাশ নেই।'
লিজা ৰিহৰল হয়ে তাকিয়ে দেখছিল লাশগুলাে। অন্য তার কাঁদছিল বােবা বেদনায়। সে জানে, এখানকার প্রতিটি লাশের কারণ সে নিজে। একদল মরেছে তাকে ছিনিয়ে নিতে এসে, অন্যরা মরেছে তার জীবন ও সতীত্ব রক্ষার জন্য। এই লাশগুলাের জন্য তার নিজেকেই দায়ী মনে হচ্ছিল।
আন নাসের তার বেদনার্ত চোখের দিকে তাকিয়ে বললাে, লিজা, আল্লাহ যার ভাগ্যে যা লিখে রেখেছে, কেউ তা খন্ডাতে পারবে না। নিয়তির হাতে বন্দী আমাদের জীবন। এদের জন্য দুঃখ করে কিছু করতে পারবাে না আমরা।
লিজা বেদনা বিধুর কণ্ঠে বললাে, কয়েক মুহূর্তের ব্যাপার মাত্র। একটু আগেও এরা জীবিত ছিল, এখন নেই। এদের পরিবর্তে তােমার আমার লাশও তাে এখন এখানে পড়ে থাকতে পারতাে!'
আন নাসের দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাে, হ্যা, মানুষের জীবন কচুপাতার পানির মতই ক্ষণস্থায়ী। অথচ এই জীবন নিয়ে আমাদের কত বড়াই! ভােগের কি দুর্মর আকাঙ্খা! লোভের ও দম্ভের ছড়াছড়ি!
‘চলাে এবার যাওয়া যাক। এখান থেকে দ্রুত সরে পড়া দরকার আমাদের।'
‘চলাে।'
ওরা আর দেরী করলাে না। আকাশের দিকে তাকিয়ে ধ্রুব তারার সাহায্যে গতিপথ নির্ধারণ করলাে আন নাসের। তারপর সঙ্গী সাথী বিহীন ওরা দু'জন আবার নেমে এলাে পথে। পিছনে পড়ে রইলাে দুঃস্বপ্নের রাত, যে রাতের স্মৃতি ওরা জীবনে কোনদিন ভুলতে পারবে না।
আহত ও রক্তাক্ত শরীর নিয়ে বাকী রাত এক নাগাড়ে পথ চললাে আন নাসের। মাথার ভেতর এলােমেলাে চিন্তার ঝড়াে তাণ্ডব। নিয়তি, হ্যাঁ, নিয়তির কি নির্মম পরিহাস! যাদের নিয়ে সে পথে নেমেছিল সভ্যতা ও মানবতা রক্ষার কঠিন শপথ নিয়ে, আজ তারা কেউ নেই সঙ্গে। অথচ যাদের বিরুদ্ধে তাদের এই জাতিগত লড়াই, সেই খৃষ্টান ক্রুসেডারদেরই এক গােয়েন্দা সদস্যাকে দুশমনের হাত থেকে বাঁচিয়ে সঙ্গী করে নিয়ে যাচ্ছে সাথে। নিঃসঙ্গ মরুভূমিতে দলছুট ঘোড়ার মত ছুটে চলেছে তাদের ঘােড়া। ঘােড়া এগিয়ে যাচ্ছে সামনে আর স্মৃতির পাতা হাতড়ে সে ক্রমেই এগিয়ে যাচ্ছিল পিছনের দিকে।
ঘটনাস্থল থেকে অনেক দূর চলে এসেছে ওরা। রাত প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। আরাে একটি নতুন দিন আসছে পৃথিবীতে। আকাশ ফর্সা হচ্ছে। পূর্ব দিকের আকাশে লালের আভা দেখা যাচ্ছে। সে আভার ভেতর থেকে একটু পরই উকি দেবে রাঙা সুরুজ। শুরু হবে নতুন করে জীবনের পথ চলা।
আন নাসের অশ্ব থামালাে। লিজার দিকে তাকিয়ে বললাে, ‘এখন বলল, তুমি কোথায় যেতে চাও?' সে লিজাকে বললাে, ‘আমি তােমাকে একা পেয়ে তােমার অসহায়ত্বের সুযােগ নেবাে, এমনটি ভেবাে না। তুমি নিরূপায় হয়ে আমার সঙ্গ নাও, এটা কখনােই আমার কাম্য নয়।
তুমি যেখানে যেতে চাও, সেখানে পৌঁছে দেয়া আমার দায়িত্ব।
আইয়ুবীর কোন কমান্ডাে নারীর ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলে না। অতএব তােমার ভয়ের কোন কারণ নেই। যদিও এখন আমি সঙ্গীহারা, তবু তুমি আমার আমানত। আমরা আমানতের খেয়ানত করি না।'যতই কষ্ট হােক, এ আমানতের হেফাজত আমি একাই করবাে।
যদি বলাে, তবে তােমাকে তােমার দেশে পৌঁছে দিয়ে আসি। আমি এখন একা, অতএব তােমার হেফাজত ছাড়া আমার আর কোন দায়িত্ব নেই, তাই আমার জন্য কোন চিন্তা করবে না!
ভােরের শীতল বাতাসের চাইতেও আন নাসেরের কণ্ঠ তার কাছে অধিক নির্লিপ্ত ও ঠাণ্ডা মনে হচ্ছিল। গত রাতের সেই আবেগঘন মুহূর্তের আলাপ আর এই উচ্চারণ একই কণ্ঠ থেকে বের হচ্ছে, বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল তার। কিছুক্ষণ সে কোন কথাই বললাে না। তারপর এক সময় মুখ তুলে আকুতিভরা কণ্ঠে বললাে, ‘তুমি আমাকে সঙ্গে নিয়ে চলাে।’ লিজা তাকে বললাে, “আন নাসের! আমাকে একটু আশ্রয় দাও।'
ভােরের আলাে আরাে স্পষ্ট হলাে। আন নাসের তাকিয়ে দেখলাে এক অসহায় নারীর বেদনা মলিন মুখ। সে মুখে দুঃসহ কষ্টের প্রলেপ। সেই অকথিত কষ্ট সইতে না পেরে আন নাসের মুখ ফিরিয়ে নিল । ভােরের আলােয় ভাল করে তাকালাে চারদিকে।
আন নাসের এলাকাটা চিনতে পারলাে। এখানেই কোথাও সে একবার তার কমান্ডো বাহিনী নিয়ে রাতে দুশমনের ওপর আক্রমণ চালিয়েছিল। এলাকাটা ছিল মাটির টিলা ও পাথরে পরিপূর্ণ। উচ্চ ভূমি পেরিয়ে গেলে সামনে স্রোতস্বিনী নদী আছে।
আরেকটু নিশ্চিত হওয়ার জন্য সে সামনের উচ্চ ভূমির দিকে হাঁটা ধরলাে। তাকে অনুসরণ করলাে লিজা। যেতে যেতে উচ্চ ভূমির পরেই সে দেখতে পেল সেই স্রোতস্বিনী নদী। ওরা নদীর কিনারে গিয়ে উপস্থিত হলাে।
আন নাসেরের সমস্ত কাপড় রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল। দুজনেই অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নেমে পানি পান করলাে। ঘােড়াকেও পানি পান করালাে। আন নাসের তার ক্ষত স্থানগুলাে দেখলাে, কত তেমন মারাত্মক ও গভীর ছিল না। অনেক আগেই রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে এই ভয়ে ক্ষতস্থানগুলাে পরিষ্কার করলাে না, কি জানি, যদি ধোয়ার পর আবার রক্ত পড়া শুরু হয়ে যায়!
পানি পান করার পর লিজা তার ব্যক্তিগত কাজে একটু আড়াল খুঁজছিল। সে একদিকে হাঁটা ধরে আন নাসের থেকে বেশ কিছুটা দূরে চলে গেল। এক টিলার আড়ালে গিয়ে বসে পড়লাে সে। এদিকে আন নাসের তার ক্ষতগুলাে পরীক্ষা করে আশপাশে তাকিয়ে দেখলাে লিজা নেই। সে নদীর পাড় থেকে উঠে এলাে এবং লিজাকে খুঁজতে খুঁজতে টিলার অপর পাশে চলে এলাে।
দূর থেকেই সে দেখতে পেলাে লিজা সেখানে বসে গভীর মনােনিবেশ সহকারে কি যেন দেখছে। আন নাসের কিছু না বলে নীরবে এসে তার পিছনে দাঁড়ালাে। দেখলাে, সেখানে মানুষের হাড়-হাড়ি ছড়ানাে। মাথার খুলি, বুকের পাজরা, হাত ও পায়ের আঙ্গুলের হাড় সব ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ছড়িয়ে আছে।
এসব হাড়-হাড্ডির মাঝে পড়ে আছে তলোয়ার ও বর্শা। লিজা একটি মাথার খুলির সামনে বসেছিল। এটা কোন মেয়ে মানুষের মাথা বলে মনে হলি। কারণ ধুলির পাশেই পড়েছিল মাথার লম্বা লম্বা চুল। কিছু ফুল লেগেছিল মাথার খুলির সাথে, কিছু এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিল। বুকের পিঞ্জরায় গােশত, চামড়া কিছুই ছিল না, কিন্তু একটা খঞ্জর তাতে বিদ্ধ ছিল। গলার হাড়ের ওপর পড়ে ছিল সােনার হার। এই দেহ পিঞ্জরের পাশে পাথর চাপা হয়ে পড়ে ছিল উন্নতমানের হেঁড়া রেশমী শাড়ী কাপড়।
আন নাসের এগিয়ে লিজার আরাে কাছে গিয়ে দাঁড়ালাে। লিজা নারীর সেই কংকালের দিকেই গভীর মনে তাকিয়ে ছিল। আন নাসের আস্তে করে ডাকলাে, লিজা!'
লিজা ভয় পাওয়া হরিণীর মত লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল এবং চিৎকার দিয়ে দ্রুত পিছন ফিরলাে। আন নামেরকে দেখে সহসা সে দুই হাত বাড়িয়ে তাকে ভীষণ জোরে জড়িয়ে ধরলাে। আন নাসের তাকে তার বুকে আশ্রয় দিল। লিজার দেহ তখন ভয়ে ভীষণ ভাবে কাঁপছে।
সে যখন কিছুটা স্বাভাবিক হলাে, আন নাসের তাকে জিজ্ঞেস করলাে, ‘চিকার দিয়েছিলে কেন?'
সে উত্তরে বললাে, এই লাশ দেখে আমার জীবনের পরিণামের কথা মনে পড়ে গেল। তখন তার কণ্ঠে ছিল ভয়ার্ত স্বর। সে বললাে, তুমি এই কংকালটির দিকে তাকিয়ে দেখাে, এটি কোন হতভাগী মেয়ের কংকাল। হয়তাে এ মেয়ে আমারই মত পাপিষ্ঠা ছিল। আমার মতই তারও ছিল রূপ ও যৌবনের বাহার। হয়তাে এ মেয়ে আমার চাইতেও সুন্দরী ও বিলাসপরায়ণ ছিল। তার রেশমী পােশাক, কণ্ঠের সােনার হার তার সেই বিলাসপ্রিয়তারই সাক্ষ্য দেয়। কিন্তু দেখাে তার পরিণাম! প্রত্যেকের জন্যই তাে এই পরিণাম অপেক্ষা করছে। কিসের জন্য এত যুদ্ধ, এত সংঘাত, এত রক্তারক্তি? এক সুন্দর ধোকার রাজ্যে পড়ে আছি আমরা। স্বপ্ন দেখছি ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির। কিন্তু এই কংকাল বলছে, এর সবকিছুই মিথ্যে, সবই মিছে মায়া মরিচীকা ।এই সুন্দর ও লাবন্যময় দেহ সৌষ্ঠব, এই মাদকতাময় যৌবনের উচ্ছাস, কিছুই স্থায়ী নয়। সবই ক্ষণিকের মােহ।
এই মেয়েও হয়তাে আমারই মত ভেবেছিল, সে চিরকালই নব যৌবনা হয়ে থাকবে। কিন্তু সামান্য এক টুকরাে ধারালাে লােহা তার সব স্বপ্ন নিঃশেষ করে দিয়েছে।
তার বুকের ওপর যে ছুরিটি বিধে আছে, তা দেখাে। দেখাে তার গলার সােনার হার । এই কণ্ঠহার ও শানিত ছুরি যে জীবনের কাহিনী শােনাচ্ছে, সেটাই তাে আমার জীবন! আর ওই যে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে আছে মাথার খুলি, পড়ে আছে তলােয়ার ও বর্শা, সেখানে কি তুমি তােমার জীবন দেখতে পাও না?
(চলবে)






শেয়ার করুন

Author:

আমি সজীব হোসাইন -এই ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা পাশাপাশি লেখালেখির কাজটাও করি। অনলাইনে প্রযুক্তির বিষয় নিয়ে যা জানি তা মানুষের মাঝে শেয়ার করার ইচ্ছায় এ ব্লগ টি তৈরি করা।