পত্রিকা পড়ার অবসান ঘটিয়ে গাম্ভীর্য গলায় বললেন,
-তুমি নিশ্চয় বুঝতে পেরেছো কেন তোমাকে ডেকে এনেছি? (আসফাক সাহেব)
-জ্বী আংকেল৷ (ভদ্রতার সহীত বললাম)
-ধন্যবাদ তোমাকে৷
-ধন্যবাদ! কিন্তু কেন? (কৌতুহলী কন্ঠে জানতে চাইলাম)
-সেদিন তুমি আমার মেয়েটাকে সাহায্য করে বাসায় পৌছেঁ দিয়েছিলে তাই৷
(আসফাক সাহেব)
-ধন্যবাদের কিছু নেই আন্কেল৷ মানুষের বিপদে সাহায্য করাটা মানবিক দায়িত্ব৷ (আমি)
-হ্যা৷ তা অবশ্য ভালোই বলেছো৷ (আসফাক সাহেব)
"
-কিছুক্ষণ গল্পস্বল্প করেই চলে এসেছি৷ কারণ উনার মেয়ে মীরার সামনে পরলেই আসল ব্যাপারটা বেরিয়ে যেতে পারে৷ আর যদি আসফাক সাহেবের সামনে সেটা ফাঁস হয়৷ তাহলে হয়তো আমাকে দেওয়া "ধন্যবাদ" টা কে "ধনেপাতার" মত কুচিঁ কুচিঁ করে শরবত বানিয়ে আমাকেই খাওয়াই দেয়া হবে৷ এর চাইতে পরিস্থিতি ঠান্ডা থাকতেই বেরিয়ে এসেছি৷
"
-কিছুদিন হলো বাড়িটাতে উঠেছি৷ উপরের ছোট্ট মানে খুব ছোট্ট রুমটাই আমি ভাড়া নিয়েছি৷ ভার্সিটি এখান থেকে খুব কাছেই৷ তাই যাতায়াতের সুবিধাটাও ভালো৷ অনেক ঝামেলাতে পোহাতে হয়েছিল বাসাটা ভাড়া নিতে৷ বাড়িওয়ালা সাহেবের ঐ এক কথা৷ নিজের অবিবাহিত মেয়ে ঘরে রেখে, উনি কিছুতেই ব্যাচেলর ভাড়া দিবেন না৷ কিন্তু আমার বাসাটা খুব ভালো লেগে গিয়েছিল৷ সবশেষে বাড়িওয়ালাকে খুব নিপুণভাবেই বুঝিয়েছি যে, ব্যাচেলরদের বাসা ভাড়া দিলে কি কি উপকার হতে পারে৷ অবশেষে বৃদ্ধকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছিলাম৷
"
-তারপরের দিনগুলো ভালোই কাটছিলো৷ কিন্তু উনার মেয়েকে তখনো দেখিইনি আমি৷ তারমধ্যে একদিন এসে গেল সেই কাঙ্খিত দিন৷ লুঙ্গি আর সেন্টু গেণ্জী পড়েই ছাদে গিয়েছিলাম৷ কারণ ছাদে কেউ তেমন একটা উঠে না৷ বলতে গেলে আমি ছাদের একক রাজা৷ কিন্তু সেদিন ছাদে কোনো এক রানীর আগমন ঘটেছিল৷ মেয়েটি ছাদের পাশের রেলিং ঘেষে উদাসভাবে আকাশ পানে চেয়ে আছে৷ আমি কালবিলম্ব না করেই রুমে গিয়ে গেন্জী পরে আসলাম৷ লুঙ্গিটা চেন্জ করা হয় নি৷ একপ্রকার দৌঁড় দিয়েই ছাদে গেলাম৷ আর অমনিই চোখাচোখি হয়ে গেলো মেয়েটার সাথে৷ গোলগাল মুখ আর নাদুস নুদুস গাল মেয়েটার৷ প্রথম দেখাতে যে কেউ মেয়েটার গালটানার লোভ সামলাতে বড্ড কষ্ট হবে৷ আমার ও হয়েছিল৷ কয়েকমূহূর্ত ভ্রম এর মধ্যে ছিলাম৷ ভ্রম ভাঙলো তার ঝাঝাঁলো কন্ঠে৷ ও বলল
-আচ্ছা! আপনিই তাহলে সে?
-আমি? ঠিক বুঝলাম না৷ (অপ্রস্তুত ভঙিতে বললাম)
-সিড়িঁঘরের পাশের রুমটাই আপনি উঠেছেন তাই না? (মেয়ে)
-হ্যা৷ কেন খুজঁছিলেন নাকি? (আমি)
-আপনি একটা বদঅভ্যাসপূর্ণ মানুষ৷ সেটা আপনি জানেন? (মেয়ে)
-হ্যা তা অবশ্য ঠিক৷ আমার মা সবসময় বলতো কথাটা৷ কিন্তু আপনি কেন বললেন? (আমি)
-ছাদটাকে কি গরুর গোয়াল পেয়েছেন? যেখানে সেখানে কলার খোসা আর সিড়িঁতে ধোঁয়া লুঙ্গির চুপসে পরা পানিতে ভিজে পিচলা করে রাখা৷ (বজ্রকণ্ঠে বললো মেয়েটা)
-তা তে আপনার কোনো সমস্যা? (ঠান্ডা গলায় বললাম)
-অবশ্যই সমস্যা৷ কারণ আমি যেকোনো সময় পিছলে পড়ে যেতে পারি৷ (রাগ চেপে বলল মেয়েটি)
-কেন? দেখেতো মনে হয় না ছোট্ট খুকিঁ? (আমি)
-ছোট্ট খুকিঁ না অন্যকিছু সেটা যখন আব্বুকে বলব তখনই বুঝবেন এই মিরা কি করতে পারে৷ (এই বলেই হনহনিয়ে চলে গেলো মেয়েটা৷
-পরের কয়েকদিন ভয় আর উৎকন্ঠার মধ্যে কেটেছিলো৷ কারন বাড়িওয়ালার কন্যারা করতে পারে না এমন কিছু নেই৷ কলা খাওয়া আর সিড়িঁঘরে ভেজা লুঙ্গি শুকাতে দেয়া রীতিমত বন্ধ করে দিলাম৷ কিন্তু কয়েকদিন পর পরিস্থিতি অনূকূলে পেয়ে আবার ও শুরু করলাম৷ মীরার সাথে ও আর দেখা হয়নি৷ তাই আমিও রাজ্য ফাঁকা পেয়েছি৷
"
-একদিন সকালে ঘুমোচ্ছিলাম৷ হঠাৎ ধপাস করে সিড়িঁতে আওয়াজ হলো আর অল্প করে চাপা আর্তনাদ৷ আমি দ্রুত গিয়ে যা দেখলাম! মীরা নামক মেয়েটি অসহায়ভাবে তাকিয়ে আছে আমার দিকে৷ আমি এসে পড়াতে হয়তো কাদঁতে পারছেনা৷ মীরা প্রাণপণ চেষ্টা করছে কান্না লুকানোর আর আমি চেষ্টা করছি আমার হাসিঁটা থামানোর৷ শেষমেষ দুজনেই ব্যর্থ হলাম৷ মীরা ভ্যাাা করে কেদেঁ দিয়েছে আর আমি হো হো করে হেসেঁ ফেলেছি৷ অনেককষ্টে হাসিঁ থামিয়ে মিরাকে বললাম,
-বাচ্চা মেয়ের মত কাদঁছেন কেন?
কিন্তু ও কেদেঁই চলেছে৷ গালে টোল পড়া হাসিঁ যেমন অদ্ভূত সুন্দর তেমনি তাদের কান্নাগুলোও উপভোগ্য৷ একবার ভাবলাম ওর বাবা মানে বাড়িওয়ালা ডাকা দরকার৷ আবার পরক্ষণেই ভাবলাম, বাড়িওয়ালাকে ডাকা মানেই নিজের পায়ে নিজে কুড়াঁল মারা৷ পরে মীরার ঐতিহাসিক কান্না শেষ হওয়ার পর তাকে কোলে করেই বাসায় পৌঁছে দিয়েছিলাম৷ মেয়েটা পা মাটিতে রাখতেই পারছিলো না৷ আমি প্রথমে ব্যাপারটা মজা হিসেবে নিয়েছিলাম৷ কিন্তু পরে বুঝতে পেরেছিলাম আঘাত টা ভালোই পেয়েছে৷
"
-সেদিন রাতেই মিরার জ্বর উঠলো৷ রাতে যখন ওদের বাসায় গেলাম৷ মিরার আম্মু দরজা খুলে দিয়েছিল আর ধন্যবাদ দিয়েছিলো৷ কিন্তু উনি হয়তো আসল ব্যাপারটা জানেন না৷ মীরা হয়তো বলেনি৷ আন্টি মীরাকে জ্বর পট্টি দিচ্ছিলো৷ মেয়েটার নাদুস নুদুস গালটা একদম শুকিয়ে গেছে৷ খুব খারাপ লেগেছিলো দেখে৷ একটু থেকেই আন্টির কাছে বিদায় নিয়ে চলে আসলাম৷ আন্টি বললো, কাল সকাল মীরাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে৷ আন্কেল যেহেতু নেই, সেহেতু আমাকে আন্টির সাথে থাকতে হবে৷
"
-সেদিনের পর কেটে গেছে অনেকটা সময়৷ বেশ অবাক হয়েছিলাম৷ কারণ মেয়েটা আসল ঘটনাটা বাসায় জানাইনি বলে৷ মীরা এখন পুরোটাই সুস্থ৷ যেখানে আমার সরি বলার কথা ছিল৷ সেখানে মীরা এসেই ধন্যবাদ দিলো৷ এরপর থেকে অদ্ভূত একটা সখ্যতা তৈরী হয়েছে আমাদের৷ চুপচাপ আর শান্তিপ্রিয় একটি মেয়ে৷ ছাদের রেলিং ধরে উদাসী দৃষ্টিতে আকাশপানে চেয়ে থাকে সে৷ আর আমি তারপাশে দাড়িঁয়ে মুগ্ধ নয়নে চেয়ে থাকি তার দিকে৷ নিয়মিতই ছাদে আসে এখন৷ ছাদে উঠার সময় আমার রুমের দরজায় ঠোকা দিবে৷ যেন ছাদে উঠার ঘন্টা বাজাচ্ছে সে৷ আর আমিও ঠোকাটা শুনার অপেক্ষায় ক্ষণ গুনতাম৷ মেয়েটা মাঝে মাঝে অদ্ভূতসব কথাবার্তা বলে লজ্জায় ফেলে দিতো আমাকে৷ সেদিন কথাচ্ছলে বললো,
-আচ্ছা আপনি কি লুঙ্গি পড়া আর কলা খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন?
মেয়ের প্রশ্ন শুনে রীতিমত মফিজ হয়ে গিয়েছিলাম৷ তারপরেরদিন সে আমার দরজার সামনে হাজির হয়েছিলো৷ তাও দুই ডজন কলা হাতে নিয়ে৷ আমার বিস্মিত চোখ দেখে সে বললো,
ছাদে চলুন৷ দুজনে বসে গল্প করবো আর কলা খাবো!
-আমি একবার মীরার দিকে তাকাচ্ছি আবার কলার দিকে তাকাচ্ছি৷ আমার চাহনী দেখে সে বললো,
-আর কলার খোসাঁগুলো ছাদেই ফেলবো৷ পুরো ছাদ কলার খোসাঁই ভরিয়ে দিব! কী রাজি তো? (মীরা)
-সুন্দরীদের কথা অগ্রাহ্য করা পাপ৷ চলুন৷ (আমি)
"
-মীরার সাথে ঘনিষ্টতা বেড়েই চলেছে দিনদিন৷ বলতে গেলে মীরাতে আসক্ত হয়ে পড়েছি৷ নামহীন সম্পর্কের মায়াজালে জড়িয়ে পরেছি মেয়েটার সাথে৷ এই মায়া অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা আমাকে সৃষ্টিকর্তা দেয়নি৷ আমাকে পাশে পেয়ে মেয়েটা চন্ঞলতা ফিরে পেয়েছে৷ মেয়েটা এখন আর শান্তশিষ্ট থাকে না৷ সে কথার ফুলঝুড়িঁ ছোটাই তার মুখ দিয়ে, খিলখিল করে হাসেঁ৷
সেদিন বাসার সামনে ফুচকা খাচ্ছিলাম৷ উপরের দিকে চোখ যেতেই দেখলাম, ছাদের রেলিং ধরে মীরা চেয়ে আমার দিকে৷ হাতের ইশারায় জিজ্ঞাস করলাম"ফুচকা খেতে চাও? জবাবে সে মাথা নেড়ে জানিয়ে দিলো খাবে না৷
-পরেরদিনই মীরা ফুচকার প্লেট নিয়ে হাজির হলো ছাদে৷ আর বলল, আজকে কলা নয় ফুচকা বানিয়ে এনেছি৷
ফুচকা খেতে খেতেই সে বলল,
- শুনুন! বাহিরের ফুচকা খাবেন না আর৷ আপনার ফুচকা খেতে ইচ্ছে হলেই আমাকে বলবেন৷ (মীরা)
-ধন্যবাদ৷ আপনার ফুচকা পছন্দ? (আমি)
-হ্যা৷ তবে বাইরেরগুলো খাই না৷ দোকান থেকে প্যাকেট কিনে বাসায় বানিয়ে খাই৷ (মীরা)
-দারুণ আইডিয়া তো৷ (আমি)
"
"
-দিনের পর দিন মীরার সঙ্গ পেয়ে মনটা লাগামহীন হয়ে যাচ্ছে৷ মীরাকে ছাড়া নিজেকে ছন্নছাড়া মনে হয়৷ জমানো আবেগগুলো হজম করার চেষ্টায় থাকি কিন্তু সেটা উল্টো বদহজমে পরিণত হচ্ছে দিনদিন৷ সিদ্ধান্ত নিলাম মীরাকে বলে দিবো৷ সম্পর্কের গাছটাকে যত্ন করে বড় করবো নয়তো মূল থেকে উপড়েঁ ফেলব৷
"
-ছাদে গিয়ে দেখি মেয়েটা রেলিং ধরে দাড়িঁয়ে আছে৷ ধীরপায়ে তারদিকে এগিয়ে গেলাম৷ বাতাসে চুল উড়ছে৷ অবাধ্য কিছু চুল তার কপালে দোলা দিচ্ছে৷ একদৃষ্টিতে অদূরে চেয়ে আছে৷ আমার অস্তিত্ব টের পেয়েই বললো,
-কিছু বলছেন না যে? (মীরা)
-অনেককিছু বলতে চাই৷ শুনবে? (আমি)
-হ্যা বলুন৷
-মীরা তোমার পাশে দাড়িঁয়ে রংহীন বিকালগুলো রঙিন করতে চাই৷ মেঘহীন আকাশের নিচে রঙিন ঘুড়িঁ উড়াতে চাই দুজনে মিলে৷ শুভ্রসকালে শিশিরে ঢাকা ঘাসে হাটঁবো দুজনে খালি পায়ে৷ তোমাকে রাজ্যের রাণী বানাতে না পারলেও মনের রাণী বানাবো৷ জীবনটা হয়তো খুব উচ্চবিলাশী হবে না ৷ কিন্তু ভালোবাসা দিয়ে ভরপুর থাকবে৷ দিবে কী আমার ইচ্ছেগুলোর পূর্ণতা? হবে কি আমার স্বপ্নপূরনের সঙ্গী?
-মীরা মুখে দুষ্টুমীমাখা হাসি টেনে বললো, শুনো পাশের নার্সারি থেকে কালকে একটা কলা গাছের চারা কিনে আনবা? , ছাদের ঐ কোণায় একটা কলা চারা লাগাবো৷ তারপর দুজনে মিলে যত্ন করে গাছটা বড় করবো৷ যখন গাছটাকে কলা হবে তখন দুজনে মিলে তা সাবাড় করবো৷ আর ভবিষ্যতে আমাদের বাবুগুলোকেও ইচ্ছেমত কলা খাওয়াবো৷ আর ঐটাই তাদের মা-বাবার ভালোবাসার স্বাক্ষী হবে৷
"
- আমার হাতটা পরম ভালোবাসায় জড়িয়ে ধরেছে মীরা৷
শেষবিকেলের লালচে আকাশটা উপভোগ করছে একজোড়া কপোত-কপোতী৷ নামহীন সম্পর্কটা আজ ভালোবাসা দিয়ে নামকরণ হয়েছে৷

0 coment rios:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন