সোমবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০১৮

অসমাপ্ত চিরকুট


 আপনি কি সবসময়েই এরকম চুপচাপ থাকেন?
- কিরকম চুপচাপের কথা বলছেন?
- মানে? চুপচাপেরও আবার রকম হয় নাকি!
- আরে আপনিই তো বললেন "এরকম চুপচাপ", তাই
ভাবলাম আপনি হয়ত কোনও বিশেষ রকম চুপচাপের
কথা বলছেন।
- এ তো আচ্ছা মুশকিল হলো রে বাবা। আপনি
সোজা কথাকে এরকম জিলিপির মত প্যাঁচাচ্ছেন
কেন বলুনতো?
- আপনি যদি প্যাঁচিয়ে প্রশ্ন করেন তাহলে তার
উত্তর সোজাভাবে দিই কি করে বলুন?
- আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর কোথায় দিলেন?
আমার প্রশ্নের পিঠে তো আপনিই প্রশ্ন করে
বসলেন।
- প্রশ্ন না বুঝলে উত্তর কিভাবে দেব?
- হয়েছে হয়েছে, আর প্রশ্ন বুঝে কাজ নেই।
আমি আমার উত্তর পেয়ে গেছি। আপনাকে ঘাটিয়ে
কাজ নেই। আপনি একটা প্যাঁচানো ইয়ে..
- এই ইয়েটা আবার কি?
- জিলিপি।
- কিইই??
.
আর কিছু না বলে মেয়েটা চলে গেল। ও
আমাদের অফিসেই চাকরি করে। দু মাস হল জয়ন
করেছে । ওর নামটা বড় অদ্ভুত, সুপ্রভা।
সুপ্রভাতের ত বাদ দিলে যা থাকে তাই। এরকম নাম
মানুষ কেন যে রাখে বুঝিনা। মেয়েটি যেমন
অদ্ভুত তার নামও অদ্ভুত। এই মেয়েটার আচরণেই
বুঝা যায় ও মারাত্মক শয়তান একটা মেয়ে। আমাকে
বলে কিনা আমি একটা প্যাঁচানো জিলিপি?? আমার তো
মনে হয় অফিসে কাউকেই শান্তিতে কাজ করতে
দেয় না। তবুও কেন যে সবাই ওর সাথে হেসে
হেসে কথা বলে বুঝিনা। আমার সাথে ওর তেমন
কোনও কথা হয়নি। ও অনেকবার আমাকে ওদের
আসরে সামিল করার চেষ্টা করেছে আমি পাত্তা দিই
নি। কারণ এগুলো আমার একদম পছন্দ নয়। আমি এর
সম্পূর্ণ বিপরীত। এসব হাসি ঠাট্টা আমি অপছন্দ করি।
আমার কাছে সবার আগে কাজ তারপর অন্যসব। আমি
সাধারণত কারো সাথেই প্রয়োজন ছাড়া কথা বলিনা।
অযথা কথা বলে মানুষের সময় নষ্ট করার কোনও
মানে নেই। এতে মানুষ বিরক্ত হয়। আমি
লাঞ্চব্রেকে ক্যান্টিনে বসে চা খাচ্ছিলাম। ভাত
খেতে ইচ্ছে করছিল না তাই চায়ে চুমুক দিতে
দিতে নেক্সট প্রজেক্ট নিয়ে ভাবছিলাম। এমন
সময় এই মেয়েটি এসে জিজ্ঞেস করল আমি
চুপচাপ কেন। কোনও মানে হয় এরকম অযথা প্রশ্ন
করার? তাই আমিও কিছু অযথা কথা বলে ভাগিয়ে
দিয়েছি। কারণ ইটের জবাব পাটকেল দিয়েই দিতে
হয়।
তবে শেষে যে আমাকে জিলিপি বলল তার জবাব
ওকে দিতে হবে। একদম ঝোঁপ বুঝে কোপ
মারব।
.
লাঞ্চ ব্রেক শেষে কেবিনে এসে বসতেই
অফিসের পিয়ন রকিব এসে বলল,
- স্যার, বড় স্যার আপনাকে ডাকছেন।
- আচ্ছা আসছি।
বড় স্যার মানে আমাদের অফিসের সি.ই.ও।
আমাদের সবাইকে ও স্যার ডাকে আর আমাদের
বসকে বড় স্যার ডাকে। ব্যাপারটা বেশ মজার। যাই
হোক আমি এসব ভাবতে ভাবতে স্যারের
কেবিনের সামনে চলে এলাম। নক করতেই স্যার
বললেন,
- ভেতরে আসুন।
- ইয়েস স্যার।
স্যারের কেবিনে ঢুকতেই দেখি সুপ্রভাও বসে
আছে। ও এখানে কেন? ও কি আমার নামে
স্যারের কাছে নালিশ করেছে? না জানি আমার নামে
কি না কি বলেছে। স্যারের সাথে তো ওর ফ্যামিলি
রিলেশন আছে। স্যার ওর মামা হন। সেই সূত্রেই ও
এখানে চাকরি করে।
যদি তিলকে তাল করে কিছু একটা বলে ফেলে
তাহলে তো আবার আমার খামকো বকা খেতে
হবে। যাই হোক সাত পাঁচ ভেবে কাজ নেই। স্যার
কি জন্যে ডাকলেন সেটাই মূল বিষয়। আমি ঢুকার পর
স্যার বললেন,
.
- বসুন অভ্র সাহেব। আপনার সঙ্গে কোম্পানির
নেক্সট প্রজেক্ট নিয়ে কিছু কথা বলার ছিল।
- হ্যাঁ স্যার বলুন।
- এই প্রজেক্ট এ আপনার অ্যাসিস্ট্যান্ট থাকবে
সুপ্রভা। যেহেতু ও এখনও তেমন কোনও বড়
প্রজেক্টে কাজ করেনি তাই ওর কাজ শেখার জন্য
বড় প্রজেক্ট কিভাবে হ্যান্ডেল করতে হয় তা জানা
প্রয়োজন।
- হ্যাঁ স্যার।
- কালকের মধ্যেই কিন্তু সব রেডি করতে হবে।
পরশুদিন উনারা আসবেন প্রজেক্টটা দেখতে।
- ইয়েস স্যার।
- তো আপনি ওকে আপনার কেবিনে নিয়ে গিয়ে
বুঝিয়ে দিন কিভাবে কি করতে হয়।
- অবশ্যই স্যার।
এরপর আমি সুপ্রভাকে নিয়ে আমার কেবিনে
আসলাম। আসামাত্র বলল,
- শুধু আমার মামা বললেন বলে আপনার কাছে কাজ
বুঝতে এসেছি। নইলে আপনার মুখদর্শনেরও
কোনও ইচ্ছা আমার নেই।
- কাজের সময় কাজ। এসব কথা অন্যসময়ও বলতে
পারবেন। আমি আপনার কাছে কোনও কৈফিয়ত চাইনি।
এখন বসুন এখানে।
ও অনিচ্ছাসত্ত্বেও বসল। আমি কম্পিউটার এর দিকে
তাকিয়ে মনে মনে হাসছি। এইতো সুযোগ
পেয়েছি। আমাকে জিলিপি বলা, না?? দেখাচ্ছি এই
জিলিপি কি করতে পারে। কাজের যে কত রকম প্যাঁচ
আছে তা এবার বুঝবেন মিস. সুপ্রভা। মু হা হা হা হা,,,,
.
আমি একটু গলা খাকারি দিয়ে বললাম,
- আমাদের এই প্রজেক্টটা কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ।
যদি কোনওরকম উল্টোপাল্টা প্যাঁচ কষেন তাহলে
কিন্তু কোম্পানির অনেক লস হয়ে যাবে।
- প্যাঁচানো তো আপনার কাজ। কারণ জিলিপিটা আপনি,
আমি নই।
এই কথাটা আস্তে আস্তে বলল। তবুও আমি শুনে
ফেললাম। কিন্তু ওকে বুঝতে না দিয়ে বললাম,
- কিছু বললেন??
- নাহ কিছুনা। আপনি বলুন আমাকে কি করতে হবে।
- আপনাকে একটা প্রেজেন্টেশন রেডি করতে
হবে পরশুদিনের মধ্যে। যে ধরণের ডিজাইন
ইউনিক হবে এবং যা লোকে পছন্দ করবে।
সেরকম কিছু একটা আপনাকে বানাতে হবে। আর
এই প্রজেক্ট ডিলও করবেন আপনি। কাজেই একটা
ভালো স্পিচ রেডি করে রাখবেন।
- আমি কোনওদিন এসব ডিল করিনি। কাজেই স্পিচ
কিরকম হবে আমি কিছুই জানিনা। স্পিচটা আপনিই রেডি
করে দিন। একবার দেখি তারপরের বার আমি নিজেই
করব।
- স্পিচ বলতে গুছিয়ে একটা বক্তব্য দেওয়া। আপনি
কিরকম প্রেজেন্টেশন করবেন তারওপর নির্ভর
করবে আপনার স্পিচ। কাজেই এটা আপনাকেই
করতে হবে।
- একদিনের মধ্যে এত কিছু করব কিভাবে?
- একদিনের জন্য যদি স্বল্পভাষী হতে পারেন
তাহলেই পারবেন। কাজকে ভালোবাসুন তাহলে
আর কাজ কঠিন মনে হবে না।
- একদিনের জন্য স্বল্পভাষী বলতে কি
বোঝাচ্ছেন?
- একদিন কাজের সময় শুধু কাজ করুন। অন্যদের
সাথে কথা বলার অনেক সময় পাবেন।
- আপনি কি আমাকে অপমান করতে চাইছেন?
- না অপমান করার আরও অনেক পদ্ধতি আছে। আমি
শুধু আপনাকে বোঝাচ্ছিলাম কিভাবে একদিনে
এতকিছু করবেন।
- আমাকে চ্যালেঞ্জ করবেন না। আমি যেমন আছি
কালও তেমনি থাকব। আর কালকের মধ্যেই সব
করে দেব।
আমি ওর কথা শুনে একটা মুচকি হাসি দিয়ে বললাম,
- দেখা যাবে।
.
অফিস শেষে বাসায় আসার পর আমি ফ্রেশ হওয়ার
আগেই আমার ছোট বোন অনন্যা এসে বলল,
- বাবা ডাকছেন তোকে।
- আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি, তুই যা।
- বাবা এখুনি যেতে বলেছেন।
- এতো মারাত্মক মেয়ে রে বাবা। দেখছিস না
সারাদিন অনেক পরিশ্রম করে এসেছি? বাবাকে একটু
বুঝিয়ে বললেই তো পারিস যে ভাইয়া ফ্রেশ হয়ে
আসছে। কেমন বোন তুই, ভাইয়ের প্রতি একটুও
দরদ নেই??
- এই শোন, তোর মত আমিও বাবাকে ভয় পাই
বুঝলি?? আমার যেচে বকা খাওয়ার কোনও সাধ
জাগেনি। বাবার বকা খেতে না চাইলে তুই চলে আয়।
এই বলে ও চলে গেলো। এটা হলো আরেক
সমস্যা। আমি জানি এখন বাবা কি বলবেন। কয়েকদিন
ধরেই আমাকে হাড়িকাঠে ঝুলানোর কথা বার্তা
চলছে। মানে বিয়ের বিষয়ে কথা হচ্ছে আরকি।
কাজেই একপ্রকার বাধ্য হয়েই বাবার রুমে গেলাম।
গিয়ে বললাম,
.
- বাবা ডেকেছ?
- হ্যাঁ ডেকেছি। তুই ড্রেস চেঞ্জ করিস না। আমরা
একটু বেরোব।
- কোথায় যাব বাবা?
- এত কথা বলছিস কেন? গেলেই তো দেখবি।
- আচ্ছা বাবা।
এই বলে বাবার রুম থেকে চলে এলাম। বাবা ভীষন
রাগী। পান থেকে চুন খসলেই হলো, আমাদের
ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে যায়। আসলে আমার দাদু মানে
বাবার বাবা জমিদার ছিলেন। উনিও ভীষন রাগী
ছিলেন। সেটাই বাবার এই রাগের মূল কারণ। আমার
অতটা রাগ নেই। এখন বাবার রাগের একটা উদাহরণ দিই।
একদিন আমাদের কোথাও একটা যাওয়ার কথা। তখন
শীত পড়েছে। কাজেই আমি সু পড়ে যাব
ভাবছিলাম। কিন্তু মোজাটা খুঁজেই পাচ্ছিলাম না। আগের
শীতে যে রেখেছিলাম একবছর পর সেটা
খুঁজে পেতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল। আমার
লেট দেখে বাবা স্বয়ং আমার রুমে এসে শুরু
করলেন ঝাড়ি দেওয়া।
- তোর এত দেরি হচ্ছে কেন? ছেলেদের
রেডি হতে এত সময় লাগে?
- ইয়ে মানে বাবা আমার মোজাটা কোথায় রেখেছি
খুঁজে পাচ্ছিনা।
- তা পাবি কেন, তোদের কোনকিছুর ঠিক থাকে?
একেকটা অমানুষ হয়েছে। অনার্স কম্পলিট ছেলে
এখনও মোজা খুঁজে পায়না।
- না মানে,,,
- কি মানে মানে করছিস? থাপ্পড় খেতে না চাইলে
২ মিনিটে রেডি হয়ে আয়।
এই বলে চলে গেলেন। তারপর আমি আর কি করব
অন্য একটা জুতো পড়ে গেলাম। এই হলেন
আমাদের বাবা।
.
অনন্যা আমার রুমে এসে বলল, সবাই রেডি আমি
যেন চলে আসি। গেলাম উনাদের সাথে। আমি যা
সন্দেহ করেছিলাম তাই হল। আমরা মেয়ে
দেখতে এসেছি। উফফ এসব আমার একদম ভালো
লাগে না। এসব বিয়ে টিয়ে নিয়ে ভাবার মত এতো
সময় আমার নেই। ফালতু সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছুনা।
তো আমাদের উনারা বেশ সমাদর করেই ঘরে
নিয়ে বসালেন। মেয়েটি চা নিয়ে এলো।
দেখতে খারাপ না। আমার বাবা মা ওকে প্রশ্ন
করছিলেন আর ও মাথা নিচু করে উত্তর দিচ্ছিল। আমি
তেমন খেয়াল করছিলাম না ওদের কথা। আমি ভাবছিলাম
সুপ্রভার কথা। ওকে বেশ ভালোই জব্দ করা
গেছে। বেচারি জানেও না যে ওর স্পিচ রেডি করা
না করাতে কিছু আসে যায় না। স্পিচ তো আমি দেব।
ওর দায়িত্ব শুধু প্রেজেন্টেশন রেডি করা। হঠাৎ বাবা
আমাকে কিছু একটা বললেন। আমার নাম শুনে চিন্তার
সূতো ছুটে গেলো। আমি চমকে জবাব দিলাম,
- হ্যাঁ,,, হ্যাঁ বাবা বলো।
- কি ভাবছিস এতো? কথা কি কানে যায়না?
এই সেরেছে, বাবা তো এখানেও ঝাড়ি মারা শুরু
করলেন। প্রেস্টিজের তো আর কিছু বাকী
থাকবে বলে মনে হয় না। বাঁচতে হলে গুছিয়ে
কিছু একটা বলতে হবে।
- নাহ কিছু ভাবছি না।
- হুম, না ভাবলেই ভালো। যা এখন মেয়ের সাথে
আলাদা কথা বলে দেখ তোর পছন্দ হয় কিনা।
- হ্যাঁ অবশ্যই।
আমি আর কি করব, গেলাম মেয়ের সাথে কথা
বলতে।
.
রুমে ঢুকে দেখলাম বেশ গোছানো রুম।
মেয়েটা আমার দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে
আছে। তো আমি কথা শুরু করার জন্য বললাম,
- আসলে আমি,,,,,
আমার কথা শেষ করার আগে মেয়েটা আমার দিকে
ঘুরে বলল,
- আপনি কিছু বলার আগে আমি একটা কথা বলতে চাই।
বাহ, মেয়েতো বেশ স্পষ্টভাষী। সরাসরি
কাউকে এভাবে বলা যায় না যখন সে তোমাকে
বিয়ের ব্যাপারে দেখতে এসেছে। এই
ক্ষেত্রে মেয়েরা বেশ নার্ভাস ফিল করে
বলেই আমার ধারণা। তবুও মেয়েটা নার্ভাসনেস ছাড়াই
বলেছে। তারমানে কথা আগে থেকে গুছিয়ে
রেখেছে। যাই হোক কি বলে সেটা শোনা
উচিত।
- - হ্যাঁ বলুন কি বলবেন।
- আমি আপনাকে বিয়ে করতে পারব না। আমি অন্য
একজনকে ভালোবাসি। বিয়ে করলে ওকেই করব।
- ও আচ্ছা।
- ও আচ্ছা না বলে আপনার পরিবারের সাথে কথা
বলে বিয়েটা ক্যানসেল করে দিন। নইলে আমি
বিয়ের রাতেই পালিয়ে যাব।
- না না ঠিক আছে। এত উত্তেজিত হবেন না। আমি
বিয়েটা ক্যানসেল করার ব্যবস্থা করছি।
- হুম সেটাই ভালো।
.
আমরা চলে এলাম ওখান থেকে। বাবার মেয়ে
পছন্দ হয়েছে। আমি যেহেতু বাবাকে সরাসরি কিছু
বলতে পারব না কাজেই মাকে বুঝিয়ে পাঠালাম
বাবাকে ম্যানেজ করতে। কিছুক্ষণ পর মা ফিরে
আসলেন একটা হাসিমুখ নিয়ে। এসে বললেন,
'তোর এই মেয়েকে বিয়ে করতে হবে না'।
আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। একটা ঝামেলা মিটল। এখন
শুধু পরশুদিনের অপেক্ষা। বেশ বড় প্রজেক্ট
হওয়ায় অনেক টাকার ডিল হয়েছে। কাজেই কাল
অফিসে কোনও ঝামেলা না হলেই হলো।
মেয়েটা ঠিকমতো প্রেজেন্টেশন রেডি
করতে পারলেই হলো।
.
পরদিন অফিসে গিয়ে দেখি যা আশা করেছিলাম তাই
ঘটছে। মেয়েটা কাজ ফেলে গল্প করছে। আমি
হাসলাম, দেখি ও কিভাবে প্রেজেন্টেশন রেডি
করে। না করতে পারলে ওই বকা খাবে। কাজেই
আমি আমার কাজ করে বিকেলে বাসায় চলে
আসলাম। এখন শুধু কালকের অপেক্ষা। কাল
মেয়েটা প্রেজেন্টেশন রেডি করে আনতে
পারলেই হল।
.
পরদিন সকালে উঠে ভালোভাবে ড্রেস আপ
করে অফিসে চলে গেলাম। প্রজেক্ট হ্যান্ডেল
করতে যখন স্পিচ দিতে হয় তখন লুকস্ ম্যাটার
করে। যাই হোক অফিসে পৌঁছে দেখি সুপ্রভা
বেশ আগেভাগেই উপস্থিত। এসে আমার
কেবিনে ঢুকে ডেস্কের সামনের চেয়ারে
বসে আছে। আমি কেবিনে ঢুকতেই ও দাঁড়িয়ে
পড়ল। দেখলাম বেশ সুন্দর করে সেজেগুজেই
এসেছে। স্পিচ দেওয়ার ফুল প্রিপারেশন আছে
ওর মধ্যে। বুঝতে পারলাম ও বেশ বুদ্ধিমতী
মেয়ে। কিন্তু খেয়াল করলাম ওর চোখদুটো লাল
হয়ে আছে। তারমানে সারারাত জেগে কাজ
করেছে। এতটা প্রেশার দেওয়া বোধহয় ঠিক
হয়নি। বেচারির জন্যে একটু মায়া হলো। কিন্তু সেটা
চেহারায় ফুটে উঠতে দিলাম না। ওর চোখ লাল থাকায়
আমার এক্সকিউজ দিতে সুবিধা হবে। তাই আমি
চেহারায় যথারীতি গাম্ভীর্য রেখে জিজ্ঞেস
করলাম,
.
- আপনার প্রেজেন্টেশন রেডি করা হয়েছে?
- হ্যাঁ হয়েছে। স্পিচও রেডি করে এসেছি।
- আমি স্পিচের কথা জিজ্ঞেস করিনি। আপনি
আজকে স্পিচ দিচ্ছেন না।
- কেন?? এত কষ্ট করে স্পিচ রেডি করালেন আর
এখন বলছেন দিতে হবে না? উদ্দেশ্য কি আপনার?
- দেখুন মিস. সুপ্রভা, আমি সঙ্গত কারণেই
আপনাকে বারণ করছি। আপনার কাজের ছাপ চেহারায়
স্পষ্ট। আমি মিন, আপনার চোখ লাল হয়ে আছে।
এই অবস্থায় আপনার স্পিচ দেওয়ার কোনো মানে
নেই।
- আমার চোখ লাল হলে সেটা আমার সমস্যা।
স্পিচের সাথে এর সম্পর্ক কি?
- আপনি হয়তো জানেন না যে, স্পিচ দেওয়ার
ক্ষেত্রে লুকস্ ম্যাটার করে। আপনি যখন স্পিচ
দেবেন তখন সবার দৃষ্টি আপনার দিকে থাকবে।
তাদের মধ্যে দু একজন ছাড়া বাকী সবাই দেখবে
যে, আপনার চোখ লাল হয়ে আছে। এতে
আমাদের কাজ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
- কিরকম প্রশ্ন?
- এই তো, আমাদের কাজ সময়মত করার অভ্যাস
নেই তাই আমাদের রাতজেগে কাজ করতে হয়।
এরকম প্রশ্ন উঠতেই পারে।
- এর শোধ আমি নিয়েই ছাড়ব। আপনি আমাকে দিয়ে
অযথা পরিশ্রম করালেন।
.
এই বলে আমার কেবিন থেকে চলে গেল। আমি
মনে মনে হাসলাম। এই মেয়ে আমাকে চিনতে
পারে নি। ও যদি বুনো ওল হয় তাহলে আমি বাঘা
তেঁতুল। ও যদি কাঁচকলা হয় তাহলে আমি আদা। ও যদি
সাপ হয় তাহলে আমি নেউল। ও যদি কুমড়ো হয়
তাহলে আমি দা। ও যদি....
আর মনে পড়ছে না। উত্তেজনায় অনেক প্রবাদ
মুখ থেকে বেরিয়ে গেছে। ছোটবেলায় বাংলা
ব্যাকরণ শেখার ভালো প্রয়োগ পেলাম। যাই
হোক, উচিত শিক্ষা হয়েছে ওর। আরও বলো
আমাকে জিলিপি। তুমি জানো না মেয়ে। অভ্রের
সাথে পাঙ্গা নিয়ে তুমি ভূল করে ফেলেছ। মু হা হা
হা।
.
অফিস থেকে ফিরেই আরামসে বিছানায় শোলাম।
আজ মন খুব খুশি। প্রজেক্টটা আমি সফলভাবে
হ্যান্ডেল করতে পেরেছি। আমাদের বস খুব খুশি
আমার ওপর। তবে আসল কাজটা করেছে সুপ্রভা।
ওর প্রেজেন্টেশন আসলেই ইমপ্রেসিভ ছিল।
অফিস সহকর্মী হিসেবে যে ও অসাধারণ তার
প্রমাণ আজ পেলাম। যদিও ওকে অপছন্দ করি তবুও
গুনীর গুণ গাইতে আমি পেছপা হই না। যেমন আমি
ফুটবলে ব্রাজিলকে সাপোর্ট করলেও স্বীকার
করি যে মেসি রোনালদো ভালোই খেলে। এটা
ওদের প্রতিভা। একে অস্বীকার করার কিছুই নেই।
আমি যখন এসব উল্টোপাল্টা ভাবছিলাম তখনই আমার
বোন অনন্যার ড্রামাটিক এন্ট্রেন্স ঘটল।
এন্ট্রেন্সটাকে ড্রামাটিক বলার অনেক কারণ
আছে। আমি তো বিছানায় শুয়ে শুয়ে এসব
ভাবছিলাম। হঠাৎ করে দেখি সুপারউইমেন এর মত
প্রায় উড়ে এসে আমার কাছে এসে দাঁড়াল। আমি
তো অবাক! এত স্পিডে ঢুকল কিভাবে?? তৎক্ষণাৎ
ওকে জিজ্ঞেস করলাম,
.
- এইই,, এত স্পিডে ঢুকলি কিভাবে?
- আমার পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখ।
আমি ওর পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি একটা নেভী
ব্লু কালারের হোভার বোর্ড। ওর নেভী ব্লু
কালারের জিন্সের কালারও প্রায় একই রকম হওয়ায়
ওইটা দেখতে পাইনি। এজন্যই মনে হয়েছে যে
ও উড়ে এসেছে।এটা দেখেই বুঝতে পারলাম
এর দাম কমপক্ষে  ২০০০০ টাকা হবে। আমার তো
মুডটা খারাপ হয়ে গেল। আমি পরিশ্রম করে উপার্জন
করছি আর ও আমার টাকা ওড়াচ্ছে। তবুও ওকে
জিজ্ঞেস করলাম,
- এত টাকা কোথায় পেলি? আমি উপার্জন করব আর
তুই সেগুলো ওড়াবি?
- আরে বাবা রাগ করছিস কেন, এটা তোর টাকায়
কেনা না। এটা মিষ্টিমামা নিউইয়র্ক থেকে নিয়ে
এসেছেন।
আহ বাঁচলাম। মুডটা ঠিক হয়ে গেল। তবুও একটু অভিমান
হল মামার ওপর। তাই সেটা অনন্যার ওপর ঝাড়লাম।
- বাহ ভালো তো। মামা তো শুধু তোকেই
ভালোবাসে। আমিও যে উনার ভাগ্নে সেটা উনার
মাথায় থাকে না।
- তোর জন্যে একটা ফোন এনেছেন। যাই
হোক ওসব বাদ দে। তুই রেডি হয়ে নে, আমরা
আবারও বেরোচ্ছি।
- ওই, আবারও মানে, কোথায় যাব?
- কোথায় আবার, তোর বউ আনতে। মানে
মেয়ে দেখতে।
- ও, ধুর আমার ওসব দেখাদেখি ভালোলাগে না।
তোরা চলে যা। তোদের পছন্দ হলেই আমারও
হবে।
- ওকে, আমি বাবাকে বলে দেখি।
- হুম তাই দেখ।
বাবা রাজি হয়েছেন আমার এই প্রস্তাবে। তাই উনারা
মেয়ে দেখতে চলে গেলেন আর আমি একটা
আরামের ঘুম দিলাম।
.
ঘুম থেকে উঠে দেখি উনারা চলে এসেছেন।
আমি অনন্যাকে ডেকে আমার রুমে নিয়ে এলাম।
তারপর জিজ্ঞেস করা শুরু করলাম আজকের
ব্যাপারে।
- কিরে পছন্দ হলো?
- হ্যাঁ আশীর্বাদও হয়ে গেছে।
- বাহ ভালো। এখন তুই যা।
- আসলে মেয়েটা বেশ সুন্দর। আর ও
তোদের..
- তোকে লেকচার দিতে হবে না। তুই এখন যা।
- আরে কথাটা তো শোন,,
- আরে বাবা যা না। এত কথা বলিস না।
- ওকে, তোর যেমন ইচ্ছা।
এই বলে ও চলে গেল। যাক অবশেষে তাহলে
আমারও বিয়ে হচ্ছে।
পরদিন অফিসে গিয়ে দেখি সুপ্রভা আসেনি। আমি
খানিকটা ভয় পেলাম। বসকে বলে দেয়নি তো
আবার? তাহলে আবার একগাদা বকা শুনতে হবে।
অফিস শেষ হওয়ার পরেও যখন বস কিছু বললেন না
তখন নিশ্চিন্ত মনে বাসায় ফিরলাম।
.
বাসায় ফিরেই শুনি নতুন কথা। কাল নাকি আমার বিয়ে।
মিষ্টিমামার অফিসে কি একটা ঝামেলা হয়েছে। তাই
উনাকে পরশুদিন ফ্লাইট ধরে নিউইয়র্ক চলে
যেতে হবে। উনি বিয়েটা দেখে যেতে
চাচ্ছিলেন তাই বাবা আমার হবু শ্বশুর বাড়ির
লোকেদের সাথে কথা বলে বিয়েটা কাল হবার
ব্যবস্থা করেছেন। বিয়েটা কাল ঘরোয়াভাবে
হবে। আর খাওয়াদাওয়া কয়েকদিন পর হবে।
সারাজীবন যা খেয়েছি এখনও দেখছি তাই খেতে
হবে, বাঁশ। ভেবেছিলাম সবাইকে নিয়ে আনন্দ
করে বিয়েটা করব। তা না এখন ঘটনা কিছুটা বদলে
গেছে। আমাকে কালকেই হাড়িকাঠে বসানো
হবে। তারপর বলা হবে, "মিঃ অভ্র আজ থেকে
আপনার ব্যাচেলর জীবনের শেষ হলো। এখন
থেকে আপনার জীবনের নতুন অতিথিই সব কিছু
দেখবে। এখানে আমি কাঠের পুতুল। যে যা
পারছে তাই করাচ্ছে আমাকে দিয়ে। এসব আর
ভালো লাগে না। মাঝে মাঝে মনে হয় সবকিছু
ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যাই। এমন সময় খুব
সুন্দর একটা গানের কথা মনে পড়ছে। আমার
সিচিউয়েশন এর সাথে একদম খাপ খেয়ে যায়।
"এমন যদি হত, আমি পাখির মত
উড়ে উড়ে বেড়াই সারাক্ষণ।"
"পালাই বহুদূরে, ক্লান্ত ভবঘুরে
ফিরব ঘরে কোথায় এমন ঘর।"
.
হুট করে যেমন সবকিছু ঠিক হয়েছিল তেমনি
বিয়েটাও হয়ে গেল। বিয়ের সময় বউয়ের চেহারা
দেখিনি। ইচ্ছে হয়নি দেখার। কারণ বিয়েটার ধরণ
আমার পছন্দ হয়নি। হুট করে পুরোহিত এনে সাতপাক
দেওয়ালেই কি বিয়ে হয়? তাই এসব নিয়ে আমার
কোনও আগ্রহ নেই। কাজেই যথারীতি
রোবটের মত নিয়ম পালন করতে বাসর ঘরে
ঢুকলাম। দেখলাম বউ নামক প্রাণীটি লম্বা একটা
ঘোমটা দিয়ে বসে আছে। তো আমি গিয়ে
পাশে বসলাম। একটা লম্বা ভাষণ দেওয়ার জন্য মনে
মনে প্রস্তুতি নিচ্ছি। এই যেমন, আমার বাবা মায়ের
খেয়াল রাখবে। এই পরিবারকে নিজের করে
রাখবে। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটল তা আমার কল্পনারও
অতীত।
.
বউ আমার ঘোমটা খুলতেই আমি ৪৪০ ভোল্টের
শক খেলাম।
- একি আ আ আপনি??
- হ্যাঁ আমি। এরকম ভূত দেখার মত চমকে গেলে
কেন?
- একে তো আমার বউ সেজে বসে আছেন
তারওপর আমাকে তুমি করে বলছেন?
- তুমি জানতে না আমার সাথে যে তোমার বিয়ে
হবে?
আমার ছবি দেখোনি?
- নাহ, আর আমি তো আমার পরিবারকে বলে
দিয়েছিলাম যে উনাদের পছন্দ হলেই আমারও
পছন্দ হবে। তবে উনারা যে আপনাকে দেখতে
যাচ্ছেন সেটা আমি কিভাবে বুঝব?
- যাক ভালোই হয়েছে। আমাকে দিয়ে অতিরিক্ত
কাজ করাবার মজা এবার বুঝাব মিঃ জিলিপি। আমি ইচ্ছে
করেই তোমাকে বিয়ে করতে মত দিয়েছি।
যাতে করে সারাজীবন তোমাকে জ্বালাতে পারি।
- কিহহ?? আমি জিলিপি?
- নয়তো কি সনপাপড়ি?
- এই আমার বিছানা থেকে নামুন। আমি ঘুমোব।
- মামা বাড়ির আবদার?? এখন থেকে এটা আমার বিছানা।
তুমি সোফায় ঘুমোবে।
- এহহ,, বললেই হলো?? আমার বাড়ি আমার ঘর আর
হুকুম আপনার?? ওসব হচ্ছে না। ভালোয় ভালোয়
নেমে যান নইলে খবর আছে।
- খবর?? হাহ দেখাচ্ছি মজা। বাবা আ আ আ আ,,,
- এইই না না চিৎকার দেবেন না। আমি সোফায় যাচ্ছি।
বাবাকে ডাকবেন না প্লিজ।
- হুম, আর কখনও আমার সাথে পাঙ্গা নিবে না
বুঝলে??
- হ্যাঁ হ্যাঁ
বুঝেছি।
- না, আমি আমার মত পাল্টেছি। তুমি এখানেই আমার
পাশে ঘুমোবে।
- ওহ, ধন্যবাদ।
- আগেই ধন্যবাদ দিও না। আমার কথা পুরোপুরি শুনে
নাও।
- হ্যাঁ বলুন।
- তুমি আমার পাশে কম্বল ছাড়া ঘুমোবে। আর
ঘুমের  মধ্যেও যদি আমাকে টাচ করেছ তাহলে
কিন্তু,,,
- না না আমি আমি আপনাকে টাচ করব না।
- হুম শুয়ে পড়ো।
.
ওর পাশে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে শীতের কামড় খাচ্ছি আর
ভাবছি। হাঁড়িকাঠের নমুনা যে এমন হবে এটা আশা করিনি।
সেদিন হয়তো অনন্যা এটাই বলতে চাচ্ছিল যে, ওরা
যাকে দেখে এসেছে সে আমাদের
অফিসেরই। হ্যাঁ ওই শয়তান সুপ্রভাকেই ভূলবশত আমি
বিয়ে করে ফেলেছি। লোকে বাসর রাতে কত
কিছুই না করে আর আমি কম্বল ছাড়া ঘুমোচ্ছি।
নেহাৎ ও আমাকে বাবার ভয় দেখিয়ে দমিয়ে দিল।
নইলে আজ ওকে বুঝিয়ে দিতাম এই অভ্র কোন
চিজ।
.
আমি সুপ্রভাকে আচ্ছা করে পানিতে চুবাচ্ছি। ও শুধু
খাবি খাচ্ছে আর আমাকে যথেষ্ট সম্মান দিয়ে
বলছে, "আমাকে ছেড়ে দিন প্লিজ, আর
কক্ষনো আপনাকে বিরক্ত করব না।" ওর এই
অবস্থা দেখে কি যে আনন্দ হচ্ছিল বলে
বুঝানো যাবে না। এমন সময় কে যেন আমার
আনন্দে জল ঢেলে দিল।
সারা রাত ঠান্ডায় কাঁপার পর হঠাৎ মুখের ওপর ঠান্ডা
জলের ছিটে পড়তেই লাফ দিয়ে উঠে বসলাম।
বসেই চিৎকার দিলাম,
- ক,, কেকে কে কে???
- এই যে, লাট সাহেব ঘুম ভাঙল?
সুপ্রভাকে দেখেই মেজাজ খারাপ হয়ে গেল।
শেষ রাতে একটু ঘুম লেগেছিল এই মেয়েটা তাও
পুরো করতে দিল না। তাই দিলাম এক ঝাড়ি।
- একে তো সারারাত ঠান্ডায় ঘুমোতে পারিনি তারওপর
এখন জলের ছিটে দিয়ে ঘুমটা ভাঙ্গালেন কেন?
- এই যে জমিদারের নাতি, আস্তে কথা বলো।
বাবাকে ডাক দেই?
- ভয় দেখাতে হবে না উঠে পড়ছি।
- হুম সেটাই ভালো।
দুদিন হয়নি এ বাড়িতে এসেছে এখনই বাবাকে দিয়ে
আমাকে ভয় দেখায়। আর আমার দাদু যে জমিদার
ছিলেন তাও জেনে গেছে। জমিদারের নাতি
বলে আমাকে খোঁটা দেয়। মারাত্নক শয়তান একটা
মেয়ে। মেয়েটা ঠিক গলার কাঁটার মত। না পারছি
গিলতে না পারছি ওগলাতে। বড় জ্বালা হয়েছে
আমার।
.
বিকেলে মামাকে এয়ারপোর্টে ছেড়ে
আসতে হবে। তাই বিকেলের আগে মামাকে
সবকিছু গুছিয়ে নিতে একটু সাহায্য করার কথা মাথায়
এলো। তাই আমি রুম থেকে বেরোব এমন সময়
ডাইনির মানে আমার বউয়ের প্রবেশ।
- এই কোথায় যাচ্ছ?
- মামার রুমে। উনাকে একটু সাহায্য করতে।
- কোথাও যেতে হবে না তোমার। এখন আমি
বোর হচ্ছি। কাজেই এখন আমাকে সময় দাও।
- মানে? আমি কি তোমার সাথে বসে লুডু খেলে
তোমাকে এন্টারটেইন করব? সময় কাটাতে হলে
অনন্যার রুমে চলে যাও।
- এই তুমি আমাকে তুমি তুমি করে বলছ কেন?
বেশতো আপনি আপনি করে বলছিলে।
- নিজের থেকে বয়সে ছোট কেউ যদি তুমি তুমি
করে কথা বলে তাহলে তার সাথে আপনি করে কথা
বলাটা একটু সমস্যার।
- ও, আচ্ছা এটা ব্যাপার না। যাও, তুমি মামার রুমে যাও।
আমি বরং অনন্যার সাথেই কথা বলি।
- হুম।
এখন তো বেশ ভালো ভাবেই কথা বলল দেখছি।
এই মেয়েটার কখন যে কি মতি হয় কিছু বুঝা যায় না।
.
বিকেলে মিষ্টিমামাকে এয়ারপোর্ট এ ছেড়ে
এলাম। আসার সময় বাবা ভাবলেশহীন রইলেও মা খুব
কান্নাকাটি করলেন। উনার একমাত্র ভাই এতদিন পর
এসে দুদিনও থাকতে পারলেন না। আমি আর আগ
বাড়িয়ে কিছু বলতে গেলাম না। বললে হয়তো বাবা
বকা দেবেন। বাড়িতে এসে মামার কথা তেমন
মনে রইল না। সুপ্রভার হুকুম সইতে সইতেই আমার
জান বেরিয়ে যাচ্ছিল তাই মামার কথা মনে পড়ার কথা না।
এখন বলে এটা করো তখন বলে ওইটা করো।
লোকে বলে বিপাকে পড়লে মানুষ বাপের নাম
ভূলে যায়। কিন্তু আমার তো নিজের নামই ভূলি ভূলি
অবস্থা। এভাবেই কাটতে লাগল আমার দিন।
.
কেটে গেলো প্রায় একবছর। এখন ওর জ্বালা
সহ্য করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আর
আমাদের বিয়ের পর ও চাকরিটা ছেড়ে দেয়।
একারণে ওর স্ট্রেস ও ফিল হয় না। সবসময়েই
ফুরফুরে মেজাজে থাকে। বাড়ির সবার সাথেই ওর
ভালো সম্পর্ক হয়ে গেছে। বিশেষ করে বাবার
সাথে। বাবা তো ওকে মা ছাড়া ডাকেনই না। আমাকে
কথায় কথায় ঝাড়ি দেন আর ওর সাথে মিষ্টি করে কথা
বলেন। রাতে আমরা এক বিছানায়ই ঘুমাই। তবে
এখানেও সমস্যা আছে। ঘুমের মধ্যেও যদি আমার
হাত বা পা ওর শরীরে লাগে তাহলে মুখের ওপর
ঠান্ডা জল ঢেলে দেয়। আমি অনেকবার ওকে
আমাদের মাঝখানে কোলবালিশ রাখার পরামর্শ
দিয়েছি। কিন্তু আমার প্রস্তাবে ও রাজি নয়। ওর
মতামত হলো, মানুষের সব সিচিউয়েশন এ এডজাস্ট
করার ক্ষমতা থাকা উচিত। ওর কথা শুনে মনে হয় ও
আমাকে ভবিষ্যত বেয়ার গ্রিলস বানানোর জন্য
সারভাইভাল ট্রেনিং দিচ্ছে। এভাবেই চলছিল আমার
অদ্ভুত সংসার। কিন্তু একটি ঘটনা এই সংসারের ধারা
অনেক পাল্টে দিল।
.
সেদিন আমার অফিস থেকে ফিরতে বেশ লেট
হয়েছিল। প্রায় ৯ টার দিকে ফিরেছিলাম। সারাদিন
অনেক কাজ করতে হয়েছে। তাই এত লেট হয়ে
গেছে। আসার পরপরই সুপ্রভা বায়না ধরল ওকে
আইস্ক্রিম এনে দিতে হবে। আমি প্রচন্ড
স্ট্রেসড ছিলাম। তবুও ওকে ভালোভাবে বললাম,
- দেখো সারাদিন অনেক কাজ করতে হয়েছে।
আমি অনেক টায়ার্ড। এখন বাইরে যেতে একটুও
ইচ্ছে করছে না।
- না আমার আইস্ক্রিম লাগবেই।
- প্লিজ, একটু বোঝার চেষ্টা করো। আমার
একদমই ভালো লাগছে না।
- তুমি আনবে না বাবাকে ডাকব?
এই কথায় উঠল রাগ। এসব অশান্তি আর আমার ভালো
লাগে না। একজন মানুষের সহ্যের সীমা আছে।
আমি রেগে বললাম, "ডাকো বাবাকে, আমি এসব
আর  সহ্য করব না।" আমার এরকম রি-অ্যাকশন দেখে
ও কিছুটা ভড়কে গেলো। তবে তা ক্ষণিকের
জন্য। ও ঠিকই বাবাকে ডাকতে চলে গেলো।
আনুক বাবাকে, আজ এর একটা হেস্তনেস্ত হওয়া
প্রয়োজন। ও বাবাকে নিয়ে আসল। বাবা এসেই
আমাকে কড়া গলায় বকা দিতে শুরু করলেন।
- তুই বউমার জন্য সামান্য আইস্ক্রিম এনে দিতে
পারছিস না? এতে লাটসাহেবের কষ্ট হয়ে যাবে।
- আসলে বাবা আজ অফিসে অনেক কাজ ছিল। তাই
এখন আমি অনেক ক্লান্ত। এজন্য ওকে মানা
করেছি।
- কাজের সময় কাজ। এখন বাসায় এসেছিস। এখানে
কাজের কথা তুলবি না। যা, আইস্ক্রিম নিয়ে আয়।
- হ্যাঁ যাচ্ছি।
.
বড় বিরক্তি নিয়ে ঘর থেকে বের হলাম। শুধুমাত্র
বাবাকে সম্মান করি বলে মানা করতে পারলাম না। তবে
আমার দিকটা কেউ বিবেচনা করে দেখল না। ধ্যাৎ,
ভাল্লাগেনা এসব। অন্ধকারে হাঁটছিলাম আর এসব
ভাবছিলাম। হঠাৎ দেখলাম ফুটপাতে কিছু লোক শুয়ে
আছে। আহারে, আমার থেকেও ওরা শান্তিতে
ঘুমোচ্ছে। পকেটে হাত দিলাম ফোন বের করার
জন্য। আমার এক বন্ধুকে ফোন দেব। আজ আর
বাসায় ফিরে যাব না। ওর মেসে থাকব। তাই ওকে
বলতে হবে আমার জন্য একটা মিলের ব্যবস্থা করার
জন্য। কিন্তু ফোনটা পকেটে পেলাম না। ওহ
শীট! ফোনটা বাসায় ফেলে এসেছি। তবে সমস্যা
না। একদিক দিয়ে ভালই হয়েছে। বাসার কেউ
ফোন দিয়ে আমায় পাবে না। তাই আমি সোজা আমার
বন্ধুর মেসে চলে গেলাম। ফোন না দিলেও
চলবে। খাওয়া ভাগাভাগি করে খেয়ে নিতে পারব।
এত রাতে আমাকে দেখে রাফি একটু চমকাল। অবাক
হয়ে বলল,
- অভ্র তুই? এত রাতে, কি ব্যাপার? কোনও সমস্যা
হয়েছে?
- আরে ব্যাটা আগে ভেতরে তো আসতে দে।
একসাথে তিনটা প্রশ্ন করলি। কোনটার উত্তর দেব?
- আয় আয় ভেতরে আয়। তোর খুঁত ধরার
অভ্যেস এখনও গেল না।
- ওসব ছাড়, তোর এখানে খাবার হবে কিছু? বেশ
খিদে লেগেছে। অনেকটা পথ হেঁটে এসেছি
তো।
- হ্যাঁ আজ একটা এক্সট্রা মিল আছে। পলাশ ভাইয়ের
এক বন্ধুর আসার কথা ছিল। ও আসেনি, তুই এসেছিস।
- তাহলে তাড়াতাড়ি খাওয়া ব্যাটা।
- আচ্ছা আনছি।
.
ওর ওখানে দুদিন কাটালাম। ও আমার স্কুল ফ্রেন্ড।
ফ্যামিলি গ্রামে থাকে আর ও চাকরির সুবাদে
সিলেটে থাকে। অনেকদিন পর লাইফকে একটু
এনজয় করলাম ওর সাথে থেকে। এই দুদিন আমি
অফিসে যাই নি। ও ও ছুটি নিয়েছিল। দুইদিন পর যখন
বাসায় ফিরলাম তখন সবার চেহারায় আমূল পরিবর্তন
দেখতে পেলাম। কলিংবেল বাজানোর পর দরজা
খুললেন বাবা। বাবার মুখে হালকা সাদাকালো দাড়ি। বাবা
দাড়ি কখনও বাড়তে দিতেন না। সবসময়েই ক্লিন
শেভড থাকতেন। রোজ শেভ করতেন। আজ
উনার মুখে দাড়ি দেখে বেশ অবাক হলাম। মা আর
অনন্যা গম্ভীর ভাবে চেয়ারে বসা। দেখার মত
চেহারা ছিল সুপ্রভার। চোখ পুরো লাল আর
চোখে কাজল লেপ্টে গেছে। একদম ভুতের
মত লাগছে। আমার হাসি পেয়ে গেল ওর এই অবস্থা
দেখে। দরজা খুলে আমাকে দেখতে পেয়েই
ঠাসস্ করে একটা চড় বসালেন বাবা।
.
- হারামজাদা, কোথায় ছিলিস তুই?? তোকে খুঁজে
খুঁজে আমরা পাগল হয়ে গেছি।
- রাফির মেসে ছিলাম বাবা।
বাবা আর কিছু বলার আগে মা বলে উঠলেন,
- তোর বাবা একটু বকেছেন বলে রাতে আর
বাসায় ফিরলি না?? কেন এমন করলি বাবা?
- মা আসলে আমি বাবার ওপর না, সুপ্রভার ওপর রাগ
করে বাসায় আসিনি।
- তুই জানিস তুই বাসায় আসছিস না দেখে মেয়েটা
প্রায় পাগলের মত হয়ে গেছিল। সারারাত
কেঁদেছে মেয়েটা। দুদিন ধরে ঘুমায় নি।
- সে তো দেখতেই পাচ্ছি।
তখন অনন্যা বলে উঠল,
- তোর একটুও অনুশোচনা হচ্ছে না ভাইয়া?
- নাহ, ও আমাকে অনেক জ্বালিয়েছে। তাই এটকু
শাস্তি ওর প্রাপ্য।
- বউদি তোকে জ্বালায় নি ভাইয়া। ও তোকে খুব
ভালোবাসত তাই তোর উপর অধিকার ফলাত। বউদি সব
কথা আমার সাথে শেয়ার করত। তুই কখনও তাঁর
ভালোবাসা বোঝার চেষ্টা করিস নি।
.
তখন সুপ্রভা মুখ খুলল। অভিমানী সুরে বলল, "বাদ দাও
অনন্যা, তোমার ভাইয়া এসব বুঝবে না।" ওর কথায়
অনন্যা চুপ করে গেল। আমি সুপ্রভাকে নিয়ে
রুমে চলে এলাম। আমি আমার রুমে আসতেই
সুপ্রভা আমার সামনে মাথা নিচু করে বলল,
- আমাকে ক্ষমা করে দাও।
- পাগলি একটা। এতটা না কাঁদলেও পারতে।
- এই পাগলিকে কি একটুও ভালোবাসা যায় না?
- একটুও না। এই ভূতনিকে ভালোবাসা যায় না। আগে
মানুষ সেজে আসো।
- মানে?
- মানে তোমার চোখমুখ ধুয়ে আসো। সারা
চোখের অবস্থা বেহাল।
কাজল লেপ্টে গেছে।
- লাগবে না, আমার বর এই ভূতনিকেই ভালোবাসবে।
এই বলে আমাকে জড়িয়ে ধরল।
রাতে ঘুমানোর সময়ের সব শর্তও আমার ওপর
থেকে উঠে গেল। বুঝতে পারলাম, আমার
জীবনের একটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটেছে।
এভাবেই আমার অদ্ভুত সংসারটা ভূত সংসারে রূপান্তরিত
হলো। মানে সুন্দর সংসারে আরকি।
.
ওকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, "তোমার
নামের অর্থ কি?" ও বলেছিল, "সুপ্রভা মানে সুন্দর
আলো।" এবার ওর সাথে ওর নামের অর্থের
ভালো মিল পেলাম। ও আসলেই খুব সুন্দর একটা
আলো যা আমার পরিবারকে সম্পূর্ণ করেছে।
.
সমাপ্ত
...

শেয়ার করুন

Author:

আমি সজীব হোসাইন -এই ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা পাশাপাশি লেখালেখির কাজটাও করি। অনলাইনে প্রযুক্তির বিষয় নিয়ে যা জানি তা মানুষের মাঝে শেয়ার করার ইচ্ছায় এ ব্লগ টি তৈরি করা।