শনিবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০১৮

দোলনচাঁপা


শুভমিতা বসেছিল শান বাঁধানো পুকুর ঘাটের
শেষ ধাপটিতে। শুভমিতার
পাশে কয়েকদিনের
পুরনো শুকিয়ে যাওয়া দোলনচাঁপা পড়েছিল
নিতান্ত অবহেলায়। পশ্চিমের দিগন্ত
রেখায় সূর্যের রেখে যাওয়া লালচে আভা,
শুভমিতার চোখের বাসি কাজল, শুভমিতার
এলো খোপা থেকে বের হয়ে আসা কিছু অবাধ্য
চুল। তবুও সব ছাড়িয়ে নিশ্চুপ শুভমিতার
হাতের অনামিকার আংটি জ্বল জ্বল
করে ওঠে। কাল বিকেলে আশীর্বাদ
হয়ে গেছে শুভমিতার। বরপক্ষ
দেরী করতে চায় না। বিয়েটা হবে খুব
শীঘ্রই, হয়ত এ সপ্তাহ কিংবা ঐ।
দেরী শুভমিতাও করতে চায় নি। তাই কাল
যখন হুট করে আশীর্বাদ হয়ে গেল তখন
আজকেই শুভমিতা বের হয়ে পড়েছিল অজিতের
খোঁজে। যাকে ছাড়া চোখের কাজল,
এলো খোপা কিছুই ভাল লাগে না শুভমিতার।
অজিত শুভমিতাদের সাথেই পড়ত,
বাংলা সাহিত্যে। নিজের অজান্তেই
অজিতের সাথে বাঁধা পড়ে যায় শুভমিতা।
ছেলেটার বোকা বোকা চাহনি, সরল
হাসি আর এলোমেলো চুল শুভমিতাকে পাগল
করে দিত। অজিত যখন ভরাট কণ্ঠে গাইত বধূ
কোন আলো লাগল চোখে, তখন শুভমিতা ঠিক
ঠিক নিজেকে বধূ রুপে কল্পনা করতে পারত।
গাইতে থাকা অজিত হয়ত কখনো শুভমিতার
গালের লালচে আভা খেয়াল করেছিল, আবার
হয়ত কখনো করেনি।
আজ সকালেই তো, শুভমিতা অজিতের বাড়ির
অদূরে দাঁড়িয়েছিল। মাঝে মাঝে যখন
মাসের পর মাস অজিতের দেখা থাকে না,
তখন এখানেই
দাঁড়িয়ে শুভমিতা অজিতকে খবর দেয়। রোজ
দুপুরবেলা অজিতকে ঠিকই
বাড়িতে পাওয়া যায়। আজও খুব
সহজে টোকাই খোকনকে পাওয়া গিয়েছিল,
শুভমিতাদের বার্তা বাহক।
শুভমিতাকে দেখেই খোকন জীর্ণ জামার বুক
পকেট থেকে একটা মলিন চিঠি বের
করে দিয়েছিল। চিঠিটা হাতে দিয়েই
খোকন মাথা নিচু করে ছুটে পালিয়েছিল।
শুভমিতার বুক কেঁপে উঠেছিল
অজানা শঙ্কায়।
কাঁপা কাঁপা হাতে চিঠি খুলে পড়েছিল
শুভমিতা।
শুভ,
ক্ষমা করো। বড় অসময়ে চলে যেতে হল।
তোমাকে অপেক্ষা করতে বলার কোন অধিকার
নেই। তোমাকে অন্যকারো হতে বলারও সাহস
নেই। শুধু বলি ভালবাসি।
তোমার
অজিত
শুভমিতার পুরো পৃথিবীটা দুলে ওঠেছিল।
দুপুরের ঝা ঝা রোদে শুভমিতার হঠাৎ খুব
শীত করেছিল, মনে হয়েছিল এই
পুরো পৃথিবীতে ওর মত একলা আর কেউ নেই।
শুভমিতা ধপ করে বসে পড়েছিল রাস্তার
পাশের পরিত্যাক্ত বেঞ্চিতে।
আলগা হয়ে যাওয়া হাতের
মুঠো থেকে দুপুরের লু
হাওয়া চিঠিটা উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল।
ওটা হারিয়ে গিয়েছিল কোন প্রেমহীন
নগরের রাস্তায়।
দুপুরের রোদ
পড়ে এলে শুভমিতা নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল।
উঠে পড়েছিল নিজ ঠিকানায় ফেরার
উদ্দেশ্যে। রিক্সায় ওঠার ঠিক পূর্ব
মুহূর্তে কোথা থেকে যেন খোকন এসে হাজির
হয়েছিল। হাত বাড়িয়ে দু দিনের
পুরনো দোলনচাঁপা এগিয়ে দিয়েছিল।
শুভমিতা বিষণ্ণ হাসি হেসে খোকনের
মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিল।
কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলেছিল,‘ভাল থাকিস।’
এরপর
শুভমিতা দোলনচাঁপা হাতে নিয়ে চলে এসেছিল,
ফিরে এসেছিল মৃত নগরীতে।
শুভমিতার ঠিক মনে পড়ে সেদিনের কথা।
ঝির ঝির বৃষ্টিতে কলেজে খুব বেশী কেউ
আসেনি সেদিন। দুপুরের দিকে নামল ঝুম
বৃষ্টি। একটানা বৃষ্টি ঝরছে আকাশ থেকে।
শুভমিতা উদাস হয়ে তাকিয়ে থাকে উপরের
মেঘ কেটে যাওয়া সাদা বৃষ্টি আকাশের
দিকে। মাঝে মাঝে বৃষ্টির ছাট
এসে ভিজিয়ে দেয় শুভমিতাকে।
শুভমিতা তখন খেয়াল করলে দেখত
একটা ছেলে সেই বৃষ্টি মাথায়
করে কলেজে ঢুকছে। অজিত যখন শুভমিতার
সামনে এসে দাঁড়ায় তখন সে ভিজে চুপচুপে।
চোখ গোলগোল করে তাকিয়ে থাকে শুভমিতা।
শুভমিতাকে অবাক করে দিয়ে অজিত ব্যাগ
থেকে বের করে এক গুচ্ছ
টাটকা বৃষ্টি ভেজা দোলনচাঁপা।
মুঠো ভর্তি দোলনচাঁপা এগিয়ে দিয়ে অজিত
বলেছিল,‘আমার বৃষ্টি দিনের
দোলনচাঁপা হবি? আমি তোর রোদ বিকেলের
কৃষ্ণচূড়া হব।’
‘মিতা’, ভেতর থেকে ভেসে আসা মায়ের
কণ্ঠে শুভমিতার ধ্যান ভাঙে।
পাশে পড়ে থাকা দোলনচাঁপা গুলোকে টলটলে পানিতে ভাসিয়ে দেয়
সে। বুক ভরে একটা নিঃশ্বাস
নিয়ে উঠে পড়ে শুভমিতা। মা একবার
ডাকলে বারবার ডাকতে থাকেন যতক্ষণ
না পর্যন্ত তার ডাকের সাড়া দেওয়া হয়।
কাল থেকে মা ভীষণ খুশি। কাল রাতেই
তো পুরনো আলমারির ভেতর থেকে ডজন
খানেক শাড়ি বের করে এনে শুভমিতার
গায়ে লাগিয়ে দেখছিল। বিয়ের তোড়জোড়
কাল থেকেই শুরু করে দিয়েছেন মা।
টানাটানির সংসারে বোধহয় বিয়ের যোগ্য
মেয়েদের রাখতে বড় ভয় করেন মায়েরা।
তাই মেয়ের বিয়ের কথা শুনতেই
খুশিতে ঝলমলিয়ে ওঠে মায়ের মন।
শুভমিতা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মায়ের
ঘরে ঢোকে। মায়ের
হাতে একটা চকচকে সিতা হার
দেখে শুভমিতা চমকে ওঠে। ওদের ছা-
পোষা সংসারে সাধারণ হার তো দূরের
কথা মায়ের কানে এক জোড়া দুল পর্যন্ত
নেই! সেখানে এই সিতা হার
কোথা থেকে আসল?
শুভমিতাকে দেখে মা হাসতে হাসতে এগিয়ে এল।
শুভমিতাকে হাত
ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে আয়নার
সামনে বসিয়ে দিল। হার টি শুভমিতার
গলায় পরিয়ে মা বলতে থাকেন,
‘বাহ! খুব সুন্দর মানিয়েছে তো তোকে। কত
কষ্ট করে যে রেখেছিলাম এটা! তোর
জন্মের দিন তোর দিদিমা এটা আমার
হাতে দিয়ে বলেছিলেন খুব
সাবধানে রাখতে। তোর বিয়েতে তোর
দিদিমার আশীর্বাদ।’
মায়ের প্রতিটা কথার
মাঝে যে ভালবাসা শ্রদ্ধা ছিল
সেটা  শুভমিতাকে বেশ নাড়া দিয়ে যায়।
শুভমিতা চোখ নামিয়ে ফেলে। গলার
কাছে জমে থাকা হাজার রকম
অনুভূতিরা চোখে দিয়ে নেমে পড়ে।
‘ছিঃ মা। এভাবে কাঁদতে হয়?’ মায়ের
গলাতেও কেমন জানি কম্পনের অস্তিত্ব টের
পায় শুভমিতা। সাঁজ প্রদীপের আলোতে দুজন
ভিন্ন বয়সের নারী কাঁদতে থাকে। একজন
সব পাওয়ার আনন্দে, অন্যজন নিজের
পৃথিবী হারিয়ে অন্যরকম
ভালবাসা খুঁজে পাওয়ার আনন্দে। —দোলনচাঁপা

শেয়ার করুন

Author:

আমি সজীব হোসাইন -এই ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা পাশাপাশি লেখালেখির কাজটাও করি। অনলাইনে প্রযুক্তির বিষয় নিয়ে যা জানি তা মানুষের মাঝে শেয়ার করার ইচ্ছায় এ ব্লগ টি তৈরি করা।