আজ নিলার বিয়ে।
বিয়ে উপলক্ষে পুরো বাড়ি জমকালো ভাবে সাজানো হয়েছে।
আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব
দিয়ে বাড়ি ভরপুর। নিলা অনার্স দ্বিতীয়
বর্ষে পড়াশুনা করছে। তার মা বাবার
পছন্দের ছেলের
সাথে বিয়ে হচ্ছে। যদি ও বিয়েতে নিলার
কোন মতামত নেয়া হয় নি। লাল
বেনারসি শাড়িতে নিলাকে সত্যিই অসম্ভব
সুন্দর লাগছে। লাল রং টায়
নিলাকে বরাবরই সুন্দর মানায়।
দূরে দাঁড়িয়ে সায়ন মুগ্ধ
হয়ে নিলাকে দেখছে। সায়ন কল্পনায়
যেমনটা দেখেছিল তার থেকে ও একটু
বেশীই সুন্দর লাগছে আজ।
সায়ন নিলার ক্লাসমেট এবং অনেক ভাল
বন্ধু। যদিও এই বন্ধুত্বের মাঝে কখন
যে মনে মনে নিলাকে ভালোবেসে ফেলেছে তা সে নিজে ও
জানে না। কিন্তু কখনো সেই ভাল লাগার
কথা নিলাকে বলার মত সাহস হয় নি।
যদি নিলা আবার তাকে ভুল
বুঝে দূরে চলে যায় তাই। বিয়ের
অনুষ্ঠানে সায়ন আসতে চায় নি। নিলার
অনেক চাপাচাপির করণেই তার আজ আসা।
সবাই বিভিন্ন কাজ নিয়ে ব্যস্ত কিন্তু
সায়ন
চুপচাপ এক কোণায়
দাঁড়িয়ে নিলাকে দেখছে। এরই
মাঝে অন্যান্য বন্ধুরা তাকে কয়েকবার
করে ডেকে গিয়েছে কিন্তু সেদিকে তার
কোন খেয়াল নেই। কেন জানি সায়নের
মনে হচ্ছে যে আর কোন দিন
সে নিলাকে দেখতে পাবে না।
নিলা আজকের
পরে থেকে অন্যকারো হয়ে যাবে। আর
কখনো হয়ত মন
খুলে নিলার সাথে কথা বলতে পারবে না,
অকারণে ঝগড়া করতে পারবে না। হঠাৎ সব
কিছু শূণ্য শূণ্য লাগছে। মনে হচ্ছে জীবন
থেকে অনেক মূল্যবান কিছু
সে হারিয়ে ফেলছে। তার কল্পনার মনের
মানুষটা আজ তার থেকে অনেক
দূরে চলে যাচ্ছে।
এই সব ভাবতে ভাবতে কখন যে তার
পাশে এসে নিলা দাঁড়িয়েছে সেটা সে খেয়ালই
করে নি। কিরে হাবার মত এই
খানে একা একা দাঁড়িয়ে আছিস ক্যান?
সায়ন একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, কিছুনা,
এমনি দাঁড়ায় আছি। তুই এই খানে ক্যান?
একটু পরে তো বর যাত্রী চলে আসবে।
নিলা একটু হেসে বলল, হুম আসবে।
তোকে অনেক্ষণ থেকে একা একা চুপ চাপ এই
খানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এলাম। তোর
কি কোন কারণে মন খারাপ?
সায়ন মুচকি হেসে বলল, আরে নাহ।
এমনি দেখতেছিলাম বিয়ের আয়োজন।
ভাবতেছিলাম যে কি কি খাব তোর
বিয়েতে। এই মূহর্তে সায়নের
ইচ্ছে করছে নিলার হাত
দুটো ধরে বলতে যে তোকে অনেক
ভালোবাসি, তুই অন্য
কারো হবি এটা মেনে নিতে আমার অনেক
কষ্ট হচ্ছে। তোকে ছাড়া বাকিটা জীবন
চলতে পারব কিন্তু সেটা হবে অনেক
কষ্টের।
এই কথা গুলো বলার মত সাহস সায়ন এর হয়ত
কখনোই হবে না। সবাই
ভালোবাসতে পারলে ও সেই
ভালোবাসাটা প্রকাশ করার ক্ষমতা সবার
মধ্যে থাকে না। হঠাৎ নিলা বলল, জানিস
সায়ন আমার না একটু ও
বিয়ে করতে ইচ্ছা করছে না। মনে হচ্ছে সব
ছেড়ে দূরে কোথাও পালিয়ে যাই। নিলার
খুব বলতে ইচ্ছা করছে সায়ন তুই কেনো বুঝিস
না যে তোকে ছাড়া অন্য
কাউকে বিয়ে করাটা আমার জন্য অসম্ভব।
ভালোবেসে ও মিথ্যা ভালো না বাসার
অভিনয় করাটা অনেক কঠিন এবং অনেক
কষ্টের।
কি আজেবাজে কথা বলতেছিস এখন? একটু
পরেই তোর বিয়ে। এই সব চিন্তা বাদ
দিয়ে গিয়ে রেডি হয়ে নে। আমি একটু ওই
দিকে গিয়ে দেখি আর সবাই কি করছে।
বলেই সায়ন দ্রুত নিলার
সামনে থেকে চলে যায়। নিলার
চোখে পানি চলে এসেছে। কেন কেউ
তাকে বুঝতে চায় না। বর চলে এসেছে। আর
কিছুক্ষণ পরে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু
হবে। সবাই সে সব নিয়ে ব্যস্ত। সায়নের
আর ইচ্ছা করছে না এইখানে থাকতে। কেমন
যেন এক রকম অস্বস্তি লাগছে। কাউকে কিছু
না বলেই সে নিলাদের বাসা থেকে বের
হয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটছে। কোথায়
যাবে বুঝতে পারছে না। আজ নিজেকে খুব
অসহায় লাগেছ। সায়ন আর
হাঁটতে পারছে না। তার পা দুটো যেন অনেক
ভারি হয়ে আসছে। রাস্তার
পাশে একটা যাত্রী ছাউনিতে মাথা নিচু
করে বসে আছে সায়ন। সব কিছুই কেমন যেন
ঝাপসা হয়ে আসছে।
নিলাকে ছাড়া বাকিটা পথ
সে কিভাবে একা একা চলবে? পাশেই কোন
একটা দোকানে। সায়নের অনেক প্রিয়
একটা গান বাজছিল....
'' বন্ধু আমার চুল গুলো দেখ্ কেমন এলোমেলো,
তুই কাছে নেই শান্ত আমি, কোথায়
যে পালালো....
তোরই ঠোঁটের ডান দিকের ওই ছোট্ট
কালো তিল, একটু ছুঁতেই মনের মাঝে উষ্মতার
মিছিল...
তুই নামের এক রং এ আঁকা আমার এ পৃথিবী,
বলনা বন্ধু আছিস কোথায় কবে আমার
হবি???
স্বপ্ন গুলো দিচ্ছে ছাড়ি রাখছি কেন দূরে,
তোকে ছাড়া স্বপ্নগুলো স্বপ্ন হয় কি করে....
সময় টার ও মনটা খারাপ আজ, ইচ্ছেদের ও
অনশন... তোর গল্পটা লিখতেই হবে, মন
চাইবেই যখন...।।।''
গানটা শুনতে শুনতে কখন যে সায়নের
চোখে পানি চলে এসেছে সে বুঝতেই
পারে নি। হঠাৎ তার কাঁধে কে যেন হাত
রাখল, সায়ন চমকে গিয়ে তাকাতেই
দেখে সামনে তার পৃথিবীর সব থেকে প্রিয়
মানুষ টা দাঁড়িয়ে আছে। নিলার চোখ
দিয়ে পানি পরছে। কাপুরুষের মত সব
বিসর্জন দিয়ে বসে বসে কাঁদলেই সব
পাওয়া যায় না গাধা। তুই মহাপুরুষ
না যে মন থেকে চাইলেই সব পাবি। তোর
মত নিবন্ধিত গাধা এবং ভীতু কাপুরুষ
কে কিভাবে এতটা ভালোবাসলাম সেটাই
বুঝি না, একটানা কাঁদতে কাঁদতে কথা বলেই
যাচ্ছে নিলা। সায়নের এই সব কেন যেন
স্বপ্নের মত লাগছে। হয়তো হ্যালুসিনেশন
হচ্ছে। এবার সত্যি সত্যিই মনে হয় সায়ন
পাগল হয়ে যাবে। কি হচ্ছে এসব??? কোন
কথা বলছিস না কেন তুই? এই রকম হাবার
মত তাকিয়ে আছিস কেন? অসম্ভব রাগ
হচ্ছে নিলার। সায়ন
কি বলবে বুঝতে পারছে না। কাঁদার সময়
রেগে গেলে তো তোকে অনেক সুন্দর দেখায়,
কথাটা বলা মাত্র
নিলা সায়নকে একটা থাপ্পর দিল। থাপ্পর
খেয়ে সায়ন একটু অবাক, কিন্তু অনেক খুশি।
তার সামনে যা হচ্ছে তা কল্পনা বা স্বপ্ন
না, বাস্তব। নিলা তুই এখানে ক্যান?
নিলা কোন উত্তর না দিয়ে কেঁদেই যাচ্ছে।
আশে পাশের উৎসুক মানুষ একটু হতবাক হয়েই
তাকিয়ে আছে।
-তুই
বিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে আসলি কিভাবে?
-তোর মত ভীতুর সে সব না জানলে ও চলবে।
আমি তোর মত গাধা না যে সব কিছু বিসর্জন
দিয়ে সারাটা জীবন কষ্ট পাবো। তুই
তো কিছু পারবি না তাই মেয়ে হয়ে ও
আমাকে এত কিছু করতে হল।
যাত্রী ছাউনীতে পাশাপাশি বসে থাকা ছেলে মেয়ে দুটোর
চোখে পানি দেখে আশে পাশের মানুষ
গুলো একটু আবাক। কিন্তু তারা কেউ
জানে না যে এটা কষ্টের না, সুখের পানি।
হারানো না, কাছে পাওয়ার অসীম আনন্দের
চোখের পানি। হারিয়ে ফেলার
পরে ফিরে পাওয়ার মধুর সুখ। সায়নের কেন
যেন এত সুখের মূহর্ত টা বিস্বাস করতে একটু
কষ্টই হচ্ছে। সত্যিই কি উপর ওয়ালা এত
টা ভাগ্যবান করে পাঠিয়েছে??? তার মত
ভীতু কাপুরুষ ছেলের জন্য
এতটা পাওয়া প্রত্যাশার ও বাইরে।
নিজেকে অনেক সুখী মনে হচ্ছে।
বৃষ্টিতে ভেজার কষ্ট না পেয়ে ও আজ
সে রংধনু পেয়েছে। সবার
কপালে হয়তো এতটা সুখ লেখা থাকে না।।।। —

1 coment rios:
Niccc
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন