শুক্রবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৯

ক্রুসেড সিরিজ-১৮. বিষাক্ত ছোবল(পর্ব-3)

১৮. বিষাক্ত ছোবল(পর্ব-3)

আন নাসের দৃষ্টি প্রসারিত করে দূরে তাকালাে। দুর্গের প্রাসাদগুলাের বিন্যাস দেখে বুঝতে পারল, দুর্গটি বেশ বড় এবং দুর্গটি লম্বাটে ধ্বনের।
লিজা আন নাসেরকে প্রাসাদ থেকে বের করে যেখানে নিয়ে এসেছে, সে জায়গাটি খুবই মনােরম। ওরা পাথরের ওপর বসে যখন আলাপ করছিল, আন নাসের ধরেই নিয়েছিল, কেউ তাদের দেখতে পাচ্ছে না, তাদের এ আলাপও কেউ শুনতে পাচ্ছে না। কিন্তু প্রাসাদের বারান্দার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে বহু দূর থেকেও ওদের দেখতে পাচ্ছিল খৃস্টান অফিসার এবং কারিশমা। কারিশমা বারান্দার এক পিলারের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে নীরবে তাকিয়ে ছিল ওদের দিকে।
‘লিজা কি তাকে তার যাদুর ফাঁদে ফেলতে পারবে!' খৃষ্টান অফিসার শঙ্কিত কণ্ঠে বললাে।
হ্যা, লিজা খুব আবেগী মেয়ে।' কারিশমা বললাে, ভাবছি, ভাব করতে গিয়ে সে তার মূল দায়িত্বই না ভুলে যায়!
‘আসলে এতাে অল্প বয়সে তাকে এ ধরনের জটিল ডিউটিতে পাঠানাে উচিত হয়নি আমাদের।' খৃস্টান অফিসারের কণ্ঠে সহানুভূতির সুর।
“আরে, এতে ঘাবড়ানাের কি আছে! আমরা তার সঙ্গে আছি না! আর সেও একেবারে কচি খুকী তাে নয়, আশা করি ঠিকই সামলে নিতে পারবে। যদি কুলিয়ে উঠতে না পারে, আমি তাে আছিই।'
ওরা যখন এসব বলাবলি করছিল, লিজা তখন আন নাসেরকে বলছিল, তুমি তাে আমাকে জিজ্ঞেস করছিলে, আমি তােমার প্রতি কেন এত সদয় হয়েছি। তুমি তাে তখন আমাকে শক্ত ভেবেই একথা জিজ্ঞেস করছিলে। আচ্ছা, তুমিই বলো তাে, তােমার আমার মাঝে কিসের শত্রুতা? শক্রতা তাে তােমার ও আমার সুলতান ও সম্রাটের ব্যাপার। তাদের সে শত্রুতা তােমার ও আমার মাঝে অন্তরায় সৃষ্টি করবে কেন?'
আর বন্ধুত্বই বা কেমন করে হবে, যেখানে আমরা দুই প্রতিদ্বন্দী দলের সদস্য। আন নাসের জিজ্ঞেস করলাে। ‘সেটা তাে লড়াইয়ের ময়দানের ব্যাপার! আচ্ছা, এটা কি কোন যুদ্ধের মাঠ, নাকি এখানে এখন কোন সংঘাত চলছে। এই নিস্তব্ধ রাত, এই শীতল হাওয়া, এই ফুলের সুবাস, এই নির্জনতা, এরা কি যুদ্ধের কথা বলে, নাকি প্রেমের বার্তা বয়ে আনে?'
‘প্রেমের বার্তা তাে প্রেমিক-প্রেমিকার জন্য, আমরা তাে যােদ্ধা, আমরা কমাণ্ডা সৈনিক। প্রেমের ভাবালুতায় মজে যাওয়ার সময় কোথায় আমাদের?
লিজা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললাে। সে দীর্ঘশ্বাসের তপ্ত বাতাস যেন আন নাসেরকে স্পর্শ করে গেল। লিজা তার কোমল বাহু আন নাসেরের কাঁধে রেখে বললাে, তুমি কি সত্যি এক কঠিন পাথর? আমি শুনেছিলাম, মুসলমানের মন রেশমের মত নরম ও কোমল। ধর্ম বিষয়টা কিছুক্ষণের জন্য দূরে সরিয়ে রেখে তুমি কি নিজেকে এবং আমাকে মানুষ ভাবতে পারাে না? তুমি মুসলমান আর আমি খৃষ্টান, এটা তাে পরের ব্যাপার, পৃথিবীতে আমরা তাে এসেছি মানুষ হিসাবে! সেই মনুষত্বের কি কোন মূল্য নেই আমাদের উভয়ের বুকের মধ্যে আল্লাহ যে একটা কোমল মন দিয়েছেন, তাকে কি তুমি অস্বীকার করতে চাও? চোখ বন্ধ করে একটু হৃদয়ের হাহাকার শােন। উপরের আবরণ সরিয়ে অন্তরের অন্তস্থলে যে সুরের মূর্ছনা বাজছে, কান পেতে শােন সে আওয়াজ। নিজের আত্মাকে জিজ্ঞেস করাে, সে কি চায়? চারদিক থেকে একটি ধ্বনিই কেবল শুনতে পাবে তুমি, ভালবাসা, ভালবাসা। এই ভালবাসাকে যে অস্বীকার করে, সে মানুষ নয়। হয় সে ফেরেশতা, নয়তাে শয়তান। জানি না তুমি এর কোনটি।
‘দেখাে লিজা! আমি ফেরেশতা নই, শয়তানও নই। আর দশজন রক্তমাংসের মানুষের মত আমিও মানুষ। কিন্তু আমার যেমন আত্মা আছে তেমনি বিবেকও আছে। আত্মা আমার কাছে অনেক কিছুই চায়, কিন্তু আমি ততটুকুই তাকে দেই, যতটুকু বিবেক অনুমােদন করে। মানুষ ও পশুর মধ্যে পার্থক্য কি জানাে? পশু আত্মার গােলামী করে আর মানুষ বিবেকের হুকুম মতাে চলে। তুমি কি তােমার বিবেককে অস্বীকার করতে চাও? তুমি কি বলতে চাও, তােমার মধ্যে বিবেক বলে কিছু নেই?
‘হয়তাে আছে, হয়তাে নেই!’ লিজা উদাস কণ্ঠে বললাে, তুমি পুরুষ মানুষ! তুমি তােমার মনকে বাঁধতে পারাে। কিন্তু আমি যে এক অবলা নারী! আমার তাে সে শক্তি ও সাহস নেই, যা দিয়ে আমি বশ করবাে আমার চিত্তকে। আমি আমার অন্তরের হাহাকার শুনবাে, তার বেদনায় ক্ষতবিক্ষত হবো । আমার রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত চিত্ত দেখে আমার দুর্বল মন ছন্নছাড়া হয়ে যাবে, এইতাে আমাদের নিয়তি! আচ্ছা, বলতে পারাে নিয়তি এত নিষ্ঠুর কেন?'
‘নিয়তিকে অযথা দোষারােপ করছাে কেন, সে তাে আমাদের দুজনকে দুই আলাদা ঠিকানা ঠিক করে দিয়েছে, যাতে বেদনার তীর পরস্পরকে বিদ্ধ করতে না পারে।
‘না’, ভুল বললে তুমি। দু'দিন আগেও আন নাসের বলে কাউকে চিনতাম না আমি। নিয়তিই তােমাকে আমার কাছে এনে দিয়েছে। তােমাকে দেখে আমার চোখে নতুন স্বপ্নের বীজও বুনেছে নিয়তিই। আমার মনের ভেতর তােমার যে ছবি অক্ষয় হয়ে আছে, সে ছবি কে এঁকে দিয়েছে আমার মনে? এটাও নিয়তিরই কাজ। আমার মনের মনিকোঠায় তােমার যে ছবি খােদাই করা হয়েছে, পৃথিবী উল্টে গেলেও সেখান থেকে কেউ কোন দিন তা সরাতে পারবে না।'
‘লিজা, এসব কথা বলে আমাকে তুমি পটাতে পারবে না। ট্রেনিং দেয়ার সময়ই এ ব্যাপারে আমাদের সাবধান করা হয়েছে। তােমাদের পাতা ফাঁদে পা না দেয়ার জন্য বার বার সতর্ক করা হয়েছে আমাদের অতএব আমার পেছনে সময় ব্যয় না করে তুমি অন্য কাজে মন দিতে পারাে।
কি! আমাকে তুমি তাদের দলে ফেলতে চাও, যারা প্রতারক, ধোঁকাবাজ! তােমার বিশ্বাস, ভালবাসার কথা বলে আমি তােমাকে ফাঁদে জড়াতে চাইছি। কিন্তু না, এটা তােমার ভুল ধারনা।
লিজা কিছুটা উত্তেজিত কণ্ঠে বলতে লাগলাে, তাহলে শােন, আমি তােমাকে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় এই দুর্গে নিয়ে এসেছিলাম। শেখ মান্নান তােমাদের চারজনকেই কারাগারের গােপন প্রকোষ্ঠে বন্দী করার হুকুম দিয়েছিল। যদি তােমাদেরকে সেখানে সত্যি বন্দী করা হতাে, তবে তােমাদের লাশ ছাড়া আর কিছুই সেখান থেকে বের হতাে না। আমি তােমাদের এই পরিণতির কথা স্মরণ করে শিউরে উঠলাম। শেখ মান্নানকে বললাম, এরা তােমার কয়েদী নয়, আমাদের শিকার। এরা আমাদের হেফাজতেই থাকবে। এই নিয়ে ওর সাথে আমাদের অনেক কথা কাটাকাটি হয়। সে শর্ত আরােপ করে বলে, যদি তুমি এই বন্দীদেরকে কয়েদখানার জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে চাও, তবে এক শর্তে আমি তা মেনে নিতে পারি, তুমি আমার স্বপ্নপুরীতে এসে আমার আশা পূরণ করবে। কিন্তু শেখ মান্নানের মত জঘন্য খুনীকে আমি ঘৃণা করি। তার মত এক বুড়াের কুৎসিত আহবান প্রত্যাখ্যান করে আমি বলি, এটা কিছুতেই সব নয়।' শেখ মান্নানও তার শর্তে অনঢ়। বললাে, “ঠিক আছে, এই চার কমাণ্ডো কারাগারে থাকবে নাকি তুমি আমার স্বপ্নপুরীতে আসবে, এটা তুমিই ফায়সালা করাে। এ শর্তের কোন নড়চড় হবে না।'
কারিশমা আমাদের ঝগড়া থামাতে অনেক চেষ্টা করেছে। সে একবার শেখ মান্নানকে বুঝায়, একবার আমাকে। কিন্তু আমরা
উভয়েই যার যার সিদ্ধান্তে অটল থাকি। তখন কারিশমা আমাকে একদিকে টেনে নিয়ে বললাে, লিজা, এটা শেষ মান্নানের দুর্গ। আমাদের মত দুই মেয়ে তার সাথে লাগালাপি করে কখনাে পারবাে না। তুই যদি শেখ মান্নানের কাছে নাও যাস, আপাতত তুই তার শর্ত মেনে নে। তারপর কি করা যায় আমি দেখবাে।
আমার তখন জিদ চেপে গেছে। যে করেই হােক তােমাদের আমি মুক্ত রাখার অটল সিদ্ধান্ত নিলাম। কেন যেন আমার তখন মনে হচ্ছিল, যুগ যুগ ধরে তুমি আমার পরিচিত। আমি যেন তােমাকে আজ থেকে নয়, সেই ছােট বেলা থেকেই ভালবেসে এসেছি। শুধু তােমার জন্যই আমার এ দেহ ও মন এত যত্ন করে গড়ে তুলেছি। আমি শেখ মান্নানের শর্ত মেনে নিয়ে তােমাদের মুক্ত করে নিলাম।
‘তুমি কি তােমার সম্মান ও ইজ্জত কুরবানী করে দিয়েছ আন নাসের উদ্বিগ্ন হয়ে ব্যথিত কণ্ঠে বললাে।
না!' লিজা বললাে, “আমি শুধু তাকে ওয়াদা দিয়েছি। বলেছি, দুদিন সময় দাও, আমার শরীরটা এখন ভাল নেই। শরীর ঠিক হলেই তােমার ডাকে আমি সাড়া দেবাে। এই বলে তাকে ঠেকিয়ে রেখেছি।
“তুমি খুব বেশী ঝুঁকি নিয়ে ফেলেছে লিজা। শেখ মান্নান মানুষ নয়।'
জানি, কিন্তু সে আমার আশ্বাসেই খুশী। আমার সম্মতি শুনে সে খুশীতে ডগমগ হয়ে বলেছে, ঠিক আছে, ভাল হওয়ার
আগ পর্যন্ত যত খুশী কেল্লার ভেতর মুক্ত বিহঙ্গের মত ঘুরে ফিরে বেড়াও, ভাল হলেই চলে আসবে আমার কাছে।
আন নাসের বললাে, ঠিক আছে, তুমি চাইলে আমি তােমার ইজ্জত ও সম্ভ্রমের হেফাজত করবাে।'
‘আমি কি তাহলে ধরে নেবাে, তুমি আমার ভালবাসাও গ্রহণ করেছাে?' লিজা তার ডাগর দু'চোখ তুলে জিজ্ঞেস করলাে আন নাসেরকে।
আন নাসের এ প্রশ্নের কোন উত্তর দিল না। সে তখন ভাবছিল তার প্রশিক্ষণকালীন শিক্ষার কথা। ট্রেনিং দেয়ার সময় তাদের বার বার সাবধান করে বলা হয়েছে, ইহুদী ও খৃষ্টান মেয়েদের থেকে সব সময় দূরে থাকবে। তারা তাদের রূপ ও যৌবনের পসরা নিয়ে তােমাদের সমােহিত করতে চাইবে। ভালবাসার নামে প্রতারণার ফাঁদ পেতে জালে আটকাতে চেষ্টা করবে তােমাদের।
কিন্তু সে সাবধানতা মুখের ভাষা ও কিছু উপদেশ ছাড়া আর কিছু ছিল না। এসব মেয়েদের ফাঁদ কত ভয়ংকর এবং জাল কত শক্ত হতে পারে, এ সম্পর্কে কোন বাস্তব ধারনা ছিল না আন নাসেরের। আন নাসের ও তার সঙ্গীরা নারীর চাক্ষুষ হামলার শিকার হয়নি কোনদিন। ফলে সতর্কতা সত্ত্বেও এমন হামলা থেকে বাঁচার কোন বাস্তব অভিজ্ঞতা বা ট্রেনিং তারা পায়নি। এখন যখন এক খৃস্টান মেয়ে তাকে এই ফাদে ফেলার চক্রান্ত করছিল, তখন মানুষের স্বভাবগত দুর্বলতার শিকার হতে লাগলাে আন নাসের। তার জ্ঞান ও বুদ্ধি ক্রমে দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতে লাগলাে, সেখানে প্রভাব ফেলতে লাগলাে বিভ্রান্তির মােহ। সে মরুভূমির উত্তপ্ত বালুকা রাশিতে এবং কন্টকাকীর্ণ জঙ্গলে মৃত্যুর সাথে লড়াই করতে অভ্যস্ত! - ভীতি কখনাে তাকে আচ্ছন্ন করতে পারেনি। কিন্তু এখনকার দ্বন্দ্ব তাে তার প্রজ্ঞার সাথে আবেগের। প্রজ্ঞাকে সজাগ ও সচল রাখতে হয় সক্রিয় চেতনার মাধ্যমে আর আবেগ পরিবেশের হাতে পড়ে আপনাতেই চেপে বসে মানুষের মনের গোপন তন্ত্রীতে। একটির জন্য দরকার সচেতন কর্মপ্রয়াস অন্যটির জন্য দরকার এই প্রয়াসের সামান্য নিষ্ক্রিয়তা। ফলে সচেতন না থাকলে সহজেই মানুষ আবেগ-বন্দী হয়ে পড়ে। আন নাসের সেই নিষ্ক্রিয়তারই শিকার হতে লাগলাে।
সে লিজার মত এমন আকর্ষণীয় ও সুন্দরী মেয়ে জীবনে কখনও দেখেনি। প্রথম যখন সে লিজাকে দেখেছিল, তখন তার সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করলেও সেই সৌন্দর্যের প্রতি বিন্দুমাত্র আকর্ষণ সৃষ্টি হয়নি তার। কিন্তু এখনকার পরিবেশ ভিন্ন। লিজার রেশমের মত কোমল চুল কখনও তার গাল, কখনও বাহু স্পর্শ করছিল। সেই স্পর্শ তার অস্তিত্বে জাগিয়ে তুলছিল এক অনাস্বাদিত শিহরণ। সেই শিহরণে বার বার তার দেহ কেঁপে কেঁপে উঠছিল।
তার জীবনে এমন ঘটনাও ঘটেছে, শক্রর নিক্ষিপ্ত তীর কয়েক বারই তার দেহকে স্পর্শ করে চলে গেছে। বর্শার আঘাতে তার শরীরের চামড়া ছিড়ে গেছে, তবুও সেদিকে সে খেয়াল করেনি, এমনকি ভীতও হয়নি। তীর ও বর্শার আঘাত তার মনে কোনই কম্পন জাগাতে পারেনি। মৃত্যুও কয়েকবার তার সামনে দিয়ে চলে গেছে, কিন্তু তাকে ভড়কে দিতে পারেনি। সে আগুন নিয়ে খেলেছে। দুশমনের রসদ ভাণ্ডারে আগুন দিয়ে সেই অগ্নিশিখার ভেতর থেকে সে হাসতে হাসতে লাফিয়ে বেরিয়ে এসেছে দ্বিধাহীন চিত্তে। সেই বীর আজ নতুন এক আক্রমণের শিকার। কি করে এই আক্রমণের মােকাবেলা করবে, তা তার জানা নেই। অবস্থা এখন এমন যে, সে যে আক্রান্ত এই অনুভূতিও যেন সে হারিয়ে ফেলছে।
সামান্য এক অবলা মেয়ের চুলের সৌরভ ও তার কণ্ঠের যাদু আন নাসেরের মধ্যে যেন ভূ-কম্পনের মত কাঁপন সৃষ্টি করলাে। সেই কাঁপন যেন তাকে অবশ করে ফেললাে। সেই আবেশ বিহবলতার কারণে এই মেয়ের মাদকতাময় প্রলােভন থেকে বাঁচার চেষ্টা বাদ দিল আন নাসের। তীর ও বর্শার আঘাত থেকে বাঁচার যেমন চেষ্টা ছিল তার, তেমন কোন চেষ্টা করলাে না সে, এমনকি চেষ্টা যে করতে হবে এই কথাও যেন সে ভুলে গেল।
লিজা তার যতই কাছে সরে আসছিল, এই আচ্ছন্নতা ততই তাকে আরও তীব্রভাবে গ্রাস করছিল। এক সময় আন নাসেরের মনে হলাে, লিজাকে নিবিড় করে কাছে পাওয়ার স্বপ্ন বা ইচ্ছে তার মধ্যেও জেগে উঠছে।
লিজা ছিল ট্রেনিং পাওয়া যুবতী। কেমন করে শিকারীকে বশীভূত করতে হয় তার সব ছলাকলাই জানা ছিল তার। সে তার এতদিনের শেখা বিদ্যা বাস্তবে প্রয়ােগ করে দেখছিল।
আন নাসেরের হৃদয়ে আকাবার পিপাসা জাগলাে। এ এমন এক পিপাসা, মরুভূমির পিপাসার সাথে যার কোন সম্পর্ক নেই। এ পিপাসার ধরন ভিন্ন, পিপাসা নিবৃত্তির পদ্ধতিও ভিন্ন। পানি দিয়ে সে পিপাসাকে নিবৃত্ত করা যায় না।
রাত যতই বেড়ে চললাে, আন নাসের হারিয়ে যেতে লাগলাে লিজার ভুবনে। প্রথম তার দেহ কাঁপলাে, পরে তার ঈমান কাঁপলাে, তারপর আবেগের স্রোত এসে তাকে ভাসিয়ে নিয়ে চললাে অজানা স্বপ্নের রাজ্যে।
হ্যা!' আন নাসের আবেগমথিত স্বরে বললাে, আমি তােমার ভালবাসা গ্রহণ করে নিলাম। কিন্তু এর পরিণাম কি হবে জানি না।'
নাসের! পরিণামের কথা আমিই কি জানি! তােমার সাথে এভাবে দেখা হবে, তােমাকে দেখেই আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলবাে তােমার মধ্যে, দুদিন আগেও কি আমি তা জানতাম তােমার আমার ধর্ম আলাদা, জগত আলাদা, অথচ সে সব অবলীলায় তুচ্ছ করে আমরা দু'জন একাকার হয়ে যাবাে, কে জানতাে এ কথা?
অন্ধকারের মাঝেও তারার আবছা আলােয় ওরা একে অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। আন নাসেরের হৃদয় তােলপাড় করছিল নানা রকম জটিল দ্বন্দ্বে। সে লিজার দিকে তাকিয়ে বললাে, “আচ্ছা, তুমি কি আমাকে আমার ধর্ম ত্যাগ করে তােমার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে বলবে? তুমি কি এখন আমাকে তােমার সঙ্গে যেতে বলবে?


না, আমি এমন কোন সিদ্ধান্ত তােমার ওপর চাপিয়ে দেয়ার কথা কখনাে ভাবিনি।' লিজা বললাে, যদি তুমি আমার সঙ্গে যেতে চাও, যাবে। আর যদি আমাকে জীবনের মত সঙ্গিনী করে তােমার সাথে নিয়ে যেতে চাও, আমি খুশী মনে তােমার হাত ধরে পথে নামতে রাজি। ধর্মকর্ম আমি কখনাে তেমন একটা করিনি। যদি তুমি চাও, ধর্ম ত্যাগ করতেও আমার কোন আপত্তি নেই। তােমার জন্য যে কোন ত্যাগ ও কুরবানী করতে আমি প্রস্তুত। আমার পবিত্র ভালবাসার কসম, ভালবাসা ছাড়া তােমার কাছে আমি আর কিছুই চাই না। আমার নিষ্কলুষ প্রেম পার্থিব চাওয়া পাওয়ার উর্ধ্বে। তুমি যেমন আমার হৃদয়ে আসন গেড়ে বসে আছে, আমি শুধু তেমনি তােমার আত্মায়, তােমার চেতনায় একটু ঠাঁই চাই।'
প্রেমের জালে পুরােপুরি বন্দী হয়ে গেল আন নাসের। রাত তখন অর্ধেকেরও বেশী পার হয়ে গেছে। আন নাসের তবু সেখান থেকে উঠার নাম নিল না। এক সময় লিজাই তাকে বললাে, রাত প্রায় শেষ হতে চললাে। কেউ এভাবে আমাদের দেখে ফেললে পরিণতি খুবই খারাপ হবে। তুমি তােমার কামরায় চলে যাও। কি করে আমরা এখান থেকে বের হবাে সে চিন্তা আমি করছি। আমাদের এ সম্পর্কের কথা এখন কাউকে বলার দরকার নেই। কখন কি করতে হবে সময় মত সব আমি তােমাকে জানাবাে।'
আন নাসের কামরায় প্রবেশ করলাে। তার সঙ্গীরা তখন গভীর ভ্রিায় নিমগ্ন । সেও শুয়ে পড়লাে, কিন্তু তার চোখে ঘুম এলাে না।
লিজাও তার কামরায় প্রবেশ করলাে ! দেখলে কারিশমা ঘুমিয়ে আছে। সে পােশাক পাল্টাতে শুরু করলাে। তখনই চোখ মেলে চাইলাে কারিশমা।
‘এত দেরী হলাে যে?’ কারিশমার প্রশ্ন।
‘আইয়ুবীর কমান্ডো বাহিনীর পাথর গলানো কি এতই সহজ যে, এক ফু’তেই মােমের মত নিভে যাবে?' লিজা বললাে।
মােমের মত না নিভুক, আগুনের পরশ পেলে মােমের মত গলতে দোষ কি! তা শেষ পর্যন্ত পাথর কি গললাে?”
কেন, তুমি কি ভেবেছিলে আমি ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে ফিরে আসবাে?'
না, বলছিলে পাথর খুব শক্ত, তাই বললাম।
‘হা, পাথর খুব শক্ত। লিজা উত্তর দিল, সে জন্যই আমাকে খুব সাবধানে বেছে বেছে তীর ছুঁড়তে হয়েছে। তবে তুমি এখন এ কথা ভাবতে ভাবতে নিশ্চিন্তে ঘুমুতে পারাে যে, সে তােমার বান্ধবীর একান্ত গােলাম হয়ে গেছে।
সত্যি করে বলাে তাে, সে তােমার গােলাম হয়েছে, না তুমি তার ক্রিতদাসী হয়ে ফিরে এসেছাে? তুমি যে আবেগী মেয়ে, আমার তাে ভয় হচ্ছে, পুরুষ স্পর্শে তুমিই না গলে মােম হয়ে যাও!' কারিশমা বললাে।
ভয়টা একেবারে অমূলক নয়। এমন সুন্দর যুবককে দেখলে, গলে যেতে কতক্ষণ! লিজা হেসে বললাে, এ যুবককে সত্যি আমার খুব ভাল লেগেছে। এ ধরনের সরল সুন্দর লােককে ভাল না বেসে পারা যায় না। এর কথা ও কাজে কোন রকম ছলচাতুরী নেই। সাইফুদ্দিনের মত বুড়াের সাথে থাকতে থাকতে জীবনের প্রতি যে ঘেন্না ধরে গিয়েছিল, এর সাথে থাকতে পারলে সেটা কিছুটা দূর হবে।'
“তার মানে ছুড়ি তুই মরেছিস!”
“আরে ধ্যাত, আমাকে এত সরল সহজ মনে করাে না।'
কারিশমা বললাে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সামাল দিতে পারবি তাে? মনে রাখিস, তার হাত দিয়ে আমাদের বড় শত্রু সালাহউদ্দিন আইয়ুবীকে খুন করাতে হবে।
কারিশমা উভয়ের মধ্যে কি কি কথা হয়েছে পুরাে কাহিনী শুনলাে। শেষে তাকে আরও কিছু প্রয়ােজনীয় পরামর্শ ও নির্দেশ দিয়ে বললাে, নে, এবার শুয়ে পড়। তারা উভয়ে শুয়ে পড়লাে ।
আন নাসের তখনও জেগেই ছিল। কিছুতেই তার চোখে ঘুম আসছিল না। শুয়ে শুয়ে সে লিজার কথাই ভাবছিল । মেয়েটি মিথ্যা তাে কিছু বলেনি! তাকে সে সত্যি ভালবাসে। নইলে শেখ মান্নানের হাত থেকে সে ওদের রক্ষা করার ঝুঁকি নিতে যাবে কেন? দিনেও একবার এ কথা বলতেই কি সে ছুটে এসেছিল? বন্দী হওয়ার পরও যে জামাই আদর পাচ্ছি তার কারণ তাে এই মেয়ে। তাহলে তার ভালবাসাকে কি করে মিথ্যা বলবাে?
পরক্ষণেই তার মনে পড়ে গেল ট্রেনিংকালীন সময়ের কথা। স্মরণ হলাে, প্রশিক্ষণের সময় তাদের বার বার সতর্ক করা হয়েছে। খৃস্টান মেয়েদের প্রতারণার কাহিনী তুলে ধরে বলা হয়েছে, খবরদার, এদের সম্পর্কে সাবধান থাকবে। একবার এদের খপ্পরে পড়ে গেলে ইহ ও পরকাল উভয়ই বরবাদ হয়ে যাবে। তাহলে লিজা কি সেই ধোঁকা, যে তার ইহকাল ও পরকাল সব বরবাদ করতে এসেছে?
এক অস্বস্তিকর দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেল আন নাসের। একবার মনে হয়, লিজার ভালবাসা সত্য, আবার মনে হয় ধোঁকা। এভাবে ছটফট করেই বাকী রাতটুকু কাটলাে তার। শেষে সে এই সিদ্ধান্তে এসে উপনীত হলাে যে, লিজার ভালবাসা ধোকা নয়। তার সুঠাম সুন্দর দেহ ও সুদর্শন চেহারা যে কোন মেয়েকেই আকর্ষণ ও আকৃষ্ট করতে পারে । আগুন দেখে পতঙ্গ ঝাঁপ দিলে তাকে অস্বীকার করার কিছু নেই।
এই সিদ্ধান্তে আসার পর তার এতক্ষণের উত্তেজনা ও টেনশন কিছুটা দূর হলাে। সঙ্গে সঙ্গে নিস্তেজ হয়ে এলাে শরীর। সারা রাতের ক্লান্তি ও ঘুম এসে জড়িয়ে ধরলাে তাকে। ভাের হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে ঘুমের কোলে ঢলে পড়লাে আন নাসের। অনেক বেলায় এক লােক তাকে ডেকে তুললাে। বললাে, কারিশমা আপনাকে তার কামরায় ডেকে পাঠিয়েছে।
আন নাসের উঠে বসলাে। হাত-মুখ ধুয়ে লােকটির সাথে রওনা দিল কারিশমার ওখানে। কামরায় কারিশমা একাই ছিল । লােকটি তাকে কারিশমার কামরায় পৌঁছে দিয়েই চলে গেলাে ।
বসাে, নাসের! কারিশমা বললাে, আমি তােমার সাথে খুব জরুরী কিছু কথা বলতে চাই।'
আন নাসের তার সামনে এক চেয়ারে বসলাে। কারিশমা বললাে, আমি তােমাকে একথা জিজ্ঞেস করবাে না যে, রাতে লিজা তােমাকে বাইরে নিয়ে গিয়েছিল, না, তুমি তাকে বাইরে নিয়ে গিয়েছিলে?
রাতের প্রসঙ্গ উঠতেই আন নাসের ভয়ে ও লজ্জায় একেবারে এতটুকু হয়ে গেল। সে কোন রকমে ঢােক গিলে মাটির দিকে চেয়ে রইলাে, মুখে কিছু বললাে না।
কারিশমাই আবার মুখ খুললাে। বললাে, এ জন্য আমি তােমাকে তিরস্কার করতে এখানে ডেকে আনিনি। আমি জানি, মেয়েটা খুবই সুন্দরী ও শিশুর মত সরল! সে তােমাকে অসম্ভব পছন্দ না করলে এভাবে রাতে গােপনে তােমার সাথে দেখা করতাে না। কিন্তু আমি তাকে এবং তােমাকেও এ অনুমতি দিতে পারি না যে, এভাবে রাতভর তােমরা বাইরে কাটাও। এটা একটা কেল্লা, এটা কোন প্রেম কানন নয় যে, সারা রাত তােমরা অভিসারে মেতে থাকবে। হয়তাে গত রাতের ঘটনা আমি ছাড়া আর কেউ জানে না। লিজা আমার রুমে না থাকলে হয়তাে আমিও টের পেতাম না। কিন্তু প্রতিদিন এমনটি নাও ঘটতে পারে। তােমরা ধরা পড়ে যেতে পারাে। ধরা পড়লে তার ফলাফল যে ভাল হবে না, এটুকু বােঝ?
“জ্বি। কোন রকমে উচ্চারণ করলাে আন নাসের। কারিশমা বললাে, ঠিক আছে, এ কথা আমি আর কাউকে বলবাে না। কিন্তু আর কখনাে লিজাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে না।
‘বিশ্বাস করুন, আমি কখনও এমন চেষ্টা করিনি। আন নাসের বললাে, “রাতে আপনাদের সাথে আলাপ সেরে যাওয়ার পথে হঠাৎ লিজার সাথে আমার দেখা হয়ে যায়। আমরা দু'জনে কথা বলতে বলতে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিলাম সত্যি, কিন্তু লিজাকে আমি বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করিনি।'
দেখাে আন নাসের, আমার চোখে ধুলাে দিতে চেষ্টা করাে না। আমার যথেষ্ট বয়স হয়েছে। আমি তােমাদের চোখের দিকে তাকিয়েই এমন সব কথা বলে দিতে পারবাে, যা হয়তাে তােমরা নিজেরাও বলতে পারবে না। লিজা তােমার প্রেমে দিওয়ানা হয়ে যাক এটা আমি চাই না।' কারিশমা তাকে বললাে, আমি তােমার কাছেও আশা করবাে, তার অল্প বয়সের সুযােগ তুমি গ্রহণ করবে না। এই বয়সে প্রেমের বাণ মেরে যে কোন মেয়েকেই ঘায়েল করা যায়।'
‘আমি আপনার কথা বুঝতে পেরেছি। স্বীকার করি, লিজা রাজকুমারীদের মতই রূপসী । তার কাছে এমন রূপ ও যৌবন আছে, যা যে কোন মানুষকে অন্ধ করে দিতে পারে।' আন নাসের বললাে, কিন্তু আমরা আপনাদের কয়েদী! আর আমি নিজে একজন নগণ্য যােদ্ধা মাত্র। তাছাড়া লিজার ও আমার ধর্ম ভিন্ন। দুই ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর মধ্যে যেমন প্রেম হতে পারে না, তেমনি রাজকন্যা এবং এক বন্দীর মধ্যেও ভালবাসা হতে পারে।'
তুমি নারীর স্বভাব সম্পর্কে কিছুই জানাে না যুবক। কারিশমা। বললাে, রাজকুমারী যদি কোন কয়েদীকেই ভালবেসে ফেলে তখন সে তাকেই মনে করে শাহজাদা। ওই শাহজাদার বাহবন্ধনে বন্দী হওয়ার জন্য সে তখন কেবল ছটফট করতে থাকে। আর ধর্মের কথা বলছাে! ধর্মই তাে মানুষকে প্রেমিক বানায়। সব ধর্মের সার কথা, মানুষকে ভালবাসাে। মানুষকে ভালবাসার মধ্য দিয়ে যে মানব ধর্মের সৃষ্টি হয়, সেটাই তাে প্রকৃত ধর্ম! ভালবাসা ধর্মের ক্ষুদ্র বন্ধন ছিন্ন করে ফেলে। তার সাথে আলাপ করে আমি তাজ্জব হয়ে গেছি! সে তােমার এতটাই অনুরক্ত হয়ে পড়েছে যে, তােমার থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করলে সে বাঁচবে কিনা সন্দেহ।
তাকে যখন আমি চাপ দিলাম এবং বললাম, খবরদার, আর কখনাে তার সাথে মিশবি না।
সে কাঁদতে কাঁদতে বললাে, না, না, অমন কথা বলাে না। তাহলে আমি বাঁচবাে না। এখন থেকে আমার বাঁচা মরা সবই আন নাসেরের জন্য।'
আমি বললাম, “সে এক মুসলমান আর তুই খৃস্টান কন্যা। ধর্ম সাক্ষী করে সে তাে তােকে বিয়ে করতে পারবে না!'
কেন পারবে না, সে যেই খােদাকে মানে আমিও তাে তাকেই মানি। যদি ধর্ম তার ও আমার মধ্যে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, আমি তার ধর্ম কবুল করে তার সঙ্গে চলে যাবাে।'
আন নাসের অবাক হয়ে শুনছিল কারিশমার কথা। এ কথা শুনে লিজার জন্য তার অন্তরেও ভালবাসার ঢেউ উঠলাে। সে তার অসহায়ত্ব আর ভালবাসার জটিল সমীকরণে ডুবে গেল ।
চিৎকার করে বললাে, 'চুপ করুন। আমিও তাে মানুষ, না কি! দয়া মায়া, প্রেম ভালবাসা এসব কি আমার থাকতে নেই? আপনি জানেন, লিজা শুধু আমার জন্যই শেখ মান্নানকে অসন্তুষ্ট করেছে? শেখ মান্নান আমাকে ও আমার সঙ্গীদেরকে কারাগারে বন্দী করতে চেয়েছিল । কিন্তু লিজা তার ইজ্জত ও সম্ভ্রমের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের মুক্ত রেখেছে। কেন সে এ কাজ করেছে। শুধু আমার ভালবাসার টানে। আপনি কি আমাকে তার সাথে গাদ্দারী করতে বলেন। তার পবিত্র ভালবাসাকে অপমান করতে বলেন?
‘শেখ মান্নানও তাে লিজাকে ভালবাসে। লিজাকে ভালবাসে বলেই তাে সে তার কথায় তােমাকে ও তােমার সঙ্গীদেরকে মুক্ত রেখেছে। ভালবাসে বলেই তাে সে লিজার শর্ত মেনে নিয়েছে। এখন লিজাকেও তার শর্ত পূরণ করতে হবে। লিজা যদি শেখ মান্নানের স্বপ্নপুরীতে না যায় তবে কিসের জন্য শেখ মান্নান তােমাদের মুক্ত রাখবে?
শেখ মান্নান লিজাকে ভালবাসে না, ভােগ করতে চায়। যদি আপনার কথা মতাে ধরে নিই সে লিজাকে ভালবাসে, তাতেও কিছু আসে যায় না। কারণ লিজা তাকে ভালবাসে না। অতএব শেখ মান্নানের স্বপ্নপুরীতে তার যাওয়ার প্রশ্নই উঠে না। লিজা আমাকে ভালবাসে, আমিও লিজাকে ভালবাসি। অতএব আপনি আপনার নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নিন । দয়া করে আপনি আমাদের পথ আগলে দাঁড়াবেন না।
‘কিন্তু শেখ মান্নানও তাে তার ভালবাসায় অন্ধ হয়ে আছে। এ কেল্লার অধিপতি সে। সে কি তােমাদের ভালবাসা মেনে নেবে। যুবক, তুমি বুঝতে পারছে না, তুমি যা বলছে তার পরিণতি কত ভয়ংকর! শেখ মান্নান তােমাদের কাউকেই জীবিত রাখবে না। আমি আবারও বলছি, তুমি লিজার পথ থেকে সরে দাঁড়াও।'
না, এটা কিছুতেই সম্ভব নয়। প্রয়ােজন হলে আমি লিজার সম্ভ্রম বাঁচাতে নিজেকে কুরবানী করে দেবাে। আন নাসের বললাে, যদি সে মেয়ে হয়ে আমার প্রতি তার ভালবাসার কথা প্রকাশ করতে পারে, তবে আমি কেন তা প্রকাশ করতে পারবাে না? আমি পুরুষ, লিজার প্রতি আমার অন্তরে যেমন গভীর ভালবাসা রয়েছে, তেমনি তাকে রক্ষা করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করার দায়িত্বও রয়েছে। আমি সে দায়িত্ব প্রাণ দিয়েই পালন করবাে।'
আস্তে বলো, দেয়ালেরও কান আছে। আমি বুঝতে পারিনি তােমরা পরস্পরকে এত বেশী ভালবাসাে। আমি তােমার মঙ্গলের জন্যই তােমাকে লিজার পথ থেকে সরে দাঁড়াতে বলেছিলাম। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, মহাপ্রভু সত্যি তােমাদের দুজনের অন্তরকে এক করে গেঁথে দিয়েছেন। কিন্তু তােমাদের মিলনের পথে মহা অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শেখ মান্নান। তার মােকাবেলা করার সাধ্য এ মুহূর্তে আমাদের কারাে নেই। সে যদি তােমাদের সম্পর্কের কথা টের পায় তাহলে দু’জনকেই খুন করে ফেলবে। সে এক গুপ্তঘাতক দলের সর্দার। তােমাকে গুমাস্তগীনের হাতে তুলে দিতে রাজি হলেও লিজাকে সে ছাড়বে না। আমি তাে কিছুই বুঝতে পারছি না এখন আমি কি করবাে?
দুশ্চিন্তায় ছেয়ে গেল কারিশমার চেহারা। একটু পর মুখ তুলে আন নাসেরকে ইশারায় কাছে ডাকলাে। আন নাসের তার কাছে গেলে সে বললাে, তুমি কি সিরিয়াস? তুমি কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে, তুমি তার সঙ্গে কোন প্রতারণা না করবে না।'
বুকে হাত দিয়ে নয়, আপনি যদি চান, এই গর্দান কেটে দিয়ে আমি প্রমাণ করবাে, আমার ভালবাসায় কোন খাদ নেই। তাহলে আমার কথা শোেন। লিজা আমার ছােট বােনের মত। তাকে আমি যেমন শাসন করি, তেমনি ভালও বাসি। আজ সে জীবন মরণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এ অবস্থায় আমি নিস্ক্রিয় থাকতে পারি না। যদি লিজাকে বাঁচাতে চাও এবং নিজে বাঁচতে চাও, তবে তােমাদের এখান থেকে পালাতে হবে। তােমরা যদি জলদি এ কেল্লা থেকে পালাতে না পারাে, তবে লিজাকে শেখ মান্নান তার শর্ত মান্য করতে বাধ্য করবে।
সে সুযােগ আমি তাকে দেবাে না। আপনি একটু রহমদীল হােন। একটু সহায়তা করুন আমাদের। আমি লিজাকে নিয়ে অবিলম্বে এ কেল্লা থেকে পালাতে চাই।' মাথা ঠাণ্ডা করাে। ভেবে দেখি কি করা যায়। কারিশমা বললাে, তুমি এখন আর কয়েদী নও, গুমাস্তগীনের অনুরােধে শেখ মান্নান তােমাদেরকে তার হাতে তুলে দিয়েছেন। গুমাস্তগীন নিজের মেহমান বলে গণ্য করেছেন তােমাদের।'

আন নাসেরের মনে লিজা সম্পর্কে যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল, কারিশমার সাথে এ আলাপের মধ্য দিয়ে তা পরিষ্কার হয়ে গেল। লিজার প্রতি তার ভালবাসা আরও গভীর হলাে। লিজাকে দেখা ও তাকে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলাে তার মন। সে কারিশমাকে জিজ্ঞেস করলাে, লিজা এখন কোথায়?
কারিশমা তাকে বললাে, রাতে ফেরার পর তাকে আমি অনেক বকাঝকা করেছি। দুঃখে, লজ্জায় সে রাতভর জেগে কাটিয়েছে। ভােরে আমি তাকে আদর করে বললাম, কাঁদিস না। যে যুবককে তুই মন দিয়েছিস, সে কয়লা না হীরা আমি বাজিয়ে দেখি। যদি তােদের প্রেম খাঁটি হয়, তাহলে তুই তাকে পাবি। আর যদি দেখি প্রেম নয়, এ শুধু চোখের নেশা, তাহলে তুই মরেছিস। এখন আর কান্নাকাটি করার দরকার নেই । নাস্তা করে পাশের রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে থাক, আমি আন নাসেরের সাথে আলাপ করে তােকে ডেকে তুলবাে।'
ও প্রথমে যেতে চায়নি, শেষে আমি জোর করে তাকে শুইয়ে দিয়ে এসেছি। এখন হয়তাে সে ঘুমিয়ে আছে।' কারিশমার তীর পরিপূর্ণ লক্ষ্য ভেদ করলাে। সে লিজার জন্য আন নাসেরকে পাগল বানাতে চাচ্ছিল, তার সে উদ্দেশ্য সফল হলাে।
আন নাসের সেখান থেকে যেন বাতাসে উড়ে বাইরে এলাে। যখন সে তার কামরায় গেল, সাথীরা জিজ্ঞেস করলাে, কোথায় গিয়েছিলে?
সে ওদের মিথ্যা বললাে এবং সান্ত্বনা দিয়ে বললাে, ‘পালাবার একটা ব্যবস্থা হচ্ছে। চিন্তার কিছু নেই, সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে।'
কিন্তু সে যে তখন তার দায়িত্ব থেকে অনেক দূরে সরে গেছে, বন্ধুরা তার কিছুই টের পেলাে না।
খৃষ্টান অফিসার গুমাস্তগীনের পাশে বসে ছিল। গুমাস্তগীন তাকে বলছিল, ‘আন নাসের ও তার সাথীদের নিয়ে দু'এক দিনের মধ্যেই আমি হারান যাত্রা করবাে।'
এমন সময় সেখানে এসে উপস্থিত হলাে কারিশমা। সে তাদের দু'জনকে বললাে, “এই কমাণ্ডার এখন আমাদের জালে বন্দী।'
খৃষ্টান অফিসার বললাে, কি বললাে আন নাসের সে কি সত্যি লিজার ফাঁদে ধরা দিয়েছে? কি বুঝলে তার সাথে আলাপ করে?
কারিশমা সব কথা খুলে বললাে তাদের। জানালাে কেমন করে আন নাসেরের মন লিজার মুঠোর মধ্যে চলে এসেছে। এখন যে সে পরিপূর্ণভাবেই লিজার নিয়ন্ত্রণে আছে, এ কথা জানিয়ে কারিশমা বললাে, “এই লােকগুলােকে দিয়ে সহজেই সুলতান আইয়ুবীকে হত্যা করানাে যাবে বলে আমার বিশ্বাস। তবে তাদের প্রস্তুত করতে হয়তাে কয়েকদিন সময় লাগবে। এদেরকে কত তাড়াতাড়ি তাদের আদর্শ থেকে সরিয়ে আনা যায়, সে চেষ্টাই এখন আমাদের মূল কাজ। আদর্শ থেকে সরে এলেই তারা নির্দ্বিধায় সুলতানকে হত্যা করতে প্রস্তুত হয়ে যাবে।
‘আমি এই চার কমান্ডোকে দু'একদিনের মধ্যেই হারানে নিয়ে যেতে চাই।' গুমাস্তগীন বললাে, তােমরা কি দু'জনই আমার সাথে যাবে, নাকি লিজা একা? ওদেরকে খুনের ব্যাপারে তৈরী করতে হলে তােমাদের সহযােগিতা অবশ্যই লাগবে।
‘আমি মেয়েদেরকে আমার সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি।' বললাে খৃস্টান অফিসার, আমি আর দেরী করতে পারছি না। বর্তমান যুদ্ধের খবর আমাকে সরকারের কাছে পৌঁছাতে হবে। সরকারকে জানাতে হবে, হলব, 'মুশেল ও হারানের সম্মিলিত বাহিনীর অবস্থা শােচনীয়। ময়দান ছেড়ে তাদের বীর সেনাপতিরা পালিয়েছে।
কেন, এ খবর কি তােমাদের সরকার এখনাে পায়নি? হয়তাে পেয়েছে। কিন্তু এ পরিস্থিতিতে সরকারের করণীয় কি সে সম্পর্কে সরকারকে পরামর্শ দেয়াও আমার দায়িত্ব। আমি সরকারকে এখানকার ক্রুসেডারদের অবস্থা জানিয়ে এ পরামর্শ দিতে চাই যে, সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীকে পরাজিত করার জন্য আমাদের বিকল্প পন্থা অনুসরণ করতে হবে। সম্মিলিত বাহিনীকে দিয়ে আমাদের আশা পূরণের আর কোন সম্ভাবনা নেই। সরকারকে এ পরামর্শ দেয়ার জন্যই আমাকে দ্রুত সেখানে যেতে হবে।
তুমি এ পরামর্শ দিলে তাে তােমাদের তরফ থেকে আমরা যে সাহায্য পাচ্ছিলাম তা বন্ধ হয়ে যাবে!' শঙ্কিত কণ্ঠে বললাে গুমাস্তগীন, এমন কথা বলাে না ভাই! আমাদের আর একবার সুযােগ দাও, আইয়ুবীকে আমিই হত্যা করবাে। তারপর দেখবে কেমন বিজয়ীর বেশে আমি দামেশকে প্রবেশ করি।
তুমি দুই মেয়েকেই সঙ্গে না নিয়ে অন্তত লিজাকে আমার কাছে রেখে যাও। সে এরই মধ্যে কমান্ডোদের নেতার উপর তার কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে। এখন সে সহজেই তাকে আইয়ুবীর বিরুদ্ধে প্রস্তুত করে নিতে পারবে।
কিন্তু ওদের সহযােগিতা যে আমারও দরকার।' বললে খৃস্টান অফিসার।
গুমাস্তগীনের কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়লাে অনুনয়। বললাে, ‘আন নাসের সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর কমান্ডো বলে বিনা বাধায় যে কোন সময় তার কাছে যেতে পারবে। কারিশমার কথাই ঠিক, তাকে প্রস্তুত করতে পারলে সে সহজেই সুলতান আইয়ুবীকে হত্যা করতে পারবে। এখন চিন্তা করে দেখাে, তুমি যদি লিজাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাও, তবে আন নাসেরকে তৈরী করবে কে? সে ছাড়া এই কমান্ডোদের সঙ্গে নিয়ে আমি কি করবাে?
কিছুক্ষণ কথা কাটাকাটির পর খৃস্টান অফিসার বললাে, তবে এক কাজ করি। ওদেরকে হারান পাঠানাের পরিবর্তে আমিই এখানে আরাে কিছুদিন থেকে যাই। এই সময়ের মধ্যে মেয়েরা তাদেরকে কাজের উপযােগী করে দেবে। লিজা প্রস্তুত করবে আন নাসেরকে, আর তার সঙ্গী তিনজন কমান্ডোকে ট্রেনিং দেবে কারিশমা। তাদের কাজ তাে একটাই, কমাণ্ডোদের মনে সুলতান আইয়ুবীর প্রতি দারুণ ঘৃণা ও আক্রোশ সৃষ্টি করা।'
‘আন নাসের সম্পর্কে আমার ধারণা, সে নারীর ব্যাপারে খুবই দুর্বল।' কারিশমা বললাে, “লিজা এত অল্প সময়ে তাকে কাবু করতে পারবে, আমার ধারণা ছিল না। মহব্বতের তীরে সে পুরােপুরি ঘায়েল হয়ে গেছে। লিজা এখন তাকে চোখের ইশারায় নাচাতে পারবে।
খৃষ্টান অফিসার বললাে, আজ তাদের চার জনকেই এক সাথে খাওয়ার দাওয়াত দাও। এতে সবাই তােমাদের সাথে আরও ফ্রি হবে। তুমি এমন পরিবেশ তৈরী করাে, যাতে ওরা আমাদের শত্রু না ভেবে বন্ধু মনে করে।
আহারের সময় হলাে। আন নাসের ও তার সঙ্গীদের ডাকা হলাে খাওয়ার টেবিলে। তারা এলে এক সাথে সবাই খেতে বসলাে। বাবুর্চি সবার সামনে প্লেট, গ্লাস দিচ্ছে; এ সময় শেখ মান্নানের এক খাদেম এসে অফিসারের কানে কানে কিছু বললাে। অফিসার সবার দিকে ফিরে বললাে, তােমরা খাও। আমি আসছি।'
খৃস্টান অফিসার খাবার টেবিল থেকে উঠে শেখ মান্নানের কামরায় প্রবেশ করলাে।
‘মেয়েটি সম্পর্কে তুমি কি চিন্তা করেছাে?' অফিসারকে সামনে পেয়েই শেখ মান্নান জিজ্ঞেস করলাে।
‘আমি যখন যাবাে, তাদের দু'জনকে সাথে করে নিয়ে যাবাে।' খৃস্টান অফিসার উত্তর দিল।
তােমার যাওয়ার আগ পর্যন্ত মেয়েটি আমার কাছে থাকবে, শেখ মান্নান বললাে।
আমি আজই চলে যাবাে।' বললাে খৃস্টান অফিসার।
“ঠিক আছে যাও। শেখ মান্নান বললাে, তবে মেয়েটিকে . আমার কাছে রেখে যাবে। একে দুর্গের বাইরে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি তুমি পাবে না।
মান্নান! খৃস্টান অফিসার ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বললাে, “সাবধান! আমাকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস করলে এই কেল্লার ইটগুলােও গুড়াে হয়ে যাবে।'
‘ও, মনে হচ্ছে তােমার মাথা এখনও ঠিক হয়নি। শেখ মান্নান চিবিয়ে চিবিয়ে বললাে, আজ রাতে মেয়েটিকে এখানে আসতেই হবে। তুমি যদি যেতে চাও, একা যাও। আর যদি এখানে থাকো, রাতে মেয়েটিকে আমার কাছে পৌঁছে দেবে। যদি আমার এ হুকুমের অন্যথা করাে তবে রাতে তুমি থাকবে কারাগারের গােপন কক্ষে, আর মেয়েটি থাকবে আমার পাশে। যাও, এখনও সময় আছে, ভেবে চিন্তে ঠাণ্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নাও।' খৃস্টান অফিসার এ কথার কোন জবাব না দিয়ে কক্ষ থেকে। বেরিয়ে এলাে।
খাবারের কামরায় এসে প্রবেশ করলাে অফিসার। সবাই অধীর হয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছিল। উৎসুক প্রশ্ন নিয়ে সবাই তাকালাে তার দিকে। বললাে, কি খবর? কোথায় গিয়েছিলে?' ‘দেখাে বন্ধুগণ! শেখ মান্নান আমাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। আজ রাতে যদি লিজাকে আমি তার মহলে পৌঁছে না দেই, তবে সে আমাকে কারাগারে নিক্ষেপের হুমকি দিয়েছে। বলেছে, আমাকে কারা প্রকোষ্ঠে পাঠিয়ে লিজাকে সে উঠিয়ে নিয়ে। যাবে।
‘আপনাকে কারাগারের গােপন কক্ষে পাঠাবে আর লিজাকে জোর করে তার মহলে নিয়ে যাবে! কেন, আমরা কি মরে গেছি’ আন নাসের বললাে, লিজাকে সে কোন দিনই পাবে না। তার ইজ্জতের জিম্মা আমি নিয়েছি।'
আন নাসেরের এক সঙ্গী অবাক হয়ে বললাে, এই মেয়েটির সাথে তােমার কি সম্পর্ক আন নাসের যে মেয়ে আমাদের পাকড়াও করে এখানে নিয়ে এসেছে, তার ইজ্জত রক্ষার জিম্মা তুমি নিতে যাবে কেন?'
‘তােমরা নিজেদেরকে এখন আর কয়েদী ভেবাে না।' গুমাস্তগীন বললাে, এ বিপদ তাে আমাদের সবার জন্য এসেছে।'
কারিশমা বললাে, তােমাদেরকে আমরাই ধরে এনেছি ঠিক, কিন্তু এখন আর তােমরা আমাদের বন্দী নও, শেখ মান্নানের মেহমান।'
খৃস্টান অফিসার বললাে, তােমরা আমাদের সাথে চলাে। আমরা এখন সবাই শেখ মান্নানের জালে আটকা পড়ে গেছি। অতএব এখান থেকে বেরােনাের চেষ্টাও আমাদের সম্মিলিতভাবেই করা উচিত।
কিন্তু এখান থেকে কেমন করে বের হবাে আমরা? শেখ মান্নান তাে আমাদের সবাইকে তার পাহারার মধ্যেই রেখেছে। বললাে আন নাসের।
‘শেখ মান্নান আমাকে অনুমতি দিয়ে রেখেছে, এই চারজন কমাণ্ডোকে আমি সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবাে।' গুমাস্তগীন বললাে, আমি এদেরকে নিয়ে আজই রওনা হয়ে যাবাে। তােমরা জলদি তৈরী হয়ে নাও। আমরা সন্ধ্যার আগেই রওনা দেবাে।'
ওরা খাবার টেবিলে বসেই ওখান থেকে কিভাবে পালাবে তার শলাপরামর্শ করলাে। এ ক্ষেত্রে দিশারীর ভূমিকা নিল গুমাস্তগীন। সে তার গােপন পরিকল্পনা সবার সামনে তুলে ধরলাে। পরিকল্পনা সমাপ্ত হলে যে যার কামরায় ফিরে গেল। গুমাস্তগীন তার চাকর ও দেহরক্ষীদের ডেকে বললাে, জলদি তৈরী হয়ে নাও। সন্ধ্যার আগেই আমরা যাত্রা শুরু করবাে।'
গুমাস্তগীনের এ তাৎক্ষণিক ঘােষণায় কিছুটা অবাক হলাে তার লােকজন। কিন্তু কেউ কোন প্রশ্ন না করেই যে যার মত আসবাবপত্র গুছাতে লেগে গেল।
কাফেলা তােড়েজোড়ে যাত্রার জন্য প্রস্তুতি নিতে লাগলাে। তাদের নিজস্ব ঘােড়া ছাড়াও অতিরিক্ত চারটি ঘােড়া প্রস্তুত করা হলাে কমাণ্ডোদের জন্য। চারটি উটের পিঠে মাল-সামান বােঝাই করা হলাে। সঙ্গে নেয়া হলাে প্রয়ােজনীয় খাদ্য ও পানীয়।
আছিয়াত থেকে হারান অনেক দূরের পথ। একাধিক রাত তাদের কাটাতে হবে পথে, মরুভূমির মধ্যে। ফলে সঙ্গে নেয়া হলাে তাবু এবং তাঁবু খাটানাের অন্যান্য সরঞ্জাম। মাল-সামানে উটগুলাের পিঠ বােঝাই হয়ে গেলাে। গুমাস্তগীন নিজে তদারক করলাে প্রস্তুতিপর্ব।
প্রস্তুতিপর্ব শেষ হলে গুমাস্তগীন শেখ মান্নানের কাছে বিদায় নিতে গেল। তাকে বললাে, তােমাকে অনেক ধন্যবাদ। তােমার মেহমানদারীর কথা বহুদিন মনে থাকবে আমার। আমি যাওয়ার জন্য তৈরী। যাওয়ার আগে তােমার কাছ থেকে বিদায় নিতে এলাম। আশা করি তুমিও সময় করে আমার ওখানে বেড়াতে আসবে।'
শেখ মান্নান তার সাথে করমর্দন করে খুশীর সাথেই বললাে, “অবশ্যই, অবশ্যই।
‘আমি কি তাহলে এখন তােমার দেয়া চার কমান্ডোকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারি?
কেন নয়। আপনার সাথে তাে ওদের সম্পর্কে সব লেনদেন শেষ হয়েছে। আপনি যখন সােনা ও মুক্তা দিয়ে ওদের মূল্য পরিশােধ করেছেন, তখন থেকেই তাে ওরা আপনার সম্পত্তি হয়ে গেছে।'
যাওয়ার আগে সালাহউদ্দিন প্রসঙ্গ তােমাকে আরেক বার স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। আমি আশা করি, ক্রুসেডারদের দাবী অনুসারে যে চারজন ভাড়াটে খুনীকে পাঠিয়েছে সুলতানকে হত্যা করতে, তারা এবার সালাহউদ্দিন আইয়ুবীকে শেষ করেই ফিরবে।'
শেখ মান্নান বললাে, 'আইয়ুবীর বিষয়টা আমি দেখছি। তুমি সাইফুদ্দিনকে সামলাও। যে চারজন কমাণ্ডোকে তােমার হাতে তুলে দিয়েছি, ওদের দিয়ে হত্যা করাও সাইফুদ্দিনকে।' শেখ মান্নান আরও বললাে, তােমরা আর যুদ্ধ করতে পারবে না। সে শক্তি এখন নিঃশেষ হয়ে গেছে। এবার ঘরের শত্রুদের চোরের মত গােপনে হত্যা করাে।
এ নিয়ে তুমি ভেবাে না, সাইফুদ্দিন তাে আর আইয়ুবী নয় যে, তাকে হত্যা করা খুব কঠিন কিছু। তুমি ধরে নাও, সাইফুদ্দিন দুনিয়া থেকে হারিয়ে গেছে।
ভাল কথা! তােমার খৃষ্টান বন্ধু ও তার পরী দুটি কোথায়?
তারা তাদের কামরাতেই আছে। গুমাস্তগীন বললাে। ‘সে তােমার কাছে ছোট মেয়েটির ব্যাপারে কোন কথা বলেনি তাে?'
হ্যা, শুনেছি ছােট মেয়েটাকে আজ রাতে তােমার কাছে পাঠাবে । শুনলাম, মেয়েটাকে খৃস্টান অফিসার বলছে, লিজা, এই বেলা তুমি একটু ঘুমিয়ে নাও। রাতে আজ শেখ মান্নানের ওখানে দাওয়াত আছে আমাদের। ঘুম থেকে উঠে এমন সাজ পােশাক পড়বে, দেখলে যেন ভােরের শিশির ভেজা তরতাজা ফুলের মত মনে হয়। গুমাস্তগীন বললাে, তার কথায় মনে হলাে, সে তােমাকে খুবই ভয় পাচ্ছে।'
বুদ্ধিমান অফিসার।' বললাে শেখ মান্নান, 'এখানে বড় বড় শক্তিধর সম্রাটরা পর্যন্ত ভয় পেয়ে যায়, আর ও তাে এক
(চলবে)






শেয়ার করুন

Author:

আমি সজীব হোসাইন -এই ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা পাশাপাশি লেখালেখির কাজটাও করি। অনলাইনে প্রযুক্তির বিষয় নিয়ে যা জানি তা মানুষের মাঝে শেয়ার করার ইচ্ছায় এ ব্লগ টি তৈরি করা।