সেমিস্টার ফাইনাল কাল থেকে। তূর্য
বরাবরই উদাসীন সবকিছু নিয়ে - হোক
তা পরীক্ষা, বন্ধুত্ব
কিংবা কারো প্রতি কোন কর্তব্য। এলোমেলো,
অগোছালো জীবনেই যেন সে অভ্যস্ত
হয়ে পড়েছে। পরিবার, বন্ধুত্ব, ভালবাসা -
সব অধ্যায়ে ব্যর্থতার সিল ছাপা তার
জীবনে। তাই এখন যেমন ইচ্ছা তেমন চলে,
কোন বাঁধন, কোন মায়া তাকে পিছু টানেনা।
"পরীক্ষায় বসতে হবে, বাবাকে আর কষ্ট
দেয়া যাবেনা " - এইসব সাত পাঁচ
ভেবে নোট খুঁজতে শুরু করে সে। ব্যাগ খুলতেই
দেখে এই সেমিস্টারের সকল লেকচার শীট
গুছিয়ে তার ব্যাগে রাখা! জয়া 'র কাজ।
পাগলী মেয়েটা! বন্ধুত্বের সেই শুরু
থেকে তূর্যকে গোছানোর চেষ্টায়
লেগে আছে। কিন্ত নিশ্চুপ ভাবে। তূর্যের খুব
কাছের বন্ধু হওয়া সত্বেও কখনো কর্তৃত্ব
ফলায় না। তবুও তূর্যের কাছে জয়াকে যেন
এক বোঝা মনে হয়। তার প্রতি জয়া কোন
প্রত্যাশা রাখেনা সে জানে, কিন্তু বড়
ঋণী সে মেয়েটার প্রতি। তার এই
একতরফা দানের প্রতিদান দেয়ার
মানসিকতা আজ বেঁচে নেই আর। তার
দেয়া অবহেলার স্বাদেও যেন জয়ার
কাছে তিক্ত না! অদ্ভূত এই মেয়েটি!
কিভাবে যেন তার মনের সব অবস্থা টের
পেয়ে যায়। কোন কোন রাতে ঘুম
না আসলে যখন বারান্দায় চুপ
মেরে বসে থাকে তখনই জয়ার
ক্ষুদেবার্তা আসে, "ঘুম আসছেনা?
খাসনি নিশ্চয়ই? কিছু খেয়ে শুয়ে পড়। ঝিম
ধরে বসে থাকলে ঘুম আসেনা। "
খুব আশ্চর্য লাগে তখন! পরীক্ষার দিন
সকালে যখন বাজে প্রিপারেশন
নিয়ে পরীক্ষায়
বসবে কি বসবেনা ভাবতে থাকে, তখন
দৈববাণীর মত ক্ষুদেবার্তা আসে,
"চিন্তা বাদ দিয়ে পরীক্ষায় বস, ক্লাস
তো করেছিস, কিছু না কিছু লিখে পাশ তুলেই
ফেলবি আমি জানি। গুড লাক! "
এসব ক্ষুদেবার্তার কোন জবাব
সে দেয়না কখনো। বুঝে, মেয়েটা কষ্ট পায়।
কিন্ত কেন যেন কোনকিছুতেই কিছু যায়
আসেনা তার। খুব খারাপ সে, আসলেই খুব
খারাপ।
পরীক্ষা দিয়ে কিছুক্ষণ এদিক ওদিক
হাঁটাহাঁটি করে তূর্য। পুকুর পাড়ে তার খুব
প্রিয় একটা জায়গা আছে।
সেখানে গিয়ে দেখে জয়া বসে আছে,
কানে হেডফোন,
একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে পানির দিকে।
পাশে বসে সে একটা হেডফোন নিজের
কানে গুঁজলো। "More than this "
বাজছে। তূর্যের খুব প্রিয় গান।
"তুই না ইংরেজী গান শুনিশ না? " তূর্য
বললো।
"শুনি না তো, র্যানডোমলি চলে এসেছে। "
হাসে তূর্য। জয়া মিথ্যা বললে মাটির
দিকে তাকিয়ে বলে, সে কি তা জানেনা!?
বোকা মেয়ে!
"পরীক্ষা কেমন দিলি? "
"ভালো। তোর মত পরীক্ষা নিয়ে উদাসীন
না আমি। "
"খোঁচা দিয়ে কথা বলিস কেন রে? "
"বাহ্, যে কোন কথাই বোঝেনা,
সে খোঁচা বুঝে? "
একটু হেসে চুপ হয়ে যায় তূর্য। জয়ার খুব মন
খারাপ কোন কারণে। কিন্তু কারো মন
ভালো করার ক্ষমতাই যে নেই তার। আর কোন
কথা বলছেনা জয়া। উঠে চলে আসে তূর্য।
অনেক দূরে গিয়ে কি মনে করে যেন
পিছে ফিরে। জয়া তাকিয়ে নেই!! সবসময়
সে দৃষ্টির আড়াল না হওয়া পর্যন্ত
তাকিয়ে থাকে মেয়েটা। কি হয়েছে আজ
জয়ার?
রাতে কল করে জয়া।
"তূর্য, বলা হয়নি তোকে। বাসায় আমার
বিয়ের আলাপ চলছিল। কালকে ছেলের
সাথে দেখা করতে যাব। আমি মত দিলেই
পাকা কথা দেয়া হবে।
কি পরে যাবো বলতো? "
কি ভয়ংকর রকম শীতল কণ্ঠ জয়ার!এই
জয়াকে চেনেনা সে!
"পর, যা খুশি! "
"আমাকে কোন কালারে মানায় তূর্য? "
তূর্য জানে আকাশী রং এর
শাড়ি তে মেয়েটাকে এক খন্ড আকাশ
মনে হয়। কিন্তু কষ্ট দেয়া যে তার স্বভাব!
"এতকিছু কে খেয়াল করেছে?
একটা রং পরলেই হলো! "
"হুম্, আচ্ছা রাখি। "
খট্ করে ফোন রেখে দেয় জয়া। বড়
কানে বাজে তূর্যের। "আচ্ছা রাখি " বলার
পরও দীর্ঘসময় ফোন
কানে চেপে বসে থাকতো জয়া। তূর্য
না রাখা পর্যন্ত কোনদিন ফোন
রাখেনি সে!
গভীর রাত। কোনভাবেই ঘুম
আসছেনা তূর্যের। ফোন
নিয়ে নাড়াচাড়া করলো কিছুক্ষণ। জয়ার
কোন ক্ষুদেবার্তা নেই।
ভালো লাগছেনা কেন ব্যাপারটা?
পরশু আরেকটা পরীক্ষার। ব্যাগ
খোলে সে নোটের জন্য। নাহ্, কোন নোট নেই!
হঠাৎ এক তীব্র বিষন্নতা ভর করে।
নিজেকে এত নিঃসঙ্গ
কখনো মনে হয়নি তার! অনেকদিন
থেকে মেয়েটার কোন কল, কোন টেক্সট কিচ্ছু
নেই। এমন শূন্যতার সাথে সে কি পরিচিত?
তার পাশে জয়ার খুব অভাব অনুভব করছে সে।
তার পিছুটানহীন মন আজ ভীষণ ভাবে পিছু
টানছে। এই অগোছালো জীবনটা গোছানোর
জন্য জয়াকে তার খুব দরকার। নিশ্চুপ
ভাবে সরে গেছে জয়া, অথচ এই
নীরবতা কি সরব ভাবেই না তার
অনুপস্থিতি জানান দিচ্ছে। খুব
কি দেরি করে ফেললো সে? দীর্ঘদিন
অব্যবহৃত তার ফেইসবুক একাউন্টে ঢোকে সে।
জয়ার প্রোফাইলে যায়। জয়ার কালকের
পোস্ট,
"যদি আজ বিকেলের ডাকে
তার কোন চিঠি পাই?
যদি সে নিজেই এসে থাকে?
যদি এতকাল পরে তার মনে হয়
দেরি হোক, যায়নি সময়??.... "
এক প্রশান্তিতে ভরে যায় তূর্যের মন!
আকাশী রং এর একটা শাড়ি আর জয়ার খুব
পছন্দের রূপার পায়েল কেনে সে।
ক্যাম্পাসের সেই পুকুরের পাড়ে বসে এক
ক্ষুদেবার্তা পাঠায় জয়াকে,
"পুকুর পাড়ে একটু আসবি? কাজল দিতে ভুলিস
না যেন! জানিস, টলমলে জলে তোর চোখের
কাজল যখন লেপ্টে যায়, দারুণ দেখায়
তোকে! .....
লিখেছেন - Iffat Noshin Juthi

0 coment rios:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন