রবিবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০১৯

ক্রুসেড সিরিজ-১৭. গাদ্দার(পর্ব-2)

১৭. গাদ্দার(পর্ব-2)
ছিল সর্বাধিক। তিনি সামরিক বাহিনীর শৃংখলা ভঙ্গকে অমার্জনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করতেন। ফলে তার বাহিনী ছিল খুবই সুশৃংখল। এই যুদ্ধে কিছুসংখ্যক শত্রু সৈন্য এলোমেলোভাবে যে যেদিকে পারে পালিয়েছিল। সুলতানের বাহিনী পালিয়ে যাওয়া এসব সৈন্যদের পিছু ধাওয়া করেছিল। কিন্তু তাদের ট্রেনিং এমন ছিল যে, পিছু ধাওয়া করার সময়ও তারা একে অপরের সাথে যোগাযোগ ও সম্পর্ক অটুট রাখতো। সুলতান আইয়ুবী তাদেরকে পিছু ধাওয়া করে বেশী দূর যেতে নিষেধ করেছিলেন। 
যুদ্ধের সময় তিনি একদল সৈন্যকে ময়দানের ডানে ও বামে, দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। তাদের ওপর নির্দেশ ছিল, সুলতানের পরবতী হুকুম না পাওয়া পর্যন্ত তারা যেন তাদের অবস্থানে সুশৃংখলভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। যুদ্ধ শেষ হলেও সেই বাহিনীকে তিনি সেখান থেকে সরে আসার নির্দেশ দেননি । ফলে তারা তখনাে পূর্ব অবস্থায় দাঁড়িয়েছিল। 
আহত সৈন্যদের আলাদা করার পর রিজার্ভ বাহিনীর সালার সুলতানের কাছে এগিয়ে গেল। সুলতানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললো, ‘সুলতান, শত্রুদের অস্ত্রশস্ত্র, মালসামান, ঘোড়া সবই সংগ্রহ করা হয়েছে। গনিমতের এসব মাল সম্পর্কে আপনার আদেশ কি?” 
সুলতান পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন তার দিকে। বললেন, যুদ্ধ শেষ হয়েছে। এ কথা তোমাকে কে বললো? খুশীতে বিভোর হওয়ার মত সময় এখনও আসেনি আমাদের। আমার শিক্ষা এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে তাে চলবে না, বিজয়ের পূর্ণতা পাওয়ার আগে গনিমত বন্টনের কথা আমি কখনোই ভাবি না। আমার বিবেচনায় আমরা শক্ৰদের একটি বৃহৎ দলকে বিচ্ছিন্ন করেছি মাত্র। কিছু সংখ্যক সৈন্য নিহত এবং কিছু সৈন্যকে আমরা বন্দীও করেছি ঠিক, কিন্তু আমার বিশ্বাস, যুদ্ধ এখনাে শেষ হয়নি। 
আমাদের বাহিনী কি কোন পার্শ্ব আক্রমণের সম্মুখীন হয়েছে? না, হয়নি। কিন্তু এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। মূল বাহিনীর ডানে বায়ে রক্ষী বাহিনী মোতায়েন না করে ময়দানে আসার কথা নয় সাইফুদিনের। আমার সন্দেহ হচ্ছে, আমাদের উভয় পাশে এখনও শত্রু বাহিনী ওঁৎ পেতে আছে। ময়দানে না আসার কারণে এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী ও সুরক্ষিত থাকার কথা ওদের। তারা যোদ্ধা সৈনিক, যদিও ঈমান বেচা গাদ্দার। কিন্তু এত আনাড়ী নয় যে, তাদের যে ব্যাটেলিয়ান যুদ্ধে অংশ নেয়নি, তারা বিনা যুদ্ধেই ফিরে যাবে? মনে হয়, সুরক্ষিত দল পলাতক সৈন্যদের গুছিয়ে নিয়ে আবার আক্রমণ চালাবে।” 
‘তাদের কেন্দ্রীয় কমাণ্ড তো শেষ হয়ে গেছে, সম্মানিত সুলতান! এক সেনাপতি বললো, সৈন্য থাকলেও এখন তাদের কমাণ্ড করার আর কেউ নেই।” 
আছে, কেউ না থাকুক খৃস্টানরা তো আছে। যাদের সাথে এতক্ষণ যুদ্ধ করলে তারা আমাদের মূল শক্র নয়, এরা তো আসলে খৃস্টানদের হাতের পুতুলমাত্র। খৃস্টানরা নিশ্চিহ্ন না হওয়া পর্যন্ত এ লড়াই চলতেই থাকবে।'
সুলতানে আইয়ুবী আরো বললেন, যদিও কোন দিক থেকে কোন সংবাদ আসছে না, কিন্তু আমি নিশ্চিত, খৃস্টানরা কাছেই কোথাও গোপনে সৈন্য ও অস্ত্র মজুদ করে রেখেছে। এটা পার্বত্য এলাকা। এখানে আছে অসংখ্য গলিঘুপচি। উচু টিলার আড়ালে আছে গভীর নিম্নাঞ্চল। কোথাও কোথাও আবার গভীর জঙ্গলও রয়েছে। ফলে এই অরণ্য বা টিলার আড়ালে কি আছে কিছুই দেখা যায় না। এই সুবিধাটুকুই ভোগ করছে দুশমন। লুকিয়ে আছে দৃষ্টির অন্তরালে।”
‘তেমন কিছু হলে আমরা কি খবর পেতাম না? আমাদের টহল বাহিনীর চােখে কি কিছুই ধরা পড়তো না?” বললো এক, সেনাপতি। '
‘শত্রু ও বিষধর সাপকে কখনও বিশ্বাস করতে নেই, মরার সময়ও তা দংশন করে বসে। বেশ কিছু দিন হলো আমি সাইফুদিনের সেনাপতি মুজাফফরুদ্দিনের কোন সংবাদ পাচ্ছি না। তোমরা সবাই জানো, মুজাফফরুদ্দিন এত সহজে পালানাের মত সেনাপতি নয়। খৃস্টানদের সহযোগিতা নিয়ে কখন মুজাফফরুদ্দিন ময়দানে আসে। আমি তারই অপেক্ষা করছি। তােমরাও চারদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখো। সৈন্যদের সংহত করে প্রস্তুত রাখো তাদের। আমি মুজাফফরুদ্দিনকে যতটুকু চিনি, তাতে তোমাদের এ নিশ্চয়তা দিতে পারি, ওই সাপ অবশ্যই আমাদের ওপর ছােবল হানবে, মৃত্যুপথযাত্রী হলেও সে চেষ্টা করবে। শেষবারের মত আমাদের ওপর এক প্ৰচণ্ড আক্রমণ চালাতে ।”
সুলতান আইয়ুবীর এ আশংকা ভিত্তিহীন ছিল না। তিনি মুজাফফরুদ্দিনকে ভাল মতই শিক্ষা দিয়েছিলেন। সে শিক্ষার কথা ভুলে গিয়ে না থাকলে প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা মুজাফফরুদিন অবশ্যই করবে। 

এই মুজাফফরুদ্দিন এক কালে সুলতান আইয়ুবীরই সেনা সদস্য ছিল। নিজের যোগ্যতা ও প্রতিভাগুণে দৃষ্টি কেড়েছিল আইয়ুবীর। আইয়ুবী তাকে ধাপে ধাপে প্রমোশন দিয়ে সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। গাদারীর খাতায়, নাম লেখানোর সময় সে-ই ছিল সুলতান আইয়ুবীর সেনাপতির দায়িত্বে। সুলতান তাকে এতটাই বিশ্বাস করেছিলেন যে, সেনাবাহিনীর কেন্দ্রীয় কমাণ্ড তিনি তার হাতেই তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু শক্তি ও ক্ষমতার মোহ এমন এক দুরারোগ্য ব্যাধি, যা বশে রাখতে না পারলে তা নিজের বিবেক ও মনুষত্বকেই ধ্বংস করে দেয়। মুজাফফরুদ্দিনকেও ধরেছিল সেই দুরারোগ্য ব্যাধিতে। আইয়ুবীর  বাহিনীর সেনাপতি হওয়ার পরও গাদ্দারের খাতায় নাম লেখাতে বাঁধেনি তার । 
ফলে তারা উভয়ে উভয়কে ভাল মতাে চিনতো। সুলতান আইয়ুবীর যুদ্ধ কৌশল, নিপূণতা ও দক্ষতার কথা যেমন জানা ছিল মুজাফরুদ্দিনের, তেমনি আইয়ুবীর জানা ছিল মুজাফরুদ্দিনের দৌড় কতদূর যেতে পারে।
মুজাফরুদ্দিনের এ দিকটিও সুলতানের নজরে রেখেছিলেন যে, সে জন্মগতভাবেই যোদ্ধা প্রকৃতির লোক, এটা তার বংশীয় উত্তরাধিকার। আর সে সামরিক শিক্ষা লাভ করেছে। সুলতানের নিজের কাছেই । যুদ্ধের ময়দান থেকে পালানোর শিক্ষা তিনি তাকে দেননি । 
মুজাফফরুদ্দিন ছিল সাইফুদিনের নিকটাত্মীয় অর্থাৎ চাচাতো ভাই। সুলতান আইয়ুবী যখন মিশর থেকে দামেশকে চলে আসেন তখন সেখানকার একদল মুসলমান আমীর সুলতানের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাঁধা দেয়ার চেষ্টা করেছিল। সে সময় দৃশ্যতঃ শক্তির পাল্লা ভারী ছিল ওই ষড়যন্ত্রকারীদের। সাইফুদিন তখন তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিল। আত্মীয়তার সূত্র ধরে মুজাফফরুদিনের সাথে যোগাযোগ করে সাইফুদ্দিন এবং তার মধ্যে সৃষ্টি করে লোভ ও ক্ষমতার মােহ। সেই মােহ তাকে আর সুলতানের দলে থাকতে দেয়নি। মুজাফরুদ্দিন সুলতান আইয়ুবীকে কিছু না বলে পালিয়ে গিয়ে যোগ দেয় সাইফুদিনের সাথে। উদ্দেশ্য, দুই ভাই মিলে নতুন এক সাম্রাজ্য গড়ে তুলবে। কিন্তু সে স্বপ্ন তাদের এখনাে পূরণ হয়নি। 
তুর্কমান যুদ্ধের আগে হিম্মত পর্বত শৃঙ্গের যুদ্ধে সুলতান প্রথম মুজাফফরুদিনের মুখোমুখি হন। মুজাফফরুদিন সুলতান আইয়ুবীর বাহিনীর ওপর পার্শ্বদেশ থেকে এমন আক্রমণ চালিয়েছিল যে, সে আক্রমণ ঠেকাতে শেষ পর্যন্ত সুলতান আইয়ুবীকে নিজের হাতে কমাণ্ড নিয়ে সরাসরি ময়দানে নেমে আসতে হয়েছিল। 
কাজী বাহাউদ্দিন শাদাদ লিখেছেন, যদি সুলতান আইয়ুবী সে যুদ্ধে নিজের হাতে কমাণ্ড নিয়ে ময়দানে ঝাপিয়ে না। পড়তেন, তবে যুদ্ধের ফলাফল হতো ভিন্ন রকম।
সে যুদ্ধে মুজাফফরুদ্দিন সেনানায়ক হিসেবে যথেষ্ট দূরদশীতার পরিচয় দিয়েছিল । সমর নৈপুণ্যের ওস্তাদী প্রদর্শনে সে কোনরূপ কার্পণ্য করেনি, কিন্তু দুৰ্ভাগ্য তার, সে লড়ছিল তারই ওস্তাদ সুলতান আইয়ুবীর সাথে, যে জন্য বিজয়ের দেখা পাওয়া তার ভাগ্যে ঘটেনি। 
মরু সাইমুম উপেক্ষা করে ছুটে আসা মিল্লাতের এক দুঃসাহসী কন্যা ফৌজির কাছ থেকে খবর পেয়ে আইয়ুবীর থেকে তারা সম্মিলিত শক্র বাহিনীর যেসব তথ্য ও বিবরণ সংগ্ৰহ করতে পেরেছিল সুলতানের কাছে তা যথাসময়েই পৌঁছে দিয়েছিল। গোয়েন্দা বাহিনীর দেয়া সে তথ্য বিবরণী থেকে জানা যায়, মুজাফফ্রুদ্দিনও এ বাহিনীর সাথে যুক্ত ছিল। কিন্তু সময়ের স্বল্পতার কারণে সে ঠিক কোথায় ছিল, অগ্রবর্তী বাহিনীতে, নাকি মূল বাহিনীতে, না ডান ও বায়ের রিজার্ভ বাহিনীতে, তার কিছুই জানার সুযোগ হয়নি। এটা জানা থাকলে সুলতান এখন ঠিকই আন্দাজ করতে পারতেন, মুজাফফরুদ্দিন এখন কোথায় কি করছে।
সুলতান আইয়ুবী কয়েকজন যুদ্ধবন্দীকে ডেকে এনে মুজাফফরুদ্দিন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তারা জানালো, তিনি সম্মিলিত বাহিনীর সাথেই ছিলেন। কিন্তু এখন কোথায় তা তারা বলতে পারে না।
হতে পারে বন্দীরা আসলেই মুজাফফরুদ্দিন সম্পর্কে বেশী কিছু জানে না অথবা জেনেও তারা তা গােপন করে গেছে। ঘটনা যাই হােক, সুলতান আইয়ুবী যে তার ব্যাপারে তেমন কোন তথ্য সংগ্রহ করতে পারলেন না এটাই সত্যি হয়ে দাঁড়ালাে।
তিনি সেনাপতিদের বললেন, 'আমি বিশ্বাস করি না, সে যুদ্ধ না করে পালিয়ে গেছে। সে আমার সাগরেদ। আমি তার সামরিক যােগ্যতা ও দক্ষতা সম্পর্কে জানি। কেবল তার যােগ্যতা ও দক্ষতা সম্পর্কেই জানি না, তার স্বভাব চরিত্র সম্পর্কেও ভাল রকম খবর রাখি। সে অবশ্যই আক্ৰমণ চালাবে। সে যদি মনে করে যুদ্ধে পরাজিত হবে, তবুও সে আক্রমণ চালাবে। তাকে আক্রমণ চালাতেই হবে, কারণ প্রতিহিংসা চরিতার্থ না করা পর্যন্ত তার নাওয়া খাওয়া ঘুম সব হারাম হয়ে যাবে। সালাহউদ্দিন আইয়ুবী আর যাই হােক, এ কথা মানতে পারে না, মুজাফফরুদ্দিন পালিয়ে গেছে।
সুলতান আইয়ুবী এত জোর দিয়ে এ কথা বলার পেছনে একটা কারণ আছে। হিম্মত পর্বত শৃঙ্গের যুদ্ধে পরাজিত হয়ে সে যখন ফিরে যাচ্ছিল তখন চিৎকার করে বলছিল, সালাহউদ্দিন, আবার আমাদের দেখা হবে যুদ্ধের ময়দানে । যতক্ষণ তােমাকে পরাজিত করতে না পারবাে বা নিজে নিঃশেষ হয়ে যাবাে ততক্ষণ আমি ক্ষান্ত হবে না। মুজাফফরুদ্দিনের মুখের সে আওয়াজ বহু দূর থেকেও সৈনিকরা শুনতে পাচ্ছিল।
তুর্কমান রণাঙ্গণ থেকে বহু দূরে হিম্মত পর্বত শৃঙ্গের সে আওয়াজ এখনো যেন সুলতান শুনতে পাচ্ছেন। সাইফুদ্দিনের পরিত্যক্ত ক্যাম্পে দাঁড়িয়ে সে আওয়াজের প্রতিধ্বনিই শুনছিলেন আইয়ুবী।
তুর্কমান যুদ্ধের পূর্ব মুহূর্ত। সাইফুদ্দিনের এক গােয়েন্দা কমাণ্ডার মুজাফফরুদ্দিনের কাছে পৌছে বললাে, এই মাত্র দু’জন অশ্বারােহীকে দূর থেকে দেখতে পেলাম, তারা তীর বেগে ছুটে যাচ্ছে আইয়ুবীর ক্যাম্পের দিকে। সম্ভবত এরা আইয়ুবীর তথ্য অনুসন্ধানী সদস্য। যদি আমার অনুমান সঠিক হয় তাহলে বলতে পারি, আক্রমণের আগেই আমাদের এখানে এসে পৌঁছার সংবাদ সুলতান সালাহউদ্দিনের কাছে পৌঁছে। যাবে। আর আইয়ুবী আমাদের আক্রমণের খবর পাওয়ার মানে হচ্ছে, যত সহজে আমরা বিজয় আশা করছি তা সম্ভব হবে না। আমাদের আক্রমণের আগেই সে আমাদের বাঁধা দিতে ছুটে আসবে।
মুজাফফরুদ্দিনের জন্য এ ছিল এক তাৎপর্যময় খবর। সে আর কালবিলম্ব না করে কাউকে কিছু না জানিয়ে যুদ্ধের ছক নতুন করে আঁকলাে। আইয়ুবীর বিরুদ্ধে এখন এখানে মুখােমুখি যুদ্ধ করা বৃথা। এ মুহূর্তে এ যুদ্ধে জয় লাভ করার একটাই উপায়, প্রাথমিক লড়াই থেকে নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেয়া। সবচেয়ে ভাল হয়, বাহিনীকে কোন নিরাপদ স্থানে লুকিয়ে রেখে যুদ্ধের সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা। তারপর যদি আইয়ুবী জিতেই যায়, তখন বিজয়ের আনন্দে বিভাের হয়ে ওরা যখন মেতে উঠবে আনন্দ কোলাহলে, তখন তাদের ওপর অতর্কিতে চড়াও হওয়াটাই হবে তার একমাত্র কাজ।।
সেই মােক্ষম সময় আসার আগ পর্যন্ত ময়দান থেকে নিজের বাহিনী সরিয়ে নেয়ার দ্রুত উদ্যোগ নিল মুজাফফরুদ্দিন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই সে তার বাহিনী নিয়ে সেখান থেকে সরে পড়লাে।
আমরা আপনার প্রতিটি আদেশ পালন করবাে। মুজাফফরুদ্দিনের এক সহ-সেনাপতি বললাে, কিন্তু এই অবস্থায়, যখন আমাদের সম্মিলিত বাহিনী পরাজিত, সৈন্যদের অধিকাংশই হয় মৃত, আহত বা বন্দী, যে সামান্য সংখ্যক সৈন্য পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে তারা ভীত-সন্ত্রস্ত, সেই অবস্থায় আমাদের এই সামান্য সংখ্যক সৈন্য নিয়ে আক্রমণ চালানাে মােটেই সমীচীন হবে না।
আমার এই সৈন্যবাহিনীকে আমি নগণ্য সংখ্যক বলতে পারি না। একেই আমি যথেষ্ট মনে করি। মুজাফফরুদ্দিন বললাে, এই সৈন্য আমাদের সম্মিলিত সৈন্যের এক চতুর্থাংশ । সুলতান আইয়ুবী এর চেয়েও কম সংখ্যক সৈন্য নিয়ে যুদ্ধ করতেন ও সফলতা লাভ করতেন। আমি তার বাহিনীর এক পাশ থেকে আক্রমণ করবাে। তাকে সে কৌশল চালানাের সুযোগ দেবাে না, যে কৌশল তিনি হিম্মত পর্বত শৃঙ্গে চালিয়েছিলেন। তােমরা সবাই আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হয়ে নাও।
আমাদের সুপ্রিম কমাণ্ড সাইফুদ্দিন গাজী মুশেলের আমীরসহ তিনটি বাহিনীর সম্মিলিত ফোর্স নিয়েও হেরে গেলেন। সহ-সেনাপতি বললাে, আমাদের পরামর্শ নিয়ে আবারও চিন্তা করুন। কারণ এই সামান্য সৈন্য নিয়ে যুদ্ধ করা আত্মহত্যার সামিল।।
যুদ্ধের ময়দান নারী, মদের পিপা ও সুরাহী রাখা লােক । দিয়ে ভরে ফেললেই যুদ্ধ জয় করা যায় না। মুশেলের আমীর সাইফুদ্দিন সে চেষ্টা করতে গিয়েই পরাজিত হয়েছে। মুজাফফরুদ্দিন বললাে, আমিও শারাব পান করি। কিন্তু সব সময় না। সুলতান আইয়ুবী আমাকে গাদ্দার বলে গাল দেয়। আমার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার সময় সে যখন চিন্তা করে না আমি তার সাগরেদ ছিলাম, তখন আমিও এ কথা মনে রাখতে চাই। না, তিনি আমার ওস্তাদ ছিলেন। তিনি আমাকে গাদ্দার বলেন, আমি গাদ্দার নাকি মুসলমান এখন আর এ হিসাব করতে চাই না। আমার হিসাব হচ্ছে, এখানে দুই সেনাপতির লড়াই ও সংঘর্ষ হবে, দুই বীর যােদ্ধার শক্তি পরীক্ষা হবে। .এ. শক্তি পরীক্ষায় দুই তলােয়ারের সংঘর্ষে সেই জিতবে, যার বাহুর জোর বেশী। আমার বাহুর উপর আমার আস্থা আছে। তােমরা নিজেদের বাহিনী প্রস্তুত করাে।
মুজাফফরুদ্দিনকে বুঝানাের চেষ্টা বৃথা ভেবে সহ - সেনাপতি যাবার জন্য পা বাড়ালাে, মুজাফফরুদ্দিন বললাে, আর স্মরণ রেখাে, সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর গােয়েন্দাদের দৃষ্টি
মাটির নিচেও যেতে পারে। তােমাদের থাকতে হবে খুবই হুশিয়ার। মােক্ষম সময়ের জন্য আমাকে হয়তাে আরাে কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। সুলতান আইয়ুবী খেকশিয়ালের মতই চালাক আর খরগােশের মত ক্ষীপ্র । আমাকে আমার গােয়েন্দারা জানিয়েছে, তিনি এখনও গনিমতের মাল বন্টন শুরু করেননি। তার সৈন্যদেরও স্ব-স্ব স্থান ত্যাগ করার হুকুম দেননি। এতে বােঝা যায়, তিনি আর অগ্রাভিযান চালাবেন না। আর এ কথাও আমার মােটও বুঝতে কষ্ট হচ্ছে না, তিনি আশংকা করছেন, আমরা আবারও তার ওপর আক্রমণ চালাতে পারি।
আমি ভাল ভাবেই জানি, তিনি কেমন ধরনের চিন্তা, করছেন। আমি তাকে ধোঁকা দেবাে, তাকে বুঝিয়ে দেবাে, আমরা সবাই পালিয়ে গেছি। এখন আর বিপদের কোন সম্ভাবনা নেই। এরপর শুরু হবে যুদ্ধের নতুন খেলা। অস্ত্র নয়, শুরু হবে বুদ্ধির লড়াই।।
এ জন্য দিন দুইয়ের বেশী তােমাদের অপেক্ষা করতে হবে না। তার গতিবিধির ওপর আমি পূর্ণ নজর রাখছি। তার গােয়েন্দারা ঘুরবে বুকে সন্দেহ আর সংশয় নিয়ে আর আমার গােয়েন্দারা নজর রাখবে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর স্থির লক্ষ্যে। যখনই আইয়ুবী তার সৈন্যদের মাঝে লুটের মাল বন্টন করতে আরম্ভ করবে, তখনই আসবে সেই কাংখিত সময়। তখন সৈন্যদের শৃংখলা ভেঙ্গে যাবে, লক্ষ্য থাকবে। শুধু গনিমতের মালের দিকে, তখন আমি অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়বাে তাদের ওপর।
সুলতানের মত আমিও জানি, অস্ত্ৰ বা লােকবল দিয়ে যুদ্ধে বিজয় আসে না, যুদ্ধে জয় হয় শত্রুর দুর্বল জায়গায় সময় মত । আঘাত হানার মাধ্যমে। আইয়ুবী বহু লড়াই করেছে, কিন্তু কেউ তার দুর্বল জায়গায় সময় মত আঘাত হানতে পারেনি। ফলে বার বার সে বিজয়ী হয়েছে, কিন্তু সে সুযােগ আর আমি তাকে দেবাে না। •
সহ-সেনাপতি স্থির চোখে তাকিয়েছিল তাদের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সেনাপতির দিকে। তার কথা শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, তিনি ঠিকই বলছেন। আইয়ুবী যত বড় সেনানায়কই হােক না কেন, তার কোন না কোন দুর্বলতা না থেকেই পারে না। হয়তাে এই দিগ্বিজয়ী সেনানায়কের পরাজয় আমাদের হাতেই লেখা আছে। হয়তাে তাকে অন্তিম আঘাত হানার জন্য নিয়তি আমাদেরকেই বাছাই করে রেখেছে।
সে মুজাফফরুদ্দিনের দিকে তাকিয়ে বললাে, ‘আমাকে ক্ষমা করুন। আপনার দূরদর্শিতার তারিফ করার ভাষা আমি হারিয়ে ফেলেছি। আপনি যেমনটি ভেবেছেন তাই ঘটবে। সময় মত আপনি আমাদের প্রস্তুত পাবেন।
মুজাফফরুদ্দিন বললাে, আজ রাতেই সৈন্যদেরকে এখান থেকে আরাে দূরে কোথাও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেবে। আর দূর দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে দেবে নিজেদের গােয়েন্দাদের। তাদের বলে দেবে, সন্দেহজনক কাউকে ঘােরাফেরা করতে দেখলেই যেন তাকে গ্রেফতার করে ধরে আমাদের গােপন ক্যাম্পে নিয়ে আসে।
আক্রমণের নির্দিষ্ট দিনক্ষণ ও সময় সম্পর্কে মুজাফফরুদ্দিন কিছুই বললাে না। সহ-সেনাপতি তাকে বললাে, আপনার ধারনাই ঠিক, সুলতান আইয়ুবী নিশ্চয়ই কিছু সন্দেহ বা আশংকা করেছেন। নইলে এতক্ষণে, তিনি গনিমতের মাল বন্টন শুরু করে দিতেন।
রাতে মুজাফফরুদ্দিনের নির্দেশে ‘সৈন্যদলকে লুকিয়ে রাখা সম্ভব এমন একটি জায়গা বেছে নিয়ে ক্যাম্প করলাে সহসেনাপতি ।
সাইফুদ্দিনের সেনাদলের ওপর সুলতান আইয়ুবীর আক্রমণ ছিল যেমন অতর্কিত ও তাদের কল্পনার অতীত, আইয়ুবীর বাহিনীর জন্যও তেমনি এক অতর্কিত ও কল্পনাতীত আক্রমণের প্রস্তুতি চলছিল মুজাফফরুদ্দিনের ক্যাম্পে।।
সাইফুদ্দিন স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি আইয়ুবী তার এত সতর্ক ও অতর্কিত অভিযানের খবর আগেই পেয়ে যাবে এবং তার স্বপ্ন ও আশা ধুলিস্মাৎ করে দিয়ে তার বাহিনী তছনছ করে তাকে পালিয়ে প্রাণ বাঁচাতে বাধ্য করবে।
আইয়ুবীও ভাবতে পারেনি, তাঁর এত সতর্কতাকে ডিঙিয়ে মুজাফফরুদ্দিন তাকে ধোঁকা দিয়ে বােকা বানিয়ে ঝড়ের বেগে আঘাত হানতে পারে তার বাহিনীর ওপর। কিন্তু যুদ্ধ এমন এক জিনিস, যা পূর্ব নির্ধারিত ধারনা ও কল্পনাকে মুহূর্তে পাল্টে দিয়ে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারে।
সুলতান আইয়ুবী তার সৈন্যদেরকে সাইফুদ্দিনের সম্মিলিত বাহিনীর ভান, বাম ও পিছনে এমনভাবে সুবিন্যস্ত করেছিলেন যে, চতুর্মুখী আক্রমণে সাইফুদ্দিন যেন ধরাশায়ী হতে বাধ্য হয়। এ ছাড়াও তার কমাণ্ডো বাহিনীকে আশেপাশে আগে থেকেই মােতায়েন করে রেখেছিলেন, যাতে আশপাশের এলাকাতেও তাদের প্রাধান্য বজায় থাকে।
এসব কমাণ্ডো বাহিনীর কমাণ্ডার ও সৈনিকরা ছিল বিশেষভাবে বাছাই করা। তারা সূবাই ছিল অসাধারণ প্রতিভাধর। বুদ্ধিমত্তা, বীরত্ব ও ক্ষীপ্রগতির জন্য এরা ছিল দুশমনের আতংক। এদেরকে এমনভাবে কমাণ্ডো ও গােয়েন্দা ট্রেনিং দেয়া হতাে, যাতে তারা যে কোন ধরনের পরিস্থিতির মােকাবেলা করতে পারে।
এই গােয়েন্দা বাহিনীর প্রতিটি গ্রুপের সদস্য সংখ্যা ছিল নিচে চার, উপরে বারাে জন। চার থেকে শুরু করে বারাে জনের একেকটি ছােট্ট গ্রুপ কাজ করতে স্বাধীনভাবে। যে কোন পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার ভােগ করতাে এরা। এরা ছােট ছােট দলে বিভক্ত হয়ে দুশমনের বাহিনীর ওপর ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে শত্রু শিবিরে ত্ৰাস ও আতংকের সৃষ্টি করতাে।
শত্রুদের পিছু ধাওয়া করে এমনি একটি কমাণ্ডো দলের বারাে জন সদস্য যুদ্ধের ময়দান থেকে বহু দূরে চলে গিয়েছিল। দফায় দফায় শত্রুদের সাথে তাদের সংঘর্ষ হয় এবং এই সংঘর্ষে বারাে জনের মধ্যে আট জনই শহীদ হয়ে যায়।
এই কমাণ্ডো দলের কমাণ্ডার ছিল আন নাসের সঙ্গে তিন জন সদস্য নিয়ে আন নাসের তখনাে খুঁটছিল সাইফুদ্দিনের পলাতক বাহিনীর পিছনে। তার কমাণ্ডো বাহিনী তখন তুর্কমান যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বহু দূরে।
সাইফুদ্দিনের এ বাহিনীটি ছিল রসদবাহী। কমাণ্ডোদের লক্ষ্যবস্তু ছিল শত্রুদের সেই রসদপত্র। তারা সবাই ছিল অশ্বারােহী। তাদের কাছে ছিল পেট্রোল ভেজা সলতে জড়াননা তীর, তবে তা পরিমাণে খুব কম। এ ছাড়াও ছিল বর্শা, তলােয়ার ও খঞ্জর।
রসদ তখনাে তাদের নাগালের অনেক দূরে। এলাকাটি মরুভূমি না হওয়ায় ধাওয়া করতে সুবিধা হচ্ছিল আন নাসেরের। দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছিল পাহাড়ী এলাকা, টিলা ও নিম্নাঞ্চল। এলাকাটি লুকিয়ে অনুসরণ করার জন্য ছিল খুবই উপযােগী ! দিনের বেলায়ও লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি পৌঁছে ঘােড়া লুকানাের সুযােগ ছিল।
সম্মিলিত বাহিনীর সৈন্যদের যাবতীয় খাদ্যদ্রব্য, পশুর শুকনাে ঘাস, খড়, দানা, ভূষি যতটুকু সম্ভব নিয়ে পালাচ্ছিল তারা। এ ছাড়াও এদের কাছে ছিল যুদ্ধের সাজ-সরঞ্জাম, তীর, ধনুক, বর্শা ও তলােয়ার। | 
আন নাসের প্রথম রাতেই রসদপত্রের ওপর সফল আক্রমণ চালিয়েছিল। অনেক খাদ্যশস্য ঐ সলতে জড়ানাে তীর নিক্ষেপের ফলে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল।দিনের বেলা পলায়নপর বাহিনী লুকিয়ে এক জায়গায় বিশ্রাম নিচ্ছিল। আন নাসেরও তার দলবল নিয়ে লুকিয়ে ছিল একটু দূরে পাহাড়ের এক গােপন গুহায়।
তারা বিশ্রাম নিলেও তাদের চোখ ছিল দুশমন কাফেলার। ওপর। তারা দেখতে পেলাে, শত্ৰু সেনারা নিম্নাঞ্চলে গৰ্ত, নালা ও টিলার আড়ালে তাদের খুঁজে বেড়াচ্ছে। সাথে সাথে আন নাসের তার দলের কমাণ্ডোদের নিয়ে সরে গেল পাহাড়ের চুড়ার
দিকে।
তাদেরকে পাহাড়ের উঁচু জায়গায় ঝােপের আড়ালে এদিক-ওদিক সুবিধামত স্থানে বসিয়ে দিল। তারা ধনুকে তীর জুড়ে বসে রইল কমাণ্ডারের নির্দেশের অপেক্ষায়। শত্ৰু সেনারা আশপাশের নিম্নাঞ্চল ঘুরে কাউকে না পেয়ে নিরাশ হয়ে ফিরে শেল।
সূর্য ডােবার পর খাদ্যশস্যবাহী কাফেলা আবার যাত্রা শুরু করলাে এবং মধ্য রাতের দিকে সৈনিকদের বিশ্রাম দেয়ার জন্য আবার এক স্থানে ক্যাম্প করে সে রাতের মত আশ্রয় নিল । কিন্তু গত রাতের মত অতর্কিত আক্রমণ আসতে পারে এই ভয়ে সে রাতে পর্যাপ্ত পাহারার ব্যবস্থা রাখলাে।
আন নাসের ভেবে দেখলাে, আজ রাতে গুপ্ত আক্রমণ তত সহজ হবে না। শত্রুরা ক্যাম্প ছাড়াও তার আশেপাশে কঠিন পাহারার ব্যবস্থা করে রেখেছে। পদাতিক ছাড়াও এ পাহারায় অংশ নিয়েছে অশ্বারােহী বাহিনী।
এমন প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও আন নাসের একটি রাত নষ্ট করতে চাইলাে না। সে গুপ্ত হামলা চালানাের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল। কারণ তার সামনে এখনও পড়ে আছে শত্রুদের বহু রসদ-সম্পদ। এ সম্পদ শত্রুরা তাদের চোখের সামনে দিয়ে ফেরত নিয়ে যাবে, তা হতে পারে না। সুলতান আইয়ুবীর নির্দেশ ও শিক্ষার কথা মনে পড়ে গেল তার। কমাণ্ডোদের কাজ বুঝিয়ে দেয়ার সময় তিনি বলতেন, শত্রুদের রসদপত্র ধ্বংস করা কমাণ্ডো বাহিনীর অন্যতম কাজ।
কমাণ্ডো বাছাই ও ট্রেনিংয়ের সময় এ জন্যই তিনি এমন সব সৈন্যদের দিকে নজর দিতেন, যারা বীরত্ব, সাহসিকতা ও বুদ্ধিমত্তায় অসাধারণ! যাদের মধ্যে জাতীয় চেতনা বােধ ও ঈমানী জ্যবা প্রখর। এসব জানবাজ কমাণ্ডোরা দায়িত্ব পালনে এমন নিষ্ঠার পরিচয় দিত যে, বিপদসংকুল, মরুভূমিতে, যেখানে কেউ সাহায্য করার নেই, সেখানেও গুরুদায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জীবন কোরবানী করতে কুণ্ঠিত হতাে না।
আন নাসের তাদের অনুসরণ করে তাদের ক্যাম্প থেকে নিরাপদ দূরত্বে নিজেদের ক্যাম্প করলাে। ঘােড়াগুলাে গােপন জায়গায় বেঁধে রেখে সঙ্গীদের বললাে, চলাে আমার সঙ্গে।
সে সঙ্গীদের নিয়ে হেঁটে গিয়ে পৌছলাে দুশমনের ক্যাম্পের কাছে। তারপর পাহারাদারদের এড়িয়ে একটি গুপ্ত রাস্তা দিয়ে প্রবেশ করলাে তাদের রসদের ক্যাম্পে। সেখানে ওদের খাদ্যগুদামে পেট্রোল ছিটিয়ে আগুন লাগিয়ে সঙ্গীদেরকে যার যার মত পালিয়ে যাওয়ার হুকুম দিল। কিন্তু আগুন জ্বলার সাথে সাথেই পাহারাদাররা তৎপর হয়ে উঠলাে। বেপরােয়া তীর বর্ষণ শুরু করলাে ওরা।। | আন নাসের ও তার এই সঙ্গীরা তখনাে এক সাথেই। ছিল। তীর বর্ষণ শুরু হতেই আন নাসের ওদের বললাে, খবরদার, দৌড়ে পালানাের চেষ্টা করে এখন আমরা বাঁচতে পারবাে না। বাঁচতে চাইলে আমার সঙ্গে এসাে। | আন নাসের ওদের নিয়ে দুশমনের আস্তাবলের মধ্যে ঢুকে গেল। সেখানে তুলনামূলকভাবে আলাে ছিল কম। তারা ঘােড়া এবং ঘােড়াগাড়ির আড়াল নিয়ে একটু একটু করে সরে এলাে সেখান থেকে । এক সময় সেখান থেকে বেরিয়ে সন্তৰ্পনে নিজেদেরকে ছুঁড়ে দিল ক্যাম্পের বাইরে অন্ধকারের রাজ্যে।।
এ যাত্রায়ও আন নাসের ও তার তিন জন সঙ্গী আল্লাহর অসীম রহমতে বেঁচে গেলাে। শত্ৰু সেনাদের দৃষ্টি এড়িয়ে নিরাপদ দূরত্বে সরে এসে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাে চার
জন।
আন নাসের আকাশের দিকে তাকালাে। কিন্তু আকাশ ছিল মেঘলা, তাই সেখানে কোন তারার আলাে দেখা গেল না।
রাতের তারকা কামণ্ডোদের পথ দেখিয়ে থাকে। আলাের অভাবে দিকভ্রান্ত হলাে আন নাসের ও তার সঙ্গীরা। যে অন্ধকারকে একটু আগে মনে হচ্ছিল আল্লাহর রহমত, সেই অন্ধকারই হয়ে দাঁড়ালাে ওদের চলার পথের প্রতিবন্ধক ।
সঙ্গীরা বললাে, আমাদের তাড়াতাড়ি ক্যাম্পে ফেরা দরকার। ওরা আমাদের সন্ধানে টহল বাহিনী পাঠাতে পারে।
আন নাসের তাদের কথার যৌক্তিকতা অনুভব করলাে।
অনুভব করলাে এখানে বেশীক্ষণ অপেক্ষা করা ঠিক নয়। সে বন্ধুদের বললাে, চলাে।।
আন্দাজের ওপর পথ চলছিল ওরা। আন নাসের ও তার সঙ্গীরা দীর্ঘক্ষণ পথ চলার পর অনুভব করলাে, তারা পথ হারিয়েছে। যেখানে তারা ক্যাম্প করেছিল ঠিক পথে এগুলে আরাে অনেক আগেই তাদের ক্যাম্পে পৌঁছে যাওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু আশায় আশায় বহু পথ মাড়িয়েও তারা ক্যাম্পের কোন হদিস পেল না। আন নাসের ওদের বললাে, ‘আমরা বােধহয় পথ হারিয়েছি।
হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হচ্ছে। বললাে এক সঙ্গী।
ওরা থমকে দাঁড়ালাে। পেছনে ফিরে দেখতে চেষ্টা, করলাে দুশমন ক্যাম্পের প্রজ্জ্বলিত অগ্নিশিখা। কিন্তু তারা তখন দুশমন ক্যাম্প থেকে বহু দূর চলে এসেছিল, কোন আলাের শিখাই তাদের নজরে এলাে না।
তখনও তাদের চোখে লেগে ছিল দুশমন শিবিরের রসদ ছাউনি, প্রজ্জ্বলিত আগুনের লাল শিখা ও দুশমনের তীর বৃষ্টির ঘাের। তাদের কোনই খবর ছিল না যে, তারা বেহুশের মত ছুটতে ছুটতে কোথায় চলে এসেছে।
কিছুক্ষণ তারা হতবুদ্ধি হয়ে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলাে। তারপর আবার শুরু করলাে হারানাে ক্যাম্পের অন্বেষণে অনিশ্চিত যাত্রা।
দিকনির্দেশনাহীনভাবে তারা সারা রাত ঘুরে মরলাে। পথ চললাে শ্লথ পায়ে, অন্ধকারে গভীর দৃষ্টি ফেলে তালাশ করলাে নিজেদের ক্যাম্প, দুশমনের তাঁবু। কিন্তু চার জোড়া চোখ বার বার ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলাে। শত্রুদের ক্যাম্পের লেলিহান শিখা দূরে থাক, সে অগ্নিশিখার সামান্য লাল আভাও ওরা কোথাও দেখতে পেলাে না। 
হাঁটতে হাঁটতে পাহাড়ের এক টিলা থেকে আরেক টিলায় উঠে যাচ্ছিল, ঘন জঙ্গল ও ঝােপঝাড় পেছনে ফেলে ঢুকে যাচ্ছিল আরেক জঙ্গলে, কিন্তু কোন ঘােড়া বা বাহনের দেখা পাচ্ছিল না এই ক্ষুদ্ৰ কাফেলা।।
দুশমনের খাদ্যগুদামে দেয়া আগুনের সামান্য আলাের রেখাও যদি ওরা দেখতে পেতাে, তবু না হয় নিজেদের ঠিকানা খুঁজে পাওয়ার একটা সম্ভাবনা সৃষ্টি হতাে। কিন্তু তাও নেই, তাই তারা এলােমেলাে পথ চলতেই থাকলাে।
এক সময় পাহাড় ও জঙ্গলের সীমানা শেষ হলাে। মাটির উঁচু নিচু ভাব শেষ হয়েছে, সামনে সমান্তরাল ভূমি, কিন্তু তাতে গাছপালার কোন চিহ্নমাত্র নেই।
তারা পায়ের তলে কঠিন মাটির ছোঁয়ার পরিবর্তে বালির প্রান্তর অনুভব করতে লাগলাে। টিলা ও পাথরের কোন চিহ্ন নেই এখানে। বালির পথে তাদের অনিশ্চিত চলার গতি ভারী ও শিথিল হয়ে পড়লাে। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় তারা পিপাসাৰ্ত হয়ে পড়লাে। অসম্ভব ক্লান্তি এসে ঘিরে ধরলাে তাদের। .
খাদ্য ও খাবার পানি ঘােড়ার সাথে ক্যাম্পে রয়ে গেছে। এক ফোটা খাবার পানিও সাথে নেই যে তারা পিপাসা নিবারণ
(চলবে)



শেয়ার করুন

Author:

আমি সজীব হোসাইন -এই ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা পাশাপাশি লেখালেখির কাজটাও করি। অনলাইনে প্রযুক্তির বিষয় নিয়ে যা জানি তা মানুষের মাঝে শেয়ার করার ইচ্ছায় এ ব্লগ টি তৈরি করা।