বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০২২

সংসার

#Writer অরণী মেঘ
চেয়ারের উপর ময়লা শার্টটা রেখে গেছিল তারিক। শাওয়ার সেরে বেড়িয়ে আসার কিছুক্ষণ বাদেই কারোর চেঁচানোর আওয়াজ শুনতে পেলো সে। কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হলো কানের মধ্যে তালা লেগে গেছে। দুই আঙুল কানে দিয়ে তালা ছুটানোর চেষ্টা করল সে। তবুও কেমন শো শো আওয়াজ হচ্ছে। আওয়াজের উৎসের দিকে তাকিয়ে দেখল শুভ্রা দাঁড়িয়ে আছে। সে রেগে জিজ্ঞেস করছে, -চেয়ার টা কি জন্য কেনা হয়েছে? তারিক থতমত খেয়ে উত্তর দিলো, -বসার জন্য। -তাহলে এখানে ময়লা শার্ট রেখেছো কেন? দুনিয়ার সব জামাকাপড় তুমি এই চেয়ারের মধ্যে কেন রাখো? তারিক কাঁচুমাচু মুখ করে বলল, -অভ্যাস হয়ে গেছে। সে শার্ট টা নিয়ে কাচতে চলে গেল। শার্ট টা কেচে দিয়ে ঘরে এসে দেখল খাটের উপর ভেজা তোয়ালে রেখে দেয়া। চুল মুছে ভেজা তোয়ালেটা খাটের উপরেই রেখে দিয়েছে তারিক। শুভ্রা বিস্ফোরিত চোখে তোয়ালেটা দুই আঙুল দিয়ে উঠালো। বিছানার অনেকখানি জায়গা ভিজে গেছে। তারিকের আত্মা যেন শুকিয়ে গেল। সে কী এক্সকিউজ দেবে সেটা ভাবছে। শুভ্রা অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করল তারিকের দিকে। তারিক মিনমিন স্বরে বলল, -ইয়ে মানে....তাড়াহুড়ো করে ভুলে রেখে গেছিলাম। -তা কী এমন রাজকার্য ছিল তোমার একটু বলবে? -না। -না মানে? -কিছু না। শুভ্রা আর কিছু বলল না। সে ভেজা তোয়ালে টা শুকাতে দিলো। তারিক খাটের উপর বসলো। সুন্দর টান টান করে চাদর বিছানো একটা খাট। অগোছালো জীবনটা হঠাৎ করেই কেউ এসে গুছিয়ে দেয়ার জন্য বড্ড ঝামেলাতে পড়েছে সে। সবকিছুই কেমন যেন ছকেবাধা হয়ে গেছে তার। তোয়ালে টা শুকাতে দিয়ে কোমড়ে আঁচল গুজতে গুজতে শুভ্রা বলল, -অভ্যাস গুলো পাল্টাও, বুঝলে। এখন তুমি মেসে থাকো না। আর গাদাগাদি করে একসাথে বন্ধুদের সাথে থাকোও না। এখন তোমার বিয়ে হয়েছে। আর আমি তোমার বিয়ে করা বউ, রুমমেট না। তারিক কী উত্তর দেবে ভেবে পেলো না। মাঝে মাঝে তার স্ত্রীকেও মনে তার মেসের কোনো রুমমেট বলেই মনে হয়। একবার বাজার নিয়ে বাসায় ফেরার পর তারিক বলেছিল, -একি! এখানে কী করছেন! শুভ্রা রান্নাঘরে প্লেট গুলো ধুতে ধুতে উত্তর দিলো, -এখানে কী করছি মানে! -মেসবাড়িতে মেয়েদের প্রবেশ নিষেধ। জানেন না সেটা? শুভ্রা ভ্রু কুঁচকে পিছন ঘুরে তাকাতেই ঢোক গিলল তারিক। সেদিন শুভ্রা রেগে বলেছিল, -নিজের বউকে চিনতে পারো না। কেমন মানুষ তুমি! অফিস শেষ করে বাসায় ফেরার পর সবকিছু গোছানো অবস্থায় পেতে পেতে নতুন আরেক অভ্যাস হয়ে যাচ্ছিলো তারিকের। বাসায় ফেরার কিছুক্ষণের মধ্যেই এক কাপ চা এগিয়ে দিতো শুভ্রা। আজকে দরজায় একটা তালা ঝুলছে। শুভ্রা ঘরে তালা মেরে কোথায় গিয়েছে সেটা ভাবতে না ভাবতেই একটা মেসেজ আসলো। 'ডানপাশে পড়ে থাকা ইটের নিচে ঘরের চাবি রাখা আছে।' তারিক তালা খুলে ঘরে ঢোকার পর হা হয়ে গেল। সে মেসবাড়িতে থাকার সময় তার ঘর যেমন অগোছালো থাকত, এখন ঠিক সেরকম। চেয়ারের উপর তার জামা কাপড় গুলো পড়ে আছে, বিছানার চাদর অগোছালো, ক্যালেন্ডার, চামচ, প্লেট সহ ছোট খাটো হাবিজাবি জিনিস এখানে সেখানে ছড়িয়ে আছে। রান্নাঘরের অবস্থাও বেহাল। তারিক শুভ্রাকে কল দিলো। কল রিসিভ করে শুভ্রা হেসে বলল, -বাসায় ফিরেছেন মশাই? -হ্যাঁ, ঘরের অবস্থা এমন কেন? আর তুমি কোথায়? -আমি খেয়াল করে দেখলাম, তুমি মেসবাড়িটাকে খুব মিস করছো। তোমার গোছানো ঘরবাড়ি ঠিক তেমন একটা পছন্দ হচ্ছে না। তাই তোমার মেসবাড়ির যেমন বর্ণনা দিতে সেরকম ভাবেই রেখে এসেছি। আর ফ্রিজে ডিম আছে। -শুভ্রা, এটা কিন্তু ঠিক হচ্ছে না। -অবশ্যই হচ্ছে। এক কাজ করো মেস বাড়িতে তো নিশ্চয়ই অন্য রুমমেট থাকত। তোমার কিছু বন্ধু বান্ধবদের ডেকে নাও নাহয়। -উফ, এসব বাদ দাও তো। তুমি কোথায় আছো? -আমি গার্লস হোস্টেলে চলে এসেছি। তুমি ওইটাকে মেসবাড়ি মনে করে থাকো কিছুদিন। আমি থাকলে তো আর পুরোপুরি মেসবাড়ির ফিল পাবে না। তারিক একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, -আচ্ছা, আমি বিছানায় ভেজা তোয়ালে রাখব না, চেয়ারে জামাকাপড় রাখব না, মোজা যেখানে সেখানে ফেলব না, আর জুতার র‍্যাকে জুতা রাখব। -এই তো লাইনে এসেছ। আর হ্যাঁ, প্রতিদিন ডিম আনা চলবে না। -একটা ব্যাচেলরের থেকে ডিমটাও কেড়ে নেবে? ডিমের সাথে কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে আমার জানো? শুভ্রা কল কেটে দিলো। মনে মনে ভাবল, ''এই লোকটা যে এখন আর ব্যাচেলর না, তার একটা বউ আছে, ছোট্ট একটা সংসার হয়েছে এটাও কি তার মনে থাকে না?'' তারিক আবার কল দিচ্ছে। শুভ্রা কল রিসিভ করে তাকে কিছু বলার সুযোগ দিলো না। সে রেগে বলতে লাগল, -শোনো, তুমি যেখানে থাকবে সেটা মেসবাড়িও থাকবে না। সেটা হবে গোয়ালঘর। বুঝেছো? শুভ্রা আবার কল কেটে দিলো। তারিক খেয়াল করেনি, তার স্ত্রী তাকে ঘুরিয়ে গরু বলেছে। কিছুক্ষণ বাদে দরজায় নক পড়লো। তারিক হেসে দরজা খুলল। সে জিজ্ঞেস করল, -গার্লস হোস্টেল থেকে ফিরে আসলে যে? বিরক্তমুখে শুভ্রা বলল, -ফিরে না এসে উপায় আছে? তোমার ভরসায় ঘরটা রেখে গেলে মেস বাড়ি থেকে গোয়াল ঘর বানিয়ে ফেলতে। এই বলে শুভ্রা ঘরে ঢুকল। কিন্তু অবাক হয়ে সে দেখল বাড়িটাকে একদম মেসবাড়ি বলে মনে হচ্ছে না। সবকিছু কেমন সুন্দর করে গুছিয়ে রেখেছে তারিক। অবাক হয়ে সে তারিকের দিকে তাকাল। তারিক হেসে বলল, -ম্যাডাম, গোয়াল ঘরটাকে মানুষের ঘরে পরিণত করতে পেরেছি তো? শুভ্রা হাসল। সে ভাবুক গলায় বলল, -আমার এমন ছোট্ট সাজানো সংসারটা আজীবন এমন সাজানো থাকবে তো?

শেয়ার করুন

Author:

আমি সজীব হোসাইন -এই ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা পাশাপাশি লেখালেখির কাজটাও করি। অনলাইনে প্রযুক্তির বিষয় নিয়ে যা জানি তা মানুষের মাঝে শেয়ার করার ইচ্ছায় এ ব্লগ টি তৈরি করা।