মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২০

ক্রুসেড সিরিজ- ২৩. ইহুদী কন্যা(পর্ব-9)

২৩. ইহুদী কন্যা(পর্ব-9)


,

গিয়ে পৌঁছলো, যেখানে শামসুন নেছার আসার কথা।
আমের যেমন ভাবে উনুশীর ছায়া দেখেছিল ঠিক তেমনি সে শামসুন নেছার ছায়াও দেখতে পেলো। তার ঘোড়া সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছিল। কাছাকাছি গিয়ে আমের ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে এলো।
‘এতক্ষণ তুমি কোথায় ছিলে?’ শামসুন নেছা উদগ্রীব কণ্ঠে তাকে বললো, ‘আমি অনেকক্ষণ ধরে এখানে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।’
‘আমার কাজ তো তুমি জানোই।’ আমের মিথ্যা বললো, ‘ডিউটি সাজাতে গিয়ে পথে পথে নামতে হলো, সে জন্য দেরী হয়ে গেছে।’
‘নিজের লোকদের কথাও মনে রেখো।’ শামসুন নেছা বললো, ‘তাড়া সবাই খুব সতর্ক। তাদের ওপর আস্থা রাখলে তোমার কাজ সহজ হবে।’
শামসুন নেছা সেই লোকদের কথা বলছিল, যারা হলবে সুলতান আইয়ুবী ও রাজিয়া খাতুনের হয়ে গোয়েন্দাগিরি ও তথ্যানুসন্ধানের কাজ করছে। এদের মধ্যে মহলের চাকর বাকরও আছে। তারাও এই কাফেলার সাথে যাচ্ছে। আরও কিছু লোককে সঙ্গে আনা হয়েছে যারা দিন মজুরের কাজ করতো।
তাদের আনা হয়েছে তাবু খাটানো, গুটানো ও অন্যান্য কাজের জন্য। তাদের সঙ্গে ওয়াদা করা হয়েছে, মুশেলে পৌঁছে তাদের কাজের ব্যবস্থা করে দেয়া হবে। রাজিয়া খাতুনের দাসী এসব মজুর সংগ্রহ করে দিয়েছে। শামসুন নেছা এবং আমের বিন উসমানও দেখেছে তাদের।
একটা পাথর দেখিয়ে আমের বলল, ‘এসো, এখানে বসি।’
শামসুন নেছা তার হাত ধরল। আমের তার কোমর বেষ্টন করে পা বাড়াল পাথরের দিকে।
কোমর বেষ্টন করার কারণে দু’জন একেবারে ঘনিষ্ঠ হয়ে গেলো।
এক কদম সামনে এগিয়েই শামসুন নেছা থেমে গেল। সে তার নাক আমেরের বুকে লাগিয়ে শুকলো এবং সঙ্গে সঙ্গে তাকে ছেড়ে দিয়ে দু’কদম দূরে গিয়ে বললো, ‘সত্যি করে বলতো, তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে? কার কাছে ছিলে?’
‘ডিউটি ভাগ করে একটু পশুগুলোকে দেখে এলাম।’ আমের আবারও মিথ্যা বলল।
‘তোমাদের পশুগুলোও এখন সুগন্ধি মাখতে শুরু করেছে নাকি?’
শামসুন নেছা তার দিকে সন্দেহের চোখে তাকিয়ে চাপা রাগের সাথে বলতে লাগলো, ‘তুমি তো কোনদিন সুগন্ধি ব্যবহার করো না! আর এ সুগন্ধ কোন পুরুষের শরীরের নয়, মেয়ে মানুষের।’
আমের নিরব হয়ে গেল। বুঝতে পারল, এভাবে মিথ্যে বলা ঠিক হয়নি তার। এখন সত্য কথাও শামসুন নেছার কাছে মিথ্যাই মনে হবে। একবার বিশ্বাস হারালে সেই আস্থা ও বিশ্বাস আর ফিরিয়ে আনা যায় না।
শামসুন নেছার কাছে সত্য গোপন করার পরিবর্তে ঘটনা খুলে বলার জন্য সে বললো, ‘বিশ্বাস করো, আমি তোমার কাছে মিথ্যে বলতে চাইনি। কিন্তু ভাবলাম, সব কথা তোমাকে শুনিয়ে লাভ কি? তাই একটি ঘটনা তোমাকে বলা হয়নি।’
‘বুঝতে পারছি, তুমি অই সুন্দরী ডাইনীর পাল্লায় পড়েছিলে। তাহলে তুমিও শেসে অই ডাইনীর ফাঁদে পা দিলে?’
‘না শামছি, বিশ্বাস করো এখনও তেমন কিছু ঘটেনি।’
আমের বললো, ‘আমি আসার পথে সে আমাকে রাস্তায় আটকে দিল। আমি সে কথা তোমাকে জানাতে চাচ্ছিলাম না ঠিকই, কিন্তু এ নিয়ে তোমার সন্দেহ করা উচিত নয়। আমি এত নির্বোধ নই যে তার ফাঁদে পড়বো। স্বীকার করছি, তুমি আমার বুকে যে সুগন্ধির ঘ্রাণ পেয়েছো সে ঘ্রাণ তারই। কিন্তু এতেই যে আমি তার হয়ে গেছি এ কথা মনে করার কোন কারণ নেই।’
‘বাহ! কি চমৎকার কথা! তুমি কোনদিন আমার কাছে মিথ্যে বলবে, ভাবিনি। অথচ এক ডাইনীর শরীরের ঘ্রাণ বুকে নিয়ে বলছো তুমি আমার হওনি। তাহলে সে তোমার বুকের নাগাল পেল কেমন করে?’
আমেরের বুকের ভেতরটা কেঁপে গেল। সে ভয়ের ভাব বুকে নিয়েই বলল, ‘আমি খুবই অস্থির আছি শামছি। আমাকে একটু শান্ত হতে দাও, সব তোমাকে খুলে বলবো। আমি কোন শাসক, আমীর বা সেনাপতি নই; সামান্য চাকরিজীবী মাত্র।
উনুশী আমাকে সহজেই তার প্রতিশোধের টার্গেট বানাতে পারে। আমি যে অবস্থায় তার হাত ফসকে বেরিয়ে এসেছি, তা সে সহজভাবে মেনে নাও নিতে পারে। বিশ্বাস করো, আমার খুব ভয় করছে।’
আমেরের কথার চেয়েও তার কণ্ঠস্বরে প্রভাবিত হয়ে শামসুন নেছা বললো, ‘মনে হচ্ছে আজ সে তোমাকে একটু বেশীই বিরক্ত করেছে?’
‘অনেক বেশী।’ আমের বিন উসমান উত্তর দিল, ‘আজ সে আমার কাছে তার হৃদয় উজাড় করে ঢেলে দিয়েছে। সে এ পর্যন্ত বলেছে, সে গোনাহগার ও বদকার মেয়ে হলেও আমার সাহচর্য পেলে সে ভাল হয়ে যাবে।
কিন্তু আমি তাকে প্রত্যাখান করায় সে আমার ওপর ভীষণ ক্ষেপে গেছে। আমাকে হুমকি দিয়ে বলেছে, সে যেখানে সরকার পাল্টে দেয়ার ক্ষমতা রাখে, ভাইকে দিয়ে খুন করাতে পারে সেখানে আমি এক কীট-পতঙ্গের বেশী কিছু নই।
আমি যখন তাকে ফেলে সেখান থেকে পালিয়ে আসি তখনো সে আমার পিছু পিছু ছুটছিল আর আমাকে ডাকছিল। আমার খুব ভয় করছে শামছি!’
‘শান্ত হও! এত উতলা হলে বিপদ বাড়া ছাড়া কমবে না। সে যখন এত করেই তোমার ভালবাসা চাচ্ছে তখন কিছু ভালবাসা না হয় তাকে দিলেই!’
‘কি বলছো তুমি! সে তার যত ধন রত্ন সব আমার পদতলে রেখে দিয়ে তার বিনিময়ে আমার কাছে পবিত্র ভালবাসা চায়। কিন্তু জীবন গেলেও আমি তোমাকে ধোঁকা দিতে পারবো না, শামছি!’
‘তবে তুমি তাকেই ধোঁকা দাও। ভালবাসার ধোঁকা।’ শামসুন নেছা বললো, ‘তাকে সে ভালবাসা দাও যে ভালবাসা সে চায়। তার বিনিময়ে তুমি তার কাছ থেকে জেনে নাও সেই গোপন তথ্য, যা আমাদের দরকার।
সে তো তার ক্ষমতার কথা তোমাকে বলেই দিয়েছে। এখন সে ক্ষমতা তুমি তোমার স্বার্থে ব্যবহার করার ফন্দি বের করো। তুমি তো আর কোন আনাড়ি ব্যক্তি নও, তুমি এক সতর্ক সৈনিক। ব্যাপারটা কি করে সামাল দিবে ভাল করে চিন্তা করো। তার কাছ থেকে জেনে নাও তাদের ভেতরের খবর। তারপর সে খবর আমাকে জানাও।’
শামসুন নেছার কোথায় দৃষ্টিভঙ্গির নতুন দিগন্ত খুলে গেল আমের বিন উসমানের। বলল, ‘আমি তো এভাবে চিন্তা করিনি!’
‘এবার করো।’
‘আমি তো আরো ভয় পাচ্ছিলাম তুমি আমকে ভুল বুঝে বুঝবে।’
‘আমি তোমার ও আমার ভালবাসাকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে দিয়েছি।’
শামসুন নেছা বললো, ‘মা আমাকে প্রতিদিন যে কথা বলেছেন, সে কথা আমার অন্তরে গেঁথে গেছে। আমার ভালবাসার মৃত্যু নেই। মায়ের আশা সফল করার জন্য সব রকম কোরবানীর জন্য প্রস্তুত হতে হবে আমাদের।
প্রথমে আল্লাহ ও পরে আমার কাছে শপথের কথা স্মরণ রাখবে, তখন আর কোন ভুল হবে না। সে কি জেনে গেছে, তুমি আমার সাথে দেখা করো?’
‘না।’ আমের বললো, ‘আমি এ ব্যাপারে তাকে কিছুই বলিনি।’
‘একটা কাজের কথা শোনো।’ শামসুন নেছা বললো, ‘হলবের থেকে বিদায় নেবার কিছুক্ষণ আগে কায়রো থেকে এক লোক এসেছে। সে জানতে চায়, ইয়াজউদ্দিনের নিয়ত কি আর খৃস্টানদের পরিকল্পনাই বা কি। তাকে সঠিক কোন উত্তর দেয়া সম্ভব হয়নি।
সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী খুব শীঘ্রই কায়রো থেকে অভিযানে বের হবেন। সে লোক বলেছে, সুলতান আইয়ুবী এ জন্য আগেই অভিযান চালাতে বাধ্য হচ্ছেন যে, খৃস্টান বাহিনী মুশের, হলব ও দামেশকের দিকে অগ্রসর হলে কায়রো থেকে সৈন্য সঠিক সময়ে এসে পৌঁছতে পারবে না।
এখানে ভয় হলো, সুলতান আইয়ুবী তার সেনাবাহিনীকে এদিকে পাঠালেন, আর খৃস্টানদের চাল অন্য রকম হলো, তখন তাঁর সেনাবাহিনীকে অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হবে। আমদেরকে অতি সত্বর জানতে হবে, গাদ্দার মুসলিম শাসকদের স্বপ্ন কি আর খৃস্টানদের সংকল্পই বা কি?’
‘আমি শুনেছি, সুলতান আইয়ুবীর গোয়েন্দারা আকাশের খবরও নিতে পারে।’ আমের বিন উসমান বললো, ‘কেন, খৃস্টানদের এলাকায় কি তাঁর কোন গোয়েন্দা নেই?’
‘মা আমাকে যা বললেন, তাতে তিনি এ কথাই বললেন এ, ইসহাক তুর্কী নামে এক যোগ্য ও সুচতুর গোয়েন্দা আছে।’ শামসুন নেছা বললো, ‘সে বৈরুত গিয়েছিল। সঠিক খবর তারই দেয়ার কথা। কিন্তু তার কাছ থেকে কোন সংবাদ এ পর্যন্ত কায়রো পৌঁছেনি। ফলে সুলতান অন্ধকারে পড়ে গেছেন।
দেখো আমের, সৈন্যদের তৎপরতা ও আনাগোনা শুরু হলে সে খবর আর গোপন থাকে না, জানাজানি হয়ে যায়। কিন্তু এখানে তেমন কোন চাঞ্চল্য দেখা যাছহে না। ফলে ধরে নিতে পারো, গোপন পরিকল্পনা ও তথ্য যা আছে তা সবই ইয়াজউদ্দিন ও ইমাদউদ্দিনের মনের খাতায় লেখা। এসব উদ্ধার করা ভেতরের লোকের পক্ষেই সম্ভব। আর এ গোপন সংবাদ তোমাকে উনুশীই দিতে পারে।’
‘কিন্তু সে যে মূল্য চায় সে মূল্য তো আমি তাকে দিতে পারবো না।’ আমের বললো।
তোমাকে এ মূল্য দিতেই হবে।’ শামসুন নেছা বললো, ‘এর জন্য যে কোন মূল্য দিতে আমি প্রস্তুত। আমি আমার ভাইয়ের গোনাহের কাফফারা দিতে চাই। মুসলিম মিল্লাতের সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য আমার অন্তরের ভালবাসা এবং জীবনের সব আশা আকাংখাও কোরবান করতে প্রস্তুত আমি। আমাদেরকে সেইসব শহীদদের ঋণ পরিশোধ করতে হবে, যারা ইসলামের জন্য তাদের যুবতী স্ত্রীদের বিধবা করে গেছে। আমের! আর কিছু চিন্তা করো না। সবকিছু কোরবানী দাও। আমি যা বলছি তাই করো।’
রাত গভীর হয়ে এসেছিল। উনুশীর ব্যাপারে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আর সংকল্প নিয়ে ওরা তাবুর দিকে হাঁটা ধরল।

শেয়ার করুন

Author:

আমি সজীব হোসাইন -এই ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা পাশাপাশি লেখালেখির কাজটাও করি। অনলাইনে প্রযুক্তির বিষয় নিয়ে যা জানি তা মানুষের মাঝে শেয়ার করার ইচ্ছায় এ ব্লগ টি তৈরি করা।