১৭. গাদ্দার(পর্ব-5)
নিহত সৈন্যদের লাশগুলাে তারাই কবর দেবে, এটাই স্বাভাবিক। আমাকে বলো, সুলতান আইয়ুবী তার সেনাবাহিনীতে কোন রদবদল করেছেন কিনা? তার মূল বাহিনীর দু'পাশের বাহিনী কি আগের মতই সেখানে দাঁড়িয়ে আছে, নাকি তাদের এদিক-ওদিক সরিয়েছেন আইয়ুবী?
সম্মানিত সেনাপতি!' গােয়েন্দা বললাে, আমি শুধু সৈনিক নই কমাণ্ডারও। আমি যে সংবাদ দিচ্ছি তা একটু ভেবেচিন্তেই দিচ্ছি। আমার উদ্দেশ্য এ নয় যে, শুধু আপনাকে খুশী করি। আমার উদ্দেশ্য ঠিক আপনারই মতই। আমিও সুলতান আইয়ুবীর বিজয়কে পরাজয়ে রূপান্তর করার কথাই ভাবছি।
আপনাকে বিশেষভাবে জানানাে দরকার, তারা কেউ তাদের অবস্থান ত্যাগ করেনি। আমার পরামর্শ হচ্ছে, আপনি তাড়াহুড়াে করবেন না।
‘পরামর্শ পরে দিও, আগে সেখানকার সৈন্যদের রিপাের্ট দাও।'
মাননীয় সেনাপতি, দয়া করে আমাকে বাঁধা দিবেন না। আমি যা বলছি তা আমাকে বলতে দিন, দেখবেন ময়দান আপনার চোখের সামনে ভাসছে। আমি জানি, আপনার প্রথম টার্গেট সুলতান আইয়ুবীর ডাইনের বাহিনী। কারণ তারা আপনার সহজ আওতার মধ্যে রয়েছে। কিন্তু আমি তার সেনাবাহিনীর অন্য দিকটাও দৃষ্টির সামনে রেখে দেখেছি, আমরা যখন তার ডাইনের বাহিনীর ওপর আক্রমণ করবাে, তখন সুলতান আইয়ুবীব সৈন্যরা অপর দিকটা কিভাবে ব্যবহার করবে।'
তারা আমাদেরকে ঘেরাও করার চেষ্টা করবে। মুজাফফরুদ্দিন বললাে, তাদের ঘেরাও কর্মসূচী শুরু হবে অনেক দূর থেকে। তারপর আস্তে আস্তে অবরােধ খাটো করে আনবে। আমি তার যুদ্ধের চাল সম্পর্কে আগাম খবর বলতে পারি।'
সুলতান আইয়ুবী তার রিজার্ভ বাহিনী, যে বাহিনী দিয়ে আমাদের সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করেছেন, সে বাহিনীকে এক ক্রোশ পিছনে সরিয়ে নিয়ে আবার প্রস্তুত করে রেখেছেন। আপনি ঠিকই বুঝতে পেরেছেন, সুলতান আইয়ুবী আমাদের বাহিনীকে অবরােধ করে ফেলতে চেষ্টা করবেন।
আরও খবর আছে। সুলতান আইয়ুবীর ডাইনের বাহিনী থেকে দেড় ক্রোশ পিছনে আমাদের ও সুলতান আইয়ুবীর মৃত সৈন্যদের লাশের জন্য কবর খােদাই করা হয়েছে। কবরের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার। কবরগুলাে তারা করেছে পাশাপাশি এবং বিশেষ পদ্ধতিতে। দেড় হাজার কবর মানে দেড় হাজার গর্ত। আমি কবরের চওড়া, দিকটা লক্ষ্য করে বিস্মিত হয়েছি। আপনি যখন ডান দিক থেকে আক্রমণ চালাবেন, আইয়ুবীর সৈন্যরা পিছনে সরতে থাকবে। আপনি ধাওয়া করে তাদেরকে কবরের কাছে নিয়ে যাবেন। সামনা-সামনি আঘাত না করে আপনি এলােপাথাড়ী তীর বর্ষণ করবেন। তাদেরকে বাধ্য করবেন কবরের দিকে চলে যেতে। তারপর আপনি যখন তাদের, অশ্বারােহী সৈন্যদের ওপর তীব্র আক্রমণ চালাবেন, অশ্বসহ তারা তখন হুমড়ি খেয়ে পড়বে সেই কবরে। এ ছাড়া সেখানে অসংখ্য লাশ গাদা করে রাখা হয়েছে, তারা লাশের সঙ্গেও বাঁধা পাবে, ফলে যুদ্ধের গতি সহজেই চলে আসবে আমাদের অনুকূলে।'
সুলতান আইয়ুবীর ডান দিকের ব্যাটেলিয়ানকে কতটা শক্তিশালী মনে করাে তুমি?’ মুজাফফরুদ্দিন জিজ্ঞেস করলাে।
কমের পক্ষে এক হাজার অশ্বারােহী ও দেড় হাজার পদাতিক রয়েছে এ বাহিনীতে। গােয়েন্দা কমাণ্ডার উত্তরে বললাে, এই বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত অবস্থায় আছে। আপনি তাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ করতে পারবেন না।'
মুজাফফরুদ্দিনের সামনে ময়দানের একটি নকশা পড়েছিল। সে সেই নকশার উপরে হাত রেখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বললাে, এই হলাে আইয়ুবীর ডাইনের বাহিনী। তাদের সামনের ময়দান কিছুটা অসমান। ছােট বড় নানা রকম গর্ত এবং উঁচু ঢিবিও আছে সেখানে। তার দক্ষিণ দিকটা পরিষ্কার। আক্রমণের জন্য এ রাস্তা অধিক উপযুক্ত মনে হয়। এ পথে সরাসরি প্রচণ্ড হামলা চালাতে পারলে তারা পিছু হটতে বাধ্য হবে এবং কবরে গিয়ে পড়বে।
হ্যা, সেই কবরেই আমি ওদের দাফনের ব্যবস্থা করবাে। আমার আক্রমণ সামনে থেকেও হবে এবং ডাইনের পরিষ্কার জায়গা দিয়েও হবে।
মুজাফফরুদ্দিন তার সহ-সেনাপতিকে বললাে, এখান থেকে ময়দান পর্যন্ত এর মাঝখানে এখন থেকে কোন লােক দেখতে পেলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে ধরে এনে বন্দী করবে এ আস্তানায় । এ অঞ্চল পুরােটাই এখন যুদ্ধের আওতার মধ্যে এসে গেছে। এদিক দিয়ে কোন যাত্রী আর চলাচল করতে পারবে না। এদিকের সারা পথে এখন থেকে থাকবে শুধু আমার গােয়েন্দা।
হতভাগা দুই মুসাফিরের জানা ছিল না, এ অঞ্চল এখন যুদ্ধের আওতার মধ্যে পড়ে আছে। তাদের একজন এক উটের ওপর সওয়ার ছিল। লােকটা খুব বৃদ্ধ। তার সমস্ত দাড়িই ধবধবে সাদা। উটের ওপর কিছু মালপত্রও আছে। অপর ব্যক্তি উটের লাগাম ধরে টানছিল।
তারা দুজনই গ্রাম্য বেদুইনদের পােষাক পরিহিত। তারা এমন জায়গা দিয়ে যাচ্ছিল, যেখান থেকে মুজাফফরুদ্দিনের লুকানাে সৈন্য বাহিনী দেখা যাচ্ছিল।
এক সৈনিক তাদের ডাকলাে। কিন্তু তারা দাঁড়ালাে না, বরং যাত্রার গতি আরও বাড়িয়ে দিল। তারা না থামায় এবার এগিয়ে গেল এক অশ্বারােহী । দ্রুত তাদের সামনে গিয়ে তাদের পথরােধ করে দাঁড়ালাে। বাধ্য হলাে তারা থেমে যেতে।
অশ্বারােহী মুসাফিরদেরকে বললাে, ক্যাম্পে চলাে। তােমাদের তল্লাশী নেয়া হবে।
আমরা মুসাফির! উটের লাগামওয়ালা বললাে, আপনাদের কি ক্ষতি করেছি যে, আমাদের পথ চলতে দিচ্ছেন না?’
আমাদের ওপর আদেশ আছে, এদিক দিয়ে যে যাবে তাকেই ধরে নিয়ে যেতে হবে ক্যাম্পে। ব্যস, আর কোন কথা নয়, চলাে। অশ্বারােহী ধমকে উঠলাে।
ওদেরকে সঙ্গে নিয়ে অশ্বারােহী ক্যাম্পে ফিরলাে। এক তাঁবুর সামনে তাদেরকে দাঁড় করিয়ে তাঁবুর মধ্যে সংবাদ দেয়া হলাে। কমাণ্ডার বেরিয়ে এলাে তাঁবু থেকে। সে মুসাফিরদেরকে জিজ্ঞেস করলাে, তােমরা কোখেকে আসছে এবং কোথায় যাবে?'
তারা যে উত্তর দিল তাতে কমাণ্ডার নিশ্চিত হলাে, এরা কোন গােয়েন্দা নয়। কিন্তু তবু তাদের বলা হলাে, “তােমাদেরকে এখন আর সামনে যেতে দেয়া যাবে না। কয়েদী করে নয় সসম্মানে রাখা হবে তােমাদের।'
‘এভাবে আমাদের কতদিন মেহমান রাখবেন?' জানতে চাইলে বৃদ্ধ।
কিন্তু এ প্রশ্নের কোন জবাব না দিয়ে সেন্ট্রির দিকে তাকিয়ে কমাণ্ডার বললাে, 'এদের থাকার তাঁবু দেখিয়ে দাও।
এ হুকুম জারি করে কমাণ্ডার আবার তার তাঁবুতে ঢুকে পড়লাে। মুজাফফরুদ্দিনের আদেশে আটকাপড়া মুসাফির এই প্রথম।
মুসাফিররা সেন্ট্রিকে অনুরােধ করলাে তাদের ছেড়ে দিতে। অনেক কাকুতি মিনতি করলাে, কিন্তু তাদের অনুরােধ কেউ শুনলাে না।
তাদের যে তাঁবুতে রাখা হলাে, সেখানে পালাক্রমে দুই সিপাহী ডিউটি দিচ্ছিল।
রাত । ডিউটিরত দুই সিপাহী বসেছিল তাঁবুর সামনে। রাত ক্রমে গভীর হতে লাগলাে। দুই সেন্ট্রি তাঁবুর সামনে বসে নিশ্চিন্ত মনে গল্প করছে। তাদের ধারনা, নিরীহ দুই বন্দী ঘুমিয়ে আছে তাঁবুর ভেতর। তাদের দিক থেকে কোন রকম বিপদ আসতে পারে, এমন কথা সেন্ট্রিদের কল্পনারও অতীত।
এক পাহারাদার তার সঙ্গীকে বললাে, দোস্ত, কি কপাল দেখ, বন্দী হয়েও বুড়াে আর তার খাদেম নিশ্চিন্তে তাঁবুর ভেতর আরামে ঘুমাচ্ছে, আমরা শত্রু নেই, যুদ্ধ নেই, তবু ঘুম হারাম করে পাহারা দিচ্ছি এক আজনবী বৃদ্ধকে।
সাদা দাড়িওয়ালা বৃদ্ধ তখনও জেগেই ছিল। সে তাঁবুর মধ্যে শুয়ে শুয়ে শুনছিল সেন্ট্রিদের আক্ষেপ ভরা কণ্ঠ। তাঁবুর ভেতর ঘন অন্ধকার।
একটু পর বৃদ্ধ তাঁবুর বাইরে নাক ডাকার শব্দ শুনতে পেলাে। বুঝলাে, সিপাহী দুইজন জেগে থাকা নিরর্থক ভেবে ঘুমিয়ে পড়েছে। সে তার খাদেমকে আস্তে করে টোকা দিল। হাতে মৃদু চাপ দিয়ে সাড়া দিল খাদেম। দু’জন নিঃশব্দে উঠে, বসলাে বিছানায়। বেড়ালের মত সন্তর্পনে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল দরজার দিকে।
দরজার কাছে পৌছে পর্দা ইষৎ ফাঁক করে বাইরে মুখ বাড়ালাে বৃদ্ধ, দেখলাে কাছেই পাশাপাশি দুই সেন্ট্রি হাঁটুতে মাথাগুজে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে।
দ্রুত তাঁবুর বাইরে চলে এলাে ওরা। বাইরে নীরবতা বিরাজ করছিল। তাঁবু থেকে কিছু দূরে গিয়ে বৃদ্ধ তার সাথীকে বললাে, তুমি পৃথক হয়ে যাও। দু’জন আলাদা থাকলে একজন ধরা পড়লেও আরেকজনের পালিয়ে যাওয়ার সুযােগ থাকবে। | দু’জন দুদিকে পৃথক হয়ে গেল। আলাদা হয়েই বুড়াে সঙ্গী তাঁবুর উল্টো দিক দিয়ে দ্রুত পা চালালাে ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য।
তাদের ধারণা সঠিক ছিল না, পুরাে ক্যাম্প ঘুমিয়ে থাকলেও ক্যাম্পের পাহারাদাররা ছিল সজাগ ও সতর্ক। তেমনি এক ক্যাম্প প্রহরীর চোখে অন্ধকারে কারাে ছায়া নড়ার দৃশ্য ধরা পড়লাে । সেও বসেছিল অন্ধকারেই, ফলে চলমান ছায়াটি তাকে দেখতে পেলাে না।
প্রহরী কোন রকম সাড়া শব্দ না করে ছায়াটিকে অনুসরণ করতে শুরু করলাে। কিছুদূর যাওয়ার পর কিছুতে হোঁচট খেল প্রহরী, সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধ তাকালাে পিছন দিকে। তাকিয়েই দেখতে পেল এক প্রহরী তাকে অনুসরণ করছে। সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধ এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলাে কাছেই কিছু আসবাবপত্র পড়ে আছে। সে কালবিলম্ব না করে তার আড়ালে গিয়ে লুকালাে।
এরপর শুরু হলাে লুকোচুরি খেলা। প্রহরী তাকে খুঁজতে লাগলাে আর বৃদ্ধ এখানে ওখানে পালাতে লাগলাে। ঠিক একইভাবে তার সাথীকেও দেখে ফেললাে অন্য এক প্রহরী। সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধের সাথীও লুকিয়ে পড়লাে।
মুজাফফরুদ্দিন সুলতান আইয়ুবীর গােয়েন্দাদের নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তায় ছিল। কারণ সে জানতাে আইয়ুবীর গােয়েন্দারা কেমন তৎপর ও চৌকস। তাই দুশমনের গােয়েন্দাদের ওপর কড়া দৃষ্টি রাখার হুকুম ছিল তার। তার আরও নির্দেশ ছিল, গােয়েন্দাদের দেখা পেলে তাদের হত্যা না করে ধরতে চেষ্টা করবে।'
সুতরাং মুজাফফরুদ্দিনের প্রহরীরা গােয়েন্দাদের ধরার জন্য বিশেষ ভাবে সচেষ্ট হলাে। এ কারণেই বৃদ্ধ ও তার সাথীকে দেখার পরও তাদেরকে ডাকেনি ওরা, অনুসরণ করে তাদের ধরার চেষ্টা করছিল।
বৃদ্ধ ও প্রহরীর লুকোচুরি খেলা তখনাে চলছে। বৃদ্ধ এখান থেকে ওখানে ছুটছে লুকাতে, আর তাকে তালাশ করতে তার পিছু পিছু ছুটছে প্রহরী। এবার বৃদ্ধ লুকালাে জড়াে করে রাখা কিছু কাঠের আড়ালে, ঘন অন্ধকারের মধ্যে। কাঠগুলাে যেভাবে রাখা, তাতে তার এক হাত দূর দিয়ে গেলেও প্রহরী তাকে দেখতে পাবে না।
প্রায় কাছাকাছি চলে এলাে প্রহরী । বৃদ্ধ দম বন্ধ করে পড়ে রইলাে সেই স্তুপীকৃত কাঠের আড়ালে। সাবধানে এক পা, এক পা করে এগুতে লাগলাে প্রহরী। খানিক থমকে দাঁড়ায়, খানিক এগােয়, এভাবে এগুতে এগুতে একেবারে তার পাশ কেটে সামনে এগিয়ে গেল প্রহরী। এমনি একটি সুযােগেরই অপেক্ষায় ছিল বৃদ্ধ। প্রহরী তার হাত দুয়েক দূরে গিয়ে আবার থমকে দাঁড়ালাে। বৃদ্ধ খঞ্জর বের করে তৈরী হলাে। তারপর আলগােছে পা তুললাে কাঠের আড়াল থেকে।
সে জানে, প্রহরীর হাত থেকে মুক্তির এখন একটি পথই খােলা আছে, আর তা হচ্ছে তাকে হত্যা করা। বৃদ্ধ পা উঠালাে, খঞ্জর তাক করা হাতটি নিয়ে এলাে বুক বরাবর, তারপর ঝাঁপিয়ে পড়লাে।
প্রহরী হয়তাে শেষ মুহূর্তে কিছু আঁচ করতে পেরেছিল, পই করে ঘুরে দাঁড়ালাে সে, আর সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধের খঞ্জর আমূল ঢুকে গেল লােকটির বুকে। চিৎকার করারও সময় পেলাে না প্রহরী, বাম হাত দিয়ে তার গলা পেঁচিয়ে ধরে তাল সামলাতে না পেরে তাকে নিয়েই পড়ে গেল বৃদ্ধ। সে অবস্থায় থেকেই বৃদ্ধ দ্রুত খঞ্জর টেনে বের করলাে এবং পরপর আরও কয়েকটি আঘাত করলাে।
লােকটি মারা গেল। নিস্তেজ হয়ে গেল তার দেহ। বৃদ্ধ তাকে রেখে দ্রুত উঠে দাঁড়ালাে এবং সেখান থেকে পালানাের চিন্তা করলাে ।।
ধ্বস্তাধ্বস্তি সামান্য হলেও নির্জন রাত বলে তার আওয়াজ স্পষ্টই শুনতে পেলাে অন্য প্রহরী । আওয়াজের উৎস লক্ষ্য করে সে যখন তাদের কাছাকাছি এসেছে ততক্ষণে একজন বিদায় নিয়ে পাড়ি জমিয়েছে পরপারে। | প্রহরীরা ঘটনাস্থলে এসে যখন কি ঘটছে বুঝতে পারলাে, তখন দেরী না করে পিছন থেকে জোরে চেপে ধরলাে বৃদ্ধকে।
বৃদ্ধ এ আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না, কিন্তু আক্রান্ত হওয়ার সাথে সাথে সজাগ হয়ে উঠলাে তার পঞ্চেন্দ্রিয়। শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে বৃদ্ধ ধাক্কা দিল প্রহরীকে। প্রহরী ছিটকে গিয়ে পড়লাে পেরেকআঁটা কাঠের এক তক্তার ওপর। প্রহরীর গলা চিরে বেরিয়ে এলাে মরণ চিঙ্কার।
বৃদ্ধ ছুটলাে দ্রুত, কিন্তু কিছুর মধ্যে পা আটকে পড়ে গেল। হাঁচড়ে পাঁচড়ে বৃদ্ধ আবার উঠে দাঁড়ালাে এবং দৌড় দিল।
ততক্ষণে চারদিকে মশাল জ্বলে উঠেছে। তিন চারজন প্রহরী এক সঙ্গে ছুটলাে বৃদ্ধকে ধরার জন্য। মশালের আলােয় তারা দেখলাে, সাদা দাড়িওয়ালা যে বৃদ্ধকে তারা মনে করেছিল জয়ীফ ও দুর্বল, সে ততটা দুর্বল নয়। নিজেকে মুক্ত করার জন্য বৃদ্ধ এমন তেজের সাথে লড়ছিল, যে শক্তির প্রদর্শনী কেবল কোন প্রশিক্ষিত যুবকের পক্ষেই সম্ভব।
সে ছিল একা আর তাকে ঘেরাও করে ধরেছিল ছয়সাতজন প্রহরী । ফলে সে চেষ্টা করেও তাদের থেকে মুক্ত হতে পারলাে না। কিন্তু এই চেষ্টা করতে গিয়ে তার আসল পরিচয় ফাঁস করে দিল দুশমনের সামনে। কারণ ততক্ষণে তার সাদা দাড়ি খসে পড়েছে। সেখানে এখন শােভা পাচ্ছে সুন্দরভাবে ছাটা ছােট ছােট কালাে দাড়ি। সকলেই দেখলাে, এ কোন বৃদ্ধ নয়, বরং এক যুবক সৈনিক। সম্ভবত আইয়ুবীর এক জানবাজ কমাণ্ডো।
তাকে কাবু করার পর যেখানে একটু আগে সে এক প্রহরীকে খঞ্জর মেরে হত্যা করেছে মশাল নিয়ে সেখানে গেল প্রহরীরা। মশালের আলােয় তারা দেখতে পেলাে, এ লােক তাদের কোন প্রহরী নয়, বরং সে তারই সঙ্গী ছিল। এ মৃত যুবক ছিল সাদা দাড়িবেশী বৃদ্ধের খাদেম। অন্ধকারে ওরা পরষ্পরকে চিনতে পারেনি, এখানকার প্রহরী মনে করে অন্ধকারে নিজের একমাত্র সাথীকেই হত্যা করেছে এ যুবক।
লাশের ময়না তদন্ত নেয়া হলাে। তার কাপড়ের মধ্যেও পাওয়া গেল খঞ্জর। তাদের উটের ওপর যেসব মালামাল ছিল, এবার তা খুলে দেখলাে প্রহরীরা। কিন্তু তাতে তেমন কিছু ছিল না, শুধু বস্তাতে কিছু ঘাস ও খড় বােঝাই করা ছিল। | গােয়েন্দা যুবককে এক সহ-সেনাপতির তাঁবুতে নিয়ে যাওয়া হলাে। সহ-সেনাপতি তার কাছে অনেক কিছু জানতে চাইলাে। কিন্তু সে কোন প্রশ্নেরই জবাব দিল না। সে এমন নীরবতা পালন করলাে, যা সহ্য করা সত্যি কঠিন। কিন্তু সহসেনাপতিকে তাতেও বিরক্ত মনে হলাে না।
প্রহরীরা সেনাপতির কাছে তার মুখের নকল সাদা দাড়ি হাজির করলাে। সহ-সেনাপতি এ সম্পর্কে প্রশ্ন করেও কোন জবাব পেলাে না তার কাছ থেকে। কিন্তু এটা এমন এক প্রমাণ, যার সত্যতা অস্বীকার করার উপায় নেই।
তাকে বলা হলাে, তাহলে তুমি স্বীকার করছাে, তুমি এবং তােমার সাথী সুলতান আইয়ুবীর গােয়েন্দা!'
এ প্রশ্নেরও কোন জবাব দিল না ধৃত যুবক । সহ-সেনাপতি বললাে, ঠিক আছে, ওকে শাস্তি সেলে নিয়ে যাও। সে তার পরিচয় না দিলে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তার পরিচয় দেবে।'
তাকে শাস্তি সেলে ঢুকানাে হলাে। নানা রকম শাস্তি দেয়া হলাে, অসহ্য মারপিট করা হলাে, কিন্তু সে কিছুতেই স্বীকার করলাে না, সে আইয়ুবীর গােয়েন্দা।
রাত কেটে গেল। সকাল বেলা তাকে উপস্থিত করা হলাে মুজাফফরুদ্দিনের সামনে। রাতে যা ঘটেছে সে সম্পর্কে অবহিত করা হলাে তাকে। তার নকল দাড়ি ও উটের বােঝা সেনাপতি মুজাফফরুদ্দিনের সামনে হাজির করা হলাে।
তুমি আলী বিন সুফিয়ানের শাগরেদ নাকি হাসান বিন আব্দুল্লাহর?’ মুজাফফরুদ্দিন তাকে জিজ্ঞেস করলাে।
আমি এ দুজনের কাউকে চিনি না। উত্তর দিল যুবক।
আমি এ দুজনকেই ভাল মত চিনি।' মুজাফফরুদ্দিন বললাে, আমি নিজেও সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর শাগরেদ ছিলাম। ওস্তাদ তার শাগরেদকে কখনও ধোকা দিতে পারে।
আপনার সাথে যেমন আমার কোন সম্পর্ক নেই তেমনি সুলতান আইয়ুবীর সাথেও আমার কোন সম্পর্ক নেই। বললাে বন্দী।
‘শােননা, হে হতভাগা বন্ধু ! মুজাফফরুদ্দিন তার কাঁধে হাত রেখে বললো, আমি তােমার সাথে কোন ঝগড়া করবাে না। আমি তােমাকে অযােগ্য এবং অকম্মাও বলবাে না। তুমি তােমার দায়িত্ব সুন্দরভাবেই পালন করেছে। ধরা পড়া কোন দোষের ব্যাপার নয়, সেটা দুর্ভাগ্য। তােমার দুর্ভাগ্যের পরিমাণটা একটু বেশী, নইলে তােমার সাথী তােমারই হাতে খুন হতাে না। তুমি আমাকে অনুগ্রহ করে বলে দাও, তােমার কোন সঙ্গী এখান থেকে সংবাদ নিয়ে সুলতান আইয়ুবীর কাছে পৌছেছে কিনা, আমরা যে, এখানে আছি এবং কতজন আছি সে খবর সুলতান জানেন কিনা? আর এ কথাও বলাে, তােমাদের সৈন্যরা যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও এখানে বসে আছে কেন? সেখানে কি তৎপরতা ও প্রস্তুতি চলছে? মাত্র এই প্রশ্ন কয়টির উত্তর দাও, আমি তােমার সাথে কোরআন ছুঁয়ে শপথ করছি, যুদ্ধ শেষ হওয়ার সাথে সাথে তােমাকে মুক্ত করে দেয়া হবে। এখন তােমাকে এখানে সসম্মানে রাখা হবে।
আপনার অঙ্গীকার ও কসমের ওপর আমার কোন বিশ্বাস নেই।' সে বললাে, কারণ আপনি কোরআন থেকে মুখ, ফিরিয়ে নিয়েছেন। | মুজাফফরুদ্দিন ধৈর্য ধারণ করে বললাে, তুমি বলতে চাচ্ছাে, আমি মুসলমান নই?
হ্যা, আপনি অবশ্যই মুসলমান!' বন্দী কমান্ডো বললাে, কিন্তু আপনি কোরআনের অনুগত নন, ক্রুশের অনুগত!
‘আমি তােমার অভিযােগ এই শর্তে মেনে নিতে পারি যে, তুমি আমার প্রশ্নের উত্তর দিবে ।' মুজাফফরুদ্দিন বললাে, তােমার জীবন মৃত্যু এখন আমার হাতে।
না, জীবন মৃত্যুর মালিক আপনি নন, আল্লাহর ইচ্ছে না থাকলে আপনি আমার জীবন কেড়ে নিতে পারবেন না।'
কমান্ডো এবার মুজাফফরুদ্দিনের অভিযোেগ মেনে নিয়ে বললাে, আপনি আমাদের সেনাবাহিনীতে ছিলেন, আপনার ভাল মতই জানা আছে, আমাদের সব সৈনিক তার জীবন আল্লাহর হাতে সঁপে দেয়। আমি আপনাকে বলে দিতে চাই, আমি যেমন আইয়ুবীর বাহিনীর এক সামান্য গােয়েন্দা, আমার সঙ্গীও তাই। আমি আর আপনার কোন প্রশ্নের উত্তর দেবাে না। আমি এখনাে বেঁচে আছি, অতএব তােমরা ইচ্ছা করলে এখন আমার গায়ের চামড়া খুলে নিতে পারাে, কিন্তু আমার মুখ থেকে তােমাদের কোন প্রশ্নের উত্তর কখনও শুনতে পারবে না। আমি তােমাকে এ কথাও বলে দিতে চাই, পরাজয় আল্লাহ তােমার ভাগ্যেই লিখে রেখেছেন, আমাদের নয়।'
‘এর পায়ের গিরাতে শক্ত করে রশি বাঁধাে, আর উল্টো করে গাছের ডালে লটকিয়ে দাও।' মুজাফফরুদ্দিন একটি গাছ দেখিয়ে এ হুকুমনামা জারী করে দ্রুত তার তাঁবুতে চলে গেলাে।
ওদের দু'জনের একজনও এখন পর্যন্ত ফিরলাে না!' হাসান বিন আব্দুল্লাহ সুলতান আইয়ুবীকে বললাে, তাদের ধরা পড়ার তাে কোন ভয় ছিল না। আমাদের গােয়েন্দাদের ধরার মত লােক এখানে আর কে আছে? তাছাড়া তাদের তাে বেশী দূরে যাওয়ারও কথা নয়, তবে দেরী হচ্ছে কেন?
তারা গ্রেফতারওতাে হয়ে যেতে পারে। সুলতান , আইয়ুবী বললেন, তারা সেই সকালে গিয়েছে, এখন সন্ধ্যা।
কিন্তু এখনও তাদের ফেরার নাম নেই, মনে হয় তারা ধরাই পড়েছে। তাদের এখন পর্যন্ত না আসাই প্রমাণ করে, আশেপাশে শক্র আছে। আজ রাতে আরও কয়েকজনকে পাঠিয়ে দাও। তারা আরাে কয়েক মাইল পর্যন্ত দেখে আসুক।
সুলতান আইয়ুবী গােয়েন্দাদের নিয়ে কথা বলছিলেন হাসান বিন আব্দুল্লাহর সাথে। যে দুই গােয়েন্দাকে সকালে পাঠিয়েছিলেন আশপাশের এলাকা পরিদর্শন করতে, তাদের না ফিরার কারণে পেরেশান ছিলেন দু'জনই। নিজের গােয়েন্দা সংস্থার ওপর সব সময় ভরসা ছিল সুলতান আইয়ুবীর। এই গােয়েন্দাদের দিয়েই তিনি শত্রুদের নাকানি-চুবানি খাওয়াচ্ছেন। কিন্তু আজ দুই গােয়েন্দার ফিরে না আসার একটিই কারণ হতে পারে, তারা ধরা পড়েছে। কিন্তু আইয়ুবীর গােয়েন্দাদের ধরে এমন সাধ্য কার? সুলতান ভেবে দেখলেন, একমাত্র মুজাফফরুদ্দিনই তা পারে। কারণ মুজাফফরুদ্দিন তাঁরই শাগরেদ, তার সমর কৌশল সম্পর্কেও মুজাফফরুদ্দিন জ্ঞাত।
গত রাতে সুলতান আইয়ুবীর এক গােয়েন্দার লাশ তুর্কমানের কিছু দূরে এক নির্জন প্রান্তরে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। তার বুকে বিদ্ধ ছিল বিষাক্ত তীর।
মুজাফফরুদ্দিন তার সহ-সেনাপতিদের বলেছিলাে, যদি তােমরা সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর গােয়েন্দাদের বিরুদ্ধে কঠিন পদক্ষেপ নিতে পারাে, তবে তিনি অন্ধ ও বােবা হয়ে যাবেন। কেবল তখনই তােমরা তাকে পরাজিত করার চিন্তা করতে পারাে।সুলতান আইয়ুবী এই দুটি ঘটনাকে তুচ্ছ মনে করলেন । তার আদেশে হাসান বিন আব্দুল্লাহর ছয়জন কমাণ্ডো সেনা রাতের আঁধারেই নিখোঁজ গােয়েন্দাদের সন্ধানে যাত্রা করলাে।
সুবহে সাদেকের পর মসজিদে ফজরের আজান ধ্বনিত হলাে। আল্লাহু আকবার' ধ্বনিতে ঘুম ভাঙ্গলাে সুলতান আইয়ুবীর। তিনি তাঁবুর বাইরে গেলেন। খাদেম মশাল জ্বালিয়ে তার তাবুর সামনে রেখে দিল।
এ সময় একদিক থেকে ছুটে এলাে এক অশ্বারােহী। থামলাে এসে সুলতান আইয়ুবীর সামনে। দ্রুত অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নেমে সালাম দিল সুলতানকে। তারপর সময় ক্ষেপন না করে বলতে লাগলাে, সুলতান, আপনার ভাগ্য সুপ্রসন্ন হােক! মনে হয় আপনার ডান বাহিনীর অদূরে দুশমন সৈন্য সমাবেশ করছে। অন্ধকারে ওদের দেখা না গেলেও তাদের আনাগােনার আওয়াজ স্পষ্ট শােনা যাচ্ছে। প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য দু’জনকে পাঠিয়েছি, তারা সঠিক খবর নিয়ে এখুনি আপনার সামনে হাজির হবে।'
অশ্বারােহীর কথা শেষ হলাে না, দূর থেকে শােনা গেল অশ্বখুরধ্বনি; সুলতান এবং অশ্বারােহী উভয়েই কথা বন্ধ করে সেদিকে তাকালাে। নতুন এক অশ্বারােহী ছুটে এসে ঘােড়া থামালো সুলতানের সামনে। সে ঘােড়া থেকে নামার আগেই সুলতান প্রশ্ন করলেন, কি খবর নিয়ে এসেছাে?
খবর সঠিক, দুশমন সৈন্য এগিয়ে আসছে আপনার ডান পাশের বাহিনীর দিকে।
সুলতান আইয়ুবী কেন্দ্রীয় কমাণ্ড কাউন্সিলের সেনাপতিদের নাম উল্লেখ করে বললেন, ‘এদেরকে জলদি খবর দাও।'
সুলতান তাদেরকে খবরের জন্য পাঠিয়ে সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে বসে পড়লেন এবং তায়াম্মুম করে নিলেন। কারণ তার কাছে ওজু করার মত সময় ছিল না। তায়াম্মুম শেষে সেখানেই তিনি কেবলামুখী হয়ে নামাজ পড়ে নিলেন। নামাজ শেষে সংক্ষিপ্ত মােনাজাত করে তিনি তার ঘােড়া আনতে বললেন।
‘এ মুজাফফরুদ্দিন ছাড়া আর কেউ হতে পারে না।' সুলতান আইয়ুবী তার সেনাপতিদের বললেন, ‘এ সৈন্য দল খৃস্টানদের নয়। তাদের আক্রমণের সময় এখন নয়। যদি এ সংবাদ সত্যি হয় যে, শত্রু সৈন্য আমাদের ডান দিক থেকে আসছে এবং আমাদের ডান বাহিনীকেই ওরা প্রথম টার্গেট বানাতে চায়, তবে মনে রেখাে, ওরা দুই তরফা আক্রমণ চালাবে। তােমরা কোন দলকেই পিছনে হটতে দিবে না। তােমাদের পিছনে দেড় হাজার কবরের গর্ত রয়েছে। সব লাশ এখনও দাফন করা সম্ভব হয়নি। যুদ্ধ শুরু হলে তােমরা আস্তে আস্তে পিছু হটবে, পিছনের সৈন্যদের সুযােগ দেবে কবর পেরিয়ে ওপাশে চলে যাওয়ার। এরপর তাদের সহায়তায় তােমরাও পার হয়ে আসবে কবরের সীমানা। পুরনাে সৈন্য নয়, এই গর্তগুলাে আমি ভরে তুলতে চাই এই নবাগত সৈন্যদের লাশ দিয়ে। সেই লাশ আমি কষ্ট করে কবরে নামাতে চাই না, আমি চাই ওরা পায়ে হেঁটে সেই কবরে নেমে যাক।
সুলতান আইয়ুবী ঘােড়ায় আরােহণ করলেন, তার রক্ষীবাহিনীর বারাে জন রক্ষী চললাে তার পিছনে। তারাও অশ্বারােহী। রক্ষী ছাড়া তিনি ছয়জন কাসেদও সঙ্গে নিলেন সংবাদ সরবাহের জন্য। আর নিলেন দু’জন সেনাপতি।
তিনি দ্রুত ঘােড়া ছুটালেন এবং পাহাড়ের এমন এক উঁচু স্থানে গিয়ে দাঁড়ালেন, যেখান থেকে তার ডানের বাহিনীর এলাকা ও সৈন্যদের দেখা যায়।
রাতের আঁধার কেটে ভােরের আলাে ফুটছিল একটু একটু করে। তিনি উপত্যকা থেকে নিচে নামলেন এবং ডান পাশের সৈন্যদের কমাণ্ডারকে ডেকে বললেন, অশ্বারােহী সৈন্যদের ঘােড়ায় আরােহণ করতে বলো। পদাতিক বাহিনীকে বলল অতিসত্ত্বর সামনের ময়দানে পজিশন নিতে আর তীরন্দাজ বাহিনীকে পরিখা, নিম্নভূমি ও উপরের নিরাপদ স্থানে তীর-ধনুক নিয়ে অবস্থান নিতে বলাে। সবাইকে বলাে, তারা যেন তাড়াতাড়ি যুদ্ধের পজিশন নিয়ে বসে থাকে।
কমাণ্ডররা নিজ নিজ সৈন্যদের পজিশনে বসিয়ে দিল।
সুলতান বললেন, এখন থেকে ডান পাশের বাহিনীকে আমি নিজে উপস্থিত থেকে কমাণ্ড করবাে। তিনি সেই বাহিনীর সেনাপতি ও কমাণ্ডারদের বললেন, তােমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ কাসেদ পাশে রাখাে, তাদের মাধ্যমে প্রতি মুহূর্তে আমার সাথে যােগাযােগ ঠিক রাখবে এবং প্রতিটি নির্দেশ বিচক্ষণতা ও দ্রুততার সাথে পালন করবে।
সুলতান আইয়ুবীর বাহিনীর গতি এমনিতেই ছিল দ্রুত ও বেগবান, আইয়ুবীর এ নির্দেশ পাওয়ার পর তাদের গতি যেন বিজলীর মত দ্রুতগতি হয়ে উঠলাে। সুলতানের যে কোন নির্দেশ পালনের জন্য সৈন্যরা অধীর হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাে। সুলতানের প্রতিটি চাল বা কৌশল মুহূর্তে সারা ময়দানে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য সীনা টান করে অপেক্ষা করতে লাগলাে কাসেদ বাহিনী। বিজলীর মতই দ্রুত গতিতে সুলতানের আদেশ তারা পৌঁছে দিতে লাগলাে সৈনিকদের কানে কানে।
মুজাফফরুদ্দিনের সৈন্যবাহিনী তখনও নিকটবর্তী হয়নি, সুলতান আইয়ুবী তার বাহিনীকে তৎপর করে তুললেন।
ময়দানে নেমে এলাে মুজাফফরুদ্দিনের সেনাবাহিনী। প্রথমে অশ্বারােহী বাহিনী নিয়ে আক্রমণ চালানাের সিদ্ধান্ত নিলাে মুজাফফরুদ্দিন। যেইমাত্র তার প্রথম অশ্বারােহী দল সুলতান আইয়ুবীর সৈন্যদলের সামনে এলাে, অমনি শুরু হলাে তীর বৃষ্টি। মুহূর্তে তার সব প্ল্যান প্রােগ্রাম যেন উলট-পালট হয়ে গেল। কারণ এখানে অসংখ্য মাটির ঢিবি ও গর্ত ছিল। সেই সব গর্ত থেকে সুলতান আইয়ুবীর তীরন্দাজেরা অবিরাম তীর বর্ষণ করে চললাে। তারা দ্রুতগামী ঘােড়া এবং তার আরােহী উভয়কেই তীর মেরে ঘায়েল করতে লাগলাে। ধরাশায়ী হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে লাগলাে মুজাফফরুদ্দিনের অশ্বারােহী সৈন্যরা।
যে সব ঘােড়া তীরের আঘাতে আহত হলাে, সে সব ঘােড়া পাগলের মত এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করতে লাগলাে। এমন ঘটনা তাে প্রত্যেক যুদ্ধ ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে, মুজাফফরুদ্দিনের জন্য এই অবস্থা বিস্ময়ের কিছু ছিল না। কিন্তু তার অশান্তির কারণ হলাে, তার আশার বিপরীত সুলতান আইয়ুবীর ডানের সেনাদল সজাগ ছিল ও মােকাবেলার জন্য প্রস্তুত ছিল।
এই প্রচণ্ড আক্রমণে সুলতান আইয়ুবীর অসংখ্য তীরন্দাজও হতাহত হয়। এই কোরবানী বিফলে যায়নি, মুজাফফরুদ্দিনের আক্রমণের প্রচণ্ডতা তীরন্দাজদের এই তীর খেয়েই শেষ হয়ে যায়। এরপর আসে সুলতান আইয়ুবীর সেই বিশেষ আক্রমণের পালা, যার কথা মনে হলেই দুশমন সৈন্যদের পানির পিপাসা পেয়ে যায়।
মুজাফফরুদ্দিন এই আশা নিয়ে যুদ্ধে এসেছিলাে যে, সে সুলতানের বাহিনীর সম্পূর্ণ অজ্ঞাতে অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়বে তাদের ওপর, যেমনটি তার ওস্তাদ সুলতান আইয়ুবী করে থাকেন। তার সে আশা-ভরসা তীরন্দাজদের আঘাতেই শেষ হয়ে গিয়েছিল । | এখন সুলতান আইয়ুবী তার আপন চাল অনুযায়ী যুদ্ধ করার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তার যেসব তীরন্দাজ সৈন্য মুজাফফরুদ্দিনের অশ্বারােহী বাহিনীর পদতলে জীবন উৎসর্গ করেছিল, তার সুফল এখন সুলতান আইয়ুবীর হাতে।
মুজাফফরুদ্দিনের অশ্বারােহী বাহিনীর কিছু সৈন্য
(চলবে)
সম্মানিত সেনাপতি!' গােয়েন্দা বললাে, আমি শুধু সৈনিক নই কমাণ্ডারও। আমি যে সংবাদ দিচ্ছি তা একটু ভেবেচিন্তেই দিচ্ছি। আমার উদ্দেশ্য এ নয় যে, শুধু আপনাকে খুশী করি। আমার উদ্দেশ্য ঠিক আপনারই মতই। আমিও সুলতান আইয়ুবীর বিজয়কে পরাজয়ে রূপান্তর করার কথাই ভাবছি।
আপনাকে বিশেষভাবে জানানাে দরকার, তারা কেউ তাদের অবস্থান ত্যাগ করেনি। আমার পরামর্শ হচ্ছে, আপনি তাড়াহুড়াে করবেন না।
‘পরামর্শ পরে দিও, আগে সেখানকার সৈন্যদের রিপাের্ট দাও।'
মাননীয় সেনাপতি, দয়া করে আমাকে বাঁধা দিবেন না। আমি যা বলছি তা আমাকে বলতে দিন, দেখবেন ময়দান আপনার চোখের সামনে ভাসছে। আমি জানি, আপনার প্রথম টার্গেট সুলতান আইয়ুবীর ডাইনের বাহিনী। কারণ তারা আপনার সহজ আওতার মধ্যে রয়েছে। কিন্তু আমি তার সেনাবাহিনীর অন্য দিকটাও দৃষ্টির সামনে রেখে দেখেছি, আমরা যখন তার ডাইনের বাহিনীর ওপর আক্রমণ করবাে, তখন সুলতান আইয়ুবীব সৈন্যরা অপর দিকটা কিভাবে ব্যবহার করবে।'
তারা আমাদেরকে ঘেরাও করার চেষ্টা করবে। মুজাফফরুদ্দিন বললাে, তাদের ঘেরাও কর্মসূচী শুরু হবে অনেক দূর থেকে। তারপর আস্তে আস্তে অবরােধ খাটো করে আনবে। আমি তার যুদ্ধের চাল সম্পর্কে আগাম খবর বলতে পারি।'
সুলতান আইয়ুবী তার রিজার্ভ বাহিনী, যে বাহিনী দিয়ে আমাদের সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করেছেন, সে বাহিনীকে এক ক্রোশ পিছনে সরিয়ে নিয়ে আবার প্রস্তুত করে রেখেছেন। আপনি ঠিকই বুঝতে পেরেছেন, সুলতান আইয়ুবী আমাদের বাহিনীকে অবরােধ করে ফেলতে চেষ্টা করবেন।
আরও খবর আছে। সুলতান আইয়ুবীর ডাইনের বাহিনী থেকে দেড় ক্রোশ পিছনে আমাদের ও সুলতান আইয়ুবীর মৃত সৈন্যদের লাশের জন্য কবর খােদাই করা হয়েছে। কবরের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার। কবরগুলাে তারা করেছে পাশাপাশি এবং বিশেষ পদ্ধতিতে। দেড় হাজার কবর মানে দেড় হাজার গর্ত। আমি কবরের চওড়া, দিকটা লক্ষ্য করে বিস্মিত হয়েছি। আপনি যখন ডান দিক থেকে আক্রমণ চালাবেন, আইয়ুবীর সৈন্যরা পিছনে সরতে থাকবে। আপনি ধাওয়া করে তাদেরকে কবরের কাছে নিয়ে যাবেন। সামনা-সামনি আঘাত না করে আপনি এলােপাথাড়ী তীর বর্ষণ করবেন। তাদেরকে বাধ্য করবেন কবরের দিকে চলে যেতে। তারপর আপনি যখন তাদের, অশ্বারােহী সৈন্যদের ওপর তীব্র আক্রমণ চালাবেন, অশ্বসহ তারা তখন হুমড়ি খেয়ে পড়বে সেই কবরে। এ ছাড়া সেখানে অসংখ্য লাশ গাদা করে রাখা হয়েছে, তারা লাশের সঙ্গেও বাঁধা পাবে, ফলে যুদ্ধের গতি সহজেই চলে আসবে আমাদের অনুকূলে।'
সুলতান আইয়ুবীর ডান দিকের ব্যাটেলিয়ানকে কতটা শক্তিশালী মনে করাে তুমি?’ মুজাফফরুদ্দিন জিজ্ঞেস করলাে।
কমের পক্ষে এক হাজার অশ্বারােহী ও দেড় হাজার পদাতিক রয়েছে এ বাহিনীতে। গােয়েন্দা কমাণ্ডার উত্তরে বললাে, এই বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত অবস্থায় আছে। আপনি তাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ করতে পারবেন না।'
মুজাফফরুদ্দিনের সামনে ময়দানের একটি নকশা পড়েছিল। সে সেই নকশার উপরে হাত রেখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বললাে, এই হলাে আইয়ুবীর ডাইনের বাহিনী। তাদের সামনের ময়দান কিছুটা অসমান। ছােট বড় নানা রকম গর্ত এবং উঁচু ঢিবিও আছে সেখানে। তার দক্ষিণ দিকটা পরিষ্কার। আক্রমণের জন্য এ রাস্তা অধিক উপযুক্ত মনে হয়। এ পথে সরাসরি প্রচণ্ড হামলা চালাতে পারলে তারা পিছু হটতে বাধ্য হবে এবং কবরে গিয়ে পড়বে।
হ্যা, সেই কবরেই আমি ওদের দাফনের ব্যবস্থা করবাে। আমার আক্রমণ সামনে থেকেও হবে এবং ডাইনের পরিষ্কার জায়গা দিয়েও হবে।
মুজাফফরুদ্দিন তার সহ-সেনাপতিকে বললাে, এখান থেকে ময়দান পর্যন্ত এর মাঝখানে এখন থেকে কোন লােক দেখতে পেলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে ধরে এনে বন্দী করবে এ আস্তানায় । এ অঞ্চল পুরােটাই এখন যুদ্ধের আওতার মধ্যে এসে গেছে। এদিক দিয়ে কোন যাত্রী আর চলাচল করতে পারবে না। এদিকের সারা পথে এখন থেকে থাকবে শুধু আমার গােয়েন্দা।
হতভাগা দুই মুসাফিরের জানা ছিল না, এ অঞ্চল এখন যুদ্ধের আওতার মধ্যে পড়ে আছে। তাদের একজন এক উটের ওপর সওয়ার ছিল। লােকটা খুব বৃদ্ধ। তার সমস্ত দাড়িই ধবধবে সাদা। উটের ওপর কিছু মালপত্রও আছে। অপর ব্যক্তি উটের লাগাম ধরে টানছিল।
তারা দুজনই গ্রাম্য বেদুইনদের পােষাক পরিহিত। তারা এমন জায়গা দিয়ে যাচ্ছিল, যেখান থেকে মুজাফফরুদ্দিনের লুকানাে সৈন্য বাহিনী দেখা যাচ্ছিল।
এক সৈনিক তাদের ডাকলাে। কিন্তু তারা দাঁড়ালাে না, বরং যাত্রার গতি আরও বাড়িয়ে দিল। তারা না থামায় এবার এগিয়ে গেল এক অশ্বারােহী । দ্রুত তাদের সামনে গিয়ে তাদের পথরােধ করে দাঁড়ালাে। বাধ্য হলাে তারা থেমে যেতে।
অশ্বারােহী মুসাফিরদেরকে বললাে, ক্যাম্পে চলাে। তােমাদের তল্লাশী নেয়া হবে।
আমরা মুসাফির! উটের লাগামওয়ালা বললাে, আপনাদের কি ক্ষতি করেছি যে, আমাদের পথ চলতে দিচ্ছেন না?’
আমাদের ওপর আদেশ আছে, এদিক দিয়ে যে যাবে তাকেই ধরে নিয়ে যেতে হবে ক্যাম্পে। ব্যস, আর কোন কথা নয়, চলাে। অশ্বারােহী ধমকে উঠলাে।
ওদেরকে সঙ্গে নিয়ে অশ্বারােহী ক্যাম্পে ফিরলাে। এক তাঁবুর সামনে তাদেরকে দাঁড় করিয়ে তাঁবুর মধ্যে সংবাদ দেয়া হলাে। কমাণ্ডার বেরিয়ে এলাে তাঁবু থেকে। সে মুসাফিরদেরকে জিজ্ঞেস করলাে, তােমরা কোখেকে আসছে এবং কোথায় যাবে?'
তারা যে উত্তর দিল তাতে কমাণ্ডার নিশ্চিত হলাে, এরা কোন গােয়েন্দা নয়। কিন্তু তবু তাদের বলা হলাে, “তােমাদেরকে এখন আর সামনে যেতে দেয়া যাবে না। কয়েদী করে নয় সসম্মানে রাখা হবে তােমাদের।'
‘এভাবে আমাদের কতদিন মেহমান রাখবেন?' জানতে চাইলে বৃদ্ধ।
কিন্তু এ প্রশ্নের কোন জবাব না দিয়ে সেন্ট্রির দিকে তাকিয়ে কমাণ্ডার বললাে, 'এদের থাকার তাঁবু দেখিয়ে দাও।
এ হুকুম জারি করে কমাণ্ডার আবার তার তাঁবুতে ঢুকে পড়লাে। মুজাফফরুদ্দিনের আদেশে আটকাপড়া মুসাফির এই প্রথম।
মুসাফিররা সেন্ট্রিকে অনুরােধ করলাে তাদের ছেড়ে দিতে। অনেক কাকুতি মিনতি করলাে, কিন্তু তাদের অনুরােধ কেউ শুনলাে না।
তাদের যে তাঁবুতে রাখা হলাে, সেখানে পালাক্রমে দুই সিপাহী ডিউটি দিচ্ছিল।
রাত । ডিউটিরত দুই সিপাহী বসেছিল তাঁবুর সামনে। রাত ক্রমে গভীর হতে লাগলাে। দুই সেন্ট্রি তাঁবুর সামনে বসে নিশ্চিন্ত মনে গল্প করছে। তাদের ধারনা, নিরীহ দুই বন্দী ঘুমিয়ে আছে তাঁবুর ভেতর। তাদের দিক থেকে কোন রকম বিপদ আসতে পারে, এমন কথা সেন্ট্রিদের কল্পনারও অতীত।
এক পাহারাদার তার সঙ্গীকে বললাে, দোস্ত, কি কপাল দেখ, বন্দী হয়েও বুড়াে আর তার খাদেম নিশ্চিন্তে তাঁবুর ভেতর আরামে ঘুমাচ্ছে, আমরা শত্রু নেই, যুদ্ধ নেই, তবু ঘুম হারাম করে পাহারা দিচ্ছি এক আজনবী বৃদ্ধকে।
সাদা দাড়িওয়ালা বৃদ্ধ তখনও জেগেই ছিল। সে তাঁবুর মধ্যে শুয়ে শুয়ে শুনছিল সেন্ট্রিদের আক্ষেপ ভরা কণ্ঠ। তাঁবুর ভেতর ঘন অন্ধকার।
একটু পর বৃদ্ধ তাঁবুর বাইরে নাক ডাকার শব্দ শুনতে পেলাে। বুঝলাে, সিপাহী দুইজন জেগে থাকা নিরর্থক ভেবে ঘুমিয়ে পড়েছে। সে তার খাদেমকে আস্তে করে টোকা দিল। হাতে মৃদু চাপ দিয়ে সাড়া দিল খাদেম। দু’জন নিঃশব্দে উঠে, বসলাে বিছানায়। বেড়ালের মত সন্তর্পনে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল দরজার দিকে।
দরজার কাছে পৌছে পর্দা ইষৎ ফাঁক করে বাইরে মুখ বাড়ালাে বৃদ্ধ, দেখলাে কাছেই পাশাপাশি দুই সেন্ট্রি হাঁটুতে মাথাগুজে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে।
দ্রুত তাঁবুর বাইরে চলে এলাে ওরা। বাইরে নীরবতা বিরাজ করছিল। তাঁবু থেকে কিছু দূরে গিয়ে বৃদ্ধ তার সাথীকে বললাে, তুমি পৃথক হয়ে যাও। দু’জন আলাদা থাকলে একজন ধরা পড়লেও আরেকজনের পালিয়ে যাওয়ার সুযােগ থাকবে। | দু’জন দুদিকে পৃথক হয়ে গেল। আলাদা হয়েই বুড়াে সঙ্গী তাঁবুর উল্টো দিক দিয়ে দ্রুত পা চালালাে ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য।
তাদের ধারণা সঠিক ছিল না, পুরাে ক্যাম্প ঘুমিয়ে থাকলেও ক্যাম্পের পাহারাদাররা ছিল সজাগ ও সতর্ক। তেমনি এক ক্যাম্প প্রহরীর চোখে অন্ধকারে কারাে ছায়া নড়ার দৃশ্য ধরা পড়লাে । সেও বসেছিল অন্ধকারেই, ফলে চলমান ছায়াটি তাকে দেখতে পেলাে না।
প্রহরী কোন রকম সাড়া শব্দ না করে ছায়াটিকে অনুসরণ করতে শুরু করলাে। কিছুদূর যাওয়ার পর কিছুতে হোঁচট খেল প্রহরী, সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধ তাকালাে পিছন দিকে। তাকিয়েই দেখতে পেল এক প্রহরী তাকে অনুসরণ করছে। সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধ এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলাে কাছেই কিছু আসবাবপত্র পড়ে আছে। সে কালবিলম্ব না করে তার আড়ালে গিয়ে লুকালাে।
এরপর শুরু হলাে লুকোচুরি খেলা। প্রহরী তাকে খুঁজতে লাগলাে আর বৃদ্ধ এখানে ওখানে পালাতে লাগলাে। ঠিক একইভাবে তার সাথীকেও দেখে ফেললাে অন্য এক প্রহরী। সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধের সাথীও লুকিয়ে পড়লাে।
মুজাফফরুদ্দিন সুলতান আইয়ুবীর গােয়েন্দাদের নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তায় ছিল। কারণ সে জানতাে আইয়ুবীর গােয়েন্দারা কেমন তৎপর ও চৌকস। তাই দুশমনের গােয়েন্দাদের ওপর কড়া দৃষ্টি রাখার হুকুম ছিল তার। তার আরও নির্দেশ ছিল, গােয়েন্দাদের দেখা পেলে তাদের হত্যা না করে ধরতে চেষ্টা করবে।'
সুতরাং মুজাফফরুদ্দিনের প্রহরীরা গােয়েন্দাদের ধরার জন্য বিশেষ ভাবে সচেষ্ট হলাে। এ কারণেই বৃদ্ধ ও তার সাথীকে দেখার পরও তাদেরকে ডাকেনি ওরা, অনুসরণ করে তাদের ধরার চেষ্টা করছিল।
বৃদ্ধ ও প্রহরীর লুকোচুরি খেলা তখনাে চলছে। বৃদ্ধ এখান থেকে ওখানে ছুটছে লুকাতে, আর তাকে তালাশ করতে তার পিছু পিছু ছুটছে প্রহরী। এবার বৃদ্ধ লুকালাে জড়াে করে রাখা কিছু কাঠের আড়ালে, ঘন অন্ধকারের মধ্যে। কাঠগুলাে যেভাবে রাখা, তাতে তার এক হাত দূর দিয়ে গেলেও প্রহরী তাকে দেখতে পাবে না।
প্রায় কাছাকাছি চলে এলাে প্রহরী । বৃদ্ধ দম বন্ধ করে পড়ে রইলাে সেই স্তুপীকৃত কাঠের আড়ালে। সাবধানে এক পা, এক পা করে এগুতে লাগলাে প্রহরী। খানিক থমকে দাঁড়ায়, খানিক এগােয়, এভাবে এগুতে এগুতে একেবারে তার পাশ কেটে সামনে এগিয়ে গেল প্রহরী। এমনি একটি সুযােগেরই অপেক্ষায় ছিল বৃদ্ধ। প্রহরী তার হাত দুয়েক দূরে গিয়ে আবার থমকে দাঁড়ালাে। বৃদ্ধ খঞ্জর বের করে তৈরী হলাে। তারপর আলগােছে পা তুললাে কাঠের আড়াল থেকে।
সে জানে, প্রহরীর হাত থেকে মুক্তির এখন একটি পথই খােলা আছে, আর তা হচ্ছে তাকে হত্যা করা। বৃদ্ধ পা উঠালাে, খঞ্জর তাক করা হাতটি নিয়ে এলাে বুক বরাবর, তারপর ঝাঁপিয়ে পড়লাে।
প্রহরী হয়তাে শেষ মুহূর্তে কিছু আঁচ করতে পেরেছিল, পই করে ঘুরে দাঁড়ালাে সে, আর সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধের খঞ্জর আমূল ঢুকে গেল লােকটির বুকে। চিৎকার করারও সময় পেলাে না প্রহরী, বাম হাত দিয়ে তার গলা পেঁচিয়ে ধরে তাল সামলাতে না পেরে তাকে নিয়েই পড়ে গেল বৃদ্ধ। সে অবস্থায় থেকেই বৃদ্ধ দ্রুত খঞ্জর টেনে বের করলাে এবং পরপর আরও কয়েকটি আঘাত করলাে।
লােকটি মারা গেল। নিস্তেজ হয়ে গেল তার দেহ। বৃদ্ধ তাকে রেখে দ্রুত উঠে দাঁড়ালাে এবং সেখান থেকে পালানাের চিন্তা করলাে ।।
ধ্বস্তাধ্বস্তি সামান্য হলেও নির্জন রাত বলে তার আওয়াজ স্পষ্টই শুনতে পেলাে অন্য প্রহরী । আওয়াজের উৎস লক্ষ্য করে সে যখন তাদের কাছাকাছি এসেছে ততক্ষণে একজন বিদায় নিয়ে পাড়ি জমিয়েছে পরপারে। | প্রহরীরা ঘটনাস্থলে এসে যখন কি ঘটছে বুঝতে পারলাে, তখন দেরী না করে পিছন থেকে জোরে চেপে ধরলাে বৃদ্ধকে।
বৃদ্ধ এ আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না, কিন্তু আক্রান্ত হওয়ার সাথে সাথে সজাগ হয়ে উঠলাে তার পঞ্চেন্দ্রিয়। শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে বৃদ্ধ ধাক্কা দিল প্রহরীকে। প্রহরী ছিটকে গিয়ে পড়লাে পেরেকআঁটা কাঠের এক তক্তার ওপর। প্রহরীর গলা চিরে বেরিয়ে এলাে মরণ চিঙ্কার।
বৃদ্ধ ছুটলাে দ্রুত, কিন্তু কিছুর মধ্যে পা আটকে পড়ে গেল। হাঁচড়ে পাঁচড়ে বৃদ্ধ আবার উঠে দাঁড়ালাে এবং দৌড় দিল।
ততক্ষণে চারদিকে মশাল জ্বলে উঠেছে। তিন চারজন প্রহরী এক সঙ্গে ছুটলাে বৃদ্ধকে ধরার জন্য। মশালের আলােয় তারা দেখলাে, সাদা দাড়িওয়ালা যে বৃদ্ধকে তারা মনে করেছিল জয়ীফ ও দুর্বল, সে ততটা দুর্বল নয়। নিজেকে মুক্ত করার জন্য বৃদ্ধ এমন তেজের সাথে লড়ছিল, যে শক্তির প্রদর্শনী কেবল কোন প্রশিক্ষিত যুবকের পক্ষেই সম্ভব।
সে ছিল একা আর তাকে ঘেরাও করে ধরেছিল ছয়সাতজন প্রহরী । ফলে সে চেষ্টা করেও তাদের থেকে মুক্ত হতে পারলাে না। কিন্তু এই চেষ্টা করতে গিয়ে তার আসল পরিচয় ফাঁস করে দিল দুশমনের সামনে। কারণ ততক্ষণে তার সাদা দাড়ি খসে পড়েছে। সেখানে এখন শােভা পাচ্ছে সুন্দরভাবে ছাটা ছােট ছােট কালাে দাড়ি। সকলেই দেখলাে, এ কোন বৃদ্ধ নয়, বরং এক যুবক সৈনিক। সম্ভবত আইয়ুবীর এক জানবাজ কমাণ্ডো।
তাকে কাবু করার পর যেখানে একটু আগে সে এক প্রহরীকে খঞ্জর মেরে হত্যা করেছে মশাল নিয়ে সেখানে গেল প্রহরীরা। মশালের আলােয় তারা দেখতে পেলাে, এ লােক তাদের কোন প্রহরী নয়, বরং সে তারই সঙ্গী ছিল। এ মৃত যুবক ছিল সাদা দাড়িবেশী বৃদ্ধের খাদেম। অন্ধকারে ওরা পরষ্পরকে চিনতে পারেনি, এখানকার প্রহরী মনে করে অন্ধকারে নিজের একমাত্র সাথীকেই হত্যা করেছে এ যুবক।
লাশের ময়না তদন্ত নেয়া হলাে। তার কাপড়ের মধ্যেও পাওয়া গেল খঞ্জর। তাদের উটের ওপর যেসব মালামাল ছিল, এবার তা খুলে দেখলাে প্রহরীরা। কিন্তু তাতে তেমন কিছু ছিল না, শুধু বস্তাতে কিছু ঘাস ও খড় বােঝাই করা ছিল। | গােয়েন্দা যুবককে এক সহ-সেনাপতির তাঁবুতে নিয়ে যাওয়া হলাে। সহ-সেনাপতি তার কাছে অনেক কিছু জানতে চাইলাে। কিন্তু সে কোন প্রশ্নেরই জবাব দিল না। সে এমন নীরবতা পালন করলাে, যা সহ্য করা সত্যি কঠিন। কিন্তু সহসেনাপতিকে তাতেও বিরক্ত মনে হলাে না।
প্রহরীরা সেনাপতির কাছে তার মুখের নকল সাদা দাড়ি হাজির করলাে। সহ-সেনাপতি এ সম্পর্কে প্রশ্ন করেও কোন জবাব পেলাে না তার কাছ থেকে। কিন্তু এটা এমন এক প্রমাণ, যার সত্যতা অস্বীকার করার উপায় নেই।
তাকে বলা হলাে, তাহলে তুমি স্বীকার করছাে, তুমি এবং তােমার সাথী সুলতান আইয়ুবীর গােয়েন্দা!'
এ প্রশ্নেরও কোন জবাব দিল না ধৃত যুবক । সহ-সেনাপতি বললাে, ঠিক আছে, ওকে শাস্তি সেলে নিয়ে যাও। সে তার পরিচয় না দিলে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তার পরিচয় দেবে।'
তাকে শাস্তি সেলে ঢুকানাে হলাে। নানা রকম শাস্তি দেয়া হলাে, অসহ্য মারপিট করা হলাে, কিন্তু সে কিছুতেই স্বীকার করলাে না, সে আইয়ুবীর গােয়েন্দা।
রাত কেটে গেল। সকাল বেলা তাকে উপস্থিত করা হলাে মুজাফফরুদ্দিনের সামনে। রাতে যা ঘটেছে সে সম্পর্কে অবহিত করা হলাে তাকে। তার নকল দাড়ি ও উটের বােঝা সেনাপতি মুজাফফরুদ্দিনের সামনে হাজির করা হলাে।
তুমি আলী বিন সুফিয়ানের শাগরেদ নাকি হাসান বিন আব্দুল্লাহর?’ মুজাফফরুদ্দিন তাকে জিজ্ঞেস করলাে।
আমি এ দুজনের কাউকে চিনি না। উত্তর দিল যুবক।
আমি এ দুজনকেই ভাল মত চিনি।' মুজাফফরুদ্দিন বললাে, আমি নিজেও সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর শাগরেদ ছিলাম। ওস্তাদ তার শাগরেদকে কখনও ধোকা দিতে পারে।
আপনার সাথে যেমন আমার কোন সম্পর্ক নেই তেমনি সুলতান আইয়ুবীর সাথেও আমার কোন সম্পর্ক নেই। বললাে বন্দী।
‘শােননা, হে হতভাগা বন্ধু ! মুজাফফরুদ্দিন তার কাঁধে হাত রেখে বললো, আমি তােমার সাথে কোন ঝগড়া করবাে না। আমি তােমাকে অযােগ্য এবং অকম্মাও বলবাে না। তুমি তােমার দায়িত্ব সুন্দরভাবেই পালন করেছে। ধরা পড়া কোন দোষের ব্যাপার নয়, সেটা দুর্ভাগ্য। তােমার দুর্ভাগ্যের পরিমাণটা একটু বেশী, নইলে তােমার সাথী তােমারই হাতে খুন হতাে না। তুমি আমাকে অনুগ্রহ করে বলে দাও, তােমার কোন সঙ্গী এখান থেকে সংবাদ নিয়ে সুলতান আইয়ুবীর কাছে পৌছেছে কিনা, আমরা যে, এখানে আছি এবং কতজন আছি সে খবর সুলতান জানেন কিনা? আর এ কথাও বলাে, তােমাদের সৈন্যরা যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও এখানে বসে আছে কেন? সেখানে কি তৎপরতা ও প্রস্তুতি চলছে? মাত্র এই প্রশ্ন কয়টির উত্তর দাও, আমি তােমার সাথে কোরআন ছুঁয়ে শপথ করছি, যুদ্ধ শেষ হওয়ার সাথে সাথে তােমাকে মুক্ত করে দেয়া হবে। এখন তােমাকে এখানে সসম্মানে রাখা হবে।
আপনার অঙ্গীকার ও কসমের ওপর আমার কোন বিশ্বাস নেই।' সে বললাে, কারণ আপনি কোরআন থেকে মুখ, ফিরিয়ে নিয়েছেন। | মুজাফফরুদ্দিন ধৈর্য ধারণ করে বললাে, তুমি বলতে চাচ্ছাে, আমি মুসলমান নই?
হ্যা, আপনি অবশ্যই মুসলমান!' বন্দী কমান্ডো বললাে, কিন্তু আপনি কোরআনের অনুগত নন, ক্রুশের অনুগত!
‘আমি তােমার অভিযােগ এই শর্তে মেনে নিতে পারি যে, তুমি আমার প্রশ্নের উত্তর দিবে ।' মুজাফফরুদ্দিন বললাে, তােমার জীবন মৃত্যু এখন আমার হাতে।
না, জীবন মৃত্যুর মালিক আপনি নন, আল্লাহর ইচ্ছে না থাকলে আপনি আমার জীবন কেড়ে নিতে পারবেন না।'
কমান্ডো এবার মুজাফফরুদ্দিনের অভিযোেগ মেনে নিয়ে বললাে, আপনি আমাদের সেনাবাহিনীতে ছিলেন, আপনার ভাল মতই জানা আছে, আমাদের সব সৈনিক তার জীবন আল্লাহর হাতে সঁপে দেয়। আমি আপনাকে বলে দিতে চাই, আমি যেমন আইয়ুবীর বাহিনীর এক সামান্য গােয়েন্দা, আমার সঙ্গীও তাই। আমি আর আপনার কোন প্রশ্নের উত্তর দেবাে না। আমি এখনাে বেঁচে আছি, অতএব তােমরা ইচ্ছা করলে এখন আমার গায়ের চামড়া খুলে নিতে পারাে, কিন্তু আমার মুখ থেকে তােমাদের কোন প্রশ্নের উত্তর কখনও শুনতে পারবে না। আমি তােমাকে এ কথাও বলে দিতে চাই, পরাজয় আল্লাহ তােমার ভাগ্যেই লিখে রেখেছেন, আমাদের নয়।'
‘এর পায়ের গিরাতে শক্ত করে রশি বাঁধাে, আর উল্টো করে গাছের ডালে লটকিয়ে দাও।' মুজাফফরুদ্দিন একটি গাছ দেখিয়ে এ হুকুমনামা জারী করে দ্রুত তার তাঁবুতে চলে গেলাে।
ওদের দু'জনের একজনও এখন পর্যন্ত ফিরলাে না!' হাসান বিন আব্দুল্লাহ সুলতান আইয়ুবীকে বললাে, তাদের ধরা পড়ার তাে কোন ভয় ছিল না। আমাদের গােয়েন্দাদের ধরার মত লােক এখানে আর কে আছে? তাছাড়া তাদের তাে বেশী দূরে যাওয়ারও কথা নয়, তবে দেরী হচ্ছে কেন?
তারা গ্রেফতারওতাে হয়ে যেতে পারে। সুলতান , আইয়ুবী বললেন, তারা সেই সকালে গিয়েছে, এখন সন্ধ্যা।
কিন্তু এখনও তাদের ফেরার নাম নেই, মনে হয় তারা ধরাই পড়েছে। তাদের এখন পর্যন্ত না আসাই প্রমাণ করে, আশেপাশে শক্র আছে। আজ রাতে আরও কয়েকজনকে পাঠিয়ে দাও। তারা আরাে কয়েক মাইল পর্যন্ত দেখে আসুক।
সুলতান আইয়ুবী গােয়েন্দাদের নিয়ে কথা বলছিলেন হাসান বিন আব্দুল্লাহর সাথে। যে দুই গােয়েন্দাকে সকালে পাঠিয়েছিলেন আশপাশের এলাকা পরিদর্শন করতে, তাদের না ফিরার কারণে পেরেশান ছিলেন দু'জনই। নিজের গােয়েন্দা সংস্থার ওপর সব সময় ভরসা ছিল সুলতান আইয়ুবীর। এই গােয়েন্দাদের দিয়েই তিনি শত্রুদের নাকানি-চুবানি খাওয়াচ্ছেন। কিন্তু আজ দুই গােয়েন্দার ফিরে না আসার একটিই কারণ হতে পারে, তারা ধরা পড়েছে। কিন্তু আইয়ুবীর গােয়েন্দাদের ধরে এমন সাধ্য কার? সুলতান ভেবে দেখলেন, একমাত্র মুজাফফরুদ্দিনই তা পারে। কারণ মুজাফফরুদ্দিন তাঁরই শাগরেদ, তার সমর কৌশল সম্পর্কেও মুজাফফরুদ্দিন জ্ঞাত।
গত রাতে সুলতান আইয়ুবীর এক গােয়েন্দার লাশ তুর্কমানের কিছু দূরে এক নির্জন প্রান্তরে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। তার বুকে বিদ্ধ ছিল বিষাক্ত তীর।
মুজাফফরুদ্দিন তার সহ-সেনাপতিদের বলেছিলাে, যদি তােমরা সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর গােয়েন্দাদের বিরুদ্ধে কঠিন পদক্ষেপ নিতে পারাে, তবে তিনি অন্ধ ও বােবা হয়ে যাবেন। কেবল তখনই তােমরা তাকে পরাজিত করার চিন্তা করতে পারাে।সুলতান আইয়ুবী এই দুটি ঘটনাকে তুচ্ছ মনে করলেন । তার আদেশে হাসান বিন আব্দুল্লাহর ছয়জন কমাণ্ডো সেনা রাতের আঁধারেই নিখোঁজ গােয়েন্দাদের সন্ধানে যাত্রা করলাে।
সুবহে সাদেকের পর মসজিদে ফজরের আজান ধ্বনিত হলাে। আল্লাহু আকবার' ধ্বনিতে ঘুম ভাঙ্গলাে সুলতান আইয়ুবীর। তিনি তাঁবুর বাইরে গেলেন। খাদেম মশাল জ্বালিয়ে তার তাবুর সামনে রেখে দিল।
এ সময় একদিক থেকে ছুটে এলাে এক অশ্বারােহী। থামলাে এসে সুলতান আইয়ুবীর সামনে। দ্রুত অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নেমে সালাম দিল সুলতানকে। তারপর সময় ক্ষেপন না করে বলতে লাগলাে, সুলতান, আপনার ভাগ্য সুপ্রসন্ন হােক! মনে হয় আপনার ডান বাহিনীর অদূরে দুশমন সৈন্য সমাবেশ করছে। অন্ধকারে ওদের দেখা না গেলেও তাদের আনাগােনার আওয়াজ স্পষ্ট শােনা যাচ্ছে। প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য দু’জনকে পাঠিয়েছি, তারা সঠিক খবর নিয়ে এখুনি আপনার সামনে হাজির হবে।'
অশ্বারােহীর কথা শেষ হলাে না, দূর থেকে শােনা গেল অশ্বখুরধ্বনি; সুলতান এবং অশ্বারােহী উভয়েই কথা বন্ধ করে সেদিকে তাকালাে। নতুন এক অশ্বারােহী ছুটে এসে ঘােড়া থামালো সুলতানের সামনে। সে ঘােড়া থেকে নামার আগেই সুলতান প্রশ্ন করলেন, কি খবর নিয়ে এসেছাে?
খবর সঠিক, দুশমন সৈন্য এগিয়ে আসছে আপনার ডান পাশের বাহিনীর দিকে।
সুলতান আইয়ুবী কেন্দ্রীয় কমাণ্ড কাউন্সিলের সেনাপতিদের নাম উল্লেখ করে বললেন, ‘এদেরকে জলদি খবর দাও।'
সুলতান তাদেরকে খবরের জন্য পাঠিয়ে সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে বসে পড়লেন এবং তায়াম্মুম করে নিলেন। কারণ তার কাছে ওজু করার মত সময় ছিল না। তায়াম্মুম শেষে সেখানেই তিনি কেবলামুখী হয়ে নামাজ পড়ে নিলেন। নামাজ শেষে সংক্ষিপ্ত মােনাজাত করে তিনি তার ঘােড়া আনতে বললেন।
‘এ মুজাফফরুদ্দিন ছাড়া আর কেউ হতে পারে না।' সুলতান আইয়ুবী তার সেনাপতিদের বললেন, ‘এ সৈন্য দল খৃস্টানদের নয়। তাদের আক্রমণের সময় এখন নয়। যদি এ সংবাদ সত্যি হয় যে, শত্রু সৈন্য আমাদের ডান দিক থেকে আসছে এবং আমাদের ডান বাহিনীকেই ওরা প্রথম টার্গেট বানাতে চায়, তবে মনে রেখাে, ওরা দুই তরফা আক্রমণ চালাবে। তােমরা কোন দলকেই পিছনে হটতে দিবে না। তােমাদের পিছনে দেড় হাজার কবরের গর্ত রয়েছে। সব লাশ এখনও দাফন করা সম্ভব হয়নি। যুদ্ধ শুরু হলে তােমরা আস্তে আস্তে পিছু হটবে, পিছনের সৈন্যদের সুযােগ দেবে কবর পেরিয়ে ওপাশে চলে যাওয়ার। এরপর তাদের সহায়তায় তােমরাও পার হয়ে আসবে কবরের সীমানা। পুরনাে সৈন্য নয়, এই গর্তগুলাে আমি ভরে তুলতে চাই এই নবাগত সৈন্যদের লাশ দিয়ে। সেই লাশ আমি কষ্ট করে কবরে নামাতে চাই না, আমি চাই ওরা পায়ে হেঁটে সেই কবরে নেমে যাক।
সুলতান আইয়ুবী ঘােড়ায় আরােহণ করলেন, তার রক্ষীবাহিনীর বারাে জন রক্ষী চললাে তার পিছনে। তারাও অশ্বারােহী। রক্ষী ছাড়া তিনি ছয়জন কাসেদও সঙ্গে নিলেন সংবাদ সরবাহের জন্য। আর নিলেন দু’জন সেনাপতি।
তিনি দ্রুত ঘােড়া ছুটালেন এবং পাহাড়ের এমন এক উঁচু স্থানে গিয়ে দাঁড়ালেন, যেখান থেকে তার ডানের বাহিনীর এলাকা ও সৈন্যদের দেখা যায়।
রাতের আঁধার কেটে ভােরের আলাে ফুটছিল একটু একটু করে। তিনি উপত্যকা থেকে নিচে নামলেন এবং ডান পাশের সৈন্যদের কমাণ্ডারকে ডেকে বললেন, অশ্বারােহী সৈন্যদের ঘােড়ায় আরােহণ করতে বলো। পদাতিক বাহিনীকে বলল অতিসত্ত্বর সামনের ময়দানে পজিশন নিতে আর তীরন্দাজ বাহিনীকে পরিখা, নিম্নভূমি ও উপরের নিরাপদ স্থানে তীর-ধনুক নিয়ে অবস্থান নিতে বলাে। সবাইকে বলাে, তারা যেন তাড়াতাড়ি যুদ্ধের পজিশন নিয়ে বসে থাকে।
কমাণ্ডররা নিজ নিজ সৈন্যদের পজিশনে বসিয়ে দিল।
সুলতান বললেন, এখন থেকে ডান পাশের বাহিনীকে আমি নিজে উপস্থিত থেকে কমাণ্ড করবাে। তিনি সেই বাহিনীর সেনাপতি ও কমাণ্ডারদের বললেন, তােমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ কাসেদ পাশে রাখাে, তাদের মাধ্যমে প্রতি মুহূর্তে আমার সাথে যােগাযােগ ঠিক রাখবে এবং প্রতিটি নির্দেশ বিচক্ষণতা ও দ্রুততার সাথে পালন করবে।
সুলতান আইয়ুবীর বাহিনীর গতি এমনিতেই ছিল দ্রুত ও বেগবান, আইয়ুবীর এ নির্দেশ পাওয়ার পর তাদের গতি যেন বিজলীর মত দ্রুতগতি হয়ে উঠলাে। সুলতানের যে কোন নির্দেশ পালনের জন্য সৈন্যরা অধীর হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাে। সুলতানের প্রতিটি চাল বা কৌশল মুহূর্তে সারা ময়দানে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য সীনা টান করে অপেক্ষা করতে লাগলাে কাসেদ বাহিনী। বিজলীর মতই দ্রুত গতিতে সুলতানের আদেশ তারা পৌঁছে দিতে লাগলাে সৈনিকদের কানে কানে।
মুজাফফরুদ্দিনের সৈন্যবাহিনী তখনও নিকটবর্তী হয়নি, সুলতান আইয়ুবী তার বাহিনীকে তৎপর করে তুললেন।
ময়দানে নেমে এলাে মুজাফফরুদ্দিনের সেনাবাহিনী। প্রথমে অশ্বারােহী বাহিনী নিয়ে আক্রমণ চালানাের সিদ্ধান্ত নিলাে মুজাফফরুদ্দিন। যেইমাত্র তার প্রথম অশ্বারােহী দল সুলতান আইয়ুবীর সৈন্যদলের সামনে এলাে, অমনি শুরু হলাে তীর বৃষ্টি। মুহূর্তে তার সব প্ল্যান প্রােগ্রাম যেন উলট-পালট হয়ে গেল। কারণ এখানে অসংখ্য মাটির ঢিবি ও গর্ত ছিল। সেই সব গর্ত থেকে সুলতান আইয়ুবীর তীরন্দাজেরা অবিরাম তীর বর্ষণ করে চললাে। তারা দ্রুতগামী ঘােড়া এবং তার আরােহী উভয়কেই তীর মেরে ঘায়েল করতে লাগলাে। ধরাশায়ী হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে লাগলাে মুজাফফরুদ্দিনের অশ্বারােহী সৈন্যরা।
যে সব ঘােড়া তীরের আঘাতে আহত হলাে, সে সব ঘােড়া পাগলের মত এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করতে লাগলাে। এমন ঘটনা তাে প্রত্যেক যুদ্ধ ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে, মুজাফফরুদ্দিনের জন্য এই অবস্থা বিস্ময়ের কিছু ছিল না। কিন্তু তার অশান্তির কারণ হলাে, তার আশার বিপরীত সুলতান আইয়ুবীর ডানের সেনাদল সজাগ ছিল ও মােকাবেলার জন্য প্রস্তুত ছিল।
এই প্রচণ্ড আক্রমণে সুলতান আইয়ুবীর অসংখ্য তীরন্দাজও হতাহত হয়। এই কোরবানী বিফলে যায়নি, মুজাফফরুদ্দিনের আক্রমণের প্রচণ্ডতা তীরন্দাজদের এই তীর খেয়েই শেষ হয়ে যায়। এরপর আসে সুলতান আইয়ুবীর সেই বিশেষ আক্রমণের পালা, যার কথা মনে হলেই দুশমন সৈন্যদের পানির পিপাসা পেয়ে যায়।
মুজাফফরুদ্দিন এই আশা নিয়ে যুদ্ধে এসেছিলাে যে, সে সুলতানের বাহিনীর সম্পূর্ণ অজ্ঞাতে অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়বে তাদের ওপর, যেমনটি তার ওস্তাদ সুলতান আইয়ুবী করে থাকেন। তার সে আশা-ভরসা তীরন্দাজদের আঘাতেই শেষ হয়ে গিয়েছিল । | এখন সুলতান আইয়ুবী তার আপন চাল অনুযায়ী যুদ্ধ করার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তার যেসব তীরন্দাজ সৈন্য মুজাফফরুদ্দিনের অশ্বারােহী বাহিনীর পদতলে জীবন উৎসর্গ করেছিল, তার সুফল এখন সুলতান আইয়ুবীর হাতে।
মুজাফফরুদ্দিনের অশ্বারােহী বাহিনীর কিছু সৈন্য
(চলবে)
3 coment rios:
Nice
লোকেরা এটাও সার্চ করেছে
Love story generator
Love story image
রোমান্টিক লাভ স্টোরি গল্প
Romantic love story
সুন্দর লাভ স্টোরি
রিয়েল লাভ স্টোরি
লোকেরা এটাও সার্চ করেছে
Love story generator
Love story image
রোমান্টিক লাভ স্টোরি গল্প
Romantic love story
সুন্দর লাভ স্টোরি
রিয়েল লাভ স্টোরিসার্চ করেছে
Short love story
লাভ স্টোরি বাংলা
লাভ স্টোরি ভিডিও
লাভ স্টোরি গান
স্কুল লাভ স্টোরি গান
Love Story song Original
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন