#পর্ব_৩৭ [সমাপ্তি পর্ব]
#লেখিকা_আমিশা_নূর
**********+++++++++++
সময় যেমন কারো জন্য থেমে থাকে না তেমনি প্রকৃতিও যেনো নিজের গতিতে পরিবর্তন হয়।দেখতে দেখতে তিন'টা বছর পার হয়ে যায়।পূর্ব তার পড়ালেখা কানাডা'য় সমাপ্ত করে আজ নিজ দেশের মাটিতে পা রাখবে।তার বাড়ি'তে গমগম একটা ভাব লেগেই আছে।আজ সকাল থেকে রোদ কোন শাড়ি পড়বে তা নিয়ে বেশ চিন্তিত।কার্বাডের সব শাড়ি সে বিছানায় রাখলো।রোদ ভিষণ ভাবে কনফিউজড কোন শাড়ি পড়বে?
ভাবান্তর হয়ে থুতনিতে হাতের আঙ্গুল লাগিয়ে কিছুক্ষণ ভাবলো কী করা যায়?তখন তার পরণে থাকা শাড়ি'র আচলে টান পড়লো।রোদ পেছন ফিরে দেখলো তার দু বছরের "নক্ষত্র" কাঁদো কাঁদো চেহেরায় ঠোঁট উল্টিয়ে আছে।এখন সে গুটিগুটি পায়ে হাটতে পারে।নিজের মেয়ে'কে দেখে রোদ আহ্লাদ করে বললো,"আমার মেয়ের কী হয়েছে?কে বকেছে মা?"
নিজের মায়ের আহ্লাদ দেখে নক্ষত্র তার কান্না শুরু করে দিলো।বাচ্চাদের সাথে কেউ আহ্লাদ করে কথা বললে তাদের কান্নার বেগ যথেষ্ট বেড়ে যায়।রোদ "ও ও" বলে নিজের সন্তান'কে বুকে জড়িয়ে নিলো।এই সন্তান আসার পর থেকে রোদের আর একা অনুভব হতো না।নক্ষত্র দেখতে হুবহু পূর্বের মতো হয়েছে।বাড়ির বড়'রা এটাই বলে।
যেদিন পূর্ব'কে সন্তানের কথা জানানো হয় পূর্ব তখন টানা দু'মিনিট চুপ ছিলো।রোদ বেশ ভয় পেয়েছিলো।না জানি কথা বলা না অফ করে দে।কিন্তু ঠিক হলোও তাই রোদের সাথে এক সপ্তাহ কথা বলেনি।তবুও রোদের খোঁজ খবর,তার মেয়ের খবর সবটা পূর্ব তার অন্য আপনজনদের থেকে নিতো। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে পূর্ব নিজের রাগ'কে কমিয়ে রেখে সব ঠিক করে নেয়।তবে রোদের উপর তার ভিষণ ক্রোধ!সন্তান জন্মানোর সময় একটি বারের জন্যও পাশে থাকতে দিলো না।যদি পূর্ব জানতো সে বাবা হবে তাহলে কানাডা থেকে চলে আসতো।তার বাচ্চা পৃথিবীর আলো দেখেছে জানার পর পরই আসতে চেয়েছিলো।কিন্তু বাড়ির সবাই বকেছে বলে একেবারে তিনবছর কর আসতে হয়।
"ফুলা মেলেছে মা..." নক্ষত্রের কান্নার বেগ বেড়ে গেলো।কান্নার শব্দে রোদ ভাবনার জগত থেকে বেরিয়ে এলো।নক্ষত্র স্পষ্টভাষী এখনো নয়।আলতো আলতো করে কথা বলে।সবাই তার কথা না বুঝলেও রোদ সবটা বুঝে।তাই তো নক্ষত্র তার মা ছাড়া কিছু বুঝে না।এখানে নক্ষত্র 'ফুলা' বলে রাফিয়া'কে সম্মোধন করছে।ফুলা বলে ডাকার জন্য রাফিয়া শিখিয়ে দিয়েছে।রাফিয়া'র কথা অনুযায়ী সে পূর্বের বোন হলে ডাকতো 'ফুফি' আর রোদের দিক থেকে 'খালা'।তাই দু'টো মিলিয়ে ডাকে 'ফুলা'।
রাফিয়া নক্ষত্র'কে মারায় রোদ বেশ রেগে গেলো।আজ রাফিয়া প্রথম মেরেছে তা না মাঝেমধ্যে নক্ষত্র'কে একা পেলেই মারে।তবে আজ তার একটা হস্তক্ষেপ করবেই।
রোদ তার মেয়ে'কে কোলে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলো।নিচ তলায় গিয়ে দেখলো আলো,রাফিয়া আর তিহান আড্ডা দিচ্ছে।রান্নাঘর থেকে টুংটাং আওয়াজ আসছে।চাঁদনি মোহাম্মদ আর ছায়া আহমেদ তাদের ছেলের জন্য রান্না করছে।
রোদ গিয়ে তাদের সামনে দাঁড়ালো।ওমনি সুরসুর করে রোদের কোল থেকে নক্ষত্র নেমে তিন জনের মাঝখানে বসে গেলো।নক্ষত্রের চোখে জল নেই।রোদ রাগি ভাব নিয়ে রাফিয়া'কে বললো,"তুই আমার মেয়ে'কে মারলি ক্যান?"
রোদের কথা শুনে রাফিয়া দাঁত কেলিয়ে হাসলো।এতে রোদ আরো রেগে আলতো করে চড় দিলো।অমনি নক্ষত্র ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে দিলো।নক্ষত্রের সামনে কাউকে বকলে বা মারলে সবসময় কেঁদে দেয়।রোদ শাসানোর স্বরে রাফিয়া'কে বললো,
"দেখছিস?তোকে মারছি দেখে নক্ষত্র কাদে।তুই শুধু শুধু মারিস ক্যান?"
"কই মারি শুধু শুধু?তুই স্কুলে থাকার সময় আমাকে যে মারতি তা তোর মেয়ে'কে মেরে উসুল করি।কিন্তু এখন তোর মেয়ে আমার কী হাল করছে দেখ..."
রাফিয়া নিজের কাঁধা দেখালো যেখানে ছোট ছোট দাঁতে ছাপ স্পষ্ট!রোদ নক্ষত্রের দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করলো।নক্ষত্র আলোর পেছনে মুখ লুকালো।রাফিয়া আর নক্ষত্র দুজনে কারো থেকে কেউ কম না।নক্ষত্র আজ অবধি রাফিয়া ছাড়া কাউকে কামড় দেইনি।তাই রাফিয়াও যা ইচ্ছে করে।
রোদের দৃষ্টি তিহানের দিকে গেলো।সে চুপচাপ ফোন টিপছে।এই তিনবছরে তিহানের মাঝে অনেক পরিবর্তন এসেছে।আগের মতো এলোমেলো না।গুছানো স্বভাবের আছে।আর একটু মোটাও হয়েছে।রোদ তিহান'কে উদ্দেশ্য করে বললো,"নাবিলাপু'র সাথে কথা হয়েছে ভাইয়া?"
রোদের কন্ঠস্বর পেয়ে তিহান মোবাইলেড স্কিন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রোদের দিকে তাকালো।যতবারই রোদের সাথে তার দেখা হয়েছে প্রতিবার রোদ একটা প্রশ্নই করে।আর উত্তর টাও তিহানের মুখস্থ।সে নির্দ্বিধায় বললো,
"হুম হয়েছে।"
"কেমন আছে আপু?"
"ভালো আছে।"
"ওহ।"
রোদ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো।নাবিলা আমেরিকা গিয়েছিলো তিনবছর আগেই।আমেরিকা যাওয়ার পর থেকে নাবিলা আর বাংলাদেশে আসেনি।রোদ ফোন করে যখন কান্নাকাটি করতো তখন নাবিলা কল কেটে দিতো।নাবিলা থেকেও কঠিন হয়ে গেছে।কেউ যদি তাকে বাংলাদেশ আসার কথা বলে তাহলে তখনি কল কেটে দে শুধু তার মা ছাড়া।নাবিলা'র এমন ব্যাবহারে রোদ আর নাবিলাকে কল দে না।প্রথম কয়েকদিন নাবিলা করতো কিন্তু রোদ রিসিভ করতো না।তারপর একসময় নাবিলাও আর কল করে না।তখন রোদ-নাবিলা'র মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়।তবে নাবিলা বাড়ির বাকি সদস্যের সাথে ঠিকই কথা বলে।
হঠাৎ তিহান উচ্চস্বরে বলে উঠলো,"ইন্না-লিল্লাহ!এখন তো বারোটা বাজতে চললো।ভাবি তুমি যাবে এয়ারপোর্টে?"
"এয়ারপোর্ট?নাহ।রাফিয়া আর তুমি যাও।"
"ইন্না-লিল্লাহ।কেনো ভাবি?"
"নক্ষত্র আর আমি থাকি।তোমরা যাও।"
রোদের কথার বিপরীতে তিহান আর কথা বললো না।রাফিয়া-তিহান এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্য বেরিয়ে গেলো।রোদ নক্ষত্র'কে আলোর কাছে রেখে আবারো রুমে গেলো।শাড়ি পরার উদ্দেশ্য....
পাক্কা আধ ঘন্টা সময় নিয়ে রোদ শাড়ি ঠিক করে রাখলো।সিলেক্ট করা শাড়ি'টা বিছানায় রেখে রোদ রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো।গিয়ে দেখলো চাঁদনি মোহাম্মদ চুলায় থাকা চিংড়ি বোনা নেড়ে দিচ্ছে আর সাথে ছায়া মোহাম্মদ কথা বলছে।তাদের দৃষ্টি রোদের উপর পড়তেই জিজ্ঞেস করলো,
"তুই এখানে কী করিস?বাকিরা কই?নক্ষত্র কই?"
"আলোর কাছে নক্ষত্র।তিহান ভাইয়া আর রাফিয়া এয়ারপোর্টে গেলো।"
"তুই যাসনি?"
"নাহ।কী করছো তোমরা?"
রোদের প্রশ্নে চাঁদনি মোহাম্মদ উত্তর দিলেন,"রাঁধছি।"
"কতো করে বললাম আমি রান্না করি।"
"তুই নক্ষত্র'কে সামলা।"
"বাবা কোথায়?"
"বাইরে গেছে।"
"ওহ।"
রোদের কানে ভেসে আসলো নক্ষত্রের কান্নার আওয়াজ।রোদ জানে নক্ষত্রের খুদা লেগেছে এখন।তাই প্লেটে করে ভাত নিয়ে গেলো।
।
।
রোদের আজ অনুভূতি'টা অন্যরকম।কতো বছর পর দেখবে পূর্ব'কে!রোদের মনে হয়েছিলো এক-একটা দিন যেনো কারো দেওয়া অভিশাপ!কিন্তু নক্ষত্রের দিকে তাকালে সব কষ্ট ভূলে যেতো।রোদের ভাবতেই খুশি লাগছে পূর্ব আসলে তার ছোট্ট কুঁড়ে ঘরের অপূর্ণতা পূর্ণ হবে।আচ্ছা,পূর্বের রিয়াকশন কেমন হবে তাকে দেখে?
রুমে থাকা কাঁচের আয়না'র দিকে তাকিয়ে রোদ তার চোখে কাজল পরে নিলো।ঠোঁটে শুধু হালকা লিপস্টিক দিলো।আর গায়ে পরলো নীল-কালো কাতান শাড়ী।সাজা সম্পূর্ণ হলে রোদ আয়নায় তাকিয়ে নিজেকে বললো,"বাহ পূর্বে শঙ্খপুষ্পি!তোকে দারুণ লাগছে।"
রোদ 'শঙ্খপুষ্পি' র মানে জানে।কেরালায় নীলকন্ঠ ফুল'কে শঙ্খপুষ্পি বলে ডাকে।তার পূর্ব তাকে সেদিন নীল শাড়ি পরায় 'শঙ্খপুষ্পি' নাম দে।
রোদের কানে ভেসে আসলো গাড়ির হর্ণ।হয়তো তারা এসে গেছে।রোদ দ্রুত গতিতে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে নিজেকে বললো,"রোদ রিলাক্স!উত্তেজনা দেখাস না।"
রোদের আর সামনে এগোতে হলো না।পূর্ব'কে সাথে করে রাফিয়া আর তিহান ভিতরে প্রবেশ করলো।পূর্ব'কে দেখে রোদ থমকে গেলো।ভিতরে চলতে থাকা স্পন্দনের গতি বেড়ে গেলো।আগে থেকে পূর্বকে অনেকটা ভদ্র দেখাচ্ছে।গালে থাকা সুন্দরময় দাঁড়ি।রোদ যেনো অন্য এক পূর্বের দেখা পেলো।কিন্তু পূর্বের সেই ঘায়েল করা চাহনি এখনো একই রকম।রোদের চোখ জলে ভর্তি হয়ে এলো।ধীরে পায়ে সে বাকি সিঁড়ি পার করলো।পূর্ব এখন তার কাছে।তার সামনে!যাকে ধরা যাবে,ছোঁয়া নেওয়া যাবে,মনভরে তাকিয়ে তাকা যাবে।
রোদ শুধু চেয়ে আছে তার হরিচন্দনের দিকে।পূর্ব আলতো করে তার হাত রোদের গালে ছোঁয়ালো।অমনি রোদ পূর্ব'কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিলো।পূর্ব রোদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো।রোদকে সে নিজের থেকে আর কোনোদিনও আলাদা করবে না।কোনোদিনও না।
"এহেম এহেম।"
রাফিয়া'র গলা ঝাঁকানো শুনে ওরা একে অপরকে ছেড়ে দিলো।পূর্ব শীতল কন্ঠে রোদকে জিজ্ঞেস করলো,"নক্ষত্র কোথায়?"
শীতল কন্ঠ!তিন বছর পর।পাক্কা তিন বছর পর এই কন্ঠস্বর কাছ থেকে শুনে।রোদ আগের মতো চাহনিতেই তাকিয়ে রইলো।তখন রাফিয়া বললো,"ভাই পূর্ব,রোদ এখন অন্যজগতে আছে।"
রাফিয়া'র কথায় রোদ বেশ বিরক্ত হলো।কথার মাঝখানে শুধুই বিরক্ত করে।রোদ পূর্বের উদ্দেশ্যে বললো,"নক্ষত্র ঘুমিয়েছে কিছুক্ষণ আগে।"
পূর্ব বাড়ির সবার সাথে হালকা কথা বলে নিজের রুমে চলে এলো।চৌকাঠে পা রেখে ভিতরে দৃষ্টি ফেললো।বিছানায় চারপাশে কৃত্রিম পুতুলের মধ্যে প্রকৃত পুতুল ঘুমিয়ে আছে।পুতুলটা তার মেয়ে!নিজের মেয়ে!পূর্বের আফসোস হয় খু-ব।নক্ষত্রের জন্মের সময় সে রোদের পাশে ছিলো না।
পূর্ব রুমে হালকা পা টিপে টিপে ভিতরে ঢুকে নক্ষত্র থেকে কয়েক ফুট দূরত্বে গিয়ে বিছানায় বসলো।ভিডিও কলো যখন তার মেয়ে'কে দেখতো তখন ইচ্ছে হতো একটু ছুঁয়ে দেখি।পূর্বের ইচ্ছে আজ পূরণ করে নিলো।ঘুমন্ত নক্ষত্রের কপালে চুমু দিলো।পূর্ব পিতৃত্ব অনুভব করছে।প্রত্যেকটা সম্পর্কের অনুভূতি মনে হয় আলাদাই হয়।
পূর্ব ফ্রেশ হয়ে নিচে গিয়ে দেখে সবার দৃষ্টি দরজার দিকে।সবার দৃষ্টি অনুসরণ করে পূর্ব দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলো নাবিলা সুটকেস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।মুখে গম্ভীর একটা ভাব!পূর্ব তাকে দেখে এগিয়ে এলো।নাবিলা'কে উদ্দেশ্য করে বললো,
"কখন এলি?আন্টি আর মেঘ কই?"
"আসছে।এখন এলাম।"
"ভিতরে আয়।"
নাবিলা ভিতরে ঢুকতেই তিহান তার কাছে এসে বললো,"ইন্না-লিল্লাহ মোটি,তুই চিকনা হয়ে গেছিস।"
তিহানের কথা শুনে নাবিলা রেগে বললো,"কবে মোটি ছিলাম আমি?তুই মোটা হয়েছিস।"
নাবিলা পূর্বের মা,রোদের মা সবার সাথেই কথা বলে নিলো।রোদের সাথে কথা বলতে চাইলে রোদ মুখ ঘুরিয়ে নে।এতে নাবিলা অবাক হয় না।সে আগে থেকে জানতো এমন কিছু একটা হবে।নাবিলা দুহাতে রোদকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো,"সরি বোন!কিন্তু আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করতে পারিনি।"
নাবিলার কথা রোদ অভিমানি কন্ঠে বললো,"এখন কেনো এসেছো?চলে যাও।"
"বাংলাদেশে এসেছি দু'দিন আগে।মেঘের বিয়ে উপলক্ষে।"
"মেঘের বিয়ে?"
"হ্যাঁ।কেনো তুমি জানো না?সবাই তো জানে।"
"আমাকে কেউ বিন্দুমাত্রও জানায়নি।"
রোদ সবার দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকালো।তখন পূর্ব বলে উঠলো,"আমি বলেছিলাম তোমাকে না বলতে।নাবিলা এসে সারপ্রাইজ দিবে তাই।"
রোদ কিছু বলার আগে বাড়ির ভিতর মেঘ আর নিনা হাসান প্রবেশ করলো।রোদের সাথে মেঘের দেখা হয়েছিলো নক্ষত্রের জন্মের পরে।নিনা হাসান যখন রোদকে দেখতে আসে তখন মেঘও সাথে করে এসেছিলো।কিন্তু মেঘ রোদের সাথে কোনোরকম কথা বলেনি আর রোদও তার কথা শুনার অপেক্ষা করেনি।
নিলয়ের মৃত্যুর কথা সবাই জানে।তাই নাবিলা'র আমেরিকা চলে যাওয়াতে সবাই ওর অবস্থা বুঝতে পারে।কিন্তু রোদের অভিমান ছিলো যা নাবিলা'কে কাছে পেয়ে এখন আর বিরাজ করছে না।নিনা হাসান জানিয়ে দিলেন সামনের ৩০তারিখ মেঘের বিয়ে।মেঘের বিয়ে শুনে রোদ খুব খুশি হয়েছে।এতোদিন যে সামান্য অপরাধবোধ ছিলো তা আর নেই।
।
।
"কী দেখছো শঙ্খপুষ্পি?"
"চাঁদ!"
"কী দেখো চাঁদে?"
"সুখ!"
"কী সুখ?"
"আমাদের চারপাশ কেমন দেখছো?শুধু অপেক্ষা!টানা তিন বছর পার করার পর আমাদের কপালে সুখ লিখনটা ভেসে উঠেছে।"
"সুখটাকে হারিয়ে যেতে দিলে বারবার লুকোচুরি খেলে।জানো তো?"
রোদ স্নিগ্ধ ভাবে পূর্বের দিকে তাকালো।চাঁদের আলো'তে বারান্দা জলমলে হয়েছে।চাদের আলো পূর্বের সারা শরীরে পড়ছে।রোদের হিংসে হয় প্রকৃতি'র উপর।তারা কতো সুন্দর করে পূর্বের সারা শরীরে মিশে যেতে পারে অথচ রোদ পারে না।
এসব আবোল-তাবোল চিন্তা ভাবনা করছিলো রোদ।পূর্ব তার সামনে তুড়ি বাজিয়ে বললো,"ভাবো কী?"
"নাবিলা আপু কী আবার আমেরিকা চলে যাবে?"
"ওর যাওয়ার ইচ্ছে ছিলো।"
"কেনো?"
"নিলয়ের স্মৃতি দিন দিন ও কে নিখুঁত ভাবে কষ্ট দিচ্ছে।ও সেটা নিতে পারছে না।সবার আড়ালে কাঁদে।এখন ওর রুমে গিয়ে দেখো ও কাঁদবে।একটা রাতও ভালে করে কাটেনি ওর।"
"কিছু ভালোবাসা এমন কেনো হয়?"
"ভালোবাসায় সুখ,দুঃখ,অভিমান,রাগ সব আছে।সময়ের গতিতে ঘুরে ঘুরে সব দেখা দে।এক না একসময় যেকোনো একটা স্থায়ী হয়।যেমন আমার-তোমার সুখ,নাবিলা'র দুঃখ।"
"আগের নাবিলা আপু'কে মিস করি খু-ব।"
"আন্টি নাবিলাকে যেতে দিবে না।একবার মেঘের বিয়ে হোক নাবিলা'র বিয়ের ব্যবস্থা করবো।"
"আচ্ছা,মেঘের বিয়ে কীভাবে ঠিক হলো?আর তুমি সব জানতে?"
"আমাকে আন্টি আর নাবিলা বলেছে।মিহু নামের একটা মেয়ের সাথে বিয়ে হচ্ছে।সম্পর্কে ওর ফুফির মেয়ে হয়।"
"ওহ।"
রুম থেকে নক্ষত্রের কান্নার আওয়াজ ভেসে আসলো।পূর্ব তাড়াতাড়ি গিয়ে নক্ষত্র'কে নিয়ে আসলো।কিন্তু নক্ষত্র হাত টেনে তার মায়ের কাছে চলে গেলো।পূর্ব বিড়বিড় করে বললো,
"শুধু মা'কে চিনোস।আমাকে চিনোস না?আমি তাের বাপ।"
পূর্বের কথা শুনে রোদ দাঁত কেলিয়ে হেসে দিলো।নক্ষত্র তার মায়ের হাসি দেখে নিজেও হেসে উঠলো।তখন পূর্ব অবাক হয়ে বললো,"মা হাসলে বাচ্চাও হাসে?"
"পূর্ব কী শুরু করেছো?ঘুমাতে দাও ও কে।"
রোদ তার মেয়ে'কে কাঁদে নিয়ে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করলো।রোদের চেহেরায় এখন মা স্বাভাবের ভাব!এরকম ভাবটা রোদকে খু-ব বেশি মানিয়েছে।পূর্ব এক ধ্যানে পূর্বের দিকে তাকিয়ে রইলো।এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে রোদ বললো,
"কী দেখছো?"
"তোমাকে শঙ্খপুষ্পি।"
"আজ নতুন দেখছো নাকি আমাকে?"
"উহু।"
পূর্ব ঘোর লাগা কন্ঠে কথাটি বলে রোদের চুল বেঁধে রাখা রাবারটা খুলে দিলো।সাথে সাথে রোদের ঢেউখেলানো চুল ছড়িয়ে পড়লো সারা পিঠময়।রোদ কিছু একটা বলতে গেলে পূর্ব তার ঠোঁট জোড়ায় আঙ্গুল দিয়ে কপালে চুমু দিলো।তাদের মেয়ে নক্ষত্র তখনো রোদের কাঁধে ঘুমিয়েছিলো।কী সুন্দর দৃশ্য!
চাঁদের গম্ভীর আলো ছড়িয়ে পড়েছিলো তাদের বন্ধনের উপর।আজ তারা খুশি!পূর্ব-রোদ খুশি!
[সমাপ্ত]
পূর্ব-রোদ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
পূর্ব-রোদ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সোমবার, ১৪ জুন, ২০২১
পূর্ব-রোদ🌿(পর্ব-৩৬)
✔
md sojib
#পর্ব_৩৬
#লেখিকা_আমিশা_নূর
<<<<<<<<<<™®©>>>>>>>>>>>><
মেঘের কোনো উত্তর না পেয়ে করুণ কন্ঠে নাবিলা আবার জিজ্ঞেস করলো,"ভাই,নিলয়ের সাথে তোর ইন্ডিয়ায় মিট হয়নি?"
প্রতিত্তোরে এবারেও মেঘ চুপ করে রইলো।মূলত মেঘের অবস্থা এখন এমন যে কথা বললেই চোখ থেকে জল পড়বে।মেঘ জানালার চারপাশে তাকালো।নাবিলা মেঘের আচরণে অবাক থেকে যেমন অবাক হচ্ছে তেমনি ভয়ও পাচ্ছে।নিলয়ের কথা বলায় মেঘ চুপ কেনো হয়ে গেলো?
নাবিলা হার মেনে নেবার পাত্রী না।চর্তুথ বারের মতো নিলয়ের প্রসঙ্গে আবার প্রশ্ন করলো।নাবিলা মেঘের সামনা-সামনি দাঁড়িয়ে বললো,"তুই আমার কথা পাত্তা দিচ্ছিস না কেনো?মেঘ আমি কিছু বলছি।নিলয়..."
"হি ইজ নো মোর!"
চার অক্ষরের বাক্যটা বুঝতে নাবিলা'র সামান্য বেগ পেতে হলো।"হি ইজ নো মোর!"এই বাক্য ধারা মেঘ কী বুঝাচ্ছে তা আড়ষ্ট হয়ে নাবিলা জিজ্ঞেস করলো,
"মা..মানে?" তখনি ঝড়ের গতিতে মেঘ এসে নাবিলা'কে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে দিলো।নাবিলা'র আর বুঝতে বাকি রইলো না একথা সঠিক অর্থ কী!নাবিলা বুকটা দুমড়ে-মুষড়ে উঠলো।ভিতরের কিছু একটা ছিড়ে ফেলার মতো ব্যাথা অনুভব হচ্ছে।মনে হচ্ছে সে এ জগতে নেই।যেনো শূন্যে ভাসছে আর তার সামনে নিলয় নামের মানুষটি!নিলয়!এ মানুষটা নাবিলা'র জীবনটা কেমন করে দিলো?কোন স্রোতের দিকে চলছে সে?
।
।
"জানো তো পূর্ব আমাদের সম্পর্কটা পরিপূর্ণ হওয়ার পরও আমার কেনো জানি মনে হয় কোনোকিছু কমতি কমতি।"
"কমতি,কমতি?আমম..তুমি কী ইনডাইরেক্টলি বেবি'র কথা বলছো রোদ?"
কথাটা বলে ওপাশে পূর্ব হু হু করে হেঁসে উঠলো।কিন্তু রোদের কাছে বিষয়টা মোটেও রসিকতা মনে হলো না।সে সিরিয়াস!সব ঠিক থাকলে বেবি তো আসবে।রোদ নিজেকে প্রশ্ন করলো তার কমতি কমতি কেনো মনে হয়?পূর্ব নেই বলে?নাকি পূর্ব'কে বেবির কথা বলা হয়নি দেখে?
রোদ নিজের দেহে থাকা ছোট্ট প্রাণ'টা দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো।এ'কে নিয়ে কতো হাজারো স্বপ্ন বুনে রেখেছে রোদ!পূর্ব'কে বাবা হওয়ার খবরটা জানাতে রোদের বেশ ইচ্ছে করে।কিন্তু রোদ চাই না পূর্বের স্বপ্ন থেমে যাক।তাই রোদ ঠিক করে রেখেছে বাচ্চা হওয়ার পরই পূর্বকে জানানো হবে।নয়তো অনেকটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে।
"ও হ্যালো রোদ?রোদ?"
"হু হু।"
"কোন রাজ্যে হারিয়ে গেলে?"
"আমাদের রাজ্যে!"
রোদের আবেগ ছোঁয়া বাক্য শুনে পূর্বের মুখের হাসি নামক বাকা রেখা ফুটে উঠলো।আজকাল রোদ বড্ড বাচ্চামো করে।অনেকটা কিশোরী'র মতো!যেন মনে প্রেম নায়ক রঙটা প্রথম কেউ ছোঁয়ালো।অবশ্য প্রথম ছোঁয়া'টা পূর্ব ছোঁয়ে দিয়েছে।সদ্য প্রেমে পড়া কিশোরী যেমন তার প্রেমিকের জন্য শত আবদার,আকাঙ্খা,অভিমান পুষে রাখে রোদও ঠিক তেমন!রোদের ব্যবহারে পূর্বেরও মাঝেমধ্যে মনে হয় সেও আবেগ নামক অনুভূতি'র শহরের বাসিন্দা!অবশ্য প্রতিটা মানুষ অনুভূতি নামক শহরের বাসিন্দা।
"পূর্ব,আমাদের যদি বেবি হয় তাহলে কী নাম রাখবো?"
রোদের কথা শেষ না হতেই পূর্ব ফটাফট উত্তর দিলো,"নক্ষত্র!"
পূর্বের এতো জলদি উত্তরে রোদ অনেকটা ভ্যাচকা খেলো।সে নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,"নক্ষত্র?এটা কেনো?"
"নক্ষত্র কেমন জানো তো?নক্ষত্রের নিজস্ব সম্পত্তি থাকে।নিজে ত্যাগি হয়।আর সবমিলিয়ে আমাদের সবার নামের সাথে মিলে।"
"মানে ছেলে হোক কিংবা মেয়ে প্রথম সন্তানের নাম 'নক্ষত্র' হবে?"
"হুম।বাট তুমি এসব কেনো তুলছো?"
"জানতে ইচ্ছে হলো।"
দুজনে এভাবেই কথা চালিয়ে গেলো।কথা বলার এক পর্যায়ে রোদ ঘুমিয়ে পড়বে।তখন পূর্ব মুচকি হেসে কল কেটে দিবে।এটা তাদের দৈনন্দিনের রুটিন!কথা বলতে বলতে রোদ ঘুমিয়ে পড়বে।পূর্ব পুরাতন স্মৃতি'র অধ্যায়'টা খুলে বসবে!
।
।
"মা আমি আমেরিকা চলে যাচ্ছি।"
"কী?নীরা কী বলছিসটা কী?"
"মা..তুমি এতো হাই লেভেলের কোনো হয়ে যাও বলোতো?"
"হাই লেভেলের হবো না?কী আবোল তাবোল বকছিস?"
"তুমি শান্ত হয়ে বসো।আমি সব বলছি।"
নাবিলা কথায় বিচলিত হয়ে নিনা হাসান সোফায় বসলেন।তিনি অস্থির হয়ে কিছু একটা জিজ্ঞেস করার জন্য ঠোঁট জোড়া নাড়তেই নাবিলা তার মুখের সামনে পাঁচ আঙ্গুলের বাম হাতটা রেখে বললো,"আমি যা বলছি চুপটি করে শুনো।"
নিনা হাসান সম্মতিসূচক দৃষ্টি জানার দিলেন।নাবিলা খানিক সময় নিরব থেকে বললেন,"বাবা'র থেকে দূরে আছি অনেক দিন।তোমাকে পেয়ে যে বাবা'কে একেবারে ভূলে যাবো তা কিন্তু নয় মা।গত রাতে ফাহিয়া মানে বাবার দ্বিতীয় পক্ষের মেয়ে ফোন করে কান্নাকাটি করছিলো।বাড়িতে নাকি ছোটমা প্রবলেমে আছে বললো।আমাকে বললো আমি যেনো জলদি আমেরিকা চলে যায়।তাই মা ভাবছিলাম আমেরিকা কিছুদিন গিয়ে ঘুরে আসি।"
"কিন্তু তুই..."
"মা,আমি জলদি চলে আসবো।রোদের ডেলিভারি হওয়ার আগে।"
"আমাকে এভাবে ফেলে যাবি?"
"তাহলে তুমিও চলো।ঘুরে আসবে।"
"এ্যাএএ..না না না।আমি যাবো না।"
"তাহলে আমাকে যাওয়াী অনুমতি দাও।প্লিজ প্লিজ.."
"কখন যাচ্ছিস?"
"কাল রাতে ঢাকা যাবো।ঢাকায় গিয়ে পাসপোর্ট,ভিসা সব চেক করবো,রোদের সাথে দেখা করবো।তারপর এসে একেবারে চলে যাবো।"
"তাহলে কিন্তু তুই রোদের ডেলিভারি'র আগে আসবি।"
"একদম।"
নিনা হাসানের সম্মতি লাভ করে নাবিলা নিজের রুমে গেলো।এখন তার মন তৃপ্ত!বাংলাদেশে দিন দিন তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো।প্রতিটা দিন নিলয় সামনে ভাসে।এই যেনো ডাক দিলো,"পাখি?"নাবিলা বুক চিড়ে কান্না আসলো।নিলয়কে ছাড়া থাকাটা অভ্যাস করে নিচ্ছিলো তো।কিন্তু নিলয় তার লাইফে আবার এসে সবকিছু এলোমেলো করে দিলো।নাবিলা'র অজান্তেই চোখ থেকে দু’ফোটা অভি গড়িয়ে পড়লো।ছোট বেলায় থাকতে মা-বাবা আলাদা হয়ে যায়!আস্তে আস্তে সে বেড়ে উঠে 'পর' দেশে!জন্মস্থানের সাথে তো আর সবদেশের তুলনা হয় না!তখন না কোনো বন্ধু পেলো সে আর না খেলায় সাথী।তখন থেকে নাবিলা নিজেকে যতোটা সম্ভব বাইর থেকে কঠিন রাখে।কিন্তু ভেতরেরটা আজও একি রকম।নিলয়'কে পেয়ে মনে হয়ে ছিলো একপলাশ স্থায়ী সুখের ছায়া তার মন দখল করছে।হ্যা,সত্যিই সুখের ছায়া তার মন দখল করে নিয়েছিলো কিন্তু সেটা সাময়িক!তারপর তার জীবনে নিলয় নামের অধ্যায়টা আবার শুরু হলো।কিন্তু পরিণাম?পরিমাণ তো কষ্ট দিয়েই শেষ হলো।
নাবিলা নিজের চোখের নিচের নোনা জল মুছে কান্না থামানোর বৃথা চেষ্টা করলো।কান্না তো বাঁধ ভাঙ্গা নদী!একবার শুরু হলে থামানো কষ্টকর।
সিলেট আসার পনেরো দিন পার হলো।এ ক'দিনে মেঘ অনেকটা ভেঙ্গে পড়েছিলো।কিন্তু নাবিলা তাকে পুরোপুরি ভাঙ্গতে দেইনি।"মৃত্যু এক কঠিন সত্য" বলে মানিয়েছে।নিজের ভেতরে থাকা কষ্টের পাখিদের একদম পাখা ঝাপটাতে দেইনি মেঘের সামনে।তা নাহলে আজ মেঘ'কে সামলানো যেতো না।নাবিলা জানতে পেরেছে নিলয়ের ক্যান্সার ছিলো।তার মায়ের পাশাপাশি তারও ক্যান্সার হলে নিলয় সেটা এড়িয়ে যায়।যার ফলে দিন দিন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে গেলো।নাবিলা'র আশেপাশের মানুষ জন এমন কেনো?শুধু তাকে কষ্ট দে!তারা কর একবারও বুঝে না তার কষ্ট হয়।অবশ্য মানুষের ঠোঁটে লেগে থাকা হাসি কৃত্রিম না প্রকৃত সেটা ক-ম মানুষই বুঝে!
।
।
"ইন্না-লিল্লাহ!নাবিলা'র বাচ্চা তোরে এমন আবোল মার্কা ডিসিশন কে নিতে বললো?"
"তাইলে কী করবো আমি?"
"তিহান তুই শান্ত হো।নাবিলা তুই আমেরিকা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলি ক্যান?"
"ভাবলাম ঘুরে আসি।"
ফোনের তিন প্রান্তে থাকা তিন ব্যাক্তি কিছুটা সময় চুপ ছিলো।পূর্ব হয়তো নাবিলা'র মনের অবস্থা আন্দাজ করতে পারছিলো কিছুটা।তাই সে খানিকটা সময় ভাবলো।শেষে মুখ ফুটে বললো,"আচ্ছা যা আমেরিকা।কিছুদিন ঘুরে আয়।"
পূর্বের কথা শুনে নাবিলা এপাশে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো।যাক তাহলে এখন বাংলাদেশ থেকে মোটামোটি বিদায়!কিন্তু তখনি ব্যাঘাত ঘটিয়ে তিহান বললো,
"ইন্না-লিল্লাহ!পূর্ব তুই বলে দিলি ক্যান যেতে?"
"তিহান বাদ দে।ঘুরে আসুক।এখন তুইও শরীয়তপুর,আমিও কানাডা তাই মনে হয় নাবিলা'রও ঘুরা দরকার।আন্টি পারমিশন দিলে ঠিক আছে।"
পূর্বের কথায় তিহান আর উল্টো প্রশ্ন করলো না।এভাবে কিছুটা সময় থাকার পর নাবিলা তাদের জানিয়ে দিলো ঢাকায় যাওয়ার কথা।পরে অনেকটা সময় তিন বন্ধু মোবইল নামক প্রযুক্তি'তে আড্ডা জমালো।
[চলবে]
পূর্ব-রোদ🌿(পর্ব-৩৫)
✔
md sojib
#পর্ব_৩৫
#লেখিকা_আমিশা_নূর
*********%%%%*********
রাফিয়া তাড়াতাড়ি রোদের মুখ চেপে ধরলো।রাফিয়ার ইচ্ছে করছে নিজের কাপলে নিজের থাপ্পড় লাগাতে।তার আগেই বুঝা উচিত ছিলো রোদ একটা বদের হাড্ডি।একরাশ বিরক্তি নিয়ে নাবিলা সব তেঁতুল তিন ভাগ করলো।তারপর সবাই মিলে ঠিক করলো ছাদে গিয়ে তেঁতুল খাওয়া হবে।তিনজন চুপিচুপি ছাঁদে গেলো।
।
।
"রোদ,তোর বেবি'র নাম কী দিবি?"
"তোকে বলবো ক্যান?"
"না মানে তোর যদি মনে কর ছেলে হলো আর আমার মেয়ে তখন তোর ছেলের সাথে আমার মেয়ের বিয়ে দিবো।"
"কক্ষণো না।আমার আর পূর্বের দশা দেখোস নাই?বোন আগে থেকে বিয়ে ঠিক করে রাখা অফ কর।বড় হয়ে ওরা নিজেরা ঠিক করবে।"
রোদের অসহায় কন্ঠ শুনে নাবিলা হুহু করে হেসে উঠলো।রাফিয়া গাল ফুলিয়ে তেঁতুল খেতে লাগলো।তখন তাদের কেনে ভেসে আসলো চাঁদনি মোহাম্মদের কন্ঠস্বর।তিনজন ভয় পেয়ে পেছন ফিরে তাকালো।তার হাতে থাকা তেতুল পেছন করে রাখলো।চাঁদনি মোহাম্মদ তখন বললেন,
"তোরা এই সময় ছাঁদে কী করছিস?রোদ তোকে না বলছি যখন তখন ছাঁদে আসবি না।"
"আম্মি আমি আসিনি।রাফিয়া জোর করে এনেছে।"
রোদের কথা শুনে রাফিয়া হা হয়ে গেলো।কিন্তু চাঁদনি মোহাম্মদ তার কথা বিশ্বাস করলেন না।তখন তিনি বললেন,"তোদের হাত পেছনে কেনো?কী আছে হাতে?"
এই কথা শুনে বাকি তিনজোড়া চোখ রসগোল্লার সাইজ হয়ে গেলো।তিনজন এক সাথে মাথা নাড়ালো।তিনি তাদের কথা না শুনে হাত দেখে প্রচন্ড রেগে বললেন,"এই জন্য তো বলি তেঁতুল কম হলো কেনো?তোদের'কে আমি...."
তিন মূর্তিকে পিটানোর জন্য তিনি লাঠির খোজ করছেন।এই ফাঁকে তারা ছাদ থেকে সুরসুর করে নেমে গেলো।চাঁদনি মোহাম্মদ সাবধানের স্বরে রোদকে উদ্দেশ্য করে বললেন,"রোদ সাবধানে যাস!"
।
।
নাবিলা চতুর্থ বারের মতো মেঘের নাম্বারে ডায়াল করলো।কিন্তু ওপাশ থেকে বার বার জানান দিচ্ছে মেঘের ফোন বন্ধ।নাবিলা রেগে মোবাইল ফোন বিছানায় ছুঁড়ে মারলো।গত তিন ধরে মেঘের নাম্বার থেকে এই একটা কথায় আসছে।কিন্তু নাবিলা বুঝছে না মেঘের নাম্বার বন্ধ কেনো?নাবিল মোবাইল বিছানা থেকে তুলে তার মায়ের নাম্বারে ডায়াল করলো।দু'বার রিং হতেই ওপাশ থেকে রিসিভ হলো।নাবিলা মোবাইল ফোন কানে লাগিয়ে কর্কশ কন্ঠে বললো,
"ভাই কোথায়?তিন ধরে কল করছি ফোন বন্ধ কেনো?"
"মেঘ কাল ইন্ডিয়া থেকে এসেছে আর এসেই রুমের দরজা বন্ধ করে দেয়।এখনো দরজা খুলেনি।"
"কী?দরজা খুলেনি মানে কী?বাড়িতে কখন এসেছে?"
"ইন্ডিয়া থেকে রাতে আসলো।চোখ খুব লাল ছিলো।হয়তো এখনো ঘুমাচ্ছে।"
"মেঘ ইন্ডিয়া গেছিলো?"
"হুম।বুঝছি না আমি ছেলেটার কী হলো?"
"আঙ্কেল কোথায়?"
"উনি তো এখন অফিসে।"
"ওহ।আমি আজ সিলেট আসছি মা।"
"রোদের কী অবস্থা?কেমন আছে?"
"আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভালো।রাফিয়া এসেছে।রোদ কিছুদিন ওর বাড়িতে যাবে।এই ফাঁকে আমি সিলেট আসছি।"
"আচ্ছা আয়।"
নিনা হাসানের সাথে কথা শেষ করে নাবিলা চিন্তায় পড়ে গেলো।একদিকে সেদিনের পর থেকে নিলয়ের কোনো খোঁজ নেই অন্যদিকে মেঘের এই অবস্থা।কিন্তু নিলয়ের বাড়ি তো ইন্ডিয়া।তাহলে কী মেঘ নিলয়ের কাছে গেছিলো?
এসব ভাবতে ভাবতে নাবিলা জামা-কাপড় গুছিয়ে নিলো।এতোদিন সে নিলয়ের নাম্বারে চাইলে ডায়াল করতে পারতো।কিন্তু কেনো যেনো শত কষ্ট হলেও নাবিলা'র মন চাইনি দ্বিতীয় বার নিলয়ের সাথে কথা বলুক।তবুও মনে পড়তো নিলয়কে।বিশেষ সে রাতটা!যে রাতে তাদের শেষ দেখাটা হয়।নাবিলা কাঁদে!খুব কাঁদে!তবে সেটা একলা।কাউকে বুঝতে দেয়না সে ভালো নেই!তার আশেপাশের সবাই জানে নাবিলা হ্যাপি আছে।কিন্তু নাবিলা জানে সে কেমন আছে?
।
।
"দেখেছিস কান্ডখানা?রোদের আজকেই যেতে হচ্ছে তোরও আজকে?"
"ও মাই কিউটি আন্টি প্লিজ রাগ করে না।মা'কে মনে পড়ছিলো খু-ব।"
"আচ্ছা যা।সাবধানে যাবি।"
"ওক্কে।রোদ কী বেরিয়েছে?"
"না।এখনো রুমে আছে।"
"আচ্ছা।তুমি নিজের খেয়াল রাখবে,ঠিক মতো ঔষুধ খাবে আর আঙ্কেলের সাথে রোমান্স কম করো।"
"তবে রে ফাজিল..."
চাঁদনি মোহাম্মদের হাতের নাগাল থেকে বেরিয়ে নাবিলা রোদের রুমে ঢুকলো।রুমের দরজা খুলা ছিলো তাই নাবিলা রুমে ঢুকে দেখে রোদ রেডি হচ্ছে আর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করছে।বিড়বিড়'টা হলে অনেকটা এরকম,"ইশ রে রাফিয়া!দিন দিন মোটু হয়ে যাচ্ছি।এই জামাটা আগে ঠিক মতো হতো না এখন দেখ।"
নাবিলা আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো রাফিয়া'কে কোথাও দেখা যাচ্ছে না।তাহলে রোদ কথা বলছে কাকে?ভূত-টুত দেখলো নাকি? নাবিলা এহেম এহেম করে রুমে ঢুকলো।
কারো আওয়াজ পেয়ে রোদ চারপাশে তাকিয়ে নাবিলা'কে উদ্দেশ্য করে বললো,"আরে রাফিয়া কোথায়?এখানে তো ছিলো।"
"তিহানের সাথে ফোনে প্রেমআলাপ করছে হয়তো।"
"হায়রে..বয়ফ্রেন্ড হলে সবাই বেস্টফ্রেন্ড'কে ভূলে যায়।"
কথাটা বলে রোদ নিজের জিহ্বা কাটলো।কারণ রাফিয়া'র বয়ফ্রেন্ড থাকলে রোদের স্বামী আছে।হাবলার মতে হেসে নাবিলা'র দিকে তাকিয়ে বললো,"জাস্ট কথার কথা বললাম আর কি!"
তখনি রাগান্বিত চেহেরা নিয়ে রাফিয়া রুমে প্রবেশ করলো।রাফিয়ার মুখ দেখে মনে হচ্ছে কারে সাথে ঝগড়ায় পরাজিত হয়ে এসেছে তাই রেগে আছে।রোদ-নাবিলা কিছু জিজ্ঞেস করার আগে রাফিয়া বললো,
"বয়ফ্রেন্ড না কচু,ঐটা হ্যান ঐটা ত্যান।বিরক্তিকর একটা বিষয়।সামান্য বিষয় নিয়ে ঝগড়া দিবে।এক্কেবারে ব্রেকআপ করে ফেলছি।ঠিক করছি না নাবিলাপু?"
"হ্যা হ্যা একদম ঠিক।"
"ঠিকই তো।আমি ঠিকই করি।তবে এবার ফাইলান ব্রেকআপ করলাম।দেখি এবার তিহানের বাচ্চা কী করে?আমাকে..."
রাফিয়া আরো কিছু বিড়বিড় করছে।রাগের কারণে কোনো কিছু স্পষ্ট হচ্ছে না।রাফিয়া'র মুখ থেকে ব্রেকআপ শব্দ শুনে নাবিলা-রোদ মোটও অবাক হলো না।কারণ রাফিয়া-তিহানের নিত্যদিনের ব্যাপার ব্রেকআপটা।প্রতিবারই বলে ফাইলান ব্রেকআপ।কিন্তু এই ঝগড়া দিলো তো এই আবার ভালো হয়ে গেলো।রাফিয়া দিকে গুরুত্ব না দিয়ে নাবিলা রোদের উদ্দেশ্য বললো,"আমি সিলেট যাচ্ছি।তুমি নিজের খেয়াল রাখবে।বুঝেছো?"
"আচ্ছা।"
"আর একদম ভ্যাঁ ভ্যাঁ কাঁদবে না।এতে বাবু'র ক্ষতি হতে পারে রোদ।"
"আমি একদম কাদি না নাবলাপু।"
রোদের কথা শুনে নাবিলা মুচকি হেসে জড়িয়ে ধরলো।এই ক'মাসে নাবিলা'র প্রিয় মানুষদের মধ্যে একজন হয়ে উঠেছে নাবিলা।একদম বোনের সম্পর্ক তাদের!
।
।
"নাস্তা করেছো রোদ?"
"হুম।মামুনির কাছে আসছি।সকালে রাফিয়া আনতে গেছিলো।"
"হু,মা বলেছে।"
"নাবিলাপু সিলেট গেছে। জানো?"
"হু।ওর সাথে একটু কথা বলা দরকার ছিলো।"
"এখন বাসে থাকবে হয়তো।রাতে ফ্রী থাকলে করিও।"
"নাইট ক্লাস আছে আজ।"
"ওহ।তারমানে রাতে কথা বলতে পারবে না কারো সাথে?"
ওপাশ থেকে পূর্ব ভালোভাবে বুঝলো "কারো সাথে" মানে রোদ তার সাথে বুঝাচ্ছে।খুব কষ্ট হয় পূর্ব এমন অভিমানি কথা শুনলে।কিন্তু মানিয়ে নিতে হয়।নাহলে সামলানো কষ্টকর!
।
।
"মা মেঘ কোথায়?"
"রুমে আছে।সকালে বের হয়ে নাস্তা করেছে কিন্তু কোনো কথা বলেনি।"
"কী যে হয়েছে তোমার ছেলেটার?দাঁড়াও আমি দেখে আসি..."
"খেয়ে যা।"
"আগে মেঘের সাথে কথা বলে আসি।"
"মেঘ কী?তোকে না বলেছিলাম 'ভাই' ডাকতে?"
"মা..ডাকি তো 'ভাই'।আমার মাঝেমধ্যে মনে হয় তোমার ছেলে বয়সে আমার ছোট তাই মেঘ চলে আসে।"
"হু,"
নাবিলা নিনা হাসানের সাথে কথা না বারিয়ে মেঘের রুমের উদ্দেশ্য হাঁটতে লাগলো।এখন নাবিলা মেঘের বাবার বাড়িতে।নিনা হাসানের জেদের জন্য এবাড়িতে আসতে হয়।যদিও নাবিলা মেঘের বাবা'কে "বাবা" ডাকে না কিন্তু উনি বাবা'র চেয়ে কোনোকিছু'তে কম না।দশটার সময় নাবিলা নিজের বাড়িতে পৌঁছে।আর এখন মেঘের রুমের সামনে এসে দেখলো দরজা খোলা আছে।
নাবিলা নক না করে রুমে ঢুকে দেখে মেঘ রুমে নেই।নাবিলা ভ্রু-কুচকে বেলকোনি চেক করলো।দূর্ভাগ্যবশত মেঘকে বেলকোনিতে পাওয়া গেলো না।নাবিলা মেঘের রুমের বেডে বসে কিছুক্ষণ ভাবলো রুমের কোথায় থাকতে পারে।তখন বা'পাশে তাকিয়ে দেখলো ওয়াশরুম।ওয়াশরুম থেকে এখন পানির আওয়াজও আসছে।নাবিলা ভাবলো হয়তো ওয়াশরুমে আছে।সে কিছুক্ষণ কান খাড়া করলো।তখনি ভেসে কারো গোঙানির শব্দ।নাবিলা সে শব্দ অনুসরণ করে ওয়াশরুমের পাশে গেলো।
নাবিলা'কে অবাক করে দিয়ে তার কানে ভেসে আসলো ওপাশ থেকে কান্নার আওয়াজ।নাবিলা অবাকের চেয়েও বেশি অবাক হলো।মেঘ কাঁদছে?কাঁদছে মেঘ!কেনো?
নাবিলা শুকনো হাত দিয়ে নিজের মুখ মুছে নিলো।কপালে তার ভি-ষ-ণ রকমের চিন্তার ভাব।তার মাথায় ঢুকছে না মেঘ এভাবে কাদছে কেনো?কী হয়েছে মেঘের?
হঠাৎ ওয়াশরুমের পানির কল বন্ধ হয়ে গেলো।নাবিলা ভাবলো এবার হয়তো মেঘ বের হবে।নাবিলা নিজেকে যথেষ্ট স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেছে।তার মনে হলো এখন মেঘের সামনে না পড়া উচিত।তাই সে রুম থেকে বের হতে যাবে তখন পেছন থেকে মেঘ ডাকলো।মেঘের কন্ঠস্বর শুনে নাবিলা থেমে গেলো।থমথমে মুখ নিয়ে নাবিলা মেঘের দিকে তাকালো।
মেঘের চোখ দুটো ফোলে লাল হয়ে আছে।শরীর আগের থেকে অনেকটা শুকিয়ে গেছে।নাবিলা অনেকটা তাড়াহুড়ো করে মেঘের সামনে দাঁড়ালো।নাবিলা কিছু জিজ্ঞেস করার আগে মেঘ বললো,
"তুই কখন এলি?"
"সকালে।তুই ইন্ডিয়া গেলি আমাকে না জানিয়ে?"
"জরুরি কাজ পড়ে গেছিলো।"
"ওহ।"
নাবিলা আড় চোখে মেঘের দিকে তাকালো।মেঘ তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছচে।মেঘকে সরাসরি কান্না করার কথা জিজ্ঞেস করতে নাবিলা'র অসস্তি হচ্ছে।কারণ মেঘ তো লুকিয়ে কাঁদছিলো!সবার আড়ালে!একলা!!
নাবিলা শীতল কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,"তুই ঠিক আছিস?"
নাবিলা'র কথা শুনে মেঘ তোয়ালে চেয়ারে রেখে তার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,"কিছু হয়নি।"
নাবিলা অতিরিক্ত মায়া মাখা কন্ঠস্বরে বললো"ভাই বল না!"
নাবিলা'র ইমোশন কথা শুনে মেঘ আরো নরম হয়ে গেলো।মেঘ এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়ালো।যার অর্থ "না"!
নাবিলা এবার কান্না কান্না কন্ঠস্বরে বললো,"বল না তোর কি হয়েছে?ঠিক আছিস তুই?"
"হু।"
এবারেও মেঘের নেতিবাচক উত্তর শুনে নাবিলা হতাশ হলো।আবারো একরাশ অসস্তি নিয়ে বললো,"নিলয়ের সাথে কথা হয় তোর?"
এই একটা কথা শুনে মেঘ স্থীর হয়ে গেলো।নিলয়?নিলয়ের খোঁজ করছে নাবিলা?কী উত্তর দিবে মেঘ?মেঘের কাছে নিলয় অধ্যায়ের সব প্রশ্ন-উত্তর তো ধোঁয়াশা!
[চলবে]
পূর্ব-রোদ🌿(পর্ব-৩৪)
✔
md sojib
#পর্ব_৩৪
#লেখিকা_আমিশা_নূর
((((((♪♥♪)))))))
"দশ তারিখ" শব্দটা শুনে রোদ থমকে গেলো।দশ তারিখ!তাহলে তো মাত্র চারদিন বাকি।চারদিন পর পূর্ব তিন বছরের জন্য গায়েব হয়ে যাবে?ইচ্ছে করলে যখন তখন পূর্বকে আর ছোঁয়া যাবে না।বিনা কারণে ঝগড়া দেওয়া হবে না।সকাল বেলা পূর্বের চেহারা দেখা হবে না।কেমন কষ্ট এটি?এতো কষ্ট!
।
।
ভোর পাঁচটায় এলার্মের শব্দ কানে আসতেই পূর্ব মাথা তুলে আন্দাজে এলার্মটা অফ করে দিলো।পাশে এক দৃষ্টিতে রোদের দিকে তাকিয়ে রইলো।আজ দশ তারিখ!আজকে রোদের সাথে পূর্বের শেষ দেখা।বেঁচে থাকলে আবার তিন বছর পর দেখা হবে।এটা মাথায় আসতে পূর্ব দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো।উপর হয়ে সে রোদের কপালে চুমু দিতে গেলে সামনে হাত দেখতে পেলো।পূর্ব ভ্রু-কুচকে দেখলো রোদ ঘুমের ঘোরে কপালে হাত রেখেছে।পূর্ব হাত'টা সরাতে চাইলো কিন্তু হাতটা একদম শক্ত করে রেখে রোদ।তখন পূর্ব বুঝলো রোদ ইচ্ছে করে এমনটা করছে।তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে খাড়া হাতের উপর মাথা রেখে তাকিয়ে রইলো।তখন রোদ হাই তুলে ঘুম ভাঙ্গার অভিনয় করলো।পূর্ব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে রোদের অনেক আগেই ঘুম ভেঙ্গেছে।এখন অভিনয় করছে মাত্র।
রোদ হাত-পা নেড়ে পূর্বের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো।তখন পূর্ব হুট করে তার কপালে চুমু দিতে আসলে পূর্বের ঠোঁট জোড়া'র উপর হাত রাখলো।
"একদম চুমু দিবে না বলে দিলাম।"
"কেনো?কী করলাম?"
"অভ্যাস পরিবর্তন করছি।তুমি প্রতিদিন একই কাজ করতে করতে অভ্যাস খারাপ করে রেখেছো।তুমি চলে যাওয়ার পর কী করবো আমি?"
আগের মতো দৃষ্টিতে পূর্ব রোদের দিকে তাকালো।রোদের প্রশ্নের উত্তর পূর্বের কাছে নেই।তখন হুট মাথায় আসায় বললো,"দূরে থাকবো বলে ভালোবাসা কমে যাবে শঙ্খপুষ্পি?"
একথা শুনে রোদ নরম হয়ে এলো।দূরে থাকলে কিছুতে ভালোবাসা কমবে না।কিন্তু কষ্ট হবে ভীষণ।কান্না আসবে থেমে থেমে!রোদের গলা ভারি হয়ে গেলো।কিন্তু সে নিজেকে যতোটা সম্ভব আটকানোর চেষ্টা করলো।কারণ রোদ মনে মনে প্রতিজ্ঞা বদ্ধ হয়েছে আজ কিছুতেই পূর্বের সামনে চোখের জল ফেলবে না।কিছুতেই না!
।
।
"আম্মি কী রান্না করেছো?"
"পূর্বের যা পছন্দ।না জানি ছেলেটা কখন আবার আমার হাতের রান্না খেতে পারে।"
চাঁদনি মোহাম্মদের একথা শুনে রোদ কৃত্রিম হাসি দিলো।এখন নয়টা বাজছে।সকালে নাস্তা করার পর চাঁদনি মোহাম্মদ রান্নায় লেগে আছেন।অথচ শরীর অতোটা ভালো না।কিন্তু উনার কাছে ছেলে বড়।তাই রোদ আর বারণ করেনি।এখন পূর্ব রুমে জামা-কাপড় গুছিয়ে নিচ্ছে।রোদ সাহায্য করতে চেয়েছিলো কিন্তু পূর্ব বাঁধা দিয়েছে তাই রোদ রাগ করে রান্না ঘরে চলে এসেছে।তখন তার কানে কলিং বেলের আওয়াজ ভেসে আসলে দরজা খুলতে যায়।
দরজা খুলে দেখলো সামনে রাফিয়া,নাবিলা,তিহান আর তার মামুনি দাঁড়িয়ে আছে।তাদের দেখে রোদ অবাক হলো না।কারণ রোদ জানতো পূর্বের বিদায়ের সময় তারা আসবে।ঠোঁট জোড়া বাঁকা করে রোদ দরজার পাশ থেকে সরে আসলো।
নাবিলা পূর্বের কথা জিজ্ঞেস করতে রোদ জানিয়ে দিলো উপরে আছে।নাবিলা আর তিহান পূর্বের দিকে গেলো।ছায়া আহমেদ তার বান্ধবী'র কাছে গেলো।
।
।
"পূর্ব সব গুছিয়ে ফেলেছিস?"
"হুম।আর শুন Anniversary'র কিছু পিক ফ্রেম করতে দিছিলাম।ফ্রেমগুলা আসলে তুই রোদকে দিয়ে দিস।"
"ইন্না-লিল্লাহ!রোদ জানে না?"
"নাহ।নাবিলা তুই কিন্তু মনে করে ফ্রেম কালেক্ট করে দিবি।"
"ওক্কে রোদের জামাই।"
বাক্যটি বলে নাবিলা চেয়ারে আরাম করে বসে পরলো।কিন্তু নাবিলা'র আরাম'টা তিহান-পূর্ব'কে অসস্তি 'তে ফেলে দিলো।আজ প্রথম নাবিলা পূর্বকে এমন অদ্ভুত নামে সম্মোধন করলো।তিহান খুব উচ্চস্বরে বললো,"ইন্না-লিল্লাহ।"
তিহানের কথায় পূর্ব অবাকের জগত থেকে বেরিয়ে নাবিলা'কে বললো,
"রোদের জামাই কী?আমার নাম নাই।"
"ও মা!নাম থাকবে না ক্যান?ক্যান তুই রোদের জামাই না?নিকনেইম'টা বেশ লজিক্যাল।"
নাবিলা'র কথায় পূর্ব কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলো।কারণ নাবিলা'র ডাকা নামটা যুক্তিসম্মত।পূর্ব বিষয়টা এড়িয়ে বললো,
"মেঘ কোথায় আছে এখন?"
"সকালে মা'কে কল করেছিলাম।মা বললো অফিসের কাজে বাইরে গেলো।"
"ওহ।সেদিনের পর থেকে রোদকে আর কলও করলো না।"
"হুম।করবেও না।"
নাবিলা'র কথায় পূর্ব সস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।যাক তাহলে মেঘ নামের কালো ছায়াটা তাদের মাথার উপর থেকে সরে গেলো।
।
।
পূর্বের যাওয়ার সময় হলো।কিন্তু রোদ কিছুতে তার সামনে আসছে না।রোদ রুমের এক কোণে হাটু গেড়ে বসে আছে।চোখ থেকে নিরবে চোখের জল পড়ছে।রোদের কিছুতে পূর্বের সামনে যেতে ইচ্ছে করছে না।কারণ পূর্বের সামনে গেলে চোখের জল ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।তখনি তার দরজায় কেউ টুকা দিলো।রোদ চোখের জল মুছে রুম থেকে আওয়াজ দিলো,"কে?"
ওপাশে থাকা চাঁদনি মোহাম্মদ বললো,"রোদ বাইরে আয়।"
উনার কথা শুনে রোদ হাতের পিট দিয়ে চোখের জল ভালোভাবে মুছে নিলো।ঠোঁটে কৃত্রিম হাসির বাঁকা রেখা ঝুলিয়ে দরজা খুললো।
চাঁদনি মোহাম্মদ রোদকে দেখে তার মনের অবস্থা বুঝতে পারলেন।তিনি আলতো করে রোদকে জড়িয়ে ধরে বললেন,"রোদ,পূর্বের সাথে একবার দেখা কর দয়া করে।"
রোদ একবার ভাবলো মানা করে দিবে।পরে কি যেনো ভেবে চাঁদনি মোহাম্মদ'কে ছেড়ে দিয়ে নিচে গেলো।রোদের যাওয়ার পনে থাকিয়ে চাঁদনি মোহাম্মদ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন।তার ছেলের চলে যাওয়া'তে নিজেরও খুব কষ্ট হচ্ছে।তাই তো পূর্বকে আগে যেতে দিতে চাইছিলো না।কিন্তু শর্ত জিতে কানাডা যাওয়ার যোগ্যতা পূর্ব নিজে অর্জন করেছে।এখন তার রোদের জন্য কষ্ট হয়।কী করে ভালো থাকবে মেয়েটা?
নিচে গিয়ে রোদ দেখে পূর্ব'রা বাইরে আছে।ধীরগতিতে রোদ পূর্বের সামনে গেলো।পূর্বের হাতে থাকা ঘড়িটা নাড়তে নাড়তে বললো,"নিজের খেয়াল রাখবে।পৌঁছে জানাবে।"
পূর্ব শীতল দৃষ্টিতে রোদের দিকে তাকালো।মেয়েটা কতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে চোখের জল আটকানো।কিন্তু ব্যর্থ হয়ে চোখে জল ভর্তি হয়েছে।পূর্ব চাইনা রোদ এক বিন্দুও কষ্ট পাক।কিন্তু অদ্ভুত কারণে রোদের সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় তারই কারণে।পূর্ব এক টানে রোদকে জড়িয়ে ধরলো।রোদও এই ফাঁকে চোখের কোণে লেগে থাকা অভি বিন্দু মুছে নিলো।
পূর্ব তার কপালে পরম আবাশে চুমু দিয়ে বললো,"নিজের যত্ন নিবে।আর একদম কান্নাকাটি করবে না শঙ্খপুষ্পি।"
"হু।"
"এয়ারপোর্ট অবধি চলো।"
"নাহ।নাবিলাপু আর তিহান ভাইয়া যাক।",
ততক্ষণে নাবিলা আর তিহান তাদের কাছে এগিয়ে আসে।তারা দু'জনও রোদকে বলে এয়ারপোর্টে যেতে।কিন্তু রোদ সোজাসাপ্টা মানা করে দিয়ে আবারো নিজেকো রুম বদ্ধ করে নে।পূর্ব তার মা-বাবা,মামুনি'র থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে বসে পরে।
রোদ বেলকোনিতে দাঁড়িয়ে পূর্বের যাওয়া দেখছে।তার সাথে কাটানো প্রতিটা মুহুর্ত মনে করছে।কীভাবে তাকে ছাড়া থাকবে এসব ভাবছে।হঠাৎ রোদের মস্তিষ্ক খুব দ্রুত কাজ করা শুরু করলো।তার মস্তিষ্ক জানান দিলো পূর্বকে আরো পাঁচ মিনিট বেশি দেখতে পাওয়া যাবে।রোদ তাড়াতাড়ি নিজের ব্যাগ নিয়ে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্য বেরিয়ে পড়লো।বাসা থেকে রোদকে এভাবে বেরুতে দেখে রাফিয়া তার পিছু নিলো।রোদ গাড়িতে উঠার সময় রাফিয়াও একই গাড়িতে উঠে বসে।
রাফিয়া রোদকে জিজ্ঞেস করতে চাইলো সে কোথায় যাচ্ছে।কিন্তু পরক্ষণে কিছু একটা মাথায় আসতেই আর জিজ্ঞেস করলো না।সে চুপচাপ দেখতে চাইলো রোদ কী কী করে।তখনি সে দেখলো তাদের থেকে কয়েক মিনিটের দূরত্বে পূর্বদের গাড়ি।রাফিয়া কথাটা রোদকে বলতে চেয়ে আর বললো না।সে চুপচাপ রোদের বিষয়টা অনুভব করছে।
পূর্ব' গাড়ি থেকে নেমে নাবিলা-তিহান'কে বিদায় জানিয়ে এয়ারপোর্টের ভিতরে প্রবেশ করতে যাবে তখন দেখলো রোদ হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে আসছে।পূর্ব তাকে দেখে কিছুটা সামনে এগিয়ে গেলো।রোদ তার কাছাকাছি আসতেই হুমড়ি খেয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।পূর্ব ঠোঁট বাকা করে রোদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো।পূর্ব জানতো রোদ তার পেছনে অবশ্যই আসবে।
এয়ারপোর্টে এনাউন্সমেন্ট শুরু হওয়ার পূর্ব রোদকে ছেড়ে দিলো।তারপর কিছু সর্তকবাণী শুনিয়ে ভিতরে ঢুকে গেলো।রোদের মাথাটা ভনভন করছিলো।সামনে সবকিছু ঝাপসা দেখছিলো।একসময় ঝাপসা থেকে সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেলো।রোদ তার শরীরের ভর সম্পূর্ণ ছেড়ে দিয়ে মাথা ঘুরিয়ে পরে গেলো।
তিন মাস পর......
রোদ চার মাসের গর্ভবতী!
সেদিন মাথা ঘুরে যাওয়ার পর যখন হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয় তখন ডাক্তার জানান দে তার দেহে আরো একটি ছোট্ট দেহ বাস করছে।প্রেগন্যান্সির কথা রোদ পূর্ব'কে জানায়নি।এমনকি কাউকে জানাতেও দেয়নি।প্রেগন্যান্সির কথা শুনলে পূর্ব কানাডা'র সবকিছু ফেলে বাংলাদেশ চলে আসবে।তখন পূর্বের স্বপ্নটা অপূর্ণ থেকে যাবে।
এই তিন মাসে রোদ নিজেকে অনেকটা সামলে নিয়েছে।প্রথম প্রথম পূর্বের জন্য খুব কাঁদতো।পূর্ব যখনই ফোন করতো না কেঁদে ফোন ছাড়তো না।তাই রাগ করে পূর্ব একবার এক সপ্তাহ ফোন করেনি।তারপর থেকে রোদ আর কান্না করে না।করলেও সেটা গোপনে করে।সবার থেকে আড়াল করে কাঁদে।তবে নিজের সন্তানের কথা ভেবে নিজের যত্ন নে খুব।যদিও রোদের যত্ন নেওয়ার জন্য মানুষের কম নেই।নাবিলা ঢাকায় থেকে গেছে পূর্বের বাড়িতে।মাঝে একবার সিলেট গিয়ে তার মায়ের সাথে দেখা করেছিলো তারপর থেকে ঢাকায় আছে।মূলত নাবিলা রোদের যত্নের জন্য সিলেট যায়নি।চাঁদনি মোহাম্মদ একার সম্ভব না রোদকে সামলো।তাই সে এখনো আছে।
রোদ এক ধ্যানে ফ্রেমে বন্দি থাকা পূর্ব-রোদে'র ছবির দিকে তাকিয়ে রইলো।পূর্ব চলে যাওয়ার কয়েকদিন পর নাবিলা এনে দিয়েছিলো।রোদ যখনি রুমে একা থাকে সারাক্ষণ বড় ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকে।হঠাৎ দরজা নাড়ার শব্দে রোদের ধ্যান ভাঙ্গলো।সে দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলো রাফিয়া আর নাবিলা চুপিচুপি রুমে ঢুকছে।কিন্তু চুপিচুপি ঢুকার অর্থ রোদ খোঁজে পেলো না।রাফিয়া'কে দেখতে পেয়ে রোদ বললো,
"পেত্নী,সেই কবে এসেছিলি আর আজকে এলি।"
"ও মা!তুই আমাকে মিস করছিলি?"
"তোকে মিস করি নাই।তোকে যে বললাম আমার জন্য তেঁতুল আনতে, আনছিলি?তেঁতুল না এনে একেবারে উধাও হয়ে গেলি।"
"এই নে তেঁতুল।"
রাফিয়া দুহাত বাড়িয়ে দিলো।দুহাতে মাত্র দুইটা তেঁতুল ছিলো।দুইটা তেঁতুল পেয়েই রোদ খুশি হলো।নিজের হাতে তেঁতুল নিয়ে লবনের কথা জিজ্ঞেস করতে নাবিলা একবাটি লবণ এগিয়ে দিলো।রোদ বুঝতে পারলো না দুইটা তেঁতুলের জন্য একবাটি লবণ কেনো?
তখন তাকে অবাক করে দিয়ে নাবিলা পেছন থেকে এক থলে তেঁতুল বের করলো।এতো তেঁতুল দেখে রোদের মুখটা হা হয়ে গেলো।অমনি রোদ রাগি কন্ঠে বললো,
"এতো তেঁতুল থাকতে আমাকে মাত্র দুইটা দিলে নাবিলাপু?এতো তেঁতুল তোমরা কী করবে?"
"খাবো।" (নাবিলা)
"কিন্তু এতে তেঁতুল পেলে কোথায়?" (রোদ)
"তোমার শ্বাশুড়ি আম্মা আচার করার জন্য এনেছিলো।ঐখান থেকে রাফিয়া চুরি করেছে।" (নাবিলা)
"চুরি?রাফিয়া.."
রোদ রাগান্বিত দৃষ্টিতে রাফিয়ার দিকে তাকালো।রাফিয়া তার দিকে ভ্যাংচি কাটলো।রোদের কিছুতে সহ্য হচ্ছে না তাকে দুইটা দিয়ে ওরা দুজন এতো খাবে।হঠাৎ রোদের মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি আসায় বললো,
"ফটাফট সব তেঁতুল সমান তিন ভাগে ভাগ করো নয়তো আম্মি'কে সব বলে দিবো।"
"এ্যাঁএএ!রোদ এইটা ব্ল্যাকমেইল।" (নাবিলা)
"যাই হোক।ভাগ করলে করো নয়তো.... আম্মিইই"
রাফিয়া তাড়াতাড়ি রোদের মুখ চেপে ধরলো।রাফিয়ার ইচ্ছে করছে নিজের কাপলে নিজের থাপ্পড় লাগাতে।তার আগেই বুঝা উচিত ছিলো রোদ একটা বদের হাড্ডি।একরাশ বিরক্তি নিয়ে নাবিলা সব তেঁতুল তিন ভাগ করলো।তারপর সবাই মিলে ঠিক করলো ছাদে গিয়ে তেঁতুল খাওয়া হবে।তিনজন চুপিচুপি ছাঁদে গেলো।
[চলবে]
রবিবার, ১৩ জুন, ২০২১
পূর্ব-রোদ🌿(পর্ব-৩৩)
✔
md sojib
#পর্ব_৩৩
#লেখিকা_আমিশা_নূর
শত হলেও নিলয় তার বন্ধু!বিপদে-আপদে সবটা সময় ছায়ার মতো পাশে লেগে ছিলো।আজ শেষ মুহুর্তে মেঘ কিছুতেই নিলয়কে একা ছাড়বে না।কোনোদিনও না!এখন নিলয়ের পাশে মেঘকে খুব প্রয়োজন।খু-ব!
।
।
"নাবিলা,পূর্ব-রোদ কোথায় গেলো?দেখতে পাচ্ছি না।"
চাঁদনি মোহাম্মদের কথা শুনে নাবিলা স্ব জোরে হেসে উঠলো।তারপর হাসি থামিয়ে বললো,"আছে আশেপাশে।"
"হাসছো কেনো?"
"আন্টি তুমি জানো না কী একটা.....হাহাহাহা।"
ততক্ষণে তাদের দুজনের কাছে রোদের মা ছায়া আহমেদও এসে যায়।নাবিলা'কে হাসতে দেখে তিনি বললেন,"না হেসে বলো কী হয়েছে?ওদের কেক কাটতে হবে তো।"
পেছন থেকে রাফিয়া সবটা বলতে যাবে তখন নাবিলা রাফিয়ার মুখ চেপে ধরে বললো,"আন্টি আন্টি ওটা হাস্যকর।তোমাদের বলা যাবে না।"
নাবিলা'র কথা বলার ডিজাইন দেখে চাঁদনি এবং ছায়া আহমেদ দুজনে একসাথে বললো,"ওওওও"
সবাই পূর্ব-রোদকে নিয়ে কথা বলছিলো।তখন সবার দৃষ্টি গিয়ে পড়লো সিঁড়ির দিকে।একরাশ লজ্জা নিয়ে,গাড় খয়েরী রংয়ের শাড়িতে গোলাপি কালারে আঁচল,উপরের সাদা রংয়ের কৃত্রিম বেলি ফুলের আর্ট।হাত ভর্তি মেজেন্টা কালারের চুরি,কানে সোনালী রংয়ের ঝুমকা,গলায় তার বাবার দেওয়া চেইন,ঠোঁটে খয়েরী লিপস্টিক,চোখ ভর্তি গাড় কালো কাজল,চুল খোঁপা করা।সব মিলিয়ে যেনো নিখুঁত স্ত্রী!
রোদ'কে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখে সবাই মুচকি হাসলো।কিন্তু রাফিয়া 'হা' করে তাকিয়ে আছে।রোদ তাদের কাছে এসে বললো,"কী হয়েছে রাফিয়া?হা করে আছিস কেনো?"
"ইয়াআআআর!তোকে দেখে ক্রাশ খেলাম।হায়!তেরা রুপ দেক্ষার মে মার জায়োনগা!"
রাফিয়ার মন্তব্য শুনে সবাই হেসে উঠলো।তখন রোদের ছোট বোন আলো নাগের ঢগায় নেমে আসা চশমা ঠিক করে বললো,
"আপি তোর খোঁপায় যদি ফুল দিই না তাহলে আরো সুন্দর দেখাবে।"
"লাগবে না ফুল।"
রোদ চারপাশ তাকিয়ে পূর্বের খোঁজ করছে।তখন নাবিলা তার কানে কানে বললো,"পূর্ব তৈরি হচ্ছে।"
নাবিলা'র কথায় রোদ হচকিয়ে উঠলো।রোদ চেহেরা দেখে মনে হলো কিছু চুরি করতে গিয়ে রোদ ধরা পড়েছে।তা দেখে নাবিলা বাঁকা হাসলো।তাদের সবার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে পূর্বের আগমন হলো।রোদ আড়চোখে তাকিয়ে দেখলো খয়েরী রংয়ের পাঞ্জাবির সাথে পায়জামা ম্যাচ করা।রোদ আজ প্রথম পূর্বকে খয়েরী রঙে দেখলো।দু'জনকে দেখে মনে হচ্ছে তারা একে অপরের জন্য তৈরি।
রোদের মা পূর্বের কাছে গিয়ে মাথায় হাত বুলাতে চাইলে পূর্ব নিচু হয়ে বললো,"মামুনি,চুলের স্টাইল নষ্ট হয়ে যাবে।"
"চুপ বেয়াদব!আমার ছেলের উপর কারো যেনো নজর না লাগে।"
রোদের মা নিজের চোখ থেকে কাজলের কালো ফোঁটা নিয়ে পূর্ব গলায় লাগিয়ে দিলো।তাদের দু'জন'কে দেখে পূর্বের মা রোদের কাছে গিয়ে বললো,
"এ্যাঁহহ।তোর ছেলের চেয়ে আমার মেয়েকে বেশি সুন্দর লাগছে।কোনো পরীর থেকে একটুও কম না।এই নে কালো টিক্কা লাগিয়ে দিলাম।"
ছায়া আহমেদের মতো চাঁদনি মোহাম্মদও রোদের কানের লতি'তে কাজলের চিহ্ন দিলো।চাঁদনি মোহাম্মদের কর্ম দেখে ছায়া আহমেদ ভেংচি দিয়ে বললো,
"তোর মেয়ের চেয়ে আমার ছেলে বেশী সুন্দর!"
"মোটও না।আমার মেয়ে চাঁদের মতো সুন্দর।"
"চাঁদনি তুই কী বললি এটা?চাঁদের নিজস্ব কোনো আলো নেই তারমানে রোদও প্রকৃত সুন্দর না।হাহা"
ছায়া মোহাম্মদের কথা শুনে উপস্থিত সবাই উচ্চস্বরে হেসে ফেললো।এমনকি রোদও হাসছে।চাঁদনি হাসান কিঞ্চিৎ রেগে বললেন,"রোদ তুই হাসছিস ক্যান?আগে তো আমার সাথে তাল মিলাই ঝগড়া করতি।"
চাঁদনি মোহাম্মদে কঠিন দৃষ্টি দেখে রোগ চুপসে গেলো।পূর্ব তাদের থামিয়ে বলল,"আচ্ছা।রোদ পিওর সুন্দর!ঠিক আছে?"
"পূর্বঅঅঅ।তুই আমার ছেলে হয়ে চাঁদনির মেয়েকে সুন্দর বলছিস?"
দুই মহিলা রেগে গেছে দেখে বাকিরা মিটিমিটি হাসছে।তখন আফসোসের স্বরে ছায়া আহমেদ বললেন,
"বুঝেছিস চাঁদনি।ওরা আগের মতো নেই।চল রে যাই।আমাদের দুজনের ঝগড়া করে কোনো লাভ নেই।"
ছায়া আহমের তার বান্ধবীর হাত ধরে সেই স্থান ত্যাগ করলো।নাবিলা কিছুক্ষণ সন্দিহান দৃষ্টিতে পূর্ব-রোদের দিকে তাকিয়ে রাফিয়াকে বললো,
"রাফিয়া তোমার না পানি খেতে ইচ্ছে করছিলো?চলো যাই।"
"পানি?আমি..."
"চলো চলো।"
নাবিলা এক প্রকার টেলেঠুলে রাফিয়া'কে নিয়ে গেলো।সেই জায়গায় তখন শুধু পূর্ব-রোদ ছিলো।রোদ হাত কচলাতে লাগলো।তখন পূর্ব তার কাছে এসে বললো,"কী ব্যাপার শঙ্খপুষ্পি?লজ্জা পাচ্ছো নাকি?"
"ল..লজ্জা?লজ্জা কেনো পাবো?"
"ওহ হো..তাহলে লজ্জা পাও না?ভয় পাও?"
"না।তো..তোমাকে..'
রোদের বলতি বন্ধ হয়ে গেলো যখন পূর্ব তার অনেকটা কাছে চলে এলো।একটুখানি মাথা উচু করে রোদের কপালে চুমু দিলো।তারপর শীতল কন্ঠে বললো," সবসময় এভাবে হাসিখুশি থেকো শঙ্খপুষ্পি!তোমার ভালো'তে আমিও ভালো।"
রোদ পূর্বের বুকে মাথা রাখলো কিছুক্ষণ।তারপর তাদের কানে ভেসে আসলো চাঁদনি মোহাম্মদের কন্ঠস্বর।হয়তো কেক কাটে নতুন বছর শুরু করার জন্য ডাকছে।পূর্ব-রোদ তাড়াহুড়ো করে বাকিদের কাছে গেলো।
।
।
"মেঘ তুই কোথায় যাচ্ছিস?"
"মা আমি একটু নিলয়ের সাথে ইন্ডিয়া যাচ্ছি।কিছু'দিন পর চলে আসবো।"
"কীহ?হুট করে এভাবে?মেঘ,নিলয় যাওয়ার আগে আমাকে জানালো না?"
"মা নিলয়ের সময় ছিলো না।আমি এখন চলে যাচ্ছি।বাবাকে জানিয়ে দিও।"
"নীরা জিজ্ঞেস করলে?"
"নাবু ঢাকায় কিছুদিন থাকবে।আর ও ফোন করলে বলিও অফিসের কাজে বাইরে গেছি।"
"কিন্তু..."
"মা প্লিজ,যা বলেছি তাই করিও।"
"আচ্ছা।"
নিনা হাসান থেকে বিদায় নিয়ে মেঘ রেলওয়ে স্টেশনে উদ্দেশ্য বেরিয়ে পড়লো।এখন নিয়লের কাছে থাকার সময়!নিলয়কে বিপদের মুখে রেখে মেঘ পালিয়ে যেতে পারে না।কোনো দিনও না!
।
।
"মা তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।"
"ধন্যবাদ কেনো?"
"তুমি যদি অমন কন্ডিশন না দিতে তাহলে হয়তো আমি আর রোদ কোনোদিনও ভালো হতাম না।"
"হাহ!এই কথা?শুন পূর্ব তোরা আগে থেকেই ভালোবাসতি সেটা তোদের বুঝানোর জন্য আমি হেল্প করেছি মাত্র।অবশ্য আমার সাথে তিহানও ছিলো।"
"কীহ?তিহান?"
"হুম।একদম তিহানকে বকবি না।ওর জন্য সবটা এতো সহজ হয়েছে।"
"হুহ।আমাকে না জানিয়ে এতোকিছু করলো বলদটা।"
পূর্বের কথা শুনে চাঁদনি মোহাম্মদ শুধু হাসলেন।পূর্ব তার মায়ের রুম থেকে বেরিয়ে নিজের রুমে চলে এলো।এখন সূর্য ডুবুডুবু!তাদের বিবাহ বার্ষিকীর ছোট্ট অনুষ্টান'টাও শেষ হয়ে গেছে।তবে অনুষ্ঠানে থাকা বাকি লোকজন পূর্বের বাড়িতে থেকে গেলো।পূর্ব রুমে ঢুকে দেখলো রোদ আনমোনা হয়ে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে।পূর্ব তার পাশে গিয়ে বললো,
"মুখটা শুকনো কেনো?"
"পূর্ব তুমি সত্যি চলে যাবে?"
"রোদ তুমি আবার শুরু করেছো?"
"আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না পূর্ব।খুব কষ্ট হবে।"
"নিজেকে সামলাও রোদ।ভালোলাগা'টাকে করো উপর নির্ভর করে থেকো না।"
"যাও কানাডা!আর কোনোদিন আসবে না।"
"রোদ তুমি কিন্তু কাল রাতে ঘরটা খুব সুন্দর করে সাজিয়ে ছিলে।"
রোদ চোখের কোণে থাকা অভি বিন্দু মুছে নিয়ে আড়চোখে পূর্বের দিকে তাকালো।সে ভালোভাবে বুঝছে কথা ঘুরানোর জন্য পূর্ব এমনটা বলছে।রোদ পূর্বের কথার উত্তর দিয়ে বললো,"সবকিছু আমি সাজিয়ে ছিলাম।"
"হু।বেশ হয়েছিলো।কিন্তু তুমি সারারাত কেঁদেই কাটালে।"
ওমনি রোদের গলায় কান্নাটা আটকে গেলো।রোদ ঠোঁট উল্টিয়ে কাঁদতে যাবে তখনি পূর্ব রোদের মাথাটা নিজের কাঁদে রাখলো।তার নিজেরও বেশ কষ্ট হবে রোদকে ছাড়া থাকতে।কিন্তু রোদের সামনে কিছু তেই দূর্বল হওয়া যাবে না।নাহলে রোদ আরো নরম হয়ে যাবে।
পূর্ব-রোদের কানে ভেসে আসলো ছায়া আহমেদের কন্ঠস্বর।রোদ চেয়ার ছেড়ে রুম থেকে বেরুতে যাবে তখন পূর্ব পিছু ডাকলো।রোদ ভ্রু-কুচকে পূর্বের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো।পূর্ব রোদের কাছাকাছি এসে বললো,"আমার ফ্লাইট ১০তারিখ।"
"দশ তারিখ" শব্দটা শুনে রোদ থমকে গেলো।দশ তারিখ!তাহলে তো মাত্র চারদিন বাকি।চারদিন পর পূর্ব তিন বছরের জন্য গায়েব হয়ে যাবে?ইচ্ছে করলে যখন তখন পূর্বকে আর ছোঁয়া যাবে না।বিনা কারণে ঝগড়া দেওয়া হবে না।সকাল বেলা পূর্বের চেহারা দেখা হবে না।কেমন কষ্ট এটি?এতো কষ্ট!
[চলবে]
পূর্ব-রোদ🌿(পর্ব-৩২)
✔
md sojib
#পর্ব_৩২
#লেখিকা_আমিশা_নূর
পূর্ব যথেষ্ট ভয়ার্ত হয়ে রোদকে সত্য কথা বলছিলো।মনের এক কোণে জমা আছে কোথাও সত্যিটা জেনে রোদ ভূল বুঝবে নাতো?অভিনয় করছে ভেবে রাগ করবে নাতো?
"পূর্ব,অভিনয় করে প্রেমটা শুরু হলেও ভালোবাসাটা তো সত্যি ছিলো!" রোদের ইতিবাচক কথা শুনে পূর্ব আকাশের তারা হাতে পাওয়া পরিমান খুশি হলো।সাথে কিঞ্চিত ভাবান্তর হয়ে রোদের দিকে তাকালো।রোদ আবারো বললো,
"প্রেমটা যেভাবেই শুরু হোক না কেনো ভালোবাসা'টা মিথ্যা নাকি সত্য সেটা মূল বিষয়।তুমি কেনো ভয় পাচ্ছো আমি ভূল ভাববো ভেবে?তখন আমাদের মধ্যে সাপে-নেউলের সম্পর্ক ছিলো।তাই তোমার স্বপ্ন পূরণের মাধ্যম আমি হওয়ায় তোমার মাথা ব্যাথা ছিলো না।এন্ড এইটা স্বাভাবিক!তাই তুমি নিজের মধ্যে আর গ্লিটি ফিলিং আনিও না।"
রোদ পূর্বের বাহু দুহাতে ধরে তার স্বামীর কাঁদে মাথা রাখলো।এই জায়গা যেনো পরম শান্তির জায়গা রোদের কাছে।পূর্ব রোদের মাথায় চুমু দিলো।পূর্বের শান্তির ঘুমটা আজকে হবে।এতোদিন রোদ দূরে যাবে ভয়ে কিছু ঠিক মতো করতে পারতো না।কিন্তু রোদ এতো সহজে সবটা মেনে নিবে সেটা ভাবেনি।অবশ্য যখন থেকে তাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়েছে তখন থেকে রোদের মধ্যে সংসারিক একটা ভাব।আগের মতো অবুঝ নেই।বুঝদার হয়ে গেছে এক কথায়!
।
।
"কী বলছিস তুই নাবিলা?নিলয় এতোকিছু করেছে?"
"ইন্না-লিল্লাহ!"
"তিহান তুই চুপ থাক।মাঝখানে কথা বললে লাথি দিয়া ট্রেনের নিচে ফেলে দিবো।"
পূর্বের কথায় তিহানের মধ্যে কোনো ভাবান্তর হলো কি-না বুঝা গেলো না।সে মনোযোগ দিয়ে নাবিলা'র অবস্থা বুঝার চেষ্টা করছে।পূর্ব সেদিকে আর মাথা না ঘামিয়ে নাবিলাকে জিজ্ঞেস করলো,
"তুই নিলয়ের সাথে একা ছিলি?যদি নিলয় কিছু করে ফেলতো?"
"কাম অন ইয়ার।তোরা আমাকে ঐ দু'কথায় ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কান্না করা মেয়ে ভেবেছিস?এতো নরম আমি নই।"
"হ্যাএএ!তাই তো নিলয় গদগদ করে তোর প্রেমে পরে গেলো।"
তিহানের কথায় পূর্ব-নাবিলা দুজনে তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো।তিহান তাদের দৃষ্টি বুঝে চুপ হয়ে গেলো।নাবিলা তার দিকে শাসানোর মতো করে তর্জনী আঙ্গুল নাড়লো।তারপর শান্ত হয়ে বললো,
"আমি সাথে করে মরিচ গুড়া আর আমার যে দুটো কাটি ছিলো ওগুলা নিয়ে গেছিলাম।যদি নিলয় সত্যি সত্যি কিছু করতো তাহলে আমিও আমার কাজ করতাম।"
"ইন্না-লিল্লাহ!"
"সবই বুঝলাম কিন্তু নিলয় কোথায় গেলো?"
"এগজ্যাক্টলী সেটা আমিও বুঝছি না।ওর কিছু একটা হয়েছে নাহলে আমাকে ফোন করা অফ করতো না।"
"মানে?" (পূর্ব)
"ও আমাকে প্রতিদিন সকাল ও রাতে ফোন করতো।তবে ও মনে করতো আমি জানি না কে কল করে।"
"ইন্না-লিল্লাহ।তুই কীভাবে জানলি তাহলে?"
"আমার আগেই সন্দেহ হয়েছিলো ওটা নিলয়।ক'দিন আগে মেঘের মোবাইল চেক করলে সিওর হয়।"
নাবিলা'র বক্তব্যে তিহান বিজ্ঞদের মতো "ওহ" বললো।ওরা তিনজন বাড়ির সামনের দিকে বসে ছিলো।নাবিলা সকালেই ঢাকা পৌঁছে যায়।তারপর তার দুই বন্ধুকে একসাথে পেতেই নিলয়ের বিষয়টা আলোচনা করে।নাবিলা'র কাছে এখন একটাই প্রশ্ন,"নিলয় কোথায় গেলো?"
"নাবিলা,রোদ বলেছিলো মেঘ আসবে।ও আসেনি?"
"ইন্না-লিল্লাহ!মেঘ?"
"তুই অফ তিহান!নাবিলা বল"
"পূর্ব তুই কী পাগল?মেঘকে দাওয়াত দেওয়া মানে বিপদকে ডেকে ডেকে সংসারে আনা।আর তাছাড়া আমার যতটুকু মনে হয় মেঘ এবার শোধরে যাবে।"
"কেনো?কী করেছিস?"
"বাদ দেয়।শুন,রাফিয়া'র থেকে শুনলাম রোদ নাকি তোর কানাডা যাওয়ার কথা জেনেছে?"
"হুম।কিন্তু আল্লাহ অশেষ শুকরিয়া যে রোদ সবটা পজিটিভলি এক্সপেক্ট করলো।"
"রোদ কিন্তু নিজেকে একদম সামলাতে পারবে না তুই চলে গেলে।খুব কান্না করবে।"
"হু।"
"কখন ফ্লাইট তোর?"
"দশ তারিখ।"
"কিহ?এতো জলদি?"
"জলদি নাতো অনেক সময় কেটে গেলো।সবকিছু রেডি এখন।"
"ইন্না-লিল্লাহ পূর্ব।রোদ জানে?"
"উহু আজ বলবো।"
"কী ব্যাপার?তোমরা তিন বন্ধু মিলে কী গসুরগসুর ফুসুরফসুর করছো?"
রাফিয়ার কন্ঠ শুনে ওরা তিনজন পেছন ফিরলো।নেভি ব্লু কালারের গাউনের সাথে হালকা সাজে রাফিয়াকে বেশ মানিয়েছে।হাত ভর্তি নীল চুরি যেনো পরিপূর্ণতা!তিহান মুগ্ধ দৃষ্টিতে অল্পখানিক তাকিয়ে বললো,"ইন্না-লিল্লাহ!"
তিহানে বাক্যশুনে রাফিয়ার আগে নাবিলা রেগে গেলো।রাগী স্বরে নাবিলা বললো,
"তোর গার্ল ফ্রেন্ড এতো সুন্দর করে সেজেগুজে আসছে।কই তুই বেবি টেবি বলে জড়ায় ধরবি তা না করে বললি ইন্না-লিল্লাহ?তিহান তুই সারাজীবন নিরামিষ,পান্তা ভাত,কচুর লতিই থাকবি।যত্তসব!পূর্ব চলতো।"
একপ্রকার বিরক্তি নিয়ে নাবিলা পূর্বকে সাথে করে নিয়ে গেলো।তিহান-রাফিয়া সেই জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।তখন তিহান রাফিয়ার অনেকটা কাছে এসে বললো,"যেনো মেয়ে নয়।পরীর সপ্তম রাজ্য থেকে নেমে আসা সদ্য নীল পরি!তোমাকে কারো সাথে তুলনা করা যায় না।তাই তুমি আমার 'ব্লু-লেডি'"
এখন বিকেল হতো চললো। নাবিলা আর পূর্ব ভিতরে গিয়ে দেখে সবকিছু রেডি।তাই হয়তো রাফিয়া ডাকতে এসেছিলো।নাবিলা-পূর্বকে দেখে রোদ তাদের কাছে এগিয়ে গেলো।রোদকে আসতে দেখে নাবিলা পূর্বকে একা ছেড়ে গেলো।
রোদ পূর্বের কাছে এসে বললো,"নাবিলাপু কোথায় গেলো?"
"তোমার হরিচন্দন এখানে আছে কিন্তু তোমার নাবিলাপু'কে লাগবে?কী ব্যাপার?তোমার আর নাবিলা'র মধ্যে কিছু চলছে না তো?"
"মানে?কী চলবে?"
"না মানে তুমি নাবিলা'র প্রেমে পড়ে যাওনি তো।"
পূর্বের এই কথায় রোদ ভালোভাবে বুঝলো সে কী মিন করছে।ওমনি তেড়ে পূর্বকে মারতে গেলে পূর্ব রোদের হাতজোড়া নিজের দখলে নিয়ে রোদকে উল্টোদিকে ঘুরিয়ে তার গাড়ে থুতনি রেখে বললো,
"তোমার কালো জাদু'তে সম্পূর্ণভাবে ফেঁসে গেছি জাদুমন্ত্রী!"পূর্ব সম্পূর্ণ ঘোরে আছে।মাতাল করা কন্ঠস্বর!রোদ থেমে থেমে কেঁপে উঠছে।ঠোঁট জোড়া যেন নড়বে না বলে প্রতিজ্ঞা করেছে।পূর্ব একই অবস্থায় থেকে বললো,"বেশি'র থেকেও বেশি ভালোবেসে ফেলেছি শঙ্খপুষ্পি!"
পাঁচ-ছ' অক্ষরের বাক্যটি বিরতি নিয়ে নিয়ে রোদের কানে বার বার ধাক্কাধাক্কি করছে।একই কথা তার কানে বেজেই চলেছে।পূর্ব পেছন থেকেই রোদের কম্পনে থাকা হাত জোড়ায় নিজের ছোঁয়া দিলো।তখনি তাদের দুজনের কানে ভেসে আসলো,"হাউ রোমান্টিক!তিহান তোমার বন্ধু থেকে কিছু তো শিখতে পারো।"
বাক্যটি শুনে পূর্ব-রোদ দু'জন-দু'জন থেকে খুব দ্রুত দূরে সরে গেলো।লজ্জার আভায় রোদের গাল দুটো হালকা গোলাপি হয়ে গেছে।পূর্ব অসস্তি'তে ভুগছে।তারা হালকা মাথা তুলে দেখলো তিহান,রাফিয়া আর নাবিলা তিনজনই দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে।তখন নাবিলা রাফিয়া'র উদ্দেশ্য বললো,
"উফ রাফিয়া!ফ্রী'তে কতো সুন্দর একটা রোমান্টিক মুভি দেখছিলাম।একদম লাইভ!দিলে তো সব ভেস্তে।তিহান তুই রাফিয়া নিয়া গিয়া রোমান্স কতো প্রকার কী কী শিখা।পূর্ব-রোদ তোমরা কন্টিউ করো..."
নাবিলা'র কথা শুনে রোদের লজ্জার পরিমাণ আরো বেড়ে গেলো।এতো বিব্রতকর অবস্থার সাথে রোদ আজই পরিচিতি হলো।না পারছে নড়ছে,না পারছে কিছু বলতে।তখন পূর্ব আমতা আমতা করে কিছু একটা বলে জায়গা ত্যাগ করলো।এবার রোদও সুযোগ পেয়ে এক দৌড়ে রুমে চলে এলো।ওদের দুজনের পালাতন দেখে বাকি তিন মূর্তি হু হু করে হেসে উঠলো।
।
।
জলন্ত সিগারেট হাতে নিয়ে মেঘ রুমের মধ্যে পায়চারি করছে।কানে বাজছে নাবিলা'র বলা প্রত্যেকটি কথা।মেঘের ইচ্ছে করছে সবকিছু ছেড়ে অনেক দূরে চলে যেতে।এতো বিষন্নতা নিয়ে মেঘের বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করছে না।চোখের সামনে ভেসে উঠছে তার মায়ের হাত জোড় করার দৃশ্য।তারপর পরই ভেসে উঠছে নাবিলা'র চেহেরা।যে তাকে নিজের ভাইয়ের মতো ভালোবাসে।নাবিলা'র ক্ষতি করার পরও এখনো সে তারই ভালো চাই।আর মেঘ কি'না ওদেরই এতো কষ্ট দিলো?
মেঘ নিজের ফোন খুঁজে নিলয়ের নাম্বারে ডায়াল করলো।ওপাশ থেকে জানান দিলো নাম্বারটি বন্ধ আছে।মেঘ নিলয়ের অন্য নাম্বারে ডায়াল করবো।চর্তুথবার রিং হতেই ওপাশ থেকে উত্তর এলো।মেঘ কানে ফোন লাগিয়ে বললো,
"কোথায় তুই?নাবু'কে কী কী বলেছিস তুই?ও তোর এক্স হয়ে ও কে সবটা বললি আর বলার আগে একবারও ভাবলি না ও কষ্ট পাচ্ছে কি'না?কীভাবে পারলি তুই এমনটা করতে নিলয়?"
"আমার মনে হয়েছিলো সবটা বলা উচিৎ তাই বলেছি।"
"আমার বোন কষ্ট পাবে এইটা তোর মাথায় আসেনি?"
"এখন তোর বোন কষ্ট পাবে?তাই না?কাজের বেলায় তো আমাকে একবারও বারণ করিসনি।"
"আমি নাহয় বারণ করিনি কিন্তু তুই?তোর কী বুদ্ধি ছিলো না?"
"মেঘ তুই শান্ত হয়।দেখ আমরা দুজনে ভূল বুঝতে পারছি তাই প্লিজ আর ঝামেলা করিস না।"
নিলয়ের কথায় মেঘ কিছুটা থামলো।পাশে থাকা গ্লাস ভর্তি জল ঢকঢক করে খেয়ে ফেললো।তারপর দুজনে খানিকটা সময় নিশ্চুপ থাকলো।একসময় মেঘ বললো,"কোথায় তুই?"
"রেলওয়ে স্টেশনে আছি!ইন্ডিয়া চলে যাচ্ছি।"
"হুয়াট?তুই ইন্ডিয়া যাচ্ছিস আর আমাকে বলবি না?পাগল হয়ে গেছিস তুই নিলয়?"
"নাহ!বিডি'তে আর আমার কোনো কাজ নেই।নিজের মেয়াদও দিন দিন নিম্নতার দিকে এগোচ্ছে।তাই ভাবলাম মায়ের কাছেই চলে যায়।"
"তাই বলে তুই আমাকে জানাবি না?তোর পাশে আমাকে থাকতে দিবি না?"
"বাদ দে!নাবিলা' আমার ব্যাপারো কিছু জিজ্ঞেস করলে তুই বলবি জানিস না।"
"কিন্তু ও কেনো জিজ্ঞেস করবে?"
"করবে।"
তারপর দুই বন্ধু আবারো নিরবতা বিরাজ করলো।একসময় কলটা কেটে গেলো।হয়তো মেঘের ব্যালেন্স শেষ হয়েছে।অনেকক্ষণ বিছানায় বসে সবকিছুর সমীকরণ মিলালো।তারপর এক দৌড়ে র্যাডি হতে লাগলো।
শত হলেও নিলয় তার বন্ধু! বিপদে-আপদে সবটা সময় ছায়ার মতো পাশে লেগে ছিলো।আজ শেষ মুহুর্তে মেঘ কিছুতেই নিলয়কে একা ছাড়বে না।কোনোদিনও না!এখন নিলয়ের পাশে মেঘকে খুব প্রয়োজন।খু-ব!
[চলবে]
শনিবার, ১২ জুন, ২০২১
পূর্ব-রোদ🌿(পর্ব-৩১)
✔
md sojib
#পর্ব_৩১
#লেখিকা_আমিশা_নূর
<<<<<<<<<<<<>>>>>>>>>>>
পেছন থেকে নিনা হাসানের কন্ঠস্বর আসায় নাবিলা-মেঘ দুজনে
পেছন ফিরে তাকালো।নিনা হাসানের কথা মেঘ কিঞ্চিৎ অবাক হলো।তার মা তাকে রোদের থেকে
দূরে আসতে বললে এইটা সে এক্সপেক্ট করেনি। "মা তুমি কী বলছো?" "দেখ মেঘ,আমি কোনোদিনও
তোর খারাপ চাইনি সেটা তুইও জানিস।তাহলে রোদের পেছনে কেনো পড়ে আছিস?রোদ যদি তোকে
চাইতো তাহলে আমি নীরা তোকে যথেষ্ট সাপোর্ট করতাম।কিন্তু তোকে রোদ চাই না।" "তোমাকে
নাবু বলেছে এসব?" "হ্যাঁ।তুই বাচ্চাদের মতো কেনো করছিস?একটু বুঝ।তুই দয়া করে মেঘ
রোদের সুখের সংসারে ঝামেলা করিস না।হাত জোড় করল বলছি তোকে.." মেঘে মস্তিষ্ক নড়ে
উঠলো।আজ পর্যন্ত কারো সামনে তার মাকে ছোট হতে দেইনি অথচ তার নিজের সামনে তার মা
হাত জোড় করছে।তার মায়ের অনুরোধ দেখে মেঘে অনুতাপ হলো।শীতল চাহনিতে সে তার মায়ের
দিকে তাকালো।এই মহিলা'টি তাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছে সারা জীবন।অথচ মেঘ তার এক
বিন্দু মূল্যও দিতে পারেনি।বরং আজ হাত জোড় করছে।মেঘের ইচ্ছে করছিলো মাটি ফাঁক করে
নিচে ঢুকে যেতে।তার মায়ের এমন চেহেরা মোটেও সহ্য হচ্ছে না।মেঘ মনে মনে ঠিক করে নিলো
তার পরিবারের জন্য হলেও রোদকে ভূলে যাবে।রোদের কাছে দ্বিতীয়বার যাবে না।মেঘ তার
মায়ের হাত জোড়া নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললো,"মা তুমি এভাবে আমার কাছে....কথা
দিচ্ছি মা আর কোনোদিন রোদের কোনো সমস্যা হয় এমন কিছু আমি করবো না।" নিনা হাসান
মেঘের কপালে আলতো করে চুমু দিলো।এবার যেনো তিনি সন্তুষ্ট!নাবিলার মাথায় হাত বুলিয়ে
দিয়ে তিনি বেরিয়ে গেলেন। নিনা হাসান রুম ত্যাগ করতে নাবিলা মেঘ'কে উদ্দেশ্য করে
বললো,"মেঘ,জীবন আমাদের অনেকবার সুযোগ দে আজ একবার নাহয় জীবন'কে সুযোগ দিয়ে দেখ।"
"হুম।" "তুই কী ঢাকা যাচ্ছিস?" "নাহ।" "আর একটা কথা।" নাবিলা'র তিন অক্ষরের বাক্যটা
শুনে মেঘ ভ্রু-কুচকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালো।একরাশ সংকোচ নিয়ে নাবিলা
বললো,"তুই নিলয়'কে ওর অসৎ পথে বাঁধা কেনো দিসনি?" কথাটি শুনে বিদ্যুৎয়ের গতিতে মেঘ
চমকে গেলো।হঠাৎ নিলয়ের কথা কেনো তুললো নাবিলা?তারওপর এ কথা কেনো বললো?মেঘ
নাবিলা'কে কিছু বলতে যাবে তার আগে মেঘের মুখের সামনে পাঁচ আঙ্গুলের হাতটি রেখে
বললো, "ব্যস!আমি জানি তুই কী জিজ্ঞেস করবি।আমি কীভাবে এসব জানলাম তা তো?নিলয় আমাকে
সবটা বলেছে।কারণ নিলয়ের এক্স ছিলাম আমি।নিলয়ের যতো মেয়েদের হার্ট করেছে না তার
মধ্যে তোর বোনও একজন।তোর বোনের মনটাও নিলয় ভেঙ্গেছে।তারজন্য নিলয় যতোটা না দায়ী তার
চেয়ে বেশী তুই দায়ী।কী করে পারলি তুই এমনটা করলে?আমি না আগে 'সৎ সঙ্গে স্বর্গ বাস
অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ' প্রবাদ আছে না?ওটা একদম বিশ্বাস করতাম না।কিন্তু তোকে দেখে মনে
হচ্ছে কথাটি একদম সত্য!মাথা কী বুদ্ধি ছিলো না তোর?কী করে পারলি অতোগুলা মেয়ের মন
নিলে পুতুল খেলা খেলতে?তোদের বিবেগ একটুও বাধা দেইনি?অাজ বাঁধা দিলো হয়তো তোর বোন
যথেষ্ট ভালো থাকতো।মনটা কাঁচের মতো ভেঙে টুকরো টুকরো হতো না।" মেঘের কথা বলা বন্ধ
হয়ে গেলো।এখন তাকে অপরাধবোধ,অনুসূচনা ঘিরে রেখেছে।মেঘ নিলয়কে জাস্ট মজার ছলে উৎসাহ
করতো।এটা ভবিষ্যৎে কী প্রভাব ফেলবে সেটা কোনোদিন ভাবেনি।ভাবলে আজ হয়তো সেই মেয়েদের
জায়গায় তার বোন থাকতো না।নাবিলা'র প্রত্যেকটা কথায় সত্য!সুক্ষ্ম সুচের মতো
প্রত্যেকটা বাক্য গায়ে ফুটে যাচ্ছে।মেঘের খু-ব থেকে খু-ব অপরাধবোধ হচ্ছে। । । রাত
বারোটা বাজতেই তিহানের মেবাইলে এলার্ম বেজে উঠলো।যার ফলে পূর্ব যথেষ্ট অবাক হয়ে
তিহানের উদ্দেশ্য বললো, "রাত বারোটাই এলার্ম?" "ইন্না-লিল্লাহ!" "কী
ইন্না-লিল্লাহ?রাফিয়া সাথে ব্রেকআপ করে গাঁজা টাজা খেয়েছিস নাকি?"
"ইন্না..লিল্লাহ!রাফিয়া'র সাথে ব্রেকআপও হয়নি গাঁজাও খাইয়ি।ইন্না-লিল্লাহ।" "তাইলো
এলার্ম?" পূর্বের কথায় তিহান হাবলা'র মতো চেহেরা করলো।বারোটায় এলার্ম দিয়েছিলো কারণ
রোদ বলেছে পূর্বকে বারোটায় বাসায় পাঠিয়ে দিতে।তিহান রাস্তায় হাঁটতে হাটঁতে
বললো,"এলার্ম দিলাম কারণ আমাকে এখন বাসায় যেতে হবে।তুইও যা।" তিহানে কথায় পূর্বের
চেহেরা দেখো মনে হলো সে এক্ষুনি তিহানে কাঁচা খেয়ে ফেলবে।এতোক্ষণ ধরে বাইরে রেখেছে
একটা ইম্পর্ট্যান্ট কাজে করবে বলে।আর এখন সে নিজে ব্যাস্ততা দেখাচ্ছে।ওদিকে রোদ একা
বাড়িতে কী করছে ভেবেই পূর্বের ঘাম বের হচ্ছে।যদিও পূর্ব রোদকে আগেই জানিয়েছে বাসায়
যেতে রাত হবে।তিহানের পিটে কয়েকটা চড় দিলো পূর্ব।তারপর বিরবির করে তিহানকে একধপা
গালি দিয়ে রিকশায় উঠলো।এখন বাড়ির পথ ধরতে হবে। রোদ পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু তৈরি
করে ফেললো।রাফিয়া সাহায্য করতে চাইছিলো কিন্তু একবারের জন্যও ও কে কিছু করতে
দেইনি।রোদ সবকিছু নিজের হাতে করেছে।নিজের কাজ নিজে করতে যেনো এক আলাদা মজা পাওয়া
যায়।তাই রোদ এসবের ভাগ কাউকে দে না।সবকিছু করে রোদ পূর্বের জামা নিতে তার আলমারি
খুললো।রোদকে অবাক করে দিয়ে শার্ট নড়াচড়া করতেই কিছু কাগজ পেলো। । । পূর্ব এসে কলিং
বেল বাজাচ্ছিলো।তখন দেখলো দরজা আছে।তা দেখে পূর্ব কিঞ্চিৎ ভয় পেলো।তাড়াহুড়ো করে
বাড়ি প্রবেশ করে চারিদিকে তাকালো।কিন্তু রোদের কোনো আবাশ পাওয়া গেলো না।পূর্ব এক
দৌড়ে নিজের রুমে গেলো।রুমে ঢুকেই পূর্বের চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। রুমে লাইট জ্বলছে না
কিন্তু চারিদিকে মোমবাতি'র রাজ্য সাথে গোলাপ পুষ্প।রংধনুর সাত রঙে রাঙানো
বেলুন!এতোকিছুর মধ্যে পূর্বের চোখ শুধু রোদকে খুঁজছে।পূর্ব রোদের খুজে বেলকোনিতে
গিলো।এক পলক সেই জায়গায় দেখলো রোদ নেই।পূর্ব কয়েকবার রোদের নাম ধরে ডাকলো।কিন্তু
কোনো সাড়া পাওয়া গেলো না।পূর্ব অস্থিরতা কমিয়ে নিজেকে শান্ত রেখে কান খাঁড়া করে
দূরে শব্দ শুনার চেষ্টা করলো। চারদিকে পিনপিনে নিরবতা।কোনো আওয়াজ যেনো আসছে
না।পূর্ব আরো একটু মনোযোগ দিলো।এবারে কারো নাক টানার সাথে হালকা কান্নার আওয়াজ
এলো।পূর্ব ভালোভাবে বুঝলো এটা রোদ ছাড়া অন্য কেউ নই।পূর্ব সেই কান্নার শব্দ অনুসরণ
করে বেলকোনিতে গেলো।বেলকোনির চারিদিকে পূর্ব তাকিয়ে দেখলো সেই স্থানের এক কোণে
গুটিসুটি হয়ে হাটু গেড়ে বসে রোদ হাতের পিট দিয়ে চোখের জল মুছচে। পূর্ব যখন বুজতে
পারলো রোদ কাঁদছে ওমনি বুকের ভিতর তোলপাড় সৃষ্টি হলো।অটোমেটিক্যালি প্রশ্নের দল
তাকে ঘিরে ধরলো।পূর্ব ধীরে পায়ে সামনে এগোলো।তার ভিতর অস্থিরতা বেড়েই চলছে। পূর্ব
এসেছে আবাশ পেয়ে রোদ মাথা তুলে তাকালো।চোখ থেকে জল নদীর বাঁধ ভাঙ্গা'র মতো
জরছে।পূর্বোর দেখা পেয়ে রোদের কান্নার গতি আরো বেড়ে গেলো। সে দৌ-ড়ে পূর্বের উপর
ঝাঁপিয়ে পড়লো।এখন তার কান্নার শব্দ প্রকর হয়েছে।পূর্বকে দেখে আবেগে যেনো কান্না
বেড়ে গেলো। এভাবে জড়িয়ে ধরায় পূর্ব হতবাক হয়ে গেলো।তখন রোদ কাঁদতে কাঁদতে বললো,
"আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না।কখনো না!" রোদ পূর্ব'কে এতোটা শক্ত করে জড়িয়ে
ধরেছে যে পূর্বের ঘাড় ব্যাথা হয়ে যাচ্ছে।রোদের লম্বা নখের জন্য গলায় আঘাত
পাচ্ছে।এতে পূর্ব-রোদ দুজনেরই হুস নেই।পূর্ব বুঝতে পারছে না রোদ কাঁদছে কেনো।তবে
রোদের কান্নায় সমান কষ্ট তারও হচ্ছে।রোদের কান্না পূর্বের একদম সহ্য হয় না।মোটও না!
এভাবে কতক্ষণ জড়িয়ে ধরেছিলো রোদ তা জানে না।পূর্বের আবছা ডাকে রোদের ঘোর
কাটলো।পূর্ব তাকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দাঁড় করালো।রোদ হাতের পিট দিয়ে বাচ্চাদের
মতো চোখের জল মুছচে।পূর্ব হালকা স্বরে বললো, "কাঁদছো কেনো?কী হয়েছে?কেউ কিছু
বলেছে?" অমনি রোদের কান্না বেড়ে গেলো।রোদ আবারো কান্না করায় পূর্ব রোদের মাথা নিজের
বুকে রাখলো।একসময় রোদ অভিমানি কন্ঠে বললো,"তুমি কানাডা চলে যাবে।" চার অক্ষরের
বাক্যটি পূর্বের কান অবধি আসতেই পূর্বের হাত আলগা হয়ে গেলো।রোদ তার দিকে মাথা তুলো
তাকালো।পূর্ব এক চিমটি পরিমাণ অবাক হলো।তবে মুখের উপর কালো ছায়া ভর করলো।বুকের
বা'পাশে কষ্ট হচ্ছে,চিনচিন অনূভুতি হচ্ছে রোদ তাকে ভূল বুঝলো ভেবে।এখন রোদ কী
করবে?তাকে ছেড়ে চলে যাবে?নাকি অপেক্ষা করবে? "তোমার শার্ট নিতে গিয়ে পাসপোর্ট,ভিসা
আর কিছু কাগজ পেলাম।তুমি কী সত্যি আমাকে ছাড়া চলে যাবে পূর্ব?" রোদ একরাশ অভিযোগ
নিয়ে পূর্বের দিকে তাকালো।পূর্ব নিশ্চুপ!রোদ ধরে নিলো নিরবতা সম্মতি'র লক্ষণ।রোদের
খুব কষ্ট হলো!যাকে এতোটা ভালোবেসেছে সে তাকে ফেলে চলে যাচ্ছে।তাও অনেক দূরে....রোদ
অনেকক্ষণ থেমে চোখের জল মুছে আবারো বললো, "তুমি যদি আমাকে ফেলে চলে যেতে পারো
ফাইন।আমিও মেনে নিলাম।তুমি তো আর আমার কেউ না।তুমি না থাকলে তো এমনটা নয় যে আমি
খাবো না,নিজের খেয়াল রাখবো না।তুমি যত ইচ্ছে দূরে যাও।আমি তো আর তোমাকে মিস করছি
না।এস ইউর উইশ!তুমি তো আর আমার ফিউচার সন্তানের বাবা নই যে..." রোদকে আর কিছু বলতে
না দিয়ে পূর্ব শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।হু হু করে রোদ আবারো কেঁদে দিলো।আজ যেনো চোখের
জল কিছুতেই বাঁধা মানছে না।যতইচ্ছে কেঁদে নিচ্ছে রোদ।পূর্বের চোখ জোড়া ভিষণ রকমের
লাল হয়ে গেছে।তারও কান্না পাচ্ছে।কিন্তু ছেলেদের তো আর মেয়ে দের মতো কাঁদতে
নেই।তারা নিরবে কাঁদে!একা কাঁদে! । । "তিহান তোমার ভাগ্য অনেক ভালো যে পূর্বের মতো
কানাডা যাওয়া ডিসিশন নাওনি।" "ইন্না-লিল্লাহ!আমি কি করলাম?" "কিছু করো নি।কিন্তু
কানাডা-টানাডা যাওয়ার চিন্তা মাথায় আনোনি সেটা ভালো।নাহলে তোমাকে মেরে ভর্তা করে
বাসায় মিনি কুত্তা'কে খেতে দিতাম।" "ইন্না-লিল্লাহ!আল্লাহ বাঁচালো।" "হু হু।নাহলে
হাত-পা ভেঙ্গে.." "হয়েছে বুঝেছি তোমার থ্রেট।" তিহান কথায় রাফিয়া হেসে
ফেললো।ফোনের এপাশ থেকে তিহান মন ভরে রাফিয়ার হাসিটা অনুভব করলো।রাফিয়া'র মতো
অন্যরকম মেয়ে তিহান প্রথম দেখলো।তিহানের মাঝেমাঝে মনে হয় পৃথিবী একদিকে থেকে
অন্যদিকে উল্টে গেলেও রাফিয়া পরিবর্তন হবে না।সবকিছুর মাঝে তিহানের ভাবতেই সুখি মনে
হয় যে রাফিয়া শুধু তার!তিহান মনে মনে প্রার্থনা করলো পূর্ব-রোদের যেনো সব ঠিক হয়ে
যায়। । । "তুমি ক'বছর থাকবে কানাডা?" "তিন বা চার বছর।তারপর জব ওখানে করলে কানাডাই
থেকে যাবো।" পূর্বের কথায় রোদ তারদিকে একচামচ পরিমাণ কষ্ট নিয়ে তারদিকে তাকালো।সে
বুঝার চেষ্টা করলো পূর্ব মজা করছে কি-না।কিন্তু পূর্বকে যথেষ্ট স্বাভাবিক
দেখালো।পূর্বের কী একটুও কষ্ট হচ্ছে না তাকে ছেড়ে যেতে?রোদ অভিমানি কন্ঠে
বললো,"তাহলে আমি এবাড়িতে থেকে কী করবো?ওবাড়িতে চলে যাবো কালকে একেবারের জন্য।"
রোদের কথায় পূর্ব ভালোভাবে বুঝলো রোদ অধিক আঘাতে এমনটা বলছে।পূর্ব রোদের হাত দুটো
নিজের হাতে ছুঁইয়ে বললো,"তিন বছর পর চলে আসবো।যদি কানাডা জব হয় তাহলে তোমাকে সাথে
করে নিয়ে যাবো।" সাথে সাথে রোদ উত্তর দিলো,"না আমি যাবো না।তুমি একেবারে বিডি চলে
আসবে নয়তো..নয়তো আমি তোমাকে ছেড়ে চলে যাবো।" "রোদ আমি কানাডায় স্যাটেল হবো এইটা
আমার ড্রিম।" "ড্রিম নাহয় আমি।যেকোনো একটা চুস করো আর এক্ষুনি করো।" পূর্ব শীতল
দৃষ্টিতে রোদের দিকে তাকালো।মেয়েটা একদম জেদ ধরে বসে আছে।অবশ্য জেদ হওয়াটাও
স্বাভাবিক।পূর্ব আগে থেকেই জানতো রোদ তাকে কানাডা স্যাটেল হতে দিবে না।পূর্ব নিচু
স্বরে বললো,"ঠিক আছে।আমি তিনবছর পর চলে আসবো।" "সিওর?" "হুম।" রোদের মনে ক্ষীণ আশার
আলো জাগলো।পূর্ব একেবারে বাংলাদেশে থাকবে এটার খুশিতে তিনবছর দূরে থাকবে সেই দুঃখটা
চাপা পড়ে গেলো।পূর্ব খানিকটা সময় নিয়ে বললো, "রোদ,আমি তোমার সাথে প্রথমের দিকে
অদ্ভুত রকমের বিহেভ করায় অবাক হওনি?" "কখন?" "তোমার পরিক্ষার সময়।" "ওওহ।হ্যাএএ
হয়েছিলাম।তবে তুমি এমনটা কেনো করেছিলে?" "রোদ তোমার থেকে কিছু লুকিয়ে আমি আমাদের
বিবাহিত জীবনের নতুন আর একটা বছর শুরু করতে চাই না।তোমার সাথে ভালো ব্যবহার বাধ্য
হয়ে মায়ের কথায় করেছিলাম।নাহলে মা আমাকে কানাডা যাওয়ার টাকা,আর সাথে পড়াশোনার জন্য
বিশ লাখ টাকা টাও দিতো না।আমি সরি!প্রথমে তোমার সাথে অভিনয় করার সময় ভয় হয়েছিলো
তুমি আমার প্রেমে পড়ে যাবে ভেবে।কিন্তু অদ্ভুত ভাবে আমিই তোমাকে ভালোবেসে ফেলি।"
পূর্ব যথেষ্ট ভয়ার্ত হয়ে রোদকে সত্য কথা বলছিলো।মনে এক কোণে জমা আছে কোথাও সত্যিটা
জেনে রোদ ভূল বুঝবে নাতো?অভিনয় করছে ভেবে রাগ করবে নাতো? [চলবে]
পূর্ব-রোদ🌿(পর্ব-৩০)
✔
md sojib
#পর্ব_৩০
#লেখিকা_আমিশা_নূর
<<<<<<<<<<>>>>>>>>>>
আজ কোনো প্রথম মেয়েকে নিলয় টাচ করেনি।তবুও নাবিলা যেনো অন্য রকম।মাতাল করা মতো ঘ্রাণ নিলয়ের নাকে বেঁধে গেলো।কালো শাড়ি'টা নাবিলা'র সৌন্দর্য আরো বৃদ্ধি করেছে। নাবিলা মুখে তাকা তীল চিহ্ন যেনো নাবিলা'র সৌন্দর্যের পরিপূর্ণতা!খুব কষ্ট হয় নিলয়ের যখন মনে পরে নাবিলা অন্যকারো হয়ে যাবে।কিন্তু নিয়তির খেলা তো কেউ আটকাতে পারে না।
নাবিলার নিজের মধ্যে হুস আসায় তাড়াতাড়ি দাঁড়িয়ে পড়লো।আমতাআমতা করে নিলয় বললো টেবিলের সামনে গিয়ে চেয়ার টেনে বললো,"বসো।'
"এসব কী?"
"কিছুই না।ক্যান্ডেল লাইট ডিনার উইথ ইউ।"
নাবিলা'র স্নায়ু উত্তেজিত হলো।এত্তোক্ষনে নাবিলা এটুকু বুঝলো যে নিলয় তার সাথে শুধুমাত্র টাইম স্পেন্ড করার জন্য ডেকেছে।নাহলে এতোকিছুর আয়োজন করতো না।নাবিলা নিলয়'কে কোনো প্রশ্ন করলো না বরং চেয়ারে গিয়ে বসলো।
।
।
"পূর্ব দরজা খুলো।দেখো আমি আর কোনোদিন মেঘের সাথে কথা বলবো না।পূর্ব..."
এখন প্রায় রাত বারোটা।পূর্বের দরজা খুলার কোনো নামই নেই।রোদ অনেকবার ডেকে গেছে কিন্তু প্রতিবারই হতাশ হয়েছে।রোদ মনে মনে কঠোর প্রতিজ্ঞা করেছে যে পূর্বের কাছ থেকে কোনোদিন কিছু লুকাবে না।ডাকতে ডাকতে রোদ একসময় দরজার কাছেই বসে পড়লো।
পূর্বের খুব রাগ হচ্ছে রোদের উপর।মেঘের সাথে কথা বলছিলো আর সেটা লুকালো?রোদ যে এতোক্ষণ ধরে ডাকছিলো তা পূর্ব শুনছিলো কিন্তু কোনো সাড়া দে নি ইচ্ছে করে।কিন্তু পাঁচ মিনিট হয়ে গেলো রোদের কোনো আওয়াজ আসছে না।পূর্ব একবার ভাবলো ঘুমিয়ে পড়বে।পরক্ষণে আবার রোদের কথা মাথায় আসায় সব রাগ সাইড করে দরজা খুললো অমনি রোদের কান্না-কান্না চেহেরা দেখা গেলো।পূর্ব কিছু বলতে যাবে তার আগেই রোদ বলে উঠলো,"পূর্ব আ'ম সরি।আর কোনোদিন এমনটা করবো না।মেঘের সাথে আমার কী কথা...."
"শুনতে চাইনা আমি কী কথা হয়েছে।"
সূর্য মোহাম্মদের বলা কথা অনুযায়ী রোদ পূর্বের সামনে ঠোঁট উল্টিয়ে কান্না করে দিলো।অমনি পূর্বের সব রাগ হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো।হাত ধরে রোদকে রুমে এনে দরজা বন্ধ করে দিলো।তারপর বার বার অনুরোধ করলো কান্না থামাতে কিন্তু রোদের কান্না থামানোর কোনো নামই নেই।শেষমেশ পূর্ব বললো,
"মেঘের সাথে কী কথা হয়েছে বলো.."
রোদ যেনো এই একটি কথা অপেক্ষা করছিলো।অমনি গদগদ করে মেঘের সাথে কী কী কথা হয় সবটা বলে।সবশুনার পর পূর্ব বলে,
"তুমি আমাকে রাতে বলে দিলেই পারতে..."
"তুমি রাগারাগি করবে তাই আমি রাতে বলিনি।ভেবেছিলাম মেঘ আসলে সবটা বলবো।"
"মেঘের সমস্যা'টা কী বুঝলাম না।আমরা সুখে সংসার করছি এইটা ওর সহ্য হচ্ছে না?"
"পূর্ব,মেঘ নাহয় পরশু এসে দেখে যাক।"
"কিন্তু পরশু কী স্পেশাল কিছু?"
পূর্বের কাছ থেকে রোদ ম্যারেঞ্জ ডেইটের বিষয়টা লুকিয়ে রাখলো।পূর্বের কথায় রোদ বললো,"সামথিং স্পেশাল!"
"আমাকে বলো।"
"নাহ।সারপ্রাইজ!"
।
।
আজ পূর্ণিমা!চাঁদ চারিদিকে নিজের সম্পূর্ণ আলো বিলিয়ে দিচ্ছে।নাবিলা দোলনায় ভাবান্তর হয়ে বসে আছে।রাত এখন ১টা!নিলয় তার সামনে চাঁদের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে।নাবিলা তার থেকে কিছু শুনার অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।অপেক্ষার প্রহর কাটিয়ে নিলয় বলতে শুরু করলো,
"জীবনে প্রথম প্রেম করেছিলা রুমি নামের মেয়ের সাথে।প্রপোজটা আমি নিজে করেছিলাম।প্রথম আবেগময় অনুভূতি'র সৃষ্টি হয় ইন্টারের রুমিকে নিয়ে।আমাদের দুজনের মধ্যে বনিবনা না হওয়ায় ছয়মাসের মধ্যে ব্রেকআপ হয়ে যায়।তার তিনমাস পর আবার প্রেম করলাম তবে সেটা রুমি'র সাথে পাল্লা দেওয়ায়।রুমি রিলেশনে যায় তখন আমিও তাকে দেখিয়ে প্রেম করতাম।এরপর কলেজে আরো ক'জনকে ভালো লেগেছে জানিনা।হঠাৎ একদিন জানতে পারি মায়ের ক্যান্সার।তখন আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিলো না।কিন্তু যেভাবে হোক মা'কে সুস্থ করতে হতো।তখন মেঘ আমাকে বুদ্ধি দে আমার গার্লফ্রেন্ডের কাছ থেকে টাকা নিতে।আমার হাতে আর কোনো অপশনও ছিলো না।তাই আমি গার্লফ্রেন্ডের কাছ থেকে টাকা ধার নিই।মায়ের চিকিৎসা'র জন্য শুধু অল্প টাকা না আরো বেশি প্রয়োজন ছিলো।তারপর তোমার সাথে আমার পরিচয় হয়।তোমার আইডি'র নাম ছিলো "নী রা"।ভেবেছিলাম তুমি বড় লোকের মেয়ে তাই টাকা উসুল করা সহজ হবে।আমার এসব কর্মে কেউ বাঁধা দেইনি।বরং মেঘ উৎসাহ দিতো।শেষে তুমি যখন বললে আমেরিকা থেকে চলে আসবে তখন রাগ হয়েছিলো।তিন তিনটে বছর তোমার পেছনে নষ্ট করলাম অথচ কোনো লাভই নেই?শেষমেশ মাকে ইন্ডিয়া নিয়ে সেখানকার চিকিৎসা চালানো হয়।আর দেখতে দেখতে ইন্ডিয়া'তে বাড়ি তৈরি করে ফেলি।সব টাকা দিয়েছিলো আমাকে অনন্য নামের একটি মেয়ে।ওর সাথে প্রেমের সম্পর্কটা শেষ করে অনন্য নিজে।তারপর ছয়মাস আমি একা ছিলাম।বিডি'তে এসে তোমার সাথে দেখা।কখনো ভাবিনি কারো জন্য নিজে এতোটা পাগলামো করবো।কিন্তু নাবিলা তোমার সাথে যে এটাই আমার শেষ দেখা।"
নিলয় পেছন ঘুরে দেখলো নাবিলা আরামে দোলনায় ঘুমাচ্ছে।নাবিলা'র ঘুমন্ত চেহেরা দেখে নিলয় আরো গলে গেলো।চুপি চুপি সে নিজের রুম থেকে ছাদর এনে নাবিলা'র গায়ের উপর টেনে দিলো।তারপর সামনের চেয়ারে বসে এক ধ্যানে নাবিলা'র দিকে তাকিয়ে রইলো।এই দেখা যেনো কোনোদিন শেষ হওয়ার নই!
।
।
পূর্বের ঘুম ভাঙ্গতে দেখলো রোদ তার বাহু দুহাতে ধরে রেখেছে।পূর্ব এগিয়ে রোদের কপালে চুমু দিলো।এই মেয়েটাকে ছাড়া পূর্বের এক মুহূর্তেও কাটে না।কানাডা গিয়ে কীভাবে থাকবে সে বুঝতে পারছে না।রোদ যখন জানতে পারবে পূর্ব কানাডা গেছে তখনই বা কী করবে?আবারো ভূল বুঝবে না তো?পূর্ব মনে মনে ঠিক করে নিলো রোদকে সবকিছু পরশু জানিয়ে দিবে।
।
।
সূর্যের কড়া রশ্মি একদম চোখ বরাবর এসে পড়তেই নাবিলা চোখ কুচকে নিলো।গায়ে থাকা ছাদর টেনে মুখ ঢেকে দিলো।পরক্ষণে নাবিলা'র কাল রাতের কথা মাথায় আসায় ঘুম ছেড়ে উঠে বসলো।এখনো সে দোলনায় আছে।নাবিলা চারপাশে চোখ বুলালো।সবকিছু কাল রাতের মতো আছে।নাবিলা'র মনে প্রশ্ন জাগলো নিলয় কোথায়?আশে পাশে থাকিয়ে মোবাইল খুঁজলো তখন মাথায় আসলো মোবাইল কাল রাতে নিলয়ের রুমে রেখেছিলো।নাবিলা দোলনা ছেড়ে নিচে গেলো।তার চোখ জোড়া নিলয়কে খুজছিলো।নাবিলা নিলয়ের রুমে গিয়ে দেখলো তার মোবাইল টেবিলে রাখা৷নাবিলা মোবাইল হাতে নিয়ে দেখলো মেবাইলের নিচে সাদা কাগজ রাখা।নাবিলা কাগজটি তুলে নিয়ে পড়তে শুরু করলো,
"শুভ সকাল পাখি!
আমি তোমাকে বলেছিলাম আমার সাথে এক রাত কাটাতে।আর দেখো কাল রাত'টা কাটিয়ে দিলে।রাত কাটানো মানে শারীরিক সম্পর্ক নই শুধু আড্ডা দেওয়া,একসাথে রাত পার করা কেও রাত কাটানো বলে।অনেক ধন্যবাদ তোমাকে একটা রাত আমাকে দেওয়ার জন্য!বাড়িতে আমি নেই তাই খোঁজে পাবে না।নাস্তা রাখা আছে টেবিলে।খেয়ে নিও!"
চিরকুট'টা পড়ে নাবিলার অনুভূতি'টা কেমন হলো সে জানে না।শাড়ি পাল্টিয়ে নাবিলা নিজের ড্রেস পড়ে নিলো।সাথে ব্যাগে করে আনা মরিচ গুঁড়া,দুটো ছোট কাটি আছে কি'না চেক করলো।রাতে যদি নিলয় উল্টা পাল্টা কিছু সত্যি করতো তাহলে মার্ডার করেই যেতো।অবশ্য সেই চিন্তা ভাবনা করেই নাবিলা এসেছিলো।কারণ আর যাই হোক নাবিলার মতো কঠিন মেয়ে অতো সহজে হার মেনে নিবে না।রুম থেকে বেরিয়ে নাবিলা নিলয়ের রাখা নাস্তার দিকে তাকায়নি।সে সোজা বাইক নিয়ে বেরিয়ে এলো।
।
।
"আম্মি তোমরা কোথায় যাচ্ছো?"
"একটু ছোট'র কাছে যাচ্ছি আমি।কাল চলে আসবো।"
"বাবাই যাবে?"
"হুম।"
"আচ্ছা।"
"পূর্ব কোথায়?"
"রুমে আছে।"
"আমি ডাকছি বল।"
চাঁদনি মোহাম্মদের আদেশ পেয়ে রোদ তাদের রুম থেকে বেরিয়ে নিজের রুমের দিকে গেলো।রোদ বুঝতে পারছে না হঠাৎ করে তার শ্বশুর-শ্বাশুড়ি ঘুরতে কেনো যাচ্ছেন।তবু এতে রোদের ভালোই হচ্ছে।এলোমেলো হেটে রোদ রুমে এসে পূর্বকে খবরটা জানালো।দুজনে বের হয়ে চাঁদনি মোহাম্মদ এবং সূর্য মোহাম্মদ'কে বিদায় জানালো।
রুমে এসে পূর্বের আড়ালে রোদ রাফিয়াকে কল করলো,
"রাফিয়া তোকে আমার একটা কাজ করে দিতে হবে।"
"কী কাজ?"
"তিহান ভাইয়া'কে ফোন করে বলবি পূর্বকে রাত বারোটা অবধি বাইরে রাখতে।"
"ক্যান ক্যান?"
"তুই আমার কাছে চলে আয় তোকে সবটা জানাবো।"
"কখন যাবো?"
"এক ঘন্টা বাদে আসলে হবে।আর শুন তোকে কিছু জিনিস বলছি।আসার সময় সাথে করে নিয়ে আসিস।"
"ওকে।"
কী কী আনতে হবে তার লিস্ট রোদ রাফিয়া'কে মেসেজ করে দিলো।এখন রোদের অর্ধেক কাজ রাফিয়া করে দিবে।বাকি কাজটা রাফিয়া আসলে করবে।এখন নাবিলা'কে ফোন করে জানাতে হবে।
।
।
নাবিলা ঢাকায় যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে রুম থেকে বেরুতে যাবে তখন দেখলো মেঘ নিজের রুমে র্যাডি হচ্ছে।নাবিলা ভ্রু-কুচকে মেঘের রুমে ঢুকলো।পূর্ব নাবিলাকে ফোন করে মেঘের কথা সবটা জানিয়েছে।তাই নাবিলা সোজাসাপ্টা বললো,
"কোথায় যাচ্ছিস তুই?"
"নাবু তুই?ঢাকা যাচ্ছিলাম। কেনো?"
"ভাই তুই পাগল হয়ে গেছিস?তোর মাথায় আছে তুই কী করছিস?"
"বুঝলাম না তোর কথা আমি।"
মেঘ নাবিলা'র কথায় কোনো ভাবান্তর দেখাচ্ছে না।সে নিজের মতো আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের চুল আঁচড়াচ্ছে।নাবিলা কঠিন কন্ঠে বললো,"এই দিকে তাকা তুই।",
নাবিলা'র কঠোর আদেশ শুনে মেঘ তার দিকে ঘুরে তাকালো।এতোদিনে তাদের সম্পর্ক আসল ভাই-বোনের মতো হয়েছে।আর মেঘ যেনো নাবিলা'র কথাই বাধ্য।
শীতল কন্ঠে নাবিলা বললো,"তুই সত্যি রোদকে ভালোবাসিস?"
"হ্যা।"
"না তুই ভালোবাসিস না।তুই যদি রোদকে ভালোবাসতি তাহলে রোদের খুশিতে আগুনে ঘি ঢালার মতো হতো না।"
"তুই জানিস আমি কোথায় যাচ্ছি?"
"হুম জানি।ভাই তুই যেটা করছিস সেটা সম্পূর্ণ ভূল।পূর্ব-রোদ দুজন দুজনকে যথেষ্ট ভালোবাসে।এন্ড দে আর সো হ্যাপি।মাঝখান থেকে তুই যদি রোদকে উল্টা পাল্টা কন্ডিশন দিস তাহলে ওদের মধ্যে ঝামেলা হবে।আর ঝামেলা হওয়া মানে এমনটা নয় যে রোদ তোর কাছে আসবে।রোদ শুধুমাত্র পূর্বকে ভালোবাসে।তোকে কিন্তু একবিন্দুও পছন্দ করে না।নিজেকে ছোট কেনো করছিস?কতো মেয়ের জীবন নিয়ে খেলবি তোরা?তোদের নিয়ে মানুষ কী ভাবছে সেটা একবারও মাথায় আনিস না?"
নাবিলা'র প্রত্যেকটা কথা মেঘ মন দিয়ে শুনছিলো।কিন্তু শেষে 'তোরা' শব্দটা শুনে মেঘ হকচকিয়ে উঠলো।মেঘের সাথে নাবিলা আর কাকে সম্মোধন করছে?
"মেঘ তুই রোদের থেকে অনেক বেটার মেয়ে পাবি।"
"হ্যা।রোদের থেকেও ভালো মেয়ে পাবি যে আমার ছেলেকে ভালোবাসবে।"পেছন থেকে নিনা হাসানের কন্ঠস্বর আসায় নাবিলা-মেঘ দুজনে পেছন ফিরে তাকালো।নিনা হাসানের কথা মেঘ কিঞ্চিৎ অবাক হলো।তার মা তাকে রোদের থেকে দূরে আসতে বললে এইটা সে এক্সপেক্ট করেনি।
।
।
[চলবে]
পূর্ব-রোদ🌿(পর্ব-২৯)
✔
md sojib
#পর্ব_২৯
#লেখিকা_আমিশা_নূর
<<<<<<<<<>>>>>>>>>>
"ইয়েস।এক রাত কাটালে তোমার থেকে চিরদিনের জন্য মুক্তি তো পেয়ে যাবো।"
কথাটা নিলয়ের বুকে নির্ধারিত তীরের মতো ভেদ করলো।নাবিলা'র কাছে সত্যিই সে অতোটা বিরক্ত যে মুক্ত হওয়ার জন্য কতোকিছু করছে।হ্যা!নিলয় তাকে সত্যি চিরদিনের মতো মুক্ত করে দিবে।নিলয় বাঁকা হাসলো।সে হাসিতে লুকিয়ে পরলো জমে থাকা কষ্টের পাহাড়'টা।
নিলয় ওয়াইন গ্লাসে ঢালতে ঢালতে বললো,"ওয়াইন তো খাও?"
"নাহ।"
"আমেরিকার মেয়ে হয়ে ওয়াইন খাও না?"
"আমেরিকা যখন ছিলাম তখন খেতাম।আপাতত এক বছর হলো খাই না।"
"নাইস!যেমন দেশে আছো তেমন সংস্কৃতি।বাই দ্যা ওয়ে তুমি আগে যে অতিরিক্ত মাত্রায় ফর্সা ছিলে সেটা এখন নেই।"
"জানি।"
নিলয় গ্লাসে ঢেলে রাখা মদটা এক বার মুখে দিয়ে পুরাটা খেয়ে ফেললো।নিলয় আবার বোতল থেকে গ্লাসে ওয়াইন নিচ্ছিলো তখন নাবিলা সামনের সোফায় বসে বললো,"আগে তো ওয়াইন খেতে না এখন কেনো খাও?"
"সবসময় খেতাম।"
"ওহ।তুমি সেদিন বলেছিলে তোমার অসুস্থ তাই ইন্ডিয়া ছিলে।কী অসুখ হয়েছিলো উনার?"
"ক্যান্সার।এখন আগের তুলনায় বেটার আছে।"
"ওহ।উনারা এখানে থাকেন না?"
"নাহ।ইন্ডিয়া আছেন।"
প্রতিত্তোরে নাবিলা চুপ করে রইলো।ক্যান্সারের খরচ চালানোর জন্য হয়তো নিলয় মেয়েদের ফাঁসাতো।নাবিলা জানে তার বাবা নেই।নাবিলা'র ছোট বোন আছে একটা।তাহলে সংসারের হাল এখন নিলয়ের হাতে।অথচ নিলয় কতোটা চিল আছে।ভাবতেই নাবিলা'র মুখটা 'চ' এর রুপ ধারণ করলো।
"তো নাবিলা?"
"হুয়াট?"
নিলয় ওয়াইনের গ্লাস'টা সাথে নিয়ে নাবিলা'র পাশে বসলো।তাদের মধ্যে দূরত্ব বলতে শুধু মাত্র দু ইঞ্চি।হঠাৎ নিলয় এভাবে তার পাশে বসায় নাবিলা চমকে উঠলো।আড়চোখে নিলয়ের দিকে তাকিয়ে দেখলো সে আরাম করে মদ খাচ্ছে।নাবিলা'র নাকে বেঁধে গেলো অন্যরকম একটা সুগন্ধ।অনেকটা বেলি ফুলের মতো।কিন্তু নাবিলা'র জানা মতে ওয়াইন থেকে তো বিদঘুটে গন্ধ আসে।তাহলে নিলয়ের কাছ থেকে মধুর ঘ্রাণ কেনো আসছে?
নিলয়ের পান করা শেষ হলে গ্লাসটা পাশে রেখে দিলো।তারপর নাবিলা'র হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললো,
"সেদিন পার্টি'তে কতো সুন্দর ড্রেস পরে গেলে অথচ আজকে আমার কাছে আসলে জিন্স পরে?"
নিলয়ের কথায় নাবিলা যতটা না রাগলো তার চেয়ে বেশি রাগলো তার হাত ধরায়।নাবিলা এক ঝটকায় নিজের তার নিলয়েড কাছ থেকে নিয়ে নিতে চাইলো।কিন্তু নিলয় আগে থেকে যেনো জানতো নাবিলা এমনটা করবে।তাই সে হাতটাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে।প্রচন্ড রেগে নাবিলা কিছু বলার জন্য ঠোঁট নাড়বে তার আগেই নিলয় তার ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে বললো,"সসস!কোনো কথা না।আজ রাতে তুমি টোটালি আমার।আমি যা বলতো তুমি তাই করবে।"
"ইউ ব্লা..."
"জানি আমি।এখন যাও গিয়ে শাড়ি পরে আসো।"
"হুয়াআআট?আর ইউ গন ম্যাড?তুমি ভাবলে কী করে আমি শাড়ি পরবো।তাও তোমার কথায়?"
নাবিলা'র কথায় নিলয় কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে নিজের কানে এক হাত দিয়ে বললো,"কান'টা একদম গেলো।নাবিলা পাখি এভাবে চিল্লাও কেনো?"
"তোমাকে আমি...."
"চাইলে কিস করতে পারো।মাইন্ড করবো না।"
"রাবিশ!"
নাবিলা খুব ভালো করে বুঝতে পারছে নিলয় তাকে শাড়ি পরিয়ে ছাড়বে।কিন্তু নাবিলা জীবনেও শাড়ি পরেনি।তাহলে হুট করে শাড়ি কীভাবে পরবে?আর পরবেই না কেনো?নিলয়ের সাথে এক রাত থাকতে এসেছে এখানে শাড়ি পরার কী দরকার?
নাবিলা হুট করে নিলয়ের উদ্দেশ্য বললো,"শাড়ি পরতে পারি না।আর আমি শাড়ি কেনো পরতে যাবো কেনো?হু আর ইউ?"
"আপাতত তোমার ওয়ান নাইট পার্টনার।শাড়ি আমি পরাতে পারি।"
"তোমার থেকে শাড়ি পরার মতো লো ক্লাস ইচ্ছে আমার নেই।আর শাড়ি না পরলে কী করবে তুমি?"
"আন্টি'কে ফোন করে বলবো তুমি এখন আমার সাথে আছো।তারপর আন্টি মনে করবে আমাদের মধ্যে কুচ কুচ আছে।দ্যান.... বাকিটা বুঝে নাও।"
নাবিলা'র নিজের কপালে নিজের চড় দিলো।কেনো যে শুধু শুধু নিলয়ের কাছে আসতে গেলো।আর যদি মা ঘুনাক্ষরেও টের পাই তাহলে তো ভাবতে নিলয়ের সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক আছে।তখন তাদের বিয়ে পাক্কা সেট।আর নিলয়ের মতো একটা থার্ড ক্লাস ছেলেকে নাবিলা বিয়ে করে লাইফ হ্যাল করবে না।তার চেয়ে বরং শাড়ি পরাটাই শ্রেয়।নাবিলা আগের মতো কন্ঠস্বরে কঠিন ভাব বজায় রেখে বললো,"শাড়ি পরতে পারি না।আর তোমার থেকেও পরবো না।অন্য কেনো ওয়ে থাকলে বলো।"
"গুড গার্ল!এবার নাহয় হট গার্লের মতে আচরণ করলে।ইউটিউব থেকে দেখে শাড়ি পরে আধ-ঘন্টা'র মধ্যে আমার সামনে আসবে।"
"শাড়ি কোথায়?"
"ঐ রুমে।"
নিলশ হাতের ইশারায় নিজের রুমটা দেখিয়ে দিলো।নাবিলা বিরক্তি নিয়ে সে রুমে প্রবেশ করতে যাবে তখন পেছন থেকে নিলয় বললো,"একটু সুন্দর করে বাঙ্গাল বউয়ের মতো পরিও।হিন্দি নায়িকার মতো না কিন্তু।"
নাবিলা'র ইচ্ছে করছিলো নিলয়কে কয়েকটা কথা শুনাতে।কিন্তু কথায় কথা বাড়ে।তাই সে সবটা হজম করে রুমে ঢুকে গেলো।
।
।
রোদ অনেকক্ষণ ধরে সদর দরজার সামনে পাইচারি করছে।অপেক্ষা করছে পূর্ব।সেই আছরের সময় যে বেরিয়ে গেলো এখনও বাসায় ফেরেনি।টেনশনে রোদের মাথা ফেটে যাচ্ছে।এদিকে এশা'র সময় হতে যাচ্ছে।রোদ অগণিত বারের মতো দরজার বাইরে তাকাতে দেখলো পূর্ব নামের মানুষটি বাসার দিকে এগিয়ে আসছে।রোদ দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললো।তার অপেক্ষা শেষ করে পূর্ব তার সামনে এলো।এক পকল রোদের দিকে কিছু না বলে রুমের দিকে এগোলো।রোদ পেছন পেছন যেতে যেতে বললো,"কোথায় ছিলে তুমি?কতো অপেক্ষা করেছি?কিছু বলছি তো আমি।পূর্ব?"
রোদের একটা প্রশ্নেরও পূর্ব উত্তর দিচ্ছে না।পূর্ব রুমে ঢুকে রোদের মুখের সামনে টাস করে দরজা বন্ধ করে দিলো।পূর্বের এমন ব্যাবহারে রোদ হতবাক হয়ে গেলো।রোদের মনে পরলো আসরের সময় কী হয়েছিলো।রোদ দরজায় হালকা টুকা দিয়ে বললো,"পূর্ব তুমি ভূল ভাবছো।মেঘ...."
"আমার রুমে যেনো কেউ না ঢুকে।"
পূর্বের বিপরীত কথা শুনে রোদের কিঞ্চিত মন খারাপ হলো।পরক্ষণে ভাবলো দোষ সে নিজে করেছে তাই শাস্তি পাচ্ছে।কিন্তু রোদ ঠিক করে নিয়েছে যেভাবে হোক পূর্বের রাগ ভাঙ্গিয়ে ছাড়বে।রোদ বিড়বিড় করে দরজায় হালকা আঘাত করে চলে গেলো।
।
।
"Disgusting,শাড়ি পরছি না কচু।যত্তসব!"
নাবিলা শাড়ির কুচিটা কিছুতেই ঠিক করতে পারছে না।ইউটিউবে হাজার বার দেখেছে শাড়ি পরার ভিডিও।কিন্তু এতো দেখার পরও ভূল হচ্ছে।বিরক্ত হয়ে নাবিলা একবার খুলছে আরেকবার পরছে।ওদিকে নিলয় অনেকক্ষণ ধরে ডাকাডাকি করছে।দু-তিনবার সাড়া দেওয়ার পর নাবিলা একদম কথায় বলছে না।মূলত তার রাগ উঠছে নিলয়ের উপর।নাবিলা শেষ বারের মতো শাড়িটা গায়ে প্যাঁচালো।
প্রায় এক ঘন্টা হয়ে যাওয়ার পরও যখন নাবিলা'র রুম থেকে বের হওয়ার নাম নেই নিলয় তখন ভয় পেয়ে গেলো।নাবিলা'র নাম ধরে কয়েকবার ডাকাডাকিও করলো কিন্তু সাড়া আসছে না।নাবিলা'র কিছু হয়েছে মনে করে নিলয় ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে রুমের দরজা খুললো।
দরজা নড়ার শব্দে নাবিলা মাথা তুলে তাকিয়ে দেখলো নিলয় আতঙ্কিত চেহেরা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।হঠাৎ সে বাতাসের গতিতে দৌড়ে এসে নাবিলাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।এভাবে হুট করে ঝাপিয়ে পরায় নাবিলা হতবাক হয়ে গেলো।প্রায় পাঁচমিনিট পর নিলয় তাকে ছেড়ে দিলো।রাগান্বিত কন্ঠে নাবিলা শাসাতে যাবে তখন নিলয় বললো,"জাস্ট সিম্পল একটা শাড়ি পরতে এতোক্ষণ লাগে?প্রাণটাই চলে যাচ্ছিলো।"
পরক্ষণে নিলয় নাবিলা'র শাড়ি পরা দেখে ফিক করে হেসে উঠলো।নিলয়ের হাসিতে নাবিলা অবাকের রশ্মি কাট হলো।নাবিলা নিজের দিকে খেয়াল করে দেখলো শাড়িটা মোটামোটি পরা হয়েছে কিন্তু কোনো রোলস ফলো করেনি।শাড়ি শুধু ওপাশ থেকে এপাশে পেঁচিয়ে রেখেছে।নিলয় যেভাবে জড়িয়ে ধরেছিলো তখন ভয় পেয়ে কুঁচি গুলায় খুলে যায়।নিলয় হঠাৎ তার শাড়িতে হাত দিলো।অসস্তিতে নাবিলা রেগে বললো,
"স্টপ দিস ননসেন্স।"
"তোমাকে আমি....ওয়েট"
নিলয় তার ড্রয়ার খুলে ড্রয়ার থেকে ট্যাপ নিয়ে নাবিলা'র মুখে লাগিয়ে দিলো।তার মুখের সামনে তর্জনী আঙ্গুল তুলে শাসিয়ে বললো,"যদি নড়াচড়া করেছো তাহলে হাত-পাও বেঁধে দিবো।"
নিলয় নিজে ইউটিউব দেখলো কিছুক্ষণ মন দিয়ে।তারপর নাবলিকে উদ্দেশ্য করে বললো,"তুমি আঁচল'টা ধরে রাখে আমি হেল্প করছি।"
অনিচ্ছা সত্ত্বেও নাবিলা শাড়ির আঁচলটা ধরলো।নাবিলাকে অবাক করে দিয়ে নিলয় কয়েক মিনিটের মধ্যে শাড়ি'র কুঁচি খুব সুন্দর করে তৈরি করলো।কুঁচি গুচ্ছ নাবিলা হাতে দিলে নাবিলা তা গুঁজে নিলো।একটু পরে শাড়ি পরানো শেষ হলে নাবিলাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
"ঐ বক্সে কিছু সরঞ্জাম আছে।তুমি এ রুম থেকে বের হয়ে পূর্ব দিকে গেলে দেখবে ছাঁদে যাওয়ার সিঁড়ি দেখবে।তারপর ছাঁদে চলে এসো।"
নাবিলা'কে কিচ্ছুটি বলার সুযোগ না দিয়ে নিলয় বেরিয়ে গেলো।নিলয়ের এতে সুন্দর ব্যবহারে নাবিলা অবাক থেকে অবাক হচ্ছে!ছাঁদে কেনো যেতে বললো নিলয়?কী উদ্দেশ্য ওর?
।
।
"রোদ কী হয়েছে?পূর্ব এখনো আসেনি?"
"এসেছে।রুমে আছে।"
"কী হয়েছে তোর?মুখটা ওমন কেনো?"
"কিছু না বাবা।"
"বল আমায়.."
সূর্য মোহাম্মদের জোরাজোরি'তে রোদ শুধু বললো পূর্ব রেগে আছে।সূর্য মোহাম্মদ রাগ ভাঙ্গানোর জন্য রোদকে কিছু টিপস দিলো।সূর্য মোহাম্মদের কথায় রোদ বেশ খুশি হলো।কথামতো রোদ পরিকল্পনা তৈরি করলো।
।
।
নাবিলা তৈরি হয়ে নিলয়ের দেওয়া নকশা অনুযায়ী ছাঁদে গেলো।ছাঁদে পা রাখতেই নাবিলা অবাক হয়ে গেলো।ছাদের এক কোণায় বড় বড় সাইজের দুটি গোলাপ গাছ।গাছের উপরে ছোট ছোট বাতি দিয়ে লাইটিং করা।লাইটিংটা এতোটা নিখুঁতভাবে করেছে যে আলো'টা খুব নিখুঁতভাবে গোলাপের উপর পরছে।ছাদের মাঝখানটাই দোলনা।দোলনাটা তেও লাইটিং করেছে। নাবিলা'র থেকে কয়েক ফুট দূরে ডিনারের জন্য গোল করা টেবিল।নাবিলা অবাক হয়ে চারপাশটা দেখছে তখনি তার চোখে এক গুচ্ছ আলোর রশ্মি পরলো।এমনভাবে আলোটা আসায় নাবিলা মুখে হাত দিলো।পেছনে দু'পা এগোতে গেলে শাড়িতে পা লেগে হুঁচট খেয়ে পড়ে যেতে চাইলে নিলয় তাকে ধরে ফেললো।ভয়ংকর রকম দৃষ্টিতে দু'জন দু'জনকে নিখুঁতভাবে খেয়াল করছে।
নাবিলা নিলয়'কে কাছ থেকে দেখে বুঝতে পারলো চেহেরা আগের থেকে অনেকটা শুকিয়ে গেছে।চোখের নিচটা কালো হয়ে গেছে।তবুও যেনো নাবিলা'র মনে হলো নিলয় তার দেখা সেরা পুরুষ!
আজ কোনো প্রথম মেয়েকে নিলয় টাচ করেনি।তবুও নাবিলা যেনো অন্য রকম।মাতাল করা মতো ঘ্রাণ নিলয়ের নাকে বেঁধে গেলো।কালো শাড়ি'টা নাবিলা'র সৌন্দর্য আরো বৃদ্ধি করেছে।নাবিলা মুখে থাকা তীল চিহ্ন যেনো নাবিলা'র সৌন্দর্যের পরিপূর্ণতা!খুব কষ্ট হয় নিলয়ের যখন মনে পরে নাবিলা অন্যকারো হয়ে যাবে।কিন্তু নিয়তির খেলা তো কেউ আটকাতে পারে না।
[চলবে]
পূর্ব-রোদ🌿(পর্ব-২৮)
✔
md sojib
#পর্ব_২৮
#লেখিকা_আমিশা_নূর
<<<<<<<<<<>>>>>>>>>>
হঠাৎ নিলয়ের মনে পড়লো সে তো নাবিলা'র কান্না শুনতে পারে অজানা নাম্বার হয়ে।নিলয় তাড়াতাড়ি নাবিলা'র নাম্বারে কল করলো।ওপাশে রিসিভ হলো ঠিকই কিন্তু কান্নার আওয়াজ ছাড়া কিছুই শুনা গেলো না।নিলয়ের চোখজোড়া লাল হয়ে এলো।কান্নাটা যেনো গলা বরাবর এসে ধাক্কাধাক্কি করছে।এতো কষ্ট কেনো হয় মানব-জাতির?
।
।
রোদের চোখ লেগে আসবে তখনি ফোনটা বেজে উঠলো।চোখ পিটপিট করে মোবাইল হাতে নিয়ে দেখলো মেঘের কল।এতো রাতে মেঘের কল দেখে রোদ হতবাক হলো।কেনো কল করেছে তা ভেবে রোদ রিসিভ করলো।
"হ্যালো,রোদ কেমন আছো?"
"ভালো।তুমি এতো রাতে?"
"কেনো জানি না আজ হঠাৎ তোমাকে বেশি মনে পড়ছিলো।তাই কল করলাম।সরি!"
মেঘের কথা রোদ বিরক্ত হলো।ভদ্রতার খাতিরে উত্তর দিলো,"না না ইট'স ওকে।"
"পূর্ব কোথায়?"
মেঘের কথায় রোদ পাশে তাকিয়ে দেখলো পূর্ব চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে আছে।হাসিমুখে রোদ উত্তর দিলো,"ঘুমাচ্ছে।"
"ওহ।"
"গুড নাইট মেঘ।"
"রোদ শুনো.."
বিদায় জানিয়ে রোদ কান থেকে মোবাইল নামিয়ে রাখছিলো।মেঘের কথায় সে আবার কানে মোবাইল লাগালো।অসস্তি স্বরে বললো,
"বলো,"
"পূর্বের সাথে সব ঠিক আছে তো?"
"মানে?"
"মানে" শব্দটা একটু জোরে উচ্চারণ করায় পূর্ব নড়ে উঠলো।পূর্বের ঘুম ভাঙবে ভেবে রোদ সাবধানে পা ফেলে বারান্দায় গেলো।ওপাশ থেকে মেঘের কন্ঠস্বর শুনা গেলো,
"মানে পূর্ব তোমার সাথে ভালো ব্যাবহার করছে তো?"
"মেঘ,তোমাকে শুরু থেকে আমি বন্ধু ভাবতাম শুধু।আর কিছুই না।পূর্বের সাথে আ'ম টোটালি হ্যাপি।আমি আরো হ্যাপি থাকবো যদি তুমি আমার সংসারে নাক না ঢোকাও।"
রোদের শেষ কথাটা শুনে মেঘের অনুভূতি সব ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেলো।মেঘের মনটা যে বড্ড অবুঝ হয়ে গেছে।মেঘ কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো,
"রোদ,আমি জানি আমি তোমাকে ডিসটার্ব করছি।জানো তো সবচেয়ে কষ্ট কখন হয়?নিজের ভালোবাসা'র মানুষকে না পেলেও অতোটা কষ্ট হয় না যতটা নিজের ভালোবাসার মানুষের সাথে অন্য'জনকে দেখলে হয়।"
"আমি হ্যাপি আছি কি'না তা কেনো জিজ্ঞেস করো?"
"জানিনা।শুধু মনে হয় তোমার জন্য আমি পারফেক্ট!তুমি শুধু আমার কাছেই খুশি থাকবে।"
"মেঘ,এইটা তোমার ভূল ধারণা।আমি পূর্বের সাথে যথেষ্ট হ্যাপি আছি।"
রোদের কথা শুনে ওপাশ থেকে কোনো আওয়াজ এলো না।রোদ দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে আবারো বললো,"তোমার যদি ডাউট হয় আমি ভালো নেই তাহলে তুমি নিজে এসে দেখে নিতে পারো।"
"মানে?"
"মানে সামনে যে কোনো একদিন আমি তোমাকে ইনফর্ম করলে তুমি ঢাকা এসে দেখে নিবে আমি কতোটা হ্যাপি।তখন হয়তো নিজেকে শুধরে নিতে পারবে।মরীচিকা'র মতো আর আমার পেছনে ছুটবে না।"
রোদের কথায় মেঘ কিছু বললো না।রোদ আর কিছু না বলে ফোন কেটে দিলো।রোদ আবারো ঘুমাতে যাবে তখন পূর্বের কন্ঠস্বর কানে আসলো,"কার সাথে কথা বললে এতো রাতে?"
পূর্বের কথায় রোদ ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো।এখন যদি মেঘের সাথে কথা বলছি বলে তাহলে মাঝরাতে কোলাহল করবে।তার চেয়ে বরং না বলায় ভালো ভেবে রোদ বললো,
"আলো'র নাকি পেট ব্যাথা করছিলো তাই কল করে কান্নাকাটি করছিলো।আমি ওষুধ খেয়ে ঘুমাতে বললাম।"
"ওহহ।ঘুমাও এখন।"
পূর্বের শেষ কথায় রোদ হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো।আল্লাহ'র নাম নিতে নিতে ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমালো।
।
।
"আম্মি,ও আম্মি বলো না ৬ তারিখ কী?"
"তোর মনে নেই রোদ?"
"মনে থাকলে তোমাকে জিজ্ঞেস করতাম?"
"৬ তারিখ তোদের বিয়ের ডেইট।"
"কীহ?"
চাঁদনি মোহাম্মদের কথা শুনে রোদ মুখটা হা হয়ে গেলো।নিজের বিয়ের তারিখ নিজেরেই মনে নেই।চাঁদনি মোহাম্মদ যখন তার স্বামীর সাথে ৬তারিখ নিয়ে কথা বলছিলো রোদ সবটা শুনে নে।কিন্তু ৬তারিখ যে তার বিয়ে হয়েছিলো মনেই নেই।এমন লজ্জাজনক পরিস্থিতি'তে রোদ কোনোদিন পরেনি।পরক্ষণে মনে এলো সেই ছোট বেলায় বিয়ে হয়েছিলো এখন কীভাবে মনে থাকবে?রোদ ভাব নিয়ে বললো,
"পিচ্চিকালে বিয়ে দিছিলে তোমরা।মনে থাকবে কেনো?"
"হয়েছে।"
রোদের মনে হঠাৎ প্রশ্ন জাগলো পূর্বের কী মনে আছে?আবার ভাবলো পূর্বেরও ছোট বেলায় বিয়ে হয়েছে নিশ্চয় তার ও মনে নেই।রোদ আবুল-তাবোল ভাবতে ভাবতে রুমে প্রবেশ করে।পূর্ব এখন বাড়িতে নেই।কোথাও বেরিয়েছে হয়তো।রোদ বিছানায় বসে ভাবতে লাগলো ৬তারিখ হলো পরশু।তাহলে সেদিন কী স্পেশাল কিছু করা যায় না?রোদ অনেকক্ষণ ভেবে সিদ্ধান্ত নিলো আগামী কাল সে কিছু একটা করবে।তাড়াতাড়ি সে নিচে গেলো।নিচে গিয়ে চাঁদনি মোহাম্মদ'কে বললো,
"আম্মি,পরশু কী কিছু করছো?"
"হ্যা।ছায়া,আলো,রাফিয়া তিহান আর নাবিলা ওরা সবাই আসবে।"
"মানে আমরা কয়েকজন থাকবো?পার্টি হবে নাকি?"
"পার্টি টাটি না।এমনি সবাই আসবে।"
"ওহহ।আচ্ছা আম্মি তাহলে আমি আমার একফ্রেন্ড'কে ইনভাইট করি?"
"তোর আবার বন্ধু কখন হলো?"
"আরে আছে।"
"ঠিক আছে।আসতে বল।"
রোদ এলোমেলো হেটে নিজের রুমে চলে এখন।রোদের এখন অনেক কাজ।
।
।
পূর্ব পা নাড়িয়ে সামনে হাটছে।আজ বাইরে বের হয় কোনো কারণ ছাড়া।হঠাৎ তার রোদের মায়ের কথা মনে পড়ায় তার কাছে যায়।ওবাড়িতে গিয়ে পূর্ব যখন আলো'র থেকে শরীরের অবস্থা জিজ্ঞেস করে তখন আলো বলে সে একদম ঠিক আছে।এমনকি রাতে কোনো কল করেনি।
তাহলে রোদ কী তাকে মিথ্যা বললো?কিন্তু রোদের মিথ্যা বলার কারণ কী?কার সাথেই বা ও কথা বলছিলো?হাঁটতে হাঁটতে পূর্ব নিজের বাড়িতে প্রবেশ করে।তখন বাড়ি'র পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিলো।কিন্তু অস্বাভাবিক ছিলো পূর্ব।পূর্ব মনে মনে ঠিক করলো সে সোজা রোদ থেকে জিজ্ঞেস করবে কাল রাতে কার সাথে কথা বলছিলো।সেই ভাবা সেই অনুযায়ী পূর্ব রোদকে খুজতে লাগলো।তখনি তার সামনে এসে রোদ হাসিমুখে হাজির হলো।রোদের এমন চেহেরা দেখে পূর্ব সবকিছু ভূলে গেলো।রোদ'কে আর কোনো কিছু জিজ্ঞেস করলো না।
সময় এখন চার'টা।আসরের আজান দেওয়া হয়ে গেছে।আছরের পরের সময় সবটা রোদের কাছে যথেষ্ট মূল্যবান।খুব ভালো-ভাবে অনুভব করে সময়টা।তখন পরিবেশটা থাকে থমথমে,নিরব!রোদ নামাজ আদায় করে ফোনটা হাতে নিলো।মেঘ'কে কল করে জানাতে হবে পরশু এখানে উপস্থিত হওয়ার জন্য।
ঐদিন আসলে ভালোমতো দেখবে পূর্ব-রোদের সংসার।রোদ মোবাইল থেকে মেঘের নাম্বারে ডায়াল করলো।দু'বার রিং হতে ওপাশে রিসিভ হলো।রোদ মোবাইলটা কানে লাগিয়ে বললো,
"হ্যালো,মেঘ?"
"হুম।কী অবস্থা?"
"আলহামদুলিল্লাহ ভালো।তোমাকে একটা কথা জানাতে কল করলাম।"
"কী কথা?"
"তুমি যদি ফ্রি থাকো তাহলে পরশু ঢাকায় আসতে পারো।"
"পরশু?"
"হুম।তুমি এসে দেখে নিও আমি হ্যাপি কি'না।"
"ওকে।ট্রাই করবো।"
"হুম।"
রোদ কল কেটে দিয়ে ফোনটা বিছানায় রাখলো তখনি পেছন থেকে পূর্ব বলে উঠলো,"কার সাথে কথা বলছিলে?"
পূর্বের থমথমে কন্ঠ শুনে রোদ গত রাতের মতো চমকে গেলো।পূর্বের কথা শুনে রোদ ভাবতে লাগলো কী বলবে এখন?মেঘ যদি আসে তাহলে তো ঠিকই দেখবে আর এখন যদি বলে দে তাহলেও রাগারাগি করবে।রোদের নিজের সাথে যুদ্ধ শুরু করলো।এক মন বলছে সবটা বলে দিই অন্য মন বলছে না থাক,মেঘ আসলে বলবো।রোদের নক কামড়াতে লাগলো।পূর্ব রোদের কোনো সাড়া না পেয়ে নিজে বললো,"কল কী মেঘ করেছিলো?"
এবার রোদ আগের তুলনায় বেশি চমকালো।পূর্ব কী করে জানলো সে মেঘের সাথে কথা বলছিলো?তাহলে কী সব শুনে ফেলেছে?রোদ আমতা আমতা করে কিছু একটা বলতে যাবে তখন পূর্ব বললো,"তুমি কাল রাতেও মেঘের সাথে কথা বলেছো।অথচ আমাকে বললে আলোর সাথে কথা বললে।এখন আবার মেঘের সাথে কথা বলছো।কী এতো কথা জমে আছে ওর সাথে?আর লুকিয়ে লুকিয়ে কেনো কথা বলছো?সমস্যা কী তোমার?"
পূর্ব কথায় রোদের আশ্চর্য আকাশ ছোঁয়ালো।পূর্ব সবটা কে বললো?আর পূর্ব কী মিন করছে?রোদ কাঁপা কাঁপা স্বরে বললো,
"পূর্ব তুমি ভূল ভাবছো।মেঘ কল ক..."
"এখন আমি সবকিছু জানার পর কেনো সত্যি'টা বলছো?আগে বলতে পারোনি?আর মেঘের কিসের এতো ফষ্টিনষ্টি?"
"পূর্ব তুমি সিম্পল একটা....."
"হুয়াট সিম্পল?আমার স্ত্রী মাঝরাত পর পুরুষের সাথে কথা বলছে তাও চুপিচুপি।এইটা তোমার কাছে সিম্পল?"
"পূর্ব...."
"শাট আপ।একটা কথাও বলবে না তুমি।যা বুঝার আমি বুঝে গেছি।"
নিজের মতে করে বকবক করে পূর্ব রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।রোদ শুধু ছলছল দৃষ্টিতে পূর্বের যাওয়ার পনে তাকিয়ে রইলো।পূর্ব তাকে সন্দেহ করছে।নূন্যতম বিশ্বাস টুকুও কী পূর্বের নেই?এ কেমন জন'কে ভালোবেসে ফেলেছে রোদ?
।
।
সন্ধ্যা ছয়'টা তেত্রিশ মিনিট।নাবিলা নিজের বাইক নিয়ে বেরিয়ে পরলো নিলয়ের সাথে এক রাত কাটানে উদ্দেশ্য।তার গন্তব্য স্থান নিলয়ের বাড়ি।পরণে তার সোনালি কালারের টপস সাথে এ্যাস কালারের জিন্স পেন্ট।নাবিলা একদম নরমাল ভাবে যাচ্ছে।মুখে একদম সাজেঁর চিহ্ন পর্যন্ত নেই।বাড়িতে মা'কে বলে এসেছে বান্ধবী'র বাসায় যাচ্ছে।আর রাতে ওখানেই থাকবে।প্রথমে তিনি না মানলেও পরে নাবিলা'র জোরাজোরি'তে রাজি হয়ে যায়।
টানা আধ ঘন্টা বাইক চালানোর পর নাবিলা আহমেদ মঞ্জিলে পৌছালো।বাড়িটা বেশি বড় না হলেও অতো ছোটও না।নাবিলা চাপা স্বরে নিজে পা সে বাড়ির মাটিতে রাখলো।সামনে যত এগোচ্ছে নিজের মধ্যে অস্থিরতা ততটাই বাড়ছে।নাবিলা যতটা সম্ভব নিজেকে কঠিন রাখছে।নাবিলা অনেকটা ডাবের মতো।বাইর থেকে যেমন শক্ত ভিতরে ঠিক তেমনি সরল।
নাবিলা সেই একতলা বাড়ি'টার সদর দরজার সামনে দাঁড়ালো।দরজার বাম পাশে কলিং বেল দেখা যাচ্ছে।নাবিলা কলিং বেল চাপতে গিয়ে থেমে গেলো।কারণ সদর দরজা খুলা দেখা যাচ্ছে।নাবিলা আলতো করে ঠেলে ভিতরটা দেখলো।নাবিলা'র প্রথমে চোখ পরলো সামনে থাকা নিলয়ের ছবিটার উপর।তারমানে সে ঠিক জায়গায় এসেছে।এভাবে বিড়ালের মতে লুকিয়ে লুকিয়ে না দেখে নাবিলা খুব জোরে দরজা ধাক্কা দিলো।দরজা আগে থেকে হালকা খুলা ছিলো বিধায় এখন পুরাটা খুলে গেলো।
নাবিলা দেখলো বাড়িটা বাইর থেকে দেখতে মাঝারি হলেও ভিতরে বেশ বড়সড়।নাবিলা বা'পাশে তাকিয়ে দেখলো ওয়াইনের বোতল রাখার জন্য তিন-চারটা তাক।কিন্তু নাবিলা'র জানা মতে তো নিলয় ড্রিংক করে না।তাহলে এগুলা?নাবিলা ভিতরে থাকা সরল মনের মানুষটি তার মস্তিষ্কে জানান দিলো নাবিলা জানে না এমন আরো অনেক কাজ নিলয় করে।আর নিলয়ের মতো ছেলে ওয়াইন খাবে এইটা স্বাভাবিক।নাবিলা হঠাৎ জোর বলে উঠলো,"মি.নিলয়,তোমার ওয়ান নাইট পার্টনার এসে..."
"ওহ।এতোক্ষণ তোমার অপেক্ষা'তে ছিলাম।"
নিলয়ের কন্ঠ অনুসরণ করে নাবিলা পেছনে তাকালো।ওদিকে থাকা একটি রুম থেকে নিলয় বের হচ্ছে।নাবিলা ভ্রু-কুচকে দু'হাত ভাজ করে নিলো।তাচ্ছিল্যের সুরে হেসে বললো,
"এতো অপেক্ষা করার কী ছিলো?অন্য কোনো মেয়েকে ডেকে নিলেই পারতে।"
"উফ!তোমার এই ট্যারা কথায় না আমি ফেঁসে গেছি পাখি।চারপাশে শুধু এখন নাবিলাকেই দেখি।"
"জোক্স!"
নিলয় নাবিলা'র কাছাকাছি এসে তার চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে বললো,"এখন সময় সাত'টা বারো মিনিট।তুমি পাক্কা এক ঘন্টা লেইট করেছো।তাই যেতে দিবো ওদিকে প্লাস করে।"
"আই ডোন্ট কেয়ার!নাবিলা কারো কথায় নিজেকে চালায় না।"
"তাহলে তুমি এখানে নিজের ইচ্ছায় এসেছো?"
"ইয়েস।এক রাত কাটালে তোমার থেকে চিরদিনের জন্য মুক্তি তো পেয়ে যাবো।"
কথাটা নিলয়ের বুকে নির্ধারিত তীরের মতো ভেদ করলো।নাবিলা'র কাছে সত্যিই সে অতোটা বিরক্ত যে মুক্ত হওয়ার জন্য কতোকিছু করছে।হ্যা!নিলয় তাকে সত্যি চিরদিনের মতো মুক্ত করে দিবে।নিলয় বাঁকা হাসলো।সে হাসিতে লুকিয়ে পরলো জমে থাকা কষ্টের পাহাড়'টা।
[চলবে]
পূর্ব-রোদ🌿(পর্ব-২৭)
✔
md sojib
#পর্ব_২৭
#লেখিকা_আমিশা_নূর
<<<<<<<<<♪>>>>>>>>>>>>>♪♪♥
সবার সাথে তিহান পরিচয় করিয়ে দিলো।তখন রাফিয়া'র ছোট ফুফি আর তিহানের মা রান্না ঘরে ছিলো।ওরা সবাই মিলে বারান্দা'র আড্ডায় মগ্ন হয়ে পরলো।
দুপুরে সবার খাওয়া দাওয়া শেষ করে রাফিয়া'র ফুফি রোদকে উদ্দেশ্য করে বললো,
"রোদ তুমি সিলেট কোথায় আছো?"
"পূর্বের সাথে বাড়িতে।"
রোদের সহজ-সরল উত্তরটা সবার মধ্যে অস্থিরতা বারিয়ে দিলো।তারা কেউ জানে মা পূর্ব-রোদ স্বামর স্ত্রী।তাই সবাই চোখ গোল গোল করে তাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলো।তিহান ফিসফিস করে রাফিয়াকে বললো,"ইন্না-লিল্লাহ!বাড়ির কেউ জানে না পূর্বের বিয়ের কথা।এখন কী হবে?"
তিহানের প্রশ্নের উত্তরে রাফিয়া ভয়ার্ত স্বরে বললো,"আল্লাহ মালুম!"
সবার দৃষ্টি,চেহেরা দেখে নাবিলা হেসে ফেললো।হঠাৎ হেসে উঠাই সবাই ওর দিকে তাকালো।তিহানকর বড় বোন তানঞ্জু বললো,"নাবিলা হাসসো কেনো?"
"হাহাহাহা!আপু তোমরা কেউ পূর্ব-রোদের ব্যাপারে কিছু জানো না?"
"কী জানবো?"
নাবিলা পূর্ব-রোদের তাকালো।নাবিলা পূর্বকে উদ্দেশ্য করে বললো,"কি রে?তোরা বলবি নাকি আমি বলবো?"
নাবিলা'র কথায় পূর্ব সবার উদ্দেশ্য বললো,"রোদ আমার স্ত্রী।পালিয়ে বিয়ে করিনি আবার।বাড়ি থেকে দিয়েছে।"পূর্বের কথা শুনে রোদের মধ্যে ভালো লাগার হওয়া উড়াল দিলো।আজ প্রথম বার সবার সামনে পূর্ব তাকে নিজের স্ত্রী হিসাবে পরিচয় দিচ্ছে।এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে?
পূর্বের কথায় সবাই বড়সড় শকট খেলো।কিন্তু পরক্ষণে তারা পরিবেশটা সামলে নিলো।তিহানের বাড়িতে তারা সবাই অনেক আনন্দে কাটিয়েছে।
।
।
তিহানের বাড়ি থেকে ফিরার পর নাবিলা,রাফিয়া,পূর্ব-রোদ রাতে বাসে করে ঢাকার পথে রওনা দিলো।তিহান দুদিন পর যাবে ঢাকা।বাসে পেছন দিকে পূর্ব-রোদ বসেছে সামনে রাফিয়া'র সাথে নাবিলা।নাবিলা চোখ বন্ধ করে হেলান দিছিলো।তখন তার মোবাইল বেজে উঠাই ঘুম ভেঙ্গে গেলো।মোবাইল হাতে নিয়ে দেখলো আননোন নাম্বার।নাবিলা কল রিসিভ করে সালাম দিলো।কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো আওয়াজ আসলো।নাবিলা অনেকক্ষণ হ্যালো হ্যালো করলো কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো শব্দ আসলো না।বিরক্ত হয়ে নাবিলা কল কেটে দিলো।
।
।
মেঘ আর নিলয় ছাঁদে বসে গল্প করছিলো।একটু আগে নিলয় নাবিলা'র নাম্বারে কল করেছিলো।নিলয় ইচ্ছে করে কোনো কথা বলেনি।হঠাৎ করে নিলয়ের ইচ্ছে জাগলো নাবিলা'র কন্ঠস্বর শুনার।তাই কল করে।নিলয় এতো মেয়ের সাথে মেলামেশা করেছে কিন্তু কোনোদিন কোনো মেয়ের প্রতি অন্যরকম ফিলিংস আসেনি।নাবিলাকে দেখে মনে হয়েছিলো সে অন্য জগতে আছে।আর নাবিলা'র এটিটিউড দেখে আরো গলে যায়।নাবিলা'র সাথে আগে যখন কথা হয়েছিলো তখন নিলয়ের কোনো ফিলিংস আসেনি।তবে নাবিলা'র সাথে কথা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর মিস করতো ভিষন।কিন্তু সময়ের সাথে সব পাল্টে যায়।নিলয় ইন্ডিয়া গিয়ে তার মায়ের চিকিৎসা করায়।তখন আরো একটি মেয়ের সাথে তার দেখা হয়েছিলো।যার ফলে নিলয় নাবিলাকে একে বারের জন্য ভূলে যায়।তারপর গতদিন হুট করে নাবিলাকে চিনতে পারে।এরপর থেকে নিলয় ঠিক করে রাখে নাবিলাকে সে মানিয়ে নিবে।
"ঐ নিলয়?কী ভাবিস?"মেঘের কন্ঠ শুনে নিলয় ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলো।মেঘকে উদ্দেশ্য করে বললো,
"রোদের তো বিয়ে হয়ে গেলো।কী করবি এখন?"
"রোদ আমার সাথে অন্যায় করেছে।তার ফল তো ভোগ করবে।"
"মেঘ তুই পাগল হয়ে গেছিস?একটা মেয়ের ক্ষতি করবি?"
নিলয়ের কথা শুনে মেঘ অবাক হলো।শুধু অবাক না যথেষ্ট অবাক হলো।যে মেয়েদের খেলার পুতুল বানাই সে কি'না মেঘকে জ্ঞান দে?নিলয়ের উদ্দেশ্য মেঘ বললো,
"ভূতের মুখে রাম রাম।নিলয় তোর জ্বর হয়েছে?"
"যেটা সত্যি সেটা বললাম।"
"আর রোদ যে আমাকে ঠকালো?"
"কাম অন ইয়ার।এইটা তোর ভূল ধারণা।মেঘ তোর কিন্তু মেয়ের কম পরবে না।শুধু শুধু রোদের সংসার নষ্ট করিস না।"
"সংসার নষ্ট করবো না।শুধু একটু মাশলা দিবো।"
"মানে?"
"জাস্ট চিল ব্রো।"
।
।
ঢাকায় আসার পনেরো দিন হয়ে গেছে।পূর্ব-রোদের সম্পর্ক আগের মতো।খুনসুটি প্রেমের তাদের সংসার বেশ চলছে।এর মধ্যে নাবিলা দু'দিন থেকে সিলেট চলে যায়।পূর্ব-রোদের স্বাভাবিক ব্যাবহার দেখে বাড়ির সবাই যথেষ্ট খুশি হয়।চাঁদনি মোহাম্মদ পূর্বের সাথে ঠিক মতো কথা বলতে পারেননি।তাই আজ পূর্বকে নিজের রুমে ডেকেছে।চাঁদনি মোহাম্মদ পূর্বের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।তখনি দরজায় টুকা পড়ায় তিনি চোখ তুলে তাকালেন।পূর্বকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি কাছে ডাকলেন।
তারপর শান্ত স্বরে বললেন,
"কি সিদ্ধান্ত নিয়েছিস?রোদের সাথে সব তো ঠিক দেখলাম।"
"আমি কানাডা যাচ্ছি।"
"তাহলে ডিভোর্স?"
"ডিভোর্স হবে না আমাদের।"
"তুই কানাডা চলে গেলে রোদের কী হবে?"
"আমি তো একেবারের জন্য যাচ্ছি না।আর তোমার শর্ত ছিলো শুধুমাত্র রোদের সাথে ভালো ব্যাবহার করা।ডিভোর্স কথাটা ওখানে উল্লেখ ছিলো না।"
"তারমানে রোদকে সবকিছু বলেছিস?"
"নাহ।বলে দিবো।তুমি পাসপোর্ট র্যাডি করে রেখো আর সাথে টাকাও।"
কথা এটুকু শেষ করে পূর্ব রুম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলো।তখন চাঁদনি মোহাম্মদ পেছন থেকে বললো,
"তুই কানাডা যেতে চাইছিলি বিএসসি করার জন্য সাথে বিশ লাখ টাকা।আর তোকে কানাডা পাঠানোর জন্য আমার শর্ত ছিলো রোদের সাথে ভালো ব্যাবহার করবি।তোর স্বপ্ন পূরণের মাধ্যম ছিলো রোদ।আর এখন নিজে মন থেকে কানাডা যেতে চাইছিস না।কারণটা কী রোদ?"
তার মায়ের কথায় পূর্ব থমকে গেলো।ছোট বেলা থেকে স্বপ্ন ছিলো সে কানাডা যাবে।ওখান-কার পরিস্থিতি'র সাথে চলাফেরা করবে।আর এখন যখন সময় এলো যাওয়ার তখন তার মন সায় দিচ্ছে না।পূর্ব বিড়বিড় করে বললো,"কারণটা রোদের পাগলামো ভালোবাসা!"
পূর্বের কথা চাঁদনি মোহাম্মদের কর্ণ অবধি আসলো না।তবে তিনি সন্তুষ্ট কারণ তার দুই সন্তান এখন ভালো আছে।
।
।
নাবিলা অনেকক্ষণ ধরে একটা কলের অপেক্ষা করছে।সে জানে না ওপাশ থেকে প্রতিদিন কে কল করে?কিন্তু এটুকু বুঝে মানুষটা নাবিলা'র কন্ঠস্বর শুনার জন্য কল করে।গতদিনগুলার প্রতি সকাল-রাত দু'বার কল করে।বলতে গেলে নাবিলা'র একরকম অভ্যাস হয়ে গেছে সেই কলের প্রতি।তাই আজ সকালে যখন কল এলো না নাবিলা'র অস্থির লাগছে।রুমের মধ্যে পায়চারি করছে।নিচ থেকে নিনা হাসান সকালের নাস্তা করার জন্য ডেকেই যাচ্ছে।নাবিলা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছে যতক্ষণ না পর্যন্ত ঐ কল আসবে ততক্ষণ সে খাবে না।এমন পাগলামো করার কোনো কারণ খোজে পেলো না নাবিলা।তবুও পাগলামো করতে মন চাইলো।প্রায় আধঘন্টা পর নাবিলা'র ফোন বেজে উঠলো।নাবিলা খুব দ্রুত তার মোবাইলের উপর ঝাঁপিয়ে পরলো।রিসিভ করা মাত্র নাবিলা বলে উঠলো,
"কতক্ষণ ধরে আমি কলের অপেক্ষা করছি।এতক্ষণ লাগে কল করতে?প্রতিদিন তো ঠিকই সকালে কল করো।আজ কি হলো?কিছু বলছো না কেনো?"
নাবিলা নিজের ইচ্ছে মতো বলে যাচ্ছে।তখন তার মোবাইলে মেসেজ আসলো।নাবিলা মেসেজ বক্স চেক করে দেখলো ঐ নাম্বার থেকে মেসেজ এসেছে,"আরে কুল কুল!কী ম্যাম আমাকে মিস করছিলেন নাকি?"
মেসেজটা দেখে নাবিলা'র কথা বলা বন্ধ হয়ে গেলো।সত্যিই তো!নাবিলা কী তাকে মিস করছিলো?মেসেজটার আন্সার না দিয়ে নাবিলা ফোন অফ করে রাখলো।এমনটা কেনো করেছে সে জানে না।
।
।
পাখির কিচিরমিচির শব্দে রোদের ঘুম ভেঙ্গে গেলো।পিটপিট করে চোখের পাতা খুলে দেখলো পূর্ব এখনো ঘুমিয়ে আছে।রোদ কিছুক্ষণ তার স্বামীর দিকে পকল না ফেলে তাকিয়ে রইলো।হঠাৎ রোদের মাথায় আসলো অনেক দিন পূর্বের সাথে ঝগড়া হয় না।রোদ বিছানা থেকে আস্তে আস্তে নেমে নিজের মেকাপবক্স নিয়ে আসলো।পূর্বের মুখটা খুব সুন্দর করে মেকাপ করলো।নাকের ঢগায় লিপস্টিক দিয়ে লাল করে ফেললো।চোখের পাশে কালো দাগ দিলো।পূর্ব মূলত ভূতের মতো করে সাজিয়েছে।মেকাপ করা শেষ হলে রোদ ফিক করে হেসে দিলো।রোদ এতোটা উচ্চস্বরে হাসলো যে পূর্বের ঘুম ভেঙ্গে গেলো।হাই তুলে হাত পা নেড়ে বিছানায় বসলো।পূর্বের ঘুম ভাঙ্গছে দেখে রোদ তাড়াতাড়ি মেকাপবক্স ছাদর দিয়ে ঢেকে দিলো।রোদকে দেখে পূর্ব জিজ্ঞেস করলো,
"হাসছিলে কেনো?"
"এমনি।"
"এমনি এমনি কেউ হাসে?"
"আমি হাসি।"
"হু, তুমি তো পাবনা'র মেন্টাল হসপিটাল থেকে পালিয়ে আসা পেশেন্ট।"
"কী বললে তুমি?আমাকে পাগল বললে?আমি পাগল?"
"পাগল বলিনি মেন্টাল বললাম।"
"হরিচন্দওওওন।"
রোদ রেগে গিয়ে পাশ থেকে বালিশ নিয়ে মারতে লাগলো।হুট করে পূর্ব তার হাত নিজের কাছে নিয়ে আসলো।এভাবে কাছে আনায় রোদ কেঁপে উঠলো।মুহুর্তে নিজেকে সামাল দিয়ে দূরে আসতে চাইলে পূর্ব তার কোমড় জড়িয়ে ধরলো।রোদ ভয়ে ভয়ে আছে না জানে কী করে?পূর্ব তার কপালে চুমু দিতে চাইলে রোদ পূর্বের ঠোঁটে হাত দিলো।পূর্ব ভ্রু-কুচকে রোদের দিকে তাকালো।রোদ হাবলার মতো হেসে বললো,
"চুপচাপ নিচে আসো।তোমার মুখ থেকে গন্ধ।ওয়াক!"রোদের মুখের রিয়েকশন দেখে পূর্ব হেসে দিলো।রোদ বিড়বিড় করে বললো," উফ!চুমু দিলে এখনি কপালে লিপস্টিক লেগে যেতো!তখন সব বুঝে যেতো হরিচন্দন!"
রোদ বিছানা থেকে নেমে দরজার কাছে গিয়ে বললো,"একটু নিচে আসো।ফ্রেশ হতে হবে না।"
পূর্বের উত্তর শুনার আগে রোদ চলে গেলো।কোনো কিছু গুরুত্বপূর্ণ মনে করে একটু পর পূর্ব নিচে গেলো।পূর্ব নিচে গিয়ে প্রথমে তার মাকে দেখলো।তার মা তার দিকে ফিরে তাকাতেই তিনি হেসে দিলেন।হাসির শব্দ শুনে পূর্বের বাবা পেছন ফিরে তিনিও হাসতে লাগলেন।তারা কেনো হাসছে পূর্ব কিছুই বুঝছে না।কিঞ্চিৎ রেগে পূর্ব বললো,"আমাকে দেখে তোমাদের জোকার মনে হয়?"
পূর্বের কথা শুনে তাদের হাসির মাত্রা আরো বেড়ে গেলো।হাসতে হাসতে পূর্বের মা বললেন,"তোকে জোকারের চেয়েও বাজে লাগছে।কাঁদা ভূত..হাহাহাহা।"
তার মায়ের কথা শুনে পূর্ব সত্যি সত্যি বোকা হয়ে গেলো।তখন পূর্বের সামনে কেউ একজন আয়না ধরলো।আয়নায় নিজের চেহেরা দেখে পূর্ব নিজেই ভ্যাচকা খেলো।খুব বাজে লাগছে আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি'টা।তার সামনে থেকে আয়না সরে যেতে দেখলো রোদের চেহারা।পূর্বের বুঝতে বাকি রইলো না আর এইটা কার কাজ।অমনি রোদের পেছনে তাড়া করলো।দু'জনে পুরা বাড়িতে দৌড়াদৌড়ি করতে লাগলো।
।
।
"কেমন আছো?"
"নিলয়,তোমার কী নূন্যতম লজ্জাটাও নেই?"
"কেনো?লজ্জা থাকতে হবে কেনো?"
"তোমাকে আমি কতোটা ইগনোর করছি তুমি বুঝতে পারছো না?"
"তুমি আমার উপর রেগে আছো তাই এমনটা করছো।আর গার্লফ্রেন্ড রাগ করলে বয় ফ্রেন্ড রাগ ভাঙ্গাবে এটাই স্বাভাবিক।"
"স্টপ সে ননসেন্স।তোমার সাথে আমার ব্রেকআপ হয়ে গেছে এন্ড ব্রেকআপ না হলেও কী?আমার পেছনে কেনো পরে আছো?তোমার মেয়ের কম পরেছে?"
"সব মেয়ে তো আর তুমি হলে না জানেমন।ইউ আর ডেঞ্জারাস!"
"কী চাও তুমি?তোমার সাথে রাত কাটাবো আমি?"
"এবার মেইন টপিকে আসলা।"
"হুয়াট ডু ইউ মিন?"
"আমার সাথে একরাত কাটাতে হবে তোমাকে।"
মেসেজটা পড়ে নাবিলা'র মুখটা কিছুক্ষণ হা করে রইলো।এতোদিন নাবিলা ভাবতো হয়তো নিলয় তাকে একটু হলেও ভালোবাসে।কিন্তু নিলয় তার সাথে ওয়ান নাইট স্পেন্ড করার জন্য এতোদিন মেসেঞ্জারে ডিসটার্ব করতো?নাবিলা নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে বললো,"নিলয়ের মতো ছেলের কাছে এর থেকে বেশি কিছু আশা করা মুশকিল।"নাবিলা নিজেকে যথেষ্ট কঠিন রেখে রিপ্লে দিলো,"ক'টা থেকে ক'টা থাকতে হবে?"
"ও এম জি!তুমি আসবে?"
"হুম।টাইম বলো?"
"সন্ধ্যা ছ'টা থেকে ভোর পাঁচটা।"
"কয় তারিখ যেতে হবে?"
"পরশু!"
"ওকে।"
নাবিলা এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করে অফলাইন হয়ে এলো।এখন তার ভিষণ কান্না পাচ্ছে।নিলয়ের কাছে দ্বিতীয় বারের মতো ঠকলো!কষ্ট'টা যেনো বুকের ভিতর নিজের স্থায়ী বাসা তৈরি করছে।দিন দিন কষ্ট বেড়েই যাচ্ছে।
।
।
নিলয়ের বুকের ভিতরটা খা খা করছে।তার মনে হচ্ছে নাবিলা কান্না করছে।আর অদ্ভুত ভাবে নাবিলা'র কান্নার কারণ সে নিজে।কিন্তু তার নিজের হাতেও যে কিছুই নেই।কেউ একজন যেনো তার হাত-পা শিকলে আবদ্ধ করে রেখেছে।হঠাৎ নিলয়ের মনে পড়লো সে তো নাবিলা'র কান্না শুনতে পারে অজানা নাম্বার হয়ে।নিলয় তাড়াতাড়ি নাবিলা'র নাম্বারে কল করলো।ওপাশে রিসিভ হলো ঠিকই কিন্তু কান্নার আওয়াজ ছাড়া কিছুই শুনা গেলো না।নিলয়ের চোখজোড়া লাল হয়ে এলো।কান্নাটা যেনো গলা বরাবর এসে ধাক্কাধাক্কি করছে।এতো কষ্ট কেনো হয় মানব-জাতির?
[চলবে]