Writer -Shakhawat Hossen
একটা লাশ পাওয়া গেল। ভার্সিটি ক্যাম্পাসের কোনায়। নগ্ন লাশ। মাথা থেকে কোমর অবধি মাটিতে পোঁতা। পা জোড়া উপরে শুধু, আসমানের দিকে মুখ করে খাড়া। যেন কেউ বৃক্ষের চারা মনে করে রোপণ করে গেল মানব। লাশের ডান পায়ের বুড়ো আঙুলে আংটায় আটকানো একটা কাগজে যুবকের নাম ও বয়স খচিত।তওকীর মরে গেল। এ কি মরা? শান্তির মৃত্যুও হলো না তার। আহারে! আমার প্রথম এক ঘন্টা বিশ্বাস হলো না। কোনো মৃত্যু সংবাদ শুনে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারি না আমি। জোর করেও না। ভার্সিটির বাইরে দেয়ালের সঙ্গে সেঁটে দাঁড়ানো টং-এ এসে প্রীতি যখন হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘তওকীরের লাশ, এটা তওকীর’, আমি তখন চা খাচ্ছিলাম। আমার হাতে ধরা চায়ের কাপে আরও কমসে কম পাঁচ চুমুক চা অবশিষ্ট ছিল। আমি পাঁচ চুমুক দিয়েই খালি করলাম চায়ের কাপ। প্রীতি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তুই কি শুনেছিস আমি কী বলেছি?’
‘শুনেছি।’
‘তাও বসে বসে এখনও চা খাচ্ছিস?’
‘কী করবো?’
প্রীতি আমার ডান গালে সজোরে একটা থাপ্পড় বসিয়ে যেভাবে আসলো দোকানে, ঐভাবে চলে গেল। তাড়াহুড়া তার খুব। হন হন। ধুপ ধাপ। যেন আমি চায়ে পাঁচ চুমুক না দিলে তওকীর বেঁচে যেত। পুলিশদের আনা অ্যাম্বুলেন্সের স্ট্রেচার ছেড়ে উঠে মৃত তওকীর দৌড়ে চলে আসতো টং-এ। আমার পাশে বসতো। চা খেত। বরাবরের মতোন চায়ের টাকা দিতো না। যেন প্রীতি এইরকম হন হন, ধুপ ধাপ করে একবার ক্যাম্পাস একবার টং-এ আসা যাওয়া করলে তওকীর বেঁচে যাবে। নাকের ভেতর ঢুকে থাকা মাটি ঝেড়ে ফেলে দিব্যি স্ট্রেচার ছেড়ে উঠে চলে আসবে প্রীতির পাশে। হাত ধরে বলবে, ‘একশো টাকা দে। খোদার কসম ফেরত দিমু।’ এবং বরাবরের মতোন আর কখনই ফেরত দেবে না ঐ টাকা।
.
তওকীর মরে গেছে। এটা সত্য। আমি আজ যে জিন্স পরে এসেছি, তার ডান পায়ের হাঁটুর কাছে পানের পিকের দাগ। সম্ভবত মা পান খেয়েছেন বিকালে। পিক ফেলেছেন। ছিঁটে এসে পড়েছে। ওটা পরেই আমি ভার্সিটি চলে আসলাম সকাল সকাল। চা খেলাম। হাঁটু ভাঁজ করতে গিয়ে খেয়াল করলাম দাগ। জিন্সের হাঁটুতে সেঁটে বসা এই লাল দাগের মতোন তওকীর মরে গেছে, এটাও সত্য। সত্য খুব সহজ। মেনে নিতে জানলে। আমি মেনে নিতে পারি। প্রীতি পারল না। সে অস্বাভাবিক আচরণ করল। ক্যাম্পাস ছেড়ে উঠল না। সন্ধ্যে হয়ে গেল। আমি ওর হাত ধরলাম। যে জায়গায় মাটি খুঁড়ে তওকীরকে উল্টো করে পোঁতা হয়েছিল, ঐ জায়গার চারপাশে বৃত্তাকার করে নির্দিষ্ট জায়গা অবধি পুলিশ হলুদ ফিতে বেঁধে দিয়েছে তখনই। ফিতের ভেতর ঢোকা অপরাধ। তদন্ত চলছে। রিপোর্ট আসার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। প্রীতি ঐ ফিতের বাইরে মাটির উপর বসে রইল দুই হাঁটু ভাঁজ করে। দৃষ্টি গর্তের উপর।
আমার হাত ঝাড়া দিলো জোরে।
‘বাসায় চল।’
‘না।’
‘এখানে বসে কী করবি?’
‘জানি না।’
‘আন্টি ইতোমধ্যে তের বার ফোন দিয়েছেন আমায়। টেনশন করছেন। উঠ, চল, বাসায় যাবি।’
‘যাবো না।’
‘প্রীতি...’
‘না।’
আমি একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে কাঁধে হাত রাখলাম প্রীতির। নরম স্বরে ফিসফিস করলাম, ‘তওকীর মরে গেছে প্রীতি।’ সত্যি মরে গেছে। একটা জ্বলজ্যান্ত মানুষ মরে গেছে। কালও বেঁচে ছিল। নিঃশ্বাস নিচ্ছিল সুন্দর। ঝগড়া করছিল। প্রেমে পড়ছিল। আজ মরে গেছে। প্রীতি আমার হাতের উপর মাথা হেলে দিয়ে হু হু করে কাঁদল। শরীর কাঁপল থরথর করে ওর। হেঁচকি দিয়ে। আমার একফোঁটা কান্না পেল না। আমি তখনও অনুভব করতে পারছিলাম না, তওকীর আর কখনই আমাদের পাশে বসবে না এসে। আড্ডা দেবে না। চা হাতে তর্ক করবে না। টাকা খুঁজবে না। ভালোবাসবে না। তওকীর কখনই আর আমাদের পাশে হাঁটবে না। ঘাসে চুমু খাবে না ওর পায়ের তালু। আমি জানি, এই যে ওর অভাববোধ না করা, এটা সাময়িক। তওকীর মরে গেছে এটা আমি আগামীকালও টের পাবো না। পরশুও না। এমনকি পরবর্তী এক সপ্তাহও আমি দিব্যি আরামসে নাকে তেল দিয়ে ঘুমাতে পারবো। সিনেমা দেখবো। আড্ডা দেবো। ক্লাস করবো। পড়াশোনা করবো। তওকীরের মৃত্যু আমি খানিক অনুভব করবো হয়তো এক মাস পর। অনুভুতির দিক দিয়ে আমি গণ্ডার। আমার বুঝতে দেরী হয়। অনুভব ক্ষমতা ক্ষীণ নয়, তীব্র। কিন্তু অনুভব করতে দেরী হয়। প্রীতি আমার সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রথম এক সপ্তাহ প্রীতিকে দুইবার হসপিটালে নেওয়া লাগলো।
অ্যাজমা আছে ওর। ঠাণ্ডায় বেড়ে যায়। বৃষ্টিতে ভিজতে পারে না। ধুলোবালি সহ্য হয় না। ইলিশ খেতে পারে না। ওর অনেক সমস্যা। অথচ গ্রীষ্মের দাবদাহে ধুলোবালিহীন শুষ্ক শহরে কোনোরকম ইলিশ খাওয়া ছাড়াই ওর শ্বাসকষ্ট বাড়লো। আন্টি পাগলের মতোন দৌড়াদৌড়ি করলেন। আমি পাশে রইলাম। ধমক দিলাম।
‘তওকীর মরে গেছে। এটা তুই মানলেও সত্য। না মানলেও সত্য।’
‘কে মারলো ওকে?’
‘রাজনীতি করত অল্প-স্বল্প। বামদের সাথে যুক্ত ছিল। ওদের শত্রুর অভাব নেই দেশে।’
‘তুই কী করে সিউর হচ্ছিস?’
‘আমি সিউর না। সম্ভাবনার কথা বলছি। যে কাজটা নির্জনে গোপনে করা যেত, ঐ কাজটা প্রকাশ্যে করার অর্থ একটাই। তোমরা ভয় পাও। এক প্রকার হুমকি। তওকীরকে উল্টো করে পোঁতা হয়েছে ক্যাম্পাসে। মাথা মাটির ভেতর, পা মাটির উপর। এটার অর্থ, মগজ দিয়ে চিন্তা কোরো না। মগজ দিয়ে চিন্তা করলে মগজ খাবে পিঁপড়া। তওকীরের মগজ পিঁপড়া খেয়েছে।’
প্রীতি হা করে তাকিয়ে থেমে থেমে থমথমে স্বরে জিজ্ঞেস করল, ‘তুই মানুষ?’
আমি মাথা উপর নিচ করলাম।
‘এতটা নির্দয় তুই কেমনে হতে পারিস ইভু?’
‘নির্দয় না। প্র্যাক্টিক্যাল। আমিও তওকীরের জন্য কষ্ট পাচ্ছি। কিন্তু তার জন্য আমি আমার ঘুমোনো বন্ধ করে দিইনি, খাওয়া দাওয়া বন্ধ করিনি, গোসল বন্ধ করিনি, আড্ডা বন্ধ করিনি। বরং বাড়িয়েছি।’
‘রিয়েলিটি থেকে পালানোকে তুই প্র্যাক্টিক্যাল ভাবিস কী করে?’
‘রিয়েলিটি থেকে পালাচ্ছি না। রিয়েলিটি মেনে নিচ্ছি। তুই মেনে নিচ্ছিস না।’
আমাদের নয়, দশ কিংবা এগার বৎসরের বন্ধুত্ব। প্রীতি আমার দিকে অনেকবার তাকিয়েছে এর আগে। আমি ওর হতাশাভরা দৃষ্টি দেখেছি, রাগান্বিত দৃষ্টি দেখেছি, বিব্রতকর দৃষ্টি দেখেছি, খুশিতে ছলছল কিংবা গাঢ় বেদনায় টলটল দৃষ্টি দেখেছি, ঘৃণার দৃষ্টি দেখিনি কোনোদিন। তা পূর্ণ হলো অবশেষে। প্রীতি আমার দিকে গা ঘিনঘিন করা ঘৃণার দৃষ্টি একবার নিক্ষেপ করে অন্যদিকে তাকালো। আর আমার দিকে তাকালো না। অনেকদিন।
.
স্কুলে আমার নাম ছিল গণ্ডার। কলেজে উঠার পর সামান্য ইজ্জত বেড়েছিল। নাম হয়েছিল, গণ্ডারবাবা। ভার্সিটি লাইফে নতুন বন্ধু হয় না। যারা হয়, ওরা হয় শুধু। থাকে না। ওদের নামগুলো নোটস, ক্লাস, সাবজেক্টের সমার্থক শব্দগুলোর মতোন শিখে রাখা হয়। ওরা জানে না, আমাদের রাগ, কখন আমরা শুনি মেঘমল্লার, কখন বাজাই ভায়োলিন, কখন সুর কেটে দিই একে অন্যের। কখন ভাত মেরে দিই। কখন মেরে দিই একে অন্যের চায়ের কাপের দাম। ওসব জানে মায়ের মতোন বন্ধুরা। ওসব জানে বাবার মতো বন্ধুরা। প্রীতি জানে। তওকীর জানে। দু’জন মিলে কত তরুণীর সঙ্গে পরিচয় করালো আমার। আমি একবার শুধু যদি প্রেমে পড়ি কারোর, ওরা আমার প্রেমে পড়া পরবর্তী অস্থিরতাটুকুন দেখবে। দেখে খিলখিল হাসবে। আমিও যে মানুষ, ওদের মতোন স্বাভাবিক সহজ সরল অনুভূতি সম্পন্ন একজন মানুষ, প্রমাণ হবে। তাদের এক জনমের ইচ্ছা পুরণ হবে সঙ্গে। অথচ হলো না। তার আগে প্রীতি হসপিটালে চলে গেল। আর তওকীর মরে গেল। মাটি খেয়ে।
হসপিটাল থেকে প্রীতির ফিরতে লাগল বেশ কিছুদিন। ততদিনে তওকীরের মৃত্যু কী করে হলো জানা গেল। তদন্ত, মেডিক্যাল সব রিপোর্ট এসে গেছে। আমরা জানলাম, তওকীরের মৃত্যু হয়েছে মাটিতে পোঁতার কারণে। গলায় মাটি ঢুকে গেছে। নাকের ছিদ্রেও আটকে ছিল মাটি। যেহেতু উল্টো করে পোঁতা হয়েছে, মাটি গলার নিচে নামেনি। ওখানেই আটকে জমে ছিল। অর্থাৎ, তওকীরকে মাটিতে পোঁতা হয়েছে যখন সে জীবিত ছিল। এই কাজটা ভয়ানক ঝুঁকিপূর্ণ। খুনী যে কোনো নির্জন জায়গা বেছে নিতে পারতো। কলেজ ক্যাম্পাস কেন বেছে নিলো তা জানা নেই কারোর। খুনীর টিকিটিরও পাত্তা পেল না পুলিশ। সন্দেহভাজনদের মধ্যে আমরাও ছিলাম। আমি আর প্রীতি ছিলাম ঐ তালিকায় শেষদিকে। আমার জিন্সের লাল দাগটা বাকি সবাইকে টপকে আমাকে এক নাম্বারে পৌঁছে দিলো দ্রুত। আমায় থানায় সবার থেকে আড়ালে নিয়ে যাওয়া হলো। একটা অন্ধকার রুমে বসিয়ে ভারী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘ট্রায়াঙ্গেল লাভ?’
‘কী ট্রায়াঙ্গেল লাভ?’
‘ন্যাকা তুমি? কিছু বুঝো না? প্রীতি আর তুমি ছিলে তওকীরের বেস্ট ফ্রেন্ডস। তুমি প্রীতিকে ভালোবাসো?’
‘অসম্ভব স্যার। আমরা তিনজন বন্ধু
শুধু বন্ধু। আমাদের বন্ধুত্বে ভালোবাসা আছে, কিন্তু যেরকমটা আপনি মিন করছেন, সেরকম কিছু নাই। ওরকম কিছু থাকলে বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যেত। তওকীরের মৃত্যুর আগপর্যন্ত আমাদের মধ্যে দারুণ বন্ধুত্ব ছিল।’
‘মৃত্যুর পর? মৃত্যুর পর কী হলো? প্রীতি তোর সাথে কথা বলে না কেন এখন?’
‘কারণ, আমি একটা গণ্ডার। কারোর মৃত্যু আমায় স্পর্শ করে না। তওকীরের মৃত্যু সংবাদ শুনে আমি চা খাচ্ছিলাম। চায়ের কাপ ফেলে দিয়ে হুট করে বেঞ্চি ছেড়ে উঠে ধুপধাপ হেঁটে ক্যাম্পাসে ওর লাশের কাছে যাইনি, তাই প্রীতি আমার সাথে কথা বলে না আগের মতো। ওর অভিমান বেশী। অভিমান কমলে ঠিক হয়ে যাবে।’
‘তওকীরের মৃত্যু তোকে স্পর্শ করেনি?’
পুলিশ অফিসার নড়েচড়ে বসলেন। যেন বিরাট একটা ক্লু পেয়ে গেছেন। খুনী তার চোখের সামনে বসা। ঘাড় ধরে শুধু লকাপে পুরে দেওয়া বাকি। অন্ধকার রুমের ছোট্ট টেবিলের উপর ঝুলন্ত একটা কম ওয়াটের হলুদ বাল্বের বিষণ্ন আলোয় অফিসারের চোখ চকচক করল খুব। কিন্তু চকচক বেশীক্ষণ রইল না। প্রথমত জানা গেল, আমার জিন্সের লাল দাগটা রক্ত-পক্ত নয়, পানের পিকের দাগ। দ্বিতীয়ত, কেইসে সাহায্য করা অধিকাংশই সাক্ষী দিলো তওকীরের মৃত্যুকালীন ক্ষণটায় আমি বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম ওদের সঙ্গে। ক্যাম্পাস থেকে শ’দেড়েক মাইল দূর। আমি অন্ধকার রুমে অফিসারের ক্রমশ কমতে থাকা চকচকে চক্ষুজোড়ার দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘স্যার। তওকীরের কাছে আমি সতেরশো টাকা পাই। আন্টির কাছে চাইতে পারবো না। আপনি একটু নিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন প্লিজ।’
.
ভার্সিটি খুলে গেল তওকীরের মৃত্যুর ষোলদিন পর। যে জায়গায় তওকীরকে উল্টো রোপণ করা হয়েছিল, ক্যাম্পাসের ঐ জায়গার চারপাশে ভার্সিটি কর্তৃপক্ষের তদারকিতে একটা ছোট্ট দেয়াল তুলে দেওয়া হলো হাত তিন-চারেক উঁচু করে। প্রীতি ঐ দেয়ালের উপর উঠে বসে থাকলো ভার্সিটির ক্লাস চলাকালীন পুরো সময়। কয়েকদিন দেখলাম ওকে। একদিন গিয়ে পাশে বসলাম। প্রীতি রোবোটের মতো ব্যাগ খুলে বারো’শ টাকা বের করে আমার হাতে গুঁজে দিলো।
টাকা নিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই আমার চোখের দিকে তাকালো একবার। প্রীতির চোখজোড়া অচেনা। ঐ দিন বোধহয় পুরোপুরি টের পেলাম আমি, আমাদের বন্ধুত্ব শেষ। তওকীর নিজের সাথে সাথে গর্তের ভেতর বন্ধুত্বটাও পুঁতে দিয়েছিল। প্রীতি বলল, ‘তুই তওকীরের কাছে সতের'শ টাকা পাস। পুলিশ অফিসার আন্টিকে বলছিল কথার কথা। আপনার ছেলের বন্ধু ভাগ্য খুব খারাপ। আমার খুব লজ্জা লাগছিল তখন। আমার কাছে বারো’শ আছে, নে। বাকি পাঁচশো পরে দিয়ে দিবো।’
আমি বারো’শ টাকা পকেটে গুঁজলাম। উঠে চলে এলাম। পেছন ফিরে তাকালাম না। কারণ, ঘাড় না ঘুরিয়েও আমি জানি, প্রীতি আমার দিকে তাকিয়ে। ওর চোখে ঘৃণা। এতবেশী ঘৃণা যে, আমি একবার পেছন ফিরে তাকালেই ভস্ম হয়ে যাবো। অথবা একটা গর্ত খুঁড়ে স্বেচ্ছায় ঢুকে যাবো অন্দর। প্রীতির সাথে আমার আর কোনোদিন কথা হয়নি। ভার্সিটি শেষ হলো। প্রীতির আব্বুর ট্রান্সফার হলো। অনেক খেটেখুটে নিজের জন্য জোগাড় করে নিলাম একটা চাকুরি। মোটামুটি বেতন। প্রীতিও কোথাও কাজ খুঁজে নিলো। অন্য শহর। নতুন কিছু বন্ধু হলো ওর। এবং একজন মানুষও পেল। মনের মানুষ। তার সঙ্গে বিয়ে ঠিক হলো। ভার্সিটি ছাড়ার অনেক অনেক বৎসর পর আমি প্রীতির মুখচ্ছবি দেখতে পেলাম। বাইশে এপ্রিল। আমার ঠিকানায় একটা কার্ড এলো। বিয়ের কার্ড। প্রীতি পাঠিয়েছে। প্রীতি বিয়ে করতে যাচ্ছে। আমাকে থাকতে হবে। আমার যাওয়া দরকার।
.
আট বৎসর পর প্রীতির মুখোমুখি হলাম আমি। মোটা হয়েছে আগের চেয়ে অনেক। সুন্দর হয়েছে তিনগুণ। চুল লম্বা হয়েছে খুব। হাঁটায় পরিবর্তন এসেছে। ধুপধাপ নেই। ধীর স্থির। আমার চোখের দিকে তাকালো প্রীতি। চোখজোড়া শুধু একই র'য়ে গেল। হায়। সেই পুরনো দৃষ্টি। থমথমে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেমন আছিস?’
‘ভালো। তুই?’
‘ভালো।’
‘কী করছিস আজকাল?’
আমি মৃদু হাসলাম। উত্তর দিলাম না। প্রীতিও মৃদু হাসলো। ইতস্তত করল। এদিক ওদিক তাকালো। কথা খুঁজল। পরিস্থিতির সঙ্গে মানানসই কোনো কথা। যে কথা দিয়ে ঢাকা যাবে আট বৎসরের দূরত্ব। আট বৎসরের ইতস্ততা কেটে যাবে যে কথায় চট করে। প্রীতি সে কথা খুঁজে পেল না। আমি পেলাম। দু'হাত বাড়িয়ে বললাম, ‘আয়।’ প্রীতি আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। শক্ত করে খামচে ধরল পিঠ। মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদল। বিয়ে বাড়িতে কনের কান্নাকাটির একটা ব্যাপার আগে ছিল, আজকাল দেখা যায় না। আমি প্রীতিকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম না। কাঁদুক। প্রীতি কাঁদতে কাঁদতে জিজ্ঞেস করল, ‘তুই কেন ছাড়ছিস না ঐ শহর?’
আমি চুপ করে রইলাম। প্রীতির ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে করা কান্না আমায় ফিসফিস করে জানিয়ে গেল, বন্ধুত্ব গর্তে পুঁতে ফেলা যায় না কোনোদিন। প্রীতি লুকিয়ে লুকিয়ে খোঁজ রেখেছে আমার। আমার বিয়ে। আমার সংসার। আমার বাচ্চা। আমার চাকুরি। আমার নতুন নতুন ঢের ভালো চাকুরির অফার। ওদের শর্ত একটাই। শহর ছাড়তে হবে। আমার নিঃসঙ্কোচে করা সব ‘না’-এর খোঁজ রেখেছে প্রীতি, লুকিয়ে। অথচ আট বৎসর পর সম্মুখে দাঁড়িয়ে জড়িয়ে ধরে কান্না করা, তওকীরের পর আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুটিকে আমি জানাতে পারলাম না, সব মানুষের সব খোঁজ রাখা যায় না। আমি প্রীতিকে জানাতে পারলাম না, শহর ছাড়তে পারি না আমি। ঐ শহর আমার কিছু দুঃখ পুষে। আমি আমার ভেতর আস্ত ঐ শহর পুষি।
1 coment rios:
Nn
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন