২২. হেমসের যোদ্ধা(পর্ব-5)
সাথে আপনি আমাদেরকেও শরীক হতে দিন। আল্লাহ। শাহাদাত পিয়াসী বান্দাদের বার বার বিজয় দিয়েছেন। হয় আমরা সে ময়দানে শহীদ হয়ে যাবাে নয়তাে বিজয় এনে তুলে দেবে আপনার মােবারক হাতে।
সুলতান আইয়ুবী আর বিলম্ব করলেন না। সঙ্গে সঙ্গে তিনি আদেশ জারী করলেন, অভিযানের দিক পরিবর্তন করাে। আমাদের গতি হবে ইবনে লাউনের দিকে। ইয়াজুদ্দিনের ওপর আক্রমণকারীদের বুঝিয়ে দেয়া দরকার, মুসলমানদের দেহ একটাই। এর যে কোন অংশে আঘাত লাগলে তার প্রতিবিধানের জন্য মুসলমানরাই যথেষ্ট। আল্লাহ তার বান্দাদের অপমানিত হওয়ার জন্য দুনিয়ায় প্রেরণ করেননি। সুলতান আইয়ুবী একনায়কের মত কোন সিদ্ধান্ত নিতেন না। তিনি সিদ্ধান্ত নিতেন তার পরিষদের সবার সাথে পরামর্শ করেই। তবে তিনি কি চান সেটাও সঙ্গীদের দৃষ্টির আড়ালে রাখতেন না। তাঁর ভাবাবেগ ও চেহারাই বলে দিত তিনি কি চান। আর তাঁর সঙ্গীরাও তাঁরই মত মন-মস্তিষ্ক ও আবেগ নিয়ে ঘটনার বিশ্লেষণ করতে পারতেন। যে কারণে দেখা যেতাে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সবাই সম্মিলিতভাবে একই রকম সিদ্ধান্তের প্রতি ঝুঁকে যেতেন। এ ক্ষেত্রেও তাই ঘটলাে। সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই কাফেলা তার দিক পরিবর্তন করে ইবনে লাউনের দিকে যাত্রা করলাে। দূতের জন্য এটা ছিল এক অভাবনীয় ও অচিন্তনীয় ব্যাপার।
দূত ইবনে লাউনের প্রকৃত অবস্থা জানতাে, সেই সাথে এটাও জানতাে, এই চিঠিতে কি লেখা আছে। তার প্রথম বিস্ময়ের কারণ ছিল, কায়রাে পৌঁছার অনেক আগেই সুলতানকে পেয়ে যাওয়া। দ্বিতীয় কারণ ছিল, তাঁর বাহিনীকে সম্পূর্ণ রণসাজে পাওয়া। তৃতীয় বিস্ময় হয়ে দেখা দিল, মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে এ সশস্ত্র বাহিনীর দিক পরিবর্তনের ঘটনাটি। সামান্য এক পরগণার ক্ষুদ্র এক শাসকের ছােট্ট একটি চিঠির শক্তি দেখে সে হতবুদ্ধি হয়ে পড়লাে। সে বিস্ময়ের ধাক্কা সামাল দিতে না পেরে মুখ ফসকে বলেই ফেললাে, মহামান্য সুলতান! সত্যি আপনি ইবনে লাউন যাবেন?
কেন, তােমার কি সন্দেহ হচ্ছে? আমার উস্তাদ মরহুম নুরুদ্দিন জঙ্গীর এক শিষ্য ডাক দিয়েছে তার ভাইকে। ভাই কি সে ডাক ফেলতে পারে?
