সোমবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০১৮

ভালবাসার পরী


পরীর সাথে আমার প্রথম দেখা হয় শীতের
এক ভোরবেলায় । সেই
ভোরে কুয়াশা নামছিল ঘাসের চূড়া পর্যন্ত।
কুয়াশার ভীড় ঠেলে আমার
সামনে নেমে আসে পরী নামের মেয়েটি।
আমি তখন বসে আছি ক্ষেতের কিনার ছুঁয়ে ।
গ্রামে বেড়াতে এলে ভোরবেলা ঘুম
ভেঙ্গে যায় আমার । আমি তখন
বাইরে গিয়ে বসে থাকি। শহরের
সকালগুলোকে আমার কাছে একঘেয়ে মনে হয়।
আর
গ্রামের প্রতিটি সকালই যেন নতুন রূপের
বহিঃপ্রকাশ । এ রকম এক সকালে পরীর
সঙ্গে আমার দেখা। পরী আমার পাশ
দিয়ে হেঁটে চলে গেল। একবার আমার
দিকে তাকিয়েছিল কি ? আমার
চারপাশে কুয়াশার ঘেরাটোপ তৈরি হয়।
আমি বিড় বিড় করে বলি , অদ্ভুত সুন্দর
তো মেয়েটা । মেয়েটির সাথে আবার
দেখা হয় ওই দিন বিকেলবেলা। আমি তখন
উঠানে বসে বই পড়ছি। এমন সময় মেয়েটার
কন্ঠ কানে আসে। দাদী , দাদী।
আমি উঠে গিয়ে দরজা খুলি। বলি,
দাদী তো বাসায় নেই। মেয়েটার
হাতে একটা নীল রঙের বাটি।
বাটিটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,
এগুলো আপনার জন্য। কী এটার ভেতর ?
পিঠা। কে বানিয়েছে , তুমি ? জী। কী নাম
তোমার ? পরী। বাহ্ ! সুন্দর নাম তো !
দাদীর কাছ থেকে জানতে পারি ,
পরী এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে। পরীর
বাবা বেঁচে নেই। পরী যে স্কুলে পড়ে, ওর
মা সেই স্কুলের শিক্ষক। পরদিন
সকালে পরীর সাথে আবার দেখা হয় ।
কুয়াশার মাঝখানে । পরী আমার
সামনে এসে দাঁড়ায় । প্রশ্ন করে।
ভোরবেলা এই কুয়াশার
মাঝে এসে বসে থাকেন কেন ? কুয়াশার
সাথে মিতালী গড়ব বলে !
মিতালী হয়েছে ? কুয়াশার সাথে হয়নি ,
তবে তোমার সাথে হয়েছে। মানে ? মানে ,
কিছু না। আমি পরীর দিকে তাকাই । ওর
মুখে হাসি। আমি বলি , হাসছ কেন ?
মেয়েটি জবাব না দিয়েই চলে যায়।
পরদিন ওকে বলি । আমার সাথে নদীর
পাড়ে বেড়াতে যাবে ? যাব না ! এই
বলে হনহন করে হেঁটে চলে যায় পরী। পরীর
এ রকম আচরনে মন খারাপ হয়।
একা একা নদী তীরে যাই , হঠাত্ কে যেন
আমার পাশে এসে দাঁড়ায়।
তাকিয়ে দেখি পরী। চোখটা টলমল করছে।
আমি অবাক হয়ে বলি। কী হয়েছে কাঁদছ
কেন ? পরী ভেজা কন্ঠে বলে , আপনি অনেক
কষ্ট পেয়েছেন তাই না ? আমি কিছুক্ষন চুপ
থেকে বলি , হ্যাঁ , কষ্ট পেয়েছি।
তবে আমার পাশে এসে বসলে সব কষ্ট দূর
হয়ে যাবে। পরী আমার পাশে এসে বসে।
ধীরে ধীরে সময় চলে যায়। আমার
বেড়ানোর সময় শেষ হয়ে যায়।
বিদায়বেলায় পরীকে বলি , আমি আবার আসব
। পরী কোনো কথা বলেনা । এই প্রথম ওর
হাত ধরি আমি। ওর চোখ থেকে কয়েক
ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
আমি উপলব্ধি করি , ভালবাসা।
""তার আকাশে মেঘের বাসা সাদা মেঘ ,
নীল মেঘ, কালো মেঘ আরেকটা মেঘ
ভালবাসা তাতে ছিল তার আবেগ""
এরপর সময় পার হতে থাকে। এর মধ্যে আমার
আর গ্রামে যাওয়া হয় না। পরীর
কখা ভাবতে ভাবতে আমার
দিনগুলো যাচ্ছিল। আমি আর
থাকতে না পেরে দুবছর পর যখন গ্রামের
উদ্দেশ্যে পা রাখলাম, মনে হলো বহুকাল পর
আমি পরীর কাছে যাচ্ছি । কতদিন
দেখি না পরীকে ! বাড়ি পৌছেই দাদির
কাছে পরীর কথা জিঙ্গেস করি ।
কথাটা শুনে দাদী যেন কেমন বিষন্ন
হয়ে যান। আমার বুকটা ধ্বক করে ওঠে। কিছু
হয়নি তো পরীর ! পরীর সাথে দেখা করার
জন্য আমার মনটা ব্যাকুল হয় । কিন্তু দুপুর
গড়িয়ে বিকেল হলেও পরী আসে না ।
আমি বিষন্ন মন নিয়ে ধানক্ষেতের
কিনারে গিয়ে বসি । ওপরে বিশাল
আকাশটা হঠাত্ আঁধারে ছেয়ে আসে ।
বজ্রপাত হলে যে রকম শব্দ । তারপর টাপুর
টুপুর বৃষ্টি । আমি গাছতলায় বসে থাকি।
বৃষ্টি নামছে তো বাসায় যাবেন না ?
আমি চমকে উঠে পিছনে তাকাই ।
একটি মেয়ে আমার দিকে পেছন
ফিরে দাঁড়িয়ে আছে । পরী ! আমার
ভালবাসার পরী। আমি উঠে দাড়াই । তখন
বৃষ্টি থেমে গেছে । আমি পরীর
সামনে গিয়ে দাঁড়াই । মেয়েটি নত
মুখে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে । আর
আমার চোখের পলক পড়তে চায় না ।
আমি পরীর দুই গালে হাত রেখে চোখের
গভীর দৃষ্টি মেলে জিঙ্গেস করলাম, কেমন
আছ ,পরী ? আমাকে অবাক
করে দিয়ে পরী আমার
বুকে মাথা রেখে ঝরঝর করে কেঁদে দিল ।
এর কয়েক বছর পর
আমি বেলকনিতে বসে কবিতা আবৃতি করছিলাম,আর
পরী ঠিক সেদিনটির মত আমার
বুকে মাথা রেখে আমার
পাশে বসে কবিতা শুনছিল । তবে আজ পরীর
চোখে কোন অশ্রুজল নেই আছে সীমাহীন
ভালবাসা। অনেক ভালবাসি আমার
পরীটাকে।
""মনের মাঝে স্বপ্ন সাজাই শুধু তোমায়
নিয়ে, তুমি ছাড়া অবুঝ হৃদয়
চলবে কি দিয়ে। তুমি আমার ভীষন আপন
অন্ধকারের আলো, তুমি ছাড়া এক মুহূর্ত
লাগেনা আর ভালো। তুমি আমার ঐ সমুদ্রের
ভালবাসার তরী, তুমি আমার সাত জনমের
ভালবাসার পরী ।"

শেয়ার করুন

Author:

আমি সজীব হোসাইন -এই ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা পাশাপাশি লেখালেখির কাজটাও করি। অনলাইনে প্রযুক্তির বিষয় নিয়ে যা জানি তা মানুষের মাঝে শেয়ার করার ইচ্ছায় এ ব্লগ টি তৈরি করা।