১৮. বিষাক্ত ছোবল(পর্ব-5)
কোনদিন আমি ইতিহাসের কথা মনােযােগ দিয়ে শুনিনি। আজ এই মেয়ের কংকাল দেখে আমার মনে হচ্ছে, এ লাশ ও এ দেহ পিঞ্জরা আমারই।
এই কংকালে আবার মাংস ও চর্ম লাগিয়ে দিলে সেখানে আমার চেহারাই ফুটে উঠবে।
আমি কল্পনায় দেখতে পেলাম এক শকুনকে, সে আমার চেহারা থেকে টেনে বের করছে চোখ। এক নেকড়েকে দেখলাম, সে আমার উজ্জ্বল গােলাপী গাল ছিড়ে খাচ্ছে। এসব মরাখেকোদের তৃপ্তিকর আহারের জন্যই কি আমার জন্ম হয়েছিল?
এই কংকাল চিৎকার করে বলতে চাইছে, লিজা! এই তােমার শেষ পরিণাম! ভাল করে দেখে নাও।' কংকালের সে বিকট চিৎকার শুনে এবং তার বিভৎস রূপ দেখে আমি ভয়ে চিৎকার করে উঠেছিলাম।'
আন নাসের নিবিষ্ট মনে শুনলাে লিজার কথাগুলাে। তার মনে হলাে, সে তাে সত্য কথাই বলেছে! যেখানে ফেদাইনরা আমাদের আক্রমণ করেছিল, কিছুদিন পর সেখানে পেলে আমরা তাে একই দৃশ্য দেখতে পাবাে!'
আন নাসের লিজার কথায় সায় দিয়ে বললাে, সত্যি কথাই বলেছাে লিজা। যেখানে আমরা আক্রান্ত হয়েছিলাম, ক’দিন পর সেখানে গেলে আমরা একই দৃশ্য দেখতে পাবাে। লাশের কংকাল, মাথার খুলি, তলােয়ার ও বর্শা। হয়তাে সেখান থেকে কিছু দূরেই পাওয়া যাবে কারিশমার কংকাল। তার বুকেও দেখতে পাবাে এমনি ভাবে বিদ্ধ হয়ে আছে ছুরি।
কিন্তু তুমি কি জাননা, এই সব মেয়েরাই নারী জাতির কলংক। সভ্যতার বিনাশ সাধনে এদেরকে ব্যবহার করে মানবতার শত্রুরা। আমিও এই জঘন্য পেশায় নিয়ােজিত এক নারী। যদি আমি এ পেশা পরিবর্তন না করি, হয়তাে একদিন এমন নির্জন মরুভূমিতে শিয়াল, শকুন ও নেকড়ে আমার মাংস এমনি করে কুরে কুরে খাবে। যে রূপ নিয়ে আমি গর্ব করি, যাকে পাওয়ার জন্য মানুষ অকাতরে অর্থ-সম্পদ বিলিয়ে দিতে কার্পণ্য করে, যাকে পাওয়ার জন্য এতগুলাে মানুষ আত্মাহুতি দিল, এই তাে তার পরিণতি!
আন নাসের বললাে, কিন্তু মানুষ এ থেকে কোন শিক্ষা গ্রহণ করে না। নিজেদের ধ্বংস ও অধ:পতন লক্ষ্য করে দেখে না। এর আগেও এ পৃথিবীতে এক শ্রেণীর মানুষ ও অহংকারী রাজাবাদশাহ রূপ, যৌবন, সৌন্দর্য ও শক্তির প্রদর্শন করে বেড়িয়েছে, আজও বেড়াচ্ছে। গর্ব, অহংকার ও দম্ভে মদমত্ত মানুষ ভুলে গেছে তার পরিণামের কথা।'
মানুষ এ ভুল করে তার উপলব্ধিহীনতার জন্য, যেমন এতদিন আমি করে এসেছি। কিন্তু এখন আমি নিজেকে চিনতে পেরেছি। আমার মৌলিক সত্ত্বাকে জানতে পেরেছি। লিজা উদ্দীপ্ত কণ্ঠে বললাে, “আন নাসের, তুমিও শুনে নাও, তােমাকেও খােদা পৌরুষদীপ্ত এক অনুপম সৌন্দর্য ও শক্তি দান করেছেন। তােমাকে যে নারী একবার দেখবে সেই তােমাকে পাওয়ার জন্য পাগল হবে। সাবধান হও, তুমিও দেখে নাও তােমার পরিণতি।
সে এমন ভঙ্গীতে কথা বলছিল, যেন তার উপর জ্বীনের আছ পড়েছে। তার চঞ্চল হরিণীর চাপল্য ও চেহারা থেকে দুষ্টুমীর ভাব শেষ হয়ে গিয়েছিল। সে দুনিয়াত্যাগী সন্নাসিনীর মত ভাবগম্ভীর স্বরে কথা বলছিল। আন নাসের অভিভূত হয়ে তাকিয়ে দেখছিল লিজার এ নতুন রূপ। বললাে, লিজা, আমি আমার পৌরুষ নিয়ে গর্ব ও অহংকার করি না। আমি এই শক্তি সেই কাজেই লাগাতে চাই, যে কাজ আল্লাহর পছন্দ। এ উদ্দেশ্যেই আমি কমান্ডো বাহিনীতে নাম লিখিয়েছি।
এই কংকাল তােমার হুশ ফিরিয়ে দিয়েছে, এটা খুবই আশার কথা। কিন্তু মনে রেখাে, জীবন যেমন কেবল ভােগের নাম নয়, তেমনি আশা ও স্বপ্নহীনতার নামও জীবন নয়। এ কংকাল দেখে তুমি মারাত্মক রকম ধাক্কা খেয়েছে, জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা এসে গেছে তােমার, এই উভয় প্রান্তিকতা থেকেই ফিরে আসতে হবে তােমাকে। চলাে উঠা যাক।
ওরা ওখান থেকে উঠে এলাে। ফিরে এলাে নদীর পাড়ে। হাঁটতে হাঁটতে লিজা বললাে, ‘আন নাসের, তােমাকে আমি এমন কিছু কথা শােনাতে চাই, যা তুমি আমার কাছ থেকে কখনাে আশা করেনি। আমিও ভাবতে পারিনি, এসব গােপন কথা কখনাে আমি তােমার কাছে প্রকাশ করবাে। কিন্তু আজ আমি উপলব্ধির এক নতুন দিগন্তে এসে পড়েছি। লােভ ও স্বার্থের চাইতে সত্যকে প্রকাশ করে দেয়া এখন আমি অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি। তুমি কি একটু মন দিয়ে আমার কথাগুলাে শুনবে?'
বিস্মিত আন নাসের লিজার দিকে তাকিয়ে বললাে, কি কথা লিজা!
আমি তােমাকে বলে দিতে চাই, আমার বুকের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অনেক গােপন কথা, যা আমি না বললে কোনদিন তুমি জানতে পারতে না।
সে হাঁটতে হাঁটতে নদীর পাড়েই এক পাথরের ওপর বসে পড়লাে । প্রশ্নবােধক দৃষ্টি নিয়ে আন নাসেরও বসলাে আরেক পাথরে।
লিজা কিছুক্ষণ আনমনা হয়ে তাকিয়ে রইলাে নদীর দিকে, যেন। কি বলবে গুছিয়ে নিচ্ছে। তারপর কিছু না বলেই সে তার হাত দুটো নিয়ে গেল গলায়। নিজের কণ্ঠহারটি আকড়ে ধরলাে, যে হারে মূল্যবান হীরা ও জওহর লাগানাে ছিল।
সে হারটি মুঠোর মধ্যে নিয়ে জোরে টান দিল। হারটি ছিড়ে চলে এলাে তার হাতে। লিজা দেরী না করে সামনের স্রোতস্বিনী নদীতে ছুঁড়ে ফেললাে হারটি।
লিজা আঙ্গুল থেকে তার মূল্যবান হীরার আংটিটিও খুলে ফেললাে। সেটাও নদীতে ফেলে দিল। বিস্মিত আন নাসের বলে উঠলাে, এসব কি হচ্ছে? কি করছাে তুমি? গলার হার, হাতের আংটি এসব ফেলে দেয়ার মানে কি?
‘এসবই সকল বিভ্রান্তির মূল । এই সম্পদ ও সােনার মােহই আমাকে এই পঙ্কিল পথে টেনে নামিয়েছে। এগুলােই আমার জীবনের অনিষ্টের মূল।' লিজা উত্তেজিত কণ্ঠে বলতে লাগলাে, ‘আন নাসের! তুমি জানাে না, আমি কত বড় শঠ, প্রতারক। প্রতারণা করার জন্য আমাদেরকে নানা রকম প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। আমরা মানুষের চোখে মায়ার অঞ্জন মেখে তাকে বিভ্রান্ত করি। মরুভূমির মরিচীকার মতই আমরা স্রেফ ধোকা ছাড়া আর কিছু নই। আমার নিজেরই বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে, আমি তােমাকেও ধোঁকা দিতে গিয়েছিলাম।'
ভালবাসার নাম করে তুমি আমার সাথে প্রতারণা করেছিলে? প্রশ্ন নয়, বিস্ময় ঝরে পড়লাে আন নাসেরের কণ্ঠ থেকেও।
না, নাসের, না!' ব্যাকুল কণ্ঠে বললাে লিজা, তােমাকে দেখেই আমার অন্তরে ভালবাসা সৃষ্টি হয়েছিল। সেই ভালবাসার টানেই তােমাকে বলেছিলাম, পালাতে চাইলে আমি তােমাকে সাহায্য করবাে। কিন্তু পরে তোমার সাথে ভালবাসার অভিনয় করার দায়িত্ব পড়ে আমার ওপর। দায়িত্ব পাওয়ার পর তােমার সাথে মিশতে গিয়ে আমি ভেতরে ভেতরে রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত হয়েছি। কখনাে মনে হয়েছে, ভালবাসার টানেই তােমার কাছে ছুটে এসেছি, কখনাে মনে হয়েছে, ভালই তাে অভিনয় চালাচ্ছি!
ফেদাইনরা যদি আমাদের উপর আক্রমণ না চালাতাে এবং এই কংকাল আমার চোখ খুলে না দিত, তবে তুমি জানতেও পারতে না, ভালবাসার নাম করে আমি তােমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিলাম।
লিজার কথা শুনে আন নাসের এতটাই বিস্মিত হয়েছিল যে, সে যেন বােবা হয়ে গেলাে। তবু কোন রকমে ঢােক গিলে বললাে,
‘কি সব আবােল তাবােল বকছে! তােমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?
না, নাসের, মাথা আমার খারাপ হয়নি। আজ যদি এ কংকাল আমার হুশ ফিরিয়ে না দিত তবে তােমাকে আমি এমন জায়গায় নিয়ে যেতাম, যেখানে তােমার আমার ভালবাসারই সমাধি হতাে না, তােমার জীবনও ভয়ংকর এক দুঃস্বপ্নের মধ্যে ডুবে
যেত। তুমি গুমাস্তগীনের এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের শিকার হতে গিয়ে বেচে গেছো। এখন আমি আর কোন মিথ্যা বলব না। তোমাকে দিয়ে সুলতান আইয়ুবীকে হত্যা করার কন্য এক গভীর ষড়যন্ত্র করা হয়। পরিকল্পনা সফল হলে ইতিহাসে তুমিই চিহ্নিত হতে আইয়ুবীর খুনী হিসেবে।
স্তম্ভিত আন নাসের বলল, তা কি করে সম্ভব। আমি আইয়ুবীর জন্য জান দেয়ার সংকল্প করে পথে নেমেছি, আমি তাকে হত্যা করতে যাব কেন?
সে অনেক কথা। তাহলে শােন, আইয়ৰীকে হত্যা করার লােক ভাড়া করার জন্য হারান থেকে গুমাস্তগীন এসেছিল আহিয়াত দুর্গে । শেখ মান্নান তাকে বললাে, চারজন ফেদাইন খুনীকে এরই মধ্যে এ উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। যদি এরা সফল হয় ভাল, কিন্তু যদি ব্যর্থ হয়, তবু আমার করার কিছু নেই। আমি আমার শ্রেষ্ঠ খুনীদেরকেই আইয়ুবীর পিছনে লাগিয়েছি, এরা ব্যর্থ হলে বেহুদা অন্য কোন ফেদাইনকে তার পেছনে লাগিয়ে অযথা সময় ও শক্তির অপচয় করতে চাই না।' গুমাস্তগীন তাকে বললাে, তুমি আমাকে নিরাশ করাে না।
আমি অনেক আশা ভরসা করে তােমার কাছে এসেছি।
গুমাস্তগীনের কথা শুনে শেখ মান্নানের মাথায় নতুন বুদ্ধি আসে। সে তােমাদেরকে উপযুক্ত মূল্যের বিনিময়ে তার কাছে বিক্রি করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
এ সময় আমাদের খৃষ্টান অফিসারও সেখানে উপস্থিত হয়। সুলতান আইয়ুবীকে হত্যা করা আমাদের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। প্রস্তাব শুনে তিনি খুশী হন এবং তােমাদের মগজ ধোলাইয়ের দায়িত্ব তিনি নিজেই নিয়ে নেন। শেষ পর্যন্ত দাম ঠিক করে মূল্য বুঝে পেয়ে তিনি তােমাদেরকে তুলে দেন গুমাগীনের হাতে।
সেই খৃষ্টান অফিসারই আমার ওপর দায়িত্ব দেয় তােমাকে আমার রূপের ফাঁদে আটক করার। ভালবাসার অভিনয় করে তােমার জ্ঞান-বুদ্ধি, চিন্তা-চেতনা আমার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার হুকুম পেয়ে সাথে সাথেই আমি কাজে নেমে পড়ি। আমার তােমাকে তৈরী করা।'
না, এটা কখনও সব নয়। আমি সুলতান আইয়ুবীর ছায়াকেও সম্মান করি। আমাকে দিয়ে কোনদিনই তুমি এ উদ্দেশ্য সফল করতে পারতে না। আন নাসের বললাে, দুনিয়ার কোন শক্তিই আমাকে দিয়ে আমাদের নেতা, ক্রুসেডের বিরুদ্ধে অকুতােভয় বীর, মহানায়ক গাজী সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর কোন ক্ষতি করাতে পারতাে না। আমি কখনােই নিজেকে এতটা নির্বোধ মনে করি না।'
লিজা একটু হাসলাে। বললাে, তুমি কতটা নির্বোধ আর বুদ্ধিমান সেটা এখন আর বিচার করতে চাই না। তবে আমি চাইলে ইস্পাতকেও গলিয়ে পানি করে দিতে পারি। তুমি আর বুদ্ধির বড়াই করাে না। নিজের ওপর তােমার কতটা নিয়ন্ত্রণ আছে ভালই জানা আছে আমার।
তােমার ধর্ম, তােমার এতদিনের শিক্ষা ও আচার কি নিশুতি রাতে অচেনা মেয়ের সাথে গােপনে দেখা করার অনুমতি দেয়? কিন্তু তুমি তা করােনি? যেভাবে এই অনুচিত কাজকে তুমি বাস্তবে করেছে, সেভাবেই তােমার ইচ্ছার বিপরীত আইয়ুবীকে হত্যার কাজও তুমি নির্বিঘ্নে করে দিতে, যদি আমি চাইতাম।'
সত্যি আমি বিবেকের ওপর আবেগকে প্রাধান্য দিয়ে বড় অন্যায় করে ফেলেছি। আমার ঈমানকে তুমি দুর্বল করে দিয়েছিলে। আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন। আমি চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছি, এ জন্য আমি অনুতপ্ত। আমার মনের মধ্যে যে অপরাধবোেধ ছিল, সত্যকে প্রকাশ করে তা থেকে মুক্তি চাচ্ছিলাম আমি। এখন আমার মনে আর কোন গ্লানি নেই। তােমার কাছে এ সত্যটুকু প্রকাশ করতে না পারলে মরেও আমি শান্তি পেতাম না। আমাকে তুমি ক্ষমা করে দিও। দোয়া করাে, যেন মৃত্যুর আগে আর কখনাে এমন জঘন্য পাপ আমাকে করতে না হয়।'
ক্ষমার মালিক আল্লাহ। অন্ধকার থেকে যদি আলাের ভুবনে তুমি আসতে চাও, আমি তােমাকে স্বাগতম জানাবাে। দোয়া করি, বিবেকের পথ ধরে যেনাে চলতে পারাে চিরদিন।
তুমি কি জাননা, এক সময় আমি সাইফুদ্দিনের কাছেও থেকেছি আমি এক অপবিত্রা ও পাপিষ্ঠা মেয়ে। এই পাপ নিয়ে আমি কি আলাের পথে আসতে পারবাে? আমাদের মত পাপী মেয়েদেরও কি অধিকার আছে তােমাদের ধর্ম গ্রহণ করার?
আমাদের ধর্ম তাে তাদের জন্যই, যারা এখনাে আলােকের সন্ধান পায়নি। মুক্তির রাজপথ থেকে যারা দূরে, তাদেরকে মুক্তি পথের সন্ধান দেয়ার জন্যই পৃথিবীতে এসেছিলেন আমাদের নবী। তিনি রাহমাতুল্লিল আলামীন- সমস্ত বিশ্ব জগতের জন্য রহমত স্বরূপ। কোন বিশেষ গােষ্ঠী, গোত্র বা বর্ণের জন্য তিনি আসেননি। আল্লাহর দেয়া সূর্য যেমন সবাইকে আলাে দেয়, আল্লাহর দেয়া জীবন বিধান তেমনি সবার জন্য।
সে বিধানের নাম ইসলাম। সে বিধানটি যেখানে লিপিবদ্ধ আছে তাকে বলা হয় কোরআন। আর সে বিধান মত যারা জীবন চালায় তাদের বলা হয় মুসলিম। মুসলিম মানে অনুগত, তুমি আল্লাহর আনুগত্য কবুল করে নিলেই মুসলিম উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। তােমার স্রষ্টার দেয়া বিধানের আনুগত্য করবে। তুমি, কার সাধ্য আছে তােমাকে সে অধিকার থেকে বঞ্চিত করে?
লিজা বললাে, আমি যদি বিশুদ্ধ মনে ইসলাম গ্রহণ করে নেই, আল্লাহ হয়তাে আমাকে গ্রহণ করে নেবেন। কিন্তু জেনে শুনে তুমি কি আমার মত একজন পাপীকে তােমার জীবন সঙ্গী হিসাবে গ্রহণ করতে পারবে?
‘তুমি যদি বিশুদ্ধ মনে তওবা করে নিজেকে আল্লাহর কাছে সােপর্দ করে দিতে পারাে, আল্লাহ ওয়াদা করেছেন, তােমার পূর্ববর্তী সকল গুণাহ তিনি মাফ করে দেবেন। যাকে আলাহ ক্ষমা করে দিয়ে নিজের পছন্দনীয় বান্দী করে নেবেন, তাকে অপছন্দ করা এবং গ্রহণ না করা তাে আমার জন্য পাপ ও অপরাধ হবে!
‘আন নাসের!' লিজা আবেগ মথিত কণ্ঠে বললাে, তাহলে আমি আমার ধর্ম ত্যাগ করে নিজেকে মুসলিম বলে ঘােষণা করছি।'
আমিও তােমাকে আমার জাতির এক কন্যা হিসাবে গ্রহণ করে নিচ্ছি। কিন্তু তােমাকে জীবন সঙ্গী করার সিদ্ধান্ত আমি এ মুহুর্তে নিতে পারবাে না। আমি সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর এক কমান্ডো সেনা। তাঁর অনুমতি ছাড়া জীবন সঙ্গী বাছাই করার মত গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক সিদ্ধান্ত আমি গ্রহণ করতে পারি না।'
তেমন সিদ্ধান্ত নিতে আমি তােমাকে কখনােই বাধ্য করবে। তুমি আমাকে তােমার জাতির এক কন্যা হিসাবে গ্রহণ করে নিয়েছে, এতেই আমি সন্তুষ্ট। আমি যেনাে সঠিকভাবে আল্লাহর পথে চলতে পারি, এ ব্যাপারে আমি তােমার সাহায্য ও পরামর্শ চাই।'
‘অন্তর থেকে পাপের বােঝা নামিয়ে দাও! যখন থেকে তুমি ইসলামকে গ্রহণ করে নিয়েছে, তখন থেকেই বিরাট এক দায়িত্ব এসে কাঁধে চেপেছে তােমার। এ বি জাহানের একমাত্র স্রষ্টা ও মালিক মহান রাববুল আলামীনের বিশ্বস্ত
গােলাম হিসাবে আল্লাহ তােমাকেই তাঁর খলিফা নিযুক্ত করেছেন। অতএব এখন থেকে আল্লাহর এ দুনিয়ায় শান্তি শৃংখলা রক্ষা করার দায়িত্ব তােমার। এ পৃথিবী আল্লাহর বাগান। তুমি এ বাগানের মালি। অতএব সেইভাবে জীবন যাপন করাে, যাতে তােমার চেষ্টা ও সাধনায় আল্লাহর এ বাগানের সৌন্দর্য ও শ্রী বৃদ্ধি পায়।
এ সময় হঠাৎ লিজা উঠে দাঁড়ালাে। এক ধরনের ব্যগ্রতা ও ব্যস্ততা ফুটে উঠলাে তার চোখে মুখে। আন নাসের প্রশ্নবােধক দৃষ্টি নিয়ে তাকালাে তার দিকে। বললাে, কি হয়েছে লিজা!
লিজা চেহারায় সেই ব্যগ্রতা ধরে রেখেই বললাে, তােমার কি জানা আছে, ফেদাইনরা সুলতান আইয়ুবীকে হত্যা করতে গেছে। তাদের এ হত্যা পরিকল্পনা কেমন করে বাস্তবায়ন করবে, তা কি তুমি জাননা?'
না, কিছুই জানি না। লিজা, তুমি কি নিশ্চিত যে চারজন ফেদাইন খুনী সুলতানকে হত্যা করার জন্য সত্যি রওনা হয়ে গেছে?
লিজা উত্তর দিল, “একশাে ভাগ। তবে আমাকে শুধু এ পর্যন্তই জানানাে হয়েছে, সেখানে চারজন ফেদাইন খুনীকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। তারা কি পােশাকে গেছে, কিভাবে তারা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে, সে সব আমি কিছুই জানি না।'
‘আমাকে এখন উড়ে গিয়ে তুর্কমান পৌছাতে হবে।' আন নাসের বললাে, সবার আগে সুলতানকে এবং তার রক্ষী বাহিনীকে সতর্ক ও সাবধান করতে হবে।
আন নাসেরের ভাবালুতা কেটে গেল। সে আবার পুরােদস্তুর আইয়ুবীর একজন কমান্ডো ও কমাণ্ডোদের দলনেতা হয়ে উঠলাে, যদিও তখন তার আর কোন সাথী বেঁচে ছিল না।
সে লিজাকে ঘােড়ার পিঠে বসিয়ে দ্রুত ঘােড়া ছুটিয়ে দিল। ঘােড়ার গতি তীব্র হওয়ায় বার বার তার শরীরের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল লিজা। কিন্তু এমন সুন্দরী ও যুবতী নারীর স্পর্শ তার মনে কোনই প্রভাব ফেলতে পারছিল না। তার চোখের সামনে তখন ভাসছিল শুধু সুলতান আইয়ুবীর হাসিমাখা প্রশান্ত ছবি।
আশঙ্কার দাবানল তার পেরেশানী বাড়িয়ে তুলছিল। সে মনে মনে শুধু প্রার্থনা করছিল, হে আল্লাহ, আমাকে তুমি তােমার কাছে তুলে নাও, তার আগে শুধু এই খবরটা একবার সুলতানকে পৌঁছানাের সুযােগ দাও আমায়।'
আন নাসের এখন তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন। দায়িত্ব ও কর্তব্যের বাইরে আর কিছুই তাকে স্পর্শ করতে পারছে না। যৌবনের চাহিদা, ভালবাসার আবেগ।
সবকিছুই তার অন্তর থেকে হারিয়ে গেছে। এমনকি তার জৈবিক চাহিদা ক্ষুধা-তৃষ্ণার কথাও যেন সে ভুলে গেছে।
অন্যদিকে লিজার মধ্যেও ঘটে গেছে এক আশ্চর্য পরিবর্তন। মানুষের মন কত দ্রুত বদলে যেতে তাকে না দেখলে তা বুঝার উপায় নেই। চির চঞ্চলা লিজার মধ্যে এখন আর চাঞ্চল্যের ছিটেফোটাও অবশিষ্ট নেই। ভাবগম্ভীর লিজাকে দেখলে মনে হবে তার আত্মাটাই আমূল পরিবর্তিত হয়ে গেছে।
প্রতিটি নারীর মধ্যে নারীত্বের যে সহজাত বােধ কাজ করে সে উপলব্ধি যেন সে হারিয়ে ফেলেছে। রেলিং ধরে একাকী দাঁড়িয়ে থাকা, আর এক সুঠাম ও তেজস্বী যুবককে জড়িয়ে ধরে থাকার মধ্যে যে পার্থক্য আছে, এই বােধটুকুও তার মধ্যে কাজ করছিল না।
এক যুবকের কণ্ঠলগ্ন হয়ে বসে আছে এক যুবতী, এ বােধ তখন ওদের কারাে মাঝেই ছিল না। আন নাসের ফিরে গিয়েছিল তার অতীত ভূমিকায় আর লিজা আন নাসেরের কথা ও কাজে এবং সঙ্গীদের পরিণতি ও কংকাল দর্শনে এতটাই বিহবল হয়ে পড়েছিল যে, কোন উপদেশ দাতা সারা জীবন উপদেশ দিয়েও তার মধ্যে যে পরিবর্তন আনতে পারতাে না, কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে সেই অভাবিত পরিবর্তন এমনিতেই ঘটে গিয়েছিল। আন নাসেরের চোখের জ্যোতি যেন তাকে সতর্ক ও সাবধান করে দিয়ে বলছিল, যদি পবিত্র জীবন-যাপন করতে চাও, তবে সে জীবন একমাত্র ইসলামই তােমাকে উপহার দিতে পারে।
সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী এজাজ দুর্গের অধিপতির উত্তর শুনে এবং দূতের সাথে তার খারাপ ব্যবহারের খবর পেয়ে খুবই মর্মাহত হলেন। তার এ ব্যবহারে তিনি কেবল মর্মাহতই হলেন না, যথেষ্ট রাগান্বিতও হলেন। উপলব্ধি করলেন, এর একটি সমুচিত জবাব দেয়া ফরজ হয়ে গেছে।
তিনি তখনই সে কেল্লা দখল করার সংকল্প করলেন। সঙ্গে সঙ্গে হলব শহরও অবরােধ করার পরিকল্পনা করলেন।
বুজা ও মুমবাজ দুর্গ বিনা বাধায় দখল হয়ে গিয়েছিল। সেখানকার সেনাবাহিনী সুলতানের আনুগত্য স্বীকার করে নিয়ে সুলতানের বাহিনীতে শামিল হয়ে গিয়েছিলাে। সুলতান তার বাহিনীর পরীক্ষিত সৈন্যদেরকে সেই দুই কেল্লার দায়িত্বে পাঠিয়ে সেখানকার সেনাদলকে নিজের বাহিনীর সাথে একীভুত করে দিলেন।
এরপর তিনি এজাজ ও হলবে অভিযান চালানাের পরিকল্পনা করলেন। অভিযান চালানাের আগে ওখানকার অবস্থা সরেজমিনে তদন্তের জন্য তিনি তাঁর গােয়েন্দা বিভাগের বিশেষ বাহিনীকে আগেই পাঠিয়ে দিলেন। বাহিনীর সাথে পাঠালেন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা, যাতে তিনি অভিযান চালানাে ও হল অবরােধের সুনির্দিষ্ট কর্মসূচী প্রণয়ন করতে পারেন।
গােয়েন্দা বাহিনী যথাসময়ে সুলতানের কাছে হলব ও এজাজের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিস্তারিত রিপাের্ট পেশ করলাে।
সুলতান আইয়ুবীর এটি ছিল একটি ব্যতিক্রমী অভিযান। তিনি এ অভিযানে তার নিজস্ব পতাকা সঙ্গে না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। নিজের দেহরক্ষীদের বললেন, 'এ অভিযানে আমাকে সঙ্গ দেয়ার কোন দরকার নেই তােমাদের।'
এরপর তিনি তার ঘােড়া পাল্টালেন। তার নিজ ঘােড়ার রং ছিল সাদা। সেই সাদার মধ্যে মাঝে মাঝে উজ্জ্বল লাল রংয়ের ডােরাকাটা দাগ। শত্রুরা এ ঘােড়াটিকে ভালমতই চিনতাে।
এসব কিছুর উদ্দেশ্য ছিল একটাই, শক্ররা যাতে তাকে চিনতে না পারে। সালাহউদ্দিন আইয়ুবী এখন কোথায় আছেন, এ প্রশ্নের উত্তর যেন জানা না থাকে কারাে।
গােয়েন্দা বাহিনীর রিপাের্টের ওপর ভিত্তি করে পথ চলতে লাগলেন তিনি। নিজেও মিলিয়ে নিচ্ছিলেন, রিপাের্টগুলাে ঠিক আছে কিনা। যাত্রা পথের সকল বাঁধা ও প্রতিবন্ধকতাগুলাে সচক্ষে দেখে, ধীরে ধীরে এগুচ্ছিলেন তিনি, যাতে যুদ্ধের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু ছােটখাটো বিষয়গুলােও দৃষ্টি না এড়ায়। যুদ্ধ সংক্রান্ত ব্যাপারে তিনি যেসব উপদেষ্টা ও সেনাপতিদের পরামর্শ গ্রহণ করেন, তারা তাকে বার বার সতর্ক করলাে, “দয়া করে আপনি দেহরক্ষী ছাড়া একা কোথাও যাবেন না। কিন্তু ব্যক্তিগত বিষয় বলে এ প্রসংগটিকে তিনি কোন রকম আমলেই নিলেন না।
আসলে এজাজের ব্যবহারে তিনি এতটাই অসন্তুষ্ট ও ক্ষীপ্ত হয়েছিলেন যে, তিনি তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছিলেন না। তার মাথায় রীতিমত খুন চেপে গিয়েছিল। তিনি শেষবারের মত তার মুসলমান শত্রুদের নাকানি-চুবানি খাওয়াতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হলেন। কিন্তু তিনি যে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, সেদিকে কোন খেয়াল নেই।
তিনি এখন যে এলাকাটি অতিক্রম করছিলেন তা সর্বত্র টিলা ও পাহাড়ী উপত্যকায় পরিপূর্ণ। কোথাও কোথাও বৃক্ষের ছায়া আছে। কোন কোন স্থানে আবার গভীর খাদ। এলাকাটি দুর্গম ও সত্যি ঝুঁকিপূর্ণ। এমন এলাকায় দেহরক্ষী ছাড়া সুলতান
(চলবে)
0 coment rios:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন