রবিবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০১৯

ক্রুসেড সিরিজ-১৭. গাদ্দার(পর্ব-3)

১৭. গাদ্দার(পর্ব-3)
করে। ক্ষুধা, পিপাসা ও ক্লান্তিতে তাদের চলার শক্তি ক্ৰমশ: শিথিল হয়ে এলাে। চলতে না পেরে এক সময় আন নাসের থেমে গেলাে। বললাে, আর পারছি না। একটু পানি পেলে হতাে!
এটা কেবল আন নাসেরের কথা ছিল না, এটা ছিল সবারই মনের অব্যক্ত কষ্টের প্রতিধ্বনি। তারা সেখানেই বালির ওপর বসে পড়লাে।
কতক্ষণ ওরা এভাবে বসেছিল বলা মুশকিল। এক সময় আন নাসেরের এক সঙ্গী বললাে, কিন্তু আমরা কি এভাবে বসে বসে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করবাে? খাদ্য নেই, পানীয় নেই, এটা বাস্তবতা। কিন্তু মুজাহিদ কখনাে আল্লাহর সাহায্য থেকে নিরাশ হয় না। আমরামরবাে, তবে শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত বাঁচার চেষ্টা করে মরবাে।।
আন নাসের ও তার সাথীরা আবার উঠে দাঁড়ালাে। তারা এই আশা নিয়ে পথ চলতে লাগলাে যে, সামনে কোথাও না কোথাও পানি পাওয়া যাবেই।
ওরা পথ চলছে। কিন্তু ঐ অঞ্চলে পানির কোন চিহ্নও ছিল না, বরং যত দূর এগুচ্ছিল ততই সে অঞ্চলকে মনে হচ্ছিল আরও কঠিন মরুভূমি ।
ততক্ষণে সূর্য উঠে গেছে । ক্রমশ: সূর্য তার প্রচণ্ড উত্তাপ ছড়িয়ে উপরে উঠতে লাগলাে। ক্লান্ত পায়ে পথ চলতে চলতে এক সময় বসে পড়তে বাধ্য হলাে ওই কাফেলা। সামনে পানির কোন নিশানাও দেখা যাচ্ছে না। মাথার ওপর উত্তপ্ত সূর্য নিয়ে ওরা মরুভূমির সেই গনগনে বালির উপরই স্থির হয়ে বসে রইলাে।

আন নাসের চোখ খুললাে। দেখলাে তার তিন সাথী বেহুশ হয়ে পড়ে আছে বালির ওপর। সূর্য দিগন্তের পাড় থেকে উপরে উঠে ছুটে যাচ্ছে গােধূলির দিকে। আন নাসের চারদিকে তাকালাে। দেখলাে, বালির সীমাহীন সাগরের মাঝে পড়ে আছে ওরা।
তার মন ছেয়ে যেতে লাগলাে গভীর বেদনায়। সে তাে মরুভূমিতেই লালিত-পালিত হয়েছে এবং মরুভূমিতে যুদ্ধও. করেছে। মরুভূমিকে ভয় পাওয়ার লােক সে নয়। তার দুঃখের কারণ, সে ধারণা বা আশাও করেনি যে, হাঁটতে হাঁটতে সে তার বন্ধুদের এমন মরুভূমিতে এনে ফেলবে। দিগন্ত বিস্তৃত এই মরু এলাকায় পানির কোন চিহ্নও নেই।
পিপাসায় তার প্রাণ ওষ্ঠাগত, কিন্তু সে নিজেকে নিয়ে ভাবছে না, ভাবছে তার সাথীদের কথা । তার বােকামীর কারণেই তার সাথীদের এখন এ করুণ অবস্থা। সে তীব্রভাবে অনুভব করলাে, এখান থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সরে পড়তে হবে তাদের।
সে উঠে বসলাে এবং সূর্যের গতিপথ দেখে অনুমান করলাে, কোন দিকে তুর্কমান । সে তার সঙ্গীদের জাগালাে । তারা যখন উঠলাে, তখন তাদের চেহারায় ভয় ও শংকার শিহরণ খেলা করছিল। 
আন নাসের সাথীদের বললাে, ক্ষুধা ও পিপাসা নিয়ে বেঁচে থাকার ট্রেনিং আমরা পেয়েছি। সুলতান আমাদের এ জন্য ট্রেনিং দেননি যে, অসহায়ের মত আমরা ভাগ্যের হাতে নিজেদের সমর্পন করবাে। আমরা আরও দু'চার দিন খিদে ও পিপাসা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবাে। আর এই সময়ের মধ্যে যদি আমরা আমাদের ঠিকানায় পৌছতে না পারি, তবে আল্লাহ নিশ্চয়ই পানির কোন না কোন সন্ধান অবশ্যই দিয়ে দেবেন।
আন নাসেরের কথা শেষ হলে সঙ্গী তিন জনও তাদের কথা বললাে। আন নাসের তুকমান কোন দিকে হতে পারে সে সম্পর্কে তার ধারনা পেশ করে বললাে, তােমাদের কি মনে হয়?
সঙ্গীরা নিজ নিজ মতামত প্রকাশ করে বললাে, আমরা আমাদের এলাকা ছেড়ে অনেক দূরে চলে এসেছি। কিন্তু এতটা দূরে নয় যে, দু'দিন চলার পরও এই মরুভূমি আমরা পার হতে পারবাে না। আমাদেরকে এ মরুভূমি থেকে বেরিয়ে যেতে হবে এবং এখন থেকে নতুন উদ্যমে ও আশায় বুক বেঁধে আমাদের পথ চলতে হবে।'
এক সঙ্গী বললাে, যদি আমাদের কাছে ঘােড়া থাকতাে তবে এই মুস্কিল অনেকটা আসান হয়ে যেতাে। আমরা অল্প সময়ের মধ্যেই কোন লােকালয়ে পৌঁছে যেতে পারতাম।
‘কিন্তু যা নেই তা নিয়ে আফসােস করে লাভ নেই।' বললাে অন্য জন, আমি এখন অনেকটা সতেজ অনুভব।
করছি। মনে হয় আমরা যে কিছুটা সময় ঘুমােত পারলাম তাতেই শরীরে এ সজীবতা ফিরে এসেছে। এটাকেও আমি আল্লাহর এক রহমত মনে করি।
অন্যরাও তার সাথে একমত হলাে।
আন নাসের বললে, ‘হে সাথীরা আমার। আল্লাহ জাল্লে শানুহ আমাদেরকে যে অগ্নি পরীক্ষার মধ্যে ফেলেছেন, সে পরীক্ষায় আমাদেরকে কোন রকম অভিযােগ ছাড়াই উত্তীর্ণ হতে হবে। এখানে চুপ করে বসে থাকলে সমস্যার কোন সমাধান। হবে না।
এক সঙ্গী বললাে, বরং মাথার ওপর সূর্য বসে থেকে আমাদের কেবল পােড়াতেই থাকবে। অতএব আর বসে থাকা। নয়, চলাে যাত্রা শুরু করি। আল্লাহ চাইলে আমাদের পথ খাটো ও সহজ করে দিবেন।
তারা যাত্রা শুরু করলাে, তবে এবারও অনুমানের ওপর নির্ভর করে। পার্থক্য এটুকু, রাতে অনুমান করার কোন মাধ্যম ছিল না, এখন অনুমান ও দিক নির্ণয় করার জন্য অন্তত সূর্য আছে।
তারা পথ চলছে। পায়ের নিচে উত্তপ্ত বালির সমুদ্র। সূর্যের তাপে সেখানে এক ধরনের তরঙ্গ উঠছে। মনে হচ্ছে বালির ওপর দিয়ে নদীর পানির মত অবিরাম ঢেউ বয়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে নেচে উঠছে হাজারটা মরীচিকা। সম্মুখে কিছু দূর থেকে যত দূর দৃষ্টি যায়, মনে হয় বালি নয়, যেন পানির তরঙ্গ বয়ে যাচ্ছে। পায়ের নিচের মাটির উত্তাপ অসহ্য ঠেকছে, তবু পথ চলছে ওরা।
এরা চার জনই মরুভূমির সাথে পরিচিত। মরুভূমির   
গজব ও বিভীষিকার সাথে অভ্যস্থ এদের জীবন। তাই যতই। মরীচিকা ওদের হাতছানি দিক, ওরা তাতে ভুলবার নয়। মরুভূমির এই মরীচিকার সাথে পরিচিত বলেই তারা মরীচিকার লােভাতুর আহবান ও আকর্ষণ উপক্ষো করে চলতে লাগলাে।
‘হে, সাথীগণ!' আন নাসের বললাে, আমরা ডাকাত নই। জেহাদের ময়দানে এসে আমরা এমন কোন অপরাধ করিনি, যার জন্য আল্লাহ আমাদের শাস্তি দিতে পারেন। যদি আজ এই অবস্থায় আমাদের মৃত্যু হয়, আমাদের মৃত বলা যাবে না, আল্লাহর ঘােষণা অনুযায়ী আমরা শহীদ হয়ে যাবাে। যে শাহাদাতের তামান্না নিয়ে আমরা এ জেহাদের ময়দানে এসেছি, যে শাহাদাতের মর্যাদা আমাদের প্রতি মুহূর্তের স্বপ্ন-সাধ ও কামনা। সে জন্যই কোন ভয়, হতাশা, নৈরাশ্য আমাদের স্পর্শও করতে পারবে না। আর, কোন মানুষকে যদি ভয় বা হতাশা স্পর্শ করতে না পারে সে কখনাে দুর্বল হয় না। ক্ষুৎপিপাসাঁর কাতরতা আত্মশক্তির ঐশ্বর্যের কাছে কিছুই না। নিশ্চয়ই আমাদের এই পরীক্ষায় ফেলা আল্লাহরই ইচ্ছা এবং তিনিই আমাদেরকে এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করতে পারেন। আল্লাহকে স্মরণ করাে, আল্লাহর জিকির করতে করতে পথ। চলাে, দেখবে ক্লান্তি কমে যাবে।
রাস্তায় যদি কোন যাত্রীর কাছে পানি পাই, তবে তা
ছিনিয়ে নিতে দ্বিধা করবাে না আমি।' বললাে এক সাথী ।
ছিনিয়ে নিতে যাবে কেন, যদি আল্লাহ তাদেরকে দিয়ে আমাদের জন্য পানি পাঠানােরই ব্যবস্থা করতে পারেন, তবে সে পানি আমরা কেমন করে পাবাে, তার ব্যবস্থাও তিনিই করবেন।' 
‘একেই বলে গাছে খেজুর গােফে রুমাল। যেখানে পানির ‘প’ও নাই সেখানে উনি ছিনতাইয়ের জন্য পেরেশান হয়ে উঠেছেন।' বললাে অন্য জন ।।
তার এ কথায় সবাই একটু হাসলাে। এ হাসিই যেন তাদের সবার মন আরাে হালকা করে দিল। কিন্তু যদি অন্য কেউ এ হাসিটুকু দেখতে পেতাে তাহলে অনুভব করতাে, হাসি দেয়াটা কোন সহজ কাজ নয়, এর জন্যও লাগে প্রচুর শক্তি।
গনগনে সূর্য মাথার ওপর বসে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। সেই উত্তাপের কথা ভুলে যেতে আন নাসের যুদ্ধের সঙ্গীতের সুর গুন গুন করে গাইতে লাগলাে। সঙ্গে সঙ্গে তার সাথীরাও সেই সুরে সুর মিলালাে। সঙ্গীতের সেই সুরে আল্লাহর প্রতি আস্থা ও নির্ভরতা। তারা সম্মিলিত কণ্ঠে গেয়ে চললাে,
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ / জানের মালিক এক আল্লাহ 
তার নামে হও ফানাফিল্লাহ/ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ 
তিনি নেতা নাবিয়াল্লাহ / নিপাত যাবে গায়েরুল্লাহ।'
তখন হালকা হালকা বাতাস বইতে আরম্ভ করলাে। সূর্যের কিরণ বালিতে পড়ে যে চমক সৃষ্টি করছিল, বাতাসের উড়ে আসা বালিতে ঢেকে গেল সে চমক।
সূর্য পশ্চিম দিগন্তের দিকে নেমে যেতে লাগলাে। উত্তাপের দাবদাহ কমতে লাগলাে একটু একটু করে। ক্লান্ত সূর্যের মত ওই চার মুজাহিদের পা-ও শ্রান্তিতে অবশ হয়ে আসছিল।
পশ্চিমের দিগন্তে হারিয়ে যাওয়ার মত সূর্যের একটি ঠিকানা আছে, যেখানে সে নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নিতে পারবে একটি পুরাে রাত। কিন্তু এই মুজাহিদদের বিশ্রামের মত কোন নিশ্চিত আশ্রয় ছিল না। ধীরে ধীরে অবশ পায়ে ওরা চলতেই থাকলাে। কিন্তু সে চলায় ছিল ক্লান্তি ও অবসন্নতার ছাপ। ওদের ঠোটগুলাে শুকিয়ে গিয়েছিল, মুখ থেকে হারিয়ে গিয়েছিল যুদ্ধের উদ্দীপনাময় গান।।
তাদের ছায়া যখন পূর্ব দিকে লম্বা হতে হতে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়লাে, সাথীদের মুখ থেকে হারিয়ে গেল গান, তখনও আন নাসের বিড়বিড় করে পড়ছিল,
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ / জানের মালিক এক আল্লাহ , 
তার নামে হও ফানাফিল্লাহ/ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ । 
তিনি নেতা নাবিয়াল্লাহ / নিপাত যাবে গায়েরুল্লাহ।
এক সময় আন নাসেরের বিড়বিড় জপমালাও বন্ধ হয়ে গেল।
আন নাসের বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বললাে, প্রিয় সাথীরা আমার! আষীদের বােধহয় এখন একটু বিশ্রামের দরকার।'
ওরা থামলাে। সূর্যের শেষ লালিমায় রক্তিম হয়ে উঠেছিল ওদের চেহারাগুলাে। এখন আর সূর্যের সেই তেজ নেই।
অনেক সহনীয় হয়ে এসেছে বাতাস ও বালি।
| সেই নরম বালির ওপর বসে পড়লাে ওরা। কিছুক্ষণ কারাে মুখে কোন কথা নেই। অবশেষে নিরবতা ভাঙলাে আন নাসেরই, শরীরের অবশিষ্ট শক্তি সঞ্চয় করে বললাে, তােমরা নিরাশ হয়াে না, মুমীনের জীবন খাতায় নিরাশার কোন ছায়া থাকে না। হয়তাে আমাদের ঈমান এখনাে কমজোর। তাই আমাদের চেহারায় খেলা করছে দুশ্চিন্তার ছায়া। ঈমানকে মজবুত করাে। বাঁচতে হলে আমাদেরকে ঈমানের জোরেই বাঁচতে হবে।
সে কথা বলছিল আর সাথীদের চেহারা বার বার লক্ষ্য করছিলাে। তাদের চেহারা, ও মুখ রক্তশূন্য, ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। চোখগুলাে ঢুকে গেছে ভিতরের দিকে। 
সূর্য ডুবে গেল। অন্ধকারে ছেয়ে গেল মরু চরাচর। বালিও ক্রমশ ঠাণ্ডা হয়ে এলাে। আন নাসেরের সঙ্গীরা শুয়ে পড়লাে সেই ঠাণ্ডা বালির ওপর।
আন নাসের তাদের কোন বাঁধা দিল না, বরং সেও শুয়ে পড়লাে তাদের পাশে। ওরা যদি কমাণ্ডে সেনা না হয়ে কোন সাধারণ মুসাফির হতাে, তবে অনেক আগেই মাটিতে পড়ে যেত। ওরা একে তাে সৈনিক, তার ওপর কমাণ্ডে সেনা। সাধারণ মানুষ থেকে অনেক বেশী কষ্ট ও বিপদ সহ্য করার শক্তি ও ক্ষমতা রাখে তাদের শরীর। তাই এখনাে টিকে আছে ওরা।
ঠাণ্ডা বাতাসে ওদের শরীর জুড়িয়ে গেল। গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল আইয়ুবীর চার কমাণ্ডো সেনা। মরু শেয়াল তাদের হামলা করতে পারে, ঘটে যেতে পারে কোন অযাচিত বিপদ, এমন কোন চিন্তাই জাগলাে না ওদের মধ্যে।
তখনও সকাল হয়নি, তবে হতে বেশী দেরীও নেই, ঘুম ভাঙতেই আকাশের দিকে তাকিয়ে তারকারাজি দেখে অনুমান করলাে আন নাসের। তারার আলােয় আরেকবার দিক নির্ণয় করে সে সঙ্গীদের ডেকে তুললাে। বললাে, রাত প্রায় শেষ, চলাে রােদ উঠার আগেই যতদূর পারা যায় এগিয়ে থাকি। .
ওরা আবার যাত্রা শুরু করলাে। সারা রাত ঘুম ও বিশ্রামের কারণে শরীর অনেকটা চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। চলার গতি মােটামুটি ভালই, তবে ক্ষুধা ও পিপাসার কথা কেউ মন থেকে মুছে ফেলতে পারছে না।
এখানে মরুভূমি এত বিস্তৃত হতে পারে না। আন নাসের আত্মপ্রত্যয় নিয়ে বললাে, “আজ নিশ্চয়ই পানির সন্ধান পেয়ে যাবাে।
সঙ্গীরা তার এ কথার কোন জবাব দিল না। তবে দিনের বেলায় মরীচিকা দেখে পানির জন্য যত পেরেশানী ছিল, রাতের আঁধারে পেরেশানী ততটা প্রখর ছিল না। বরং আন নাসেরের মত তারাও আশা করছিল, রাত পেরােলে হয়তাে কোন মরুদ্যান বা ঝর্ণা তাদের 
সামনে পড়ে যেতেও পারে। এ আশা নিয়েই তারা পথ চলতে লাগলাে।
সকাল হলাে। পূর্ব দিগন্তে দেখা দিল আলাের রেখা। রক্তিম সূর্য উদয় হলাে ওদের দিকে চোখ রাঙানি দিয়ে। একটু পরই তেতে উঠতে শুরু করলাে বালি। কিন্তু আশার দিক হলাে, ক্রমেই বালির পরিমাণ কমে গিয়ে মাটি দেখা দিতে শুরু করলাে।
এই জানবাজ কমাণ্ডোদের জন্য দিনের প্রথম দুঃখ নিয়ে এলাে উত্তপ্ত সূর্য। পানির আশায় আশায় জান বের হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলাে তাদের। বালি আর ছিল না, তবে মাটি ছিল খুব কঠিন। সূর্যের প্রচণ্ড উত্তাপে সে মাটিতে লম্বা লম্বা ফাটল সৃষ্টি হয়েছিল।
সেই সব ফাটল টপকে পথ চলতে হচ্ছিল তাদের। এতে মাঝে মাঝেই পায়ে ঠোকর খাচ্ছিল। দ্বিতীয় দুঃখ হিসাবে দেখা দিল এই পায়ে ঠোকর খাওয়া। কারণ এতে করে ক্লান্ত পাগুলাে আহত হয়ে পড়ছিল। | 
আট দশ মাইল দূরে হঠাৎ মাটির স্তম্ভ চোখে পড়লাে ওদের। এতেই ওরা উৎফুল্ল হয়ে পড়লাে। কিন্তু পরে দেখা গেল, আসলে সেগুলাে ছিল মাটির টিলা ও বালির ঢিবি। সেখানে কোন গাছপালা বা পানির উৎস ছিল না। মাটির অবস্থা যা তাতে মনে হচ্ছে, শতাব্দীর পর শতাব্দী এ মাটি পিপাসায় মরছে। এখন পানি কেন, এ মাটি মানুষের রক্ত পান করতেও আপত্তি করবে না।
আন নাসের তার সঙ্গীদের দিকে তাকালাে। তাদের চেহারা দেখেই বুঝতে পারলাে নিজের চেহারাটা এখন কেমন হয়েছে। পিপাসায় তার এক সাথীর ততক্ষণে জিহ্বা বের হয়ে এসেছিল। ঠোটের অবস্থা ছিল আরাে করুণ, শুকিয়ে তা কাঠ হয়ে গিয়েছিল। বােধহয় সে ঠোট কিছুটা ফেটেও গিয়েছিল, কারণ একটু একটু জ্বালা করছিল ঠোটে।
আলামত খুব সুবিধের নয়। আর বেশী সময় এভাবে টেকা যাবে না। পানি না পেলে হয়তাে মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যেই মৃত্যু ঘটবে তাদের। এসব আলামত তারই করুণ ইঙ্গিত বহন করছে। মরুভূমি তার মাশুল নিতে শুরু করেছে। সুলতান আইয়ুবীর চার চৌকস কমান্ডো এখন রক্ত পিপাসু মাটির খােরাক হতে যাচ্ছে।
আন নাসের আবার তাকালাে বন্ধুদের দিকে। তার দুই সৈন্যের অবস্থা এখন এতটাই নাজুক যে, তারা আর ঐ স্তম্ভ বা মাটির টিলার কাছেও পৌঁছতে পারবে বলে মনে হয় না।
আন নাসের নিজের দিকে মনােযােগ দিল। তাকে স্মরণ করিয়ে দিল, আন নাসের, তুমি এই জানবাজ কমাপ্তেদের কমার। এদের বাঁচানাের দায়িত্ব এখন তােমার। তুমি তােমার অনুভূতিকে তীক্ষ্ণ করে তােল। নিজের বুদ্ধি ও বিবেককে সজাগ ও নিয়ন্ত্রণে আনাে। যদিও তােমার শারীরিক অবস্থা সাথীদের তুলনায় তেমন উন্নত নয়, কিন্তু মানসিক অবস্থা তাদের মত, হলে চলবে না তােমার। যদি তাই হয় তাহলে তুমি কেমন কমাণ্ডার? একই যদি হবে তােমার অবস্থা তাহলে তােমার পদমর্যাদাও হতাে এক। কিন্তু সেটা যখন হয়নি, যখন সুলতান তােমাকে অর্পন করেছেন উচ্চতর মর্যাদা ও পদবী, তখন তােমাকে তার মর্যাদা রক্ষা করতেই হবে। 
আন নাসের এভাবে নিজেকে বুঝাচ্ছিল আর উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করছিল সঙ্গীদের। সে তাদের পড়ে শােনাচ্ছিল আল্লাহর কালাম ও রাসূলের ত্যাগ-তিতীক্ষাপূর্ণ হাদিসগুলাে। কিন্তু তাতে বন্ধুদের মনে কোন প্রভাব পড়ছে কিনা বুঝতে পারলাে বুঝতে পারলাে না, এতে কোন কাজ হচ্ছে, নাকি সবই ব্যর্থ প্রয়াস মাত্র।
যতই সূর্য উপরে উঠতে লাগলাে, মাটির তাপ ততই বাড়তে লাগলাে। এই চার জন হতভাগা সৈন্যের চলার শক্তি একেবারে নিঃশেষ হয়ে এলাে। তারা আর পা উঠাতে পারছিল না। কোন রকমে পা টেনে টেনে তবু চলা অব্যাহত রাখলাে ওরা। 
যে সৈনিকটির জিহ্বা বের হয়ে পড়েছিল, তার শক্তি এতটাই নিঃশেষ হয়ে এলাে যে, তার হাত থেকে খসে পড়ে গেল বর্শা। পরে সে তার কোমরবন্ধ থেকে তলােয়ারও খুলে ফেলে দিল। সে যখন ‘এসব করছিল তখন তার আদৌ হুশ ছিল কিনা বলা মুশকিল, কারণ তখন সে কোন কথা বলছিল না ।
মরুভূমি তখন তাকে নিয়ে নিষ্ঠুর খেলায় মেতে উঠেছে। যখন কোন পথিক এমন অবস্থায় পড়ে যায় তখন সে এক ধরনের ঘােরের মধ্যে পতিত হয়। সেই তন্দ্রাচ্ছন্ন ঘােরে সে এমন সব কাজ করতে থাকে যার কোন ঠিক ঠিকানা থাকে ।
সে যেদিকে হাত ইশারা করেছিল, সেখানে কোন পানি ছিল না, এমন কি পানির কোন মরীচিকাও ছিল না। কারণ ওই অঞ্চল মরুভূমি ছিল না, জায়গাটা ছিল নিরেট কঠিন মাটিতে পরিপূর্ণ। এ মাটি মরীচিকা হওয়ারও যােগ্য ছিল না। কারণ মরীচিকা সৃষ্টি হয় বালির চাকচিক্যে।
এটা ছিল তাদের ওপর মরুভূমির দ্বিতীয় নিষ্ঠুর তৎপরতা। এ ব্যাপারটা ঘটে সম্পূর্ণ কল্পনার মধ্যে। হতাশার মাঝে আশার কাল্পনিক ধারণা হঠাৎ মূর্ত হয়ে উঠে মৃত্যুপথযাত্রী মুসাফিরের মধ্যে। কল্পনা তখন বাস্তব রূপ ধরে চোখের সামনে দেখা দেয়। পানির ঝর্ণা, ফলের বাগান, অট্টালিকা সবই সে দেখতে পারে সেই কল্প-বাস্তবতার চোখে। এমনও চোখে পড়ে, যেন সামনেই আছে কোন শহর নগর। এমন কি সে ইচ্ছা করলেই দেখতে পায়, বিশাল কাফেলা এগিয়ে যাচ্ছে তার পাশ ঘেঁষে। নর্তকী ও গায়িকার দলকে দেখতে পায় নৃত্যরত অবস্থায়। মৃত্যু পথযাত্রী মুসাফিরের সামনে এমনি নির্দয়-নিষ্ঠুর খেলায় মেতে উঠে বিরান মরুভূমি।
আন নাসেরের এক সঙ্গীকে এমনি ধোঁকা দিতে আরম্ভ করলাে সেই বিরাণ প্রান্তর। তার প্রাণ নিয়ে শুরু করলাে মরণ খেলা । একে মরুভূমির সান্ত্বনাও বলা চলে। কোন যাত্রীর প্রাণ কেড়ে নেয়ার আগে অপূর্ব মনােরম দৃশ্য ও ছবির বহর দেখিয়ে তার মৃত্যু কষ্ট কিছুটা লাঘব করে দেয়।
আন নাসেরের সঙ্গী সামনের দিকে দৌড়াতে শুরু করলাে। যে সৈনিক একটু আগেও কোন রকমে পা টেনে টেনে পথ চলছিল, সে সুস্থ্য মানুষের মত দৌড়াতে শুরু করলাে। এই দৌড়ানাে ঠিক প্রদীপ নিভে যাওয়ার আগের অবস্থার মত। আন নাসের তার পিছনে দৌড় দিলাে এবং তাকে ধরে ফেললাে। তার অন্য দুই সাথীর মধ্যে প্রাণশক্তি তখনও কিছুটা অবশিষ্ট ছিল, তারাও দৌড়ে এসে তাকে ধরে ফেললাে। সে তাদের থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করতে লাগলাে এবং চিৎকার করে বলতে লাগলাে, চলাে, ঐ পানির ঝিলের ধারে যাই। ঐ দেখাে হরিণ ও পাখি ঝিলে পানি পান করছে।'
সাথীরা তাকে ধরে পা টেনে টেনে আস্তে আস্তে চলতে লাগলাে। আন নাসের তার মাথার কাপড় দিয়ে তার মুখ-চোখ ঢেকে দিল যেন ধোকার দৃশ্য তার সামনে থেকে বন্ধ হয়ে যায়।
সূর্য মাথার ওপর উঠে এলাে। তখন আর এক সিপাহীও চিৎকার দিয়ে বলে উঠলাে, “ঐ যে বাগানের মধ্যে নর্তকী নাচছে। ধূর, পানির আশা বাদ দাও, চলাে নাচ দেখি। চলাে বন্ধু সেখানে পানিও পাওয়া যাবে। ঐ যে লােকেরা আহার করছে, আমি তাদের সবাইকে চিনি, চলাে, চলাে ।।| সেও দৌড়াতে উদ্যত হলাে। প্রথম যে সৈনিকের দৃষ্টিভ্রম হয়েছিল সে কিছুক্ষণ পর নীরব হয়ে গিয়েছিল। ফলে সাথীরা তাকে ছেড়ে দিয়েছিল।
সে তার সাথীকে দৌড়াতে দেখে নিজেও পিছু পিছু সে তার দেহকে হালকা করার জন্য শরীরের সমস্ত কাপড় চোপর ও অস্ত্র খুলে ছুঁঁড়ে ফেলতে শুরু করল। 
তার মনে-হলাে, তার সামনে মরুভূমিতে এলােমেলাে পড়ে আছে কোন দিকভ্রান্ত মুসাফিরের লাশ। সে দেখতে পেলাে, হতভাগা সেই মরুাযাত্রীর হাড় ক'খানা বাতাসে দুলছে। না না, ওরা তাে দুলছে না, বরং হাত ইশারায় তাকে ডাকছে। সে সেই ডাকে সাড়া দেয়ার জন্য তার সকল সম্বল রাস্তায় ফেলে দিয়ে সেদিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
মরুভূমি আন নাসেরের এক সাথীকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেল, যখন সে তার সব সাজ-সরঞ্জাম দুনিয়াতেই ফেলে দিয়ে তার দুনিয়ার দায়িত্ব শেষ করতে চাচ্ছিল। 
আন নাসের তার সঙ্গীর বর্শা ও তলােয়ার উঠিয়ে নিল এবং তার কাঁধে হাত রেখে সঙ্গীকে ঝাঁকুনি দিয়ে বললাে, এত তাড়াতাড়ি জীবনে হার মানতে নেই বন্ধু! আল্লাহর সৈনিক মৃত্যুবরণ করে কিন্তু অস্ত্র ফেলে দেয় না। তােমার সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে এসব তােমাকে সাথে রাখতে হবে। হবে।
সাথী তার দিকে ঘােলাটে চোখে তাকালাে। আন নাসের চেয়ে রইল তার দিকে । চার চোখ মিলিত হলাে পরম্পর। সহসা সে হাে হাে করে হেসে উঠলাে। তারপর চোখ সরিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে, হাত দিয়ে ইশারা করে বলে উঠলাে, ‘পানি! ঐ দেখাে বাগান, পানি পেয়ে গেছি। সে সামনের দিকে দৌড় দিল ।দৌড়াতে শুরু করলাে আর চিৎকার করে বলতে লাগলাে, নর্তকী খুবই সুন্দরী, তাকে আমি কায়রােতে দেখেছি। সেও আমাকে চিনে। আমি তার সাথে আহার করবো, তার সাথে সরবত পান করবাে।'
এ দৃশ্য দেখে আন নাসেরের মাথাও খানিকটা এলােমেলাে হয়ে গেল। সে মরুভূমির কষ্ট ও বিপদ সহ্য করতে পারে কিন্তু সাথীদের এ করুণ অবস্থা তার সহ্যের বাইরে। তাদেরকে সামাল দেয়াই এখন তার জন্য দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়ালাে। তার যে সহকারী এখনাে সুস্থ আছে, শারীরিক দিক দিয়ে সেও একেবারে নিঃশেষ হয়ে গেছে। এমনকি তার নিজের শারীরিক অবস্থাও খুবই শােচনীয়।
তার দুই সাথী, যারা বাগানে নর্তকীর নাচ দেখার কাল্পনিক ছবি দেখে দৌড়াচ্ছিল, তারা কয়েক কদম গিয়েই পড়ে গেল। তারা তাে পড়বেই। কারণ তাদের শরীরে আর আছেই বা কি। আন নাসের ও তার সাথী দু'জনকে ধরে তুলে বসালাে এবং চোখ ও মাথার ওপর কাপড়ের আবরণ ফেলে দিল। তাদের চোখ বন্ধ হয়ে গেল, তারা বসে টলতে লাগলাে।
. তােমরা আল্লাহর সৈনিক! আন নাসের আস্তে তাদের কানের কাছে মুখ নিয়ে বললাে, তােমরা আল্লাহর রাসূলের অনুসারী। তােমরা ইসলামের শত্রুদের কোমর ভেঙ্গে দিয়েছাে। তােমাদের দেখে কাফেররা ভয়ে কাঁপে। তােমরা অগ্নিশিখাকে মাড়িয়ে চলা বীর সৈনিক! এই মরুভূমি, পিপাসা, সূর্যের তাপকে তােমরা কি মনে করাে? তােমাদের ওপর শীঘ্রই আল্লাহর রহমত বর্ষিত হবে। আল্লাহর ফেরেশতারা বেহেশতের ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে আনবে তােমাদের জন্য। তােমাদের শরীর তৃষ্ণার্ত ও ক্ষুধার্ত কিন্তু তােমার আত্মা তৃষ্ণার্ত নয়। ঈমানের উষ্ণতায় তােমাদের দীল ভরপুর। মােমিন জিন্দা থাকে তার এই ঈমানকে সম্বল করে।
দু’জন সঙ্গে সঙ্গে চোখের ওপর থেকে ফেলে দিল কাপড়ের আচ্ছাদন। পূর্ণ দৃষ্টি মেলে ওরা আন নাসেরকে দেখলাে। আন নাসের একটু হাসতে চেষ্টা করলাে। সে আবেগের আতিশয্যে যে কথাগুলাে বলেছিল সে কথা ওদের মনে এমন প্রভাব ফেলবে ভাবতে পারেনি আন নাসের। ক্ষুৎপিপাসায় কাতর দু’জন সৈনিকই কল্প-বাস্তবতার পথ ত্যাগ করে বাস্তব জগতে ফিরে এলাে। তারা সজোরে আন নাসেরের হাত আকড়ে ধরে বললাে, আমরা কি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম?
আন নাসের বললাে, না, একটু তন্দ্রার ঘাের লেগেছিল। ও কিছু নয়, চলাে, এখনাে অনেক পথ বাকী।'
তারা উঠে দাঁড়ালাে এবং ধীরে ধীরে চলতে শুরু করলাে।
ওরা টিলা ও বালির যে স্তম্ভ দেখেছিল অনেক আগে, তার কাছাকাছি এসে গেল। এখন সেগুলাে অনেক বড় বড় দেখা যাচ্ছে। তারা আশা করলাে, সেখানে আর কিছু না হােক, অন্তত পানি পাওয়া যাবে। সেখানে নিম্নাঞ্চল আছে, সেই নিম্নাঞ্চলে নিশ্চয়ই পানির নালা ও ঝর্ণা থাকবে।
আন নাসের তাদের বুঝালাে, আমরা পানির কাছাকাছি এসে গেছি, আজ সন্ধ্যার আগেই ইনশাআল্লাহ পানি পাওয়া যাবে| 
তারা সেই প্রান্তরে এসে পা রাখলাে। কিন্তু এখানকার মাটি এত শুকনাে ও কঠিন যে, এখানে পানির আশা শিশির কণার মত বাষ্প হয়ে উড়ে গেল। তারা মাটির টিলা ও ঢিবির ওপর বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।| 
সহসা এক সিপাই দৌড় দিল ও চিৎকার করে বলতে লাগলাে, আমরা গ্রামে এসে গেছি! আমি সবার জন্য খানা পাকাতে যাচ্ছি। ওই দেখাে কুপ থেকে আমাদের গায়ের মেয়েরা পানি উঠাচ্ছে।'
তার পিছনে দ্বিতীয় সৈনিকও দৌড়ালাে এবং চিৎকার করে বলতে লাগলাে, “ঐ যে হংস মিথুন।
তারা দৌড়াতে দৌড়াতে মুখ থুবড়ে পড়ে গিয়ে মুষ্টি ভরে মাটি ও বালি মুখে পুরে নিল।
আন নাসের ও তার অপর সঙ্গী দৌড়ে তাদের কাছে গেল। তাদের মুখ থেকে মাটি বের করে কাপড় দিয়ে মুখ পরিষ্কার করে তাদের দুজনকেই তুলে বসালাে। কিন্তু তাদের আর চলার শক্তি ছিল না। তখনাে এক সৈনিক বলছিল, কুপ থেকে আগে পানি পান করি, তারপর তােমাদের জন্য রান্না চড়াবাে।
আন নাসের দোয়ার জন্য হাত উঠালাে। আকাশের দিকে দু’হাত উঠিয়ে বললাে, 'আয় আল্লাহ জাল্লে জালাল! আমরা তােমার নামের ওপর লড়তে ও মরতে এসেছি। আমরা কোন পাপ করিনি, কোন চুরি-ডাকাতিও করিনি। যদি কাফেরদের , সাথে যুদ্ধ করা আমাদের অপরাধ হয়ে থাকে, তবে আমাদের ক্ষমা করে দাও। হে মরুভূমি ও এই অসহনীয় পরিবেশের মালিক! হে আমাদের দয়ালু খােদা! তুমি আর আমাদের কষ্ট দিও না। তুমি আমার প্রাণ নিতে চাও, নিয়ে নাও। তাতে, আমার কোন আফসােস নেই। শুধু তােমার রহমতের কাছে আমার প্রার্থনা, তুমি আমার রক্তকে পানি বানিয়ে দাও, যাতে আমি আমার মুমূধূ সাথীদেরকে তাঁ পান করাতে পারি। এরাইতাে তােমার প্রথম কেবলাগ্রাসকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তুমি আমার রক্তকে পানি বানিয়ে এদেরকে পান করিয়ে দাও খােদা। | মােনাজাত শেষ করে সে তার সঙ্গীদের দিকে ফিরলাে। সঙ্গীরা আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালাে এবং চলতে লাগলাে।
আন নাসের তার সাথীদেরকে দেখলাে এবং পা টেনে টেনে চলতে লাগলাে ওদের সাথে।
এ সময় আন নাসেরের চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এলাে। বেশীক্ষণ স্থায়ী হলাে না এ অন্ধকার, সহসাই সেখানে যেন আলাের নাচন শুরু হলাে। চাঁদকে মুক্ত করে কালাে মেঘ সহসা সরে গেল যেমনটি হয় অনেকটা সে রকম। অন্ধকার দূর হওয়ার সাথে সাথে তার মনে হলাে,  যেন সামনে সবুজ শস্য ক্ষেত। কিন্তু তার সামনে আসলে বালির টিলা ও পাথরের স্তম্ভ ছাড়া আর কিছু ছিল না। সে এক মুহূর্তের জন্য সবুজ মাঠ দেখলাে, সঙ্গে সঙ্গে সে চোখ বন্ধ করে ফেললাে। সে বুঝতে পারলাে, মরুভূমি তাকেও ধোকা দিতে শুরু করেছে।
তারা এক টিলার মাঝ দিয়ে যাচ্ছিল। টিলাটি ছিল বেশ প্রশস্ত। কোথাও কোথাও বালির মাঝে পাথরের চূড়া দেখা যাচ্ছিল। তারা একটু সামনে অগ্রসর হলাে, তখন তাদের সামনে পড়লাে একটি মরা নদীর শুকনাে পাড়। স্পষ্টতই বুঝা যাচ্ছে, এখানে পানির চিহ্ন ছিল, তবে তা কত শত বছর আগে, তা বলা মুশকিল।
আন নাসের আগে ও তার সাথীরা পিছনে তাকে অনুসরণ করছিল। আন নাসের চলতে চলতে থেমে গেল। সে তার মাথাকে জোরে ঝাঁকি দিয়ে সামনে তাকালাে। সে পূর্বে যা দেখেছিল, তাই দেখতে পেল। শুকনাে নদীর অপর তীরে বালির পাহাড়। সে পাহাড় উপরে উঠে আবার ঝুঁকে গেছে উল্টো দিকে। সম্ভবত বহু শতাব্দী আগে এর তলদেশ দিয়ে পানি প্রবাহিত হতাে। এখনও তার সেই আকৃতি বহাল আছে। পাহাড়ের একাংশ ঝুঁকে আছে নিচের দিকে, তার নিচে ঘন ছায়া।
আন নাসের দেখতে পেল, সেই পাড়ের ছায়ায় দুটি ঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে। আর তার কাছেই দুই যুবতী বসে আছে। তাদের গায়ের রং ধবধবে ফর্সা, চেহারাও কোমল ও আকর্ষণীয়। আন নাসের ভাবলাে, আবার সে মরুভূমির হেলােসিনেশনে পড়েছে। সে আবারও চোখ বন্ধ করে মাথা ঝাঁকালাে এবং চোখ খুলে তাকালাে সেদিকে। না, সে ভুল দেখছে না। তার ইন্দ্রিয়ও প্রতারণা করছে না তাকে।
(চলবে)


শেয়ার করুন

Author:

আমি সজীব হোসাইন -এই ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা পাশাপাশি লেখালেখির কাজটাও করি। অনলাইনে প্রযুক্তির বিষয় নিয়ে যা জানি তা মানুষের মাঝে শেয়ার করার ইচ্ছায় এ ব্লগ টি তৈরি করা।