শুক্রবার, ৩ নভেম্বর, ২০১৭

16-গল্প_ভালবাসার পরিপূর্ণতা


ঘুমের মধ্যে ফোনটা বেজে উঠলো।এদিকে আমার রাগের সাথে বিরক্তি ভাবটাও ফুটে উঠলো।
এত সকালে আবার কে!
এনাইম্মের ফোন।এই ক্লিকবাজ এত সকালে কেন।আমি ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে এনাইম্মে বললো,
-তাড়াতাড়ি সেন্ট্রাল হসপিটাকে চলে আয়।
বলে কি!এমনিতেই ঘুমটা নষ্ট করে দিছে আবার বলে হাসপালে যেতে।আমি বললাম,
-ভাই অনেক ঘুম আসছে।মাফ চাই।বাই।
-আরে মেহেদী এক্সিডেন্ট করছে।
'
এনামুলের কথায় আমি একটু ভয়ই পেলাম।মেহেদী এক্সিডেন্ট করছে।কিছু হয় নি তো।আমি আর কিছু না বলে ফ্রেশ হয়ে তাড়াতাড়ি হাসপালের দিকে রওনা দিলাম।
"
মেহেদী আমার বেশ কাছের বন্ধু।দেখতে খারাপ না তবে ক্লিকবাজ আছে।আর ওর থেকেও বড় ক্লিকবাজ হলো এনামুল।আমি এনাইম্মে বলেই ডাকি।একে অন্যের সাথে ঝগড়া বাধানোই এদের কাজ।
"
হাসপাতালের সামনে যেতেই দেখি এনাইম্মে গেইটে দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখেই টানতে টানতে ভেতরে নিয়ে গেল।আরে এরকম করার কি আছে।পালিয়ে যাচ্ছি না তো।আমাকে চেয়ারে বসিয়ে এনামুল বললো,
-তোর রক্তের গ্রুপ ও পজেটিভ না।
-হুম।কেন?
-মেহেদীকে রক্ত দিতে হবে।
-হুম দেবো।কিন্তু তোর ও তো ও পজেটিভ।তুই দিলেই তো হতো।ও তোর যা শরীরের অবিস্থা তুই যদি এক ব্যাগ দ্যাস তাইলে তোকে বাচাতে আবার চারব্যাগ লাগবে

""
রক্ত দিয়ে বের হতেই আগের কথা গুলা মনে পড়ে গেলো।প্রায় তিন চার মাস আগের কথা। হঠাৎ মেহেদী ফোন দিয়ে বললো,
একজনকে রক্ত দিতে হবে।আমিও রাজি হয়ে গেলাম।
হাসপাতালে গিয়ে দেখি মেহেদীর সাথে এনামুলও আছে।আমি ওদের কাছে যেতেই ওরা আমাকে একটা রুমে নিয়ে গেলো।কত বার যে বললাম আগে রুগীকে দেখি কিন্তু ওরা দেখতেই দিল না।
বললো রুগীর অবস্থা নাকি ভাল না।
'
আমি ভাবলাম হয়তো অবস্থা খুব খারাপ। তাই এক ব্যাগের জায়গায় দুই ব্যাগ রক্ত দিলাম।
রক্ত দিয়ে বের হতেই নার্সকে বললাম,
-এখন তো রুগী দেখা যাবে।
-কিসের রুগী কার রুগী।
-আরে যাকে আমি রক্ত দিলাম।
-রক্ত দিলেন মানে!আপনি তো রক্ত বিক্রি করলেন।
নার্সের কথায় আমি একদম বোকা বনে গেলাম।বলে কি!দিলাম রক্ত বলে বিক্রি।তার মানে কি ওরা আমাকে এনে মিথ্যা বলে রক্ত বলে করে দিল।
"
ওদের যখনি কিছু বলতে যাব তখনি দেখি ওরা আমার দিকে ফলমুল আর বিরিয়ানির প্যাকেট এগিয়ে দিয়ে বললো,
-ভাবছিলাম শুধু ফলমুল দেব কিন্তু দুই ব্যাগ দেওয়াতে বিরিয়ানিও আনলাম।
"
বিরিয়ানির গন্ধে পেট একদম ভরে গেল।সালাদের মাথায় বুদ্ধি আছে।বিরিয়ানির কাছে যে আমি কাবু এটা খুব ভালভাবেই জানতো ওরা।প্রিয় খাবার বলে কথা।
সেদিন বিরিয়ানির জন্যে ওদের আর কিছু বলতে পারিনি।তবে টাকার অর্ধেক ঠিকই নিয়েছিলাম।আর নিজের মনকে নিজেই সান্তনা দিয়েছিলাম যে,
তবুও একটা কিডনি নেয় নাই।রক্তই তো।
""
এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে মেহেদীর কেবিনে এসেছি সেদিকে খেয়ালই নেই।একদম সাদা বিছানায় বেশ ভালভাবেই তো শুয়ে আছে।অবশ্য মাথায় ব্যান্ডেজ করা।
"
ওনার বাড়ির লোক কে?
'
নার্সের কথায় আমরা ওনার দিকে তাকালাম।আমি বললাম,
-হুম আমরা।
-চলুন ম্যাডাম ডেকেছে।
কথাটি বলেই নার্স চলে গেল।এদিকে দেখি মেহেদীর জ্ঞান ফিরেছে।আর ওদিকে এনাইম্মে আমার জন্যে আনা ফলমুল খাওয়ায় ব্যাস্ত।আমি এনামুলকে বললাম,
-তুই যা দেখা করে আয়।আমি একটু বসি এখানে।
-আরে না।তুই যা।এগুলা খেতে হবে তো।
এনাইম্মেকে আমি আর কিছু না বলে রুম থেকে বের হলাম।ওকে কিছু বলে লাভ নাই।
""
তুমি!
'
রুমে ঢুকে ইতিকে দেখে আমি একটি অবাকই হলাম।একটু না বেশ ভালই অবাক হলাম।ও এখানে।আমি কিছু বলতে যাব তার আগেই ইতি বললো,
-তুমি!তুমি এখানে!
আমি কিছু বললাম না।ইতিকে এতদিন পর দেখে কেমন যেন একটা ভাল লাগা কাজ করতেছে।
""
ইতির সাথে আমার ব্রেকআপ হয়েছিল আমার কারনেই।মেয়েটাকে অনেক ভালবাসতাম।ইতিও আমাকে খুব বেশীই ভালবাসতো।
"
আমার সাথে রিলেশনের পর মেয়েটা কেমন যেন পড়ায় মনোযোগ দিতে পারতো না।বলতে গেলে পড়তেই বসতো না।এদিকে ওর ইচ্ছে ডাক্তার হবে।আর কোন এক ইঞ্জিনিয়ার ছেলেকে বিয়ে করবে।
'
আমি থাকলে ইতির স্বপ্ন কোনদিনও পৃরন হবে না।তাই সেদিন আমি ইতিকে ছেড়ে চলে এসেছিলাম।কষ্ট হয়েছিল তবে আজ ইতিকে দেখে আর কষ্ট হচ্ছে না।
ইতি ডাক্তার হলেও আমি ইঞ্জিনিয়ার হতে পারিনি।হয়তো ইতি এখন কোন এক ইঞ্জিনিয়ারকে বিয়েও করে ফেলেছে।
""
তুমি এখানে।
'
ইতির কথায় আমার ধ্যান ভাংলো।আমি কাপা গলায় বললাম,
-আমি রুগীর ফ্রেন্ড।
-ও আচ্ছা।কেমন আছো?
-এইতো।তুমি?
-হুম ভাল।
আমি আর কিছু বললাম না।এখানে আর এক মূহুর্ত বসতে ইচ্ছে করতেছে না।কেমন যেন বুকটা ব্যাথা করছে।
আমি চেয়ার থেকে উঠতেই ইতি বললো,
-বিয়ে করেছো?
ইতির কথায় আমি ওর দিকে তাকালাম।ওর চোখ মুখ কি বলছে এইটা আমি জানি না।আর জানতেও চাই না।আমি বললাম,
-সুযোগ হয়ে ওঠে নি।
-আমাকে জিজ্ঞেস করবে না?
-সেটা দরকার নেই।ভাল থেকো।
কথাটি বলেই আমি চলে আসলাম।ইতির মুখে অন্য কারও নাম শুনতে পারবো না।হয়তো বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে সুখেই আছে।
""
ইতিকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল।কিন্তু সেটা আমি নিজেই শেষ করে দিয়েছি।
"
কলিংবেলের আওয়াজে ঘুমটা ভেঙে গেলো।আমি ফোনটা হাতে নিয়ে দেখি মেহেদী প্রায় অনেকবার ফোন দিছে।সাথে আননোন নাম্বার ও ছিল।ঘুমের কারনে বুঝতে পারি নাই।এখন হয়তো ফোনে না পেয়ে বেল বাজাচ্ছে।
"
সেদিনের পর আর কারও সাথে যোগাযোগ করিনি।ফোন বন্ধ রেখে একটু শান্তির খোজে অনেক দূর চলে গিয়েছিলাম।কিন্তু শান্তি আর খুজে পাইনি।শুনেছিলাম মেহেদী এখন পুরোপুরি সুস্থ।
"
ভালবাসি।
'
দরজা খুলে ইতিকে দেখে বেশ ভালই অবাক হলাম।ও এখানে।ঠিকানা পেলো কোথায়!মনে হয় এটা মেহেদীর কাজ।আমি কিছু বলতে যাব তার আগেই ইতি ভেতরে চলে গেলো।সাথে ইয়া বড় একটা ব্যাগ।
আমি দরজা আটকিয়ে ইতির সামনে এসে বললাম,
-কি চাও?
-তোমাকে।
-মানে।
-ভালবাসি।
ইতির কথায় আমি কিছু বললাম না।আমি যে ওকে ভালবাসিনা তা না।কিন্তু এটা এখন আর সম্ভব না।ও ওর স্বামী সন্তান রেখে আমার কাছে আসতে পারে না।
আমি ইতিকে বললাম,
-এটা সম্ভব না।
-কেন?
-তুমি তোমার স্বামীর কাছে ফিরে যাও।
ইতি আমার কথায় কি বুঝলো জানি না কিন্তু এভাবে হাসার মানে বুঝলাম না।আমি কি হাসির কথা বলছি নাকি।ইতি হাসি থামিয়ে বললো,
-বুদ্ধু,আমি এতদিন তোমার অপেক্ষায় ই ছিলাম।
ইতি এবার আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
-আমি আর তোমাকে হারাতে চাই না।আমি সবকিছু নিয়ে তোমার কাছে চলে এসেছি।
-তাহলে তো এবার আমার চাকরিটা ছাড়তেই হচ্ছে।
-কেন?
-ঘরে ডাক্তার বউ থাকতে আমার চাকরীর কি দরকার।
-হুম তাই তো।তোমার কিছুই করতে হবে না।তুমি শুধু আমাকে ভালবাসবা।শুধু আমাকেই ভালবাসবা।
আমি কিছু না বলে ইতিকে শক্ত করেই জড়িয়ে ধরলাম।আজ অনেক দিন পর কেমন যেন শান্তির আভাস পেলাম।শান্তির আভাস।

শেয়ার করুন

Author:

আমি সজীব হোসাইন -এই ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা পাশাপাশি লেখালেখির কাজটাও করি। অনলাইনে প্রযুক্তির বিষয় নিয়ে যা জানি তা মানুষের মাঝে শেয়ার করার ইচ্ছায় এ ব্লগ টি তৈরি করা।