চমকে উঠলো অধরা।একেই কাজ আবার
করেছে বয়স্ক লোকটা।অথচ তিনি তার
বাবার বয়সী।রাগে ঠোঁটের পাতা কয়েকবার
নড়ে উঠলো অধরার।
পরীক্ষা দিয়ে লোকাল বাসে বাসায় ফির
ছিলো অধরা।সিএনজি বা রিকশায়
করে প্রতিদিন বাসায় ফেরা তার
মতো নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়ের
কাছে এক প্রকার বিলাসিতাই।তাই
পয়সা বাঁচাতে প্রতিদিন লোকাস
বাসে যাতায়াত।
আর এই লোকাল বাসে কিছু অমানুষ ভীড়ের
ভিতর ওত পেতে থাকে মেয়েদের স্পর্শকাতর
জায়গায় হাত দেয়ার।অধরার বেলায় ও
তেমনটা ঘটেছে।অথচ লোকটা তার বাবার
বয়সী।মন খারাপের ভাবটা দূর
করতে বাসের জানালার গ্লাস খুলে দেয়
সে। এক ঝটকায় কিছু তাজা বাতাস এসে তার
চুলগুলোকে এলোমেলো করে দেয়।
অধরা স্বপ্নের জাল বুনতে থাকে।আর মাত্র
কয়েকটা দিন, পরীক্ষা শেষে রেজাল্ট বের
হবে তারপর ছোটখাট
একটা চাকুরী জুটিয়ে নিবে।মায়ের উপর
চাপ কমাবে।বাবা মারা গেছে অধরা ছোট
থাকতেই, এরপর মা ই তার সব।একমাত্র
সন্তান কে মানুষ করতে অনেক খেঁটেছেন
তিনি।মায়ের কথা ভেবে মন খারাপ হয়
অধরার ।
হঠাত আবীরের কথা মনে পড়ে ।
চশমা পড়া ছেলেটি চশমার ফাঁক
দিয়ে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকতো।
স্বভাবে লাজুক হ ওয়ায় কোন দিন কিছু সাহস
করে বলতে পারেনি।তবে তার
প্রতি আবীরের মুদ্ধতার কথা স্পষ্ট
বুজতে পারতো অধরা।হ্যাদারামট া একবার
চুপিচুপি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার
লাইন লিখে দিয়েছিলো ডায়েরীতে ...
" দুরন্ত ষাঁড়ের চোখে,
বেঁধেছি লাল কাপড়
বিশ্ব সংসার তন্ন তন্ন করে
খুঁজে এনেছি ১০৮ টি নীলপদ্ম " ।
সুনীলের " কেউ কথা রাখেনি " কবিতার মত
আবীর ও কথা রাখেনি।হঠাত একদিন কেউ
কে কিছু না বলে কোথায় যেন উধাও
হয়ে গেলো।বুকের ভিতর আবীরের জন্য
একটা চাপা কষ্ট অনুভব করে অধরা।
" আপা মনি কিছু লাগবে "?
বাসে ওঠা হেল্পারের ডাকে কল্পনার জগত
থেকে বাস্তবে নেমে আসে অধরা।
মনে পড়ে আর কয়েক দিন পরেই তার বিয়ে।
ছেলে বেশ পয়সাওয়ালা, বয়সটা একটু
বেশি আর মাথায় চকচকে একটা টাক এই
যা সমস্যা।অধরার মা আপত্তি করেনি।
টানাটানির সংসারে এমন
ছেলে কে হাতছাড়া করতে চায়? বিয়ের পর
অধরার সব দায়িত্ব তো ঐ ছেলেরেই।
তাছাড়া সুদর্শনা অধরাকে প্রথম দেখাতেই
মনে ধরেছে ছেলের।মেয়ে নিশ্চয়েই
সুখে থাকবে।
অধরা স্বপ্নের জাল বুনতে থাকে।ছোট খাট
একটা টোনাটুনির সংসার হবে তার।সেই
সংসার সুখের
প্রতিটি বিন্দুতে ভরা থাকবে।একটা ছোট
খাট চাকরী, মা কে নিয়ে আসবে বাসায়,
ব্যস্ত জীবনে একটু অবসরে বরের
সাথে ছাদে বসে কফির মগে চুমুক লাগানো...
অধরার চিন্তার জগতে ছেদ পড়ে।হঠাত
কয়েক জন মুখোশ পড়া ছেলেকে গাড়ীর
দিকে এগিয়ে আসতে দেখে সে।কিছু
বুঝে ওঠার আগেই গাড়ীর দিকে কিছু
একটা ছুড়লো তারা।মুহুর্তেই গাড়ীর ভিতর
আগুন ছড়িয়ে পড়ল।যাত্রীদের ভিতর কেউ
চেঁচিয়ে বললো " পেট্রোল বোমা "
পড়েছেরে..পেট্রো ল বোমা পড়েছে..
সেন্সলেস হবার
আগে ঝলসে যাওয়া মুখে হাত
দিতে গিয়ে যেন অন্য এক জগতে চলে যায়
অধরা।চোখের সামনে মায়ের অসহায়
মুখটা ভাসতে থাকে, হবু বরের
চেহারা ভাসতে থাকে, লোকটা তার
সুশ্রী মুখমন্ডল দেখেই বিয়ের
অফারটা দিয়ে ছিলো।এই ক্ষতবিক্ষত
শরীরটাকে সে কি আর বিয়ে করবে?
আবীরের মুখ ভাসতে থাকে।নিজের
সাথে নিজেই কথা বলে অধরা।
: আমি কে?
-আমি অধরা।
: কি হয়েছে?
-স্বপ্ন পুড়েছে।
: আচ্ছা কাক কি কাকের মাংস খায়?
- উঁহু
: পশুদের ভিতর কোন
পশুকি স্বজাতিকে আক্রমন করে মারে?
- উঁহু ।শুধু এটা সৃষ্টির সেরা জীব(!)
মানুষের দ্বারাই সম্ভব।
অধরার সামনে লাল নীল
আলো খেলা করতে থাকে।
মনে হতে থাকে আবীরটা বোকা বোকা দৃষ্টি নিয়ে খুব
কাছেই দাঁড়িয়ে আছে।হয়তো এখনেই
হাতটা ছুঁয়ে আবৃত্তি করবে...
" বিশ্ব সংসার তন্ন তন্ন করে,
খুঁজে এনেছি ১০৮ টি নীল পদ্ম "।
* কাল্পনিক স্ট্যাটাসে অধরা একটি চরিত্র
মাত্র।মৃত্যু যেখানে হাতছানি দেয়
প্রতি মুহুর্ত, স্বপ্ন যেখানে মিলিয়ে যায়
কর্পূরের মতো, যেখানে ধ্বংস
নাচে প্রতিদিন , সেখানে পেট্রোল বোমায়
এভাবেই অধরার মতো শেষ হয়ে যায় বহু
মানুষের স্বপ্ন!
By - Dibakar

0 coment rios:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন