হাত ছাড়ো এটা বাসা না,
লোকজন তাকায়া আছে।
-দেখুক।
হাসবেন্ড এর হাত ধরতে জনগনের পারমিশন
নেয়া
লাগবে নাকি???
-এইবার আর কথা না বলে এক ঝটকায় জয়ার
হাতটা
নিজের বাহু থেকে সরিয়ে দিলো রিদিম।
মনে খুব কষ্ট পেলেও প্রকাশ না করে
স্বাভাবীক
ভাবে বল্লো
-বল্লেই তো পারতা,
এতো জোরে ধাক্কা দেয়া লাগে!!!
ব্যাথা পাই না বুঝি???
-আহ্লাদী বাদ দাও,
তুমি এখন কুচি খুকি না।
তুমি বিবাহীত,
রাস্তাঘাটে কীভাবে চলাফেরা করতে হয়
সেটা
তোমার জানা উচিৎ।
রিদিম এর এমন আচরনে জয়ার পুরাতন কথা
মনে পড়তে
লাগলো,
বিয়ের আগে একটু দেখা করার জন্য কতো
উদগ্রীব হয়ে
থাকতো রিদিম,
ওর জন্য বাসায় হাজার মিথ্যা বলে দেখা
করতে
আসতো সে।
হাতের ভিতর হাত দিয়ে জড়িয়ে না ধরলে
যেই
ছেলের পেটের ভাতই হজম হতো না,
আর আজকে হাত ধরছি এইজন্য সে এমন করতে
পারলো!!!
ভাবতেই চোখে পানি চলে আসলো জয়ার,
কিন্তু সে তা কিছুতেই বুঝতে দিলো না
রিদিমকে।
আজকে জয়ার বার্থডে,
সে জানে রিদিম সেটা ভুলে গেছে।
এই কদিনে এমন অনেক দিন গেছে যেগুলা
নিয়া জয়া
খুব এক্সাইটেড হলেও অন্যদিকে রিদিমের
তা মনেই
ছিলো না।
প্রথম দেখা,প্রথম ফুচকা খাওয়া,
প্রথম হাত ধরে হাটা ইত্যাদী।
এমনকি জয়া মনে করিয়ে দিলেও সে কোন
ভ্রুক্ষেপ
করেনি।
আজক কেন জানি গত বছরের বিয়ের আগের এই
দিনটির কথা মনে পরতেছে জয়ার।
কতো আনন্দে কেটেছিলো দিনটি,
সারাদিন কতো আনন্দ করেছিলো তারা...
সন্ধ্যায় চন্দ্রিমা উদ্যানের ঝিলে পা
ডুবিয়ে
সিঁড়িতে বসে রিদিমের কাধে মাথা
রেখে...
-আচ্ছা রিদিম,
-হুমম
-আমরা বিয়ে করবো কবে???
-হুমম
-কি হুমম???
-হুমম
-আমি কি বলেছি বলোতো??
-হ্যা
-হ্যা হুমম তোমারে গুইল্লা খাওয়াবো।
-হুমম
- আচ্ছা দাড়াও দেখাচ্ছি...
- এই এইইই কি করতেছো!!!
পরে যাবো তো।
-সেটাই তো করতেছি....
-আচ্ছা আচ্ছা ছাড়ো শুনতেছি...
বলো কি বলতেছিলা।
-আচ্ছা আমাদের প্রথম বাবুটা কি হবে?
ছেলে না মেয়ে বাবু???
-আমি কীভাবে বলবো?
আজব!!!
-বলোনা...
-মেলে।
-মানে???
-একটা মেয়ে একটা ছেলে,
মেলে।
-শয়তান!!!!
-তাইলে তুমি শয়তান এর ফিমেল ভার্সন...
জয়া মুচকি হাসি দিয়ে থেমে গেলো।
তারপর ক্ষনিক নীরবতা....
রিদিম অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জয়ার
দিকে।
-এই
-হুমম
-হাআআআ কইরা তাকাইয়া আছো ক্যান???
-দেখি
-কি দেখ???
-তোমাকে
-হইছে,আর দেখা লাগবে না।
-ক্যান তোমাকে দেখতে কি টিকিট কাটা
লাগবে???
-এভাবে তাকায়া আছো,
আমার লজ্জা লাগে না বুঝি!!!
-ওলে আমার লজ্জাবতীরে....
-এই দেখো তো ক'টাবাজে...
-মাত্র ৭টা
-ওহহো ৭টা বেজে গেছে আব্বু বাসায় আসার
সময়
হয়ে গেছে,
আমাকে যেতে হবে।
-আরেকটু থাকো না প্লিজজ....
জয়ার হাতটা ধরে রিদিম বল্লো।
-নাগো আর থাকা যাবে না।
আমারও তো ইচ্ছা করতেছে থাকতে,
কিন্তু আর দেরি করলে বাসায় সমস্যা হবে।
-আচ্ছা ময়না পাখি তো চলো তোমায় বাসায়
দিয়ে
আসি।
হঠাৎ ফোনের শব্দে ঘোর কাটলো জয়ার।
রিদিম ফোন দিয়েছে,
যা ভেবেছিলো তাই....
রিদিমের মনে নেই বিয়ের পর আজ জয়ার
প্রথম
বার্থডে।
অফিসের কাজে চিটাগাং চলে যাচ্ছে,
আজ ফিরবে না।
এট লিস্ট উইশটা তো করতে পারতো???
কীভাবে করবে তার তো মনেই নেই আজ তার
ওয়াইফ
এর একটা স্পেশাল ডে।
খুব কষ্ট পেলো জয়া,
মানুষ কীভাবে এতো তারাতারি বদলে
যায়!!!
কই সে তো বদলায়নি,
আগের মতোই ভালবাসে রিদিমকে।
তবে তার সাথে কেন এমন হচ্ছে???
সিনেমার নায়িকাদের মতো বালিশে মাথা
গুজে
চোখ,গাল, বালিশ অশ্রুজলে ভিজিয়ে এগুলোই
ভাবছিলো...
দু:খে অভিমানে বিষন্ন মনে গা এলিয়ে
দিলো
বিছানায়,
একটা সময় চোখ দুটো ধরে এলো।
হঠাৎ কলিংবেলের শব্দ,
আধো ঘুম মাখানো চোখ নিয়ে দরজা খুলতে
গেলো
জয়া,
চোখ ঘড়িতে আটকে গেলো!!!
রাত ১১.৪০
এতো রাতে কে আসলো???
দরজার অপর প্রান্তে তিশা,
জয়ার বাল্যকালের বান্ধবী।
দরজা খুলতেই ভূতের মতো ঘাড়ে চড়ে বসলো,
ঐ তুই কি পাইছিস হ্যা???
একটা ফোন নাই কিছু নাই,
এফ.বিতেও আসিস না।
বিয়ে কইরা জামাই পাইয়া সব ভুইলা গেছস
না???
এতোদিনের বান্ধবীও বাদ!!!
তুই কি ভাবছিস তুই আমাকে ভুলাগেছিস তাই
আমিও
ভুলে যাবো যে আজ তোর বার্থডে।
কক্ষনো না,
কই তোর জামাইটা কই,
ডাক দে ওরে,
একা একা বার্থডে করবা,
দাড়াও দেখাচ্ছি মজা।
আচ্ছা এতাদিন পর বাসায় আসছিস একটু
শান্ত হয়ে
বস,
আমি তোর জন্য চা করে নিয়া আসি...
(বলতে বলতেই চোখে পানি চলে আসছে
জয়ার)
-জয়া তুই কাদছিস ক্যান???
কি হইছে তোর?
মন খারাপ,ভাইয়া কিছু বলছে???
ভেজা বেড়ালটা কই লুকাইছেরে???
-ও বাসায় নেই।
-বাসায় নেই মানে!!!
কোথায়???
-অফিসের কাজে চিটাগাং গেছে।
-আজকে তোর বার্থডে সে জানে না???
-এগুলা নিয়া ভাবার টাইম কি আর উনার
আছে???
উনি তো খালি বিজনেস আর বিজনেস...
(আবারো
কান্নায় ভেংগে পড়লো)
তিশা মেয়েটা জয়াকে সান্ত্বনা দিয়েই
যাচ্ছে,
এই মুহুর্তে আর তো কিছু দেয়ারও নাই।
-থাক কাদিস না,
কাদলে তো আর সলিউশান হবে না,
তুই বরং ফ্রেশ হয়ে আয়,
আমরা ছাদে বসে গল্প করবো,তোর ভাল
লাগবে।
তিশা আর জয়া ছাদে একে অপরের মুখোমুখি
বসে
আছে,
-দেখছিস বিলাইটা থাকতে না পারুক একটা
ফোন
দিয়ে উইশ তো করতে পারতো?
-তুই ফোন দে,
-থাক উনার তো মনেই নাই,
পরে আবার ব্যাস্ততা দেখাবে বলবে পরে
ফোন
দিতে,
আরো রাগ লাগবে বাদ দে।
ঘড়িতে ১১.৫৯
.
.
হঠাৎ
হ্যাপী বার্থডে টু ইউ
হ্যাপী বার্থডে টু ইউ
হ্যাপী বার্থডে ডিয়ার জয়া
হ্যাপী বার্থডে টু ইউ....
মনে হচ্ছে ভয়েসটার সাথে কোন একটা
অবয়বও আস্তে
আস্তে সামনে আসছে....
মোবাইলের ঝাপসা আলোতে চেহারাটা
পরিচিত
মনে হচ্ছে জয়ার,
চারিদিকে আলো ছড়িয়ে
একে একে ২৩টি আতশবাজি আকাশের দিকে
ছুটে
চললো,
আজ জয়ার ২৩তম জন্মবার্ষিকী।
আকস্মিক ঘটনায় জয়া হকচকিয়ে গেছে।
সামনে দাড়ানো চিরচেনা রিদিমকেও
বিশ্বাস
করতে পারছে না,
একবার ওর দিকে তাকাচ্ছে আরেকবার
তিশার
দিকে।
তিশার মুখের বাকা হাসি দেখেই বুঝা
যাচ্ছে এগুলা
প্রি-এরেঞ্জড।
রিদিম- হা করে তাকাইয়া আছো ক্যান???
কেক কাটবা না?
-তুমি না চিটাগাং...
-যাই নাই,
তোমাকে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্যই তো...
-ভালইতো
সারাদিন আমাকে কাদাইয়া,
এত্তোগুলা পেইন দিয়া আসছে সারপ্রাইজ
দিতে!!!
-হি হি হি
-হাসি বন্ধ করো,
এর জন্য তোমাকে কঠিন শাস্তি পেতে হবে
-তাই নাকি!!!
কি শাস্তি?
-অফিস টাইম ছাড়া বাবুর দায়িত্ব সম্পূর্ণ
তোমার,
রাতে আমি ঘুমাইয়া পড়লে আর ডাক দিবানা,
ডায়পারটা যত্ন করে চেঞ্জ করে দিবা।
খবরদার যদি বাবুর ঘুম ভাংগছে তো পরের
দিন
খাবার অফ।
আর হ্যা শুক্রবার দিন বাবুর কাপড় চোপড়
ভালভাবে
ধুয়ে রোদে শুকিয়ে আনবা, বুঝছো???
-মানে কি!!!
বাবু আসলো কোত্থেকে!!!
এইসব কি বলতেছো???
-গাধা!!!
এইটার মানেও বুঝো না???
তুমি আব্বু হইতাছো আর আমি...
-এই কথা আগে বলো নাই ক্যান???
-বলার সুযোগ দিলা কই???
-আনন্দে মুখ দিয়ে আর কথা বের হচ্ছিলো না
রিদিমের।
অশ্রুসিক্ত নয়নে জড়িয়ে ধরলো একে
অপরকে...
উহু উহু(পেছন থেকে গলা দিয়ে শব্দ করলো
তিশা)
আমি কি দাড়িয়ে দাড়িয়ে আপনাদের
রোমান্স
দেখবো?
নাকি কেকও খাওয়াবেন।
সবাই একসাথে হেসে উঠলো,
রিদিম জয়াকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো,
এ বন্ধন আবেগের বন্ধন,
ভালবাসার বন্ধন,
সুনামি কিংবা নার্গিসের সাধ্য নেই ওদের
আলাদা
করার।
জয়া রিদিমের বাহুডোরে একটু ঠাই পাওয়ার
জন্য
নিজেকে আরো গুটিয়ে নিচ্ছে,
এ যেন পরম সুখ,
অসীম বিশ্বস্ততার অনূভুতি।
জয়া অনুভব করতে পারে যতোদিন তার মাথা
গুজার
জন্য এই বাহুটা আছে ততোদিন তার কিচ্ছু
হবে না।
মানুষটা কোন কষ্টের আঁচড়ই তার গায়ে
লাগতে দিবে
না।
এই বিশ্বাসটা দরকার,
ভালবাসার জন্য,বেচে থাকার জন্য।
আর ঐদিকে বেচারা রিদিম
এখনো কাদতেছে (খুশিতে) সারপ্রাইজ দিতে
এসে
নিজেই সারপ্রাইজড হয়ে গেলো।

0 coment rios:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন