১৭. গাদ্দার(পর্ব-4)
মানসিক ভারসাম্যহীন তার দুই সাথী নীরব থাকলাে, কথা বললাে না। অন্যজন বললাে, হ্যা, আমি ওদের দেখতে পাচ্ছি, দু'টি ঘােড়া দাঁড়িয়ে আছে, তার পাশে বসে আছে দুই যুবতী।
আল্লাহ আমাদের ওপর রহম করুন!' আন নাসের বললাে, আমাদের দু'জনেরও কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে! আমরাও কি সেই ভৌতিক দৃশ্য দেখতে শুরু করেছি, যা সত্য নয়! নইলে এই বিরান জাহান্নামে, এমন নিস্তব্ধ নির্জন প্রান্তরে এত সুন্দরী মেয়ে আসবে কোত্থেকে? |
তাদের পােষাক যদি মরুভূমির বেদুইনদের মত হতাে, তবু না হয় ভাবতাম, এটা কোন ভৌতিক কাণ্ড নয়! তার সাথী বললাে, কিন্তু এমন নাগরিক পােষাক পরা মেয়ে এখানে আসতেই পারে না। তােমার ধারনাই বােধহয় ঠিক, আমরাও মানসিক দু:স্বপ্নের কবলে পড়ে গেছি। চলাে এক কাজ করি, সামনের ছায়ায় গিয়ে বসি। হয়তাে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলে আমাদের এ ভ্রান্তি কেটে যাবে।
কিন্তু আমি তাে স্বাভাবিক অবস্থায় আছি। আন নাসের বললাে, আমি তােমাকে চিনতে পারছি, তােমার কথাও আমি বুঝতে পারছি। আমার মাথা এখনও আমার নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে!
আমিও তাে সজ্ঞানেই আছি!' তার সাথী বললাে, আমি তো আসলে মেয়েই দেখছি, পরীর মত সুন্দরী দুই মেয়ে!
হঠাৎ কি মনে হতে একটি মেয়ে মুখ উপরে তুললাে, সাথে সাথে তার নজরে পড়ে গেল কয়েকটি মনুষ্য মূর্তি। সে সঙ্গের মেয়েটিকে কিছু বললাে, তারপর দুজনেই তাকালাে তাদের দিকে।
মেয়েরা তাদেরকে দেখে এতটাই বিস্মিত হলাে, যে, তারাও বাকশক্তি হারিয়ে ফেললাে। মনে হলাে, তারাও অনড় অনুভূতিহীন পাথর হয়ে গেছে। তারা অপলক চোখে তাকিয়ে রইলাে পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকা অনড় মনুষ্য মূর্তিগুলাের দিকে।
আন নাসের ভীরু বা কাপুরুষ ছিল না। জ্বীন-ভূত যাই হােক, সে তাদের মুখােমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। সে বিস্ময় কাটিয়ে নিজের মধ্যে একটা সপ্রতিভ ভাব ফিরিয়ে আনলাে। তারপর বীরের মতই ধীর অথচ দৃঢ় পায়ে তাদের দিকে অগ্রসর হলাে।
এ দেখেও মেয়ে দুটির মধ্যে তেমন কোন ভাবান্তর এলাে না। তারা তাদের জায়গায় তেমনি অনড় হয়ে বসে রইলাে, পালিয়ে যাওয়ার বা রুখে দাঁড়াবার কোন চেষ্টাই তাদের মধ্যে দেখা গেল না।
আন নাসের ও তার সঙ্গীরা তাদের থেকে আর মাত্র চার পাঁচ গজ দূরে, এমন সময় একটি মেয়ে তার ডান হাত সামনে বাড়িয়ে আন নাসেরের দিকে তাক করলাে এবং তাদেরকে ওখানেই থেমে যাওয়ার ইঙ্গিত করলাে।
আন নাসের ও তার সঙ্গীরা থেমে গেল। তারা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাে সেই রূপসীদের দিকে। এমন সুন্দরী মেয়ে তারা জীবনেও দেখেনি। মেয়েদের মাথায় রঙিন ওড়না। ওড়নার পাশ দিয়ে কাঁধের ওপর পড়ে আছে রেশমের মত কোমল চুলের গুচ্ছ। চোখের তারায় আশ্চর্য মােহিনী আকর্ষণ। সেই চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে রইলাে চার কমাণ্ডো সেনা।
‘দেখেই বুঝতে পারছি তােমরা সৈনিক! ওদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত যে বড় সে বললাে, ‘তােমরা কার সৈনিক?'
সব কথাই বলবাে। আন নাসের বললাে, আগে আমাকে বলল, তােমরা মরুভূমির ধোকা, নাকি পরীস্থানের পরী।।
আমরা যা কিছুই হই না কেন, আগে বলাে, তােমরা কে, আর কোনদিক থেকে এসেছাে?' মেয়েটি প্রশ্ন করলাে।
অন্য মেয়েটি বললাে, আমরা মরুভূমির ধোঁকাও নই, পরীস্থানের পরীও নই। তােমরা আমাদের যেমন দেখছাে আমরা ঠিক তেমনটিই। আমরা তােমাদের দেখে যেমন বুঝতে পারছি, তােমরা সৈনিক, চোখ থাকলে তােমরাও নিশ্চয়ই বুঝতে পারছাে আমরা দুই নারী ছাড়া আর কিছু নই।
আমরা সুলতান সালাহউদ্দিন আইবীর কমাণ্ডো সৈনিক। আন নাসের বললাে, আমরা রাস্তা ভুলে এদিকে চলে এসেছি। যদি তােমরা জ্বীন জাতির হও, তবে হযরত সােলায়মানের কসম! দয়া করে আমার এই সাথীদের পানি পান করাও, বিনিময়ে ইচ্ছে করলে আমার জান নিয়ে নিও। এরা আমার অধীনের সৈনিক, এদের জীবনের নিরাপত্তার দায়িত্ব আমার।'
‘তােমার সব কথাই আমি শুনতে রাজি, তবে সবার আগে তােমাদের অস্ত্র ত্যাগ করতে হবে। অস্ত্রের মুখে কোন শর্ত মানাকে আমি অপমানজনক মনে করি। মেয়েটি তার দিকে তাকিয়ে বললাে, “হযরত সােলায়মানের কসম দিয়ে চাওয়া জিনিস তুমি পাবে। তােমার সঙ্গীদেরকে আগে ছায়ায় নিয়ে এসাে।
আন নাসেরের অস্তিত্বে জীবনের নতুন স্রোত বয়ে গেল। সে অনুভব করলাে, এই স্রোত তার মাথা দিয়ে প্রবেশ করে পায়ের তলা দিয়ে বের হয়ে গেল। এই স্রোতের অনুভব অন্যরকম। সে মানুষের সঙ্গে মােকাবেলা করতে পারে, রাতের অতর্কিত আক্রমণে সে বরাবর সঙ্গীদের চমক লাগিয়ে দিয়েছে, কিন্তু কোন জ্বীনের সঙ্গে লড়াই করার ট্রেনিং বা অভিজ্ঞতা তার নেই। তার মনে হলাে, এরা বাস্তব দুনিয়ার কোন মানুষ নয়। আর এ কথা মনে হতেই সে এই দুই অবলা নারীর কাছে নিজেকে খুব অসহায় অনুভব করতে লাগলাে। তার অন্তরে এমন ভয় ঢুকে গেল যে, সে কাপুরুষের মত এই দুই মেয়ের কাছে আত্মসমর্পন করবে কিনা ভাবতে লাগলো।
সে জ্বীন-পরীদের বহু গল্প শুনেছে, কিন্তু নিজে কোন জ্বীন বা পরীর সামনে কোনদিন পড়েনি। তার ভয় হলাে, যদি মেয়ে দুটি বা তাদের ঘােড়া এখন চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়! অথবা তারা যদি আকৃতি পরিবর্তন করে ফেলে! এমন হলে তাে তার কিছুই করার থাকবে না। সে অসহায় ও নিরুপায় ভঙ্গিতে তার সাথীদের বললাে, তােমরা ছায়ায় চলাে।'
তার এক সাথী তখন বেহুশের মত পড়েছিল মাটিতে। অন্য সাথীরা তাকে ধরাধরি করে টেনে ছায়াতে নিয়ে গেল।
ওরা ছায়ায় আশ্রয় নেয়ার পর অপেক্ষাকৃত বড় মেয়েটি বললাে, এবার আমাদের বলাে, তােমরা কি করে এখানে এসেছাে?'
'আগে পানি পান করাও!' আন নাসের অনুরােধ করলাে, শুনেছি, জ্বীন-পরীরা সব জিনিস সবখানে উপস্থিত করতে পারে।
‘ঘােড়ার সাথে পানির মশক আছে, একটা খুলে নাও। মেয়েটি বললাে। '
আন নাসের নিজেই এগিয়ে গিয়ে ঘােড়ার জ্বীনের সাথে বাধা মশক খুলে আনলাে। মশকটি পানিতে পূর্ণ। সে প্রথমে বেহুশ সাথীর ওপর ঝুঁকে পড়ে তার মুখে পানির ফোটা ঢেলে দিল। কয়েক ফোটা মুখে যেতেই সে চোখ খুললাে। তার ওপর কমাণ্ডারকে ঝুঁকে থাকতে দেখে নিজে থেকেই উঠে বসলাে। আন নাসের তার মুখে মশক চেপে ধরলাে।
কয়েক ঢােক পান করার পর আন নাসের তার মুখ থেকে সেই মশক একরকম কেড়েই নিয়ে নিল । ও চাচ্ছিল, সে পেট ভরে পানি পান করবে; কিন্তু আন নাসের তাকে বেশী পানি পান করতে দিল না।
তার পানি খাওয়া হয়ে গেলে একে একে সবাই পানি পান করলাে। আন নাসের ও তার সাথীদের ক্লান্তি ও অবসাদ তাতে অনেকটাই দূর হয়ে গেল। তখন তাদের চিন্তা শক্তি নতুন করে সচল হয়ে উঠতে লাগলাে।
আন নাসের ভেবে দেখলাে, এই নারীরা যদি কাল্পনিক কিছু হতাে তবে এই সজীবতা ফিরে পাবার পর তাদের আর দেখা যাওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু মেয়েরাতাে এখনও বর্তমান, সে সম্পূর্ণ সজ্ঞানে এবং নিজ চোখেই তাদের দেখতে পাচ্ছে। তার চেয়ে বেশী বাস্তব হলাে, তারা পানি পান করতে দিয়েছে। আর এ পানি যদি কাল্পনিকই হতাে, তবে শীরে সজীবতা ফিরে আসতাে না। সে মেয়েদের দিকে আর একবার গভীর দৃষ্টিতে তাকালাে। তখন মেয়ে দু'টিকে আরও সুন্দরী ও আকর্ষণীয় মনে হলাে তার কাছে। সেদিকে তাকিয়েই তার আবার মনে হলাে, এরা সত্যি মানুষ নয়, কারণ মানুষ এতাে সুন্দর হতে পারে না।
এই যখন আন নাসেরের মানসিক ও শারীরিক অবস্থা তখন আবার সে নিজেকে খুব দুর্বল ও অসহায় অনুভব করলাে। নিজেকে তার এতটাই হীনবল মনে হচ্ছিল যে, নিজের উপর থেকে নিজেই আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছিল। সে অনুভব করছিল, তার বুদ্ধি সব গুলিয়ে যাচ্ছে, সে আর সুস্থ মাথায় চিন্তা করারও যােগ্য নেই।
পানি পান করার কারণে তার সাথীদের চেহারায়ও জীবন ফিরে এসেছিল। মেয়েদের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে সে, সাথীদের দিকে তাকালাে। কয়েক ফোটা পানির কি অপূর্ব মহিমা তাই দেখে বিস্মিত হলাে সে। পানিটুকু যেন তাদের শরীরের প্রতিটি কোষে ও শিরায় শিরায় অনুপ্রবেশ করে তাদেরকে জীবন্ত করে তুলেছে।
আন নাসেরের মত তার সাথীদের মনেও ভয় সঞ্চারিত হয়েছিল। তারাও ভাবছিল, এরা কি মানুষ, না জ্বীন!
মেয়ে দুটিও তাদেরকে দেখছিল প্রস্ফূটিত নীরব দু'চোখ মেলে। বাইরের দুনিয়া তখন জ্বলছে মরু সূর্যের প্রচণ্ড উত্তাপে। মাটি জ্বলন্ত কয়লার মত উত্তপ্ত হয়েছিল, কিন্তু ওরা যেখানে আশ্রয় নিয়েছিল পাহাড়ের সেই ছায়াঘন জায়গাটি ছিল অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ও উত্তাপের ভয়াবহ তাপ মুক্ত।
এক মেয়ে আন নাসেরের দৃষ্টি আকর্ষণ করে হাত তুলে ঘােড়া দুটি দেখালাে। বললাে, ঘােড়ার সাথে বাঁধা থলি খুলে নিয়ে এসাে এবং তােমার সাথীদের তা থেকে কিছু খেতে দাও।
আন নাসের ভয়ে ভয়ে ঘােড়ার জ্বীনের সাথে বাঁধা ব্যাগটা খুলে আনলাে, যেন ঐ থলিটা কোন যাদুর ব্যাগ।
সে যখন ব্যাগটা খুললাে, তখন দেখলাে তার মধ্যে খেজুর ছাড়াও খাবারের আরও কিছু জিনিস আছে, যেসব কেবল ধনী লোকেরাই খায়। এ ছাড়াও তাতে ছিল উপাদেয় শুকনাে গােস্ত ।
সে মেয়েদের দিকে তাকালাে। বড় মেয়েটি বললাে, ‘খেয়ে নাও।
আন নাসের এসব খাবার তার সঙ্গীদের মধ্যে ভাগ করে দিল। ওদের সবার পেট পিঠের সাথে লেগে গিয়েছিল। তারা খাওয়া শুরু করলাে। কিন্তু খাদ্যের পরিমাণ, তাদের সে ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। বড়জোর দু'জন স্বাভাবিক মানুষের একবেলার আহার হতে পারে। ওরা বিসমিল্লাহ বলে তাই খেতে শুরু করলাে এবং আল্লাহর রহমে সবাই তৃপ্তি সহকারে খাওয়া শেষ করলাে।
এই সামান্য খাবার তাদেরকে যেন মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরিয়ে আনলাে। নতুন করে তারা দেহে প্রাণের স্পন্দন অনুভব , করলাে।
খাওয়া দাওয়া শেষ হলে তারা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলাে এবং আশপাশে চারদিকে তাকিয়ে এলাকাটা দেখতে লাগলাে। মেয়েদের দিকে চোখ পড়তেই তারা অনুভব করলাে, কিছুক্ষণ আগেও তাদের দুর্বল চোখ যা দেখেছে, তা মোটেও ভুল নয়। যদিও এখন তাদেরকে আগের চেয়েও আকর্ষণীয় ও সুন্দরী মনে হচ্ছে।
‘তােমরা আমাদের সাথে কেমন ব্যবহার করবে?' আন নাসের মেয়েদের দিকে তাকিয়ে বললাে, জ্বীন ও মানুষের সাথে কোন প্রতিযােগিতা হয় না, তােমরা আগুন! আর আমরা মাটি ও পানি। কিন্তু আমাদের সবার স্রষ্টা এক আল্লাহ! আমাদেরকে তােমাদের সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি হিসেবে একটু দয়া করাে। আমাদেরকে তুকমান এলাকার রাস্তাতে দিয়ে এসাে। তােমরা ইচ্ছা করলে চোখের পলকে আমাদের তুকমান পৌছে দিতে পারাে।
‘তােমরা কি কোন নৈশ আক্রমণ চালাতে গিয়েছিলে? বড় মেয়েটি জিজ্ঞেস করলাে। সঙ্গে সঙ্গে আরাে বললাে, সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর কমাণ্ডেরাও জ্বীনের মতই। আমাদেরকে বলাে, তােমরা কোথায় গিয়েছিলে ও কি করে এসেছাে?
আন নাসের সমস্ত ঘটনা বিস্তারিত তাদেরকে খুলে বললাে। তার দল যে সাহসিকতা ও বীরত্বের সাথে রাতের আক্রমণ চালিয়েছিল তার পূর্ণ বর্ণনা দিয়ে বললাে, আমরা তাদের বিপুল ক্ষতি সাধন করেছি। কিন্তু ফেরার পথে রাতের আঁধারে পথ হারিয়ে সারা রাত ঘুরে সকালে নিজেদেরকে আবিষ্কার করি মরুভূমিতে। আমাদের সাথে কোন খাবার বা পানি ছিল না, গত দুই দিন এই মরুভূমিতে টিকে আছি কেবল। ঈমানের জোরে, নইলে অনেক আগেই আমাদের মরণের পরপারে পাড়ি জমাবার কথা ছিল।'
‘তােমরা যে সাহসিকতা ও বীরত্বের পরিচয় দিয়েছে তা সত্যি বিস্ময়কর। মেয়েটি বললাে, তােমাদের সব সৈন্যই কি এমন দুঃসাহসী ও বীর?
হ্যা। আন নাসের উত্তর দিল, 'আমাদের সব সৈন্যই ঈমানের শক্তিতে আমাদের মতই বলীয়ান। তবে আমাদের চার জনকে এমন প্রশিক্ষণ দেয়া
হয়েছে, যা সব সৈনিককে দেয়া হয় না। দুঃখ কষ্ট ও বিপদ মুসীবত সহ্য করার যে ট্রেনিং আমাদের দেয়া হয়েছে, কেবল বাছাই করা কমাণ্ডোরাই সে ট্রেনিং পায়। আমরা মরুভূমির হরিণের মত দৌড়াতে পারি, ঈগল পাখির মত আমরা বহু দূর পর্যন্ত দেখতে পারি এবং আমরা চিতা বাঘের মত আক্রমণ চালাতে পারি। আমাদের মধ্যে কেউ চিতা দেখেনি, কিন্তু চিতা কি জীব আমরা তা জানি! তারা কেমন করে হামলা করে, কেমন তাদের শারীরিক শক্তি ও তেজ, সবই আমাদের জানা।
অন্য সৈনিকরা যুদ্ধ করে সেনাপতির নির্দেশ মত, কিন্তু আমাদের যুদ্ধ করতে হয় আমাদের নিজস্ব জ্ঞান ও বুদ্ধি দিয়ে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই অন্য সৈনিকদের তুলনায় আমরা একটু অন্যরকম। আমরা দ্রুত চিন্তা করতে পারি। আমাদের ওস্তাদরা আমাদের শিখিয়েছে কি করে দ্রুত চিন্তা করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হয় তার কৌশল। শিখিয়েছে কি করে শত্রু এলাকায় গিয়ে সেখানকার ফৌজের সাথে মিশে যেতে হয়। আমরা পােষক বদলে ফেলতে পারি, কণ্ঠস্বর পরিবর্তন করতে পারি, পারি নিজের চেহারা সুরত পাল্টে ফেলতে। আমরা অন্ধ ও বধির সাজতে পারি। প্রয়ােজন হলে আমরা অশ্রু বিসর্জন করতে পারি। আর ধরা পড়ার আশংকা থাকলে আমরা আত্মগােপন করতে পারি, প্রয়ােজনে দ্বিধাহীন চিত্তে জীবনের আশা ত্যাগ করে যুদ্ধ করতে পারি। আমরা অকাতরে শত্রু নিধন করতে পারি এবং হাসতে হাসতে মরতে পারি। আমরা শুধু একটি কাজ পারি না, আর তা হলাে, আমরা কখনও বন্দীত্ব বরণ করতে পারি না, হয় সফল হই নতুবা শাহাদাত বরণ করে পৌঁছে যাই আল্লাহর দরবারে।
আমরা যদি জ্বীন না হয়ে মানুষ হতাম, তবে তােমরা আমাদের সাথে কেমন ব্যবহার করতে?' মেয়েটি জিজ্ঞেস করলাে।
তুমি হয়তাে সে কথা বিশ্বাস করবে না।' তবু বলাে।'
আন নাসের বললাে, আমরা এমন পাথর, যে পাথরকে নারীর রূপ যৌবন দ্বারা ভাঙা যায় না। আমরা যদি জানতে পারি, তােমরা মানুষ এবং তােমরা আমাদের মতই পথ হারিয়ে এদিকে চলে এসেছে, সঙ্গে সঙ্গে আমরা তােমাদেরকে আমাদের আশ্রয়ে নিয়ে নেবাে। যতক্ষণ তােমরা আমাদের জিম্মায় থাকবে ততক্ষণ তােমাদের জান-মাল ও ইজ্জতের মুহাফেজ থাকবাে আমরা। এ জন্য আমরা জীবনের ঝুঁকি নিতেও পিছপা হবাে না। আমাদের ঈমান যেমন মূল্যবান আমাদের কাছে তেমনি মূল্যবান তােমাদের জীবন ও ইজ্জত । অতএব তােমাদের জীবন ও ইজ্জত রক্ষার জন্য আমরা আমাদের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করবাে।
কিন্তু এসব বলে কি লাভ! তােমরা তাে আর মানুষ নও। তােমাদের অবস্থা ও শঙ্কাহীন চেহারাই বলে দিচ্ছে, তােমরা মনুষ্য সমাজের কেউ নও। তােমাদের মত এমন অনিন্দ্য রূপসীরা কোনদিন এই মাটির পৃথিবীর বাসিন্দা হতে পারে না।
যদি এটাই তােমাদের বিশ্বাস হয় তবে বলল, এখন আমরা তােমাদের জন্য কি করতে পারি। আমাদের কাছ থেকে কতটুকু কি আশা করাে তােমরা?'
আমরা তােমাদেরকে অনুরােধ করছি, আমাদেরকে তােমাদের হেফাজতে নিয়ে নাও এবং আমাদেরকে কোন নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দাও।
তুমি ঠিকই অনুমান করেছে। আমরা মানব সমাজের কেউ নই।' মেয়েটি বললাে, আমরা জানতাম তােমরা কি করছাে। তােমরা যে রাস্তা হারিয়ে বিভ্রান্ত পথিকের মত মরুভূমির গভীর বিস্তারে ধুকে ধুকে ফিরছাে, আমরা সবই তা লক্ষ্য করছিলাম। তােমরা যদি গােনাহগার হতে তবে যে মরুভূমি তােমরা অতিক্রম করে এসেছে, সে মরুভূমি অতিক্রম করে এখানে আসার সাধ্য তােমাদের হতাে না। তার আগেই মরুভূমি তােমাদের রক্ত পান করে, তােমাদের মাংস ও হাড্ডি শুটকি বানিয়ে বালির মধ্যে তােমাদের পুতে রাখতাে। এই মরুভূমি কখনও পাপিষ্ঠদের ক্ষমা করে না।
তােমাদের অবস্থা দেখে আমরা দু'জনই তােমাদের অনুসরণ করছিলাম। সারাক্ষণ আমরা তােমাদের সঙ্গে সঙ্গেই ছিলাম। তােমাদের যে সব কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে তা তােমাদের ওপর এ জন্যই চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল, যাতে তােমরা আল্লাহকে ভুলে না যাও, আর তােমাদের মন থেকে পাপ চিন্তা দূর হয়ে যায়। আল্লাহর পক্ষ থেকে এ তােমাদের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা ছিল। আল্লাহর শােকর, সে পরীক্ষায় তােমরা সাফল্যের সাথেই উত্তীর্ণ হয়েছে।
তােমাদের কষ্ট দেখে যখন বুঝলাম, তােমরা ধৈর্যের শেষ পরীক্ষা দিচ্ছাে তখন আমরা তােমাদের সামনে মনুষ্যরূপে আবির্ভুত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু তখন আমাদের মনে একটা ভয় কাজ করছিল, আমরা ভাবছিলাম, আমাদের হুরপরীর মত চেহারা দেখে যদি তােমাদের সংযম ভেঙে যায়? যদি তােমরা সর্বশেষ পরীক্ষার মুখােমুখি হয়ে ভুলে যাও তােমাদের ক্ষুধা-তৃষ্ণার কথা! যদি শয়তানের আছর পড়ে তােমাদের ওপর আর তার প্রভাবে তােমরা ধ্বংস হয়ে যাও! কিন্তু আল্লাহ মেহেরবান, তিনি তােমাদের এ ধ্বংস হওয়া থেকেও রক্ষা করেছেন।
আন নাসের ও তার সঙ্গীরা মেয়েটির কথা শুনে খুব অবাক হলাে। বিস্ময় নিয়ে আন নাসের জিজ্ঞেস করলাে, তাহলে তােমরা এতক্ষণ আমাদের সাথেই ছিলে? কিন্তু......'
হ্যা, দীর্ঘক্ষণ ধরে আমরা তােমাদের সাথে আছি। আমাদেরকে তিনিই পাঠিয়েছেন, যিনি মরুভূমিতে পথ হারিয়ে ফেলা নেক বান্দাদের পথ দেখান। বড় মেয়েটি বললাে, ‘তােমাদের ওপর আল্লাহ যে অপরিসীম রহমত বর্ষণ করেছেন, সে রহমতের পরিমাণ তােমরা কল্পনাও করতে পারবে না। পুরুষ মানুষ মুমূর্ষ অবস্থায়ও শয়তানের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারে না। এমন অপবিত্র অবস্থা থেমে মুক্ত করার জন্য আল্লাহতায়ালা তােমাদেরকে কঠিন শাস্তিতে ফেলেছিলেন। পরীক্ষায় পাশ করার পর আমাদের ওপর আদেশ হলাে, ওদের সামনে দেখা দিয়ে অভয় ও আশ্রয় দাও। আমরা জনতাম, তােমরা শয়তানদের কি বিপুল পরিমাণ ক্ষতি সাধন করেছে।
তবে কেন আমাদেরকে জিজ্ঞেস করলে? আন নাসের প্রশ্ন করলাে।
আমরা শুধু দেখতে চাইলাম, তােমরা মিথ্যা বলাে কি ? মেয়েটি বললাে, দেখলাম, তােমরা সত্যি কথাই বলছাে।'
আমরা কখনাে মিথ্যা বলি না। আন নাসের বললো, ‘আইয়ুবীর বাহিনীর প্রতিটি সেনা নিজেকে মনে করে আল্লাহর সৈনিক। আমরা যারা কমাণ্ডো সৈনিক, যারা রাতের আঁধারে অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ি দুশমনের ওপর, আমাদের একমাত্র ভরসা থাকে আল্লাহর ওপর। তাঁকেই আমরা আমাদের মােহাফেজ ও রক্ষাকর্তা মনে করি। আমরা আমাদের বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, সেনাপতির নির্দেশনা থেকে বঞ্চিত হয়ে একমাত্র এই শক্তিবলেই জীবনের মায়াকে তুচ্ছজ্ঞান করি। আমরা বিশ্বাস করি, আল্লাহ আমাদের সর্বক্ষণ দেখছেন ও দেখবেন। আমরা যেহেতু আল্লাহর দৃষ্টির বাইরে যেতে পারবাে না! তাই তাবু নাফরমানিরও কোন প্রশ্ন আসে না । এই বিশ্বাস ও শক্তিই আমাদেরকে সব পাপাচার থেকে রক্ষা করে।
আন নাসের চুপ করলাে। মেয়েরাও চুপ। একটু পর নীরবতা ভঙ্গ করলাে আন নাসেরই, প্রশ্ন করলাে, “তােমরা তাে আমার
এ প্রশ্নের কোন উত্তর দিলে না যে, তােমরা আমাদের সাথে কেমন ব্যবহার করবে?
আমাদের যে আদেশ করা হয়েছে, তার ব্যতিক্রম কিছু। করার ক্ষমতা আমাদের নেই। মেয়েটি উত্তর দিল, তােমরা আশ্বস্ত থাকতে পারাে, আমরা তােমাদের সাথে কোন খারাপ ব্যবহার করবাে না। আমি লক্ষ্য করছি, তােমরা কথা বলতে পারছে না। তুমি ও তােমার সঙ্গীদের চোখ বন্ধ হয়ে আসছে ঘুমে। কিন্তু ভয়ের কারণে তােমরা ঘুমাতে পারছে না। অন্তর থেকে ভয়ভীতি দূর করে দাও। এখন প্রশান্ত মন নিয়ে ঘুমিয়ে পড়াে।
তারপরে কি হবে?' আন নাসের জানতে চাইলাে।
যা আল্লাহর আদেশ হবে, তাই! মেয়েটি উত্তরে বললাে, তবে আমরা তােমাদের কোন ক্ষতি করবাে না। কিন্তু যদি আমাদের এ আশ্বাসে আশ্বস্ত না হয়ে পালাতে চেষ্টা করাে তবে ঐ বালির খুঁটি বা স্তম্ভের মত দাঁড়িয়ে থাকবে অনন্তকাল ধরে। এই বলে সে অদূরে দণ্ডায়মান কতগুলাে বালির স্তম্ভের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বললাে, “তােমরা তাে দূর থেকেই দেখতে পাচ্ছাে ওই বালির স্তম্ভগুলাে। এগুলাের ওপর যুগ যুগ ধরে কোন চালা নেই, তবু ওরা টিকে আছে পাপের সাক্ষী হয়ে। দেখতে ওগুলাে স্তম্ভ বা ঢিবির মত দেখা গেলেও, আসলে এগুলাে মানুষ! তােমাদেরকে দেখানাের কোন আদেশ নেই, যদি আদেশ থাকতাে তবে যে কোন স্তম্ভের ওপর তলােয়ারের আঘাত করলে তােমরা দেখতে পেতে, তা থেকে রক্ত ঝরছে।'
আন নাসের ও তার সাথীদের ভয় আরও তীব্র হলাে, ভীতিবিহ্বল চোখে তারা তাকিয়ে রইলাে সেই স্তম্ভগুলাের দিকে। তাদের দিকে তাকালে যে কেউ বুঝবে, মেয়েটির কথা তারা অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করেছে, যার কারণে তারা দম আটকে বসে আছে।
‘এই মরুভূমিকে বলতে পারাে মাটির জাহান্নাম। মেয়েটি আবার বলতে শুরু করলাে, সাধারণত পথ ভুলে এদিকে যারা আসে, তাদের পরিণতি হয় খুবই করুণ। তারা হয়ে যায়, বিপথগামী ও পাপী। বিভ্রান্ত মুসাফিরকে পথ দেখানাের জন্য কখনও সুন্দর হরিণের রূপ ধরে, কখনও আমাদের মত জান্নাতের হুর-পরীর রূপ ধরে যারা তাদের পথ দেখাতে আসে, যারা সেই পিপাসার্ত পথিকদের পানি পান করায়, যারা জাহান্নামের এই কষ্ট থেকে তাদের উদ্ধার করে, মানুষ পরে তাদের ওপরই জুলুম শুরু করে দেয়। মানুষ পাপে এতই অভ্যস্ত যে, সুন্দর হরিণ সামনে দেখলে তারা তার ওপর তীর চালিয়ে তাকে হত্যা করে এবং তার মাংস ভক্ষণ করে। আর যখন আমাদের মত অপূর্ব সুন্দরী নারী দেখতে পায়, তখন তাকে একাকী অসহায় ভেবে আনন্দ-ফুর্তি ও ভােগের সামগ্রী বানাতে চেষ্টা করে। তারা এটা বােঝে না, জীবনের অন্তিম , সময় এসে গেছে তাদের।
সে তখন মেয়েটাকে বলে, এসাে আমার সঙ্গিনী হও, বিয়ে করে তােমাকে আমার মহলের রাণী বানাবাে। বালি ও মাটির এই যে বিশ্রী স্তম্ভগুলাে এসবই এই ধরনের মানুষের পাপের প্রায়শ্চিত্য । তােমরা এদের মধ্যে গণ্য হবে না। শুয়ে পড়াে, যদি আমাদের দেখে তােমাদের মনে কোন পাপ চিন্তা এসে থাকে তবে তওবা করে ঘুমিয়ে পড়াে। নতুবা তােমাদের পরিণামও এমনিই হবে, যেমনটি দেখছে।
মানুষের এই স্বাদ ও তৃপ্তিই তার বড় দুর্বলতা। এই তৃপ্তির মােহে পড়ে মানুষ খুব কঠিন পরিণামের দিকে এগিয়ে যায়। মানুষের এই দুর্বলতা তার গৌরব ও সম্মানকে ধূলায় মিশিয়ে দেয়। জাতিগতভাবে কোন জাতি এই দুর্বলতায় জড়িয়ে পড়লে তাদের ভাগ্যেও নেমে আসে কঠিন পরিণতি।'
মেয়েটির বলার ভঙ্গিতে ছিল সম্মােহিত যাদুর প্রভাব। তা ছাড়া তারা তাে ধরেই নিয়েছিল এরা এই জগতের কোন মেয়ে নয়, ফলে মেয়েটির কথা দারুণ প্রভাব ফেললাে ওদের মধ্যে। তারা নিবিষ্ট মনে মেয়েটির কথা শুনে ভয়ে একেবারে জড়ােসড়াে ও সংকুচিত হয়ে গেল। ওরা একে অন্যের মুখের দিকে চাইলাে এবং মেয়েটির কথা মত সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিল ।
পাহাড়ের কোলে ছায়াঘন সেই পরিবেশে শুয়ে পড়লাে আইয়ুবীর চার পথহারা কমান্ডো এবং ধীরে ধীরে তারা গভীর নিদ্রায় ডুবে গেলাে ।
চার কমাণ্ডের সেই ঘুমন্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে বড় মেয়েটির ঠোঁটে ফুটে উঠলো মুচকি হাসি। সে সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলাে এবং দু'জনের ঠোঁটেই ধীরে ধীরে ফুটে উঠলাে স্বস্তি ও তৃপ্তির হাসি।
আন নাসের যুদ্ধের সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতাে না। তাদের বিজয় হয়েছে এমন কোন সংবাদ তখনাে পৌঁছেনি তার।
কাছে। সুলতান আইয়ুবী ও তার জানবাজ বাহিনী দুশমনের সম্মিলিত বাহিনীকে পর্যদুস্ত ও বিতাড়িত করেছেন, সম্মিলিত বাহিনীর হেড অব দ্যা কমাণ্ড সাইফুদ্দিন গাজী যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে গেছে, সুলতান আইয়ুবী এখন সাইফুদ্দিন গাজীর আরেক সেনাপতি মুজাফফরুদ্দিনের প্রতি-আক্রমণের অপেক্ষা করছেন, এসব কিছুই তার জানা ছিল না।
কিন্তু সুলতান আইয়ুবী ঠিকই জানেন, মুজাফফরুদ্দিন এমন এক গাদ্দার, যে সুলতান আইয়ুবীর সমর কৌশল সম্পর্কে জ্ঞাত। লােকটি একরােখা ও জেদী, কাল সাপের মত ছােবল হানার জন্য নিশ্চয়ই কোথাও ওঁৎ পেতে আছে, নইলে ময়দানে তার সাথে মােকাবেলা হতােই। মুজাফফরুদ্দিনের প্রতি-আক্রমণের আশংকায় তিনি তাই অপেক্ষা করছেন। - সুলতান আইয়ুবীর ধারণা মােটেই অমূলক বা ভুল ছিল।
মুজাফফরুদ্দিন তখন ময়দানের কাছেই এক গােপন স্থানে আত্মগােপন করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এলাকাটি ছিল জঙ্গলাকীর্ণ এক নিম্নভূমি। সেখানে সে স্ব-সৈন্যে আত্মগােপন করেছিল। সম্মিলিত বাহিনীর মাত্র এক চতুর্থাংশ সৈন্য ছিল সে বাহিনীতে। এ সৈন্য নিয়ে সুলতান আইয়ুবীর সামনে টিকতে পারবে কিনা এই দুশ্চিন্তা পেয়ে বসেছিল তাকে। তার এ দুশ্চিন্তা কিছুটা লাঘব হয়েছিল, কিছু পরাজিত সৈন্য পালিয়ে যাওয়ার সময় তার দলে যােগ দেয়ায়।
সুলতান আইয়ুবী এ বাহিনীর পরিমাণ ও উপস্থিতির কোন সঠিক খবর জানতেন না। কিন্তু বিচক্ষণ সুলতানের কাছে এটা পরিষ্কার ছিল যে, সামনে বিপদ আছে। এ আশংকার কথা জানিয়ে তিনি তার গােয়েন্দা বাহিনীকে আশপাশে ও দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে রেখেছিলেন। তাদের ওপর হুকুম ছিল, 'যদি কোথাও শত্রু সেনার সন্ধান পাও, তবে সে সংবাদ দ্রুত আমার কাছে পৌছে দেবে।
কিন্তু আইয়ুবী ছাড়া তার বাহিনীর অন্যান্য সদস্যের ধারণা ছিল, সাইফুদ্দিনের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত বাহিনী সম্পূর্ণরূপে শেষ হয়ে গেছে এ যুদ্ধে। এ প্রশ্ন কারাে মনে উদয়ই হয়নি যে, সম্মিলিত বাহিনীর কোন দল এখনাে অক্ষত আছে এবং তারা আইয়ুবীর সৈন্যদের ওপর আবার হামলা করতে পারে। বরং তাদের অটুট বিশ্বাস ছিল, দুশমন বাহিনীর এখনাে যারা জীবিত আছে তাদের অধিকাংশই বন্দী। খুব সামান্য সংখ্যক পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।
আগেই বলা হয়েছে, মুজাফফরুদ্দিন যে অঞ্চলে অবস্থান। করছিল, সেটা ছিল জঙ্গলাকীর্ণ ও নিম্নভূমি। পাহাড় থেকে গড়িয়ে আসা পানি, পানির নালা, খাল ও পানি পাওয়ার কারণে গজিয়ে উঠা গাছগাছালিতে এলাকাটি ছিল এমন জঙ্গলাকীর্ণ যে, সেখানে মানুষের যাতায়াত ও আনাগােনা ছিল না। ফলে সুলতান আইয়ুবীর গােয়েন্দা সংস্থার লােকেরা সেখানে কেউ শক্র খুঁজতে যায়নি।
মুজাফফরুদ্দিনের এ অঞ্চলটা ছিল সমরাঙ্গণ থেকে দু’আড়াই মাইল দূরে। সেখানে পাহাড় ও জঙ্গল পরিবেষ্টিত নিরাপদ স্থানে বসে সে সুলতান আইয়ুবীর ওপর আক্রমণ চালানাের পরিকল্পনা করছিলাে। সে উপলব্ধি করছিল, আর বিলম্ব করার অবকাশ নেই। অনতিবিলম্বে আক্রমণ না চালালে আইয়ুবী সুসংগঠিত হয়ে নিজের বাহিনী নিয়ে যে কোন দিকে অগ্রাভিযান চালাতে পারে।
মুজাফফরুদ্দিন যখন এসব ভাবছিল তখন তাঁবুতে প্রবেশ করলাে তার এক সহ-সেনাপতি। তার সাথে আরও একজন লােক।
কি! নতুন কোন সংবাদ আছে?’ মুজাফফরুদ্দিন জিজ্ঞেস করলাে।
সুলতান আইয়ুবীর সেনাবাহিনীর মাঝে কোন পরিবর্তন আসেনি! সহ-সেনাপতি বললাে, বিস্তারিত এই লােকের কাছে শুনুন! এ লােক স্বচক্ষে দেখে এসেছে!
‘এ লােক কি আমাদের গােয়েন্দা?’
হা। সহ-সেনাপতি বললাে।
বলল, তুমি কি দেখে এসেছে?
সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর সৈন্যবাহিনী এখনও আমাদের ফেলে আসা মালসামান ভাগ-বাটোয়ারা করেনি। তারা শুধু আহতদের উঠিয়ে নিয়ে গেছে। তারা লাশগুলাে দাফন করার জন্য কবর খুঁড়ছে। তাদের লাশের সঙ্গে আমাদের লাশগুলােও পৃথকভাবে দাফন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে ওরা।'
আমাকে তাদের কথা শােনাও, যারা এখনও জীবিত আছে। মুজাফফরুদ্দিন বললাে, যারা মরে গেছে, তাদের তাে কবর দিতেই হবে। আমরা ময়দানে নেই, তাই আমাদের
(চলবে)
তুমি হয়তাে সে কথা বিশ্বাস করবে না।' তবু বলাে।'
আন নাসের বললাে, আমরা এমন পাথর, যে পাথরকে নারীর রূপ যৌবন দ্বারা ভাঙা যায় না। আমরা যদি জানতে পারি, তােমরা মানুষ এবং তােমরা আমাদের মতই পথ হারিয়ে এদিকে চলে এসেছে, সঙ্গে সঙ্গে আমরা তােমাদেরকে আমাদের আশ্রয়ে নিয়ে নেবাে। যতক্ষণ তােমরা আমাদের জিম্মায় থাকবে ততক্ষণ তােমাদের জান-মাল ও ইজ্জতের মুহাফেজ থাকবাে আমরা। এ জন্য আমরা জীবনের ঝুঁকি নিতেও পিছপা হবাে না। আমাদের ঈমান যেমন মূল্যবান আমাদের কাছে তেমনি মূল্যবান তােমাদের জীবন ও ইজ্জত । অতএব তােমাদের জীবন ও ইজ্জত রক্ষার জন্য আমরা আমাদের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করবাে।
কিন্তু এসব বলে কি লাভ! তােমরা তাে আর মানুষ নও। তােমাদের অবস্থা ও শঙ্কাহীন চেহারাই বলে দিচ্ছে, তােমরা মনুষ্য সমাজের কেউ নও। তােমাদের মত এমন অনিন্দ্য রূপসীরা কোনদিন এই মাটির পৃথিবীর বাসিন্দা হতে পারে না।
যদি এটাই তােমাদের বিশ্বাস হয় তবে বলল, এখন আমরা তােমাদের জন্য কি করতে পারি। আমাদের কাছ থেকে কতটুকু কি আশা করাে তােমরা?'
আমরা তােমাদেরকে অনুরােধ করছি, আমাদেরকে তােমাদের হেফাজতে নিয়ে নাও এবং আমাদেরকে কোন নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দাও।
তুমি ঠিকই অনুমান করেছে। আমরা মানব সমাজের কেউ নই।' মেয়েটি বললাে, আমরা জানতাম তােমরা কি করছাে। তােমরা যে রাস্তা হারিয়ে বিভ্রান্ত পথিকের মত মরুভূমির গভীর বিস্তারে ধুকে ধুকে ফিরছাে, আমরা সবই তা লক্ষ্য করছিলাম। তােমরা যদি গােনাহগার হতে তবে যে মরুভূমি তােমরা অতিক্রম করে এসেছে, সে মরুভূমি অতিক্রম করে এখানে আসার সাধ্য তােমাদের হতাে না। তার আগেই মরুভূমি তােমাদের রক্ত পান করে, তােমাদের মাংস ও হাড্ডি শুটকি বানিয়ে বালির মধ্যে তােমাদের পুতে রাখতাে। এই মরুভূমি কখনও পাপিষ্ঠদের ক্ষমা করে না।
তােমাদের অবস্থা দেখে আমরা দু'জনই তােমাদের অনুসরণ করছিলাম। সারাক্ষণ আমরা তােমাদের সঙ্গে সঙ্গেই ছিলাম। তােমাদের যে সব কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে তা তােমাদের ওপর এ জন্যই চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল, যাতে তােমরা আল্লাহকে ভুলে না যাও, আর তােমাদের মন থেকে পাপ চিন্তা দূর হয়ে যায়। আল্লাহর পক্ষ থেকে এ তােমাদের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা ছিল। আল্লাহর শােকর, সে পরীক্ষায় তােমরা সাফল্যের সাথেই উত্তীর্ণ হয়েছে।
তােমাদের কষ্ট দেখে যখন বুঝলাম, তােমরা ধৈর্যের শেষ পরীক্ষা দিচ্ছাে তখন আমরা তােমাদের সামনে মনুষ্যরূপে আবির্ভুত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু তখন আমাদের মনে একটা ভয় কাজ করছিল, আমরা ভাবছিলাম, আমাদের হুরপরীর মত চেহারা দেখে যদি তােমাদের সংযম ভেঙে যায়? যদি তােমরা সর্বশেষ পরীক্ষার মুখােমুখি হয়ে ভুলে যাও তােমাদের ক্ষুধা-তৃষ্ণার কথা! যদি শয়তানের আছর পড়ে তােমাদের ওপর আর তার প্রভাবে তােমরা ধ্বংস হয়ে যাও! কিন্তু আল্লাহ মেহেরবান, তিনি তােমাদের এ ধ্বংস হওয়া থেকেও রক্ষা করেছেন।
আন নাসের ও তার সঙ্গীরা মেয়েটির কথা শুনে খুব অবাক হলাে। বিস্ময় নিয়ে আন নাসের জিজ্ঞেস করলাে, তাহলে তােমরা এতক্ষণ আমাদের সাথেই ছিলে? কিন্তু......'
হ্যা, দীর্ঘক্ষণ ধরে আমরা তােমাদের সাথে আছি। আমাদেরকে তিনিই পাঠিয়েছেন, যিনি মরুভূমিতে পথ হারিয়ে ফেলা নেক বান্দাদের পথ দেখান। বড় মেয়েটি বললাে, ‘তােমাদের ওপর আল্লাহ যে অপরিসীম রহমত বর্ষণ করেছেন, সে রহমতের পরিমাণ তােমরা কল্পনাও করতে পারবে না। পুরুষ মানুষ মুমূর্ষ অবস্থায়ও শয়তানের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারে না। এমন অপবিত্র অবস্থা থেমে মুক্ত করার জন্য আল্লাহতায়ালা তােমাদেরকে কঠিন শাস্তিতে ফেলেছিলেন। পরীক্ষায় পাশ করার পর আমাদের ওপর আদেশ হলাে, ওদের সামনে দেখা দিয়ে অভয় ও আশ্রয় দাও। আমরা জনতাম, তােমরা শয়তানদের কি বিপুল পরিমাণ ক্ষতি সাধন করেছে।
তবে কেন আমাদেরকে জিজ্ঞেস করলে? আন নাসের প্রশ্ন করলাে।
আমরা শুধু দেখতে চাইলাম, তােমরা মিথ্যা বলাে কি ? মেয়েটি বললাে, দেখলাম, তােমরা সত্যি কথাই বলছাে।'
আমরা কখনাে মিথ্যা বলি না। আন নাসের বললো, ‘আইয়ুবীর বাহিনীর প্রতিটি সেনা নিজেকে মনে করে আল্লাহর সৈনিক। আমরা যারা কমাণ্ডো সৈনিক, যারা রাতের আঁধারে অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ি দুশমনের ওপর, আমাদের একমাত্র ভরসা থাকে আল্লাহর ওপর। তাঁকেই আমরা আমাদের মােহাফেজ ও রক্ষাকর্তা মনে করি। আমরা আমাদের বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, সেনাপতির নির্দেশনা থেকে বঞ্চিত হয়ে একমাত্র এই শক্তিবলেই জীবনের মায়াকে তুচ্ছজ্ঞান করি। আমরা বিশ্বাস করি, আল্লাহ আমাদের সর্বক্ষণ দেখছেন ও দেখবেন। আমরা যেহেতু আল্লাহর দৃষ্টির বাইরে যেতে পারবাে না! তাই তাবু নাফরমানিরও কোন প্রশ্ন আসে না । এই বিশ্বাস ও শক্তিই আমাদেরকে সব পাপাচার থেকে রক্ষা করে।
আন নাসের চুপ করলাে। মেয়েরাও চুপ। একটু পর নীরবতা ভঙ্গ করলাে আন নাসেরই, প্রশ্ন করলাে, “তােমরা তাে আমার
এ প্রশ্নের কোন উত্তর দিলে না যে, তােমরা আমাদের সাথে কেমন ব্যবহার করবে?
আমাদের যে আদেশ করা হয়েছে, তার ব্যতিক্রম কিছু। করার ক্ষমতা আমাদের নেই। মেয়েটি উত্তর দিল, তােমরা আশ্বস্ত থাকতে পারাে, আমরা তােমাদের সাথে কোন খারাপ ব্যবহার করবাে না। আমি লক্ষ্য করছি, তােমরা কথা বলতে পারছে না। তুমি ও তােমার সঙ্গীদের চোখ বন্ধ হয়ে আসছে ঘুমে। কিন্তু ভয়ের কারণে তােমরা ঘুমাতে পারছে না। অন্তর থেকে ভয়ভীতি দূর করে দাও। এখন প্রশান্ত মন নিয়ে ঘুমিয়ে পড়াে।
তারপরে কি হবে?' আন নাসের জানতে চাইলাে।
যা আল্লাহর আদেশ হবে, তাই! মেয়েটি উত্তরে বললাে, তবে আমরা তােমাদের কোন ক্ষতি করবাে না। কিন্তু যদি আমাদের এ আশ্বাসে আশ্বস্ত না হয়ে পালাতে চেষ্টা করাে তবে ঐ বালির খুঁটি বা স্তম্ভের মত দাঁড়িয়ে থাকবে অনন্তকাল ধরে। এই বলে সে অদূরে দণ্ডায়মান কতগুলাে বালির স্তম্ভের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বললাে, “তােমরা তাে দূর থেকেই দেখতে পাচ্ছাে ওই বালির স্তম্ভগুলাে। এগুলাের ওপর যুগ যুগ ধরে কোন চালা নেই, তবু ওরা টিকে আছে পাপের সাক্ষী হয়ে। দেখতে ওগুলাে স্তম্ভ বা ঢিবির মত দেখা গেলেও, আসলে এগুলাে মানুষ! তােমাদেরকে দেখানাের কোন আদেশ নেই, যদি আদেশ থাকতাে তবে যে কোন স্তম্ভের ওপর তলােয়ারের আঘাত করলে তােমরা দেখতে পেতে, তা থেকে রক্ত ঝরছে।'
আন নাসের ও তার সাথীদের ভয় আরও তীব্র হলাে, ভীতিবিহ্বল চোখে তারা তাকিয়ে রইলাে সেই স্তম্ভগুলাের দিকে। তাদের দিকে তাকালে যে কেউ বুঝবে, মেয়েটির কথা তারা অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করেছে, যার কারণে তারা দম আটকে বসে আছে।
‘এই মরুভূমিকে বলতে পারাে মাটির জাহান্নাম। মেয়েটি আবার বলতে শুরু করলাে, সাধারণত পথ ভুলে এদিকে যারা আসে, তাদের পরিণতি হয় খুবই করুণ। তারা হয়ে যায়, বিপথগামী ও পাপী। বিভ্রান্ত মুসাফিরকে পথ দেখানাের জন্য কখনও সুন্দর হরিণের রূপ ধরে, কখনও আমাদের মত জান্নাতের হুর-পরীর রূপ ধরে যারা তাদের পথ দেখাতে আসে, যারা সেই পিপাসার্ত পথিকদের পানি পান করায়, যারা জাহান্নামের এই কষ্ট থেকে তাদের উদ্ধার করে, মানুষ পরে তাদের ওপরই জুলুম শুরু করে দেয়। মানুষ পাপে এতই অভ্যস্ত যে, সুন্দর হরিণ সামনে দেখলে তারা তার ওপর তীর চালিয়ে তাকে হত্যা করে এবং তার মাংস ভক্ষণ করে। আর যখন আমাদের মত অপূর্ব সুন্দরী নারী দেখতে পায়, তখন তাকে একাকী অসহায় ভেবে আনন্দ-ফুর্তি ও ভােগের সামগ্রী বানাতে চেষ্টা করে। তারা এটা বােঝে না, জীবনের অন্তিম , সময় এসে গেছে তাদের।
সে তখন মেয়েটাকে বলে, এসাে আমার সঙ্গিনী হও, বিয়ে করে তােমাকে আমার মহলের রাণী বানাবাে। বালি ও মাটির এই যে বিশ্রী স্তম্ভগুলাে এসবই এই ধরনের মানুষের পাপের প্রায়শ্চিত্য । তােমরা এদের মধ্যে গণ্য হবে না। শুয়ে পড়াে, যদি আমাদের দেখে তােমাদের মনে কোন পাপ চিন্তা এসে থাকে তবে তওবা করে ঘুমিয়ে পড়াে। নতুবা তােমাদের পরিণামও এমনিই হবে, যেমনটি দেখছে।
মানুষের এই স্বাদ ও তৃপ্তিই তার বড় দুর্বলতা। এই তৃপ্তির মােহে পড়ে মানুষ খুব কঠিন পরিণামের দিকে এগিয়ে যায়। মানুষের এই দুর্বলতা তার গৌরব ও সম্মানকে ধূলায় মিশিয়ে দেয়। জাতিগতভাবে কোন জাতি এই দুর্বলতায় জড়িয়ে পড়লে তাদের ভাগ্যেও নেমে আসে কঠিন পরিণতি।'
মেয়েটির বলার ভঙ্গিতে ছিল সম্মােহিত যাদুর প্রভাব। তা ছাড়া তারা তাে ধরেই নিয়েছিল এরা এই জগতের কোন মেয়ে নয়, ফলে মেয়েটির কথা দারুণ প্রভাব ফেললাে ওদের মধ্যে। তারা নিবিষ্ট মনে মেয়েটির কথা শুনে ভয়ে একেবারে জড়ােসড়াে ও সংকুচিত হয়ে গেল। ওরা একে অন্যের মুখের দিকে চাইলাে এবং মেয়েটির কথা মত সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিল ।
পাহাড়ের কোলে ছায়াঘন সেই পরিবেশে শুয়ে পড়লাে আইয়ুবীর চার পথহারা কমান্ডো এবং ধীরে ধীরে তারা গভীর নিদ্রায় ডুবে গেলাে ।
চার কমাণ্ডের সেই ঘুমন্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে বড় মেয়েটির ঠোঁটে ফুটে উঠলো মুচকি হাসি। সে সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলাে এবং দু'জনের ঠোঁটেই ধীরে ধীরে ফুটে উঠলাে স্বস্তি ও তৃপ্তির হাসি।
আন নাসের যুদ্ধের সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতাে না। তাদের বিজয় হয়েছে এমন কোন সংবাদ তখনাে পৌঁছেনি তার।
কাছে। সুলতান আইয়ুবী ও তার জানবাজ বাহিনী দুশমনের সম্মিলিত বাহিনীকে পর্যদুস্ত ও বিতাড়িত করেছেন, সম্মিলিত বাহিনীর হেড অব দ্যা কমাণ্ড সাইফুদ্দিন গাজী যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে গেছে, সুলতান আইয়ুবী এখন সাইফুদ্দিন গাজীর আরেক সেনাপতি মুজাফফরুদ্দিনের প্রতি-আক্রমণের অপেক্ষা করছেন, এসব কিছুই তার জানা ছিল না।
কিন্তু সুলতান আইয়ুবী ঠিকই জানেন, মুজাফফরুদ্দিন এমন এক গাদ্দার, যে সুলতান আইয়ুবীর সমর কৌশল সম্পর্কে জ্ঞাত। লােকটি একরােখা ও জেদী, কাল সাপের মত ছােবল হানার জন্য নিশ্চয়ই কোথাও ওঁৎ পেতে আছে, নইলে ময়দানে তার সাথে মােকাবেলা হতােই। মুজাফফরুদ্দিনের প্রতি-আক্রমণের আশংকায় তিনি তাই অপেক্ষা করছেন। - সুলতান আইয়ুবীর ধারণা মােটেই অমূলক বা ভুল ছিল।
মুজাফফরুদ্দিন তখন ময়দানের কাছেই এক গােপন স্থানে আত্মগােপন করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এলাকাটি ছিল জঙ্গলাকীর্ণ এক নিম্নভূমি। সেখানে সে স্ব-সৈন্যে আত্মগােপন করেছিল। সম্মিলিত বাহিনীর মাত্র এক চতুর্থাংশ সৈন্য ছিল সে বাহিনীতে। এ সৈন্য নিয়ে সুলতান আইয়ুবীর সামনে টিকতে পারবে কিনা এই দুশ্চিন্তা পেয়ে বসেছিল তাকে। তার এ দুশ্চিন্তা কিছুটা লাঘব হয়েছিল, কিছু পরাজিত সৈন্য পালিয়ে যাওয়ার সময় তার দলে যােগ দেয়ায়।
সুলতান আইয়ুবী এ বাহিনীর পরিমাণ ও উপস্থিতির কোন সঠিক খবর জানতেন না। কিন্তু বিচক্ষণ সুলতানের কাছে এটা পরিষ্কার ছিল যে, সামনে বিপদ আছে। এ আশংকার কথা জানিয়ে তিনি তার গােয়েন্দা বাহিনীকে আশপাশে ও দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে রেখেছিলেন। তাদের ওপর হুকুম ছিল, 'যদি কোথাও শত্রু সেনার সন্ধান পাও, তবে সে সংবাদ দ্রুত আমার কাছে পৌছে দেবে।
কিন্তু আইয়ুবী ছাড়া তার বাহিনীর অন্যান্য সদস্যের ধারণা ছিল, সাইফুদ্দিনের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত বাহিনী সম্পূর্ণরূপে শেষ হয়ে গেছে এ যুদ্ধে। এ প্রশ্ন কারাে মনে উদয়ই হয়নি যে, সম্মিলিত বাহিনীর কোন দল এখনাে অক্ষত আছে এবং তারা আইয়ুবীর সৈন্যদের ওপর আবার হামলা করতে পারে। বরং তাদের অটুট বিশ্বাস ছিল, দুশমন বাহিনীর এখনাে যারা জীবিত আছে তাদের অধিকাংশই বন্দী। খুব সামান্য সংখ্যক পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।
আগেই বলা হয়েছে, মুজাফফরুদ্দিন যে অঞ্চলে অবস্থান। করছিল, সেটা ছিল জঙ্গলাকীর্ণ ও নিম্নভূমি। পাহাড় থেকে গড়িয়ে আসা পানি, পানির নালা, খাল ও পানি পাওয়ার কারণে গজিয়ে উঠা গাছগাছালিতে এলাকাটি ছিল এমন জঙ্গলাকীর্ণ যে, সেখানে মানুষের যাতায়াত ও আনাগােনা ছিল না। ফলে সুলতান আইয়ুবীর গােয়েন্দা সংস্থার লােকেরা সেখানে কেউ শক্র খুঁজতে যায়নি।
মুজাফফরুদ্দিনের এ অঞ্চলটা ছিল সমরাঙ্গণ থেকে দু’আড়াই মাইল দূরে। সেখানে পাহাড় ও জঙ্গল পরিবেষ্টিত নিরাপদ স্থানে বসে সে সুলতান আইয়ুবীর ওপর আক্রমণ চালানাের পরিকল্পনা করছিলাে। সে উপলব্ধি করছিল, আর বিলম্ব করার অবকাশ নেই। অনতিবিলম্বে আক্রমণ না চালালে আইয়ুবী সুসংগঠিত হয়ে নিজের বাহিনী নিয়ে যে কোন দিকে অগ্রাভিযান চালাতে পারে।
মুজাফফরুদ্দিন যখন এসব ভাবছিল তখন তাঁবুতে প্রবেশ করলাে তার এক সহ-সেনাপতি। তার সাথে আরও একজন লােক।
কি! নতুন কোন সংবাদ আছে?’ মুজাফফরুদ্দিন জিজ্ঞেস করলাে।
সুলতান আইয়ুবীর সেনাবাহিনীর মাঝে কোন পরিবর্তন আসেনি! সহ-সেনাপতি বললাে, বিস্তারিত এই লােকের কাছে শুনুন! এ লােক স্বচক্ষে দেখে এসেছে!
‘এ লােক কি আমাদের গােয়েন্দা?’
হা। সহ-সেনাপতি বললাে।
বলল, তুমি কি দেখে এসেছে?
সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর সৈন্যবাহিনী এখনও আমাদের ফেলে আসা মালসামান ভাগ-বাটোয়ারা করেনি। তারা শুধু আহতদের উঠিয়ে নিয়ে গেছে। তারা লাশগুলাে দাফন করার জন্য কবর খুঁড়ছে। তাদের লাশের সঙ্গে আমাদের লাশগুলােও পৃথকভাবে দাফন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে ওরা।'
আমাকে তাদের কথা শােনাও, যারা এখনও জীবিত আছে। মুজাফফরুদ্দিন বললাে, যারা মরে গেছে, তাদের তাে কবর দিতেই হবে। আমরা ময়দানে নেই, তাই আমাদের
(চলবে)
1 coment rios:
Enter your comment...nice
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন