রবিবার, ২৫ মার্চ, ২০১৮

কাজল রঙ্গা মেঘ


বাতাস জোরে বইতে শুরু করেছে। পার্কের
বেঞ্চটাতে একাই বসে আছে ইশিতা।
আকাশের লক্ষণ ভাল না। যেকোন সময় বৃষ্টি
নামতে পারে। আকাশে অনেক মেঘ। মেঘ
জমেছে ইশিতার চোখেও। কিন্তু সে মেঘের
কোন রঙ নাই। কারণ, ইশিতা কাজল পড়ে না।
কাজলে ভীষণ এলার্জি যে!! ইশিতার চোখে
একফোঁটা জল টলটল করছে। যারা কাজল পড়ে
তারা কাজলের একটা অপকারিতা জানে না।
কাজল পড়া মেয়েরা সহজে কাঁদতে পারে
না। কাঁদলে চোখ থেকে বিচ্ছিরি রকম কাল
পানি গড়িয়ে পড়ে। অনেক ভেজাল। এত
ভেজাল যে সেটাকে আর শুধু ভেজাল বলা চলে
না, ঝামেলা বলতে হয়। বড় বড় ফোঁটায়
বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। মাথার উপরে
একটা কৃষ্ণচুড়া গাছ আছে।কিন্তু কৃষ্ণচূড়া
বৃষ্টি আটকাতে পারছে না, পাতা অনেক কম,
তাই বোধহয়। কয়েকটা লোক ইশিতার দিকে
এক মুহুর্তের জন্য অদ্ভুত দৃষ্টিতে
তাকিয়েছে, বৃষ্টির মধ্যে বসে বসে ভিজছে,
পাগল নাকি মেয়েটা? ইশিতার সেদিকে
চোখ নেই।
এক মুহুর্তের জন্য চোখ তুলল ইশিতা। একটা
ছেলে দৌড়ে আসছে। বৃষ্টিতে চোখ বেশিদুর
চলে না, ছেলেটাকে চিনার কোন উপায়
নাই। তবু ইশিতা জানে ছেলেটা নীরব।
ছেলেটা হাঁপাতে হাঁপাতে এসে ইশিতার
পাশে বসে পড়ল।
-কিরে ধুমসি, ভিজবিও বসে বসে? এত অলস
হলে তোর আর জিরো ফিগার হওয়া লাগবে
না। ওঠ, গিয়ে বৃষ্টির মধ্যে লাফালাফি
কর।
ইশিতা চুপ।কথা বলতে ইচ্ছে করছে না, এই
বেয়াদবটার সাথে তো আরো না।
-কি? মুখটা প্যাঁচার মত বানায়ে রাখসিস
ক্যান? একসময় মুখ কিন্তু সত্যি সত্যি বাঁকা
হয়ে যাবে, তখন কেউ বিয়ে করবে না!
-দেখ, আমার বিয়ে নিয়ে তোকে টেনশন
করতে হবে না, আর আমার ফোরটিন
জেনেরেশানে কেউ দেখতে সুন্দর না, সো
আমার মুখ স্বাভাবিকভাবেই প্যাঁচার মতন।
-আরে খেপিস ক্যান? আমি কি বলছি তুই
প্যাঁচার মত দেখতে? যাক, বাদ দে,
পদ্মপুকুরে যাবি? বৃষ্টিতে দেখতে সুন্দর
হবার কথা।
নীরবের পাশাপাশি হাঁটছে ইশিতা। নিচের
ঠোঁট কামড়ে ও প্রাণপণে উথলে ওঠা
কান্নাটাকে দমিয়ে রাখতে চাইছে।
কান্নাটা বাঁধ মানছে না, ঠেলে বেড়িয়ে
আসতে চাইছে। কিছু অকারণ আবেগের অনুভুতি
কেন যেন কখনোই কাউকে বুঝিয়ে উঠতে
ইচ্ছে করেনা। শধু কয়েকটা খুব প্রিয়
মানুষকে বলতে ইচ্ছে করে। প্রিয় মানুষ
গুলোকে সেই গল্পগুলো বলতে না পারার
কষ্টটা সবাই বুঝতে পারে কি? না, পারে
না, অন্তত, নীরবেরা পারে না।
…………………………………………
পদ্মপুকুরটা কানায় কানায় ভরা। বরিশাল
শহরটাতে এই একটা জায়গায় এসে শান্তি
পায় নীরব। পুরো পুকুর সাদা সাদা পদ্মে
ভরে আছে। এতটা সাদা যে কবিরা এরকম
সাদা কে শুধু সাদা বলে শান্তি পায়না,
শাদা বলে। নীরব চোখ ফেরাতে পারছে না।
পুকুরের ঘাটলাটা পিছল হয়ে আছে। অন্য
সময় হলে এই বৃষ্টির মাঝেও ইশিতা
পানিতে নামতে চাইত। আজকে চাইছে না।
নীরব জানে ইশিতার খুব মন খারাপ।
মেয়েটা আড়ালে চোখ মুছেছে কয়েকবার।
নীরব খেয়াল করেও না দেখার ভান
করেছে।
-কিরে, এইখানে এসেও এমন বসে আছিস
ক্যান? তোর কি খুঁটা গেঁড়ে বসা ছাড়া কোন
কাজ নাই? -আচ্ছা, তুই আমার পিছনে
লাগছিস ক্যান? তোর ইচ্ছা হইলে
নাচানাচি কর গিয়া বৃষ্টির মধ্যে।
-আমি কি তাই বলছি নাকি? তুই এমন
খিটমিট করিস কেন?
-সেইটা তোকে বললেও তুই বুঝবি?
-বাংলা ভাষায় বললে বুঝব, শত হলেও
মাতৃভাষা!
-আচ্ছা, থাক, বুঝছি তুই কতটা বুঝবি,
-আহা, বলেই দেখ না।
-নাহ, তুই বুঝবি না।
নীরব জানে সে বুঝবে। না বলেও ইশিতারা
অনেক কিছু বুঝাতে পারে। চোখের জলের
আড়ালে লুকোনো অভিমান টুকু বুঝাতে পারে,
রাগের আড়ালে লুকোনো ভালবাসাটুকু বুঝাতে
পারে। শুধু নীরবেরাই বুঝেও কিছু করতে
পারে না। ইশিতারা তাদের চেয়ে ভাল
কাউকে পাবার অধিকার রাখে বলেই
নীরবেরা ইশিতাদের কখনো ভালবাসি
বলতে পারে না। ছোট্টবেলায় একই ক্লাসে
পড়া মেয়েগুলো কখন যে নিজেদের মেধার
জোরে মেডিকেলে পৌঁছে যায়, ঠিক আন্দাজ
করা যায় না। সামান্য ভুলে, কিছুটা
অবহেলায় নীরবেরা ছোটখাট সাবজেক্টে
অনার্স পড়তে থাকে। তাই বাস্তবতার
খাতিরেই ইশিতাদের কান্নার কারণ
জানতে চাওয়া হয় না, বলা হয় না,
কাজলবিহীন চোখের রঙহীন মেঘেও অনেক
মায়া লুকোনো থাকে, খেপে গিয়ে নাকের
বাম পাশটা ফুলানো মেয়েটাকে কখনোই
জানানো হয় না, ওই বিশেষ মুহুর্তে শ্যামলা
মেয়েটাকে কতটা অসাধারণ মনে হয়। থাক
কিছু কথা না বলাই থাক, কিছু জিনিস বুঝেও
না বোঝাই থাক। শুধু আকাশে অনেক মেঘ
থাকুক, কাজল রঙ্গা মেঘ…

শেয়ার করুন

Author:

আমি সজীব হোসাইন -এই ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা পাশাপাশি লেখালেখির কাজটাও করি। অনলাইনে প্রযুক্তির বিষয় নিয়ে যা জানি তা মানুষের মাঝে শেয়ার করার ইচ্ছায় এ ব্লগ টি তৈরি করা।