সোমবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

আত্মসম্মান

Writer-বর্ষা ইসলাম

অফিস থেকে ফিরে এসে বেগুনী রঙ্গের মোটা জামদানী শাড়িটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে কানের কাছে এক প্রকার ফিসফিসিয়েই সাজিদ বলে উঠলো,

-'শাড়িটা আলমারিতে তুলে রাখো।মা কিংবা বড় আপা কে জানানোর দরকার নেই যে আমি শাড়িটা তোমাকে এনে দিয়েছি।

কথাটা বলে সাজিদ রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।যাওয়ার সময় খেয়াল করলাম ওর হাতে আরও দুটো শাড়ির প্যাকেট।প্যাকেট দুটো নিয়ে আমার শ্বাশুড়ি মা আর ননদকে দিয়ে আবার রুমে আসলো।শাড়িটা আলমারিতে তুলে রাখতে রাখতে সাজিদ কে জিজ্ঞেস করলাম,-'আচ্ছা! আমাকে শাড়ি এনে দেওয়াতে কি মা রাগ করবেন তোমার সাথে?

সাজিদ একটু স্থির হলো।পরক্ষনেই বিছানায় বসে গায়ের শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে বললো-'তেমন কোনো বিষয় নয় নিরু,এক সাথে তিনটা শাড়ি এনেছি দেখলে মা একটু বকাবকি করতে পারে।এক সাথে অনেক গুলো টাকা খরচ হয়ে গেলো না!এই আর কি!

আমি আর কোনো কথা বললাম না।ঠোঁটে বাকা হাসি এনে খুব শান্ত স্বরেই বললাম,-'ওহ আচ্ছা!

সাজিদ আমার স্বামী। আজ ১০ দিন হলো আমাদের বিয়ে হয়েছে।বিয়ের প্রথম দিন থেকেই দেখে আসছি এ সংসারে আমার শ্বাশুড়ি আর বড় ননদের কথার বাইরে একটা গাছের পাতারও নড়চড় হয় না।বিষয় টা প্রথম প্রথম স্বাভাবিক মনে হলেও এখন একটু বেপোরোয়া লাগছে আমার কাছে।তবুও এ নিয়ে সাজিদ কে কোনো কথা না বলে রাতের খাবার শেষ করে চুপচাপ ঘুমিয়ে গেলাম।তার কিছুদিন পর হঠাৎ করেই শরীরটা বেশ অসুস্থ লাগছিলো।সন্ধ্যা হতে না হতেই গায়ে খুব জ্বর চলে আসলো ।গ্রীষ্ম কালের ভ্যাপসা গরমেও সেদিন কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছি দেখে শ্বাশুড়ি এক প্রকার ব্যঙ্গ করেই বললেন,
-'আজকাল বউ দের চুন থেকে পান খসলেই ন্যাকামির আর শেষ থাকে না।আমাদের সময় সেই ভোর বেলা উঠে সারাদিন কত কাজ কর্ম করেছি,তবুও মুখ ফুটে ইশশ! শব্দটি করিনি কখনো। দিনে দিনে যে আরও কত কি দেখতে হবে আল্লাহ মালুম।

শ্বাশুড়ির এমন কাঠপোড়া কথায় কেমন অসস্তি লাগছিলো।তার কথার জবাব দিতে গিয়েও সেদিন থেমে গিয়েছিলাম।উনি মনে কষ্ট পাবেন বলে।সন্ধ্যার পর সাজিদ কে ফোন করে বললাম বাসায় আসার সময় আমার জন্য কিছু কমলালেবু আর পেয়ারা এনো তো!জ্বরে মুখের রুচি কেমন নষ্ট হয়ে গেছে।তেঁতো তেতো লাগছে।সাথে জ্বরের কিছু ঔষধও এনো।

সাজিদ আচ্ছা বলে ফোন কেটে দিলো।আমি অপেক্ষায় রইলাম সাজিদ বাড়ি ফেরার।আসলে কমলালেবুর প্রতি কেমন তীব্র আসক্তি লাগছিলো। খুব খেতে ইচ্ছে করছিলো।অবশেষে আমার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সাজিদ বাসায় ফিরলো।রাত তখন ১১ টা বাজে।দেরি করে বাড়ি ফেরায় জিজ্ঞেস করলাম,

'আজ এতো দেরি হলো যে?

ইচ্ছে করেই দেরি করেছি।মা এতোক্ষণে হয় তো ঘুমিয়ে গেছে।হাতে এতো ফলফলাদি দেখলে মা কি না কি ভাব্বে।তাই ইচ্ছে করেই দেরি করে ফিরেছি।নেও এবার খেয়ে নাও।ঔষধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।সকালে দেখবে জ্বর পালিয়েছে।

বলেই মৃদু স্বরে হাসতে লাগলো।আমি নির্লিপ্ত চোখে তাকিয়ে আছি। অবাক হয়ে যাচ্ছি সাজিদের কর্মকারখানা দেখে।মনে প্রশ্ন করে বসলো,'সে সব কিছু কেনো এভাবে চোরের মতো লুকিয়ে আমাকে দিবে?স্ত্রী হিসেবে তার কাছে এতোটুকু পাওয়ার অধিকার কি আমার নেই?বিবেক নাড়া দিলো।মস্তিষ্ক জুড়ে ঘিরে বসলো এমন গোটা কয়েক প্রশ্ন। আত্মসম্মান জাগ্রত হলো।নাহ!এভাবে লুকিয়ে চুকিয়ে কত দিন?কমলালেবু খাওয়ার বাসনা নিমিষেই জলাঞ্জলি দিলাম। তীব্র রাগ হলো। তবে এ রাগ আমার সাজিদের প্রতি নাকি নিজের নিষ্ক্রিয়তার প্রতি বুঝে উঠতে পারলাম না।সেদিনের মতোও সাজিদ কে কিছু বললাম না।অভুক্ত শরীরেই ঘুমাতে গেলাম।পেটে ক্ষুধা নিয়ে রাতে খুব একটা ভালো ঘুম হলো না।

পরদিন সকাল হতেই বাড়িতে খুব হাসিঠাট্টা শুনতে পেলাম।বসার ঘরে সবাই আছেন।আমার শ্বশুর, শ্বাশুড়ি, ননদ,ননদের হাজবেন্ড আর সাজিদ।থমথমে পায়ে আমি সেখানে গিয়ে দাড়ালাম।আমাকে দেখা মাত্রই আমার শ্বাশুড়ি মা আমাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন,

-'নিরুপমা,কাল আমরা সবাই সাজিদের মামা বাড়িতে যাবো।রাইসা,(সাজিদের মামাতো বোন) কে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে।তুমি বাড়িটা ঠিক ঠাক মতো দেখেশুনে রেখো একটু।

আজ আর চুপ থাকতে ইচ্ছে হলো না।ভীষন বেপোরোয়া হয়েই শ্বাশুড়িকে জিজ্ঞেস করলাম,

-'আমি আপনাদের সাথে যাবো না, মা?

আমার প্রশ্ন শুনে উনি একটু অপ্রস্তুত বোধ করলেন।হয়তো এমন প্রশ্ন আশা করেন নি আমার কাছ থেকে।ঘরের বউ বলে কথা!নিমিষেই নিজেকে সামলে নিয়ে উত্তপ্ত গলায় বলে উঠলেন,

-'বাড়ির বউ বাড়িতে থাকাই তার কাজ।কাজ বাজ করবে খাবে এই অনেক।এতো বাইরে বাইরে ঘোরার কি দরকার?তাছাড়া রাইসা কে তো কাল দেখতে আসবে শুধু। বিয়ে টিয়ে হলে তখন দেখা যাবে।তখন সাজিদ ইচ্ছে হলে নিয়ে যাবে!

-'ছেলে বিয়ে দিয়ে বাড়িতে বউ না এনে কাজের লোক আনলেই তো পারতেন, মা।তাহলে বোধ হয় আর কোনো অসুবিধে হতো না।

আমার কথা শুনে শ্বাশুড়িমা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন।সাজিদ কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন,

-'তোর বউয়ের কথা শুনেছিস?কেমন বেয়াদবের মতো মুখে মুখে তর্ক করছে দেখ একবার।

-'নিজের সম্মান বাঁচাতে বেয়াদব হওয়া বোধ হয় দোষের কিছু নয়, মা!

এবার সাজিদ বসা থেকে উঠে আসলো।মুখে রাগ আর চোখ গরম করে বললো, 'আমার সামনে মায়ের সাথে এভাবে কথা বলার সাহস কিভাবে হয় তোমার?

আমি সাজিদের এমন গরম গরম চেহারা দেখে আজ মোটেও ভয় পাচ্ছি না।তার চোখের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত স্বরেই বললাম,

-'তোমার সামনে মায়ের মুখে মুখে কথা বলার জন্য যদি আমার সাহসের প্রয়োজন হয়,তবে আমার সাথে কথা বলার জন্যও তোমার সাহসের দরকার হবে সাজিদ!

সাজিদ ভ্রু কুচকে তাকালো। কপাল ভাজ হলো।সে কিছু বলে উঠার আগেই আমি আবারও বললাম,

এক সাথে তিন টা শাড়ি আনাতে একটা শাড়ির টাকা যদি তোমার কাছে বেশী খরচ মনে হয়, সেই শাড়ি লুকিয়ে চুকিয়ে আমাকে আলমারিতে তুলে রাখতে হয়, জ্বরের ঔষধ আর কমলালেবু আনার জন্য যদি সবাই ঘুমানোর পর তোমাকে চোরের মতো ঘরে প্রবেশ করতে হয় তবে সে অসৎ সাহস নিয়ে তুমি আমার সাথে কথা বলতে এসো না!এটা আমার সম্মানের প্রশ্ন!এই বাড়িতে আমার কতটা গুরুত্ব আছে,কতটা গুরুত্ব তুমি দিচ্ছো,আমি পাচ্ছি সেই প্রশ্ন।

মা কে ভালোবাসা, তার কথা শোনা দোষের কিছু নয়।এটা উত্তম কাজ।তবে আমি তোমার স্ত্রী!বিয়ে করা বউ!চুরি করা কোনো পন্য নই।যেকোনো কিছু আবদার করার অধিকার আমার তোমার প্রতি আছে।তোমার বাড়িতে আমার সম্মান রক্ষা করার ক্ষমতা যদি তোমার না থাকে তবে আমাকে ধমকানোর অধিকারও তোমার নেই!

সেদিনের মতো এই টুকু বলে সেখান থেকে চলে আসলাম।পরদিন রাইসাদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য বেগুনি রঙের মোটা জামদানী টা পড়ে আমিই সবার আগে রেডি হয়েছিলাম।সেদিনের পর আর শুনতে হয় নি ' নিরু,শাড়ি টা লুকিয়ে আলমারিতে তুলে রাখো,কেউ যেনো না দেখে'

__________সমাপ্ত____________
#অনুগল্প


শেয়ার করুন

Author:

আমি সজীব হোসাইন -এই ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা পাশাপাশি লেখালেখির কাজটাও করি। অনলাইনে প্রযুক্তির বিষয় নিয়ে যা জানি তা মানুষের মাঝে শেয়ার করার ইচ্ছায় এ ব্লগ টি তৈরি করা।