১৭. গাদ্দার(পর্ব-6)
সুলতান আইয়ুবী এবার বামের অশ্বারােহী দলের দিকে ঘােড়ার মুখ ঘুরালেন এবং তীরবেগে ঘােড়া ছুটলেন তাদের দিকে। সাথে সাথে ডানের বাহিনী তীর বেগে সরে দাঁড়ালাে ময়দান থেকে। আক্রমণকারী শত্রুদের সামনে থেকে মুহূর্তে সব বাঁধা অপসারিত হয়ে গেল।
শত্রু সেনারা যখন ময়দান ছেড়ে দেয়ার কথা ভাবছিল, সে সময় ময়দান এমন উন্মুক্ত দেখে আবার দুঃসাহসী হয়ে উঠলাে এবং আগ-পিছ না ভেবে মুজাফফরুদ্দিনের অবশিষ্ট সৈন্য সামনে এগিয়ে এলাে। সুলতান আইয়ুবী এটাই চাচ্ছিলেন, তিনি ডান ও বামের সৈন্য বাহিনীর মাঝখানের ফাঁক দূর করে তাদের একত্রিত করে দিলেন। এই দুই বাহিনী একত্রিত হয়ে তাদেরকে তিন পাশ থেকে ঘিরে ধরলাে।
মুজাফফরুদ্দিনের বাহিনী সামনে এগিয়ে গেল। তাদের পেছনে আইয়ুবীর ডান-বামের বাহিনী একত্রিত হয়ে ক্রমশ তাদের ঘেরাও সংকুচিত করে আনছিল । মুজাফফরুদ্দিনের তিন দিক ঘিরেছিল এই বাহিনী, সামনে আইয়ুবীর মূল ফৌজ।
আইয়ুবীর সম্মুখ বাহিনীর দিকে ছুটছিল মুজাফফরের বাহিনী, এ সময় তিন দিকের ঘেরাও সংকুচিত করে তাদের ওপর আঘাত হানলাে আইয়ুবীর ঘেরাওকারী বাহিনী।
তিন দিকের আক্রমণে শত্রু সেনারা চোখে সর্ষে ফুল দেখতে লাগলাে। তাদের ওপর আইয়ুবীর পার্শ্ব সেনাদের বর্শার একটি আঘাতও ব্যর্থ হলাে না।
আক্রমণকারী সৈন্যের নজর ছিল সামনের দিকে। সেদিকেই তারা ছুটে চলছিল তীব্র গতিতে, দু'পাশে নজর দেয়ার মত কোন সুযােগ ছিল না তাদের। কিন্তু এ আক্রমণ তাদের হতভম্ব করে দিল। তারা দেখলাে, সম্মুখ বাহিনীর একটি পাশ এখনাে ফাঁকা, চারদিক থেকে ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়ে যাওয়ার আগেই এ ফাঁক গলে বেরিয়ে যাওয়া ছাড়া কোন গত্যন্তর নেই তাদের। সেই ফাঁক গলে বেরিয়ে যাবার জন্য মুজাফফরুদ্দিনের বাহিনী এবার ছুটলাে সেদিকে। কিন্তু সে ফাঁকেই যে পড়ে আছে দেড় হাজার কবর, জানা ছিল না তাদের।
প্রচণ্ড বেগে ছুটছিল মুজাফফরুদ্দিনের অশ্বারােহী বাহিনী। মুহূর্তে গিয়ে পড়লাে সেই কবরের সামনে। মুখ হা-করা দেড় হাজার কবর দেখে থমকে দাঁড়াবার সুযােগও পেল না, হুমড়ি খেয়ে পড়লাে সে কবরের ওপর। যারা থমকে দাঁড়াবার চেষ্টা করলাে, তারা পিছন থেকে সুলতান আইয়ুবীর ধাওয়াকারী অশ্বারােহী বাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হলাে।
মুজাফফরুদ্দিনের আক্রমণকারী বাহিনী আইয়ুবীর বাহিনীর ধাওয়া খেয়ে কবরের ওপর দিয়েই ছুটতে আরম্ভ করলাে। কবর টপকে এগুতে গিয়ে তাদের অনেকেই পড়ে গেল কবরের ভেতর। সেখান থেকে তারা উঠে আসার আগেই তাতে পড়লাে আরাে সৈন্য। এভাবে নিজের সৈন্যদের চাপে পড়ে ইহলীলা সাঙ্গ হলাে অনেক সৈন্যের।
মুজাফফরুদ্দিন ভীত হওয়ার পাত্র ছিলাে না। সুলতান আইয়ুবীর বাহিনীতে থাকতেও অল্প সৈন্য নিয়ে যুদ্ধ করার অভিজ্ঞতা তার ছিল। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মুজাফফরুদ্দিন রুখে দাঁড়িয়ে তার অবশিষ্ট সৈন্য নিয়ে পাল্টা আঘাত হানলাে আইয়ুবীয় বাহিনীর ওপর। তারা তরঙ্গের মত ছুটে গেল আইয়ুবীর ঘেরাওকারী বাহিনীর দিকে। সঙ্গে সঙ্গে সুলতান আইয়ুবী তার অশ্বারােহীদের থামিয়ে দিলেন, ইশারা করলেন তাদেরকে ময়দান ছেড়ে দিতে। তারা তাই করলাে এবং মুজাফফরুদ্দিনের বাহিনীকে ময়দানে রেখে দ্রুত সরে গেল সুবিধাজনক পাশে। এই ফাঁকে আবার তাদের ওপর শুরু হলাে তীর বর্ষণ।
তারা নিজেদের সামাল দেয়ার সুযােগও পেল না। তীরের আঘাতে একে একে লুটিয়ে পড়তে লাগলাে ময়দানে।
অবস্থা বেগতিক দেখে মুজাফফরুদ্দিনও ময়দান ছেড়ে পাশে দণ্ডায়মান অশ্বারােহী বাহিনীর ওপর টুটে পড়লাে। যুদ্ধ চলে গেল হাতাহাতির পর্যায়ে। সুলতান আইয়ুবীর তীরন্দাজ বাহিনীর তীর বর্ষণ বন্ধ হয়ে গেল। কারণ ময়দানে উভয় বাহিনীর যােদ্ধারা একাকার হয়ে পড়েছিল। উভয় বাহিনীর এ মারমুখী লড়াইয়ের কারণে যুদ্ধের অবস্থা বড় করুণ হয়ে উঠলাে । সুলতান আইয়ুবী কাসেদ মারফত রিজার্ভ বাহিনীকে ময়দানে তলব করলেন। সাথে সাথে সংরক্ষিত রিজার্ভ বাহিনীও ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়লাে।
মুজাফফরুদ্দিনের সমস্য হলাে, সে কোন সাহায্য পাচ্ছিল না। তারপরও বীরের মত লড়ে যাচ্ছিল মুজাফফরুদ্দিন ও তার বাহিনী। বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়লাে যুদ্ধ। সন্ধ্যা পর্যন্ত চললাে এ মরণপণ লড়াই। সুলতান আইয়ুবী কাসেদ মারফত যােগাযােগ রক্ষা করছিলেন। নিজেও ছুটাছুটি করে যুদ্ধের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন।
সন্ধ্যা। সুলতান আইয়ুবীর রিজার্ভ বাহিনীর প্রবল আক্রমণের ফলে মুজাফফরুদ্দিনের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেল। অবস্থা এতটাই নাজুক হয়ে দাঁড়ালাে যে, ময়দান থেকে বের হওয়ারও কোন পথ খুঁজে পেল না সে। | সন্ধ্যা পর্যন্ত দুই বাহিনীর রক্তাক্ত সমর চললাে। যুদ্ধের কমাণ্ড সুলতান আইয়ুবীর হাতে ছিল বলেই বাচা নতুবা অবস্থার বিপর্যয় ঘটে যেতে পারতাে। মুজাফফরুদ্দিন তার চুড়ান্ত যােগ্যতা প্রদর্শন করে উস্তাদের সাথে যুদ্ধ করলাে। সুলতান আইয়ুবীর শিখানাে যুদ্ধের সকল কলা-কৌশল প্রদর্শন করে লড়াই করলাে সে, কিন্তু পরাজয় রােধ করতে পারলাে না শুধুমাত্র বাইরে থেকে কোন সাহায্য না পাওয়ায়।
বাজীতে হেরে গেলাে মুজাফফরুদ্দিন। এ যুদ্ধেও সুলতান আইয়ুবী অনেক যুদ্ধবন্দী আটক করলেন । মুজাফফরুদ্দিনের এক উপদেষ্টা ফখরুদ্দিন, তাকেও যুদ্ধবন্দী হিসাবে হাজির করা হলাে সুলতানের সামনে। এই ফখরুদ্দিন যেনতেন লােক ছিলেন না। তিনি ছিলেন সাইফুদ্দিনের প্রধানমন্ত্রী ।
তুর্কমানের যুদ্ধে যখন সাইফুদ্দিন পলায়ন করে, তখন ফখরুদ্দিন মুজাফফরুদ্দিনের কাছে চলে যায় ও তাকে যুদ্ধের জন্য উৎসাহিত করতে থাকে। সুলতান আইয়ুবীর ওপর এ আক্রমণ চালানাের অন্যতম উস্কানিদাতা ছিল এই ফখরুদ্দিন।
এই যুদ্ধ ১১৭৬ সালের এপ্রিল মাস, মুতাবেক হিজরী ৫৭১ সালের সওয়াল মাসে অনুষ্ঠিত হয়। এই যুদ্ধে মুজাফফরুদ্দিনের চরম পরাজয় ঘটেছিল। সুলতান আইয়ুবী বলতে গেলে এ যুদ্ধেই নামধারী মুসলিম শত্রুদের কোমর ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। '
কিন্তু এই যুদ্ধে সুলতান আইয়ুবীরও এত বেশী ক্ষতি হয়েছিল যে, যুদ্ধপরবর্তী দুই মাস তিনি তুর্কন সমরাঙ্গণ থেকে বের হতে পারেননি। তার দক্ষিণ বাহিনী শেষ হয়ে গিয়েছিল। তাতে তার নিজের দক্ষিণ হস্তই যেন ভেঙ্গে গিয়েছিল। এই ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য তিনি নতুন সৈন্য ভর্তি শুরু করলেন।
সাথে সাথে তিনি মিশর ও দামেস্কে কাসেদ পাঠালেন সামরিক সাহায্য চেয়ে । যদি তার এত বেশী ক্ষতি না হতাে, তবে তিনি বিলম্ব না করে হলব, মুশেল ও হারানের ওপর আক্রমণ চালাতেন। আর তিনি যদি তেমন আক্রমণ চালাতে পারতেন তবে ফিলিস্তিনের পথে অগ্রাভিযানে যেসব মুসলমান বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, অচিরেই তিনি তাদের সঠিক পথে আনতে পারতেন অথবা তাদের সব সামরিক শক্তি নিঃশেষ করে দিতে পারতেন।
‘এই বিজয় আমার বিজয় নয়!' যুদ্ধ অবসানের পর সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী তার সেনাপতিদের বলছিলেন, ‘এই বিজয় আসলে খৃস্টানদের বিজয়! তারা আমাদের দুর্বল করতে চায়, তাদের সে উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। তারা আমার অগ্রাভিযানের গতি দুর্বল করে ফিলিস্তিনের উপরে তাদের আধিপত্য দীর্ঘস্থায়ী করতে চায়, তাদের এ উদ্দেশ্যও সফল হয়েছে এ যুদ্ধে। আমি সেই দিনের অপেক্ষায় আছি, যেদিন আমাদের মুসলমান ভাইয়েরা বুঝবে, কাফেররা কোনদিন মুসলমানের বন্ধু হতে পারে না। যখন তারা মুসলমানের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয়, তখন বুঝতে হবে, এই বন্ধুত্বের মধ্যেও লুকিয়ে আছে শত্রুতা ও ষড়যন্ত্র। আমি বলতে পারি না, ইতিহাস লেখার সময় ঐতিহাসিকরা আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য কি লিখবেন। তারা যদি লেখেন, মুসলমানরা নিজেদের মধ্যে লড়াই করেই শেষ হয়ে গেছে তাহলে তা খণ্ডনের কোন ভাষা নেই আমাদের।'
সুলতান আইয়ুবী যখন তার মুসলমান ভাইদের জন্য এই দরদ ও আবেগ প্রকাশ করছিলেন, সে সময় তার অজ্ঞাতে তার সেই সব মুসলমান ভাইয়েরা ষড়যন্ত্রের নতুন এক ছক তৈরী করছিল। যারা তুমানের অদূরে সংঘটিত সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পালিয়ে গিয়েছিল, তারা তাকে হত্যা করার নতুন পরিকল্পনা তৈরী করছিল। এই পরিকল্পনায় শামিল হয়েছিল গুমাস্তগীন ও গুপ্তহত্যাকারী দলের সরদার শেখ মান্নান।
সে সময় শেখ মান্নান আছিয়াত নামক এক কেল্লায় অবস্থান করছিলাে। তাকে এ কেল্লা উপহার দিয়েছিল খৃস্টানরা। শেখ মান্নান খৃস্টানদের কাছ থেকে এ কেল্লা উপহার পাওয়ার পর সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা তার গুপ্তঘাতক দলের সদস্যদের এনে জড়াে করে এ কেল্লায়। তারপর সেখানে চলতে থাকে তাদের নানা রকম প্রশিক্ষণ। এসব প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য ছিল একটাই, যে কোন ভাবে সুলতান আইয়ুবীকে হত্যা করা ।
আসিয়াত ও তুকমান অঞ্চলের মাঝামাঝি এক বিশাল মরুভূমি। মরুভূমি না বলে তাকে দুনিয়ার জাহান্নাম বলাই ভাল। সুলতান আইয়ুবীর চার কমাণ্ডে সৈন্য রাস্তা ভুলে চলে এসেছিল এই মরু-জাহান্নামে।
সূর্য দিগন্তের পাড়ে হেলে পড়েছিল। কমাণ্ডে নেতা আন নাসেরের ঘুম ভাঙলাে পড়ন্ত বেলায়। শুয়ে থেকেই চোখ খুললাে কমাণ্ডে নেতা। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে গেল তার দুঃসহ সফরের কথা। দ্রুত সে উঠে বসলাে এবং চারদিকে তাকালাে। দেখলাে, মেয়ে দু’জন তখনাে তেমনি বসে আছে। আন নাসেরের মনে পুরােনাে ভয় আবার জেগে উঠলাে।
মেয়েদের একজন বললাে, ঘুম কেমন হলাে? ভালাে । ‘এখন কি ক্লান্তি কিছুটা কমেছে। হ্যা, এখন আমি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও সুস্থ। সফর করতে তেমন কষ্ট হবে না আর।
মেয়েরা তার সাথে এমন অন্তরঙ্গভাবে কথা বলছিলাে, আন নাসের অনুভব করলাে, মেয়েরা তাদের সাথে কোন দুর্ব্যবহার করবে না। তবুও আন নাসেরের ভয় গেল না। কারণ তখনও সে তাদেরকে মানুষ নয়, জ্বীন ভাবছিল। এদের সাথে কথাবার্তা ও আচরণে তাই সে সাবধানতা অবলম্বন করছিল।
‘ওদেরকে জাগাও।' আন নাসেরের সঙ্গীদের দিকে ইশারা করে বললাে মেয়েদের একজন, 'আমাদেরকে বহু দূর যেতে হবে।
আমাদেরকে কি তােমাদের সঙ্গে নেবে, নাকি আমাদের ফেলে চলে যাবে তােমরা?' আন নাসের চিন্তান্বিত মনে প্রশ্ন করলাে।
‘তোমরা সবাই আমাদের সঙ্গে যাবে! মেয়েটি উত্তর দিল, আমাদের ছাড়া তােমরা সঠিক পথ খুঁজে পাবে না।'
আন নাসের সাথীদের জাগালাে। বড় মেয়েটি সঙ্গের মেয়েটিকে কিছু বললাে। সে উঠে দাঁড়ালে এবং ঘােড়র কাছে এগিয়ে গেল। সে ঘােড়ার সাথে বাঁধা থলি থেকে কিছু বের করলাে এবং পানির মশক খুলে নিচে নামিয়ে আনলাে। তারপর মশকের মুখ খুলে থলি থেকে বের করা জিনিস তাতে ঢেলে দিল। এবার সে মশক ভাল করে কঁকিয়ে কমাণ্ডোদের কাছে নিয়ে এলাে। মশকটি আন নাসেরর হাতে ধরিয়ে দিতে দিতে বললাে, সঙ্গীদের নিয়ে পানিটুকু পান করে নাও। কারণ সফরের সময় আর পানি পারে না।'
বড় মেয়েটা তাদের কিছু শুকনাে খাবার দিল । আন নাসের ও তার সাথীরা সেই খাবার খেয়ে সবাই পানি পান করে নিল।
ওরা যখন খাওয়া দাওয়া সারছিল, সেই ফাঁকে মেয়েরা তাদের ব্যাগ ও মশক গুছিয়ে নিয়ে ঘােড়ার জ্বীনের সাথে বাঁধলাে। | সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিলাে। মেয়েরা তাদের তাড়া দিল, কই, চলাে।'
ওরা চলতে শুরু করলাে। একটু পরেই নেমে এলাে রাতের আঁধার। আকাশে জ্বলে উঠলাে লাখাে-কোটি তারার আলাে। একটু পর চাঁদও উঠলাে। মরুভূমিতে এমনিতেই আঁধার গাঢ় হয় না, এই তারার আলাে ও চাঁদের জোসনা অন্ধকার একেবারেই ফিকে হয়ে উঠলাে। কোমল জোসনা ছড়িয়ে পড়লাে দিগন্ত বিস্তৃত চরাচরে।।
ওরা হাঁটছিল স্বাভাবিক গতিতে। বড় মেয়েটি তার ঘােড়া আন নাসেরের কাছাকাছি নিয়ে বললাে, তােমরা তাে এই স্থানকেই জাহান্নাম বলছিলে?'
না, না, কি বলছো তুমি! আন নাসের উৎফুল্ল কণ্ঠে বললাে, এখানে তাে দেখছি চারদিকে সবুজ মাঠ। অবারিত ঘাসের সমাহার । শান্ত শীতল সমীরণ। চাঁদের মায়াবী জোসনা। এ তাে জাহান্নাম নয়, জান্নাতের বাগান! তুমি কেমন করে এত শীঘ্রই এমন মনােরম জায়গায় নিয়ে এলে আমাদের?
তার তিন সঙ্গীও অবাক বিস্ময়ে তাকাচ্ছিল এদিক-ওদিক।
‘তােমরাও কি সবাই এ সবুজ মাঠ দেখতে পাচ্ছাে? কমাণ্ডোদের দিকে তাকিয়ে মেয়েটি প্রশ্ন করলাে ।
হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমরা তাে আদিগন্ত সবুজ মাঠের ওপর দিয়ে অনেক আগে থেকেই পথ চলছি। একজন বললাে। বাকীরাও উৎফুল্ল কণ্ঠে সায় জানালাে এ কথায়।
‘তােমরা তাে আমাদের প্রাণ নিয়ে নিবে না? এ কি সত্যি, নাকি ধোঁকা? নাকি আমাদের হত্যা করার আগে অলীক মায়ার রাজ্যে নিয়ে এসেছো আমাদের? অপরজন বললাে, ‘তােমরা জ্বীন জাতির মেয়ে, তােমাদের পক্ষে তাে সবই করা সম্ভব!'
না! মেয়েটি হেসে বললাে, আমরা তােমাদেরকে এর চেয়ে অধিক সুন্দর জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি।
বড় মেয়েটি আন নাসেরকে বললাে, “এসাে এখানে কিছুক্ষণ বসি।।
ওরা থেমে গেল এবং মখমলের মত কোমল ঘাসের ওপর বসে পড়লাে সবাই। বড় মেয়েটি আন নাসের ও তার এক সাথীকে বললাে, 'তােমরা আমার চোখের দিকে তাকাও।'
অন্য মেয়েটিও আন নাসেরের দুই সাথীকে সামনাসামনি বসিয়ে তাদেরকে বললাে, 'তােমরাও আমার চোখের দিকে তাকাও।
চারজন কমান্ডো সৈন্য অনুগত ভৃত্যের মত সে হুকুম তামিল করলাে। তারা পাশাপাশি বসে তাকালাে দুই মেয়ের চোখে.। মেয়েরা তখন সুমিষ্ট সুরে ওদের বলছিল, এই তােমাদের বেহেশত! এখানকার ফুলের সৌন্দর্য দেখাে, এগুলাের ঘ্রাণ নাও। দেখাে, কি সুন্দর ছােট ছােট পাখিরা উড়ছে এ ফুলের বাগানে। তাদের কিচির মিচির আওয়াজ কতই না সুন্দর! এ সবই তােমাদের পুরস্কার। তােমাদের পদতলে মখমলের মত নরম কোমল ঘাস। তাকিয়ে দেখাে, পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ঝরনাধারা! কি স্বচ্ছ সেই পানি, পান করে দেখাে, এ পানি কত সুমিষ্ট! এসবই তােমাদের জন্য। তােমাদের মহৎ কর্ম ও চিন্তার বিনিময়ে আল্লাহ এ সব পাঠিয়েছেন তােমাদের জন্য।'
মেয়েদের সেই সুরেলা কণ্ঠের যাদু চার জনের জ্ঞান ও বুদ্ধির ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করছিল। তারা ভাবছিল, সত্যি তারা বেহেশতে চলে এসেছে। এরা মানুষও নয়, জ্বীনও নয়, এরা সেই বেহেশতের হুর, যাদের কথা আল্লাহ কোরআনে বার বার উল্লেখ করেছেন।
আন নাসের পরে হাসান বিন আব্দুল্লাহকে যে রিপাের্ট দিয়েছিল তাতে সে বলছিল, মেয়েদের চোখে তাকিয়ে আমি সামনে পানির স্বচ্ছ ঝর্ণা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম। রঙবেরঙের ফুলে ভরা বাগান দেখতে পাচ্ছিলাম। সবুজ পাতার ফাঁকে আকর্ষণীয় ফুলের গুচ্ছ দেখে মনে হচ্ছিল অপূর্ব ও অনিন্দ্য সুন্দর এ বাগান। যে বাগানের সৌন্দর্য ও ফুলের সুষম বর্ণনা করার মত নয়।
মেয়েদের সােনালী কেশগুচ্ছ থেকে ছড়িয়ে পড়ছিল প্রাণ উতলা করা সুবাস। সেখানে আমি কোন বালি বা মাটির লম্বা টিলা দেখতে পাচ্ছিলাম না। সেখানে মরুভূমির কোন ছায়াও ছিল না। সবুজ-শ্যামল বাগান, বাগানের বাহারী ফুল আর নিচে মখমলের মত ঘাসের বিছানা দেখে সত্যি আমি অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম। রঙবেরঙেরে পাখি নাচানাচি ও কিচির-মিচির করছিল সেখানে। আমার মনে হচ্ছিল, সত্যি আমরা জান্নাতের বাগানে ঢুকে পড়েছি।
মেয়েরা আবার উঠলাে। চলতে শুরু করলাে কাফেলা। তারা চার জন মখমলের মত ঘাসের মধ্য দিয়ে চলতে লাগলাে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেখানে তখনাে বালির প্রান্তরই ছিল। কোথাও কোথাও ছিল মাটির কঠিন শিলা।
তারা চার জনই গান গাইতে গাইতে পথ চলছে। তারা যাচ্ছে পায়ে হেঁটে। মেয়েরা তাদের কয়েক গজ পিছনে ঘােড়র ওপর সওয়ার হয়ে যাচ্ছে। তাদের গতি তুকমানের দিকে ছিল না, যদিও কমাণ্ডেরা জানতাে, তারা সুলতান আইয়ুবীর তুর্কমান ক্যাম্পেই যাচ্ছে। মেয়েরা এই চার কমাণ্ডে যুবককে তাদের অজ্ঞাতে তাদের লক্ষ্যস্থল থেকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল আছিয়াতের কেল্লার দিকে। সেখানে ফেদাইনের গুপ্তঘাতক দলের সরদার শেখ মান্নান থাকে।
আন নাসের ও তার সাথীদের কিছুই জানা ছিল না, তারা কোথায় যাচ্ছে। তাদের অনুভূতি . ও বিবেক বুদ্ধি মরে গিয়েছিল। তারা যাচ্ছিল না, বরং বলা যায় তাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।
তাদের পিছনে মেয়ে দুটি পরস্পর কথা বলতে বলতে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের কথা, ঐ কমাণ্ডোদের কান পর্যন্ত পৌঁছতে পারছে না ।।
তুমি তাে বললে, রাতে আর কোথাও থামবে না। ছােট মেয়েটি বড়টিকে জিজ্ঞেস করলাে, এ চার জন কি পায়ে হেঁটে সারা রাত পথ চলতে পারবে?'
তুমি পানিতে যে পরিমাণ হাশিশ মিশিয়েছ, তার প্রভাব আগামীকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকবে। বড় মেয়েটি বললাে, আর আমি যা খাইয়েছি তাও তুমি দেখেছে। ওদের সম্পকে তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। আশা করি সকাল হতে হতেই আমরা আছিয়াত পৌছে যাবাে।'
‘আমি তাে তাদের দেখে ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলাম। ছােট মেয়েটি বললাে, এটা তােমারই কৃতিত্ব যে, তুমি তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে।
মুসলমানরা জ্বীন জাতিতে বিশ্বাস করে।
আর সে জ্বীনকে ওরা ভয়ও করে। তুমি তাদের মনে সে ভয় ভাল মতই ঢুকিয়ে দিয়েছো।
‘এটা শুধু বুদ্ধির খেলা।' বড় মেয়েটি বললাে, আমি তাদের মুখ ও চাল-চলন দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম, এরা সুলতান আইয়ুবীর সামরিক বিভাগের লােক। তারা ভুলে এদিকে এসে পড়ে। আমি তাদের দেখে আরও বুঝেছি, ওরা চারজনই আমাদের দেখে ভয় পেয়েছে। ভেবেছে, আমরা জ্বীন জাতির কেউ। যদি আমরা তাদের সে ভয় দূর করে দিতাম এবং আমরা যে মেয়ে এ কথা তাদের সামনে প্রকাশ করে দিতাম, তবে ওরা আমাদের সঙ্গে এমন ব্যবহার করতাে, সারা জীবন সে কথা মনে রাখতে হতো। এমন নির্জন এলাকায় আমাদের মত যুবতী মেয়েকে কেউ তাদের বােন ও বেটি মনে করবে না। আমি তাদের শারীরিক অবস্থা দেখেছি, এমন সুঠাম শরীর কোন সাধারণ মানুষের হয় না। এমনকি সাধারণ যােদ্ধারাও তাদের মত এমন সুপুরুষ ও বীর হয় না। কমান্ডোদের বাহুতে যে অমিত তেজ ও বলিষ্ঠতা থাকে, সেই বলিষ্ঠতা আছে ওদের প্রত্যেকের মধ্যে। তাই আমি এই কৌশলের আশ্রয় নিয়েছি। এই মুসলমান কমান্ডোদের বুঝিয়েছি, আমরা কোরআনে বর্ণিত সেই জ্বীন, মানুষ বিপদে পড়লে যাদের আল্লাহ সাহায্যের জন্য পাঠায়।
ভালই করেছে। মরুভূমির এই জাহান্নামে আমাদের মত রূপসী মেয়েরা আসতে পারে, এটা তাদের বিবেক বুদ্ধিতে আসার মত বিষয় নয়। প্রথমে তারা আমাদেরকে মরুভূমির কুহেলিকা ও ধাধা মনে করেছিল। পরে তােমার সাথে আলাপ করে তাদের মনে হয়েছে আমরা জ্বীন। আর এ বিশ্বাসকে তুমি ভালই কাজে লাগিয়েছে।'
মানুষের বিশ্বাস ও আবেগকে কাজে লাগানাের কৌশল জানতে হয়। তুই ছেমড়ি এখনাে কিছুই শিখলি না। আমি তাদের সঙ্গে যে ভাষায় ও ভঙ্গিতে কথা বলেছি, তাতে তারা সন্দেহাতীতভাবেই বিশ্বাস করেছে, আমরা জ্বীন। কারণ আমি তাদের আবেগ অনুভূতি সম্পর্কে জানি। তােকে এখনও অনেক কিছু শিখতে হবে।
আর শিখেছি! আমার এসব ভাল লাগে না।
বলিস কি! এটাই তাে এ লাইনের বড় পুঁজি। আমি তাে এখন সাইফুদ্দিনের মত চালাক লােককেও ইশারায় নাচাতে পারি। আর এগুলাে তাে গােবেচারা সাধারণ সিপাহী।
আসলেও তােমার কাছ থেকে আমাকে অনেক কিছু শিখতে হবে। ছােট মেয়েটি বললাে, কিন্তু আমার যে এসব ভাল লাগে না। মানুষের সাথে প্রতারণা ও ছল-চাতুরী করতে মন চায় না আমার।'
তবুও এ চেষ্টা তােকে করতেই হবে। বড় মেয়েটি বললাে, “তােকে এ সব পুরুষের খেলনা হওয়ার হাত থেকে বাঁচতে হবে। শােন, তুই এই রাস্তায় প্রথম নেমেছিস তাে, তাই কায়দা কৌশল এখনাে সব রপ্ত করতে পারিসনি। এভাবে পুতুল সেজে বসে থাকলে তুই ক্রুশের কোন কাজই করতে পারবি না। নিজের দেহটাকে অল্প বয়সেই বৃদ্ধা বানিয়ে নিলে পুরুষরা তােকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে বাইরে।
তাহলে আমাকে কি করতে হবে?
‘শােন, মুসলমান আমীর ও শাসকদের শুধু আনন্দ দান করাই তাে আমাদের উদ্দেশ্য নয়। ওদের ভােগের সামগ্রী হয়ে থাকার জন্য আমরা এ পথে নামিনি। আমাদের কাজ ওদের বিবেক বুদ্ধির ওপর প্রভাব বিস্তার করা। ওদের দীল-দেমাগ থেকে ঈমানের আলাে সরিয়ে দেয়া।।
কিন্তু এটা তাে খুবই কঠিন কাজ?
আরে, বােকা মেয়ে বলে কি? এটা তেমন কোন কঠিন কাজই না। তুই নিজের চোখেই তাে দেখলি, আমি কত সহজে ও তাড়াতাড়ি তাদেরকে আমার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিলাম।
তুমি সত্যি যাদু জানাে, বললাে ছােট মেয়েটি।
না, এখানে যাদুর কিছু নেই, সামান্য ট্রেনিংয়ের ব্যাপার মাত্র। আমাদের খৃস্টান ও ইহুদী ওস্তাদরা শিখিয়ে পড়িয়ে আমাদের এভাবে তৈরি করেছে। আমি এই চার জনকে ঘায়েল করার জন্য সেই কথাই বলেছিলাম, যে কথা আমার ওস্তাদ শিখিয়ে ছিলেন। সে শিক্ষা হলাে, মানুষ সর্বদা ভােগের লালসা করে। আমাদের কাজ হলাে, মুসলমানদের মধ্যে এই মজা বা ভােগের লালসা বাড়িয়ে দেয়া। কারণ এই দুর্বলতা মানুষকে ধ্বংসের দিকে টেনে নামায়। তাই আমি ওদেরকে স্বপ্নের সুন্দর রাজ্য দেখিয়েছি।'
‘এই লালসা কি শুধু মুসলমানদেরই আছে, অন্য কারাে নেই?
‘এই লালসা মানুষ মাত্রই আছে। কিন্তু আমাদের কাজ মুসলমানদের দুর্বল করা আর নিজের জাতির লােকদেরকে জাতীয় প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করা। কেন, তােমার কি সে রাতের কথা মনে নেই, সাইফুদ্দিন যখন আমাদের সামনে তার এক সেনাপতিকে বললেন, তিনি সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর সাথে একটা আপােস রফা করতে চান। আমি এক রাতেই তার সে দুর্বলতা দূর করে দিয়েছিলাম। সে রাতেই আমি তার এ চিন্তা ও পরিকল্পনা বাতিল করিয়ে তাকে আইয়ুবীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানাের সংকল্প যুগিয়েছিলাম।
‘আগে আছিয়াত পৌছতে দাও, তারপর তােমার এসব ওস্তাদী কৌশল আমাকেও শিখিয়ে দিও। ছােট মেয়েটা বললাে, বুঝতে পারছি, এই কাজের প্রতি ঘৃণা পােষণ করে লাভ নেই। আমি আসলেই মুসলমান আমীরদের খেলনার বস্তু হয়ে গেছি। তুমি তােমার সম্মান রক্ষা করে চলতে পারাে, কিন্তু আমি পারি না। কখনও কখনও পালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা হয়, কিন্তু কোন পথ খুঁজে পাই না। এমন কোন আশ্রয়ও খুঁজে পাই না, যেখানে পালিয়ে গিয়ে বাঁচতে পারবাে।'
আরে মেয়ে, পালিয়ে গিয়ে বাঁচার দরকার হবে না। যে দিন সব কিছু শিখে যাবে, সে দিন দুনিয়া থাকবে তােমার হাতের মুঠোয়!’ বড় মেয়েটা বললাে, তােমাকে এই প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্যই তাে আমার সাথে পাঠানাে হয়েছে। আমি তােমার মাঝে যেসব দুর্বলতা লক্ষ্য করেছি, সে দুর্বলতা দু'দিনেই দূর হয়ে যাবে।
আন নাসের মেয়েদের আগে আগে তার সাথীদের সঙ্গে হেঁটে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে পিছন ফিরে পথের নিশানা ঠিক, আছে কিনা জেনে নিচ্ছে মেয়েদের কাছ থেকে।
বড় মেয়েটি বললাে, “পথ হারানাের কোন ভয় নেই তােমাদের। আমরা তাে তােমাদের সাথেই আছি।'
পেছনে না থেকে তােমরাই সামনে চলাে না কেন, তাতে আমাদের পথ হারাবার কোন ভয় থাকে না!'
মেয়েরা ঘােড়া সামনে নিয়ে গেল। কমান্ডোরা নিশ্চিন্ত মনে তাদের অনুসরণ করতে লাগলাে।
রাত আরও গভীর হলাে। আইয়ুবীর চার জানবাজ কমান্ডো এক সাথে গান গাইতে গাইতে পথ চলছে। কোন রকম দুঃখ, শােক, কষ্টই যেন তাদের স্পর্শ করতে পারছে না। পায়ের নিচের বালি, মাটি ও পাথর তাদের কাছে মনে হচ্ছিল পুস্পিত উদ্যানের সবুজ সতেজ ঘার্সের মখমল।
ছােট মেয়েটি বললাে, এদেরকে আছিয়াত নিয়ে গিয়ে কি করবে?'
আমাদের ওস্তাদ শেখ মান্নানের কাছে এর চেয়ে বড় উপহার আর কিছু নেই। বড় মেয়েটি উত্তর দিল, এরা সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর গােয়েন্দা! তুমি জানাে না, উস্তাদের কাছে এদের মূল্য কত! আমাকে বিশেষভাবে তিনি জানিয়েছেন, সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর একটা গােয়েন্দা ধরা এক হাজার সৈন্য হত্যার চেয়েও বেশী। কারণ এক হাজার সৈন্য হত্যা করলে নতুন সৈন্য ভর্তি করে তিনি সে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন। কিন্তু একজন গােয়েন্দা উস্তাদের হাতে পড়লে , তিনি এমনভাবে মগজ ধােলাই করে তাকে ফেরত পাঠাবেন, যখন সে আর আইয়ুবীর সৈন্য থাকবে না, সে হয়ে যাবে আমাদের। অথচ আইয়ুবীর বাহিনীতে তারা অবাধে বিচরণ করতে পারবে। তাদের যে কোন গােপন খবর আমাদের সরবরাহ করতে পারবে। আমাদের হয়ে আইয়ুবীকে বা তার যে কোন জেনারেলকে গুপ্ত হত্যা করতে পারবে। আরাে যে কত কিছু তাদেরকে দিয়ে করানাে সম্ভব তা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না।
সে জন্য গােয়েন্দা ধরার দরকার কি, যে কোন সৈন্য ধরলেই তাে হয়!'
সৈন্যদের নির্দিষ্ট ব্যারাক আছে। চলাচলের নির্দিষ্ট জায়গা আছে। যখন যেখানে খুশী তারা যেতে পারে না। কিন্তু গােয়েন্দাদের কাজই হলাে সংবাদ সংগ্রহ ও তা আইয়ুবীর কাছে পৌঁছে দেয়া। এ জন্য তারা যত্রতত্র অবাধে বিচরণ করতে পারে। তা ছাড়া গােয়েন্দাদের আছে কমাণ্ডো প্রশিক্ষণ। সুলতান আইয়ুবী তার গােয়েন্দাদের এমন কমাণ্ডো প্রশিক্ষণ দিয়ে রেখেছে, যে ট্রেনিং সেনাবাহিনীর অফিসাররাও পায় না। শক্তিতে, বীরত্বে, ক্ষীপ্রতায় তারা হয় অসাধারণ। আর মানসিক দিক দিয়ে এরা আপন কর্তব্য পালনে হয় পাগলপারা ও জানকবুল!
তাই তাে বলি, এই চার জন সৈনিক রাতের এমন দুর্ধর্ষ আক্রমণ চালানাের পর, যুদ্ধের ক্লান্তি ও অবসাদ নিয়ে মরুভূমির কঠিন বিপদে কিভাবে এত সময় বেঁচে রইলাে। কোন মানুষের পক্ষে এমন বিপদ ও ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করে বেঁচে থাকা যে আদৌ সম্ভব, এদের না দেখলে তা বিশ্বাসই করতাম না।
‘আমি হলপ করে বলতে পারি, আমাদের সৈন্যদের মাঝে এমন মনােবলের অধিকারী একটা সৈন্যও নেই। এই চারজনকে আমি শেখ মান্নানের হাতে তুলে দেবাে। তিনি ও তার লােকেরা এদেরকে সহজেই নিজেদের মত দক্ষ বানিয়ে নিতে পারবে। তাদের এই অপরিমেয় শক্তি ও কৌশল নিজেদের কাজে লাগাতে পারবে।
তােমার হয়তাে জানা নাও থাকতে পারে, সালাহউদ্দিন আইয়ুবীকে হত্যা করার জন্য আমাদের গুপ্ত সেনারা অনেকবার চেষ্টা করেছে কিন্তু একবারও সফল হতে পারেনি। এই চারজনকে হাশিশ ও নেশায় ডুবিয়ে দিয়ে তারপর ওদের ওপর প্রয়ােগ করতে হবে সম্মােহনী বিদ্যা। তখন এরাই সুলতান আইয়ুবীকে হত্যা করার জন্য পাগল হয়ে যাবে। আমাদের সৈন্যরা সুলতান আইয়ুবীর কাছে পৌঁছতে অনেক বাঁধাবিঘ্নের সম্মুখীন হয়েছে, কিন্তু এদের সে সমস্যা হবে না, কারণ এরাতাে তারই কমান্তে সেনা।
‘কেন! সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর ওপর অন্য কোন উপায়ে নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করা যায় না, যেমন সাইফুদ্দিন, গুমাস্তগীনের ওপর গ্রহণ করা হয়েছে? ছোট মেয়েটি বললাে।
‘না!' বড়াে মেয়েটি বললাে, “যে মানুষ লােভ-লালসা থেকে মুক্ত হয়ে পবিত্র উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সংকল্পবদ্ধ হয়, তার সামনে সােনা-দানা, হীরে-জহরত, মণি-মাণিক্য, আমাদের মত সুন্দরী নারী সবই মূল্যহীন। ভয় বা লােভ কিছু দিয়েই তাকে সত্য পথ থেকে সরানাে যায় না। তাদের কাছে একমাত্র মহামূল্যবান বস্তু হচ্ছে ঈমান। এই ঈমানী সম্পদের কোন কমতি নেই আইয়ুবীর। ফলে তাকে সম্পদ বা ক্ষমতার লোেভ দেখিয়ে দখল করা যাবে না।' | তােমার মত মেয়ে দিয়েও কি তাকে জয় করা সম্ভব নয়?'
না, তাদের ধর্মীয় বিধান মতে সে এক সাথে চার বিবি রাখতে পারে। কিন্তু আইয়ুবী এক বিবিতেই সন্তুষ্ট। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অন্য কোন নারীর কথা হয়তাে সে চিন্তাও করে না। তার মন ভেজানাের অনেক চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু এই পাথরকে কিছুতেই গলানাে যায়নি।
ফিলিস্তিনের ওপর আমাদের আধিপত্য চিরস্থায়ী করার পথ একটাই, সুলতান আইয়ুবীকে হত্যা করা। | ‘এমন ব্যক্তিই তাে ভাল যে এক স্ত্রীর বাধ্য থাকে। ছােট মেয়েটা বললাে, আমি ক্রুশের পূজারী এবং ক্রুশের কল্যাণ কামনা করি। কিন্তু মাঝে মাঝে চিন্তা করি, যদি আমি কোন এক ব্যক্তির হৃদয়ের রাণী হতে পারতাম, তবে এই দেহ মন তার হাতে সঁপে দিয়ে ধন্য মনে করতাম নিজেকে।
"এমন ভাবালুতা ভাল নয়, এসব ব্যক্তিগত ভাবাবেগ ত্যাগ করো!' বড় মেয়েটা তাকে সাবধান করে বললাে, তােমার সামনে সেই মহান উদ্দেশ্য রাখাে, যাতে ক্রুশের বিজয় হয়। তােমার শপথের কথা চিন্তা করাে, যে শপথ তুমি ক্রুশকে হাতে নিয়ে করেছিলে। আমি জানি তুমি পূর্ণ যৌবনা, ঘােড়শী। এ বয়সে আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। কিন্তু ক্রুশ আমাদের কাছে এই কোরবানী ও ত্যাগই চাচ্ছে।
কাফেলা চলছে তাে চলছেই। বিজন প্রান্তর ধরে নিশুতি রাতে এগিয়ে যাচ্ছে ছয় জনের এ ছােট্ট কাফেলা। আন নাসের ও তার সাথীরা তখনাে মেয়েদের ঘােড়ার পিছনে পিছনে পথ চলছে। তারা হাঁটছে আর সুর করে গান গাইছে। কখনাে অকারণে হেসে উঠছে। একজন হাসলে সে হাসি ছড়িয়ে পড়ছে অন্যদের মুখেও ! তাদের সে হাসি ও আনন্দ দেখে মনে হচ্ছিল, কোন কষ্টকর সফর নয়, তারা বেরিয়েছে প্রমােদ ভ্রমণে।
রাত ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছিল ভােরের দিকে। যতই রাত বাড়ছিল, তাদের ঠিকানাও ততই নিকটবর্তী হচ্ছিল।
এই মেয়ে দু'টি কে, কি তাদের পরিচয়? এরা সেই জাতির মেয়ে, যাদের কাহিনী ও ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে কোরআনে। এরা সেই ইহুদী ও খৃস্টান কন্যা, মুসলমানদের ঈমান ক্রয়ের জন্য যাদের লেলিয়ে দেয়া হয়েছিল।
ইহুদী ও খৃস্টানরা মুসলমানদের সাথে অসংখ্য সম্মুখ সমরে পরাজিত হয়ে বেছে নিয়েছিল এই পথ। তারা তাদের শ্রেষ্ঠ সুন্দরীদের এই কাজে লাগিয়ে দিয়েছিল। এ জন্য প্রতিষ্ঠা করেছিল ট্রেনিং স্কুল। সেই সব স্কুল থেকে এই সব মেয়েদের শিখিয়ে দেয়া হতাে, কিভাবে মুসলমানদের ঘায়েল করতে হবে। তাদেরকে সেখানে শারীরিক প্রশিক্ষণ দেয়া হতাে, মানসিক প্রশিক্ষণও দেয়া হতাে। ওস্তাদ শিক্ষকরা তাদের শিখাতাে দুস্কৃতির নানা কৌশল ও কায়দা কানুন। ওদের বলা হতাে, মুসলমানদের শত্রু নয়, তােমরা ওদের সাথে মিশবে বন্ধু বেশে। এমন ভাবে মিশবে, যেন তােমরাই হয়ে ওঠো ওদের ধ্যান-জ্ঞান, স্বপ্ন ও কল্পনা। তােমরা হবে ওদের মনের মানসী। তাদেরকে ডুবিয়ে দেবে ভােগের রাজ্যে। আনন্দফুর্তির দুনিয়ায় ওদের এমন ভাবে আটকে রাখবে, যেন জেহাদ ও যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে দূরে থাকার জন্য ওরা হাজারটা বাহানা খুঁজে বের করতে পারে।
এই ওস্তাদরা ওদের শিখাতাে মুসলমানদেরকে নিজ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার কৌশল। শিশুকাল থেকেই শুরু হয়ে যেতাে, মেয়েদের এই শিক্ষা। মুসলমানরা যে ওদের জাত শত্রু, তাদেরকে যে ঘৃণা করতে হবে, শত্রু ভাবতে হবে এটা যেমন তাদের শিখাতাে তেমনি শিখাতাে সেই শত্রুতা সাধনের জন্য ওদের বন্ধু হতে। তারপর সেই বন্ধু বেশে কিভাবে মুসলমানদের চিন্তা চেতনায় প্রভাব বিস্তার করা যায়, কিভাবে তাদের পরিণত করা যায় খৃস্টান ও ইহুদীদের মানসিক গােলামে, সব কিছুই শিখিয়ে দেয়া হতাে ওদের।
এই মেয়েদের শেখানাে হতাে দুষ্টুমী ও নির্লজ্জতা। শেখানাে হতাে নিজেদের লােভনীয় করে উপস্থাপন করার নানা কৌশল। এদের ব্যক্তিগত আবেগ অনুভূতি বলে কিছু ছিল না, কুশের জন্য ওরা সব করতে পারতাে।
এই কাজে বেশী আগ্রহী ছিল ইহুদীরা। মুসলমানদেরকে ওরা মনে করতাে সবচে বড় শত্রু। তাই তাদের সুন্দরী মেয়েদেরকে পাঠিয়ে দিত এইসব প্রশিক্ষণ স্কুলে।
অবশ্য এ কাজে খৃস্টানরাও পিছিয়ে ছিল না। তারাও তাদের মেয়েদেরকে এই কাজে ব্যবহারের জন্য অকাতরে সঁপে দিত। এ ছাড়াও তারা এ কাজে ব্যবহার করতাে আরাে কিছু মেয়ে, যারা ছিল মুসলমান। এসব মুসলিম মেয়ে ওরা সংগ্রহ করতে অধিকৃত মুসলিম এলাকা থেকে। কখনাে চুরি বা হাইজ্যাক করে, কখনাে কাফেলা আক্রমণের পর লুণ্ঠন চালিয়ে তাদেরকে সংগ্রহ করতাে। তারপর তাদেরকে ভুলিয়ে দিত তাদের জাতি পরিচয়। শিশুরা তাে এমনিতেই ভুলে যেতাে, কিন্তু যারা একটু বড় তাদেরকে ভুলানাের জন্য ব্যবহার করতাে, হাশিশ বা নেশাদ্রব্য এবং ড্রাগ। এভাবেই এসব মুসলিম মেয়েকেও ওরা ব্যবহার করতাে মুসলমানদের বিরুদ্ধে। | এই দুই মেয়েকে কিছুদিন আগে খৃস্টানরা মুশেলের আমীর সাইফুদ্দিনকে উপহার স্বরূপ পাঠিয়েছিল। সাইফুদ্দিন সুলতান আইয়ুবীর ঘাের বিরােধী এ কথা সবারই জানা। এই মেয়েদেরকে পাঠানাের উদ্দেশ্যে হলাে, প্রথমত; তারা গােয়েন্দাগিরী করবে, দ্বিতীয়ত: সাইফুদ্দিন যেন কখনাে ভুলেও সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর সাথে আপােষের চিন্তা না করে সেদিকে নজর রাখবে, তৃতীয়ত: সম্মিলিত ঐক্যফ্রন্টের এক আমীর যেন অন্য আমীরকে বিশ্বাস না করে সে জন্য তাদেরকে পরম্পর বিরােধী বানিয়ে রাখবে। কিন্তু এই বিরােধ যেন শত্রুতায় পর্যবসিত না হয় সেদিকেও দৃষ্টি রাখবে।
এই কাজ যে কেবল এ দুই মেয়েই শুধু করছিল, তা নয়। মুসলমান প্রত্যেক আমীরের হেরেমেই খৃস্টানদের পাঠানাে চর এভাবে নিয়ােজিত ছিল।
খৃস্টানরা মুসলমানদের কয়েকজন নেতাকেও খরিদ করে - নিয়েছিল এবং তাদের ঈমান-আকিদা নষ্ট করে তাদেরকে মুসলমানদের বিপক্ষেই কাজে লাগাচ্ছিল।
সাইফুদ্দিন সম্মিলিত বাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসাবে যখন তুর্কমান সমরাঙ্গণে সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে লড়তে যায়, তখন তৎকালীন নিয়ম অনুসারে তার মহলের সেরা সুন্দরীদের সঙ্গে নেয় নাচগান ও স্ফুর্তির জন্য। এই দুই খৃস্টান মেয়েও সঙ্গে ছিল তার এ অভিযানে।
সাইফুদ্দিন জানতাে, এরা মুসলমান ও অভিজাত ঘরের মেয়ে। যুদ্ধে তাদের কাফেলা লুট হয় এবং তারা ধরা পড়ে খৃস্টানদের হাতে। পরে খৃস্টানরা তাদেরকে উপহার হিসাবে পাঠিয়ে দেয় সাইফুদ্দিনের কাছে। এরা খুব সরল সহজ ও ভদ্র মেয়ে, যদিও বড় মেয়েটা যথেষ্ট ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন ও কর্তৃত্বশীলা ।
এদিকে বড় মেয়েটার অবস্থা ছিল, সে সাইফুদ্দিনের পিছনে সব সময় ছায়ার মত লেগে থাকতাে। মহলের সকল মেয়েদেরকে সে দাসী-বাদী বানিয়ে রেখেছিল। সাইফুদ্দিন তাকে নিজের কল্যাণকামী মনে করতো এবং এ জন্য মহলে তার এ আধিপত্য বিস্তারে তার কোন রকম দুশ্চিন্তা বা মাথাব্যথা ছিল না।
(চলবে)
0 coment rios:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন