শনিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২২

"জলরং"

"জলরং" ✍️ writer #রুদ্র আজাদ রাহাত আর রাহাতের স্ত্রী মুনিয়া দুজনই চাকরি করে। তাদের দুই মেয়ে। একজনের বয়স দেড় বছর, অন্যজনের আট বছর। সে ক্লাস থ্রীতে পড়ে। রাহাত অফিস থেকে বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে কিছু খেয়ে চলে যায় বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে। ফেরে খাওয়ার সময়। তারপর রাতের খাওয়া সেরে ঘুমিয়ে পড়ে। গতকাল যথারীতি সে যখন আড্ডা দেয়ার জন্য বেরুতে যাবে তখন রাহাতের বাবা হক সাহেব উচ্চ কণ্ঠে মুনিয়াকে ডেকে বললেন,"বউমা, তুমি কোথায়? তোমার ছোটো মেয়ে হিশু করে দিয়েছে। ওর ডাইপার বদলে দাও।" ছোটো মেয়েটি তখন হক সাহেবের কোলে ছিলো। মুনিয়া তখন ক্লাস থ্রীতে পড়া মেয়েটিকে পড়াচ্ছিলো। শ্বশুরের কথা শুনে সে যখন রুম থেকে বেরুতে যাবে তখন রাহাত মুনিয়াকে বললো,"তুমি মেয়েকে পড়াও। আমি দেখছি।" রাহাত বাবার কাছে গিয়ে বললো,"বাবা, ওকে আমার কাছে দিন। আমি ওর ডাইপার বদলে দিচ্ছি।" হক সাহেব অবাক হয়ে বললেন,"তুই বদলে দিবি?" "হম আমি।" এই বলে সে ছোটো মেয়েকে কোলে করে রুমে নিয়ে এলো। এবং নিজ হাতে ডাইপার বদলে দিলো। তারপর পুনরায় মেয়েকে বাবার কাছে দিয়ে বললো,"বাবা, ওর ডাইপার বদলে দিয়েছি। এবার ওকে নিন।" হক সাহেব নাতনিকে কোলে নিয়ে নতুন ডাইপারের দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে বললেন,"বাহ, ভালো করেছিস। সত্যি ভালো করেছিস। তুই নিজ হাতে কাজটা করলি এজন্য ভীষণ খুশি হলাম।" রাহাত আনন্দময় মন নিয়ে ঘর থেকে বেরুলো। এর মাস খানেক পরের ঘটনা। এক ছুটির দিন হক সাহেব বাজার থেকে বড়ো এক কাতল মাছ এনেছেন। এনেই মুনিয়াকে বললেন,"একেবারে তাজা মাছ। ফ্রীজে রেখো না। আমি চাই মাছটা তুমি আজই রান্না করো।" মুনিয়া মাছটা হাতে নিয়ে বললো,"ঠিক আছে বাবা।" অন্য দিনের মতো মুনিয়া মাছ কাটার জন্য রান্নাঘরে গেলো। রাহাত তখন সোফায় বসে পত্রিকা পড়ছিলো। আচমকা পত্রিকা বন্ধ করে সে রান্নাঘরে চলে এলো। তারপর স্ত্রীকে বললো,"মাছটা এদিকে দাও। আমি কাটবো আজ।" মুনিয়া বিস্মিত হয়ে বললো,"পারবে কাটতে?" "ছাত্রজীবনে বেশ কয়েক বছর মেসে ছিলাম। তখন রান্না করাটা শিখে নিয়েছিলাম।" কথা শেষে সে আয়োজন করে মাছ কাটতে শুরু করলো। হক সাহেব দৃশ্যটি দেখলেন। এবং বেশ খুশি হলেন। এরপর রান্নাঘরের দরোজায় দাঁড়িয়ে ছেলের উদ্দেশ্যে বললেন,"খুব ভালো করছিস। সাবাস!" বলতে বলতে তিনি ছেলের পিঠ চাপড়ে দিলেন। রাহাত তৃপ্তি নিয়ে মাছ কাটতে লাগলো। সেদিন রাতে হক সাহেব তার স্ত্রী পারভীনকে বললেন,"রাহাত আমার ছেলে ভাবতেই ভালো লাগছে।" পারভীন বললেন,"হঠাৎ এতো ভালো লাগার কারণ?" জবাবে হক সাহেব গর্বিত কণ্ঠে বললেন,"কয়টা ছেলে আছে ঘরের কাজ করে? রাহাত নিজ হাতে বাচ্চার ডাইপার বদলে দেয়। বউকে রান্নার কাজে সাহায্য করে। এই যে আজ মাছটা খেলে, অতো বড়ো মাছটা রাহাত একাই কাটলো। আলহামদুলিল্লাহ।" এর বিশ দিন পর এক রাতে সবার খাওয়া শেষ হলে মুনিয়া যখন রান্নাঘরে এঁটো থালা বাসন ধুচ্ছিলো তখন ছোটো মেয়েটা ঘুম ভেঙে কাঁদতে শুরু করলো। রাহাত কোনো ভাবে বাচ্চার কান্না থামাতে পারছিলো না। সে তখন মুনিয়াকে বললো,"থালা বাসন পরে ধুয়ো। এখন এসে মেয়েকে থামাও। আমি তো পারছি না। যে জেদী হয়েছে মেয়েটা!" মুনিয়া রান্নাঘর থেকে এসে বাচ্চাকে শান্ত করতে লাগলো। এই ফাঁকে রাহাত চলে গেলো রান্নাঘরে। এবং অবশিষ্ট এঁটো থালা বাসনগুলো ধুতে লাগলো। রান্নাঘরের সামনে দিয়ে তখন যাচ্ছিলো রাহাতের ছোটো ভাই শিমুল, যে এখন কলেজে পড়ে। বড়ো ভাইকে থালা বাসন ধুতে দেখে সে দাঁড়িয়ে পড়লো। এবং বললো,"ভাইয়া, তুমি একটা জিনিয়াস। কম্পিউটারের কাজে তুমি যেমন দক্ষ, থালা বাসন ধুতেও তাই।" রাহাত তার ধোয়া একটা প্লেট শিমুলকে দেখিয়ে বললো,"দেখ তো কেমন পরিষ্কার হলো?" "একেবারে ঝকঝক করছে। অসাধারণ ভাইয়া।" রাহাত সন্তুষ্ট মনে থালা বাসন ধুতে লাগলো। এই ঘটনার পঁচিশ দিন পরের এক বুধবার সন্ধ্যায় অফিস থেকে এসে রাহাত দেখলো মুনিয়া বিছানায় শুয়ে আছে। রাহাত উদ্বিগ্ন গলায় জানতে চাইলো,"কী হয়েছে তোমার?" মুনিয়া ক্লান্ত স্বরে বললো,"শরীরটা অসুস্থ লাগছে। বাইরে আজ গরম ছিলো প্রচুর। অফিসেও আজ অনেক খাটুনি গেছে। সব মিলে শরীরের ওপর বেশ ধকল গেছে। তাই..।" "ওষুধ খেয়েছো?" "হম।" রাহাত আর সেদিন ঘর থেকে বেরুলো না। না বেরিয়ে ক্লাস থ্রীতে পড়া মেয়েকে পড়াতে বসলো। রাহাতের ছোটো ভাই শিমুল তখন কী একটা কাজে বড়ো ভাইয়ের কাছে এলো। এসে দেখলো বড়ো ভাই মেয়েকে পড়াচ্ছে। মেয়েকে সে তখন অংক শেখাচ্ছিলো। মেয়েটা বুঝতে পারছিলো না বলে রাহাত নানা ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করছিলো। পেছন থেকে বড়ো ভাইয়ের পড়ানো কিছু সময় দেখার পর শিমুল কাছে এসে বললো,"ভাইয়া, তুমি তো দারুণ পড়াও। টিউশনি তো আমরাও করি। কিন্তু তোমার মতো এতো ধৈর্য নিয়ে এতো সুন্দর করে বোঝাতে আমরা পারবো না। তুমি অসাধারণ।" রাহাত চোখে মুখে খুশি নিয়ে হাসতে লাগলো। পরদিন বিকেলে বারান্দায় বসে মায়ের সাথে কথা বলছিলো শিমুল। কথার এক পর্যায়ে সে মাকে বললো,"ভাইয়ার কথা ভাবলেই মনটা ভালো লাগায় ভরে যায়।" পারভীন উৎসুক দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকালেন। অর্থাৎ জানতে চান, কেনো? শিমুল উত্তরে বললো,"ভাইয়া সারাদিন চাকরি করার পরও ঘরের কাজ করে। ভাবতে পারো ভাইয়া নিজ হাতে এঁটো থালা বাসন ধুচ্ছে? আর ভাইয়া পড়ায়ও খুব দারুণ। মেয়ে পড়া বুঝছিলো না বলে ভাইয়া কতো রকম ভাবে যে বোঝাচ্ছিলো! অসাধারণ।" তারপর দিন শুক্রবার। জুমার নামাজের পর সবাই এক সাথে টেবিলে খেতে বসেছে। মুনিয়া প্রতিদিনের মতো টেবিলে খাবার সাজিয়ে দেয়ার পর শ্বশুর শাশুড়ির প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছিলো। এই সময় রাহাত মুনিয়াকে বললো,"সকালে এক বোতল কোক এনে ফ্রীজে রেখেছিলাম। তুমি ওটা ফ্রীজ থেকে বের করো। বাবা মাকে খাওয়ার আমি বেড়ে দিচ্ছি।" রাহাত যখন পারভীনের প্লেটে ভাত তুলে দিচ্ছিলো তখন হক সাহেব ভরা গলায় বললেন,"মাশাল্লাহ, এই তো ছেলের মতো ছেলে। বাবা মা'র প্লেটে খাওয়ার তুলে দেয়ার মতো সুন্দর কাজ আর কী হতে পারে? সাবাস!" তারপর আলতো করে ছেলের কাঁধ চাপড়ে দিলেন। শিমুল তখন বললো,"ভাইয়া, তুমি সত্যি দারুণ একজন মানুষ। ঘরের কাজগুলো চমৎকার করো তুমি। অসাধারণ।" হক সাহেব তখন শিমুলকে বললেন,"শুধু মুখে অসাধারণ বললে হবে না। নিজেকেও বড়ো ভাইয়ের মতো অসাধারণ করে গড়ে তুলতে হবে।" বাবা আর ভাইয়ের মুখে প্রশংসা শুনে রাহাত আনন্দিত হয়ে উঠলো। এবং লাজুক হাসার ভান করে তা উপভোগ করতে লাগলো। আনন্দময় পরিবেশের ঠিক এই সময় পারভীন এমন একটা কাজ করলেন যা সবার জন্য অকল্পনীয় ছিলো। তিনি কঠোর ধমকে বললেন,"চুপ করো তোমরা। যথেষ্ট হয়েছে।" সবাই আশ্চর্য হয়ে পারভীনের দিকে তাকালো। পারভীনের এই হঠাৎ রেগে ওঠার কারণ তারা বুঝতে পারলো না। পারভীন মুনিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন,"কোকের বোতল পরে বের কোরো। এখন চেয়ারে বসো।" মুনিয়া শাশুড়ির কথা অনুযায়ী বসলো। এরপর তিনি স্বামী এবং ছেলেদের কড়া ভাষায় বললেন,"ন্যূনতম বিবেচনা বোধ যদি তোমাদের থাকতো তাহলে এমন মূর্খের মতো আচরণ করতে পারতে না।" হক সাহেব জানতে চাইলেন,"কোন আচরণটা মূর্খের মতো করলাম?" পারভীন জবাবে বললেন,"ছেলে মাঝে মাঝে বাচ্চার ডাইপার বদল করে, মাছ কাটে, এঁটো থালা বাসন ধোয়, মেয়েকে পড়ায়, বাবা মা'র প্লেটে খাবার তুলে দেয়, তাতে তুমি আর শিমুল ছেলের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। ওর জন্য গর্বে, ভালো লাগায় তোমাদের বুক ফুলে একেবারে আসমান স্পর্শ করছে।" তারপর মুনিয়াকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললেন,"আর যে মেয়েটা দিনের পর দিন ঐ একই কাজ করছে, এবং তার চেয়ে অনেক বেশি করছে, এবং অনেক ভালো ভাবে করছে, তার জন্য একটা শব্দ প্রশংসা তোমাদের মুখ দিয়ে বেরুলো না?" নিমিষে খাওয়ার রুমের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠলো। খানিক থেমে তিনি মুনিয়াকে বললেন,"বিয়ের আগে কাজ করতাম বাবার বাড়ির জন্য, বিয়ের পর করলাম শ্বশুর বাড়ির জন্য। এই করে সারাজীবন কাটলো। কিন্তু কষ্টকর এই কাজগুলোর জন্য কোনোদিন কেউ প্রশংসা করে নি। মনে মনে চাইতাম, প্রশংসা না করুক, কেউ অন্তত আমার এই পরিশ্রমের কথা স্বীকার করুক। কিন্তু কেউ করে নি।" তারপর কণ্ঠ কিছুটা দৃঢ় করে বললেন,"যে প্রশংসা আমি কোনোদিন পাই নি, আজ সবার সামনে আমি তোমাকে সে প্রশংসা করছি। মাগো, তুমি অত্যন্ত পরিশ্রমী একটা মেয়ে। খুবই ভালো একটা মেয়ে। সারাদিন অফিস তুমিও করো, রাহাতও করে। আমার সুপুত্র অফিস থেকে এসে বেরিয়ে যায় বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে, আর তুমি অফিস থেকে এসে লেগে যাও ঘরের কাজে। ঘুমানোর আগ পর্যন্ত তোমার কাজ চলতেই থাকে। তোমার হাতের কাজ খুবই ভালো। তোমার জন্য গর্বে এবং ভালো লাগায় আমি অভিভূত আপ্লুত।" এরপর তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে স্বামী এবং ছেলেদের সামনে দিয়ে হেঁটে গিয়ে মুনিয়ার কাছে গেলেন। শাশুড়িকে কাছে আসতে দেখে মুনিয়া বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। পারভীন তখন মুনিয়াকে গভীর স্নেহে জড়িয়ে ধরলেন। এবং বললেন,"এগিয়ে যাও মা। দোয়া রইলো।" হক সাহেব, রাহাত এবং শিমুল যখন মাথা নিচু করে নীরবে বসে রইলো, মুনিয়া তখন হাসলো মাথা উঁচু করে।

শেয়ার করুন

Author:

আমি সজীব হোসাইন -এই ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা পাশাপাশি লেখালেখির কাজটাও করি। অনলাইনে প্রযুক্তির বিষয় নিয়ে যা জানি তা মানুষের মাঝে শেয়ার করার ইচ্ছায় এ ব্লগ টি তৈরি করা।