১৭. গাদ্দার(পর্ব-7)
সুলতান আইয়ুবী ফৌজির কাছ থেকে খবর পাওয়ার পর আর কালবিলম্ব করেননি। তিনি দ্রুত প্রস্তুত হয়ে ছুটে গিয়েছিলেন যেখানে দুশমন অপেক্ষা করছে, সেখানে। ফৌজির খবরের কারণেই দুশমন হামলা করার আগেই তিনি তাদের ওপর চড়াও হতে সক্ষম হয়েছিলেন।
সাইফুদ্দিন এ অতর্কিত হামলার জন্য প্রস্তুত ছিল না। এ জন্যই সাইফুদ্দিনের বাহিনী সহজে ধরাশায়ী হয়। অতর্কিত হামলার ফলে অনেক সৈনিক বলতে গেলে নিজের অজ্ঞাতেই মারা পড়ে ও বন্দী হয়ে যায়। ফলে যুদ্ধটা একতরফা ভাবেই শেষ হয়।
যুদ্ধের ময়দান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর নিয়ন্ত্রণে। খৃস্টান এই দুই মেয়ে দেখলাে, সাইফুদ্দিন ও তার সম্মিলিত বাহিনী চরম মার খাচ্ছে আইয়ুবীর বাহিনীর হাতে। যুদ্ধের যা গতি তাতে সম্মিলিত বাহিনীর পরাজয় অনিবার্য। এ অবস্থা দেখে তারা প্রমাদ গুণলাে এবং সমরাঙ্গণ থেকে পালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে লাগলাে।
এরা নিঃসঙ্গ ছিল না। খৃস্টানদের তাবেদার কিছু মুসলমান এজেন্ট সাইফুদ্দিনের উচ্চ পদে নিয়ােজিত ছিল। এই মেয়েরা, সব সময় তাদের সাথে যােগাযােগ রাখতাে। মেয়েরা তাদের কাছ থেকে সংবাদ সংগ্রহ করতাে এবং সেই তথ্য খৃস্টানদের কাছে পৌছে দিত।
খৃস্টানদের এ এজেন্টরা যখন দেখলাে, যুদ্ধের অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, সম্মিলিত বাহিনীর সামনে পিছু হটা ছাড়া আর কোন গত্যন্তর নেই, তখন তারা এই দুই মেয়েকে সেখান থেকে বের করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাে। কারণ তারা জানতাে, খৃস্টানদের কাছে এই মেয়ে দুটির কদর ও মূল্য কত।
সাইফুদ্দিন যুদ্ধের ময়দানে ছুটাছুটি করে বেড়াচ্ছে। মহলের মেয়েরা তাঁবুর ভেতর জড়ােসড়াে হয়ে বসে আছে। এই দুই খৃস্টান মেয়ে তাঁবুর বাইরে এলাে। সেখানে দাঁড়িয়ে ওরা ময়দানের অবস্থা দেখছিল, এ সময় সেখানে দেখা দিল এক এজেন্ট। বললাে, ময়দানের অবস্থা ভালাে নয়। তােমাদের সরে পড়া উচিত এখান থেকে।
আমরাও সে কথাই ভাবছিলাম। এখনাে বেরােবার মত পরিবেশ আছে, জলদি বেরিয়ে যাওয়ার একটা বিহীত-ব্যবস্থা করাে।'
মেয়েরা তাঁবুর ভেতর গেল। গুছিয়ে নিল নিজেদের অপরিহার্য সামগ্রী। তারপর তাঁবু থেকে বেরিয়ে একটু দূরে এসে অপেক্ষা করতে লাগলাে সেই এজেন্টের।
একটু পর ফিরে এলাে এজেন্ট। সে তাদের দু'জনের জন্য নিয়ে এসেছে দুটো ঘােড়া। ঘােড়ার জ্বীনের সাথে পানির চারটি মশক ও দুই তিন ব্যাগ খাবার বেঁধে দিয়ে বললাে, আর কিছু লাগবে?
, শুধু এই ব্যাগটা বেঁধে দাও।' ‘এতে কি আছে?
তেমন কিছু নয়। আমাদের সামান্য কাপড় চোপড়, অতিরিক্ত দুটো খঞ্জর ও কিছু হাশিশ।'
এ থলিটিও বেঁধে দেয়া হলাে ঘােড়ার জিনের সাথে। থলিতে আরও এক ধরনের নেশার দ্রব্য ছিল, যার কোন স্বাদ গন্ধ কিছু নেই। কাউকে ধোকা দিয়ে পান করালে সে বুঝতে পারবে না, তাকে পানি দেয়া হয়েছে নাকি তাতে কিছু মিশানাে আছে। কিন্তু এর কথা মেয়ে দুটি এজেন্টকে বললাে না।
এই দু'টি নেশার জিনিস তারা সাথে নিয়েছে, যদি কোন পুরুষের হাতে ধরা পড়ে, তবে তাদেরকে এসব পান করিয়ে যেন নিজেদের রক্ষা করতে পারে।
রাতের আঁধারে যুদ্ধের ময়দানে যখন রক্তাক্ত যুদ্ধ চলছে, তখন সেই এজেন্ট মেয়ে দুটিকে ঘােড়ার পিঠে উঠিয়ে তুর্কন রণাঙ্গণ থেকে বহু দূরে নিয়ে এলাে। তারপর তাদের খুব ভাল করে বুঝিয়ে বললাে, কোন পথে তারা দ্রুত আছিয়াত ফিরে যেতে পারবে। মেয়েদেরকে আছিয়াত দুর্গের পথ দেখিয়ে সে সেখান থেকে ফিরে এলাে।
রাতের আঁধারে দুই মেয়ে রওনা করলাে আছিয়াত দুর্গে । বড় মেয়েটি বুদ্ধিমতী, কৌশলী ও বীরঙ্গণা। সে ছােট মেয়েটাকে সাহস দিয়ে বললাে, ভয়ের কিছু নেই। আমি আছিয়াতের পথ চিনি।'
সকাল হওয়ার আগেই তারা সবুজ শ্যামল এলাকা পেরিয়ে কঠিন শীলাময় অঞ্চলে প্রবেশ করলাে। তারপর তারা ঢুকলাে সেই এলাকায়, যে অঞ্চলকে পৃথিবীর জাহান্নাম বলা হয়। এলাকাটি ছিল কঠিন শিলাময় ও শুষ্ক মরুভূমি। এ ভয়ংকর মরু অঞ্চল পার হওয়ার জন্য তারা দ্রুত ঘােড়া ছুটালাে। কিন্তু একটু পরই সূর্যের উত্তাপ অসহনীয় হয়ে উঠলাে এবং বাতাস ক্রমে তন্দুরের মত গরম হতে লাগলাে। সূর্য যখন মাথার ওপর এলাে, তখন তারা একটি উপত্যকা দেখতে পেল। এ উপত্যকায় পাহাড়ের ঢালে আশ্রয় নেয়ার জন্য তারা আরাে দ্রুত ঘােড়া ছুটালাে এবং এক সময় সেখানে গিয়ে পৌঁছলাে।
এখানে ভিতরের দিকে আশ্রয়ের মত প্রশস্ত জায়গা ছিল। তারা সেই ছায়াঘন পাহাড়ের ঢালে আশ্রয়ের জন্য থেমে গেল।
ওখানে তারা আহার ও পানি পান করে বিশ্রাম করছে,এ সময় তাদের নজরে পড়লাে আন নাসের ও তার সাথীরা।
এদের দেখেই বড় মেয়েটি বুঝতে পারলাে, এরা ক্ষুৎপিপাসায় কাতর হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে।
তার প্রশিক্ষণ অনুযায়ী সে সফল অভিনয় শুরু করলাে। শেষ পর্যন্ত তার অভিনয় সফল প্রমাণিত হলাে এবং আন নাসের ও তার সাথীরা তাদেরকে জ্বীন ভেবে ভীত হয়ে পড়লাে।
মেয়েটা প্রথমে তাদেরকে হাতিয়ার ত্যাগে বাধ্য করলাে এবং তারপর তাদেরকে পানি পান করতে দিলাে । পানি পান ও আহার করানাের পর সে ওদেরকে ফেদাইন গুপ্তঘাতকদের আবিষ্কৃত ও ব্যবহৃত বিশেষ ধরনের নেশার দ্রব্য পান করালাে পানির সাথে মিশিয়ে।
তাদেরকে নেশায় মাতাল করার পর মেয়েরা এবার তাদের সম্মােহন করলাে। তাদের চোখের সামনে মেলে ধরলাে ফুল বাগান, সবুজ মাঠ, পাখির কিচির মিচির শব্দ আর গালিচার মত নরম ঘাসের বিছানা। তাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে নতুন এক স্বপ্ন-জগত, যে জগতের দৃশ্য তাদের মনে জান্নাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিল।
এটা ছিল হাসান বিন সাব্বাহর এক বিশেষ আবিষ্কার। লোকদের হাশিশ ও নেশাদ্রব্য পান করিয়ে তাদের মনে সুন্দর ও মধুর দৃশ্য সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে সে সবিশেষ সাফল্য লাভ করেছিল। তার মৃত্যুর পরও ফেদাইনরা এই নেশার দ্রব্যের ব্যবহার অব্যাহত রাখে ।
তার মৃত্যুর একশ বছর পর শেখ মান্নান তার পদে অধিষ্ঠিত হয়। এই দল এখনাে ‘ফেদাইন' দল বলে সর্বসাধারণের কাছে পরিচিত।
বড় মেয়েটা ফেদাইনদের কাছে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ লাভ করেছিল। কি করে মানুষকে হিপটোনাইজ করতে হয় ভাল মতই জানতাে সে। লােকেরা নেশার ঘােরে আচ্ছন্ন হলে তাদের মনে কাল্পনিক ছবি তুলে ধরতে হয়। তখন সে সেই কাল্পনিক ছবিই চোখের সামনে বাস্তবে দেখতে পায়।
আন নাসের ও তার সঙ্গীদেরকে হিপটোনিজম করে বশে আনার পর নিশ্চিন্ত মনে পথ চলছে মেয়েরা। কারণ তারা জানে, এদেরকে এখন তারা যেভাবে খুশি সেভাবে চালাতে পারবে।
ছােট মেয়েটি সঙ্গীর দিকে মুখ ঘুরিয়ে বললাে, আচ্ছা, এরা তাে আমাদের জ্বীন বলে ধরেই নিয়েছিল। তাহলে শুধু শুধু এদেরকে হাশিশ পান করালে কেন?
তাদেরকে হাশিশ ও নেশা পান করানাের মূল উদ্দেশ্য হলাে তাদেরকে সম্পূর্ণ আমাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। পুরুষ সজ্ঞানে থাকলে কখন তাদের মতিগতি কি হয় বলা মুশকিল। কোনভাবে ওরা যদি বুঝতে পারে আমরা জ্বীন নই, তাদেরই মত মানুষ তাহলে আমাদের ভােগ করার চিন্তা আসতে পারে তাদের মাথায় । আর ওরা আমাদের দিকে হাত বাড়ালে তাদের বাঁধা দেবাে এমন শক্তি আমাদের নেই। তাই কোন রকম ঝুকি নেয়া সঙ্গত মনে করিনি আমি।।
তাছাড়া যখন জানতে পারলাম, ওর সুলতান আইয়ুবীর কমাণ্ডো বাহিনীর লােক, যাদের কৃতিত্বের কথা লােক মুখে বহুল প্রচারিত, তখন মনে একটু ভয়ও ঢুকে গেল। চিন্তা করে দেখলাম, এমন দুর্ধর্ষ সৈনিকদের প্রথমেই ঘায়েল না করলে তাদের বশে আনার সুযোেগ আর নাও পেতে পারি। আমি তাে জানি, শেখ মান্নানের কাছে ওরা কত মূল্যবান। এমন মূল্যবান সম্পদের দখলটা একটু নিশ্চিত করলাম ওদের নেশাগ্রস্থ করে।
শেখ মান্নান এদের দিয়ে বড় ধরনের ফায়দা লুটতে পারবেন। তিনি বারবার সুলতান আইয়ুবীকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেও সফল হতে পারেননি, তার সে স্বপ্ন সফল করার একটা মােক্ষম সুযােগ এসেছে আমার হাতে, ওদেরকে নেশাগ্রস্ত না করে সেই সুযোেগকে কাজে লাগানাের উপায় ছিল আমার।'
ওরা যখন মরুভূমিতে পথ চলতে চলতে এসব আলাপ করছিল, আছিয়াত কেল্লায় তখন হারানের শাসক গুমাস্তগীন শেখ মান্নানকে বলছিল, আরও একবার চেষ্টা করে দেখাে, আইয়ুবীকে হত্যা করার কোন না কোন পথ তুমি পেয়েই যাবে।'
তুর্কমানে মুজাফফরুদ্দিনের আক্রমণকে ব্যর্থ করার পর সুলতান আইয়ুবী তার সেনাপতি ও কমাণ্ডারদের বললেন, এখন যুদ্ধ শেষ হয়েছে। এবার তােমরা গনিমতের মাল জমা করাে।'
গনিমতের মাল অপরিমেয়! গাজী সাইফুদ্দিনের আশ্রয় ক্যাম্পে প্রচুর সােনা ও নগদ অর্থ পাওয়া গেল। শত্রু সেনাদের লাশের পােষাকেও নগদ অর্থ ও সােনার আংটি ছিল। আর বিভিন্ন সাজ-সরঞ্জাম ও অস্ত্রপাতিও পাওয়া গেল বেশুমার।
সুলতান আইয়ুবী সৈন্যদের ব্যবহার্য জিনিসপত্র ও অস্ত্রশস্ত্র তার সৈন্যদের মাঝে বন্টন করে দিলেন। অন্যান্য জিনিসপত্র দামেস্কে ও কায়রােতে পাঠিয়ে দিলেন গরীবদের মধ্যে বিলি বন্টনের জন্য। কারণ মিশর ও সিরিয়া তখন একই সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত।
তৃতীয় অংশ পাঠিয়ে দিলেন মাদরাসা নিজামুল মুলকের জন্য। ইউরােপের প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক লেন পল বর্ণনা করেছেন, সুলতান আইয়ুবী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষা লাভ করেছিলেন। তিনি আরও লিখেছেন, বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্য প্রমাণ থেকে জানা যায়, সুলতান আইয়ুবী তার নিজের জন্য গনিমতের মালের কিছুই রাখতেন না।'
গনিমতের মাল বন্টনের পর তিনি যুদ্ধবন্দীদের দিকে মনােযােগ দিলেন। এসব যুদ্ধবন্দীদের সবাই ছিল মুসলমান!
সুলতান আইয়ুবী তাদের সবাইকে এক জায়গায় একত্রিত করে বললেন, তােমরা সবাই মুসলমান হয়েও মুসলমানের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করতে এসেছাে। তােমাদের পরাজয়ের কারণ তাে এটাই যে, এ যুদ্ধে তােমরা জেহাদী প্রেরণা থেকে বঞ্চিত ছিলে। তােমাদের শাসক ইসলামের জঘন্যতম শত্রুর সঙ্গে, বন্ধুত্ব করে তাদের শক্তি বৃদ্ধি করেছে। তাই তােমাদের ভাগ্যে দুনিয়াতে জুটেছে লাঞ্ছনা, পরকালে তােমাদের জন্য রয়েছে কঠিন আজাব ও শাস্তি। কিন্তু আল্লাহ বড় মেহেরবান। তিনি তার অপরাধী ও গােনাহগার বান্দাদের জন্য ক্ষমা ও মাগফেরাতের দুয়ার খােলা রেখেছেন। জানিনা তােমরা তওবা করে ইসলামের পথে ফিরে এলে সে ক্ষমা ও মাগফেরাত তােমাদের ভাগ্যে জুটবে কিনা। তবে আমি এটুকু বুঝি, যে পাপ তােমরা করেছে তার থেকে মুক্তির একটাই পথ খোলা আছে, আর তা হলাে, তােমরা আবার ইসলামের সৈন্য হয়ে যাও এবং তােমাদের প্রথম কেবলা বায়তুল মােকাদ্দাসকে মুক্ত করার জেহাদে নিজেদের নাম লেখাও।
সুলতান আইয়ুবীর এই বক্তৃতা বন্দীদের হৃদয় ছুঁয়ে গেল। এ বক্তৃতায় বন্দীদের জন্য শাস্তির পরিবর্তে কেবল মুক্তির ঘােষণাই ধ্বনিত হয়নি, সেই সাথে তাদের অপরাধ ক্ষমা করে দিয়ে তাদেরকে নিজের বাহিনীতে শামিল করার মহৎ প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি। সুলতানের এই ক্ষমাসুন্দর আহবানে সবাই আবেগাপ্লুত হয়ে উঠলাে। তাদের মধ্যে নতুন করে জেহাদের প্রেরণা সৃষ্টি হলাে এবং তারা আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে মুখর করে তুললাে পুরাে এলাকা।
সূলতান আইয়ুবী ঘােষণা করলেন, যারা জেহাদের উদ্দেশ্যে আমার বাহিনীতে শামিল হতে চাও তারা আমার সৈন্য দলে নাম লেখাও। আর যারা বাড়ি যেতে চাও মুচলেকা দিয়ে তারা চলে যেতে পারবে।''
কিন্তু দেখা গেল, কেউ বাড়ি যাওয়ার দরখাস্ত করলাে না, বরং সবাই আইয়ুবীর সেনা দলে নাম লেখানাের জন্য ভীড় করলাে। | এমনিভাবে সুলতান আইয়ুবীর সৈন্য সংখ্যা বেড়ে গেল।
এরা সবাই ছিল প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈনিক, ফলে নতুন করে সামরিক প্রশিক্ষণ দরকার ছিল না ওদের। কিন্তু সুলতান আইয়ুবী বললেন, ‘ওদেরকে আমাদের বিশেষ যুদ্ধ কৌশল শিখাতে হবে এবং মানসিক দিক দিয়ে ওদেরকে জেহাদী জযবায় উজ্জীবিত করে তুলতে হবে।
ফলে শুরু হয়ে গেল তাদের ট্রেনিং। এ জন্য সুলতান আইয়ুবী অভিযান বন্ধ রাখলেন। সৈন্য বাহিনীকে নতুন ভাবে প্রশিক্ষণ দেয়ার ফাঁকে তিনি দামেস্ক ও কায়রােতে খবর পাঠালেন সামরিক সাহায্য পাঠানাের। মনােযােগ দিলেন আহত সৈন্যদের চিকিৎসার দিকে। মােটের ওপর মুজাফফরুদ্দিনের সাথে সংঘর্ষে তার যে সামরিক ক্ষতি হয়েছিল তা পুষিয়ে নেয়ার জন্য তিনি সর্বাত্মক পদক্ষেপ নিলেন।
আছিয়াত দূর্গ বর্তমান লেবাননের সীমান্তবর্তী একটি স্থান। মিশরের লেখক মুহাম্মদ ফরিদ আবু হাদীদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, আছিয়াত দূর্গ ফেদাইন নেতা শেখ মান্নানের। কেন্দ্রস্থল ছিল। ফেদাইন একটি গুপ্তঘাতক দল। এর মূল নেতা ছিল হাসান বিন সাব্বাহ । তার মৃত্যুর পর বিভিন্ন জন এর নেতৃত্ব দিয়েছে। এ ঘটনা যখন সংগঠিত হয় তখন এর নেতা ছিল শেখ মান্নান। ফেদাইন নেতা হিসাবে আছিয়াত দূর্গের একমাত্র কর্তৃত্ব ছিল শেখ মান্নানের হাতে। সে হাসান বিন সাব্বাহর গদীনশীন হিসাবে সারা দেশের ফেদাইন কর্মীদের পরিচালনা করতাে।
গুপ্তঘাতকদের আশ্রয়স্থল এই আছিয়াত কেল্লার সুরক্ষার জন্য সে একদল সুশিক্ষিত সৈন্য মােতায়েন রেখেছিল। আছিয়াত তুলনামূলকভাবে অন্যান্য দুর্গের চেয়ে সামান্য বড় ছিল। এই দুর্গের সন্নিকটে চারপাশে আরও চারটি ছােট দুর্গ ছিল, যেগুলােকে মূলত এই দুর্গেরই সম্প্রসারিত অংশ বলা যায়।।
এই চার দুর্গে অবস্থান করতাে শেখ মান্নানের চার ফেদাইন সহকারী। খৃস্টানরা এ কেল্লা তাদেরকে দান করেছিল সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে তাদের বার বার অভিযানের পুরস্কার হিসাবে।
খৃস্টানরা চাচ্ছিল, মুসলমান নেতাদের হত্যা করার জন্য, এবং মুসলিম জাতির চরিত্র হননের জন্য ফেদাইনরা যে কাজ করছে তা যেন আরও ভালভাবে করতে পারে। এই ফেদাইন গ্রুপ নিজেদেরকে ইসলামের একটি উপদল হিসেবে পরিচয় দিতাে। কিন্তু খুন-খারাবীতে তারা এতটাই দক্ষতা দেখিয়েছিল যে, সমাজে তারা শুধু ভাড়াটে খুনীচক্র হিসেবেই পরিচিতি লাভ করে।
ভাড়াটে খুনী হিসাবে খুনের ক্ষেত্রে তারা কোন বাছবিছার করতাে না। ইতিহাস থেকে জানা যায়, খৃস্টান নেতাদেরও তারা খুন করেছে। অগ্রিম অর্থ দিয়ে তাদেরকে এই কাজে ব্যবহার করতাে লােকেরা। | সুলতান আইয়ুবীকে হত্যা করার জন্য এদের ভাড়া করেছিল খৃষ্টানরা। একাধিকবার তারা সুলতানকে হত্যা করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় প্রতিবারই তিনি বেঁচে গেছেন অল্পের জন্য। আইয়ুবীকে হত্যা করার জন্য খৃস্টানরা এদেরকে বহু রকম সুযােগ সুবিধা দিয়েছিল। এমনকি কেল্লাও দান করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল, তারা নূরুদ্দিন জঙ্গী ও সুলতান আইয়ুবীকে হত্যা করবে।
নূরুদ্দিন জঙ্গীর মৃত্যুর ঘটনা সম্পর্কে মেজর জেনারেল মুহাম্মদ আকবার খান বিভিন্ন ঐতিহাসিকের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, নূরুদ্দিন জঙ্গীর মৃত্যুর পেছনে ফেদাইন দলের হাত ছিল। তারাই তাকে ধোঁকা দিয়ে সিরাপের সাথে এমন বিষ পান করিয়েছিল, যা ক্রমে ক্রমে তার জীবনী শক্তি নিঃশেষ করেছিল! লোকে জানে, তিনি কয়েকদিন গলার ব্যথায় ভুগে মারা যান। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, গলার ব্যথার যে ঔষধ তাকে দেয়া হয়েছিল, সেই ঔষধে গােপনে ফেদাইন গুপ্তঘাতকরা সেই বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল।
এখন খৃস্টান এবং খৃষ্টানদের দোসর সম্মিলিত বাহিনীর প্ররােচনায় তারা নতুন করে সুলতান আইয়ুবীকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র শুরু করলাে।
সেদিন সকাল বেলা। সূর্য তখনও উঠেনি। আন নাসের ও তার সঙ্গীদের নিয়ে দুই মেয়ে আছিয়াত দুর্গের দরােজায় এসে থামলাে। বড় মেয়েটি সাংকেতিক ভাষায় কিছু বললাে দুর্গ রক্ষীদের, ফটকের প্রহরীরা কেল্লার গেট খুলে দিল। সঙ্গে সঙ্গে এই ছােট্ট কাফেলা ঢুকে গেল কেল্লার ভিতরে।
আন নাসের ও তার সাথীদেরকে কেল্লার প্রহরীদের হাতে বুঝিয়ে দিয়ে মেয়ে দু'টি চলে গেল শেখ মান্নানের কাছে । শেখ মান্নান সব দিক থেকেই একজন বাদশাহর মত জীবন যাপন করতাে। তার চলার ভঙ্গি, জাঁকজমক সম্পূর্ণ বাদশাহদের মতই ছিল। সে'যে বুড়াে হয়ে গেছে এমন কোন অনুভূতিই তার ছিল না।
বড় মেয়েটা তার কাছে উপস্থিত হয়ে বললাে, আমরা তুর্কমানের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে এসেছি। আপনার বন্ধু সাইফুদ্দিনের ওপর কেয়ামত নেমে এসেছে।
শেখ মান্নান মেয়েদের দিকে তাকালাে। বড় মেয়েটিকে ছাপিয়ে ওর নজর পড়লাে ছােট মেয়েটির দিকে। তার দিকে তাকিয়ে শেখ মান্নান বললাে, এখানে এসাে! বসাে আমার কাছে।
শেখ মান্নান বড় মেয়েকে উপেক্ষা করে ছােট মেয়েকে কাছে ডাকায় ভেতরে ভেতরে মনক্ষুন্ন হলাে বড় মেয়েটি। সে কথা বন্ধ করে তাকালাে সঙ্গী মেয়েটির দিকে।
তুমি প্রয়ােজনের চেয়েও বেশী সুন্দরী! আমার পাশে বসাে।' মেয়েটা তার কাছে গেলে সে তার বাহু ধরে টেনে নিজের পাশে বসাতে বসাতে বললাে, তুমি খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আজ আমার পাশেই আরাম করবে! মেয়েটা শেখ, মান্নানের নাম শুনলেও এই প্রথম তাকে দেখলাে। সে কি বলবে, কি করবে বুঝতে পারলাে না,
ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাে তার দিকে। তার মত বুড়াে মানুষের কাছ থেকে সে এমন আচরণ আশা করেনি।
সে একবার বড় মেয়েটিকে আবার শেখ মান্নানকে দেখতে লাগলাে। শেষে সেখান থেকে উঠে সরে যেতে চাইলাে শেখ মান্নানের নাগালের বাইরে। শেখ মান্নান চট করে তাকে ধরে ফেলে ঝটকা টান দিয়ে একেবারে তার কোলের কাছে টেনে নিল।
শেখ মান্নানের এ আচরণে মেয়েটি যেমন অপমান বােধ করলাে, তেমনি শেখ মান্নানও অপমান বােধ করলাে, মেয়েটি তাকে এড়ানাের চেষ্টা করেছে দেখে। | শেখ মান্নান বড় মেয়েটাকে বললাে, একে আমার সম্পর্কে কেউ কিছু বলেনি? সে জানে না, আমি কে? ও আমার কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করে আমাকে অপমান করেছে। ও কি জানে না আমাকে অপমান করা কত বড় অপরাধ?
আমি আপনার কেনা দাসী নই! ছােট মেয়েটি রেগে গিয়ে বললাে, এটা আমার কর্তব্যের মধ্যে পড়ে না যে, যে কেউ আমাকে কাছে টানলেই তাতে আমাকে সাড়া দিতে হবে।' সে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললাে, আমি একজন ক্রুসেডার। ক্রুশের সেবায় নিবেদিত এক দাসী। ক্রুশের জন্য আমি সব করতে পারি, কিন্তু আমি ফেদাইনদের কেনা দাসী নই যে, দায়িত্বহীনভাবে কেউ আমাকে কাছে টেনে নেবে?
বড় মেয়েটা তাকে সাবধান করতে চাইলাে। কিছুটা ধমকের সুরেই বললাে, তাের কি মাথা খারাপ হয়ে গেল! কি সব আবােল তাবােল বকছিস?'
কিন্তু এ ধমকেও সে চুপ করলাে না। বলতে লাগলাে, মুসলমানদের অন্দর মহলেও এমন লােক আমি দেখেছি। আমাকে সাইফুদ্দিন ও তার উপদেষ্টাদের বিবেকের উপর পর্দা দেয়ার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, কিন্তু যে লােক আলাপ পরিচয়ের আগেই গায়ে হাত দেয়, তেমন অভদ্রের খায়েশ মেটানাে আমার দায়িত্ব নয়। আর দায়িত্ব ছাড়া শুধু শুধু এক বুড়াের সাথে এক কামরায় থাকার কোন প্রয়ােজন দেখি না আমি।
যদি তুমি এতাে বেশী সুন্দরী না হতে তবে আমি তােমার এই অপমান মােটেই সহ্য করতাম না। তােমাকে ক্ষমাও করতাম না। শেখ মান্নান বড় মেয়েটিকে হুকুম করলাে, একে নিয়ে যাও এবং আছিয়াত দুর্গের আদব কায়দা ওকে ভাল করে শিখিয়ে দাও। দ্বিতীয়বার আমাদের যখন মােলাকাত হবে তখন যেন এ মেয়ে এখানকার রেওয়াজ মত আচরণ করতে পারে।
বড় মেয়েটা যে কথা বলতে শেখ মান্নানের কাছে এসেছিল তা আর বলতে পারলাে না, ছােট মেয়েটাকে টানতে টানতে তাকে নিয়ে বাইরে চলে গেলাে।
বেরােবার সময়ও সে বেশ উচ্চস্বরে শেখ মান্নানকে বলছিলাে, আমার ওপর আপনার অসন্তুষ্ট হওয়া বৃথা । কারণ আমি আমার বসদের নির্দেশ ও অনুমতি ছাড়া অন্য কারাে আদেশ মানতে বাধ্য নই।'
বাইরে এসে বড় মেয়েটির প্রশ্নের জবাবে সে বলতে লাগলাে, ‘কেন, আমি কি ফুরিয়ে গিয়েছিলাম। আমরা এত বড় এক তুফান থেকে এলাম, সুদীর্ঘ ও দুঃসহ সফরের ক্লান্তি ভুলে তাকে বলতে গেলাম, আমরা আপনার জন্য মূল্যবান উপহার নিয়ে এসেছি। আইয়ুবীর চার জানবাজ কমান্ডোকে ফাঁসিয়ে এনে হাজির করেছি আপনার দরবারে। কোথায় তিনি আমাদের কাছে দেখতে চাইবেন সেই উপহার, তা না করে কাজের কথা ফেলে হাত বাড়ালেন আমার দিকে। তুমিই বলাে, তিনি এটি ঠিক করেছেন?'
শান্ত হও। তুমি তাকে চেনাে না, কিন্তু আমি চিনি। এই কেল্লায় আমি আগেও এসেছি। আমরা তার....'।
মেয়েটির কথা শেষ হলাে না, কামরা থেকে বেরিয়ে এলাে শেখ মান্নান বললাে, 'কি বললে? কি উপহার এনেছে তােমরা?'
বড় মেয়েটি জবাব দিল। বললাে, আপনার জন্য আমরা আইয়ুবীর চার কমাণ্ডো সেনা ধরে এনেছি।
শেখ মান্নান আবার তাদেরকে ঘরে ডেকে নিল। বললাে, বলাে, পুরাে কাহিনী খুলে বলাে আমাকে।'
বড় মেয়েটি সফরের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে বললো, আইয়ুবীর গােয়েন্দা বাহিনীর কমাণ্ডার আন নাসের ও তার তিন সাথীকে আমরা আপনার কাছে সােপর্দ করার জন্য নিয়ে এসেছি।' সে আন নাসেরদের সম্পর্কে যা জানে বিস্তারিত শেখ মান্নানকে শােনালাে।
শেখ মান্নানের দু'চোখে এবার জ্বলে উঠলাে অন্য রকম আলাে। সে আনন্দিত কণ্ঠে বললাে, আমি এই লােকগুলাে দিয়ে এমন কাজ আদায় করে নেবাে,.এতদিন কেবল যার স্বপ্ন দেখেছি, কিন্তু সফল হতে পারিনি।
ওরা শেখ মান্নানের কামরা থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে আসছিল, শেখ মান্নান বড় মেয়েটিকে ইঙ্গিতে কাছে ডেকে আস্তে করে বললাে, কিন্তু আমি এ মেয়েকে আমার কামরায় অবশ্যই চাই।'
‘এ বিষয়টি আমার উপরেই ছেড়ে দিন। বড় মেয়েটি জবাবে বললাে, “দেখি, কত দূর কি করা যায়! আমাকে একটু সময় দিতে হবে। আমি তাকে রাজি করাতে চেষ্টা করবাে, যাতে সে খুশী মনেই আপনার কাছে আসে। আশা করি আমি বিফল হবে না।'
যদিও শিশুকাল থেকেই এসব মেয়েদের পাপ ও নােংরা কাজের ট্রেনিং দেয়া হয়, তার মধ্যেই দু'একজন বেরিয়ে আসে, যাদের এসব ভাল লাগে না। এ মেয়েটি সেই প্রকৃতির। যখনই পাপের প্রশ্ন আসে, বিবেক যেন তাকে চাবুকপেটা করতে থাকে। খৃস্টানদের সযত্ন প্রশিক্ষণের পরও কেন যেন সত্য ও সুন্দরের প্রতি তার আকর্ষণ নিঃশেষিত হয় না। ক্রুশের ব্যাপারে তার আগ্রহ কম নয়, কিন্তু এ জন্য ধোঁকা ও প্রতারণার আশ্রয় নিতে হবে, এতে তার মন কিছুতেই সায় দেয় না।
লােকদের ভুলিয়ে ক্রুশের জালে আবদ্ধ করবে কি, এই কাজের প্রতি তার নিজেরই ঘৃণা ধরে গেছে। এই পেশাকে তার মনে হচ্ছে জঘন্যতম পেশা।
ওরা সারারাত সফর করেছে। নিঘুম রাত কেটেছে তাদের। ঘুমে তাদের চোখ বুজে আসছিল।শেখ মান্নানের কামরা থেকে বেরিয়ে নিজেদের কামরায় ফিরে ওরা ঘুমানাের চেষ্টা করলাে। বড় মেয়েটি বিছানায় শুয়েই ঘুমিয়ে পড়লাে, কিন্তু ছােট মেয়েটির চোখে ঘুম এলাে না। শেখ মান্নানের অভদ্র আচরণ এখনাে তার মনটাকে বিষিয়ে রেখেছে। সে বিছানা থেকে উঠে গিয়ে জানালার পাশে বসলাে, তারপর দৃষ্টি ছুঁড়ে দিল বাইরে।
বাইরে দৃষ্টি মেলে দিয়ে জীবনের তিক্ত কথাগুলােই ভাবছিল সে। এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে নিজের অজান্তেই দু'চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে শুরু করেছে, খেয়াল করেনি।
তার এ কান্নার কারণ, এ পরিবেশকে সে যেমন মেনে নিতে পারছিল না, তেমনি আকাশ-পাতাল ভেবেও এর থেকে মুক্তির কোন পথও খুঁজে পাচ্ছিল না। এ বিশ্রি পরিবেশ থেকে। পালিয়ে যাবে, পালানাের তেমন কোন জায়গাও ছিল না।
বড় মেয়েটি জেগে উঠলাে। সঙ্গের মেয়েটিকে জানালার পাশে বসা দেখে উঠে তার কাছে এগিয়ে গেলাে। তার চোখে অশ্রু দেখে পাশে বসে পড়ে বললাে, 'দ্যাখ, প্রথম প্রথম মনের অবস্থা এমনটিই হয়। কিন্তু আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, আমরা যা কিছু করছি তা কেবল নিজেদের স্বার্থ, বা বিলাসিতার জন্য নয়। আমাদের লক্ষ্য অনেক বড়, আমরা কাজ করছি ক্রুশের জন্য। ইসলামের নাম ও চিহ্ন পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার আগ পর্যন্ত আমাদেরকে এ কাজ করে যেতে হবে। আমাদের সৈন্যেরা যুদ্ধের ময়দানে লড়ছে, আমাদেরকে লড়ে যেতে হবে আমাদের সেক্টরে। আবেগের ওপর নিজের বুদ্ধিকে জয়ী করাে। দেহের অপবিত্রতা নিয়ে পেরেশান হয়ে না। আরে, দেহ তাে অপবিত্র থাকে ততক্ষণ, যতক্ষণ গােসল না করাে।
মুসলমান তাদের মেয়েদেরকে কেন এমনভাবে ব্যবহার করে না, যেমন আমাদের করা হয়?' ছােট মেয়েটা কান্না থামিয়ে প্রশ্ন করলাে, আমাদের সম্রাট, সৈন্য ও সেনাপতিরা কেন মুসলমান সৈনিকদের মত বীরত্বের সাথে লড়াই করতে পারে না? কাপুরুষের মত আমাদের কেন প্রতারণার আশ্রয় নিতে হবে। কেন চোরের মত গােপনে, মুসলমানদের হত্যা করতে হবে? সুলতান আইয়ুবীর কমাণ্ডোদের মত নিবেদিতপ্রাণ সৈন্য কেন খৃস্টানরা গঠন করে না? তাহলে কি বুঝবাে, আমাদের জাতি কাপুরুষ ও ভীরু, শঠ ও প্রবঞ্চক?
বড় মেয়েটা তাড়াতাড়ি তার মুখ চেপে ধরে অস্থির কণ্ঠে বললাে, ছি! এমন কথা আর কারাে সামনে বলবে না! তাহলে তুমি খুন হয়ে যাবে। এখন আমরা শেখ মান্নানের কাছে আছি। সে গুপ্তঘাতক বাহিনীর নেতা। তাকে দিয়ে আমাদের বিরাট কাজ করিয়ে নিতে হবে। তাকে, অসন্তুষ্ট করলে আমাদের উদ্দেশ্য সফল হবে না।
‘এই লােকটাকে দেখেই আমার ঘৃণা ধরে গেছে। ছােট মেয়েটা বললাে, 'এ লােক কোন বাদশাহ বা সম্রাট নয়, একজন ভাড়াটে খুনী মাত্র। বড়জোর বলতে পারাে খুনীদের সরদার। এ রকম হিংস্র খুনীদের আমি ঘৃণা করি। তাকে আমি আমার গায়ে হাত দেয়ারও যােগ্য মনে করি না।'
বড় মেয়েটা অনেকক্ষণ ধরে তাকে বুঝালাে, শেষে তাকে রাজী করালাে শেখ মান্নানের সাথে ভাল ব্যবহার করতে। সে তাকে আরও বললাে, আরে, ভয়ের কিছু নেই। আমি তােকে শিখিয়ে দেবাে, কি করে পুরুষদের শুধু লালসা ও লােভ দেখিয়ে দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখা যায়। তুমি তাে আমার কৃতিত্ব দেখােনি? আমি বড় বড় বাদশাহ এবং সম্রাটদেরও মাটিতে বসিয়ে রাখতে পারি ঘন্টার পর ঘন্টা! শেখ মান্নান তাে সে তুলনায় কিছুই না। | তুমি কি এমন কোন উপায় বের কতে পারবে, যাতে আমরা তাড়াতাড়ি এখান থেকে বেরিয়ে যেতে পারি?’ ছােট মেয়েটি বললাে।
‘চেষ্টা করে দেখবাে।' বড় মেয়েটা বললাে, তবে শেখ মান্নানকে অসন্তুষ্ট করে কিছুই করা যাবে না।'
ইতিমধ্যে দু'জন লােক কামরায় প্রবেশ করলাে। তারা আইয়ুবীর চার কমাণ্ডো সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলাে মেয়েদের কাছে। বড় মেয়েটা তাদের সম্বন্ধে সব কিছু খুলে বললাে ওদের। তাদেরকে কি জন্য এখানে আনা হয়েছে তাও বললাে। তারপর জানতে চাইলাে, তারা এখন কেমন আছে?'
‘এখনও ঘুমিয়ে আছে।' একজন উত্তর দিল। তাদেরকে কি কারাগারে পাঠাবে? ছােট মেয়েটি প্রশ্ন করলাে।
‘কারাগারে পাঠানাের কোন প্রয়ােজন নেই। লােকটি উত্তরে বললাে, এখান থেকে পালিয়ে ওরা যাবেই বা কোথায়?
আমি কি তাদের সাথে দেখা করতে পারবাে? ছােট মেয়েটি জিজ্ঞেস করলাে।
‘কেন পারবেনা। সে উত্তর দিল, তারা তাে তােমাদেরই শিকার। তাদের নিয়ে যেমন খুশী খেলা করার অধিকার তােমাদের অবশ্যই আছে। তাদের সাথে সাক্ষাৎ করাে, তাদের কাছে বসে তাদেরকে আরাে ভাল করে জালে আটকাও, কে মানা করছে তােমাদের।' এ কথা বলেই লােক দু’জন বেরিয়ে গেল কামরা থেকে।
সফরের সময় পথে বড় মেয়েটিকে সে তার মনের কথা খুলে বলেছিল। যদিও তার গার্জিয়ানরা তাকে ক্রুশের সেবায় উৎসর্গ করেছে, কিন্তু তার স্বপ্ন ছিল একটি সাজানাে সংসার। এ পথে এসেছে সে অল্প কিছুদিন। বয়সে নবীন যুবতী। এখনাে মনের আবেগ দমন করার কায়দা আয়ত্ব করে উঠতে পারেনি। আগ্রহ না থাকার কারণে অন্য মেয়েদের মত চালুও হয়ে উঠেনি। এই প্রথম তাকে পরীক্ষামূলকভাবে বাইরে পাঠানাে হয়েছে। তার সাথে বড় মেয়েটিকে পাঠানাে হয়েছে, যেন সে তাকে পারদর্শী করে তােলে।
বড় মেয়েটি এখন বড় বিপদে আছে ওকে নিয়ে। কারণ এ মেয়ের কাজ শেখার মােটেই আগ্রহ নেই, ফলে সে কোন কাজেই তেমন সফল হতে পারছে না। পুরুষকে আঙ্গুলের ওপর নাচানাের কায়দা কানুন এখনাে তার রপ্ত হয়নি। হবে কি করে, সে নিজেই এ কাজকে জঘন্য মনে করে। বুড়াে সেনাপতিদের ভীমরতি দেখে নাকি তার ঘেন্না পায়।
সাইফুদ্দিন যে কয়দিন তাকে খেলার পুতুল বানিয়ে রেখেছিল, সে কয়দিন সে ভালই ছিল। তেমন কোন অভিযােগ শােনা যায়নি তার কাছ থেকে। কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে সাইফুদ্দিনের বিপর্যয় তাকেও এলোমেলাে করে দিল।
যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে দু:সাহসিক ও দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয়েছে তাকে। রাতভর সফর করতে হয়েছে। সেই কষ্ট ও ক্লান্তি দূর করার আগেই অভদ্রের মত তার দিকে শেখ মান্নানের হাত বাড়ানােটা তার মনে হয়েছে অমানবিক ও বর, আচরণ। বড় মেয়েটি বুঝতে পারলাে, এ নিয়ে শেখ মান্নানের সাথে তার বাদানুবাদের বিষয়টিই তাকে অস্থির করে তুলেছে।
কিছুক্ষণ পর ছােট মেয়েটি বড় জনের বাঁধা সত্ত্বেও সেই কমান্ডো সৈন্যদের কামরায় গেল। সেখানে আন নাসের ও তার সাথীদেরকে সে ঘুমিয়ে থাকতে দেখলাে।
আন নাসের আসলে জেগেই ছিল। সে ছােট মেয়েটাকে কামরায় প্রবেশ করতে দেখে ঘুমের ভান করে শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলাে, এখন তার কি করা উচিত। শেষে এই সিদ্ধান্তে এলাে, মেয়েটির সাথে কথা বলা দরকার।
সে, যেন হঠাৎ করেই তার ঘুম ভেঙ্গে গেল এমন ভাব ।
করে জেগে উঠলাে। জেগেই সামনে মেয়েটিকে দেখে কিছুটা অবাক হওয়ার ভান করে উঠে বসলাে এবং জিজ্ঞেস করলাে, আমাদের কোথায় নিয়ে এসেছাে? সত্যি করে বলাে তাে, তােমরা কে বা কারা? এটা কি ধরনের জায়গা? জ্বীনদের আবাস কি এমন দূর্গের মত হয়?
ছােট মেয়েটা আন নাসেরের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাে । কখনাে সে দৃষ্টিতে ক্ষোভ, কখনাে করুণা প্রকাশ পাচ্ছিল। মেয়েটা যে আবেগ ও উত্তেজনায় অধীর তাও প্রকাশ পাচ্ছিল সে দৃষ্টিতে । আন নাসের মেয়েটার এ উত্তেজনা ও অধীরতা দেখে অবাক হলাে। আবার জিজ্ঞেস করলাে, কি, আমার প্রশ্নের কোন জবাব দিলে না যে!'
মেয়েটি আন নাসেরের একদম কাছ ঘেষে দাঁড়িয়ে চুপি চুপি বললাে, “তােমরা কি পালাতে চাও?
‘তােমরা কে তাইতাে জানি না। তােমরা শত্রু না মিত্র তা না জানলে আমরা কি করবাে তা ঠিক করি কিভাবে? আগে বলাে তােমরা কে? আমাদের নিয়ে তােমাদের পরিকল্পনা কি? তারপর আমি চিন্তা করে আমাদের করণীয় নির্ধারণ করবাে।' আন নাসের উত্তর দিল।।
মেয়েটা তার চোখে চোখ রেখে ফিসফিস করে বললো, আমি জ্বীন নই, মানুষ! আমার ওপর বিশ্বাস রাখাে। পালাতে চাইলে বলাে, আমি সহযােগিতা করবাে।
মেয়েটির এ অযাচিত আশ্বাস বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করলাে না আন নাসের। বরং এতে তার প্রতি তার সন্দেহই বৃদ্ধি পেলাে।
আন নাসের কোন জবাব দিচ্ছে না দেখে মেয়েটি এবার তার খাটের দিকে এগিয়ে গেল এবং খাটের ওপর পা তুলে বসে পড়লাে।
আন নাসের ছিল সুঠাম সুন্দর দেহের অধিকারী এক সুদর্শন যুবক। যেমন বুদ্ধিমান, তেমনি সাহসী। সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর কমাণ্ডো বাহিনীতে যােগ দেয়ার আগে লােকে তাকে বলতাে ডানপিটে, বাহিনীতে শামিল হওয়ার পর বন্ধুরা তাকে জানে দুঃসাহসী বলে।
মৃত্যুর চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারতাে এ যুবক। সে এবং তার মত অন্যান্য কমাণ্ডোদের নিয়ে খৃস্টানদের মধ্যে প্রবাদ বাক্য সৃষ্টি হয়েছিল যে, সুলতান আইয়ুবীর এসব কমাণ্ডোদের দেখে মৃত্যুও ভয় পায়। মরুভূমির কঠিন জীবন, নদীর প্লাবন এবং কংকরময় পাহাড় ও প্রান্তর, এসব কোন বাঁধাই তাদের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারত না। বিপদ মুসিবতের কোন পরােয়াই ছিল না এইসব জানবাজদের। তারা আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়তে ভয় পেতাে না। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পিছপা হতাে না।
যদি আন নাসের আছিয়াত কেল্লা পর্যন্ত নিজ ক্ষমতা বলে ও সজ্ঞানে সফর করতাে, তবে এতটা ভীত হতাে না। যদি তাদের বন্দী করে ধরে আনা হতাে, তবু ভয় তাদের কাবু করতে পারতাে না বরং তারা পালানাের হাজারটা পথ খুঁজে বের করতাে। কিন্তু তাদেরকে নেশার ঘােরে আচ্ছন্ন করে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। এখন সে নেশার ঘোর চলে গেলেও নেশার ঘােরে দেখা সবুজ মাঠ, ফলের বাগান, ঘাসের গালিচার কথা তারা ভুলেনি। তার মনে হচ্ছিল, এই পৃথিবীর কোন অঞ্চলে হয়তাে এমন সবুজ মাঠ ও ফলের বাগান থাকতেও পারে। হয়তাে সে অঞ্চলটাই তারা পেরিয়ে এসেছে।
এখন তার খাটের ওপর যে মেয়েটি বসে আছে তাকে সে জ্বীনের মেয়েই মনে করেছিল । মেয়েটি তার কল্পনার চেয়েও বেশী সুন্দরী। আন নাসের এমন মেয়েকে মানুষ কন্যা না মেনে নিতে পারে না।
মেয়েটি যখন তাকে বললাে, তার ওপর সে ভরসা করতে পারে, তাতে সে আরও ভীত হয়ে পড়লাে। সে শুনেছিল, পরীরা প্রলােভন দেখানােতে ওস্তাদ। মানুষকে প্রলােভন দেখিয়ে তাদের সুবিধামত জায়গায় নিয়ে তারপর তাকে হত্যা করে ফেলে। এখন তার কাছে এই কেল্লাটা পরীদের প্রেতাত্মার কেল্লা বলে মনে হচ্ছিল। তার সাথীরা তখনও গভীর নিদ্রায় ডুবে ছিল আচ্ছন্ন হয়ে।
তারপরও সে মনকে বুঝালাে, আমি কমাণ্ডার। আমাকে সাহস হারালে চলবে না। এভাবে নিজের মনকে প্রস্তুত করে সে মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলাে, আমি তােমার ওপর কেন ভরসা করবাে? কি জন্য নির্ভর করবাে তােমার আশ্বাসের ওপর? তুমি আমার ওপর এত দয়া দেখাচ্ছে কেন? কেনই বা আমাকে এখানে আনলে? এ স্থানটাই বা কোথায়?
যদি তুমি আমাকে বিশ্বাস না করাে, তবে তােমার পরিণাম খুবই খারাপ হবে। মেয়েটি বললাে, তােমার হাত তােমার ভাইয়ের রক্তে রঞ্জিত হবে। তুমি সে রক্তকে ফুল মনে করে খুশী হবে। আমি এখনই তােমাকে এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবাে না যে, কেন আমি তােমার প্রতি দয়া বা অনুগ্রহ দেখাচ্ছি। তবে জেনে রেখাে, আমি তােমার একজন শুভাকাঙ্খী।
কথা কয়টি বলে সে আর সেখানে অপেক্ষা করলাে না, দ্রুত সেখান থেকে বেরিয়ে নিজের কামরায় ফিরে গেল।
আন নাসের ও তার সঙ্গীদেরকে শেখ মান্নানের দুই প্রহরী তাদের হেফাজতে নিয়ে গিয়েছিল। তখনও তাদের নেশার ঘাের কাটেনি। সারা রাত পায়ে হেঁটে এসে তারা ঢলে পড়ছিল ক্লান্তির কোলে।
প্রহরীরা তাদেরকে এক কামরায় নিয়ে এলাে। কামরাটি বেশ বড়ােসড়াে। তাতে কয়েকটি খাট পাতা। এক প্রহরী বললাে, সারা রাত সফর করেছে, নিশ্চয়ই তােমাদের ঘুম পেয়েছে। নাও, এই খাটে শুয়ে পড়াে।
বাধ্য ছেলের মত প্রহরীর হুকুম পালন করলো কমাণ্ডোরা। তারা পালংকের ওপর শুয়েই ঘুমিয়ে পড়লাে।
দুপুরের পর আন নাসেরের ঘুম ভাঙ্গলাে। সে এদিকওদিক তাকিয়ে দেখলাে। তার সাথীরা তখনও ঘুমাচ্ছে। সে তার আশপাশে তাকিয়ে চিনতে চেষ্টা করলাে কোথায় আছে।
সে দেখতে পেল, কামরার দরজা বন্ধ, তবে সবকটি জানালা খােলা । ঘরে খাটের ওপর ঘুমিয়ে আছে তার সাথীরা।
তার মনে পড়ে গেল গত রাতের সেই স্বপ্নময়তার কথা। চারদিকে অবারিত সবুজ মাঠ, চাঁদের কোমল জোসনা, সুবাসিত ফুলের বাগান, বিভিন্ন রংয়ের পাখির কিচির মিচির, গালিচার মত ঘাসের কোমল স্পর্শের কথা তার স্মৃতিপটে ভেসে উঠতে লাগলাে। মনে পড়লাে তার মেয়ে দু'টির কথা। মনে পড়লাে মরুভূমি ও, মরুভূমির খরতাপের কথা। মরুভূমির নির্দয় আচরণ, সাথীদের স্মৃতিবিভ্রম, মরীচিকা ও সেই দুঃসহ কষ্টের কথা। এখন সেসব কথা তার দু:স্বপ্ন বলেই মনে হচ্ছে। | সে বিছানা থেকে উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। দৃষ্টি ছুঁড়ে দিল বাইরে। দেখতে পেলাে, এটা একটা দুর্গ। সৈন্যরা আসা যাওয়া করছে। কিন্তু তাদের পােষাক আইয়ুবীর সৈন্যদের মত নয়।
সহসা সে পূর্ণ চৈতন্যে ফিরে এলাে। অনুভব করলাে, মরুভূমির বিপদসংকুল সফরটিই ছিল প্রকৃত সত্য ও বাস্তব। তারপর তার মেয়েদের সাথে সাক্ষাৎ ঘটেছিল। মেয়েদেরকে তার জ্বীন বলে মনে হয়েছিল। তার পরের ঘটনা তার কাছে অস্পষ্ট। মধুর স্মৃতিগুলােকে নিছক স্বপ্ন ও কল্পনা বলে মনে হলাে তার। কিন্তু সে এখন কোথায়? এই প্রশ্ন তাকে অস্থির করে তুললাে।
সে তার সঙ্গীদেরকে জাগালাে না। জানালার কাছে দাঁড়িয়ে সৈন্যদের আসা যাওয়া দেখতে লাগলাে। এরা কার বাহিনী? এটা কোথাকার দুর্গ, কেমন ধরনের দুর্গ? এসব নানা প্রশ্ন কিলবিল করতে লাগলাে তার মাথায়। কিন্তু সে এ কথা কাউকে জিজ্ঞেস করাও সমীচিন মনে করলাে না।।
সে ধারন করলাে, এটা নিশ্চয়ই কোন শত্রু বাহিনীর দুর্গ হবে। তবে কি সে তার সঙ্গীদের নিয়ে এখানে বন্দী হয়ে আছে? কিন্তু এ কামরাতাে কয়েদখানার কামরা নয়!
সে এক গােয়েন্দা ও কমাণ্ডো সৈনিক! কাউকে জিজ্ঞেস করেই এই ধাধার সমাধান বের করা উচিত তার। তার বিবেক ও বুদ্ধি সক্রিয় হয়ে উঠলাে। তখনি এক অজানা ভয় এসে ভর করলাে তার ওপর।
সে জানালা থেকে সরে গিয়ে খাটের ওপর বসে পড়লাে। এ সময় বাইরে কারাে পদশব্দ শুনতে পেলাে। সঙ্গে সঙ্গে সে শুয়ে পড়ে ঘুমের ভান করে নাক ডাকতে লাগলাে।
সে আড় চোখে দেখলাে, যে দুই মেয়ের সাথে তারা রাতে সফর করেছে, এ তাদেরই একজন। সে মেয়েটির সাথে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিল এবং উঠে বসে তার কাছ থেকেই জানতে পারলাে, তারা জ্বীনপরী কিছু নয়, তারা তাদের মতই মানুষ। মেয়েটি তাকে পালিয়ে যাওয়ার কথা বললাে এবং এ ক্ষেত্রে তার পক্ষ থেকে সাহায্যেরও আশ্বাস দিল। কিন্তু, এ আশ্বাসে বিশ্বাস আনলাে না আন নাসের।
মেয়েটি চলে যেতেই সে ভাবতে লাগলাে, এর পিছনেও আবার কোন ষড়যন্ত্র নেই তাে! যে মেয়ে তাকে ও তার সাথীদের এখানে এনে বন্দী করেছে, সে কেন তাকে সহায়তা করতে যাবে। সে একটি বিষয়ে খুব চিন্তাগ্রস্ত হলাে, মেয়েটি বলেছে, তাকে বিশ্বাস না করলে তার পরিণাম খুব খারাপ হবে। ভাইদের রক্তে রঞ্জিত হবে তার হাত। মেয়েটির এ হুমকি উড়িয়ে দেয়া যায় না। যে মেয়েরা তাদের নেশাগ্রস্ত করে ভুলিয়ে এনে বন্দী করতে পারে, তারা এমন নেশাও তাদেরকে পান করাতে পারবে, যার ঘােরে পড়ে ভাইদের হত্যা করতে সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে ওরা। কারণ আন নাসের শুনেছিল, ফেদাইন গুপ্ত ঘাতকদের হাতে বিচিত্র ধরনের নেশা আছে। আচ্ছা! এরা ফেদাইন নয়তাে? প্রশ্নটা মনে হতেই আন নাসের আরেকবার শিহরিত হলাে। | মেয়েটি চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর আন নাসের তখন খাটের ওপর বসে বসে ভাবছে, এমন সময় বাইরে আবারও কারাে পায়ের আওয়াজ পেলাে। সঙ্গে সঙ্গে সে বিছানায় শুয়ে পড়ে নাক ডাকতে লাগলাে। দু’জন লােক কামরার মধ্যে প্রবেশ করলাে। একজন অন্যজনকে বললাে, কিছুক্ষণ আগে ঘুমিয়েছে।'
আচ্ছা, ওদের শুয়ে থাকতে দাও। অন্যজন বললাে, মনে হচ্ছে এদেরকে বেশী পান করানো হয়ে গেছে। এদের সম্পর্কে কি বলা হয়েছে?
দুই খৃস্টান মেয়ে এদেরকে ফাঁসিয়ে নিয়ে এসেছে। আগের লোকটি বললাে, এরা সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর কমাণ্ডো ও গােয়েন্দা। শুনেছি এরা খুবই চালাক ও দুর্ধর্ষ হয়।
এদেরকে ঠিক মত সম্মােহিত করতে পারলে অসাধ্য সাধন করা যাবে।
লােক দু'টি চলে গেল। আন নাসেরের শরীরের প্রতিটি লোম শিউরে উঠলাে। সে বুঝতে পারলাে, ভয়ংকর এক চক্রের হাতে আটকা পড়েছে ওরা। মেয়ে দুটি তাদের ধোঁকা দিয়েছে। জ্বীন-পরী কিছু নয়, ওরা স্রেফ শিকার ধরার টোপ।
এখন তাকে জানতে হবে এটা কাদের কেল্লা, কি ধরনের কেল্লা! এ কেল্লা কোন এলাকায় অবস্থিত? তাকে ও তার সঙ্গীদেরকে কেন সম্মােহিত করা হবে? কি কাজ করানাে হবে তাদের দিয়ে?
সে আরাে উপলব্ধি করলাে, “এটা একটা দূর্গ। এই কঠিন দূর্গ থেকে পালানাে মােটেই সহজ ব্যাপার নয়!
কিন্তু যত কঠিনই হােক, আন নাসের সিদ্ধান্ত নিল, এখান থেকে তাদের পালাতেই হবে। সে তার সঙ্গীদেরকে জাগিয়ে তুললাে।
(সমাপ্ত)
1 coment rios:
ডঠটটটট
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন