বৃহস্পতিবার, ২ জানুয়ারি, ২০২০

ক্রুসেড সিরিজ- ১৯. খুনী চক্রের আস্তানায়(পর্ব-2)


১৯. খুনী চক্রের আস্তানায়(পর্ব-2)
x



গুমাস্তগীন আল মালেকুস সালেহের বিরুদ্ধে নতুন ষড়যন্ত্র পাকাতে শুরু করলে সে তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। আল মালেকুস সালেহ তখন তাকে কারাগারেই হত্যা করতে বাধ্য হয়।
এজাজ দুর্গ। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর শেষ পর্যন্ত দুর্গের সৈন্যরা অস্ত্রসমর্পণ করতে শুরু করল। এই অবরােধ ও যুদ্ধে সুলতান আইয়ুবীর বিজয় হলাে বটে, কিন্তু এ বিজয়ের জন্য তাঁকে অনেক বেশী মূল্য দিতে হল। সেনা বাহিনীর যে দলটি প্রথম কেল্লার মধ্যে প্রবেশ করেছিল, এ যুদ্ধে তাদের অধিকাংশই শাহাদাত বরণ করেছিল। এজাজের দুর্গ রক্ষীরা প্রমাণ করে দিয়েছিল, তারা কাপুরুষ বা ভীরু নয় ।
এজাজ দুর্গ জয় করার পর সুলতান আইয়ুবী বিলম্ব না করে দ্রুত হলব শহর অবরােধ করে নিলেন। হলব শহর ছিল এজাজ দুর্গের খুবই সন্নিকটে। হলব শহরে সৈন্যরা রাতভর দেখেছে এজাজ দুর্গের বিভীষিকা। জ্বলন্ত আগুনের লেলিহান শিখা শুধু নয়, আহতদের আর্ত চিৎকারের ক্ষীণ আর্তনাদ তাদের অন্তরে ভয়ের শিহরণ বইয়ে দিয়েছে। অজানা শংকায় কেঁপেছে তাদের হৃদয়গুলাে।
যুদ্ধ করার সব প্রেরণা ও সাহস তাতেই উবে গিয়েছিল। ভােরে যখন ওরা দেখতে পেল, কাল রাতে যারা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছিল এজাজ দুর্গে, এখন তারাই এ শহর অবরােধ করে বসে আছে, ভয়ের হীমশীত স্রোত তাদের কণ্ঠতালু পর্যন্ত শুকিয়ে ফেলল। তারা এজাজ দুর্গের রাতের বিভীষিকাময় দৃশ্যের কথা স্মরণ করে ভীতসন্ত্রস্ত হরিণীর মত পালাবার পথ তালাশ করতে লাগল।
হলববাসীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল এ ভীতির শিহরণ । তারা আইয়ুবীর সাথে তাদের অতীত আচরণের কথা স্মরণ করে ভাবছিল আইয়ুবী না জানি তাদের জন্য কি কঠিন শাস্তি বরাদ্দ করে।
পালাবার সব পথ বন্ধ। শহরের চারদিক আইয়ুবীর সৈন্যরা ঘেরাও করে রেখেছে। এ অবস্থায় কিছুই করার নেই দেখে জনসাধরণ ঘরের ভেতর দরজা জানালা বন্ধ করে বসে বসে আল্লাহ আল্লাহ করতে লাগল। কারণ শহরের সেনাবাহিনী যে সুলতান আইয়ুবীকে প্রতিরােধ করার শক্তি হারিয়েছে সে কথা বুঝতে কারাে কোন কষ্ট হচ্ছিল না। আইয়ুবী তাদের জন্য কি শাস্তি নির্ধারণ করে তাই দেখার জন্য দুরু দুরু বুকে অপেক্ষা করতে লাগল শহরের প্রতিটি নাগরিক, এমনকি সৈন্যরা পর্যন্ত।
অবরােধের দ্বিতীয় দিন। আল মালেকুস সালেহের এক দূত এলাে সুলতান আইয়ুবীর কাছে। দূত সুলতানের কাছে একটি চিঠি হস্তান্তর করল। সুলতান ভেবেছিলেন, আল মালেকুস সালেহ হয়তাে কোন সন্ধি প্রস্তাব পাঠিয়েছে। কিন্তু চিঠি খুলে তিনি তাজ্জব হয়ে গেলেন। এটি কোন সন্ধি প্রস্তাব ছিল না, ছিল এক আবেগময় ছােট্ট চিরকুট, যা পড়ে সুলতান আইয়ুবী হতভম্ব হয়ে গেলেন।
চিঠিটা ছিল এমন: সুলতান নূরুদ্দিন জঙ্গী মরহুমের শিশু কন্যা সুলতান আইয়ুবীর সাথে সাক্ষাৎ করতে চায়।
এই মেয়েটির নাম শামসুন নেছা । সে আল মালেকস সালেহের ছােট বােন। বয়স মাত্র নয় কি দশ। আল মালেকুস সালেহ যখন দামেশক থেকে বিপথগামী আমীরদের প্ররােচনায় হলবে পালিয়ে আসে, তখন সে তার ছোট বােনকেও সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু তার মা মরহুম নূরুদ্দিন জঙ্গীর বিধবা স্ত্রী রাজিয়া খাতুন দামেশকেই থেকে যান। কারণ তিনি বিপথগামী আমীরদের ষড়যন্ত্র ধরতে পেরেছিলেন। সুলতান আইয়ুবীই যে মরহুম নুরুদ্দিন জঙ্গীর সত্যিকার অনুসারী এবং ইসলামের একনিষ্ঠ সেবক, তা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন।
সুলতান আইয়ুবী দূতকে নির্দেশ দিলেন, যাও, সেই মেয়েকে নিয়ে এসাে।'
মরহুম নূরুদ্দিন জঙ্গীর কন্যা অনুমতি পেয়ে সুলতানের সামনে এসে হাজির হলাে। তার সাথে এল আল মালেকুস সালেহের দুই সেনাপতি।
সুলতান আইয়ুবী তাকে কাছে পেয়েই বুকে টেনে নিলেন। তখন তাঁর হৃদয়ে বইছে আবেগের বন্যা। তিনি নূরুদ্দিন জঙ্গীর শিশু কন্যাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আবেগে কেঁদে ফেললেন। অনেকক্ষণ মেয়েটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে রাখার পর কিছুটা শান্ত হয়ে মেয়েটিকে পাশে বসিয়ে বললেন, তােমরা কেমন আছাে মা? তােমার ভাই ভাল আছে?'
মেয়েটি বিহবল কণ্ঠে বলল, আমরা ভাল আছি মামা। ভাইয়া আপনাকে এ চিঠিটা দিতে বলেছে।' বলে সে ওড়নার ভেতর থেকে একটি চিঠি বের করে দিল। সুলতান চিঠিটি নিয়ে পড়লেন। তাতে আল মালেকুস সালেহ পরাজয় স্বীকার করে নিয়ে লিখেছে, 'আজ থেকে আমি আপনার আনুগত্য স্বীকার করে নিলাম। বিপথগামী আমীরদের প্ররােচনায় এতদিন আপনার বিরােধীতা করে যে অন্যায় করেছি, সে জন্য আমি ক্ষমা প্রার্থী। আল্লাহ আমাকে মাফ করুন। আমার কারণে ইসলামের অগ্রযাত্রায় যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছিল আপনার অধীনে বাকী জীবন কাজ করে আমি তার কাফফারা আদায় করতে চাই। আপনার অবগতির জন্য জানাচ্ছি, ইসলামের দুশমন, গাদার গুমাস্তগীনকে হত্যা করা হয়েছে। এখন থেকে হারান কেল্লা ও তার রাজ্য আপনার অধীন। আশা করি আপনি আমাকে আমার ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করার সুযােগ দেবেন।'
ইতি
আপনার দেহের সালেহ'।
চিঠি পড়ে সুলতান আইয়ুবী তাকালেন সালেহের পাঠানো দুই সেনাপতির দিকে। বললেন, ‘তােমরা এই মেয়েটাকে কেন এখানে নিয়ে এসেছাে? তােমরা কি এই পয়গাম নিজেরাই পৌছে দিতে পারতে না?”
সেনাপতি দুজন এ প্রশ্নের কি জবাব দেবে বুঝতে পারল না। তারা একে অন্যের মুখের দিকে তাকাল। শেষে দুজনেই তাকালাে মেয়েটার দিকে। তখন মেয়েটিই এ প্রশ্নের জবাব দিল। বলল, মামুজান! এদের কোন দোষ নেই। আমাকে ভাইয়াই পাঠিয়েছেন।'
‘কেন, সে কি চায় আমার কাছে? তােমাকে কিছু বলেছে? আপনি যদি এজাজ দুর্গটি ভাইয়ার হেফাজতে রাখেন এবং হলব শহরে তাকে থাকার অনুমতি দেন তাহলে ভাল হয়। ভাইয়া বলেছে, সে আর কোনদিন আপনার বিরুদ্ধে লড়াই করবে না।'
সুলতান আইয়ুবী দুই সেনাপতির দিকে রাগতঃ দৃষ্টিতে তাকালেন। তার এ চাহনীর মানে হচ্ছে, তােমরা এসব শর্ত হাজির করার জন্য এ ছােট্ট মেয়েটিকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার না করলেও পারতে! অতীতে আমি যেসব কেল্লা ও রাজ্য জয় করেছি, তার শাসকদের ওপর কি আমি জুলুম করেছি? আমি কি তাদেরকে উপযুক্ত মর্যাদা ও সম্মান দেইনি?'
‘আমি এজাজ দুর্গ, হলব শহর এবং এ রাজ্য তােমাকেই দিয়ে যাচ্ছি শামসুন নেছা।' সুলতান আইয়ুবী ছোট মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, যাও, তােমার ভাইকে গিয়ে এ সুসংবাদ দাও।'
সঙ্গে সঙ্গে তিনি তার সেনাপতিদের দিকে তাকিয়ে আদেশ জারী করলেন, এজাজ দুর্গ থেকে সব সৈন্য বের করে নাও এবং হলব শহরের অবরােধ উঠিয়ে নাও।'
এরপর তিনি হলবের সেনাপতিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমি এজাজ দুর্গ এবং হলব রাজ্য ও শহর এই মাসুম মেয়েটাকেই শুধু দিয়ে যাচ্ছি। তােমরা কাপুরুষ, নির্লজ্জ ও গাদ্দার। তােমাদের আর সেনাবাহিনীতে থাকার অধিকার নেই।২৪শে জুন, ১১৭৬ মুতাবেক ১৪ই জিলহজ্ব ৫৭১ হিজরী। আল মালেকুস সালেহের সাথে সুলতান আইয়ুবীর চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হলাে। এই চুক্তিপত্রের বলে এজাজ দুর্গ ও হলব রাজ্য ইসলামী হুকুমাতের অধীন হয়ে গেল। হলবে আল মালেকুস সালেহকে সুলতানের অধীন শাসক হিসেবে গণ্য করা হলাে।
এ চুক্তিপত্রের সময় মুশেলের আমীর সাইফুদ্দিন হলবেই ছিলেন। তিনিও সুলতান আইয়ুবীর আনুগত্য কবুল করে নিয়ে নিজের রাজ্য ইসলামী হুকুমাতের অধীন করে দিলেন।
এজাজ দুর্গের পতন, আল মালেকুস সালেহ ও সাইফুদ্দিনের আনুগত্য স্বীকার এবং গুমাস্তগীনের হত্যার মধ্য দিয়ে মুসলমানদের মধ্যে যে অন্তদ্বন্দ্ব ও বিরােধ ছিল তার অবসান হল। নিজেদের মধ্যে যুদ্ধের যুগ শেষ হয়ে আপােস যুগের সূচনা হল। কিন্তু তাই বলে মুসলিম জাতির বুক থেকে ঈমান বিক্রয়কারী গাদ্দাররা নিঃশেষ হয়ে গেলাে, এ কথা বলার অবকাশ তখনাে তৈরী হয়নি। এক গাদ্দারের পরাজয় ও নিস্ক্রিয়তার শূন্যতা পূরণের জন্য দশ গাদ্দার দাঁড়িয়ে গেল। খৃস্টানদের ঈমান ক্রয়ের প্রয়ােজন ও তৎপরতা আরাে বেড়ে গেল । ষড়ষন্ত্রের নিত্য-নতুন ক্ষেত্র তৈরীর জন্য মরিয়া হয়ে কাজে নামল ক্রুসেড বাহিনী।
হলবের একটি কবরস্থান। গােরস্তানটি অনেক বিস্তৃত। বিশাল মাঠ জুড়ে সারি সারি কবর। এর অধিকাংশ কবরই এখনও নতুন। কবরের উপরে যে মাটি ফেলা হয়েছে সে মাটিগুলােতে কোন যত্নের ছাপ নেই । এলােমেলাে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সে মাটি। কোনটা উঁচু, কোনটা নিচু। কোনটা অন্যটার সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে। কোন যুদ্ধের পর মৃত সৈনিকদের কবরগুলাের দশা ঠিক এমনটিই হয়।
হিম্মত থেকে হলব পর্যন্ত এমন বিরাট আকারের আরাে দুটি গােরস্তান রয়েছে। তিনটি গােরস্তানেরই দশা ঠিক একই রকম। সদ্য দাফন করা শত শত লাশের সারি শুয়ে আছে নিশ্চুপ। এর ভেতরে যেসব লােকেরা শুয়ে আছে আজ আর তাদের কোন কাজ নেই। অথচ দুদিন আগেও তাদের দাপটে পৃথিবীর মাটি কাঁপতাে। হিংসা, দ্বেষ, হানাহানির জগত থেকে চির বিদায় ঘটেছে তাদের। দুনিয়ায় তারা যতটুকু ভাল বা মন্দ কাজ করেছে সেটুকুই আজ তার একমাত্র সম্বল। আমল তার সঙ্গ ছাড়েনি, তার সাথে সাথে তার কবরে গিয়ে ঢুকেছে।
হিম্মতের ধূসর প্রান্তর আজ ছেয়ে আছে উদাসীনতায়। সেখানকার মাটি ও বাতাসে রক্তের গন্ধ। গন্ধ পচা-গলা লাশের। সেই দুর্গন্ধে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। যেখানে সবসময় পাখির কিচির-মিচির ও সুমিষ্ট স্বর ভেসে বেড়াতাে, সেখানে আজ শােনা যাচ্ছে শকুন ও শিয়ালের বিশ্রি চিৎকার।
এমনি একটি করবস্থান ছিল হলব শহরের বর্ধিত এলাকা এজাজ দুর্গের পাশে। কবরের মাটি তখনও নতুন এবং ভেজা। কয়েকজন মুসল্লিসহ একজন ইমাম সেখানে দাঁড়িয়ে মৃতদের রূহের মাগফিরাত কামনা করছিল। মােনাজাত শেষে তিনি যখন হাত মুখের উপর রাখলেন তখন দেখতে পেলেন, অশ্রুতে তার দাঁড়ি ভিজে একাকার হয়ে গেছে।
তিনি সমবেত মুসল্লিদের লক্ষ্য করে বললেন, এ অঞ্চল এখন অনাবাদী ও বিরাণ হয়ে যাবে। যেখানে একই কালেমা ও কুরআন পাঠকারীরা পরস্পর ঐক্যের মূলে কুঠারাঘাত করে অস্ত্র হাতে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে, সেখানে আল্লাহর গজব নেমে আসে। সেখানে একই রাসূলের অনুসারীরা পরস্পর খুনী সেজে বসে। যে মাটিতে ভাইয়ের হাতে ভাইয়ের রক্ত ঝরে, সে মাটি বিরাণ ও মরুভূমি হয়ে যায়।'
মুসল্লিদের চেহারাগুলােতে বিষাদবিন্দু খেলা করছিল। সেই বেদনাবিধুর চেহারাগুলাের দিকে তাকিয়ে তিনি আবার বললেন, এখানে দু’দিন আগেও তােমরা অহংকারের গর্জন ধ্বনি শুনেছ। অস্ত্রের ঝনঝনানি শুনেছ। সেই সংঘাতে যারা জড়িয়ে পড়েছিল, তারা সবাই ছিল মুসলমান। এই যুদ্ধে যারা ইসলামের খাতিরে সত্যের প্রতি সমর্থন করে মারা গেছে, তারা শহীদের মর্যাদা ও সম্মান লাভ করবে। আল্লাহর শ্রেষ্ঠতম মেহমান হিসাবে গণ্য হবে তারা। কিন্তু যারা বাতিলের সমর্থক হয়ে, কোন রাজা বা শাসকের আধিপত্য রক্ষার জন্য অন্যায়ভাবে যুদ্ধ করে জীবন দিয়েছে, তারা কখনােই এই মর্যাদা পাওয়ার অধিকারী হতে পারে না। এদেরকে যখন হাশরের ময়দানে উঠানাে হবে তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাদেরকে অবশ্যই এই রক্তপাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন। তিনি যখন জানতে চাইবেন, তােমরা একই রাসূলের উম্মত হয়ে কেন একে অন্যের রক্ত প্রবাহিত করেছিলে? এই রক্ত যদি তােমরা ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে কুরবানী করতে তবে শুধু ফিলিস্তিন কেন, ইউরােপের স্পেন পর্যন্ত তােমরা পৌঁছে যেতে পারতে। ইউরােপ আবার তােমাদের ঠিকানা হয়ে যেত, অথচ তােমরা তােমাদের জীবন ও রক্ত সব বৃথাই ব্যয় করলে?
ইমাম সাহেব কথা বলছিলেন, এ সময় অনেক অশ্বের মিলিত পদধ্বনি শােনা গেল। ইমামের পাশে দাঁড়ানাে কোন একজন বলে উঠলাে, আমাদের সুলতান আসছেন। ইমাম সাহেব ঘুরে তাকালেন, দেখলেন সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী আসছেন।
তার সঙ্গে কয়েকজন সেনাপতি ও ছয়জন দেহরক্ষী অশ্বারােহী । গােরস্তানের কাছে এসে সুলতান আইয়ুবী অশ্ব থামালেন এবং অশ্বপৃষ্ঠ থেকে লাফিয়ে নেমে ইমাম সাহেবের কাছে গিয়ে তার সাথে মুছাফেহা করলেন।
মুহতারাম সুলতান!’ ইমাম সাহেব সুলতান আইয়ুবীকে লক্ষ্য করে বললেন, এ কথা সত্য যে, এখানে আপনার বিরুদ্ধে যারা লড়াই করেছে তারা সবাই মুসলমান ছিল। কিন্তু আমি তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনার যােগ্য মনে করি না।। এদেরকে শহীদদের সাথে দাফন করা উচিত হয়নি আপনার । আমাদের মুজাহিদরা সত্যের জন্য যুদ্ধ করেছে, তাদেরকে আপনি খুনীদের সাথে দাফন করলেন?
‘আমি তাদেরকেও শহীদ মনে করি, যারা বাতিলের পক্ষে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে মারা গেছে।' সুলতান আইয়ুবী বললেন, এরা তাদের সরকারের ধোঁকায় পড়ে যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছে। আমি আমার সৈন্যদেরকে আল্লাহর পথে লড়াই করার আহবান জানিয়েছিলাম। আমাদের বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধ করেছে তাদের সরকার সৈন্যদেরকে মিথ্যা শুনিয়ে বিভ্রান্ত করেছে। আমাকে ইসলামের দুশমন হিসাবে চিত্রিত করে পেশ করেছে তাদের সামনে। বলেছে, আমি সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য লড়াই করছি। তারা তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য সরকারী ইমামদের ব্যবহার করেছে। তারা আমার বিরুদ্ধে ফতােয়া দিয়েছে। সেই মিথ্যা নসিহত শুনে এই সরলপ্রাণ সৈন্যরা প্রতারিত হয়েছে। সরকারী ইমামরা পুরস্কার ও অর্থের লােভে সৈন্যদেরকে বিভ্রান্ত করেছে বলেই তারা আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিয়ে সত্যের সৈনিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। আমি তাদের লাশের অপমান করতে পারি না। সে লাশগুলােকে একই গর্তে ফেলে গণকবর দিতে পরি না অথবা কোথায়ও জঙ্গল বা নদীতে ফেলে এসব লাশের আমি অবমাননা করতে পারি না। এদের মধ্যে যারা তাদের ভুল বুঝতে পেরেছে তারা আমাদের সঙ্গে মিশে গেছে। কিন্তু যারা মারা গেছে তাদের কাছে সত্যের আলাে পৌছাবার সুযােগ হয়নি আমাদের। তাদের সরকার তাদের চোখে যে পট্টি বেঁধে অন্ধ করে রেখেছিল সে পট্টি আমরা খুলে দিতে পারিনি। এ ব্যর্থতা আমাদের। তাই আমি তাদের জন্যও আল্লাহর কাছে ক্ষমা 



চাই। হয়তাে বেঁচে থাকার সুযােগ পেলে তারা একদিন সত্যের কাফেলারই সৈনিক হয়ে যেতাে।
কিন্তু সুলতান! ইমাম সাহেব আবেগঘন কণ্ঠে বললেন, তারা তাে আপনার শত্রু হয়ে গিয়েছিল। তারা কেন্দ্রীয় খেলাফাতের অধীন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনতা ঘােষণা করেছিল। নূরুদ্দিন জঙ্গীর ছেলে আল মালেকুস সালেহ, মুশেলের আমীর সাইফুদ্দিন ও হারানের কেল্লাধিপতি গুমাস্তগীন- এরা সবাই স্বাধীনতার ঘােষণা দিয়ে ঐক্যজোট করেছিল। শুধু তাই নয়, সামরিক জোট গঠন করে যুক্ত কমাণ্ডের অধীনে তারা আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। এই যুদ্ধে ইসলামের দুশমন খৃস্টানরা তাদের পুর্ণ সাহায্য-সহযােগিতা করেছে। খৃস্টানদের এই সাহায্য-সহযােগিতার উদ্দেশ্য ছিল, মুসলমানরা যেন নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করে দুর্বল ও ধ্বংস হয়ে যায়। যাতে মুসলমানরা খৃষ্টানদের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে অথবা এমন দুর্বল হয়ে থাকে যাতে খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে আর যুদ্ধ করতে না পারে। এত কিছুর পরও আপনি তাদের ক্ষমার যােগ্য মনে করেন?
‘এ জন্য দায়ী ক্ষমতালােভী শাসকরা, সাধারণ সৈনিকরা নয়। খৃস্টানরা মুসলমানদের মধ্যে ব্যক্তিগত ক্ষমতার লােভ সৃষ্টি করেছে, আর্থিক সাহায্য দিয়েছে, যুদ্ধের উপকরণ সরবরাহ করেছে, মদ ও সুন্দরী নারী দিয়ে মুসলমান আমীরদের অন্ধ করে রেখেছে। তাদের এ ষড়যন্ত্রের কারণেই নূরুদ্দীন জঙ্গীর ওফাতের সঙ্গে সঙ্গে এরা ইসলামের অগ্রযাত্রার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালাে। আমি মিশর থেকে এ সংকল্প নিয়েই বের হয়েছিলাম, এ ষড়যন্ত্রের আমি মূলােৎপাটন করবাে। খৃষ্টানদের কবল থেকে আমাদের প্রথম কেবলা বায়তুল মুকাদ্দাস ইসলামী হুকুমাতে শামিল করবাে। আলহামদুলিল্লাহ, সে পথেই আমরা অগ্রসর হচ্ছি। কিন্তু পরিপূর্ণ বিজয় ছিনিয়ে আনতে হলে আমাদের এ কাফেলায় আরাে: মুজাহিদ শামিল করতে হবে। সেই মুজাহিদ আমি কোথায় পাবাে? বিভিন্ন মুসলিম শাসকদের হাতে যে সৈন্যবল আছে তারাই হবে আমাদের সৈনিক। তাদেরকে যদি আপনি কোনভাবে একবার শুধু এটুকু বুঝতে পারেন যে, ইসলামের জন্য আজ তাদের রক্ত দরকার, তাহলে দেখবেন, তারা দলে দলে এ জেহাদে শামিল হয়ে যাবে। এদের অপরাধ ক্ষমার চোখে না দেখলে কি করে তারা দ্বীনের মুজাহিদদের কাফেলায় শামিল হবে?
ইমাম সাহেব মাথা নিচু করলেন। এই মহান মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধায় তার মাথা নত হয়ে এলাে। তিনি ধরা গলায় বললেন, ‘আমাকে ক্ষমা করুন। বিষয়টি আমি কখনাে এভাবে ভেবে দেখিনি।'
না, এতে আপনার লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই। আপনার চিন্তা ভুল, এ কথা আমি বলছি না। বাহ্যত আপনার কথাই ঠিক। কিন্তু একজন মুজাহিদের জন্য চর্মচক্ষুই যথেষ্ট নয়, তার চাই গভীর অন্তর্দৃষ্টি। যে দৃষ্টি দিয়ে সে দেখবে অতীতের ঘটনাবলী, দেখবে ভবিষ্যতের সমাজ ও রাষ্ট্র । আপনি জানেন, আজ কয়েক বছর ধরে হিম্মত থেকে হলব পর্যন্ত এই শস্যশ্যামল প্রান্তরে মুসলমানের রক্ত বয়ে চলেছে অবিরাম ধারায় ।
শেষ পর্যন্ত বিজয় সত্যেরই হলাে। খৃস্টানদের ষড়যন্ত্রের ফাঁদে যারা পা দিয়েছিল, সেখান থেকে সরে আসতে বাধ্য হলাে তারা। বিদ্রোহী সব কজন মুসলমান শাসকই আমাদের আনুগত্য স্বীকার করে নিয়েছে। কিন্তু এতে আমার মনে সামান্যতম আনন্দ বা উৎফুল্লতা সৃষ্টি হয়নি। কারণ ভ্রাতৃঘাতি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে এ জাতির সামরিক শক্তির উল্লেখযােগ্য অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। আপনারা হয়তাে ভাবছেন, এ লড়াইয়ে আমরা জিতেছি। কিন্তু আমার হিসাব মতে, এ লড়াইয়ে খৃস্টানদের কূটনৈতিক তৎপরতারই বিজয় হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছে খৃস্টানদের কূটনৈতিক চাল, কারণ তারা আমাদেরকে দিয়ে আমাদের ভাইদের হত্যা করাতে সমর্থ হয়েছে। অবস্থা এখন এতটাই নাজুক যে, নতুন করে সৈন্য সংগ্রহ না করে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে অগ্রসর হওয়ার কোন উপায় নেই আমাদের। তাই আপনি দোয়া করুন, আল্লাহ যেন বিপথগামী সৈনিকদেরকে হকের পথে আসার সুযােগ সৃষ্টি করে দেন।
সুলতান আইয়ুবী এজাজ দুর্গের কাছে বিস্তৃত এক গােরস্তানের পাশে দাঁড়িয়ে ইমাম সাহেবের সাথে কথা বলছিলেন। সে সময় তাঁর চেহারায় খেলা করছিল মালিন্য ও দুশ্চিন্তার ছাপ। তিনি ইমাম সাহেবকে আরাে বললেন, 'আপনি প্রতি নামাজের পর এই দোয়াই করুন, আল্লাহ গাফুরুর রাহীম যেন এদের ক্ষমা করে দেন, যাঁরা বিভ্রান্তির কারণে বিপথগামী হয়েছিল। আর যারা জেনে বুঝে চোখে অন্ধত্বের পট্টি বেঁধে ভাইয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে তাদের জন্য বদ দোয়া না করে তাদের বিষয়টি আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিন।
সুলতান আইয়ুবী অশ্বপৃষ্ঠে আরােহন করলেন। কবরস্থানের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললেন, আল্লাহ, এত রক্তের হিসাব কে দেবে? অন্তর্যামী, তুমি সাক্ষী, আমার ব্যক্তিগত লাভের জন্য আমি এক ফোটা রক্তও বইতে দেইনি।
তিনি তাঁর সেনাপতিদের দিকে লক্ষ্য করে বললেন, চলাে।' ইমাম সাহেব দ্রুত তাঁর ঘােড়ার সামনে এসে বললেন, আপনার কাফেলায় শরীক হয়ে কোরবান হােক আমাদের সন্তানগুলাে । আপনি কি যাওয়ার আগে আমাকে আরাে কিছু নসিহত করে যাবেন?'
আমাদের জাতি এখনও আত্মহত্যার পথে এগিয়ে চলেছে। কাফেররা রাসূলের উম্মতের শক্তি, সাহস ও আবেগ দেখে ভীত ও সন্ত্রস্ত। তারা এই শক্তিকে দুর্বল করার জন্য ভ্রাতৃঘাতি যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিয়ে দূরে বসে তামাশা দেখছে। বিচিত্র লােভের ফাঁদ পেতে তারা আমাদের ভাইদের মাথা ও বিবেক কিনে নিচ্ছে। না বুঝেই অনেকে তাদের কৌশলের জালে ধরা দিচ্ছে। পরিণতিতে ইতিহাস প্রত্যক্ষ করছে নিস্ফল গৃহযুদ্ধের অনাকাঙ্খিত অধ্যায়। আমরা যদি এখানেই এর গতিরােধ না করতে পারি, তবে আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে দুঃসহ ভবিষ্যত। এই গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়া আর আত্মহত্যার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। উম্মতে মােহাম্মদীর ধ্বংস ও অধপতনের জন্য এই গৃহযুদ্ধই যথেষ্ট। কাফেররা বর্তমান যুগের মত ভবিষ্যতেও মুসলিম জাতি থেকে গাদ্দারদের খুঁজে নেবে। তাদেরকে অর্থ ও যুদ্ধ উপকরণ সাহায্য দিয়ে এ জাতির ধ্বংসকে ত্বরান্বিত করতে সচেষ্ট থাকবে। আজকের মতই মুসলমানদের পরস্পরের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতি যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিয়ে তারা দূরে বসে তামাশা দেখবে। গুটি কয়েক লােক, গদি ও ক্ষমতা লাভের জন্য উন্মাদের মত কাড়াকাড়ি করবে। সাধারণ মানুষকে তারা বানাবে বলির পাঠা । তাদের ঘাড়ে পা দিয়ে বসবে গিয়ে সিংহাসনে। জাতির সৎ ও কর্মঠ লােকগুলাে অকেজো হয়ে যাবে। তাদের মাথার ওপর দিয়ে ছড়ি ঘুরাবে দুষ্টের দল। ইমামরা হালুয়া-রুটির ভাগ পেয়ে অসৎ শাসকের সপক্ষে সাফাই গাইবে। যখন এ অবস্থা হবে তখন এ জাতির ডুবতে আর বাকি থাকবে না । ক্ষমতা লাভের নেশায় কুচক্রীরা জাতির রক্ত এমন ভাবে বইয়ে দেবে যে, মানুষের মৃত্যুর হিসাব রাখাও সম্ভব হবে না। গ্রামের পর গ্রাম গােরস্তানে পরিণত হবে। যদি পারেন এই বিষয়গুলাে আপনার মুসল্লি ও সন্তানদের বুঝাতে চেষ্টা করুন। তাদের ঈমানকে, সতেজ ও সজীব করে গড়ে তুলুন। তাদেরকে কোরানের সে কথা ভাল করে বুঝিয়ে দিন, যেখানে বলা হয়েছে, যে জাতি তার নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করে না আল্লাহও তাদের ভাগ্য পরিবর্তন করে দেন না। আল্লাহর ওপর গভীর আস্থা, ঐক্য, সংহতি ও দৃঢ় ঈমানই জাতি হিসাবে তাদেরকে পৃথিবীর বুকে বাঁচিয়ে রাখবে।'
সুলতান তাঁর কথা শেষ করে চলতে শুরু করলেন। তাঁর সঙ্গের সেনাপতিরাও ঘােড়ার মুখ ঘুরিয়ে চলতে লাগলেন সুলতানের সাথে ।
‘গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা এখন শেষ হয়ে গেছে, সুলতান। একজন 



সেনাপতি সুলতানের পাশাপাশি তার ঘােড়া নিয়ে বললাে, ‘এখন সামনের চিন্তা করুন। আমাদের বায়তুল মুকাদ্দাস ডাকছে। আমাদের প্রথম কেবলা অধীর আগ্রহে পথ চেয়ে তাকিয়ে আছে আমাদের জন্য।'
কিন্তু ওদিকে যে মিশরও আমায় ডাকছে।' সুলতান আইয়ুবী চলতে চলতেই বললেন, ‘ওদিক থেকে খুব আশংকাজনক সংবাদ আসছে। সেখানে আমার দায়িত্ব পালন করছে আমার ছােট ভাই। সে আমাকে দুশ্চিন্তা থেকে বাঁচানাের জন্য কঠিন অবস্থার সংবাদ গােপন করছে। আলী বিন সুফিয়ান এবং পুলিশ সুপার গিয়াস বিলকিসও আমাকে বিস্তারিত কিছু জানাচ্ছে না। শুধু এইটুকু সংবাদ পেয়েছি, শত্রুদের গােপন তৎপরতা এখন বাড়াবাড়ি রকমের বেড়ে গেছে। মনে হচ্ছে, শেখ মান্নানকে আছিয়াত থেকে বিতাড়িত করাটা ভুল হয়েছে। উচিত ছিল তাকে এবং তার দলকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়া। তাহলে তার খুনী দলটা আজ মিশরে অপতৎপরতা চালাতে পারতো না। সম্প্রতি আমাদের দু'জন কমাণ্ডার অত্যন্ত গােপনে আততায়ীর হাতে নিহত হয়। তাদের শরীরে কোন ক্ষতচিহ্ন বা আঘাতের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মরার পর লাশের ময়না তদন্তে কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে, তাদের বিষ প্রয়ােগ করে হত্যা করা হয়েছে। আমার অনুমান, এদেরকে বিশেষ এক ধরনের হিরােইন জাতীয় নেশার দ্রব্য প্রয়ােগ করে খুন করা হয়েছে। এ ধরনের নেশার দ্রব্য কেবল ফেদাইন খুনীচক্রই ব্যবহার করে।
আপনি কি তবে শিঘ্রই মিশর যেতে চান?' চিন্তান্বিত কণ্ঠে।
বললাে সেই সেনাপতি, সৈন্যদেরকে কি এখানেই রেখে যাবেন, না সঙ্গে নিয়ে যাবেন?
‘এ সম্পর্কে আমি এখনও কোন সিদ্ধান্ত নেইনি।' সুলতান সালাহউদ্দিন বললেন, হয়তাে কিছু রক্ষী সঙ্গে নিতে পারি। সৈন্যের প্রয়ােজন এখানেই বেশী। খৃস্টান শত্রুরা মিশরে ধ্বংসাত্মক কাজ এ জন্য বাড়িয়ে দিয়েছে, যাতে আমি ফিলিস্তিনের দিকে অগ্রসর না হয়ে মিশরে ফিরে যাই । আমি তাদের এ উদ্দেশ্য পুরণ হতে দিতে পারি না। কিন্তু মিশরের সমস্যাও আমি এড়িয়ে যেতে পারবাে না। আমাকে অবশ্যই মিশর যেতে হবে, তবে আমি ফিলিস্তিনের দিকে আমার অগ্রযাত্রাও অব্যাহত রাখবাে ।
সুলতান আইয়ুবীর সন্দেহ ভিত্তিহীন ছিল না । খৃস্টানদের বুদ্ধি ও কৌশল তার চেয়ে কেউ বেশী বােঝেন না। যখন তিনি করবস্থানে ফাতেহা পাঠ করে তার সামরিক হেড কোয়ার্টারে যাচ্ছিলেন, তখন শেখ মান্নান ত্রিপলী পৌছে গিয়েছিল । হাসান বিন সাবাহের পর এই দলের মুরশিদ রূপে আবির্ভূত হয় শেখ মান্নান। এই ব্যক্তিই এখন ফেদাইন খুনীচক্রের দলনেতা।
সুলতান আইয়ুবী খৃস্টান ও তাদের পদলেহী মুসলিম গাদ্দারদের বিরুদ্ধে অভিযান চালালে ফাঁক তালে সে তার দলকে আরাে মজবুত ও সক্রিয় করে তােলে। কারণ আইয়ুবী ও খৃস্টান পক্ষ মুখখামুখি হওয়ায় তার দিকে নজর দেয়ার মত সময় কারাে ছিল না। এই সময় এ ভাড়াটে খুনীর দল শেখ মান্নানের নেতৃত্বে সুসংহত ও তৎপর হয়ে উঠে। তারা খৃস্টান ও তার সহযােগীদের কাছ থেকে পয়সা পেয়ে সুলতান আইয়ুবীর উপর বহু বার আক্রমণ চালিয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই তাঁকে হত্যা করার পরিবর্তে নিজেরাই খুন হয়ে গেছে। যারা খুনের হাত থেকে বাঁচতে পেরেছে, তারা হয়েছে বন্দী।
খৃস্টানরা শেখ মান্নানকে আছিয়াত দুর্গটি উপহার দিয়েছিল আইয়ুবীকে হত্যা করার শর্তে। দুর্গটি ১১৭৬ সালের মে মাসে সুলতান আইয়ুবী দখল করে নেন। শেখ মান্নানকে দলবলসহ - নিরস্ত্র অবস্থায় কেল্লা থেকে বেরিয়ে যাওয়ারও সুযােগ দিলে ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে যায় তারা। এই ক্ষমাই যেন আইয়ুবীর জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল, অন্তত এখন আইয়ুবীর তাই মনে হচ্ছে।
শেখ মান্নান ১১৭৬ সালের জুন মাসে ত্রিপলী গিয়ে উপস্থিত হয়। তার সাথে তার বাহিনী এবং সাঙ্গ-পাঙ্গরাও ছিল। ত্রিপলী (বর্তমান লেবানন) ও তার আশপাশের বিস্তৃত এলাকা খৃস্টান রাজা রিমাণ্ডের অধিকারে ছিল। শেখ মান্নান তার কাছে গিয়ে আশ্রয় চাইল।
শেখ মান্নানকে পেয়ে খুশী হল রিমাণ্ড। সে অনতিবিলম্বে অন্যান্য খৃস্টান সম্রাট ও ক্রুসেড নেতাদের ত্রিপলী ডেকে পাঠালাে। উদ্দেশ্য, সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত ও অপ্রতিরােধ্য যুদ্ধের কর্মসূচী গ্রহণ করা।
খৃস্টান গােয়েন্দা সংস্থার অভিজ্ঞ পরিচালক জার্মান বংশােদ্ভূত হরমনও সেই সভায় উপস্থিত হল। সবাই আসন গ্রহণ করার পর শেখ মান্নান বলতে শুরু করল, আপনারা আমাকে এই বলে অভিযুক্ত করতে পারেন যে, আমি সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর কাছে পরাজিত হয়ে এখানে এসেছি। আপনারা জানেন, আমরা সৈন্যদের মত সম্মুখ লড়াইয়ে পারদর্শী নই। সুলতান আইয়ুবীর মােকাবেলা করতে গিয়ে যেখানে আপনাদের বিশাল বাহিনী ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে আমরা মুষ্টিমেয় ফেদাইন কেমন করে সাফল্যের আশা করতে পারি! আমার তাে মনে হয়, আপনারা আপনাদের মুসলমান বন্ধুদের সৈন্য সাহায্য দান করলেও সুলতান আইয়ুবীর মােকাবেলায় তারা সফল হতে পারবে না।'
‘শেখ মান্নান! গর্জে উঠল রাজা রিমান্ড, এ বিষয়টি আমাদের মধ্যেই আলােচনা করতে দাও। আমরা সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা গ্রহণ করবাে সেটা আমাদের ব্যাপার। আমরা কি পারি না পারি, সে পর্যালােচনা করতে আমরা তােমাকে ডেকে পাঠাইনি। আমরা তােমাকে বলতে চাই, তুমি সুলতানকে হত্যা করার কথা বলে বার বার আমাদের কাছ থেকে অর্থ নিয়েছ, কিন্তু প্রতিবারই তােমার লােক ব্যর্থতা বরণ করেছে। শেষ বার যে চারজনকে পাঠিয়েছিলে, তারাও ব্যর্থ হয়েছে। আইয়ুবীকে খুন করার পরিবর্তে নিজেরাই খুন হয়ে গেছে তারা। সুলতান আইয়ুবীর ওপর তােমার একটি অভিযানও সফল হয়নি। এতে কি প্রমাণ হয় , তুমি অযােগ্য ব্যক্তিদের পাঠিয়েছিলে? তারা মারা যাক অথবা গ্রেফতার হােক, তাতে তােমার কিছু যায় আসে না? আমরা তােমাকে যে মূল্য দিয়েছি সেগুলাে সবই বৃথা গেছে?
‘শুধু এক সালাহউদ্দিনকে হত্যা করা যায়নি বলে আপনাদের সব অর্থ বৃথা গেছে, এই যদি হয় আপনার বক্তব্য, তাহলে আমি বলব, আপনি ঠিক বলেননি।' শেখ মান্নান বললাে, আমি মিশরে সুলতান আইয়ুবীর যে দু’জন চৌকস সেনা অফিসারকে হত্যা করিয়েছি, তার মূল্যটা হিসাবে ধরবেন না? আপনার তিন শক্তিশালী শত্রু সুদানে ছিল, তাদেরকে আমি কবরে নামিয়েছি। এর ফলে সেখানে আপনার প্রবেশের রাস্তা বাঁধা মুক্ত হয়েছে, এর মূল্যটা কি আপনি ধরবেন না? আপনার ইঙ্গিতে আমি মিশরে গুপ্তহত্যা শুরু করে দিয়েছি। আপনি কি সে কাজকেও ব্যর্থ বলবেন?
আইয়ুবী কবে নিহত হবে?’ ফ্রান্সের ক্রুসেড নেতা গে অব লুজিনান টেবিলে থাবা মেরে বললাে, তুমি নূরুদ্দিন জঙ্গীকে বিষ দিয়েছিলে, তেমন করে কবে সালাহউদ্দিন আইয়ুবীকে বিষ দিয়ে হত্যা করতে পারবে?
সে কথা এখন আমি কেমন করে বলবাে? এখন তাে বাতাস। সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর অনুকূলে বইছে। আপনাদের সহায়তায় যে সব মুসলমান তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল, তারাই এখন সুলতান আইয়ুবীর সমর্থক ও অনুগত হয়ে গেছে। হলবের আল মালেকুস সালেহ ও তার সহযােগী সাইফুদ্দিন আইয়ুবীর বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে। তার বিরােধী গুমাস্তগীন খুন হয়েছে। এ অবস্থায় তাকে হত্যা করা সহজ হবে না। তবে আমি আপনাদের কথা দিতে পারি, যেদিন সেই ধরনের অবস্থার সৃষ্টি হবে, তাকে আমি অবশ্যই খুন করবাে।'
(চলবে) 









'

শেয়ার করুন

Author:

আমি সজীব হোসাইন -এই ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা পাশাপাশি লেখালেখির কাজটাও করি। অনলাইনে প্রযুক্তির বিষয় নিয়ে যা জানি তা মানুষের মাঝে শেয়ার করার ইচ্ছায় এ ব্লগ টি তৈরি করা।