মঙ্গলবার, ৭ নভেম্বর, ২০১৭

18-ভালোবাসার গল্প


মেহরাব জানো? আমার নতুন ক্রাশ পেয়ে গেছি। উফফফ, ছেলেটা এতো ভালো গল্প লিখে তুমি না পড়লে বিশ্বাস করতে পারবানা। আমি তো ছেলেটার লিখার একদম প্রেমে পড়ে গেছি !!
--আরো একটা ক্রাশ? আরো একজন রাইটারের প্রেমে? জানিনা আর কতো হাজার ক্রাশ তোমার লাইফে আসবে। আচ্ছা মিহি... মাঝে মাঝে আমার প্রেমে পড়লে কি খুব ক্ষতি হবে??
মিহি আমার দিকে কিছুটা রহস্য চোখে তাকালো... কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে বললো-
-- তুমি কি আমাকে প্রপোজ করলে মেহরাব?
সেদিন মিহির প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়েই চলে আসছিলাম..!!
.
মিহি... মেয়েটা রাইটারদের এতোটা ভালোবাসে যা লিখে বুঝাতে পারবোনা। সারাদিন এর লিখা গল্প, ওর লিখা গল্প পড়ে দিনটা কাটিয়ে দেয়। মাঝে মাঝে নিজের উপর খুব রাগ লাগতো... কেনো রাইটার হলাম না? কেনো গল্প লিখতে পারিনা? রাইটার হলে হয়তো মিহির ভালোবাসা কিছুটা হলেও পেতাম !!
.
এখনো মনে পড়ে সেই দিনটার কথা। টানা ১টা বছর চেষ্টা করেও যে কথাটা মিহিকে বলতে পারিনি, সেদিন হঠাৎ করেই মিহিকে কথাটা বলে ফেলেছিলাম।
সেদিন একসাথে কলেজের রাস্তায় হাঁটার সময় হুট করে মিহির চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম-
--আমি তোমাকে রাইটারদের মতোন-ই ভালোবাসবো মিহি... সারাজীবন এভাবে আমার সাথে হাঁটবে?
আমাকে অবাক করে দিয়ে মিহি আমার হাতটা ধরে বলছিলো-
--রাইটারদের মতো লাগবেনা... লাগবেনা কোনো গল্প বা উপন্যাসের নায়কদের মতো ভালোবাসতে... নিজের মতো করে একটু ভালোবাসিও আমায়? সারাজীবন এই হাতটা ধরে হাঁটতে চাই !!
সেদিন আমার মনের ভিতর কি'রকম ফিলিংস কাজ করছিলো তা কাউকে বুঝানো সম্ভব না। হয়তো এটাই ছিলো আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহুর্ত...!!
.
সন্ধ্যা ৬টা ৩০মিনিট। প্রতিদিন ৬টা অবধী রোগি দেখে কিছু সময় চেম্বারেই বসে মিহির সাথে কাটানো সময়গুলো চিন্তা করতে থাকি। সত্যি বলতে বাসায় যেতে ইচ্ছা করেনা... কি কারনে বাসায় যাবো? কি করবো বাসায় গিয়ে? কে আছে বাসায়?
.
--আসসালামু আলাইকুম আংকেল !!
চোখটা বন্ধ করে মিহির কথা চিন্তা করছিলাম। পিচ্ছি একটা মেয়ের গলার আওয়াজ শুনে ঘুর কাটলো। দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলাম ৫-৬বছরের পিচ্ছি একটা মেয়ে আমার চেম্বারে সালাম দিয়ে ঢুকছে। মেয়েটাকে দেখার সাথে সাথে আমার বুকটা আরো একবার ধুক করে উঠলো। অনেক বেশিই পরিচিত মনে হলো ওর মুখটা। মেয়েটা এসে আমার সামনের চেয়ারে বসলো। আমি তখনো মেয়েটার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম... আমি দেখলাম মেয়েটা চেয়ারে বসে বসে ওর ডান হাতের নখ কামড়াচ্ছে। কি আজব... কি অদ্ভুত... এভাবে তো মিহি নখ কামড়াতো... কি এই মেয়েটা? কেনো ৯ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া মিহিকে ওর মাঝে দেখতে পাচ্ছি? একটু স্বাভাবিক হয়ে মেয়েটাকে প্রশ্ন করলাম-
--তোমার নাম কি আম্মু? কেনো আসছো এখানে?
মেয়েটা নিজের ডান হাত মুখের কাছে নিয়ে কাশতে কাশতে বললো-
--আমার নাম মেহরিমা। 17-গল্প/প্রেম একটা মুহূর্তে হয়ে,হাজারো মুহূর্তকে সাক্ষী করে রাখে।

আমি অসুস্থ ডাক্তার আংকেল... আমাকে তাড়াতাড়ি সুস্থ করে দিন। আমি সুস্থ না হলে আমার আম্মু আমাকে বন্ধুদের সাথে খেলতে দিবেনা !!
মেহরিমা? মেয়েটার নখ কামড়ানো আর কাশির স্টাইল দেখেই বুঝে গেছিলাম মেয়েটার সাথে নিশ্চই মিহির কোনো সম্পর্ক আছে। কিন্তু যখন মেয়েটা নিজের নাম মেহরিমা বললো, তখন বুঝলাম মেয়েটা আসলে মিহির মেয়ে। মিহিকে একদিন বলছিলাম-
--আমাদের মেয়ে হলে নাম মেহরিমা রাখবো" সুন্দর না নামটা?
মিহি হেসে হেসে বলছিলো-
--অনেক সুন্দর নাম তো... মেহরাব আর মিহির মেয়ে মেহরিমা। অনেক ভালো হবে !!
মেহরিমার দিকে ভালো করে আরেকবার তাকালাম। দেখতে একদম ওর মায়ের মতো মিষ্টি হইছে। কেমন জানি একটা দীর্ঘশ্বাস কাজ করলো মনের ভিতর। মেয়েটা তো আমার হতে পারতো। আংকেল ডাক না শুনে হয়তো আজকে মেহরিমার মুখ থেকে বাবা ডাক শুনতে পেতাম। আফসোস... মানুষের জীবনটা কেনো এমন হয়? কেনো? মনে পড়ে গেলো ৯ বছর আগের সেই রাতের কথা-
.
সেদিন রাত ১১টায় মিহি আমাকে ফোন করে বলছিলো-
--মেহরাব একটা প্রশ্ন করি? মন থেকে উত্তর দিবা?
--হুম !!
-- আমি যদি কখনো তোমার জীবন থেকে হারিয়ে যাই তখন তুমি কি করবে? তুমি কি অন্য একটা মেয়েকে ভালোবাসবে? বিয়ে করে সংসার করবে?
--এসব প্রশ্নের মানে কি মিহি?
--মেহরাব প্লিজ... উত্তর দাও !!
--তোমার জায়গায় অন্য কোনো মেয়েকে কখনো বসাতে পারবনা মিহি। বিয়ে বা সংসার সে'তো অনেক দুরের কথা। এখন কি হইছে বলবে আমাকে?
মিহি কিছুক্ষণ চুপ থাকলো... আমি মেয়েটার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করার আওয়াজ পাচ্ছিলাম। কয়েক মিনিট চুপ থেকে কান্না কান্না কন্ঠে মিহি বললো-
--আজকের পর থেকে আমার সাথে আর কোনোভাবেই যোগাযোগ করার চেষ্টা করোনা মেহরাব !!
--মানে কি মিহি? কি হইছে তোমার? এরকম কথা কেনো বলছো?
--কোনো প্রশ্ন করোনা প্লিজ। শুধু এতোটুকু মনে রেখো আমার ভালোবাসা সত্যি ছিলো। আমি নিরুপায় মেহরাব। আরেকটা রিকুয়েস্ট... আমার জন্য নিজেকে কষ্ট দিওনা। ভালো থেকো... টেক কেয়ার !!
--মিহি শুনো... মিহি... মিহিইই...!!
মিহি ফোনটা কেটে নাম্বারটা অফ করে দিছিলো... সারাটা জীবনের জন্য !!
.
পরেরদিন সকালে মিহিদের বাসায় গিয়ে দেখলাম গেইটে তালা দেওয়া। ব্যাস... তারপর কেটে যায় ৯টা বছর। ভুলতে পারিনি মেয়েটাকে। পরে অবশ্য মিহির বান্ধবী রিতার কাছ থেকে জেনেছিলাম মিহিকে বাধ্য করে ঢাকায় নিয়ে এসে বিয়ে দেওয়া হইছে। মিহিকে ওর বাবা বলেছিলেন "হয়তো আমার বন্ধুর ছেলেকে বিয়ে করবি, না'হয় আমার মরা মুখ দেখবি"... রিতার মুখে কথাটা শুনে মিহিকে ক্ষমা করে দিছিলাম। একটা মেয়ে তখন কি করবে? কি করা উচিত তার? নিজের বাবার মরা মুখ দেখতে কোনো মেয়ে চাইবে? মিহির হয়তো সেদিন কোনো দোষ ছিলোনা। হয়তো দোষটা ছিলো আমার ভাগ্যের... মেনে নিছিলাম ভাগ্যকে। কিন্তু ভাগ্য আবারো ৯বছর পর কেনো এমন করছে আমার সাথে?
.
--ভিতরে আসতে পারি?
অনেক দিন পর... অনেক দিন পর সেই পরিচিত কন্ঠটা শুনতে পেলাম। দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলাম মিহি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ থেকে চশমাটা খুলে বললাম-
--জ্বি !!
মিহি রুমে ঢুকে কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। কিছুটা অবাক হয়ে বললো-
--তুমিইই ডাঃ মেহরাব?
মিহির দিকে না তাকিয়েই বললাম-
--হুম !!
--চিনতে পেরেছো আমাকে?
--হুম !!
--কেমন আছো মেহরাব?
--ভালো !!
আমার এক কথায় উত্তর দেওয়া দেখে মিহি কিছুক্ষন চুপ থাকলো। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো-
--বিয়ে করেছো?
আমি প্রশ্নটা শুনেও না শুনার ভান করলাম। মেহরিমার কাছে জানতে চাইলাম কি কি প্রবলেম হয় তার। মেহরিমাকে ভালোভাবে পরিক্ষা করে বললাম-
--প্রেসক্রিপশন লিখে দিচ্ছি, আশা করি মেহরিমা ভালো হয়ে যাবে !!
-- আমার প্রশ্নের কিন্তু উত্তর পাইনি মেহরাব। বিয়ে করেছো?
--আমি বিয়ে করছি কি'না তা জেনে আপনি কি করবেন? কি লাভ আপনার?
কথাটা বলার সময় মিহির চোখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম ওর চোখটা ভিজে গেছে। মাথাটা নিচু করে চোখটা মুছতে মুছতে মিহি বললো-
--আমি জানি মেহরাব আমার কোনো লাভ নেই। কিন্তু তারপরেও জানতে ইচ্ছা করে, বিয়ে করেছো? সুখে আছো তুমি? তোমার সুখে থাকাটা আমার কাছে অনেক বেশিই জরুরী মেহরাব। বিশ্বাস করো... প্রতিটা রাত ঘুমাতে পারিনা, নিজেকে প্রচন্ড অপরাধী মনে হয় !!
আমি মিহির দিকে তাকালাম। মিহি কান্না করেই যাচ্ছে... আমার উচিত এখন ছোট একটা মিথ্যা কথা বলে মিহিকে শান্ত করা। আমি মুখে মিথ্যা একটা মুচকি হাসি দিয়ে বললাম-
--হুম আমি বিয়ে করেছি। অনেক সুখে আছি। ও আমাকে অনেক টেক কেয়ার করে... আর আমাদের ছোট একটা মেয়েও আছে, একদম মেহরিমার মতো। সবমিলিয়ে আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভালো আছি !!
--সত্যি বিয়ে করেছো? কি নাম রাখছো তোমার মেয়ের?
আমি মিহির প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলাম না। প্রেসক্রিপশনটা মিহির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললাম-
--মেডিসিন গুলো ঠিকমতো মেহরিমাকে খাইয়ে দিও। আর তোমার কাছে শেষ একটা রিকুয়েস্ট করবো, রাখবে?
--শেষ রিকুয়েস্ট? হুম বলো !!
--সিলেটে আমার চাইতেও আরো অনেক বড় বড় ডাক্তার আছে, নেক্সট টাইম প্লিজ আর আমার কাছে আসিওনা। পুরনো কথাগুলো আবার মনে করে কষ্ট পেতে চাইনা।
মিহির চোখটা পানিতে টলমল করছে। অনেক কষ্টে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে মিহি বললো-
--ঠিক আছে... আসি মেহরাব। ভালো থেকো তুমি !!
মিহি চেয়ার থেকে উঠে মেহরিমাকে নিয়ে চলে যায়। আমি ওদের চলে যাওয়ার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। আমি খেয়াল করে দেখলাম আমার বাম চোখ থেকে একফোঁটা পানি টুপ করে গড়িয়ে পড়লো। কেনো এই চোখ থেকে পানি বের হলো? বিয়ে না করেও বিয়ে করেছি মিহিকে মিথ্যা কথাটা বলার জন্য? না'কি সুখে থাকার অভিনয় করলাম এর জন্য? না'কি মিহিকে জীবন থেকে হারিয়ে ফেলার জন্য? না'কি মেহরিমার মতো ফুটফুটে একটা মিষ্টি মেয়ের মুখ থেকে বাবা ডাক শুনার সৌভাগ্য না হওয়ার জন্য? আমি প্রশ্নটার উত্তর জানিনা। আমি শুধু এটা জানি... কিছু মেহরাবের জীবনে সুখ নামক জিনিষটা অধরাই থেকে যায়...!!


শেয়ার করুন

Author:

আমি সজীব হোসাইন -এই ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা পাশাপাশি লেখালেখির কাজটাও করি। অনলাইনে প্রযুক্তির বিষয় নিয়ে যা জানি তা মানুষের মাঝে শেয়ার করার ইচ্ছায় এ ব্লগ টি তৈরি করা।