শুক্রবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৯

ক্রুসেড সিরিজ-১৮. বিষাক্ত ছোবল(পর্ব-1)

১৮. বিষাক্ত ছোবল(পর্ব-1)
অন নাসের ও তার সাথীরা মরুভূমিতে ঘুরতে ঘুরতে প্রখর সূর্যতাপ, ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও ক্লান্তিতে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছিল। মরুভূমির সেই জাহান্নাম থেকে তাদের উদ্ধার করতে এগিয়ে এলাে দুই নারী। প্রথমে ওরা ভেবেছিল, এটা মরুভূমির তামাশা, এই দুর্গম প্রান্তরে মেয়ে আসবে কোথেকে? পরে মেয়েরা যখন ওদের পানি ও খাবার দিয়ে জীবন্ত করে তুললাে, তখন ওরা ভাবলাে, এরা মেয়ে নয়, জ্বীন বা পরী হবে। ছােটবেলা থেকে জ্বীন-পরীদের গল্প শুনতে শুনতে জ্বীন ও পরীর ভয় আন নাসেরের মনে বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল। যদিও জীবনে কোনদিন জ্বীনপরী দেখেনি, তবু গল্প শুনতে শুনতে কল্পনায় তাদের যে ছবি খােদাই করা হিল, এ মেয়েদের দেখে সে না যেন বাস্তব হয়ে ধরা দিল। মরুভূমির জাহান্নামে দুই অনিন্দ্যসুন্দর মেয়েকে দেখে সে নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল, এরাই সে কল্পনার জীন। 
মরুভূমিতে ঘুরতে ঘুরতে সে তার সাথীদের নিয়ে শেষ পর্যন্ত জীনের খপ্পরে এসে পড়লাে? ভাবনাটা মনে আসতেই এক অজানা ভয় ও শিহরণ ঘিরে ধরলাে তাকে। 
সেই মেয়েরা পানির সাথে বিশেষ ধরনের নেশা জাতীয় দ্রব্য মিশিয়ে সম্মােহিত করে ওদেরকে এনে তুললে এক দুর্গে । দুর্গে আসার পর এক সময় তাদের নেশার ঘাের কেটে গেল। আন নাসেরের কাছে এগিয়ে এলাে এক মেয়ে। তার প্রশ্নের জবাবে বললাে, আমরা জ্বীন-পরী কিছু নই, তােমাদের মতই রক্ত-মাংসের মানুষ। আন নাসের চারদিকে তাকিয়ে দেখলাে। তার অভিজ্ঞ চোখ বললাে, এটা একটা দুর্গ। জ্বীন-পরীদের এমন দুর্গের প্রয়ােজন হয় না। মেয়েটি তাহলে সত্যি কথাই বলেছে! এরা জ্বীন-পরী কিছু নয়! তাহলে কি ওরা মেয়েদের ফাঁদে পা দিয়ে নিজেরাই পায়ে হেঁটে এসে ঢুকে পড়েছে দুশমনের দুর্গে? এতক্ষণে আন নাসের বুঝতে পারলাে, সে এবং তার সাথীরা কি ভয়ংকর জালে আটকা পড়েছে। কি করে এ জাল কেটে বেরিয়ে যাওয়া যায় এ নিয়েই ভাবছিল আন নাসের। 
তার সাথীরা তখনও ঘুমিয়ে, মেয়েটি আবার ফিরে এলাে। বললাে, তুমি জানতে চাচ্ছিলে তােমরা এখন কোথায় এবং কেন তােমাদের এখানে নিয়ে এসেছি। 
কেন এনেছি এ প্রশ্নের জবাব এখন দেয়া সম্ভব নয়, তবে তােমরা এখন কোথায় তা বলে দিতে পারি।' 
আন নাসের উদগ্রীব হয়ে বললাে, কোথায়? 
‘এটা একটা কেল্লা।' 
‘এটা যে কেল্লা তা তুমি না বললেও জানি। কিন্তু কেল্লাটি কোথায় অবস্থিত, কি এর নাম, এখানে কারা থাকে। 
‘এ কেল্লার নাম আছিয়াত। এটা ফেদাইনদের কেল্লা। এখানে ফেদাইন নেতা শেখ মান্নান বাস করেন। ফেদাইনদের সম্পর্কে তুমি কিছু জানাে’?
হ্যা জানি!' আন নাসের উত্তর দিল, ‘খুব ভাল করেই জানি। আর এখন এটাও জানতে পারলাম, তুমি আসলে কে? আমি শুনেছিলাম, ফেদাইনদের দলে সুন্দরী মেয়েরাও কাজ করে। তুমি তাহলে সেই সুন্দরীদের একজন? 
‘আমার সঙ্গে তাদের কোন সম্পর্ক নেই।' মেয়েটি উত্তর দিল, ‘আমার নাম লিজা! তাদের সঙ্গে কোন সম্পর্ক না থাকলে তােমরা আমাদের এখানে নিয়ে এসেছে কেন? তােমার সাথে তাে আরও একটি মেয়ে ছিল, সে কোথায়? 
হা! আমার সাথে অন্য যে মেয়েটি ছিল তার নাম কারিশমা। সেও এখানেই আছে। লিজা বললাে, কেন তােমাদের এখানে এনেছি, সে কথা বলা যাবে না। তবে কেমন করে এনেছি, সেটা বলতে পারি। তােমাদেরকে নেশা খাইয়ে সম্মোহিত করে এখানে এনেছি।' 
সে এই পর্যন্ত বলে শেষ করেছে, এমন সময় কামরার দরােজায় এসে দাঁড়ালাে কারিশমা। কারিশমা চোখের ইশারায় লিজাকে বাইরে ডাকলাে, লিজা বাইরে চলে গেল। আন নাসের খাটে বসে আকাশ পাতাল ভাবতে লাগলাে। তার কাছে এখন অনেক কিছুই পরিষ্কার। মরুভূমির মহা বিস্তারে হারিয়ে যাওয়ার পর যে মেয়েরা তাদের পানি ও খাবার দিয়েছিল, ওরা আসলে জ্বীন নয়, মানুষ। ওরা তাদেরকে নেশাগ্রস্ত করে নিয়ে এসেছে চরম এক সন্ত্রাসী গ্রুপ ফেদাইনদের কেল্লায়। ফেদাইনরা বেশ সুসংগঠিত এবং তাদের সংগঠন আরবের সব কয়টি দেশে বিস্তৃত। ওদের মূল পরিচয় ওরা প্রফেশনাল গুপ্তঘাতক। পয়সার বিনিময়ে ওরা যে কাউকে যে কোন সুরক্ষিত স্থানেও অবলীলায় খুন করে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যেতে পারে। কে বা কারা লােকটির হত্যাকারী সে হদিস কেউ কোনদিন বের করতে পারে না। এ ধরনের ভয়ংকর খুনীদের আস্তানা বা কেল্লা থেকে বের হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। 
‘এখানে কি করছে?' কারিশমা জিজ্ঞেস করলাে, ‘লােকটির সাথে এমন ঘনিষ্ট হয়ে বসার সময় তােমার কি একবারও মনে হয়নি, মুসলমানরা ঘৃণার পাত্র! তুমি কি শেষে গাদ্দারী করবে নাকি? 
লিজার মনটা কেমন যেন হয়ে গেল। চেহারা ভাবলেশহীন, নির্বিকার। মুখে কোন কথা নেই। একদিন আবেগের বশে এবং অন্যের প্ররােচনায় পড়ে মুসলমান নেতাদের চরিত্র হননের যে পেশা গ্রহণ করেছিল, এখন সে কথা মনে হতেই নিজের প্রতি ঘৃণা জন্মাল। 
দিনে দিনে এই জঘন্য পেশার প্রতি তার ঘৃণা এমন পর্যায়ে পৌছে গেলাে, নিজেকে এই পেশা থেকে সরিয়ে নেয়ার কথা ভাবলাে সে। কিন্তু যখন মনে হলাে, এ পথে আসা যায়, কিন্তু যাওয়া যায় না, তখন ঘৃণা রূপ নিল প্রতিশােধ স্পৃহায়। কিভাবে নিজের ওপর প্রতিশােধ নেবে, কোন কূল না পেয়ে সে এই পরিবেশ থেকে পালানাের পথ খুঁজতে লাগলাে। এ সময়ই ওদের হাতে এসে পড়ে আন নাসেররা। 
আমিও যুবতী মেয়ে!' কারিশমা তাকে বললাে, আন নাসেরের মত সুদর্শন যুবক, যে কোন যুবতীর হৃদয় দখল করতে পারে। তাকে আমারও ভাল লাগে। সত্যি বলছি, এমন আকর্ষণীয় যুবককে ভাল না বেসে পারা যায় না। যদি তুমি বলাে, তাকে তুমি ভালবেসে ফেলেছে, তাতে আমি আশ্চর্য হবে না। আমি বুঝতে পারছি, বুড়াে মুসলিম আমীর ও সেনাপতিদের বিরুদ্ধে তােমার মনে ঘৃণা জমে উঠেছে। কিন্তু তােমার দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা মনে করাে, স্মরণ করাে তােমার শপথের কথা, এই মুসলমানরা তােমার শত্রু। এদের অনিষ্ট করার শপথ নিয়েছে তুমি।
তা নয় কারিশমা! লিজা অধীর হয়ে বললাে, আমার সঙ্গে তার তেমন কোন ভাব হয়নি, যে জন্য তুমি আমাকে তিরস্কার করতে পারাে।' 
তবে তার কাছে কেন এসেছে, কেন তার সাথে ঘনিষ্টভাবে মিশছে?' 
“আমি এখন সে বর্ণনা দিতে পারবাে না।' লিজা বিরক্ত কঠে বললাে, জানি না আমার মাথায় হঠাৎ এমন খেয়াল কেন এলাে, কেন তার পাশে গিয়ে বসতে ইচ্ছে জাগলাে মনে। 
তার সাথে কি কি কথা হয়েছে তােমার? 
‘তেমন কোন বিশেষ কথা হয়নি। লিজা বললাে। ‘তুমি তােমার দায়িত্ব পালনে খুব অবহেলা করছো।' কারিশমা বিরক্তি প্রকাশ করে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললাে, এটা বিশ্বাসঘাতকতা। তুমি জাননা বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি কি? 
জানি। মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু কারিশমা, তুমি শুনে রাখাে!' লিজা বললাে, “আমি ঐ বুড়াের খায়েশের খেলনা হবে না। ফেদাইনদের নেতা বলে শেখ মান্নান তােমার কাছে যত গুরুত্বপূর্ণই হােক, আমার কাছে সে একজন খুনী ও সন্ত্রাসী মাত্র। যদি সে আমার ওপর শক্তি প্রয়ােগ করে তবে আমি তাকে খুন করবাে। নয়তাে নিজেই শেষ হয়ে যাবাে। 
কারিশমা এ কথা শুনে একদম পাথর হয়ে গেল । আসলে সে উজ্জ্বল পাথরই ছিল, যার রং ও উজ্জ্বলতা সবাইকে আকৃষ্ট করে। সবাই তাকে আপন করে পেতে চায়। কিন্তু পাথরের তাে কোন পছন্দ অপছন্দ নেই। কিন্তু লিজা ততদূর পর্যন্ত অগ্রসর হতে পারেনি। নারীর সহজাত কামনা-বাসনা, ভাললাগা-ভালবাসা থেকে এখনাে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে পারেনি। 
কারিশমা তাকে বললাে, আমি কল্পনাও করতে পারিনি, তুমি এত বেশী আবেগপ্রবণ হয়ে উঠবে। বুঝলে তােমাকে আমি এখানে আনতাম না।' 
‘আমি কি তােমার পায়ে পড়েছিলাম যে, আমাকে ওখানে নিয়ে চলাে!' শ্লেষ মেশানাে কণ্ঠে বললাে লিজা। 
রাগ করলাে না কারিশমা। বললাে, এ কেল্লাটাই সবচে কাছে ছিল, তাই প্রথম মঞ্জিল হিসাবে এখানে এসেছি। নয়তাে এক টানে ত্রিপলী পর্যন্ত পৌছা সম্ভব ছিল না আমাদের পক্ষে।তাছাড়া আমাদের মত দুই নারীর পক্ষে চারজন কমান্ডোকে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সামাল দেয়ার ঝুঁকিও আমি নিতে চাচ্ছিলাম না। কিন্তু আমাকে এক হিংস্র পশুর হাতে তুলে দেয়ার ঝুঁকি তাে ঠিকই নিতে পারলে।' লিজার ক্ষুব্ধ কণ্ঠ। কারিশমা দরদভরা কণ্ঠে বললাে, তােমার কাছে অঙ্গীকার করছি, শেখ মান্নানের কবল থেকে তােমাকে বাঁচাতে চেষ্টা করবাে। 
তাহলে এখান থেকে জলদি পালিয়ে যাওয়ার একটা উপায় বের করে। 
সে চেষ্টা আমি করছি, কিন্তু মহাপ্রভুর দোহাই, তুমি আমাকে কথা দাও, বন্দীদের সাথে তুমি আর কোন রকম দহরম মহরম করবে না। 
সত্যি কথা বলবাে কারিশমা!' লিজা বললাে, আমি এখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এই কমান্ডোদের সাহায্য নেবাে। কারন শেখ মান্নানের সাথে আমি যে ব্যবহার করেছি, তাতে আমি নিশ্চিত, সে আমাদের এখান থেকে বেরােতে দেবে না।
তুমি নিজে বের হতে পারবে, আমাকে বের করতে পারবে। কিন্তু এরা দক্ষ কমাণ্ডো, এদের বীরত্বের অনেক বিস্ময়কর গল্প-কাহিনী লােক মুখে প্রচলিত। এদের সামান্য সুযােগ দিলেই এরা পালিয়ে যেতে পাবে। চাই কি সে সহযােগিতার বিনিময়ে তােমাকে-আমাকেও সঙ্গে নিতে রাজি হবে। এ ছাড়া আর কোন পথ নেই। 
আমি এদের বীরত্ব ও সাহসের প্রশংসা করি। স্বীকার করি এরা কুশলীও। তােমার কথাই ঠিক, সুযােগ পেলে ওরা পালিয়ে যেতে পারবে। কারিশমা বললাে, কিন্তু তুমি কি চিন্তা করে দেখেছাে, এরা আমাদের দু'জনকে বের করে নিয়ে যেতে পারলে আমাদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করবে? তুমি কি মনে করো তারা আমাদেরকে আমাদের ঠিকানায় পৌছে দেবে? নিশ্চয়ই তারা তা করবে না, তারা আমাদেরকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবে। আমার কথা শােনাে! মিথ্যা আশ্রয় খুঁজতে চেষ্টা করাে না।' 
কারিশমা থামলাে। লিজাও চুপ। কারাে মুখে কোন কথা নেই। কারিশমার কথাগুলাে নিয়ে ভাবছে লিজা। এক সময় কারিশমাই পুনরায় মুখ খুললাে। বললাে, 'গােছল করে পােশাক পাল্টে নাও। আজ রাতে শেখ মান্নানের খাস কামরায় খাওয়ার দাওয়াত রয়েছে। আমি তােমাকে বলে দিচ্ছি তার সাথে তােমার ব্যবহার ও আদব-কায়দা কেমন হবে। তুমি তাকে অপছন্দ করাে এমন মনােভাব যেন তার সামনে বিন্দুমাত্র প্রকাশ না পায়। এটাও যেন প্রকাশ না পায়, তুমি তার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। আমি এইমাত্র খবর পেলাম, হারানের গভর্ণর গুমাস্তগীন এখানে এসেছেন। 
তুমি তাে ভাল করেই জানাে, ওমাস্তগীন সুলতান আইয়ুবীর ঘােরতর দুশমন। ফলে তাকেও আমরা আমাদের উৎকৃষ্ট বন্ধু মনে করি। আমরা খুব কষ্ট করে এই মুসলমান শাসকদের হাত করেছি, তাদেরকে বন্ধু বানিয়েছি। এরা সবাই আমাদের অগ্রযাত্রার একমাত্র প্রতিবন্ধক সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর বিরুদ্ধে লড়ছে। ফলে এমন কোন আচরণ করাে না, যাতে তারা অসন্তুষ্ট হতে পারে।তে পারে।
কারিশমার ডাকে লিজা বেরিয়ে যেতেই আন নাসের গভীর চিতায় ডুবে গেল। তার মনের সন্দেহ দূর হয়ে গেছে। এরা যে জ্বীন-পরী কিছু নয়, আসলেই রক্ত মাংসের মানুষ, এ কথাটা বুঝতে এত দেরী হলাে কেন, তাই ভেবে আফসােস হলাে তার। 
এদিকে লিজার আচরণও তাকে অধীর করে তুললাে। লিজা বলেছে, নেশাগ্রস্ত করে তাদেরকে এখানে আনা হয়েছে। আন নাসের অনুভব করলাে, তার এ কথায় সত্যতা আছে। কারণ মরুভূমির সব কথাই তার মনে আছে, কিন্তু ওদের সাথে সাক্ষাতের পর থেকে যা ঘটেছে তার সব স্মৃতি স্পষ্ট নয়। যদি তাই হয় তাহলে ওরা তার দুশমন। কিন্তু দুশমন হলে মেয়েটি তার প্রতি সদয় হবে কেন? 
অনেক ভেবেও এ প্রশ্নের কোন সদুত্তর পেলাে না আন নাসের। লিজা তাকে আরও বলেছে, আন নাসের ও তার সাথীরা এখন ফেদাইন গ্রুপের হাতে। অথচ মেয়েটি নিজে ফেদাইন নয়, তাহলে সে কে ফেদাইন না হয়েও কেন তবে তারা ফেদাইনদের আস্তানায় এসে উঠেছে?
সে ভাবলাে, অস্বীকার করলেও এই মেয়ে দুটি কি ফেদাইন দলেরই কর্মী হতে পারে না। কারণ ফেদাইনরাই মেয়ে ও নেশা দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে চেষ্টা করে। ফেদাইনদের হাতে আছে হরেক রকম নেশা জাতীয় দ্রব্য। এত বিচিত্র নেশার দ্রব্য আর কারাে কাছে নেই। কমাণ্ডো ট্রনিংয়ের সময় ফেদাইনদের নেশা জাতীয় দ্রব্য সম্পর্কে তাদেরকে বিস্তারিত জানানাে হয়েছে এবং এই নেশা থেকে বেঁচে থাকার জন্য তাদেরকে বিশেষ ভাবে সাবধান করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু কি লাভ হলাে সেই সাবধান বাণীতে এই সুন্দরী মেয়েরা তাে সেই নেশার অস্ত্র দিয়েই তাদের ঘায়েল করে এখানে নিয়ে এল। সে তার সঙ্গীদেরকে জাগালাে। তারাও জেগে উঠে দুর্গের এক কামরায় নিজেদের আবিষ্কার করে আন নাসেরের মতই বিস্মিত হলাে। বিস্ময়ের ঘাের কাটাতে ওরা আন নাসেরের মুখের দিকে প্রশ্নবােধক দৃষ্টি নিয়ে তাকালাে। 
বন্ধুগণ!' আন নাসের তাদের বললো, আমরা ফেদাইনদের জালে আটকা পড়ে গেছি। এই কেল্লার নাম আছিয়াত কেল্লা। এটা ফেদাইনদের হেডকোয়ার্টার। ফেদাইন নেতা শেখ মান্নানও এখানেই থাকেন। 
যে মেয়ে দুটি আমাদের ধরে এনেছে তারা জ্বীন-পরী কিছু নয়, আমাদের মতই মানুষ। আমি এখনও বলতে পারছি না, এরা আমাদের সাথে কি ব্যবহার করবে। তবে আমরা সাবধান ও সতর্ক  না হলে আমদের পরিণতি হবে ভয়ংকর। আন নাসের সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে আরাে বললাে, তােমরা সবাই জানাে, ফেদাইনরা গুপ্তঘাতক। এ জন্য তারা সম্মোহনসহ নানা রকম বিদ্যা প্রয়ােগ করে থাকে। তাদের খপ্পর থেকে বেরিয়ে যাওয়া সােজা ব্যাপার নয়। যদি আমরা কখনাে এই কামরা থেকে বাইরে যাওয়ার সুযােগ পাই, তবে আমাদের প্রথম কাজ হবে এ কেল্লা থেকে পালানাের কৌশল বের করা। আপাতত তােমরা এ নিয়ে কোন কথা বলবে না, সবাই নীরব থাকবে। যদি এরা কিছু জিজ্ঞেস করে তবে সংক্ষেপে উত্তর দেবে। মনে রেখাে, এই শয়তানদের হাত থেকে উদ্ধার পাওয়া। সহজ ব্যাপার নয়। 
এরা কি আমাদের কারাগারে পাঠাবে? আন নাসেরের এক সাথী প্রশ্ন করলাে। 
যদি কারাগারে পাঠায় তবে আমাদের খুশী হওয়ারই কথা। আন নাসের বললাে, কিন্তু এরা আমাদের মন-মগজে নতুন চিন্তা ঢুকাতে চায়। হাশিশ ও নেশা জাতীয় দ্রব্য দিয়ে আমাদের বিবেক ও বুদ্ধি গুলিয়ে দিতে চায়। সুন্দরী মেয়ে দিয়ে আমাদের চিন্তা-চেতনায় ভােগের স্পৃহা জাগাতে চায়। ভুলিয়ে দিতে চায় আমাদের ধর্ম ও ঈমান। 
‘পালানাে ছাড়া আমাদের মুক্তির আর কোন পথ নেই।' আন নাসেরের এক সাথী বললো। 
‘পালাতে না পারলে আমরা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করবো, কিন্তু ঈমান হারাতে পারবাে না।' অন্য একজন বললাে। হ্যা, এ ব্যাপারে আমাদের খুবই সাবধান থাকতে হবে। আন নাসের বললাে, “ওদেরকে আর নেশা খাওয়ানাের সুযােগ দেয়া যাবে না। আল্লাহর ওপর ভরসা করে পালানাে, লড়াই অথবা মৃত্যু- এর যে কোন একটা বেছে নেব আমরা, কিন্তু কিছুতেই তাদের মুঠোর ভিতর ঢুকবাে না।' 
সারাদিন কেটে গেল। উল্লেখযােগ্য তেমন আর কিছু ঘটলাে না সারাদিন। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলাে। পশ্চিম দিগন্তে হারিয়ে গেল সূর্য। 
সন্ধ্যার আঁধার নেমে আসতেই এক লােক কামরার মধ্যে বাতি দিয়ে গেল। সে কারাে সঙ্গে কোন কথা বললাে না। প্রচণ্ড ক্ষুধা পেয়েছিল তাদের। সারাদিন তাদের কিছুই খেতে দেয়নি। তারা ভেবেছিল, বাতি যখন দিয়েছে, খাবারও পাঠাবে নিশ্চয়ই। কিন্তু তাদের সে আশা পূরণ হলাে না। বাইরে থেকে সেই যে কামরা বন্ধ করে চলে গেলাে লােকটি, তারপর থেকে আর কোন লােকের দেখা নেই। 
একটু দূরে কেল্লার মধ্যে শেখ মান্নানের মহল সাজানাে হয়েছে। গুমাস্তগীনের সম্মানে বাড়তি আলােকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এরা কামরার মধ্যে বসে শুনতে পাচ্ছিল নারী ও পুরুষের সম্মিলিত কলকাকলি। সেখানে উৎসব চলছিল। সমবেত অফিসারদের মধ্যে পরিবেশন করা হচ্ছিল খাবার ও মদ। উৎসব হলের পাশেই শেখ মান্নানের খাস কামরা। ওখানেও খাবার পরিবেশন করা হলাে। দামী মদের বােতল। সাজিয়ে রাখা হলাে টেবিলে। বিভিন্ন ধরনের খাবারের সুগন্ধে কামরার পরিবেশ মাতােয়ারা। 
আহার্য সামগ্রী সামনে নিয়ে বসে আছে শেখ মান্নান। তার ডাইনে কারিশমা ও বামে লিজা। সামনে ওমাস্তগীন। শেখ মান্নান গুমাস্তগীনকে বললাে, নিন, খাওয়া শুরু করুন। 
ওরা খাওয়া শুরু করলাে। চার কমাণ্ডো তাদের কামরায় বসে সুস্বাদু খাবারের সুবাস পাচ্ছিল। এতে তাদের ক্ষুধা আরাে বেড়ে গেল। 
হারান দুর্গের অধিপতি গুমাস্তগীন সুলতান নুরুদ্দিন জঙ্গীর ওফাতের পর নিজেকে স্বাধীন শাসক রূপে ঘােষণা করে আশপাশের অঞ্চল নিয়ে একটি রাজ্য গঠন করেছিল। সেই সুবাদে সে বিশেষ সম্মানিত মেহমান ছিল শেখ মান্নানের। 
খেতে খেতে গুমাস্তগীন শেখ মান্নানকে বললাে, তুমি জাননা সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে আল মালেকুস সালেহ ও সাইফুদ্দিনের যে সম্মিলিত বাহিনী তুর্কমান অভিমুখে যাত্রা করেছিল, সে বাহিনীতে আমার সৈন্যও শামিল ছিল। এই সম্মিলিত বাহিনী সুলতান আইয়ুবীর বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়েছে। আমি নিজে আমার সৈন্যদের সাথে ময়দানে যেতে পারিনি। সাইফুদ্দিন বললাে, সম্মিলিত বাহিনীর কমাণ্ড একক হাতে না থাকলে যুদ্ধে বিশৃংখলা দেখা দেবে, তাই আমি যাইনি। ভেবেছিলাম সাইফুদ্দিন এ যুদ্ধে সফল নেতৃত্ব দিতে পারবে। কিন্তু যুদ্ধের ফলাফল তো জানাে। এ যুদ্ধে আমাদের সম্মিলিত বাহিনী,চরমভাবে পরাজিত হয়েছে।' 
হ্যাঁ, বড়ই আফসােসের কথা। এমনটি আমরা আশা করিনি। যুদ্ধের কমাণ্ড আপনার হাতে থাকলে হয়তাে এমনটি হতাে না।
গুমাস্তগীন বললাে, আমি নিজেদের মধ্যে ফাটল ধরানাের জন্য তার বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াতে চাই না। কিন্তু যুদ্ধ জয়ের জন্য যেসব কৌশল ও টেকনিক ব্যবহার করা দরকার ছিল, তা তিনি করতে পারেননি। এ যুদ্ধ জয়ের জন্য প্রথম যে কাজটি করা দরকার ছিল, তা হলাে খৃস্টানদেরকে ময়দানে টেনে আনা। তিনি খৃষ্টানদের সাথে বন্ধুত্ব অটুট রাখার দাবী করলেও তাদের কাছ থেকে কোন রকম সামরিক সাহায্য আদায় করতে পারেননি। 
হ্যাঁ, এটা তার বড় ব্যর্থতা।' 
সে তাদের উপদেষ্টা ও গােয়েন্দাদের সাহায্য নেয়ার পরিবর্তে উন্নত মানের মদ, সুন্দরী মেয়ে ও নগদ মূল্য নিয়েই সন্তুষ্ট ছিল। কিন্তু যুদ্ধ করার জন্য দরকার অস্ত্র ও সেনা, এ দুটোই সে চায়নি ওদের কাছে। 
গুমাস্তগীন ছিল কূটবুদ্ধিসম্পন্ন ও ষড়যন্ত্রে ওস্তাদ। শক্ররা মাটির নিচে লুকিয়েও রেহাই পেতাে না তার হাত থেকে। 
বন্ধুদেরকেও সে সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দিত না। সে ছিল চরম ক্ষমতালিপ্সু। ছলে বলে কৌশলে রাজ্যের পরিধি বাড়ানােই ছিল তার একমাত্র স্বপ্ন। 
আইয়ুবীকে সম্মুখ সমরে হারানাে যাবে না জানতাে বলেই সে নিজে এ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেনি। আবার সম্মিলিত শক্তি যাতে বুঝে সে তাদেরই একজন, এ জন্য পরাজিত হবে জেনেও নিজের বাহিনী পাঠিয়েছিল সে অভিযানে।
গুমাস্তগীন তার ক্ষমতার পথে প্রধান প্রতিবন্ধক মনে করতাে সুলতান আইয়ুবীকে। ফলে সে ছিল সুলতান আইয়ুবীর সবচেয়ে কঠিন দুশমন। সম্মুখ যুদ্ধ নয়, গুমাস্তগীন বিশ্বাস করতাে আইয়ুবীকে ধ্বংস করতে হবে ষড়যন্ত্রের পিচ্ছিল পথে। গােপনে তাকে হত্যা করতে হবে। আর এ কাজে ওস্তাদ শেখ মান্নানের ফেদাইন গুপ্তঘাতক দল। তাই যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে সে এসেছিল শেখ মান্নানকে ভাড়া করতে, তাকে এ কাজে উদবুগ্ধ ও উৎসাহিত করতে। 
শেখ মান্নানও সুলতান আইয়ুবীর হত্যার ষড়যন্ত্রে খুবই উৎসাহী ছিল। তার ভাল মতােই জানা ছিল, সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীই একমাত্র ব্যক্তি, যার সামরিক শক্তি ঈমানী চেতনায় পরিপূর্ণ। সমরনায়ক হিসাবে যেমন অপ্রতিদ্বন্দী আইয়ুবী, ঈমানী বলেও তেমনি অতুলনীয়। এ ধরনের লােকের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে যাওয়া যেমন বিপদজনক, তেমনি এমন লােককে বাঁচিয়ে রাখাও ভয়ের। কারণ অন্যায় আধিপত্য বিস্তার আইয়ুবী কিছুতেই মেনে নেবে না। 
ফলে তুর্কমানের সমর শেষ হওয়ার আগেই মুসলিম মিল্লাতের দুই গাদ্দার এসে মিলিত হলাে একত্রে। আইয়ুবী যখন তলােয়ার দিয়ে লিখছিল নিজের ভাগ্যের ফয়সালা, তখন শেখ মান্নান ও গুমাস্তগীন আছিয়াত কেল্লায় বসে তার ভাগ্য নির্ধারণের জল্পনা কল্পনা করছিল। 
সুলতান আইয়ুবীকে হত্যার এমন কৌশল আবিষ্কার করাই তাদের এ বৈঠকের উদ্দেশ্য, যেন অন্যান্য বারের মত এবারের হত্যা প্রচেষ্টাও ব্যর্থতায় পর্যবসিত না হয়। 
গুমাস্তগীন আছিয়াত দুর্গে পৌছে ছিল কারিশমা ও আন নাসেররা পৌছার একদিন আগে। তখনাে সে জানতাে না, সাইফুদ্দিনের নেতৃত্বে সম্মিলিত বাহিনী সুলতান আইয়ুবীর কাছে কেমন মার খেয়েছে। সৈন্যবাহিনীকে সমরাঙ্গণে পাঠিয়ে দিয়েই সে নেমে পড়েছিল ষড়যন্ত্রমূলক কাজে। আর এ কাজ শেখ মান্নানকে ছাড়া অসম্ভব ভেবেই ছুটে এসেছিল আছিয়াত দুর্গে।
‘ভাই গুমাস্তগীন! শেখ মান্নান খাওয়া বন্ধ করে বললাে, ‘তােমার বাহিনীও তাে তুর্কমান সমরাঙ্গণ থেকে পালিয়েছে। তুমি শুধু শুনেছো সম্মিলিত বাহিনী পরাজিত হয়েছে, কিন্তু তাদের কি হাল হয়েছে বিস্তারিত জানাে না। এ জন্যই এদেরকে এখানে ডেকেছি। সে কারিশমা ও লিজাকে দেখিয়ে বললাে, এরা যুদ্ধের সময় ময়দানে ছিল। সব কিছু নিজ চোখে দেখেছে। আগে ওদের কাছ থেকে যুদ্ধের বিস্তারিত খবর শোন।' 
গুমাস্তগীন তাকালাে কারিশমাদের দিকে। কারিশমা গুমাস্তগীনের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলাে যুদ্ধের কাহিনী। কি করে সুলতান আইয়ুবী, অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে সম্মিলিত সৈন্যদলকে পরাজিত করে তাক লাগিয়ে দিল। কি করে সাইফুদ্দিন নিজের সৈন্যদেরকে ময়দানে রেখেই গােপনে পালিয়ে গেল, সবিস্তারে বললাে সে। গুমাস্তগীন নীরবে শুনলে তার কাহিনী। 

‘আমাকে আমার বন্ধুরাই লাঞ্ছিত ও অপমানিত করলাে। গুমাস্তগীন লজ্জায় ও রাগে বলতে লাগলাে, আমি সাইফুদ্দিনকে তিন বাহিনীর হেড অব দ্যা কমাণ্ড করতে মােটেই রাজি ছিলাম । কিন্তু আমার কথা কেউ শুনলাে না, জানি না আমার সৈন্যরা  
কি অবস্থায় আছে। 
‘খুবই শােচনীয় অবস্থায় আছে। কারিশমা বললাে, সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর কমাণ্ডো বাহিনী পলাতক সৈন্যদের নির্বিঘ্নে ঘরে ফিরতে দিচ্ছে না। ধাওয়া করে পাকড়াও করছে তাদের। 
ভাই মান্নান! তুমি জাননা আমি এখানে কেন এসেছি। গুমাস্তগীন বললাে। 
হ্যা, জানি আপনি সুলতান সালাহউদ্দিনের হত্যার পরিকল্পনা করতে এসেছেন।' শেখ মান্নান বললাে। 
হ্যা, ঠিকই বলেছ গুমাস্তগীন বললাে, এর বিনিময়ে তুমি যা চাইবে তাই আমি দিতে রাজি! সুলতান আইয়ুবীকে হত্যা করাে ভাই!' 
‘আমি খৃষ্টান ও সাইফুদ্দিনের অনুরােধে চারজন ফেদাইন খুনীকে আপনি আসার আগেই এ কাজে পাঠিয়ে দিয়েছি। শেখ মান্নান বললাে, কিন্তু তাকে হত্যা করা খুবই কঠিন। বার বার চেষ্টা করেও আমরা সফল হতে পারিনি। এবারও যে পারবাে তার কোন নিশ্চয়তা এ মুহূর্তে আমি আপনাকে দিতে পারবাে না। 
‘আমার কাছ থেকে পৃথক ভাবে বখশিশ নাও।' গুমাস্তগীন বললাে, নতুন লােক দাও, যারা এ কাজে দক্ষ। আর তাদেরকে আমার অধীনে দাও, যেন আমি সরাসরি তাদের পরিচালনা করতে পারি।' 
‘আমি যে চারজন খুনী পাঠিয়েছি, তারা আমার বাছাই করা চার খুনী। শেখ মান্নান বললাে, আমার কাছে খুনী গ্রুপের অভাব নেই। কিন্তু আমি সালাহউদ্দিন আইয়ুবীকে হত্যার ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে উঠেছি অন্য কারণে। 
‘কেন? গুমাস্তগীন বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করলাে, আইয়ুবী কি তােমাকে কোন কেল্লা টেক্কা দিয়ে দিল নাকি?'
‘না!’ শেখ মান্নান উত্তর দিল, কিন্তু ঐ ব্যক্তিকে খুন করার জন্য আমি আমার বহু মূল্যবান ফেদাইন খুনী শেষ করে ফেলেছি। আমার পাঠানাে ঘাতকরা তাকে ঘুমন্ত অবস্থায়, খঞ্জরের আক্রমণ চালিয়েছে, কিন্তু দেখা গেছে, আইয়ুবী নয়, সে নিজেই নিহত হয়ে গেছে। তার ওপর আমার দক্ষ তীরন্দাজরা তীর বর্ষণ করেছে, কিন্তু সে তীর তাকে স্পর্শও করতে পারেনি। আমার কেন যেন মনে হয়, সুলতান আইয়ুবীর ওপর আল্লাহর রহমতের ছায়া আছে। তার মধ্যে এমন কিছু আছে, যে শক্তির বলে তিনি খঞ্জর ও তীরের আঘাত থেকে রক্ষা পেয়ে যান। আমার গােয়েন্দারা বলেছে, সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর ওপর যতবার আক্রমণ চালানাে হয়েছে, ততবারই তিনি সে আক্রমণ ব্যর্থ করে দিয়েছেন অলৌকিকভাবে। আক্রমণ হলে তিনি ভীত বা রাগান্বিত হতেন না। আক্রমণ প্রতিহত করে এমনভাবে হাসতেন, যেন কিছুই হয়নি।' 
ভাই মান্নান, রাখাে তাে এসব প্যাঁচাল । আগে বলল, কত চাও?' গুমাস্তগীন বিরক্ত হয়ে বললাে, আমি সুলতান আইয়ুবীকে আর জীবিত দেখতে চাই না। আনাড়ী খুনীদের ব্যর্থতার কাহিনী বাদ দিয়ে কাজের কথায় আসাে’ আনাড়ী নয়, আমি যাদের পাঠিয়েছিলাম, তারা প্রত্যেকেই এ কাজে ওস্তাদ ছিল। শেখ মান্নান বললাে, আইয়ুবী ছাড়া তাদের হাত থেকে কেউ কোনদিন বাঁচতে পারেনি। তারা মৃত্যুকে ভয় করার মত লােক ছিল না। আমার কাছে এখনও এমন ওস্তাদ লােক রয়েছে, যারা বহু গুপ্তহত্যার নায়ক। তারা এমন কৌশলে হত্যাকাণ্ড চালায় যে, কাকপক্ষীও টের পায় না। কিন্তু ভাই গুমাস্তগীন, আমি আমার এত মূল্যবান ফেদাইনদের আর এমনভাবে বৃথা নষ্ট করতে পারবাে না। তােমরা তিন বাহিনীর সম্মিলিত শক্তি নিয়েও তার কিছু করতে পারলে না, আর আমার মাত্র তিন-চারজন ফেদাইনকে দিয়ে কেমন করে তাকে হত্যা করাতে চাও? 
বুঝেছি, তুমি আইয়ুবীর শক্তি দেখে ভয় পেয়ে গেছে। 
না! আমি ভয় পাইনি। সুলতান আইয়ুবীর সাথে আমার কোন ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই। শেখ মান্নান বললাে, হাসান বিন সাবাহ পয়গাম্বর হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর আমাদের এই দল পেশাদার খুনী হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে। বুঝলে ভাই গুমাস্তগীন! আমি এখন একটি পেশাদার খুনীচক্রের নেতা! প্রশ্নটা ভয়ের নয়, প্রশ্নটা পেশার। এখন যদি সুলতান আইয়ুবী আমাকে টাকা দিয়ে বলে তােমাকে হত্যা করতে, তবে আমি তােমাকেও হত্যা করতে পারবাে।' 
কিন্তু সালাহউদ্দিন আইয়ুবী কাউকে কাপুরুষের মত টাকা দিয়ে হত্যা করান না।' লিজা বললাে, সেই কারণেই তিনি কাপুরুষদের আঘাতে ও ষড়যন্ত্রে মৃত্যবরণ করছেন না।
বাহ! তুমি এই বয়সেই বুঝতে শিখেছো যে, যে কাপুরুষ নয়, তাকে কাপুরুষরা হত্যা করতে পারে না!' শেখ মান্নান তাকে কাছে টেনে নিয়ে আদরের ছলে বললাে। 
গুমাস্তগীন আশাহত হয়ে গুম মেরে বসে রইলাে। শেষ মান্নান তাকে বললাে, ভাই গুমাস্তগীন, তুমি, সাইফুদ্দিন ও আল মালেকুস সালেহ এবং খৃষ্টানরা শুধু এই কারণে পরস্পর বন্ধু সেজে রয়েছে যে, সালাহউদ্দিন আইয়ুবী তােমাদের সবারই শত্রু নতুবা তােমাদের পরস্পরের মধ্যে কোন বন্ধুত্বের বন্ধন নেই। আচ্ছা, আমাকে বলাে তাে, আইয়ুবীকে হত্যা করে তােমরা কি লাভ করতে চাও? তিনি মারা গেলে তখন তাে তােমরা নিজেরাই মারামারি করে মরবে।' 

গুমাস্তগীন চুপ। সে এসব প্রশ্নের কোনই জবাব দিল না। শেখ মান্নান আবার বললাে, “ভাই গুমাস্তগীন! খুব মনােযােগ সহকারে আমার কথা শুনে নাও! আইয়ুবীকে হত্যা করতে পারলেও তােমরা নতুন করে এই সাম্রাজ্যের এক ইঞ্চি জায়গা দখলে নিতে পারবে না। এ সাম্রাজ্য এখনাে আইয়ুবীই ধরে রেখেছেন। তিনি 
তার সৈনিকদের মধ্যে যে জাতীয় চেতনা ও জেহাদী জযবা সৃষ্টি করে রেখেছেন, সে কারণেই এখনাে খৃষ্টানরা এখানে দাঁত বসাতে পারছে না। 
তুমি যদি কাউকে হত্যা করতেই চাও, তবে সাইফুদ্দিনকে টার্গেট নাও। সাইফুদ্দিনকে হত্যা করে মুশেলের ওপর তােমার আধিপত্য কায়েম করাে। অবশ্য তাকে তুমি নিজেই হত্যা করতে পারবে, এ জন্য আমার সাহায্যের প্রয়ােজন নেই। সে তােমাকে বন্ধু হিসেবে জানে এবং তােমরা উভয়েই মিত্র বাহিনীর সদস্য। তাকে বিষ প্রয়ােগে হত্যা করতে পারে অথবা সুযােগমত আক্রমণ করেও হত্যা করতে পারাে। 
শেখ মান্নানের দীর্ঘ বৃক্তব্য শেষ হলাে। গুমাস্তগীন গভীর চিন্তায় ডুবে রইলাে এ বক্তব্য শুনে। কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর বললাে, যা, তুমি সাইফুদ্দিনকেই হত্যা করার ব্যবস্থা করাে। বলাে, এর বিনিময়ে তুমি কি চাও?' 
তােমার সখের হারান দুর্গ! শেখ মান্নান বললাে। 
‘তােমার মাথাটা তাে ঠিক আছে, মান্নান!’ গুমাস্তগীন বললাে, ইয়াকী রাখাে। হীরা, জহরত, অর্থ, সম্পদ ও বিত্ত দিয়ে তােমার মূল্য চাও।' 
‘ধন-রত্নের বিনিময়ে তােমাকে চারজন লােক দিতে পারি। শেখ মান্নান বললাে, কিন্তু এরা আমার গুপ্ত বাহিনীর সদস্য নয়। ওরা সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর স্পেশাল কমাণ্ডো। তাদেরকে এই দুই মেয়ে হাশিশ পান করিয়ে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। আমার কাছে এরা খুবই মূল্যবান সম্পদ। আমি এদেরকে অন্য কারাে হাতে ছেড়ে দেয়ার কথা কখনাে চিন্তাও করিনি, কারণ এমন যােগ্য ও দক্ষ কমাণ্ডো কোথাও পাওয়া যায় না। কপাল গুণে ওদের পেয়ে গেছি আমি। তুমি তাে জানাে, ফেদাইনদের হরেক রকম নেশার দ্রব্য ও সম্মোহন বিদ্যা যে কোন মানুষকে আমূল বদলে দিতে পারে। এই পরীরা তাদেরকে হাশিশের নেশায়, তাদের রূপ-যৌবনের নেশায়, এমন যােগ্য বানিয়ে নিবে যে, এরা শেষ পর্যন্ত আপন বাবা-মাকেও হত্যা করতে পিছপা হবে না। 
এই সম্পদ আমি হাত ছাড়া করতাম না, কিন্তু আমি তােমাকে নিরাশ করতে চাই না। তুমি কষ্ট করে এবং বড় আশা নিয়ে আমার কাছে এসেছে, এ জন্যই আমি এদেরকে তােমার হাতে তুলে দিতে রাজি হলাম। তুমি ওদের নিয়ে যাও, কিছু দিন এদেরকে আমার পরীদের দিয়ে স্বপ্নের জান্নাত দেখাও। তাদেরকে তােমার মহলের রাজকুমার বানিয়ে নাও। গােপনে মাত্রানুযায়ী হাশিশ পান করাও এবং কায়দা করে মদের মধ্যে ডুবিয়ে দাও, দেখবে তােমার ইশারায় ওরা নাচবে।' 
সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর কমাণ্ডোরা এত কচি খােকা নয়, যেমন তুমি বুঝাতে চাচ্ছে। গুমাস্তগীন বললাে। 
তুমি তাে জানাে গুমাস্তগীন, আমাদেরকে ফেদাইন বলা হয়। আমরা মানুষের মনস্তত্ব নিয়ে খেলা করি। শেখ মান্নান বললাে, আমরা আমাদের শিকারীকে মনভােলানাে স্বপ্নের রাজ্যে নিয়ে যাই। সম্মোহিত করে তাদেরকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাই যে, তার সামনে যা বলা হয় তাকেই সে বাস্তব মনে করে নেয়। তার সামনে নারীর সুন্দর ছবি এঁকে বলো, এ হচ্ছে বেহেশতের হুর, সে তাই বিশ্বাস করবে। হাতে পাথর দিয়ে বলল, এ হচ্ছে স্বর্ণের টুকরাে, সে তার হাতে স্বর্ণের টুকরােই দেখতে পাবে। তাকে নারীর বাহুলগ্ন করে দাও, খুব কম মূল্যে তার ঈমান ও বিশ্বাস কিনতে পারবে।' 
শেখ মান্নান তাকে আরাে বললাে, তুমি এই চারজনকে সঙ্গে করে নিয়ে যাও। একথা মনে করার কোন কারণ নেই যে, এরা তােমার উদ্দেশ্য সফল করতে পারবে না। শেখ মান্নান একটু হেসে বললাে, তুমি তােমার নিজেকে নিয়েই চিন্তা করাে। নারী, মদ ও বিলাসিতা তােমাকে কোথা থেকে কোথায় নামিয়ে নিয়ে এসেছে তুমি মুসলমান হয়েও মুসলমানের শত্রু হয়ে গিয়েছে।' 
দরদাম ঠিক করে শেখ মান্নান আন নাসের ও তার সঙ্গীদেরকে তুলে দিল গুমাস্তগীনের হাতে। বললাে, এদেরকে কারাগারে রেখে না বরং রাজপুত্রের মত রাখবে। 
গুমাস্তগীন তার পরামর্শ মেনে নিল। খাওয়া দাওয়ার পর এই বলে বিদায় নিল, দু'একদিনের মধ্যেই কমাণ্ডোদের নিয়ে আমি রওনা করতে চাই।' 
আপনি আমার মেহমান। যতক্ষণ খুশী থাকবেন, যখন ইচ্ছে বললেন, আমি আপনার যাত্রার ব্যবস্থা করবাে।' বললাে শেখ মান্নান।
গুমাস্তগীন খাওয়া দাওয়া শেষে সেখান থেকে বেরিয়ে এলাে। একটু পর সেখানে প্রবেশ করলাে মান্নানের এক নিরাপত্তা প্রহরী । জিজ্ঞেস করলাে, “আজ যে চারজন কমাণ্ডোকে ধরে আনা হয়েছে তাদের সম্পর্কে আপনার আদেশ কি? 
হারানের শাসক গুমাস্তগীন এসেছেন।' শেখ মান্নান বললাে, তিনি তাদেরকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন। তােমরা তাদের আহারাদি ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করাে। কিন্তু তাদেরকে কোথায় পাঠানাে হচ্ছে, তা ওদের বলার দরকার নেই। 
প্রহরী চলে গেল। সে আন নাসের ও তার সঙ্গীদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করলাে। খাবারের সামগ্রী তাদের সামনে দেয়ার পর আন নাসের খাবার খেতে অস্বীকার করে বললাে, ‘এ খাবার আমরা গ্রহণ করবে না, নিশ্চয়ই এতে হাশিশ মিশানাে আছে।' 

আন নাসের ও তার সাথীদের এমন সন্দেহের সঙ্গত কারণও ছিল। কারণ তাদের সামনে যে খাবার পরিবেশন করা হয়েছিল, তা ছিল উন্নতমানের শাহী খাবার। এমন খাবার সচরাচর সাধারণ লােকে খায় না। বন্দীদের জন্য এমন খাবারের ব্যবস্থা করার তাে প্রশ্নই উঠে না। 
প্রহরী অনেক কষ্টে তাদের বুঝালাে যে, এতে কিছু মিশানাে হয়নি। কেল্লায় শাহী মেহমান এসেছেন। তাদের সম্মানে এ রান্নার আয়ােজন করা হয়। অনেক করে বুঝানাের পর আন নাসের ও তার সাথীরা এ খাবারই খেতে রাজি হয়ে গেল, কারণ এমনিতেই তারা ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিল। 
শেখ মান্নান কারিশমাকে বললাে, তুমি চলে যাও, লিজা এখানেই থাকুক। 
কারিশমা বললাে, সে গত তিন চার দিন অনবরত সফরে ছিল, এখন তার বিশ্রাম দরকার। আজকের মত ওকে তার কামরায় যেতে দিন। 
শেখ মান্নানের মধ্যে তখন পশুত্ব জেগে উঠেছে। সে কারিশমার আবদারের তােয়াক্কা না করে হাত বাড়ালাে লিজার দিকে। তাকে ধরে টানা-হেঁচড়া করতে লাগলাে। লিজার মনে পড়ে গেলাে কারিশমার অনুরােধ, ফলে সে তেমন জোরালাে ভাবে বাঁধা দিতে পারছিল না। সে একেবেঁকে তার কবল থেকে মুক্ত হওয়ার কৌশল খুঁজতে লাগলাে। 
মান্নান যত দিয়ে টানাটানি করছে, পাশে দাঁড়িয়ে অসহায়ের মত এই অসভ্যতা দেখছে কারিশমা। লিজার মেজাজ ও চেহারা বিগড়ে গেছে ক্ষোভে। হঠাৎ কামর দরজা খুলে গেল! দারোয়ান বললাে, এক আগন্তুক আপনার সাথে দেখা করতে। চায়।' 
শেষ মান্নান রাগের সাথে বললাে, ‘গর্দভ, এটা কি কারাে সাথে সাক্ষাতের সময় ভাগাে এখান .....।
শেখ মান্নানের কথা তখনাে শেষ হয়নি, দরজা ঠেলে অনুমতি ছাড়াই ভেতরে ঢুকলাে এক আগন্তুক। দারােয়ানকে এক পাশে সরিয়ে মুখােমুখি হলাে শেখ মান্নানের। বিস্মিত শেখ মান্নান, লিজা ও কারিশমা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাে আগন্তুকের দিকে।

সে লােকটি ছিল এক খৃষ্টান ক্রুসেডার। সে যেই মাত্র কামরায় প্রবেশ করলাে সঙ্গে সঙ্গে শেখ মান্নান তাকে চিনতে পেরে তার নাম ধরে উৎসাহের সাথে বলে উঠলাে, আরে তুমি! আগন্তুক হাত বাড়িয়ে দিল, শেখ মান্নান সে হাত লুফে নিয়ে বললাে, কখন এলে?'
এই মাত্র।' 
“ঠিক আছে। এখন তাহলে গিয়ে বিশ্রাম করাে, সকালে তােমার সাথে আলাপ হবে। 
‘আমি হয়তাে সকালেই আপনার সাথে দেখা করতাম। ক্রুসেডার বললাে, কিন্তু এখানে এসেই জানতে পারলাম, এখানে আমাদের দুটি মেয়ে এসেছে। তাদের সাথে আমার জরুরী আলাপ আছে। আমি ওদেরকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে এসেছি।' 
ঠিক আছে তােমার লােক তুমি নেবে এতে আমার আপত্তির কি আছে। এখন গিয়ে বিশ্রাম করাে, সকালে আমি ওদেরকে তােমার কাছে পৌঁছে দেবাে।'
না!’ ক্রুসেডার প্রবল আপত্তি তুলে বললাে, “ওদেরকে আমার এখনি দরকার।' 
শেখ মান্নানের আঁতে ঘা লাগলাে। সে এ কেল্লার সর্বাধিনায়কই শুধু নয়, সারা দেশের ফেদাইনদেরও নেতা। যে ফেদাইনদের নাম শুনলে শিউরে উঠে আমীর ওমরা ও অভিজাত মানুষের বুক। গুপ্তহত্যার মত নিষ্ঠুর কাজে যাদের কোন জুড়ি নেই। সে কিছুটা ক্ষোভের সাথেই বললাে, কি এমন জরুরী বিষয় যে, এখন, এই মুহূর্তেই তা বলতে হবে। যদি এতােই জরুরী হয় তাহলে এখানে বসেই আলাপ শুরু করাে না কেন? 
খৃস্টান ক্রুসেডারদের তখন দাপটই ভিন্ন। ছােট ছােট মুসলিম রাজ্যের শাসক বা ফেদাইনদের মত খুনী ও সন্ত্রাসীরা তাদের অনুকম্পার ভিখারী । সে শেখ মান্নানের কথা গায়ে না মেখে 
ক্ষমতার দাপট জাহির করে বললাে, শেখ মান্নান, তুমি ভাল করেই জানাে আমি কি রকম ব্যস্ত। আর তুমি এ কথাও জানাে, এই মেয়েদের দায়িত্ব কি? তােমার কোলের কাছে বসে থাকা এদের দায়িত্ব নয়। আমি ওদের সাথে কি আলাপ করতে চাই তা এ মুহুর্তে তােমার না জানলেও চলবে। এখন আমি এই দু’জনকে নিয়ে যাচ্ছি। তােমার আর কিছু বলার আছে?
শেখ মান্নানকে এ প্রশ্নের জবাব দেয়ার সুযােগ না দিয়েই ক্রুসেডার মেয়ে দুটিকে বললাে, এসাে তােমরা, চলাে আমার সঙ্গে।'
লিজা ও কারিশমা দুজনেই দ্রুত আগন্তুকের পাশে গিয়ে দাড়ালাে।
তুমি কি আমার সাথে শত্রুতা সৃষ্টি করতে চাও?' শেখ মান্নান বললাে, তুমি এখনও আমার কেল্লার মধ্যে। আমি ইচ্ছে করলে তােমাকে অতিথি থেকে কয়েদী বানিয়ে দিতে পারি। তুমি কি তাই চাও? মেহমান না হয়ে বন্দী হতে চাচ্ছাে তুমি? সে গর্জন করে বললাে, মেয়েটাকে আমার কাছে রেখে তুমি এখন বাইরে চলে যাও।'
মান্নান!' খৃস্টান লােকটি দাঁতে দাঁত চেপে রাগে গর্জন করে বললাে, তুমি কি আসলেই ভুলে গেছাে, এ কেল্লা তােমাকে আমরাই উপহার দিয়েছিলাম? তুমি কি এই সত্যটুকুও ভুলে গেছে যে, আমরা যদি তােমাদের বাঁচিয়ে না রাখতাম তবে তুমি এবং তােমার ফেদাইন দলের অস্তিত্বই আজ বিলীন হয়ে যেতাে?'
শেখ মান্নানের মাথায় তখন মদের নেশার সাথে কেল্লা প্রধানের গর্ব এবং অহংকারও চেপে বসেছিল। উত্তেজনা উস্কে দিয়েছিল তার অহংবােধকে। সে যে এক গােপন খুনী চক্রের নেতা, যারা যে কোন সময় মানুষের সন্দেহের উর্ধে উঠে মানুষ খুন করতে পারে, এ চিন্তা ছড়িয়ে পড়েছিল তার মগজের কোষে কোষে। তার মনে পড়ে গেল, অতীতে খৃষ্টান অফিসারদের হত্যার কথা। পারস্পরিক শক্রতার কারণে এক অফিসার অন্য অফিসারকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে চাইলে সহযােগিতা নিয়েছে তার। সামরিক অফিসার ছাড়া প্রভাবশালী সাধারণ খৃষ্টানরাও কখনাে কেউ শক্রতার কারণে প্রতিদ্বন্দীকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে চাইলে তারই শরণাপন্ন হতাে। সে সব অভিযানের তুলনায় এক অর্বাচীন দেমাগী খৃষ্টানকে খুন করা তার কাছে কোন বিষয়ই ছিল না।
শেখ মান্নান ভাবছিল, এ লােকটি কি ভুলে গেছে, সে এখন কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। এই সে আছিয়াত, যে দুর্গকে মানুষ জানে প্রেতাত্মার কেল্লা বলে। এ কেল্লার মধ্যে একজন দুজন মানুষের গুম হয়ে যাওয়া কোন অস্বাভাবিক ব্যাপারই নয়। ফেদাইনরা ছিল আক্ষরিক অর্থেই নিরেট রক্তচোষা। দয়ামায়া বলে কোন কিছুর সাথে তাদের আদৌ পরিচয়ই ছিল না। খুন করা তাদের কাছে মুখের থুতু ফেলার সমতুল্য।
শেখ মান্নান তাকিয়েছিল দেয়ালের দিকে। এ কেল্লার দেয়াল ও কার্নিশ জুড়ে রং-বেরংয়ের কাঁচের নকশা, ঝাড়বাতির মায়াবী আলাে। এ সব দেখে এখানে এলে মানুষ ভুলে যায়, এই কেল্লার ভেতরে এবং তার আশেপাশে কত শত নির্দয় ও নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটেছে। আর এসব সমুদয় ঘটনার নেপথ্য নায়ক শেখ মান্নান। তার সামান্য ইশারার কাছে মানুষ কত অসহায়, জানে মান্নান। মানুষের সেই অসহায়ত্ব দেখতে দেখতে তার মনে জন্ম নিয়েছিল এমন এক অহমিকা, যার কারণে আক্ষরিক অর্থেই সে ধরাকে সরা জ্ঞান করতাে। পৃথিবীর দাম্ভিক সম্রাটদের চাইতেও নিজেকে অধিক ক্ষমতাবান ভাবতাে সে। আর এ ভাবনার কারণেই তার মধ্যে প্রবল হয়ে উঠেছিল পশুত্ব ও বর্বরতা। বন্য জন্তুর মতই হিংস্রতা গ্রাস করে নিয়েছিল তাকে।
লিজার মত এমন সুন্দরী মেয়েকে হাতছাড়া করতে চাইল না সে। যতটা সম্ভব নিজেকে দমন করে খৃষ্টান প্রতিনিধিকে বললাে, আমি তােমাকে আবারও চিন্তা করার সুযােগ দিচ্ছি। এই কেল্লাতে আল্লাহ প্রেরিত ফেরেশতাও গুম হয়ে যায়। আর সে গুমের খবর আল্লাহ পর্যন্ত জানতে পারে না। আমি এই মেয়েকে কেল্লার বাইরে যেতে দেবাে না। যদি তুমি জোর খাটাতে চাও তবে তুমিও কেল্লার বাইরে যেতে পারবে না। আমার এক সাথী এইমাত্র কেল্লার ফটক থেকে বিদায় নিল। খৃস্টান লােকটি বললাে, সে জানে আমি এখানে দু-তিন দিন থাকবে। এরপর আমিও গিয়ে শরীক হবে তাদের সাথে। যদি আমি যথাসময়ে সেখানে না পৌছি, তাহলে আমি যে এখানে বন্দী এ কথা তাদের জানতে বাকী থাকবে না। এর পরিণতি কি হতে পারে তা তােমাকে বুঝিয়ে বলার দরকার আছে বলে আমি মনে করি না।'
সে আরও বললাে, “আমি এখানে এসেছি এই অধিকার নিয়ে যে, এই কেল্লা আমাদেরই আশ্রয়স্থল ছিল। বিশেষ করে দূর পথের বিশ্রামাগার হিসাবে আমরা এটা ব্যবহার করতাম। তােমাকে অনুগ্রহ করে আমরা এই দুর্গ দান করেছি। কখনাে ভাবিনি, এর ফলে অতিথি হিসাবে এখানে আমাদের আর কখনাে জায়গা হবে না।'
‘স্বীকার করি, এ কেল্লা তােমরাই আমাকে দান করেছে। কিন্তু দান করার পরদিন থেকে এর মালিক আর তােমরা নও, আমি। আর আমি এটা তােমাদের কাছ থেকে এমনিতেই পাইনি, আমার অতীত কাজের পুরস্কার হিসাবেই এটা আমি পেয়েছি। তারপরও বরাবর আমি তােমাদের এখানে থাকতে দিয়েছি। কিন্তু তুমি অতিথির সীমা অতিক্রম করে কর্তৃত্ব ফলাতে চাইছাে। তুমিই আমাকে বাধ্য করছে তােমার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে।'
যদি তুমি আমাদের হাড় শুদ্ধ গায়েব করে দাও তবুও তােমাকে জিজ্ঞেস করা হবে, এখানে আমাদের এক লােক ও দু'টি মেয়ে ছিল, তারা কোথায়? এ প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হলে তার পরিণতি কখনাে শুভ হবে না। আগন্তুক খৃস্টানটি বললাে, কিন্তু একটি সুযােগ তােমাকে দিতে পারি। যদি তুমি সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীকে হত্যা করতে পারাে, তবে তােমাকে শুধু এই মেয়েটি কেন, এরূপ এক ডজন সুন্দরী মেয়ে দান করা হবে।
তুমি তাে আমাদের দেয়া অর্থ, সােনা-দানা সব হজম করে বসে আছ, অথচ চুক্তিমত এখনাে সুলতান আইয়ুবীকে হত্যা করতে পারোনি। তুমি বলেছে, তােমার চার ফেদাইন খুনীকে সুলতান আইয়ুবীর হত্যার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছে, কিন্তু বাস্তবে তার কোন প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। আইয়ুবী এখনও বহাল তবিয়তে আছেন ও বিজয়ীর বেশে সামনে অগ্রসর হলেন। ‘আমি মিথ্যা বলিনি। শেখ মান্নান রাগ সামলে বললাে, আমি চার ফেদাইনকে সত্যি পাঠিয়ে দিয়েছি। আশা করি কয়েক দিনের মধ্যেই তােমরা এ সুসংবাদ পেয়ে যাবে যে, সালাহউদ্দিন আইয়ুবী নিহত হয়েছে।'
তােমার এ আশা যদি সফল হয় তাহলে আমি অঙ্গীকার করছি, তােমাকে আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে যে সব পুরস্কার দান করা হয়েছে এবং হবে, সে সব পুরষ্কার ছাড়াও তােমাকে লিজার মত আরও দুটি মেয়ে আমার তরফ থেকে উপহার দেয়া হবে।
‘আচ্ছা, সেটা সময় হলেই দেখা যাবে!' শেখ মান্নানের কণ্ঠে আক্ষেপ ও আপােসের সুর, হ্যা, যাও একে নিয়ে যাও। আমি কেল্লার মধ্যে খৃষ্টানদের জন্য যে সব কামরা খালি করে রেখেছি, সে সব কামরাতে চলে যাও। সেখানে থাকো, খাও, পান করাে আর আমােদ-কূর্তি করে। কিন্তু চিন্তা করে উত্তর দিও, লিজাকে আমার কাছে রেখে যাবে কি না?
“ঠিক আছে আমি চিন্তা করে দেখবাে।' বললাে খৃস্টান লােকটি, তাহলে এবার আমরা যাই?
যাও। কিন্তু আমার অনুরােধের কথাটা মনে রেখাে। এই মেয়েটাকে তুমি আমার স্বপ্নপুরী থেকে বের করে নিয়ে যেও না। আমি তােমাকে পরিস্কার করে বলে দিতে চাই, একে কেল্লা থেকে বের করে নেয়াটা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারবাে না।
খৃস্টান অফিসার মেয়ে দুটিকে সঙ্গে নিয়ে বের হয়ে গেল। এ লােক ছিল খৃস্টান গােয়েন্দা বিভাগের এক অফিসার। গােয়েন্দাবৃত্তি ছাড়াও নাশকতামূলক কাজে যারা ওস্তাদ ছিল, সেই বিভাগের উর্ধতন কর্মকর্তা ছিল সে। সে এবং তার অন্যান্য সঙ্গীরা মুসলিম এলাকায় ঘুরে ফিরে গােয়েন্দাগিরি করতাে আর সুযােগ পেলেই লিপ্ত হতাে নাশকতামূলক কাজে। আছিয়াত দুর্গ শেখ মান্নানকে দান করার পরও এ কেল্লায়
খৃস্টানদের ছিল অবাধ যাতায়াত। এখানে তাদের জন্য আবাসিক ব্যবস্থা ছিল। যখন ইচ্ছা খৃষ্টানরা এখানে এসে থাকতে পারতাে। সাধারণত এ কেল্লাকে ওরা ব্যবহার করতে বিশ্রামের ঘাঁটি হিসাবে।
গােয়েন্দা বিভাগের লােকেরাই এখানে বেশী আসতাে। কারিশমারও জানা ছিল এ খবর। সেই সুবাদেই লিজা এবং আন নাসেরদেরকে নিয়ে সে এখানে এসেছিল। সঙ্গীদের নিয়ে এখানে আশ্রয় নেয়ার সময় সে ভাবতেও পারেনি, এখানে এসে সে এক অনাকাঙ্খিত সমস্যায় জড়িয়ে পড়বে।
খৃস্টান অফিসারটিরও জানা ছিল না, এখানে কারিশমা ও লিজারা এসেছে। মরুভূমির উত্তাপে ক্লান্ত হয়ে এখানে সে এসেছিল বিশ্রামের জন্য। ইচ্ছে ছিল, দু’একদিন বিশ্রাম নিয়ে আবার সে তার পথ ধরবে। কেল্লায় প্রবেশের সময় দ্বার রক্ষীদের কাছ থেকেই সে জেনেছিল, এখানে দুটি খৃষ্টান মেয়ে এসেছে। কে হতে পারে? প্রশ্নটা মনে উদয় হতেই মেয়েদের দেখার আগ্রহটা জেঁকে বসলাে তার মনে। খবর নিয়ে জানতে পারলাে, তারা এখন শেষ মান্নানের কাছে আছে। মেয়ে দুটিকে দেখার আগ্রহ নিয়ে সে শেখ মান্নানের মহলের ভেতরে প্রবেশ করলাে। কিন্তু প্রহরী তাকে বাঁধা দিতেই জেদ চেপে বসলাে মনে, প্রহরীকে গ্রাহ্য করে সে ঢুকে পড়লাে শেখ মান্নানের খাস কামরায়।
শেখ মান্নান তাকে চিনতাে। তার সাথে শেখ মান্নানের ঝগড়া হবে এমন ভাবনা তার মনে কখনাে উদয় হয়নি। কিন্তু কামরায় ঢুকেই সে এক অনভিপ্রেত পরিস্থিতির শিকার হয়ে গেল। ভাগ্য ভাল, বাগড়া শেষ পর্যন্ত খারাপের দিকে মোড় নিতে গিয়েও আর নেয়নি। নিলে পরিস্থিতি তার জন্য খারাপই হতাে। শেখ মান্নান তার স্বভাবের বিপরীতে আপােষ রফায় এসে বরং তাকে বাঁচিয়ে দিয়ে গেল। যেভাবে কথা কাটাকাটি ও উচ্চবাচ্য চলছিল, শেখ মান্নান নত না হলে ভয়ংকর দিকে গড়াতে পারতাে ঘটনা।
সে মেয়েদের নিয়ে বেরােতে বেরােতে বললাে, ঈশ্বর মঙ্গলময়! আরেকটু হলে একটা খুনাখুনি হয়ে যেতাে।
মেয়েরা এর কোন জবাব দিল না। চুপচাপ তার সাথে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল।
ওরা বেরিয়ে গেলে শেখ মান্নান হাত তালি দিল। সঙ্গে সঙ্গে সেখানে উদয় হলাে তার একান্ত নিজস্ব কিছু অনুচর। সে তাদের বললাে, “এই খৃষ্টান ও মেয়ে দুটি আমাদের বন্দী নয়, তবে তাদেরকে ইচ্ছামত কেল্লা থেকে বের হওয়ার সুযােগ দেয়া যাবে না। ফটকে বলে দাও, আমার অনুমতি ছাড়া এদের যেন বাইরে যেতে দেয়া না হয়। যখন চাইবে বাইরে যাবে, যখন ইচ্ছা আসবে এ অধিকার তারা নিজেরাই হারিয়েছে। বন্দী না হলেও কেল্লায় তাদের গতিবিধির ওপর কড়া দৃষ্টি রাখবে।' অনুচররা বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলে শেখ মান্নান তাদের ডেকে বললাে, আর শােন, গুমাস্তগীন যখন চায় তার যাওয়ার ব্যবস্থা করবে। মেয়ে দুটি সঙ্গে করে যে চার বন্দীকে নিয়ে এসেছে সে ওদের সঙ্গে করে নিয়ে যাবে।
হাঁটতে হাঁটতে খৃষ্টান গােয়েন্দা অফিসারকে কারিশমা জানালাে, ‘হারানের আমীর গুমাস্তগীন এখন এ কেল্লাতেই অবস্থান করছেন। তিনি সুলতান আইয়ুবীকে গােপনে হত্যা করার ব্যবস্থা করতে এখানে এসেছেন।'
তাকে আন নাসের ও তার সাথীদের সম্পর্কেও জানানাে হলাে। খৃষ্টান অফিসার বললাে, আগে কামরায় চলাে। ওখানে গিয়ে আলাপ করাটাই নিরাপদ। এ অবস্থায় আমাদের কি করণীয় তা খুব ভেবেচিন্তে ঠিক করতে হবে এবং আমাদের পরিকল্পনা শেখ মান্নানের লােকদের জানানাে যাবে না।'
সে মেয়ে দুটিকে কেল্লার এমন অংশে নিয়ে গেল, যেখানটা শুধু আগত খৃস্টান মেহমানদের জন্যই বিশেষভাবে নির্ধারিত ছিল। এ অংশটা খৃস্টানরাই নিয়ন্ত্রণ করতাে এবং এ অংশটুকুই ছিল এ কেল্লায় তাদের নিরাপদ স্থল।
সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী সাইফুদ্দিনের সেনাপতি মুজাফফরুদ্দিনের আক্রমণকে প্রতিরােধ ও প্রতিহত করে তাদের পিছু সরতে বাধ্য করেছিলেন। লড়াইয়ের প্রচণ্ডতায় তারা ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যে যেদিকে পারে পালিয়েছিল। বাকীরা হাতিয়ার ফেলে আত্মসমর্পন করেছিল। কিন্তু মুজাফফরুদ্দিন এ যুদ্ধে নিহত বা ধৃত হয়নি। সে যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। নিখোঁজ সেনাপতি কোথায় লুকিয়েছে আইয়ুবীর গােয়েন্দারা তখনও তার সন্ধানে চষে ফিরছে পাহাড়-প্রান্তর। সুলতান আইয়ুবী যেসব সৈন্যদের বন্দী করেছিলেন, তাদের মধ্যে ছিল সাইফুদ্দিনের বিশিষ্ট উপদেষ্টা ফখরুদ্দিন জঙ্গী । এক সময় তিনি মুশেলের প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন। সুলতান আইয়ুবী ফখরুদ্দিন জঙ্গীকে সাধারণ বন্দীদের থেকে পৃথক করে তাঁর তাঁবুতে নিয়ে এলেন এবং তাঁকে তাঁর যথাযােগ্য সম্মান ও মর্যাদা দিলেন। গনিমতের মাল ভাগ করে সুলতান আইয়ুবী প্রথমেই এই সিদ্ধান্ত নিতে বসলেন, আরও অগ্রসর হবেন, নাকি পলাতকদের পিছু ধাওয়া পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকবে এ অভিযান। ঐতিহাসিক বলেছেন, এ সময় সুলতান আইয়ুবী দোটানায় ভুগছিলেন। কিন্তু ইসলামের ইতিহাস এই বীর মুজাহিদের সুদূরপ্রসারী চিন্তা ও সিদ্ধান্তের সাক্ষ্য বহন করে। এটা সত্য, শক্ত সেনাদের বেধড়ক পিছু ধাওয়া করলে হয়তাে তিনি শত্রুদের আরাে ব্যাপক ক্ষতি ও ধ্বংস সাধন কতে পারতেন কিন্তু এতে তাঁর নিজের বাহিনীও ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হতাে।
তিনি সৈন্যদেরকে অধিক দূর পিছু অনুসরণ না করে ফিরে আসার হুকুম জারি করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, মুজাফফরুদ্দিনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে তিনি যে মূল্য দিয়েছিলেন, তা যেন আর না বাড়ে। কারণ এ যুদ্ধে তার সৈন্য বাহিনীর অনেক চৌকস যােদ্ধাকে শাহাদাত বরণ করতে হয়েছিল। আহতদের সংখ্যাও ছিল বেশ। এ জন্যই তিনি অভিযান চালাতে বা বেপরােয়া পিছু ধাওয়া করতে গিয়ে চিন্তায় পড়েছিলেন।
তিনি পিছু ধাওয়া করলে, রিজার্ভ বাহিনীকে ব্যবহার করতে হতো। কিন্তু তিনি তা করতে রাজি ছিলেন না। আরও একটি কারণে অভিযান বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। কারণটি হলাে, মুসলমানদের হাতে মুসলমানদের রক্তপাত তিনি বাড়াতে চাননি। জাতিকে এমন সংঘাত থেকে বাঁচানাের চেষ্টাই ছিল তাঁর সারা জীবনের সাধনা।
সুলতান আইয়ুবী সাইফুদ্দিনের নিজস্ব তাবুর সামনে
(চলবে)







শেয়ার করুন

Author:

আমি সজীব হোসাইন -এই ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা পাশাপাশি লেখালেখির কাজটাও করি। অনলাইনে প্রযুক্তির বিষয় নিয়ে যা জানি তা মানুষের মাঝে শেয়ার করার ইচ্ছায় এ ব্লগ টি তৈরি করা।