‘তবু! এ অভিযানের ভালমন্দ খতিয়ে দেখা কি প্রয়ােজন ছিল না? আমার তাে মনে হলাে, বাস্তবতা যাচাই না করেই আপনি আবেগের বশে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।'
পথ চলতে চলতেই কথা বলছিল কাসেদ। সুলতান তাকে ডেকে সঙ্গে নিয়েছিলেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ইবনে লাউনের সর্বশেষ অবস্থা বিস্তারিত জানার জন্য। কাসেদের কথা শুনে তিনি বললেন, ‘ভুল বললে মুজাহিদ। অবশ্যই আমি আবেগের মূল্য দেই। কিন্তু তাই বলে বাস্তবকে অস্বীকার করি এমন অভিযোেগ তুমি করতে পারাে না।' সুলতান আইয়ুবী বললেন, ইয়াজুদ্দিনের উক্তিতে আমি আমার উস্তাদ নুরুদ্দিন জঙ্গীর ধ্বনিই যেনাে শুনতে পেয়েছি। আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এক এবং আমাদের সংকল্পও এক। যে আবেগ তাকে ক্ষমতা ও রাজ্যের লােভ থেকেই রক্ষা করেনি বরং সেই আবেগের জন্য নিজের জীবনটাও কুরবানী করতে প্রস্তুত হয়েছে সেই একই আবেগ লালন করি আমিও। তার স্বপ্নের সাথে আমার স্বপ্ন ও সিদ্ধান্ত মিলে গেছে বলেই আমি দিক পরিবর্তন করে ইবনে লাউনের পথ ধরেছি এ কথা মনে করার কোন কারণ নেই। বরং সব দিক বিবেচনা করেই আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি।'
সম্মানিত সুলতান! কাসেদ বলল, বেয়াদবী না নিলে জানতে চাই, কোন বাস্তবতা আপনাকে এই সিদ্ধান্তে আসতে সহায়তা করেছে?
‘দুনিয়ার বর্তমান বাস্তবতাই আমাদেরকে এ সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করেছে।' বললেন সুলতান, বাস্তবতা এখন এই যে, এখন আমরা দামেশকে গেলে খৃস্টানের সহযােগিতায় ইবনে লাউনের সৈন্য ইয়াজুদ্দিনের উপর আক্রমণ করে বসবে। আর তাদের আক্রমণ একা প্রতিরােধ করতে পারবে না ইয়াজুদ্দিন। ইবনে লাউনের সামনেই হলব রাজ্য। তােমরা সবাই আল মালেকুস সালেহকে জানাে। তার উপদেষ্টাদেরকেও তােমরা ভাল করেই চেনাে। সে বাধ্য হয়ে আমাদের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হলেও চুক্তি তাে কোন লৌহ কপাট নয় যে তা ভাঙা যাবে না। যুদ্ধ শুরু হলে তাদের মাথা আবার বিগড়ে যেতে পারে। কোন লােভের টোপ দেখলেই তারা আমাদের সাথে সম্পর্কেচ্ছেদ করে ক্রুসেড বাহিনীর সাথে মিলিত হয়ে যাবে, এ সম্ভাবনাই বেশী। কিন্তু আমি ক্রুসেড বাহিনীকে হলবের সীমানায় আমন্ত্রণ জানাতে পারি না। এ জন্যই আমি ইয়াজুদ্দিনকে নিঃসঙ্গ রাখতে চাই না। কারণ সে হচ্ছে আমাদের সীমান্ত প্রহরী। এখানে কোন ফুটো তৈরী হলে সে ফুটো দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকবে। সেই পানির সাথে থাকবে কুমীর। ক্রুসেড কুমীরদের প্রতিরােধ করাই এখন বাস্তবতার দাবী। অতএব আমরা যা করছি, জেনে বুঝে ভেবেচিন্তেই করছি।'
সুলতান আইয়ুবী ইয়াজুদ্দিনের দূতকে বললেন, তুমি ইয়াজুদ্দিনকে আমাদের আগমনের খবর দিয়ে বলবে, তিনি যেন আমরা আসার আগ পর্যন্ত দুশমনকে তার এলাকায় প্রবেশের কোন অধিকার না দেয়। প্রয়ােজনে তাদের সাথে আপােষরফার কথাবার্তা চালাতে থাকে। তাকে শক্তি নয়, কৌশলে শত্রুর মােকাবেলা করতে বলবে। প্রয়ােজনে তাকে এমন ভান করতে বলবে, যেন দুশমন তাকেও তাদেরই একজন ভাবতে পারে।' তিনি বললেন, তুমি যত দ্রুত সম্ভব ফিরে যাও। আমরা আসছি।'
ইয়াজুদ্দিনের দূত দ্রুত এ সংবাদ নিয়ে ছুটে চললাে মালহাক অভিমুখে।
খৃস্টান গােয়েন্দারা সারা দেশ জুড়েই ছড়িয়েছিল। তারা সুলতান আইয়ুবীর গতিবিধি লক্ষ্য করে ক্রুসেড বাহিনীর কাছে নিয়মিতই রিপাের্ট পাঠাচ্ছিল। সুলতান আইয়ুবী বাহিনী নিয়ে বেরিয়ে পড়ার সাথে সাথেই তারা এ খবর পৌঁছে দিয়েছিল কেন্দ্রে। তারা জানিয়েছিল, সুলতান আইয়ুবী তার বাহিনী নিয়ে দ্রুত দামেশকের দিকে ছুটে চলেছে।'
কিন্তু তারা ভালভাবেই জানতাে, সুলতান আইয়ুবীর চাল বুঝে নেয়া কোন সহজ ব্যাপার নয়। তিনি আদৌ দামেশক যাবেন কিনা, এই নিয়েও তাদের মধ্যে সন্দেহ কাজ করছিল। তাই তারা সুলতানের গতিবিধির ওপর কড়া নজর রাখছিল।
সুলতানকে তার গতিপথ পরিবর্তন করতে দেখে তাই তারা বিস্মিত হলাে না। সঙ্গে সঙ্গে তারা সুলতানের গতিপথ পরিবর্তনের খবর কেন্দ্রে পাঠিয়ে দিল।
ক্রুসেড বাহিনীর সম্মিলিত হেড কোয়ার্টারে যখন গােয়েন্দাদের এই খবর পৌঁছলাে যে, সুলতান আইয়ুবীর বাহিনী দামেশকে যাওয়ার পরিবর্তে অভিযানের গতিপথ ইবনে লাউনের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন, খৃস্টান জেনারেলরা বললাে, ‘সুলতান আইয়ুবী তাঁর পরীক্ষিত ময়দান বেছে নিয়েই যুদ্ধে নামতে চাচ্ছে।
হেমসের সেই ইহুদী বণিক, যে হেমসের মুসলিম জনপদকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করার আবেদন নিয়ে সম্রাট বিলডনের সেনা ক্যাম্পে গিয়েছিল, সে ফিরে এসেছে। সেখানে সে সম্রাট বিলডনের সাক্ষাৎ পায়নি। কারণ তখন তিনি তার খৃস্টান বন্ধুদের কাছে সাহায্য চাইতে গিয়েছিলেন।
বিলডনের জেনারেলরা ইহুদী বণিকের প্রস্তাব শুনে তাকে বলে দিয়েছে, আপনার প্রস্তাব উত্তম। কিন্তু সম্রাটের আদেশ ছাড়া আমরা কোন অভিযান পরিচালনা করতে পারি না। তিনি ফিরে আসুক। তিনি এলে বিষয়টি অবশ্যই আমরা তার কাছে উত্থাপন করবাে।
ইহুদী ফিরে এসে দেখলাে, জাভীরা জীবিত ফিরে এসেছে।
সে অবাক হয়ে বললাে, তুমি! তবে যে সবাই বললাে তুমি ডুবে মারা গেছাে?
তাই গিয়েছিলাম। জাভীরা বললাে, তানভীর নামের এক মুসলমান যুবক আমাকে উদ্ধার করে এখানে নিয়ে এসেছে। তানভীর! ওকে তাে আমি চিনি। সে ওখানে কি করছিল! সে তাে এই হেমসেরই যুবক!
হ্যা, সে হেমসেরই যুবক। আমাদের কাফেলার সাথেই সেও ওদিক থেকেই আসছিল। আমি যখন ডুবে যাচ্ছিলাম তখন সে আমাকে উদ্ধার করে। আমরা স্রোতের টানে অনেক ভাটির দিকে চলে গিয়েছিলাম, তাই কাফেলাকে খুঁজে পাইনি। রাত হয়ে গিয়েছিল। আমার হাঁটার মত কোন শক্তি ছিল না। তাই রাতটা আমরা এক পাহাড়ের গুহায় কাটিয়ে পরদিন যাত্রা করি।'
জাভীরার কথা শুনে চিন্তিত দেখালাে ইহুদী বণিককে। সে বললাে, কিন্তু আমি ভাবছি, তানভীর ওদিকে কেন গিয়েছিল? পরদিন। ইহুদী বণিক তানভীরকে তার বাড়ীতে ডেকে পাঠাল। তানভীর এলে তাকে বললাে, আমি খুবই খুশী হয়েছি যে, তুমি আমার বন্ধু কন্যা জাভীরাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছাে। তােমার এ কাজের বদলা দেয়ার কোন সাধ্য আমাদের নেই। শুধু কৃতজ্ঞতার নিদর্শন স্বরূপ তােমার জন্য আমার পক্ষ থেকে সামান্য উপহার। আশা করি তুমি আমার এ উপহার গ্রহণ করবে। তানভীর ইহুদীর দেয়া পুরস্কার নিতে অস্বীকার করে বললাে, ‘একি বলছেন আপনি! আমি তাে আমার মানবিক দায়িত্ব পালন করেছি শুধু। না, এর বিনিময়ে আমি আপনাদের কাছ থেকে কিছু নিতে পারবাে না।'
কিন্তু বাবা, তুমি এত বড় উপকার করলে, আর আমরা তােমার জন্য কিছুই করতে পারবাে না!
কেন, আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন। আপনাদের নেক দৃষ্টিই আমার জন্য বিরাট পাওনা।
তাহলে কথা দাও, মা মরা এই মেয়েটিকে মাঝে মধ্যে দেখতে আসবে?
‘অবশ্যই আসবাে। আপনারা আমাদের পড়শী। এক পড়শী আরেক পড়শীর ভাল-মন্দ খবর নেবে না, তাও কি হয়! নিশ্চয়ই আমি আসবাে।' তানভীর এই বলে সেখান থেকে বিদায় নিল।
এ ইহুদীর কাছে জাভীরার মত মেয়ের আর কোন প্রয়ােজন ছিল না। কেননা সে হেমসের মুসলমানদের ধ্বংস করার ব্যবস্থা পাকা করে ফেলেছে। এখন খালি সম্রাট বিলডনের ফিরে আসার অপেক্ষা। তিনি নিশ্চয়ই এ প্রস্তাব খুশী চিত্তে লুফে নিবেন। তাই সে বৃদ্ধ খৃষ্টানকে বললাে, “জাভীরাকে এখন আর কি দরকার! আমি তাে সম্রাট বিলডনের বাহিনীকে দাওয়াত করেই এসেছি।'
হ্যাঁ, একটা জটিল কাজ খুব সহজ হয়ে গেল। আমিও সে কথাই ভাবছিলাম।'
‘তাহলে জাভীরাকে আবার হেড কোয়ার্টারে ফেরত পাঠিয়ে দিলেই তাে হয়!'
জাভীরাকে বলা হলাে এ কথা। সে ছিল চতুর মেয়ে। সে চাচ্ছিল এখানে আরাে কিছুদিন থেকে যেতে। বললাে, কোথাকার পানি কোথায় গড়ায় না দেখেই চলে যাওয়া কি ঠিক হবে? আর লড়াইয়ের সময়ও তাে আমার দরকার হতে পারে। বিশেষ করে খতিবকে যদি আমি বাগে নিয়ে আসতে পারি তবে হয়তাে লড়াইয়ের প্রয়ােজনই হবে না।'
কিন্তু খতিবকে তুমি কিভাবে বাগে আনবে?
‘সেটা আমার ব্যাপার। সেটা যদি তােমরাই পারতে তবে আমাদের মত মেয়েদের এত ট্রেনিং ও প্রশিক্ষণের আর কি দরকার ছিল? তাছাড়া ভুলে যাচ্ছাে কেন, এখানকার মুসলমানদের উদ্দেশ্য এবং সংকল্প জানতে হলেও আমার প্রয়ােজন আছে। আমি তাদের মধ্যে পরম্পর শত্রুতা সৃষ্টি করে তাদের ঐক্য ধ্বংস করে দিতে পারবাে। মুসলমানদের এ অনৈক্যই তােমাদের বিজয়কে নিশ্চিত করবে।
জাভীরার যুক্তি ফেলে দেয়ার মত ছিল না। সুতরাং ইহুদী তার প্রস্তাব ফিরিয়ে নিল এবং তাকে হেমসেই রাখার সিদ্ধান্ত হলাে। কিন্তু বৃদ্ধ খৃস্টান বা ইহুদী কেউ জানতেও পারলাে না, জাভীরা শুধু তানভীরের জন্যই আরাে কিছুদিন হেমসে থাকতে চাচ্ছিল।
জাভীরাকে তানভীর ইহুদীর বাড়ীতে রেখে আসা পর্যন্তই তার দায়িত্ব বলে জ্ঞান করেছিল। কিন্তু ঘটনা সেখানেই থেমে থাকেনি। পরদিন ইহুদীর বাড়ীতে তার যে আলাপ হয় তাতে ইহুদীর বাড়ীতে তার যাতায়াত অবাধ অধিকার লাভ করেছিল। সেই অধিকার জাভীরা ও তানভীরকে এক নতুন পৃথিবীতে টেনে নিল। তাদের মধ্যে শুরু হলাে নিয়মিত মেলামেশার খেলা। রাতের আঁধারে লােকালয় ছেড়ে অনেক দূরে খােলা মাঠে গিয়ে ওরা বসতাে। গল্প করতাে ঘন্টার পর ঘন্টা। দুজনের দুই আলাদা পৃথিবী এক হয়ে মিশে যেতাে সেই গল্পের ভূবনে।
খৃস্টান মেয়েটির মধ্যে ছিল রাজমহলের আভিজাত্য। বিলাসের বিচিত্র উপকরণ দিয়ে সেভাবেই তাকে গড়ে তােলা হয়েছে। তাকে শেখানাে হয়েছে কিভাবে শাহজাদা বা আমীর ও বাদশাহদের কজা করতে হয়। সে তুলনায় তানভীর ছিল নিতান্তই এক গ্রাম্য যুবক। একে কজা করা মেয়েটির কাছে ছিল এক তুচ্ছ কাজ। কিন্তু এই তুচ্ছ কাজটিও জাভীরা যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে করছিল।
দামেশকে তার প্রশিক্ষণের সময় এ মেয়ে দুই আমীরকে তার পদতলে বসিয়ে রাখতাে। তাদের দিয়ে সে এমন ষড়যন্ত্র পাকিয়ে তুলেছিল যে, সেই ষড়যন্ত্র মােকাবেলার জন্য স্বয়ং সুলতান আইয়ুবীকে দামেশকে ছুটে যেতে হয়েছিল। কিন্তু তানভীরের সাথে তার মেলামেশাটা ছিল আসলেই আন্তরিক। দুর্যোগের বিভীষিকা এবং তানভীরের সে সময়কার কর্মকান্ডে মেয়েটি নিতান্তই অভিভুত হয়ে পড়েছিল। তানভীরের ব্যবহার তার সত্বকে এমনভাবে ধাক্কা দিয়েছিল যে, মেয়েটি নিজের মধ্যে অভাবনীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করলাে। তার মধ্যে জন্ম নিল আবেগপ্রবনতা। সে অনুভব করলাে, তার অন্তরের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে থরাে থরাে প্রেমের লাল গােলাপ। দিনে দিনে সে গােলাপ সুবাস ছড়াতে শুরু করলাে। কখন যে সে তার ভালবাসায় তানভীরকে সিক্ত করে ফেলল এবং নিজেও তানভীরের ভালবাসায় বিভাের হয়ে গেলাে, নিজেও টের পেলাে না। কিন্তু তারপরও মেয়েটি ছিল খৃষ্টানদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এক গােয়েন্দা। তার একটি নির্দিষ্ট দায়িত্ব ছিল, ছিল সুস্পস্ট এসাইনমেন্ট। সেই এ্যাসাইনমেন্টের কথা তো সে ভুলে যেতে পারে না। তাই সে একদিন কথায় কথায় তানভীরকে জিজ্ঞাসা করলো, তানভির, একটি কথা জিজ্ঞেস করবো?
কি কথা, বলাে?
খতিব এবং আরও যারা তোমাদের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে তারা কি সবাই এখানকার, নাকি বাইরে থেকে এসেছে?
তানতীর নাম ধরে ধরে তার উত্তর দিতে শুরু করলে জাভীরাই আবার বলে উঠলো, থাক এখন সে কথা। এখন সে খবর নিয়ে আমাদের কি লাভ, যে যা করার করুক। আমরা এমন সুন্দর রাত কেন যুদ্ধের কথা বলে নষ্ট করবো।'
এমনিভাবে সে দুদিকই সামাল দিতে লাগলাে। অথবা বলা যায়, সে নিজেই দোদুল্যমানতায় ভুগতে লাগল। সে যখন তানভীরের সাথে থাকে তখন এক অবুঝ প্রেমিকা ছাড়া নিজেকে আর কিছুই ভাবতে পারে না। তার তখন এ কথাও মনে থাকে না যে, সে এক গােয়েন্দা। তাকে কায়রো থেকে বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে পাঠানাে হয়েছে। কিন্তু এই জাভীরাই যখন ইহুদী বণিকের ঘরে যায় এবং তার অন্যান্য সঙ্গীদের সঙ্গে মিলিত হয়, তখন সে তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে তাদের মত সমান তালে মুসলমানদের ধ্বংসের পরিকল্পনা নিয়ে মেতে উঠে।
(চলবে)
0 coment rios:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন