২০. পাল্টা ধাওয়া(পর্ব-6)
তকিউদ্দিনের এ আক্রমণ ছিল অসাধারণ সাহস ও বীরত্বপূর্ণ কাজ। যুদ্ধের কলা-কৌশল, আবেগ ও জোশের দিক থেকে এ আক্রমণ ছিল অনন্য ও অসাধারণ। কিন্তু এ যুদ্ধের ফলাফল বা লাভ-ক্ষতির দিক বিবেচনা করে ঐতিহাসিকগণ বলেছেন, শত্রু বাহিনী যখন দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পালাচ্ছিল, সে সময় যদি তাদের পিছু ধাওয়া করে তাদের সামরিক শক্তি একেবারে ধ্বংস করে দেয়া যেতাে তবেই এ সফলতা পূর্ণাঙ্গ হতাে।
তা ছাড়া তকিউদ্দিন যদি আরেকটু সাহসিকতা প্রদর্শন করে অধিকৃত এলাকায় অগ্রাভিযান চালাতাে এবং নিজস্ব বন্দীদের মুক্ত করার ব্যবস্থা করতাে তবে ক্রুসেড বাহিনীর সাধ্য ছিল না তাদের প্রতিরােধ করে।
কিন্তু সুলতান তকিউদ্দিন এ ঝুঁকি নিতে চাননি। কারণ তার হাতে পর্যাপ্ত সৈন্য ছিল না। যেটুকু বিজয় অর্জিত হয়েছে সেটুকু হাতছাড়া হয়ে যাক, তা তিনি চাননি। কমাণ্ডো হামলা করে আঁধার রাতে ঘুমন্ত বিশাল বাহিনীকে লণ্ডভণ্ড করা আর বিশাল এলাকায় নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এক কথা নয়। কিন্তু এটুকু বিজয়ও কম সফলতা ছিল না। রমলার পরাজয় মুসলমান সৈন্যদের মনে যে অশুভ প্রভাব বিস্তার করেছিল এই বিজয়ের ফলে তা দূর হয়ে গেল। তারা আবার নতুন প্রেরণা ও আবেগ নিয়ে চাঙ্গা হয়ে উঠল। আইয়ুবীর পরাজয় এবং খৃস্টানদের বিশাল বহর দেখে জনমনে এবং সৈন্যদের মধ্যে যে ভীতির সৃষ্টি হয়েছিল এই বিজয় তা ধুয়ে মুছে সাফ করে দিল। খৃস্টানরা মুসলমানদের চেয়ে বেশী শক্তিশালী এই ধারনার পরিবর্তে বিজয়ের মালিক যে আল্লাহ এই ধারনা আবার তাদের মনে বদ্ধমূল হয়ে গেল। তাদের মধ্যে এই আস্থা ফিরে এলাে যে, এখন তারা খৃস্টানদেরকে যে কোন ময়দানে পরাজিত করতে পারবে। এখন প্রয়ােজন সৈন্য বাড়ানাে।
খৃস্টানরা এ যুদ্ধে বড় রকমের ধাক্কা খেল। তারা ভেবেছিল, আইয়ুবী যখন পরাজিত হয়েছে তখন তাদের অগ্রগতি আর কোথাও বাঁধাপ্রাপ্ত হবে না। তারা স্রোতের মত সমগ্র মুসলিম সালতানাতে খৃস্টবাদের বন্যা বইয়ে দেবে। অধিকৃত অঞ্চলগুলে ভাগ বাটোয়ারা করে নেবে নিজেদের মধ্যে। আর এ বাটোয়ারাব মূলনীতি হবে, যে যতটুকু অঞ্চল দখল করতে পারবে, সেটুকু তার অঞ্চল বলে গণ্য হবে।
কিন্তু এই ব্যর্থতা তাদের অগ্রাভিযানের গতি থামিয়ে দিল। খৃস্টান সৈন্যরা বিজয় যতটা সহজ ভেবেছিল, তত তেলতেলে আর রইল না। মুসলমানরা যুদ্ধের সময় অলৌকিক ও কুদরতি সাহায্য পায় বলে খৃস্টান সৈন্যদের মনে সব সময়ই যে ভীতি কাজ করতাে, সেই ভীতিটা আবার তাদের পেয়ে বসল। সবচে বড় কথা হল, যে হিম্মত দুর্গ নিয়ে এ লড়াই হলো, সে দুর্গ মুসলমানদের হাতেই রয়ে গেল। খৃস্টান বাহিনীকে এগুতে হলে এ দুর্গের পতন ঘটিয়েই সামনে এগুতে হবে। কিন্তু এ দুর্গ দখল করা কতটা কঠিন, আর কেউ না হলেও খৃস্টান সম্রাট বিলডন তা হাড়ে হাড়ে টের পেল।
যুদ্ধের পর দিন। সুলতান তকিউদ্দিন তার হেডকোয়ার্টারে বসে আফসােস করছিলেন। তার সেনাপতিদের অবস্থাও ছিল উত্তেজনা ও আবেগে পরিপূর্ণ। তকিউদ্দিন বলছিলেন, 'যদি আমার কাছে আরও কিছু সৈন্য থাকতাে, তবে কমাণ্ডো আক্রমণের এই সফলতার পর আরাে বড় ধরনের বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারতাম । সম্রাট বিলডন তার বাহিনীর কিছুই ফেরত নিতে পারতেন না। হয় তারা মারা যেত, নয় বন্দী হতাে।
একই রকমের আক্ষেপ ধ্বনিত হচ্ছিল তার সেনা অফিসারদের কণ্ঠ থেকেও।
তকিউদ্দিন তার কাতেবকে ডাকালেন। তিনি তার বড় ভাই সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীকে চিঠি লিখতে বসলেন।
তিনি লিখলেন:
শ্রদ্ধেয় বড় ভাই, মিশরের সম্মানিত সুলতান!
‘আল্লাহ আপনাকে ইসলামী সাম্রাজ্যের শক্তি ও সম্মান বৃদ্ধি করার জন্য আরাে দীর্ঘ কাল বাঁচিয়ে রাখুন। আমি এই আশা নিয়েই চিঠি লিখছি, আপনি সুস্থ্য ও মঙ্গল মতেই কায়রাে পৌছে গেছেন। প্রথমে গুজব শুনেছিলাম, আপনি নাকি শহীদ হয়ে গেছেন। পরে জানতে পারলাম, আপনি সামান্য আহত হয়েছেন। আমি ও আমার সেনাপতিগণ আপনার প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য খুবই উদগ্রীব ছিলাম। আপনি বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে কাসেদ মারফত আপনার জীবিত ও সুস্থ্য থাকার খবর আমাদের জানিয়ে দিয়েছিলেন বলে আমরা কৃতজ্ঞ।
আমি আশা রাখি, আপনি রমলার আকস্মিক পরাজয়ের ব্যথা অন্তরে লালন করে নিজেকে কষ্ট দেবেন না। আমরা ইনশাআল্লাহ শীঘ্রই এ পরাজয়ের প্রতিশােধ নেবাে। হারানাে এলাকা আবার উদ্ধার করবাে এবং বায়তুল মুকাদ্দাসও আমরা মুক্ত করে ছাড়বাে ইনশাআল্লাহ।
আপনি পরাজয়ের কারণগুলাে অবশ্যই খুঁটিয়ে দেখছেন। আমি এ ত্রুটি সৈন্যদের ওপর চাপাতে চাই না। আমাদের পরাজয় দেখার জন্য আমাদের ভাইয়েরা যেদিন থেকে দলবদ্ধ হয়েছিল, সেদিন থেকে তারা আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও অস্ত্রধারণ করেছিল। যখন দুই ভাই পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হয় তখন শত্রুরা পরস্পরের প্রতি সহানুভূতি ও দরদ দেখিয়ে গােপনে পরস্পরকে উত্তেজিত করতে থাকে।
আমাদের ভাইদেরকে গদি ও রাজ্যের নেশা অন্ধ করে দিয়েছিল। আমাদের যে অর্থ ও শক্তি ইসলামী সাম্রাজ্যের মজবুতির জন্য ব্যয় করা প্রয়ােজন ছিল, সে সব গৃহযুদ্ধ করে আমরা শেষ করে ফেলেছি। আমাদের বিশাল সমরিক শক্তি এবং পরীক্ষিত সৈন্যরা এই যুদ্ধে নিহত বা আহত হয়ে আমাদের দুর্বল করে দিয়েছে।
বিদ্রোহীদের সৈন্য বাহিনী এই ইসলামী খেলাফতেরই সৈন্য ছিল। এই সেনাবাহিনী শুধু এ জন্যই নষ্ট হয়ে গেল যে, জাতির কিছু লােক ক্ষমতা ও গদীর লােভে নিজেদের বাদশাহ হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল। তারা ইসলামী খেলাফত ও হুকুমতকে নিজ নিজ অংশে ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়েছিল। তাদের পরস্পরের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে, লােভের বশে তারা নিজের পায়ে কুড়াল মারতেও প্রস্তুত।
এখন আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে, জাতি যেন বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে না থাকে। মাজহাবী মতপার্থক্যই কি কম বিশৃংখলা সৃষ্টি করছে? রাজত্ব ভাগ-বাটোয়ারার মত জাতিকেও বিভক্ত রাখার অপচেষ্টা চলছে। আমি মনে করি, এই দলাদলিই আমাদের পরাজয়ের কারণ। দলাদলি করে গুটিকয় লােক, কিন্তু এর শাস্তি ভােগ করতে হয় সমগ্র জাতিকে। এ কথা এখন আমাদের সেনাপতি ও সামরিক অফিসাররা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছে। কিন্তু এটুকুই যথেষ্ট নয়। জাতির প্রতিটি নাগরিককে আজ এ কথা বুঝাতে হবে। গৃহযুদ্ধে আমাদের শ্রেষ্ঠ সামরিক শক্তি নষ্ট হয়ে গেলে সেই শূন্যতা আমরা পূরণ করেছি নতুন সৈন্য ভর্তি করে। অনভিজ্ঞ সৈন্যদেরকে সমরক্ষেত্রে পাঠানাের কারণেই আমাদেরকে পরাজয় বরণ করতে হলাে। যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে যাওয়া সমস্ত সৈন্যই নতুন ও আনাড়ী ছিল। তাদেরকে শক্তিতে পরিণত করতে হলে যথেষ্ট প্রশিক্ষণের প্রয়ােজন রয়েছে, নিশ্চয়ই আপনি তা স্বীকার করবেন।
আমি ও আমার সেনাপতিগণ রমলার পরাজয়ের পরপরই প্রমাণ করে দিয়েছি, আমাদের সেনাবাহিনী পরাজিত হয়নি। আপনি যে পদাতিক ও অশ্বারােহী সৈন্য আমার কমাণ্ডে রেখে গিয়েছিলেন; তারা খৃস্টান বাহিনীকে হিম্মত দূর্গে ঢুকতে দেয়নি। হিম্মত দুর্গের বাইরেই আমরা তাদের কবর রচনা করেছি। অন্ধকার তাদের সহায় হয়েছিল, নইলে তাদের কাউকে আমরা পালিয়ে যাওয়ার সুযােগ দিতাম না।
আপনি আমাকে ও আমার বাহিনীকে রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে সংরক্ষিত রেখে গিয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের অবস্থা এমন আকস্মিকভাবে বদলে গেল যে, আপনার আদেশ নেয়ার সুযােগও হলাে না। সমরাঙ্গণে কি হচ্ছে, সেখানে আমার প্রয়ােজন আছে কি না, আমি কিভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি, এসব কিছু জানার আগেই আপনার পরাজয়ের খবর আমার কাছে পৌঁছে যায়।
আপনাকে সাহায্য করার জন্য তখনি আমি বাহিনী নিয়ে রওনা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আপনার রেখে যাওয়া অভিজ্ঞ অফিসাররা আমাকে থামিয়ে দেয়। তারা আমাকে উত্তেজিত হয়ে আবেগের বশে কোন সিদ্ধান্ত নিতে নিষেধ করে। এ জন্য আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। তারা আমাকে সঠিক পরামর্শ দিয়ে অশেষ উপকার করেছে।
তাদের পরামর্শেই আমি আমার সমস্ত আবেগ ও উত্তেজনা প্রশমিত করে নিলাম। তারপর ধীরস্থিরভাবে চিন্তা করে দেখলাম, হিম্মতের অবস্থান টিকিয়ে রাখাই এ মুহূর্তে সবচে জরুরী । আমি আমার সৈন্য দলকে সেভাবেই পরিচালনা করলাম ।
আপনার পরাজয়ের খবর আমার বাহিনীকেও ভীষণভাবে আহত করেছিল। আমি আল্লাহর দরবারে তাদের মনােবল ও সাহসের জন্য প্রার্থনা করলাম। দুশমনের প্রতিটি তৎপরতা জানার জন্য আমি গােয়েন্দা লাগিয়ে দিলাম। এক গােয়েন্দা 'আমাকে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ জানালাে। সে বলল, সম্রাট বিলডন তার সেনাবাহিনী নিয়ে এদিকেই ছুটে আসছে। সাথে সাথে আমি আপনার কথা স্মরণ করলাম। আমি নিজেকে প্রশ্ন করলাম, যদি আমার ভাই এ পরিস্থিতিতে পড়তেন তবে কি করতেন? এ প্রশ্নের যে উত্তর পেলাম সেভাবেই আমি যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করলাম।
বিলডন দুর্গ অবরােধ করল। সে ধরেই নিল, আমার সমস্ত বাহিনী হিম্মত দুর্গেই আশ্রয় নিয়েছে। বিলডনের বাহিনী আমাকে সদলবলে বন্দী করার জন্য হিম্মত দুর্গ অবরােধ করে বসে রইল।
আমি আপনার যুদ্ধ কৌশল অবলম্বন করে আমার বাহিনীর মূল অংশ আগেই দুর্গ থেকে বের করে পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে রাখলাম। কেল্লাধিপতিকে কি করতে হবে বুঝিয়ে দিয়ে আমি এসে যােগ দিলাম মূল বাহিনীর সাথে। আমার আশা আল্লাহ পূরণ করলেন। সম্রাট বিলডনের সৈন্য সংখ্যা আমার বাহিনীর দশগুণেরও বেশী ছিল। রাতের বেলা আমাদের জানবাজ সৈন্যরা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে বীরের মত কমাণ্ডো আক্রমণ চালালাে। নিবেদিতপ্রাণ মুজাহিদদের ত্যাগ, কোরবানী ও সাহসিকতার বর্ণনা দেয়ার ভাষা আমার নেই। শুধু এতটুকু বলবাে, জয়-পরাজয়ের দায়িত্ব আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিয়ে যদি কোন বাহিনী তার সমগ্র শক্তি ময়দানে হাজির করতে পারে তবে আল্লাহ কখনাে তাদের নিরাশ করেন না, এই বিশ্বাসের বাস্তবতা আমি সচক্ষে দেখেছি।
যদি আপনি সে দৃশ্য দেখতেন, যে দৃশ্য আমরা সেদিন সকালে সূর্যের আলােয় দেখেছি, তবে আপনার পরাজয়ের বেদনা ও গ্লানি সত্যি ভুলে যেতেন। আমার সবচেয়ে আফসােস এই, বিলডন আমার ফাঁদ থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল, তাকে আমি ধরতে পারিনি।
আমি এখন পাহাড়ের এক চূড়ায় বসে কাতিব দিয়ে চিঠি লিখাচ্ছি। এখান থেকে হিম্মত দুর্গ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সেখানে এখনও মিশরের ইসলামী পতাকা পতপত করে উড়ছে।
কেল্লার আশেপাশে ক্রুসেড সৈন্যদের লাশ ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ছে না। আমি তাদের দাফন করার কথা বললেও তা শেষ করতে আরাে দু’তিন দিন লেগে যাবে। ততক্ষণ পর্যন্ত লাশগুলাে সেখানে থাকবে কিনা আমি বলতে পারি না। কারণ হাজার হাজার শকুন আকাশে উড়ছে। শকুনেরা ভীড় করে লাশ খেতে শুরু করেছে। কোন কোন স্থান থেকে এখনও ধোঁয়া উঠছে। এসব আগুন গত রাতে আমার কমান্ডো বাহিনী লাগিয়েছিল। বিলডনের কত সৈন্য মারা গেছে আর কত সৈন্য পালিয়ে যেতে পেরেছে, এখনও আমি সে শুমার করতে পারিনি।
আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি, বিলডন এখনি কোন প্রতিশােধমূলক আক্রমণ চালানাের কথা চিন্তা করতে পারবে না। কিন্তু তাই বলে আমরা অপ্রস্তুত অবস্থায় নেই। আমরা পরিপূর্ণ সতর্কতা, ও প্রস্তুতি নিয়েই এখানে অপেক্ষা করছি। আমার কাছে এখন যে পরিমাণ সৈন্য আছে আর এই পরিমাণ সৈন্য থাকলে আমি পলায়নপর ক্রুসেডদের পিছু তাড়া করতাম। আর তা করতে পারলে রমলাসহ যেটুকু অঞ্চল খৃস্টানরা দখল করে নিয়েছে তা ফিরিয়ে দিয়ে তবেই তারা নিজেদের জান বাঁচাতে পারতাে। আর কিছু সৈন্য থাকলেই পরাজয়কে আমি বিজয়ে রূপান্তর করে দিতাম।
আমি আপনাকে আশ্বাস দিচ্ছি, আমার সেনাপতি, কমাণ্ডার ও সেনাবাহিনীর সমস্ত যােদ্ধাদের মনে যুদ্ধ করার বলিষ্ঠ আগ্রহ ও মনােবল রয়েছে। আমি এটাও জানি, আপনি নিশ্চিন্তে ও আরামে বসে নেই। নিশ্চয়ই আপনি নতুন সৈন্য ভর্তি ও তাদের ট্রেনিংয়ের কাজ শুরু করে দিয়েছেন।
আপনি সেই ব্যস্ততা নিয়েই প্রশান্ত মনে প্রস্তুতি নিতে থাকুন। আমি সুযােগ মত কমাণ্ডো লড়াই অব্যাহত রাখবাে। শত্রুদের, কখনও আরামে বসে থাকতে দেবাে না। এই সৈন্য নিয়ে হয়তাে কোন অঞ্চল অধিকার করে ধরে রাখতে পারবাে না, কিন্তু আপনি যেন প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় ও সুযােগ পান সে ব্যবস্থা আমি করবাে।
আমি দামেশকে ভাই শামসুদ্দিনকেও চিঠি পাঠিয়েছি, তিনি যেন কিছু সৈন্য ও সামানপত্র পাঠান। হলবে আল-মালেকুস সালেহকেও সংবাদ পাঠিয়েছি, তার সাথে আপনার যে চুক্তি হয়েছে সে চুক্তি অনুসারে সে যেন আমাকে সাহায্য পাঠায়।
আমি আপনাকে আল্লাহর উপর ভরসা করেই, এ কথা বলতে চাই, আপনি আমার সম্পর্কে কোন চিন্তা করবেন না। আমি ও আমার সঙ্গী সেনাপতিগণ আপনার মঙ্গল ও তৎপরতা সম্পর্কে জানার জন্য অধীর আগ্রহে চেয়ে আছি। আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন। আমরা তারই করুণার ছায়া চাচ্ছি। কারণ আমরা জানি, আমাদের সকলকে একদিন তার কাছেই ফিরে যেতে হবে।
আপনার স্নেহের ভাই তকিউদ্দিন।
তকিউদ্দিন চিঠিতে দস্তখত করে কাসেদের হাতে দিয়ে দ্রুত তা কায়রাে পৌঁছে দেয়ার হুকুম দিলেন। কাসেদ সে চিঠি নিয়ে ছুটল কায়রাের পথে।
(সমাপ্ত)
পরবর্তী পর্ব 'ধাপ্পাবাজ' শীঘ্রই আসছে।
তা ছাড়া তকিউদ্দিন যদি আরেকটু সাহসিকতা প্রদর্শন করে অধিকৃত এলাকায় অগ্রাভিযান চালাতাে এবং নিজস্ব বন্দীদের মুক্ত করার ব্যবস্থা করতাে তবে ক্রুসেড বাহিনীর সাধ্য ছিল না তাদের প্রতিরােধ করে।
কিন্তু সুলতান তকিউদ্দিন এ ঝুঁকি নিতে চাননি। কারণ তার হাতে পর্যাপ্ত সৈন্য ছিল না। যেটুকু বিজয় অর্জিত হয়েছে সেটুকু হাতছাড়া হয়ে যাক, তা তিনি চাননি। কমাণ্ডো হামলা করে আঁধার রাতে ঘুমন্ত বিশাল বাহিনীকে লণ্ডভণ্ড করা আর বিশাল এলাকায় নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এক কথা নয়। কিন্তু এটুকু বিজয়ও কম সফলতা ছিল না। রমলার পরাজয় মুসলমান সৈন্যদের মনে যে অশুভ প্রভাব বিস্তার করেছিল এই বিজয়ের ফলে তা দূর হয়ে গেল। তারা আবার নতুন প্রেরণা ও আবেগ নিয়ে চাঙ্গা হয়ে উঠল। আইয়ুবীর পরাজয় এবং খৃস্টানদের বিশাল বহর দেখে জনমনে এবং সৈন্যদের মধ্যে যে ভীতির সৃষ্টি হয়েছিল এই বিজয় তা ধুয়ে মুছে সাফ করে দিল। খৃস্টানরা মুসলমানদের চেয়ে বেশী শক্তিশালী এই ধারনার পরিবর্তে বিজয়ের মালিক যে আল্লাহ এই ধারনা আবার তাদের মনে বদ্ধমূল হয়ে গেল। তাদের মধ্যে এই আস্থা ফিরে এলাে যে, এখন তারা খৃস্টানদেরকে যে কোন ময়দানে পরাজিত করতে পারবে। এখন প্রয়ােজন সৈন্য বাড়ানাে।
খৃস্টানরা এ যুদ্ধে বড় রকমের ধাক্কা খেল। তারা ভেবেছিল, আইয়ুবী যখন পরাজিত হয়েছে তখন তাদের অগ্রগতি আর কোথাও বাঁধাপ্রাপ্ত হবে না। তারা স্রোতের মত সমগ্র মুসলিম সালতানাতে খৃস্টবাদের বন্যা বইয়ে দেবে। অধিকৃত অঞ্চলগুলে ভাগ বাটোয়ারা করে নেবে নিজেদের মধ্যে। আর এ বাটোয়ারাব মূলনীতি হবে, যে যতটুকু অঞ্চল দখল করতে পারবে, সেটুকু তার অঞ্চল বলে গণ্য হবে।
কিন্তু এই ব্যর্থতা তাদের অগ্রাভিযানের গতি থামিয়ে দিল। খৃস্টান সৈন্যরা বিজয় যতটা সহজ ভেবেছিল, তত তেলতেলে আর রইল না। মুসলমানরা যুদ্ধের সময় অলৌকিক ও কুদরতি সাহায্য পায় বলে খৃস্টান সৈন্যদের মনে সব সময়ই যে ভীতি কাজ করতাে, সেই ভীতিটা আবার তাদের পেয়ে বসল। সবচে বড় কথা হল, যে হিম্মত দুর্গ নিয়ে এ লড়াই হলো, সে দুর্গ মুসলমানদের হাতেই রয়ে গেল। খৃস্টান বাহিনীকে এগুতে হলে এ দুর্গের পতন ঘটিয়েই সামনে এগুতে হবে। কিন্তু এ দুর্গ দখল করা কতটা কঠিন, আর কেউ না হলেও খৃস্টান সম্রাট বিলডন তা হাড়ে হাড়ে টের পেল।
যুদ্ধের পর দিন। সুলতান তকিউদ্দিন তার হেডকোয়ার্টারে বসে আফসােস করছিলেন। তার সেনাপতিদের অবস্থাও ছিল উত্তেজনা ও আবেগে পরিপূর্ণ। তকিউদ্দিন বলছিলেন, 'যদি আমার কাছে আরও কিছু সৈন্য থাকতাে, তবে কমাণ্ডো আক্রমণের এই সফলতার পর আরাে বড় ধরনের বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারতাম । সম্রাট বিলডন তার বাহিনীর কিছুই ফেরত নিতে পারতেন না। হয় তারা মারা যেত, নয় বন্দী হতাে।
একই রকমের আক্ষেপ ধ্বনিত হচ্ছিল তার সেনা অফিসারদের কণ্ঠ থেকেও।
তকিউদ্দিন তার কাতেবকে ডাকালেন। তিনি তার বড় ভাই সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীকে চিঠি লিখতে বসলেন।
তিনি লিখলেন:
শ্রদ্ধেয় বড় ভাই, মিশরের সম্মানিত সুলতান!
‘আল্লাহ আপনাকে ইসলামী সাম্রাজ্যের শক্তি ও সম্মান বৃদ্ধি করার জন্য আরাে দীর্ঘ কাল বাঁচিয়ে রাখুন। আমি এই আশা নিয়েই চিঠি লিখছি, আপনি সুস্থ্য ও মঙ্গল মতেই কায়রাে পৌছে গেছেন। প্রথমে গুজব শুনেছিলাম, আপনি নাকি শহীদ হয়ে গেছেন। পরে জানতে পারলাম, আপনি সামান্য আহত হয়েছেন। আমি ও আমার সেনাপতিগণ আপনার প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য খুবই উদগ্রীব ছিলাম। আপনি বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে কাসেদ মারফত আপনার জীবিত ও সুস্থ্য থাকার খবর আমাদের জানিয়ে দিয়েছিলেন বলে আমরা কৃতজ্ঞ।
আমি আশা রাখি, আপনি রমলার আকস্মিক পরাজয়ের ব্যথা অন্তরে লালন করে নিজেকে কষ্ট দেবেন না। আমরা ইনশাআল্লাহ শীঘ্রই এ পরাজয়ের প্রতিশােধ নেবাে। হারানাে এলাকা আবার উদ্ধার করবাে এবং বায়তুল মুকাদ্দাসও আমরা মুক্ত করে ছাড়বাে ইনশাআল্লাহ।
আপনি পরাজয়ের কারণগুলাে অবশ্যই খুঁটিয়ে দেখছেন। আমি এ ত্রুটি সৈন্যদের ওপর চাপাতে চাই না। আমাদের পরাজয় দেখার জন্য আমাদের ভাইয়েরা যেদিন থেকে দলবদ্ধ হয়েছিল, সেদিন থেকে তারা আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও অস্ত্রধারণ করেছিল। যখন দুই ভাই পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হয় তখন শত্রুরা পরস্পরের প্রতি সহানুভূতি ও দরদ দেখিয়ে গােপনে পরস্পরকে উত্তেজিত করতে থাকে।
আমাদের ভাইদেরকে গদি ও রাজ্যের নেশা অন্ধ করে দিয়েছিল। আমাদের যে অর্থ ও শক্তি ইসলামী সাম্রাজ্যের মজবুতির জন্য ব্যয় করা প্রয়ােজন ছিল, সে সব গৃহযুদ্ধ করে আমরা শেষ করে ফেলেছি। আমাদের বিশাল সমরিক শক্তি এবং পরীক্ষিত সৈন্যরা এই যুদ্ধে নিহত বা আহত হয়ে আমাদের দুর্বল করে দিয়েছে।
বিদ্রোহীদের সৈন্য বাহিনী এই ইসলামী খেলাফতেরই সৈন্য ছিল। এই সেনাবাহিনী শুধু এ জন্যই নষ্ট হয়ে গেল যে, জাতির কিছু লােক ক্ষমতা ও গদীর লােভে নিজেদের বাদশাহ হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল। তারা ইসলামী খেলাফত ও হুকুমতকে নিজ নিজ অংশে ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়েছিল। তাদের পরস্পরের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে, লােভের বশে তারা নিজের পায়ে কুড়াল মারতেও প্রস্তুত।
এখন আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে, জাতি যেন বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে না থাকে। মাজহাবী মতপার্থক্যই কি কম বিশৃংখলা সৃষ্টি করছে? রাজত্ব ভাগ-বাটোয়ারার মত জাতিকেও বিভক্ত রাখার অপচেষ্টা চলছে। আমি মনে করি, এই দলাদলিই আমাদের পরাজয়ের কারণ। দলাদলি করে গুটিকয় লােক, কিন্তু এর শাস্তি ভােগ করতে হয় সমগ্র জাতিকে। এ কথা এখন আমাদের সেনাপতি ও সামরিক অফিসাররা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছে। কিন্তু এটুকুই যথেষ্ট নয়। জাতির প্রতিটি নাগরিককে আজ এ কথা বুঝাতে হবে। গৃহযুদ্ধে আমাদের শ্রেষ্ঠ সামরিক শক্তি নষ্ট হয়ে গেলে সেই শূন্যতা আমরা পূরণ করেছি নতুন সৈন্য ভর্তি করে। অনভিজ্ঞ সৈন্যদেরকে সমরক্ষেত্রে পাঠানাের কারণেই আমাদেরকে পরাজয় বরণ করতে হলাে। যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে যাওয়া সমস্ত সৈন্যই নতুন ও আনাড়ী ছিল। তাদেরকে শক্তিতে পরিণত করতে হলে যথেষ্ট প্রশিক্ষণের প্রয়ােজন রয়েছে, নিশ্চয়ই আপনি তা স্বীকার করবেন।
আমি ও আমার সেনাপতিগণ রমলার পরাজয়ের পরপরই প্রমাণ করে দিয়েছি, আমাদের সেনাবাহিনী পরাজিত হয়নি। আপনি যে পদাতিক ও অশ্বারােহী সৈন্য আমার কমাণ্ডে রেখে গিয়েছিলেন; তারা খৃস্টান বাহিনীকে হিম্মত দূর্গে ঢুকতে দেয়নি। হিম্মত দুর্গের বাইরেই আমরা তাদের কবর রচনা করেছি। অন্ধকার তাদের সহায় হয়েছিল, নইলে তাদের কাউকে আমরা পালিয়ে যাওয়ার সুযােগ দিতাম না।
আপনি আমাকে ও আমার বাহিনীকে রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে সংরক্ষিত রেখে গিয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের অবস্থা এমন আকস্মিকভাবে বদলে গেল যে, আপনার আদেশ নেয়ার সুযােগও হলাে না। সমরাঙ্গণে কি হচ্ছে, সেখানে আমার প্রয়ােজন আছে কি না, আমি কিভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি, এসব কিছু জানার আগেই আপনার পরাজয়ের খবর আমার কাছে পৌঁছে যায়।
আপনাকে সাহায্য করার জন্য তখনি আমি বাহিনী নিয়ে রওনা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আপনার রেখে যাওয়া অভিজ্ঞ অফিসাররা আমাকে থামিয়ে দেয়। তারা আমাকে উত্তেজিত হয়ে আবেগের বশে কোন সিদ্ধান্ত নিতে নিষেধ করে। এ জন্য আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। তারা আমাকে সঠিক পরামর্শ দিয়ে অশেষ উপকার করেছে।
তাদের পরামর্শেই আমি আমার সমস্ত আবেগ ও উত্তেজনা প্রশমিত করে নিলাম। তারপর ধীরস্থিরভাবে চিন্তা করে দেখলাম, হিম্মতের অবস্থান টিকিয়ে রাখাই এ মুহূর্তে সবচে জরুরী । আমি আমার সৈন্য দলকে সেভাবেই পরিচালনা করলাম ।
আপনার পরাজয়ের খবর আমার বাহিনীকেও ভীষণভাবে আহত করেছিল। আমি আল্লাহর দরবারে তাদের মনােবল ও সাহসের জন্য প্রার্থনা করলাম। দুশমনের প্রতিটি তৎপরতা জানার জন্য আমি গােয়েন্দা লাগিয়ে দিলাম। এক গােয়েন্দা 'আমাকে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ জানালাে। সে বলল, সম্রাট বিলডন তার সেনাবাহিনী নিয়ে এদিকেই ছুটে আসছে। সাথে সাথে আমি আপনার কথা স্মরণ করলাম। আমি নিজেকে প্রশ্ন করলাম, যদি আমার ভাই এ পরিস্থিতিতে পড়তেন তবে কি করতেন? এ প্রশ্নের যে উত্তর পেলাম সেভাবেই আমি যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করলাম।
বিলডন দুর্গ অবরােধ করল। সে ধরেই নিল, আমার সমস্ত বাহিনী হিম্মত দুর্গেই আশ্রয় নিয়েছে। বিলডনের বাহিনী আমাকে সদলবলে বন্দী করার জন্য হিম্মত দুর্গ অবরােধ করে বসে রইল।
আমি আপনার যুদ্ধ কৌশল অবলম্বন করে আমার বাহিনীর মূল অংশ আগেই দুর্গ থেকে বের করে পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে রাখলাম। কেল্লাধিপতিকে কি করতে হবে বুঝিয়ে দিয়ে আমি এসে যােগ দিলাম মূল বাহিনীর সাথে। আমার আশা আল্লাহ পূরণ করলেন। সম্রাট বিলডনের সৈন্য সংখ্যা আমার বাহিনীর দশগুণেরও বেশী ছিল। রাতের বেলা আমাদের জানবাজ সৈন্যরা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে বীরের মত কমাণ্ডো আক্রমণ চালালাে। নিবেদিতপ্রাণ মুজাহিদদের ত্যাগ, কোরবানী ও সাহসিকতার বর্ণনা দেয়ার ভাষা আমার নেই। শুধু এতটুকু বলবাে, জয়-পরাজয়ের দায়িত্ব আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিয়ে যদি কোন বাহিনী তার সমগ্র শক্তি ময়দানে হাজির করতে পারে তবে আল্লাহ কখনাে তাদের নিরাশ করেন না, এই বিশ্বাসের বাস্তবতা আমি সচক্ষে দেখেছি।
যদি আপনি সে দৃশ্য দেখতেন, যে দৃশ্য আমরা সেদিন সকালে সূর্যের আলােয় দেখেছি, তবে আপনার পরাজয়ের বেদনা ও গ্লানি সত্যি ভুলে যেতেন। আমার সবচেয়ে আফসােস এই, বিলডন আমার ফাঁদ থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল, তাকে আমি ধরতে পারিনি।
আমি এখন পাহাড়ের এক চূড়ায় বসে কাতিব দিয়ে চিঠি লিখাচ্ছি। এখান থেকে হিম্মত দুর্গ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সেখানে এখনও মিশরের ইসলামী পতাকা পতপত করে উড়ছে।
কেল্লার আশেপাশে ক্রুসেড সৈন্যদের লাশ ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ছে না। আমি তাদের দাফন করার কথা বললেও তা শেষ করতে আরাে দু’তিন দিন লেগে যাবে। ততক্ষণ পর্যন্ত লাশগুলাে সেখানে থাকবে কিনা আমি বলতে পারি না। কারণ হাজার হাজার শকুন আকাশে উড়ছে। শকুনেরা ভীড় করে লাশ খেতে শুরু করেছে। কোন কোন স্থান থেকে এখনও ধোঁয়া উঠছে। এসব আগুন গত রাতে আমার কমান্ডো বাহিনী লাগিয়েছিল। বিলডনের কত সৈন্য মারা গেছে আর কত সৈন্য পালিয়ে যেতে পেরেছে, এখনও আমি সে শুমার করতে পারিনি।
আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি, বিলডন এখনি কোন প্রতিশােধমূলক আক্রমণ চালানাের কথা চিন্তা করতে পারবে না। কিন্তু তাই বলে আমরা অপ্রস্তুত অবস্থায় নেই। আমরা পরিপূর্ণ সতর্কতা, ও প্রস্তুতি নিয়েই এখানে অপেক্ষা করছি। আমার কাছে এখন যে পরিমাণ সৈন্য আছে আর এই পরিমাণ সৈন্য থাকলে আমি পলায়নপর ক্রুসেডদের পিছু তাড়া করতাম। আর তা করতে পারলে রমলাসহ যেটুকু অঞ্চল খৃস্টানরা দখল করে নিয়েছে তা ফিরিয়ে দিয়ে তবেই তারা নিজেদের জান বাঁচাতে পারতাে। আর কিছু সৈন্য থাকলেই পরাজয়কে আমি বিজয়ে রূপান্তর করে দিতাম।
আমি আপনাকে আশ্বাস দিচ্ছি, আমার সেনাপতি, কমাণ্ডার ও সেনাবাহিনীর সমস্ত যােদ্ধাদের মনে যুদ্ধ করার বলিষ্ঠ আগ্রহ ও মনােবল রয়েছে। আমি এটাও জানি, আপনি নিশ্চিন্তে ও আরামে বসে নেই। নিশ্চয়ই আপনি নতুন সৈন্য ভর্তি ও তাদের ট্রেনিংয়ের কাজ শুরু করে দিয়েছেন।
আপনি সেই ব্যস্ততা নিয়েই প্রশান্ত মনে প্রস্তুতি নিতে থাকুন। আমি সুযােগ মত কমাণ্ডো লড়াই অব্যাহত রাখবাে। শত্রুদের, কখনও আরামে বসে থাকতে দেবাে না। এই সৈন্য নিয়ে হয়তাে কোন অঞ্চল অধিকার করে ধরে রাখতে পারবাে না, কিন্তু আপনি যেন প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় ও সুযােগ পান সে ব্যবস্থা আমি করবাে।
আমি দামেশকে ভাই শামসুদ্দিনকেও চিঠি পাঠিয়েছি, তিনি যেন কিছু সৈন্য ও সামানপত্র পাঠান। হলবে আল-মালেকুস সালেহকেও সংবাদ পাঠিয়েছি, তার সাথে আপনার যে চুক্তি হয়েছে সে চুক্তি অনুসারে সে যেন আমাকে সাহায্য পাঠায়।
আমি আপনাকে আল্লাহর উপর ভরসা করেই, এ কথা বলতে চাই, আপনি আমার সম্পর্কে কোন চিন্তা করবেন না। আমি ও আমার সঙ্গী সেনাপতিগণ আপনার মঙ্গল ও তৎপরতা সম্পর্কে জানার জন্য অধীর আগ্রহে চেয়ে আছি। আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন। আমরা তারই করুণার ছায়া চাচ্ছি। কারণ আমরা জানি, আমাদের সকলকে একদিন তার কাছেই ফিরে যেতে হবে।
আপনার স্নেহের ভাই তকিউদ্দিন।
তকিউদ্দিন চিঠিতে দস্তখত করে কাসেদের হাতে দিয়ে দ্রুত তা কায়রাে পৌঁছে দেয়ার হুকুম দিলেন। কাসেদ সে চিঠি নিয়ে ছুটল কায়রাের পথে।
(সমাপ্ত)
পরবর্তী পর্ব 'ধাপ্পাবাজ' শীঘ্রই আসছে।
0 coment rios:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন